নিশানা
লিংকনস্ ইন-এর একটা ঘরে, দলিল-দস্তাবেজের মধ্যে একেবারে ডুবে ছিলেন এডওয়ার্ড বেলামি। বাইরে বৃষ্টিভেজা সন্ধেটা চমৎকার হলেও সেদিকে তাকানোর উপায় ছিল না তাঁর। ক্রিমিনাল বারের সবচেয়ে প্রতিভাধর আর পরিশ্রমী তরুণ ব্যারিস্টারের কাছে অলস মায়ায় মজে থাকার মতো সময় থাকে না যে!
টেলিফোনটা ঝনঝন করে উঠল। অন্যমনস্কভাবে সেটা তুলে সাড়া দিয়েই বেলামি চমকে উঠলেন, “ফিলিপ!… কেমন আছ?… কেন?… কোথায়?… পাক্কা!… রাত আটটায় ব্রুকস্-এ দেখা হচ্ছে তাহলে।”
ফোনটা রেখেও বেশ কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইলেন বেলামি।
বনেদি ঘরের সুখী আর শৌখিন সন্তান বলতে যা বোঝায়, তেমনই একজন হলেন ফিলিপ ফ্রান্টন। অন্যদিকে বেলামি উঠে এসেছিলেন গরিব ঘর থেকে, প্রতিভা আর মনের জোর দিয়ে। এমন দু’জনের বন্ধুত্ব হওয়া একটু অস্বাভাবিক। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সময় থেকেই ফিলিপ আর বেলামি’র মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। তারপর যুদ্ধ বাধল। ধাপে-ধাপে ওপরে উঠলেন বেলামি। ফিলিপের ক্ষেত্রে তেমন কিছু হয়নি। বরং বিষাক্ত গ্যাসে ভরা একটা শেল তাঁর একটা ফুসফুসকে অকেজোই করে দিল।
ফিলিপের পরিবারের কিছু সম্পত্তি ছিল আরিজোনাতে। শুকনো আর পরিষ্কার আবহাওয়া নাকি এমন রোগীদের পক্ষে ভালো। তাই পাক্কা সাতটি বছর ফিলিপ ওখানেই ছিলেন। অবশেষে তিনি যে লন্ডনে ফিরেছেন— সে খবর বেলামি পেয়েছিলেন। তবে তাঁর লেখা একটা নেহাত মামুলি চিঠি পড়ে তাঁর মনে হয়েছিল, তাঁদের বন্ধুত্বে অবশেষে পূর্ণচ্ছেদ পড়ে গেল।
তারপর আজকের এই ফোন। তাহলে ফিলিপ তাঁকে ভুলে যাননি!
ঠিক রাত আটটায় ব্রুকস্-এ পৌঁছোলেন বেলামি। মিনিটখানেকের মধ্যেই সেখানে পৌঁছে, বেলামি’র হাত ঝাঁকিয়ে ফিলিপ বললেন, “আমি জানি তুমি কী ভাবছ। এ-ও জানি যে আমার আচরণের সত্যিই কোনও ক্ষমা নেই। তবে তার একটা ব্যাখ্যা আছে।”
“আমার কাছে তোমাকে কোনও ব্যাখ্যা দিতে হবে না, ফিলিপ।” বেলামি বললেন, “আট বছর পর আমাদের দেখা হল। আজকের সন্ধেটা বরং অন্যভাবে কাটাই।”
“বেশ-বেশ।” ফিলিপ একটু সহজ হলেন, “তুমি কি কিছু খাবে? অর্ডার করে দাও তাহলে। আমি খাব না, তবে পান করব।”
বেলামি হালকা গোছের ডিনার অর্ডার করলেন। কিন্তু সেটা আসার আগে, মোটামুটি দশ সেকেন্ডে দু’গ্লাস মার্টিনি ফিলিপ-কে উদরস্থ করতে দেখে তিনি বুঝলেন, ব্যাপার গুরুতর। সন্ধের পর থেকেই যে ফিলিপ লিকুইড ডায়েটে ছিলেন— এটাও তাঁর ধারালো চোখে ধরা পড়ল।
কিছুক্ষণ অসংলগ্ন কথার পর ফিলিপ আর থাকতে পারলেন না। সামনে ঝুঁকে বললেন, “তুমি ছাড়া আর এমন কেউ নেই, যাকে সব কথা বলা যায়। আমি বড্ড বাজে একটা ঝামেলায় পড়েছি। তোমার সাহায্য চাই, এডি।”
“পাবে।” বেলামি সংক্ষেপে বললেন, “যে সমস্যাতেই তুমি পড়ে থাক না কেন, আমার সাহায্য পাবে।”
দিগন্তে একটা নৌকো দেখলে ডুবন্ত মানুষের মুখে যে ভাব ফোটে, প্রায় সেই ভাবই ফুটল ফিলিপের মুখে। গলায় কিছুটা জোর ফিরিয়ে এনে তিনি বললেন, “তাহলে আমার ‘গল্প’টা শোনো। তার আগে একটা কথা বলো। তুমি কি অস্কার ক্লিন্টন বলে কারও নাম শুনেছ?”
কিছুক্ষণ ভাবলেন বেলামি। তারপর সায় দিয়ে বললেন, “শুনেছি। আমার কাছে এমন এক-আধটা কেস আসে যার সঙ্গে নাকি ওই লোকটিই জড়িত। প্রমাণ করার মতো কিছু পাইনি। তবে গোলমেলে চরিত্র— এটা জানি।”
“হ্যাঁ, আমি এই লোকটির কথাই বলছি। তুমি কি জান, ও তিন মাস আমার সঙ্গে ফ্রান্টনে থেকেছিল?”
“তাই নাকি!” বেলামি’র হঠাৎ অস্বস্তি হল, “এমন একজন লোক তোমার সঙ্গে ছিল! কেন?”
“আরিজোনা একটা ভয়ানক জায়গা।” দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ফিলিপ, “ওখানে প্রকৃতি এত উদার আর বিশাল যে নিজেকে পোকামাকড়ের মতো মনে হয়। আকাশ আর দিগন্তের দিকে তাকিয়ে থাকতে-থাকতে আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছিল, এডি। সাত বছর পর আমি যখন লন্ডনে ফিরলাম, তখন মনে হত, যারা ‘আগের’ আমাকে চেনে, তারা ‘এই’ আমাকে দেখে পাগল ভাববে আর হাসাহাসি করবে। তাই আমি তোমাকে ওইরকম যাচ্ছেতাই চিঠিটা লিখেছিলাম।”
বেলামি বুঝতে পারলেন, কী সাংঘাতিক অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল ফিলিপকে। তিনি সংক্ষেপে মাথা নাড়লেন। একটা বড়ো শ্বাস ফেলে কথা চালিয়ে গেলেন ফিলিপ।
“আমি ভেবেছিলাম, এ-ভাবে বেঁচে থেকে কোনও লাভ নেই। মাঝেমধ্যে ফ্রান্টন থেকে আমি লন্ডনে আসতাম শুধু শব্দ আর হইচইয়ের মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে দেওয়ার জন্য। সে-ভাবেই একদিন আমি এসে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরছিলাম। হঠাৎ সোহো-তে একটা ক্লাব আমার নজরে পড়ল। ওটার নাম ‘কোরাজিন’। ওখানে নাকি সদস্য না হলে ঢোকা যায় না। কিন্তু ক্লাবটা চুম্বকের মতো আমাকে টেনে নিল। দারোয়ানকে একরকম ঠেলে, জোর করে আমি ক্লাবে ঢুকলাম। সেখানে একটা বড়ো ঝামেলা হতে পারত। হয়নি, কারণ অস্কার ক্লিন্টন এসে সাদরে আমাকে ওর টেবিলে নিয়ে বসিয়েছিল।
একটা কথা একেবারে সোজাসুজি বলি, এডি। ক্লিন্টনের মতো ব্যক্তিত্ব আমি আজ অবধি আর কারও মধ্যে দেখিনি! সহৃদয় ভাব, রহস্যময়তা, মনের ওঠা-নামা বোঝার ক্ষমতা— এ-সব মিশিয়ে অন্যকে শান্ত করা, আবার চাইলে তাকে পাগল করে দেওয়ার যে ক্ষমতা অস্কারের মধ্যে আমি দেখেছি, তা তুলনাহীন। ‘সম্মোহক’ ব্যক্তিত্ব একেই বলে। আর হ্যাঁ, এ-ও সত্যি যে ওর সঙ্গে কথা বলে আর সময় কাটিয়েই আমি অবসাদ আর একাকিত্বের সেই মারাত্মক কুয়োটা থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলাম। তাই ওর প্রতি কিছুটা কৃতজ্ঞতাবোধ আমার আমৃত্যু থেকে যাবে।
মোদ্দা কথা হল, পরদিন থেকে ক্লিন্টন ফ্রান্টনে আমার সঙ্গে থাকতে শুরু করল।
বেশ কিছুদিন ধরে ক্লিন্টনের বিরুদ্ধে বলার মতো কিছু পাইনি আমি। হ্যাঁ, ও মাঝেমধ্যে আমার কাছ থেকে টাকা ধার নিত বটে, কিন্তু তার পরিমাণ খুবই সামান্য— বড়োজোর কুড়ি পাউন্ড। কিন্তু তারপর…!
একদিন আমার বাটলার আমার কাছে এল। যথোচিত গাম্ভীর্যের সঙ্গে সে জানাল, দু’জন পরিচারিকা ‘মা’ হতে চলেছে। আরও একজন চেঁচামেচি জুড়েছে, যেহেতু তাকেও বশ করার জন্য সবরকম জোর খাটানোর চেষ্টা চলছে। বুঝতেই পারছ, সবকিছুর জন্য দায়ী হিসেবে একজনকেই পাওয়া গেল— ক্লিন্টন! সেদিন আমি একেবারে স্পষ্টভাবে ওকে জিজ্ঞেস করলাম, ওর বিরুদ্ধে আনা এই অভিযোগগুলো সত্যি কি না। ও অস্বীকার করল না, লজ্জাও পেল না। বরং কিছুটা নিঃস্পৃহ স্বরে আমাকে বোঝাল, আমার এই ‘মধ্যযুগীয়’ ধ্যানধারণাগুলো ও জানে। কিন্তু তাতে ওর কিছুই যায়-আসে না। এমন ঘটনা ওর কাছে নতুন নয়। ইতোমধ্যেই সে নাকি চুয়াত্তরটি সন্তানের গর্বিত পিতা হয়েছে!
আমার ওপর তখনও ওর প্রভাব অনেকটাই ছিল। কিন্তু এবার আমি ওর কোনও কথা শুনলাম না। বরং আমাদের আলাপের পর প্রথমবার ঠিক করলাম, অস্কার ক্লিন্টন সম্বন্ধে একটু খোঁজখবর নেব।
পরদিন লন্ডন যাওয়ার সময় আমি চিঠিপত্রের বান্ডিলটা নিয়েই বেরিয়েছিলাম। সেগুলো পড়ার সময় দেখলাম, যে দোকান থেকে আমি জামাকাপড় বানাই, সেখান থেকে একটা বেশ বড়ো অংকের বিল এসেছে। পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যাপারে কিছুটা উদাসীনই হয়ে পড়েছিলাম যুদ্ধের পর থেকেই। বিলটা দেখে অবাক হয়ে ভাবলাম, আমি আবার কবে এমন একটা পোশাক বানাতে দিলাম! খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, ক্লিন্টন আমার সই জাল করে ওখানে একটা কাগজ দিয়েছে, যাতে বলা হয়েছে যে ওর জন্য পোশাক বানানোর সম্পূর্ণ খরচ আমি দেব! তখনই আমার খেয়াল হল, এটা দেখা দরকার যে ক্লিন্টনকে আমি চেক আর অন্যভাবে গত তিন মাসে মোট কত টাকা দিয়েছি। ব্যাংকে গিয়ে পুরোটা জানতে পারলাম।
চারশো কুড়ি পাউন্ড!
এই তিনটে জিনিস আমার সঙ্গে ক্লিন্টনের সম্পর্কটা একেবারে বদলে দিল। তখনও ওর সঙ্গে লড়াই করার ক্ষমতা ছিল না। তবে এটা বুঝতে পারছিলাম যে ওর সঙ্গে আমি আর থাকতে পারব না। সেদিন রাতে ফ্রান্টনে ফিরেই আমি নিজের সিদ্ধান্তটা ওকে জানিয়ে দিলাম। জান এডি, ও একটুও অসন্তুষ্ট হল না। হাসিমুখে, আর একেবারে নির্লজ্জভাবে ক্লিন্টন বলল, ও আমার অবস্থা বুঝতে পারছে। পরদিন সকালে ও আমার কপালে একটা আঙুল ছুঁইয়ে, চোখ বন্ধ করে দুর্বোধ্য কী-সব মন্ত্র উচ্চারণ করে বিদায় নিল। আমার হয়তো আপত্তি করা উচিত ছিল, কিন্তু আমি পারিনি। বরং ক্লিন্টন চলে যাওয়ার পর আমার ভয়ানক খারাপ লেগেছিল।
দু’জন পরিচারিকাকেই আশ্বস্ত করলাম যে তাদের কাজ যাবে না। উপরন্তু, তাদের পিতৃপরিচয়হীন সন্তানদের ভরণপোষণের ব্যবস্থাও আমি করলাম একেবারে উকিল-টুকিল ডেকে!
তারপর সময় কাটতে লাগল একেবারে নিস্তরঙ্গভাবে। আমি হাঁটতাম, বই পড়তাম, বিশ্রাম নিতাম। বহুবার ভেবেছি, তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করব। কিন্তু কেন যেন ঠিক সেই মুহূর্তগুলোতেই ভীষণ অলস লাগত। ইতিমধ্যে দুই পরিচারিকাই পুত্রসন্তানের মা হয়েছিল। তারপর আমার কাছে মেলরোজের চিঠি এল।”
“মেলরোজ।” বেলামি মাথা নাড়লেন, “ও তো প্রাচ্যবিদ্যায় বিশেষজ্ঞ হয়েছে বলেই শুনেছিলাম। অনেকদিন দেখাসাক্ষাৎ হয়নি অবশ্য।”
“ঠিকই শুনেছ।” ফিলিপ সায় দিলেন, “মেলরোজ, আর ওর মতো আরও কিছু শিক্ষিত, ভদ্র মানুষ একটা ডাইনিং ক্লাব চালায়। যুদ্ধের আগে আমিও ওটার সদস্য ছিলাম। নির্দোষ আলোচনা হয় ওতে, সঙ্গে কিছু গভীর তত্ত্ব আর মিস্টিক ভাবনাও থাকে। যাইহোক, মেলরোজের চিঠিতে জানলাম, ক্লিন্টন নাকি সেই ক্লাবে সদস্য হওয়ার জন্য আবেদন করেছে। মুরুব্বি হিসেবে সে আমার নাম উল্লেখ করেছে! মেলরোজ বলেছিল, ক্লিন্টন সম্বন্ধে সে ‘অনেক কিছু’ শুনেছে। আমি কি সত্যিই মনে করি যে সে ওই ক্লাবের সদস্য হওয়ার উপযুক্ত?
এই নিয়ে কোনও সংশয় নেই যে মিস্টিক বা তথাকথিত অলৌকিক ব্যাপার-স্যাপার সম্বন্ধে ক্লিন্টনের চেয়ে বেশি কেউ জানে না। এ-ক্ষেত্রে ওই ক্লাবের সব সদস্যের মোট জ্ঞানও ওর তুলনায় কম হবে হয়তো! কিন্তু ওকে রেকমেন্ড করা আমার পক্ষে একেবারেই অসম্ভব। আমি জবাবি চিঠিতে ঠিক সেটাই লিখলাম। পরদিন আমি ক্লিন্টনের কাছ থেকে একটা চিঠি পেলাম। তাতে ও লিখেছিল, ক্লাবের সেক্রেটারির কাছে ওর নাম রেকমেন্ড না করায় ও খুব দুঃখ পেয়েছে। ওর মনে হয়েছে, আমি ওকে মানুষ হিসেবে খুবই নিকৃষ্ট শ্রেণির মনে করছি… ইত্যাদি-ইত্যাদি।
আমি এবার সত্যি চিন্তায় পড়ে গেলাম, এডি। কেন বল তো? কারণ আমি কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না, কী-ভাবে ক্লিন্টন জানতে পারল যে আমি ওর নাম রেকমেন্ড করিনি। শেষ অবধি মেলরোজকেই জিজ্ঞেস করলাম। ও স্পষ্ট বলল, এই নিয়ে ও কারও সঙ্গে কথা বলেনি। শুধু চুপচাপ ক্লিন্টনের নামটা তালিকা থেকে কেটে দিয়েছে। তাহলে ক্লিন্টন জানল কীভাবে?
এর এক সপ্তাহ পর আমি ক্লিন্টনের কাছ থেকে আর একটা চিঠি পেলাম। তাতে ও লিখেছিল, এক মাসের জন্য ও ইংল্যান্ড ছেড়ে যাচ্ছে। চিঠির সঙ্গে ও একটা কাগজ পাঠিয়েছিল। তাতে ওরিগামি করে, মানে ওই কাঁচি দিয়ে কেটে-কেটে একটা ভারি অদ্ভুতদর্শন ছবি ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। সেটা… অনেকটা এ-রকম দেখতে।”
দ্রুত হাতে পেন দিয়ে টেবিলে রাখা প্যাডে একটা ছবি আঁকলেন ফিলিপ। ছবিটা দেখে বেলামি-র মধ্যে বিকর্ষণ আর আকর্ষণের একটা মিশ্র ভাব তৈরি হল। ওটা কোনও একটা জন্তুর, যে নিচু হয়ে তাড়া করার পোজে আছে। তার পোশাক… বা চামড়ার একাংশ ফুলে উঠেছে তার পেছনে। হাতগুলো বিশাল লম্বা, যার নখগুলো বাঁকানো। গোটা চেহারায় একটা অদ্ভুত লালসামিশ্রিত হিংস্রতা আছে— যা দেখলেই বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। আবার… ছবিটা থেকে চোখও সরানো যায় না।
ফিলিপ ভালো আঁকেন, এটা বেলামি জানতেন। কিন্তু এত অল্প টানে এমন একটা ভাব ফুটিয়ে তোলা চাট্টিখানি কথা নয়। তবে স্রেফ এই একটা ছবির জন্য ফিলিপের এমন দশা হলে সেটা গভীর চিন্তার বিষয়! একটা সিগারেট ধরিয়ে ফিলিপের কথায় আবার মনোনিবেশ করলেন বেলামি।
“ক্লিন্টন লিখেছিল, এই চিহ্নটা নাকি ও আমার জন্যই ভেবেছে। এটা তখনই কপালে ছোঁয়ানো দরকার। সেই সঙ্গে একটা কথা বলা দরকার, যেটা ও চিঠিতে লিখেছিল।”
“কী কথা?” বেলামি জিজ্ঞেস করলেন।
“মনে নেই।” অসহায়ভাবে বললেন ফিলিপ, “যেমন আমার মনে নেই, ঠিক কেন আমি তক্ষুনি ওই কাগজটাকে আমার কপালে ঠেকিয়ে ওই কথাটা বলেছিলাম। বিশ্বাস করো এডি, আমার ও-রকম কিচ্ছু করার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু আমি নিজেকে ঠেকাতে পারিনি। অথচ পরদিন নিজের পকেট, দেরাজ— সম্ভব-অসম্ভব সব জায়গা হাতড়েও আমি কাগজটা আর পাইনি। আর তারপর থেকেই আমি… ভালো নেই।”
“কীরকম?” ফিলিপের ক্লিষ্ট, ক্লান্ত চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করলেন বেলামি।
“সেই রাতে শুতে যাওয়ার আগে আমার হঠাৎ মনে হল, একটা বুককেসের ছায়া কেমন অন্যরকম লাগছে। যেন… ওটার পেছনে কেউ ওত পেতে রয়েছে! আমি কাছে গিয়ে দেখলাম, কিচ্ছু নেই। বুককেসের ছায়াটাও স্বাভাবিক, আয়তাকার দেখাল। লাইব্রেরির আলো নিভিয়ে শুতে যাচ্ছিলাম। মনে হল গ্র্যান্ডফাদার ক্লকের জায়গায় কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। তার ছায়াটাও ওইরকম… যেন ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বড়োসড়ো চেহারার কেউ। ওখানে গিয়েও দেখলাম, তেমন কেউ নেই— স্রেফ ঘড়িটা দাঁড়িয়ে আছে। মনে হল, শ্রান্তি আর ঘুমের ঘোর মিশিয়ে বোধহয় আমাকে ভুল দেখাচ্ছে। শুয়ে পড়লাম। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেল। কী মনে হল, জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। দেখলাম, গাছের ছায়ার মধ্যে থেকেও সেই… আততায়ী যেন ঝাঁপাবার জন্য ঝুঁকে পড়েছে।”
“তারপর?”
“সেই শুরু হল। গত একমাস ধরে চলছে এই জিনিস। ছায়াটা খুব অপ্রত্যাশিত জায়গায় দেখি আমি। আর… ওটা প্রথমদিকে হালকা থাকলেও ক্রমশই ঘন আর বড়ো হয়ে উঠছে।”
বেলামি চুপ করে রইলেন। ফিলিপের মুখে নিঃসীম ক্লান্তি স্পষ্ট হয়ে উঠল। তিনি বললেন, “এডি, আমি বুঝতে পারছি যে তুমি আমাকে পাগল ভাবছ। হতে পারে। আমি হয়তো পাগলই হয়ে গেছি ইতিমধ্যে। পাগল না ভেবে আমাকে মাতাল ভাবলেও তোমাকে দোষ দেওয়া যাবে না। কিন্তু সত্যি কথাটা অন্য। আসলে আমি ওই জিনিসটার নিশানায় রয়েছি! কাল রাতেই আমার শোয়ার ঘরের দরজার পাশে ছায়াটাকে দেখেছি। ও আমার নাগাল পেল বলে।”
উলটোদিকের চেয়ারে বসা ভাঙাচোরা মানুষটাকে দেখে বেলামি-র মধ্যে সেই চাপা রাগটা দানা বাঁধল— যেটা তাঁকে অনেক কঠিনস্য কঠিন কেস লড়তে আর জিততে সাহায্য করেছে। একটা বড়ো শ্বাস নিয়ে বেলামি বললেন, “যাই ঘটুক না কেন, একটা কথা মাথায় রেখো ফিলিপ। তুমি আর একা নও।”
“বাঁচালে!”
“কিন্তু জিনিসটাকে একটু ঠান্ডা মাথায় ভাবা দরকার। ক্লিন্টন তোমাকে একটা কাগজ পাঠাল, যাতে একটা নকশা বা ছবি ছিল। তারপর থেকেই তুমি এই… জিনিসটাকে দেখতে শুরু করলে, তাই তো?”
“হ্যাঁ।”
“ক্লিন্টনের ব্যক্তিত্ব যে সম্মোহক— সেটা তুমি আগেই বলেছ। ও কি সম্মোহন জানে? হিপনোটিজম বা মেসমেরিজম বা ওই জাতীয় কিছু?”
“ক্লিন্টন জানে না এমন জিনিস নেই— বিশেষত সেটা দিয়ে যদি অন্যকে প্রভাবিত করা যায়। ও খুব ভালোভাবেই সম্মোহন জানে। তুমি কি ভাবছ, এগুলো সেইরকম কিছু?”
“হতেই পারে। আর সেটা যদি হয়ে থাকে, তাহলে সেটা সরিয়ে দেওয়াও অসম্ভব নয়।”
“তোমাকে ধন্যবাদ জানানোর ভাষা আমার নেই, এডি।” ফিলিপের বুক থেকে একটা গভীর শ্বাস বেরিয়ে এল, “আমাকে অনেকখানি বলভরসা জোগালে তুমি। কিন্তু আজ রাতে তুমি আমার সঙ্গে থাকতে পারবে?”
“অবশ্যই পারব। কিন্তু তাতে কী হবে?”
“আজ রাতেও, ওই বারোটা নাগাদ যখন আমি ছায়াটাকে দেখব, তখন যদি তুমি সেটাকে দেখতে না পাও তাহলেই প্রমাণ হয়ে যাবে— সবটাই সম্মোহন বা স্নায়ুর চাপে আমার ভুল দেখা। আর… যদি অন্যরকম কিছু হয়, তাহলে তোমাকে অন্তত পাশে পাব।”
“বেশ। তুমি যদি তাই চাও তাহলে সেটাই করব।”
“দারুণ! গাড়িটা রাত সোয়া ন’টা নাগাদ আসবে। আগে তোমার বাড়ি যাব। তুমি রাত কাটানোর মতো কিছু জিনিস নিয়ে নেবে। তারপর বেরোলে আমরা একদম সময়মতো ফ্রান্টন-এ পৌঁছোব।”
হঠাৎ বেলামি সোজা হয়ে উঠলেন। সেই মুহূর্তে ওই ঘরে তাঁদের ধারে-কাছে কেউ ছিল না। তবু তাঁর মনে হল, যেন ঘরের আলোগুলো একটু ম্লান হয়ে আবার জোরালো হল। বেলামি-র মনে হল, একটা প্রকাণ্ড ছায়া যেন ওঁদের দু’জনের ওপর এক মুহূর্তের জন্য পড়ে আবার সরে গেল। কিন্তু আশেপাশে তাকিয়ে এর কোনও কারণ তিনি খুঁজে পেলেন না। তবে একটা অদ্ভুত কথা তাঁর কানে কে যেন ফিসফিস করে বলে উঠল।
‘সে আসে, আবার সে চলেও যায়!’
এই সামান্য কথাটার মধ্যে এমন একটা কুৎসিত ইঙ্গিত ছিল যে বেলামি শিউরে উঠলেন। ফিলিপের ফ্যাকাশে মুখ আর গ্লাস আঁকড়ে ধরা হাতের দিকে তাকিয়ে তিনি বুঝলেন, নিজের ভাবনাগুলো নিজের কাছে রাখাই উচিত হবে। তা-ছাড়া পুরো ব্যাপারটাই হয়তো বিদ্যুৎ-ব্যবস্থার অবদান। সেন্ট জেমস স্ট্রিটেও এমন ওঠানামা হয় বইকি।
ফ্রান্টন অবধি পথটুকু ফিলিপ একটাও কথা বলেননি। মনে হচ্ছিল, বেলামি-র সান্নিধ্যেই মানুষটি অনেকখানি ভরসা পেয়েছেন। তাই তিনি রাস্তাটা ঘুমিয়েই কাটালেন। বেলামি অবশ্য ঘুমোননি। বরং ক্লিন্টনের এই সম্মোহন আর মাথায় নানা ধরনের ভুল ধারণা ভরে দেওয়ার হাত থেকে ফিলিপকে কীভাবে বাঁচানো যায়— সেটাই ভেবে চলছিলেন তিনি।
“ক্লিন্টন লন্ডনে কবে ফিরবে?” বেলামি জিজ্ঞেস করলেন।
“আজকেই বোধহয় ফেরার কথা।” মাথাটা সোজা করে বললেন ফিলিপ, “শ্যাফটসবেরি অ্যাভিনিউ-এ্র পাশে লার্ন স্ট্রিটে কোরাজিন ক্লাব। ওখানেই ও নির্ঘাত আড্ডা বসিয়েছে আজ থেকেই।”
“আমি যে তোমার বন্ধু— এটা কি ও জানে?”
“উহুঁ। মানে জানার তো কোনও কারণই নেই।”
“চমৎকার। লোকটার সঙ্গে আমাকে আলাপ করতে হবে।”
“অ্যাঁ!” চমকে উঠলেন ফিলিপ, “লোকটা কিন্তু অত্যন্ত বিপজ্জনক, এডি। আমার জন্য তোমার কোনও ক্ষতি হলে…!”
“কিচ্ছু হবে না।” বেলামি’র সংক্ষিপ্ত উত্তর শুনে ফিলিপ শুধু সখেদে মাথা নাড়লেন। আর কিছু বললেন না। দশ মিনিটের মধ্যেই গাড়ি ফ্রান্টন-ম্যানরে ঢুকল।
ফ্রান্টন-ম্যানর একটি বিশাল জর্জিয়ান প্রাসাদ। সামনে বাগান, পেছনে ছোটোখাটো একটা বন, দূরে মাঠ— সব মিলিয়ে জায়গাটা একজন নার্ভাস প্রকৃতির একা মানুষের পক্ষে একেবারেই উপযুক্ত নয়। বেলামি ঠিক করেই ফেললেন, পরদিন তিনি ফিলিপকে লন্ডনে কোনও একটা হোটেলে নিয়ে যাবেনই।
রাত তখন সোয়া এগারোটা। ওঁদের দু’জনকে আসতে দেখে একজন প্রৌঢ় বাটলার স্যান্ডউইচ আর অন্য কিছু খাদ্য ও পানীয় নিয়ে এল। বেলামি’র মনে হল, ওঁরা আসায় বাটলারটিও যেন একটু স্বস্তি পেয়েছে। খাওয়ার পর বেলামি ইচ্ছে করেই একটা অন্য প্রসঙ্গ তুললে, যেটা নিয়ে একসময় তাঁর আর ফিলিপের প্রচুর তর্ক হত। তাতে কিছুটা কাজ হল। তবে সবকিছুর মধ্যেও যে ফিলিপের চোখ ঘড়ির দিকে সরে যাচ্ছে, সেটা বেলামি বুঝতে পারলেন।
“চারদিকে আলোর মধ্যেও ওই ছায়াটা আসে।” ঈষৎ কম্পমান গলায় বললেন ফিলিপ, “ঠিক বারোটা বাজলেই!”
“আসুক।” বেলামি ফিলিপকে আশ্বস্ত করতে চাইলেন, “আজকে আমিও আছি। দেখিই না…”
কথাটা শেষ করতে পারলেন না বেলামি। তার আগেই অস্ফুট আর্তনাদের মতো করে ফিলিপ বলে উঠলেন, “ওটা এসে গেছে!”
“কোথায়?” সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক দেখলেন বেলামি। উত্তর না দিয়ে জানালার পাশে এসে নীচে তাকালেন ফিলিপ। ওর পাশে দাঁড়িয়ে বেলামিও দেখলেন…
দেওয়ালের গায়ে তৈরি হয়েছে একটা জমাট ছায়া— যার সঙ্গে ফিলিপের আঁকা ছবিটার আশ্চর্য সাদৃশ্য!
“নীচে চলো।” নিজের ভারী লাঠিটা হাতে তুলে নিয়ে কঠিন গলায় বললেন বেলামি, “দু’জনে মিলেই দেখে আসি, আসলে ওটা ঠিক কী।”
সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলেন ওঁরা দু’জন। সদর দরজা তালাবন্ধ করে বাটলার ততক্ষণে ঘুমোতে চলে গেছিল। ছাদ থেকে মেঝে অবধি লম্বা ফ্রেঞ্চ উইনডো দেখিয়ে ফিলিপ বললেন, “এটা দিয়ে বেরোনো যাবে।”
সায় দিলেন বেলামি। জানালাটা কোনওভাবে এঁটে গিয়েছিল। সেটার হাতলের ওপর ভর দিয়ে গায়ের সবটুকু জোর লাগিয়ে, অনেক কষ্টে সেটা খুলতে পারলেন ফিলিপ। তারপরেই প্রায় একসঙ্গে কয়েকটা ঘটনা ঘটল।
জানালা দিয়ে বাইরে পা রেখে নিজেকে সামলাতে পারলেন না ফিলিপ। কয়েক পা এগিয়ে তিনি দেওয়ালটার একেবারে কাছে গিয়ে পড়লেন।
একটা দমকা হাওয়া হঠাৎই কোথা থেকে উড়ে এসে জানালাটা বন্ধ করে দিল। ঝাঁপিয়ে পড়েও সেটাকে খুলতে পারলেন না বেলামি।
দেওয়াল থেকে কালো আর বিশাল ছায়াটা বেরিয়ে এল! দীর্ঘ আর নখরযুক্ত হাতগুলো দিয়ে সে ফিলিপকে টেনে নিল নিজের কাছে। এক মুহূর্তের জন্য প্রাণপণে ছটফটিয়ে উঠলেন ফিলিপ। তাকে নিজের আলিঙ্গনে পিষে ফেলে মুখ তুলল সেই… জিনিসটা। গাঢ় অন্ধকারের মধ্যে তার রক্তলাল চোখদুটোয় ব্যঙ্গ, ক্রূরতা, আর নিঃসীম ক্ষুধা দেখলেন বেলামি। তাঁর সামনেই মাটিতে পড়ে গেলেন ফিলিপ।
জানালাটা খুলে গেল। লাফিয়ে বেরিয়ে এলেন বেলামি। তবে তখন আর তাঁর কিছু করার ছিল না।
তদন্তে গোলমেলে কিছুই পাওয়া গেল না। ডাক্তার জোর গলায় বললেন, “যুদ্ধের সময়কার ধাক্কা পুরোপুরি সামলে ওঠেননি ফিলিপ। একটা ফুসফুসে বেশি চাপ পড়তে থাকলে হৃদরোগ হওয়া নিতান্তই স্বাভাবিক। এখানেও সেটাই হয়েছে।”
করোনার জিজ্ঞেস করলেন, “তাহলে এই মৃত্যুতে অস্বাভাবিক কিছুই পাননি আপনি?”
“অস্বাভাবিক…!” একটু ইতস্তত করে ডাক্তার বললেন, “আর কিছু না। তবে মৃত্যুর সময় ফিলিপের চোখের মণিগুলোর প্রায় অর্ধেক ওপরদিকে ঢুকে গেছিল। মানে মৃত্যুর পর ওঁর চোখগুলো অনেকটা বেড়ালের মতো হয়ে গেছিল। ব্যস— এটুকুই।”
বেলামিও সাক্ষ্য দিলেন। তবে তাঁকে সে-ভাবে কিছু জিজ্ঞেস করা হয়নি। আদালতে দাঁড়িয়ে তাঁর বিশেষ কিছু বলার ছিলও না।
তবে করার ছিল।
পরদিন বেলামি দুটো কাজ করলেন। আগে তিনি নিশ্চিত হলেন যে অস্কার ক্লিন্টন লন্ডনে ফিরেছে এবং কোরাজিন ক্লাবে জমিয়ে বসেছে। তারপর তিনি ইউনাইটেড ইউনিভার্সিটিজ ক্লাবে লেকচার দিতে আসা মিস্টার সোলানের কাছ থেকে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিলেন।
সোলানের চেহারাতে এমন কিছু বিশেষত্ব নেই। বেঁটে মানুষটির পারিপাট্য আর ছটফটে ব্যক্তিত্ব সম্বন্ধে অনেকেই ওয়াকিবহাল। হয়তো প্রাচ্যবিদ্যা আর দর্শন নিয়ে তাঁর কোনও লেকচারে আপনিও উপস্থিত ছিলেন। তবে সেদিনের সাক্ষাতের কারণটা ছিল অন্য। অলৌকিক এবং অদ্ভুত নানা বিষয়ে এই মানুষটির মতো জ্ঞানী আর কাউকে চিনতেন না বেলামি। একদা একটি জটিল মামলায় তাঁকে সাহায্য করেছিলেন তিনি। ব্যাপারটা ভোলেননি সোলান। তাই অনেকদিন পর দেখা হলেও ভদ্রলোক উঠে দাঁড়িয়ে, প্রায় জড়িয়ে ধরে বেলামি-কে স্বাগত জানালেন। প্রাথমিক কথাবার্তার পাট চুকলে সোলান সকৌতুকে জানতে চাইলেন, “তারপর! উকিল মশাই আজ আমাকে কী নিয়ে জেরা করবেন?”
“আমার দুটো জিজ্ঞাস্য আছে।” বেলামি বললেন, “প্রথম প্রশ্ন, আপনি কি অস্কার ক্লিন্টন বলে কাউকে চেনেন? দ্বিতীয় প্রশ্ন, কাউকে কাগজে একটা বিশেষ নকশা পাঠিয়ে কি তার ক্ষতি করা সম্ভব?”
সোলানের চোখ থেকে হাসির যাবতীয় চিহ্ন মুছে গেল। মাথা নেড়ে, নিজের সরু গলাকে অনেকটা নীচে নামিয়ে ভদ্রলোক বললেন, “দুটো প্রশ্নেরই উত্তর হল ‘হ্যাঁ’। আর অযাচিতভাবে হলেও একটা পরামর্শ দিই। দুটো থেকেই যথাসম্ভব দূরে থাকুন।”
“সেটা আর সম্ভব নয়।” বেলামি’র চোখের সামনে ভেসে উঠল ফিলিপের দুমড়ে যাওয়া চেহারাটা, “কেন নয়— সেটা পরে বলছি। আগে আপনি আমাকে অস্কার ক্লিন্টন সম্বন্ধে বলুন।”
“অস্কার ক্লিন্টন…” সোলানের চোখে আগুন জ্বলে উঠল, “একজন অত্যন্ত প্রতিভাশালী শয়তান। ওর সম্বন্ধে প্রায় কেউই সঠিকভাবে কিছু জানে না— এটাও ওর ‘ক্ষমতার’ প্রকাশ বলতে পারেন। নয়ের দশকের আর পাঁচজন বড়ো ঘরের বেহায়া বজ্জাতের মতো করেই নিজের জীবন কাটাতে শুরু করেছিল ক্লিন্টন। কিন্তু বাকিরা যখন ক্রমেই কাজ, ব্যবসা বা রাজনীতির চক্করে থিতু হচ্ছিল, ও তখন বিশ্বভ্রমণ করছিল— দেখার জন্য নয়, শেখার জন্য। এ-কথা সত্যি যে অলৌকিক বা মিস্টিকাল নানা বিষয়ে ওর মতো এত জ্ঞান খুব কম মানুষেরই আছে। কিন্তু এ-ও সত্যি যে কাউকে নষ্ট করা, পথভ্রষ্ট করা, তিলে-তিলে অন্যের সর্বনাশ করা— এ-সব ব্যাপারেও ও একেবারে অতুলনীয়! সেগুলো নিয়ে ওর কোনও অনুতাপ নেই, বরং রীতিমতো গর্ব আছে। আর একটা ব্যাপার নিয়ে ওর গর্ব আছে। প্রতিহিংসার বশে বা অন্য কারণে আজ অবধি যারাই ওর নিশানায় এসেছে, তাদের একজনও বাঁচেনি।
অস্কার ক্লিন্টন সমাজ ও মনুষ্যত্বের পক্ষে একটি জোঁক। আর ঠিক জোঁকের মতো করেই ওকে পায়ের তলায় পিষে ফেলা উচিত!
এবার বলুন, এই কুগ্রহটি আপনার আকাশে কেন আর কীভাবে উদয় হয়েছে?”
দু’ঘণ্টা পর বেলামি উঠে দাঁড়ালেন। ইউনিভার্সিটির চেয়ারগুলো আরামদায়ক নয়। তাতে ঠায় বসে থাকার ফলে কোমরে সামান্য ব্যথা হলেও বেলামি সে-সব নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছিলেন না। বরং ফিলিপের ওই মর্মান্তিক মৃত্যুর একটা বদলা নেওয়ার রাস্তা তিনি অবশেষে দেখতে পাচ্ছিলেন।
“আপনার যা-যা বইপত্র লাগবে, সব আমি দেব।” সোলানের ঠোঁটের কোণে একটা ক্রূর হাসি ফুটল, “হাতে-কলমে শেখানোর কাজটাও আমি করব। প্রত্যেক বুধবার আর শুক্রবার, বিকেল চারটে থেকে ছ’টা আপনি এখানে আসবেন। এই সময়টা আমি ক্লিন্টনের ওপর নজর রাখব। কিন্তু আমি না বলা অবধি আপনি এর বেশি কিছু করবেন না। আপনার মতো একজন উকিল অকালে বিদায় নিলে সেটা কারও পক্ষে ভালো হবে না।”
বেলামি তাঁর ক্লার্ককে জানিয়ে দিলেন, আগামী তিন মাস তিনি কোনও ব্রিফ নেবেন না। অত্যধিক পরিশ্রমের পর তাঁর এখন বিশ্রাম, আর সম্ভব হলে হাওয়া-বদল প্রয়োজন— এমনটাই জানল সবাই। তারপর শুরু হল তাঁর পড়াশোনা আর অন্য কিছু জিনিসের অভ্যাস। পুরো একটি মাস ওভাবেই কেটে গেল। তারপর এক সন্ধ্যায় সোলান বেলামি-কে আলাদাভাবে ডেকে পাঠালেন।
“আপনি আমার প্রত্যাশা পূর্ণ করেছেন।” শান্ত গলায় বললেন সোলান, “মাত্র এক মাসে আপনি যতটা জেনেছেন আর বুঝেছেন, সেটা অভাবনীয় ছিল। হ্যাঁ, সত্যিই জবরদস্ত হাতিয়ার হয়ে উঠতে পেরেছেন আপনি। কিন্তু এবার আপনাকে জায়গামতো পৌঁছোতে হবে। এই কাজটাই সবচেয়ে কঠিন। পারবেন তো, মিস্টার বেলামি?”
এক মুহূর্তের জন্য বেলামি’র পেটের ভেতরটা ফাঁকা হল। পরক্ষণেই তাঁর চোখের সামনে ফুটে উঠল রক্তলাল ব্যঙ্গাত্মক চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকা সেই অন্ধকার চেহারাটা। কথা না বাড়িয়ে মাথা ঝাঁকালেন তিনি। সোলান উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “ক্লিন্টন আজ রাত ন’টায় কোরাজিনে থাকবে। ও আপনার সম্বন্ধে কিচ্ছু জানে না— এ-ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। আজ রাত থেকেই শুরু করুন আপনি। তবে যাই হোক না কেন, আমি আপনার পাশে আছি এবং থাকব।”
রাত তখন সোয়া ন’টা। কোরাজিন ক্লাবের দারোয়ানকে বেলামি বললেন, তিনি মিস্টার ক্লিন্টনের সঙ্গে দেখা করতে চান। মিনিট-দুয়েকের মধ্যেই বেলামিকে ক্লাবের একটা বিশেষ ঘরে নিয়ে যাওয়া হল। স্থূল আর সূক্ষ্ম রুচির অমন বিচিত্র সমন্বয় বেলামি কোথাও দেখেননি। অবাক হয়ে এদিক-ওদিক তাকানোর সময় পেলেন না তিনি। তার আগেই তাঁকে একটা টেবিলে নিয়ে যাওয়া হল, যেখানে মাত্র একজন বসেছিলেন।
অস্কার ক্লিন্টন-কে প্রথমবার দেখার অনুভূতি বেলামি কোনওদিন ভুলতে পারেননি। মানুষটি উঠে দাঁড়াতেই বোঝা গেল, এর উচ্চতা ছ’ফুট পাঁচ ইঞ্চি বা তার কাছাকাছিই হবে। চওড়া কাঁধ, চ্যাটালো বুক, নির্মেদ পেট, আর এ-সবের ওপর একটা বিশাল মাথা— সব মিলিয়ে যে চেহারাটা দৃশ্যমান হয়, তা সর্বার্থে অদ্বিতীয়। মানুষটির চুল এমনিতে ছোটো করে ছাঁটা হলেও একগাছি চুল তেল মাখিয়ে কপালের ওপর আলোগোছে ফেলে রাখা হয়েছে। সাদা মুখে কয়েকটা ছিটে-ছিটে দাগ। তবে সব ছাপিয়ে গেছে চোখজোড়া। সমাজের সব শ্রেণি থেকে আসা অপরাধীদেরই দেখার অভিজ্ঞতা আছে বেলামি-র। তবু, ও-রকম নিষ্ঠুর আর অন্তর্ভেদী চোখ তিনি আর কখনও দেখেননি। তার মধ্যে একটা চোখ একেবারে ভেজা, তার থেকে জলও গড়াচ্ছে।
বেলামি বুঝলেন, তিনি সত্যিই এক দুর্ধর্ষ দুশমনের সামনে রয়েছেন।
“আসুন স্যার।” ওই বিশাল চেহারায় একেবারেই বেমানান সুরেলা গলায় বলে উঠল ক্লিন্টন, “আপনি কি স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের সঙ্গে যুক্ত?”
“আজ্ঞে না।” কষ্ট করে হলেও মুখে হাসি ফুটিয়ে ক্লিন্টনের উলটোদিকের চেয়ারে বসলেন বেলামি, “আপনার হঠাৎ এ-কথা মনে হল কেন?”
“আসলে পুলিশ বিভাগের অনেকেই আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেন।” দুঃখিত গলায় বলল ক্লিন্টন, “তাঁদের ব্যবহার ভদ্র হলেও আমার সম্বন্ধে তাঁদের ধারণা খুবই খারাপ। কেন যেন মনে হল, আপনি আইন-কানুন নিয়েই কাজ করেন। তাই ও-কথা বলেছিলাম। তা আপনি কি কোনও কাজ নিয়ে এসেছেন?”
“আমি আপনার সঙ্গে দেখা করতেই এসেছি।” শান্তভাবে বললেন বেলামি, “আপনার লেখা বইগুলো পড়ে আমি আপনার ভাবনা, জীবনদর্শন, কার্যকলাপ— এগুলো যথাসম্ভব জানার চেষ্টা করেছি। আমাকে আপনার একজন অনুরাগীই বলতে পারেন। এক বন্ধুর কাছে শুনেছিলাম, আপনি নাকি এই ক্লাবে আসেন। একরকম ঝোঁকের মাথায় আপনার সঙ্গে দেখা করতে চলে এসেছি। এতে যদি আপনার অসুবিধা ঘটিয়ে থাকি, তাহলে মাফ চাইছি।”
ক্লিন্টন বেলামি-র দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। মনে হচ্ছিল, ও যেন ঠিক স্বস্তি পাচ্ছে না। তারপর বলল, “ইন্টারেস্টিং। কে আমার বন্ধু, আর কে শত্রু— সেটা চিনে নেওয়ার কয়েকটা নিজস্ব পদ্ধতি আমি ব্যবহার করি। সেগুলোর একটাও আপনার ওপর খাটেনি! এর অনেক অর্থ হয়। একটা কথা বলুন, আপনি কি কখনও দূর প্রাচ্যে গেছেন? তিব্বত, বা আরও দূরে?”
“আজ্ঞে না।”
“প্রাচ্যবিদ্যার গুপ্তজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনাও করেননি?”
“একেবারেই না। আমি তো বললামই, আমি স্রেফ আপনার ভাবনা আর কাজের অনুরাগী। আপনার শত্রু থাকা স্বাভাবিক। ক্ষমতাধর মানুষদের শত্রু থাকেই। তবে আমি তাদের মধ্যে পড়ি না।”
“হুঁ।” কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ক্লিন্টন বলল, “আমার একটা চোখ থেকে জল পড়ছে— এটা দেখে আপনি একটু অবাক হয়ে গেছেন, তাই না? আজ সন্ধেবেলা আমি একটা বিশেষ মাদকের ইঞ্জেকশন নিয়েছি। তারই ফলে এটা হয়েছে। আমি মাদক নিই, তবে তাদের বশে থাকি না। আচ্ছা, আপনি তো আমার বই পড়েছেন বললেন। কোন বইটা আপনার সবচেয়ে ভালো লেগেছে?”
“কঠিন প্রশ্ন।” বেলামি একটু ভেবে বললেন, “তবে ‘তারসপ্তকের সুন্দরী’ আমাকে একেবারে মোহিত করে দিয়েছিল। বড়ো ভালো ছিল কবিতাগুলো।”
“বইটা ভালো।” ক্লিন্টনের মুখে হাসি ফুটল, “ওটা লেখার সময় আমি এক বেদুইন মেয়ের সঙ্গে থাকতাম। ওদের কয়েকটা আলাদা ক্ষমতা আছে, জানেন তো!”
এরপর ক্লিন্টন যে বর্ণনাগুলো দিল, তাদের মতো অশ্লীল কথা এডওয়ার্ড বেলামি জীবনে শোনেননি! নির্বিকার মুখে সেগুলো হজম করতে বাধ্য হলেন তিনি। ইতিমধ্যে ক্লিন্টন বলছিল, “বরং আমার নিজের পছন্দের বই হল ‘হামাদোনার গান’। তখন এক ফারসি মেয়ে আমার সঙ্গিনী ছিল। দুনিয়ায় এমন কোনও অপকর্ম বোধহয় ছিল না যেটা ও মেয়ে করেনি। আমি ওকে খুব পছন্দ করতাম। অথচ সেই মেয়ে আমার সঙ্গে বেইমানি করল! তারপর বেচারি বেশিদিন বাঁচেনি।”
“হ্যাঁ, ওই বইয়ের গানগুলোও ভারি সুন্দর।” বলে বেলামি বইটা থেকে বেশ কয়েকটা গানকে কবিতার মতো করে আবৃত্তি করলেন।
“আপনার আবৃত্তি সত্যি খুব সুন্দর।” মন দিয়ে শুনে বলল ক্লিন্টন, “আমার সঙ্গে একটা ড্রিংক নেবেন?”
“নিতে পারি, যদি দু’জনের ড্রিংকের দামই আমাকে দেওয়ার সুযোগ দেন আপনি।”
কাঁধ ঝাঁকিয়ে ক্লিন্টন বলল, “আমি ব্র্যান্ডি নেব। আপনি যা খুশি নিন।”
হুইস্কি আর স্নায়ুর চাপের যৌথ আক্রমণ সামলানোর জন্য বেলামি গ্লাস হাতে দেওয়ালের ফ্রেস্কো আর মুরালগুলোর ওপর মনোনিবেশ করলেন। এতক্ষণ যা অদ্ভুত দেখাচ্ছিল, এবার সেগুলোর মধ্যে লুকিয়ে থাকা অশুভের আভাস তাঁর চোখে ধরা দিল।
ক্লিন্টন একদৃষ্টিতে বেলামিকে দেখছিল। এবার সে বলে উঠল, “ভালিন— মানে যে শিল্পী এই ঘরের সব অলংকরণ করেছিল— আমার নির্দেশেই কাজ করেছিল। আমি ওকে বলেছিলাম, ‘ব্ল্যাক মাস’-এর প্রত্যেকটা পর্যায় যেন ও ফুটিয়ে তোলে। মদেই ওকে খেল। যা হতে পারত ভয়ংকর, তা হয়ে গেল হাস্যকর।”
“আমিও তাই ভাবছিলাম।” বেলামি গলা স্থির রেখে বললেন, “ওই বেড়ালটাকে বলি দেওয়ার জায়গাটা অমন বিকটভাবে না দেখিয়ে অনেক সূক্ষ্মভাবে দেখানো যেত।”
বেলামি-কে মেপে নিল ক্লিন্টন। নিজের ভেজা চোখে স্পঞ্জ ছুঁইয়ে ও বলল, “আমি নিজের ভাবনা আর জীবন নিয়ে আপনার সঙ্গে এত খোলাখুলি কেন কথা বলছি জানেন? আপনার প্রতিক্রিয়া লক্ষ করছিলাম আমি। যদি আর পাঁচজনের মতোই আপনি ঘৃণা বা বিরক্তি দেখাতেন, তাহলে বুঝতাম যে আমার বন্ধু হওয়ার যোগ্যতা আপনার নেই। সমাজ, আইন, ভদ্রতা— এ-সব কৃত্রিম জিনিস আমি কোনওকালে মানিনি। এ-সবের ঊর্ধ্বে উঠতে পারলে কী পাওয়া যায়— হয়তো আপনিও তা জানবেন একদিন।”
“নীতি বলে আপনার কি কিছুই নেই?” গলাকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক রেখে জানতে চাইলেন বেলামি।
“একদম নেই। আমি কিছু চাইলে সেটা নিয়ে নিই। কেউ আমার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালে তার ক্ষতি হয়। আমি অকারণে কিচ্ছু করি না। তাই আলাদাভাবে কোনও ‘নীতি’-র সাহায্য নিয়ে কাজের ব্যাখ্যা দেওয়ার কোনও প্রয়োজনই হয় না আমার।”
“আপনি কি প্রতিহিংসাপরায়ণ?”
“আমি নিষ্ঠুরতা ভালোবাসি।” ক্লিন্টনের মুখে একটা কুৎসিত হাসি ফুটে উঠল, “প্রতিশোধ— সেটাও যদি তিলে-তিলে নেওয়া হয়— আমার বড়ো পছন্দের জিনিস, মিস্টার বেলামি। তাই একবার কেউ আমার নিশানায় এলে…! ভালো কথা, আপনি আমার লেখা ‘শয়তানের জবানবন্দি’ পড়েছেন?”
“পড়েছি।” বেলামি বললেন, “অসাধারণ গদ্য। তবে ওই লেখাটার আরও অনেকগুলো স্তর আছে। আমার সামান্য জ্ঞান দিয়ে সেটা উদ্ধার করতে পারিনি।”
“দুঃখ পাবেন না, বন্ধু। ইউরোপে মাত্র একজন মানুষই আছে যে ওই বইয়ের সম্পূর্ণ অর্থ বুঝতে পারে।”
“তাই নাকি!” বেলামি কৌতূহলী হলেন, “কে তিনি?”
ক্লিন্টনের মুখে ক্রোধ আর হিংসা একেবারে নগ্ন হয়ে প্রকাশ পেল। নিজেকে অতি কষ্টে সামলে নিয়ে সে বলল, “লোকটার নাম সোলান। একদিন ওকেও আমি…! যাইহোক, জীবনের কিছু অজানা দিক নিয়ে আমি পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছি— সে তো আমার বই থেকেই আপনি জেনেছেন। তাতে আমি কী জেনেছি, সেটা শুনুন।”
ঘণ্টাখানেক পর ক্লিন্টনের কথা ফুরোল। তারপর সে জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু মিস্টার বেলামি, আপনার পছন্দ-অপছন্দ বুঝলেও আপনি ঠিক কী করেন— সেটাই তো এখনও জানা হল না।”
“আমি একজন ব্যারিস্টার।” ক্লিন্টনের মুখ দেখে বেলামি তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, “কিন্তু তার সঙ্গে আপনার প্রতি আমার অনুরাগের কোনও সম্পর্ক নেই। বিশ্বাস করুন!”
“বিশ্বাস… করতে পারি, যদি বন্ধু হিসেবে আপনি আমাকে দশ পাউন্ড দেন। আমি নোটকেস আনতে ভুলে গেছি। অথচ একজন মহিলা আমার সাহচর্যের আশায় বসে আছেন। … ধন্যবাদ। আশা করি আমাদের আবার দেখা হবে।”
“আমি ভাবছিলাম, একদিন কি আমরা একসঙ্গে ডিনার করতে পারি?”
“আজ মঙ্গলবার।” ক্লিন্টন বলল, “বৃহস্পতিবার ডিনার করাই যায়। কোথায়?”
“গ্রিডিরন রেস্তোরাঁ। রাত আটটা?”
“আমি থাকব।” চোখে স্পঞ্জ বুলিয়ে বলল ক্লিন্টন, “শুভরাত্রি।”
“এইবার বুঝেছি, কেন ফিলিপ ওর ফাঁদে পড়েছিল।” বললেন বেলামি, “লোকটার ব্যক্তিত্ব সত্যিই সম্মোহক। আর ও যাই বলুক না কেন, সে চূড়ান্ত অশ্লীল হোক বা চরম কাব্যিক, তখনকার মতো শুনতে বেশ লাগে।”
“বৃহস্পতিবার কিন্তু আপনার আসল পরীক্ষা।” সোলান বললেন, “সেদিন ও নানাভাবে আপনাকে বাজিয়ে দেখবে। অতি-অভিনয় ও ধরে ফেলবে। তেমন কিছু না করে ওকে বোঝাতে হবে যে আপনি ওর ফাঁদে পড়েছেন। আর তাহলেই…!”
রাত তখন সোয়া দশটা। গ্রিডিরনের একটা আলাদা ঘরে ডিনার সারার পর ক্লিন্টন তৃপ্ত গলায় বলল, “তথাকথিত ‘অশ্লীলতা’ নিয়ে আপনার মধ্যে কোনও শুচিবায়ু নেই— এটা দেখে বেশ ভালো লাগল। আমার লেখা পড়ে যদি এমনটা হয়ে থাকে, তাহলে বলব, অন্তত কিছুটা পথ আপনি পেরিয়েছেন।”
“আপনার লেখার আরও অনেক অর্থ হয়, তা জানি।” বেলামি সহজভাবে বললেন, “তবে তা বোঝা আমার কম্মো নয়।”
“সেগুলো বুঝতে পারলে আপনি আরও অনেক কিছু দেখতে-বুঝতে পারতেন।” সামনে ঝুঁকে বলল ক্লিন্টন, “জানালা দিয়ে বাইরে তাকান। স্থির হয়ে বসে থাকুন, যতক্ষণ না আমি কিছু বলি।”
বেলামি ঘুরে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন। নিস্তব্ধ রাত। শুনশান কিংসওয়ে-তে কাউকে দেখা যাচ্ছিল না। শুধু মাঝেমধ্যে গাড়ির যাওয়া-আসায় উজ্জ্বল আলোর বিন্দু বড়ো হতে-হতে চোখ-ধাঁধানো বৃত্ত হয়ে আবার বিন্দুতেই মিলিয়ে যাচ্ছে। পশ্চিমে মেঘেদের মৃদু গুরুগুরু আর ভাঙা চাঁদের আলোয় তাদের ওঠানামা দেখে মনে হল, বৃষ্টি আসছে। কিন্তু তাদের ওপর একটা পর্দার মতো করে নেমে এল অন্য একটা দৃশ্য।
ধু-ধু বরফে ঢাকা প্রান্তর। দূরে একটা বন। সেখান থেকে ছুটে বেরিয়ে এল একটা লোক। সে প্রাণপণে দৌড়োনোর চেষ্টা করছিল, কিন্তু পারছিল না। তার পেছনেই জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এল জমাট অন্ধকারের মতো একটা কালো চেহারা— যাকে বেলামি খুব ভালো করে চেনেন! লোকটা ছুটতে-ছুটতে পড়ে গেল। উঠে দাঁড়িয়ে সে আবার দৌড়োতে গেল, কিন্তু পারল না। মনে হল, যেন একটা অদৃশ্য দেওয়ালে সে হাত-পা-মাথা ঠুকছে। ইতিমধ্যে ওই কালো চেহারাটা তার খুব কাছে এসে পড়ল। লোকটা ঘুরে দাঁড়িয়ে তার মুখোমুখি হল। এক মুহূর্তের জন্য দুটো চেহারা যেন মিশে গেল। তারপর ধবধবে সাদা বরফের পটভূমিতে পড়ে রইল ভাঙা পুতুলের মতো লোকটার মৃতদেহ।
“কেমন দেখলেন?”
ক্লিন্টনের প্রশ্ন শুনে বর্তমানে, রেস্তোরাঁর একটা আলোজ্বলা ঘরে ফিরে এলেন বেলামি। পানীয়তে চুমুক দিয়ে বললেন, “বেশ… ভয়াবহ।”
“লোকটা আমার ক্ষতি করার চেষ্টা করেছিল।” ক্লিন্টন নির্বিকারভাবে বলল, “নরওয়ের ওই বিজন প্রান্তরে ওর মৃতদেহ পাওয়া যায়। ও কেন ওখানে গেছিল— এটা নিয়ে পুলিশমহলে এখনও বিতর্ক চলছে।”
“কার্য-কারণ সম্পর্কটা নিয়ে কেউ ভাবেনি বোধহয়?” বেলামি হেসে বললেন।
“বোধহয়।” ক্লিন্টন উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “ইতিমধ্যে আমাকে একজন মহিলার সঙ্গে দেখা করতে যেতে হবে। বুঝতেই পারছেন, খালি হাতে যাওয়া তো ভালো দেখায় না। আপনি কি দশ পাউন্ড আমাকে দিতে পারবেন?”
সেই রাতে নিজের বাড়ি ফিরে গরম জল আর কার্বলিক সাবান দিয়ে প্রায় ঘণ্টাখানেক স্নান করলেন বেলামি। তারপরেও তাঁর নিজেকে ঠিক ‘পরিষ্কার’ মনে হচ্ছিল না। একটা নির্দোষ বই হাতে বিছানায় গিয়েও বিচিত্র, বীভৎস নানা দৃশ্য আর সেই কালো ছায়াটা তাঁর মনে আসতেই থাকল— বারবার!
“আপনার অভিনয় বেশ ভালোই হয়েছে।” মৃদু হেসে সোলান বললেন, “একাধিক সূত্র থেকে আমি জেনেছি, বার থেকে ক্লাব— প্রায় সবারই বক্তব্য, ‘বেলামি ক্লিন্টনের খপ্পরে পড়েছে!’ নিঃসন্দেহে ক্লিন্টনও সেটা জেনেছে। আপনার কী মনে হয়, ও আপনাকে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে?”
“এই একমাস আমি নরকভোগ করেছি।” থেমে-থেমে বললেন বেলামি, “কী-কী যে আমি দেখেছি আর শুনেছি— তা বার বা ক্লাবের কেউ বিশ্বাস করবে না। আপনার কথা আলাদা। আপনি সঙ্গে না থাকলে আমি এতদূর এগোতে পারতাম না। ক্লিন্টন আমাকে বিশ্বাস করে কি না, জানি না। ও আমার কাছ থেকে যখনই ‘ধার’ চায়, আমি ওকে টাকা দিই। এতে হবে?”
“হবে।” সোলানের ছাই-ছাই চোখের গভীরে আগুন জ্বলে উঠল, “এতেই হবে। ও আপনার নিশানায় এসে গেছে, বেলামি। এবার ট্রিগার টেপার পালা। যা বলব, অক্ষরে-অক্ষরে সেটা করতে হবে আপনাকে। আপনারা আবার কবে ডিনার সারছেন?”
“আগামী শুক্রবার। তারপর ক্লিন্টন ইউরোপে চলে যাবে।”
“চমৎকার। খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকিয়ে ঠিক এগারোটার সময় আপনাদের একসঙ্গে ক্লিন্টনের ঘরের সামনে পৌঁছোতে হবে। পারবেন?”
“পারব। বেরোনোর পাঁচ মিনিট আগে আমি আপনাকে ফোন করে দেব?”
“তাহলে তো খুবই ভালো হবে। এইবার মন দিয়ে শুনুন!”
“আপনাকে আমার ভালো লেগেছে, মিস্টার বেলামি।” হাসিমুখে গ্লাস খালি করে বলল ক্লিন্টন, “আপনার নিশ্চয় মনে আছে, আমাদের প্রথম আলাপের সময়ই আমার মনে হয়েছিল যে আপনি আমার বন্ধু না শত্রু— সেটা ঠিক বুঝতে পারছি না। একমাস পরেও অবস্থাটা একইরকম থেকে গেছে! আমার মনে হচ্ছে, কিছু একটা শক্তি আপনাকে ঘিরে রয়েছে। আপনি নিজে সেটা টের পাচ্ছেন না, কিন্তু সেটা আছে। এটা থেকে বোঝা যায় যে আপনার মধ্যে আরও এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। তবে আপনার চারপাশের এই… বলয়টা আমাকে পছন্দ করে না। ভারি অদ্ভুত ব্যাপার!”
“আমি এ-সব বুঝতে পারি না।” বেলামি সহজভাবে বোঝালেন, “আপনার মতো একজন প্রতিভাধর যদি আমার সম্বন্ধে এমন কথা ভাবেন, তাহলে গর্ব হয়। কিন্তু আমি আপনার একজন একনিষ্ঠ ভক্ত— এটা নিশ্চয় মানবেন। তারপরেও আপনার মনে হয় যে আমার এই… রক্ষাকবচ বা বলয়টি আপনাকে অপছন্দ করছে?”
“হুঁ।” মাথা নাড়ল ক্লিন্টন, “তবে আপনি যে সময়ে-অসময়ে আমাকে আর্থিকভাবে সাহায্য করেন— এটাও তো ফেলনা নয়। তাছাড়া আপনার ব্যবহার আর মানসিকতাও আমার বেশ ভালো লেগেছে। বরং এক কাজ করা যাক। ডিনারের পর আমার ফ্ল্যাটে চলুন। হুইস্কি সহযোগে কিঞ্চিৎ আড্ডা হবে। আমি একটা এক্সপেরিমেন্ট করব আপনাকে নিয়ে। আপনার মধ্যে যে ক্ষমতা আছে তাতে সেটা ভালোভাবেই করা যাবে বলে মনে হয়।”
“চমৎকার।” বেলামি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “আমি হুইস্কিটার অর্ডার দিয়ে আসি। তারপর আমরা আপনার ফ্ল্যাটে যাব।”
বেলামি উঠলেন। পাশের কাউন্টারে গিয়ে অর্ডার দিলেন। টুক করে সোলানকে ফোনটাও করে দিলেন তিনি। তারপর টেবিলে ফিরে, বিল মিটিয়ে ক্লিন্টনকে নিয়ে বেরোলেন তিনি।
ব্রিটিশ মিউজিয়াম থেকে কিছুটা দূরে একটা বাড়ির দোতলায় ক্লিন্টনের ফ্ল্যাট। বেলামি আগেই জেনেছিলেন, দুটো ঘর, সামান্য কিছু আসবাব, আর কিছু বই ছাড়া ওখানে কিছুই নেই। ওর আসল ডেরা কোরাজিন ক্লাবেই।
রাত তখন ঠিক এগারোটা বাজে। ক্লিন্টন ঘরের দরজায় চাবি ঘুরিয়ে দরজাটা খুলল। ঠিক তখনই নিজের স্টাডির পেছনে একটা ছোট্ট ঘরে ঢুকলেন সোলান। সেই ঘরে একটা সিন্দুক থেকে চামড়া দিয়ে বাঁধানো একটা মোটা বই বের করলেন তিনি। একটা টেবিলে বসে বইটার মধ্য থেকে একটা কুঁচকে যাওয়া ট্রেসিং কাগজের মতো জিনিস বের করলেন তিনি। তার নানা জায়গায়, খুব সাবধানে আর যত্ন নিয়ে কয়েকটা অদ্ভুত চিহ্ন আঁকলেন সোলান। তারই সঙ্গে চলছিল একটা বিজাতীয়, দুর্বোধ্য ভাষায় মন্ত্রোচ্চারণের মতো করে কিছু কথা বলা। সুরেলা ভঙ্গিতে সেই মন্ত্রগুলো উচ্চারণের সঙ্গে-সঙ্গে ঘরের ভেতরে আবহাওয়া বদলে যাচ্ছিল। আলো কমে আসছিল। বাতাস হয়ে উঠছিল ঘন। প্রক্রিয়াটা সম্পূর্ণ হলে সোলান কাগজটার দু’পাশে হাত রেখে বসলেন। একটু-একটু করে তিনি প্রায় অচৈতন্য হয়ে পড়লেন, কিন্তু তাঁর অনড় শরীরটা বসে রইল ওই ঘরেই।
“দু’পাত্তর হয়ে যাক আগে?” জিজ্ঞেস করল ক্লিন্টন।
কথা না বাড়িয়ে বোতলের ছিপি খুলে দু’টো গ্লাসে ঢাললেন বেলামি। জল বা সোডার তোয়াক্কা না করে নিজের গ্লাসটা খালি করে ফেলল ক্লিন্টন। তার মুখে অশ্বস্তি প্রকট হয়ে উঠছিল।
“আমার কোনও শত্রু কিছু একটা করছে আমার বিরুদ্ধে।” ঈষৎ স্থলিত গলায় বলল ক্লিন্টন, “তবে ও-সব করে আমার নাগাল পাওয়া যায় না। যাইহোক, ওই জানালা দিয়ে বাইরে তাকান তো। আমি না বলা অবধি পেছনে ফিরবেন না।”
জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন বেলামি। অন্ধকার রাস্তা, আর তার ওপাশে উল্টোদিকের বাড়ির দেওয়াল ছাড়া কিছুই দেখতে পাচ্ছিলেন না তিনি। কিন্তু তারপরেই একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। মনে হল, যেন দেওয়ালের পর দেওয়াল পড়ে যাচ্ছে তাঁর চোখের সামনে থেকে। অবশেষে বেলামি’র মনে হল, তিনি একটা লম্বা ঘরে এসে পড়েছেন। সেখানে নানা জায়গায় নারী আর পুরুষেরা আধশোয়া ভঙ্গিতে ছিল। হঠাৎ তাদের মধ্যে একজনের পাশে একটা আগুনের শিখা লাফিয়ে উঠল। উঠে দাঁড়াল সে। বোঝা গেল, সে একজন পুরুষ। তার চারধারে একে-একে জ্বলে উঠল আরও একের-পর-এক অগ্নিশিখা। আগুনের একটা বলয়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে পুরুষটি সরাসরি বেলামি’র দিকে তাকাল। পাপ, লালসা, রিরংসা সেই মুখ থেকে চুঁইয়ে-চুঁইয়ে পড়ছিল। কিন্তু সবচেয়ে বেশি করে তার মধ্য থেকে যা বেরিয়ে আসছিল তাকে একটাই শব্দ দিয়ে বোঝানো যায়— ক্ষমতা!
সেই ভয়ংকর উপস্থিতির সামনে থেকে সরে আসতে চাইলেন বেলামি। নিজের অজান্তেই দুটো হাত সামনে তুলে পিছিয়ে এলেন তিনি। তখনই তিনি বুঝতে পারলেন, তিনি ক্লিন্টনের ঘরেই আছেন। সামনে অন্ধকার রাস্তা আর ওপাশের বাড়ির দেওয়াল ছাড়া কিছুই নেই।
“কী বুঝলেন?” ক্লিন্টন জানতে চাইল।
“আমি কাকে দেখলাম?” জানতে চাইলেন বেলামি।
“আমাকেই দেখলেন।” হাসল ক্লিন্টন, “অনেক-অনেক বছর আগের আমাকে। ওটা ছিল আমার তৃতীয় জন্ম। সুমের। যাইহোক, আমাকে আর একটা ড্রিংক বানিয়ে দিন।”
বেলামি উঠে দাঁড়ালেন। তাকের ওপর রাখা বোতল থেকে পানীয় গ্লাসে ঢালছিলেন তিনি। হঠাৎ তাঁর মনে হল, একটু আগের দৃশ্যটা তাঁর মধ্যে যে ভয়ের জন্ম দিয়েছিল তার লেশমাত্রও আর নেই। যেন… একটা অদ্ভুত শক্তির প্রবাহ বয়ে যাচ্ছে তাঁর শিরায়-ধমনীতে! সময় উপস্থিত, বুঝতে পারলেন বেলামি। সেই মুহূর্তে ক্লিন্টন তাঁর পেছনে ছিল। রুমালটা ঠিকমতো পকেটে রাখার ফাঁকে সেখান থেকে একটা ছোট্ট পিল বের করে একটা গ্লাসে ঢেলে দিলেন। ধূমকেতুর মতো বুদ্বুদের একটা ঝড় তুলে তরলের মধ্যে মিলিয়ে গেল সেটা।
“আমাদের বন্ধুত্ব আর সুস্বাস্থ্যের উদ্দেশে।” বলে একটা গ্লাস ক্লিন্টনের দিকে এগিয়ে দিয়ে অন্যটা হাতে তুলে নিলেন বেলামি।
“ধন্যবাদ।” এক চুমুকে গ্লাসটা ফাঁকা করে ক্লিন্টন বলল, “বাপস্! এটা কি একটু বেশি কড়া ছিল?”
“যেমন হয়, তেমনই ছিল।” চেয়ারে গুছিয়ে বসলেন বেলামি, “একটা কথা বলুন। আমার এক বন্ধু’র এইসব… প্রাচ্যবিদ্যায় আগ্রহ আছে। ও বলছিল, কাগজে ছবি এঁকে বা নকশা কেটে নাকি শত্রুদের কাছে পাঠিয়ে তাদের ক্ষতি করা যায়। আপনি এইরকম কিছুর সম্বন্ধে জানেন?”
গ্লাসটা ঠক্ করে টেবিলে রাখল ক্লিন্টন। একদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ বেলামি’র দিকে তাকিয়ে রইল সে। তারপর থেমে-থেমে, সামান্য জড়ানো গলায় বলল, “আপনার এই বন্ধুটির নাম কী?”
“বন্ড।”
চুপ করে রইল ক্লিন্টন। তারপর বলল, “হ্যাঁ, জানি। আমি নিজেও ওই জিনিস ব্যবহার করেছি।”
“তাই নাকি?” বেলামি কৌতূহল ফোটালেন চোখে-মুখে, “কী-ভাবে?”
“দেখতে চান? আচ্ছা বেশ। এখনই দেখাচ্ছি আপনাকে। ওই ড্রয়ারে একটা বিশেষ ধরনের কাগজ আছে। সেটা নিয়ে আসুন। ওই টেবিলে কাঁচি আছে, আর আছে কিছু ক্রেয়ন। ওগুলোও নিয়ে আসুন।”
বেলামি আজ্ঞা পালন করলেন। ক্লিন্টন নিজের কপালে হাত দিয়ে চুপ করে বসে ছিল। সামনে রাখা জিনিসগুলো দেখল সে। তারপর আপনমনেই বলল, “নেশা হচ্ছে কেন? আমার তো নেশা হওয়ার কথা নয়!”
মাথা ঝাঁকিয়ে কাগজের ওপর ঝুঁকে পড়ল ক্লিন্টন। তারপর অত্যন্ত কুশলী হাতে একটা নকশা কেটে নিল কাগজটার মধ্য থেকে। সেটাকে রঙ করে সামনে তুলে ধরতেই চেহারাটা চিনতে পারলেন বেলামি।
“এই মুহূর্তে এটা আর কাগজ নেই, মিস্টার বেলামি।” বলল ক্লিন্টন, “এটা একটা মৃত্যুবাণ। এই জিনিস কাছে না রাখাই ভালো। এটাকে কুচি-কুচি করে ওই হিটারের মধ্যে ঠুসে দিন তো।”
জিনিসটাকে সন্তর্পণে ধরে হিটারের কাছে গেলেন বেলামি। ইতোমধ্যে আর একটা পাতলা কাগজ তিনি বের করে রেখেছিলেন হাতের তেলোর মধ্যে। সেটাকেই কুচি-কুচি করে আগুনে ফেলে দিলেন তিনি। তারপর নিজের চেয়ারে ফিরে এলেন।
ক্লিন্টনের চোখগুলো সামান্য ঘোলাটে দেখাচ্ছে। “আর একটা ড্রিংক বানাব?” জিজ্ঞেস করলেন বেলামি।
“কী?” ক্লিন্টন চেয়ার থেকে কাত হয়ে যাচ্ছিল। এক লাফে ওর কাছে পৌঁছে ওকে সোজা করে বসিয়ে দিলেন বেলামি। সেই সময় এক মুহূর্তের জন্য ক্লিন্টনের কোটের পকেটের ওপর তাঁর হাতটা ঘুরে এল। ওকে সোজা করে বসিয়ে বেলামি বললেন, “আপনি কি আরেকটা ড্রিংক নেবেন?”
“নাহ্!” সোজা হয়ে বড়ো একটা শ্বাস নিল ক্লিন্টন, “কাগজটা পুড়িয়ে দিয়েছেন তো?”
“দিয়েছি।” বেলামি অভয় দেওয়ার ভঙ্গিতে হাত তুলে বললেন, “কিন্তু ওই সামান্য কাগজটায় কী এমন ছিল যা দিয়ে অন্যের ক্ষতি করা যায়?”
“শুধু ওটা দিয়ে হয় না। সঙ্গে একটা কথাও বলতে হয়।”
“কথা! মানে একটা শব্দ?”
“না। ছ’টা শব্দ। কিন্তু আপনি এ-সব জানতে চাইছেন কেন?”
“ভেবে দেখুন।” বেলামি শান্তভাবে বললেন, “এখনও অবধি আপনি আমাকে একটাও বানানো বা ফাঁপা কথা বলেননি। যা বলেছেন, সব হাতে-কলমে দেখিয়েছেন। এখন হঠাৎ আপনি বাচ্চারা যেমন ড্রইং করে তেমন একটা নকশা বানিয়ে এই জিনিস দাবি করলে আমার কৌতূহল হবে না?”
“হলেও আমি সেগুলো বলছি না।” দাঁতে দাঁত চিপে কথাটা বলেই ক্লিন্টন চমকে উঠল। তারপর ঘরের এককোণে তাকিয়ে বলল, “কে? কে ওখানে?”
বেলামি বুঝতে পারলেন, পরিবেশটা বদলে গেছে। তাঁর মনে হল, যেন একটা বিশাল বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে ঘরের মধ্যে। টলমল করে চেয়ার ছেড়ে ওঠার চেষ্টা করছিল ক্লিন্টন, কিন্তু তার আগেই বাঘের মতো তার ওপর লাফিয়ে ক্লিন্টনের কপালে একটা কাগজ চেপে ধরলেন বেলামি।
“বলো ক্লিন্টন! কথাটা বলো!”
এমনিতে ক্লিন্টনের যা শারীরিক শক্তি, তাতে বেলামি-কে ছুড়ে ফেলা তার কাছে কোনও ব্যাপারই ছিল না। কিন্তু সে হাত নাড়তে পারল না। বিকৃত মুখে, নিজের ইচ্ছের সঙ্গে লড়তে-লড়তে জড়ানো গলায় ক্লিন্টন বলে উঠল, “সে আসে, আবার সে চলেও যায়!”
যতদ্রুত সম্ভব সরে এসে ঘরের দরজাটা খুললেন বেলামি। ক্লিন্টনের শরীরটা টলছিল তখন। ওর ঠোঁটের কোণে ফেনার আভাস দেখা যাচ্ছে। সেই অবস্থাতেও ও দরজার দিকে ছুটে আসার চেষ্টা করল। কিন্তু তার আগেই ঘটনাটা ঘটল।
ঘরের আলোগুলো হঠাৎই নিভু-নিভু হয়ে গেল। সেই সঙ্গে বন্ধ ঘরের মধ্যেও জাগল কনকনে হাওয়ার স্রোত। তারপর, ঘরের দেওয়ালে যে কোণের দিকে তাকিয়েছিল ক্লিন্টন, ঠিক সেখানেই দেখা দিল একটা কালো বিন্দু। কাপড়ে ছড়িয়ে যাওয়া কালির দাগের মতো সেটা দ্রুত বড়ো হয়ে উঠল। বড়ো— আরও বড়ো! তারপর দেওয়াল থেকে বেরিয়ে এল জমাট অন্ধকার ওই চেহারাটা, যাকে বেলামি আগেও দেখেছেন। নিজের দীর্ঘ হাতদুটো দিয়ে ক্লিন্টনকে সে কাছে টেনে নিল। অন্ধকারের মধ্য থেকে তার রক্তলাল চোখদুটো এক ঝলকের জন্য বেলামি-কে দেখল। তারপরেই সে মিলিয়ে গেল।
ক্লিন্টনের ভারী শরীরটা মেঝেতে পড়ে গেল।
দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে এলেন বেলামি। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে ধীরে-ধীরে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলেন নীচের রাস্তায়। তাঁর মাথায় তখন একটাই কথা ঘুরছিল।
ক্লিন্টনের প্রতিশোধস্পৃহা আর নিশানা— দুইই অব্যর্থ ছিল। কিন্তু তার বিরুদ্ধেও যে কেউ প্রতিহিংসার বশে হাতিয়ার হয়ে উঠবে, আর তার মাধ্যমে মৃত্যু যে ধেয়ে যাবে সেই নিশানায়— এটা সে ভাবতে পারেনি!
_
মূল কাহিনি: ‘হি কামেথ, অ্যান্ড হি পাসেথ বাই’
লেখক: হার্বার্ট রাসেল ওয়েকফিল্ড
প্রথম প্রকাশ: ‘দে রিটার্ন অ্যাট ইভনিং’ সংকলন (১৯২৮)
