সতেরো – ঋজু গাঙ্গুলী

সতেরো

দিনের কাজকর্ম সেরে ব্যাক্সটার যখন বেরোলেন, তখন সূর্য ডুবছে। ডানকাস্টার গল্‌ফ্‌ ক্লাবের বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ, দূরে একটা ঘন বন, একদিকে বালিয়াড়ি, তার পেছনে সমুদ্র— সব মিলিয়ে ভারি সুন্দর লাগছে জায়গাটা। ব্যাক্সটার মনে-মনে ভাবলেন, বছর ত্রিশেক আগে নরফোকে বেড়াতে আসা এক গল্‌ফ্‌-প্রেমিকের মাথায় ভাগ্যিস আইডিয়াটা এসেছিল। নইলে এমন বিজন প্রান্তরে গল্‌ফ্‌ কোর্স গড়ে উঠত না।

রেল স্টেশন থেকে বারো মাইল দূরত্বের এই গল্‌ফ্‌ কোর্সে খেলার জন্য এখন লোকে রীতিমতো লাইন দেয়! নিয়মিত সদস্যদের পাশাপাশি বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি ইদানীং এখানে খেলা আর অন্যদের সঙ্গে মেলামেশার জন্য ফর্ম জমা দেন। গর্বিত বাবা-র মতো ব্যাক্সটার দু’চোখ মেলে ক্লাবের পুরো এলাকাটা দেখছিলেন এ-সব ভাবতে-ভাবতেই।

বল পড়ার গর্তগুলো ছোট্ট-ছোট্ট, কিন্তু উজ্জ্বল লাল পতাকা দিয়ে চিহ্নিত করা রয়েছে। সেগুলোর ওপর দিয়ে চোখ বোলাতে-বোলাতে হঠাৎ ব্যাক্সটারের নজর আটকে গেল একটা বিশেষ পতাকার ওপর। এতক্ষণ নিতান্ত শান্ত হয়ে থাকা তাঁর দৃষ্টিও ধারালো হয়ে উঠল তক্ষুনি।

সতেরো!

বনের গাছগুলোর লম্বা-লম্বা ছায়া এসে পড়েছে গর্তের লাগোয়া পতাকার ওপর। এক মুহূর্তের জন্য ব্যাক্সটারের মনে হল, পতাকাটার রঙ আর লাল নেই। বরং ওটাতে যেন শুকনো রক্ত লেগে আছে। ওটার কাছে কি কেউ দাঁড়িয়ে আছে? একটু এগিয়ে গেলেন তিনি, কিন্তু কাউকে দেখতে পেলেন না।

ব্যাক্সটার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এই সতেরো নম্বর গর্তটা বানানো নিয়ে কমিটির সদস্যদের মধ্যে যে কী পরিমাণ ঝগড়াঝাঁটি হয়েছে, তা তিনি হাড়ে-হাড়ে জানেন। বনটার কিছুটা অংশ কাটতে হয়েছিল ওটা বানানোর জন্য। তার ফলে গল্‌ফ্‌ কোর্সের আকার বেড়ে গেছে বেশ কিছুটা। ঈষৎ উঁচু হয়ে থাকা জমিটা পেশাদার গল্‌ফারদের জন্য একটা মোক্ষম চ্যালেঞ্জও হয়ে উঠেছে। কিন্তু সে-ভাবে কেউ ব্যাপারটা দেখছেই না। গাছ কেন কাটা হয়েছে? ঢালটা কেন ঠিকঠাক হয়নি? বনের এত কাছে কেন গর্ত করা হয়েছে? এমন হাজারটা প্রশ্ন শুনে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন ব্যাক্সটার।

আনমনে হাঁটতে-হাঁটতে এক পেশাদার গল্‌ফারের ছোট্ট কেবিনের সামনে এসে পড়লেন ব্যাক্সটার। ডেকার্স নামের সেই ভদ্রলোক তখন দাঁতের ফাঁকে পাইপ কামড়ে রেখে আকাশের গায়ে লেগে থাকা শেষ আলোর খেলাটুকু দেখছিলেন।

“শুভ সন্ধ্যা, ডেকার্স।” ব্যাক্সটার বললেন, “একটু আগে সতেরো নম্বরের দিকে কাউকে দেখলাম মনে হল। এখন আবার কে খেলতে গেল?”

বেশ কয়েকটা অনুভূতি ঝিলিক দিল ডেকার্সের মুখে। তারপর, পাইপ সরিয়ে তিনি বললেন, “না স্যার। সবাই নিজের-নিজের ঘরে ফিরে গেছেন। মিস্টার আর মিসেস স্ট্যানার্ড খেলা শেষ করেছেন… তা-ও প্রায় পনেরো মিনিট আগে। ওঁরাই শেষে বেরিয়েছেন।”

“আমারও তো তা-ই ধারণা ছিল। কিন্তু তখন যেন স্পষ্ট দেখলাম, কেউ ওখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে।”

ডেকার্স কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “ছায়ার জন্য ও-রকম মনে হয়েছিল আপনার। আমারও এমন ভুল হয় মাঝে-মাঝে।”

“তা-ই হবে।” দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ব্যাক্সটার, “তা… এই নতুন গর্তটা নিয়ে আপনার কী মনে হয়?”

“আমার পক্ষে ওটা বড্ড কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে গেছে, মিস্টার ব্যাক্সটার।” ডেকার্সের মুখে একটা ক্লিষ্ট হাসি ফুটল, “মাঠটা এমন চমৎকার। এখনও অবধি সাতবার আমি ওটাকে নিশানা করেছি। এমনিতে আমার যেটা স্বাভাবিক খেলা, তাতে পাঁচ নম্বর বা ছ’নম্বর থেকে একটা ড্রাইভ আর একটা পুশ— এতেই ওটার নাগাল পাওয়া যায়। আমার ক্লাবের ধাক্কায় বলটা বেরোয় ঠিকঠাক, কিন্তু তারপর যে ওটার কী হয়!”

“এই তো হয়েছে মুশকিল!” ব্যাক্সটার একেবারে অকপটে বলে ফেললেন, “আপনার মতো পেশাদার খেলোয়াড়রা যদি এইরকম বলতে থাকেন, তাহলে কে ওখানে খেলতে যাবে, বলুন? অথচ ওটাকে নিয়ে যে কী পরিমাণ ঝামেলা পোয়াতে হয়েছে, সে তো আপনিও কিছুটা জানেন।”

ডেকার্স অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। অন্ধকার আকাশের পটভূমিতে তাঁর পাইপের আগুনটা শুধু ধিকধিক করে উঠছিল। অবশেষে নীরবতা ভেঙে ভদ্রলোক একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করে বসলেন, “আচ্ছা, যে ঠিকাদার ওই গর্তটা বানানোর জন্য গাছ কাটছিল আর মাটি সমান করছিল, তার লোকগুলো কীসে মরল সেটা জানা গেছে?”

“নিশ্চিতভাবে কেউই তো কিছু বলছে না।” ব্যাক্সটার ঠোঁট বাঁকালেন, “তবে কানাঘুষোয় শুনলাম, কী-একটা অদ্ভুত রোগ হয়ে ওদের রক্ত দূষিত হয়ে গিয়েছিল। তাতেই নাকি…!”

“জানেন নিশ্চয়, ওখানে মাটির নীচ থেকে বেশ কিছু হাড়গোড় বেরিয়েছিল।” ডেকার্স থেমে-থেমে বললেন, “এ-নিয়ে তখন কাছের গ্রামে অনেক কথা রটেছিল। ওই গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দাকে আমি চিনি। তাদের মুখেই শুনেছিলাম, ওই বন সম্বন্ধে বেশ কিছু অদ্ভুত-অদ্ভুত কাহিনি নাকি অনেকদিন ধরেই এখানকার মানুষের মধ্যে প্রচলিত। সেই বন কেটে, মাটি ফেলে, আবার খুঁড়ে সতেরো নম্বর গর্ত বানানোর ফল ভালো হবে না— স্থানীয় লোকেরা কিন্তু এমনটাই বলাবলি করছিল তখন।”

“এটা নিয়ে আমরা পরে কথা বলব, ডেকার্স।” কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ব্যাক্সটার বললেন, “আজ অন্য কয়েকটা কাজ আছে। তবে সতেরো আমাকেও ভাবাচ্ছে!”

পরদিন মিটিং ছিল। মিটিঙের আগে কর্নেল সেনলিসের সঙ্গে এক দফা গল্‌ফ্‌ খেলতে গেলেন ব্যাক্সটার। খেলাটা দু’জনের কারও পক্ষেই খুব একটা ভালোভাবে এগোচ্ছিল না। সেনলিসের উৎসাহ প্রচুর হলেও দক্ষতা কম। ব্যাক্সটারের হাতে স্টিক এমনিতে কথা শুনলেও সেদিন খেলায় তাঁর খুব একটা উদ্যোগ ছিল না। এই করতে-করতে প্রথম ষোলোটা গর্ত সামলানো গেল। অবশেষে তাঁরা এলেন সতেরো নম্বরের কাছে। যে হাওয়াটা এতক্ষণ নেহাত মৃদুমন্দ সমীরণ হয়ে প্রান্তরে ঘুরে বেড়াচ্ছিল, সেটাই এবার ভয়ংকর জোরালো হয়ে উঠল। যথাসাধ্য মনঃসংযোগ করে স্টিক চালিয়েও ব্যাক্সটার বলটাকে কিছুতেই গর্তের কাছেই পাঠাতে পারছিলেন না! সেনলিসের কথা তো না-বলাই ভালো।

বনের দিক থেকে হাওয়াটা হিংস্রভাবে দুই খেলোয়াড়ের মুখেই বালি ছিটিয়ে দিচ্ছিল। হয়তো সেটাই দু’জনকে খেপিয়ে তুলল। ব্যাক্সটারের তিন নম্বর, আর সেনলিসের চার নম্বর শট্‌ বলগুলোকে হাওয়া ভেদ করে পাঠিয়ে দিল উঁচু ঢালের ও-পাশে।

“কী!” সেনলিসের মুখে গর্ব একেবারে ফেটে পড়ল, “কেমন দিলাম?”

“দারুণ!” ব্যাক্সটারও হাসল, “চলুন। দেখি আমরা কদ্দুর পাঠালাম বলগুলোকে।”

উঁচু জায়গাটা পেরিয়ে ওপাশে গেলেই সতেরো নম্বর গর্ত। গাছেরা সেখানে একেবারে ঘাড়ের ওপর ঝুঁকে আসে। কিছুটা অস্বস্তিভরে ঢালটা পেরিয়ে গেলেন ব্যাক্সটার আর সেনলিস। কিন্তু দুটো বলের একটাও ওখানে নেই।

“এ কী!” সেনলিস অবাক, “বালির ওপর দিয়ে বলগুলো গড়িয়ে গেল কোথায়?”

বিস্তর খোঁজাখুঁজির পর কর্নেল সেনলিসের বলটা পাওয়া গেল একটা গাছের গুঁড়ির নীচে। ব্যাক্সটারের বলটা বেরোল বনের ভিতরে একটা গর্তের মধ্যে থেকে।

কিন্তু সতেরো নম্বর গর্তে দুটো বলের একটাও ঢোকেনি।

“ব্যাপারটা কী হল, কর্নেল?” ব্যাক্সটার চিন্তিত মুখে বললেন, “দু’জনের একজনের ক্ষেত্রেও বলটা গর্তে ঢুকল না কেন?”

“ওই হতচ্ছাড়া গর্ত…!” ছাপার অযোগ্য একরাশ গালি দিলেন সেনলিস, “প্রথম থেকেই মনে হচ্ছিল, ওটা আমার সঙ্গে বজ্জাতি করছে।”

ব্যাক্সটার কিছু বললেন না। ডেকার্সের কথাগুলো মনে পড়ে গেল তাঁর। এই সতেরো নম্বর গর্তটা নিয়ে বারে-বারে এ-রকম সমস্যা হচ্ছে কেন? কী আছে এখানে?

“আরেহ্‌!” সেনলিস হঠাৎ বলে উঠলেন, “আমার বলটা পুড়ল কী ভাবে?”

“কই দেখি।” ব্যাক্সটার কৌতূহলী হয়ে বলটা হাতে নিয়ে আশ্চর্য হয়ে গেলেন। সত্যিই তো! একটা অদ্ভুত ঘষে যাওয়ার দাগ বলটায়— গরম শিক বা কয়লায় ঘষা খেলে যেমন হয়, অনেকটা তেমন।

“তোমারটাতেও তো রয়েছে দেখছি।” সেনলিসের চোখগুলো বড়ো হয়ে উঠল, “এই বনে লুকিয়ে থেকে কেউ আমাদের সঙ্গে বদমাইশি করছে নাকি হে?”

অন্যমনস্কভাবে মাথা নাড়লেন ব্যাক্সটার। পুরো ব্যাপারটা তাঁর কাছে বড়োই গোলমেলে ঠেকছে।

মিটিং ভালোয়-ভালোয় মিটল। ডেকার্সের সঙ্গে কথাপ্রসঙ্গে ব্যাক্সটার বললেন, “আজ আমি একহাত খেললাম।”

“দেখেছি।” মুচকি হাসলেন ডেকার্স, “সতেরো-কে কেমন দেখলেন?”

“আমার কপাল খারাপ।” আক্ষেপের সুরে বললেন ব্যাক্সটার, “নইলে তিন নম্বর শটে হয়ে যেত।”

“কপাল?” ডেকার্সের মুখে একটা ক্লিষ্ট হাসি দেখা দিল, “না স্যার। এটা অন্য জিনিস। আগামী সপ্তাহে তো বাকি মেম্বাররা আসবেন খেলতে। তখন দেখবেন। সতেরো আমাদের ভোগাবে, মিস্টার ব্যাক্সটার।”

“আগেরদিন আপনি কী যেন বলছিলেন?” ব্যাক্সটার জানতে চাইলেন, “গ্রামে এই নিয়ে কী-সব আলোচনা হয়েছে নাকি।”

“তা হয়েছে।” ধীরে-সুস্থে পাইপ ধরালেন ডেকার্স। তারপর বললেন, “আপনি কি জানেন, সন্ধের পর ওরা ওই বনে যায় না!”

“কেন?”

“ওদের ধারণা…” ডেকার্স খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন, “অনেকদিন ধরে চলে আসা একটা সংস্কার বলতে পারেন। টনি-কে চেনেন? গ্রামের মুচি। ওর বাবা-কে মৃত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল ওই বনে। শুধু ওই একটিই নয়। অনেকদিন ধরে, অনেক মৃত্যু হয়েছে ওখানে। তাই শুধু সন্ধেবেলা কেন, ওরা দিনের বেলাও বনটায় ঢুকতে ভয় পায়। কীসের ভয়— আমাকে কেউ বলেনি। কিন্তু ভয়টা বোঝা যায়। অনেক আগে থেকেই নাকি ওই বনটাকে ‘রক্তবন’ বলা হত, হয়তো এ-সব কারণেই। মাঝে গ্রামের ছেলে-ছোকরারা এই ব্যাপারটা হালকাভাবে নিতে শুরু করেছিল। কিন্তু ঠিকাদারের লোকগুলোর মৃত্যুর পর ভয়টা আবার পুরোদমে ফিরে এসেছে সবার মধ্যে।”

পরের সপ্তাহটা ভালোভাবেই শুরু হল। মোট চুয়াল্লিশজন সদস্যকে খাতায় নাম-সই করতে দেখে গর্বিত পিতার মতো বুক ফুলিয়ে হাঁটাচলা করতে লাগলেন ব্যাক্সটার। এই বিজন কোণের গল্‌ফ্‌ কোর্সে খেলতে লন্ডন থেকে যে এতজন লোক এসেছেন, সে-জন্য সেক্রেটারি হিসেবে তিনিও কৃতিত্ব দাবি করতেই পারেন বইকী।

কিন্তু খেলা শুরু হওয়ার পর ব্যাপারটা অন্যরকম হয়ে গেল। সন্ধেবেলা ক্লান্ত খেলুড়েদের স্বাগত জানাতে গিয়েই ব্যাক্সটার সেটা বেশ টের পেলেন।

ঘৃণা আর সম্ভ্রমের একটা অদ্ভুত মিশেল ধেয়ে যাচ্ছিল সতেরো নম্বরের উদ্দেশে!

পরদিন হাওয়াটা আগের দিনের তুলনায় কম ছিল। তাতেও, দিনের প্রতিযোগিতা শেষ হলে ব্যাক্সটার রীতিমতো ঘেরাও হয়ে গেলেন। খেলোয়াড়রা সমস্বরে দাবি করলেন, সতেরো নম্বর কোনও গর্ত নয়— বরং একটি অত্যন্ত বদমাইশ প্রকৃতির জিনিস। একেবারে চ্যাম্পিয়ন গল্‌ফার থেকে নেহাৎ আনাড়ি— সব-রকম খেলোয়াড়কেই সে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাচ্ছে। প্রতিবাদ করার মতো কোনও যুক্তি বা কারণ খুঁজে না পেয়ে ব্যাক্সটার প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য হলেন, ওই সপ্তাহের মধ্যে অবস্থার উন্নতি না হলে তিনি সতেরো নম্বর গর্তটাকে বাতিল করাবেন।

“কিন্তু আপনারা ভাবুন!” হতাশভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলেন ব্যাক্সটার, “এত খরচাপাতি করে গর্তটা বানিয়ে কোর্সটা বড়ো করা হল। তারপর, মাত্র এইক’দিনের মধ্যেই যদি সেটা বাতিল করতে হয়, তাহলে ট্রাস্টিরা কী ভাববেন?”

“যা-খুশি ভাবুন তাঁরা।” রাগত ভঙ্গিতে বললেন এক প্রৌঢ়, “তিন-তিনটে বল গচ্চা গেছে ওই সতেরো নম্বরের চক্করে। আমাদের পয়সাগুলো যে বরবাদ হচ্ছে, সেই নিয়ে কিছু করতে পারবেন আপনার ট্রাস্টিরা? যত্ত সব!”

উত্তেজিত সদস্যরা বিদায় নিলে সিরিল ওয়ার্ড ব্যাক্সটারের কাছে এসে বলল, “আপনার একটু সময় হবে? সতেরো নম্বর নিয়ে কিছু কথা ছিল আপনার সঙ্গে।”

ক্লাবের সবচেয়ে তরুণ আর সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় হিসেবে সিরিলের মতামতকে ব্যাক্সটার বরাবর গুরুত্ব দিয়েছেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি ওকে বসতে বললেন। বিনা ভূমিকায় সিরিল বলল, “আপনি এই বুড়োদের কথাকে এত গুরুত্ব দেবেন না, ব্যাক্সটার।”

“না দিতে পারলে তো খুশিই হতাম, সিরিল।” তুম্বো মুখে বললেন ব্যাক্সটার, “কিন্তু কেন ওই সতেরো নম্বরে একটা বলও ঢুকছে না— তার একটা ব্যাখ্যা থাকবে তো! সেটা দিতে না পারলে আমি ওই মেম্বারদের কী বোঝাব?”

“ওই দেখুন।” সিরিল জানালা দিয়ে বাইরে, দূরে সতেরো নম্বর গর্তটা দেখাল, “মনে হচ্ছে না, সতেরো নম্বর গর্তটা যেন রক্তে ভেসে যাচ্ছে?”

ব্যাক্সটার মানতে বাধ্য হলেন যে অস্তগামী সূর্যের আলোয় ঢালের ওই অংশটুকু সত্যিই ওইরকম দেখাচ্ছে। তবে দৃশ্যটা দেখে অবধি ব্যাক্সটারের মাথার ভেতরটা খচখচ করতে শুরু করল।

“ওখানে উঁচু-নিচু ঢাল আর হাওয়ার জন্য এইরকম অদ্ভুত ব্যাপার আমি সারাদিন ধরে লক্ষ করেছি।” বলল সিরিল, “এর ফলে কোনও খেলোয়াড়ের পক্ষেই ওই গর্তটাকে ঠিকমতো তাক করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে কোনও অলৌকিক বা অমঙ্গল-গোছের বিষয় নেই।”

“ডেকার্সের মুখে শুনেছিলাম, ওটাকে নাকি ‘রক্তবন’ বলা হয়।” ব্যাক্সটার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, “তাহলে সেটাও বোধহয় এই জন্যই। কিন্তু অন্য মেম্বারদের কী ভাবে বোঝাবে?”

আলোচনাটা ওখানেই থেমে গেল। বিষণ্ণচিত্তে ঘরমুখো হলেন দু’জনেই।

সেই রাতে ব্যাক্সটার ভারি অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখলেন।

তিনি শুনলেন, কোথায় যেন একটা ঘণ্টা বাজছে। তার গভীর, গম্ভীর আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ছে তাঁর চেতনায়, শিরায়, ধমনীতে। তারই মধ্যে কে যেন স্পষ্ট, সুরেলা গলায় বলে উঠল, “সিরিল ওয়ার্ডের পুণ্য স্মৃতির উদ্দেশে, যে রক্তবনে একবার-মাত্র আর্তনাদ করার সুযোগ পেয়েছিল!”

কথাটা শেষ হতেই একটা বিশ্রী খলখল হাসির শব্দ পেলেন ব্যাক্সটার। সেই শব্দ যেন তাঁকে ডুবিয়ে, দমবন্ধ করে মেরে ফেলতে চাইছে! প্রায় আর্তনাদ করে ঘুম থেকে উঠে পড়লেন তিনি।

“এই সতেরো নম্বরের ব্যাপারটা আমার মাথায় এমন বিশ্রীভাবে চেপে বসেছে কেন?” বিড়বিড় করতে করতে জল খেলেন ব্যাক্সটার। স্নায়ুগুলো একটু শান্ত হতেই তাঁর প্রচণ্ড, মানে একেবারে ঐকান্তিক ইচ্ছে হল তক্ষুনি ডানকাস্টার ছেড়ে কেটে পড়তে— যেদিকে দু’চোখ যায়। কিন্তু ইচ্ছে হলেই যদি সবকিছু করা যেত…!

পরদিন ঝড়বৃষ্টির চোটে খেলা মাথায় উঠল সবার। দিনের যে প্রতিযোগিতাটা আয়োজন করে ক্লাব, সেটাও স্থগিত হল। জল আর হাওয়ায় নেতিয়ে রইল সবুজ মাঠ। কিন্তু বিকেলে ঝড় থেমে গেল। শুধু তাই নয়, সারাদিন ময়লা স্লেটের মতো হয়ে থাকা আকাশ এক-রকম হঠাৎ করেই পরিষ্কার হয়ে গেল। নিজের ঘরের জানালা দিয়ে পশ্চিম আকাশে লাল রঙের খেলা দেখছিলেন ব্যাক্সটার। সিরিল ওয়ার্ড হন্তদন্ত হয়ে তাঁর ঘরে ঢুকল।

“যেটুকু আলো আছে, তাতে এক হাত হয়ে যাবে।” সিরিল হাসিমুখে বলল, “সারাদিন ধরে আমি ওইদিকে হাওয়ার বাঁকটা খেয়াল করেছি। আজ সতেরো-র একদিন, কি আমার একদিন!”

“পাগলামি কোরো না!” হঠাৎ গতরাতের স্বপ্নটা মনে পড়ে গেল ব্যাক্সটারের। জোর গলায় প্রতিবাদ জানালেন তিনি, “আর একটু পরেই অন্ধকার হয়ে যাবে। বল হারাবে। উঁচু-নিচু ঢাল পেরোতে গিয়ে দুর্ঘটনাও হতে পারে। এখন খেলার কোনও মানেই হয় না।”

“ধুর!” সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে রেজিস্টারটা তুলে নিল সিরিল। তারপর এন্ট্রি করে হাঁটা দিল সতেরো-র দিকে। ব্যাক্সটার ওকে প্রায় বনের কাছে পৌঁছোনো অবধি দেখলেন। তারপরেই পাশের ঘর থেকে তাঁর ডাক পড়ল। ঘরবন্দি দুই সদস্যের মধ্যে গল্‌ফ্‌-এর নিয়ম নিয়ে কী-একটা বিবাদ শুরু হয়েছে।

মধ্যস্থতা করে, দুই বুড়োকেই ‘কবে যে আমিও আপনাদের মতো করে খেলাটা বুঝব!’ ইত্যাদি বলে শান্ত করতে-করতেই ব্যাক্সটার একটা জিনিস খেয়াল করলেন।

হাওয়ার দাপট হঠাৎ বেড়ে গেছে!

ঠিক তখনই কোর্সের দিক থেকে একটা যন্ত্রণাকাতর চিৎকার শোনা গেল। ঝোড়ো হাওয়ায় সেটা পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার আগেই ব্যাক্সটার সেদিকে ছুটতে শুরু করলেন।

আওয়াজটা এসেছে ওই রক্তবন থেকেই।

তরল অন্ধকার নেমে এসেছে চরাচর জুড়ে। তার মধ্যেও ব্যাক্সটার আর তাঁর সঙ্গীরা দেখলেন, টলতে-টলতে বন থেকে বেরিয়ে আসছে কেউ-একজন। অসহায়ভাবে দু’হাত ওপরে তুলে সে বোধ হয় কিছু বলতে চাইল, কিন্তু কিচ্ছু শোনা গেল না। ধুপ্‌ করে পড়ে গেল সে।

শেষ কবে এত জোরে দৌড়েছিলেন, মনে করতে পারলেন না ব্যাক্সটার। সবার আগে তিনিই পৌঁছোলেন সিরিলের পাশে। যন্ত্রণায় বিকৃত মুখে, চিত হয়ে, বিস্ফারিত চোখদুটো আকাশের দিকে তুলে মাটিতে পড়ে ছিল সিরিল ওয়ার্ড। ব্যাক্সটারের পরেই সেখানে পৌঁছোলেন ডক্টর ব্রোগান। নিচু হয়ে কিছুক্ষণ তাকে পরীক্ষা করে ব্রোগান বিষণ্ণমুখে মাথা নাড়লেন। তারপর বললেন, “কোনও কারণে হৃদযন্ত্র কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে— এ-ছাড়া তো কিছু মনে হচ্ছে না। ওকে ক্লাবে নিয়ে চলুন তো।”

চারজনে মিলে সিরিল-কে ধরাধরি করে ক্লাবের দিকে নিয়ে চললেন। ব্যাক্সটার সিরিলের একটা পা ধরেছিলেন। কিন্তু তাঁর মাথায় ক্রমাগত পাক খেয়ে চলেছে গতরাতের স্বপ্নটা।

কীভাবে এটাকে ব্যাখ্যা করা যায়?

পুলিশ এবং অন্যদের ব্যাপারটা জানানো হল। ঠিক হল, অকালপ্রয়াত খেলোয়াড়ের উদ্দেশে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য পরদিন কোর্স বন্ধ থাকবে। তবে প্রতিযোগিতাটা বন্ধ হচ্ছে না। সেটা হবে পরদিন— কারণ সিরিল সেটাই চাইত।

“এই মৃত্যু নিয়ে কি কোনও তদন্ত হবে?” একটু শঙ্কিতভাবেই জানতে চাইলেন ব্যাক্সটার।

“মনে হয় না।” ব্রোগান ভেবেচিন্তে বললেন, “আমি যা বুঝেছি তাতে ওকে কেউ মারেনি। ডেথ সার্টিফিকেটও সেভাবেই লিখেছি।”

“ওর চোখগুলো ও-রকম বিস্ফারিত হয়ে ছিল কেন?”

“হৃদরোগ বড়ো যন্ত্রণাদায়ক জিনিস, মিস্টার সেক্রেটারি।” ব্রোগান মৃদু হেসে বললেন, “এক মুহূর্তের জন্য হলেও বেচারিকে যে পরিমাণ কষ্ট পেতে হয়েছিল তাতে মুখচোখের ওই বিকৃতিটুকু নিতান্তই স্বাভাবিক। তবে অন্য একটা ব্যাপার নিয়ে আপনার মাথা ঘামানো উচিত।”

“কোন ব্যাপার?”

“বন থেকে একটা বিশ্রী, পচা গন্ধ বেরোচ্ছিল। পেয়েছিলেন আপনি?”

ব্যাক্সটার কথা না বলে মাথা নেড়ে বোঝান, তিনি পেয়েছিলেন। গন্ধটা যে সেদিন প্রায় ক্লাব অবধি তাঁদের অনুসরণ করেছিল, সেটা আর তিনি বললেন না।

“আপনি কাল ওই বনের ভেতর দেখুন, কিছু মরে পড়ে আছে কি না। খেলোয়াড়দের জন্য ওটা স্বাস্থ্যকর নয়। আর বোঝেনই তো, যা-ই হোক না কেন, সব ঘুরে-ফিরে সেই আপনার ঘাড়েই চাপবে।”

“আমি দেখছি।” দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ব্যাক্সটার। সতেরো এসে তাঁর এই চমৎকার চাকরিটার যে কী অবস্থা করছে— সেটা নিয়ে তিনি ব্রোগানের কাছে আর হাহাকার করলেন না।

পরদিন নিজের ঘরের জানালা দিয়ে নির্জন গল্‌ফ্‌ কোর্স, দূরের বালিয়াড়ি, আর সেই কালান্তক রক্তবনের দিকে তাকিয়েই পুরো সময়টা কাটালেন ব্যাকস্টার। ক্লাবে তখন এমন কেউ ছিল না যাকে ওই দুর্গন্ধের ব্যাপারে অনুসন্ধান করতে পাঠানো যায়। আবার তাঁর নিজেরও সেখানে যাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই। তাই এতোল-বেতোল ভাবনাই সার হল।

ক্লাব থেকে ফিরে নমো-নমো করে খাওয়া সেরে শুতে গেলেন ব্যাক্সটার। ঘুমিয়েও পড়লেন প্রায় তৎক্ষণাৎ।

“ঢং! ঢং! ঢং!”

ঘুমের মধ্যেও যেন কেঁপে উঠলেন ব্যাক্সটার। গভীর, গম্ভীর সেই ঘণ্টাধ্বনি তিনি চিনতে পেরেছেন। এটা কি স্বপ্ন? নিশ্চয়ই তাই। কারণ এমন বড়ো আর ওজনদার ঘণ্টা এই ক্লাবের ত্রিসীমানায় তো বটেই, ডানকাস্টারেই নেই।

“সিবিল গ্র্যান্টের পুণ্য স্মৃতির উদ্দেশে, যে রক্তবনে দু’বার চিৎকার করার সুযোগ পেয়েছিল।”

কথাটা শেষ হতে-না-হতেই ভেসে এল সেই কদর্য খলখল হাসির শব্দ। ঘর্মাক্ত অবস্থায় প্রায় লাফিয়ে উঠলেন ব্যাক্সটার।

সোমরস আস্বাদনে ব্যাক্সটারের তেমন আগ্রহ কোনওকালেই ছিল না। কিন্তু সেই রাতে কড়া পানীয়ে ভরা একটি গ্লাস প্রায় একচুমুকে খালি করে তবে তাঁর কাঁপুনি থামল। তারপর তিনি ভাবতে বসলেন, সিবিল গ্র্যান্ট নামে কাউকে তিনি চেনেন কি না।

অনেক ভেবেও নিজের চেনাজানা মানুষদের মধ্যে ওই নামের কাউকে খুঁজে পেলেন না তিনি। কিছুটা আশ্বস্ত হলেন ব্যাক্সটার, “বাঁচা গেছে! অন্তত এবার আর আমার কিছু করার নেই।”

পরদিন ব্রেকফাস্টের পর ক্লাবে গিয়ে আগে ওই দুর্গন্ধের ব্যাপারে খোঁজাখুঁজি করার জন্য একজনকে পাঠালেন ব্যাক্সটার। তার কিছুক্ষণ পর ব্রোগানের সঙ্গে তাঁর দেখা হল।

“কী ব্যাপার?” ব্রোগান চিন্তিত মুখে ব্যাক্সটারকে দেখে বললেন, “আপনাকে এমন দেখাচ্ছে কেন? অসুখ-বিসুখ হল নাকি?”

“কাল রাতে ঘুম হয়নি।” ব্যাক্সটার এর বেশি বললেন না, “ভালো কথা, আমি ওই বনে গন্ধের উৎস খোঁজার জন্য একজনকে পাঠিয়েছিলাম। সে ওখানে মড়া বা জ্যান্ত— কিছুই পায়নি। কোনও পচা গন্ধও নাকি ওখানে নেই।”

“তার কপাল ভালো বলতে হবে।” ব্রোগান নাক কুঁচকে বললেন, “ও-রকম ভয়ানক দুর্গন্ধ আমি জীবনেও পাইনি মশাই!”

সেদিন প্রতিযোগিতা শুরু হল সময়মতো। বেচারি সিরিলের মৃত্যু সবার মনের আকাশেই কালো মেঘের মতো জমে রয়েছে। হয়তো সে-জন্যই সব খেলোয়াড়রাই একরকম জোর করেই হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করছিলেন। ধীরে ধীরে বিশাল কোর্সের নানা দিকে ছড়িয়ে পড়লেন তারা।

নিজের ঘরে একা বসে রইলেন শুধু ব্যাক্সটার।

আচমকা উঠে দাঁড়িয়ে তোয়ালেটা লকার থেকে বের করে কাঁধে ফেললেন তিনি, “নাহ্‌! এই ঘরে একা-একা বসে থাকলে আমার মাথাটাই খারাপ হয়ে যাবে। বরং সমুদ্র থেকে স্নান করে আসি।”

ক্লাব-লাগোয়া উঁচু বালিয়াড়ি আর দূরে সমুদ্রের মাঝে ঢালু একটা জায়গা আছে। আগের দিনের ঝড়-বৃষ্টিতে জল জমে সেটা জলাভূমির মতো হয়ে গিয়েছে। ব্যাক্সটার জানতেন, ওখানে পাখি আসে। পাখি দেখার জন্যই ওদিকে গিয়েছিলেন তিনি। হঠাৎ দূরে একতা লাল রঙের ঝলক তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করল।

হাত দিয়ে চোখদুটোকে রোদ থেকে আড়াল করে ব্যাক্সটার বুঝতে পারলেন, সাঁতারের পোশাক-পরা কোনও মেয়ে… না, কোনও মহিলা সমুদ্রস্নানে চলেছেন। উত্তাল ঢেউয়ের মধ্যে মানুষটিকে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখে ব্যাক্সটারের ভালো লাগল। পাশাপাশি, নিজের একাকিত্বের কথা ভেবেও তাঁর বুকের ভেতরটা খচখচ করে উঠল।

“ধুর! এই ডানকাস্টারে পড়ে থেকে থেকে দরকচা মেরে যাওয়া ছাড়া আমার আর কিছুই হবে না।” বিরসবদনে ভাবলেন ব্যাক্সটার। রোদের বুকে আবার মেঘের একটা বড়ো টুকরো ভেসে এল। তামাটে জলের মধ্যে লাল পোশাক-পরা মানুষটিকে খুঁজে পেলেন না তিনি।

সমুদ্রে স্নানের পর ব্যাক্সটারের এমনিতে বেশ তরতাজা লাগে। কিন্তু সেদিন তেমন কিছু হল না। বালি ঠেলে তিনি যখন ক্লাবে ফিরলেন, ততক্ষণে অস্তিত্বের ভার তাঁকে আরও কুঁজো করে দিয়েছে। ক্লাবে ঢুকে নিজের অফিসে যাওয়ার পথে স্মোকিং রুমে ঢুঁ-মারলেন তিনি। শুনলেন সেনলিস বলছেন, “ও মেয়ে শুধু গল্‌ফ্‌-এ নয়, আরও অনেক বিষয়ে বড়ো খেলোয়াড় হে!”

“কার কথা বলছেন?” ব্যাক্সটার কৌতূহলী হলেন।

“সিবিল গ্র্যান্ট।” ব্রোগান হেসে বললেন, “আমাদের কর্নেল সেনলিস বোধহয় সুন্দরী মহিলাদের সম্বন্ধে খুব একটা ভালো ধারণা পোষণ করেন না।”

“এটা ভালো-মন্দের ব্যাপার নয়।” সেনলিস রেগে উঠলেন, “যা জানি তাই বলছি।”

“সিবিল গ্র্যান্ট!” ব্যাক্সটারের মনে হল, কেউ যেন সপাটে থাপ্পড় মেরে তাঁকে জাগিয়ে তুলল, “কে সে? কোথায় সে?”

ব্রোগান আর সেনলিস দু’জনেই অবাক হয়ে ব্যাক্সটারের দিকে তাকালেন। সেনলিস ভ্রূ কুঁচকে বললেন, “সিবিল গ্র্যান্ট এই ক্লাবের এক ট্রাস্টি-র আত্মীয়। বার্টলেটদের কটেজে উঠেছে।”

“এখন সে কোথায়?” উদ্বিগ্নকণ্ঠে জানতে চাইলেন ব্যাক্সটার।

“সিবিল কিছুক্ষণ আগে সমুদ্র-স্নানে গিয়েছিল না?” ব্রোগান ঘড়ি দেখে বললেন, “ও মেয়ে নির্ঘাত বনের মধ্য দিয়ে শর্টকাট করছে। বার্টলেটদের কটেজে তো ওই সতেরো নম্বর গর্তের পাশ দিয়ে গেলেই তাড়াতাড়ি পৌঁছোনো যায়। কিন্তু আপনি…”

ব্রোগানের বাকি কথাটা শোনার জন্য ব্যাক্সটার আর অপেক্ষা করলেন না। রক্তবনের উদ্দেশে পাগলের মতো ছুটতে শুরু করলেন তিনি। ব্রোগান আর সেনলিস মুখ চাওয়াচাওয়ি করে যথাসম্ভব দ্রুতগতিতে ব্যাক্সটারের পিছু নিলেন।

ক্লাব থেকে কয়েক-পা এগোতেই নারীকণ্ঠের এক যন্ত্রণাকাতর আর্তনাদ ভেসে এল বনের দিক থেকে।

ব্যাক্সটার দাঁড়িয়ে পড়লেন। ভয় আর দুঃখের একটা জমাট ঢেউ যেন তাঁকে আর এগোতে দিচ্ছে না। সে-ভাবেই ব্যাক্সটার শুনলেন, ভেসে এল আরও একটা চিৎকার। তারপর সব চুপচাপ।

নিজেকে একরকম ঠেলতে-ঠেলতেই বনের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেলেন ব্যাক্সটার। ততক্ষণে সেখানে আরও কয়েকজন পৌঁছে গিয়েছে। মাটিতে কিছু পড়ে আছে। সে-দিকে আঙুল দেখিয়ে উত্তেজিতভাবে তারা কথা বলছে। ব্যাক্সটার ধীর-পায়ে সেদিকে এগোলেন। লাল আর সাদার অস্পষ্ট তালটা একটু-একটু করে তাঁর চোখে স্পষ্ট হয়ে উঠল।

সাঁতারের পোশাক-পরা মেয়েটির শরীর দুমড়ে-মুচড়ে পড়ে আছে বনের মাটিতে।

ভিড়ের মধ্য থেকে একজন নিজের কোট খুলে মেয়েটিকে ঢেকে দিল। অন্য কেউ ব্যাকস্টারকে বলল ডাক্তার ডেকে আনতে।

টলতে-টলতে পেছন ফিরে ক্লাবের দিকে এগোলেন ব্যাক্সটার। মাঝপথে ব্রোগান আর সেনলিসের সঙ্গে দেখা হল তাঁর। বনের দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে দিলেন ব্যাক্সটার, তারপর ফিরে চললেন নিজের কটেজের দিকে। সেই অসহ্য পচা গন্ধটা তাঁর নাকে লেগে রইল অনেকদূর অবধি।

সিবিল গ্র্যান্টের মৃত্যুটাকে হৃদরোগ বলে চালানোর কোনও উপায় ছিল না। হতভাগিনীর গলাটা প্রায় মুচড়ে দেওয়া হয়েছে। তাই পরের সোমবার করোনারের আদালত বসল। এলাকাটা পুলিশ আর সাংবাদিকে গিজগিজ করছে। ব্যাক্সটারকে কাঠগড়ায় ডাকা হল সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য।

শপথ ইত্যাদির পর বিশালবপু করোনার ব্যাক্সটারের আপাদমস্তক মেপে নিলেন। তারপর সোজা কাজের কথায় এলেন, “আপনি নাকি সেদিন মেয়েটি আর্তনাদ করার আগেই বনের দিকে ছুটেছিলেন। কথাটা সত্যি?”

“আজ্ঞে হ্যাঁ।” বললেন ব্যাক্সটার।

“কেন?”

ব্যাক্সটার নিজেকে সামলাতে পারলেন না। এই ক’দিনের ক্রমাগত দুর্ভাবনা আর অসহায়তা তাঁর ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইল। পাগলের মতো হা-হা করে হেসে উঠলেন তিনি।

“আপনার কি এটা ‘হাস্যকর’ প্রশ্ন বলে মনে হচ্ছে, মিস্টার সেক্রেটারি?” চিবিয়ে-চিবিয়ে বললেন করোনার।

“ক্ষমা করবেন।” হাত দিয়ে চোখের কোণ মুছে বললেন ব্যাক্সটার, “আসলে ব্যাখ্যাটা আপনাদের কাছে একেবারে অবিশ্বাস্য ঠেকবে। এই আদালতে আমার কথাগুলো কেমন বোকা-বোকা শোনাবে— তাই ভেবেই আমি হেসে ফেলেছিলাম।”

“সেটা বিচারের ভার আপনি আমার ওপরেই ছেড়ে দিন।” কড়া গলায় বললেন করোনার।

“আসলে আমি একটা স্বপ্ন দেখেছিলাম, মানে শুনেছিলাম!” বললেন ব্যাক্সটার, “তাতে কেউ সিবিল গ্র্যান্ট-এর পুণ্য স্মৃতি… এইসব বলছিল।”

“অ।” করোনার বললেন, “আপনি এই নিয়ে মহিলাকে কিছু বলেছিলেন?”

“আমি ওঁকে চিনতামই না! ওই স্বপ্নের আগে আমি সিবিল গ্র্যান্টের নাম অবধি শুনিনি। যে মুহূর্তে আমি মহিলার কথা জানতে পারলাম, সেই মুহূর্তেই আমি ওঁকে সাবধান করতে ছুটেছিলাম।”

“সত্যিই অবিশ্বাস্য।” ব্যাক্সটারের সাক্ষ্যের এটুকুই মূল্যায়ন করলেন করোনার। বোঝা যাচ্ছিল, গল্‌ফ্‌ ক্লাবের সেক্রেটারিকে তিনি মন্দ লোক বলে না-ধরলেও মন্দবুদ্ধি বলেই ভেবে নিয়েছেন।

ডানকাস্টার আসার পরেই যে সিবিল একাধিক তরুণের সঙ্গে ভাব জমিয়েছিলেন— এটা অনেকেই বললেন। সেই আলাপ-পরিচয় যে শুধুই তাস বা গল্‌ফ্‌ খেলার উদ্দেশ্য নিয়ে করা হয়নি, এমন কথাও উঠল। কিন্তু সারাদিন ধরে জেরা চালিয়েও এমন কাউকে পাওয়া গেল না যে ওই মুহূর্তে রক্তবনের মধ্যে ছিল।

“অজ্ঞাত আততায়ীর দ্বারা নিহত।”— এই রায়ই দিল আদালত।

ঝিমধরা জায়গাটায় তুমুল আলোড়ন তুলে ন’দিন ধরে তদন্ত চলল। সে-সব মিটতেই ব্যাক্সটার চাকরি থেকে পদত্যাগ করে লন্ডনে চলে গেলেন। অনেক কম মাইনের, রীতিমতো অস্বাচ্ছন্দ্যদায়ক পরিবেশে একটা চাকরি জোটালেন তিনি। কিন্তু ডানকাস্টার ছেড়ে আসার জন্য তাঁর কোনও আপশোস ছিল না।

ব্যাক্সটারের কোনও উত্তরাধিকারীই বেশিদিন টেকেননি। ক্লাবের অন্য পদাধিকারীরাও জায়গাটা ছেড়ে কার্যত পালালেন ক’দিনের মধ্যেই। সতেরো নম্বর গর্ত আর রক্তবন থেকে তৈরি হওয়া হাজারটা সমস্যায় দীর্ণ গল্‌ফ্‌ কোর্স শেষ অবধি পরিত্যক্ত হল।

এই ঘটনার বেশ কিছুদিন পর ব্যাক্সটার তাঁর এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করলেন। জিম মার্কেস নামের সেই বন্ধুটি ইংল্যান্ডের পুরোনো প্রবাদ আর কিংবদন্তি নিয়ে লেখালেখি করতেন। ব্যাক্সটারকে দেখে খুশি হলেন মার্কেস। স্মৃতিচারণ এবং কয়েকগ্লাস সুধাপানের পর ব্যাক্সটার তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার এই বিশাল লাইব্রেরির মধ্যে ডানকাস্টার নিয়ে কিছু আছে?”

“আছে বইকি।” মার্কেস মুচকি হাসলেন, “কাগজে তোমাকে নিয়ে প্রচুর কড়া-কড়া মন্তব্য করা হয়েছিল ঠিকই। কিন্তু সাংবাদিকেরা তো আর এইসব জিনিসের খবর রাখে না। গত শতাব্দীতে সাইমন টাইলার নামের এক ভদ্রলোক ওই তল্লাট ঘুরে এসে বেশ কয়েক খণ্ডের একটি ভ্রমণ-কাহিনি লিখেছিলেন। লেখাটার বেশিরভাগই অবশ্য ভীষণ বিরক্তিকর। নরফোক হয়ে ডানকাস্টার পৌঁছে সাইমন ওখানে ‘স্লিপিং সেন্টিনেল’ নামের একটা সরাইখানায় ছিলেন।”

“ওই সরাইটা এখনও আছে।” ব্যাক্সটার মাথা নেড়ে বললেন, “সাইমন কি ওখানে কিছু দেখেছিলেন?”

“ওখানে থাকার দ্বিতীয় দিন, সন্ধেবেলা, সাইমনের সঙ্গে একটা ঘটনা ঘটেছিল। তার বিশদ বিবরণ দিয়েছেন ভদ্রলোক। সেটা তোমাকে পড়েই শোনাই তাহলে।”

একটা বাঁধানো জার্নাল বের করলেন মার্কেস। তারপর পড়তে শুরু করলেন।

‘দিনটা বেশ ভালোভাবেই কাটল। সমুদ্র, বালিয়াড়ি, একটা জায়গায় জল জমে তৈরি হওয়া একটা পাখ-পাখালির আড্ডা— এ-সব দেখতে বেশ লাগছিল। বিকেলবেলা সরাইখানার মালিককে যখন বললাম, এবার আমি বনের ভেতরটা ঘুরে দেখতে চাই, তখনই হল বিপত্তি। একেবারে কড়া গলায় মালিক বললেন, অন্ধকারে ওই বনের মধ্যে থাকা একেবারেই উচিত নয়। গ্রামের কেউই নাকি সন্ধের পর ও-বনে যায় না।

এটা সত্যি যে তখন দিনের আলো ফুরিয়ে আসছিল। কিন্তু ওইরকম তীব্র আপত্তির কোনও কারণ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। জিজ্ঞেস করলাম, অন্ধকারে বনের মধ্যে চোর-ডাকাতের ভয় আছে কি না। সরাইয়ের মালিক তাতে সায় দিলেও তার মুখ দেখে আমার মনে হল, ব্যাপারটা ঠিক ও-রকম নয়। আমি শারীরিকভাবে দুর্বল নই। একা-একা বিস্তর ঘোরাঘুরি করতে হয় বলে আমি একেবারে নিরস্ত্রও থাকি না। তবু, তখনকার মতো তর্ক না করে আমি বললাম, আমি বনে ঢুকব না। স্রেফ একটু পায়চারি করেই ফিরে আসব।

বেরিয়ে পড়লাম। এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করে আমি যখন বনের কাছে পৌঁছলাম তখন দিনের আলো ফুরিয়ে গেছে। তবু, ঘন গাছের মধ্য দিয়ে একটা সরু পথ নজরে পড়ল। ভাবলাম, এইসব এলাকায় লোকের জীবনে উত্তেজনার উপলক্ষ্য বলে তো বিশেষ কিছুই নেই। নির্ঘাত কল্পনা আর গুজব দিয়ে সেগুলো ভরাট করে তারা। এই বন নিয়েও তেমন কিছু থাকাই স্বাভাবিক। হাতের মজবুত লাঠিটাকে শক্ত করে ধরে আমি বনে ঢুকলাম।

কিছুটা পথ এগিয়েই বুঝতে পারলাম, সরাইয়ের মালিক আমাকে মিথ্যে বলেছে। বনে নাকি সন্ধের পর কেউ যায় না! আমি তো গাছ আর ঝোপের পেছন থেকে ক্রমাগত ফিসফিস শুনতে পাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিল, প্রেমিক-প্রেমিকা থেকে নবদম্পতি— অনেকেই ভিড় জমিয়েছে এই বনে, অন্ধকারের সদ্ব্যবহার করবে বলে! চোখের কোণ দিয়ে ওই অন্ধকারে আমি তাদের চেহারার আভাস পাচ্ছিলাম, কিন্তু দেখতে পাচ্ছিলাম না।

বেশ কিছুটা এগোনোর পর মনে হল, একটু দূরে বন শেষ হয়েছে। অন্ধকার আকাশের পটভূমিতে দেখতে পাচ্ছিলাম, ওখানে মাটিটা উঁচু হয়ে উঠেছে। তার পেছনে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা মাত্র ওক্‌ গাছ। ঠিক করলাম, ওই অবধি গিয়ে ফিরে যাব।

তখনই ওই ঢিপির মতো জায়গায় একটা নড়াচড়া লক্ষ করলাম। তারপরেই পেলাম একটা বীভৎস পচা গন্ধ। মনে হল, একটা অদ্ভুতদর্শন জন্তু এতক্ষণ ওখানে অলসভাবে শুয়ে ছিল। এবার সেটা সোজা হয়ে উঠল। স্তম্ভিত বিস্ময়ে দেখলাম, প্রাণীটার মাথা গাছ ছাপিয়ে গেছে। আর… ওটা আমার দিকে তাকিয়ে একটু-একটু করে নিচু হচ্ছে। মানে, আমার দিকে ঝাঁপানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে!

মুহূর্তের মধ্যে পেছন ফিরে আমি ছুটতে শুরু করলাম।

শুধু পেছনে নয়, আমার মনে হচ্ছিল যেন ওই পথের দু’পাশ বরাবর আমার সঙ্গেই ছুটছে আরও অনেকে। তারা ক্রমেই আমার কাছে এগিয়ে আসছিল। গন্ধটা আরও গাঢ়, আরও ভয়ংকর হয়ে উঠছিল। ঠিক যখন মনে হচ্ছিল যে আমার দম ফুরিয়ে গেছে, আমি আর ছুটতে পারছি না— তখনই দেখলাম, আমি বনের কিনারায় এসে পড়েছি।

প্রাণপণে লাফিয়ে বেরোনোর সময় মনে হল, কে যেন আমার কাঁধটা ছুঁল। গলা ফাটিয়ে আর্তনাদ করলাম আমি। তারপর সব অন্ধকার হয়ে গেল।

যখন জ্ঞান ফিরল তখন দেখলাম, আমি মাটিতে পড়ে আছি। সরাইয়ের মালিক আর আরও কয়েকজন গ্রামবাসী আমাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে নিচু গলায় কী-সব বলাবলি করছে। তারা সবাই মিলে ধরাধরি করে আমাকে সরাইয়ে নিয়ে গেল। পথে, বা সরাইয়ে কেউ একটাও কথা বলেনি। আমিও কাউকে কিছু বলিনি। তবে পরদিনই আমি ডানকাস্টার ছেড়ে প্রায় পালিয়ে বেঁচেছিলাম। ওই পচা গন্ধটা তখনও আমার নাকে লেগে ছিল।’

“সাইমনের বক্তব্য এখানেই শেষ।” জার্নালটা তাকে রেখে বললেন মার্কেস।

ব্যাক্সটার মন্ত্রমুগ্ধের মতো কথাগুলো শুনছিলেন। এবার চটকা ভেঙে বলে উঠলেন, “তারপর?”

“ভদ্রলোক জোর বাঁচা বেঁচে গেছিলেন সে-যাত্রা।” মার্কেস বললেন, “তবে খুব বেশিদিনের জন্য রেহাই পাননি। বাকি সফরটা তো বটেই, জীবনের বাকি বছর দেড়েকের পুরোটাই এই ঘটনাটা ভদ্রলোককে ভুগিয়েছিল। রাতে ভালো ঘুম না হওয়া, দুঃস্বপ্ন, হঠাৎ-হঠাৎ ওই গন্ধ পাওয়া— এমন নানা কথা বহুবার এসেছে ওঁর জার্নালে।”

“কিন্তু কেন?” ব্যাক্সটার কৌতূহলী হলেন, “ঠিক কী আছে ওই ‘রক্তবন’-এ?”

“ড্রুইডদের উপাসনাস্থল।” একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন মার্কেস, “বন, বালিয়াড়ি, সমুদ্র, আর তাদের ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় একটা ওক্‌ গাছ— এইরকম জায়গাতেই ড্রুইডরা বলি দিত। ওগুলো এখনও একেবারে মরণফাঁদ হয়ে রয়েছে। ওখানে গেলে কাউকে না কাউকে রেখে আসতেই হয়— অন্যকে, বা নিজেকে!”

“তার বিনিময়ে কী মেলে— তা আমি জানি।” তিক্ত গলায় বলে উঠলেন ব্যাক্সটার, “স্মৃতি। পুণ্য স্মৃতি!”

_

মূল কাহিনি: দ্য সেভেনটিন্থ হোল অ্যাট ডানকাস্টার

লেখক: হার্বার্ট রাসেল ওয়েকফিল্ড

প্রথম প্রকাশ: ‘দে রিটার্ন অ্যাট ইভনিং’ গল্পগ্রন্থে— ১৯২৮ সালে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *