একজন – ঋজু গাঙ্গুলী

একজন

প্রাক্‌কথন

কেমব্রিজের গিল্ডহলের পেছনে কাকা-র একটা পুরোনো বইয়ের দোকান ছিল। ছোটোবেলায় ওটাকে স্বর্গরাজ্য বলে মনে হত। কিন্তু পরে, কাকা’র একমাত্র উত্তরাধিকারী হিসেবে দোকানটার বিলি-বন্দোবস্ত করতে গিয়ে মাথা গেল খারাপ হয়ে। পুরোনো বইয়ের সঠিক মূল্যায়ন কী-ভাবে করতে হয়— সে-সম্বন্ধে আমার কোনও ধারণাই ছিল না। অনেক খোঁজখবর করে উইলটন বলে এক ভদ্রলোককে পেলাম, যিনি এই ব্যাপারগুলো বোঝেন। তাঁর সাহায্য নিয়ে, উকিলদের পরামর্শের ভিত্তিতে বইগুলো বিক্রির ব্যবস্থা হল।

কিছু ডায়েরি, ব্যক্তিগত মেমো-বুক, চ্যাপবুক বিক্রি না করে কাকা-র দোকানের স্মৃতি হিসেবে রেখে দিতে বলেছিলেন উইলটন। বাকি সব থেকে টাকা মন্দ উঠল না। উইলটনের কমিশন আর বাকি খরচাপাতি সামলে যা রইল সেটা কাকা-র স্কুলের লাইব্রেরির জন্য দান করে দিলাম। ওই একটি জায়গা নিয়েই কাকা কিঞ্চিৎ নস্ট্যালজিক ছিলেন।

সব মিটলে উইলটন আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। ক্যাটালগ বানানো থেকে শেষ অবধি বিক্রি সেরে হিসেব মেলানো— এই কাজগুলো আমাদের একসঙ্গেই করতে হল। ভদ্রলোক এমনিতে কম কথা বললেও বেশ রসিক। সেদিন কিন্তু কফি আর কুকি নিয়ে বসার পর উইলটন সোজা কাজের কথায় এলেন।

“আপনার কাকা একটা এস্টেটের নিলামের পর সেখান থেকে অ্যালবার্ট পেইনেল-এর ডায়েরিগুলো কিনেছিলেন। মনে আছে তো?”

“পেইনেল… মানে সেই গাইড-বুক লিখিয়ে, তাই তো?” মনে পড়ল, “হ্যাঁ, ওই ডায়েরিগুলো তো বিক্রি হয়ে গেল। কিংস ট্যুর কিনল। ভদ্রলোক বেশ রিসার্চ-টিসার্চ করে লিখতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেরও আগে রাস্তাঘাট তো এখনকার মতো ছিল না। কিন্তু উনি বোধহয় নিজে জায়গাগুলোতে গিয়ে তবেই লিখতেন, তাই না?”

“হ্যাঁ, পেইনেলের একটা অন্যরকম বিশ্বাসযোগ্যতা ছিল সে-জন্যই।” গম্ভীরভাবে মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন উইলটন, “উনি যা নিজে দেখেছেন বা পড়েছেন— সেটাই লিখতেন। মুশকিল হল, এই ধারণা চোট খেলে ওঁর লেখার কপিরাইট যাঁদের কাছে আছে, তাঁরাও মামলা করে আমাদের জেরবার করে দিতেন।”

“এই সেরেছে!” আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম, “উনি কি বানিয়ে-বানিয়েও লিখতেন নাকি? আপনিই বা সেটা জানলেন কীভাবে?”

“আমি কিচ্ছু জানি না।” উইলটন মুচকি হাসলেন, “তবে পেইনেলের একটা ডায়েরি পড়লে লোকে সেইরকমই ভাবত। সে-জন্যই ওটা আমি বিক্রি করতে দিইনি। আমাদের ইনডেক্সে ওটা #পি-ইএ— মানে ইস্ট অ্যাংলিয়া সিরিজে আছে। পাতলা একটা নোটবই। আপনি ওটা একবার পড়ে দেখুন। তারপর ভাবা যাবে, ওটা নিয়ে কী করা যায়।”

“কোন জায়গার কথা আছে ওই ডায়েরিতে?”

“লোস্টফট থেকে মার্শ্যাম হয়ে পেইনেল আরও দক্ষিণে গেছিলেন। ভূমিক্ষয়ের ফলে সেখানে অনেকটা জায়গা সমুদ্রের তলায় চলে গেছিল। জায়গাটার নাম রাশওল্ড। সেখানে ওঁর যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল, সেটাই লেখা আছে ওতে। আপনি পড়ে দেখুন। চাইলে ওটাও বিক্রি করতে পারেন। তবে একবার উকিলদের সঙ্গে কথা বলে নিলে ভালো হবে।”

আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে উইলটন বিদায় নিলেন। আমি নিজের কাজে গেলাম, কিন্তু সারাদিন ব্যাপারটা আমাকে ভাবাল। ফ্ল্যাটে ফিরে বাক্স খুলে অল্প খুঁজতেই ডায়েরিটা পেলাম। যা পড়লাম, সেটাই ঈষৎ সংক্ষেপিত আকারে লিখে দিচ্ছি।

১৭ তারিখ

‘একজন’! এইরকম অদ্ভুত নাম কোনও সরাইয়ের হয়— এ আমি আজ অবধি দেখিওনি, শুনিওনি। তবে ব্যবস্থাপত্র ভালোই। ফলে কাল রাতে ঘুমটা বেশ জোরদার হয়েছিল। সকালে ব্রেকফাস্ট সেরে জায়গাটা দেখতে বেরিয়ে পড়লাম।

গেজেটিয়ারে রাশওল্ডকে ছোটো শহর বলা হলেও আমার চোখে এটা বিশুদ্ধ গ্রাম বলেই মনে হল। সমুদ্র অনেকটা পিছিয়ে গিয়েছিল বলে পুবে অনেকদূর অবধি যেতে পারলাম। ফেরার পথে জেলে-পট্টি পেরোচ্ছিলাম। তখন দেখলাম, একঝাঁক বাচ্চা স্কিপিং-রোপ নিয়ে খেলছে। ওদের মুখের ছড়াটা বেশ অন্যরকম লাগল—

‘সবাই মিলে ফিরল ঘরে, ফিরল না তো একজন,

জলের তলে ছটফটিয়ে, খিদেয় জ্বলে সেই শমন।

খারাপ সে লোক! তার নজরে, পড়লে জেনো রক্ষে নেই।

সাগর যদি যায় শুকিয়ে, নামলে আঁধার আসবে সে-ই!’

দুপুরের খাওয়া সেরে এখানকার চার্চে গেলাম। সেন্ট বার্থেলামি-এর নামে হলে কী হবে, চার্চটা দেখে মোটেও ভক্তি হল না। রেভারেন্ড ক্লেডন, মানে ওখানকার ভিকার আমাকে যে-ভাবে অভ্যর্থনা জানালেন তাতে মনে হল, বেচারির বোধহয় কথা বলার মতো লোক জোটে না। এটা-সেটা দেখানোর পর ক্লেডন আমাকে বাইরের বাগানে নিয়ে গেলেন। দেখলাম, সেখানে একটা বড়ো স্মৃতিফলক লাগানো রয়েছে।

“একসময় কিন্তু রাশওল্ড এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড়ো বন্দর ছিল।” ক্লেডনের মুখে একটা মলিন হাসি দেখা দিল, “এখন অবশ্য দেখে তা বুঝবেন না। ১৪৩৩ সালে একটা বিশাল ঝড়ের পর এখানকার প্রায় সবটাই সমুদ্র গিলে ফেলে। পুরোনো চার্চ ভেঙেচুরে ওই জলের সঙ্গেই নীচে চলে যায়। যদি আপনি সমুদ্রের নীচে নামেন, তাহলে ওই ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাবেন। অবশ্য এখন ক’দিন কোনও জেলেনৌকো জলে নামবে না।”

“কেন?” আমি কৌতূহলী হলাম, “ঝড়-টর হয় বুঝি?”

“না-না।” ক্লেডন সমুদ্রের দিকে আঙুল তুলে দেখালেন, “জল এখন কতটা কমে গেছে, দেখেছেন? এইরকম হলেই নৌকোগুলো জলে নামতে চায় না। জেলেরা ঘর থেকে বেরোতে অবধি চায় না। ‘জল কম, ধরে যম’— এইরকম একটা প্রবাদ ওদের মুখে শুনেছি। তবে তার অর্থ আমি জানি না।”

বাড়ির পাশ দিয়ে আসার সময় যে ছড়াটা বাচ্চাদের কাছে শুনেছিলাম, সেটার প্রসঙ্গ উঠল। ক্লেডন ফলকটাকে হাত দিয়ে দেখিয়ে বললেন, “ওই ছড়াটা তৈরি হয়েছে সেই ঝড়ে রাশওল্ডের বেশিরভাগ তলিয়ে যাওয়ার পরেই। ব্যাপার হল, পরে যখন নতুন করে চার্চ তৈরি হল, তখন আগের চার্চে যাদের কবর দেওয়া হয়েছিল, তাদের নতুন জায়গায় তুলে আনার কথা উঠল। সেইমতো প্রায় সবাইকেই তুলে আনা হল। বাদ পড়ল শুধু রজার ডে লিল নামের একজন। বিশপ রেকর্ডে পেলেন, সে নাকি ছিল শয়তানের উপাসক। আরও নানা দোষ ছিল তার। তাই ওই একজন, মানে রজার ডে লিল সত্যিই জলের তলে অন্ধকারে বন্দি হয়ে আছে।”

ভিকারের বাড়িতে সান্ধ্য চায়ের আসরে স্থানীয় ডাক্তার গটফ্রেডের সঙ্গে আলাপ হল। কমবয়সী, ঠান্ডা মাথার লোকটিকে বেশ লাগল। কথাপ্রসঙ্গে ক্লেডনকে বললাম, “আমি কি চার্চের কিছু পুরোনো নথিপত্র ঘাঁটতে পারি? গাইড বুকে দেওয়ার মতো মালমশলা না পেলে এখানে আসাই সার হবে।”

পরদিন পুরোনো রেকর্ড দেখার প্রতিশ্রুতি আদায় করলাম। গটফ্রেডের বেশ কিছু মেডিকেল জোক শুনে ‘একজন’-এ ফিরেছি এই কিছুক্ষণ হল। আসার সময় পথঘাটে একটা লোকের দেখাও পেলাম না। কম গ্রাম তো ঘোরা হল না। কিন্তু এইরকম অবস্থা আগে দেখিনি! যাইহোক, এবার ঘুম দেব।

১৮ তারিখ

রাতে চমৎকার ঘুম হয়েছিল। সকালে উঠে জানালায় দাঁড়ানোমাত্র ঝলমলে রোদ আর সমুদ্রের হাওয়া আমাকে সুপ্রভাত জানাল। ব্রেকফাস্ট সেরে চার্চের উদ্দেশে রওনা হলাম। পথে গটফ্রেডের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। জেলে-পট্টির একটি বাচ্চা মেয়ে ভয়ানক অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তাই বেচারিকে একেবারে ভোররাতেই বেরোতে হয়েছিল।

চার্চে পৌঁছোনোর পর ক্লেডন আমাকে চা ও ‘টা’ দিয়ে স্বাগত জানালেন। তারপর আমরা দলিল-দস্তাবেজ নিয়ে পড়লাম। প্রথমেই ১৪৪৩-এর পরের সেই কবর নাড়াচাড়ার ব্যাপারগুলো দেখলাম। তারপর ক্লেডন আরেকটা জিনিস দেখালেন।

“আপনার মনে আছে নিশ্চয়, গতকাল আমরা আরও একটা বিষয় নিয়ে কথা বলেছিলাম।” বললেন ক্লেডন, “জল খুব কমে গেলে বা সমুদ্র অস্বাভাবিক পিছিয়ে গেলে এলাকায় একটা আতঙ্কের আবহ দেখা যায়। ১৭০১ সালে কবর দেওয়ার রেজিস্টারে দেখছি, এক সপ্তাহের মধ্যে তিনটি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল। রেভারেন্ড ব্রেসওয়েল ওয়েবস্টার তখন প্যারিশের দায়িত্বে ছিলেন। উনি সেই নিয়ে নিজের ডায়েরিতে কী লিখে গেছেন, পড়ে দেখুন।”

চামড়া দিয়ে শক্ত করে বাঁধানো জার্নালের পাতাগুলো সাবধানে আলোর কাছে আনলাম। খুদে-খুদে হরফে তাতে লেখা—

‘জলের স্তর এখনও অনেকটা নীচে রয়েছে। আজ সকালে মেরি হডসল ভিকারেজে এসেছিল। সে অভাগিনীও এই মরসুমে নিজের ছেলেকে হারাল। ভোরের আলো ফুটতেই ছেলেটিকে নিজের নৌকোর পাশেই পাওয়া গেছে। এরও অবস্থা ছিল অন্যদের মতোই। এই ভয়াবহ অভিশাপ যে আর কত যুগ ধরে রাশওল্ডে থাকবে— কে জানে! এটা বুঝি যে আমার কর্তব্য হল এইসব কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লোকেদের সতর্ক করা। কিন্তু অন্যদের কী বোঝাব? আমি নিজেই তো এই ক’টা দিন অন্ধকারে ঘরের বাইরে পা রাখিনি!’

“ব্যাপারটা কী বলুন তো?” আমি এবার সত্যিই কৌতূহলী হলাম, “এটা কি কোনও অসুখ? মহামারীর মতো কিছু— যেটা জল কমে গেলে দেখা দেয়? কিন্তু তাহলে এই… কুসংস্কারের কথা আসছে কেন?”

“কী জানি! তবে এক সপ্তাহের মধ্যে তিনটে অস্বাভাবিক মৃত্যু হলে এইরকম ছোটো জায়গায় নানা কথা উঠতে বাধ্য। সবচেয়ে বড়ো ব্যাপার কী জানেন? এমন জিনিস এর পরেও হয়েছে। অন্তত একটা রেকর্ড তো আমাদের লাইব্রেরিতেই আছে।”

“বলেন কী! কোথায় পেলেন সেই রেকর্ড?”

ক্লেডন পরিতৃপ্তির হাসি মুখে ফুটিয়ে একটা পাতলা বই হাতে তুলে নিলেন। তারপর বললেন, “এককালে পত্রসাহিত্য বলে একটা বিশেষ ধারা খুব জনপ্রিয় হয়েছিল, জানেন তো! সেই ধারাতেই একটা বই লেখা হয়েছিল। নামখানা বিশাল— ‘সাফোক-নিবাসী মিসেস হেনরি আউট্রাম আর তাঁর বন্ধু লেটিশিয়া-র পত্রমিতালি’। ১৮৭০ সালে ছাপা সেই বইয়ের এক কপি আছে লাইব্রেরিতে। তাতে ১৮৫৮ সালের এই চিঠিটা একবার পড়ে দেখুন।”

‘প্রিয় লেটিশিয়া…’ দিয়ে শুরু হয়েছে চিঠিটা। রডোডেনড্রন, চাকরদের অভব্যতা, মাংসের দাম… এইরকম হাবিজাবি পেরিয়ে আমি সেই অংশটা পেলাম, যেটার কথা ক্লেডন বলছিলেন।

‘ক’দিন ধরে প্যারিশের আবহ ঠিক আগের মতো নেই, জান! আমাদের এখানে এক জেলে-র ছেলে জ্যাকি গাবিন্স-এর মৃত্যুর পর থেকেই কেমন একটা ভয় আর রাগের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। গত সপ্তাহে একদম ভোরবেলা, ওদের ছোট্ট বাড়ির লাগোয়া বাগানের বাইরে ওর মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল। ডাক্তার দেখে বলেছিলেন যে তারও ঘণ্টাতিনেক আগেই নাকি সব শেষ হয়ে গেছে। ওর চেহারাটা একেবারে শুকনো আর হাড্ডিসার দেখাচ্ছিল। আমি আর হেনরি একবার ভেবেছিলাম, হয়তো বেচারি অনাহারে বা অসুখে কষ্ট পাচ্ছিল। কিন্তু গাবিন্সরা বেশ সম্পন্ন। ওদের বাড়ির পরিবেশও বেশ ছিমছাম, শান্ত। আমি মিসেস গাবিন্সের সঙ্গে দেখা করলাম। মহিলা কাঁদতে-কাঁদতে বললেন, গত ক’দিন ধরেই নাকি জ্যাকি খুব অস্থির হয়ে ছিল। বারবার একটা খারাপ লোকের কথা বলছিল। কিন্তু কেন সে বিছানা ছেড়ে বাইরে গিয়েছিল, আর ঠিক কী-ভাবে ও এমন শুকিয়ে গেল— এগুলো আমি বুঝিনি।

অন্যদের কাছে শুনেছি যে সমুদ্রের জল খুব কমে গেলেই নাকি মৃত্যু এইভাবে হানা দেয় এখানে। এটা কুসংস্কার ছাড়া অন্য কিছু বলে ভাবতে পারছি না। তবে জল নেমে গেলে নীচের পচা জিনিস থেকে উঠে আসা বাষ্পে কিছু হয়ে থাকলে আলাদা কথা।

থাক। তুমি এই চিঠি নিশ্চয় খাবার টেবিলে বসে পড়ছ। সেখানে আর এ-সব আলোচনা করে লাভ নেই। আগামী সপ্তাহে চার্চের তরফে একটা মেলা আয়োজন করার কথা ভাবছি। তাতে কী-কী করা যায় বল তো? আমি ভাবছি…’

চিঠির বাকিটার সঙ্গে আমাদের আলোচনার কোনও সম্পর্ক ছিল না। ক্লেডন গম্ভীর মুখে বললেন, “দেখেছেন তো! আমার আশঙ্কা হচ্ছে, এবারেও যদি এইরকম কিছু হয় তাহলে আমার প্যারিশের অর্ধেক লোক চার্চে আসা ছেড়ে দিয়ে নিজেদের মতো মন্ত্রতন্ত্রের শরণ নেবে। আশা করি, তেমন কিছু হবে না।”

সায় দিলাম। হঠাৎ মনে পড়ল, গটফ্রেড একটি শিশুর অসুস্থতার কথা বলছিলেন না? তবে এই নিয়ে ক্লেডনকে কিছু বললাম না। ভদ্রলোক লাঞ্চ খাওয়ানোর জন্য ঝুলোঝুলি করছিলেন। পরদিন সন্ধেবেলা একহাত দাবা হবে— এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে তবেই ছাড় পাওয়া গেল।

বাকি দিনটা নদীর ধার ধরে হাঁটাহাঁটি করতেই গেল। যখন রাশওল্ডে ফিরছি, তখন সূর্য ডুবছে। হঠাৎ দেখলাম, জেলে-পট্টির একটা বাড়ির সামনে বেশ ভিড়। সেখানে রুক্ষ চেহারার বেশ ক’জন পুরুষ একটি মহিলার সঙ্গে কথা বলছে। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে জানলাম, যারা দাঁড়িয়ে আছে তারা সবাই স্থানীয় জেলে। আর ওই বাড়ির বাচ্চা মেয়েটিই অসুস্থ হয়েছে। শুনলাম, মেয়েটির অবস্থার অবনতি হয়েছে। মন খারাপ হয়ে গেল।

ক্লান্ত দেহে এই ডায়েরি লিখছি। বাইরে অন্ধকার নেমেছে। খেয়াল করেছি, রাস্তা ইতোমধ্যেই জনশূন্য হয়ে পড়েছে। ভারি অদ্ভুত লাগছে ব্যাপারটা! অস্বস্তিও হচ্ছে। মেয়েটার কী হয়েছে? তার সঙ্গে কি এই জল কমে যাওয়ার সত্যিই কোনও সম্পর্ক আছে?

লেখা বন্ধ করি এবার।

১৯ তারিখ

আবহাওয়া বদলে গেছে একরাত্তিরেই! সকাল থেকে আকাশে মেঘ জমেছিল। গুমগুম আওয়াজ আর হাওয়াতে বোঝা যাচ্ছিল, বৃষ্টি আসছে। দুপুরের পর থেকেই শুরু হল তুমুল বৃষ্টি। বাধ্য হয়ে আজকের দিনটা ‘একজন’-এর এই ঘরেই কাটাতে হল।

নীচের বারে বেশ কিছু জেলে বসে পানাহার করছিল। তাদের মধ্যে কয়েকজন কাল বিকেলে ওই জমায়েতেও ছিল বলে মুখ-চেনা হয়ে গিয়েছে। কথা শুনে বুঝলাম, এরা কেউ গত ক’দিন ধরে সমুদ্রে মাছ ধরতে যায়নি। পরিবেশ একেবারে গুমোট হয়ে রয়েছে। ওরাই বলল, মেয়েটার শরীর আরও খারাপ হয়েছে। সবচেয়ে মারাত্মক ব্যাপার হল, ওই দুর্বল শরীরেও মেয়েটা নাকি ঘুমের মধ্যে হাঁটতে শুরু করেছে! ওকে সেদিন ভোরবেলা বাড়ির দরজায় পাওয়া গেছে। ঠকঠক করে কাঁপছিল বেচারি। কাউকে চিনতে অবধি পারছিল না।

ব্যাপারটা আমাকে জোর ধাক্কা দিল। সেদিন সন্ধেবেলা ভিকারেজে দাবা খেলার ফাঁকে ক্লেডনকে সুজি হডসল— মানে অসুস্থ হয়ে পড়া বাচ্চা মেয়েটির অসুস্থতার কথা জানালাম। বললাম, “কাল আমরা যার কথা পড়লাম, সেই জ্যাকি গাবিন্স নামের ছেলেটির সঙ্গে সুজি-র এই অসুস্থতার সাদৃশ্যটা লক্ষ করেছেন?”

ক্লেডন যে বেশ অস্বস্তিতে পড়ে গেছেন, এটা বুঝতে পারছিলাম। তবে একরকম জোর করেই ভদ্রলোক হেসে বললেন, “আরে না-না! এ আর কী এমন সাদৃশ্য? তাছাড়া সাদৃশ্য থাকলেই বা কী করব? ধরুন, ডক্টর গটফ্রেডকে গিয়ে বললাম, ষাট বছর আগের একটা কেসের সঙ্গে সুজি’র অসুখের মিল আছে। উনি সেটা শুনে কী করবেন?”

“উনি আগে ভিজে চুপ্পুস রেইনকোট আর কোট খুলে শুকোতে দেবেন।”

গটফ্রেড যে আমাদের কথার অন্তত কিছুটা শুনেছেন সেটা বোঝা গেল। কথা-অনুযায়ী কাজ সেরে, ক্লান্ত শরীরটাকে ফায়ারপ্লেসের সবচেয়ে কাছের চেয়ার অবধই টেনে এনে ধপাস্‌ করে বসে পড়লেন ভদ্রলোক। তারপর বললেন, “হ্যাঁ, এবার বলুন। সুজি হডসলের ব্যাপারে এখন আপনারা কেন, আমি এখানে যে ছোকরা বুট-পলিশ করে, তার থেকেও উপদেশ নিতে পারি। সারাদিন ধরে আমি মেয়েটাকে পর্যবেক্ষণ করেছি। কোনও রোগ নেই। অথচ শরীরে রক্ত প্রায় নেই বললেই চলে! কী-ভাবে ওর এই অবস্থা হল— সেটা আমি বুঝতে পারছি না কিছুতেই। ওই পরিবারের লোকেরা বুঝতে পারছে যে আমি চেষ্টা করছি। কিন্তু কিছুক্ষণ আগে মেয়েটির ঠাকুরদা… কী যেন নাম?”

“জেথরো হডসল?” ক্লেডন বললেন।

“হ্যাঁ! জেথরো আমাকে বলল, ‘আপনি অনেক করেছেন ডাক্তার। এবার যান।’ জানি, হয়তো উনি ভালো মনেই কথাটা বলেছিলেন। তবু, আমার কেমন লাগে, বলুন? কাল সকালের মধ্যে অবস্থার উন্নতি না হলে আমি ডক্টর মিডের সঙ্গে যোগাযোগ করে সাউথওল্ডের স্যানাটোরিয়াম-এ সুজি’র ভর্তির ব্যবস্থা করাব। কিন্তু তার আগে আপনারা বলুন, আমার চিকিৎসায় কি কিছু ভুল আছে? বলুন!”

একরকম বাধ্য হয়ে ক্লেডন আর আমার মধ্যে হওয়া কথাবার্তা, আর যা পড়েছি তার নির্যাস পেশ করলাম। ভেবেছিলাম, গটফ্রেড হয়তো অট্টহাসিতে ফেটে পড়বেন। নয়তো ধর্ম আর কুসংস্কারের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে কিছু তেতো কথা বলবেন। উনি সে-সব কিচ্ছু করলেন না। স্তব্ধ হয়ে ফায়ারপ্লেসের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন গটফ্রেড। তারপর উনি যখন মুখ খুললেন, তখন মনে হল যেন ওঁর গলার আওয়াজটা অনেক দূর থেকে আসছে।

“এগুলোও এক ধরনের এভিডেন্স!” গটফ্রেড আমাদের বলছিলেন, নাকি নিজেকে, তা বুঝতে পারছিলাম না। সে-ভাবেই উনি বলে চললেন, “লক্ষণগুলো তো একইরকম। মেয়েটা যে মরণাপন্ন— এ-বিষয়েও আমি নিশ্চিত। কিন্তু…”

“ঠিক তাই!” জোর গলায় বলে উঠলেন ক্লেডন, “সাফোকের এই অজ-পাড়াগাঁয়ে অনেক কথাই রটতে পারে। তার কিছু সত্যি হতেই পারে। কিন্তু কী করলে মেয়েটা সেরে উঠবে? মিসেস আউট্রাম যা বলেছিলেন, সেটাই কি তাহলে আমাদের মানতে হবে? জলের তলা থেকে বেরিয়ে আসা কোনও দূষিত বাতাসই কি এই অসুস্থতার জন্য দায়ী? সে-ক্ষেত্রে মেয়েটিকে এখান থেকে দূরে নিয়ে যাওয়াই ভালো।”

গটফ্রেড অন্যমনস্কভাবে সায় দিলেন। আমরা চুপচাপ বসে রইলাম কিছুক্ষণ। ক্লেডন খাদ্য ও পানীয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু সেটা আমরা কেউই ঠিক উপভোগ করতে পারলাম না।

যখন বেরোলাম, তখন বাইরে ঘন অন্ধকার। বৃষ্টি থেমে গেলেও হঠাৎ হাওয়ার দমক আমাদের একেবারে ঝাঁঝিয়ে দিয়ে যাচ্ছিল। গটফ্রেড আমার সঙ্গেই চুপচাপ হাঁটছিলেন। আমিই বললাম, “রেভারেন্ড ক্লেডনের কথাটা কি আপনি মেনে নিচ্ছেন? সুজি’র অসুস্থতার সঙ্গে কি এই… কুসংস্কারের কোনও সম্পর্ক সত্যিই নেই?”

“ভিকারের কথায় যুক্তি আছে, মিস্টার পেইনেল।” দুঃখিত গলায় বললেন গটফ্রেড, “কিন্তু উনি তো আমার মতো করে দিন-রাত এক করে মেয়েটার পাশে বসে লড়ে যাননি। বিশ্বাস করুন, মেয়েটার কোনও অসুখ নেই। অথচ আমার চোখের সামনে বেচারি একটু-একটু করে মৃত্যুর দিকে ঢলে পড়ছে! জ্বরের ঘোরে হাত-পা নেড়ে সে বেচারি কেঁদে উঠছে, ‘সরিয়ে দাও! লোকটাকে সরিয়ে দাও! ও খুব খারাপ।’ সবটাই কি স্বপ্ন আর কাকতালীয় ব্যাপার? এ-জিনিস আমি কিছুতেই মানতে পারছি না।”

“বুঝতে পারছি।” আমি সহানুভূতির সঙ্গেই বললাম। তারপর হঠাৎ একটা কথা মনে হল। গটফ্রেডকে জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা, আপনি তখন ফায়ারপ্লেসের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘লক্ষণগুলো তো একইরকম।’ এটা কি আপনার কোনও পুরোনো কেসের সঙ্গে মিলছে?”

“আমার নয়।” নিচু গলায় বললেন গটফ্রেড, “এডিনবরা-য় আমাদের এক প্রফেসর ছিলেন, যিনি মেডিকেল মিশনের অংশ হয়ে দীর্ঘদিন ভারতে কাটিয়েছিলেন। উনি আমাদের একটা ঘটনা বলেছিলেন। একবার একটি পাহাড়ি জায়গায় উনি হাসপাতালের কাজে গেছিলেন। সেখানে তখন ক’দিন ধরে এক ভারি অদ্ভুত রোগ দেখা দিয়েছিল। সুস্থ মানুষ, বিশেষ করে ছোটোরা, রাতারাতি শুকিয়ে যেত, তারপর মারা পড়ত! হাসপাতালের ডাক্তাররা, এমনকি স্থানীয় হাতুড়েরাও কিছু বুঝতে পারছিল না। তখন এক সন্ধেবেলা হাসপাতাল থেকে ফেরার পথে প্রফেসর দেখেন, তাঁর খানসামা এক সাধু’র সঙ্গে কথা বলছে। উনি এই সাধু বা তথাকথিত গুরু-টুরুদের দু’চোখে দেখতে পারতেন না। খানসামাকে উনি সেই রাতেই ডেকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘ঠগটা তোমাকে কী বলছিল?’

খানসামা কিন্তু-কিন্তু করে বলেছিল, ‘সাধু বলেছেন, এটা সাধারণ অসুখ বা ব্যাধি নয়। এক দুষ্ট প্রেত এক ব্যক্তির মৃতদেহকে আশ্রয় করে এইসব করছে। সেই মৃতদেহটি পুড়িয়ে দিতে পারলে প্রেতের উপদ্রব বন্ধ হবে।’

প্রফেসর এতে একেবারে তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠেন। কবর থেকে কারও মৃতদেহ খুঁড়ে বের করে সেটাকে পোড়াতে গেলে এলাকায় দাঙ্গা বেধে যাবে। উনি খানসামাকে শাসিয়ে দেন, ভবিষ্যতে ওই সাধুকে এলাকার চৌহদ্দিতে দেখা গেলে তিনি তাকে পুলিশে দেবেন।”

“তারপর?”

কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন গটফ্রেড। তারপর, যেন কিছুটা অনিচ্ছাভরে বললেন, “কিছুদিন পর দেখা গেল, একটা বিশেষ কবর কে বা কারা রাতের অন্ধকারে খুঁড়ে দেহটা বের করেছে। সেটা কোথায় পোড়ানো হয়েছিল, কারা পুড়িয়েছিল— সে-সব প্রফেসর জানতে পারেননি। তবে তিনি নিজে রেকর্ড করেছিলেন, সবক’টি অসুস্থ শিশু তারপর সেরে উঠেছিল। নতুন করে আর কেউ অসুস্থও হয়নি!”

“তার মানে?” উত্তেজনায় আমি গটফ্রেডের হাত চেপে ধরলাম, “আপনি কী বলতে চাইছেন, ডক্টর?”

“আমি?” ঘুম ভেঙে ওঠার মতো করে বলে উঠলেন গটফ্রেড, “গপ্পো! গপ্পো বলছিলাম আমি আপনাকে। আমাকে বলেছিল এক বুড়ো। বোঝেনই তো, ডাক্তারদেরও তো গল্প বলতে আর শুনতে হয়। যা-ই হোক, আমরা তো হাঁটতে-হাঁটতে ‘একজন’ ছাড়িয়ে প্রায় হডসল-দের বাড়ির কাছে এসে পড়েছি। আপনি ফিরে যান। আমিও এগোই।”

সমুদ্রের তীর ধরে হেঁটে ‘একজন’-এ পৌঁছোলাম। এখন জানালার পাশে বসে এই ডায়েরি লিখছি। বৃষ্টি থেমে গেলেও বাইরে অন্ধকার আকাশ চিরে মাঝেমধ্যে বিদ্যুৎ ঝলসাচ্ছে। মনে হচ্ছে, প্রকৃতিও যেন দম বন্ধ করে কিছু একটার জন্য অপেক্ষা করছে।

কী ঘটছে এই ঝিম-ধরা রাশওল্ড-এ?

২০ তারিখ

সকালে ব্রেকফাস্ট করার জন্য নীচে গিয়ে গটফ্রেডকেও পেয়ে গেলাম। ভদ্রলোক একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছেন। কী ব্যাপার জিজ্ঞেস করলাম।

“সুজি!” ক্লান্ত গলায় বললেন গটফ্রেড, “কাল শোয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই হডসল-রা আমাকে ডাকতে এল। সুজি বিছানা ছেড়ে নামতে গিয়ে পড়ে গেছিল। আমি গিয়ে দেখি, অবস্থা একেবারে শেষের কাছাকাছি। সারা রাত যমে-মানুষে টানাটানি করে মেয়েটাকে ঘুম পাড়িয়ে এসেছি। অজ্ঞান অবস্থাতেও মেয়েটা ক্রমাগত ছটফট করছিল। পরিষ্কার মনে হচ্ছিল, কেউ যেন ওকে টেনে নিয়ে যেতে চাইছে। সেই আগের দুঃস্বপ্নই কি দেখছিল ও? জানি না। তবে আমি আর ঝুঁকি নেব না। সাউথওল্ডে টেলিগ্রাম পাঠিয়ে দিয়েছি। আজ সন্ধের মধ্যেই ওরা সুজিকে নিয়ে যাবে।”

একজন অভিজ্ঞ ডাক্তারের কাছে এই ব্যাপারটা যে কতখানি হতাশাজনক, তা বুঝতে পারছিলাম। তাই আমি আর কিছু না বলে, মৃদু সহানুভূতি জানিয়ে উঠে পড়লাম।

ঘরে বসে আমার কিছু রাফ নোটকে গুছিয়ে একটা বইয়ের আকার দিতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু কাজে মন বসল না। বুঝতে পারলাম, রাশওল্ড-এ যা ঘটছে তার সহজ, এমনকি প্যাঁচালো একটা ব্যাখ্যাও কেউ না দেওয়া অবধি শান্তি পাব না।

ঘর ছেড়ে সমুদ্রের তীরে হাঁটতে গেলাম। বেশ কিছুদূর এগোনোর পর শুনশান জেটি-র কাছে ক’জন জেলেকে বিষণ্ণ, হতাশ হয়ে বসে থাকতে দেখলাম। তাদের কাছে গিয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে জানতে চাইলাম সুজি’র কথা।

“আমি জেথরো হডসল।” অত্যন্ত শক্তপোক্ত চেহারার এক প্রৌঢ় উঠে দাঁড়িয়ে, মাথার টুপি খুলে আমার হাত ঝাঁকাল। তারপর ভাঙা গলায় বলল, “সুজি ভালো নেই, মিস্টার পেইনেল। ডাক্তারবাবু যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন। কিন্তু ও ভালো নেই। আমরা ওকে প্রায় বেঁধে না রাখলে ও এতক্ষণে এই বালিয়াড়ির কাছে চলে আসত। হয়তো ওখানেই ও…!”

জেথরো-র লম্বা-চওড়া শরীরটা থরথরিয়ে কেঁপে উঠল। চুপ করে গেল ও। অস্বস্তিভরে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম আমিও। তারপর বললাম, “ডক্টর গটফ্রেড বলছিলেন, সুজি নাকি কী-সব দুঃস্বপ্ন দেখছে। হয়তো সমুদ্রের ধারের এই হাওয়া কোনও কারণে ওর সহ্য হচ্ছে না। তাই ওকে বোধহয় স্যানাটোরিয়ামে নিয়ে যাওয়াই ভালো হবে।”

“ঠিক।” জেথরো উত্তেজিতভাবে বলে উঠল, “ডাক্তারবাবু একদম ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সমুদ্র এখনও অনেক পিছিয়ে আছে! সমুদ্রের ধার থেকে দূরে না নিয়ে গেলে ওকে বাঁচানো যাবে না। আপনি এখানে নতুন এসেছেন স্যার। আপনি হয়তো জানেন না। কিন্তু সমুদ্র পিছিয়ে গেলে রাশওল্ড, বিশেষত তার ছোটোরা বিপদে পড়ে। এটা আমরা অন্তত জানি।”

“হ্যাঁ, রেভারেন্ড ক্লেডন আমাকে আপনাদের এই বিশ্বাসের ব্যাপারটা বলেছেন।”

“বিশ্বাস!” জেথরো-র মুখে একটা মলিন হাসি দেখা দিল, “রেভারেন্ড ক্লেডন ভালো মানুষ। তবে উনি এসেক্স থেকে এসেছেন। এই এলাকার খবরাখবর উনি সেভাবে জানেন না, জানতে চানও না। কিন্তু আমাদের কাছে এটা শুধু কুসংস্কার বা বিশ্বাস নয়। আমরা জানি, এগুলো কেন হয়!”

কথাটার মধ্যে এমন একটা জোর ছিল যে আমি থমকে গেলাম। জেথরো-কে বললাম, “এই অসুস্থতার জন্য কি তাহলে বিশেষ কেউ দায়ী? আপনারা কেউ তাকে দেখেছেন?”

“আমিই দেখেছি।” জেথরো-র চোখ জ্বলে উঠল, “ভোর রাতে যখন সুজি ছটফট করছিল, তখন আমি বাইরে ছিলাম। তখনই দেখলাম, বাড়ির কাছের ওই বালিয়াড়ির ওপর একটা প্রকাণ্ড গিরগিটির মতো করে লেপ্টে আছে কেউ! সুজি বলছিল, ‘ওই খারাপ লোকটাকে সরিয়ে দাও! ও আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।’ আমি ক’জনকে নিয়ে বালিয়াড়ির দিকে এগোলাম। তখনই দেখলাম, পিছলে দূরে সরে গেল ও।”

আমি অবাক হয়ে বললাম, “কে ছিল সে?”

“রজার ডে লিল।”

মুহূর্তের জন্য আমার মনে হল, কোথায় যেন নামটা শুনেছি। তারপর মনে পড়ল, এই লোকটির কবরই সমুদ্রের তলা থেকে তুলে আনা হয়নি!

জেথরো বলে চলল, “ছোটোবেলা থেকে শুনে এসেছি, সমুদ্র পিছিয়ে গেলে ও উঠে আসে অনন্ত খিদে নিয়ে। কথাগুলোকে পাত্তা দিইনি এতদিন। কিন্তু এবার বুঝতে পারছি, কিছু একটা করতে হবে। নইলে এই অভিশাপের হাত থেকে শুধু সুজি কেন, রাশওল্ড-ই কোনওদিন নিস্তার পাবে না। তাই যা-করার আমরাই করব এবার।”

কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম লোকগুলোর দিকে। ভাবলাম, এরা সবাই পাগল হয়ে যায়নি তো? অথচ কাল রাতে গটফ্রেডের বলা ‘গপ্পো’, আর জেথরো-র কথার মধ্যে কোথায় যেন মিল পাচ্ছিলাম। জিজ্ঞেস করেই ফেললাম, “কী করবেন আপনারা?”

“আজ রাতে আমরা সমুদ্রের ধারে থাকব।” শান্ত গলায় বলল জেথরো, “ভাটার সময় হলেই ও উঠে আসবে। আমরা জানি। আজ রাতেই ওর খেল খতম করব আমরা। তবে, যদি অভয় দেন, তাহলে একটা কথা বলি, মিস্টার পেইনেল।”

“নিশ্চয়। বলুন।”

“বাইরে থেকে ক’দিনের জন্য এসেও আপনি সুজি-র ব্যাপারে খোঁজ নিয়েছেন। বুড়োর ভীমরতি হয়েছে ভাবলেও ধৈর্য ধরে আমার কথাগুলো শুনেছেন। কথাগুলো যে কল্পনা আর বাজে বকা নয়— এটা বিশ্বাস করার জন্য শোনা নয়, দেখাও জরুরি। তাই একটা কাজ দয়া করে করুন। আজ রাতে আপনিও আমাদের সঙ্গে থাকুন। থাকবেন, স্যার?”

হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম। কতক্ষণ ওভাবে ছিলাম জানি না। তবে আগের ক’দিনের কথা, আর রাশওল্ড-এর ওই অদ্ভুত পরিবেশ নিশ্চয় আমার ওপর প্রভাব ফেলেছিল। নইলে আমি কোনওমতেই ওই কথায় সায় দিতাম না। অথচ…

“আমি থাকব, মিস্টার হডসল।” ঢোঁক গিলে বলে উঠলাম, “আজ রাতে আমিও আপনাদের সঙ্গে থাকব।”

“বাঁচালেন স্যার।” আমার ডান হাতটা নিজের মুষ্টির মধ্যে নিয়ে ঝাঁকিয়ে, আবেগে কেঁপে ওঠা গলায় বলল জেথরো, “আমি ভেবেছিলাম, আপনি হয়তো রাগ করবেন। হয়তো ভাববেন, এই বুড়ো জেলে বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে। কিন্তু আপনি… হডসল পরিবার আপনার কাছে ঋণী হয়ে রইল। সূর্য ডোবার পরেই আপনি ঠিক এইখানে চলে আসবেন। ব্যস!”

এই কথোপকথনের পর আট ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। এবার আমি ‘একজন’ ছেড়ে বেরোব। রক্তে যেন মাখামাখি হয়ে আছে পশ্চিম আকাশ। জেটির কাছে যেতে-যেতে অন্ধকার হয়ে যাবে।

এখনও ঠিক বিশ্বাস করতে পারছি না, আমি কী করতে যাচ্ছি। এ কি কোনও মধ্যযুগীয় রোমান্স? আমরা কি কোনও দানবকে বধ করতে চলেছি? পুরো ব্যাপারটাকে এক উদ্বিগ্ন, বয়স্ক মানুষের উত্তেজিত মস্তিষ্কের কল্পনা বলে উড়িয়েই দেওয়া যেত। কিন্তু জেথরো যখন বলছিল সে বালিয়াড়ির ওপর কী… কাকে দেখেছে, তখন কেমন যেন লাগছিল। আজ রাতের অভিযানের পর যা-ই হোক না কেন, অন্তত সেই অস্বস্তির হাত থেকে রেহাই পেয়ে যাব।

হারানোর মধ্যে তো শুধু এক রাতের ঘুম! সে পরে পুষিয়ে নেব’খন।

২৩ তারিখ

তিন দিন কেটে গেছে। সেই রাতের কথাগুলো লেখার কোনও ইচ্ছেও ছিল না। কিন্তু গটফ্রেড বলেছেন, ওগুলো না লেখা অবধি আমি শান্তি পাব না। তাই, একরকম মরিয়া হয়ে আমি সেগুলো লিখতে বসেছি।

সেদিন সন্ধেবেলা ‘একজন’ থেকে বেরিয়ে জেটির দিকেই এগোচ্ছিলাম। হঠাৎ মনে হল, রেভারেন্ড ক্লেডন সবকিছুকে যতই কুসংস্কার বলে মনে করেন, এই প্যারিশের লোকেদের নিয়ে উনি সত্যিই ভাবেন। তাই ওঁকে একবার এই অভিযানের কথা বলতে ক্ষতি কী? সেইমতো ভিকারেজে হাজির হলাম। তারপর এক কাপ চা হাতে নিয়ে ওঁকে আমাদের সান্ধ্য তথা নৈশ অভিযানের ব্যাপারটা গুছিয়ে বললাম।

“সময়!” পাইপে কামড় দিয়ে, তেতো গলায়, অথচ মুখে হাসি ফুটিয়ে বললেন ক্লেডন, “সময় বড়ো বলবান। আজ থেকে এক সপ্তাহ আগে কেউ যদি আমাকে বলত যে আমার বেশ ক’জন প্যারিশনার এইরকম একটা পরিকল্পনা নিয়ে সমুদ্রের তীরে সারারাত কাটাবে, আমি হইচই বাধিয়ে তাদের আটকাতাম। অথচ এই ক’দিনে আমিও কেমন যেন…! তবে আমাকে একটা কথা বলুন, পেইনেল।”

“কী?”

“আজ আপনারা যা করতে যাচ্ছেন, তাতে চার্চের অনুমোদন থাকার কোনও প্রশ্নই নেই।” ঠান্ডা গলায় বললেন ক্লেডন, “কিন্তু আমার প্যারিশনারদের এইরকম একটা কাজ করতে হচ্ছে— এটা থেকেই বোঝা যায় যে আমার কর্তব্য আমি ঠিকমতো করতে পারিনি। তাই আমাকে ব্যক্তিগতভাবে একটা কাজ করতে হবে। আমিও আজ রাতে আপনাদের সঙ্গে থাকতে চাই। এতে কি জেথরো আর তার সঙ্গীরা আপত্তি জানাতে পারে?”

“প্রশ্নই ওঠে না।” আমি সোৎসাহে বললাম, “বরং আপনি ওদের সঙ্গে থাকলে ওরা খুশি হবে বলেই আমার ধারণা।”

গরম পোশাকের ওপর রেইনকোট চাপিয়ে, ঝড়েও জ্বলতে পারে এমন লণ্ঠন আর দূরবীন হাতে নিয়ে আমরা জেটির দিকে রওনা হলাম।

জেটির কাছে পৌঁছোতে-পৌঁছোতে অন্ধকার নেমে গেল। আকাশের গায়ে লেগে থাকা অতি সামান্য আলোতে দেখলাম, জনাদশেক মানুষ হাজির হয়েছে সেখানে। তাদের সবার হাতে লণ্ঠন। বেশ ক’জনের হাতে নৌকো বাঁধতে কাজে লাগে এমন হুকও রয়েছে। সেই ভিড়ের মধ্যে আরও একটি চেনামুখ দেখলাম।

“আপনাদেরও দলে টেনেছে এরা?” ঈষৎ হেসে বললেন গটফ্রেড, “আমার বুড়ো প্রফেসরের কথায় কিছু সারবত্তা ছিল তাহলে— কী বলেন, পেইনেল?”

জেলেরা মুখে কিছু বলেনি। তবে আমাদের উপস্থিতিতে তারা যে খুশি হয়েছে, এটা বেশ বোঝা যাচ্ছিল। প্রত্যেকটি জেলে, বিশেষত জেথরো এসে ক্লেডনের দু’হাত ধরে ঝাঁকিয়ে গেল। ভিকারের উপস্থিতি যে ওদের অনেকটা সাহস জুগিয়েছে— এ আর বলে দেওয়ার দরকার ছিল না।

“তাহলে জেথরো…” ক্লেডন মাথা দুলিয়ে বললেন, “আজকের অভিযানে তুমিই তো নেতা। বলে দাও, আমাদের কাকে কী করতে হবে।”

“অনেক-অনেক ধন্যবাদ, রেভারেন্ড।” মাথা ঝুঁকিয়ে বলল জেথরো, “আপাতত আমাদের হাতে কিছুটা সময় আছে। ভাটার টানে সমুদ্র আরও পিছিয়ে না যাওয়া অবধি কিছু হবে না। ও আমাদের বাড়ির দিকেই আসবে। তাই আমরা সে-দিকে গিয়েই অপেক্ষা করব।”

হডসলদের বাড়ি, বালিয়াড়ি, সমুদ্র— সবক’টাকেই দেখা যায় এমন একটা জায়গা বের করলাম আমরা। নুড়ি জমে জায়গাটা শুকনো আর শক্ত হয়ে রয়েছে। আমি আর গটফ্রেড ওখানেই দাঁড়ালাম। ক্লেডন জেথরো-র সঙ্গে সমুদ্রের আরেকটু কাছে একটা জায়গায় দাঁড়ালেন। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে নিজেদের বালি আর আশেপাশের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলল বাকিরাও।

“হ্যামারস্মিথে ইনটার্ন ছিলাম কিছুদিন।” পাইপ ধরিয়ে তাতে টান দিয়ে বললেন গটফ্রেড, “সেখানে একবার রাতে কিছু বদমায়েশকে ধরার জন্য ফাঁদ পেতে পাহারা দিয়েছিলাম। সে ঘটনাটাই শুনুন। সময়টা কাটবে।”

অন্ধকার একটা ভারী চাদরের মতো চেপে বসতে লাগল আমাদের ওপর। জলের মৃদু ছলছল আর হাওয়ার শনশন ছাড়া কোনও শব্দ রইল না চরাচরে। গটফ্রেডের গল্প ফুরিয়ে গেল। আমি নিশ্চিত যে শুধু আমার নয়, উপস্থিত সবারই কখনও-না-কখনও মনে হয়েছিল যে এই পুরো ব্যাপারটাই পণ্ডশ্রম। কিন্তু জেথরো হডসলের নড়াচড়া, মৃদু কথা আমাদের জায়গামতো স্থির রেখেছিল। আধঘণ্টা কেটে গেল এ-ভাবেই।

“হুঁশিয়ার!” হঠাৎ জেথরো হিসহিস করে উঠল, “ভাটার টানে জল একদম নেমে গেছে। চোখ-কান খোলা রেখো, ভাইসব।”

আমাদের হাতে কয়েকটা লণ্ঠন টিমটিম করে জ্বলছিল। কিন্তু সামনের অন্ধকারের মধ্যে নজর চলছে না। কান পেতে কোনও শব্দ হচ্ছে কি না শোনার চেষ্টা করলাম। কিন্তু নিজের হৃৎপিণ্ডই এমন আওয়াজ তুলল যে তার পাশে বাইরের সব শব্দ চাপা পড়ে গেল।

একসময় শুনলাম, নিচু গলায় জেথরো বিড়বিড় করছে। শুনতে পেলাম ও বলছে, “এইবার সে জাগছে। বালি আর কাদার তলায় নড়ছে সে। এইবার সে উঠল। জল-কাদা ঠেলে, বালির মধ্য দিয়ে ও আসছে শুকনো ডাঙায়, খোলা আকাশের নীচে। এত-এতদিন ধরে আমরা ওর ওপর দিয়েই নৌকো চালিয়েছি। এত-এতদিন আমরা ওর সামনে থেকেই মাছ ধরেছি। এবার ওকে ধরব, ভাইসব! এবার ও চিরতরে ঘুমোবে। ঢিলে দিলে চলবে না আর। হুঁশিয়ার!”

কথাগুলো আমার চোখের সামনে যেন পর্দায় দৃশ্যের পর দৃশ্য ফুটিয়ে তুলল। আমি যেন সত্যিই দেখতে পেলাম, জলের নীচে, বালি আর কাদার নীচ থেকে একটা প্রকাণ্ড গিরগিটির মতো করে এগিয়ে আসছে কেউ। একবার মনে হল, ক্লেডনও কি এইরকম কিছুই কল্পনা করছেন? আরও কিছুক্ষণ অসহ্য উৎকণ্ঠায় রইলাম আমরা। তারপর চাবুকের মতো আছড়ে পড়ল জেথরো-র নিচু গলা, “লণ্ঠন নেভান!”

জ্বলন্ত লণ্ঠনগুলো দ্রুত নিভে গেল। এক মুহূর্তের জন্য মনে হল, আমি বোধহয় অন্ধই হয়ে গেছি। তারপর জেথরো-র ফিসফিস কানে এসে ধাক্কা মারল, “সামনে— একেবারে সোজাসুজি।”

প্রাণপণে তাকিয়েও কিচ্ছু দেখতে পেলাম না আমি। তবে শুনলাম জেথরো বলছে, “আমি ওর আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। চটপট! আমার সঙ্গে এসো তো ক’জন।”

আমি, গটফ্রেড আর ক্লেডন অন্ধকারের মধ্যেও মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম। জেথরো-র নিচু গলা আবার হাওয়ায় ভেসে এল, “আপনারা এখানেই থাকুন, স্যারেরা। এটা রাশওল্ড-এর ব্যাপার। আমাদের বুঝে নিতে দিন। দরকার পড়লে আপনাদের ডাকব। ততক্ষণ অবধি অপেক্ষা করুন। বাকিরা, বোট-হুক আর লণ্ঠন নিয়ে আমার সঙ্গে এসো। খুব সাবধান! একটা শব্দও যেন না হয়।”

বালিয়াড়ির মধ্য থেকে কয়েকটা নুড়ি গড়িয়ে পড়া ছাড়া কোনও শব্দ হল না। তবে বুঝতে পারলাম, আমাদের আশপাশ থেকে প্রত্যেকে এগিয়ে গেছে। তাদের চলার গতি, আর তার আগে যে-ভাবে সবাই দাঁড়িয়েছিল— এই দুইয়ের থেকে জেথরো-র পরিকল্পনা কিছুটা হলেও বুঝতে পেরেছিলাম। ও একটা অর্ধবৃত্তের মতো করে জায়গাটা ঘিরে ফেলতে চাইছে।

তারপর সমুদ্রের দিক থেকে ভেসে এল একটা শব্দ! ক্ষীণ, চুপসে যাওয়া ফুসফুস নিয়ে শ্বাস টানার মতো শব্দটা পেলাম আমি। তারই সঙ্গে এল একটা বীভৎস গন্ধ! অনেকদিন ধরে জলের নীচে থেকে পচে যাওয়া মাছ আর ঝাঁঝির সঙ্গে তার তুলনা চলে। কিন্তু মনে হচ্ছিল, সে গন্ধ যেন সত্যিই পাতাল থেকে উঠে এসেছে।

একটা আগুনের শিখা দেখলাম দূরে, কাদামাটির অংশে। তারই সঙ্গে গর্জে উঠল জেথরো, “আলো জ্বালাও সব্বাই! এক্ষুনি!”

বিদ্যুদ্বেগে জ্বলে উঠল আরও বেশ ক’টা লণ্ঠন আর মশাল।

“কী হচ্ছে ওখানে?” রুদ্ধকণ্ঠে বলে উঠলেন গটফ্রেড, “এই অন্ধকার, ওই আগুন— এ আমি আর সহ্য করতে পারছি না। আমি ওদিকে যাচ্ছি। আপনারা কী করবেন?”

গটফ্রেড হনহন করে এগোলেন আগুনের দিকে।

আমি নিজের হাতের লণ্ঠনটা জ্বালালাম। সেই আলোয় দেখলাম, ফ্যাকাশে মুখে দাঁড়িয়ে আছেন রেভারেন্ড ক্লেডন। না, ঠিক দাঁড়িয়ে নয়। ভয়ে আর উত্তেজনায় মানুষটি থরথর করে কাঁপছিলেন। ওঁকে নিয়ে টানাটানি করলাম না। দূরবীন আর লণ্ঠন হাতে আমিও গটফ্রেডের পেছনে ছুটলাম।

বালি আর নুড়িতে হড়কে যাচ্ছিলাম বারবার। তার মধ্যেও কোনওক্রমে চোখে দূরবীন লাগিয়ে দেখছিলাম, কী হচ্ছে সামনের বালিয়াড়িতে। আগুনের কম্পমান শিখা, আমার নিজের নড়বড়ে হাত— এর মধ্যেও আমার চোখে পড়ল দৃশ্যগুলো।

গোল হয়ে একটা জায়গা ঘিরে দাঁড়িয়েছে জেলেরা। তাদের প্রায় সবার হাতে জ্বলছে মশাল আর লণ্ঠন। বাকিরা তাদের হাতের হুক দিয়ে আছড়ে-আছড়ে মারছে একটা কিছুকে। মনে হল, সেটা উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করছে, কিন্তু হুকের আঘাতে পারছে না।

প্রায় ফিটত্রিশেক দূরে এসে আমি গটফ্রেডের গায়ে প্রায় ধাক্কা দিয়ে তবে থামতে পারলাম। গটফ্রেড আমার দিকে ঘুরলেন। লণ্ঠনের আলোতেও দেখতে পাচ্ছিলাম, মানুষটির চোখজোড়া বিস্ফারিত হয়ে প্রায় বেরিয়ে এসেছে।

“ওই যে!” আঙুল তুলে দেখালেন গটফ্রেড।

দূরবীনটা হঠাৎ ফোকাসে এল। একেবারে দিনের আলোয়, হাতকয়েক দূর থেকে দেখার মতো করে আমি দেখলাম… ওটাকে।

গিরগিটি নয়, বরং একটা মস্ত বড়ো জোঁকের মতো কিলবিল করে বালি আর কাদার ওপর আছাড়ি-পিছাড়ি খাচ্ছিল ওটা। তবে তার চেহারার মধ্যে একটা মানুষের আদল ছিল। তীক্ষ্ণ গলায় চিৎকার করছিল ওটা। কিছু একটা বলার চেষ্টা করছিল কি? জানি না। তবে এটুকু জানি যে লণ্ঠনের আলোয় আমি ওটার চোখজোড়া দেখেছিলাম। সেগুলো একদম মানুষের মতো! আর… সেগুলোর পেছনে যেন সবুজ আগুনের মতো কিছু জ্বলছিল!

ওটার ওপর লণ্ঠন থেকে তেল ছড়িয়ে দিচ্ছিল জেথরো। তারপর ও লাফিয়ে দূরে সরে গেল। একসঙ্গে নীচে নেমে এল সবক’টা মশাল।

একটা তীব্র আর্তনাদ শুনলাম আমি। মানুষের নয় সে কণ্ঠ, আবার জন্তুরও নয়। আর কিছু শুনতে পেলাম না। আমার চোখের সামনে হঠাৎই অন্ধকার নেমে এল।

গটফ্রেড আমাকে ‘একজন’-এ পৌঁছে দিয়েছিলেন। রেভারেন্ড সঙ্গে ছিলেন অনেকক্ষণ অবধি। শেষ রাতে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল জেথরো। গম্ভীর গলায় ও বলেছিল, “ও শেষ, স্যার। সহজে মরেনি। তবে যতক্ষণ না ও পুড়েছে, তারপর সেই ছাই বালি আর কাদার সঙ্গে একেবারে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে, ততক্ষণ অবধি আমরা ওকে ছাড়িনি। আমি আপনার কাছে চিরকৃতজ্ঞ রইলাম, মিস্টার পেইনেল।”

এই তিনদিনে সুজি সুস্থ হয়ে উঠেছে। আমি… এমনিতে ঠিক থাকলেও আমি বোধহয় আগের মতো নেই। হতেও পারব না। আপাতত রাশওল্ড ছাড়তে হবে। ‘একজন’-এর সান্নিধ্য আর নিতে পারছি না আমি!

শেষাংশ

ডায়েরিটা পড়ার পর উইলটনকে ফোনে ধরলাম।

“কী বুঝলেন?” উইলটনের গলায় কৌতুক আর কৌতূহল প্রায় সমান মাপেই মিশে ছিল।

“এ-জিনিস বেচা যাবে না।” সংক্ষেপে বললাম, “আচ্ছা, আপনি তো ভদ্রলোকের বাকি ডায়েরি আর নোটবইগুলো পড়েছিলেন? উনি কি এই নিয়ে আর কিছু লিখেছিলেন কোথাও?”

“না। তবে… ওই ‘একজন’ বোধহয় ওঁকে ছাড়েনি।”

“মানে?”

“আপনি এই একটা ডায়েরিতেই হয়তো দেখেছেন, ভদ্রলোক ঘুমোতে ভারি ভালোবাসতেন। আগের রাতে ওঁর ঘুমটা কতটা জমাট হয়েছে— সেটা লিখেই উনি ডায়েরি শুরু করতেন। ইস্ট অ্যাংলিয়া থেকে ফিরে আসার পর ভদ্রলোকের আর কোনও এন্ট্রিতে আমি ঘুমের কথা পাইনি। কোত্থাও না!”

_

মূল কাহিনি: ওয়ান ওভার

লেখক: স্টিভ ডাফি

প্রথম প্রকাশ: গোস্টস্‌ অ্যান্ড স্কলার্স পত্রিকা

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *