লাল – ঋজু গাঙ্গুলী

লাল

ছিমছাম, পুরোনো হলেও বেশ যত্নে রাখা একটা মাঝারি মাপের বাড়ি— এই হল আমার গল্পের পটভূমি। সেটাকে ওই বদমায়েশ বাড়িওয়ালা ‘লাল’ বলে ডাকলেও গেজেটিয়ারে বাড়িটা ‘দ্য রেড লজ’ নামে চিহ্নিত করা ছিল। বাড়ি আর তার লাগোয়া বাগান— দুটোকেই বেশ পছন্দ করে ফেলল মেরি, মানে আমার স্ত্রী। ডানপিটে টিম আবার বেশি পছন্দ করল বাড়ির পেছনেই বয়ে যাওয়া ছোট্ট নদীটাকে। দামও ঠিকঠাক লাগল। আমি চুপচাপ টাকা-পয়সা মিটিয়ে বাড়িটা ভাড়া নেওয়ার ব্যবস্থা করলাম।

হাতের কাজ মিটিয়ে ওখানে যেতে আমার অন্তত সাতদিন লাগত। ততদিন মেরি আর টিম-কে লন্ডনের ধোঁয়া আর ধুলোর মধ্যে রাখার ইচ্ছে ছিল না। আমি লন্ডন ছাড়ার হপ্তাখানেক আগেই মেরি আর টিম ‘লাল’-কে দখল করল। টিমের নার্স-ও ওদের সঙ্গে গিয়েছিলেন। অবশেষে আমি যখন ‘লাল’-এর সামনে পৌঁছোলাম, তখন সূর্য একেবারে মধ্যগগনে। তবু, চৌকাঠ পেরিয়ে ভেতরে ঢোকামাত্র আমার ভেতরে অস্বস্তিটা শুরু হল।

আমি একজন চিত্রশিল্পী। আলো-ছায়ার খেলা আমার মনে যে একটু বেশিই প্রভাব ফেলে— এ-কথা অস্বীকার করব না। হয়তো সে-জন্যই আলোয় ভেসে যাওয়া বড়ো ঘরটাতে দাঁড়িয়েও আমার ঠিক… ভালো লাগছিল না। মনে হচ্ছিল, যেন বাড়িটার ভেতর সর্বত্র একপোঁচ কালো রঙের স্তর লাগিয়ে রেখেছে কেউ। বা আমি যেন একটা কালচে কাচের মধ্য দিয়ে সবকিছু দেখছি। মেরি-কে দেখেও মনে হল, ও ভালো নেই। বাধ্য হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “সব ঠিক আছে তো?”

“হ্যাঁ।” মেরি বেশ কষ্ট করেই মুখে হাসি ফোটাল। আমি ঠিক নিশ্চিন্ত হতে পারলাম না। তখনই আমার নজর গেল কার্পেটের ওপর একটুকরো সবুজ শ্যাওলার দিকে।

“ওগুলো বোধহয় টিম-ই সারা বাড়িতে ছড়ায়।” হাসার চেষ্টা করল মেরি, “নদীর ধারে বেশিক্ষণ কাটালে যা হয় আর কী।”

কথা না বাড়িয়ে বাইরে এলাম। বাগানে একটা মালবেরি গাছের নীচে দাঁড়িয়ে ধূমপান করতে গিয়ে মনে হচ্ছিল, মেরি-কে এখানে প্রায় একা-একা পাঠানোটা বোধহয় ঠিক হয়নি। নতুন জায়গায় কতরকম ব্যাপার হয়। বেচারির স্নায়ুতে যথেষ্ট চাপ পড়েছে মনে হচ্ছে। এর বেশি ভাবার সুযোগ পেলাম না। টিম-কে আসতে দেখলাম। মেরি-ও খেতে ডাকল।

খাওয়ার টেবিলে টিম-কে দেখে মনে হল, ও-ও কিছুটা ঝিমিয়ে আছে। তবে চল্লিশ বছরের এক পুরুষ, তেত্রিশের এক মহিলা, আর সাড়ে ছ’বছর বয়সী একটি ছেলের মধ্যে একবার কথা শুরু হলে থামানো মুশকিল। সেদিনও তা-ই হল। সুখাদ্য ও পানীয় সহযোগে খাওয়া শেষ হতে-হতে আমি মাথা থেকে যাবতীয় দুর্ভাবনা দূর করে দিয়েছিলাম। অবশেষে, ‘এমনি করেই যায় যদি দিন’ ইত্যাদি ভেবে সেই মালবেরি গাছের নীচে একটা আরামকেদারা পেতে আমি আধশোয়া হলাম। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি খেয়ালও নেই।

তবে ঘুমটা ভালো হয়নি। মনে হচ্ছিল, কে বা কারা যেন আমাকে লক্ষ করছে। বারবার চটকা ভেঙে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিলাম, কিন্তু কাউকে দেখতে পাচ্ছিলাম না। আমি ‘লাল’-এর দিকে মুখ করেই বসা আর শোয়ার মাঝামাঝি অবস্থায় রয়েছি। একবার ঘুম ভেঙে সোজা তাকিয়ে মনে হল, দোতলার একটা ঘরের জানালার পর্দার পাশ দিয়ে একজন আমাকে দেখছে। সে নারী না পুরুষ— তা বুঝতে পারলাম না। তবে মুখটা ভারি অদ্ভুতভাবে কাচের গায়ে একেবারে চ্যাপ্টা হয়ে লেগে ছিল। ভালো করে চোখ কচলে আবার তাকাতেই আর কিছু দেখতে পেলাম না। আমি বোধহয় স্বপ্ন দেখছিলাম। তারই রেশ হয়তো জেগে ওঠার পরেও থেকে গেছে। এরপর আর শুতে ইচ্ছে করল না। আমি উঠে বাগানে পায়চারি করা শুরু করলাম।

বাগানটা প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। শুধু একেবারে শেষ মাথায় একটা ছোট্ট দরজা খুললে একটা পায়ে-চলা পথ পাওয়া যায়। ডানদিকের দেওয়ালের সমান্তরালে কিছুদূর চলার পর পথটা সেই ছোট্ট নদীর ধারে গিয়ে শেষ হয়। ওই দরজাটার গায়ে আমি সবুজ শ্যাওলার মতো বেশ কয়েকটা ছোপ দেখলাম। এগুলোও কি টিম লাগিয়েছে? জায়গাটা অবশ্য দুটো ঝুপসি রোয়ান গাছের ছায়ায় এমনিতেই অন্ধকার আর স্যাঁতসেঁতে হয়ে রয়েছে। ওখানে বেশিক্ষণ থাকতে ইচ্ছে করল না। ফিরে এসে টিমের সঙ্গে খেলায় মেতে গেলাম। খেলাটা খুব বেশিক্ষণ চালানো গেল না অবশ্য। কিছুটা দূরের ম্যানর হাউজের বাসিন্দা স্যার উইলিয়াম প্রাউস, লেডি প্রাউস, আর তাঁদের মেয়ে— তিনজনেই আমাদের সঙ্গে দেখা করতে চলে এলেন।

ওঁদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে আমার বেশ ভালো লাগল। চায়ের পাট চুকলে স্যার উইলিয়ামের সঙ্গে একটু হাঁটতে বেরোলাম।

“আমাদের আগে এখানে কারা থাকত?” জিজ্ঞেস করলাম।

“হকার পরিবার।” উইলিয়াম বললেন, “সে-ও দু’বছর আগের কথা।”

“মালিক এখানে থাকে না কেন?” পড়ন্ত আলোয় বাড়িটাকে ভারি সুন্দর লাগছিল বলেই প্রশ্নটা মাথায় এল, “বাড়িটা তো এমনিতে বেশ যত্নেই রাখা আছে।”

“কে জানে!” উইলিয়াম ঠোঁট বাঁকালেন, “হয়তো বাড়িটা নদীর এত কাছে বলে থাকতে চায় না। লোকটাকে আমার অসহ্য লাগে। ভালো কথা, আপনারা কদ্দিনের জন্য বাড়িটা ভাড়া নিয়েছেন?”

“তিন মাস।”

“বেশ-বেশ। কোনওরকম ঝামেলা হলে নির্দ্বিধায় বলবেন কিন্তু।”

মাথা নেড়ে সায় দিতে-দিতেও মনে হল, উইলিয়াম ‘ঝামেলা’ কথাটাকে একেবারে আন্ডারলাইন করে দিলেন কেন? এই পরিবেশে এমন একটা বাড়িতে কী ঝামেলা হতে পারে? তবে অধিকাংশ মানুষই শিল্পীদের নিয়ে অনেককিছু ভাবেন। নিজেকে বোঝালাম, উনিও হয়তো তেমনই কিছু ভেবে কথাটা বললেন।

প্রাউস পরিবার বিদায় নিলে টিমের সঙ্গে গল্প আর খেলা শুরু করলাম। বুঝলাম, নদীটাকে ও কোনও কারণে ভয় পাচ্ছে। ঠিক করলাম, এই অমূলক ভয়টা ভেঙে না দিলে পরে বেচারিকেই এ-জন্য ভুগতে হবে। তবে একটা কথা মনের মধ্যে কাঁটার মতো খচখচ করছিল।

গতবছর ফেন্টনে গিয়ে ছুটি কাটানোর সময় টিম সমুদ্রকে আদৌ ভয় পায়নি!

বাকি দিনটাতে উল্লেখযোগ্য কিছু হল না। শুধু রাতের খাওয়ার পর হাঁটতে গিয়ে আমি একবার ভাবলাম, ছোটো দরজাটা খুলে বাইরে নদীর দিকে যাব। কিন্তু দরজার ছিটকিনিতে হাত দিতেই একটা তীব্র শিসের শব্দ পেলাম। চমকে এদিক-ওদিক তাকিয়েও শব্দটার উৎস আবিষ্কার করতে পারলাম না। কাউকে দেখতেও পেলাম না। তবে এই শিসের ধাক্কায় বাইরে যাওয়ার উৎসাহটাই চলে গেল। আমি বাড়ি ফিরে এসে শুয়ে পড়লাম।

পরদিন ঘুম থেকে উঠে আবিষ্কার করলাম, মাথাটা ভার হয়ে রয়েছে। কাজের ঘরের বাতাসটাও কেমন যেন ভ্যাপসা ঠেকছে। জানালাগুলো খুলতে গিয়ে কীসে যেন আমার পা পিছলে গেল। চমকে উঠে দেখলাম, নীচে আর দরজায় দেখা সেই সবুজ শ্যাওলার একটা ছোপ ওখানে পড়ে আছে। এবার আমি সত্যিই অবাক হলাম, কারণ টিম আমার কাজের জায়গায় একদম আসে না। জিনিসটা তাহলে কোত্থেকে এল? ওটাকে ঘষে সাফ করে ফেললাম ঠিকই, তবে প্রাতরাশের সময়টা আমি ওই শ্যাওলা কোত্থেকে এসে থাকতে পারে— সেই ভেবেই কাটালাম।

খাওয়ার পর টিমকে বললাম, “চলো, আমরা দু’জন নৌকো চেপে নদীতে একটু বেড়িয়ে আসি।”

“আমাকে কি যেতেই হবে, বাবা?” একটু শঙ্কিত ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল টিম।

“জোরজারির ব্যাপার নেই।” আমি একটু বিরক্ত হয়েই বললাম, “তবে না-গেলে তোমারই হয়তো পরে খারাপ লাগবে।”

“না গেলে তুমি রাগ করবে?”

“না, টিম।” আমি হেসে ফেললাম, “তবে একবার গিয়ে দেখলে হয় না?”

“আ…চ্ছা।”

একরকম বাধ্য হয়েই আমি নার্সকে জিজ্ঞেস করলাম, “টিম তো জল-কে ভয় পেত না। কী হল হঠাৎ?”

“জানি না, স্যার।” নার্স ঈষৎ বিব্রতমুখে বললেন, “প্রথমদিন এখানে আসার পর আমরা ঠিকমতও গুছিয়ে বসার আগেই ও একদম হই-হই করে নদীর দিকে ছুটেছিল। কিন্তু তারপরেই ও কাঁদতে-কাঁদতে আবার বাড়িতে ফিরে এল। আমাদের মনে হয়েছিল, ও বোধহয় জলে কিছু দেখে ভয় পেয়েছে।”

নৌকাবিহারের পরিকল্পনা মাথায় তুলে আমরা সবাই মিলে বাড়ির আশপাশটাই ভালো করে দেখতে বেরোলাম। ঘোরাঘুরি করতে বেশ ভালো লাগছিল। কিন্তু এ-ও বুঝতে পারছিলাম, বাড়িটাতে ফিরে আসার কথা ভাবলেই আমার মনটা ভার হয়ে যাচ্ছে। কেন জানি না, মনে হচ্ছিল যেন ‘লাল’-এর মধ্যে কিছু একটা ঘটছে আমাদের অবর্তমানে। হয়তো মেরিও এমন কিছু ভাবছিল।

ফেরার পর ঝটপট খাওয়া সেরে নিলাম আমরা। মাথা ধরেছে বলে মেরি তখনই শুতে চলে গেল। আমি নিজের ঘরের দরজাটা বন্ধ করে বই নিয়ে বসলাম। দরজাটা বন্ধ করতে বাধ্যই হলাম। নইলে ‘আমাকে কেউ লক্ষ করছে’ এমন একটা অনুভূতি এতই জোরালো হয়ে উঠছিল যে বইয়ের পাতায়  মনঃসংযোগ করতেই পারছিলাম না। বার-কয়েক চমকে উঠলাম খুট-খাট শব্দ শুনে। নিজেকে বোঝালাম, ওককাঠের প্যানেলগুলো নিশ্চয় সারাদিনের রোদ পাওয়ার পর, এখন রাত নামতে এমন আওয়াজ তুলছে। তবুও বারবার চোখ যাচ্ছে ঘরের অন্ধকার কোণগুলোর দিকে। অবশেষে, যখন সক্রেটিসের বলা একটা জটিল বক্তব্যে প্রায় ঢুকেই পড়েছি, দেখলাম আমার চেয়ারের পাশেই সবুজ শ্যাওলার একটা টুকরো পড়ে আছে। আমাকে প্রায় স্তম্ভিত করে দিয়ে চোখের সামনেই মেঝেতে আরেকটা টুকরো গজাল, তারপর আরেকটা, তারপর আরেকটা! প্রায় লাফিয়ে উঠে জিনিসটা হাতে নিলাম। জলে ভেজা একটুকরো শ্যাওলা ছাড়া আর সেটা আর কিছুই না। আমার চেয়ার আর ঘরের দরজার মাঝের দূরত্বটা পায়ে হেঁটে পেরোতে গেলে যে-দূরত্বে কারও পা পড়বে, মোটামুটি সেই দূরত্বেই পড়ে আছে শ্যাওলার টুকরোগুলো।

মনের সবটুকু জোর আর সাহসে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। ঘরের মাঝের বড়ো আলোটা জ্বালালাম। টেবিল-ল্যাম্প নেভালাম। তারপর নিজের কাজের ঘরে গিয়ে পুরো জিনিসটা ভাবতে শুরু করলাম। ‘লাল’-এ যে একটা বড়োসড়ো গোলমাল আছে— এটা আর উপেক্ষা করার উপায় নেই। মন বলছে, এই মুহূর্তেই সবাইকে নিয়ে এখান থেকে চলে যাওয়া উচিত। কিন্তু তিন মাসের ভাড়ার আগাম হিসেবে দেওয়া একশো আটষট্টি পাউন্ডের কথাটা ভাবতেই বড়ো কষ্ট হল। তা-ছাড়া দুম্‌ করে যাবই বা কোথায়? নিজেকে শেষ অবধি বোঝালাম যে আমি বোধহয় সত্যিই বেশি কল্পনাপ্রবণ তাই এ-সব দেখছি। চিন্তা হল, আমার এমন ভাবনার ছোঁয়া লাগলে মেরি আর টিমও অনেককিছু ‘দেখতে’ শুরু করবে। তাই ঠিক করলাম কাউকে কিছু না বলে আপাতত নিজেই ব্যাপারগুলো বোঝার চেষ্টা করব।

পোশাক বদলে, আলো নিভিয়ে মেরির পাশে শুয়ে পড়লাম।

কোনও কারণে মন বেশিরকম বিক্ষিপ্ত থাকলে ঘুম আসতে চায় না। কিছুক্ষণ এপাশ-ওপাশ করার পর মনে হল, এই বাড়ি বা নিজের কাজ থেকে একেবারেই ‘অন্যরকম’ কিছু নিয়ে ভাবা যাক। তা-ই করলাম। ভিড়, শহরের গমগমে আলো আর আওয়াজ, একটা পার্টিতে পানীয় হাতে গল্প আর তর্ক, পিয়ানোর টুংটাং— এ-সব ভাবতে-ভাবতে চোখ প্রায় লেগে এসেছে, ঠিক তখনই খেয়াল হল…

আমি আর বিছানায় নেই! রোয়ান গাছদুটোর নীচে দাঁড়িয়ে আমি আতঙ্কে ঠকঠক করে কাঁপছি!

কেন?

কারণ আমার সামনের ওই ছোট্ট দরজাটা একটু-একটু করে খুলে যাচ্ছে! আমি জানি না, ও-পাশে কে বা কী আছে। কিন্তু যে-ই থাকুক না কেন, আমি জানি, তার মুখোমুখি হওয়ার অর্থ নিশ্চিত মৃত্যু!

দরজাটা খুলে গেল। আমি… ঠিক কী যে দেখলাম, তা বুঝতে পারলাম না। তবে মনে হল, মানুষ আর অমানুষের মাঝামাঝি একটা ভয়ংকর অস্তিত্ব আমার দিকে এগিয়ে আসছে।

আমি কি স্বপ্ন দেখছি? ঘুমের মধ্যেই আমার মাথার মধ্যে চাপ বাড়তে শুরু করল। মনে হচ্ছে, যেন আগুনের মতো গরম একটা বীজ আমার মাথার মধ্যে বড়ো হচ্ছে। কী অসহ্য সে উত্তাপ! আপনা থেকেই আমার দু’চোখ খুলে গেল।

ঘন অন্ধকারের মধ্যে আমার মনে হল, আমার মুখের ঠিক বড়োজোর ফুটখানেকের দূরত্বে কেউ রয়েছে। আমার দিকে তাকিয়ে আছে সে। আর তারপর…

আমার মুখের ওপর ফোঁটা-ফোঁটা করে কিছু একটা পড়তে শুরু করল।

ওই অবস্থাতেও মনে হল, মেরি আমার পাশে শুয়ে আছে। আমি আর্তনাদ করতে শুরু করলে ও আরও ভয় পেয়ে যাবে। কী কষ্ট করে যে কাপড়-চোপড় আর চাদর নিয়ে নিজের মাথা ঢাকলাম, তারপর ভয়ে প্রায় ফুঁপিয়ে কাঁদতে-কাঁদতে রাত কাটালাম— সে আমি লিখে বোঝাতে পারব না।

অবশেষে, নীচের বড়ো ঘড়িতে পাঁচটা বাজার শব্দ হল। পাখির ডাক আর আলোর আভাস বুঝিয়ে দিল, আমার নৈশ নরকবাস শেষ হয়েছে। তখন আমি ঘুমোলাম।

বেলা করে উঠলাম বটে, কিন্তু ভেতরে-ভেতরে একেবারে ভেঙে পড়েছিলাম। খাওয়া-দাওয়া সেরে ঠিক করলাম, বাগানে বসে ছবি আঁকব। নিজের মতো কিছুটা সময় কাটালে হয়তো একটু সুস্থ লাগবে। সেই মতো কাগজ আর চারকোল নিয়ে মালবেরি গাছের ছায়ায় বসলাম বটে, কিন্তু রাতের অভিজ্ঞতাটা কিছুতেই মন থেকে সরাতে পারছিলাম না। তারপর হঠাৎ নজর গেল হাতের কাগজটার দিকে।

এ কী! এটা আমি কী এঁকেছি?

এ তো… কাল রাতে দরজার ওপাশ থেকে আসা সেই জিনিসটা! আর এ-ই তো আমার মুখের ঠিক ওপরে ভেসেছিল কাল রাতে!

লাফিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে কাগজটা ছিঁড়ে কুচিকুচি করলাম। মন চাইছিল তখনই রেল স্টেশনের দিকে ছুটে সামনে যে ট্রেন পাই সেটাতে চেপে এখান থেকে পালাতে। নিজেকে অনেক কষ্টে সামলালাম। তারপর মেরি-কে নিয়ে রওনা দিলাম ম্যানর হাউসের দিকে। একবার ভেবেছিলাম, টিম-কেও সঙ্গে নেব কি না। কিন্তু বাড়িতে নার্স আর এলাকা থেকে আসা অন্যান্য কাজের লোকেদের ভিড়ে টিম হাসিখুশি থাকবে ভেবে ওকে আর অতদূর হাঁটালাম না।

রাস্তায় মেরি একটাও কথা বলল না। আমিও খুব বেশি কথা বলার অবস্থায় নেই। আমাদের দু’পাশের ঘাসজমি কিন্তু হাওয়ায় দুলতে-দুলতে ফিসফিস করে অনেক কিছু বলছিল। তাদের মধ্যে আমি একটাই কথা শুনলাম— ‘পালাও!’ কিন্তু একগুঁয়ে হয়ে ঠিক করে ফেলেছিলাম, স্যার উইলিয়ামের সঙ্গে কথা না বলে এখান থেকে যাব না। ‘ঝামেলা’-য় যখন পড়েইছি তখন ওঁর সঙ্গে কথা বলাটা জরুরি।

কপাল খারাপ আর কাকে বলে! গিয়ে শুনলাম, স্যার উইলিয়াম সেদিনের জন্য লন্ডনে গেছেন। তবে সন্ধে নাগাদ ফিরবেন। বলে এলাম, উনি ফিরলে যেন আমাদের আসার কথা ওঁকে জানানো হয় আর উনি কখন আমার সঙ্গে দেখা করতে পারবেন সেটাও যেন আমাকে কেউ ফোন করে জানিয়ে দেয়। তারপর নিজেদের একরকম টানতে-টানতে আবার ‘লাল’-মুখো হলাম।

বাড়ি পৌঁছোতে ছ’টা বাজল। ক্লান্ত, অনিচ্ছুক শরীরগুলো টেনে গেটের কাছে আসতেই ভেতরে, বাগানের দিক থেকে একটা আর্তনাদ শুনলাম।

টিমের গলা!

পেছন ফিরে দেখলাম, টিম বাগানের মধ্য দিয়ে, দু’হাতে নিজের চোখ ঢেকে টলতে-টলতে ছুটে আসছে। নার্স ওর পেছনেই দৌড়ে আসছেন। মেরি ছুটে গিয়ে টিমকে কোলে নিতে-নিতেই ও আরও একবার আর্তনাদ করল। তারপর মেরি-র কাঁধে মুখ গুঁজল। কথা না বাড়িয়ে মেরি ওকে কোলে নিয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকে সোজা শোয়ার ঘরের দিকে এগোল।

আমি নার্সকে জিজ্ঞেস করলাম, “কী হয়েছে? টিম কি ব্যথা পেয়েছে?”

“জানি না, স্যার।” নার্স ফ্যাকাশে মুখে বললেন, “আমরা দু’জন সরু রাস্তাটা ধরে হাঁটছিলাম। দরজাটা খোলাই ছিল। টিম আমার চেয়ে একটু এগিয়ে ছিল। ও গেট পেরিয়ে ওপাশে গেল। আমি গেট পেরোবার আগেই শুনলাম, ও ওইভাবে আর্তনাদ করে উঠল। তারপর বাগানের মধ্য দিয়ে ওর ছুটে যাওয়া, চোখ ঢেকে রাখা— এগুলো তো আপনারাও দেখেছেন।”

“এমন কিছু আপনার চোখে পড়েছিল, বা শুনেছিলেন, যার থেকে টিম এইরকম ভয় পেতে পারে?”

“না, স্যার।”

টিমের কাছে গেলাম। জানতাম, ওকে এই নিয়ে জিজ্ঞেস করে কোনও লাভ নেই। মেরি’র আদরে ও একটু-একটু করে শান্ত হল। তারপর হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা মা, ওই সবুজ বাঁদরটা আমাকে ধরবে না তো?”

“না-না।” মেরি টিমের কপালে চুমু খেয়ে বলল, “ও তোমার কাছেই আসতে পারবে না। আমরা রইলাম পাহারায়। এবার ঘুমোও তো একটু।”

টিম ঘুমোলে মেরি শুকনো মুখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “এই বাড়িটাতে কী সমস্যা আছে, বল তো? আমি এখানে আসার পর থেকে… অনেককিছু দেখেছি। তুমি কি কিছু দেখেছ?”

আমি সংক্ষেপে বললাম, “দেখেছি।”

“আমি তোমাকে কিছু বলতে চাইনি।” মেরি যে খুব কষ্ট করে নিজেকে সংযত রাখছে সেটা বেশ বুঝতে পারছিলাম। নিজেকে সামলে নিয়ে ও বলে চলল, “যেদিন এখানে এলাম, সেইদিনই দেখলাম, আমার আগে-আগে একজন পুরুষ আমাদের শোয়ার ঘরে ঢুকল। আমি অবাক হয়ে ঘরে এসে কাউকে দেখতে পেলাম না। ভাবলাম, ভুল দেখেছি। কিন্তু তারপরেও আমি ফাঁকা ঘরে ফিসফিস শুনেছি। কোনও কোণার পাশ দিয়ে বাঁক ঘুরতে গিয়ে স্পষ্ট মনে হয়েছে, সামনে থেকে কেউ সরে গেল। আর যেদিন তুমি এলে…”

“সেদিন কী দেখেছিলে?”

“আমি শুয়ে ছিলাম।” মেরি ঢোঁক গিলে বলল, “হঠাৎ জানালা থেকে শব্দ পেলাম। অবাক হয়ে উঠতে গিয়ে মনে হল, কী যেন একটা ভার আমার ওপর চেপে রয়েছে। তবু আমি হামাগুড়ি দিয়ে জানালা অবধি গেলাম। পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকালাম। দেখলাম, একজন মহিলা বাগান দিয়ে দৌড়োচ্ছেন!”

“মহিলা!”

“হ্যাঁ। তিনি দু’হাত সামনে বাড়িয়ে ছুটছিলেন। আর তাঁর পাশে একটা বীভৎস কিছু ছিল।”

মেরি হু-হু করে কেঁদে ফেলল। আমি অতি কষ্টে ওকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে শান্ত করলাম। তারপর জানতে চাইলাম, “আর কেউ কিছু দেখেছে?”

“নার্স কিছু দেখেননি। তবে গ্রাম থেকে যারা কাজ করতে আসে, তারা কিছু দেখেছে। কিছু জানেও, তবে বলে না। কিন্তু আমি খেয়াল করেছি, ওরা কেউ একা থাকতে চায় না। সবচেয়ে খারাপ জিনিস হল এই শ্যাওলার টুকরোগুলো! ওগুলোর মতো কুৎসিত আর কদর্য জিনিস আমি জীবনে দেখিনি।”

মেরি-র ভয়টা রাগের চেহারা নিয়েছে দেখে একটু আশ্বস্ত হলাম। তারপর জিজ্ঞেস করলাম, “টিম কি এর আগে কিছু দেখেছিল?”

“দেখেছিল।” টিমের মাথায় হাত বুলিয়ে মেরি বলল, “কিন্তু কী দেখেছিল, সেটা ও বুঝিয়ে বলতে পারেনি।”

তখনই ফোন বাজল। ম্যানর হাউজ থেকে আমাকে জানানো হল, পরদিন সকাল সাড়ে দশটার সময় স্যার উইলিয়াম আমার সঙ্গে দেখা করতে পারবেন।

“ব্যস।” আমি ফোনটা রেখেই মেরিকে বললাম, “কাল আমি এই ব্যাপারটা ভালোভাবে একবার বুঝে নিই শুধু। তিন মাস তো দূরের কথা, একটা গোটা সপ্তাহও এখানে কাটালে আমি পাগল হয়ে যাব। টাকা যায় যাক। কিন্তু ‘লাল’-এর পাল্লায় আমি বেশিদিন পড়ে থাকতে চাই না।”

‘লাল’-এর স্থায়ী বাসিন্দারা আমি আলো নেভানো অবধি অপেক্ষা করেছিল। তারপর তারা দলবেঁধে আমাদের শোয়ার ঘরে ঢুকল। আমার থেকে হাতখানেকের ব্যবধানে মেরি আর টিম ঘুমোচ্ছে। বিছানার একটা ধার শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আমি ঠিক করলাম, পৃথিবী রসাতলে গেলেও আমি ভয় পাব না।

মনের ওপর অমানুষিক চাপ পড়ছিল। তবু আমি হাল ছাড়লাম না। নিজের সবটুকু জেদ, সবটুকু রাগ একটা বিন্দুতে সংহত করে আমি লড়ছিলাম চারদিক থেকে আমাকে ঘিরে ধরা ছায়াগুলোর সঙ্গে। বাতাসে মিশে যাচ্ছিল একটা গা-ঘিনঘিনে ভাব আর জোলো গন্ধ। কারা যেন কথা বলছিল আমার সামনে-পেছনে। ভয়ের একটা কুয়োতে তলিয়ে যাওয়ার অবস্থা হলেও আমি কিছুতেই নিজেকে ভাসিয়ে দিইনি অন্ধকারে।

ভোর হল। আলোর আভাস আর পাখির ডাক জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকে বুঝিয়ে দিল, ‘লাল’-এ আমাদের আরও একটা রাত কেটেছে। আমি ঘুমিয়ে পড়লাম।

সকালে উঠে আবিষ্কার করলাম, রাতভোর লড়াইয়ের পর আমি যথারীতি ধ্বংসস্তূপ হয়ে থাকলেও মেরি আর টিম শান্তিতে ঘুমিয়েছে। যথাসাধ্য পরিপাটি হয়ে, ঠিক সকাল সাড়ে দশটার সময় ম্যানর হাউসে হাজিরা দিলাম। এই বাড়িটায় ঢুকতেই আমার বেশ ভালো লাগল। বাড়িটার কোথাও আড়ম্বর ছিল না, কিন্তু একটা সহজ উষ্ণতা ছিল।

“আমি জানতাম, এমন কিছু হবে।” লাইব্রেরিতে আমাকে বসিয়ে গম্ভীরভাবে বললেন স্যার উইলিয়াম, “প্রথম থেকে বলুন, ঠিক কী-কী হয়েছে।”

যথাসম্ভব সংক্ষেপে সবটাই বললাম। মেরির, টিমের, আমার অভিজ্ঞতা শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উইলিয়াম বললেন, “সব্বার সঙ্গে এমনটাই হয়। ভুতুড়ে বাড়ি ভাড়া দেওয়া হয়তো আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ নয়। কিন্তু ওই বদমায়েশ উইল্কস্‌ যে-ভাবে এই কথাগুলো চেপে গিয়ে আপনাদের মতো লন্ডনের বাসিন্দাদের ওই ‘লাল’-এ টেনে আনে, সেটাকে শয়তানি ছাড়া কিছু বলা যায় না। চল্লিশ বছর ধরে আমি ওই বাড়িটাকে দেখে আসছি। বিশ্বাস করুন, আমি যা বলছি, জেনে-বুঝেই বলছি।”

“কিন্তু ওখানে কী হয়েছিল?” আমি প্রশ্নটা না করে পারলাম না, “মানে এমনি-এমনি একটা বাড়িতে তো এই…সব হয় না।”

“অষ্টাদশ শতাব্দীতে বাড়িটার মালিক ছিলেন উইল্কস্‌-এর এক পূর্বপুরুষ। তিনি তাঁর স্ত্রীকে পছন্দ করতেন না। নিজের অনুগত চাকর-বাকরদের তিনি বলেছিলেন, তারা যেন তাঁর স্ত্রীকে যখন সম্ভব, যেখানে সম্ভব, যতভাবে সম্ভব ভয় দেখায়! সেই চাকরেরা কী করেছিল, তার কোনও খতিয়ান নেই। তবে একদিন ভোরের আগে সেই মহিলা নদীর জলে ডুবে নিজের জ্বালা-যন্ত্রণা জুড়িয়েছিলেন।”

“তারপর?”

“বাড়ির মালিক একটা ছোটোখাটো হারেম বানিয়েছিলেন ওই ‘লাল’-এ। তবে সেই সুন্দরীদের কারও পরিণতি সুখের হয়নি। একে-একে তারাও আশ্রয় নিয়েছিল ওই নদীর জলেই। তারপর ঠিক কতজন ‘লাল’-এর শিকার হয়েছে, আমি জানি না। গত চল্লিশ বছরে আমি ওখানে একটার-পর-একটা ‘দুর্ঘটনা’ বা আত্মহত্যা ঘটতে দেখেছি। আমার খুব কাছের দু’জন মানুষ— দুই ভাই ওই বাড়িতে থাকত। তাদের একজন আপনাদের শোয়ার ঘরটায় আত্মহত্যা করেছিল, অন্যজন নদীতে ডুবে মারা গেছিল। তবে সবচেয়ে ভয়ানক ছিল সেই প্রথম হতভাগিনী মহিলার শোয়ার ঘরটা। ওটা উইল্কস্‌ এখন বন্ধ করেই রাখে।”

“হ্যাঁ।” প্রথমদিন যে ঘরের জানালায় মুখটা দেখেছিলাম তার কথাটা মনে পড়ে শিউরে উঠলাম, “উইল্কস্‌ বলেছিলেন, ওই ঘরে নাকি ওঁর কী-সব জরুরি কাগজপত্র আছে।”

“কাগজ নয়, অন্য কিছু আছে!” শ্বাস ছেড়ে বলে উঠলেন উইলিয়াম, “ওকে বাধ্য করা হয়েছিল ওই ঘরটা বন্ধ রাখতে। সে-জন্যই ওই বাড়িতে মৃত্যুর সংখ্যা ইদানীং অনেকটাই কমে গেছে। তবু, এই চল্লিশ বছরে ‘লাল’-এর বাসিন্দাদের মধ্যে অন্তত বারোজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ এবং ছ’জন শিশুর মৃত্যুর কথা আমিই জানি। ভয় পেয়ে বা অন্যভাবে মৃত্যুর সব কথা তো আমি জানতেও পারিনি।”

আমি কিছু না বললেও উইলিয়ামা আমার অবস্থাটা বুঝতে পারলেন। একটু নরম গলায় ভদ্রলোক বললেন, “দু’বছর আগের ভাড়াটেরাও এক সপ্তাহ ওখানে থেকেই পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। সেই ভদ্রলোক উইল্কস্‌-এর বিরুদ্ধে মামলা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আইনত কিছু করার উপায় ছিল না। আমি আপনাকেও বলব, টাকার মায়া না করে ওখান থেকে চলে যান।”

“আচ্ছা…” হঠাৎ টিমের বলা কথাটা মনে পড়ল, “ওই বাড়িতে সবুজ বাঁদর টাইপের কিছুর কথা কেউ কখনও বলেছে? আসলে টিম কাল সন্ধেবেলা ওইরকম কিছু দেখেছিল।”

“কী সর্বনাশ!” উইলিয়াম উত্তেজিতভাবে বলে উঠলেন, “আপনি আর দেরি করবেন না। যে ছ’টি বাচ্চার মৃত্যুর কথা আমি বললাম, তারা প্রত্যেকেই জলে ডুবে যাওয়ার আগে বাগানের একপ্রান্তে ওই ছোট্ট গেটের কাছে সবুজ রঙের একটা জন্তু বা ওইরকম কিছু দেখেছিল। টিম যখন ওটাকে দেখেছে তখন ওরও ঘোর বিপদ!”

“আপনি নিজে কিছু দেখেছেন কখনও?”

“আমি ওই জঘন্য জায়গাটাকে যতটা পারা যায় এড়িয়েই চলি।” আমার চোখে চোখ রেখে বললেন উইলিয়াম, “যখনই ওখানে যাই, আমি কিছু-না-কিছু দেখি। সবচেয়ে মারাত্মক ব্যাপার হল, নিজের ঘরে এসেও রেহাই পাই না। স্বপ্নে দেখি, আমি ওই সরু লেনের একমাথায় নদীর পারে দাঁড়িয়ে আছি। জলের মধ্যে কিছু একটা জিনিস ভেসে আছে। প্রথমে মনে হয়, কাঠের টুকরো-টাকরা হবে। কিন্তু তারপর, যখন ওটা জলে ভেসে আমার কাছে আসে, তখন দেখি ওটা… অন্যকিছু! তারপর ওটা আমার দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। আর তখনই আমার ঘুম ভেঙে যায়। তবে প্রত্যেকবারই ভাবি, যদি ঘুম ভাঙার আগেই ওটা আমার নাগাল পেয়ে যায়?”

চুপ করে গেলেন উইলিয়াম। তারপর শান্ত গলায় বললেন, “উইল্কস্‌-এর বিষদাঁত কীভাবে ভাঙা যায়, তাই নিয়ে আমরা পরে আলোচনা করব। আপাতত আপনি ওখানে ফিরে যান, প্যাকিং করুন, তারপর ওখান থেকে পাততাড়ি গোটান।”

উইলিয়ামের সঙ্গে করমর্দন করে উঠে পড়লাম।

‘লাল’-এ ফিরে দেখলাম, টিম খুব ভালো মনমেজাজে আছে। তা-ও ভাবলাম, ওকে বাড়িটার থেকে দূরে রাখাই ভালো। মেরি আর নার্সকে প্যাকিং সারতে বলে আমি টিম-কে নিয়ে হাঁটতে বেরোলাম। কতক্ষণ যে আমরা নিজেদের আনন্দে এদিক-সেদিক ঘুরেছি, খেয়ালও ছিল না। তবে আলো কমে আসছিল। তারপর পশ্চিম আকাশ থেকে মেঘের গুমগুম আর একপশলা ঠান্ডা হাওয়া জানিয়ে দিল, বৃষ্টি আসছে। পেছনদিকে হাঁটা লাগালাম আমরা।

একটা বড়ো মাঠ পেরোনোর ঠিক আগেই চোখ-ধাঁধানো বিদ্যুতের ঝলক তুলে ঝড়টা এসে পড়ল। এবার দৌড় লাগালাম আমরা। আমরা যখন বাড়ির পাশের ওই সরু রাস্তাটায় এসে পড়েছি, তখনই আলগা হয়ে থাকা জুতোর ফিতেয় পা আটকে আমি আছাড় খেলাম। টিম আমার চেয়ে আগে ছিল। ও দৌড়ে ছোটো গেটের কাছে এসে পড়ল।

জুতোর ফিতেটা বেঁধে সোজা হতে-হতে আমার মনে হল, কে যেন গেট দিয়ে সাঁৎ করে বাইরে এল। টিম আর আমার মাঝে দাঁড়িয়ে এক-মুহূর্তের জন্য সে আমার দিকে ঘুরল, তখনই আমি তাকে ভালোভাবে দেখলাম।

লম্বা, সরু, সবুজ রঙের একটা… কিছু, যার মুখের জায়গায় রয়েছে বড়ো একখণ্ড শ্যাওলা!

পরক্ষণেই সে টিমের দিকে ঘুরল। একটা আর্তনাদ করে টিম নদীর দিকে ছুটতে শুরু করল। আমি প্রাণপণে ওর পেছনে দৌড়োলাম। তবে আমার আগেই ওই জিনিসটা টিমের কাছে পৌঁছে ওর ওপর ঝুঁকে পড়ল।

নদীতে ঝাঁপ দিল টিম!

এক মুহূর্ত কিছু না ভেবে আমিও ওর পিছু-পিছু ঝাঁপালাম। মনে হল, যেন একটা সবুজ আর দুর্গন্ধযুক্ত আবরণের মধ্য দিয়ে আমি জলে এসে পড়লাম। টিম তখন পারের কাছের ঝাঁঝি আর দামের মধ্যে হাত-পা ছুড়ছে। ওকে কোনওক্রমে বুকে টেনে, শান্ত করে পারে উঠলাম। টিম আমার কোলে চেপেই ফিরল।

জানালা দিয়ে আমাদের দেখে মেরি’র মুখের যে কী অবস্থা হয়েছিল, তা আর বোঝানোর চেষ্টা করছি না।

গাড়ি ডেকে লটবহর আর নিজেদের বসিয়ে আমি সদর দরজাটা বন্ধ করতে গেলাম। মনে হল, যেন দরজাটাকে ওপাশ থেকেই কেউ বা কারা ঠেলে দিল ভীষণ জোরে।

‘লাল’ রয়ে গেল তার আদি ও অকৃত্রিম বাসিন্দাদের হাতেই।

_

মূল কাহিনি: দ্য রেড লজ

লেখক: হার্বার্ট রাসেল ওয়েকফিল্ড

প্রথম প্রকাশ: ‘দে রিটার্ন অ্যাট ইভিনিং’ বইয়ের অংশ হিসেবে ১৯২৮ সালে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *