রিয়ান – ঋজু গাঙ্গুলী

রিয়ান

রাস্তার কোণে যে-সব পুরোনো বইয়ের দোকান থাকে, মাঝে-মধ্যে তাতে ভারি অদ্ভুত বইপত্র পাওয়া যায়। এক অনামা লেখকের ১৯২৯ সালের ডায়েরি সে-ভাবেই আমার হাতে এসেছিল। আর পাঁচরকম কথার পাশাপাশি তাতে এমন একটা কাহিনি ছিল— যার সত্যাসত্য বিচার আমার পক্ষে অসম্ভব। সেটাই পেশ করছি।

লোকে যা-ই দাবি করুক, আমার মতে উত্তর ওয়েলসের স্নোডোনিয়া জায়গাটা বেড়ানোর পক্ষে বিশেষ সুবিধের নয়। ট্যুরিস্টদের জন্য ছাপানো গাইড বুকে অনেক কিছু লেখা থাকে। ‘রোদ-ঝলমলে আবহে নীল-সবুজ পাহাড় আর জঙ্গল দেখতে-দেখতে ট্রেকিঙের আদর্শ পরিবেশ’— এই বিজ্ঞাপন দেখে মজে গেলেই মহাবিপদে পড়বেন। কারও-কারও কপালে হয়তো ওইরকম আবহাওয়া জোটে। কিন্তু বছরকয়েক আগের এক অক্টোবরে আমার একেবারে অন্যরকম অভিজ্ঞতা হয়েছিল।

হ্যাঁ, আমিও ওই ‘আদর্শ পরিবেশ’-এর টানেই কনওয়ে উপত্যকার একটা সাদামাটা হোটেলের একটা ঘরে উঠেছিলাম। কিন্তু তারপর পাক্কা একটি সপ্তাহ ওই হোটেলের ভেতরেই হাঁটাহাঁটি করে সময় কাটাতে হল। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেই দেখতাম, মুষলধারে বৃষ্টি নেমে সৃষ্টি একেবারে ভাসিয়ে দিচ্ছে। অথচ হোটেলের ম্যানেজার বলেছিল, আমি আসার আগেই নাকি আবহাওয়া একেবারে আদর্শ ছিল।

হোটেলের অন্য বোর্ডারটি নিজের ঘর থেকে বিশেষ বেরোতেন না। দিনতিনেক এ-ভাবেই কাটার পর এক সন্ধেবেলা ভদ্রলোক নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে নীচের লবিতে এলেন। স্থানীয় খবরের কাগজটা তার কিছুক্ষণ আগেই এসেছিল। আমি সেটাই পড়ছিলাম। ভদ্রলোক নার্ভাস ভঙ্গিতে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমার পড়া হয়ে গেলে কাগজটা তাঁকে দেওয়া যাবে কি না। সোৎসাহে কাগজটা বাড়িয়ে দিলাম। কাগজটা পড়তে গিয়ে ভদ্রলোকের মুখচোখ ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছিল বলেই একটু কৌতূহলী হয়ে তাঁকে ভালো করে দেখলাম। তখন বুঝলাম, আমি এঁকে চিনি! আমার এক বন্ধু কিংস কলেজে পড়াত। ইনিও সেখানেই পড়াতেন। একটা অনুষ্ঠানে সামান্য হলেও আলাপ হয়েছিল ভদ্রলোকের সঙ্গে।

কাঁপা হাতে ভদ্রলোক কাগজটাকে একপাশে সরিয়ে রাখলেন। আমি তখন নিজের পরিচয় দিলাম। ওই হোটেলে চেনাজানা একজনকে হঠাৎ আবিষ্কার করে যারপরনাই খুশি হয়ে উঠলেন মানুষটি। এ-কথা সে-কথার পর জিজ্ঞেস করলাম, উনি কবে থেকে এই হোটেলে রয়েছেন।

“গত রবিবার এখানে এসেছি।” ভদ্রলোক আড়ষ্টভঙ্গিতে বললেন, “তার আগে অন্য একটা জায়গায় ছিলাম। সেখানে ঠিক… সুবিধে হচ্ছিল না।”

হাতে করার মতো কিচ্ছু ছিল না। তাই সেই সন্ধ্যায় আমি ধীরে-সুস্থে, কখনও উৎসাহ দিয়ে, আবার কখনও প্রশ্ন করে ভদ্রলোকের ‘অসুবিধে’ তথা অভিজ্ঞতার কথাটা জেনে নিয়েছিলাম। সেই ব্যাপারটাই আপনাদের কাছে উত্তম পুরুষ-এ লিখছি। ভদ্রলোককে আমি ‘হেপওয়ার্থ’ নাম দিয়েছি বটে, কিন্তু ওটা ওঁর আসল নাম নয়— বলাই বাহুল্য।

হেপওয়ার্থ ওয়েলসে যখন এসেছিলেন, তখন সেখানে আবহাওয়া একদম বিজ্ঞাপনের মতোই ছিল— রোদ-ঝলমলে, অথচ খুব বেশি গরম নয় এমন। উনি ‘লানেইরিয়াস হল’ নামের একটা হোটেলে ছিলেন। সেখান থেকে একটু দূরেই স্নোডোনিয়া পাহাড়, তাই ট্রেকিং ট্রেইলগুলো ওখান থেকেই শুরু হয়। ওয়েলসের সবচেয়ে বনেদি ঘরগুলোর মধ্যে অন্যতম হল ল্যুইন পরিবার। তাদেরই থাকার জায়গা ছিল লানেইরিয়াস হল। হেপওয়ার্থ দেখেছিলেন, প্রায় তিন দশক ধরে হোটেল হিসেবে থাকার পরেও বাড়িটায় নানা ঐতিহাসিক নিদর্শন সযত্নে রাখা ছিল। প্রোপ্রাইটর মিস্টার এমরিজ দক্ষ হাতে হোটেল চালানোর পাশাপাশি এই জিনিসগুলোরও খেয়াল রাখতেন। বাড়িটার অবস্থানও চমৎকার। দোতলার ঘর আর নীচের ডাইনিং রুমের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে হেপওয়ার্থ একেবারে মুগ্ধ হয়ে গেলেন।

এক সপ্তাহের বেশি ওখানে থাকার কথা প্রথমে ভাবেননি হেপওয়ার্থ। কিন্তু জায়গাটা তাঁর বড়োই ভালো লেগে গিয়েছিল। সেই সময় এমরিজ রেক্সহ্যামে গিয়েছিলেন একটা জরুরি কাজে। হোটেলের দেখাশোনা করছিলেন অ্যাসিস্টেন্ট ম্যানেজার রোডরিক ফক্স। হেপওয়ার্থ তাঁর কাছেই বুকিং বাড়ানোর কথা তুললেন। ফক্স প্রথমে রাজি হননি। বরং সবিনয়ে বলেছিলেন, “মাফ করবেন, স্যার। বুকিং বাড়ানোর ব্যাপারটা একমাত্র মিস্টার এমরিজই দেখেন। আমার দ্বারা ওটি হবে না।”

“সব ঘর বুক করা আছে বুঝি?” জানতে চাইলেন হেপওয়ার্থ।

“না-না।” আপত্তি জানালেন ফক্স, “বরং সবক’জন বোর্ডার আজকেই চলে যাচ্ছেন।”

“তাহলে বোধহয় মেরামত-টেরামতের জন্য হোটেল এখন ক’দিন বন্ধ থাকবে।”

“তা-ও তো বলা যাচ্ছে না।” ফক্স রেজিস্টার দেখে একটু বিব্রতভাবেই বললেন, “পরের সপ্তাহ থেকেই আবার পুরোদমে বুকিং রয়েছে দেখছি।”

“তাহলে আরও এক সপ্তাহ আমি যদি ঘরটায় থাকি, তাতে অসুবিধে কোথায়?”

অবশেষে ফক্স জানালেন, প্রতি বছরই নাকি এই সময়টা হোটেল এক সপ্তাহের জন্য বন্ধ রাখা হয়। তার কারণ তিনি জানেন না। মাত্র সাত মাস হল তিনি এই কাজে এসেছেন। অনেক আলোচনার পর হেপওয়ার্থ এক সপ্তাহের জন্য বুকিং বাড়িয়ে অ্যাডভান্স দিলেন। তারই সঙ্গে মিস্টার ফক্সের জন্যও তাঁকে সামান্য কিছু খরচাপাতি করতে হল। সব মিলিয়ে ঘর তথা হোটেলটাই আরও এক সপ্তাহের জন্য তাঁর দখলে এল।

পরের দেড়দিন ভালোভাবেই কাটল। হাঁটাহাঁটি করার ফাঁকে ক্যামেরার যথাসাধ্য সদ্ব্যবহার করলেন হেপওয়ার্থ। দ্বিতীয় দিন সন্ধেবেলা প্রথম ঘটনাটা ঘটল।

বেশ কয়েকটা চিঠি লেখার পর বাগানে, একটা গাছের নীচে চেয়ারে বসে ঝিমোচ্ছিলেন হেপওয়ার্থ। সেইসময় ভারি অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখলেন তিনি। তাঁর মনে হচ্ছিল, বিশাল উঁচু-উঁচু ঘাস আর ঝোপের মধ্য দিয়ে তিনি ছুটছেন। স্বপ্নের মধ্যেও ভয়ের অনুভূতি আর অন্য নানা শব্দ থেকে তিনি বুঝতে পারছিলেন, ঘাসের আড়ালে লুকিয়ে প্রাণপণ ছুটেও তিনি একজনকে এড়াতে পারছেন না। তাঁর থেকে কিছুটা উচ্চতায় কেউ, বা কিছু একটা তাঁকে তাড়া করেছে। হেপওয়ার্থ বুঝতে পারলেন, কোনও জন্তুর পেছনে শিকারি ধাওয়া করলে তার বোধহয় এমনই লাগে। এই কথাটা মনে হতেই তাঁর খেয়াল হল, তিনি তো জন্তু নন! মানুষ হিসেবে তাঁর উচিত হল শত্রুর মুখোমুখি হওয়া। হেপওয়ার্থ তৎক্ষণাৎ সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। নিজের পারিপার্শ্বিকটাও দেখতে পেলেন তিনি।

ঘাস আর ঝোপঝাড়ে ভরা প্রান্তরের মধ্য দিয়ে একটা সরু পথ চলে গেছিল। হেপওয়ার্থের মনে হল, দরকার হলে ওই পথ দিয়েও তিনি ছুটতে পারেন। কিন্তু… তখনই তিনি নিজের ভুলটা বুঝতে পারলেন। শত্রুর কাছে তিনি ধরা পড়ে গেছেন! তাঁর ওপর একটা ছায়া পড়ল। মনে হল, বাতাস চিরে প্রকাণ্ড কিছু একটা জিনিস তাঁর দিকে নেমে আসছে। অসহায়ভাবে দু’হাত তুলে নিজেকে বাঁচাতে চাইলেন হেপওয়ার্থ। তাতেই তাঁর আলগা হাত থেকে পাইপ আর বই নীচে পড়ে গেল। ঘুমটাও ভেঙে গেল সঙ্গে-সঙ্গেই।

হোটেলের একমাত্র বাসিন্দা বলে তাঁকে সাত-তাড়াতাড়ি খাওয়াদাওয়া সেরে নিতে হচ্ছিল। সেদিনও সে-সবের পাট চুকিয়ে বসার ঘরে এসেছিলেন হেপওয়ার্থ। দেওয়ালে ঝোলানো নানা টুকিটাকির মধ্যে তিনি ফ্রেমে-বাঁধানো একটা ফটোগ্রাফও দেখলেন। টিপিক্যাল ফ্যামিলি ফটো— বাবা, মা, তিন মেয়ে। নীচে ছাপানো নাম আর তারিখ থেকে বোঝা যাচ্ছিল, এলুইন বংশের এই প্রতিনিধিদের হাত থেকেই হলের মালিকানা বদল হয়েছিল। এঁদের পর থেকেই এটা হোটেল হয়ে গেছে।

পুরুষটির মিলিটারি ভঙ্গিমা, টুপি আর স্কার্ফে প্রায় ঢেকে যাওয়া মহিলা— এ-সব ছাপিয়ে হেপওয়ার্থের দৃষ্টি আকর্ষণ করল মেয়ে তিনটি। ঝাপসা হয়ে আসা ছবি আর কেঠো পোজের মধ্য দিয়েও তাদের রূপ আর প্রাণপ্রাচুর্য যেন ফেটে পড়ছিল। মূলত তাদের টানেই হেপওয়ার্থ ল্যুইন পরিবারের ইতিহাস জানতে আগ্রহী হয়ে পড়লেন। ফক্স তেমন কিছু বলতে পারেননি। তবে তাঁর কাছ থেকেই হেপওয়ার্থ কনওয়ে-র বাসিন্দা জনৈক ইউয়ান জোন্সের কথা জানতে পারলেন। এই ভদ্রলোক একটি আর্ট গ্যালারির মালিক। এই অঞ্চলের ইতিহাস নিয়ে কিঞ্চিৎ লেখালেখিও নাকি তিনি করেছেন। হেপওয়ার্থ ঠিক করলেন, পরদিন এঁর সঙ্গেই দেখা করবেন।

ব্রেকফাস্ট সেরে একটা সাইকেল ভাড়া নিলেন হেপওয়ার্থ। সেটা চেপে কনওয়ে-তে গিয়ে ইউয়ান জোন্সকে খুঁজে পেতেও বেগ পেতে হল না তাঁকে। কিছুক্ষণ কথা বলার পর হেপওয়ার্থ বলেই ফেললেন, ছবি কেনার বদলে তিনি স্থানীয় ইতিহাস জানতেই আগ্রহী।

“তাই বলুন।” মুচকি হেসে বললেন জোন্স, “আপনার সঙ্গে যতটুকু কথা বলেছি তাতে আপনাকে ঠিক চিত্রকলার সমঝদার বলে মনে হচ্ছিল না। কী জানতে চান আপনি?”

“ল্যুইন পরিবারের একটা ছবি দেখেছি ওই হলে। তাদের কী হয়েছিল, জানেন?”

“জানি। বিশেষ করে রিয়ানের কী হয়েছিল, তা তো জানিই। তবে বইয়ে ও-সব লিখিনি। সব কথা, এমনকি ঐতিহাসিক তথ্য হলেও, বইয়ে লেখা যায় না।”

“রিয়ান কে?”

“ওই পরিবারের ছোটো মেয়ে। লানেইরিয়াসের ল্যুইন পরিবারের শেষ রত্নই বলা চলে ওকে। আহা, কী প্রতিভাই না ছিল মেয়েটার! কিন্তু শেষে যা হল…!”

“কী হল?”

“সে এক বিশাল কেলেংকারি। মেয়েটা পাগল হয়ে গিয়ে নিজের দুই বোনকে পুড়িয়ে মেরেছিল। শেষে ওকে ডেনবিঘের পাগলখানায় ভর্তি করা হয়।”

“বলেন কী!” সে-আমলের নিরিখে এটা যে সত্যিই প্রকাণ্ড কেলেংকারি, এটা হেপওয়ার্থ ভালোভাবেই বুঝতে পারলেন। তাঁর কৌতূহল চচ্চড়িয়ে বাড়ছিল। কিন্তু ব্যাপারটা যাতে শুষ্কং-কাষ্ঠং না হয়ে যায় তাই তিনি বললেন, “আপনার যদি অন্য কোথাও যাওয়ার না থাকে, তাহলে কি আমরা লাঞ্চটা একসঙ্গে সারতে পারি?”

জোন্স সোৎসাহে রাজি হলেন। সুখাদ্য ও পানীয়ের সঙ্গে আলোচনাটা এগোল।

“ছোটোবেলা থেকেই রিয়ানের নাচ, গান, ছবি-আঁকা আর অভিনয়ে দারুণ উৎসাহ ছিল।” বলছিলেন জোন্স, “তবে তার সঙ্গেই ওর মধ্যে অন্য একটা ব্যাপার ছিল। মাঝেমধ্যে ওর চোখে একটা অদ্ভুত দ্যুতি দেখা যেত। এখানকার লোকজন সেটাকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করত। কেউ বলত, অন্য বেশ কিছু প্রাচীন পরিবারের মতো ল্যুইন পরিবারেও একসময় পরিদের রক্ত মিশেছে— এগুলো তারই প্রভাব। কেউ বলত, এগুলো দৈব ক্ষমতা বিকশিত হওয়ার আগের ধাপ। পরে অবশ্য সবাই বুঝেছিল, ওটা ছিল স্রেফ পাগলামির লক্ষণ।”

“শুধু ওটুকুই?”

“না।” দুঃখিত মুখে বললেন জোন্স, “আরও ছিল। এই দেখতাম ও মিষ্টি হেসে গান গেয়ে আর কবিতা আবৃত্তি করে সবাইকে মুগ্ধ করে দিচ্ছে। পরক্ষণেই দেখতাম, কর্কশ গলায় চিৎকার করে আর অন্যকে অপমান করে ও ঢুকে পড়ছে নিজের মনগড়া একটা অন্ধকার জগতে। এমন অনেক কীর্তি সে-সময় ও করেছিল যেগুলো অন্য কেউ করলে বিশাল ঝামেলা হত। নেহাত ল্যুইন পরিবারের নামডাকের খাতিরে তেমন কিছু হয়নি। তাতেও অবস্থা একটা সময় আর সামলানোর মতো রইল না। একরকম দুম্‌ করে লোকচক্ষুর অন্তরালে সরিয়ে দেওয়া হল রিয়ান-কে।”

“তখনই কি ওকে ওই পাগলখানায়…?”

“না। তখন ও লানেইরিয়াস হলেই ছিল। ওর ঘরটাকে প্রায় বন্দিশালা করে ফেলা হয়েছিল। একজন মহিলাকে নার্স হিসেবে রাখা হয়েছিল, তবে তিনি নার্সের বদলে পাহারাদারের কাজটাই করতেন। মাসের-পর-মাস কেটে গেছিল সেভাবেই। কেউ রিয়ানকে দেখেনি ওই সময়। একবার ও পালিয়ে পাশের গ্রামে এসেছিল। সেই গ্রামের মধ্য দিয়ে খালি পায়ে হাঁটছিল রিয়ান। ওর পরনে ছিল শতচ্ছিন্ন একটা রাতপোশাক। তখনও নাকি ওর হাতে ফুল ছিল। পথের ধারে হুটোপাটি করা বাচ্চাদের সেই ফুলগুলো দিতে চেয়েছিল ও। কিন্তু আগে যারা ওর রূপে, গানে, ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হত, তারা ওকে দেখে পালিয়ে গেছিল! ততদিনে তো রূপসী রিয়ানের বদলে উন্মাদিনী রিয়ানের পরিচিতিটাই জেনে গেছে সবাই। তারপরেই হল থেকে লোকজন এসে, ওকে প্রায় ধরে-বেঁধে একটা ঘোড়ার গাড়িতে তুলে সেখানে ফেরত নিয়ে গেছিল।”

“ট্র্যাজিক।”

“ধুর্‌ মশাই!” গ্লাস খালি করে বললেন জোন্স। তাঁর এমনিতেই লাল মুখটা তখন একেবারে টুকটুকে দেখাচ্ছিল। “ট্র্যাজেডি তো শুরু হল সবে। এর ক’দিনের মধ্যেই একটা লণ্ঠন দুর্ঘটনাবশত উলটে গিয়ে খাটে আগুন ধরিয়ে দেয়। তাতে মিস রোনওয়েন আর মিস আংঘারাদ মারা পড়েছিলেন। অন্তত এটাই ছিল সরকারি বয়ান। তবে ক্যানার্ভন থেকে আসা পুলিশ, স্থানীয় ম্যাজিস্ট্রেট আর ডাক্তার— এঁদের সবার বক্তব্য ছিল, লণ্ঠনটা ইচ্ছে করেই ওলটানো হয়েছিল। এরপরেই রিয়ানকে ডেনবিঘের ওই বাড়িতে সরিয়ে দেওয়া হয়।”

“তাহলে তখনই কি লানেইরিয়াস হলের মালিকানা বদল হয়েছিল?”

“না। সেটা হয়েছিল পাঁচ বছর পর। সেটাই ছিল আসল ট্র্যাজেডি।”

“কী হয়েছিল তখন?”

“সে-ও ছিল এক সেপ্টেম্বর মাস।” দীর্ঘশ্বাস ফেলে জোন্স বললেন, “হল-এ সেই অগ্নিকাণ্ডও সেপ্টেম্বরের শেষেই হয়েছিল। তখন হঠাৎ শোনা গেল, ডেনবিঘ থেকে পালিয়ে গেছে রিয়ান। কথায়-কথায় জানা গেল, তার আগের বেশ কয়েকমাস ধরেই নাকি ওর অবস্থা ক্রমেই খারাপ হচ্ছিল। দিনের-পর-দিন ও কিছু খেত না, ঘুমোত না, শুধু ঘরের একটা কোণে জড়বৎ বসে থাকত। তার আগে নাকি অবস্থা এইরকম ছিল না। স্যার ল্যুইন আর তাঁর স্ত্রী মাসে একবার গিয়ে ওর সঙ্গে দেখা করতেন। ওর সামান্য যা-কিছু লাগত, সেগুলো দিয়ে আসতেন। তখনও রিয়ান তাঁদের সঙ্গে কথা বলত না। দেওয়ালের দিকে মুখ করে বসে থাকত। খুব বেশি ডাকাডাকি করলে বলত, ‘আমার নাম রিয়ান নয়। আমি আর রিয়ান নই।’ ল্যুইন-রা চলে গেলে ও নাকি সুর করে বলত, ‘এখন আমার নাম ব্লোদিউওয়েড।’ অন্তত ওখানকার ওয়ার্ডেনের কাছ থেকে তাই জেনেছিলাম।”

“ব্লো… কী?” সলজ্জে বললেন হেপওয়ার্থ, “আসলে ওয়েলশ শব্দের উচ্চারণ ঠিকমতো পারি না।”

“সেটা অস্বাভাবিক নয়।” মুচকি হাসলেন জোন্স, “ব্লো-দিউ-ওয়েড। ওয়েলশ কিংবদন্তির সবচেয়ে বড়ো সংকলন ‘মাবিনোজিও’-তে নামটা আছে। অনেক-অনেক আগে লেউ ল্য জাইফস্‌ নামে এক মহাশক্তিধর রাজা ছিলেন। তাঁর মা অভিশাপ দিয়েছিলেন, কোনও মানবীকে তিনি স্ত্রী হিসেবে পাবেন না। জাদুকর গিডিওন আর ম্যাথ সেই রাজার জন্য ব্রুম, মিডোসুইট আর ওক-এর ফুল দিয়ে এক নারীকে সৃষ্টি করেন। তারই নাম ব্লোদিউওয়েড। কিন্তু যার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছিল, ব্লোদিউওয়েড তাকে ছেড়ে অন্য একজনকে ভালোবেসেছিল। জাইফস্‌-কে হত্যার ষড়যন্ত্রও করেছিল সে। স্রষ্টার অভিশাপে সে প্যাঁচা হয়ে যায়! পারলে মূল কাহিনিটা পড়ে নেবেন।”

“সে না-হয় বুঝলাম।” হেপওয়ার্থ অধীরভাবে বললেন, “কিন্তু রিয়ানের কী হল?”

“ডেনবিঘে রাতে ডিউটি করত এমন এক ওয়ার্ডারের মাথাটা ও চিবিয়েছিল তার আগেই। তার ‘সঙ্গে’ পালাচ্ছে এমন ভাব দেখিয়ে ও আর সেই ওয়ার্ডার ভোরের শিফট আসার আগে ওখান থেকে বেরিয়ে আসে। আবেরগেল-এ ওরা এসে লুকিয়েছিল। ওখান থেকে আর কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না দু’জনের। কিন্তু পরদিন শহরের বাইরে একটা নালায় সেই ওয়ার্ডারকে পাওয়া যায়। আতঙ্কে সে প্রায় পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। তবে মারাত্মক ছিল তার চোখের অবস্থা। বড়ো আর ধারালো নখ বা ওইজাতীয় কিছু দিয়ে ওর চোখজোড়া একেবারে উপড়ে নেওয়া হয়েছিল। সেই বিকেলেই লোকটি মারা যায়। এরপর রিয়ানের জন্য খোঁজটা একেবারে অন্য স্তরে পৌঁছে যায়।

সেদিন সন্ধ্যায় লানেইরিয়াসের এক চাষি নদীর ধারে একটি মেয়েকে দেখে। পরমাসুন্দরী সেই মেয়েটির পরনে ছিল দুধসাদা, রাজসিক পোশাক। কিন্তু তার দু’হাত ছিল লাল, পোশাকেও লাল দাগ লেগে ছিল নানা জায়গায়। সে মেয়েটির কাছে যাওয়ার সাহস পায়নি। বাড়ি ফেরার পর বউয়ের মুখে ওয়ার্ডারের কী হয়েছে জেনে সে তৎক্ষণাৎ গ্রামের পুলিশ স্টেশনে খবর দিতে দৌড়োয়। কিন্তু যতক্ষণে পুলিশ এসেছিল ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে।

লানেইরিয়াস হলের বাগানে অন্ধকারে লুকিয়ে ছিল রিয়ান। একটি পরিচারিকাকে নাগালে পাওয়ামাত্র ও তাকে খুন করে— ওয়ার্ডারের মতো করেই। তারপর হল-এ ঢুকে ও আবার আগুন লাগাতে চেষ্টা করেছিল— হয়তো আরও বড়ো আকারে। স্যার হিউ ল্যুইন, মানে ওর বাবা ওকে ধরে ফেলেন। তাঁদের মধ্যে কী কথা হয়েছিল কেউ জানে না। স্যার হিউ শটগান দিয়ে রিয়ান-কে গুলি করে মারেন। তারপর নিজের মুখে ব্যারেলটা ঢুকিয়ে আবার ট্রিগার টেপেন।

আগুন খুব একটা ছড়ায়নি। মৃতদেহগুলোও সরাতে অসুবিধে হয়নি। তবে এই কেলেংকারির ধাক্কা সামলানো অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। লেডি ল্যুইন ওখান থেকে চলে যান। বছরখানেকের মধ্যে উনিও মারা যান। তারপরেই লানেইরিয়াস হল-এর মালিকানা বদল হয়।”

“এ তো সাংঘাতিক ব্যাপার!” হেপওয়ার্থ বললেন, “আচ্ছা, রিয়ান আর ওর বাবা’র মধ্যে সেই রাত্রে কী কথা হয়েছিল— সেটা কি কোনওভাবেই জানা যায় না?”

“লেডি ল্যুইন জানতেন, কিন্তু তিনি কাউকে কিচ্ছু বলেননি।” বিমর্ষ মুখে বললেন জোন্স “আর জানত আনেউরিন— ল্যুইন-দের বাটলার। ওর জন্য একটা খোরপোষের ব্যবস্থা করেই এখান থেকে গিয়েছিলেন লেডি ল্যুইন। স্বাভাবিকভাবেই সে আমাকে তখন কিছুই বলেনি। আমার ধারণা, প্রথম ঘটনাটা, মানে দুই বোনের সঙ্গেও কী হয়েছিল সেই বিষয়ে ও অনেক কিছু জানত। ত্রিশ বছর কেটে গেছে। এখন আমার আর কোনও আগ্রহ অবশিষ্ট নেই। আপনি যদি চান, তাহলে লানডাডনো-তে গিয়ে আনেউরিনের খোঁজ করতে পারেন। অর্ম নদীর কাছেই একটা বাড়িতে থাকত ও। এখনও হয়তো ওখানেই পাবেন ওকে।”

হেপওয়ার্থের মাথায় তখন রিয়ান ভর করেছে। জোন্সকে ধন্যবাদ জানিয়ে, বিল মিটিয়েই তিনি রওনা দিলেন লানডাডনো-র উদ্দেশে।

লানডাডনো-তে নদীর ধারে আনিউরিনের বাড়িটা খুঁজে পেতে সমস্যা হল না। অন্য বাড়িগুলো থেকে একটু আলাদা হয়ে থাকা বাড়িটার সামনে যে-ভাবে ‘প্রবেশ নিষেধ’ লেখা ছিল, তা দেখে হেপওয়ার্থের একটু চিন্তাই হল। কিন্তু তারপর কৌতূহল প্রবল হয়ে উঠল। তিনি ঘণ্টিটা বাজালেন— একবার, বারবার, বহুবার! অবশেষে দরজা ফাঁক হল। এক বৃদ্ধা সন্দিগ্ধ চোখে দরজার ফাঁক দিয়ে হেপওয়ার্থকে দেখলেন।

প্রশ্ন করে জানা গেল, মহিলা আনেউইরিনের বিধবা স্ত্রী। পাঁচ বছর আগেই আনেউইরিন মারা গেছেন জেনে হেপওয়ার্থ সমবেদনা জানালেন। তবে তার চেয়েও বেশি হতাশ হলেন তিনি। তারপর একরকম মরিয়া হয়ে তিনি মহিলাকেই জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা, লানেইরিয়াস হলে ঠিক কী হয়েছিল, বলতে পারবেন?”

“তাহলে সেই কেচ্ছা খুঁজতে এসেছ!” মহিলার চোখ জ্বলে উঠল ঘরের অন্ধকারেও, “না। ওই নিয়ে আমার কাছে কিচ্ছু শুনতে পাবে না। তোমাদের মহিয়সী মিস রিয়ানের ব্যাপারে অন্য কাউকে জিজ্ঞেস করো গে যাও।”

একটু হকচকিয়ে গেলেও হেপওয়ার্থ পিছিয়ে এলেন না। বরং তাঁর মনে হল, অন্যভাবে ব্যাপারটা নিয়ে এগোনো যায়। মুখে প্রগাঢ় সহানুভূতি ফুটিয়ে হেপওয়ার্থ বললেন, “আমি বুঝতে পারছি। ওখানে যা হয়েছে তা আপনি ফিরিয়ে আনতে চাইছেন না বলেই…”

“ফিরিয়ে আনা!” হেপওয়ার্থকে কথা শেষ করতে না দিয়ে প্রায় চিৎকার করে উঠলেন মহিলা, “মূর্খ! আমি যা জানি তার অর্ধেক জানলেও তুমি ফিরিয়ে আনার কথা মুখেও আনতে না। সে তো নিজেই ফিরে এসেছিল! সঙ্গে করে এনেছিল সেই অভিশাপ, ফুল, আর… সেই পাখি! তাদের সঙ্গেই তো এসেছিল মৃত্যু। রিয়ান কী হয়ে গিয়েছিল— এটা যারা দেখেছিল তারা সব্বাই মরেছে! শেষে আমার স্বামীও…!”

স্তম্ভিত হয়ে হেপওয়ার্থ কথাগুলোর অর্থ বোঝার চেষ্টা করছিলেন। তারই মধ্যে মহিলা আবার গলা ফাটিয়ে বলে উঠলেন, “কোন সাহসে তুমি আমার বাড়িতে এসে ওর কথা তুললে? দূর হয়ে যাও এখান থেকে! আর কখনও, কোনওদিন আমার সামনে আসবে না।”

দড়াম করে বন্ধ হয়ে গেল দরজাটা।

প্রতিবেশীরা উকিঝুঁকি দেওয়ার আগেই ওখান থেকে কেটে পড়লেন হেপওয়ার্থ। তবে চলে আসার আগে আরও একটা ব্যাপার তাঁর চোখে ধরা দিল। আশেপাশের বাড়িগুলোর বাগানে ফুলে ঝলমলে গাছপালা থাকলেও আনেউরিনের বাড়ির চারধারে শুধুই উঁচু ঝোপ— যেন সবার দৃষ্টির আড়ালে লুকিয়ে থাকতে চেয়েছেন এই বাড়ির বাসিন্দাটি!!

সন্ধেবেলা হোটেলে ফিরে একা-একা ডিনার সারলেন হেপওয়ার্থ। তারপর একটু হাঁটাহাঁটি করতে বেরিয়ে নদীর দিকে এগোলেন তিনি। শেষ আলোটুকু তখন আকাশ থেকে মিলিয়ে আসছে। ফুলের গন্ধে তখনও ভারী হয়ে আছে বাতাস। একটু দূরে দুটো কাঠবিড়ালির কিচিরমিচির আর দৌড়ঝাঁপ দেখে তাদের বিরক্ত করতে চাইলেন না হেপওয়ার্থ। অন্যদিকে ঘুরলেন তিনি। তখনই তাঁর মাথার ঠিক ওপর দিয়েই হুশ্‌ করে চলে গেল একটা কিছু। একটা কাঠবিড়ালি’র করুণ কিঁচকিঁচ শুনে দ্রুত পেছনে ফিরলেন হেপওয়ার্থ। আবছা অন্ধকারেও তিনি বুঝতে পারলেন, একটা কাঠবিড়ালি প্রাণপণে গাছের উপরে উঠে যাচ্ছে। অন্যটাকে দেখতে পেলেন না তিনি।

নখ আর ঠোঁটে রক্তিম প্রকৃতির কথা ভেবে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হোটেলের পথ ধরলেন হেপওয়ার্থ। একটা প্যাঁচার নরম, চাপা ডাক ভেসে এল তাঁর পেছন থেকে।

সেদিন রাত থেকেই আবহাওয়া বদলাতে শুরু করল। পাহাড়ের মাথায় মেঘের গুরুগুরু শোনা গেল ঘনঘন। বিদ্যুৎ চমকে আকাশের ফালাফালা হওয়া দেখছিলেন হেপওয়ার্থ। তাঁর ঘরের ভেতরটা অস্বাভাবিক গরম হয়ে উঠেছে। বাধ্য হয়ে জানালা খুলে, গায়ে স্রেফ একটা পাতলা চাদর জড়িয়ে ঘুমোনোর চেষ্টা করলেন তিনি। তাতেও যে ঘুমটা খুব ভালো হচ্ছিল তা নয়। অদ্ভুত কিছু স্বপ্ন আর টুকরো-টুকরো শব্দ ভেসে আসছে ঘুমের মধ্যেই। মাঝরাতে হঠাৎ দমকা হাওয়ার দাপটে একটা ফুলদানি মেঝেতে আছড়ে পড়ল। বিছানা ছেড়ে প্রায় লাফিয়ে উঠলেন হেপওয়ার্থ। ঘুম-চোখে দেখলেন, ঝড় শুরু হয়েছে। হাওয়ায় ঝাপটাতে থাকা পর্দার সঙ্গে প্রায় যুদ্ধ করে জানালাটা বন্ধ করলেন তিনি।

সকালে ঘুম থেকে উঠে হেপওয়ার্থ দেখলেন আবহাওয়া থমথম করছে। বন্ধ জানালার কাচে ছড়িয়ে রয়েছে অজস্র ফুলের পাপড়ি। তার মানে, রাতের ঝড়ে বাগানের ফুলগুলোর দফারফা হয়েছে। ঘর সাফ করতে আসা পরিচারিকাটি যা বলল তার থেকে হেপওয়ার্থ বুঝলেন, বৃষ্টি তখনই আসার সম্ভাবনা কম। দিনটা নষ্ট করতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। তাই ব্যাকপ্যাক, রেইনকোট আর সাইকেল নিয়ে ব্যাংগর হয়ে ক্যানার্ভনের পথে রওনা দিলেন হেপওয়ার্থ।

তাঁর ভাগ্য ভালো বলতে হবে, কারণ গুমোট হয়ে থাকলেও পথে বৃষ্টি আসেনি। হেপওয়ার্থ যখন ফিরছেন, তখন মেঘের ফাঁক দিয়ে মুখ দেখিয়েই আবার সবজেটে অন্ধকারে ডুবে গেল সূর্য। পেনম্যানমর পার হওয়ার পর হেপওয়ার্থ একটা সরু রাস্তা দেখলেন— যেটা মূল পথ থেকে বেরিয়ে উপত্যকার বুক চিরে নেমে গেছে। এলাকার ভূগোলটা এই ক’দিনে তিনি বেশ বুঝে গিয়েছেন। হেপওয়ার্থের মনে হল, এই রাস্তাটা সরাসরি লানেইরিয়াসের দিকে গেছে। কনওয়ে-র ভিড়ভাট্টা এড়ানোর জন্য তিনি ওটাই ধরলেন। কিছুটা পথ ভালোভাবে এগোনোর পরেই রাস্তাটা একেবারে মেঠোপথ হয়ে গেল। নিজেকে এবং রাস্তাটাকে গালাগাল দিয়ে হেপওয়ার্থ ভাবলেন, ফিরে যাবেন কি না। ঠিক তখনই নীচে, মাইল দেড়েকের ঢালের শেষে, নদীর ও-পারে লানেইরিয়াস হল-এর দেখা পেলেন তিনি।

“অবশেষে!” বিড়বিড় করে ঢাল বেয়ে নামতে শুরু করলেন হেপওয়ার্থ। তবে নামাটা সুখদায়ক হল না। কাঁটাঝোপে বারবার আছাড় খেলেন। অবশেষে একটা জায়গায় এসে পৌঁছোনোর পর আবিষ্কৃত হল যে রাস্তা বলে সামনে আর কিছুই নেই। ইতোমধ্যে বার-দুয়েক ঘাসজমির গর্তে পা ঢুকে মচকাতে-মচকাতে বেঁচেছে।

সাইকেলটা ওখানেই রেখে দিলেন তিনি। তারপর বিশ্বসংসারের উদ্দেশে বাছাই-করা গালাগাল দিতে-দিতে কখনও বেড়া ডিঙিয়ে, কখনও কারও বাড়ির পেছনের বাগানের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চললেন হেপওয়ার্থ। হল ততক্ষণে তাঁর চোখের আড়াল হয়ে গেলেও আন্দাজের ভিত্তিতে এগোতে পারছিলেন তিনি। তাছাড়া থামার তো উপায় ছিল না। আলো কমে আসার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে স্তূপীকৃত হয়ে উঠেছিল মেঘেরাও। শেষ অবধি ঘন গাছের একটা ছোটোখাটো বন পেরোতে গিয়ে তাঁর মনে হল, একটা ঠিকঠাক রাস্তা পাওয়া গেছে। লাল পাথরগুলো যে-ভাবে বসানো রয়েছে, আর তাদের দু’ধারে যে-ভাবে লাগানো হয়েছে নিচু ঝোপ— তা থেকে বোঝাই যায় যে একসময় এটা রাস্তাই ছিল। এখন শ্যাওলায় সবুজ হয়ে গেলেও পথটার ঢাল দেখে বোঝা যায়, ওটা গেছে হল-এর দিকেই। পা যাতে হড়কে না যায় সে-বিষয়ে সচেতন হয়ে ওই পথটা ধরেই এগোলেন তিনি।

ব্যাপারটা সহজ হল না। কিছুক্ষণ পর একটা আলগা পাথরে পা দিয়ে আবার ভূমিশয্যা নিলেন হেপওয়ার্থ। চার হাত-পায়ে ভর দিয়ে ওঠার চেষ্টা করতে-করতে নিজেকে আরও একপ্রস্থ গালাগাল দিচ্ছিলেন তিনি। হঠাৎ তাঁর চোখে একটা পরিবর্তন ধরা দিল।

কেমন পরিবর্তন?

এটা কাউকেই গুছিয়ে বলতে পারেননি হেপওয়ার্থ। তাঁর মনে হয়েছিল, যেন এক ঝটকায় তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেছে! এটা কোনও উপমা বা রূপকার্থে নয়, বরং একেবারে কঠোর বাস্তবিক অর্থেই ঘটেছিল। তাঁর কাছের ঘাস আর ঝোপগুলো যেন এক লহমায় নিরক্ষীয় কোনও চিরহরিৎ অরণ্যের মতো বিশাল হয়ে উঠল। সামনের আর পেছনের দৃশ্যাবলি বারবার মিশে যাচ্ছিল। হেপওয়ার্থের মনে হল, মানুষ নয়— তিনি যেন কোনও কাঠবিড়ালি বা ইঁদুরের চোখ দিয়ে পৃথিবীটা দেখছেন!

সাবধানে, সন্তর্পণে হাঁটুতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন হেপওয়ার্থ। তাঁর চোখের সামনে সবুজ অন্ধকারে ঢাকা পৃথিবী টলে উঠে আবার সোজা হল ঠিকই, কিন্তু অচেনাই রইল। হাত বাড়িয়ে দু’পাশের গাছ… না, ঝোপ… ধরে টাল সামলালেন তিনি। ঠিক তখনই তাঁর মাথার ওপর থেকে একটা কিছু তাঁর দিকে নেমে এল ঝড়ের বেগে। জিনিসটা কী— সেটা দেখতে পেলেন না হেপওয়ার্থ, কারণ ততক্ষণে তিনি আবার মাটিতে শুয়ে একেবারে ঝোপের মধ্যে গড়িয়ে গেছেন। মাথার ওপর দিয়ে প্রায় ঝড় বয়ে গেল বলেই তাঁর মনে হল, জিনিসটা বিশাল! ঝোপের বাইরে বেরিয়ে থাকা পায়ের কিছুটা অংশে সেটার সামান্য ছোঁয়া লাগতেই আর্তনাদ করে উঠেছিলেন তিনি। তবে ভয়ে আওয়াজটা বেরিয়েছিল অনেকটা ফুঁপিয়ে কান্নার মতো করেই।

শোয়া অবস্থাতেই হেপওয়ার্থ একটা কথা বুঝতে পারলেন। এই ঝোপঝাড়ের মধ্যে লুকিয়ে থেকেই তিনি কনুই আর বুকে ভর দিয়ে কিছুটা এগোতে পারবেন। হয়তো হল অবধি পৌঁছোনো যাবে না, তবে সামনে— যেখানে মাটি কিছুটা উঁচু হয়ে উঠেছে— ওই অবধি তো যাওয়াই যাবে! ঘষটে-ঘষটে যত দ্রুতসম্ভব এগোতে শুরু করলেন তিনি।

মাথার ওপরে বাতাস ডানা ঝাপটানির শব্দ আর হাওয়ায় বিদীর্ণ হয়ে যাচ্ছে মুহুর্মুহু। ঝোপগুলো ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে তাঁর নাগাল পেতে চাইছে সেই অদৃশ্য শত্রু। প্রত্যেকবার সে নেমে আসছে, আর মাটিতে পড়ে থাকা শুকনো পাতা আর ধুলোয় মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে উঠছেন হেপওয়ার্থ। কী হচ্ছে, কে তাঁকে আক্রমণ করছে এ-ভাবে— কিছুই বুঝতে পারলেন না তিনি। তবে একটা জিনিস তিনি অনুভব করছিলেন।

বেশিক্ষণ তিনি লুকিয়ে থাকতে পারবেন না!

কতটা পথ তিনি ও-ভাবে পেরিয়েছিলেন বলা মুশকিল। অনেকক্ষণ পর, ঝোপ দিয়ে বানানো একটা বেড়ার মধ্য দিয়ে হ্যাঁচোড়-প্যাঁচোড় করে উঁচু জমিটাতে উঠতে পারলেন তিনি। তারপর দাঁড়ানোর চেষ্টা না করে তিনি ওপাশে স্রেফ গড়িয়ে পড়লেন।

গড়ানোর সময়ই আশেপাশে সুন্দর করে লাগানো ফুলগাছ, ল্যাভেন্ডার আর অন্য ফুলের ভারী গন্ধ— এগুলো টের পাচ্ছিলেন হেপওয়ার্থ। তাঁর মন বলছিল, তিনি হলের বাগানের মধ্যে ঢুকে পড়েছেন। ঠিক তখনই তাঁর প্রায় মাথা ছুঁয়ে গেল সেই বিশাল শত্রু। তারপর তার ডানা ঝাপটানো আর বাতাসের নড়াচড়া একদম ম্যাজিকের মতো থেমে গেল হঠাৎ। মাথা তুলে হেপওয়ার্থ বুঝলেন, তাঁর গা গুলিয়ে উঠছে— কারণ আশেপাশের দৃশ্যগুলো আবার ফিরে আসছে পুরোনো, স্বাভাবিক চেহারায়!

চিত হয়ে আকাশটা দেখলেন হেপওয়ার্থ। তারপর আস্তে-আস্তে উঠে দাঁড়ালেন। হ্যাঁ, তিনি লানেইরিয়াস হলের বাগানেই পৌঁছে গেছেন! আতঙ্কে, বিস্ময়ে, শ্রান্তিতে টলতে-টলতে তিনি বাড়িটার দিকে এগোলেন। সেই মুহূর্তে তিনি প্রায় মরিয়া হয়ে চেনা কাউকে, অন্তত কোনও মানুষের মুখ দেখতে চাইছিলেন। কিন্তু খাওয়ার ঘরের মস্ত জানালাগুলো ঠেলে ঢুকতে গিয়ে দেখা গেল, সেগুলো একেবারে টাইট করে বন্ধ করে রাখা হয়েছে ভেতর থেকে।

“ঝড় আসছে নির্ঘাত।” বিড়বিড় করে হোটেলের মূল দরজার দিকে এগোলেন হেপওয়ার্থ, “সেজন্যই জানালাগুলো সব বন্ধ করে রেখেছে।”

কিন্তু মূল দরজাও তালাবন্ধ ছিল। হেপওয়ার্থ কী করবেন বুঝতে পারছিলেন না। তারপর তাঁর খেয়াল হল, তাঁর নাম লেখা একটা খাম দরজার হাতলে আটকানো রয়েছে। বাধ্য হয়ে সেটা খুলতেই ভেতর থেকে একটা চিঠি বেরোল। তাতে লেখা ছিল—

‘ডিয়ার মিস্টার হেপওয়ার্থ,

খুবই দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি, মিস্টার এমরিজ একেবারে কঠোরভাবে বলেছেন যে বুকিং বাড়ানো যাবে না। তাই লানেইরিয়াসেই হার্প পাবলিক হাউসে আপনার থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমরা ওঁর কথামতো হল বন্ধ করে চলে যাচ্ছি। আপনার অসুবিধের জন্য এমরিজ অত্যন্ত দুঃখিত ও ক্ষমাপ্রার্থী। আপনি দয়া করে ‘হার্প’-এ চলে যান। এমরিজ নিজেই আপনাকে সব বুঝিয়ে বলবেন। আপনার থাকা-খাওয়ার সম্পূর্ণ দায়িত্বও এমরিজ নিয়েছেন।

বিনয়াবনত, ফক্স’

হেপওয়ার্থের মাথায় মোটামুটি বাজ পড়ল। সেই মুহূর্তে মাইলদেড়েক ঠেঙিয়ে অন্য কোথাও যাওয়ার ইচ্ছে বা অবস্থা— দুটোর কোনওটাই তাঁর ছিল না। মরিয়া হয়ে তিনি বাড়িতে ঢোকার একটা রাস্তা খুঁজতে লাগলেন। এদিক-ওদিক চক্কর লাগিয়ে অবশেষে নোংরা জামাকাপড় বের করে ধোপার কাছে দেওয়ার অংশে একটা ছোট্ট দরজা খোলা পেলেন তিনি। হোটেলের ভেতরে ঢুকে হাঁফ ছাড়লেন হেপওয়ার্থ। তারপর নিজের ঘরের চাবিটা নেওয়ার জন্য কাউন্টারে গেলেন। সেখানে টেবিলের ওপর একটা টেলিগ্রাম পড়ে ছিল। নানা কথার মধ্যে তাঁর নামটাও আছে দেখে কৌতূহলী হয়ে টেলিগ্রামটা পড়লেন হেপওয়ার্থ। ওতে লেখা ছিল—

‘ফক্স, তোমার চিঠি পেয়েছি। আজ বিকেলের মধ্যে হেপওয়ার্থ-সহ হোটেলের সবাইকে নিয়ে হল থেকে চলে যাও। শনিবার রাতে কেউ যেন হোটেলে না থাকে। হেপওয়ার্থ হার্প-এ থাকবে। সব খরচাপাতি আমার। পরে ফোনে বুঝিয়ে বলব। হল ফাঁকা করো। এমরিজ, রেক্সহ্যাম’

হাঁ-করে ওখানেই কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন হেপওয়ার্থ। এর মানে কী? তখনই তিনি গন্ধটা পেলেন।

ফুলের গন্ধ! ভারী, নাক-মুখ হয়ে স্নায়ুর ওপর একেবারে আক্রমণ চালানো গন্ধটা লবিতে ছড়িয়ে পড়ছে। তারই পাশাপাশি তাঁর মনে হচ্ছে, বাড়ির মধ্যে তিনি যেন নড়াচড়ার শব্দ পাচ্ছেন।

মুহূর্তের জন্য আবার সেই সামনে-পেছনে গুলিয়ে যাওয়ার অনুভূতি হল হেপওয়ার্থের। ওককাঠের প্যানেলগুলো যেন হালকা হয়ে দুলে উঠল তাঁর সামনে। একরকম মরিয়া হয়ে তিনি বলে উঠলেন, “ফক্স! আপনি কি এসেছেন? কেউ আছে এখানে?”

উত্তর এল না। তবু তাঁর মনে হল, কে যেন রয়েছে ওখানে— কিন্তু তাঁকে তিনি দেখতে পাচ্ছেন না।

ফুলের তীব্র গন্ধ হেপওয়ার্থের চিন্তাভাবনা আচ্ছন্ন করে ফেলল। তিনি খাওয়ার ঘরে এলেন। ঘরটা একেবারে ফাঁকা। টেবিল-চেয়ার সব সরিয়ে ফেলা হয়েছে ওখান থেকে। তার পাশের ঘরে গেলেন তিনি। তারপর অন্য একটা ঘরে। শূন্যতা ছাড়া কেউ তাঁকে স্বাগত জানাল না।

হালকা পায়ের শব্দ আর নড়াচড়া তিনি টের পাচ্ছিলেন। দূরের একটা ঘরে তিনি স্পষ্ট শুনলেন ঝাপটানোর মতো আওয়াজ। কিন্তু সেখানে ছুটে গিয়েও কাউকে দেখা গেল না। একটা ঘরে আয়নায় তিনি মুহূর্তের জন্য তাঁর পেছনে সাদা রঙের কিছু একটা দেখলেন। হেপওয়ার্থ এত দ্রুত পেছনে ফিরলেন যে তাঁর মাথা ঘুরে গেল। তবু কাউকে দেখতে পেলেন না তিনি।

তাঁর মনে হল, ওপরের কোনও একটা ঘর থেকে গানের খুব হালকা সুর ভেসে আসছে। কে যেন মিষ্টি গলায় গান গাইছে। টলছিলেন হেপওয়ার্থ। তবু সিঁড়ির ধারটা ধরে তিনি নিজেকে ওপরে নিয়ে গেলেন। তারপর এক-একটা  ঘর
ের দরজা সপাটে খুলে ভেতরে দেখতে-দেখতে এগোলেন তিনি।

নেই। কেউ নেই! কিচ্ছু নেই ঘরগুলোতে। কিন্তু গানটা ভেসে আসছে তাঁর কানে। ভাষাটা না বুঝলেও সেই সুর যেন তাঁকে ব্যঙ্গ করছিল, আবার ডাকছিলও। ওই গলার মধ্যে এমন কিছু ছিল যার টানে প্রায় অন্ধের মতো হেপওয়ার্থ এগিয়ে গেলেন করিডরের প্রান্তে— যেখান থেকে ওপরে উঠে গেছে একটা অন্ধকার সিঁড়ি। সেটার অন্য প্রান্ত থেকেই ভেসে আসছে গানটা।

শরীরের শেষ শক্তিটুকু জড়ো করে, ওই সিঁড়ি ধরে ওপরে উঠতে শুরু করলেন হেপওয়ার্থ।

সিঁড়িটা শেষ হল একটা চিলেকোঠায় এসে। ঘরটা গুমোট গরমে একেবারে চুল্লি হয়ে রয়েছে। ভেতরে বাতাস একবিন্দুও নড়ছে না। হেপওয়ার্থ পা রাখা মাত্র কাঠের মেঝে থেকে ধুলো উড়ল। অজস্র পালক ছড়িয়ে রয়েছে সর্বত্র। কোন পাখির পালক তা না বুঝলেও সেগুলো দেখামাত্র শিউরে উঠলেন হেপওয়ার্থ— নিজের অজান্তেই। তবু তিনি এগিয়ে গেলেন ঘরের সবচেয়ে অন্ধকার কোণটার দিকে। সেখান থেকেই ওই মিষ্টি, বিষাদ আর স্বপ্নে মাখা সুরেলা গানটা ভেসে আসছে। কুচকুচে কালো ওই কোণে সাদা রঙের একটা ঝলক দেখলেন তিনি। গান থেমে গেল, তার বদলে ভেসে এল খিলখিল হাসির শব্দ। তারপর ঘন, জমাট ছায়াদের মধ্য থেকে বেরিয়ে এল মেয়েটা।

ফ্রেমে দেখা, কথায় শোনা, সাদা পোশাকে রক্তের দাগ-লাগানো সুন্দরী মেয়েটাকে চিনতে পারলেন হেপওয়ার্থ। নিঃসীম আতঙ্ক গ্রাস করল তাঁকে। পাগলের মতো পেছন ফিরে সিঁড়ির দিকে ছুটলেন তিনি। ঘোরার আগে তিনি যা দেখেছিলেন, তা তাঁর নিজের কাছেই স্পষ্ট নয়। তাঁর মনে হয়েছিল, মেয়েটা যেন বাতাসে ভেসে উঠেছে, আর… বদলে যাচ্ছে। তারপর তাঁর স্মৃতি বলতে ছিল বিশাল ডানা, নখ, আর সিঁড়ি দিয়ে নীচে পড়ে যাওয়া!

ওই শেষ ব্যাপারটাই হেপওয়ার্থকে বাঁচিয়ে দিল। হাত-পা ছড়িয়ে নীচে এসে পড়লেন তিনি। পালক, ফুলের পাপড়ি আর ধুলোর একটা ঝড় সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল তাঁর দিকে। গান আর হাসি ততক্ষণে বদলে গেছে তীব্র-তীক্ষ্ণ চিৎকারে। সেই চিৎকারে এতটাই উঁচু পর্দায় বাঁধা যে হেপওয়ার্থ তা ঠিকমতো শুনতে পেলেন না। অথচ তাঁর প্রতিটি স্নায়ু, পেশি, রক্তকণা ফেটে পড়তে চাইল তাতে সাড়া দিয়ে! তারই মধ্য দিয়ে তিনি করিডর ধরে টলতে-টলতে নীচে নামার রাস্তা খুঁজছিলেন। কিন্তু সেই মুহূর্তেই আর একটা জিনিস বুঝতে পারলেন হেপওয়ার্থ— পালক, পাপড়ি, মায় ধুলো আর কাঠও অসহ্য গরম হয়ে উঠেছে!

একটু পরেই পালকগুলো জ্বলতে শুরু করল। সেই ধোঁয়ায় বিভ্রান্ত হয়ে সপাটে দেওয়ালে ধাক্কা খেলেন হেপওয়ার্থ। মুহূর্তের জন্য চোখে অন্ধকার দেখলেন তিনি। তারই মধ্যে তিনি বুঝতে পারলেন, তাঁর কোট আর ট্রাউজারে আগুন ধরে গেছে।

বাঁচতেন না হেপওয়ার্থ। কিছুতেই বাঁচতেন না তিনি, যদি-না ঠিক সেই মুহূর্তেই দু’জোড়া হাত ধোঁয়া আর আগুনের মধ্য দিয়ে এসে তাঁকে টেনে, ছেঁচড়ে প্রথমে নীচে, তারপর একেবারে হল-এর বাইরে নিয়ে আসত। চিতপাত হয়েই হেপওয়ার্থ দেখেছিলেন, অবিশ্বাস্য দ্রুততায় ছড়িয়ে পড়ছে আগুন। তার সাংঘাতিক দাপটের সামনে অসহায় হয়ে পড়েছে আকাশভাঙা বৃষ্টিও। হিস-হিস শব্দ তুলে ছাই হয়ে যাচ্ছে লানেইরিয়াস হল। প্রায় অজ্ঞান অবস্থাতেও হেপওয়ার্থ শুনেছিলেন, এমরিজ চিৎকার করে ফক্স-কে বলছেন, “কেন তুমি ওঁকে ফিরতে দিয়েছিলে? আমি তোমাকে পইপই করে বলে গিয়েছিলাম, এই রাত্তিরটা যেন কেউ হলের ত্রিসীমানায় না থাকে। এই রাত্তিরটায় সে ফিরে আসে! দেখলে তো তার ফলটা!”

ফক্সের উত্তর দেওয়ার অবস্থা ছিল না। হাঁ-করে তিনি তাকিয়ে ছিলেন দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা বাড়িটার দিকে।

“বোঝা যায়।” মাথা নেড়ে, কাশতে-কাশতে বলছলেন এমরিজ, “প্রত্যেক বছর বোঝা যায়। ছোট্ট-ছোট্ট জিনিসের মধ্য দিয়ে ও বুঝিয়ে দেয়, এই রাত্তিরটা ওর… বাসর! সময়মতো হল ফাঁকা করে দিলে কোনও ক্ষতি হয় না। কিছু পালক, বা ফুলের পাপড়ি থেকে যায় শুধু পরদিন সকালেও। ত্রিশ বছর ধরে আমরা এই ব্যাপারটা মানতে পারলাম, ফক্স। আর তুমি একটা বছর সেটা করতে পারলে না?”

ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ির ঢং-ঢং শুনতে-শুনতেই হেপওয়ার্থ দেখলেন, বাড়ির দু’দিকের দুটো জানালা দিয়ে বেরিয়ে এল দাউদাউ আগুনের শিখা। বিশাল সেই ডানা আর নখের স্মৃতি ফিরে এল তাঁর মনে। তারপর অন্ধকার।

“তারপর?” আমি জানতে চাইলাম, “আপনি এখানে এলেন কী-ভাবে?”

“লানডাডনো-র একটা হাসপাতালে আমার জ্ঞান ফিরেছিল। এমরিজ আর ফক্স আশা করেছিলেন, সাইকেল নিয়ে আমি শহরের মধ্য দিয়েই ফিরব। তাঁরা ওখানেই আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। নেহাত নদীর পাশ দিয়ে আমাকে এগোতে দেখে একজন ওঁদের খবর দিয়েছিল। তাই ওঁরা শেষ মুহূর্তে ওখানে পৌঁছোতে পেরেছিলেন।

পুলিশ এসেছিল, স্বাভাবিকভাবেই। এমরিজ তাদের বলেছিলেন, একটা লণ্ঠন উলটে গিয়ে আগুন লেগেছে! পুলিশ খুব একটা খোঁচাখুঁচি করেনি। স্থানীয় লোক বলে ওরাও এই হলের ব্যাপারটা জানে। জানতাম না শুধু আমি। আর তার ফলেই…!”

আঙুল তুলে পাশে পড়ে থাকা খবরের কাগজটা দেখিয়ে দিলেন ভদ্রলোক। অস্পষ্ট ধ্যাবড়া ছবিটা এবার আমি ভালো করে দেখলাম।

‘লানেইরিয়াস হল-এ হঠাৎ আগুন: শতাব্দীপ্রাচীন প্রাসাদ ভস্মীভূত!’

“ব্যাপারটা ঠিক…” আমি জিজ্ঞেস করলাম, “মানে ওই মেয়েটি কে? তার কী হয়েছিল?”

“এই যাচ্ছেতাই হোটেলেও আপনি এক কপি মাবিনোজিও পেয়ে যাবেন।” ক্লিষ্ট হাসি মুখে ফুটিয়ে বললেন ভদ্রলোক, “তাতে গল্পটা পড়ে নেবেন। স্রষ্টার বদলে অন্যকে ভালোবাসা, ঈর্ষা, ফুল, নখ, প্যাঁচা, আগুন… সব আছে ওতে। ভারি চমৎকার গল্প, তবে শেষটা মর্মান্তিক— রূপকথায় যেমন হয় আর কী!”

_

মূল কাহিনি: দ্য লেডি অফ দ্য ফ্লাওয়ার্স

লেখক: স্টিভ ডাফি

প্রথম প্রকাশ: গোস্টস্‌ অ্যান্ড স্কলার্স্‌ পত্রিকা (১৯৯৮)

1 Comment

অনেক গল্পের মধ্যে কিছু জায়গায় অর্ধেক ( right side এ) লেখাগুলো নেই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *