বুদ্ধদেব যখন সিদ্ধার্থ ছিলেন – দীপান ভট্টাচার্য
বুদ্ধদেব যখন সিদ্ধার্থ ছিলেন (ইতিহাসের প্রেক্ষিতে কপিলাবস্তু ও লুম্বিনী- একটি ভ্রমণ ও অনুসন্ধান) – দীপান ভট্টাচার্য
.
প্রথম লেখার উৎসাহ যাঁর কাছ থেকে পেয়েছি
সেই প্রিয়জন, আমার মা-কে দিলাম
.
পুব্বকথা
প্রথমেই বলে রাখি যে এই বইটি কোনোভাবেই বুদ্ধদেবের বিষয়ে নয়, এই বইটি কুমার সিদ্ধার্থের। বুদ্ধদেবের উপদেশ, তাঁর জীবন, তাঁর দর্শনবোধ ইত্যাদি নিয়ে বহু বই থাকলেও তাঁর ঐতিহাসিকতা নিয়ে বই একদম বিরল। তাঁর জন্মের সঙ্গে জড়িয়ে আছে লুম্বিনী ও কপিলাবস্তু। সিদ্ধার্থ হিসেবে লুম্বিনীতে জন্মের পর ২৯ বছর বয়সে জ্ঞান লাভের জন্যে নিষ্ক্রমণ অবধি তাঁর জীবন কেটেছিল কপিলাবস্তুতে। আমাদের তত্ত্বতালাশ সবকিছুই মোটামুটি এই দুটি স্থান নিয়ে। এর সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে এসে পড়েছে শাক্য জাতির উদ্ভব আর তার বিনাশও। শাক্য জাতির কথা আমরা জানি কিন্তু বুদ্ধদেব না থাকলে বোধহয় ইতিহাসে শাক্য জাতি এতটা জায়গা পেত না। তবু শাক্য জাতির ইতিহাস না জানলে সিদ্ধার্থকে জানা অসম্পূর্ণ থেকে যায় আর তাই আমাদের এখানে শাক্য জাতি নিয়ে অনেকটাই আলোচনা করতে হয়েছে।
বুদ্ধদেবের ঐতিহাসিকতা খুঁজে বার করতে গেলে আমাদের সবচেয়ে বড়ো যে অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয় তা হল তথ্যের উৎস। বুদ্ধদেবের মৃত্যুর অনেক পরে তাঁর জীবনের ঘটনাগুলি লিপিবদ্ধ হয়েছিল। ততদিনে সিদ্ধার্থ থেকে বুদ্ধদেব হয়ে তিনি ভগবানে উন্নীত হয়ে পড়েছেন আর তাই সেইসব লেখাগুলি অতিরিক্ত পরিমাণ অতিরঞ্জিত। তারপর সেখান থেকে আজ অবধি যুগে যুগে সেগুলিতে অতিলৌকিক উপাদান আরও বেড়েছে।
বুদ্ধদেবের জীবনী সেই অর্থে অনেকটাই কিংবদন্তী নির্ভর। বৌদ্ধ ধর্ম তো আর শুধু ভারতেই আবদ্ধ ছিল না, অনেক স্থানেই ছড়িয়ে পড়েছিল আর সেইসব স্থানে আরও অনেক উপাদান যুক্ত অথবা বিযুক্ত হয়েছে। আর তাই সেগুলি থেকে ঘটনার ঘনঘটাকে সরিয়ে বীজ কাহিনিটিকে বের করে আনতে হলে বিভিন্ন উৎসের কাহিনিগুলির মধ্যে একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ জরুরি ছিল।
কাহিনির সঙ্গে বাস্তবের কতোটা মিল আছে তা জানতে এর পরের হাতিয়ার হল ভ্রমণকাহিনি। সেই স্থানগুলি যদি অতীতে কেউ ভ্রমণ করে লিপিবদ্ধ করে থাকেন।
বৌদ্ধ ভারতের অন্যান্য স্থানের মতোই লুম্বিনী-কপিলাবস্তুর খোঁজে আমাদের কাছে তথ্যের একটি বড়ো উৎস হল চীনা পরিব্রাজকদের ভ্রমণ বৃত্তান্ত বিশেষ করে ফা-হিয়েন (Faxian) ও হিউয়েন সাঙ (Xuanzang)। পরিব্রাজকদের কাহিনি অনুসরণ করে এগিয়ে গিয়ে স্থানগুলি খুঁজে পাওয়া যতটা ভাবতে সহজ লাগছে বিষয়টা কিন্তু ততটা সোজা নয়। এখানেও অনেক অসুবিধার মুখোমুখি হয়েছি। চীনা পরিব্রাজকদের তথ্য যেমন সাহায্য করেছে তেমন বিষয়টিকে কম জটিল করে তোলেনি! বইটি পড়ার সময়ে পাঠক তা বুঝতে পারবেন। এই প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয় বলা প্রয়োজন- তা হল চীনা পরিব্রাজকদের নামের বানান। বিভিন্ন সময়ে ও বিভিন্ন ভাষাবিদদের কাছে এঁদের নামের উচ্চারণ হয়েছে ভিন্ন, বিশেষ করে হিউয়েন সাঙের। এখন সবাই মোটামুটি ‘ফা-হিয়েন’ নাম অনুসরণ করলেও হিউয়েন সাঙ-এর ক্ষেত্রে অনেক বৈচিত্র্য আছে। তাঁর ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নাম অনুসরণ করা হয়েছে। এখন যেমন ‘জুয়ানজ্যাং’ নামটির চল আছে। হিউয়েন সাঙের নামের বৈচিত্র্যের বিষয়ে অধ্যাপক বারিদবরণ ঘোষ বলেছেন যে, “এইসব ঐতিহাসিকেরা বিভিন্ন দেশের অধিবাসী ছিলেন বলে নিজেদের উচ্চারণ পদ্ধতি অনুসারে বানান গঠন করেছেন। সেদিক থেকে বাংলাতেও বিচিত্র উচ্চারণ হতে পারে – ইউআঁ, শূআন, হিউএন প্রভৃতি। ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ‘হিউ–এন্-ৎ-সাঙ্’ বানানও অনুমোদন করেছেন। তবে বেশিরভাগ বাঙালির উচ্চারণে হিউয়েন-সাঙ-ই গৃহীত।” অধ্যাপক ঘোষের সঙ্গে একমত হয়ে আমিও হিউয়েন সাঙ নামটিই গ্রহণ করেছি। তেমনই ফা হিয়েন নামটি ব্যবহার করেছি।
তারপর যা বলছিলাম, বিভিন্ন কিংবদন্তী থেকে মূল বীজ কাহিনিটিকে আলাদা করে নিয়ে পরিব্রাজকদের বর্ণনার সঙ্গে মিলিয়েই আমাদের কাজ শেষ হয় না। তারপর আমাদের পাথুরে প্রমাণ খুঁজে বার করবার পালা। আলাদা আলাদা ভাবে হলেও বুদ্ধের জীবনের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন স্থানে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন হয়েছে। এবারে সেই খননের সার অংশ খুঁজে তার সঙ্গে কিংবদন্তীর বীজ কাহিনির সাদৃশ্য আছে কি না সেটাও তো দেখা দরকার।
প্রকৃতপক্ষে কাজের এই পর্বটি ছিল সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং। যেখানে যেমন পাথুরে প্রমাণ পাওয়া গেছে তেমনই তার সঙ্গে কাহিনির ধারাকে বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে।
অনেক কিংবদন্তীর ভিড়ে মানুষ বুদ্ধদেব যেন এক অলৌকিক চরিত্র হয়ে উঠেছেন। এই বইয়ের মূল বিষয় হচ্ছে প্রত্নতত্ত্ব ও অন্যান্য তথ্যের কষ্টিপাথরে সেইগুলিকে যাচাই করে নেয়া। বিভিন্ন গ্রন্থে বুদ্ধের জীবন নিয়ে যে বর্ণনা আছে তাতে বুদ্ধ ছাড়া যে ভৌগোলিক বর্ণনা আমরা পেয়ে থাকি- বিশেষত স্থানগুলির নাম- তার বেশিরভাগই বাস্তবের জায়গা। যদিও কয়েকটি স্থান নিয়ে জটিলতা আছে; তার মধ্যে একটি হল কপিলাবস্তু।
বুদ্ধের জন্মস্থান হল লুম্বিনী আর নিজের নগর ছিল কপিলাবস্তু। বিভিন্ন গ্রন্থে এই স্থান দুটি নিয়ে অসাধারণ সব বর্ণনা থাকলেও বাস্তবে তার কতটুকু যে সত্যি সেই নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায় আর সেই সন্দেহ একমাত্র দূর করতে পারে প্রত্নতত্ত্ব। লুম্বিনীতে অনেকদিন ধরে খনন হয়েছে এবং কিছুদিন আগের খননের ফলে এমন সব তথ্য সামনে এসেছে যা চমকে দেওয়ার মতো।
খননের প্রত্নবস্তুর কালনির্ণয় (dating)-য়ের সঙ্গে বুদ্ধের প্রথাগত সময়কালের বেশ কিছু অংশ মানানসই হয় না; আর তখন বোঝা যায় যে বিষয়টিকে অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে। এই বইতে সেই চেষ্টাই করা হয়েছে, তবে সম্পূর্ণ যুক্তিনিষ্ঠ উপায়ে, পাথুরে প্রমাণ সংগ্রহ করে। সেইসঙ্গে বইতে আলোচিত স্থানগুলি বিশেষ করে লুম্বিনী ও কপিলাবস্তু যাওয়ার উপায়ও দিয়েছি। তবে ভ্রমণ কাহিনি নয়, আমি নিজে এইসব স্থানগুলি ঘুরেছি তাই কাজের মতন তথ্যই দিয়েছি শুধু।
কপিলাবস্তুকে খুঁজে বার করার চেষ্টা চলেছিল অনেকদিন ধরেই, আর সেই কাজে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছিলেন এক ভুলে যাওয়া বাঙালি প্রত্নতাত্ত্বিক যার নাম ছিল পূর্ণ চন্দ্র মুখার্জি বা পি সি মুখার্জি। আজ থেকে প্রায় ১২৫ বছর আগে ১৮৯৯ সালের ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাস জুড়ে তিনি প্রাণ হাতে করে কাজ করে গিয়েছিলেন তরাই অঞ্চলে। আমি বাড়িয়ে কিছু বলিনি, তিনি সত্যিই প্রাণ হাতে করে প্রত্নতত্ত্বের জন্যে কাজ করেছিলেন। তখন সেইসব অঞ্চল ছিল ঘন জঙ্গলে ঢাকা। তাঁর লেখা থেকে দেখতে পাই যে তিলৌরাকোটে খনন করতে গিয়ে তিনি বাঘের আক্রমণের মুখোমুখি হয়েছিলেন (Since the forests are all reserved by the Nepali Government, nobody is allowed to cut even for fuel. They are full of wild animals, which generally intrude upon the neighboring villages. One day, as I saw one tiger almost attacking me near the ruins of Tilaurakot, exploration of the ruins was not altogether without risks and difficulties. p 1)। সুতরাং পি সি মুখার্জির হাতে প্রথম পদ্ধতিগত ভাবে খনন শুরু হয়েছিল সেইসব এলাকায়। খনন ছাড়াও এক বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে তাঁর প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ ছিল অসামান্য। তাঁর খননেই লুম্বিনীর চরিত্র উন্মোচিত হয়। দুঃখের কথা এই যে আজ তিনি একদম বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গিয়েছেন। আমি যখন তিলৌরাকোটে গিয়ে দেখেছিলাম যে জায়গায়-জায়গায় তাঁর নাম ও কাজের উল্লেখ বোর্ডে পর্যন্ত দেওয়া রয়েছে, তখন বেশ ভালো লেগেছিল। নেপালি প্রত্নতত্ত্ব দপ্তরের কর্মচারীরা আমায় বলেছিলেন যে,“আপনারা ভারতীয়রা তাঁকে ভুলে গেলেও আমরা নেপালিরা তাঁকে চিরকাল মনে রাখব।”
বুদ্ধের জীবনের এই স্থানগুলি নিয়ে গবেষণার আরেকটা বাধা আছে- তা হল ডঃ ফিউরারের অশরীরী উপস্থিতি। জালিয়াতির গুরু এই মানুষটিকে প্রত্নতাত্ত্বিক বলাও পাপ কারণ তাঁর স্বার্থসিদ্ধি ছাড়া তিনি কোনো কাজ করেননি। তরাই অঞ্চলের একাধিক প্রত্নক্ষেত্রকে তিনি খননের ছুতোয় লুট করেছেন এবং এমন ভাবে নষ্ট করেছেন যে তার থেকে পরেও কোনো কাজ করা প্রায় অসম্ভব। এক্ষেত্রে পি সি মুখার্জি আরেকটি প্রশংসনীয় কাজ করেছিলেন, তিনি অন্তত একটি ক্ষেত্রে (সাগরওয়া) ফিউরারের নকশাকারকে খুঁজে বার করে তাঁর স্মৃতি থেকে খননে প্রাপ্ত কাঠামোর খুঁটিনাটি জেনে নিয়ে সেগুলি লিখে ও এঁকে রেখে গেছেন। আমাদের কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান পেতে সেই তথ্যগুলি খুবই সাহায্য করেছে। অবশ্য শুধু সাগরওয়া নয়, মুখার্জি তরাইয়ের অনেক স্থানেই ফিউরারের বর্ণনা যে মিথ্যে তা দেখিয়েছেন।
সুতরাং এই বইয়ের কাজটি যেমন অনেক প্রচলিত বিশ্বাসের বিরোধী তেমনই অনেক নতুন তথ্য দিয়ে একটি অজানা রাস্তার সন্ধান করা হয়েছে। কপিলাবস্তুর বিষয়টি বেশ সংবেদনশীল কারণ এখানে দুটি দেশের মধ্যে মতান্তর আছে। নেপালের পক্ষ থেকে তিলৌরাকোটকে এবং ভারতের পক্ষ থেকে পিপরাওয়াকে কপিলাবস্তু হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে। বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ সমাজের কাছে কপিলাবস্তুর গুরুত্ব অপরিসীম। এর সঙ্গে ধর্মীয় পর্যটন, অবকাঠামো উন্নয়ন, soft power, ঐতিহ্য, বৌদ্ধ প্রধান দেশগুলির সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ইত্যাদি একগুচ্ছ বিষয় জড়িয়ে আছে। তাই বর্তমানে এটি শুধুমাত্র ভারত-নেপাল দ্বিপাক্ষিক বিষয়ের মধ্যে আর আটকে নেই।
২০১০ সাল নাগাদ লুম্বিনী উন্নয়ন প্রকল্প (Lumbini Development Project) নামে একটি প্রকল্প চীন ঘোষণা করে। নেপালে অবস্থিত বুদ্ধদেবের জন্মস্থান লুম্বিনীর উন্নয়নের লক্ষ্যে চীনের এই উদ্যোগের লগ্নি ছিল প্রায় ৩০০ কোটি ডলার। চীনা সরকারের মদতপুষ্ট এশিয়া প্যাসিফিক এক্সচেঞ্জ অ্যান্ড কো-অপারেশন ফাউন্ডেশন (এপিইসিএফ), এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন ও পরিচালনার জন্য নেপালি সরকারের সঙ্গে অংশীদারিত্ব করেছে। বিভিন্ন ধর্মীয় স্থাপত্য নির্মাণ ছাড়াও এই প্রকল্পে একটি বিমানবন্দর, হাইওয়ে, হোটেল, কনভেনশন সেন্টার এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করা হবে বলে জানা গেছে। লুম্বিনীর অবস্থান ভারত নেপাল সীমান্তের খুবই কাছে এবং সেখানে চীনা উপস্থিতি আর যোগাযোগ ও অবকাঠামোতে তাদের প্রবেশ আমাদের নিরাপত্তার প্রশ্নে আশঙ্কাজনক। তাছাড়া এই প্রকল্পটি দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং বৌদ্ধ ঐতিহ্যবাহী স্থানের প্রচারে তার আগ্রহের কথা তুলে ধরে একটি সুবিধাজনক স্থানে পৌঁছাবার চেষ্টা; যেন বৌদ্ধ ধর্মীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে নিজের ভাবমূর্তি উন্নত করে তোলা। এর ফলে বিশ্বব্যাপী বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে তিব্বত প্রসঙ্গে চীনের খামতি পুষিয়ে দেওয়ার প্রয়াস আছে।
শেষ পর্যন্ত এই বইটি হল তিনটি অজানা রাশি দেওয়া অঙ্কের সমীকরণের সমাধান করা, যেখানে একটি রাশি হল কিংবদন্তী, দ্বিতীয়টি পরিব্রাজকদের বৃত্তান্ত আর তৃতীয় রাশিটি হল খননে পাওয়া তথ্য। এই বইতে প্রত্যেকটি রাশিকেই উপযুক্ত মর্যাদা দিয়ে সমাধানে পৌঁছানোর প্রয়াস করা হয়েছে।
বুদ্ধের সময়কাল ভারতের ইতিহাসে আরেকটি বৈশিষ্ট্য এনে দিয়েছিল, যাকে আমরা ষোড়শ মহাজনপদের কাল বা দ্বিতীয় নগরায়ণের কাল বলে থাকি। এই সময় ভারত জুড়ে বেশ কয়েকটি ক্ষমতার কেন্দ্র মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে এবং বুদ্ধের কার্যকলাপের সঙ্গে এদের উল্লেখ বারেবারে আসে। তখনকার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বুঝতে ষোড়শ মহাজনপদকে বোঝা জরুরি আর তাই পাঠকের সুবিধার জন্যে একটি অধ্যায়ে আমি এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে রেখেছি।
এই বই লিখতে বৌদ্ধ গ্রন্থ, পুরাণ, শাস্ত্র ও প্রত্নতত্ত্ব সম্বন্ধীয় অনেক গ্রন্থের প্রয়োজন হয়েছিল। এক্ষেত্রে আমার বাবার সংগ্রহ করা বইগুলি চাহিদার অনেকটাই মিটিয়ে দিয়েছে।
আরেক সাহায্যের কথা না বললে অপরাধ হবে তা হলো archive, ancientbuddhism ও wisdom library বলে তিনটি ইন্টারনেট সাইটের কথা। এদের বইয়ের ভাণ্ডার আমাদের কাছে এক বড়ো অবলম্বন।
বই লেখার ক্ষেত্রে আরেক সমস্যার বিষয় ছিল কিছু দুষ্প্রাপ্য বই জোগাড় করা। অনেক বই কাছে থাকলেও, বিষয়ের বিশাল ব্যাপ্তিকে ধরার জন্য আরো বহুতর বই পড়ার দরকার হচ্ছিল। এই ক্ষেত্রে অনেকের সাহায্য আমার কাছে অপরিসীম। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়, জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্দিরা গান্ধী ন্যাশনাল সেন্টার ফর আর্টস, অ্যামিটি বিশ্ববিদ্যালয়, তাদের লাইব্রেরি আমায় ব্যবহার না করতে দিলে হয়তো এই বই লেখা সম্ভব হত না।
বই পাওয়ার পর আসে পড়ার আয়োজন; কত বই যে নিয়মিত পড়ে ফেললাম তার ইয়ত্তা নেই। নিজের বোঝার পরে আরেক কঠিন কাজ ছিল তাকে সাধারণের বোঝার মতো করে লেখা। আমি চেষ্টা করেছি সহজ ভাষায় এই জটিল বিষয়গুলির উপস্থাপনা করতে যাতে একজন সাধারণ মানুষেরও কৌতূহল মেটে। অনেক সময়ই ঠিকঠাক পরিভাষা না পেয়ে আমার মতো করে লিখেছি আর ইংরেজি শব্দটাও পাশে লিখে দিয়েছি। উদ্ধৃত শ্লোকের ক্ষেত্রে, তার সংখ্যার সঙ্গে সঙ্গে আমি চেষ্টা করেছি যে মূল পাঠটি দিয়ে দিতে যাতে পাঠকের বুঝতে অসুবিধা না হয় এবং গবেষকদের সুবিধা হয়।
বৌদ্ধ গ্রন্থগুলির অনুবাদ জোগাড় করতে আমাকে প্রথমে একটু বেগ পেতে হয়েছিল। প্রত্যেকটি বিষয়ের কিছু নিজস্ব পরিভাষা থাকে। বৌদ্ধ ধর্মের বিষয়ে বাংলায় ভাব প্রকাশ করতে সেইগুলির পরিচয় পাওয়া দরকার আর তাই অন্তত কিছু গ্রন্থের বাংলা অনুবাদের প্রয়োজন ছিল। এই ব্যাপারে আমায় খুব সাহায্য করেছেন বাংলাদেশ থেকে দীনেশরত্ন প্রভাকর সিদ্ধার্থ।
আমার সৌভাগ্য যে এই বই নির্মাণে এহেন অনেক জ্ঞানীগুণী মানুষের সাহায্য আমি পেয়েছি। এঁদের মধ্যে যাঁদের নাম না বললেই নয় তাঁরা হলেন, কুন্তল রায়, ডঃ অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায়, শুভম মুখোপাধ্যায়, মোঃ ফরহাদুর রহমান, নরেন কোটনালা। বুদ্ধের জন্ম সংক্রান্ত বিষয়টি জানতে আমাকে নিজের ক্ষেত্র ছাড়িয়ে অন্য বিষয় নিয়ে প্রচুর পড়াশোনা করতে হয়েছে। এই বিষয়ে দিল্লীর All India Institute of Ayurved-র প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগ থেকে খুবই সাহায্য পেয়েছি যাঁদের মধ্যে ডঃ মীনাক্ষী পাণ্ডে অন্যতম। এরপর আসবে আমার অত্যাচার সবচেয়ে বেশি সহ্য করে চলা মানুষদের কথা-আমার স্ত্রী গোধূলি আর ছেলে ঋক। এদের হাসিমুখগুলি
আমার সব কষ্ট দূর করে দেয়।
অনেক বছর ধরে আমি বাংলার বাইরে; তাই হয়তো ভাষার আড়ষ্টতা বা ছোটোখাটো ভুল ভ্রান্তি থেকে গেল, সেগুলি পাঠক মার্জনা করে দেবেন।
দীপান ভট্টাচার্য


Leave a Reply