ওপরে – ঋজু গাঙ্গুলী

ওপরে

লোকটা ওপরদিকে তাকিয়ে কী দেখে?

ব্রায়োনি-তে আসার ক’দিনের মধ্যেই এই প্রশ্নটা প্যাকার্ডের মাথায় একেবারে জাঁকিয়ে বসল। ‘লোকটা’ মানে এক বেঁটেখাটো প্রৌঢ়। রাতে খাওয়ার জন্য ডাইনিং রুমে আসেন ভদ্রলোক। সে-সময়টা উনি একা থাকেন না। দেহরক্ষী গোছের এক মুশকো তাঁর পাশেই বসে থাকে নির্বাক হয়ে। কথা না বললেও তার হাত আর মুখ চলতে থাকে। কিন্তু লোকটা নয়, ওই প্রৌঢ়ই প্যাকার্ডের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। তার একটাই কারণ— ভদ্রলোক ওপরদিকে তাকিয়ে থাকেন!

প্রথমবার ওঁকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে নিজের অজান্তেই ওপরদিকে তাকিয়েছিলেন প্যাকার্ড। তাঁর মনে হয়েছিল, ভদ্রলোকের অবস্থান থেকে প্রায় পঁয়ত্রিশ ডিগ্রি কোণে ছাদের কাছে নিশ্চয় কিছু একটা আছে। কিন্তু সেখানে কিছুই ছিল না— নিরাবরণ, নিরাভরণ দেওয়াল ছাড়া। আরও বারকয়েক এ-জিনিস হওয়ার পর প্যাকার্ডের মনে হল, ভদ্রলোকের মাথাতেই গোলমাল আছে। সেটাও সাম্প্রতিক কিছু নয়, কারণ দীর্ঘদিনের অভ্যাস না থাকলে কেউ ঘাড় আর মাথা ও-ভাবে তুলে রেখেও পরিপাটি করে খেতে পারে না।

কিছুদিনের মধ্যেই প্যাকার্ড দেখলেন, এ-ভাবে চললে ব্রায়োনির মোলায়েম আবহাওয়া আর শান্ত পরিবেশেও তাঁর শরীর বা মন সারবে না। ভদ্রলোকের ওই অদ্ভুত ঊর্ধ্বমুখী ভঙ্গিমা নিয়ে দিনরাত ভাবা মোটেই স্বাস্থ্যকর নয়। নিজের খাওয়ার সময়টাই বদলে ফেললেন প্যাকার্ড। তার ক’দিনের মধ্যেই প্যাকার্ডের ডাক্তার হৃষ্টচিত্তে জানালেন, তাঁর স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়েছে। অতঃপর ব্রায়োনি-র রোদ-ঝলমলে পরিবেশ ছেড়ে লন্ডনে ফেরার প্রস্তুতি নিলেন তিনি।

লন্ডন ফেরার আগেরদিন বিকেলে হাঁটতে-হাঁটতে সমুদ্রের দিকে গিয়েছিলেন প্যাকার্ড। একটা ছায়াঘেরা জায়গায় মুখোমুখি দুটো বেঞ্চ পাতা। তার একটাতে বসে অনির্দিষ্টভাবে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি। আকাশে মেঘ জমেছে। তাদের গুরু-গুরু ধ্বনি আর সমুদ্রের ফিসফিস শুনতে-শুনতে তিনি বোধহয় ঘুমিয়েই পড়েছিলেন। হঠাৎ সরু, তীক্ষ্ণ গলায় একটা কথা শুনে প্যাকার্ডের চটকা ভাঙল।

“এইরকম দৃশ্যের মধ্যেও অনেকে দেবতার লীলা খুঁজে পায়— জানেন তো?”

ভারী দু’চোখের পাতা ফাঁক করে সামনে তাকালেন প্যাকার্ড। মেঘের আড়াল থেকে সূর্য অজস্র ছটায় ছড়িয়ে দিচ্ছে অস্তরাগ। সমুদ্র, আকাশ, মেঘ, রোদ— সব মিলে সত্যিই অনন্য এক দৃশ্য তৈরি করেছে। আনমনে মাথা নেড়ে বক্তার দিকে তাকিয়েই চমকে উঠে দাঁড়ালেন প্যাকার্ড।

তাঁর পাশেই এসে বসেছেন সেই ওপরদিকে তাকিয়ে থাকা প্রৌঢ়। উলটোদিকের বেঞ্চে বসে পাইপ ধরিয়েছে শক্তপোক্ত সঙ্গীটি। ঈষৎ বিরক্ত হলেও প্যাকার্ড আবার বসে পড়লেন। তারপর ঠান্ডা গলায় বললেন, “কোন দেবতা? সূর্যদেব? নাকি বরুণ? না পবন? নাকি বৃষ্টিতে ভিজে নিউমোনিয়া হলে একেবারে যম?”

“আপনাকে কিঞ্চিৎ… অবিশ্বাসী প্রকৃতির বলে মনে হচ্ছে।” সেইরকম সরু গলায় কিছুটা কৌতুক মিশিয়ে বললেন ভদ্রলোক।

আর একটু হলেই প্যাকার্ড “তাতে আপনার কী?” বলে খিঁচিয়ে উঠছিলেন। কিন্তু ডাক্তারের কড়া শাসন মনে পড়ে গেল তাঁর। শান্তভাবে তিনি বললেন, “প্রকৃতির সৌন্দর্যের মধ্যে দেব-দানব খুঁজে বেড়ালে আখেরে ক্ষতিই হয়।”

“দেব-দানব!” ভদ্রলোক বলে উঠলেন, “না। তাদের ব্যাপারে আমি কিছু জানি না। তবে আমি জানি, শয়তান আছে।”

ভদ্রলোকের নীরব সঙ্গীটি চমকে উঠল যেন। কড়া চোখে ভদ্রলোককে দেখে নিয়ে সে আবার পাইপে তামাক ঠুসতে ব্যস্ত হল। প্যাকার্ড কৌতূহলী হয়ে বললেন, “যুক্তির সাহায্যে আমারও মনে হয়েছে যে শয়তান আছে। আপনিও কি সে-ভাবেই বলছেন? না কি অন্য কিছুর ভিত্তিতে?”

“প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে বলছি।” আকাশের দিকে, সেই পঁয়ত্রিশ ডিগ্রি কোণে মুখটা তুলে রেখে ভদ্রলোক মুখে একটা শুকনো, নিরানন্দ হাসি ফুটিয়ে বললেন, “শুনবেন সে-কথা?”

“অবশ্যই। মানে… আপনার যদি কোনও অসুবিধে না থাকে, তাহলেই।”

“কোনও অসুবিধে হবে না। বরং হালকা লাগবে। ডাক্তার ছাড়া আর কাউকে তো বলিনি এ-সব কথা। আপনি গনট্রি হলের নাম শুনেছেন?”

“গনট্রি… নামটা চেনা-চেনা লাগছে যেন। কিন্তু ঠিক মনে করতে পারছি না।”

“মনে না থাকাই স্বাভাবিক।” ভদ্রলোক মাথা দুলিয়ে বললেন, “ওই বাড়িটা ছিল লিসেস্টারের কাছে। পুরোনো বাড়ি। স্থাপত্যের ভাষায় বলতে হয়, মিডল টিউডর। একটা লম্বা গ্যালারি ছিল ওখানে। আজ থেকে অনেকদিন আগে ও-বাড়িতে একটা… দুর্ঘটনা ঘটেছিল। সেই রাতে আমি ওখানে ছিলাম।”

“ওহ্‌!” অস্বস্তিভরে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন প্যাকার্ড। তারপর বললেন, “মনে পড়েছে! কী যেন একটা প্রবাদ ছিল ওই বাড়িটা নিয়ে। আমি সেই সূত্রেই নামটা শুনেছিলাম।”

“হ্যাঁ, সেই বাড়িটাই বটে।” একটা বড়ো শ্বাস নিয়ে ভদ্রলোক বলতে শুরু করলেন।

“ওই বাড়ির ছেলে জ্যাক গনট্রি আর আমি একসঙ্গে অক্সফোর্ডে পড়েছি। তখন নানা অলৌকিক ব্যাপার নিয়ে আমার খুব আগ্রহ ছিল। ঈশ্বর জানেন, সেদিনের সেই ঝোঁকের জন্য কী মূল্য দিতে হয়েছে আমাকে। কিন্তু গনট্রি হলের প্রবাদের ব্যাপারটা বিস্তৃতভাবে জানার জন্যই আমি জ্যাকের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছিলাম। একদিন রাতে আমরা আড্ডা মারছিলাম। জ্যাক সেদিন কিছুটা মাতালই হয়ে পড়েছিল। নানা কথার পর আমি বললাম, ‘তোমাদের গনট্রি হল নিয়ে অনেক গল্প শুনি। সেগুলো কি সত্যি?’

‘সত্যি না হলে বাড়ির সবাই মিলে আজ তাদের ‘বাৎসরিক সফর’ সারতে লন্ডনে গেল কেন?’

‘মানে?’

আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে জ্যাক বেশ কিছুক্ষণ ঝিম মেরে বসে রইল। আমার মনে হল, ওর মধ্যে একটা টানাপোড়েন চলছে। আরও কয়েক ঢোঁক পানীয় গলঃধকরণ করে ও বলল, ‘বছরের শেষ রাত্তিরটা ওই বাড়িতে কারও থাকার নিয়ম নেই।’

‘কেন?’

‘সেই সময়টা শয়তান আসে ও-বাড়িতে। গত তিনশো বছরে কেউ ওই বাড়িতে ও-রাত্তির কাটায়নি। ব্যাপারটা যাতে খুব বেশি প্রকট না হয় সে-জন্য তার বেশ কিছুদিন আগে থেকেই সবাই লন্ডনে চলে যায়। ক্রিসমাস, কেনাকাটা, নতুন বছরের হুল্লোড়, পিকনিক— সব সেরে ফেরে। এ-সব কথা কাউকে বলার নিয়ম নেই। তবে আজ… বলতে ইচ্ছে করছে।’

আমার বোধহয় তখনই ওকে চুপ করানো উচিত ছিল। কিন্তু কৌতূহলও হচ্ছিল। তাই জিজ্ঞেস করলাম, ‘তারপর কী হয়?’

‘পরদিন ভোরবেলা ক্যারো ওই বাড়িতে যায়। ও আমাদের বাটলার। কত বছর ধরেই ও আর ওর পূর্বপুরুষেরা আমাদের পরিবারে কাজ করছে— আমিও ঠিক জানি না। ও বাড়ির সবক’টা জানালা খুলে দেয়। না, সবক’টা নয়। দোতলায় দক্ষিণমুখো ঘরগুলোর মাঝের জানালাটা খোলা হয় সবার শেষে। সেখান থেকে সাদা সিল্কের একটা ব্যানার ও ঝুলিয়ে দেয় নীচের গ্যালারিতে। সেটাকে খুব ধীরে-ধীরে তিনবার নাড়তে হয়। তারপর… তারপর ও কী করে, শুনবে?’

‘না।’ জ্যাকের রক্তাভ মুখচোখ দেখে আমার মনে হচ্ছিল, এই কথাগুলো ও যেন ইচ্ছের বিরুদ্ধে বলছে। আমার ওর জন্য খারাপ লাগছিল। তাই ওকে থামিয়ে বললাম, ‘আর কিছু বলতে হবে। যা বলেছ সেটুকুও আমি ভুলে যাব।’

‘বেশ।’ এই বলে জ্যাক ঘর থেকে ঈষৎ স্থলিত পায়ে বেরিয়ে গেছিল। এরপর আর ওর সঙ্গে এই নিয়ে আমার কক্ষনও কথা হয়নি। তবে ওর সঙ্গে আমার বন্ধুত্বটা নিখাদ ছিল। চার বছরই আমি গরমের ছুটিতে বেশ কিছুদিন গনট্রি হলে কাটিয়েছিলাম।

স্যার জন আর লেডি গনট্রি বেশ শান্ত, ধীরস্থির, মিষ্টি স্বভাবের মানুষ। এস্টেটের লোকেদের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কটা প্রভু-ভৃত্যের বদলে অনেকটাই আত্মীয়তার ছিল। গনট্রি হলের ছিমছাম, শান্ত পরিবেশটাও আমার ভারি ভালো লেগে গিয়েছিল। তবে হ্যাঁ, গ্যালারি দিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে আমি যে মাঝেমাঝেই ওপরদিকে তাকিয়ে ওই জানালাটা দেখতাম— এ-ও অস্বীকার করব না। সেই মুহূর্তগুলোতে মনে হত, গরম আর ঝিমধরানো ওই পরিবেশেও কোত্থেকে যেন একচিলতে ঠান্ডা হাওয়া ঢুকে পড়েছে। একবার তো আমার স্পষ্ট মনে আছে, ওই জানালাতে আমি সাদামতো কী যেন দেখলাম! তবে ভালো করে তাকিয়ে আর কিছু পাইনি ওখানে। সম্ভবত আমার মনের ভুল।

পড়াশোনার পাট চুকলে আমরা নিজেদের মতো কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। তবে কিছুদিনের মধ্যেই জ্যাক বোয়্যর যুদ্ধে গেল। সেখানেই একটা শেল ওকে…! স্যার জন আর লেডি গনট্রি এই ধাক্কাটা সামলাতে পারেননি। তাঁরা সবার থেকে আলাদা হয়ে গেলেন। বছর ঘুরতে-না-ঘুরতে তাঁরা দু’জনেও চলে গেলেন জ্যাকের কাছেই।

মোটামুটি ধরেই নিয়েছিলাম যে, গনট্রি হলের সঙ্গে আমার সম্পর্ক সেখানেই শেষ হয়ে গেল। কিন্তু হঠাৎ একদিন কর্মসূত্রে টেলারের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। ও জমি-বাড়ির দালালি করত। লাঞ্চের ফাঁকে টেলার বলল, ‘গনট্রি হল কারা ভাড়া নিয়েছে জানেন?’

স্বাভাবিকভাবেই নিজের অজ্ঞতা ব্যক্ত করলাম। টেলর বলল, ‘রিফ্‌-দের নাম শুনেছেন?’

‘লন্ডনের উত্তরে বেশ কয়েকটা বড়ো দোকানের মালিক যে পরিবার, তাদের কথা বলছেন?’

‘হ্যাঁ। অসহ্য টাইপের লোকজন। পয়সার গরম আছে ষোলো আনা, কিন্তু বনেদিয়ানার লেশমাত্র নেই। ওরাই বাড়িটা ভাড়া নিয়েছে। তবে বেশিদিন থাকবে বলে মনে হয় না।’

‘কেন? বাড়িটা তো চমৎকার!’

‘সে-জন্যই তো ওরা ঠিক করেছে, বছরের শেষ দিনটা ওরা ওখানেই থাকবে— যাতে নতুন বছরকে স্বাগত জানানো যায়।’

‘সে কী! এত বছরের রেওয়াজ এভাবে ভেঙে ফেলা হবে?’

‘রেওয়াজটা কেন— তা আপনি হয়তো জানেন, অন্তত আন্দাজ করতে পারেন। তাই ওই রাত্তিরে ওরা ওখানে থাকা মানে পরদিন থেকেই আমাকে ও-বাড়ির জন্য নতুন ভাড়াটে খুঁজতে হবে। একরকম বাধ্য হয়ে আমি এই রেওয়াজটার ব্যাপারে ওদের বলেছিলাম। তাতে কিস্যু লাভ হয়নি। সব শোনার পর মিসেস রিফ খিলখিলিয়ে বলেছিলেন— ও মা! এ বাড়িতে ভূত আছে? আমার কতদিনের শখ ছিল এমন একটা বাড়িতে থাকার। তাহলে তো এই রেওয়াজটা ভাঙতেই হচ্ছে!’

‘ইন্টারেস্টিং।’ আমি বলতে বাধ্য হলাম, ‘মাত্র কয়েক বছরের মধ্য যারা লন্ডনে এতগুলো বড়ো দোকান হাঁকিয়েছে, তাদের সঙ্গে শয়তানের টক্করটা কেমন হবে— জানতে মন চায়।’

‘তাহলে আপনিও ওদের সঙ্গে সেই রাতে থাকছেন না কেন? ওরা লর্ড, স্যার, ব্যারন— এইসব উপাধিওয়ালা লোকেদের তো নেমন্তন্ন করে-টরে প্রায়ই। আর আপনিও তো একজন…!’

রিফ্‌-দের মতো মোটাদাগের লোকেদের ত্রিসীমানায় আমি থাকি না। কিন্তু টেলারের কথা শুনে মনে হল, সেই রাতে আমাদের ঘরে অসমাপ্ত থেকে যাওয়া আলোচনার শেষটা, জ্যাকের অবর্তমানেও, জানার একটা রাস্তা আমার সামনে খুলে গেছে। বাড়িটার পরিবেশ আমার কখনওই ক্ষতিকারক বলে মনে হয়নি। অলৌকিক নিয়ে বইপত্র তো অনেক পড়েছি। হাতে-কলমে কিছু দেখার সুযোগটা ছেড়ে দেব?

আমি রাজি হয়ে গেলাম।”

ভদ্রলোক এই কথাটা বলামাত্র প্যাকার্ডের মনে হল, ওই মুশকোটি চোখের ইশারায় ভদ্রলোককে কিছু একটা বলতে চাইছে। সতর্ক করতে চাইছে নাকি? কিন্তু ভদ্রলোক থামলেন না। আকাশের দিকে তাকিয়ে তিনি বলে চললেন।

“আজ থেকে তেইশ বছর আগের কথা, তবু আমার সব মনে আছে। টেলার আমার জন্য একটা আমন্ত্রণ জোগাড় করল। বছরের শেষ দিন আমি যখন লিসেস্টার স্টেশনে নামলাম তখন বিকেল সাড়ে পাঁচটা। ছোট্ট একটা ঘোড়ার গাড়িতে চেপে গনট্রি হলের দিকে রওনা হওয়ার সময় থেকেই নিজের মধ্যে একটা অদ্ভুত ভয়মিশ্রিত উত্তেজনা টের পাচ্ছিলাম। ঝোড়ো হাওয়া আর কনকনে ঠান্ডার জন্য কাঁপুনিটা ভেতরের মতো বাইরেও হচ্ছিল। হয়তো সে-জন্যই প্রথমবার বাড়িটার চৌকাঠ পেরোতে গিয়ে মনে হল, বিরক্ত আর রুষ্ট হয়ে আছে বাড়িটা।

আমরা মোট দশ জন ছিলাম ওখানে সেই রাতে— পাঁচজন পুরুষ, পাঁচজন মহিলা। প্রথম দর্শনে মনে হল, আমি ছাড়া বাকি ন’জন ‘বয়সের ধর্ম’ অনুযায়ী এই বিশেষ দিনটাতে একটু বেশিমাত্রায় পান করে ফেলেছে। তার ফলেই হইচই বড়ো বেশি হচ্ছিল। একটু-একটু করে বুঝতে পারলাম, বাকিরাও আমারই মতো ভয়ে আর উত্তেজনায় একেবারে টানটান হয়ে আছে। এই মদ্যপান আর অকারণ চেঁচামেচি তারই লক্ষণ। তার কারণটাও সহজবোধ্য। বাড়িটা যে আমাদের সবাইকে শত্রু বলে মনে করছে— সেটা একেবারে স্পষ্ট। জানালাগুলো বন্ধ থাকা সত্ত্বেও কনকনে ঠান্ডা একটা হাওয়ার দাপটে ঝনঝন করে উঠছে সবকিছু। আমরা কেঁপে উঠছিলাম থেকে-থেকে। সেই হাওয়ায় যেন একেবারে থিকথিক করছিল একটা হিংস্র শত্রুতার ভাব। মনে হচ্ছিল, সেটাকে দু’হাতে ঠেলে সরিয়ে নড়াচড়া করতে হচ্ছে আমাদের।

আমাকে পুরোনো ঘরটাই দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এবার তাতে পরিচিত উষ্ণতার লেশমাত্রও পাইনি আমি। মনে হচ্ছিল, ঘরটা যেন নীরবে আমাকে সাবধান করতে চাইছে। শুকনো মুখে পোশাক পালটে নীচে ‘পার্টিতে’ যোগ দিতে গেলাম ইচ্ছের বিরুদ্ধেই। না গিয়ে তো উপায় ছিল না।

রিফ্‌-রা ঠিক করেছিল, ডিনারটা খাওয়ার ঘরে না সেরে বড়ো ঘরে সারবে। সেই ঘরটাকে গোল করে ঘিরে রেখেছে একটা ব্যালকনি। আমরা খেতে বসলাম ঠিকই। কিন্তু নার্ভাস ভাবটা ততক্ষণে আতঙ্কের চেহারা নিয়েছে আমার মধ্যে। চেয়ারটা একহাতে ধরে রেখেছি, যাতে ছুটে পালিয়ে যতে ইচ্ছে হলেও নিজেকে সামলে রাখা যায়। তবে বাকিদের অবস্থা আমার চেয়েও খারাপ। মহিলারা একেবারে হিস্টেরিক আচরণ করছেন আর পুরুষেরা বোতলের-পর-বোতল ফাঁকা করছেন। কিন্তু নেশাগ্রস্ত হওয়ার বদলে ক্রমশ তাঁদের ভয়-পাওয়া চেহারাটাই আরও বেশি করে ফুটে উঠছে সবার সামনে।

আমার ডানপাশে বসে থাকা মহিলা একচুমুকে শ্যাম্পেনের গ্লাস ফাঁকা করে তীক্ষ্ণ গলায় চেঁচালেন, ‘কখন আসবে সে?’ বলেই খিলখিলিয়ে হাসতে শুরু করলেন তিনি। একজন পুরুষ গর্জন করে অদৃশ্য চাকরদের উদ্দেশে বললেন, ‘কারও টিকিটিও দেখা যাচ্ছে না কেন? এরপর বখশিস্‌ চাইলে শয়তানের কাছেই চেয়ে নিস্‌ তোরা!’ সব মিলিয়ে আমার মনে হচ্ছিল, আলোয় ভরা থাকলেও ঘরটা যেন নরকই হয়ে উঠেছে— ভয়ে, উন্মাদ আচরণে, অসংযমে!

সাড়ে এগারোটা থেকে ঘরটা কেমন যেন ধোঁয়াটে হয়ে উঠতে লাগল। সেই ধোঁয়ার মধ্যে অদ্ভুত-অদ্ভুত সব চিহ্ন তৈরি হচ্ছিল বাতাসে। অনুভব করলাম যেন ধীরে-ধীরে ঘরের মধ্যে হাওয়ার চাপ বাড়ছে। মাথাটা একেবারে ফেটে যাওয়ার জোগাড় হচ্ছে। একটা সময় ওই পরিবেশ আর সহ্য করতে পারলাম না। টেবিল থেকে উঠে, একছুটে নিজের ঘরে গেলাম। তারপর চাদর দিয়ে মাথা ঢেকে, পুরো পোশাক পরা অবস্থাতেই, কাঁপতে-কাঁপতে শুয়ে পড়লাম।

নীচ থেকে তখনও ফাঁপা হাসি আর অকারণ হুল্লোড়ের শব্দ ভেসে আসছিল। এ-ভাবে কতক্ষণ কেটেছিল জানি না। হঠাৎ একটা বিশাল ঘণ্টা বেজে উঠল— একবার-দু’বার-তিনবার! এতই জোরালো ছিল আওয়াজটা যে আমার মনে হল, যেন একটাই আওয়াজ টানা কিছুক্ষণ ধরে চলল। তারপর সেটা থেমে গেল। এক মুহূর্তের জন্য আর কোনও শব্দই হল না। তারপর একজন মহিলা চিৎকার করে বললেন, ‘ওই যে! ওপরে!’

পরক্ষণেই বাড়ির সব আলো নিভে গেল।

আর শুয়ে থাকতে পারলাম না। যে ব্যাগটা এনেছিলাম, তাতে একটা ইলেকট্রিক টর্চ ছিল। হাতড়ে-হাতড়ে সেটা বের করে নীচে চললাম আমি। টেবিলের ওপর আলো ফেলতেই দেখলাম, ন’জন নারী-পুরুষই পাথরের মূর্তির মতো অনড় হয়ে বসে আছেন। টর্চের আলোয় দেখতে পেলাম, প্রতিটি মানুষের চোখ বিস্ফারিত, অথচ মণিগুলো যেন চোখের কোণে সরে গেছে। আর সেইভাবে তাঁরা সবাই মুখ তুলে ওপরদিকে তাকিয়ে ছিলেন— যেখানে গ্যালারিতে ঢোকার দরজাটা আছে। মুখও খোলা ছিল। ঠোঁটের কোণে জমে ছিল ফেনা। তারপর আমি টর্চটা ঘোরালাম, যেদিকে ওঁরা সবাই তাকিয়ে ছিলেন। আর সেখানে… আর সেখানে…!”

মেঘের বাহিনী ততক্ষণে ওঁদের সবার মাথার ওপরে এসে পড়েছে। মনে হচ্ছে, যেন জমাট বাষ্পের দুটো শিং বেরিয়ে এসেছে মূল পুঞ্জটা থেকে। ভদ্রলোক ‘আর সেখানে… আর সেখানে…!’ বলামাত্র তার একটা থেকে বেরিয়ে অন্যটার দিকে ধেয়ে গেল চোখ-ধাঁধানো বিদ্যুতের ঝলক। মিস্টার প্যাকার্ডের মনে হল, মেঘ নয়— যেন জ্বলন্ত শুঁড়ের মতো অনেককিছু পাক খাচ্ছে তাঁদের ঠিক ওপরেই। আকাশ-বাতাস ফাটিয়ে বাজ পড়ার শব্দটা তাঁর কানে এসে পৌঁছোল তারপরেই।

তখনই বৃষ্টি নামল মুষলধারে।

ভদ্রলোক সে-সবের তোয়াক্কাও করলেন না। তিনি লাফিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে আর্তনাদ করলেন, “ওই যে! ওপরে!”

ঝড় আর বৃষ্টির দাপটে প্যাকার্ডের মনে হল, তিনি বোধহয় অন্ধ হয়ে গেছেন। সেই অবস্থাতেও তিনি মুখ তুলে তাকাতে চাইলেন আকাশের দিকে— যেদিকে মুখ তুলে চিৎকার করছিলেন ভদ্রলোক। কিন্তু তার আগেই তিনি দেখলেন, ভদ্রলোকের সঙ্গী পাঁজাকোলা করে তাঁকে তুলে নিয়েছে। প্যাকার্ড তার দিকে এগোতে গেলেন। লোকটা মাথা নেড়ে তাঁকে বারণ করল। তারপর মানুষটিকে দু’হাতের মধ্যে নিয়ে ছুটল অন্যদিকে। হাওয়ার দাপটের মধ্য দিয়েও তার বলা “ওঁকে আমার হাতে ছেড়ে দিন। আমি জানি কী করতে হয় এই অবস্থায়!” প্যাকার্ডের কানে এল।

ভদ্রলোকের চিৎকার ক্ষীণ হতে-হতে মিলিয়ে গেল। তুমুল বৃষ্টির মধ্যে কিছুক্ষণ হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন প্যাকার্ড। তারপর চরাচর সাদা করে দিয়ে আরেকবার বিদ্যুৎ চমকাল। হুঁশ ফিরে পেয়ে, ওই কনকনে ঠান্ডা জলের ধারা মাথায় নিয়ে হোটেলের দিকে ছুটতে শুরু করলেন তিনি।

_

মূল কাহিনি: ‘লুক, আপ দেয়ার!’

লেখক: হার্বার্ট রাসেল ওয়েকফিল্ড

প্রথম প্রকাশ: ‘ওল্ড ম্যানস্‌ বিয়ার্ড: ফিফটিন ডিস্টার্বিং টেলস্‌’ সংকলন (১৯২৯)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *