নিমন্ত্রণ
“প্রিয় এলেন ও রব্বি,
‘তোমাদের’ দুর্গে ছুটি কাটানোর সুযোগ পাওয়াটা যে আমার কাছে কী সাংঘাতিক ব্যাপার, সে লিখে বোঝাতে পারব না। সত্যি বলতে কী, তোমরা এমন একটা চাকরি পেয়েছ জেনে অবধি হিংসেয় জ্বলছিলাম। না-জানি ওই দুর্গে কত ভূত-প্রেত আছে! তবে তোমরা যা বেরসিক, তেনাদের সঙ্গে তোমাদের দেখা-সাক্ষাৎ হবে বলে মনে হয় না।
তোমরা বলেছ, ২৯ তারিখ সকালে ফ্রেজার-রা চলে যাচ্ছে। আমি সেদিন রাত নামার আগেই পৌঁছোতে চেষ্টা করব। ভূতের ভয়ের চেয়েও, অন্ধকারে তোমাদের ডেরাটা খুঁজে না-ও পেতে পারি— এটাই বেশি ভাবাচ্ছে। স্কেচটা দেখে মনে হচ্ছে, পাহাড়চুড়োর ওই দুর্গে পৌঁছোনোর রাস্তাটা রীতিমতো ঘোরালো।
এমন দুর্ধর্ষ একটা নিমন্ত্রণের জন্য আবারও ধন্যবাদ আর প্রচুর-প্রচুর ভালোবাসা জানিয়ে,
জ্যানেট”
গ্লাসগো ছাড়ার পাক্কা এক সপ্তাহ আগে চিঠিটা পোস্ট করেছিলাম। তারপর ২৯ তারিখ এল। আমিও রওনা দিলাম।
উঁচু-নিচু রাস্তা, মাঠ, নদী, পাহাড়— সব পেরিয়ে উত্তর-পশ্চিম দিকে চলতে-চলতে গোটা দিন কেটে গেল। রব্বি ম্যাককিননের আঁকা স্কেচ-ম্যাপ যথাসাধ্য অনুসরণ করেও আমি রাস্তা গোলালাম। অন্ধকার ঘনাল। দু’ধার থেকে গাছপালা এগিয়ে এসে রাস্তাটাকে ঢেকে ফেলল। গাড়ির আলোয় হাত-কয়েক দূরের জিনিস দেখাও দুঃসাধ্য হয়ে উঠল। শেষে অবস্থা এমনই হল যে আমি রাস্তার একধারে গাড়িটাকে দাঁড় করাতে বাধ্য হলাম।
ঠিক তখনই, দূরে গাছপালার ফাঁক দিয়ে, উঁচু একটা জমির ওপর দুর্গটা দেখা দিল!
ঘোলাটে অন্ধকার আকাশের বুকে আরও জমাট একটা প্রকাণ্ড মুকুটের মতো চেহারার দুর্গটা দাঁড়িয়ে রয়েছে। দুর্গের ঠিক পেছনেই জমিটা খাড়া নেমে গেছে নীচে। সমুদ্র ওদিকে খাঁড়ির মতো করে এগিয়ে এসেছে বলে আকাশের শেষ আলোটুকু তখনও রুপোর মতো লেগে ছিল দুর্গের নীচে। সেই আলোর ছটা ধরা পড়েছিল দুর্গের কাচের জানালাতেও। পুরো দৃশ্যটা দেখে আমার গা-ছমছম করে উঠল। মনে হল, এইবার উপরের কোনও টাওয়ার থেকে একটা বাদুড় ডানা ঝাপটাতে-ঝাপটাতে বেরিয়ে এলেই ষোলোকলা পূর্ণ হবে।
বাদুড় না বেরোলেও টাওয়ারে একটা টিমটিমে কমলা আলো জ্বলে উঠল।
মনে-মনে ভাবলাম, ওটাই নির্ঘাত অ্যালান আর রব্বি’র থাকার ঘর। দেখলাম, ওই টাওয়ারের জানালার পাশ দিয়ে কে যেন হেঁটে গেল, তারপর আবার এসে দাঁড়াল। আমি হাত নেড়ে তাকে ডাকার আগেই সে আর পেছনের আলো— দুটোই গেল গায়েব হয়ে।
“যাচ্চলে!” আমি চেঁচালাম, “এত তাড়াতাড়ি ঘুমোও নাকি তোমরা?”
গাছপালার মধ্য দিয়ে একটা চওড়া ড্রাইভওয়ে দুর্গের মূল ফটকের দিকে এগিয়ে গেছে। গাড়ি ঘুরিয়ে সেই পথ ধরে গেটের সামনে এসে পৌঁছোলাম আমি।
গেট খোলা ছিল।
যাক বাবা! আমি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। কম-সে-কম পনেরো ফুট উঁচু আর বারো ফুট চওড়া ওই বিশাল লোহার ফটক ঠেলে গাড়ি ঢোকানোর মতো জায়গা করা আমার পক্ষে অসম্ভব হত। হেডলাইটে গেটের গায়ের বিশাল হুকগুলো ঝকমক করে উঠল। আমি গাড়ি ঢুকিয়ে কষে হর্ন বাজালাম।
সাড়া নেই!
এর মানে কী?
মোটে দশটা বেজেছে। অথচ হর্নের আওয়াজে কেউ বেরিয়ে আসা তো দূরের কথা, পুরো দুর্গটাই একেবারে ঘুটঘুট্টে অন্ধকার হয়ে আছে। তার মানে, এরা সত্যিই ঘুমিয়ে পড়েছে!
মহা মুশকিলে পড়া গেল! একটা টর্চ হাতে গাড়ি থেকে নেমে দুর্গের গায়ে আলো ফেললাম। সদর দরজা বন্ধ। চিঠিতে রব্বি একটা ছোটো দরজার কথাও লিখেছিল, যেটা কাজের লোকজন যাতায়াতের জন্য ব্যবহার করে। সেটাও দেখলাম বন্ধ।
চন্দ্রকলার মতো ফ্রেম-লাগানো জানালার ওপর আলো ফেলে ডাকাডাকি করছি, হঠাৎ মনে হল, কে যেন জানালার ওপাশে হেঁটে গেল!
আলোটা স্থির করতেই বুঝলাম, ভুল দেখেছি। জানালার ওপাশেই রয়েছে একটি মূর্তি। মার্বেলের তৈরি। লাজুক মুখে নীচের দিকে তাকিয়ে থাকা একটি মেয়ের। সেই মূর্তিটিই নির্জন পরিবেশে, এই অন্ধকারে, আমার কাছে অন্যরকম লেগেছে।
হঠাৎ একটা গাড়ির প্রবল গর্জন এসে আমার কানে একেবারে আছড়ে পড়ল। চমকে ঘুরতে গিয়ে হাত থেকে টর্চটা পড়ে গিয়ে নিভে গেল। নিচু হয়ে টর্চটা তুলছিলাম। একজোড়া হেডলাইটের তীব্র আলো গেটের মধ্য দিয়ে আমার ওপর পড়ল। মোরামের ওপর পড়ল গেটের শিকগুলোর লম্বা-লম্বা ছায়া। একজন… একটি পুরুষ নামল গাড়ি থেকে। তারপর গেটের গায়ে লাগানো লম্বা শেকল খুলে গেটটাকে গায়ের জোরে দু’দিকে সরাল। কাজ সেরে আপনমনে গাড়িতে গিয়ে বসল লোকটি। তখনই গাড়ির ভিতর থেকে এক মহিলার গলা পেলাম, “রব্বি! চাতালে কেউ একজন রয়েছে মনে হচ্ছে।”
গাড়িটা ভেতরে ঢুকল। দরজা খুলে রব্বি আর এলেন ম্যাককিনন নেমে এল।
“জ্যানেট!” এলেন চেঁচিয়ে উঠল, “তুমি এখানে কী করছ?”
“বাহ্!” আমারও মাথাটা গরম হল এবার, “এইভাবে বন্ধুকে স্বাগত জানাতে হয় বুঝি?”
“আহা, আমি তা বলিনি। তুমি তো সদা-সর্বদা স্বাগত। কিন্তু তুমি আমাদের এই দুর্গের ঠিকানা পেলে কোত্থেকে? আমরা তোমাকে চিঠি লিখবার কথা ভেবেছি। কিন্তু লেখা হচ্ছিল না।”
“কেউ একজন লিখেছিল।” আমি ‘যুদ্ধং দেহি’ মেজাজে বললাম, ‘তারা আবার নাম সই-ও করেছিল ‘রব্বি আর এলেন’ হিসেবে।”
“মানে?” রব্বি এতক্ষণে মুখ খোলার সুযোগ পেল।
“আশ্চর্য!” চিবিয়ে-চিবিয়ে বললাম, “তোমরাই তো চিঠি লিখে আমাকে বললে, ফ্রেজার-রা মাসখানেক থাকবে, আমি যেন সেই ক’টা দিন তোমাদের সঙ্গে থেকে ‘দুর্গাধিপতি’ হওয়ার আনন্দ নিই।”
“আমরা এইরকম একটা চিঠি লিখেছি ঠিকই।” এলেন সহমত হল, “কিন্তু সেটা আজ লেখা হয়েছে। আমরা আজকেই সন্ধেবেলা গ্রামে গিয়ে সেটাকে পোস্ট করেছি। সে যাকগে, তুমি এসেছ এটাই আসল ব্যাপার। ভালো কথা, তুমি কার কাছে জানলে যে আমরা ফ্রেজারের কাছে চাকরি করছি?”
“বলছিলাম কি…” রব্বি দু’হাত ঘষে বলল, “এই মনোজ্ঞ আলোচনাটা ভেতরে গিয়ে করলে হত না? ঠান্ডায় জমে যাচ্ছি তো! তুমি একটু কফি বসাও, এলেন। আমি ততক্ষণে গাড়িটাকে গ্যারেজে রেখে আসি।”
আমার ছোট্ট লাল রঙের মিনি-টা পেরিয়ে এগোতে গিয়ে রব্বি থমকে গেল। তারপর আমার দিকে ঘুরে বলল, “তুমি ঢুকলে কী-ভাবে?”
“গাড়ি চালিয়ে।” আমার এবার সত্যিই ক্লান্ত লাগছিল, “গেট খোলা ছিল। আমিও তাই…”
আমাদের চোখাচোখি হল। সবাই হাঁ-করে দাঁড়িয়ে রইলাম। অবশেষে এলেন বলে উঠল, “গেট তো বন্ধ ছিল।”
“ঠিক।” আমি বিড়বিড় করলাম, “আমি নিজেই দেখলাম, রব্বি গেটটা খুলল। তাহলে আমি নির্ঘাত অন্য কোনও গেট দিয়ে ঢুকেছিলাম।”
“আর কোনও গেট নেই, যেখান দিয়ে একটা গাড়ি ঢুকতে পারে। সে যতই ছোটো হোক না কেন— ।” এলেন শান্ত গলায় বলল।
“এখানে দাঁড়িয়ে নিউমোনিয়া বাধালে রহস্যের সমাধান হবে না।” রব্বি বলল, “কফি চাই!”
এলেন আর আমি করিডর ধরে এগোলাম। দু’পাশ থেকে একগাদা ছবি আর পোকায়-কাটা স্টাফ-করা মাথা আমাদের দেখছে। আমি বললাম, “বাকি চাকর-বাকরেরা হয় একেবারে বদ্ধ কালা, নয়তো রাত নামলে তারা ভয়ে দরজার কাছে আসে না। চেঁচিয়ে-চেঁচিয়ে গলায় ব্যথা হয়ে গেছিল, তবু কেউ আসেনি।”
“আসবে কোত্থেকে?” এলেন হাসল, “সব চাকর তো ফ্রেজারদের সঙ্গে রোম গেছে। এখানে তো আমরা দু’জন ছাড়া আর কেউ নেই।”
“অ্যাঁ!” আমি চমকালাম, “তাহলে টাওয়ারে আলো জ্বালাল কে?”
“টাওয়ারে আলো!” এলেন ঠোঁট বেঁকাল, “সেই স্কুল থেকে দেখে আসছি, তুমি ভয় পেতে ভয়ানক ভালোবাস। এখানে আর কোনও ভৌতিক বা অলৌকিক কিছু না পেয়ে তুমি কল্পনা করতে শুরু করে দিয়েছ।”
দরজা খুলে ঢুকে একটা সুইচ টিপল এলেন। নরম, অথচ উজ্জ্বল আলোয় আশেপাশের অন্ধকারটা তক্ষুনি একটা সাজানো-গোছানো রান্নাঘরের চেহারা নিল। ইলেকট্রিক স্টোভের ওপর একটা ঝকঝকে কেটলি বসানোই ছিল। সেটাতে জল আর কফি ঢেলে চালু করে দিল এলেন।
“আমরা এখান থেকে বেরোনোর আগেই সব গুছিয়ে বেরোই।” কাপ-ডিশ আর নানা পাত্র নাড়াচাড়া করার ফাঁকে বলল এলেন, “নইলে রব্বিকে তো চেনই। রীতিমতো চেঁচামেচি করতে থাকে। রান্নাঘরটা দারুণ, তাই না? দুধ?”
“অ্যাঁ?” আমি চমকে গেলাম। আসলে এলেন একটা কথা থেকে অন্যটাতে এত দ্রুত চলে যায় যে তাল রাখাই মুশকিল হয়ে পড়ে।
“কফিতে দুধ থাকবে তো?”
“তা থাকবে। কিন্তু…” কোট খুলে ঝাড়া হাত-পা হয়ে একটা চেয়ার টেনে বসলাম, “আমি স্পষ্ট দেখেছি, টাওয়ারে আলো জ্বলেছিল। আর তোমাদের কাছ থেকে কিন্তু সত্যিই চিঠি পেয়েছিলাম। নইলে আমি এখানে এলাম কী-ভাবে?”
“আমার কোনও ধারণাই নেই।” এলেন স্বভাবসিদ্ধ ডোন্ট-কেয়ার কানাকড়ি স্টাইলে বলল, “চিনি দেব তো? আমি আজকের আগে লিখিনি— এটা নিশ্চিত। তুমি লিখেছিলে, রব্বি?”
গরম কফি মুখে নিয়ে রব্বি হাত-পা ছুড়ে যে ঠিক কী বোঝাতে চাইল, তা ও-ই জানে। মানে ‘না, আমি লিখিনি’, ‘হ্যাঁ, আমি লিখেছি’, ‘মুখ পুড়ে গেল!’— এদের মধ্যে যে-কোনও একটা ভেবে নেওয়া যায় আর কী।
আমি না বুঝলেও এলেন কথাটা বুঝে নিয়ে বলল, “জানি। এটা কিন্তু সত্যিই রহস্যময় ব্যাপার।”
“আমি কিন্তু সেইদিনই উত্তর দিয়েছিলাম।”
“তেমন কোনও চিঠিও আমরা পাইনি।”
মনটা খারাপ হয়ে গেল। জিজ্ঞেস করলাম, “আমি কি আজ রাত্তিরটা এখানে কাটিয়ে কাল গ্লাসগো ফিরে যাব?”
“মানে!” এলেন একেবারে ফেটে পড়ল, “আমরা তোমাকে এখানে থাকার নিমন্ত্রণ জানিয়েই তো আজ চিঠিটা লিখেছি। তুমি ছুটিটা এখানেই কাটিয়ে যাবে।”
“আচ্ছা জ্যানেট…” রব্বি বলল, “আমাদের চিঠিটা, মানে যেটা তুমি পেয়েছ, সেটা আছে তোমার কাছে?”
“অবশ্যই।” আমি ব্যাগ থেকে কাগজগুলো বের করলাম, “তার সঙ্গে তুমি যে স্কেচ-ম্যাপটা দিয়েছিলে, ওটা না থাকলে তো আমি এই অবধি আসতেই পারতাম না।”
রান্নাঘরের টেবিলের ওপর আকাশি-নীল নোটপেপারে লেখা ও আঁকায়-ভরা কাগজগুলো রাখলাম। একটা কাগজে স্কেল-টেলের তোয়াক্কা না করে আঁকা একটা ম্যাপ ছিল। অন্যটাতে ছিল রব্বির মাকড়সার জালের মতো খুদে-খুদে আর জটিল হাতে লেখা নির্দেশমালা। তারই পেছনে এলেনের গোল-গোল হাতের লেখায় ছিল আরও ক’টা লাইন।
“কিছুই বুঝতে পারছি না।” বিরক্ত গলায় বলল এলেন, “এই চিঠিটাই তো আমরা আজ লিখে, আজকেই পোস্ট করেছি! আর ওই-রকম একটা পচা ম্যাপ রব্বি ছাড়া আর কেউ আঁকতেই পারে না।”
“আর কেউ কি জানে যে তোমরা এখানে আছ?” আমি বললাম, “মানে পুরোনো বন্ধুদের মধ্যে কেউ? তাদেরই কেউ হয়তো ইয়ার্কি মেরেছে আমাদের সবার সঙ্গে।”
“অসম্ভব।” মাথা নাড়ল এলেন, “আমরা এই কাজটা পেয়েইছি মোটে পাঁচ সপ্তাহ হল, সে-ও আবার খুব কম সময়ের নোটিসে। ফোন করে লোকজনকে খবরটা দিতেও পারিনি। ফ্রেজার-রা ছুটিতে যাওয়ার ব্যবস্থা করে তারপর কেয়ারটেকার খুঁজছিল। ফলে আমাদের হাতে সময়ই ছিল না। সব মিটিয়ে ওরা আজ রওনা দিল। আমরাও চিঠি লেখার সুযোগ পেলাম। আজ অনেকের উদ্দেশেই চিঠি পোস্ট করেছি, তবে নেমন্তন্ন কিন্তু শুধু তোমাকেই করেছিলাম।”
“খামটা আছে?” রব্বি ভ্রূ কুঁচকে চিঠিটা দেখতে-দেখতে বলল।
আমি খাম বের করে দিলাম। রব্বি জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি পোস্টমার্কটা দেখেছ?”
“না তো।” আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না, “কেন?”
“পোস্ট করার ছাপ আজকের, মানে ২৯ তারিখের।” রব্বি খামটা আমাকে ফেরত দিয়ে বলল, “আর ডেলিভার করার ছাপ তিরিশ তারিখের— মানে আগামীকালের।”
“আরে!” এলেন খামটা ছিনিয়ে নিয়ে বলল, “এই খামটাই তো পোস্ট করেছি। তোমার মনে আছে রব্বি, চিঠির স্তূপে এটা উলটো করে রাখা ছিল বলে আমি খামটা ডানদিকের কোণের বদলে অন্য কোণে আটকে ফেলেছিলাম। এখানে তো তাই-ই আছে!”
“বোঝো!” আমি হাল ছেড়ে দিলাম, “তবে এইরকম না হলেও ব্যাপারটা ঠিক জমে না। মানে প্রাচীন দুর্গ, করিডরে ওইসব মাথা ঝুলছে! এখানে অলৌকিক বা অবিশ্বাস্য কিছু না ঘটলে চলবে কী করে?”
“কিন্তু এখানে ও-সব কিচ্ছু নেই!” এলেন প্রতিবাদ জানাল, “মানে আসার আগে আমি একটু চিন্তায় ছিলাম ঠিকই। আসলে ভূতে বিশ্বাস না থাকলেও একটু ভয় তো থাকেই। কিন্তু এই পাঁচ সপ্তাহে দেখেছি, এই দুর্গের পরিবেশ একেবারে হালকা, খোলামেলা। এমনকি দেওয়ালে ঝোলানো ছবি থেকেও কেউ দাঁত খিঁচিয়ে বা পেটব্যথা চাপার মতো করে তাকিয়ে নেই। তোমার সঙ্গে মালপত্র নেই?”
“গাড়িতে।” বলে আমি উঠতে যাচ্ছিলাম। রব্বি আমাকে থামিয়ে সেগুলো আনতে গেল। আপত্তি জানালাম না। সারাদিন ধরে ওই রাস্তায় গাড়ি চালানোর পর লম্বা হওয়ার মতো একটা খাট চাইছিলাম তখন। এলেনকে কথাটা বলতেই ও একেবারে ছটফট করে উঠল।
“ওপরে চলো। ওখানে অতিথিদের জন্য একটা ঘর সাজানোই থাকে। একটা বালিশ দিলেই তুমি শুয়ে পড়তে পারবে। আচ্ছা, তুমি কি এখন স্নান করবে? তাহলে জল গরম করতে দেব। নাকি আপাতত একটা গরমজল-ভরা ব্যাগ পায়ের কাছে নিয়ে শোবে? তাহলে পা-দুটো একটু আরাম পাবে বোধহয়। বাথরুম ওইদিকে। আমি বরং ব্যাগে জল ভরি।”
সারাদিনের ক্লান্তির পর এলেনের ওই কথার তুবড়ির সামনে পড়ে আমার মাথা বনবন করে ঘুরছিল। তখনই সিঁড়িতে পায়ের শব্দ পেলাম আমরা।
“রব্বি তোমার মালপত্র নিয়ে চলে এসেছে।” এলেন দরজার দিকে এগোল, “কিন্তু সদর দরজার শব্দ পেলাম না কেন?”
“দাঁড়াও, আমি ওগুলো নিচ্ছি।” বলতে-বলতে প্যাসেজে বেরিয়েই এলেনের মুখ হাঁ হয়ে গেল। সেভাবেই ও বলল, “আরে! এখানে তো কেউ নেই।”
তখনই সদর দরজা দড়াম করে বন্ধ হওয়ার শব্দ পেলাম। সিঁড়ি দিয়ে মালপত্র টেনে আনার আর রব্বির পায়ের শব্দও শুনলাম দু’জনেই।
“হল!” রব্বি’র কাছ থেকে মালপত্র নিতে-নিতে গজগজ করল এলেন, “জ্যানেট কারমাইকেল এই দুর্গে এসে পৌঁছোতেই এখানে ভূতের নেত্য শুরু হয়ে গেল।”
যে ঘরটা আমার জন্য বরাদ্দ হয়েছিল, সেটা কিন্তু সত্যিই বেশ ভালো। গোলাপি রঙের দেওয়ালগুলো ঝলমল করছিল আলোয়। বড়ো জানালাটা তখন বন্ধ থাকলেও ওটা দিয়ে যে প্রচুর আলো-হাওয়া আসে, তা-ও বোঝা যাচ্ছিল। এলেন প্রায় ছুটোছুটি করে আমার জন্য বালিশ, জলের জগ, গ্লাস, হটওয়াটার ব্যাগ— এ-সবের ব্যবস্থা করল। আমি অবশ্য তার মধ্যেই শুয়ে পড়েছিলাম। বিছানার পাশে আলোর সুইচটা দেখিয়ে এলেন বলল, “আমি এখন আলো নিভিয়ে দিচ্ছি। কাল তাড়াতাড়ি ওঠার কোনও ব্যাপার নেই। যতক্ষণ খুশি ঘুমোও। শুভ রাত্রি।”
দরজা খোলাই রইল। এলেনের নেমে যাওয়ার শব্দ শুনতে-শুনতেই আমি ঘুমিয়ে পড়লাম।
একটু পরে আমি উঠে একবার টয়লেটে গেছিলাম। সেখান থেকে ফিরে বোধহয় আলো না নিভিয়েই ঘুমিয়ে পড়েছি। মাঝরাতে একবার ঘুম ভেঙে গেল। তখন দেখলাম, এলেন আমার দিকে ঝুঁকে আমাকে দেখছে। শেষে লেপ দিয়ে ভালোভাবে আমাকে ঢেকে দিয়ে, আলো নিভিয়ে ও বেরিয়ে গেল।
সকাল সাড়ে ন’টায় ঘুম থেকে উঠলাম। কনকনে ঠান্ডা, ঝলমলে রোদ, জানালার বাইরে পাখিদের ডাকাডাকি— এ-সব দেখে বুঝলাম, প্রকৃতির চেয়ে বড়ো মৃতসঞ্জীবনী সুধা আর কিছু হতে পারে না! ফ্রেশ হয়ে, মন-ভালো-করা ড্রেস পরে নীচে এলাম। এলেন ততক্ষণে ব্রেকফাস্ট বানানো শুরু করে অনেকদূর এগিয়েও গেছে।
আমি চেয়ার টেনে বসার সঙ্গে-সঙ্গে আমার সামনে দুধ, কর্নফ্লেক্স, কেক, সসেজ আর আরও একগাদা জিনিস সাজিয়ে দিল। আপত্তি জানিয়ে বললাম, “এত কিছু আমি কী করে খাব?”
“আলবাত খাবে।” এলেন ব্যস্তভাবে এদিক-ওদিক যাওয়ার ফাঁকে বলে চলল, “এখানে গ্লাসগো-র মতো করে খেলে নিজেই নিজেকে হজম করে ফেলবে। কাল রাতে ভালো ঘুম হয়েছিল তো? দিনটা কিন্তু দুর্দান্ত! এই গ্রিলটা যাচ্ছেতাই। আমি স্টোভ দিয়ে কী সুন্দর সব বানাতে পারি, এটাকেই ম্যানেজ করতে পারি না। আচ্ছা, তোমার পাউরুটিগুলোর একটা দিক একটু পুড়ে গেলে অসুবিধে নেই তো। দুধটা বেশি করে খেয়ো।”
কথা না-বাড়িয়ে খাওয়ায় মনোনিবেশ করলাম। তাজ্জব ব্যাপার! মোটামুটি সব খেয়েও ফেললাম। বাসনগুলো সিংকে রাখতেই এলেন বলল, “এবার যাও তো! আমি জানি, তুমি ঘুরে বেড়ানোর জন্যই এসেছ। ফ্রেজারদের ঘরগুলো তালাবন্ধ করা আছে। ওগুলো বাদ দিয়ে যেখানে খুশি যাও।”
“যাচ্ছি।” আমি বেরোবার আগে বললাম, “কাল রাতে যা ঘুমিয়েছি, কী বলব! ভাগ্যিস তুমি এসে আমাকে লেপ দিয়ে ভালোভাবে মুড়ে, আলো নিভিয়ে দিয়ে গিয়েছিলে।”
“আমি? ধুর! আমি আর রব্বি সকালে উঠেছি। তখন তোমার ঘরের আলো নেভানোই ছিল। তবে হ্যাঁ, যে-ভাবে নাক ডাকাচ্ছিলে তাতে বোধহয় মাইল-ছয়েক দূরের গ্রাম থেকেও আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। ওইরকম ঘুমোলে স্বপ্নে যা-খুশি দেখা যায়। এখন বেরোও। লাঞ্চ হলে আমি তোমাকে ডাকব।”
কথাটা মনে ধরল। বেরিয়ে পড়লাম। এদিক-সেদিক ঘুরে একটা করিডরে ঢুকলাম। দু’ধারের দেওয়ালে ‘তুষারঝড়ে মেষপালক ও ভেড়ার দল’, ‘সমুদ্রে ডুবু-ডুবু জাহাজ’— এইরকম নানা দৃশ্যের প্রচুর ছবি টাঙানো ছিল। সেখান থেকে বাঁদিকে ঘুরতেই আমি একটা বেশ বড়ো ঘরে ঢুকলাম।
ঘরটাতে কম-সে-কম গোটা ষাটেক মূর্তি রয়েছে। অধিকাংশই নারীমূর্তি, তাদের মধ্যে আমি কাল রাতে দেখা লাজুক মেয়েটিকেও খুঁজে পেলাম। মূর্তিতে মেয়েটির হাতে ধরা একটা ছোট্ট ব্যাঙ দেখে মনে হল, এ নির্ঘাত ‘ব্যাঙ রাজপুত্র’ গল্পের সেই চরিত্রটি। চারপাশে তাকিয়ে বুঝলাম, রূপকথা, উপকথা, পুরাণ— সব-রকম উৎস থেকেই অনুপ্রেরণা নিয়ে গড়া হয়েছে এই মূর্তিগুলোকে।
দেওয়াল থেকে একগাদা তৈলচিত্র আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। সেগুলোকে পাত্তা না দিয়ে এগিয়ে গেলাম। ঘরের আরেক প্রান্তে একটা ছোট্ট দরজা। মনে হল, এই ঘরটাকে যদি কোনও পাঁচমিশেলি নাটকের মঞ্চ হিসেবে ভাবি, তাহলে ওই দরজার ওপাশে একটা গ্যালারিতে সঙ্গীতশিল্পী আর বাদ্যকারদের বসার কথা। কিন্তু বিস্তর টানাটানি করেও সেই দরজাটা খুলতে পারলাম না।
বড়ো ঘরটা থেকে এদিক-ওদিকে যাওয়ার আরও বেশ কয়েকটা দরজা ছিল। এক কোণের দরজা দিয়ে বেরিয়েই সামনে দুটো বিশাল দরজা পড়ল। মনে-মনে টস্ করে বাঁ-দিকের দরজাটা বাছলাম। গায়ের জোরে ঠেলার পর দুটো পাল্লা যেন নিতান্ত অনিচ্ছেয় ফাঁক হল। আমি একটা লম্বা লাইব্রেরিতে ঢুকলাম।
এই ঘরে কোনও ছবি নেই, তবে কাঠের সূক্ষ্ম কাজ আর নকশায় ছাদ একেবারে ঠাসা। একদিকের দেওয়ালে চারটে বিশাল জানালা দিয়ে বাইরের বাগান দেখা যাচ্ছে। অন্য দেওয়াল তিনটে ফুটদশেক উঁচু-উঁচু বিশাল বুককেসের আড়ালে ঢাকা। মনে হল, বইয়ের সমুদ্রে ডুবে গেছি! স্কট, স্টিভেনসন, ভলতেয়ার, দুমা, গ্যেথে… কেউই বাদ পড়েননি দেখলাম। সবচেয়ে বড়ো কথা, গদি-আঁটা চেয়ার, সোফা, কুশন— সব দেখে মনে হল, পড়ার চাপ বেশি হয়ে গেলে ছোট্ট করে এক রাউন্ড ঘুমও দেওয়া যাবে।
ভাবনায় পড়লাম, এখানেই একটা বই হাতে নিয়ে আধশোয়া হব, নাকি দুর্গের বাকি ঘরগুলো দেখব। অনেক ভাবনা-চিন্তা করে দ্বিতীয়টাই করার সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু পেছন ফিরে বেরোতে গিয়ে দেখি, দরজা বন্ধ!
অবাক যে হলাম, সে তো বলাই বাহুল্য। এইরকম ভারী দরজা নিজে থেকে বন্ধ হওয়া প্রায় অসম্ভব। তার ওপর দরজাটা টেনে দেখি, সেটা লকড্। হাতল ঘুরিয়ে সেটা খুলে বেরোলাম বটে, কিন্তু ব্যাপারটা ভারি অদ্ভুত লাগল। ওটাকে আবার টেনে বন্ধ করতেই ‘ক্লিক্’ করে একটা আওয়াজ হল। অন্য দরজাগুলো খোলা-বন্ধ করেও দেখলাম একই ব্যাপার হল— মানে বন্ধ হলেই সেই ‘ক্লিক্’ করে শব্দটা হচ্ছিল প্রত্যেকবার— যেটা আমি লাইব্রেরিতে থাকার সময় পাইনি।
যাকগে! আমি চিরকাল এইরকম গা-ছমছমে পরিবেশ চেয়েছি। এই দুর্গে তেমন কিছু না পেলে আমি কল্পনাই করে নিতাম। তার বদলে একেবারে খাঁটি ভুতুড়ে ব্যাপার-স্যাপারই হচ্ছে আমার সঙ্গে।
দু’নম্বর দরজাটা ঠেলে একটা বড়ো বসার ঘরে ঢুকলাম। বেশিরভাগ চেয়ার-টেবিলই দেখে মনে হচ্ছিল, এগুলো বসার নয়— শুধুই দেখার জন্য রাখা। একটা শক্তপোক্ত চেয়ার বেছে নিয়ে তাতেই বসলাম। দেখলাম, যথারীতি খান-কয়েক জানালা ছাড়া সব দেওয়াল তৈলচিত্রে ভরপুর। সেখান থেকে সুন্দরী মহিলারা নাক কুঁচকে তাকিয়ে ছিলেন আমার দিকে। একজন তো এমনভাবে হাতপাখা নাড়ছিলেন যে দেখে মনে হল, আমার মতো একজন অতি সামান্য মানুষের উপস্থিতি তিনি মোটেই মেনে নিতে পারছেন না।
“ওর’ম করে পাখা নাড়ানোর কিছু হয়নি কিন্তু!” আমি রেগে গিয়ে বললাম। মহিলা পাত্তা না দিয়ে হাতপাখা নাড়তে থাকলেন।
কী হল!
সোজা হয়ে বসে একবার ছবিটাকে দেখলাম। তারপর এদিক-ওদিক তাকিয়ে ভাবলাম, আমি কি জেগে-জেগে স্বপ্ন দেখছি? ছবির ভেতর হাতপাখা কী-ভাবে নড়তে পারে? আলো-ছায়ার খেলা নাকি? কিন্তু… এত জীবন্ত?
বিরক্ত হয়ে, পায়ের ওপর পা তুলে বসলাম।
স্পষ্ট বুঝতে পারলাম, ঘরজোড়া ছবিতে মহিলারা বিরক্ত আর ক্রুদ্ধ হয়ে আমাকে নিয়ে বলাবলি করছেন। আমি এদিক-ওদিক ঘুরেও তাঁদের কাউকে হাতেনাতে ধরতে পারলাম না ঠিকই, কিন্তু ব্যাপারটা যে হচ্ছে— এটা কিছুতেই উপেক্ষা করতে পারলাম না।
বিরক্ত হয়ে উঠে পড়লাম। ঘরটা মোটেই ভালো লাগছিল না। বেরিয়ে এসে দরজা বন্ধ করা-মাত্র মনে হল, ‘ক্লিক্’ শব্দের মতোই যেন অনেকের স্বস্তির নিঃশ্বাসের শব্দও পেলাম।
মূর্তিতে ভরা ঘরটায় ফিরে একেবারে অন্যদিকে হাঁটা দিলাম। ওদিকে একটা ঘোরানো সিঁড়ি পেঁচিয়ে-পেঁচিয়ে অনেক উপরে উঠে গেছে। তার পাশের দেওয়ালে জানালা ছিল বটে। কিন্তু একে তো তার কাচগুলো রঙিন, তায় নানা ধরনের ছবিতে ভরা। সব মিলিয়ে আলোর বদলে অন্ধকারটাই তার ফলে আরও ঘন আর সজীব হয়ে উঠেছে। সিঁড়ির ধারের হাতলটা কাঠের— তাতেও নকশা একেবারে গিজগিজ করছে। একটা নকশা দেখে মনে হল, নানারকমের ফলে ভরা একটা পাত্রের মধ্য থেকে ফুল ফুটে রয়েছে। কৌতূহলী হয়ে কাছ থেকে দেখতে গিয়ে চমকে গেলাম।
ফুলের মধ্য থেকে একটা শয়তানি-ভরা মুখ যেন আমার দিকে তাকিয়ে!
চমকে পিছিয়ে গিয়ে অন্যদিকে হাত দিতেই মনে হল, কে যেন কামড়ে দিল।
হাত সরিয়ে সেদিকে তাকিয়ে দেখলাম, ওইরকমই শয়তানি-ভরা একটা হাসি-হাসি মুখের মধ্যে আমার হাতটা পড়েছিল। তার ধারালো দাঁতের খাঁজে খোঁচা খেয়েছি আমি।
অকারণে নার্ভাস হয়ে এই অবস্থা হচ্ছে ভেবে নিজেকে খুব করে বকা দিলাম। তারপর উঠতে শুরু করলাম। বড়োজোর তেরো পা যেতে-না-যেতে মনে হল, কেউ পেছন থেকে আমাকে দেখছে। মানে শুধু দেখছে না, রাগে আমাকে প্রায় ভস্ম করে দিতে চাইছে সে। বাধ্য হয়ে পেছনে ঘুরেই আঁতকে উঠলাম।
ফ্যাকাশে মুখে, ধূসর পোশাক পরে লেডি ম্যাকবেথ রক্তমাখা দু’হাত সামনে বাড়িয়ে আমার দিকে উঠে আসছিলেন!
ভয়ে আগু-পিছু করতে গিয়ে আরেকটু হলেই পা পিছলে নীচে পড়তাম। নিজেকে সামলে নিয়ে বুঝলাম, সিঁড়ির ঠিক মুখেই রাখা আরও একটা তৈলচিত্রে রঙিন কাচ হয়ে আসা আলো আর আশেপাশের অন্ধকার মিশে ওইরকম একটা ব্যাপার মনে হচ্ছিল। তবে মহিলার মুখ দেখে মনে হচ্ছিল, হাতে পেলে বোধহয় উনি আমাকে সত্যিই মেরে-টেরে ফেলবেন! নাক কুঁচকে মহিলার উদ্দেশে হাত নেড়ে আমি আবার উঠতে শুরু করলাম।
আরও ছাব্বিশ পা উঠে তবে সবচেয়ে ওপরের ঘরটাতে পৌঁছোনো গেল। ওখানে মেঝেটা দুর্দান্তরকম পালিশ করা। ঘরের দেওয়ালে সার দিয়ে জানালা থাকায় রোদ ঢুকে ঘরটাকে একেবারে আলো-ঝলমলে করে রেখেছে। দূরের একটা জানালার খাঁজে বেশ আরাম করে বসে পা দোলাতে-দোলাতে আপন ভাবনায় ডুবে গেলাম কিছুক্ষণের মধ্যেই।
“লাঞ্চ!”
চমকে উঠলাম বললে কিছুই বলা হয় না। বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করে উঠল। হাতের তেলো ভিজে গেল। মানে একেবারে যা-তা অবস্থা যাকে বলে।
“চলে এসো, জ্যানেট। বেশি সময় লাগিয়ো না।”
ঘুরে তাকাতে-তাকাতে শুধু একটা নড়াচড়ার মতো কিছু দেখলাম। তারপর খেয়াল হল, ওদিকেও একটা সিঁড়ি আছে। সেটা ধরে এলেনের নেমে যাওয়ার শব্দ পেলাম। ততক্ষণে ভয়ের ভাবটা একটু কমেছিল। আমিও সেই সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করলাম।
মাঝ সিঁড়িতে এলেনের সঙ্গে দেখা হল।
“যাক, তোমাকে পেয়ে গেছি।” বলল এলেন, “লাঞ্চ রেডি কিন্তু।”
“আমি তো আগেরবারই শুনেছিলাম।” ওর সঙ্গে নামতে-নামতে বললাম, “চমকে উঠে হার্টফেলই করছিলাম আর একটু হলে!”
“আগেরবার মানে?” এলেন অবাক হল, “আমি তো তোমাকে এদিক-ওদিক খুঁজছিলাম। ওপরেই যে পাব তোমাকে— তা-ও তো জানতাম না।”
“আরে আমি স্পষ্ট শুনলাম! তুমি এই সিঁড়ি দিয়ে নামলে বললেই তো আমি এদিক দিয়ে নামছিলাম। নইলে তো বড়ো, ঘোরানো সিঁড়িটা ধরতাম।”
“তোমাকে নিয়ে আর পারা গেল না।” এলেন বকবক শুরু করল, “ভুল দেখা আর ভুল শোনা চলছেই। এদিকে রব্বি বোধহয় খাওয়া শুরুও করে দিয়েছে। লোকটা কিছু খেতে পারে আজকাল! অবশ্য সারাদিন ধরে বাগান আর হট হাউসে খাটাখাটনি করলে খিদে হওয়াটাই স্বাভাবিক। ওই সিঁড়ির মুখে লেডি ম্যাকবেথ-কে দেখেছিলে? মহিলার মুখটা এমন করুণ যে বিশ্বাসই হয় না, উনি খুন-খারাপির মধ্যে থাকতে পারেন! রব্বি একটা গর্তে পড়ে গেছিল সকালে। কাদা মেখে একেবারে ভূত হয়ে ফিরেছে। তা-ও ও এখানে এসে অবধি খুব হাসিখুশি রয়েছে। স্বাভাবিক। কারখানায় চাকরির পর এইরকম কাজ পেয়ে আমাদের দু’জনেরই খুব ভালো লাগছে। দুপুরে কিন্তু হরিণের মাংস হয়েছে।”
এলেন একেবারে পাহাড়প্রমাণ রান্না করেছিল। আশঙ্কা হচ্ছিল যে রুটি, মাংস, ফল, কেক, ক্রিমের ভারে টেবিলটা না ভেঙে পড়ে! সে-সব মিটলে এলেন বলল, “মিস্টার ফ্রেজারের ঠাকুমার মা’র বেশ কিছু শৌখিন পোশাক আছে ওপরে। মিসেস ফ্রেজার আমাকে বলেছিলেন, ওর মধ্যে যেগুলোর অবস্থা শোচনীয় সেগুলো বাতিল করে বাকিগুলো রেখে দিতে— যাতে ফ্যান্সি-ড্রেস অনুষ্ঠানে বা অন্য কিছুতে কাজে লাগানো যায়। সেগুলো ঝাড়াই-বাছাই করায় তুমি আমাকে একটু সাহায্য করতে পারবে?”
সোৎসাহে রাজি হলাম। থালাবাটি ধোয়ার পাট চুকলে এলেনের সঙ্গে গেলাম দুর্গের একেবারে ওপরে, একটা মাঝারি মাপের ঘরে। ঘরটার একদিকের দেওয়ালের জানালা দিয়ে দূরে পাহাড়গুলো দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু ওখানে বসে দূরের দৃশ্য দেখার বুকভরা আশা একেবারে ধুক্ করে নিভে গেল একগাদা ড্রয়ার আর ট্রাংক দেখে। আমি আর এলেন ট্রাংকের ঢাকনা খুলে নানা রঙ, ডিজাইন আর উপাদান দিয়ে বানানো কাপড়গুলো বের করেই চললাম। তাতে যে পরিমাণ ধুলো উড়ল, বুঝলাম, নেমে গিয়েই আরেকদফা স্নান করতে হবে।
“মহিলা কতদিন বেঁচেছিলেন?” থাকতে না পেরে বলেই ফেললাম, “এইরকম পোশাক তো অনুষ্ঠান কি উৎসব ছাড়া পরাও যেত না। তাতেও, এতগুলো পোশাক কি এক জীবনে পরা যায়?”
যা-যা বেরোল সেগুলো যথাসাধ্য গোছালাম। বেশ কিছু পোশাক খুবই জরাজীর্ণ হয়ে গিয়েছিল বলে বাতিল করা হল। কিন্তু বিস্তর লড়েও একটা ট্রাংকের ঢাকনা খোলা গেল না।
“একটা হাতুড়ি বা ওইরকম কিছু নিয়ে আসি।” বলে উঠে দাঁড়িয়ে, ধুলোর ঝড় তুলে নেমে গেল এলেন।
একা-একা থাকলেই আমার মাথায় দুনিয়ার ভাবনা এসে ভিড় করে। আনমনে একটা সবুজরঙা সিল্কের গাউন ভাঁজ করতে গিয়ে হঠাৎ মনে হল, আমাকে এইরকম পোশাকে কী-রকম দেখাতে পারে? সোয়েটারটা খুলে মাথার ওপর দিয়ে গাউনটাকে চড়ালাম। একটা আয়না পাই কোথায়? এই ভেবে, পেছনে হাত দিয়ে গাউনটা ফিট করতে-করতেই সিঁড়ি দিয়ে এলেনের উঠে আসার শব্দ পেলাম।
এলেন কিন্তু দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল না!
আমি অবাক হয়ে শুনলাম, ঘরের দরজার সামনে দিয়ে পায়ের শব্দটা পাশের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। সেই ঘরের দরজা খোলার আর বন্ধ হওয়ার শব্দ পেলাম। ওটা যে এলেনই ছিল এ-ব্যাপারে আমি নিঃসন্দেহ। সিঁড়ির দিকের একটা জানালার ধুলোমাখা কাচের মধ্য দিয়ে ওর বেঁটে কিন্তু চটপটে চেহারাটাকে মোটামুটি স্পষ্টভাবেই দেখা গিয়েছিল। ভাবলাম, হয়তো হাতুড়ির সন্ধানে ও পাশের ঘরে গেছে। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ পরেও ওকে না আসতে দেখে আমিই এলেনের সন্ধানে বেরোলাম।
ওকে চমকে দেব ভেবে একটা প্ল্যান করেছিলাম। সেইমতো, পাশের ঘরের দরজাটা খুলে, একদম অভিনেত্রীদের মতো করে নিজেকে ঈষৎ সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে সম্মান জানালাম। কিন্তু মাথা তুলেই সাংঘাতিক চমকে গেলাম!
একঘর মহিলা ঠিক আমারই মতো পোশাক পরে, আমারই মতো করে সামনে ঝুঁকে, মাথাটা সামান্য ওপরদিকে তুলে আমার দিকে চেয়ে আছেন।
বুক ধড়ফড় করা থামলে নিজের অবস্থা ভেবে সাংঘাতিক রাগ হল। আসল ব্যাপার অতি সামান্য। ঘরটার তিনদিকে কাঠের প্যানেল-জুড়ে আয়না বসানো ছিল। তাই আমি নিজেকেই ‘দলে-দলে’ দেখছিলাম। মাথা ঠান্ডা হলে মনে পড়ল, আমি আয়নায় নিজেকে দেখার কথা ভাবছিলাম একটু আগেই। সেইরকম একটা ঘরে যখন ঢুকেই পড়েছি, তখন সুযোগটা হাতছাড়া করা উচিত হবে না।
ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে, মাথার ওপর জ্বলা ঝাড়বাতিতে নিজেকে দেখে বেশ ভালোই লাগল। যথারীতি আরও একগাদা সম্ভাবনা উদয় হল। মাথার চুলগুলোকে যদি পুরোনো ফ্যাশনে ওপরদিকে চুড়ো করে তোলা যায়, বা মেক-আপটা একটু অন্যরকম করা যায়… এলেনের পরামর্শ নিতে পারলে হত।
আমি যে এলেনকে খুঁজতেই এই ঘরে ঢুকেছিলাম, সেটাই এতক্ষণ ভুলে ছিলাম! ও নিশ্চয় অন্য কোনও ঘরে ঢুকেছে। আমিও তাহলে এবার বেরোই। কিন্তু…
দরজা কই?
এতক্ষণ খেয়াল না করলেও এইবার আমি বুঝতে পারলাম, ঘরটাতে কোনও আসবাব নেই। আর সেটার তিনটে দেওয়ালে নয়, চারটে দেওয়াল জুড়েই রয়েছে সারি-সারি আয়না! আমি ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে চারদিক দেখলাম। কোনটা সামনে দিক, আর কোনটা পিছন— সবই গুলিয়ে যাচ্ছে। আমার ভেতর থেকে আতঙ্কের একটা ঢেউ উঠে আসছিল। অতি কষ্টে নিজেকে সামলে আমি আয়নাগুলোকে খুঁটিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম। আমার হিসেবটা সহজ। দরজা থাকলে তাতে হাতল থাকবেই। আয়নার পাশ দিয়ে সেটা দেখাও যাবে! কিন্তু কোথায় সেটা?
আমার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঘুরছে ঘরজোড়া আয়নায় প্রতিফলিত সবুজ গাউন পরা সুন্দরীদের দল। আমারই মতো করে তারা খুঁজে নিতে চাইছে দরজার হাতলটাকে। আমি যত তাড়াতাড়ি ঘুরছি আর সরছি, তারাও ঘুরছে আর সরছে তত তাড়াতাড়ি। এই ঘর থেকে বেরোবার রাস্তা খুঁজছি আমি। কিন্তু আয়নার মেয়েদের দেখে মনে হচ্ছে, হাতে ধরা পাখাটাকে আলগোছে দুলিয়ে তারা যেন নাচছে! নিপুণ হাতে চুড়ো করে বাঁধা তাদের চুল যেন সেই নাচের তালে-তালে দুলছে এপাশ থেকে ওপাশে। আমার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই তারা যেন সহাস্যে মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানাচ্ছে।
অনড় হয়ে ঘরের মাঝে দাঁড়িয়ে পড়লাম আমি।
আমার হাতে তো কোনও পাখা নেই! চুলও তো একেবারে খোলা হয়ে কাঁধের ওপর পড়ে আছে। তাহলে আয়নায়… ওরা কারা?
মেয়েগুলো নেচেই চলল। আমি এদিক-ওদিক ঘুরেও দরজার হাতল না পেয়ে পাগলের মতো চিৎকার করতে লাগলাম। আওয়াজ আমার গলা থেকে বেরিয়েই মিলিয়ে গেল। তবু আমি থামলাম না। চিৎকার করে কাঁদতে-কাঁদতে আমি মাটিতে বসে পড়লাম। মাথার ওপর দিয়ে টেনে, প্রায় ছিঁড়ে বের করে আনলাম সবুজ গাউনটাকে। তবু মেয়েগুলোর নাচ থামল না। সবুজ সিল্কের একটা সমুদ্রের মতো তারা আমার চারপাশে ঘুরেই চলল… ঘুরেই চলল!
“আরে জ্যানেট, তুমি এই ঘরে কখন ঢুকলে?”
দরজা খুলে এলেন মুন্ডুটাকে ঘরে ঢুকিয়েছে দেখেই আমি তারস্বরে আবার চিৎকার করলাম। এবার ও সত্যিই উদ্বিগ্ন হয়ে ভেতরে এসে বলল, “কী হয়েছে?”
“ওই মেয়েগুলো!” আমি কাঁপতে-কাঁপতে উঠে দাঁড়ালাম কোনও রকমে, “ওরা নাচছিল।”
“কোন মেয়েগুলো?” এলেন উদ্ভ্রান্তের মতো এদিক-ওদিক তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “এখানে তো আমরা দু’জন ছাড়া কোনও মেয়েকে দেখতে পাচ্ছি না।”
নিতান্ত অনিচ্ছার সঙ্গেই আমিও চোখ তুলে চারদিকে তাকালাম। এলেন ঠিকই বলেছে! ও আর আমি ছাড়া আর কেউ ছিল না আয়নায়।
“আমি বেরোতে পারছিলাম না।” অসহায়ভাবে এলেনকে বললাম, “দরজাটা কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছিলাম না। ঘরে কোনও জানালা নেই। আলোটা কে জ্বালাল? আমি… আমি ভীষণ ভয় পেয়েছিলাম, এলেন! তার মধ্যে ওই সবুজ মেয়েগুলো…!”
“এর মধ্যে আবার সবুজ মেয়ে কোত্থেকে এল?” এলেন বিরক্ত হল, “তুমি নীচে চলো তো। হাতুড়ি পেয়েছি, তবে সে-সব পরে হবে। আপাতত কড়া চা খাইয়ে তোমার নার্ভগুলোকে একটু ঠান্ডা করি।”
নীচে, রান্নাঘরের ঘরোয়া উষ্ণতা আর আলোর মধ্যে বসে অনেকটা স্বাভাবিক হলাম। চা খেয়ে, সোয়েটার চাপিয়ে এলেনের ব্যাখ্যা শুনলাম।
“একে-একে বলি।” চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল এলেন, “ওই আয়নাঘরটা বানানোই হয়েছিল কস্টিউম ড্রামা আর বল ড্যান্সের পোশাক-পরিচ্ছদ পরে দেখার জন্য। ঘরে জানালা থাকলে একটা বিশেষ দিক থেকে আলো আসে। ফলে প্রতিচ্ছবিগুলো ঠিক নিখুঁত হয় না— এমনটাই মিস্টার ফ্রেজারের বক্তব্য। তাই ও-ঘরে জানালা নেই। লাইটের সুইচ নেই, কারণ ওখানে সেন্সর লাগানো আছে। ঘরে কেউ ঢুকলে সেন্সর সেটা বুঝে নেয়, মাথার ওপরের ওই ঝাড়বাতিটাও জ্বলে ওঠে তখনই। দরজাটা লুকোনো আছে, তবে সেটা খুঁজে পাওয়ার রাস্তাও আছে। ঘরের মেঝেটা এমনিতে হালকা রঙের। তবে একটা বিশেষ আয়না-বসানো ফ্রেমের সামনে দেখবে, মেঝেটা গাঢ় রঙের আর সামান্য ঢালু হয়ে গেছে। ওই ফ্রেমের পেছনে হাত দিলেই দরজার হাতলটা পেয়ে যেতে তুমি।”
“ওহ!” একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চায়ের কাপে মন দিলাম।
“আমি তোমাকে ওই ঘরটাতে নিয়ে যেতাম। দেখি, তুমি তার আগেই ওখানে চলে গেছ! কিছু খুঁজছিলে ওই ঘরে?”
“আমি ওই গাউনটা পরার সময় তোমার পায়ের শব্দ পেয়েছিলাম। শুনলাম, তুমি দরজার পাশ দিয়ে এগিয়ে ওই ঘরটাতে বা অন্য কোনও একটা ঘরে ঢুকলে। তোমাকে খুঁজতেই ওই ঘরে গিয়েছিলাম।”
“আমি তো ওপরে যাইনি!” এলেন হাঁ হয়ে গেল, “নীচে এই হতচ্ছাড়া হাতুড়ি খুঁজতে বিস্তর সময় লাগল। ওটা নিয়ে ওপরে গিয়ে দেখি, তুমি ঘরে নেই। এদিক-ওদিক খুঁজছিলাম তোমায়। তখন ওই ঘরের মধ্য থেকে তোমার কান্নার শব্দ পেয়ে ওই ঘরের দরজা খুললাম। কিন্তু জ্যানেট, তুমি নিজেকে এবার একটু সামলাও। এ-ভাবে ভয় পেতে থাকলে কী করে চলবে? চলো তো, আমার সঙ্গে একটু ঘুরে আসবে।”
বাধ্য মেয়ের মতো আমি এলেনের সঙ্গে ঘুরে বেড়ালাম দুর্গের লাগোয়া জায়গাটায়। পাইনের গন্ধমাখা কনকনে ঠান্ডা হাওয়া আসছে পাহাড়ের দিক থেকে। রোদও ঝলমল করছে। নানা রঙের ফুলগাছে ভরা বাগান, ফল-চাষের জন্য হট-হাউস, দেওয়াল-ঘেরা একটা সবজি-বাগান— এ-সব দেখতে-দেখতে আমার মন থেকে ভুলভাল ভাবনাগুলো সব উধাও হয়ে গেল।
ঘাসজমি থেকে নীচে নামার জন্য পাথর কেটে সিঁড়ির ধাপের মতো করা। সেই পথ ধরে আমরা নীচে নামলাম। একটা ফোয়ারা থেকে জল বেরিয়ে আসছে। পাথরের জিভের মতো একটা অংশে ধাক্কা খেয়ে জলটা দু’ভাগ হয়ে লতানে গাছের ঝাড়গুলোকে ভিজিয়ে আবার নীচে পড়ছে। জিনিসটা দেখতে বেশ লাগছিল। আমি খানিকক্ষণ দেখে এলেনকে জিজ্ঞেস করলাম, “এই পাথরের জিভটা কি পরে বানানো হয়েছিল, না গোড়া থেকেই ছিল?”
উত্তর পেলাম না বলে একটু আগেও এলেন যেখানে ছিল, সেদিকে ঘুরলাম।
এলেন নেই!
আমার যাবতীয় ভয় একেবারে দুদ্দাড় করে ফিরে এল। আমি চিৎকার করে উঠলাম, “এলেন! কোথায় তুমি?” সাড়া পেলাম না। বরং সিঁড়িতে লেডি ম্যাকবেথের বেলায় যেমন হয়েছিল, ঠিক তেমন অনুভূতিই ফিরে এল আবার। মনে হল, যেন আমার পেছনে দাঁড়িয়ে কেউ প্রচুর রাগ আর ঘৃণা মিশিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
পেছন ফেরার মতো সাহস ছিল না। কিন্তু ওভাবে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকব? দাঁতে দাঁত চিপে, একটু-একটু-করে পেছনদিকে ঘুরলাম।
জল, পাথর, লতানে গাছ— এ-সব ছাড়া আর কিচ্ছু ছিল না ওখানে। তা-ও আমি কোনওক্রমে বললাম, “এলেন?”
“কী?” একটা ঝোপের পেছন থেকে, হাতে কয়েকটা সদ্য-ওপড়ানো আগাছা নিয়ে উঠে দাঁড়াল এলেন।
“তু…তুমি!” আমি তোতলা হয়ে গেলাম, “তুমি এখানেই ছিলে? তাহলে সাড়া দিচ্ছিলে না কেন? আমি তো ডাকছিলাম।”
“কই, শুনিনি তো!” সত্যিই অবাক হল এলেন, “আসলে নিচু হয়ে ছিলাম বলে জলের আওয়াজে তোমার গলা চাপা পড়ে গেছিল বোধহয়। ডাকছিলে কেন?”
“না। তেমন কিছু না।” আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। কী-ই বা বলতাম ওকে?
“এবার আমি রান্নাঘরে যাব, বুঝলে।” এলেন অন্যমনস্কভাবে বলল, “রান্না শুরু না করলে রব্বি আবার ঘ্যানঘ্যান শুরু করবে। তুমি কি এখানেই থাকবে?”
“না-না।” আমি শিউরে উঠলাম প্রায়, “আমি তোমার সঙ্গেই যাব।”
দিনের বাকিটা আমি এলেন আর রব্বির সঙ্গেই ঘুরঘুর করলাম। প্রচুর চা খেলাম। রাতেও একটা মহাভোজ সারলাম। ঘুমোতে যাওয়ার সময় আমি বিশেষভাবে সতর্ক ছিলাম। আলো নিভিয়ে, নিজেকে লেপ দিয়ে বেশ ভালোভাবে মুড়েই শুলাম সে-রাতে। তা-ও মাঝরাতে ঘুম ভেঙে বুঝতে পারলাম, লেপের বাইরে থেকে আমার হাত-পা প্রায় জমে গেছিল। সেগুলোকে লেপের তলায় গুঁজে দিয়ে, আলো নিভিয়ে বেরিয়ে গেল এলেন।
পরদিন সকালে ব্রেকফাস্টের আগে বা পরে আমি এলেনের নৈশ আগমন ও প্রস্থান নিয়ে একটিও কথা বলিনি। কাপ-ডিশ ধোয়ার পাট চুকলে এলেন জিজ্ঞেস করল, “পুরোনো পোশাক বাছাইয়ের কাজটা কাল শেষ হয়নি। আমার সঙ্গে ওতে হাত লাগাবে? নাকি দুর্গের অন্য অংশগুলো ঘুরে দেখবে?”
বেশ কষ্ট করে হলেও গলায় উচ্ছ্বাস ফুটিয়ে বললাম, “দুর্গটা দেখব। এমন সুযোগ কি রোজ-রোজ আসবে নাকি?”
ফাঁকা ঘর আর করিডর ধরে হেঁটে বেড়ানোর উৎসাহ ছিল না। কিন্তু ওই আয়না-ঘরের ত্রিসীমানায় যাওয়ার কথা ভাবলেই দাঁতকপাটি লাগছিল। তাই নিজেকে ঠেলে-ঠেলে ওপরে নিয়ে গেলাম। কিন্তু ভয়টা যায়নি। ফলে প্রত্যেক দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কান পাতছি। ক্রমাগত পেছনদিকে তাকাচ্ছি। কোনাখামচি এড়িয়ে যাচ্ছি। বাঁক নেওয়ার আগে একবার থমকে চারদিক দেখে নিচ্ছি। মানে, বিশ্রী অবস্থা যাকে বলে!
ভারি অদ্ভুত লাগছিল আমার। এমনই একটা দুর্গে আসার স্বপ্ন দেখেছি বরাবর— যেখানে আমার পায়ের শব্দকে অনুসরণ করবে আরও একজোড়া পা, কিন্তু কাউকে দেখা যাবে না। এখানে তাই-ই হচ্ছে, কিন্তু আমার একটুও ভালো লাগছে না। হঠাৎ করে খুলে যাওয়া দরজার পেছন থেকে এসে আমাকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে ঠান্ডা হাওয়া, অথচ সে-শিহরণে কোনও মুগ্ধতা নেই। জং ধরা লোহার স্যুটের ঢাকনা ঝনাত করে বন্ধ হচ্ছে, কিন্তু তাতে রোমাঞ্চিত হওয়ার বদলে আমি লাফিয়ে-কেঁপে অস্থির হচ্ছি। কেন?
ভেবে-ভেবে এর কারণটা আবিষ্কার করলাম। শুধু একবার— প্রথমদিন সন্ধেবেলা সিঁড়িতে ওই পায়ের শব্দটা আমার মতো এলেনও শুনেছিল। বাকি যা দেখার বা শোনার, সব আমার সঙ্গেই হয়েছে। তাহলে কি নার্ভের জন্য বা অন্য কোনও কারণে আমারই কোনও… সমস্যা হয়েছে?
তারপর গেটের কথা খেয়াল হল! ওই ব্যাপারটার কোনও ব্যাখ্যা না পেয়ে এলেন আর রব্বি ওটা মাথা থেকে স্রেফ বের করে দিয়েছিল। কিন্তু আমি ওটা ভুলতে পারিনি। এই দুর্গের চত্বরে আমি সেদিন কী-ভাবে ঢুকেছিলাম?
হঠাৎ করে একরাশ পায়ের শব্দে আমার চটকা ভেঙে গেল। পেছন ফিরেই কুঁকড়ে দেওয়ালের দিকে সরে গেলাম। পায়ের শব্দগুলো আমার দিকে ছুটে এলেও আমি কাউকেই দেখতে পাচ্ছি না! তার সঙ্গেই বাচ্চাদের খিলখিলিয়ে হাসার শব্দ। ওই করিডরেই আমার থেকে কিছুটা দূরে একটা দরজা খুলে গেল, পরক্ষণেই দুম্ করে বন্ধ হল।
সব আবার চুপচাপ।
ভয়ে কাঁপতে-কাঁপতে আমি সামনের দিকে এগিয়ে গেলাম। এমনভাবে এগোচ্ছিলাম যাতে একটা-না-একটা দেওয়ালে আমার পিঠ সবসময় ঠেকে থাকে। ওভাবে এগোতে-এগোতে বাঁ-দিকে একটা দরজা পড়ল। এখনও অবধি যা বুঝেছি তাতে ওই দরজাটা খুলে ওপাশে যেতে পারলেই এই করিডর থেকে বেরিয়ে একটা আলো-ঝলমলে ব্যালকনিতে পৌঁছোনো যায়। আমি হাতল ঘুরিয়ে দরজা খুললাম, ওপাশে গেলাম, তারপর ঠেলে দরজাটা বন্ধ করে দিলাম।
এবং ভুলটা টের পেলাম তারপর।
আমি ব্যালকনিতে আসিনি। তার বদলে আমি এসে পড়েছি একটা সরু প্যাঁচানো সিঁড়ির মাথায়। সিঁড়িটার একদিকের দেওয়ালে একটা ছোট্ট ঘুলঘুলি দিয়ে সামান্য আলো আসছে। তাতে বড়োজোর পাঁচটা ধাপের বেশি কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। ওই অন্ধকার সিঁড়ি দেখে আমার ভয়টা আরও ঘন হয়ে উঠল। পেছনের দরজাটা খোলার চেষ্টা করলাম। কিন্তু গায়ের সবটুকু জোর কাজে লাগিয়েও দরজাটা আর খুলতে পারলাম না।
এতটাই ভয় পেয়ে গেলাম যে কাঁদতেও পারলাম না। মনে হচ্ছে, আমার গলা শুকিয়ে একেবারে শিরিশ কাগজের মতো হয়ে গেছে! মাথাটা ফাঁকা-ফাঁকা লাগছে। দাঁত আর মুখ খিঁচিয়ে, অনেকটা নিঃশব্দ চিৎকারের মতো ভঙ্গিতে আমি দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। তারপর, পিঠে লেগে থাকা পাথরের দেওয়ালটার কনকনে ঠান্ডা ভাব ভয়ের কম্বলের মধ্য দিয়েও এসে আমার মনটাকে ছুঁয়ে দিল। মনে হল, কিছু একটা করতেই হবে— নইলে এই সিঁড়ির মুখেই আমাকে আটকে থাকতে হবে… হয়তো অনন্তকাল।
দরজাটা কিছুতেই খুলতে পারলাম না। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেও নিজেকে সামলে নিলাম। তারপর ওই অন্ধকার সিঁড়ি ধরে নীচে নামতে শুরু করলাম। প্রতি মুহূর্তে আশঙ্কা হচ্ছে, এই বুঝি অন্ধকারের মধ্য থেকে কেউ বা কিছু একটা লাফিয়ে পড়বে আমার ওপর! বাইরের দিকের দেওয়ালে হেলান দিয়েই নামছিলাম, যাতে দু’পাশেই যথাসাধ্য নজর রাখা যায়। দেওয়ালের গায়ে ঘুলঘুলিগুলো এত দূরে-দূরে রয়েছে যে বেশিরভাগ সময়টাই আমি ঘোর অন্ধকারে, স্রেফ দেওয়াল ধরে-ধরে নামছিলাম।
অবশেষে আমি আর একটা দরজার সামনে এলাম। ভারী, মজবুত কাঠের পাল্লাওয়ালা দরজাটার সামনে আমি দাঁড়িয়ে রইলাম বেশ কিছুক্ষণ। দরজাটা খুলে ওপাশে যাওয়ার কোনও ইচ্ছে আমার নেই। আসলে ওপাশে কী আছে তা না-জেনে আমি আর এগোতে চাইছি না। হঠাৎ শুনলাম, ওপরের দরজাটা— যেটাকে আমি প্রাণপণ চেষ্টা করেও খুলতে পারিনি— খুলে গেল। ব্যস, আমিও কর্তব্য ঠিক করে ফেললাম।
সিঁড়ি দিয়ে একজোড়া পায়ের শব্দ যখন আমার দিকে এগিয়ে আসছে, ততক্ষণে আমি সামনের দরজা খুলে ওদিকে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়লাম। কেন জানি না, তবে আমার মনে হচ্ছিল, ওই পায়ের শব্দ আমার নাগাল পাওয়ার আগে আমাকে নীচে নেমে যেতেই হবে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখলাম, আমি একটা বিশাল পাথুরে হলঘরে এসে পড়েছি। আমার পেছনের দরজাটা ছাড়া কি এ-ঘর থেকে বেরোনোর আর কোনও রাস্তা আছে? আমি খুঁজতে শুরু করলাম। একদিকে একটা বিশাল দরজা একেবারে তালা আর শেকল দিয়ে বন্ধ করা। অন্যদিকে একটা ছোটো দরজা। আমি সে-দিকেই ছুটলাম। কিন্তু বিস্তর ধাক্কাধাক্কি করেও সেটা খুলতে পারলাম না। কী করব বুঝতে না পেরে, দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে সেই দরজাটার দিকে তাকিয়ে রইলাম, যেটা দিয়ে আমি এই ঘরে ঢুকেছিলাম। পায়ের শব্দ ততক্ষণে ওই দরজার একেবারে কাছে এসে পড়েছে। মুখের মধ্যে একটা হাত ঢুকিয়ে আমি গলা ফাটিয়ে চিৎকার শুরু করলাম এবার।
“চেঁচাচ্ছ কেন?” এলেন মাথার চুল সামলাতে-সামলাতে ঘরে ঢুকল, “তোমার দরজা ধাক্কানোর আওয়াজ শুনে বুঝেছিলাম, তুমি সিঁড়ির এপাশে আটকা পড়েছ। আসলে ওই দরজাটার তালা খারাপ! রব্বি এখনও ওটা বদলাতে পারেনি। এমনিতে খুব একটা সমস্যা হয় না। কিন্তু মাঝেমধ্যে এমনভাবে আটকে যায় যে এপাশ থেকে খোলাই যায় না। তুমি ঠিক আছ তো?”
“তা আছি।” আমি একটা বড়ো শ্বাস ছাড়লাম, “কিন্তু তুমি আমার দরজা ধাক্কানোর আওয়াজ ওপর থেকে কী করে শুনলে? আমি তো এই দরজাটা ধাক্কাচ্ছিলাম, সে-ও তুমি নামা শুরু করার পর।”
“তাহলে বোধহয় দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আওয়াজটাই পেয়েছিলাম আমি। ভাগ্যিস! নইলে লাঞ্চের জন্য তোমাকে খুঁজে বের না করা অবধি ওই সিঁড়ির মুখেই আটকে থাকতে। ভালো কথা, এই পাথুরে ঘরটাই কিন্তু এককালে এই দুর্গের সবচেয়ে বাইরের ঘর ছিল। ওই বড়ো দরজাটার ওপাশেই একটা ঘরে গণ্যমান্য লোকজন এসে বসতেন, খেতেন, নাচতেন। চারদিকে রঙিন ছবি, দেওয়ালের ধার-ঘেঁসে দাঁড়িয়ে থাকা মধ্যযুগীয় যোদ্ধাদের ওই পোশাক আর অস্ত্র, ফায়ারপ্লেসের আগুনের কাঁপতে থাকা লাল-হলুদ রঙে সবকিছু জীবন্ত হয়ে ওঠা…! ভাবতেও কেমন রোমাঞ্চ হয়, তাই না?”
“হয় না।” ব্যাপারটা ভাবতে গিয়েই আমার দাঁতকপাটি লাগছিল, “ওই জংধরা লোহালক্কড়ে আলো পড়লে মোটেই ভালো দেখাবে না। তাছাড়া ছবিগুলোতে যাঁরা আছেন, তাঁদের একজনেরও নজর ঠিক বন্ধুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়নি আমার। তবে আসল কথাটা হল, আমরা এখান থেকে বেরোব কী-ভাবে?”
“যে-ভাবে এসেছি, সে-ভাবেই। আমি দরজাটা আটকে রেখে এসেছি, যাতে বন্ধ না হয়ে যায়।”
“বলছিলাম কি… ওই অন্ধকার সিঁড়িটা ছাড়া আর কোনও রাস্তা নেই এখান থেকে বেরোবার?”
“আছে।” এলেন সেই দরজাটা দেখাল যেটাকে আমি খোলার চেষ্টা করছিলাম একটু আগে, “কিন্তু ওটা খুলতে গেলে আমাকে ওপরে যেতে হবে। তারপর বলরুমের মধ্য দিয়ে, প্রধান সিঁড়িটা ধরে আবার নীচে নেমে এসে ওপাশ থেকে দরজাটা খুলতে হবে। ওটা দিয়ে গেলে আবার একটা করিডর পড়বে। কাজের লোকেরা যে ঘরগুলোতে থাকে, আর নীল রঙের কার্পেট-পাতা বসার ঘরের মধ্য দিয়ে ওই করিডরটা সোজা চলে গেছে।”
এই ঐতিহাসিক দুর্গের ভূগোল বুঝতে গিয়ে আমার মাথা বনবন করে ঘুরছিল। তাই ক্ষীণকণ্ঠে বললাম, “আমি তোমার সঙ্গেই যাচ্ছি। তবে আমরা তিনজন থাকলে ভালো হত।”
“কেন?”
“তাহলে আমি মাঝখানে থাকতাম, আর কী! আপাতত তুমি সামনে চলো। আমি পেছনে আছি।”
এলেন আমার সামনে রইল। তবে আমরা ‘তিন’জনেই চললাম, কারণ আমার পেছনে আসা পায়ের শব্দটা দু’জনের কাছেই স্পষ্ট ছিল। এলেন যথারীতি ওগুলোকে আমাদেরই পায়ের শব্দ বলে দাবি করল। আমি কিন্তু হাড়ে-হাড়ে বুঝতে পারছিলাম, আমার ঠিক পেছনেই কেউ আসছে। তবে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকানোর অবস্থাও আমার ছিল না। এলেন চোখের আড়াল হয়ে গেলে বোধহয় ভয়ে অজ্ঞানই হয়ে যেতাম তখন!
পরের ক’টা দিন আমি এলেনের গা-ঘেঁসেই রইলাম প্রায়। ব্যাপারটা এমনই হয়ে উঠল যে এলেন আমাকে বলেই ফেলল, “যাও তো! বাগানে একটু হাঁটাহাঁটি করো। আমিও ততক্ষণে একটু কাজকর্ম সারি।”
বাধ্য হয়ে বাগানে এলাম। নীল আকাশ, গলানো সোনার মতো রোদ, রঙ-বেরঙের ফুলের শোভা, পাখিদের কিচিরমিচির, গাছের ডাল দুলিয়ে ধেয়ে যাওয়া শনশনে হাওয়া— এমন পরিবেশে কিছুক্ষণ হাঁটার পর আমার নার্ভাস ভাবটা সত্যিই মিলিয়ে গেল।
মূল গেট দিয়ে বেরিয়ে, দুর্গ থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলাম তখন। মাতাল হাওয়া আমার চুলগুলো নিয়ে খেলা করছে। মেঘেদের আনাগোনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পাহাড়ের গায়ের সবুজ রঙ গাঢ় আর হালকা হতে দেখছিলাম আমি। হঠাৎ একটা চিৎকার শুনলাম। ভাঙাচোরা, শব্দহীন চিৎকার— যেন সেটা মুখ থেকে বেরোনোর মুহূর্তেই হাওয়া তার শব্দগুলো কেড়ে নিয়েছে! ঘুরতেই দুটো হেমলক গাছের মধ্য দিয়ে কাউকে ছুটে আসতে দেখলাম। মানুষটি লাফিয়ে হাত নেড়ে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছে। তারপর আমি এলেনের গলাটা শুনতে পেলাম।
“জ্যানেট… তাড়াতাড়ি…! রব্বি… ভেঙেছে…! তাড়াতাড়ি… এসো…!”
আমি টেনে দৌড় লাগালাম। একেবারে দম-আটকানো অবস্থায় দুর্গের কাছে পৌঁছে দেখি, এলেনও হাঁফাতে-হাঁফাতে আমার কাছে এসে পড়েছে।
“কী হয়েছে এলেন?” আমি কোনওক্রমে জানতে চাইলাম, “রব্বি’র কি চোট লেগেছে?”
এলেনও একইভাবে বলল, “তোমার কী হয়েছে, জ্যানেট?”
প্রায় একইসঙ্গে কথাগুলো বলে আমরা হাঁ-করে একে-অপরের দিকে চেয়ে রইলাম।
“তুমি আমাকে টেরেস থেকে ডাকছিলে যে?” আমি বললাম।
“আমি তোমায় ডেকেছি? আমি তো তোমাকে ওপরের জানালা দিয়ে দেখলাম।” এলেন আপত্তি করল, “তুমিই আমাকে ডাকছিলে।”
“আমি ডাকিনি!” জোর গলায় বললাম।
বেশ কিছুক্ষণ আমরা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইলাম। দেখলাম, এলেনের চোখজোড়ায়, এই প্রথমবার, সংশয়ের মেঘ জমছে। ও কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। তখনই রব্বি ফোয়ারা-বসানো নিচু জায়গাটা থেকে লাফাতে-লাফাতে উঠে এল।
“তোমাদের কী হয়েছে?” চেঁচাল রব্বি। আমরা পুতুলের মতো ওর দিকে ঘুরলাম। তাতে ও রীতিমতো খেপে গেল। হাত-পা ছুড়ে রব্বি বলল, “আরে হলটা কী তোমাদের? তুমি ঠিক আছ তো এলেন? জ্যানেট, তোমার কী অবস্থা? আরে, তোমরা কেউ মুখ খুলবে, না বোবা হয়ে থাকবে? তোমরা চেঁচাচ্ছিলে কেন?”
“আমরা চেঁচাইনি।” ফিসফিস করে বলল এলেন।
“বললেই হল!” ফুঁসে উঠল রব্বি, “আমি তোমাদের দু’জনকেই দেখতে পেয়েছিলাম বাগানের ওই কোনা থেকে। এলেন টেরেস থেকে, আর জ্যানেট বড়ো গেটের দিকে আসার গাড়ির রাস্তা থেকে একে-অপরের দিকে তাকিয়ে চেঁচাচ্ছিলে। তারপর তোমরা আমার দিকে ঘুরে চেঁচাতে শুরু করলে! কী জন্য চিৎকার করছিলে তোমরা?”
“আমরা চেঁচাইনি।” আমি নিচু গলায় বললাম, “আমরা দু’জনেই দু’জনকে চেঁচাতে দেখে ছুটে এসেছিলাম। কে কেন চেঁচিয়েছিল সেটা জিজ্ঞেস করতে-করতেই তুমি চলে এলে। সত্যি বলছি, আমরা কেউই কিন্তু চেঁচাইনি।”
“এ কী কিম্ভূত ব্যাপার!” দু’হাত ওপরে তুলে বলে উঠল রব্বি, “তুমি যে ভুল দেখো-শোনো— এটা আমরা জানি, জ্যানেট। কিন্তু এখন তো দেখছি আমাদেরও এই রোগ হয়েছে। এটা যে ছোঁয়াচে রোগ, তা জানতাম না।”
আমার কাঁদো-কাঁদো মুখচোখ দেখে রব্বির দয়া হল। ও আমাদের দু’জনকেই টানতে-টানতে রান্নাঘরে নিয়ে গেল। সেখানে কড়া কফি আর ব্র্যান্ডি মেশানো একটা মারাত্মক মিশ্রণ খেয়ে আমরা তিনজনেই একটু স্বাভাবিক হলাম।
যা মনে হচ্ছিল এবার সেটাই বলে ফেললাম, “আমার বোধহয় চলে যাওয়া উচিত।”
“বাজে বোকো না তো!” রব্বি আর এলেন সমস্বরে বলে উঠল। তাতেই ঘরের পরিবেশটা একটু হালকা হল। তারপর প্রায় মিনিট দশেক আমরা দুনিয়ার ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে চুটিয়ে আড্ডা মারলাম। কিন্তু সবকিছুর মধ্যেই একটা ফাঁকা-ফাঁকা ভাব থেকেই যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, যেন বাইরের চকচকে মসৃণ চেহারার আড়ালে আমাদের মন একেবারে ঠান্ডা আর ভঙ্গুর হয়ে রয়েছে। একসময় আমাদের সব কথা ফুরিয়ে গেল। আমরা চুপচাপ বসে রইলাম। তারপর এলেনই প্রশ্নটা করল, “আচ্ছা জ্যানেট, তুমি এই ভূত-প্রেত বা অলৌকিক নিয়ে কি কিছু জান? মানে ভূতের গল্পের কথা বলছি না। আসলে এই বিষয়টা নিয়ে তোমার জ্ঞানগম্যি কী-রকম?”
“প্রায় শূন্যই বলা চলে।” অকপটে স্বীকার করলাম, “আমি এই নিয়ে বিস্তর বইপত্র পড়েছি ঠিকই। কিন্তু এ-রকম অভিজ্ঞতা আমার জীবনে এই প্রথম। সত্যি বলছি, আমি ভেবেছিলাম যে তোমাদের এখানে এমন কিছু হলে আমি ভয় পাব ঠিকই, তবে সেটা উপভোগও করব। তার বদলে আমি ভয়ে কাঁটা হয়ে আছি। তার মধ্যে রোমাঞ্চ-টোমাঞ্চ কিচ্ছু নেই, আছে বিশুদ্ধ আতঙ্ক! বিশ্বাস করো, এই দুর্গে আমি… ভালো নেই।”
“তুমি কি সত্যিই চলে যাবার কথা ভাবছ?” এলেন জিজ্ঞেস করল। আমি বেশ চমকেই গেলাম, কারণ ওর গলায় একটা হালকা কাঁপুনি রয়েছে। সেটা আরও স্পষ্ট হল পরের কথাগুলোতে, “আসলে রব্বি যখন বাইরে থাকে, তখন জায়গাটা বড্ড ফাঁকা লাগে। তার ওপর অন্য কোনও কাজের লোকও তো এখন নেই।”
“আরে না-না!” এলেনের মুখটা ক্রমেই ফ্যাকাশে হয়ে উঠছে দেখে আমি ওকে সাহস দিতে চাইলাম, “আসার আগে কাগজ, দুধ— সব একমাসের জন্য বারণ করে এসেছি। দুম্ করে ফিরে গেলে তো আমিই ঝামেলায় পড়ব।”
“যাক বাবা।” রব্বিও এবার হাসল, “কয়েকটা আওয়াজ আর চিৎকারের ঠেলায় তুমি চলে গেলে আমাদের খুব খারাপ লাগত।”
আমরা সবাই আবার হেসে উঠলাম। তবে এলেনের চোখ দেখে মনে হল, তখনকার মতো স্বস্তি পেলেও ওর মধ্যে ভয়ের একটা চারাগাছ একটু-একটু করে বড়ো হতে শুরু করে দিয়েছে।
পরের একটা সপ্তাহ আমি আর এলেন একসঙ্গেই দিন কাটালাম। অবশেষে এলেন আবার বলল, “তুমি নিশ্চয় কাপ-ডিশ ধোয়া আর জামাকাপড় গোছানোর জন্য এখানে আসনি। দুর্গের বাইরেও একটু বেরোও এবার। পাশেই খুব সুন্দর ঝর্ণা আছে। মাছধরার ঝিলও আছে একটা। পাহাড়ের পাশ দিয়ে একটা ট্রেকিং ট্রেইলও পাবে। তাছাড়া গ্রামটা একটু দূরে হলেও গাড়ি নিয়ে সেখান থেকেও ঘুরে আসতে পার। সব মিলিয়ে একটা ছোট্ট আউটিং হয়ে যাবে!”
এলেনের কথা শুনে মনে হল, ও ভয় কাটিয়ে উঠেছে। তা-ছাড়া এই এক সপ্তাহ দুর্গের মধ্যে আমি গোলমেলে কিছু শুনিনি, দেখিওনি। তবে হ্যাঁ, প্রতি রাতে এলেন এসে আমাকে সুন্দরভাবে লেপমুড়ি দিয়ে যাচ্ছিল। ওটা নিয়ে আর ওকে কিছু বলিনি। আতিথেয়তাকে তো ভৌতিক বা অলৌকিক বলা চলে না!
“বেড়িয়েই আসি তবে।” আমি রাজি হলাম, “কিন্তু একটা কথা বলো। টেরেসের ওপর ওই মূর্তির মতো জিনিসটা আমি নানা ঘরের জানালা দিয়েই দেখেছি। ওটা ঠিক কী?”
“সূর্যঘড়ি। কী-ভাবে ওটার মাধ্যমে সময় বোঝা যায়, সে আমি জানি না বাবা! তুমি যদি দেখতে চাও তাহলে এখনই যাও। মেঘ আর হাওয়া দেখে মনে হচ্ছে, বেলার দিকে বৃষ্টি হতে পারে।”
দেওয়াল-জোড়া জানালা দিয়ে বেরোলেই চওড়া, শ্যাওলা-ঢাকা টেরেসটাতে যাওয়া যায়। শ্বেতপাথরের নিচু পাঁচিল দিয়ে পুরো জায়গাটা ঘেরা। গোলাপ আর লতার ঝাড় সেখান থেকে নেমে গেছে একেবারে নীচে, ফোয়ারার দিকে। টেরেসে পা রাখার সময়ও আমার ডান দিকে, একটু দূরে থাকা সূর্যঘড়ির ডাঁটির একটা হালকা ছায়া নীচে পড়ছিল। কিন্তু আমি ওটার কাছে পৌঁছোতে-পৌঁছোতে রোদ এতই ফিকে হয়ে গেল যে ছায়াটা আর রইল না।
ছায়া ছিল না বলেই শ্যাওলা-ধরা মেঝেতে প্রায় মিশে থাকা পাথরের চৌকোনা ফলকটা নজরে পড়ল। কৌতূহলী হয়ে হাঁটু মুড়ে বসলাম। তারপর নখ দিয়ে খুঁটে-খুঁটে শ্যাওলা সরালাম। ‘অ্যাডাম ম্যাকভাইকার, ১৮০৯’— স্রেফ এটুকু লেখা ছিল ওই ফলকে। লোকটি কে হতে পারে, সেই নিয়ে যখন আকাশ-পাতাল ভাবছি, তখনই মনে পড়ল, এই দুর্গটা বানানো শেষ হয়েছিল ওই বছরে। তাহলে এই দুর্গ যারা বানিয়েছিল, তাদেরই কেউ নির্ঘাত নিজেকে ‘অমর’ করে রাখার লোভ সামলাতে পারেনি!
কোমর ধরে গেছিল ওইটুকুতেই। বেঁকেচুরে উঠে দাঁড়াতেই একজোড়া পায়ের শব্দ পেলাম— একটা লঘু চালের, অন্যটা ভারী, আত্মবিশ্বাসী। এলেন আর রব্বিকে দেখতে পাব ভেবে ওদিকে তাকাতেই আমার মাথাটা বাঁই করে ঘুরে গেল।
পুরো টেরেস ফাঁকা!
ঠান্ডা জলের মতো, ভয়ের একটা স্রোত আমাকে একেবারে ভাসিয়ে দিল। এদিক-ওদিক তাকিয়ে বুঝতে পারলাম, আমার পালানোর কোনও রাস্তা নেই। টেরেস থেকে বেরোনোর ওই জানালা আর আমার মাঝামাঝি জায়গাতেই ছিল সেই দুই অদৃশ্য ব্যক্তি। মরিয়া হয়ে সূর্যঘড়ির পাশের একটা ছোট্ট খাঁজের আড়ালে কুঁকড়ে বসে রইলাম। এদিকে পায়ের শব্দ-দুটো ক্রমেই কাছে এগিয়ে এল।
গলা আর চলন থেকে বুঝতে পারছি, দুই অদৃশ্যের একজন নারী আর অন্যজন পুরুষ। নিজেদের মধ্যে নানা কথা বলতে-বলতে তারা আমার এক্কেবারে কাছে এসে পড়েছে। তখনই মেয়েটি কী যেন দেখে ভয় পেয়ে গেল। তার সঙ্গী তাকে কিছু বোঝানোর আগেই সে ছুটতে-ছুটতে আবার চলে গেল ওই জানালার দিকে।
আমি কিছুক্ষণ প্রায় দম বন্ধ করে রইলাম। তারপর, অদৃশ্য পুরুষটি ওখানে আছে কি না সেটা দেখার জন্য মাথা উঁচু করতে গেছি, অমনি আমার বাঁ পা-টা মেঝেতে পিছলে গেল। তৎক্ষণাৎ শূন্য থেকে দৈববাণীর মতো করে পুরুষকণ্ঠ ভেসে এল, “কে? কে ওখানে?”
খোলের ভেতর মাথা টেনে নেওয়ার মতো করে আমি নিজেকে আবার গুটিয়ে, ওই খাঁজের মধ্যে প্রায় ঢুকে গেলাম। পুরুষটির ভারী পায়ের শব্দ একেবারে আমার সামনে এসে থামল এবার। ভয়ে প্রায় জমে গিয়ে আমি স্পষ্ট শুনলাম, সেই কণ্ঠ বলে উঠল, “আশ্চর্য! এখান থেকেই তো আওয়াজটা এল। কে করল?”
পায়ের শব্দটা একটু পরে ওখান থেকে দূরে সরে গেল। আরও বেশ কিছুক্ষণ ও-ভাবেই থাকার পর আমি খু-উ-ব সাবধানে মাথা বের করে এদিক-ওদিক দেখলাম। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে জানালা হয়ে টেরেস থেকে বেরোলাম। রান্নাঘরের করিডর অবধি যেতে পেরেছিলাম বোধ হয়। তারপরেই চোখে অন্ধকার নেমে এল!
জ্ঞান ফিরল মুখের ওপর একটা ঠান্ডা আর ভেজা কিছুর স্পর্শে। চোখ মেলে দেখি, এলেন পাশে বসে একটা ঠান্ডা তোয়ালে দিয়ে আমার মুখ মুছে দিচ্ছে। আমাকে চোখ মেলতে দেখে ফ্যাকাশে মুখে বলল, “কী হয়েছিল, জ্যানেট?”
উঠে বসে, একটু থেমে-থেমে, আমি টেরেসের অভিজ্ঞতাটা বললাম। এলেন চুপচাপ শুনল। কিছু বলল না। তবে ওর দু’চোখ দিয়ে জলের ধারা নেমে এসে গাল তো বটেই, ওর জামাটামাও ভিজিয়ে দিল! আমি এতটাই অবাক হয়ে গেলাম যে ভয় ভুলে ওকে সান্ত্বনা দিতে শুরু করলাম। কিছুক্ষণ পর এলেন নিজেকে একটু সামলে নিল। তারপর, ওই তোয়ালেটা দিয়েই নিজের মুখ মুছে, ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে, ও নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে শুরু করল।
“তুমি সূর্যঘড়ি দেখতে চলে গেলে। আমি ময়দা মাখছিলাম। পেছনে দরজাটা খোলার আওয়াজ পেয়ে তাকিয়ে দেখি, রান্নাঘরে কেউ আসেনি। দরজাটাও বন্ধই রয়েছে। মনে হল, আমি নির্ঘাত ভুল শুনেছি। কিন্তু ভুলটা ভেঙে গেল, কারণ আমি টেবিলের দিকে কারও এগিয়ে আসার শব্দ স্পষ্ট শুনতে পেলাম! ভয়ে আমি এককোণে পিছিয়ে গেলাম। থপ করে একটা শব্দ হল, যেন মেঝেতে কেউ কিছু একটা রেখেছে। তারপর থালা-বাসন নাড়াচাড়া করার ঝনঝন আওয়াজ। কে যেন একটা চেয়ার টেনে আনল। তারপর সেই চেয়ারে বসে কেউ যেন হালকা-হালকা দুলতে শুরু করল। আমি… আমি কাউকে দেখতে পাচ্ছিলাম না। কিন্তু এই আওয়াজগুলো সব শুনতে পাচ্ছিলাম।”
“তুমি কী করলে?” এলেন কথা না বলে শুধু কেঁপে উঠছে দেখে আমিই ধরতাই দিলাম।
“আমি ওই… অদৃশ্য ব্যক্তির সঙ্গে এই রান্নাঘরে আটকা পড়ে রইলাম। আর তারপর…!”
“তারপর?”
“অনেকক্ষণ আর কোনও আওয়াজ না পেয়ে, এমনকি চেয়ার দোলার শব্দটুকুও না পেয়ে ভাবলাম, সে… বোধহয় আর ঘরে নেই। নিজেকে সাহস দেওয়ার জন্য আমি আবার ময়দার তালটা টিপতে শুরু করেছিলাম। তখনই দেখলাম, আরও একজোড়া হাত তালটাকে টিপতে শুরু করল! একদম নিপুণ হাতে সে একটা দিককে টিপে-টুপে তারপর অন্যদিকটা ধরল। তারপর পুরো তালটাকে সে যে-ভাবে ছোটো-ছোটো গোল মণ্ডে ভেঙে নিল, সেটা যারা কেক বানায় তাদের কাছে শিক্ষণীয়। কিছুক্ষণ সবটা দেখে বুঝলাম, ওই অদৃশ্য হাতের মালিক ঠিক সেই জায়গাটায় দাঁড়িয়ে আছে, একটু আগেও আমি যেখানে ছিলাম। ওটা বোঝার পর আমার সবটুকু সাহস উবে গেল। ভয়ে ঘর ছেড়ে পালিয়ে আমি তোমার কাছেই আসছিলাম। কিন্তু করিডরে এসে দেখি, তুমি মাটিতে পড়ে আছ! কী হবে, জ্যানেট? আমার যে ভীষণ ভয় করছে!”
“চলো।” আমি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, “রব্বিকে খুঁজে বের করি। ও সঙ্গে থাকলে আমাদের ভয়টা কমে যেতে বাধ্য।”
করিডরে অতক্ষণ শোয়া-বসার ফলে আমাদের চুলে আর পোশাকে ধুলো লেগে গেছিল। তা-ছাড়া প্রাণ নিয়ে যতই টানাটানি হোক, চুলগুলোকে একটু জায়গামতো না বসিয়ে কি কোথাও যাওয়া যায়? আমরা নিজেদের পরিপাটি করার ফাঁকেই দমাস করে নীচের ছোটো দরজাটা খুলে গেল। তারপর দুদ্দাড় করে রব্বি আমাদের দিকে ছুটে এল।
“কী হয়েছে?” হাঁফাতে-হাঁফাতে জিজ্ঞেস করল রব্বি। আমরা নিরুত্তর।
রব্বি প্রশ্নটাকে আরেকটু সুনির্দিষ্ট চেহারা দিল, “কী পুড়ছে?”
“পুড়ছে?” আমি অবাক হলাম।
“হ্যাঁ। রান্নাঘরের জানালা দিয়ে কালো ধোঁয়া বেরোতে দেখেই তো ছুটতে-ছুটতে এলাম।”
আমি আর এলেন একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইলাম। বিরক্ত হয়ে রব্বি করিডর ধরে হনহন করে হেঁটে গিয়ে রান্নাঘরের দরজাটা এক ধাক্কায় খুলে ফেলল। অমনি মিষ্টি আর পোড়া মেশানো একটা গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল সারা করিডরে।
“আমার প্যাটিস!” আর্তনাদ করে এলেন এতক্ষণে ছুটোছুটি শুরু করল।
জানালা খুলে দেওয়ায় ধোঁয়া আর পোড়া গন্ধ কমে এসেছে। তারই মধ্যে এলেন আঁতকে উঠে আমাকে দেখাল, একেবারে নিপুণভাবে কেকের জন্য সবকিছু গুছিয়ে রেখে ময়দার পাত্রটাকে ধুয়ে তুলে রাখা হয়েছে। রব্বি কিছুই বুঝল না। তবে ইলেকট্রিক চুল্লিটা খুলে ভেতর থেকে পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া প্যাটিসগুলো বের করে ও হতাশভাবে মাথা নাড়ল। তারপর বলল, “তুমি এই চুল্লিটা ম্যানেজ করতে পারছ না, এলেন। এটা কী করেছিলে?”
আমরা গলা লম্বা করে দেখলাম, চুল্লিটার তাপমাত্রা সাড়ে ছ’শো ডিগ্রি করে রাখা রয়েছে!
“আমি করিনি।” ঘাড় গোঁজ করে বলল এলেন, “এ নির্ঘাত ওর কাজ।”
“ও?” রব্বি জিজ্ঞেস করল, “মানে জ্যানেট? কী সর্বনাশ! তুমি জ্যানেট কারমাইকেলকে রান্নাঘরে একা ছেড়ে দিয়েছিলে?”
“জ্যানেট নয়। যে আমার জায়গায় দাঁড়িয়ে ময়দা মাখছিল, এ নিশ্চয় তার কাজ।”
রব্বি পালা করে আমাদের দিকে তাকিয়ে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করছিল। বাধ্য হয়ে আমি এর এলেন মিলে ওকে সব বললাম। সব শুনে রব্বি দারুণ খেপে গেল।
“এবার ব্যাপারটা বাড়াবাড়ির জায়গায় চলে যাচ্ছে কিন্তু!” রব্বি রাগতভাবে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “জ্যানেট, এগুলো কি তোমার কীর্তি?”
“বিশ্বাস করো রব্বি, আমি কিছুই করিনি।” আমি ক্লান্তভাবে বললাম, “কলেজে পড়ার সময় প্র্যাকটিকাল জোক করা এক জিনিস, আর এখানে যা হচ্ছে তা একেবারে আলাদা জিনিস। তা-ছাড়া আমি তো আগেই বলেছিলাম। তেমন হলে বলো, আমি এক্ষুনি চলে যাচ্ছি তোমাদের এই দুর্গ থেকে।”
“না-না।” রব্বি মাথা নেড়ে বলল, “আমরা তা বলছি না। তুমি নিজেও যে এতে কী ভয় পেয়েছ, তা তো আমরা দেখতেই পাচ্ছি। আসলে এখানে কী হচ্ছে, কিছুই বুঝতে পারছি না।”
সেদিন রাতেও যথারীতি এলেন এসে আমাকে লেপমুড়ি দিয়ে, লাইট নিভিয়ে গেল। পরদিন ভোরে আমি সেই নিয়ে কিছু না বললেও ব্রেকফাস্ট করতে গিয়ে দেখলাম, এলেন খুব অস্থির হয়ে আছে। রব্বি বেরিয়ে যেতেই আমাকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কাল রাতে আমাদের শোয়ার ঘরে গিয়ে আলো নিভিয়েছিলে কেন?”
আমি চুপচাপ ওর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। তারপর বললাম, “রব্বি আমাকে দেখেছিল?”
“না। এমনিতেই ওর ওপর প্রচুর চাপ রয়েছে। ওকে আর এই নিয়ে কিছু বলিনি। কিন্তু তুমি কাল রাতে আমাদের ঘরে গেছিলে কেন, জ্যানেট? তুমি কি ঘুমিয়ে-ঘুমিয়ে হাঁটো? নাকি ভয় পেয়েছিলে? আমার এত ঘুম পাচ্ছিল যে তোমাকে দেখেও আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। এমনি… সব ঠিক আছে তো?”
“সব ঠিক আছে।” আমি ক্লান্ত গলায় বললাম, “তবে কাল রাতে আমি তোমাদের ঘরে যাইনি।”
“মানে? আমি স্পষ্ট দেখেছি। তুমি আমার ওপর ঝুঁকে ছিলে। তারপর ঘরের আলোটা নিভিয়ে বেরিয়ে গেছিলে।”
“না, এলেন। আমি যাইনি। তবে এখানে আসার পর থেকে রোজ রাতে তুমি ঠিক ওইভাবেই আমার ওপর ঝুঁকে, আমাকে দেখে, লেপ দিয়ে আমাকে ঢেকে আর আলো নিভিয়ে যাচ্ছ। প্রথম রাতের পর তোমাকে বলেওছিলাম। মনে আছে?”
নিঃশব্দে বাসন ধুলাম আমরা। একরকম যন্ত্রের মতো করে রান্নার মধ্যে ডুবে গেল এলেন। কিছুক্ষণ ওখানে বসে থেকে আমি নিজের ঘরে ফিরে এলাম। তারপর একটু গোছগাছ সেরে কয়েকটা চিঠি লিখতে বসলাম।
প্রায় ঘণ্টাখানেক পর, আমি যখন শেষ চিঠিটার খামের মুখ আটকাচ্ছি, আমার ঘরের দরজাটা খুলে গেল। ভিক্টোরিয়ান যুগে বনেদি বাড়ির কাজের লোকেরা যেমন কালো, লম্বা ঝুলের স্কার্ট আর অ্যাপ্রনের মাঝামাঝি একটা পোশাক পরতেন, তেমন পোশাক পরে এক মহিলা ঘরে ঢুকলেন। তিনি আপনমনে ঘরটা ঝাড়পোঁছ করছিলেন, আর আমি আক্ষরিক অর্থে হাঁ-করে তাঁকে দেখছিলাম। হঠাৎ আমার দিকে চোখ পড়তেই মহিলাটি আর্তনাদ করে ঘর থেকে ছুটে পালিয়ে গেলেন।
“ভূত ‘দেখলাম’ তাহলে!” আমি আপনমনে বললাম, “কিন্তু মহিলা… মানে ভূতটি কি আমাকে দেখেই ভয় পেলেন?”
অদ্ভুত ব্যাপার হল, তখন কিন্তু আমার ভয় করছিল না। হয়তো ভূতেরা মানুষ দেখে ভয় পায় কি না— এই নিয়ে মনে-মনে গবেষণা করছিলাম বলেই ওই অবস্থা হয়েছিল। ইতিমধ্যে আমার ঘরের দরজাটা আবার, অল্প-অল্প করে খুলে গেল। দুই তরুণ-তরুণী হাসাহাসি করতে-করতে দরজার পাশ থেকে ঘরের ভেতর মুখ বাড়িয়ে আমাকে দেখল।
“মেয়েটা এখনও ওখানেই আছে!” বলে উঠল তরুণী।
তরুণ কিছু বলার আগেই দরজাটা সপাটে খুলে গেল। লম্বা-চওড়া, জমকালো পোশাক পরা একজন ভৃত্যস্থানীয়, কিন্তু দাপুটে পুরুষ ঘরে ঢুকল। কিন্তু জানালায় আমাকে বসে থাকতে দেখেই সে দস্তুরমতো ফ্যাকাশে হয়ে বলে উঠল, “ভূ… ভূত!”
লোকটি… ভূতটির পালানোর দাপটে তার পরচুলাটা একদিকে কাত হয়ে প্রায় খসেই পড়ল। এবার আমিই খিলখিলিয়ে হেসে উঠলাম। ঘরের দরজাটা সপাটে টেনে দিল কেউ। তারপর সব চুপচাপ হয়ে গেল আবার।
মন-মেজাজ একদম ফুরফুরে হয়ে গেছিল এই ঘটনায়। ভাবলাম গিয়ে এলেনকে শোনাই, এই দুর্গের ভূতেদের আমিই কেমন ভয় পাইয়ে দিয়েছি। কিন্তু রান্নাঘরে গিয়ে দেখলাম, ঘরময় আটা-ময়দা-ডিম ছড়িয়ে আছে। তাদের মধ্যে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে এলেন! কনকনে ঠান্ডা জলে একটা তোয়ালে ভিজিয়ে এলেনের গলা, মুখ, কপাল মুছে দিতে শুরু করলাম। বেশ কিছুক্ষণের চেষ্টায় এলেনের জ্ঞান ফিরল। কিন্তু চোখ মেলেও ও আমাকে চিনতে পারছিল না কিছুতেই। আমাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে, পাগলের মতো রব্বি’র নাম ধরে চেঁচাচ্ছিল। কিছুক্ষণের চেষ্টায় ওকে শান্ত করতে না পেরে বাধ্য হয়েই ওকে ঠাস-ঠাস করে গোটাকয়েক থাপ্পড় মারলাম। তাতে ওর চিৎকার থামল, কিন্তু কান্না শুরু হল।
“আমাকে বাড়ি নিয়ে চলো, রব্বি।” হেঁচকি তুলতে-তুলতে কাঁদছিল এলেন, “আমি এখানে থাকতে পারব না। কিছুতেই থাকব না আমি!”
কেন এলেনের এই অবস্থা হয়েছে— সেটা আমি কিছুতেই ওর থেকে বের করতে পারলাম না। ওর অবশ শরীরটাকে কোনওক্রমে দেওয়ালে ঠেসিয়ে, কোলে একটা কুশন ধরিয়ে দিয়ে আমি বাইরে ছুটলাম। রব্বিকে তক্ষুনি ডাকা ভীষণ জরুরি।
বাগান, হট-হাউস, সবজি-বাগান— সর্বত্র খুঁজে আর নাম ধরে ডাকাডাকি করেও আমি রব্বি’র সাড়া পাচ্ছিলাম না। এদিকে বাড়ির ভেতর একা ছেড়ে আসা এলেনকে নিয়ে আমার চিন্তা ক্রমেই বাড়ছিল। অসহায় হয়ে কী করব ভাবছিলাম, তখনই নীচের ফোয়ারার কাছ থেকে আমি একটা কান্নার শব্দ পেলাম।
একটি পুরুষকণ্ঠ ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদছিল! সেই কান্নার মধ্যে এমন একটা অসহায়, দুমড়ে যাওয়ার ভাব ছিল যে ভয়ে আমার লোম খাড়া হয়ে গেল।
ওদিকে গিয়ে, ঝোপঝাড়ের মধ্যে আমি রব্বিকে পেলাম। কেঁদে-কেঁদে ওর মুখচোখ ফুলে লাল হয়ে গেছে! চোখ বন্ধ করে, মুখের ওপর হাত চাপা দিয়ে তখনও কাঁদছিল রব্বি। আমি ওর নাম ধরে ডাকার পর ও আস্তে-আস্তে চোখ খুলে আমাকে দেখল। তারপর আর্তনাদ করে অজ্ঞান হয়ে গেল।
কোনওভাবেই রব্বি’র জ্ঞান ফেরাতে না পেরে আমি বাধ্য হয়ে দুর্গে ফিরে গেলাম। তারপর কাছের গ্রামে ফোন করে ডক্টর স্ট্রাটহার্ন-কে ডাকলাম। ফ্রেজারদের অন্য একটা সম্পত্তির দেখাশোনা করেন জিম কের বলে এক ভদ্রলোক। তাঁকেও ফোন করলাম। ওঁরা দু’জন তাড়াতাড়িই চলে এলেন। আমরা সবাই মিলে রব্বিকে দুর্গের ভেতরে নিয়ে গেলাম। রব্বি আর এলেন— দু’জনকেই দেখে ডাক্তার চিন্তিত মুখে ওষুধপত্র দিলেন। তারপর আমাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, “এ-সব হল কী করে, মিস…?”
“কারমাইকেল। আমি রব্বি আর এলেনের বন্ধু।” নিজের পরিচয় দিয়ে এই ক’দিনের ঘটনার বিবরণ দিলাম।
স্ট্রাটহার্ন যে আমাকে বিশ্বাস করতে পারছেন না, সেটা বেশ বোঝা যাচ্ছিল। এদিকে মুখের ওপর আমাকে মিথ্যেবাদীও বলতে পারছিলেন না ভদ্রলোক। শেষ অবধি হতাশভাবে মাথা নেড়ে উনি বললেন, “আপনি বলছেন, এই দুর্গে নানা ভৌতিক ঘটনার ফলে ওঁরা দু’জন এইরকম ভয় পেয়েছেন? কিন্তু আমি জন্ম থেকে এই এলাকার বাসিন্দা। এই দুর্গকে নিয়ে কস্মিনকালেও, মানে ঘোর কুসংস্কারাচ্ছন্ন লোকেদের মধ্যেও এইসব গল্প শুনিনি। হঠাৎ কী হল এখানে?”
এই প্রশ্নের উত্তরটা তো আমি এখানে আসার দিন থেকেই খুঁজছি।
রব্বির জ্ঞান ফিরলেও ও আমাদের কোনও প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি। কাঁদতে-কাঁদতে আর কাঁপতে-কাঁপতে ও বিছানায় কুকুরকুণ্ডলী হয়ে কম্বল মুড়ি দিয়েছে। স্ট্রাটহার্ন চিন্তিত গলায় বললেন, “উনি বাস্তবের থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে চাইছেন। ওঁকে ইনভার্নেসের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়াই ভালো। তবে দেড়শো মাইল রাস্তা পার হওয়ার ধকল উনি এই অবস্থায় নিতে পারবেন কি না, সেটাই চিন্তার। আমি বরং ফ্রেজারদের খবর দিই।”
আমি একমত হলাম। ইতোমধ্যে এলেন কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। রব্বির ব্যাপারে ওকে এখনই কিছু বলব না— এমনটা আমি আর স্ট্রাটহার্ন আগেই ঠিক করে নিয়েছিলাম। বরং ওর কী হয়েছিল, সেটাই আমরা জানতে চাইলাম।
“তুমি তো ওপরে চলে গেলে।” নির্জীব গলায় বলল এলেন, “আমি চুপচাপ কাজ করছিলাম। হঠাৎ আমার পেছন থেকে একটা আওয়াজ পেলাম— যেন কেউ আঁতকে উঠল। ঘুরে দেখি, একেবারে মেঝে অবধি কালো অ্যাপ্রন পরা এক মহিলা আমার দিকে তাকিয়ে, ভয়ে প্রায় দম আটকে যাওয়ার মতো করে বলছেন, ‘ভূ… ভূত!’
তক্ষুনি আমার চারপাশে, যেন বাতাস জমাট বাঁধার মতো করে আরও চারজন মহিলার চেহারা তৈরি হল। সবারই অ্যাপ্রন, মাথার ক্যাপ, কোমরে গোঁজা তোয়ালে দেখে ভৃত্যস্থানীয় বলেই মনে হচ্ছিল। তাদের মধ্যে একজন বয়স্ক মহিলা তৎক্ষণাৎ অজ্ঞান হয়ে গেলেন। একটি অল্পবয়সী মেয়ে চিৎকার করতে শুরু করল। শুধু একজন মধ্যবয়স্ক মহিলা মাথা হেলিয়ে আমার আপাদমস্তক দেখে বলল, ‘আপনি ঠিকই বলেছিলেন, মিসট্রেস ম্যাকআইভার। এটা ভূতই বটে!’
মহিলার কথা শেষ হতে-না-হতে দরজা খুলে আরও তিনজন ঢুকল। এরা পুরুষ। পোশাক দেখে মনে হল, পাহারা দেওয়ার পাশাপাশি ফাইফরমাশ খাটার জন্য এককালে বড়ো-বড়ো বাড়ি বা দুর্গে এই ধরনের বেশ কিছু লোক থাকত বটে। তারা আমাকে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখে নানা মন্তব্য করতে শুরু করল। শেষে একজন বলল, ‘মিস্টার ফ্রেজার-কে ডেকে আনা যাক।’ একজন গিয়ে মিস্টার ফ্রেজার-কে ডেকে আনল। ইনি কিন্তু আমাদের মিস্টার ফ্রেজার নন! তাঁর সঙ্গে আবার একজন পাদরিও ছিলেন। তাঁরা এসে আমাকে দেখে রীতিমতো চিৎকার-চেঁচামেচি জুড়ে দিলেন।”
“তারপর?”
“পাদরি ভদ্রলোক হাতের বাইবেল নেড়ে ভাঙাচোরা ল্যাটিনে কী বলছিলেন, ঠিক বুঝতে পারিনি। বোধহয় ভূত তাড়ানোর মন্ত্র আউড়ে আমাকে অদৃশ্য করে দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন উনি। এদিকে সেই মিস্টার ফ্রেজার ক্রমেই রেগে উঠছিলেন। একবার তিনি আমাকে চড় মারারও চেষ্টা করলেন, কিন্তু হাতটা আমার মধ্য দিয়ে চলে গেল! যতই এ-সব হচ্ছিল, আমার বেদম হাসিও পাচ্ছিল আবার রাগও হচ্ছিল।”
“রাগ হচ্ছিল কেন?”
“আরে! যেখানে ওরাই ভূত, সেখানে আমাকে কিনা ভূত বলা হচ্ছে! চড় মারার চেষ্টা করা হচ্ছে! রাগ হবে না?”
“বুঝলাম। তারপর?”
“দারুণ রাগে আমি হাতের কাছে যা পেলাম সেগুলো ওদের দিকে ছুড়তে লাগলাম। সেগুলো ওদের মধ্য দিয়ে গিয়ে দেওয়াল আর মেঝেতে আছড়ে পড়তে লাগল। আমার কেমন যেন ছোড়াছুড়ির নেশা হয়ে গেল এই করতে-করতে। তারপর দড়াম করে দরজা খুলে একজন বলল, ‘লিজির ঘরে একটা ভূত বসে আছে!’ তাই শুনে সবাই দুদ্দাড় করে বেরিয়ে গেল। আর তারপরেই আমার ভয় করতে শুরু করল। ভীষণ-ভীষণ ভয়! আমার মনে হল, এই দুর্গে থাকলে আমি ভয়েই মরে যাব। তারপর আর কিছু খেয়াল নেই। তবে একটা কথা হলফ করে বলতে পারি, জ্যানেট। এখানে আমি আর থাকতে পারব না। দরকার হলে গ্লাসগোতে গিয়ে কোনও হস্টেলে ঘর ভাড়া নিয়ে থাকব— সে-ও ভালো। কিন্তু এই দুর্গে আর নয়! আচ্ছা, রব্বির সঙ্গে কখন দেখা হবে আমার?”
পরদিন ফ্রেজার-রা রোম থেকে এসে পৌঁছোলেন। তাঁদের সঙ্গে ফাদার হুইটলো নামের একজন রোমান ক্যাথলিক পাদরিও এসেছিলেন। জানতে পারলাম, তিনি মিসেস ফ্রেজারের ভাই। হুইটলো একটু ছিটগ্রস্ত হলেও, মানুষ হিসেবে ভালো। দুর্গে ঢুকে সব শুনে তাঁর প্রথম কথাই ছিল, “ভূত মানে হল অতৃপ্ত আত্মা। তাই ভয় পাওয়ার বদলে কী করলে তারা মুক্তি পায়— সেটা দেখা বেশি জরুরি।”
মিসেস ফ্রেজার-কে প্রথম দর্শনে দাম্ভিক মনে হয়েছিল। তারপর বুঝলাম, মহিলা ভয় পেয়ে গেছেন। মিস্টার ফ্রেজার অবশ্য খুবই সহানুভূতিশীল মানুষ। ম্যাককিনন দম্পতির চিকিৎসা আর অন্য সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিতে উনি একটুও দ্বিধা করলেন না।
এই দুর্গের কোথায়-কোথায় আমরা কী দেখেছি বা শুনেছি— সেটাই দেখাচ্ছিলাম ওঁদের। মূর্তিতে ভরা ঘরটার মাঝখান দিয়ে হাঁটছিলাম তখন। হঠাৎ পেছন থেকে নারীকণ্ঠে আর্তনাদ শুনে আমরা ঘুরে দাঁড়ালাম।
বড়ো সিঁড়িটার মাঝামাঝি জায়গায় দাঁড়িয়েছিল ফ্যাকাশে চেহারার এক তরুণী।
“ইনিও কি ম্যাককিনন-দের বন্ধু?” মিস্টার ফ্রেজার আমাকে জিজ্ঞেস করলাম।
“ইনি ভূত।” সংক্ষেপে উত্তর দিলাম।
“ভূত বলে কিছু হয় না।” সস্নেহে আমাকে বোঝাতে চাইলেন মিস্টার ফ্রেজার। মিসেস ফ্রেজার ঝাঁঝালো গলায় বলে উঠলেন, “কে তুমি?”
উত্তর পাওয়া গেল না, কারণ ততক্ষণে সিঁড়িটা ফাঁকা হয়ে গেছে। মিসেস ফ্রেজার কাঁপা গলায় বলে উঠলেন, “আলো-ছায়ায় আমরা ভুল দেখছি বোধহয়।”
“ভূত কিন্তু আছে, জেনিফার।” হুইটলো তাঁর বোনকে বোঝাতে চাইলেন, “তাদের দুঃখ-কষ্টগুলো বুঝতে পারলে…”
“আমি ভূতে বিশ্বাস করি না, ফ্রান্সিস।” হনহনিয়ে এগোলেন মিসেস ফ্রেজার। আমরা তাঁর সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার জন্য প্রায় ছুটতে শুরু করলাম।
কর্মচারীদের থাকার ঘরগুলোর কাছে পৌঁছোনোর পর আর একটা ঘটনা ঘটল। কালো গাউন আর সাদা অ্যাপ্রন পরা একটি অল্পবয়সী মেয়ে হাতের ট্রে-তে বেশ কয়েকটা পাত্র নিয়ে এগিয়ে আসছিল। আমাদের দেখেই সে আর্তনাদ করে, হাত থেকে পাত্রটা প্রায় ছুড়ে ফেলে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। মিস্টার ফ্রেজার দৌড়ে মেয়েটির কাছে গিয়ে তার কপালে হাত দিতে গেলেন। কিন্তু তাঁর হাতটা মেয়েটির কপাল ভেদ করে মেঝে ছুঁয়ে ফেলল! তখনই মেয়েটি আবার বাতাসে মিলিয়ে গেল।
মিস্টার ফ্রেজার রীতিমতো কেঁপে গেলেন এবার। ‘অবিশ্বাসী’ মিসেস ফ্রেজারের লাগাতার চিৎকার থামানোর জন্য হুইটলো তাঁকে গোটাদুয়েক চড় মারতেও বাধ্য হলেন।
দুর্গ-পরিক্রমা এরপর বেশিক্ষণ চালানো গেল না। উষ্ণতা, বা অন্যদের সান্নিধ্য— ঠিক কোনটা সবাই খুঁজছিলেন, তা বলা কঠিন। তবে ফ্রেজার পরিবার রান্নাঘরেই আশ্রয় নিলেন। এলেনের তখনও যা অবস্থা ছিল তাতে ওকে আগুনের কাছে পাঠাতে ভরসা হচ্ছিল না। বাধ্য হয়ে আমিই সবার জন্য চা বানালাম।
ফাদার হুইটলো বললেন, দুর্গের দুঃখী প্রেতেদের খুশি করাটাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। আমি বললাম যে আমাদের দেখে ভয় পাওয়া ছাড়া এই দুর্গের ভূতেদের আর কোনও কষ্ট নেই। হুইটলো আমাকে থামিয়ে বললেন, “এটা আমার এলাকা, মিস কারমাইকেল। আমি ভালোভাবেই জানি যে ভূত-প্রেত বা অন্য কোনও অসুখী আত্মা অনিচ্ছাসত্বেও পৃথিবীতে আটকে থাকতে বাধ্য হয়। কয়েকটা প্রক্রিয়ার সাহায্যে তাদের মুক্ত করা সম্ভব। এবার আমাদের সেটাই করতে হবে।”
“কিন্তু এই… অতৃপ্ত আত্মারা আমাদের কী-ভাবে দেখতে পাচ্ছে?” এলেন বলে উঠল, “আর এতদিন তাদের কেউ দেখেনি কেন? বা তারাও কোনও মানুষকে দেখেনি কেন?”
“আত্মারা আপনাদের দেখতে পাচ্ছে না, মিসেস ম্যাককিনন।” বিজ্ঞের মতো বললেন হুইটলো, “তবে তাদের মনে হচ্ছে যে তারা আপনাদের মতো কাউকে দেখছে। আর এতদিন কেন এ-সব হয়নি— সেটা বলা কঠিন। আমার ধারণা, এই দুর্গে কিছু একটা হয়েছে। মানে কোনও একটা কারণে এখানকার পরিবেশে একটা পরিবর্তন হওয়ার ফলে অবস্থাটা বদলে গেছে।”
ব্যাখ্যাটা আমাদের কারও মনঃপূত হল না। একটা জোরালো তর্ক বাধার আগেই সদর দরজার ঘণ্টি বাজল। মিস্টার ফ্রেজার নিজেই দরজা খুলতে গেলেন। পোস্টম্যান এসেছে। চিঠির বান্ডিল নিয়ে এসে মিস্টার ফ্রেজার একটা চিঠি এলেনকে দিয়ে বলেন, “এটা আপনাদের জন্য এসেছে।”
এলেন আর মিস্টার ফ্রেজার চিঠি পড়ায় ব্যস্ত হলেন। আমি ফাদার হুইটলো’র কাছ থেকে এক্সরজিসম— মানে সাদা বাংলায় ভূত তাড়ানোর একটা রোমাঞ্চকর ঘটনা শুনলাম। হঠাৎ এলেন দম আটকে যাওয়ার মতো একটা শব্দ করে উঠল। আমরা সবাই চমকে ওর দিকে ঘুরলাম।
বিস্ফারিত চোখে, মুখ হাঁ করে আমার দিকে চেয়ে রয়েছে এলেন। ওর অসাড় আঙুলগুলোর ফাঁক দিয়ে চিঠিটা নীচে পড়ে গেল। আমি ওর দিকে এগোতেই চোখ উলটে অজ্ঞান হয়ে গেল ও।
আমি আর মিসেস ফ্রেজার মিলে ওর জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করছিলাম। হঠাৎ মিস্টার ফ্রেজার চেঁচিয়ে বলে উঠলেন, “সত্যি! সব সত্যি!” ভদ্রলোকের মুখের রঙটা একেবারে ছাইয়ের মতো হয়ে গেছে দেখে আমার মনে হল, এবার উনিও না অজ্ঞান হয়ে পড়েন। ফাদার হুইটলো মিস্টার ফ্রেজারের কম্পমান হাত থেকে একটা চিঠি নিলেন। খেয়াল হল, এলেন ওই চিঠিটাই পড়ছিল।
হুইটলোও চিঠি পড়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেলেন। মিস্টার ফ্রেজার একরকম টেনে মিসেস ফ্রেজারকে দাঁড় করিয়ে জাপটে ধরলেন। মিসেস ফ্রেজার কিছুই বুঝতে না পেরে ছটফট করছিলেন। ইতিমধ্যে হুইটলো গলায় ঝোলানো ক্রসটা নিজের সামনে তুলে ধরে আমার দিকে এগিয়ে এলেন। তারপর অন্য হাত দিয়ে ওই কালান্তক চিঠিটা বাড়িয়ে ধরলেন।
হাতের লেখাটা চেনা। কিন্তু কার লেখা এটা?
“প্রিয় এলেন ও রব্বি,
জ্যানেট কেন এতদিনেও তোমাদের কাছে পৌঁছোয়নি, সেই ব্যাখ্যাটা দিতে বড্ড দেরি হয়ে গেল।”
চমকে উঠে পড়া থামালাম। পৌঁছোইনি মানে? আর… হাতের লেখাটা তো আমার মা’র! চোখ তুলে দেখলাম, ফাদার হুইটলো একটা ছোট্ট বাক্স খুলে একটা বই, রুপোলি একটা পাত্র, লম্বা রিবন, আরও একটা ক্রস— এইসব বের করছেন। আমি আবার পড়তে শুরু করলাম।
“মেয়েটা বড্ড চেয়েছিল তোমাদের সঙ্গে এই ছুটিটা কাটাতে। সন্ধের আলো-আঁধারিতে যে ওর দেখতে সমস্যা হত, সে তো জানই। আমি ওকে বারবার বলেছিলাম, সন্ধে হয়ে গেলে যেন গাড়ি না চালায়। কিন্তু ও আমার কথা শোনেনি। ফলে যা হওয়ার তা-ই হয়েছিল। ইনভারনেসের পঞ্চাশ মাইল পশ্চিমে একটা খাদে পড়ে গেছিল জ্যানেট। পরদিন রাস্তায় চাকার দাগ দেখে খুঁজতে গিয়ে পুলিশ ওকে দোমড়ানো গাড়ির মধ্যেই পায়। মাথা আর ঘাড় দুটোই…!
আমার হয়তো আরও আগে লেখা উচিত ছিল। কিন্তু সেই অবস্থা ছিল না আমার।
পারলে জ্যানেটের অন্য বন্ধুদের খবরটা দিয়ে দিয়ো।
ভালোবাসা নিয়ো,
জিন কারমাইকেল”
শুনতে পেলাম, ফাদার হুইটলো কাঁপা গলায় মন্ত্রপাঠ শুরু করেছেন, “ঈশ্বর, তাঁর পুত্র, আর পবিত্র প্রেতাত্মার নামে…!”
_
মূল কাহিনি: দ্য গেটস ওয়্যার লকড্
লেখক: মোরাগ গ্রিয়ার
প্রথম প্রকাশ: ফিফটিন্থ প্যান বুক অফ হরর স্টোরিজ, ১৯৭৪
