কোথায় লুকিয়ে আছে কপিলাবস্তু
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে উত্তর-পশ্চিম প্রদেশ ও অযোধ্যা (North-Western Province and Oudh)-র বস্তি জেলায় ছিল উইলিয়ম ক্ল্যাক্সটন পেপ্পে (William Claxton Peppé)-র জমিদারি। তাঁর জমিদারিতে পিপরাওয়া গ্রামের কাছে ছিল বিশাল এক ধ্বংসস্তূপ। ১৮৯৭ সালে পেপ্পে সেই স্তূপটি খনন করবেন বলে স্থির করলেন। তার কয়েকবছর আগেই লুম্বিনীতে অশোক স্তম্ভ ও মায়াদেবীর মন্দির আবিষ্কার হয়েছে এবং সেই ঘটনা তখন বেশ আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল আর তাই লুম্বিনী থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে এমন একটি স্তূপের নীচে যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পাওয়া যেতে পারে তা তিনি আন্দাজ করেছিলেন। তখন অর্থাৎ ১৮৯৬-৯৭ জুড়ে মধ্য ও উত্তর-পশ্চিম ভারতে চলছিল ভয়ঙ্কর দুর্ভিক্ষ। অনাহার এবং মহামারীর যৌথ আক্রমণে পোকামাকড়ের মত মারা পড়ছে মানুষ। পেপ্পে ভাবলেন যে এমন সময়ে স্থানীয় মানুষদের নিয়ে খনন কাজ চালালে মজুরি বাবদ পাওয়া টাকাপয়সায় তাদের কিছু উপকার হবে। তাই ১৮৯৭ সালে তিনি তাঁর জমিদারির একটি ধ্বংসস্তূপের স্থানে খনন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। প্রায় আট ফুট মতো খুঁড়েও ইটের কাঠামো ছাড়া উল্লেখযোগ্য কিছুই পাওয়া যায়নি দেখে পেপ্পে খনন বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তারপর এই স্থানের পাশের ধ্বংসস্তূপটির ওপর থেকে জঙ্গল সাফ করে দেখা গেল যে সেটি প্রকৃতপক্ষে ১৩০ ফুট ব্যাসের ইটের তৈরি একটি বিরাট স্তূপ।
১৮৯৭ সালের অক্টোবর মাসে ভিনসেন্ট এ স্মিথ (তখন তিনি ICS officer হিসেবে কর্মরত ছিলেন) পিপরাওয়া এসে স্তূপটি দেখে মত দিয়েছিলেন যে সেটি একটি প্রাচীন বৌদ্ধ স্তূপ হতে পারে। এমন বিশাল স্তূপ যখন তখন তা সম্রাট অশোকের দ্বারাই তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা আছে এবং এর ঠিক মাঝখানে খনন করলে কিছু বস্তু হয়তো পাওয়া যাবে। স্মিথের বক্তব্য শুনে এর কয়েক মাস পর ১৮৯৮ সালের জানুয়ারি মাসে পেপ্পে আবার স্তূপের খনন শুরু করে দিলেন। স্তূপের ঠিক মাঝখানে দশ ফুটের একটি বর্গাকার গর্ত খুঁড়ে ধীরে ধীরে নীচে নামতে শুরু করেছিলেন। দশ ফুট গভীরে যাওয়ার পর প্রথম কিছু পাওয়া গেল, সেটি ছিল সাজিমাটির একটি ভাঙা পাত্র (soapstone vase)। মাটি দিয়ে ভর্তি সেই পাত্রের ভেতরে ছিল পুতি, স্ফটিকের টুকরো, সোনার অলঙ্কার, তারার আকারের বস্তু ইত্যাদি। ঠিক এর নীচে একটি গোলাকার নল বা চোঙ ছিল। বিশেষ ধরনের ইট কেটে বানানো এই চোঙটির ব্যাস ওপরে এক ফুট থেকে শুরু হলেও তা ক্রমশ কমতে কমতে দুই ফুট মতো গভীরে গিয়ে মাত্র চার ইঞ্চি হয়ে গিয়েছে। এরও নীচে অর্থাৎ স্তূপের শীর্ষ থেকে ১৮ ফুট নীচে যাওয়ার পর সেই সম্পদের হদিশ পাওয়া গেল যার আশায় সবাই ছিল। খননে উন্মোচিত স্থানে দেখা মিলল প্রায় তিন ফুট (৩১.৫”) লম্বা একটি পাথরের পাটা। পাটাটি ছিল ভাঙা কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল একটি ঢাকনা কারণ এর নীচে ছিল বেলেপাথরের তৈরি একটি বিশাল বাক্স (৪’ ৪” x ২’ ৮.২৫” x ২’ ২.২৫”)। ঢাকনা ছাড়া সেই দৈত্যাকার বাক্সের ওজনই ছিল প্রায় ৭০০ কিলোগ্রাম আর খালি ঢাকনার ওজনই হল ১৮৫ কিলোগ্রাম।

বাক্সের ভেতরে ছিল অনেকগুলি বস্তু-
১) সাড়ে সাত ইঞ্চি লম্বা একটি সাজিমাটির পাত্র,
২) ছয় ইঞ্চি লম্বা ও সাড়ে চার ইঞ্চি ব্যাসের একটি লেখ যুক্ত মঞ্জুষা,
৩) ঘটির মতো আকারের ঢাকনা সহ একটি সাজিমাটির পাত্র,
৪) একটি ছোটো সাজিমাটির পেটিকা।লম্বায় আড়াই ইঞ্চির মতো আর ব্যাস সাড়ে তিন ইঞ্চি হবে।
৫) অপূর্ব সুন্দর পালিশ করা একটি স্ফটিকের পাত্র, ঢাকনা সমেত যার উচ্চতা সাড়ে চার ইঞ্চির মতো। এই পাত্রের ঢাকনাটি ছিল একদমই আলাদা। ঢাকনার ওপরে ধরার হাতলটি একটি মাছের আকৃতির। ফাঁপা সেই মাছের মতো দেখতে হাতলের ভেতরে ছিল সাতটি তারার মতো আকৃতির দানা, সোনার ছয় পাপড়িযুক্ত ফুল, কয়েকটি ছোট পুঁতি, এবং আরও কয়েকটি সোনার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বস্তু।

এগুলি ছাড়াও আরও কিছু কাঠের ও রূপার তৈরি পাত্র ছিল যেগুলি একদম পচে/গুঁড়িয়ে গিয়েছিল। বিভিন্ন পাত্র থেকে নানারকম ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বস্তু পাওয়া গিয়েছিল যার মধ্যে ছিল স্বস্তিকা, ত্রিরত্ন, ফুল, সোনা, রূপা, কার্নেলিয়ান, অ্যামিথিস্ট, পোখরাজ, গোমেদ, প্রবাল এবং স্ফটিকের বিভিন্ন আকারের পুঁতি; সোনার অলঙ্কার; সোনার পাতায় খোদাই করা দুটি মহিলার অবয়ব, পাখি, হাতি এবং সিংহের মূর্তি ইত্যাদি মিলিয়ে প্রায় কয়েকশো জিনিস। আর ছিল কিছু দেহাস্থি, কোনো মহামানবের দেহাবশেষের নিদর্শন।
পিপরাওয়া থেকে পাওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটি হল ওপরের পাত্রের তালিকার ২ নং বস্তুটি বা মঞ্জুষাটি যার ওপরে একটি লেখ আছে, অর্থাৎ দেহাবশেষ রক্ষিত সেই পাত্রের ওপরে একটি পংক্তি খোদাই করা আছে। সাধারণ পূর্বাব্দের দ্বিতীয় শতাব্দীর সময়কালের ৩৭টি ব্রাহ্মী অক্ষর দিয়ে তৈরি লেখটির ভাষা ছিল পালি ও মাগধীর মিশ্রণ। লেখের খোদাই ছিল বড়োই অপটু হাতের –

‘উকিতি-ভাতিনাং সা-ভগিনীকানাং সা-পুত-দালনং ইয়ং সালিলনিধানে বুধস ভগবতে শাক্যানাং”

লেখটির অনেক ব্যাখ্যা প্রকাশ হলেও কয়েক প্রকারের ভাষ্য নিয়ে আলোচনা বেশি হয়েছে। জোহান জর্জ বুহলার (Johann Georg Bühler) এর প্রথম অনুবাদ করেছিলেন, যা ছিল এমন-
(Bühler: 1898) – “This relic-shrine of divine Buddha (is the donation) of the Sakya Sukiti-brothers (i.e. either ‘of Sukiti’s brothers’ or ‘of Sukiti and his brothers’)”, associated with their sisters, sons, and wives”.
“বুদ্ধের এই দেহাবশেষ মন্দিরটি শাক্য সুকিতি-ভাইদের (অর্থাৎ ‘সুকিতির ভাইদের’ বা ‘সুকিতি এবং তার ভ্রাতাদের’)”, তাঁদের বোন, পুত্র এবং স্ত্রীদের সঙ্গে জড়িত।”
বুহলারের অনুবাদে স্পষ্ট হল যে পাত্রের ভেতরের দেহাস্থি হল শাক্যমুনি বুদ্ধের বা বুদ্ধদেবের। অধিকাংশ পণ্ডিত এই অনুবাদের সঙ্গে একমত। ১৯০৫ সালে রিস ডেভিডস (Rhys Davids) আরেকটি অনুবাদ দিয়েছেন –
This shrine for relics of the Buddha, the August one, is that of the Sakyas, the brethren of the Distinguished One, in association, with their sisters, and with their children and their wives
“সেই মহান ব্যক্তি বুদ্ধের দেহাবশেষের জন্য এই মন্দির, শাক্যদের মন্দির, যা জড়িত বিশিষ্টজনের ভাই, বোন এবং তাদের সন্তানদের আর তাদের স্ত্রীদের সঙ্গে”
ডেভিডসের অনুবাদেও এই নিয়ে কোনো সন্দেহ রাখা হয়নি যে পাত্রের দেহাস্থিটি বুদ্ধদেব ছাড়া অন্য কারো। কিন্তু, জে.এফ. ফ্লিট (J F Fleet) লেখটির অনুবাদ এই ভাবে করলেন (Fleet: 1907)–
This is a deposit of relics of the brethren of Sukiti, kinsmen of Buddha the Blessed One, with their sisters, their children and wives
এটি সুকিতির ভাইদের দেহাবশেষের নিদর্শন, মহান বুদ্ধের আত্মীয়, তাঁদের বোন, তাঁদের সন্তান এবং স্ত্রীদের সঙ্গে।
ফ্লিট তাঁর অনুবাদে বুদ্ধের দেহাস্থির পরিবর্তে তাঁর আত্মীয়স্বজনদের দেহাস্থি-র উল্লেখ করেছিলেন অর্থাৎ তাঁর মতে এটি শাক্য বংশের মানুষদের (তিনি শাক্য সংহারের কথা বলেছেন যার কাহিনি আমরা পরে জানব) দেহাবশেষের নিদর্শন। ফ্লিটের অনুবাদ নিয়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে, বিভিন্ন লিপি বিশেষজ্ঞরা তাঁর অনুবাদের অসারতা প্রমাণ করে দিয়েছিলেন যাঁদের মধ্যে প্রধান ছিলেন অগস্ট বার্ত (Auguste Barth)। তিনি অনুবাদ যে রকম করেছিলেন তা হল –
The receptacle of relics of the blessed Buddha of the Sakyas (is the pious gift) of the brothers of Sukirti, jointly with their sisters, with their sons and their wives.
“শাক্যদের শ্রদ্ধেয় বুদ্ধের দেহাবশেষের আধার (পবিত্র দান)
ছিল সুকীর্তির ভ্রাতাদের, তাঁদের বোনদের, তাঁদের পুত্র এবং তাঁদের স্ত্রীদের সঙ্গে যৌথভাবে।”
লেখের মধ্যে উল্লিখিত সুকীর্তি বলতে স্বয়ং বুদ্ধকেই বোঝানো হয়েছে, ‘যিনি তাঁর কীর্তির কারণে বিখ্যাত।’ আর সেটি কোনো ব্যক্তির নাম নয়। বিষয়টি আলোচনার পর ফ্লিট তাঁর নিজের মতবাদকেই পরিত্যক্ত করেন (There was strong retaliation from French Orientalists Auguste Barth and Emile Senart who rejected the idea that the word Sukirti was a reference to the Buddha as ‘possessed of good fame’ or ‘the Well famed One’ and not a proper name as Bühler had claimed. Fleet admitted defeat, declaring that ‘I now abandon my opinion that there is any reference to Buddha in the word in question’ and Barth’s translation remained widely accepted by academics of the day. A brief history of the translation of the Piprahwa inscription, The Piprahwa Project)

সর্বশেষে, এই বিষয়ে দুর্দান্ত আলোচনা করেছেন হ্যারি ফক (Harry Falk)। বার্তের অনুবাদ প্রকাশ হওয়ার একশো বছরেরও বেশি সময় পরে, জার্মান পণ্ডিত এবং লিপি বিশেষজ্ঞ হ্যারি ফক, কলকাতার ভারতীয় জাদুঘরে মঞ্জুষাটি ভালোভাবে পরীক্ষা করে লেখটির অনুবাদ (Falk: The Ashes of the Buddha) করেন – “This enshrinement (nidhāna) of the corporal remnants (śarīra) of the Buddha [1: of the Śākyas], the lord, (is to the credit) of the [2: Śākya] brothers of the ‘highly famous’, together with their sisters, with their sons and wives.
“বুদ্ধের [১: শাক্যদের], শারীরিক অবশেষের এই মন্দির (নিধান), ভ্রাতাদের (২. শাক্য) ভগবান (সম্মানীয়) মহান সেই জন তাঁদের পুত্র এবং স্ত্রীদের সঙ্গে।”প্রাচীন প্রাকৃত ভাষা সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞান এতটাই সীমাবদ্ধ যে লেখের অর্থ বুঝতে অসুবিধা হওয়া স্বাভাবিক। পাঠক লক্ষ করবেন যে লেখের অনুবাদে
সবাই বলেছেন যে শাক্যদের মহান পুরুষ বুদ্ধের দেহাবশেষের মন্দির ছিল পিপরাওয়ার স্তূপ। এই প্রসঙ্গে আমাদের বুদ্ধের দেহাস্থি বা দেহাবশেষের বণ্টন কীভাবে হয়েছিল তা জেনে নেওয়া প্রয়োজন।
কুশিনারা বা কুশিনগরে বুদ্ধের মৃত্যুর পর সেখানেই তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছিল। নিয়মানুযায়ী বুদ্ধের জাতি হিসেবে শাক্যদের বুদ্ধের দেহাবশেষ প্রাপ্য ছিল কিন্তু সেখানে আরও কয়েকটি মহাজনপদ থেকে ক্ষত্রিয় ভ্রাতৃত্বের স্বাভিমান দেখিয়ে তাঁর দেহাস্থি দাবি করে বসেছিলেন। তখন দ্রোণ নামের এক ব্রাহ্মণের ওপর ভার পড়েছিল বুদ্ধের দেহাস্থিকে ভাগ করে বণ্টন করার জন্যে। সর্বমোট আটজন বুদ্ধের দেহাস্থি লাভ করেছিলেন এবং তাঁরা সেই দেহাস্থি-র ওপরে স্তূপ নির্মাণ করেছিলেন। মনে হয় বেঠদীপের ব্রাহ্মণ সমাজ থেকে এক বা একাধিক জন বুদ্ধের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করিয়েছিলেন আর তার কারণে তাঁরাও বুদ্ধের দেহাস্থি-র ভাগ পেয়েছিলেন। যে পাত্রটি দিয়ে দেহাস্থি ভাগ করা হয়েছিল সেই ‘কুম্ভ’টি দ্রোণ নিয়েছিলেন এবং তিনি সেটির ওপরে স্তূপ নির্মাণ করেছিলেন। পিপলবনের মৌর্যরা সব শেষে এসে পৌঁছাবার পর যখন দেখেছিল যে সব দেহাস্থি বিতরণ হয়ে গেছে, আর কিছুই অবশিষ্ট নেই তখন তারা দাহকার্যের পর পড়ে থাকা কাঠকয়লা নিয়ে তার ওপরে স্তূপ নির্মাণ করেছিলেন।

তদনন্তর মগধরাজ অজাতশত্রু রাজগৃহে ভগবানের অস্থির ওপর স্তূপ নির্মাণ পূর্ব্বক মহা-উৎসবের অনুষ্ঠান করিলেন।
বৈশালির লিচ্ছবিগণ বৈশালিতে ভগবানের অস্থির ওপর স্তূপ নির্মাণ ও মহা-উৎসবের অনুষ্ঠান করিলেন।
কপিলাবস্তুর শাক্যগণ কপিলাবস্তু নগরে ভগবানের অস্থির ওপর স্তূপ নির্মাণ ও মহা-উৎসবের অনুষ্ঠান করিলেন।
অল্পকল্পের বুলিগণ অল্পকল্পে ভগবানের অস্থির ওপর স্তূপ নির্মাণ ও মহা-উৎসবের অনুষ্ঠান করিলেন।
রামগ্রামের কোলিয়গণ রামগ্রামে ভগবানের অস্থির ওপর স্তূপ নির্মাণ ও মহা-উৎসবের অনুষ্ঠান করিলেন।
ব্রাহ্মণ বেঠদীপ বেঠদীপে ভগবানের অস্থির ওপর স্তূপ নির্মাণ ও মহাউৎসবের অনুষ্ঠান করিলেন।
পাবার মল্লগণ পাবায় ভগবানের অস্থির ওপর স্তূপ নির্মাণ ও মহা
উৎসবের অনুষ্ঠান করিলেন।
কুশিনারার মল্লগণ কুশিনারায় ভগবানের অস্থির ওপর স্তূপ নির্মাণ ও
মহা-উৎসবের অনুষ্ঠান করিলেন।
ব্রাহ্মণ দ্রোণ কুম্ভের ওপর স্তূপ নির্মাণ ও মহা-উৎসবের অনুষ্ঠান করিলেন।
পিপল বনের মোরিয়গণ পিপলবনে অঙ্গার সমূহের ওপর স্তূপ নির্মাণ ও মহা-উৎসবের অনুষ্ঠান করিলেন।
এইরূপে অস্থি সমূহের ওপর আটটি স্তূপ, কুম্ভের ওপর নবম এবং অঙ্গার সমূহের ওপর দশম স্তূপ নিৰ্ম্মিত হইল।
– মহাপরিনির্বাণ সূত্র, ৬.২৭

তাহলে দেখতে পাচ্ছেন যে প্রাথমিকভাবে বুদ্ধের দেহাবশেষের আটটি ভাগ হয়েছিল এবং তার এক ভাগ পেয়েছিল শাক্যজাতি যার অন্তর্গত ছিল তাঁর ভাই, বোন, সন্তান। বুদ্ধের এইসব দেহাবশেষগুলি প্রায় একশো বছর সেইসব দেহাস্থি স্তূপগুলিতে রক্ষিত ছিল যতক্ষণ না অশোকের আবির্ভাব ঘটল। সম্রাট অশোক স্থির করেছিলেন যে বুদ্ধের দেহাস্থি সমগ্র সাম্রাজ্যে ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন আর তাই তিনি এই স্তূপগুলির মধ্যে সাতখানি উন্মুক্ত করে তার থেকে দেহাস্থি বার করে বহু স্তূপ (কিংবদন্তী অনুসারে প্রায় ৮৪ হাজার) নির্মাণ করে তার মধ্যে সেগুলি ভাগ করে দিয়ে স্থাপন করেছিলেন। আপনারা জানেন যে বুদ্ধের দেহাস্থি-র ওপরে আদিতে আটখানি স্তূপ নির্মিত হয়েছিল আর অশোক সাতখানি উন্মুক্ত করেছিলেন, তাহলে পড়ে রইল একটি যা অশোকের আয়ত্বের বাইরে ছিল।
লুম্বিনী থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে রামগ্রামে কোলিয়দের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বুদ্ধদেবের দেহাবশেষ স্তূপ (মহাপরিনির্বাণ সূত্রে উল্লিখিত ৫ম) যা অশোকের নাগালের বাইরে ছিল। ভাবতে খুব অবাক লাগে যে অমন মহিমান্বিত সম্রাটের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কার সাহস হয়েছিল রুখে দাঁড়াবার। ফা-হিয়েন যখন রামগ্রাম গিয়েছিলেন তখন তিনি এই বিষয়ে একটি কিংদন্তি শুনেছিলেন-
যখন রাজা অশোক পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন তখন তিনি আটটি স্তূপ উন্মুক্ত করে তার থেকে দেহাবশেষগুলি নিয়ে ৮৪০০০ স্তূপ নির্মাণের কথা ভেবেছিলেন। সাতখানি স্তূপ উন্মুক্ত করার পর তিনি শেষে এই স্তূপটিও উন্মুক্ত করবেন বলে ভেবেছিলেন। এই স্তূপের পাশে একটি জলাশয় ছিল আর সেখানে একজন নাগ থাকতেন। এই স্তূপটির দেখাশোনা সেই নাগই করতেন। অশোকের কাছে নাগটি গিয়ে তাঁকে নিজের প্রাসাদে নিয়ে গিয়ে তাঁর পূজোপকরণগুলি দেখিয়ে বলেছিলেন যে অশোকের যদি তাঁর চেয়েও উত্তম রূপে পূজা করার শক্তি থাকে তাহলে তিনি যেন স্তূপটি উন্মুক্ত করে তাঁর যা মন চায় তাই নিয়ে চলে যেতে পারেন, তিনি বাধা দেবেন না। সম্রাট বুঝেছিলেন যে তেমন উপকরণ আর কোথাও পাওয়া যাবে না আর তাই তিনি তাঁর পরিকল্পনা পরিত্যাগ করে স্তূপটিকে অবিকৃত রেখেই চলে গিয়েছিলেন (Legge: 1886 68-69)।
হিউয়েন সাঙের অভিজ্ঞতাও অনেকটা একই রকমের-
“স্তূপের নিকটেই স্বচ্ছ বারিপূর্ণ একটি হ্রদ। কখনও কখনও একটি সর্প হ্রদ হইতে বহির্গত হইয়া এই স্থানে ভ্রমণ করে এবং সর্প দেহ পরিবর্তন করিয়া স্তূপ প্রদক্ষিণ করে। বন্য হস্তীযূথ এই স্থানে সমাগত হইয়া পুষ্প সংগ্রহ করিয়া এই স্থান বিকীর্ণ করে। অনৈসর্গিক ক্ষমতা দ্বারা পরিচালিত হইয়া তাহারা প্রথম হইতেই এইরূপ করিতেছে। পুরাকালে যখন রাজা অশোক পূর্ববর্তী রাজগণ নির্মিত স্তূপ সকল হইতে বুদ্ধদেবের শরীর চিহ্ন লইয়া নুতন স্তূপ নির্মাণ করিতেছিলেন তখন তিনি এই দেশে আগমন করিয়া এই স্তূপের অভ্যন্তরস্থ চিহ্ন লইবার জন্য প্রস্তুত হন। ইহাতে মন্দির অপবিত্র হইবে মনে করিয়া, সর্প ব্রাহ্মণরূপ ধারণ করিয়া রাজহস্তীর সম্মুখে উপস্থিত হইয়া ও রাজাকে প্রণাম করিয়া বলিল, ‘মহারাজ; বৌদ্ধধর্মের প্রতি আপনার যথেষ্ট আসক্তি দেখা যায় এবং আপনি যথেষ্ট ধর্মার্জনও করিয়াছেন। আপনি কিছুক্ষণের জন্য শকটের গতি প্রতিহত করিয়া অনুগ্রহপূর্বক আমার আবাসে আগমন করুন।’ রাজা কহিলেন, ‘তোমার আবাস কোথায়? ইহা কি নিকটে?’ ব্রাহ্মণ উত্তর করিলেন, ‘আমি এই হ্রদের নাগরাজ। আমি শুনিয়াছি মহারাজ স্তূপ নির্মাণ করিয়া আরও ধর্মার্জন করিতে ইচ্ছুক, সেই জন্য আমি আমার আবাস-স্থল দর্শন করিবার জন্য অনুরোধ করিতে সাহসী হইয়াছি।’ রাজা তৎক্ষণাৎ দৈত্যাবাসে প্রবেশ করিলেন এবং কিছুক্ষণ তথায় উপবেশন করিলে পর, নাগ অগ্রসর হইয়া তাঁহাকে নিবেদন করিল, ‘আমার অপকর্মের জন্য আমি নাগদেহ প্রাপ্ত হইয়াছি; বুদ্ধের এই শরীর চিহ্ন পূজা করিয়া আমি পাপের প্রায়শ্চিত্ত করিয়া দোষ স্থালন করিতে অভিলাষী হইয়াছি। রাজা যেন নিজেই অনুগ্রহ করিয়া শরীর চিহ্নগুলি দর্শন করিয়া পূজা করেন।’ রাজা অশোক পর্যবেক্ষণ করিয়া ভীত হইয়া বলিলেন, ‘মনুষ্যের মধ্যে আমি এরূপ পূজোপকরণ কোনোদিনও দেখি নাই।’ নাগ উত্তর করিলেন ‘যদি তাহাই হয়, তাহা হইলে রাজা যেন স্তূপ বিনষ্ট করিতে না ইচ্ছা করেন।’
“রাজা যখন দেখিলেন যে তিনি কোনোমতেই নাগের সমকক্ষ হইতে পারিবেন না
, তখন তিনি স্তূপ উন্মোচনে বিরত হইলেন। যেস্থানে নাগ হ্রদ হইতে বহির্গত হইয়াছিলেন, তথায় উপরোক্ত মর্মে এক শোধিত লিপি আছে।” (সমাদ্দার: ২০২১, ১১১-১২)।
পাঠকগণ প্রথমেই নাগবংশীয় মানুষের কথা খেয়াল করবেন, লুম্বিনীতে এঁদের উপস্থিতির কথা আমি বলেছিলাম। দ্বিতীয়ত আপনারা বুঝতে পারছেন যে অশোকের সময় রামগ্রামের স্তূপে ভক্তিভরে পুজাপাঠ হত। অনেকে মনে করেন যে সাধারণ মানুষ রামগ্রামে অশোকের ইচ্ছার বিরুদ্ধে একটি প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং সম্রাট তাঁদের ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে তাঁর পরিকল্পনাকে পরিত্যাগ করেছিলেন। কিন্তু এই ধারণায় কিছু অসুবিধা আছে কারণ মহাবংশে (৩১.২৫-২৯) আরেকটি অন্য কাহিনি বলা আছে।
“রামগ্রামের কোলিয়রা গঙ্গার ধারে একটি স্তূপ নির্মাণ করিয়া উহার মধ্যে বুদ্ধের পূতাস্থি স্থাপন করিয়া পুজা করিতেন। গঙ্গার প্লাবনে স্তূপটি ভাঙিয়া জলে পড়িলে বুদ্ধের পূতাস্থির কৌটাটিও নদীর জলে পড়িয়া ভাসিতে ভাসিতে একসময় মহাসমুদ্রে গিয়া পড়ে। মহাসমুদ্রে উহা দুই বিপরীত স্রোতের মধ্যস্থলে উজ্জল আলোক বিকিরণ করিয়া ভাসিতে থাকে। সমুদ্রের নাগগণ পূতাস্থির কৌটাটি দেখিয়া সত্ত্বর ‘মঞ্জেরিক’ প্রাসাদে গিয়া উহা তাঁহাদের রাজা কালনাগকে জানাইলেন। দশ হাজার কোটি নাগসহ রাজা কালনাগ ছুটিয়া গিয়া বুদ্ধের পূতাস্থি সম্বলিত কৌটাটি তাঁহার প্রাসাদে লইয়া আসেন। সেইখানে রত্নখচিত একটি চৈত্য নির্মাণ করিয়া পূতাস্থির কৌটাটি উহার মধ্যে স্থাপন করিয়া পূতাস্থির পুজা করিতে লাগিলেন। রাজা কালনাগ সেই চৈত্যের চারিধারে রক্ষীও নিযুক্ত করেন।”
এই কাহিনিকে গণ্য করে হ্যারি ফক অনুমান করে বলেছেন যে রামগ্রামের স্তূপের এলাকাটি নীচু জমিতে অবস্থিত তাই হয়তো কখনও নদীর বন্যায় এই স্তূপের মাটি ধ্বসে ভেতরে থাকা দেহাবশেষের মঞ্জুষা জলের তোড়ে ভেসে চলে যায় আর তাই অশোক এখানে উন্মুক্ত করেও কিছু পাননি। সেজন্যেই বলা হয়েছে যে বুদ্ধদেবের দেহাস্থি-র দেখাশোনা তখন জলবাসী নাগ করত। যাইহোক স্তূপটিতে খনন করে সেটিকে উন্মুক্ত করার পর কিন্তু কোনো দেহাবশেষের পেটিকা পাওয়া যায়নি। আবার খননে দেখা গেছে যে পলিমাটি সহ ভয়ঙ্কর বন্যার নিদর্শন সেখানে আছে। সেক্ষেত্রে হ্যারি ফকের অনুমান নির্ভুল হতে পারে। যদিও ধরে নেওয়া হয় যে স্তূপটি আদি রূপেই এখনও বিরাজ করছে।
আরেকটি বিষয় নিয়ে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। আপনাদের মনে আছে যখন লুম্বিনীর অশোক স্তম্ভ নিয়ে আলোচনা করেছিলাম তখন সেখানে লেখের একটি অংশ আলোচনা করেছিলাম যেখানে একটি শব্দ ছিল ‘অঠ ভাগিয়ে।’ পণ্ডিতেরা একে লুম্বিনীর গ্রামের প্রদেয় করকে ‘আট ভাগ’ বা ‘এক-অষ্টমাংশ’ করা হয়েছিল করে দেওয়া হয়েছিল বললেও আরেকটি ধারণা তৈরি হয় যে তাহলে কি অশোক আটখানি স্তূপের বুদ্ধের দেহাবশেষের কিছু লুম্বিনীতে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কি না। এমনিতে লুম্বিনীতে বুদ্ধের কোনো দেহাবশেষ রাখা হয়নি। হ্যারি ফকের ধারণা তাই এবং তিনি বলেছেন যে পিপরাওয়ার পাথরের বাক্সটির শৈলী ও পাথর পরীক্ষা করে বোঝা যায় যে তা অশোকের সময়কালের। এমন বিশাল আকারের বাক্সের হদিশ ভারতে এর পূর্বে আর কোথাও পাওয়া যায়নি। বাক্সে থাকা অপূর্ব শিল্পের উদাহরণ মাছের হাতল দেওয়া স্ফটিকের পাত্রটি এবং এতসব মূল্যবান ধাতু ও পাথরের বস্তু কোনো অসাধারণ মানুষের বদান্যতাতেই নির্মিত হওয়া সম্ভব। ফকের মতে ২৪৮ সাধারণ পূর্বাব্দ নাগাদ অশোক যখন লুম্বিনী ভ্রমণ করতে এসেছিলেন তখন তিনি এইসব অমূল্য সম্পদ সব নিয়ে এসেছিলেন এবং সেগুলি পিপরাওয়াতে স্থাপন করেছিলেন।

রামগ্রাম যাওয়ার রাস্তাও বড়ো সোজা। সুনৌলি থেকে লুম্বিনী যাওয়ার আগে রামগ্রাম ঘুরে নিতে পারেন কিংবা ফেরত আসার সময়ে। সুনৌলি থেকে সীমান্ত পার হয়ে বেলহিয়ার বাজার এলাকা থেকে বামদিকে গেলে মিলবে লুম্বিনী যাওয়ার রাস্তা আর রামগ্রাম যেতে হলে আমাদের ডান দিকে যেতে হবে। পরাসী রোড ধরে প্রায় ২২ কিলোমিটার যেতে হবে, তারপর ডানদিকে ঘুরে আরও ৪ কিলোমিটার মতো গেলে পাওয়া যায় রামগ্রামের স্তূপ।
পিপরাওয়াতে যখন অভিলেখ সহ মঞ্জুষা ও আরও অজস্র বস্তুর মতো উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার হয়েছিল (১৮৯৮) তখন এক অভূতপূর্ব সাড়া পড়ে গিয়েছিল। বুদ্ধদেবের নাম ও অস্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত থাকা কোনো বস্তু প্রথম পাওয়া গেল যে। আশা জেগেছিল যে বুদ্ধদেবের শহর কপিলাবস্তুর হয়তো এবারে একটা ঠিকানা পাওয়া গেলেও যেতে পারে। আসলে এই শহরের খোঁজ চলছে বহুদিন ধরেই। প্রফেসর ডক্টর ল্যাসেন (Professor Dr. Lassen), ১৮৫৮ সালে, গোরখপুরের উত্তর-পশ্চিমে কপিলাবস্তুর অবস্থান অনুমান করেছিলেন। সেই স্থানটি ছিল আজকের রোহিন নদীর তীরে যাকে তিনি প্রাচীন রোহিণী বলে চিহ্নিত করেছিলেন। বৌদ্ধ গ্রন্থে আছে যে কপিলাবস্তুর কাছেই ছিল রোহিণী নদী। স্ট্যানিস্লাউস জুলিয়েনও (Stanislaus Julien) প্রায় একই সিদ্ধান্তে এসেছিলেন।
১৮৬৩ সালে ক্যানিংহাম যখন শ্রাবস্তীকে শনাক্ত করতে পারলেন তখনই কপিলাবস্তু খুঁজে পাওয়ার আশা জেগেছিল তার কারণ হল চীনা পরিব্রাজকদের বিবরণ। আপনারা আগেই দেখেছেন যে ফা-হিয়েন ও হিউয়েন সাঙ উভয়ই যাত্রা শুরু করেছিলেন শ্রাবস্তী থেকে, তাই ধারণা হল যে শ্রাবস্তী থেকে পরিব্রাজকদের দেখানো অভিমুখ ও দূরত্ব পার করলেই কাঙ্খিত শহর পাওয়া যাবে।
ক্যানিংহাম শ্রাবস্তীকে একটি সূচনা বিন্দু হিসেবে ব্যবহার করে, কপিলাবস্তুর অবস্থান চিহ্নিত করতে চেয়েছিলেন। দুইজন চীনা পরিব্রাজকের বিবরণ অনুসারে কপিলাবস্তুর অবস্থান শ্রাবস্তীর ৮০ থেকে ৯০ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে। সেই হিসাবে তিনি উত্তরপ্রদেশের বস্তি জেলার ঔরঙ্গাবাদ পরগনায় অবস্থিত ‘নগরখাস’-কে প্রাচীন কপিলাবস্তু হিসাবে অনুমান করেছিলেন আর ‘কাকুয়া’-কে ধরেছিলেন ক্রকুচ্ছন্দ্র বুদ্ধের স্থান। কিন্তু ক্যানিংহামের সিদ্ধান্তে অনেকটাই গণ্ডগোল ছিল কারণ তিনি নগরখাস একবার না দেখেই শুধুমাত্র দূরত্ব দেখেই তাকে কপিলাবস্তু বলে চিহ্নিত করে দিলেন অথচ নগরখাসে কোনো ধ্বংসাবশেষের দেখাই পাওয়া যায় না। পরে ক্যানিংহামের সহকারী, মিঃ এ সি কার্লেলি (A. C. Carlleyle), ১৮৭৫-৭৬ সালে বস্তি এবং গোরখপুর জেলায় অনুসন্ধান চালিয়েছিলেন। তাঁর মতে ‘ভুঈলা ডিহ’ স্থানটি হচ্ছে কপিলাবস্তু। রাওয়াই নদীর ধারে অবস্থিত ভুঈলা ডিহে তিনি ইটের ধ্বংসাবশেষ দেখেছিলেন যদিও অনুমানের পক্ষে কোনো লেখ বা মজবুত পাথুরে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাঁর যুক্তি ছিল যে ‘ভুঈলা’ ও ‘কপিলাবস্তু’ শব্দ দুটির মধ্যে ধ্বনিগত বেশ মিল আছে। স্যার ক্যানিংহাম স্থানটি ঘুরে এসে কার্লেলির পক্ষেই মত জানিয়েছিলেন।
এদিকে ফিউরার কিন্তু ল্যাসেন, জুলিয়েন, ক্যানিংহাম বা কার্লেলির ধারণায় মোটেই বিশ্বাস করেননি। ১৮৯৬ সালে তিনি যখন লুম্বিনী খুঁজে পেয়েছিলেন তখন তিনি সেখান থেকে চীনা পরিব্রাজকদের দূরত্বের হিসেবে কপিলাবস্তুর অবস্থান নির্ণয় করতে চেষ্টা করেছিলেন এবং লুম্বিনী থেকে ১৮ মাইল উত্তর–পশ্চিমে জঙ্গলে পরিণত হয়ে যাওয়া তিলৌরাকোটের ধ্বংসাবশেষ পূর্ণ স্থানটিকে কপিলাবস্তু বলে চিহ্নিত করেছিলেন। এর দুই বছর পর নেপালের ভূমিতে পৌঁছে গিয়েছিলেন পি সি মুখার্জি। তাঁর লুম্বিনী খনন নিয়ে আলোচনা তো আগেই করেছি।
১৮৯৯ সালে লুম্বিনী থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার পশ্চিমে তিলৌরাকোটে মুখার্জি খনন করে খুঁজে পেলেন এক নগর। পরিখা ও প্রাকারে ঘেরা দুর্গের মতো নগরের বিভিন্ন দিকে প্রবেশ দ্বার ও মাঝে বিশাল বিশাল ইমারতের ভগ্নাবশেষ পাওয়া গেল। নগরের উত্তর-পূর্ব দিকে একটি কেন্দ্রীয় জলাশয় ও দক্ষিণ–পূর্বে একটি ছোটো জলাশয় নিয়ে তিলৌরাকোট ছিল একটি জমজমাট নগর। তিলৌরাকোটের ভেতরে তিনি দেখতে পেয়েছিলেন ‘সমাই-মাঈ’ নামে একটি স্থানীয়ভাবে পূজিত দেবীর মন্দির। প্রত্নক্ষেত্রের ভেতরে দেবীর সেই মন্দির আজও আছে। সেই মন্দিরের কাছেই খননে মুখার্জি পেয়েছিলেন একটি প্রাসাদের ভগ্নাবশেষ। শক্ত মেঝে সমেত বেশ কিছু কাঠামোর ধ্বংসাবশেষ তিনি দেখেছিলেন যার মধ্যে একটি ছিল অষ্টভুজাকার যা মুখার্জির বর্ণনায় স্তূপ বলে লিখিত আছে (যদিও তা পরে ভুল সাব্যস্ত হয়েছিল)।
তিলৌরাকোটের উত্তর-পূর্ব দিকে আরও দুটি স্তূপ পেয়েছিলেন যার মধ্যে একটির ভিত্তিভূমি ছিল ষোড়শভুজা।

তিলৌরাকোটের প্রাকার ঘেরা নগরীর অভ্যন্তর ছাড়াও বাইরে বেশ কিছু ধ্বংসস্তূপ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে একটি হল পূর্ব দ্বারের বাইরে প্রায় ২২০ মিটার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে পাওয়া একটি ধ্বংসস্তূপ। মুখার্জির খননের ফলে দেখা গেল যে এটি আসলে ইট দিয়ে নির্মিত ৬৮ ফুট ব্যাসের একটি স্তূপ। স্তূপটিকে বিভিন্ন সময়ে অনেকবার অদল বদল করা হয়েছে এবং মুখার্জি দেখেছিলেন যে স্তূপটির উত্তর দিকটি উন্মুক্ত করে নিয়ে আগেই তার ভেতরে থাকা বস্তু কেউ বার করে নিয়েছে আর তাই সেখান থেকে কিছু পাওয়ার এবং তার থেকে সময়কাল নির্ণয় করা অসম্ভব ছিল। প্রত্নক্ষেত্রের দক্ষিণ অংশে পরিখার ধারে অনেকটা জায়গা জুড়ে লোহার ধাতুমল দেখাতে পাওয়া গিয়েছিল যা দেখে অনুমান করা যায় যে সেখানে ধাতুর একটি ব্যস্ত কর্মশালা ছিল। স্তূপের দুই পাশে দুইটি জলাশয়ের নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে। কেল্লার পশ্চিম ধারে, ২ নং দ্বারের কাছে মুখার্জি দুয়েকটি নীচু ধ্বংসস্তূপ ও একটি বড়ো ইটের কাঠামো খুঁজে পেয়েছিলেন যা তিনি একটি ‘বিহার’ বলে চিহ্নিত করেন। প্রত্নক্ষেত্রের উত্তরে তিনি আরও কিছু অবশেষ পেয়েছিলেন। উত্তরের পরিখার বাইরে একটি ত্রিকোণাকার ভূমিতে কেল্লা ছাড়া আরেকটি বাড়তি বসতির চিহ্ন পেয়েছিলেন। সেই বসতির চারধারে প্রাকার না থাকলেও একটি পরিখা দিয়ে তা সুরক্ষিত ছিল।

পি সি মুখার্জি এই বিষয়ে নিশ্চিত ছিলেন যে তিনি বুদ্ধের কপিলাবস্তুকে খুঁজে পেয়েছেন। তাঁর মতে তিলৌরাকোট হল সেই বহু আলোচিত ও কাঙ্খিত শহর। যদিও সেখানে এমন কোনো লেখ বা প্রত্নবস্তু পাওয়া গেলো না যার মাধ্যমে ‘কপিলাবস্তু’ হিসেবে দাবি সুস্পষ্ট হয়। পি সি মুখার্জিও এই বিষয়টি বুঝতে পেরেছিলেন আর তাই তিনি চীনা পরিব্রাজক ও বিভিন্ন বৌদ্ধ গ্রন্থ থেকে কপিলাবস্তুর বর্ণনায় গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলি তুলে ধরে সেগুলির সঙ্গে তিলৌরাকোটের সাদৃশ্য দেখাতে চাইলেন। পরিব্রাজকদের উল্লেখ করা বিভিন্ন স্থানগুলির সঙ্গে আভ্যন্তরীণ দূরত্বের মাধ্যমেও তিনি এই প্রচেষ্টা করেছিলেন।
পি সি মুখার্জির খননের পর বহু যুগ কেটে যায় কিন্তু তিলৌরাকোটে আর খোঁজখবর করা হয় না। তারপর নেপাল ও ভারত দুই দেশ মিলে একটি যৌথ খননের প্রচেষ্টা নেওয়া হল। ১৯৬২ সালে বিখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক দেবলা মিত্রের নেতৃত্বে একটি অংশে খনন চালানো হয়েছিল। তিনি তিলৌরাকোটের জনপদের বিকাশকে মোটামুটি তিন পর্যায়ে ভাগ করেছিলেন,
১ম – কেল্লা পূর্ববর্তী সময়কাল (ক ও খ)
২য় – কাদামাটির প্রাকার
৩য় – ইটের সুরক্ষা প্রাকার
দেবলা মিত্র ১ক ও খ স্তর থেকে উত্তরের মসৃণ কৃষ্ণপাত্রের (NBPW) নিদর্শন পেয়েছিলেন। উত্তরের মসৃণ কৃষ্ণপাত্রের উদ্ভব সাধারণ পূর্বাব্দের ৬ষ্ঠ শতাব্দী থেকে ২য় শতাব্দী অবধি বিস্তৃত হলেও ১ম পর্যায়ের ক স্তর থেকে প্রাপ্ত একটি মৃৎপাত্রের ভাঙা টুকরোর ওপরে থাকা লিপির ধরন দেখে তিনি সেই স্তরটিকে সাধারণ পূর্বাব্দের ৩য় শতাব্দীর চেয়ে প্রাচীন নয় বলে মত দিয়েছিলেন (Mitra: 1972, 16)।

খনন থেকে মিত্রের প্রাপ্ত সময়কাল নিয়ে বিতর্ক আছে। মিত্রের মতানুযায়ী সবচেয়ে নীচের স্তর যদি সাধারণ পূর্বাব্দের ৩য় শতাব্দীর হয় তাহলে তা বুদ্ধের সময়ের পরবর্তী কালের হয় অথচ তিলৌরাকোট কপিলাবস্তু হলে সেখানে তো বুদ্ধের সময়ের অর্থাৎ সাধারণ পূর্বাব্দের ৬ষ্ঠ শতাব্দীর আগের প্রত্নবস্তু পাওয়ার কথা। বিষয়টি বেশ জটিল হয়ে পড়ে এবং অনেকেই বলেন যে দেবলা মিত্র যে সীমাবদ্ধ অঞ্চলে খনন করেছিলেন তাতে প্রত্নক্ষেত্রের সমগ্র সময়কালের ব্যাপ্তি বোঝা সম্ভব নয় এবং একই কারণে তাঁর দেওয়া প্রাচীনতম সময় ঠিকঠাক নয়।
দেবলা মিত্র কিছু ধূসর পাত্র পেয়েছিলেন যা তিনি উত্তরের মসৃণ কৃষ্ণপাত্রের সমকালীন বলেছিলেন আর বিরুদ্ধ পণ্ডিতদের মতে সেই পাত্রগুলি কোনো স্থানীয় চিত্রিত ধূসর পাত্রের (Painted Gery Ware বা PGW) নিদর্শন যার সময়কাল সাধারণ পূর্বাব্দের ৯ম থেকে ৭ম শতাব্দী (Schmidt et al, 3)।

দেবলা মিত্রের পর ১৯৭২ পর্যন্ত নেপাল সরকারের পক্ষ থেকে তিলৌরাকোটে কিছু অনুসন্ধান চালানো হয়েছিল। অনুসন্ধানগুলির মূল উদ্দেশ্য ছিল মাটির ভেতর থেকে কাঠামোগুলিকে উন্মুক্ত করা এবং মাটির তলায় থাকা বসতির সাংস্কৃতিক স্তরগুলিকে জানা। সমাই-মাঈ মন্দিরের সামনে একটি বর্গাকার পরিখায় একটি মধ্যযুগীয় মন্দিরের অংশবিশেষ পাওয়া গিয়েছিল। ধ্বংসস্তূপের পশ্চিম প্রান্তে একটি দ্বারের নিদর্শন পাওয়া গিয়েছিল।
এই খননে তিলৌরাকোটের মধ্যে দিয়ে অতিক্রম করা একটি রাস্তার নিদর্শনও মিলেছিল। এইসব খননের ফলে এখানে সাধারণ পূর্বাব্দের ৭ম শতাব্দী থেকে সাধারণ অব্দের ২য় শতাব্দী অবধি নয়টি সময়কালের স্তর পাওয়া যায় যার মধ্যে ১ ও ২ ছিল কুষাণ যুগের, ৩ ও ৪ ছিল শুঙ্গ যুগের আর ৫ থেকে ৯ ছিল চিত্রিত ধূসর পাত্রের।
১৯৭৭ অবধি সেখানে জাপানের রিস্সো বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দল নেপালের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সঙ্গে মিলে কিছু খনন করেছিল কিন্তু তার রিপোর্ট প্রকাশিত হয়নি। ১৯৭৯ সালে নেপালি প্রত্নতাত্ত্বিক বাবু কৃষ্ণ রিজাল পঞ্চম ধংসস্তূপের (Mound V) খননের একটি অংশ প্রকাশ করেছিলেন যেখানে জনপদের সময়কাল চলে যায় ১০০০ সাধারণ পূর্বাব্দ থেকে সাধারণ অব্দের ৩য় শতাব্দী অবধি। তাঁর হিসেবে সেখানে রয়েছে পাঁচটি স্তর (ibid, 4)।
১ম – সাধারণ পূর্বাব্দ ৮০০ – ১১০০ (চিত্রিত ধূসর পাত্র)
২য় – সাধারণ পূর্বাব্দ ৬০০ – ৫০০ (উত্তরের মসৃণ কৃষ্ণপাত্র)
৩য় – মৌর্য যুগ (উত্তরের মসৃণ কৃষ্ণপাত্র ও ব্রাহ্মী লিপি)
৪র্থ – শুঙ্গ যুগ
৫ম – কুষাণ যুগ

এখনও অবধি যা তথ্য পাওয়া গেছে তা থেকে বলা যায় যে এরপর ২০২১ অবধি তিলৌরাকোটে আরও কতকগুলি খনন হয়েছে অনেক অনুসন্ধান ও খনন হলেও তিলৌরাকোট নিয়ে আমরা যে তিমিরে ছিলাম সেখানেই রয়ে গেলাম কারণ তিলৌরাকোট যে সঠিক ভাবে কপিলাবস্তু তার কোনো সঠিক প্রমাণ পাওয়া গেল না।
তিলৌরাকোট যেতে হলে লুম্বিনী ঘুরে যাওয়াই ভালো কারণ সীমান্ত থেকে তিলৌরাকোটের দূরত্বের অর্ধেক আপনি পার করেই লুম্বিনী এসে পোঁছে গেছেন। এরপর আর মাত্র ৩০ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করলেই পোঁছে যাবেন তিলৌরাকোট। রাস্তায় তৌলিহওয়ার মন্দিরটিকেও দেখে নিতে পারবেন। তিলৌরাকোটে একটি জাদুঘরও আছে। বেশ অনেকটা জায়গা নিয়ে বিস্তৃত এই প্রত্নক্ষেত্রটির ঘুরে বেড়ানোর ব্যবস্থা বেশ ভালো। তিলৌরাকোটের পুরো এলাকা জুড়ে কাঠের মাচা মতো রাস্তা আছে আর প্রত্যেকটি স্থানের প্রত্নতত্ত্ব বুঝিয়ে দেওয়া একটি করে বোর্ড লাগানো আছে।
১৯৭১ সালে পিপরাওয়াতে খনন করে যিনি বুদ্ধের দেহাবশেষের মঞ্জুষা আবিষ্কার করেছিলেন সেই শ্রীবাস্তবের (K M Srivastava) মতে পিপরাওয়াতে পাওয়া লেখটি পরীক্ষা করলে বোঝা যায় যে লেখের মৌর্য শৈলীর ব্রাহ্মীর সঙ্গে মোটামুটি ৪৮৩ সাধারণ পূর্বাব্দে মৃত্যু হওয়া বুদ্ধদেবের সময়কার লিপির যথেষ্ট তফাৎ আছে। ১৯৯৭ সালে, লিপিবিশেষজ্ঞ ও প্রত্নতাত্ত্বিক আহমদ হাসান দানি একই কথা বলেছিলেন যে লেখটি সাধারণ পূর্বাব্দের তৃতীয় শতাব্দীর হতে পারে। সুতরাং দুটি সম্ভাবনা থাকতে পারে, পিপরাওয়ার মঞ্জুষাটি বুদ্ধদেবের দেহাস্থি নিয়ে স্থাপন করা হলেও তার পরে সেটির ওপরে লেখটি খোদাই করা হয়েছিল অথবা সেই দেহাস্থি শাক্য জাতিতে বুদ্ধদেবের আত্মীয় স্বজনদের যাঁদের উল্লেখ অভিলেখে শাক্য সুকীর্তির বোন, ভাই ও তাদের স্ত্রী বলে বোঝানো হয়েছে। অভিলেখের কথা মতো তো সেখানে বুদ্ধদেবেরও দেহাস্থি আছে আর বাক্সে থাকা মঞ্জুষায় যদি আত্মীয় স্বজনদের দেহাস্থি থাকে তাহলে বুদ্ধদেবের দেহাস্থি নিশ্চয়ই সেখানে অন্য কোনো স্থানে থাকবে, অর্থাৎ স্তূপের ভেতরে আরেকটি দেহাবশেষের মঞ্জুষা থাকতে পারে যা প্রকৃত দেহাস্থি বহন করছে এবং সেটি তখনও আবিষ্কার করা হয়ে ওঠেনি। এই প্রসঙ্গে সিলভাঁ লেভি (Sylvain Levi) বলেছেন যে এমনও হতে পারে যে বুদ্ধদেবের দেহাস্থি নিয়ে যে স্তূপটি নির্মিত হয়েছিল সেখানে তার বংশের অন্যান্যদের দেহাস্থি রেখে তারপর স্তূপটিকে বর্ধিত করা হয়েছিল।
সেইসব ভেবে পিপরাওয়াতে আবার খননের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাসে স্তূপের পূর্ব, দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করা হল। ধীরে ধীরে একটি বিশাল বিহারের নিদর্শন বাইরে বেরিয়ে এলো। চার পর্যায়ে নির্মিত বিহারটি যে এক বিধ্বংসী আগুনে বিনষ্ট হয়ে গিয়েছিল তারও প্রমাণ পাওয়া গেল।
বিহারের তৃতীয় পর্যায়টির সময়কাল সাধারণ অব্দের ১ম-২য় শতাব্দীর মধ্যে হতে পারে। দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে, একটি ছোট বিহার এবং কিছু বর্গাকার ভিত্তিভূমির স্মারক বা ভোটিভ স্তূপের নিদর্শন পাওয়া গিয়েছিল।
উত্তর-পশ্চিম দিকে বিভিন্ন রকমের ইটের কাঠামোর অবশেষ পাওয়া গেলেও তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল একটি বিশাল বর্গাকার হলঘর যার এক একটি প্রান্তের দৈর্ঘ্য ছিল ১০.৬০ মিটার। শ্রীবাস্তবের মতে এই হলঘরটি গণরাজ্য শাক্য ও কোলিয়দের সান্থাগার বা সমাবেশ গৃহ হতে পারে যেখানে তারা সমবেত হয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতেন। অর্থাৎ তিনি পিপরাওয়া কে কপিলাবস্তু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার দিকে একটি যুক্তি খুঁজে পেলেন।

১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে গিয়ে মূল স্তূপে হাত দেওয়া হয়েছিল। প্রথমে স্তূপের পশ্চিম অংশের কিছুটা অংশ উন্মুক্ত করা হয়েছিল আর তাতে জানা গিয়েছিল যে স্তূপটি তিন পর্যায়ে নির্মিত বা পরিবর্ধিত করা হয়েছিল।
আদি স্তূপটির ভিত্তিভূমি ছিল বর্গাকার যার চার প্রান্তে একটি করে বড়ো বড়ো কুলুঙ্গি ছিল যেখানে সম্ভবত একটি করে মূর্তি থাকত। এর নীচেই সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল আদি স্তূপের।
এবারে পাওয়া গিয়েছিল পেপ্পের খনন করা অংশ আর তখনই দেখা গিয়েছিল যে পেপ্পে যেখানে বাক্স পেয়েছিলেন সেখানে গিয়ে চোঙটি শেষ হয়ে গিয়েছিল (আগে উল্লিখিত) আর সেখান থেকে পাথরের বাক্সটি পাওয়ার পর পেপ্পে আর খনন করেননি। অর্থাৎ তিনি বাক্সটি পেয়েই ধরে নিয়েছিলেন যে স্তূপে গচ্ছিত যা কিছু ছিল সবই উদ্ধার করা হয়ে গেল।
শ্রীবাস্তব কিন্তু পেপ্পের মতো এখানেই থেমে ছিলেন না। তিনি খনন চালিয়ে গিয়েছিলেন। পাথরের বাক্স যেখানে পাওয়া গিয়েছিল তার নীচে ছিল ইটের মেঝে। মেঝের নীচে ছিল প্রায় ৬ সেন্টিমিটার মতো কাদামাটির স্তর আর তার নীচে পাওয়া গিয়েছিল ইটের দুইটি কুঠুরি। দুটি কুঠুরি যেন যমজ; লম্বায় ৮২ সেন্টিমিটার, চওড়ায় ৮০ সেন্টিমিটার ও উচ্চতায় ৩৭ সেন্টিমিটার। কুঠুরি দুটোর মাঝে ছিল ৬৫ সেন্টিমিটারের ফাঁক যা ভরতি করা হয়েছিল হলুদ রঙের কাঁকর দিয়ে। কুঠুরি দুটির গঠন দেখেই বোঝা গিয়েছিল যে সেগুলি কোনো পবিত্র বস্তু রাখবার কারণেই নির্মিত হয়েছিল।

দুটি কুঠুরির মধ্যে উত্তর দিকের কুঠুরিটি আগে খোলা হয়েছিল। মাথার তিন সারি ইট সরিয়ে দেখা গেল যে ভেতরে একটি সাজিমাটির মঞ্জুষা ও পাশে দুটি লাল রঙের মাটির রেকাবি একটির ওপরে একটি যেন ঢাকা দিয়ে রাখা আছে। ওপরের রেকাবিটি ভেঙে তিনটি টুকরো হয়ে এমনভাবে ছিল যেন মনে হচ্ছিল যে তিনটি আলাদা আলাদা বস্তুকে ঢাকতে অমন ভাঙা হয়েছে। মঞ্জুষাটির সবচেয়ে স্ফীত অংশের ব্যাস ৭ সেন্টিমিটার আর রেকাবিগুলির ব্যাস ছিল ২৬ সেন্টিমিটার। রেকাবি দুটির মধ্যে কী কী বস্তু ছিল তা বোঝা সম্ভব হয়নি কারণ সেগুলি সবই পিষে গিয়ে কাদামাটিতে মিশে গিয়েছিল তবে তার মধ্যে যে কোনো হাড় ছিল না তা মোটামুটি নিশ্চিতভাবে বলা যায়। সাজিমাটির মঞ্জুষাটির ভেতরে পোড়া হাড় পাওয়া গিয়েছিল। দক্ষিণ কুঠুরিতেও একই ধরনের পাত্র থাকলেও তাদের রাখার পদ্ধতি ও অবস্থান ছিল ভিন্ন। সেখানে দুটি রেকাবি পাশাপাশি রাখা ছিল যদিও ওপরের চাপে সেগুলি টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়েছিল। ভেতরে একটি সাজিমাটির মঞ্জুষা ছিল যার ঢাকনাটি ভেঙে তিন টুকরো হয়ে পড়েছিল। দক্ষিণের কুঠুরির মঞ্জুষাটি আগের তুলনায় বড়ো, ২ সেন্টিমিটার বেশি ব্যাসের। এই মঞ্জুষাটির ঢাকনাটি ভেঙে যাওয়ার ফলে এর মধ্যে কাদামাটি ঢুকে একদম বদ্ধ করে দিয়েছিল যদিও তার ভেতর থেকে সাবধানে মাটি সরিয়ে কয়েকটি পোড়া হাড়ের টুকরো পাওয়া গিয়েছিল।

এবারের পাওয়া মঞ্জুষাগুলি ছিল উত্তরের মসৃণ কৃষ্ণপাত্রের সমকালীন যা সাধারণ পূর্বাব্দের ৫ম–৪র্থ শতাব্দীর সময়ের হবে। ১৮৯৭-৯৮ সালে পেপ্পে খনন করে যে পাথরের বাক্স ও তাতে থাকা লেখযুক্ত মঞ্জুষা পেয়েছিলেন সেগুলিই সাধারণ পূর্বাব্দের ৫ম–৪র্থ শতাব্দীর বলে আন্দাজ করা হয় আর এবারের খননে তার থেকে প্রাচীন বা নীচের স্তর থেকে দুটি মঞ্জুষা পাওয়া গেল। পেপ্পের আবিষ্কার করা মঞ্জুষার লেখের সূত্র ধরে বোঝা যাচ্ছিল যে এগুলি সবই বুদ্ধদেব ও শাক্যজাতীর মানুষদের দেহাস্থি হবে কিন্তু স্থানটি কপিলাবস্তু কিনা তার কোনো পাথুরে প্রমাণ তখনও অবধি ছিল অধরা।

১৯৭৩ সালে পিপরাওয়াতে আবার খনন শুরু করা হল। এবারে লক্ষ্য স্তূপ নয়, বরং এর পাশে থাকা বিহারগুলির ওপরে। দক্ষিণ দিকের বিহারের খনন পেপ্পে বা মুখার্জি করেননি। সেখান থেকে এবারে পাওয়া গেল উত্তরের মসৃণ কৃষ্ণপাত্র, বাটখারা, তামার বস্তু আর বেশ কিছু কুষাণ যুগের ও অযোধ্যা রাজ্যের মুদ্রা। স্তূপের পূর্ব দিকের বিহারের খনন ভালভাবে করা হয়েছিল এবারে। এখানে নিয়মিত দূরত্বে কাঠের খুঁটি দিয়ে ছাদ বানানোর নিদর্শন পাওয়া গিয়েছিল। অন্তিম বসতির সময়কালে ঘটা এক অগ্নিকাণ্ডে সেইসব খুঁটি পুড়ে একদম ছাই হয়ে গিয়েছিল।
এবারে পালা ছিল উত্তর দিকের বিহারের অঞ্চলের খননের আর সেখানেই পাওয়া গিয়েছিল প্রথম সাফল্য। মাটি সরিয়ে বিহারের ছোটো ছোটো কক্ষ ও বারান্দা উন্মুক্ত করে দিতেই পাওয়া গিয়েছিল বেশ কয়েকটি মুদ্রাঙ্কিত মোহর (sealing, কাঁচা মাটির ওপরে সিল বা seal দিয়ে ছেপে দেওয়া ছবি ও অক্ষর) যাতে ‘কপিলাবস্তু’ লেখা ছিল। এই প্রথম কোনো পুরাবস্তুর হদিশ মিলেছিল যার ওপরে কপিলাবস্তু লেখা আছে।

সেখানে তিরিশখানির বেশি মুদ্রাঙ্কিত মোহর পাওয়া গিয়েছিল। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল এই যে এইসব মুদ্রাঙ্কিত মোহরগুলি সব একসঙ্গে রাখা ছিল এমন কিন্তু নয়, মাটির ১.০৫ থেকে ১.৭৫ মিটার গভীরতার মধ্যে বিভিন্ন স্তরে ও স্থানে এই মুদ্রাঙ্কিত মোহরগুলি পাওয়া গিয়েছিল। প্রধানত গোল হলেও কয়েকটি মুদ্রাঙ্কিত মোহর ডিম্বাকারও ছিল।

মুদ্রাঙ্কিত মোহরগুলির ওপরে ছাপা লেখটি মোটামুটি তিন রকমের ছিল যার মধ্যে এক ধরনের লেখের সম্পূর্ণ পাঠোদ্ধার সম্ভব হয়নি। সাধারণ পূর্বাব্দের ১ম–২য় শতাব্দীর ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা লেখগুলি ছিল –
১) দেবপুত্র বিহারে, কপিলাবস্তু, ভিক্ষু সঙ্ঘ আর লেখের মাথায় একটি ওঁ চিহ্ন (২২ টি),
(ওঁ) দেবপুত্র বিহারে, কপিলাবস্তুর ভিক্ষু সম্প্রদায়ের
২) মহা কপিলাবস্তু ভিক্ষু সঙ্ঘ (১৩টি),
৩) চু(—–) ত্রয় ভিক্ষু সংঘ ( ৫ টি),
ভিক্ষু সংঘের প্রতি ____ (কোনো দাতার নাম থাকবে)

পিপরাওয়ার মূল স্তূপের কাছাকাছি অনেকগুলি ধ্বংসস্তূপ আছে। পশ্চিম দিকের এমনই একটি স্তূপে খননের কাজ শুরু হয়েছিল ১৯৭৪ সালে। সেখানে তিনটি স্তর খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল আর মাঝের স্তর থেকে সাধারণ পূর্বাব্দের ১ম শতাব্দীর মুদ্রাঙ্কিত মোহর পাওয়া গিয়েছিল যার মধ্যে কিছু মোহরের ওপরে ব্রাহ্মী লিপি ছাপা ছিল। অক্ষরগুলি এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল যে সেগুলিকে ঠিকঠাক পড়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। ১৯৭৪ এর খনন থেকে পাওয়া মুদ্রাঙ্কিত মোহরগুলি মিলে প্রায় চল্লিশখানির মতো মুদ্রাঙ্কিত মোহর হয়ে গিয়েছিল যাদের ওপরে ‘কপিলাবস্তু’ শব্দটি পাওয়া গিয়েছে। এছাড়া একটি পাত্রের ঢাকনার ওপরে উৎকীর্ণ করা ছিল – ‘দেবপুত্র বিহারে, কপিলাবস্তু, ভিক্ষু সঙ্ঘ।’ এই আবিষ্কারটিও নিঃসন্দেহে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

কপিলাবস্তু নাম সহ লেখ পাওয়া গেল অর্থাৎ কপিলাবস্তুর অবস্থানের পাথুরে প্রমাণ পাওয়া গেলেও কিন্তু সংশয় মিটল না কারণ পিপরাওয়াতে যা পাওয়া গিয়েছিল তা হল একটি বিশাল স্তূপ আর তার সংলগ্ন বৌদ্ধ বিহার। সেখানে পাওয়া মুদ্রাঙ্কিত মোহরগুলিতেও কপিলাবস্তুর ভিক্ষু সংঘের কথাই উল্লেখ করা আছে। এবারে কপিলাবস্তু নগরটিকে তো খুঁজে বার করতে হবে, নয়তো রহস্যের যবনিকা পতন তো আর হচ্ছে না। এবারে আমরা বরং শ্রীবাস্তবের বক্তব্য অনুযায়ী কাহিনিকে এগিয়ে নিয়ে যাই। (Srivastava K M: 1980)
“শাক্য বংশের স্তূপ ও কপিলাবস্তু নামের বৌদ্ধ বিহারের অবস্থান নিশ্চিত হয়ে যাওয়ার পর প্রাচীন কপিলাবস্তু নগরটিকে শনাক্ত করা অনেকটাই সোজা কাজ মনে হচ্ছিল। কাছেপিঠে অল্প অনুসন্ধান করার পর ১ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে গনওয়ারিয়া (Ganwaria)-র ধ্বংসস্তূপে খনন শুরু করা হয়েছিল। পূর্ব-পশ্চিমে ২০০ মিটার এবং উত্তর-দক্ষিণে ২৫০ মিটার অবধি বিস্তৃত প্রত্নক্ষেত্রটির উচ্চতা প্রায় সাত মিটার ছিল। খননের সময়, দুটি পোড়া বিশাল ইটের ভবন সহ একটি চত্বর (complex) পাওয়া গেল যাদের উঁচু এবং চোখে পড়ার মতো বড়ো প্রবেশদ্বার ছিল পূর্ব দিকে। দুটি ভবনের মধ্যে বড়োটি ছিল ধ্বংসস্তূপের পশ্চিম প্রান্তে, প্রায় ত্রিশ মিটার বর্গক্ষেত্র জুড়ে অবস্থিত। চারদিকে দালান সহ এটি ছিল ২৫ কক্ষের একটি ভবন। শেষ পর্যায়ে এসে একটি বিভাজিকা দেওয়াল (partition wall) তুলে কক্ষের সংখ্যা ২৬ করে দেওয়া হয়েছিল। দালানগুলি চার প্রধান দিক অনুযায়ী বিস্তৃত ছিল। সব মিলিয়ে পাঁচ পর্যায়ে পুরো চত্বরটি নির্মিত হয়েছিল। প্রবেশ দ্বারের দুই পাশের কক্ষ দুটি ছিল সবচেয়ে প্রশস্ত। সাধারণত মেঝে তৈরি হত চুন সুরকির মিশ্রণ দিয়ে যদিও তৃতীয় পর্যায়ে ইটের টুকরোও ব্যবহার করা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ের নির্মাণে উত্তর-পশ্চিমে দালানের কোণে একটি ৮৫ সেন্টিমিটার ব্যাসের কূপ দেখা যায়। মাঝখানে প্রায় পঁচিশ মিটার বর্গক্ষেত্রের একটি খোলা উঠানের চারপাশ ঘিরে কক্ষ এবং বারান্দা নির্মাণ করা হয়েছিল। বাইরের প্রাকার দুই মিটারের চেয়েও চওড়া আর ভেতরের প্রাকারের উপরাংশ ১.৭০ মিটার চওড়া। আড়াআড়ি দেওয়ালগুলিও এক মিটারের বেশি চওড়া।

বড়ো কাঠামোটির স্থাপত্যের মধ্যে বেশ কিছু অসাধারণ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। আস্ত ইট দিয়ে খালি সামনের অংশ গাঁথা হয়েছিল আর ভেতরের অংশ ভর্তি করা হয়েছিল ইটের টুকরো দিয়ে। শেষ দুটি পর্যায়ে সামনের দিকে ব্যবহৃত ইটগুলিকে ঘষে তারপর গাঁথা হয়েছিল যাতে দেখতে সুন্দর লাগে ও কাঠামোটি আরও শক্তিশালী হয়। দুটি বাড়তি বুরুজের মতো কাঠামো নির্মাণ করে প্রবেশ দ্বারকে একটি রাজকীয় চেহারা দেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত আকর্ষণীয় করে তুলতে প্রতিটি বুরুজের পশ্চিম প্রান্তে তিনটি কোণ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী কালে প্রবেশ সীমিত রাখতে বুরুজ থেকে প্রবেশ দ্বারের একদম পূর্ব দিকে মুখোমুখি দুটি প্রাচীর খাড়া করা হয়েছিল। প্রাচীরদুটির সামনে আস্ত ইট ও ভেতরে ইটের টুকরো দিয়ে তৈরি এক মেঝে। দ্বিতীয় প্রবেশ দ্বারের উন্মুক্ত অংশও ২.৩৫ মিটার চওড়া।

কিন্তু কিছু অতিরিক্ত বৈশিষ্ট্য ব্যতীত, উত্তর-পূর্বে প্রায় ত্রিশ মিটার দূরে অবস্থিত ছোট কাঠামোর চত্বরটি ছিল, সামগ্রিকভাবে, বড়োটির মতোই। ২৬ মিটারের একটি বর্গাকার ভূমির ওপরে তিন পর্যায়ে নির্মিত এই কাঠামোয় ছিল ২১ টি কক্ষ। এই চত্বরের নতুন বৈশিষ্ট্যের মধ্যে একটি ছিল উত্তর-পূর্ব কোণের একটি ছোটো কুঠুরি যা হয়তো শৌচাগার বা স্নানাগার হিসেবে ব্যবহৃত হত। গোপনীয়তা বজায় রাখার জন্য, মাঝের আঙিনার দিকে মুখ করা আরেকটি ছোট কক্ষের মাধ্যমে সেখানে প্রবেশের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
ছোটো চত্বরের কক্ষের সংখ্যা কম হলেও সেখানকার দ্বার বেশি প্রশস্ত ছিল, চওড়ায় ৩.১৫ মিটার। প্রথম দিকে প্রবেশের মুখ ছিল পূর্ব দিকে। পরের যুগে এটিকে একটি দেওয়াল গেঁথে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল আর উত্তর দিকে একটি ১.২০ মিটার চওড়া, সরু প্রবেশপথ খোলা হয়েছিল। বৃহত্তর চত্বরের কাঠামোর বিপরীতে
, এখানকার দক্ষিণ-পূর্ব এবং উত্তর-পশ্চিম দিকের কোণার কক্ষগুলি ছিল সবচেয়ে বড়ো এবং আকৃতিতে বর্গাকার। গনওয়ারিয়ায় চত্বরের কাঠামোগুলির প্রবেশপথগুলি, পিপরাওয়ার বিহারগুলির প্রবেশপথদের মত স্তূপের দিকে মুখ করে নয়।

খননে পাওয়া মৃৎপাত্র ও প্রত্নবস্তুর বিচারে বলা যায় যে এখানকার প্রাচীনতম বসতির সময় হচ্ছে সাধারণ পূর্বাব্দের ৮ম শতাব্দী। এখানে পাওয়া প্রধান প্রধান মৃৎপাত্রের মধ্যে, ধূসর পাত্র, উত্তর ভারতের পশ্চিম অংশে চিত্রিত ধূসর পাত্রের সঙ্গে পাওয়া লাল পাত্রের মতো পাত্র, কালো পালিশ করা মৃৎপাত্র এবং প্রচুর পরিমাণে উত্তরের পালিশ করা কালো পাত্রের সুন্দর সুন্দর সব নমুনার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে (grey ware, red ware vases associated with the Painted Grey Ware in the western part of Northern India, black polished ware and beautiful specimens of Northern Black Polished Ware in plenty)। সাধারণ অব্দের ৪র্থ শতাব্দী অবধি প্রত্নক্ষেত্রটিতে মানুষ বাস করত।
সমস্ত বসতির সময়কালকে চারটি পর্যায়ে ভাগ করা যেতে পারে। ১ম পর্যায়ে রেকাবিগুলির কানা হত লাল ও তলদেশ ধূসর, লাল পাত্র, পালিশ করা সুন্দর লাল থালা-বাসন এবং বাটি যাতে মাঝে মাঝে কালো রঙ দিয়ে চিত্রিত ছিল, এবং কালো পালিশ করা পাত্র। ২য় পর্যায়ে ছিল সম্ভ্রান্ত উত্তরের মসৃণ কৃষ্ণপাত্র। ৩য় পর্যায় ছিল উত্তরের মসৃণ কৃষ্ণপাত্র পরবর্তী শুঙ্গ যুগের সময় কালীন ও ৪র্থ পর্যায়টি চরিত্রগতভাবে ছিল কুষাণ।

এই স্থাপনাগুলির কাছে রয়েছে পিপরাওয়া নামক প্রাচীন প্রত্নক্ষেত্র যেখান থেকে ‘কপিলাবস্তু’ নামের মুদ্রাঙ্কিত একাধিক মোহর পাওয়া গেছে। স্থাপনাগুলির চিত্তাকর্ষক আকার, নির্মাণের বৈশিষ্ট্য এবং তাদের মধ্যে পাওয়া বিপুল পরিমাণ পুরাকীর্তি নিঃসন্দেহে বোঝায় যে এটি ছিল কপিলাবস্তুর রাজার, অর্থাৎ শাক্য রাজা শুদ্ধোদন ও তাঁর পূর্বসূরিদের আবাসিক অঞ্চল।
পিপরাওয়ার কাছেই গনওয়ারিয়াতে খনন করে এমন একটি বিশাল স্থাপত্যের কাঠামো অবধারিত ভাবে বুঝিয়ে দেয় যে সেই স্থানটি কোনো সাধারণ ক্ষেত্র ছিল না। পিপরাওয়াতে ‘কপিলাবস্তু’ লেখা মোহর উদ্ধার এবং তার পাশেই এমন বিশাল আকারের সব ভবন পাওয়া দেখে শ্রীবাস্তব অনুমান করেছিলেন যে গনওয়ারিয়া ছিল শাক্য রাজাদের প্রাসাদ। যদিও সবাই এই ধারণায় একমত হতে পারলেন না। বিভিন্ন যুক্তি সামনে আসে আর তাই নিয়ে চাপানউতোর এখনও চলছে।
অনেকেই বলেন যে পিপরাওয়ার স্তূপটি যে বুদ্ধদেবের দেহাস্থির ওপরে নির্মিত আদি ‘নির্বাণ’ স্তূপ কি না তার কোনো প্রমাণ নেই, যদিও পেপ্পে-র(William Claxton Peppé) আবিষ্কার করা মঞ্জুষার ওপরের লেখ বলছে যে সেটি স্বয়ং বুদ্ধের দেহাবশেষ বহন করছে। এক্ষেত্রে আরেকটি প্রশ্ন আসে যে যদি পেপ্পে-র খননে প্রাপ্ত মঞ্জুষায় বুদ্ধদেবের দেহাস্থি থাকে তাহলে শ্রীবাস্তব তার চেয়ে নীচে খনন করে যে মঞ্জুষাগুলি পেয়েছিলেন সেগুলিতে কার দেহাস্থি রয়েছে? তুলনায় নীচের স্তরে এই দেহাস্থিসহ মঞ্জুষাদের অবস্থান থেকে প্রমাণ হচ্ছে যে সেগুলি পেপ্পে-র পাওয়া মঞ্জুষার থেকে বেশি প্রাচীন। সবক’টি মঞ্জুষাতেই যে বুদ্ধের দেহাস্থি আছে এমনটি হতে পারে না।

পিপরাওয়ার স্তূপের একটি লম্বচ্ছেদ নিলে এই বিষয়টি অনেকটা পরিষ্কার হয়ে যায়। পিপরাওয়ার আদি স্তূপ বা Phase I এর স্তূপের মধ্যে থেকে শ্রীবাস্তব তাঁর মঞ্জুষা দুইটি উদ্ধার করেছিলেন। সেই আদি স্তূপ সম্ভবত মাটির ছিল। Phase II বা দ্বিতীয় পর্যায়ে এসে সেই আদি স্তূপটিকে কয়েকগুণ বর্ধিত করা হয়েছিল। পেপ্পে-র বাক্সসমেত পাওয়া মঞ্জুষা ছিল সেই দ্বিতীয় পর্যায়ের স্তূপে।
এরপর আরেকবার স্তূপটিকে পরিবর্ধিত করা হয়েছিল কিন্তু সেই সময়ে মনে হয় কোনোকিছু আর অভ্যন্তরে স্থাপন করা হয়নি বা হলেও তার হদিশ পাওয়া যায়নি। সুতরাং ধরে নেয়া যায়, বুদ্ধদেবের অন্ত্যেষ্টিকার্যের পর শাক্যরা তাঁর দেহাস্থি-র যে ভাগ পেয়েছিল তাকে কোনো আচারের মাধ্যমে মঞ্জুষায় রেখে তার ওপরে প্রথম পর্যায়ের স্তূপটি নির্মিত হয়েছিল। সেই স্তূপটি বুদ্ধের মৃত্যুর সময়েই নির্মিত আর তাই তা ছিল বড়োই সাদামাটা (শ্রীবাস্তব দুটি মঞ্জুষা পেয়েছিলেন। তাই আমার ব্যক্তিগত ধারণা যে শুদ্ধোদনের দেহাস্থিকেও বুদ্ধদেবের সঙ্গে রেখে সেই আদি স্তূপে স্থাপন করা হয়েছিল)।
পরবর্তীকালে কোনো ক্ষমতাশালী ও ধনবান ব্যক্তি স্তূপটিকে পরিবর্ধিত করেন। আবার যেকোনো সাধারণ ক্ষমতাশালী বা ধনবান ব্যক্তির পক্ষে ইট দিয়ে এত বিশাল স্তূপ নির্মাণ, দৈত্যাকার পাথরের বাক্স বানানো, অজস্র দামি বস্তু সমেত স্ফটিকের পাত্র ইত্যাদি স্তূপে স্থাপনা করা মোটেই সম্ভব নয়। সেইদিক দিয়ে এই ব্যক্তি একমাত্র সম্রাট অশোকই হতে পারেন, আর কেউ নয়। পাথরের বাক্সের শৈলী ও মঞ্জুষার লেখের চরিত্র এই বক্তব্যকে সমর্থন করছে।
এবারে আসি দেহাস্থি-র বিষয়ে। পেপ্পের পাওয়া অশোকের মঞ্জুষায় খোদিত লিপিতে রয়েছে যে বুদ্ধ ও তাঁর জাতির মানুষদের দেহাস্থি সেখানে রয়েছে। এমন তো হতে পারে যে আদি স্তূপে রক্ষিত বুদ্ধদেবের দেহাস্থির ব্যাপারে অশোক ভালোমত ওয়াকিবহাল ছিলেন, তিনি সেই স্তূপের ভেতরে শাক্য জাতির আরও কিছু দেহাস্থি (এর সঙ্গে শাক্য জাতির সংহার জড়িয়ে আছে যা আমরা পরে পড়ব) স্থাপন করে স্তূপটিকে বর্ধিত করে ইট দিয়ে বাঁধিয়ে দিয়েছিলেন। সুতরাং স্তূপের একদম নীচে রইল বুদ্ধদেবের দেহাবশেষ (শ্রীবাস্তবের উদ্ধার করা) আর ওপরে রইল অশোকের স্থাপিত বস্তু ও শাক্যজাতির দেহাবশেষ। (পেপ্পে-র উদ্ধার করেছিলেন)
আমরা জানি যে অশোক রামগ্রামের স্তূপটি ছাড়া আদি দেহাবশেষ স্তূপগুলির সব কয়টি থেকে অল্প পরিমাণ দেহাস্থি সংগ্রহ করেছিলেন। এ ক্ষেত্রে পিপরাওয়ার স্তূপটিও তিনি নিশ্চয়ই উন্মুক্ত করিয়েছিলেন। আর তারপর মঞ্জুষাগুলি পুনরায় স্থাপনা করার সময় সেগুলিকে সুরক্ষিত করার জন্যে সেগুলিকে ঘিরে একটি করে ইটের কুঠুরি নির্মাণ করে দিয়েছিলেন। ডঃ হারবার্ট হের্টেল (Dr. Herbert Härtel) আদি স্তূপে ইটের কুঠুরি দেখে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন কারণ এমন স্তূপে ইটের ব্যবহার তখন ছিল না। কিন্তু এখানে অশোকের স্তূপ পরিবর্ধনের বিষয়টি মাথায় রাখলেই ইটের কুঠুরির আবির্ভাব যে কীভাবে হয়েছিল তা নিয়ে সংশয় থাকে না। আদি স্তূপের ভেতরে রক্ষিত বুদ্ধদেবের দেহাবশেষ ও অশোকের দ্বারা স্থাপিত শাক্য জাতির দেহাবশেষের বিষয়দুটি একত্র করলে, অশোকের মঞ্জুষার ওপরে খোদিত লেখটির অর্থ নিয়ে যে সংশয় ছিল সেটাও দূর হয়ে যাবে –
“বুদ্ধের শারীরিক অবশেষের এই মন্দির। শাক্য ভ্রাতাদের ভগবান, মহান সেই জন তাঁদের পুত্র এবং স্ত্রীদের সঙ্গে।”
যদি আমরা এমনটা ধরে নিই, তাহলে এখানে বুদ্ধ এবং তাঁর জাতির অন্যান্যদের উল্লেখ কেন করা হয়েছিল তার অর্থ পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে অশোকের স্তূপ নির্মাণ কার্যাবলী, এই অঞ্চলে তাঁর তীর্থযাত্রা এবং কোনো সম্রাটের তীর্থযাত্রার সঙ্গে যেমন কার্যকলাপ ঘটে থাকে, সেই সবকিছুই এর সঙ্গে খাপ খেয়ে যাচ্ছে -কারণ কোনো সম্রাটের তীর্থযাত্রার সময় সাধারণত তিনি এমন সব বড়ো বড়ো স্থাপনা, উৎসর্গ ইত্যাদি করতেন।
আর তৃতীয় পর্যায়ে মনে হয় কণিষ্ক স্তূপটি পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত করেছিলেন। সাধারণ পূর্বাব্দের ১ম–২য় শতাব্দীর মুদ্রাঙ্কিত মোহরে ‘দেবপুত্র’ বলতে এই কুষাণরাজকেই বোঝানো হয়েছে।
সব কিছু ঠিক মনে হলেও একটি বিষয় আমার অনেকটাই খাপছাড়া মনে হয়েছে তা হল পিপরাওয়াতে পাওয়া মঞ্জুষার ওপরে থাকা লেখটি। অশোকের উৎসর্গ করা সমস্ত কিছুর মধ্যে একটি অসাধারণ সম্পূর্ণতা (finishing) দেখতে পাওয়া যায়। তাছাড়া তাঁর সঙ্গে সম্বন্ধিত প্রত্যেকটি বস্তুর সঙ্গে মৌর্যযুগের শৈলী ওতপ্রোত জড়িয়ে থাকে। এক্ষেত্রে আমরা আশা করব যে সম্রাট অশোক যখন নিজে এসে বুদ্ধের দেহাবশেষ স্তূপটিকে পরিবর্ধিত করে তার ভেতরে আরও কিছু অতিরিক্ত সামগ্রী রেখে যাচ্ছেন তখন সেগুলিতেও সেই বৈশিষ্ট্যগুলো পরিলক্ষিত হবে। বাস্তবে বিশাল পালিশ করা পাথরের বাক্স, স্ফটিকের অপূর্ব পাত্র, মূল্যবান ধাতু ও রত্নের উপকরণ ইত্যাদি তারই সাক্ষ্য দেয়, কিন্তু এর মধ্যে একটি জিনিস বড়োই বেমানান- তা হল লেখটি। ঐতিহাসিক দিক দিয়ে বিশ্লেষণ করলে মঞ্জুষার ওপরের লেখটি হল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, অথচ সেটা পাত্রের গায়ে আঁচড়ে লেখা হয়েছে, অশোকের অন্যান্য লেখের মতো সুন্দরভাবে খোদাই করা নয়। বিষয়টি খুবই ভাবায় এবং মনে হয় যে এতে ডঃ ফিউরারের কোনো হাত নেই তো! প্রকৃতপক্ষে পেপ্পের সঙ্গে ফিউরারের যোগ ছিল। ফিউরার তখন ছিলেন উত্তর-পশ্চিম প্রদেশ ও অযোধ্যা (North-Western Province and Oudh)-র প্রত্নতত্ত্ববিদ এবং সদ্য সদ্য লুম্বিনী আবিষ্কার করে প্রচারের আলোয় এসেছেন। পেপ্পের এলাকাও পড়ত ফিউরারের অধিক্ষেত্রের মধ্যে এবং সেই সময় ফিউরার মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে নেপালের সাগরওয়াতে খনন করছিলেন। পেপ্পে একটি চিঠিতে ফিউরারকে পিপরাওয়া থেকে আবিষ্কারের ঘটনা জানিয়েছিলেন। পেপ্পের চিঠিপত্র সব পাওয়া গেছে এবং প্রকাশও হয়েছে যা “Peppe Paper” বলে পরিচিত (Allen Charles: What happened at Piprahwa)। দেখা যাচ্ছে যে শুধুমাত্র ফিউরার নয়, সেই একই দিনে (১৮ই জানুয়ারি, ১৮৯৮) পেপ্পে স্মিথকেও চিঠি লিখেছিলেন। দুটি চিঠির বয়ান মোটামুটি একই যেখানে তিনি স্তূপ থেকে যে আবিষ্কার করেছিলেন তারই বর্ণনা রয়েছে কিন্তু সেখানে মঞ্জুষার ওপরে কোনো লেখের কথা উল্লিখিত নেই। চিঠি লেখার পরের দিনই মনে হয় পাত্রের ওপরে লেখটিকে পেপ্পে নজর করেছিলেন আর তাতে মনে হয় যে পাথরের বাক্সটি তিনি চিঠি লেখার দিনই খুলেছিলেন আর তাই ভাল করে পাত্রগুলি পরিষ্কার করে দেখার সময় তিনি পাননি। পরে পেপ্পে মঞ্জুষার লেখটি নকল করে স্মিথের কাছে পাঠিয়েছিলেন আর সেই কাগজে তারিখ দেওয়া আছে ১৯ জানুয়ারি, ১৮৯৮। আবিষ্কারের চিঠি পাঠাবার পরের দিন লেখ নিয়ে আরেকটি চিঠি পাঠাবার অর্থ ছিল যে তার আগের দিন লেখটি সম্বন্ধে পেপ্পে জানতেন না। প্রথম চিঠির প্রসঙ্গে স্মিথ পেপ্পে-কে উত্তর লিখেছিলেন ১৯-২০ জানুয়ারি আর ফিউরার লিখেছিলেন ১৯ জানুয়ারি। উভয়েই পেপ্পেকে পাত্রের ওপরে লেখ আছে কি না দেখতে বলেছিলেন আর সেটি স্বাভাবিক ছিল কারণ মঞ্জুষার ওপরে সাধারণত লেখ থাকে। স্তূপের ভেতরে পাথরের বাক্সের যে ছবি আছে সেখানে বাক্সটিকে ঢাকনা খোলা অবস্থায় দেখা যায় অর্থাৎ ঢাকনা খুলে ভেতরে বস্তুগুলিকে পেপ্পে আগেই বার করে নিয়েছিলেন আর সেটাই স্বাভাবিক কারণ অমন ভারী বাক্সকে তুলবার সময় ভেতরে থাকা বস্তুগুলি ভেঙে যেতে পারে আর এক্ষেত্রে সেগুলি ছিল অমূল্য প্রত্নবস্তু। ১৯ জানুয়ারি পেপ্পে যখন লেখের নকল করছেন তখনও তাঁর কাছে স্মিথ বা ফিউরারের উত্তর এসে পৌঁছায়নি। তিনি তাঁদের পরামর্শ ছাড়াই লেখটিকে লক্ষ করেছিলেন।

লেখের নকল দেখে তার গুরুত্ব বুঝে স্মিথ দ্বিতীয় চিঠিটির উত্তর দিয়েছিলেন ২৩ জানুয়ারি আর ফিউরার লিখেছিলেন ২৪ জানুয়ারি। উভয়েই জানিয়েছিলেন যে কাজের চাপে তাঁদের পক্ষে তক্ষুনি পিপরাওয়া যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
২৭ জানুয়ারি স্মিথ পিপরাওয়াতে এসে পাথরের বাক্স ও অন্যান্য বস্তুগুলি দেখেছিলেন আর তারপর তাঁরা সাগরওয়াতে গিয়ে ফিউরারের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। ২৩ ফেব্রুয়ারির এক চিঠিতে ফিউরার পেপ্পেকে লিখেছিলেন যে তিনি ২৬ ফেব্রুয়ারির আগে পিপরাওয়া যেতে পারবেন না।
ফিউরার ঠিক কবে পিপরাওয়া এসেছিলেন তা সঠিকভাবে না জানা গেলেও বোঝা যাচ্ছে যে পেপ্পের আবিষ্কারের পাঁচ সপ্তাহ কেটে যাবার আগে অন্তত ফিউরার বস্তুগুলিকে দেখেননি।
আরেকটি বিষয় নিয়েও জলঘোলা কম হয়নি, তা হল মঞ্জুষার লেখের সঙ্গে পেপ্পের নকল করা লিপির পার্থক্য। ব্রাহ্মী ‘তি’ অক্ষরটি নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছিল যেখানে কাগজের ওপরে আঁকা পেপ্পের নকলটিতে ‘তি’ একদম ঠিক আছে কিন্তু মঞ্জুষার লেখের একটি ছবিতে দেখা গিয়েছিল যে সেখানে ‘তি’ অক্ষরটি কিছুটা
আলাদা। অনেকে বলে থাকেন যে পেপ্পের কাগজটি আসলে ছিল লেখটি লেখার আগে কী লিখতে হবে তার প্রস্তুতি নেওয়া অন্তিম খসড়া। অনভিজ্ঞ পেপ্পে সেই অনুযায়ী লেখ বানাতে গিয়ে ‘তি’ অক্ষরে একটু গোলমাল করে ফেলেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে বিষয়টি হল যে ১৮৯০ সালে পিপরাওয়ার পাত্রটির অনেকগুলি নকল বানানো হয়েছিল। কলকাতা সহ বিভিন্ন জাদুঘরে দর্শকদের সামনে এই নকলগুলো প্রদর্শিত হয়ে থাকে। আসল পাত্রটি থাকে কলকাতার জাদুঘরের স্ট্রংরুমে। ষড়যন্ত্র নিয়ে আলোচনার সময়ে দেখানো পাত্রের ওপরে লেখের ছবিটি জাদুঘরে থাকা এমনই এক প্রতিরূপ পাত্রের (replica) থেকে নেয়া। প্রকৃত পাত্রের গায়ে থাকা লেখ ও পেপ্পের আঁকা নকলে ‘তি’ অক্ষরে পার্থক্য নেই।
কাগজপত্র ঘেঁটে যা ধারণা হল তা আমি সামনে রাখলাম কিন্তু একটি ছোটো সন্দেহ কিন্তু এই সব সযত্নে গড়ে তোলা প্রাসাদকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে যদি মেনে নিই যে পেপ্পে জালিয়াতি করেছিলেন বা ফিউরারের পরিকল্পনা মতো ঘুঁটি সাজিয়েছিলেন। হ্যারি ফকের মতে ফিউরারের লিপি সংক্রান্ত জ্ঞান এতটাও ছিল না যে তিনি এত মৌর্য যুগের ব্রাহ্মী লিপি নকল করতে পারবেন (উৎস-তথ্যচিত্র-Bones of the Buddha পেপ্পে দ্বারা বুদ্ধের দেহাবশেষ আবিষ্কার নিয়ে স্টিভেন ক্লার্ক-এর ২০১৩ সালে নির্মিত এই তথ্যচিত্রটি দেখতে কোডটি স্ক্যান করুন।)

যদিও এই যুক্তি মানা শক্ত কারণ তাহলে তো নিগালি সাগরের স্তম্ভ নিয়েও প্রশ্ন করা যাবেনা। তবে পালিশ করা বিশাল পাথরের বাক্স, স্ফটিকের পাত্র, সোনা ও মূল্যবান পাথরের বস্তু ইত্যাদি বুঝিয়ে দেয় যে বস্তুগুলি আসল। পিপরাওয়া যেতে হলে গোরখপুর থেকে যাওয়া সুবিধাজনক। সাধারণ হোটেলে রাত্রিবাস করতে আপত্তি না থাকলে আমি বলব যে লুম্বিনী-তিলৌরাকোট দেখে এসে সীমান্ত পার করে সিদ্ধার্থনগর জেলার নৌগঢ় বা তেতরী বাজার-এ চলে আসুন। নৌগঢ়ে রেলস্টেশনও আছে। সেখানে রাত্রিবাস করে ওখান থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত পিপরাওয়া অটোরিকশাতেও ঘুরে আসতে পারবেন অনায়াসে।
