জোঁক – ঋজু গাঙ্গুলী

জোঁক

ধরুন আপনি পশ্চিম কর্নওয়ালে বেড়াতে গেছেন। সে-ক্ষেত্রে, পেনজ্যান্স আর ল্যান্ডস এন্ডের মাঝের ন্যাড়া আর উঁচু জায়গাটা পেরোনোর সময় রোদে পুড়ে, জলে ভিজে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া একটা নোটিসবোর্ড আপনার নজরে পড়তেও পারে। তাতে লেখা আছে, ‘পোলার্ন ২ মাইল।’ তখন আপনি গাইড বুক খুলবেন। সেখান থেকে জানবেন যে ওটা একটা মাছ-ধরা গ্রাম। দ্রষ্টব্য বলতে গির্জার রেলিঙ হিসেবে ব্যবহৃত কিছু কাঠখোদাই আর নকশা— যারা আদতে আরও পুরোনো একটা গির্জার অংশ ছিল। সেখানেই আপনি পড়বেন যে সেন্ট ক্রিডের গির্জাতেও সেই সময়ের নকশা আর স্থাপত্য দেখা যায়— বরং আরও ভালোভাবে সংরক্ষিত আকারে। এরপর আর কে ওখানে যাবে?

তা-ও ধরুন আপনি যেতে চাইলেন। একটু এগিয়েই বুঝবেন যে খানাখন্দে ভরা ওই সরু রাস্তায় যাতায়াত করে হাঁটু বা সাইকেলের, বা দুটোরই বারোটা বাজবে। তারপর আপনার বাকি ছুটিটার কী হবে?

তাই, একেবারে উত্তুঙ্গ টুরিস্ট সিজনেও পোলার্নে কেউ যায়-টায় না। বাকি সময়ের কথা তো বলাই বাহুল্য। এমনকি পোস্টম্যান অবধি রেজিস্টার্ড চিঠি বা বড়ো পার্সেল গোছের কিছু না এলে ওই গ্রামে যায় না, বরং রাস্তার কাছেই রাখা একটা বড়ো বাক্সে সব চিঠিচাপাটি ফেলে দেয়।

জেলেরা মাছ ধরে সমুদ্রপথেই জেটিতে যায়। সেখানে মাছ বেচার পর ফিরে আসে তাদের ফাঁকা ট্রলারগুলো।

কেউ আসে না পোলার্নে। সেখান থেকেও কেউ কোত্থাও যায় না। এতটা বিচ্ছিন্ন থাকলে যে-কোনও জায়গার বাসিন্দাদের মধ্যেই একটা তীব্র স্বাধীনচেতা, বা আরও সহজ ভাষায় বললে একলাষেঁড়ে মনোভাব তৈরি হতে বাধ্য। কিন্তু পোলার্নের বাসিন্দারা নিজেদের মধ্যে বেশ ভালোভাবেই মানিয়ে-গুছিয়ে নিত। মনে হত, ঝড় আর বৃষ্টি, রোদ আর হাওয়া যেন এক আলাদা মন্ত্রগান শুনিয়ে তাদের একসূত্রে বেঁধে রেখেছে। মানুষের ক্ষুদ্র-তুচ্ছ ওঠাপড়ার চেয়েও অনেক বড়ো, অনেক দুর্জ্ঞেয় কোনও শক্তির অস্তিত্ব যেন তারা সবাই জানে।

দশ বছর বয়সে আমার ফুসফুসের সমস্যা ধরা পড়েছিল। এমনিতেই রোগে ভুগে কঙ্কালসার হয়ে গিয়েছিলাম। তার ওপর এই অবস্থা হওয়ায় বড়োরা ঠিক করেছিলেন, আমাকে লন্ডন থেকে দূরে এমন কোথাও পাঠিয়ে দেবেন যেখানে বিশুদ্ধ হাওয়া আর যত্ন— দুটোই জুটবে। আমার পিসেমশাই রিচার্ড বোলিথো ছিলেন পোলার্নের ভাইকার। তিনি ওখানে একটা ছোট্ট বাড়ি কিনে সেখানেই থাকতেন। ভিকারেজটা তিনি জন ইভান্স নামের এক শিল্পীকে ভাড়া দিয়েছিলেন।

রিচার্ডের বাড়ির একপাশে পাথরের দেওয়াল আর ছাদ দিয়ে বানানো একটা ঘর ছিল। ওটাই আমার জন্য বরাদ্দ হয়েছিল। আমি ওতে দিনের ক’ঘণ্টা কাটাতাম বলা মুশকিল। আসলে লন্ডনের ওই ধূসর বাদামি আকাশ, ধোঁয়া আর বদ্ধ পরিবেশের পর এমন একটা জায়গায় এসে আর ঘরবন্দি থাকতে ইচ্ছে হত না। সারাদিন আমি ঘুরে বেড়াতাম পাহাড়ের ঢালে, সমুদ্রের ধারে, ঘাসফুলের ভিড়ে আর জেটিতে। কোনওরকম নিষেধাজ্ঞাই ছিল না আমার ওপর। শুধু দুটো জিনিস একটু অন্যরকম ছিল।

আমার রোজকার পড়াশোনা নিয়ে খুব একটা চাপ ছিল না। বাগানে হাঁটতে-হাঁটতে রিচার্ড আমাকে ল্যাটিন ব্যাকরণ আর সাহিত্য বোঝাতেন। তাঁর পড়ানোর ভঙ্গিটাই এমন ছিল যে আমার বুঝতে আর মনে রাখতে বিন্দুমাত্র অসুবিধে হত না। তারই সঙ্গে তিনি আমাকে ফুল, পাখি, গাছ— এগুলো চেনাতেন, তারপর সেগুলোর বর্ণনা দিতে বলতেন। জটিলতম বিষয়কেও সহজে আর যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করার শিক্ষাটা আমি রিচার্ডের কাছেই পেয়েছিলাম।

তবে রোববার, চার্চের বেদিতে দাঁড়ানো অবস্থায় এই মানুষটির এক অন্য রূপ দেখতাম।

ক্যালভিনিজম আর মিস্টিসিজমের কোন গোপন আগুন এই মানুষটির ভেতরে ছিল, জানি না। তবে অনুশোচনাহীন পাপীদের পরিণতি নিয়ে তাঁর সেই ভয়াবহ বক্তৃতামালা আমাকে ক্ষতবিক্ষত করে দিত। এমনকি সন্ধেবেলায়, যখন ছোটোরা আসত তাঁর কথা শুনতে, তখনও রিচার্ডের মধ্য থেকে বেরিয়ে আসত সেই কালো আগুনের এক-আধটা ফুলকি। সেখানেই তিনি বলেছিলেন, “দেবদূতেরা শিশুদের রক্ষা করেন ঠিকই। কিন্তু সেই শিশু যদি এমন কিছু করে যাতে দেবদূত বিরূপ হন, তাহলে ভয়ংকর বিপদ হবে। দেখা আর অদেখা এমন সব বিপদ আমাদের ঘিরে থাকে, যাদের হাতে পড়লে শিশু থেকে বৃদ্ধ— সবারই পরিণতি হয় অবর্ণননীয়!”

এই কথাগুলো বলার সময় রিচার্ড সেই পুরোনো কাঠখোদাই আর নকশাগুলোর দিকে ইঙ্গিত করতেন, যাদের কথা আমি প্রথমেই বলেছিলাম। সেগুলো খুঁটিয়ে দেখে বুঝেছিলাম, মোট চারটে প্যানেল আছে তাতে। প্রথমটা নিরীহগোছের— দেবদূত গ্যাব্রিয়েল কুমারী মেরি-কে জানাচ্ছেন যে তাঁর গর্ভে জন্ম নিতে চলেছেন ঈশ্বরের সন্তান, অর্থাৎ যিশু। দ্বিতীয়টাও বেশ সম্ভ্রান্ত— আর্কেঞ্জেল মাইকেল যিশু-র দেহ কাঁধে বহন করছেন পুনরুজ্জীবনের ঠিক আগে। তৃতীয়টা দেখিয়েছে এন্ডরের উইচ-কে— মানে যে মহিলার পরামর্শ অনুযায়ী সল স্যামুয়েলের কাছ থেকে ফিলিস্তিনদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য পরামর্শ নিয়েছিলেন।

চতুর্থ প্যানেলটাই ছিল গোলমেলে। ওটা ব্যাখ্যা করার সময় রিচার্ড বেদি থেকে নেমে আসতেন আর আঙুল তুলে-তুলে জিনিসটা দেখাতেন।

ওতে দেখানো জায়গাটা হুবহু পোলার্নের চার্চের সামনের চাতালের মতো। চার্চের গেটে আলখাল্লা-পরা এক পুরোহিত দাঁড়িয়ে আছেন। হাতের ক্রস তুলে ধরে একটা বিশাল জোঁকের মতো জিনিসকে ঠেকাতে চাইছেন তিনি!

একটা জোঁক যে কতটা ভয়াল হতে পারে, তা ওই প্যানেলটা না দেখলে কখনওই বুঝতে পারতাম না। তারই সঙ্গে চলতে থাকত রিচার্ডের ধারাবিবরণী। জিনিসটার নীচে লেখা ‘নেগোশিয়াম পেরামবুলান্স ইন টেনেব্রিস’ কথাটা ব্যাখ্যা করে দিতেন তিনি— সেই ব্যাধি, যা অন্ধকারে থাকে।

“এ ব্যাধি শরীরের কম, কিন্তু মনের বেশি!” গর্জন করতেন রিচার্ড, “যা কিছু অশুভ, যা কিছু কদর্য— তার সঙ্গে লেনদেন করে এই প্রাণী। ঈশ্বর যাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন, তাদের শেষ করে দেয় এ।”

আমার সমবয়সী ছেলেরা এগুলো শুনে চোখ চাওয়াচাওয়ি আর ফিসফিস করছে দেখেই মনে হয়েছিল, তারা এই ভাবনা আর তর্জনগর্জনের পেছনের ঘটনা বা কিংবদন্তিটা জানে। তাদের থেকে যে গল্পটা উদ্ধার করলাম, সেটা এইরকম—

যে চার্চে দাঁড়িয়ে রিচার্ড আমাদের ভয় দেখাতেন, সেখান থেকে বড়োজোর তিনশো গজ দূরেই একটা বহু প্রাচীন ও পরিত্যক্ত চার্চ ছিল। পরে জমির সঙ্গে সেই পরিত্যক্ত বাড়িটাও কিনেছিলেন লন্ডন থেকে আসা এক ভদ্রলোক। চার্চ ভেঙে তার পাথরগুলো দিয়ে তিনি নিজের বাড়ি বানিয়েছিলেন। শুধু ওই প্যানেলটা তিনি রেখে দিয়েছিলেন নিজের ঘরে। তার ওপরেই তিনি মদের বোতল রাখতেন, জুয়া খেলতেন, আরও নানাবিধ অপকম্মো করতেন। তবে যত দিন গেল, ভদ্রলোকের সাহসের ভাঁড়ারে ঘাটতি দেখা দিল। সবসময় বাড়ির সবক’টা আলো জ্বালিয়ে রাখতেন তিনি। কেন? উত্তরটা তিনি কাউকে বলেননি। তবু সবাই জানতে পারল একদিন।

সেদিন ভয়ংকর ঝড় উঠেছিল। সমুদ্র থেকে ধেয়ে আসা হাওয়া আর জলের ঝাপটায় নিভে গেল বাড়ির আলোগুলো। তৎক্ষণাৎ সেই ভদ্রলোকের মর্মভেদী আর্তনাদে মুখরিত হল পোলার্ন! আলো জ্বালিয়ে চাকর-বাকরদের ছুটে আসতে কিছুটা সময় লাগল। তারা এসে দেখল…

বিপুলদেহী ভদ্রলোকের শরীরটা একটা নেতানো বস্তার মতো ফাঁপা হয়ে মাটিতে পড়ে আছে। তাঁর গলার কাছটা ফাঁক হয়ে মাটিতে গড়াচ্ছে রক্ত।

আর মানুষটির শরীর থেকে দূরে অন্ধকারে মিলে যাচ্ছে একটা প্রকাণ্ড জোঁকের মতো কিছু!

“ভদ্রলোক মারা যাওয়ার আগে ল্যাটিনে কিছু একটা বলেছিলেন।” বক্তাদের একজন নাক চুলকে বলল, “সেটা ঠিক…”

“নেগোশিয়াম পেরামবুলান্স ইন টেনেব্রিস?” আমি মনে করানোর চেষ্টা করলাম।

“হতে পারে।”

“তারপর কী হল?”

“কেউ আর ওদিকে যেতই না। ভদ্রলোকের বাড়িটা রোদে-জলে পড়ে-থেকে-থেকে নষ্ট হচ্ছিল। তিন বছর আগে পেঞ্জ্যান্স থেকে মিস্টার ডুলিস এসে বাড়িটা কিনে নিয়েছেন। তারপর সেটাকে মেরামতও করেছেন। তবে উনি বোধহয় জোঁক বা অন্য কিছুতে ভয় পান না। রোজ সন্ধেবেলা পুরো এক বোতল হুইস্কি ফাঁকা করার পর তিনি ঠিক কী বোঝেন বা ভাবেন— তা তিনিই জানেন।”

এরপর থেকে মিস্টার ডুলিস আমার পোলার্ন-বাসের ফোকাস হয়ে গেলেন। ভদ্রলোকের ওপর যথাসাধ্য নজরদারি করতাম। অপেক্ষা করতাম, কখন তিনি আর্তনাদ করে উঠবেন, আর আমিও দেখতে পাব সেই ভয়াল ভয়ংকর জোঁককে— যে অন্ধকারে থাকে! কিন্তু তেমন কিছুই হল না। মিস্টার ডুলিস নিজের মতো থাকতেন। গেঁটে বাত না লিভার— কোনটা তাঁকে আগে কাত করবে, সেটা নিয়েই ভাবনা হত। ডুলিস চার্চে যেতেন না, রিচার্ড বা আমাদের মতো কাউকে আপ্যায়নও করতেন না। ফলে একটু-একটু-করে পুরো ব্যাপারটাই আমি ভুলে যেতে শুরু করলাম।

তিন বছর রোদ, জল আর হাওয়ার মধ্যে থেকে আমার চেহারা আর মন-মেজাজে আমূল পরিবর্তন এসেছিল। পোলার্নের পাট চুকিয়ে আমি লন্ডনে ফিরে এলাম। তারপর এল ইটন আর কেমব্রিজ-এর পালা। সে-সবের পর ব্যারিস্টার হিসেবে আমি যা রোজগার করতে শুরু করলাম তা প্রায় ঈর্ষণীয়। কিন্তু সবকিছুর মধ্যেও আমার একটাই কথা মনে হত।

আমাকে পোলার্নে ফিরে যেতে হবে।

দু’দশক পর বুঝতে পারলাম, আর আমার রোজগার করার দরকার নেই। সঞ্চয় আর নানা ধরনের বিনিয়োগের মাধ্যমে আমি যে ব্যবস্থা করেছি তাতে প্রতি মাসে আমার হাতে বেশ ভালো টাকাই আসবে। আমি বিয়ে করিনি, কারণ তেমন ইচ্ছেই হয়নি। ব্যারিস্টার হিসেবে বিশাল কিছু একটা হওয়ার মতো উচ্চাকাঙ্ক্ষাও আমার ছিল না। তাই লন্ডনের ওই ব্যস্ততা আর মালিন্যে ভরা জীবনের বদলে খোলা আকাশ, সমুদ্রের নোনা লে রোদের ঝিকমিক আর হু-হু হাওয়া আমাকে টানছিল। পাথর দিয়ে বাঁধানো রাস্তার বদলে ঘাসফুলে ছাওয়া পাহাড়ি পথে ছুটতে ইচ্ছে হচ্ছিল।

রিচার্ডের সঙ্গে চিঠিতে যোগাযোগ বজার রেখেছিলাম পোলার্ন থেকে চলে আসার পরেও। তাঁর মৃত্যুর পর ওখানে গিয়ে পিসি হেস্টারের সঙ্গে দেখা করতে খুব ইচ্ছে হয়েছিল। কিন্তু আমি যাইনি। আসলে ওখানে গেলে যে আর ফিরতে পারব না— এমন একটা দৃঢ় বিশ্বাস আমার ছিল। তাই শেষ অবধি লন্ডনের পাট চোকানোর সিদ্ধান্ত নিয়েই আমি পিসিকে সেই বিষয়ে জানালাম।

পিসি-র সোৎসাহ উত্তর এসে পৌঁছোল ক’দিন পরেই। তিনি লিখেছেন, “নিজের জন্য একটা পছন্দসই বাড়ি না-কেনা অবধি আমার সঙ্গেই থেকো। বোলিথো হাউজ এমনিতেও আমার একার পক্ষে বড্ড বড়ো, বড্ড ফাঁকা।”

রাজি হয়ে গেলাম। জুন মাসের এক সন্ধ্যায় পোলার্ন যাওয়ার হাঁটাপথ ধরে গ্রামে ঢোকার সময় বুঝতে পারলাম, জায়গাটা এই তিন দশকেও তেমন বদলায়নি। ছোটোবেলার চেনাজানা জায়গাগুলো বড়ো হওয়ার পর ছোটো লাগে, কিন্তু তেমন কিছুও মনে হচ্ছিল না। সবচেয়ে বড়ো কথা, ‘সবার থেকে আলাদা’ ভাবটা অটুট ছিল পোলার্নের আকাশে-বাতাসে। হাঁটতে-হাঁটতে মনে হচ্ছিল, লন্ডনের সেই আইন-আদালত আর অন্য সব মারপ্যাঁচ মুছে যাচ্ছে স্মৃতি থেকে। সবটা ভরাট করে দিচ্ছে হাওয়া আর সমুদ্রের গর্জন।

পোলার্ন বদলায়নি। হেস্টার, মানে আমার পিসিও দেখলাম তেমন বদলাননি। তিন দশক লন্ডনে থাকলে লোকজন একেবারে বেঁকে যায়। এই মহিলা কিন্তু বুড়িয়ে যাননি। বরং একটা অদ্ভুত ব্যক্তিত্ব আর লাবণ্য ফুটে উঠেছে ওঁর চেহারায় আর আচরণে। খাওয়া-দাওয়া সেরে গল্প করছিলাম আমরা। হেস্টারের ঝলমলে আকাশের মতো মুখটায় একফালি মেঘ জমল, যখন আমি মিস্টার ডুলিসের ব্যাপারে জানতে চাইলাম।

“ডুলিসের মারা যাওয়ার পর দশ বছরেরও বেশি হয়ে গেছে।” কফির কাপটা সরিয়ে রেখে বলেছিলেন হেস্টার, “মানুষটি নিউলিন থেকে এখানে আসার আগেও অনেক অপকর্ম করেছিল। এমনকি এখানেও তুমি তো দেখেইছিলে। মদ খাওয়া আর সবার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার— এই দুটো দিয়েই ডুলিসকে চিনে নেওয়া যেত। তোমার পিসে বলতেন, ওর কপালে দুঃখ আছে। কথাটা সত্যি বলে প্রমাণিত হয়েছিল আর কী।”

“কিন্তু ঠিক কী হয়েছিল?”

“চার্চে নানা কথা বলতে-বলতে তোমার পিসে বেদি থেকে নেমে আসতেন। তারপর রেলিঙে লাগানো কাঠখোদাই আর নকশাগুলো, বিশেষ করে চার নম্বর ফ্রেমটা দেখাতেন। মনে আছে তোমার?”

“বিলক্ষণ।”

“ওই বিশাল জোঁকের মতো জিনিসটা যে দেখেছে, সে-ই ভোলেনি। যাইহোক, ওটার কথা তুলে তোমার পিসে যে ভাষণগুলো দিতেন, ডুলিস সেগুলো শুনেছিল। তারপর থেকেই দেখতাম, সন্ধে হলেই ওর বাড়ির সবক’টা আলো জ্বলে। এই করতে-করতে ওর ভয় কমার বদলে বেড়েই যাচ্ছিল। তারপরেই কেলেংকারি হল।”

“কেলেংকারি!”

“হ্যাঁ। একদিন মদ খেয়ে একেবারে চুর অবস্থায় ডুলিস চার্চের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে ওই প্যানেলটা ভেঙে তছনছ করল।”

“সে কী! অত পুরোনো প্যানেলটা এইভাবে…?”

“পরদিন সকালবেলা চার্চে ঢোকার পর ওই অবস্থা দেখে তোমার পিসে তো রেগে আগুন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, এটা কার কাজ। ডুলিসের বাড়িতে গিয়ে লোকটাকে চেপে ধরতে লোকটা স্বীকার করেছিল, ‘হ্যাঁ, আমিই ভেঙেছি ওই জিনিসটাকে। বেশ করেছি। ওটাই ছিল যত কুসংস্কারের ডিপো। জানি, ওটা দেখিয়েই তুমি যতরাজ্যের হাবিজাবি বকতে। সেটাও গেল তো। বেশ হয়েছে!’

তোমার পিসে ঠিক করলেন, সোজা পেনজ্যান্সে গিয়ে পুলিশে অভিযোগ জানাবেন এই ব্যাপারে। কিন্তু চার্চে ঢুকে তিনি দারুণ চমকে গেলেন।”

“কেন?”

“প্যানেলটা একেবারে অক্ষত অবস্থায় জায়গামতো রাখা ছিল। এটা মোটামুটি স্পষ্ট হয়ে গেল যে, পুলিশ, এমনকি চার্চের থেকেও বড়ো আর ক্ষমতাধর কেউ বা কিছু এই ব্যাপারটায় হস্তক্ষেপ করেছে।”

“উনি ভুল দেখেননি তো?” আমি জিজ্ঞেস করতে বাধ্য হলাম, “মানে ব্যাপারটা এতই অবিশ্বাস্য…!”

“লন্ডনের মানুষের পক্ষে এটা মেনে নেওয়া একটু শক্তই।” হেস্টার হাসলেন, “তবে সেই রাতেই ঘটনাটা ঘটল। শুতে যাওয়ার সময়েও দেখেছিলাম, ডুলিসের বাড়ির সবক’টা আলো জ্বলছে। রাতে একটা চিৎকার শুনে আমার ঘুম ভাঙল। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি, ওর বাড়িটা একদম অন্ধকার। তারপরেই দেখতে পেলাম, রাস্তা দিয়ে টলতে-টলতে কেউ ছুটছে আর প্রাণভয়ে আর্তনাদ করছে, ‘আলো! আমাকে কেউ একটু আলো দাও!’

আমি তোমার পিসেকে তুললাম। তিনি আলো জ্বালিয়ে যতক্ষণে রাস্তায় নামলেন ততক্ষণে আরও বেশ ক’জন উঠে পড়েছিলেন। সবাই মিলে রাস্তা ধরে নেমে একেবারে জেটি অবধি চলে গেলেন। ওখানেই পাথরের ওপর পড়ে ছিল ডুলিস। ওর গলার নলিটা ফাঁক হয়ে রয়েছে। শরীরটাও একেবারে শুকিয়ে গেছে। অথচ আশেপাশে কোথাও রক্তের চিহ্নমাত্রও ছিল না।”

হেস্টার আমার দিকে ঝুঁকে বললেন, “সরকারি রিপোর্টে পুরো ব্যাপারটা মাতলামি আর তার ফলে হওয়া দুর্ঘটনা বলেই দেখানো হয়েছিল। তবে আসল কারণটা বুঝতেই পারছ।”

মাথা নাড়লেও এই নিয়ে কিছু বললাম না। জানতাম, যা-ই বলব তাকেই ‘লন্ডনের মানুষের’ ভাবনা বলে সাব্যস্ত করা হবে। তাই জিজ্ঞেস করলাম, “ওই বাড়িতে কি এখন কেউ থাকে?”

“থাকে।” হেস্টারের মুখটা অন্ধকার হয়ে এল, “একসময় আমাদেরই ভাড়াটে ছিল সে।”

“জন ইভান্স?”

“সে-ই। কী ভালোই না ছিল মানুষটা। আর সে এখন…” হেস্টার উঠে দাঁড়ালেন।

“সে এখন? কথাটা এইরকম মাঝপথে ছাড়ছেন কেন?”

“ওর কথা ও নিজেই শেষ করবে।” আলোটা জ্বালিয়ে হেস্টার বললেন, “রাত কিন্তু অনেক হল। এরপরেও আমরা জেগে থাকলে লোকে ভাববে, আমাদেরও বোধহয় সারারাত আলো জ্বালিয়ে রাখার অবস্থা হয়েছে।”

রাতে শোয়ার সময় ঘরের পর্দাগুলো সরিয়ে দিলাম। কুয়াশামাখা চালগুলো চাঁদের আলোয় চকচক করছে। সমুদ্রের দিক থেকে ভেসে আসছে হাওয়া আর মৃদু গর্জন। বাগান থেকে আসা হালকা সুগন্ধ মিশে যাচ্ছে সেই হাওয়ায়। মনে হল, পোলার্ন ফিরে আসার সিদ্ধান্তটা আরও আগেও নিতে পারতাম আমি।

আপনা থেকেই চোখ গেল ঢালের ওপরদিকে। গোটা গ্রাম অন্ধকার হয়ে থাকলেও একটা বাড়ির সবক’টা আলো তখনও জ্বলছে!

ঘুম ভাঙার পর চোখ মেলতে ভয় করছিল। আশঙ্কা হচ্ছিল, দিনের আলোয় যদি পোলার্ন দেখে হতাশ হই? কিন্তু চোখ খুলে বুঝলাম, আমার ধারণাটা একেবারে অমূলক। শুধু তা-ই নয়, একেবারে আক্ষরিক অর্থে আমি ছোটোবেলার সেই তিনটে বছরে ফিরে যেতে শুরু করলাম। পোলার্নের আকাশে-বাতাসে-মাটিতে একটা অন্যরকম শক্তির উপস্থিতি সেই সময় আবছাভাবে টের পেতাম। সেটা এখন একেবারে স্পষ্টভাবে ধরা দিল আমার কাছে। তাকে প্রাকৃতিক বা ঐশ্বরিক বলব না। বরং মনে হল, এখানে মানুষের মধ্যে থেকে দূষিত রক্তের মতো করে অসংযত জীবনযাপন বা অসদাচরণের প্রবণতা যেন শুষে নিচ্ছে কোনও অদৃশ্য জোঁক!

ক’দিনের মধ্যেই জন ইভান্সের সঙ্গে আমার মোলাকাত হল।

একদিন সকালে আমি সমুদ্রের তীরে বালির ওপর শুয়ে ছিলাম। তখনই দেখলাম, একজন স্থূলদেহী মাঝবয়সী মানুষ— মদ আর অসংযত জীবনযাপন শরীরের মতো যার মুখটাকেও একেবারে থলথলে করে দিয়েছে— টলতে-টলতে এগিয়ে আসছে। কাছে এসে চোখগুলো ছোটো করে আমাকে দেখল লোকটা। তারপর বলে উঠল, “আরে! তুমি তো ভিকারের সেই ভাইপো না বোনপো— কী যেন একটা, তাই না? বাগানের ঘরটায় থাকতে তুমি। আমাকে চিনতে পারছ না?”

গলা থেকে কিছুটা চিনলাম। তার চেয়েও বেশি চিনলাম, যেহেতু আগের সেই ছিপছিপে বলিষ্ঠ চেহারার একটা ফসিল ওই থলথলে চেহারার মধ্যে কিছুটা হলেও ছিল।

“চিনতে পেরেছি।” আমি বললাম, “আপনি আমার জন্য ভারি সুন্দর কয়েকটা ছবি এঁকে দিয়েছিলেন সেইসময়।”

“তা দিয়েছিলাম।” আমি চিনতে পারায় মানুষটি যে খুশি হয়েছেন সেটা বোঝা গেল, “আবার দেব। কিন্তু তুমি এখানে কী করছ? সমুদ্রে স্নান করতে গেছিলে নাকি? ঝুঁকির ব্যাপার। জলের নীচে ঠিক কী-কী আছে— কে জানে! ডাঙার ক্ষেত্রেও অবশ্য একই কথা প্রযোজ্য। তবে আমি ও-সব কথায় বিশ্বাস করি না। কাজ আর হুইস্কি— এই নিয়েই আমার সময় কেটে যায়। এই ক’টা বছরে আমি আঁকতে শিখেছি। মদটাও ইদানীং একটু বেশিই খাই। আসলে ওই বাড়িটায় থাকলেই কেন যেন সবসময় খুব তেষ্টা পায়!”

চুপ করে রইলাম। ইভান্স বলে চললেন, “তুমি মিসেস বোলিথো’র সঙ্গেই থাকছ কি? ওঁর একটা পোর্ট্রেইট আঁকতে পারলে কিন্তু বেশ হত। সৌন্দর্য আর অভিজ্ঞতার পাশাপাশি আরও একটা জিনিস ধরা পড়ে ওঁর মধ্যে। উনি অনেক কিছু জানেন। পোলার্নের অনেকেই অনেক কিছু জানে। তবে আমার ও-সব না জানলেও চলবে!”

আমি একইসঙ্গে ভদ্রলোকের প্রতি আকর্ষণ আর বিকর্ষণ অনুভব করলাম। বিকর্ষণের ব্যাপারটা বোঝা সহজ। কিন্তু আকর্ষণ?

আসলে ওঁর চেহারা, আর তার চেয়েও বেশি করে ওঁর কথা বলার ভঙ্গিতে আমার মনে হচ্ছিল, জীবনের একটা অন্যরকম চেহারা দেখেছেন ইভান্স। সেটা ওঁর ছবির ওপর কেমন প্রভাব ফেলেছে— সেটাই দেখার জন্য একটা প্রবল কৌতূহল মাথাচাড়া দিচ্ছিল আমার ভেতরে। সে-জন্যই বললাম, “আপনি কি বাড়ি ফিরছিলেন? আমিও তাহলে আপনার সঙ্গেই ফিরতাম।”

ইভান্সের সঙ্গেই বাড়িটায় গেলাম। বেড়ার ওপার থেকে দেখা অযত্নলালিত বাগানটা দেখলাম এত বছরে একেবারে জঙ্গলই হয়ে গেছে। একটা মোটাসোটা বেড়াল জানালায় বসে রোদ পোহাচ্ছিল। বাগান, শ্যাওলা-ধরা পাথরের বেঞ্চ, বাঁকানো পাঁচিল— সব পেরিয়ে আমরা বাড়িতে ঢুকলাম।

ভেতরের ঠান্ডা ঘরটার একপাশে এক বৃদ্ধা মহিলা খাবার-দাবার গুছিয়ে রাখছিলেন। পাথরের দেওয়ালের গায়ে আর নানা জায়গায়, এমনকি ছাদেও নানা ধরনের মুখ আর কিংবদন্তির জীবজন্তুর দেহাবশেষ দেখতে পাচ্ছিলাম। বুঝতে পারলাম, পুরোনো চার্চের ধ্বংসস্তূপের অনেক কিছু দিয়েই এই বাড়িটা বানানো হয়েছে। একটা ডিম্বাকৃতি টেবিলের সামনের দিকে একটা পাথরের আংটায় চিত্রকরের ক্যানভাস আর তুলি রাখার ব্যবস্থা করা ছিল। সেটারও ওপরে একটি দেবদূতের মূর্তি বসানো রয়েছে।

“বেশ ভক্তিমূলক পরিবেশ— কী বল!” সেদিকে বুড়ো আঙুল নাচিয়ে ইভান্স বললেন, “এদিকে আমি আঁকি একেবারেই সাদামাটা জিনিস বা মানুষের ছবি। তাই সেই ছবিতেই এমন একটা ভাব আনতে হয়, যাতে ওই ‘ভক্তিভাব’-টা ফুটে না ওঠে। যাইহোক, আমি একটু ঘরোয়া জামাকাপড় পরে আসি। তুমি ততক্ষণ ছবিগুলো দেখতে থাক।”

ছবিগুলো দেখতে-দেখতে দুটো জিনিস মেনে নিলাম।

প্রথমত, জন ইভান্স সত্যিই শিল্পী হিসেবে অনেক-অনেক উঁচু দরের একজন হয়ে গেছেন।

দ্বিতীয়ত, তাঁর ছবিতে বিষ ঢুকেছে। এটা ছাড়া আর কোনওভাবেই প্রত্যেকটা ছবির মধ্য থেকে বেরিয়ে আসা পাপ আর অশুভের অনুভূতিটাকে ব্যাখ্যা করা যায় না। জানালায় বসা বেড়ালের একটা ছবি ছিল, কিন্তু ওই বেড়াল সাক্ষাৎ নরকের বাসিন্দা। রোদে গরম বালিতে শুয়ে থাকা এক নগ্ন কিশোরের ছবি আঁকা হয়েছে— কিন্তু ওই কিশোরের জন্ম দিয়েছে সমুদ্রের নীচের অন্ধকার। সবচেয়ে মারাত্মক ছিল ইভান্সের আঁকা বাগানের ছবিগুলো— যাদের দেখে মনে হচ্ছিল, প্রতিটি ঝোপ, প্রতিটি পাতার পেছনেই ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য অপেক্ষা করছে মূর্তিমান বিপদ!

“কেমন লাগছে?” ইভান্সের হাতের গ্লাসে পানীয়ের রঙ দেখে বুঝলাম, জল-টল মেশানো হয়নি। তাতে একটা চুমুক দিয়ে ইভান্স বললেন, “আমি যা দেখি তার সারটুকু ধরতে চেষ্টা করি। শিল্পীর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে একটা বেড়াল আর একটা ঝোপের মধ্যে খুব একটা তফাত থাকে না। বরং আকার-অবয়বহীন যে অন্ধকার আর আগুন থেকে আমাদের সবার জন্ম— আমি সেটাকেই ফুটিয়ে তুলি। সুযোগ পেলে তোমারও একটা ছবি আঁকব। দেখবে, আমার আয়নায় নিজেকে দেখতে কেমন লাগে!”

গ্রীষ্ম কেটে গেল। ইভান্সের সঙ্গে আমার মাঝেমধ্যেই দেখা হত। তবে এমনও হত যে গোটা সপ্তাহ ধরেই মানুষটি নিজের বাড়ি আর আঁকা ছেড়ে বেরোতেন না। কখনও-সখনও জেটির ধারে মানুষটিকে বসে থাকতে দেখতাম— একা। তখন ওঁর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে সেই যুগপৎ আকর্ষণ-বিকর্ষণ অনুভব করতাম। মনে হত, ইভান্স একটা অন্ধকার পথ ধরে হেঁটে চলছেন যার শেষে তিনি এমন কিছু জানতে পারবেন, যা কেউ জানে না।

বাস্তবে শেষটা অন্যরকম হল।

অক্টোবরের শেষ দিন ছিল সেটা। পাহাড়ের ওপর ইভান্সের পাশে বসে সামনের দিকে তাকিয়ে ছিলাম আমি। রোদের অন্তিম আলোয় ঝলমল করছিল সমুদ্র। আচমকা পশ্চিম আকাশে একটা ঘন কালো মেঘ কোথা থেকে জানি উদয় হয়ে সেই আলোটুকু শুষে নিল হু-হু করে। তাতেই ইভান্সের চটকা ভাঙল।

“আমাকে এখনই ফিরতে হবে।” অস্থিরভাবে বললেন ইভান্স, “আজ আমার বাড়ির ওই কাজের মহিলা ছুটি নিয়েছেন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই অন্ধকার হয়ে যাবে। তার মধ্যে আলো জ্বালানো না হলে…!”

ওই খাড়া পথ ধরে ইভান্স যে-ভাবে ছুটলেন সেটা তাঁর চেহারা আর চলনের সঙ্গে একেবারেই মেলানো যায় না। ঘনায়মান অন্ধকারের মধ্যেও মানুষটিকে প্রায় ছুটতে দেখে মনে হল, উনি সত্যিই চিন্তিত… বা ভীত! আমার দিকে ঘুরে উনি চিৎকার করলেন, “আমার সঙ্গে এসো। দু’জনে হাত লাগালে তাড়াতাড়ি আলোগুলো জ্বালানো যাবে। আলো না থাকলে বড়ো বিপদ!”

ইভান্সের তুলনায় অনেক বেশি সক্ষম হলেও ওঁর সঙ্গে তাল মেলাতে হিমসিম খেলাম সেই সন্ধ্যায়। বাগানের গেটের সামনে পৌঁছে দেখি, ইভান্স তার মধ্যেই বাড়ির কাছে চলে গেছেন। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকেই একটা লণ্ঠন তুলে নিলেন ইভান্স। কিন্তু সেটা জ্বলল না। আসলে দেশলাই ধরে থাকা ওঁর হাতটা এত কাঁপছে যে শিখাতে আগুনই ধরছে না।

আমি ঘরে ঢুকে ওঁকে সাহায্য করার জন্য এগোলাম। হঠাৎ, আমার পেছনে খোলা দরজার দিকে আঙুল তুলে ইভান্স আর্তনাদ করে উঠলেন, “না-না! ওটাকে আটকাও।”

পেছন ফিরে দেখলাম, খোলা দরজা দিয়ে ঢুকে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ইভান্সের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে একটা প্রকাণ্ড জোঁক!

মলিন একটা আভা বেরিয়ে আসছিল জোঁকটার শরীর থেকে। সে-জন্যই ওই অন্ধকারের মধ্যেও প্রাণীটাকে আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম। আর পেলাম একটা গন্ধ— কাদা আর নোংরার মধ্যে অনেকক্ষণ কিছু ডুবে থাকলে তাতে যেমন গন্ধ হয়! নির্লোম শরীরে কোনও মাথা দেখিনি, তবে সামনের দিকে কুঁচকে থাকা অংশটা যেভাবে খুলছিল আর বন্ধ হচ্ছিল তাতে মুখটা চিনে নিতে অসুবিধে হয়নি। ইভান্সের কাছে এসে ওটা অদ্ভুতভাবে পেছনে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াল। মনে হল, যেন একটা বিষধর সাপ ছোবল মারার জন্য তৈরি হচ্ছে!

ইভান্সের বুকফাটা আর্তনাদ আমার অচল হয়ে থাকা শরীরটাকে ছুটে যেতে বাধ্য করল। আমি দু’হাত বাড়িয়ে জোঁকটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম— ওটাকে সরিয়ে আনব ভেবে। কিন্তু পারলাম না! মনে হল, আমি যেন একটা কাদার তালকে ধরার চেষ্টা করছি। জিনিসটা আমার আঙুলের ফাঁক দিয়ে, তেলোর পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল। এ-ভাবেই কেটে গেল কয়েক সেকেন্ড। ওটুকুই যথেষ্ট ছিল।

চিৎকার ক্রমেই অসহায় কান্না আর বিড়বিড় হয়ে নৈঃশব্দ্যে মিলিয়ে গেল। জীবটা ইভান্সের ওপর ঝুঁকে থাকতে-থাকতেই তার হাত-পা ছোড়া স্তিমিত হয়ে এল। কিছু একটা শুষে নেওয়ার আর টেনে নেওয়ার মাঝামাঝি শব্দ পেলাম। তারপর দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল জোঁকটা।

টলতে-টলতে একটা লণ্ঠন জ্বালালাম। সেই আলোয় দেখলাম, মেঝেতে যা পড়ে আছে তাকে শরীর না বলে চামড়া দিয়ে মোড়া একবস্তা হাড় বলাই সঙ্গত।

পোলার্নের বুক থেকে আরও কিছুটা দূষিত রক্ত শুষে বিদায় নিয়েছে তার রক্ষক!

_

মূল কাহিনি: নেগোশিয়াম পেরামবুলান্স

লেখক: ই.এফ.বেনসন

প্রথম প্রকাশ: হাচিনসনস্‌ ম্যাগাজিন, নভেম্বর ১৯২২

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *