কপিলাবস্তু রহস্য
লুম্বিনী থেকে সিদ্ধার্থকে আনা হয়েছিল কপিলাবস্তুতে। মাতৃহারা দুধের শিশুর লালনপালনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল মায়াদেবীর বোন মহাপ্রজাপতিকে। কপিলাবস্তুতে সিদ্ধার্থের আসার পর একদল পণ্ডিত তাঁর জন্মপত্রিকা প্রস্তুত করেছিলেন। তাঁরা কুমারের দেহে বত্রিশটি এমন লক্ষণ দেখতে পেয়েছিলেন যা দেখে তাঁরা ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন যে তিনি হয় রাজচক্রবর্তী সম্রাট হবেন অথবা প্রব্রজ্যা নিয়ে শাস্তা (গুরু, শিক্ষক) হবেন। এইসময় কপিলাবস্তুতে সিদ্ধার্থকে দেখতে এসেছিলেন অসিত নামের এক ঋষি। সব বৌদ্ধ গ্রন্থে অসিত ঋষির কাহিনি থাকায় মনে হয় যে সেই কাহিনিটি অতি প্রাচীন।
“অসিত ঋষি অত্যন্ত বিনীতভাবে শুদ্ধোদনের গৃহে আসিলেন; এবং তিনি নবজাত শিশুকে দেখিতে চাহিলেন। শাক্যগণ বোধিসত্ত্বকে অসিত ঋষির নিকটে আনিল। তখন তাঁহার নানা সুলক্ষণ দেখিতে পাইয়া ঋষি উচ্ছ্বাসের সহিত বলিয়া উঠিলেন, ‘এই শিশু মনুষ্যপ্রাণীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ।’ কিন্তু যখন অসিত ঋষির মনে পড়িল যে তিনি আর বেশিদিন বাঁচিবেন না, তখন তাঁহার চোখ হইতে ফোঁটা ফোঁটা জল পড়িতে লাগিল। তাহা দেখিয়া শাক্যরা জিজ্ঞাসা করিল, ‘নবজাত কুমারের জীবনে কি কোনো বিপদের আশঙ্কা আছে?’ ঋষি কহিলেন, ‘এই কুমার পরে সংবুদ্ধ হইবে, কিন্তু আমার আয়ু অতি অল্পই অবশিষ্ট থাকায়, আমি তাঁহার ধর্মোপদেশ শুনিবার সুযোগ পাইব না, সেইজন্য আমার দুঃখ হইতেছে।’ এইরূপ কহিয়া তিনি শাক্যদের মনের আশঙ্কা দূর করিলেন, এবং তাহাদিগকে আনন্দিত করিয়া, তিনি সেখান হইতে চলিয়া গেলেন।” (কোসম্বী: ১৯৮০, ৮০)।
অসিত ঋষির কাহিনি যেন অনেকটা যিশুর মতো যেখানে তিন জ্ঞানী মানুষ এসে যিশুর জন্মের পর তাঁকে দেখতে এসে তাঁর সম্পর্কে ভবিষ্যৎবাণী করে গিয়েছিলেন। সিদ্ধার্থ তাঁর ২৯ বছর বয়স অবধি কপিলাবস্তুতে ছিলেন তারপর তাঁর মহাভিনিষ্ক্রমণ ঘটে অর্থাৎ জাগতিক বিলাসব্যসন ত্যাগ করে তিনি বোধি লাভের উদ্দেশ্যে কপিলাবস্তু ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। অবশ্য তাঁর জীবনে তিনি একাধিকবার কপিলাবস্তুতে এসেছিলেন কিন্তু রাজকীয় জীবনে আর ফিরে যাননি কখনও।
নগরং কপিলবত্থু মে রাজা শুদ্ধোদনো পিতা
ময়ং জনেত্তিকা মাতা মায়া দেবী তি উচ্চতি।
একূনাতিম্সবস্সানি আগারং আজ্হ’ আহং বাসিং
রামো সুরামো সুভাতো তায়ো পাশাদমুত্তমা।
চত্তারীসসাহস্সানি নারীও সমলঙ্কৃতা
ভদ্দকচ্চা নাম নারী রাহুলো নাম আত্মজ।
– বুদ্ধবংশ ২৬.১৩-১৫
আমার শহর কপিলাবত্থু, রাজা শুদ্ধোদন আমার পিতা, আমার জননী এবং মাতা পরিচিত মায়া দেবী নামে। আমি উনত্রিশ বছর সংসার জীবন কাটিয়েছি। (আমার) তিনটি চমৎকার প্রাসাদ ছিল রম্ম, সুরম্ম, সুভকা। সেখানে চল্লিশ হাজার সুন্দরভাবে সজ্জিত নারী ছিল। আমার স্ত্রীর নাম ছিল ভদ্রকচ্ছা, আমার পুত্রের নাম রাহুল।
বুদ্ধদেব কপিলাবস্তুকে নিজের শহর বলেছেন। শুদ্ধোদন তাঁর ব্যবহারের জন্যে সেখানে তিনটি প্রাসাদ বানিয়ে দিয়েছিলেন। বুদ্ধের স্ত্রীকে বেশির ভাগ স্থানে ‘রাহুল মাতা’ বলা হয়। এখানে ‘ভদ্রকচ্ছা’ বলা হয়েছে। জাতকে তিনি বিম্বদেবী ও বিম্বসুন্দরী। আবার ললিতবিস্তরে তিনি গোপা আর মহাবস্তুতে যশোধরা।
এবারে আমাদের আলোচনা হবে কপিলাবস্তু নিয়ে। বুদ্ধদেবের নিজের শহর কপিলাবস্তুর অনেকগুলি নাম আমরা পেয়ে থাকি। ‘শাক্যমুনির শহর’ ছাড়াও নগরটি বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিল, যেমন কপিলাবস্তু, কপিলপুর, কপিলাহ্বয়পুর এবং কপিলস্য বস্তু (Law: 1954, 1)।
আমরা আগেই দেখেছি যে শাক্য বংশের প্রথম রাজা(রা) তরাই অঞ্চলে নির্বাসনে গিয়েছিলেন। মহাবংশম গ্রন্থ অনুযায়ী রাজা কর্ণিকার পুত্র গৌতমের বংশধর ছিলেন তাঁরা। মহাবস্তু অবদান গ্রন্থ মতে রাজা সুজাত-র পাঁচ পুত্র ও কন্যা নির্বাসনে গিয়ে শাক্য রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আবার দুল্ব পিটক অনুসারে বিরূঢ়ক রাজার চার পুত্র নির্বাসনে গিয়ে শাক্য রাজবংশের শুরু করেছিলেন। সেই রাজাদের নাম ও বংশ তালিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা আমরা করেছি। গ্রন্থ ও কিংবদন্তি অনুযায়ী নাম পৃথক পৃথক হলেও এই বিষয়ে কোনো বিবাদ নেই যে ইক্ষ্বাকু বংশের একটি শাখা তরাই অঞ্চলে গিয়ে শাক্য বংশের প্রতিষ্ঠা করেছিল। লুম্বিনীর খননে আমরা জেনেছি যে ১৪০০ সাধারণ পূর্বাব্দ নাগাদ একদল কৃষিজীবী মানুষ লুম্বিনী গ্রামের এলাকায় বসতি স্থাপন করেছিল। পাঠক দুটি ঘটনাকে জুড়তে চেষ্টা করবেন না কারণ আমাদের কাছে সময়কালের বিচারে দুটি ঘটনাকে মেলানোর উপযোগী কোনো প্রমাণ নেই। এমনকি কোনো কিংবদন্তিতেও নেই যে শাক্যরা যখন সেখানে রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছে তখন সেই অঞ্চল জনমানবশূন্য ছিল। বরং বলা হয়েছে যে সেখানে আরণ্যক জাতি বাস করত। আবার একটি বিষয়ে সব সুত্রই একমত যে শাক্যরা প্রথমে কপিলাবস্তু নগরের পত্তন করেছিল। তাহলে আমরা কপিলাবস্তু নগরের ইতিহাস নিয়ে একটু আলোচনা করে দেখি। আমরা মহাবস্তু অবদানের (প্রথম খণ্ড, একাদশ অধ্যায়) কাহিনি অনুসরণ করে এগোচ্ছি, পরে দুল্ব পিটকের কাহিনির অতিরিক্ত অংশ আলাদা করে বলে দেব।
সাকেত নগরে ইক্ষ্বাকু বংশের রাজা ছিলেন সুজাত। তাঁর পাঁচ পুত্র ছিল – ওপুর, নিপুর, করণ্ডক, উল্কামুখ ও হস্তিকশীর্ষ। পাঁচ পুত্র ছাড়াও তার ছিল পাঁচ কন্যা যাঁদের নাম ছিল, শুদ্ধা, বিমলা, বিজিতা, জলা ও জলি। জেন্তী নামের এক বিলাসিনীর গর্ভে রাজার আরেকটি পুত্র হয়েছিল যার নাম ছিল জেন্ত। এর পরের কাহিনি অনেকটাই রামায়ণের মতো। একদিন জেন্তির ওপরে খুশি হয়ে রাজা তাঁকে বর দিতে চেয়েছিলেন কিন্তু জেন্তি বলেছিলেন যে তিনি পরে ভেবেচিন্তে বর চেয়ে নেবেন। পরে একজন বুদ্ধিমান মহিলার পরামর্শে জেন্তি বর চেয়েছিলেন যে সুজাতর পাঁচ পুত্রকে যেন নির্বাসনে পাঠানো হয় যাতে রাজা সুজাতর পর তাঁর পুত্র রাজা হয়।
দুঃখিত মনে রাজা তাঁর পুত্রদের নির্বাসনে পাঠাবার ব্যবস্থা করেছিলেন। তিনি কোষাগার খুলে দিয়ে বলেছিলেন যে রাজ্যের যারা কুমারদের সঙ্গে যেতে ইচ্ছুক তাঁরা তাঁদের পছন্দমত যা কিছু সম্পদ নিয়ে যেতে
পারে। কুমারদের সঙ্গে তাঁদের বোনেরা এবং রাজ্যের অনেক মানুষ সাকেত থেকে বেরিয়ে উত্তর দিকে এগোতে লাগলেন। তাঁরা এসে পৌঁছেছিলেন কাশী। কাশী-কোশলের রাজা তাঁদের রাজ্যে থাকতে দিয়েছিলেন কিন্তু কয়েকদিনেই কুমারদের জনপ্রিয়তা দেখে তাঁর মনে ভয় হয়েছিল যে তাঁকে সরিয়ে রাজ্যের জনগণ না এই কুমারদের রাজা হিসেবে সিংহাসনে বসিয়ে দেয়। তাই তিনিও তাঁর রাজ্য থেকে কুমারদের চলে যেতে আদেশ দিলেন।
তাঁরা কাশী থেকে বেরিয়ে আরও উত্তরে এসে পৌঁছেছিলেন ‘হিমালয়প্রদেশের শাকোট বনখণ্ডে।’ সেখানে ছিল গৌতম গোত্রীয় কপিল ঋষির আশ্রম।
“তখন কুমারদিগের মনে এই কথা উদিত হইল- আমরা এই শাকোটবনখণ্ডে কি প্রকারের নিবাস রচনা করিব? (আমাদের সঙ্গে) এই মহান জনসংঘ আসিয়াছে। আমাদের নিশ্চিতই একটি নগর নির্মাণ করা উচিত। তখন সেই কুমারেরা কপিল ঋষির নিকটে গেলেন। তাঁহারা ঋষির পাদবন্দনা করিয়া বলিলেন, ‘যদি ভগবান, কপিল অনুমতি প্রদান করেন তাহা হইলে আমরা ঋষির নাম দিয়া কপিলাবস্তু নামক একটি নগর নির্মাণ করিতে পারি।’
“ঋষি বলিলেন, ‘যদি আমার এই আশ্রমকে রাজকুল (রাজবাড়ি)করিয়া নগর নির্মাণ কর, তাহা হইলে আমি অনুজ্ঞা বা অনুমতি প্রদান করিতে পারি।’ এই কুমারেরা ঋষিকে বলিলেন, ‘ঋষির যেরূপ অভিপ্রায়, আমরা সেরূপই করিব। আমরা এই আশ্রমকে রাজকুল করিয়া নগর নির্মাণ করিব।’ ঋষি তখন করক বা কমণ্ডলু গ্রহণ করিয়া উদক গ্রহণপূর্বক (অর্থাৎ কমণ্ডলু হইতে জল লইয়া) কুমারদিগকে সেই বস্তু বা ভূমিসম্পত্তি প্রদান করিলেন (অর্থাৎ জলস্পর্শ সহকারে ইহা দান করিলেন)। কুমারগণ ঋষির সেই আশ্রমটিকে রাজকুল করিয়া নগর নির্মাণ করিলেন। এই বস্তু বা ভূসম্পত্তি কপিল ঋষি দান করিয়াছিলেন বলিয়া ইহার কপিলাবস্তু এই নাম উৎপন্ন হইল। এইভাবে কপিলাবস্তু মহানগর সমৃদ্ধ, স্ফীত (সমুন্নত), ক্ষেমযুক্ত, সুভিক্ষ (অর্থাৎ খাদ্যদ্রব্যসম্পন্ন), জন-মনুষ্যদ্বারা আকীর্ণ, বহুজনমনুষ্যসমন্বিত, সুখিতজনবহুল ও জনপরিবারদ্বারা বিস্তীর্ণ হইল এবং দিগ্বিদিকে ইহা বিশ্রুত বা প্রসিদ্ধ হইল, ইহাতে উৎসব ও সমাজ (প্রীত্যর্থে জনসম্মেলন) বহুলভাবে প্রচলিত হইল, স্থানটি বণিকজনের প্রিয় হইয়া উঠিল, এবং ইহা ব্যবহার বা ব্যাবসা-বাণিজ্যসম্পন্ন হইল।” (মহাবস্তু অবদান, ১১.৩৫২-৩৫৩)।
এবারে আমরা তিব্বতীয় উপাদান দেখব। পাঠকদের নিশ্চয়ই দুল্ব পিটকে উল্লিখিত পোতলের রাজা বিরূঢ়ককে মনে আছে। বিরূঢ়ক তাঁর ছোটো রানির পিতার কথায় তাঁর ছোটো রানির পুত্র রাজ্যানন্দকে রাজা বানিয়েছিলেন আর বড়ো রানির চার পুত্র ও কন্যাদের নির্বাসনে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। সেই চার পুত্রের নাম ছিল উল্কামুখ, করকর্ণ, হস্তিঞ্জক, ও নুপুর। নির্বাসিত রাজকুমার ও রাজকন্যারা হিমালয়ের প্রান্তে এসে ভাগীরথীর তীরে অবস্থিত কপিল ঋষির আশ্রমে এসে পৌঁছেছিলেন। তাঁরা সেখানে কুটির বানিয়ে থাকতে লাগলেন এবং শিকার করে খাবার সংগ্রহ করতেন। ঋষির উপদেশ মতো তাঁরা নিজেদের বোনদের পত্নী হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁদের অনেকগুলি সন্তানসন্ততিও হয়েছিল। সংখ্যায় বৃদ্ধি পাওয়ার পর তাঁদের একটি বৃহত্তর স্থান প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল আর তখন ঋষি তাঁদের একটি স্থান দেখিয়ে দিয়েছিলেন যেখানে তাঁরা নগর বানাতে পারেন। সোনালি বালি দিয়ে ঋষি কপিল সেই নগরের স্থান চিহ্নিত করে দিয়েছিলেন। কপিল ঋষি তাদের ভূমি (বাস্তু) দিয়েছিলেন তাই সেই নগরের নাম হয় ‘কপিলাবস্তু।’ (f441-444, translated by Rockhill: 1884, 11-12)।
প্রতিটি গ্রন্থই কয়েকটি বিষয়ে একমত যে ইক্ষ্বাকু বংশের নির্বাসিত রাজকুমার ও রাজকন্যাদের একটি দল থেকে শাক্য বংশের শুরু। তাঁদের ভাই- বোনের মধ্যে বিবাহ প্রচলিত ছিল। কপিল ঋষির আশ্রমের পাশে কপিলাবস্তু নগর গড়ে উঠেছিল এবং ঋষির নাম থেকেই নগরের নাম হয়েছিল। আবার এই শাক্যদেরই একটি ধারা থেকে ‘কোলিয়’ জাতির সৃষ্টি হয়েছিল। তাঁরা ‘কোল’ নামের এক ঋষির অনুগ্রহ লাভ করেছিলেন এবং তাঁর নাম থেকেই তাঁদের জাতির নাম হয়েছিল। তাঁদের নগরের নাম ছিল ‘দেবদহ’ (দেব বা ঈশ্বরের দেখানো স্থানে নির্মিত)। এই দেবদহ ছিল সিদ্ধার্থের মাতা মায়াদেবীর পিত্রালয়। সিদ্ধার্থও দেবদহের কোলিয় রাজবংশের কন্যা যশোধরা বা গোপাকে বিবাহ করেছিলেন।
কপিলাবস্তু গড়ে ওঠার কাহিনি জানলাম। এবারে আমরা চলে আসি ঐতিহাসিক উপাদানে। কপিলাবস্তু নিয়ে লিখেছেন তিন জন চীনা পরিব্রাজক বা তীর্থযাত্রী। এর মধ্যে জি সেংজাইয়ের লেখা সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত-
“চ্লা-উয়েল-লা-ইউয়ে (কপিলাবস্তু) রাজ্যে এখন কোনো রাজা নেই। শহর ও তার পুষ্করিণী সব পরিত্যক্ত আর ময়লায় ভরা। চারিদিকে খালি শূন্যতা। কয়েকটি স্তূপ রয়েছে মাত্র। রাজা শুদ্ধোদনের বংশধর এমন কুড়িটির মতো শাক্য পরিবার সেখানে বাস করে। পূর্বে নগরের অভ্যন্তরে চারটি পরিবার থাকতেন যাঁরা উপাসক হিসেবে কাজ করতেন। তাঁদের ধর্মীয় শক্তি (বীর্য) অতি প্রবল ছিল আর তাঁরা আজও সেই ঐতিহ্য বজায় রেখেছে। যখন স্তূপগুলি জীর্ণ হয়ে পড়েছিল তখন তাঁরা সেগুলির সম্পূর্ণ সংস্কার করিয়েছিলেন। এছাড়া, কপিলাবস্তুর রাজা, একটি স্তূপের তত্ত্বাবধান করেছিলেন এবং স্সু-হো-তিয়াও-র রাজা এটিকে অলঙ্কৃত করার জন্য সাহায্য পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু এখন সেই শহরের ভেতরে বাস করেন মাত্র বারোজন সন্ন্যাসী। আর নগর থেকে মাত্র ৩ লি (১.২ কিলোমিটার) উত্তরে গঙ্গা নদীর তীরে শুদ্ধোদন শিশু সিদ্ধার্থের সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন। সেখানে একটি মন্দির আছে আর তার ভেতরে সিদ্ধার্থকে কোলে নিয়ে রাখা তাঁর পিতার একটি অনুকৃতি আছে (Petech: 1950, 33)
ওপরের বর্ণনা থেকে কপিলাবস্তুকে শনাক্ত করার মতো তেমন কিছুই খুঁজে পাওয়া না গেলেও একটি তথ্য বেশ আকর্ষণীয় তা হল স্তূপ সংস্কারের জন্যে স্সু-হো-তিয়াও-র রাজা কিছু সাহায্য পাঠিয়েছিলেন। পেটেচ সঠিকভাবে (ibid, 34) রাজ্যটিকে শনাক্ত করে বলেছেন যে স্সু-হো-তিয়াও প্রকৃতপক্ষে সিংহলের প্রাকৃত নাম সিহাদিউ (Sihadiu) বা সিংহদ্বীপের অপভ্রংশ। জি সেংজাইয়ের কপিলাবস্তু ভ্রমণের সময়কাল মোটামুটি ৩৫০-৩৭৫ সাধারণ অব্দ আর তার আগেই নিশ্চয় সিংহল থেকে কপিলাবস্তুর স্তূপ সংস্কারের সাহায্য এসে পৌঁছেছিল। সেক্ষেত্রে এই সাহায্যের সময়কাল মনে হয় কুষাণ যুগ হবে (Deeg: 2003, 25)।
চীনা পরিব্রাজকদের লেখায় দূরত্বের একক হিসেবে কখনও তাঁদের প্রচলিত হিসেব মতো ‘লি’ আবার কখনও ভারতীয় হিসেব মতো ‘যোজন’ উল্লেখ করা হয়েছে। দুটি দূরত্বের এককের মান বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রকম
ধার্য করা হয়েছিল। পাঠক ১ যোজনকে গড়পড়তা ১৩ কিলোমিটার ধরতে পারেন এবং ১ লি-কে ৪০০ মিটার ধরতে পারেন। এবারে ফা-হিয়েনের বর্ণনা দেখা যাক-
ফা-হিয়েন(৪০৫-৪১১ সাধারণ অব্দে ভারতে আসেন) শ্রাবস্তী থেকে রওনা হয়ে তার দক্ষিণ দিকে ৫০ লি (২০ কিলোমিটার) দূরে কশ্যপ বুদ্ধের জন্মস্থল টু-ই নগরে এসে পৌঁছেছিলেন। শ্রাবস্তী থেকে দক্ষিণ–পূর্ব দিকে ১২ যোজন (১৫৬ কিলোমিটার)দূরে অবস্থিত না-পি-কী নামক শহরে এসেছিলেন যা ছিল ক্রকুচ্ছন্দ বুদ্ধের জন্মস্থান। …… সেখান থেকে উত্তরে ১ যোজনেরও কম (~১০ কিলোমিটার) দূরে ছিল কনকমুনি বুদ্ধের জন্মস্থান। …… সেখান থেকে পূর্বদিকে ১ যোজনেরও কম (~১০ কিলোমিটার) যাত্রা করে পৌঁছে গিয়েছিলেন কপিলাবস্তুতে। সেখানে তখন না ছিল রাজা না ছিল প্রজা। পরিত্যক্ত নগরে ধ্বংসাবশেষের স্তূপ। কয়েকজন ভিক্ষু ও ২০ থেকে ৪০ ঘর মানুষের বাস সেখানে। শুদ্ধোদনের প্রাসাদের স্থলে যুবরাজ ও তাঁর মায়ের প্রতিকৃতি
ছিল। মায়াদেবীর গর্ভে প্রবেশ করবার সময় যেখানে যুবরাজ শ্বেতহস্তীর পিঠে আবির্ভূত হয়েছিলেন সেইখানে
, আর পূর্বদ্বার হতে বাইরে গিয়ে যেখানে পীড়িত জনকে দেখে যুবরাজ রথ ঘুরিয়ে ফিরে এসেছিলেন সেই স্থানগুলিতে স্তূপ নির্মিত হয়েছিল। এছাড়া নিম্নোল্লেখিত স্থানগুলিতেও তাঁকে নির্দেশ করা হয়েছিল-
যেখানে (ঋষি) অসিত (পালিভাষায় কাল দেবল। ইনি শুদ্ধোদনের বাবার মন্ত্রী ছিলেন) যুবরাজের (অতি শৈশবে) শরীরের (বুদ্ধত্ব-বিষয়ক) লক্ষণগুলি পরীক্ষা করেছিলেন, যেখানে তিনি নন্দ ও অন্যান্যদের সঙ্গে যাত্রাকালে ভূলুণ্ঠিত হাতিটিকে তুলে ছুঁড়ে ফেলেছিলেন
, যেখানে তিনি দক্ষিণ–পূর্ব দিকে ৩০ লি (১২ কিলোমিটার) দূরত্বে তির ছুঁড়ে মাটি ভেদ করে প্রস্রবণের সৃষ্টি করেছিলেন আর পরে তা পথিকদের তৃষ্ণা নিবারণের কারণে বাঁধিয়ে কূপের রূপ দেওয়া হয়েছিল, বোধিলাভের পর ফিরে এসে যেখানে তিনি তাঁর পিতার সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন, যেখানে ছয়বার ভূকম্পনের পটভূমিতে, উপালির প্রতি আস্থা রেখে পাঁচশ শাক্য সংসারত্যাগ করেছিল, যেখানে বুদ্ধ দেবতাদের ধর্মব্যাখ্যা করে শুনিয়েছিলেন আর সেই গৃহের চার দ্বার দেবতারা বন্ধ করে রেখেছিলেন যাতে কেউ, এমনকি রাজা অর্থাৎ তাঁর পিতা পর্যন্ত ভেতরে প্রবেশ করতে না পারেন, যেখানে বুদ্ধ একটি ন্যাগ্রোধ বৃক্ষের তলায় পূর্ব দিকে মুখ করে বসেছিলেন আর আজও বিদ্যমান সেই বৃক্ষের নীচে তাঁর মাসী মহাপ্রজাপতি তাঁকে একটি সঙ্ঘাতি (কাষায় বস্ত্র) উপহার দিয়েছিলেন, যেখানে রাজা বৈদূর্য শাক্যবংশ ধ্বংস করেন আর মৃত্যুর পর তারা সকলেই (শাক্যরা) শ্রোতপন্ন (সাধনার যে স্তরে পৌঁছে সাধকের আর ইতরজন্ম ঘটে না, যার পরে আর সাতবার মানব বা দেবযোনীতে জন্মগ্রহণ করেই তাঁরা নির্বাণ লাভ করেন) হয়ে যান। শেষ স্থানটিতে একটি স্তূপ আজও বর্তমান।
নগর থেকে কয়েক লি দূরেই রয়েছে সেই কৃষিজমি যেখানে রাজকুমার একটি গাছের ছায়ায় বসে কৃষকদের কাজ করতে দেখেছিলেন। নগর থেকে ৫০ লি (২০ কিলোমিটার) পূর্ব দিকে অবস্থিত লুম্বিনী উদ্যান। কপিলাবস্তু রাজ্যটি এখন নির্জন ও পরিত্যক্ত। কয়েকজন এখানে অনেক দূরে দূরে বাস করে। রাস্তায় শ্বেতহস্তী ও সিংহ ঘুরে বেড়ায়, তাই সতর্ক হয়ে চলতে হয়।
(James Legge রচিত Record of Buddhistic Kingdoms: Being an account by the Chinese monk Fa-hien of travels in India and Ceylon (A.D. 399-414) in search of the Buddhist books of discipline অনুসারে অনুদিত)।
ফা-হিয়েনের প্রায় ২০০ বছর পর কপিলাবস্তু ভ্রমণ করেছিলেন আরেক চীনা পরিব্রাজক, হিউয়েন সাঙ (৬৩০-৬৪৫ সাধারণ অব্দে হর্ষবর্ধনের শাসনকালে ভারতে এসেছিলেন)। ফা-হিয়েনের তুলনায় হিউয়েন সাঙের বর্ণনা অনেক বিস্তারিত। এবারে আমরা তাঁর বর্ণনা থেকে কপিলাবস্তুকে চিনে নেওয়ার চেষ্টা করব।
শ্রাবস্তীর উত্তর-পশ্চিমে ১৬ লির (৬.৪ কিলোমিটার) মতো দূরে একটি পুরনো শহর আছে। ভদ্রকল্পে যখন মানুষ ২০০০০ বছর জীবিত থাকত তখন এই শহরে কশ্যপ বুদ্ধ জন্মগ্রহণ করেছিলেন। শহরের দক্ষিণে একটি স্তূপ আছে। বোধি লাভের পর এই স্থানে তিনি পিতার সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন। শহরের উত্তরে আরেকটি স্তূপ আছে যার ভেতরে কশ্যপ বুদ্ধের অবশেষ রাখা আছে। দুটিই রাজা অশোক নির্মিত। এখান থেকে দক্ষিণ–পূর্ব দিকে ৫০০ লি (২০০ কিলোমিটার) গিয়ে পৌঁছেছিলাম কিএ-পি-লো-ফা-স্সে-তি (কপিলাবস্তু) রাজ্যে। রাজ্যটির পরিসীমা প্রায় ৪০০০ লি (১৬০০ কিলোমিটার)। রাজ্যে প্রায় দশখানি সম্পূর্ণভাবে পরিত্যক্ত নগরের ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাওয়া যায়। রাজধানী একেবারে ভুপতিত ও জনমানবশূন্য। নগরের পরিসীমা সঠিকভাবে নির্ণয় করা অসাধ্য। নগরের মধ্যে প্রাসাদের প্রাকারের দৈর্ঘ্য হবে এই ১৪/১৫ লি-র (৬ কিলোমিটার) মতো। এইসবই ইটের তৈরি যাদের ভিত্তি এখনও মজবুত ও উচ্চ রয়েছে। বহুদিন ধরেই এই স্থান পরিত্যক্ত। কয়েকটি গ্রাম টিমটিম করে টিকে আছে।
এই রাজ্যে কোনো সার্বভৌম রাজা নেই। প্রত্যেকটি জনপদ তার প্রধান নিয়োগ করে। জমি বড়োই উর্বর ও সুফলা। নিয়মিত মরশুম অনুযায়ী চাষাবাদ করা হয়ে থাকে। আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ, মানুষজন বড়ো কোমল স্বভাবের ও দয়ালু। এখানে এক হাজার বা তারও বেশি সঙ্ঘারামের অবশেষ দেখতে পাওয়া যায়। প্রাসাদের প্রাকারের পাশে একটি সঙ্ঘারাম আছে যেখানে ৩০০০ (পড়ুন ৩০) জন এখনও সম্মতীয় (প্রাচীন বৌদ্ধ দর্শন) হীনযান ধারার অনুশীলন বজায় রেখেছেন।
কয়েকটি দেবতার মন্দির রয়েছে যেখানে বিভিন্ন সম্প্রদায় এসে অর্চনা করে যায়। রাজার প্রাসাদের ভেতরে কিছু ভেঙে পড়া দেওয়ালের নিদর্শন পাওয়া যায় যেগুলি রাজা শুদ্ধোদনের প্রধান প্রাসাদের অবশেষ। এর ওপরে একটি বিহার নির্মিত হয়েছে যার ভেতরে রাজার একটি মূর্তি আছে। অনতিদূরেই রানি মহামায়ার শয়নাগারের ধ্বংসাবশেষ আছে। এর পাশেই একটি বিহার আছে, যেখানে বোধিসত্ত্বের সত্তা তাঁর মায়ের গর্ভে প্রবেশ করেছিল। দৃশ্যটি বিহারে আঁকা আছে। মহাস্থবির মতে বোধিসত্ত্ব উতালো-আন-শা-চা (উত্তরাষাঢ়) মাসের ৩০ তারিখের রাত্রে গর্ভে আগমন করেছিলেন। আমাদের হিসেবে তা হচ্ছে ৫ম মাসের ১৫ তারিখ। অন্যান্য সম্প্রদায়ের মতে এই ঘটনা সেই মাসের ২৩ তারিখে ঘটেছিল। তাহলে আমাদের হিসেবে দাঁড়াবে ৫ম মাসের ৮ তারিখ।
গর্ভাধানের প্রাসাদের উত্তর–পূর্বে একটি স্তূপ আছে। এখানেই ঋষি অসিত যুবরাজের জন্মপত্রিকা গণনা করেছিলেন। বোধিসত্ত্বের যেদিন জন্ম হয়েছিল সেই দিন অনেকগুলি অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছিল। রাজা শুদ্ধোদন সমস্ত গণকদের ডেকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, “এই শিশুর সাপেক্ষে কোনোগুলি শুভ আর কোনোগুলি অশুভ তা আমায় পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিন।” তাঁরা জবাব দিয়েছিলেন যে, “পূর্ববর্তী ঋষিদের গণনা অনুযায়ী এগুলি সবই বিশেষ শুভ চিহ্ন। যদি তিনি সংসারে থাকেন তবে চক্রবর্তী সম্রাট হবেন আর যদি প্রব্রজ্যা নেন তাহলে বুদ্ধ হবেন।”
শিল্প ও শারীরবিদ্যার সব বিভাগেই যুবরাজ সকলকে ছাপিয়ে উঠেছিলেন। দক্ষিণ দ্বারে একটি স্তূপ আছে। এই স্থানেই যুবরাজ অন্য শাক্য রাজকুমারদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় হাতি ছুঁড়ে ফেলেছিলেন। হাতিটি মাটিতে পড়ে একটি গভীর এবং চওড়া খাদ সৃষ্টি করেছিল আর তারপর থেকে এটি ‘হস্তীগর্ত’ নামে পরিচিত। এর পাশেই একটি বিহার আছে যার ভেতরে যুবরাজের একটি মূর্তি আছে। এর পাশে আরেকটি বিহার আছে। সেখানেই যুবরাজ ও তাঁর পত্নীর শয়নাগার ছিল। এর ভেতরে যশোধরা ও রাহুলের প্রতিমূর্তি রাখা আছে। রানির কক্ষের পাশে একটি বিহার আছে যার ভেতরে ছাত্রদের শিক্ষাগ্রহণের চিত্র আছে। এর থেকেই বোঝা যায় যে স্থানটি যুবরাজের বিদ্যালয়ের।
নগরের দক্ষিণ–পূর্ব কোণে একটি বিহার আছে যার মধ্যে একটি সাদা ক্ষিপ্র ঘোড়ার পিঠে বসে থাকা যুবরাজের মূর্তি আছে। এই সেই স্থান যেখান থেকে তিনি নগর ত্যাগ করেছিলেন। নগরের চার দ্বারের প্রত্যেকটিতে একটি করে বিহার আছে যেখানে যথাক্রমে একজন বৃদ্ধ, একজন অসুস্থ মানুষ, একটি মৃত মানুষ ও একজন শ্রমণের মূর্তি আছে। এইগুলি সেই সব স্থান যেখানে ঘুরতে গিয়ে বিভিন্ন চিহ্ন দেখে তাঁর মনে এক ধর্মীয় আবেগের জোয়ার এবং পার্থিব বিলাসের ওপরে বিরক্তি এসেছিল আর এই বিশ্বাসে ভর করে তিনি সারথিকে রথ ঘুরিয়ে প্রাসাদে প্রত্যাগমনের আদেশ দিয়েছিলেন।
নগরের দক্ষিণে এই ৫০ লি-র (২০ কিলোমিটার) মতো গেলে আমরা একটি প্রাচীন শহরে পৌঁছাব যেখানে একটি স্তূপ আছে। এই স্থানে ভদ্রকল্পে ক্রকুচ্ছন্দ্র বুদ্ধের জন্ম হয়েছিল যখন মানুষ ৬০০০০ বছর জীবিত থাকত। শহরের দক্ষিণে, অনতিদূরে, একটি স্তূপ আছে যেখানে বোধি লাভের পর তিনি এসে তাঁর পিতার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। শহরের দক্ষিণ–পূর্ব দিকে একটি স্তূপ আছে যার ভেতরে তথাগতর দেহাস্থি (তাঁর নশ্বর শরীরের অবশেষ) আছে; এর সামনে একটি প্রায় ৩০ ফুট লম্বা প্রস্তর স্তম্ভ প্রোথিত আছে যার শীর্ষে একটি সিংহ খোদাই করা আছে। পাশেই (বা এর পাশে) তাঁর নির্বাণের বিষয়ে লেখা আছে। রাজা অশোক এটি স্থাপন করেছিলেন।
ক্রকুচ্ছন্দ্র বুদ্ধের শহর থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে মোটামুটি ৩০ লি (১২ কিলোমিটার) গেলে আমরা এক প্রাচীন শহরে উপস্থিত হব যেখানে একটি স্তূপ আছে। ভদ্রকল্পে যখন মানুষের বয়স ৪০০০০ হত তখন কনকমুনি বুদ্ধ জন্মগ্রহণ করেছিলেন। সেই জন্মস্থানটিকে স্মরণীয় করে রাখতে এই স্তূপটি নির্মাণ করা হয়েছিল। কাছেই, শহরের উত্তর-পূর্বে একটি স্তূপ আছে। সেই স্থানে পূর্ণাঙ্গ বোধি লাভের পর তিনি তাঁর পিতার সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন। আরেকটু উত্তরে, একটি স্তূপ আছে যার ভেতরে তাঁর নশ্বর দেহের অবশেষ আছে। এর সামনে রাজা অশোকের স্থাপিত একটি প্রায় ২০ ফুট দীর্ঘ প্রস্তর স্তম্ভ আছে, যার শীর্ষে একটি সিংহ রয়েছে, যার ওপরের একটি লেখে তাঁর নির্বাণ সম্পর্কিত ঘটনা লিপিবদ্ধ করা আছে।
নগরের (কপিলাবস্তু) প্রায় ৪০ লি (১৬ কিলোমিটার) দূরে একটি স্তূপ আছে। এটি হল সেই স্থান যেখানে যুবরাজ একটি গাছের ছায়াতলে বসে হলকর্ষণ উৎসব দেখেছিলেন ও গভীরভাবে ধ্যানে মগ্ন হয়ে ‘অনাকাঙ্ক্ষা’-র স্তরে পৌঁছে গিয়েছিলেন। রাজধানীর উত্তর–পশ্চিমে শত-শত, সহস্র-সহস্র স্তূপ আছে। এগুলি সেই স্থানকে চিহ্নিত করছে যেখানে শাক্য জাতিকে হত্যা করা হয়েছিল। গণ-সংহারের স্থান থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে চারখানি ছোটো ছোটো স্তূপ আছে। এই স্থানে চারজন শাক্য একদল সৈন্যকে প্রতিহত করেছিলেন।
নগরের ৪০ লি (১৬ কিলোমিটার) দক্ষিণে ন্যাগ্রোধকুঞ্জে রাজা অশোকের নির্মিত একটি স্তূপ আছে। বোধি লাভের পর শাক্য তথাগত এই স্থানে তাঁর পিতার সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন ও উপদেশ দিয়েছিলেন। সঙ্ঘারামের পাশে এর কাছেই একটি স্তূপ আছে যেখানে তথাগত পূর্ব দিকে মুখ করে একটি বৃক্ষের নীচে বসে তাঁর মাসীর কাছ থেকে একটি স্বর্ণখচিত কাষায় বস্ত্র গ্রহণ করেছিলেন। আরেকটু গেলে পাওয়া যাবে আরেকটি স্তূপ যেখানে তথাগত আট রাজার পুত্র ও ৫০০ শাক্যকে দীক্ষিত করেছিলেন।
নগরের পূর্ব দ্বারের মধ্যে, রাস্তার বাম পাশে একটি স্তূপ আছে; এই স্থান রাজপুত্র সিদ্ধার্থ খেলাধুলা করতেন। দ্বারের বাইরে রাস্তার ধারে ছিল ‘ঈশ্বর–দেবের’ মন্দির (আগেই আলোচিত)। নগরের দক্ষিণ দ্বারের বাইরে, রাস্তার বাম পাশে একটি স্তূপ। এখানে যুবরাজ অন্যান্য শাক্যদের সঙ্গে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা করেছিলেন ও
লোহার ঢাল ভেদ করে তির নিক্ষেপ করেছিলেন। এই জায়গা থেকে ৩০ লি (১২ কিলোমিটার) দূরে আছে একটি ছোটো স্তূপ। এখানে একটি প্রস্রবণ আছে যার জল আয়নার মতো স্বচ্ছ। প্রতিযোগিতার সময়ে কুমারের তির ঢাল ভেদ করে এই জায়গায় পড়ে মাটি ভেদ করে আমূল গেঁথে গিয়েছিল আর তার ফলে একটি প্রস্রবণের জন্ম হয়েছিল। পরম্পরাগত ভাবে তা শরকূপ নামে পরিচিত। পীড়িত ব্যক্তি এই কূপের জল পান করে সুস্থ হয়ে যায়। আর তাই দূর দূরান্ত থেকে মানুষ
এখানে এসে এর কাদামাটি সংগ্রহ করে তার দেহের ব্যাধিগ্রস্ত অংশে তা লেপন করে ব্যাধিমুক্ত হয়। শরকূপের উত্তর-পূর্বে ৮০/৯০ লি (৩৬ কিলোমিটার) যাত্রা করে আমরা লুম্বিনী উদ্যানে পৌঁছেছিলাম। (
Si-Yu-Ki: Buddhist Records of the Western World” translated from the Chinese of Hsüan-tsang by Samuel Beal অনুসারে অনুদিত)।
হিউয়েন সাঙের ভ্রমণের বৃত্তান্ত অনুযায়ী তখনকার তাং সাম্রাজ্যের (Tang dynasty) রাজকীয় (সরকারি) তথ্যের ভাণ্ডারে অন্যান্য দেশের বর্ণনার সঙ্গে ভারতের কিছু বর্ণনা সংক্ষিপ্ত আকারে লেখা হয়েছিল। সেখানে একবার ঢুঁ মেরে দেখা যাক যদি নতুন কোনো তথ্য পাওয়া যায়।
“এখান (শ্রাবস্তী) থেকে দক্ষিণ – পূর্ব দিকে ৫০০ লি (২০০ কিলোমিটার) যাওয়ার পর আমি কপিলাবস্তুতে পৌঁছেছিলাম (আগে জিয়াপিলুয়ে (Jiāpíluówèi) নামে পরিচিত ছিল)। কপিলাবস্তু রাজ্যের পরিসীমা ৪০০০ লি-র চেয়ে বেশি আর এর ভেতরে দুটি প্রাসাদ রয়েছে যেগুলি সম্পূর্ণরূপে পরিত্যক্ত। রাজার প্রাসাদের প্রাকার ধ্বংস প্রাপ্ত হয়ে পড়ে আছে আর এর ব্যাপ্তি আজ আর বোঝা যায় না। ভেতরের প্রাসাদের (আবাসন বোঝাতে চেয়েছেন বোধহয়) পরিসীমা ১৪ কি ১৫ লি (৬ কিলোমিটার) হবে। এর দেওয়াল সব ইটের তৈরি আর বেশ মোটা ও মজবুত। রাজ্যটিতে বহুদিন ধরেই মানুষজন থাকে না এবং এখনও কদাচিৎ কারো দেখা পাওয়া যায়। কোনো কেন্দ্রীয় শাসক নেই, প্রত্যেকটি জনপদের এক একজন প্রধান আছে।” (Rongxi Li, The Great Tang Dynasty Record of the Western Regions (Taishō Volume 51, Number 2087), পাতা ১৫২ অনুযায়ী অনুদিত)
এখানে আমরা কপিলাবস্তুর একটি অতিরিক্ত প্রাচীন নামের উল্লেখ পাওয়া ছাড়া বাকি সব তথ্য আগের দেওয়া হিউয়েন সাঙের বর্ণনা মতোই। জি সেংজাইয়ের বর্ণনা খুবই ছোটো। এঁর লেখা বরাবরই ভীষণ হ্রস্ব থাকে তার প্রমাণ আমরা লুম্বিনীতেই পেয়েছি। তিনি লুম্বিনীতে পুষ্করিণীর কথা বললেও কোনো বিহার, স্তূপের কথা তো বলেনইনি, এমনকি অশোক স্তম্ভের কথাও উল্লেখ করেননি। ফা-হিয়েনও একই কাণ্ড করেছেন। সেই তুলনায় হিউয়েন সাঙের বর্ণনা অনেকটাই বিস্তারিত। ফা-হিয়েন ও হিউয়েন সাঙ স্থানগুলির মধ্যেকার দূরত্ব উল্লেখ করেছেন বলে আমাদের কাছে এই দুইজনের তথ্য বেশি কাজে লাগবে। আরেকটি বিষয় লক্ষ করবেন যে হিউয়েন সাঙ, ফা-হিয়েনের তুলনায় কপিলাবস্তুতে অনেক বেশি বিহার, স্তূপ, মূর্তি ইত্যাদি দেখেছেন। কেউ বলতেই পারেন যে উভয়ের সময়কালের মাঝে দুই শতাব্দীতে অনেক কিছু নির্মাণ করা হয়ে থাকতে পারে কিন্তু দুইজনের বিবরণে কপিলাবস্তুর যেরকম পরিত্যক্ত রূপ ধরা পড়েছে তাতে সেখানে অস্তিত্বে থাকা স্থাপনাগুলিকেই সংস্কার করা মুস্কিল হয়ে পড়ছিল, নতুন নির্মাণ তো ছেড়েই দিলাম। তাই কখনও হিউয়েন সাঙের বর্ণনাকে কিছুটা কাল্পনিক মনে হবে কারণ তাঁর লেখায় দ্রষ্টব্য স্থানগুলি ক্রম অনুযায়ী আসেনি। যেমন ধরুন কপিলাবস্তুর মাঝখানে শুদ্ধোদনের প্রাসাদ বর্ণনা করতে করতে হিউয়েন সাঙ হঠাৎ চলে গেলেন নগরের উত্তর–পূর্বে অসিতের কোষ্ঠী বিচারের স্থলে। তারপর আবার হাজির হয়ে গেলেন নগরের দক্ষিণে যেখানে সিদ্ধার্থের সঙ্গে অন্যান্যদের প্রতিযোগিতা হয়েছিল। সেখান থেকে তিনি একসঙ্গে চার দ্বারে অবস্থিত বিহারের কথা বলেই চলে গেলেন নগর থেকে দূরে ক্রকুচ্ছন্দ্র ও কনকমুনি বুদ্ধের শহরে। সেখান থেকে আবার কপিলাবস্তুর কাছে কর্ষণভূমির বর্ণনা দিলেন। তারপর সেখান থেকে দক্ষিণে চলে গিয়ে ন্যাগ্রোধকুঞ্জের বর্ণনা দিতে দিতেই এমনভাবে ঈশ্বর–দেবের মন্দিরের উল্লেখ করছেন যে পাঠকের মনে হবে যে সেটি বোধহয় ন্যাগ্রোধকুঞ্জে অবস্থিত অথচ সেই মন্দিরের অবস্থানের কথা তিনি বলছেন কপিলাবস্তু নগর ভ্রমণ প্রসঙ্গে, যা ছিল পূর্ব দ্বারের কাছে অথচ তিনি যখন কাছেই অবস্থিত ঋষি অসিতের স্তূপ দেখেছিলেন তখন এই মন্দিরটি ভ্রমণ করেননি। তাঁর বর্ণনা অনুসারে ক্রকুচ্ছন্দ্র বুদ্ধের শহরের ২০ কিলোমিটার উত্তরে কপিলাবস্তুর অবস্থান আবার ন্যাগ্রোধকুঞ্জ ছিল কপিলাবস্তুর ১৬ কিলোমিটার দক্ষিণে। অর্থাৎ ন্যাগ্রোধকুঞ্জ ছিল ক্রকুচ্ছন্দ্র বুদ্ধের শহরের মাত্র ৪ কিলোমিটার উত্তরে। কোনো তীর্থযাত্রী ক্রকুচ্ছন্দ্র বুদ্ধের স্থান দর্শন করে উত্তরে যাত্রা করার সময়ে ন্যাগ্রোধকুঞ্জ দর্শন করে অনায়াসে কপিলাবস্তু চলে যেতে পারবেন। কিন্তু হিউয়েন সাঙ তা করেননি, তিনি আগে কপিলাবস্তু গিয়েছিলেন তারপর ন্যাগ্রোধকুঞ্জ এসে আবার কপিলাবস্তু ফিরে গিয়েছিলেন। কিছু পণ্ডিত বলেন যে তিনি যতটা দেখেছিলেন তার সঙ্গে বৌদ্ধ কাহিনি অনুযায়ী যেমন পরম্পরা হওয়া উচিত তার একটা মেলবন্ধন তৈরি করেছিলেন তাঁর লেখায়। আবার কেউ বলেন যে তিনি আদৌ কপিলাবস্তু যাননি। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে কপিলাবস্তু বৌদ্ধদের কাছে একটি তীর্থস্থান আর হিউয়েন সাঙের কপিলাবস্তু দর্শনের প্রধান উদ্দেশ্যও তাই ছিল, সুতরাং এমনও তো হতে পারে যে তখন কপিলাবস্তু তীর্থ-প্রদক্ষিণ হয়তো এমন ক্রম অনুযায়ী দর্শন করতে হত। যাইহোক হিউয়েন সাঙের বর্ণনা আপাতদৃষ্টিতে অনেক বিস্তারিত মনে হলেও এটি অনুসরণ করে সত্য খুঁজতে গেলে যে বেশ ঘোল খেতে হবে তা হলফ করে বলতে পারি।
আমরা কপিলাবস্তুকে খুঁজে বার করার চেষ্টা করছি আর সেই জন্যেই তিনজন পরিব্রাজকের লেখা থেকে কপিলাবস্তুর বর্ণনা তুলে ধরেছি। যে বিষয়টিকে পরিষ্কার করার আশায় বর্ণনাগুলি নিলাম, দেখা যাচ্ছে যে তাতে বিষয়টি আরও অস্বচ্ছ হয়ে উঠল। শুধু কপিলাবস্তুর মধ্যের স্থানগুলি নয়, ফা-হিয়েন ও হিউয়েন সাঙ দুজনেই কপিলাবস্তুর সঙ্গে ক্রকুচ্ছন্দ্র বুদ্ধ ও কনকমুনি বুদ্ধের শহরে গিয়েছিলেন আর দুজনের দূরত্ব ও যাত্রার অভিমুখ এক নয়। সত্যি কথা বলতে কি বর্ণনাগুলি পড়লে মনেই হয় না যে তাঁরা সব এক স্থানেই গিয়েছিলেন। সবাই যেন আলাদা আলাদা স্থান কপিলাবস্তু হিসেবে দেখে এসেছিলেন।
একইভাবে লুম্বিনীর অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। যদিও মনে হয় যে লুম্বিনীর অবস্থান সবসময় একই ছিল আর তার একাধিক কারণ আছে।
১) লুম্বিনীতে থাকা অশোক স্তম্ভ আমাদের জন্মস্থান নিয়ে বিতর্কের অবসান অনেকটাই করে দিয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে হিউয়েন সাঙ অশোক স্তম্ভটিকে যেভাবে মাঝখান থেকে ভেঙে থাকা অবস্থায় দেখেছিলেন, আজও লুম্বিনীতে স্তম্ভটি ঠিক সেই রকম অবস্থায় আছে।
২)শ্রাবস্তী ও রামগ্রামের মাঝে এর অবস্থান চীনা পর্যটকদের বর্ণনার সঙ্গে মিলে যায়।
৩) মায়াদেবীর মন্দিরে খননে পরিষ্কার ভাবে বোঝা গেছে যে সেই মন্দির যুগের পর যুগ ধরে পরিবর্তিত করা হয়েছে ও সংস্কার করা হয়েছে। প্রাক-মৌর্য যুগ থেকে মধ্যযুগ অবধি একই স্থানে মন্দির ও তাতে ধর্মীয় কার্যকলাপ বুদ্ধের জন্মস্থান হিসেবে লুম্বিনীর অবস্থানকে জোরদার করে।
৪) ‘লুম্বিনী’ নামের সঙ্গে সেই স্থানের বর্তমান নাম ‘রুম্মিন’-এর ধ্বনিগত মিল আছে।
৫) লুম্বিনী/লম্বিনী নামে আদি মাতৃকার উল্লেখ কাব্যে আছে।
৬) হিউয়েন সাঙ লিখেছেন যে লুম্বিনীর দক্ষিণ-পূর্ব দিকে ‘তেল নদী’ নামের একটি নদী বয়ে যেত। এখনও লুম্বিনীর পাশ দিয়ে ‘তেলার’ নামে একটি নদী প্রবাহিত হয়।
৭) সিদ্ধার্থের জন্মের সঙ্গে জড়িত পুষ্করিণীর উল্লেখ যেমন বৌদ্ধ গ্রন্থে পাওয়া যায় তেমনই সেই পুষ্করিণীর বর্ণনা আছে দুই পরিব্রাজকের লেখায়। আজও লুম্বিনীতে একটি পুষ্করিণীর দেখা মেলে যার দূরত্ব জন্মস্থান থেকে বর্ণিত ২০/২৫ পদক্ষেপের মতো হবে।
৮) জন্ম-ভাস্কর্য ও জন্ম-চিহ্ন পাথরের অস্তিত্ব লুম্বিনীকে চিনতে সাহায্য করেছে।
সুতরাং লুম্বিনীর অবস্থান নিয়ে কোনো দ্বিমত থাকার সম্ভাবনা আগেও ছিল না বা এখনও নেই।
এবারে কপিলাবস্তুকে খুঁজতে গেলে আমরা বরং লুম্বিনীকে কেন্দ্র করে ফা-হিয়েন ও হিউয়েন সাঙের বর্ণনার সাহায্য নিয়ে দুজনেই উল্লেখ করেছেন এমন স্থানগুলির অভিমুখ ও দূরত্বের একটি সারণী বানাতে চেষ্টা করি।

এই প্রসঙ্গে একটি কথা বলা প্রয়োজন। ফা-হিয়েন ও হিউয়েন সাঙ উভয়েই ক্রকুচ্ছন্দ্র বুদ্ধ ও কনকমুনি বুদ্ধের স্থান ভ্রমণ করেছিলেন। আজও এই দুই বুদ্ধের স্থান বলে নেপালের গোঠিহওয়া ও নিগালী সাগর নামক দুই স্থান বিবেচনা করা হয়। দুটি স্থানেই অশোক স্তম্ভ (আংশিক) পাওয়া গেছে কিন্তু তাদের আবিষ্কারের সঙ্গে কুখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ ফিউরারের (Alois Anton Führer) সম্পর্ক আছে বলে স্থান দুইটির বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

সে ঘটনা ১৮৯৩ সালের। শিকার অভিযানে বেরিয়ে এক নেপালি কর্মকর্তা আবিষ্কার করে ফেললেন একটি স্তম্ভের কিছু অংশ। সেই খবর পৌঁছেছিল তখন কলকাতায় কর্মরত মিলিটারি ডাক্তার ওয়াডেলের কাছে। তিনি বহুদিন ধরে বুদ্ধের কপিলাবস্তু আবিষ্কারের চেষ্টা করছিলেন। সুতরাং তিনি যখন এই খবরটি পেলেন তখন তিনি বুঝলেন যে এটি কপিলাবস্তু খোঁজের বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি চিঠি লিখে বিষয়টা জানিয়েছিলেন উত্তর-পশ্চিম প্রদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক সার্ভেয়ার, মিঃ ফিউরারকে। ফিউরার কিন্তু ওয়াডেলকে কোনো জবাব দেওয়া তো দূরের কথা চিঠির প্রাপ্তিস্বীকার পর্যন্ত করলেন না। দুই বছর পর, ১৮৯৫ সালের মার্চ মাসে ফিউরার দাবি করেন যে তিনি নিগালীতে স্তম্ভটি দেখে এসেছিলেন ও তার ওপরে ব্রাহ্মী লিপির অভিলেখ আবিষ্কার করে সেটিকে অশোক স্তম্ভ হিসেবে সাব্যস্ত করেছিলেন। কয়েকদিন পর ভিয়েনা শহরে বুহলারের (Georg Bühler) কাছে একটি চিঠি পৌঁছাল, প্রেরক ফিউরার। চিঠিতে ছিল সেই স্তম্ভের লিপির ছাপ তুলে আনা প্রতিলিপি। চিঠিতে ফিউরার দাবি করেছিলেন যে তিনি এই স্তম্ভটি নিজের চেষ্টায় খুঁজে পেয়েছিলেন এবং এর কাছেই তিনি একটি স্তূপের ধ্বংসাবশেষ দেখেছেন। বুহলার স্তম্ভের নীচে হারিয়ে যাওয়া অক্ষরগুলির বিষয়ে জানতে চাইলে ফিউরার জানান যে সেগুলি মাটির নীচে চাপা পড়ে আছে আর নেপালি কর্তৃপক্ষ তাঁকে আর খননের অনুমতি দিচ্ছেন না। এদিকে নিগালীর স্তম্ভের আশপাশে না কোনো স্তূপ আছে, না স্তম্ভটির হারিয়ে যাওয়া অক্ষরগুলি মাটিতে চাপা পড়ে ছিল। স্তম্ভটি ভাঙা অবস্থায় পড়েছিল। এইসব দেখে মনে হয় যে ফিউরার আদৌ সেখানে যাননি (ততদিন পর্যন্ত) আর স্তম্ভের লিপির ছাপ কারো মাধ্যমে জোগাড় করা হয়েছিল।

এইদিকে সেই লিপির পাঠ নিয়ে লেখাপত্র বেরিয়ে গেল। সেই লেখা পড়ে ওয়াডেল জানতে পারলেন যে সেই স্তম্ভের লিপিতে লেখা আছে যে তাঁর রাজ্যাভিষেকের ২০ তম বর্ষে রাজা অশোক কোনোগমানা (কনকমুনি) বুদ্ধের স্তূপ দর্শন করে স্তম্ভটি স্থাপিত করিয়েছিলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ ফা-হিয়েন ও হিউয়েন সাঙের বিবরণের সঙ্গে স্তম্ভের যোগাযোগের গুরুত্ব বুঝতে পারলেন। ওয়াডেল ভেবেছিলেন যে পরিব্রাজকেরা এই স্থানটির কথাই কনকমুনি বুদ্ধের স্থান হিসেবে বলে গেছেন। তিনি আবার এই সমস্ত বিস্তারিত ভাবে লিখে ফিউরারকে জানালেন। যথারীতি আবার কোনো জবাব এল না। ইতিমধ্যে ১৮৯৫ সালে ফিউরার তাঁর রিপোর্ট প্রকাশ করে দিলেন যেখানে তিনি অশোক স্তম্ভের পাশে থাকা একটি স্তূপের ধ্বংসাবশেষের বিষয়েও লিখেছিলেন। পরে জানা গেল যে ফিউরারের সব দাবি একদম মিথ্যা, তেমন কোনো স্তূপই নেই সেখানে। ১৯০১ সালে ভিনসেন্ট স্মিথ এই বিষয় নিয়ে মুখার্জির বইতে আলোচনা করার সময়ে দেখিয়েছেন যে ফিউরার ক্যানিংহামের সাঁচির (ভিলসা) স্তূপের বর্ণনা থেকে হুবহু টুকেছেন (Prefatory to Mukherji’s book: 1901, 3-4)।
অনেক বড়ো বড়ো জালিয়াতির কারণে ফিউরারের চাকরি যায় আর সেই সঙ্গে নিগালী সাগরের অশোক স্তম্ভের প্রামাণ্যতা নিয়ে প্রশ্ন খাড়া করে দিল। নিগালীতে এই স্তম্ভের নীচে কোনো ভিত্তিবেদি পাওয়া যায়নি যার ওপরে কোনো স্তম্ভকে স্থাপন করা হয়। সুতরাং বোঝা যাচ্ছে যে এই স্তম্ভটি কোনো অজানা স্থান থেকে এখানে আনা হয়েছিল (Mukherjee: 1901, 4)। আবার এর কয়েক কিলোমিটার দূরে গোঠিহওয়া বলে একটি স্থানে একটি স্তূপের ধ্বংসাবশেষ ও একটি স্তম্ভের গোড়ার কিছুটা অংশমাত্র আবিষ্কার করা হয়েছে। সেখানে এই স্তম্ভের অংশটি ‘ফুটেশ্বর মহাদেব’ (ভগ্ন মহাদেব) নামে পূজা পেয়ে থাকেন (Mukherji: 31)।
গোঠিহওয়ার খননে একটি বড়ো স্তূপের ভগ্নাবশেষ পাওয়া গেছে যা সাধারণ পূর্বাব্দের তৃতীয় শতাব্দীতে নির্মিত হয়েছিল এবং পরবর্তী কালে অর্থাৎ শক–কুষাণ কালে (সাধারণ অব্দের প্রথম থেকে তৃতীয় শতাব্দী) স্তূপটি পরিমার্জিত করে বাড়ানো হয়েছিল। গোঠিহওয়াতে বুদ্ধের সমকালীন উত্তরের মসৃণ কৃষ্ণপাত্রের (NBPW) অবশেষ যেমন পাওয়া গেছে তেমনই সর্বনিম্ন স্তরে পাওয়া কাঠকয়লার কার্বন ডেটিং করে ৮০০ সাধারণ পূর্বাব্দের বয়স পাওয়া গেছে (
Verardi Giovanni: Excavations at Gotihawa)। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে লুম্বিনীর মতই এখানে একটি প্রাক-মৌর্য
(প্রাক-বুদ্ধও বটে) জনপদের অস্তিত্ব ছিল। অপরদিকে নিগালীতে যেমন কোনো ধ্বংসাবশেষের চিহ্ন নেই তেমন সেখানে পড়ে থাকা অশোক স্তম্ভের স্থাপনা বেদি ও ভিত্তিরও নিদর্শন নেই। তাই সেখানে খননের প্রশ্ন ওঠে না। পরিব্রাজকদের বর্ণনাও বেশ বিভ্রান্তিকর। ফা-হিয়েন যেখানে দুই বুদ্ধের স্থানে শুধুমাত্র স্তূপ দর্শন করেছিলেন সেখানে হিউয়েন সাঙ উভয় স্থানে স্তূপের সঙ্গে একটি করে সিংহ-শীর্ষ অশোক স্তম্ভের দর্শন করেছিলেন।
গোঠিহওয়া বর্তমানে ক্রকুচ্ছন্দ্র বুদ্ধের স্থান বলে পরিচিত হলেও মনে হয় যে নিগালীর স্তম্ভটি হয়তো গোঠিহওয়াতে থাকা স্তম্ভের ওপরের অংশ হবে। দুটি স্তম্ভের অংশ (পাথর ও নির্মাণ শৈলী) দেখে দেবলা মিত্রেরও তাই মনে হয়েছিল (Mitra: 1972, p. 229)। গোঠিহওয়াতে স্তম্ভের গোড়ার অংশ পাওয়া গেছে আর নিগালীতে স্তম্ভের ওপরের অংশ। ফিউরার হয়তো এখান থেকেই ওপরের অংশটি তুলে নিগালীতে নিয়ে গিয়ে রেখেছিলেন। অমন ভারী স্তম্ভকে বেশিদূর নিয়ে যাওয়াও দুঃসাধ্য আর তাই নিগালীর স্তম্ভের উৎস গোঠিহওয়া হওয়া সম্ভব কারণ দুটি স্থানের মধ্যে দূরত্ব মাত্র ১২ কিলোমিটার।
মুখার্জির ধারণা, স্তম্ভটি পল্টা দেবী বা সিসঽনিয়া থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। নিগালীর স্তম্ভের দাবিতে যে গরমিল আছে তা মেনে নেওয়ার দিকে পাল্লা ভারী কারণ নিগালীতে স্তম্ভ স্থাপনার কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ নেই, এমনকি কনকমুনি বুদ্ধের স্তূপেরও কোনো হদিশ নেই। আবার অপরদিকে গোঠিহওয়াতে পাওয়া স্তম্ভের গোড়ার নীচে খনন করে দেখা গেছে যে একটি ৭’ X ৫’-৮ ১/২” X ১০’ আকারের গ্রানাইট পাথরের বেদির ওপরে স্তম্ভটি স্থাপিত। মুখার্জি দুই স্থান মিলিয়ে মোট তিনটি স্তম্ভ-খণ্ডের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছিলেন। মুখার্জি বিশ্বাস করতেন যে নিগালীর স্তম্ভটি অন্য কোনো স্থান থেকে সেখানে আনা হয়েছিল যদিও সেই স্থান গোঠিহওয়া কিনা তাই নিয়ে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি নিগালী ও গোঠিহওয়ার তিনটি স্তম্ভের টুকরোর সুস্পষ্ট রেখাচিত্র বানিয়েছিলেন আর সেই চিত্রটি দেখলে গোঠিহওয়ার স্তম্ভের উপরিভাগের সঙ্গে নিগালীর একটি অংশের অদ্ভুত সাদৃশ্য দেখা যায়। গোঠিহওয়ার স্তম্ভের ওপরে ভেঙে যাওয়া অংশে একটি চিড় খাওয়া স্থান আছে। আবার অপরদিকে নিগালীর স্তম্ভের ভাঙা দুটি খণ্ডের মধ্যে ছোটটির নীচেও একটি চিড় খাওয়া অংশ আছে। আর অদ্ভুতভাবে আলাদা খণ্ড দুটির চিড় যেন একে অপরের প্রতিপূরক। মনে হয় যেন দুটি খণ্ড আগে এক ছিল। সঙ্গের ছবিটি দেখলে বোঝা যাবে আমি কী বলতে চাইছি।
ছবির বামদিকে রয়েছে গোঠিহওয়াতে পাওয়া একটি স্তম্ভের গোড়া। এর ওপরে চিড় খাওয়া অংশটির আকার লক্ষ করুন। ডানদিকে রয়েছে নিগালীতে পাওয়া স্তম্ভের দুটি খণ্ড। অভিলেখ সহ ছোটো খণ্ডটির নীচের চিড় খাওয়া অংশটির আকার লক্ষ করুন ও বামের গোঠিহওয়ার স্তম্ভের চিড়ের গঠনের সঙ্গে তুলনা করুন। (Mukherji: Plate XVI)

এবারে অসুবিধা অন্যদিকে, নিগালীর স্তম্ভ যদি গোঠিহওয়া থেকে আনা হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে তো ক্রকুচ্ছন্দ্র বুদ্ধের স্থান বলে পরিচিত গোঠিহওয়া হয়ে যাচ্ছে কনকমুনির স্থান। অনেকে তো মনে করেন যে নিগালীর স্তম্ভের অভিলেখও ফিউরারের জালিয়াতি। নিগালীর স্তম্ভে আরেকটি শিলালিপি রয়েছে। এখানে রিপু মল্লের একটি অভিলেখ দেখা যায় যেখানে লেখা আছে, “ওম্ মণি পদ্মে হুম্, শ্রী রিপু মল্ল চিরাম জয়তু, ১২৩৪।” অর্থাৎ ১২৩৪ শকাব্দে বা ১৩১২ সালে রিপু মল্ল তীর্থযাত্রার সময়ে এই স্তম্ভটি দেখেছিলেন। পাঠক মনে করবেন যে লুম্বিনী স্তম্ভেও রিপু মল্লের এমন একটি লিপি ছিল। আমরা জানি না যে রিপু মল্ল আদৌ এইসব লিপিটি খোদাই করিয়েছিলেন কি না! লুম্বিনীর লিপিটি দেখে ফিউরার ঠিক এমনই একটি লিপি নিগালীতেও খোদাই করিয়ে দিতে পারেন যাতে তাঁর দাবিটি বেশ পোক্ত হয়। এমনও হতে পারে যে নিগালী ও লুম্বিনীর স্তম্ভ দুটিই হয়তো উচ্চ মানের জালিয়াতির ফসল। অথবা রিপু মল্ল একটি স্তম্ভে নিজের লিপিটি খোদাই করিয়েছিলেন কারণ এখানে অশোকের লেখটির তুলনায় রিপুর লিপিটি লক্ষণীয় স্থানে রয়েছে। আরেকটি বিষয় হল যে রিপু মল্লের লুম্বিনীর স্তম্ভলিপি ও নিগালীর স্তম্ভলিপিতে অসামঞ্জস্য স্পষ্ট। পাঠক দুটির ছবি দেখলে বুঝবেন যে লুম্বিনীতে রিপু মল্লের লেখ অনেকটাই অপটু হাতের কাজ অথচ কয়েক কিলোমিটার দূরে নিগালীতে তাঁর লেখ হয়ে উঠল একদম অশোকের লেখের মতোই নিপুণ হাতের কাজ। বিষয়টি যথেষ্ট সন্দেহ উদ্রেক করে। আবার রিপু মল্লের লেখ যদি আসলও হয় তাহলেও আমরা জানি না যে রিপু স্তম্ভটি কোথায় পেয়েছিলেন, গোঠিহওয়া না নিগালীতে? যাইহোক আমরা বরং নিগালীর স্তম্ভের লিপিটিকে দেখে ফেলি।
ভাষা – প্রাকৃত, লিপি – ব্রাহ্মী, সময় প্রায় ২৫০ খ্রি পূ
স্তম্ভলেখের মূলপাঠ-
১) দেবানং পিয়েন পিয়দসিনা লাজিন চোদসবসা (ভিসিতেন)
২) বুধস কোনাকমনস থুবে দুতিয়ং বচিতে
৩) (বীসতিব) সাভি সিতেন চ অতন আগাচ মহীয়িতে
৪) (সিলাথভ) (চ) (উস) পাপিতে
মূলপাঠের সংস্কৃত অনুবাদ:
দেবানাং প্রিয়েণ (দেবপ্রিয়েণ) প্রিয়দর্শিনা রাজ্ঞা চতুর্দশবর্ষাভিষিক্তেন বুদ্ধস্য কনকমুনেঃ স্তূপঃ দ্বিতীয়ং বর্দ্ধিতঃ (;) বিংশতিবর্ষাভিষিক্তেন চ আত্মনা আগত্য মহীয়িতং, শিলাস্তম্ভঃ চ উচ্ছাপিতঃ।
বাংলা অনুবাদ:
দেবপ্রিয় প্রিয়দর্শী রাজা অভিষেকের চৌদ্দ বছরে কনকমুনি বুদ্ধের স্তূপ দ্বিতীয়বার বর্দ্ধিত করালেন। অভিষেকের কুড়ি বছরে তিনি নিজে এসে তাঁর পূজা করলেন এবং শিলাখন্ড উৎকীর্ণ করালেন। (রায় আচার্য- ২০১৪
, ৩১৮)

অশোকের অভিলেখ অনুযায়ী, তিনি তাঁর রাজ্যাভিষেকের ১৪ তম বর্ষে এসে কনকমুনি বুদ্ধের স্তূপ বর্ধিত করেছিলেন এবং ২০ তম বর্ষে এসে সেই স্থানটি দর্শন করে স্তম্ভ স্থাপিত করিয়েছিলেন। সম্রাট অশোকের দ্বারা কনকমুনি বুদ্ধের মতো গৌতম বুদ্ধের পূর্ববর্তী এক বুদ্ধের উল্লেখ করা নিয়ে অনেক পণ্ডিতের একটি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ আছে। তাঁদের মতে গৌতম বুদ্ধের পূর্ববর্তী বুদ্ধদের অস্তিত্বের ধারণা সম্রাট অশোক বা সাধারণ পূর্বাব্দের তৃতীয় শতাব্দীর পর পরিচিতি পেয়েছে। তার আগে এই মতবাদের কোনো পাথুরে প্রমাণ পাওয়া যায় না আর সেক্ষেত্রে কনকমুনি বুদ্ধের নামে কোনো ‘অশোক স্তম্ভ’ বাস্তবে থাকতে পারে না। অশোকাবদান গ্রন্থে অশোকের লুম্বিনী দর্শনের উল্লেখ আছে কিন্তু অশোকের কনকমুনি বুদ্ধের স্থান দর্শন বিষয়ে সেই গ্রন্থের কোনো স্থানে উল্লেখ নেই। আমার সবচেয়ে আশ্চর্য লেগেছে যে নেপালের প্রত্নতত্ত্ব দপ্তর কনকমুনি বুদ্ধের স্থান হিসেবে নিগালীকে প্রচার করেন এবং সেখানকার অশোক স্তম্ভের সামনে স্থাপিত বোর্ডে সেই দাবি জানিয়ে আবার এটাও লেখা আছে যে ওখানে থাকা অশোক স্তম্ভটি যে আসলে কোথাকার তা জানা যায় না। অর্থাৎ নিগালী যে কনকমুনি বুদ্ধের স্থান নয়, সে বিষয়ে তাঁরা যথেষ্ট ওয়াকিবহাল।
লুম্বিনীতে যে সিদ্ধার্থের জন্ম হয়েছিল এই বিষয়ে সমস্ত বৌদ্ধ গ্রন্থ একমত এবং আমরা সেই নামের স্থান পাই যেখানে বুদ্ধের সময়কালের আশপাশ থেকে কয়েক শত বছর ধরে মন্দিরের অস্তিত্ব ছিল কিন্তু পূর্ববর্তী বুদ্ধদের ক্ষেত্রে সেই স্থানগুলির উল্লেখ পরিষ্কার নয় যা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে পুরো বিষয়টাই কাল্পনিক। গৌতম বুদ্ধের সঙ্গে তাঁদের জীবনের সাদৃশ্য দেখে বড়ো কৃত্রিম লাগে যা স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেয় যে এগুলি সব পরের সংযোজন। ফা-হিয়েন ও হিউয়েন সাঙ উভয়েই শ্রাবস্তী থেকে লুম্বিনী ভ্রমণের পথে তিনটি পূর্ববর্তী বুদ্ধের স্থান দর্শন করেছিলেন–কশ্যপ, ক্রকুচ্ছন্দ্র ও কনকমুনি। বৌদ্ধ গ্রন্থ মতে কশ্যপ বুদ্ধের স্থান বারাণসী, ক্রকুচ্ছন্দ্রের ক্ষেমাবতী ও কনকমুনির শোভাবতী। এর মধ্যে প্রথমটির অস্তিত্ব থাকলেও বাকি দুটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক শহর বলেই ধারণা। ফা-হিয়েন এবং হিউয়েন সাঙ সুজনেই কশ্যপ বুদ্ধের স্থানে গিয়েছিলেন। ফা-হিয়েন সেই শহরের নাম
‘টু-ই’ বললেও হিউয়েন সাঙ কোনো নামের উল্লেখ করেননি। উভয়ের বর্ণনা মতো সেই স্থান শ্রাবস্তীর কাছে, অর্থাৎ বারাণসীর ধারেকাছে নয়। এখানেও কিন্তু একটি মোচড় আছে, ফা-হিয়েনের মতে কশ্যপ বুদ্ধের স্থান শ্রাবস্তীর দক্ষিণে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরত্বে তখন হিউয়েন সাঙের ভাষ্যে এই শহরের অবস্থান শ্রাবস্তীর উত্তর-পশ্চিমে ৬.৪ কিলোমিটার দূরে। ফা-হিয়েন শুধুমাত্র ক্রকুচ্ছন্দ্র বুদ্ধের স্থানের নাম
‘না-পি-কী’ বলেছেন কিন্তু কনকমুনি বুদ্ধের স্থানের নাম উল্লেখ করা নেই। হিউয়েন সাঙের বর্ণনায় দুই বুদ্ধের স্থানের নামের উল্লেখ নেই। যাইহোক আমি আগেই বলেছি যে ‘না-পি-কী’ শহর আর অশোকের শাহবাজগড়ি শিলালিপিতে ‘নভাক’ নামের একটি প্রদেশের উল্লেখ বেশ কৌতূহল জাগায়। ক্রকুচ্ছন্দ্র, কনকমুনি ও কশ্যপ বুদ্ধেরা হলেন সিদ্ধার্থের ঠিক আগের তিন বুদ্ধ এবং পরিব্রাজকরা তিনজনের জন্মস্থান প্রাচীন কোশল রাজ্যের মধ্যেই দেখে ফেলেছিলেন। এই ঘটনা দেখে যেন মনে হয় যে এঁরা সবাই হয়তো সিদ্ধার্থের সময়ের কাছাকাছি পণ্ডিত ব্যক্তি ছিলেন যাঁদের পরে বুদ্ধত্বে রূপান্তরিত করা হয়েছিল। বাকি বুদ্ধদেরও উৎপত্তি এমন ভাবে হওয়া বিচিত্র কিছু নয়। অতীত ও ভবিষ্যতের বুদ্ধদের নাম ও তাঁদের বিষয়ে কিছু তথ্য রয়েছে পরিশিষ্ট–গ-তে।
কিন্তু হিউয়েন সাঙের বর্ণনা অনুসারে তো তিনি যে শুধু কনকমুনি বুদ্ধের স্থানে অশোক স্তম্ভ দেখেছিলেন তাই নয়, তিনি ক্রকুচ্ছন্দ্র বুদ্ধের স্থানেও একটি অশোক স্তম্ভ দেখেছিলেন। যদি ধরেও নিই যে নিগালীর স্তম্ভটি আসলে গোঠিহওয়ার স্তম্ভের ওপরের অংশ তাহলে গোঠিহওয়ার ১২ কিলোমিটারের মধ্যে তো আরেকটি স্তম্ভ থাকার কথা। সেটা কোথায় গেল! আর সেই স্থানগুলিতে হিউয়েন সাঙ স্তম্ভ দেখে গেলেও তাঁর ভ্রমণের কয়েকশ’ বছর আগে ফা-হিয়েনের নজর এড়িয়ে গেল কীভাবে! আবার নিগালীর স্তম্ভ ও গোঠিহওয়ার স্তম্ভ এক হলে আমাদের মনে হতে পারে যে অন্তত স্তম্ভ-স্তূপ সমাহারের একটি হিসেব তো মিলছে কারণ গোঠিহওয়াতে একটি স্তূপও পাওয়া গেছে। সেক্ষেত্রে আমরা ধরে নিলাম যে গোঠিহওয়া হচ্ছে কনকমুনি বুদ্ধের জন্মস্থান এবং সেখানেই অশোক একবার স্তূপ বর্ধিত করেছিলেন (রাজ্যাভিষেকের ১৪ তম বর্ষে) আর তার পরবর্তী সময়ে আরেকবার যখন তিনি লুম্বিনী দর্শনে এসেছিলেন তখন গোঠিহওয়াতে এসে স্তম্ভটিও স্থাপন করে গিয়েছিলেন (রাজ্যাভিষেকের ২০ তম বর্ষে)। পরবর্তী সময়ে কোনো কারণে সেই স্তম্ভ ভেঙে পড়ে এবং কে বা কারা স্তম্ভের ওপরের অংশটিকে নিগালীতে এনেছিল। গোঠিহওয়াতে খনন হয়েছে এবং দেখা গেছে যে সেখানকার স্তূপটি নির্মিত হওয়ার পর সত্যিই একবার বর্ধিত করা হয়েছিল। গল্পটি বেশ শুনতে বিশ্বাসযোগ্য লাগলেও বাদ সাধল বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা, যা দেখিয়ে দিয়েছে যে গোঠিহওয়ার স্তূপ নির্মিত হয়েছিল সাধারণ পূর্বাব্দের তৃতীয় শতাব্দীতে অর্থাৎ অশোকের সময়ে আর বর্ধিত হয়েছিল তার প্রায় ৪০০ বছর পরে সাধারণ অব্দের ১ম বা দ্বিতীয় শতাব্দীতে। সুতরাং এখানেও অশোকের ভ্রমণের কাহিনি জোড়া গেল না।
গোঠিহওয়াতে অশোকের সময়ের আগের জনপদ এবং স্তূপের স্থানে ভাঙা পাত্র ও কাঠকয়লা পাওয়া গেছে। মেজর ওয়াডেল স্তূপের মাঝখান থেকে স্তম্ভের দিক অবধি একটি লম্বা ও গভীর পরিখা কেটেছিলেন। ওপর থেকে সাড়ে সাত ফুট নীচে যেতেই স্তূপের ইটের গাঁথনি সমাপ্ত হয়ে গিয়েছিল। তারপরও মাটির নীচে ১’৯” গভীরে পশুর কিছু হাড় ও দাঁত পাওয়া গিয়েছিল (Mukherji: 32)।
এইগুলি বলির নিদর্শন হতে পারে। মনে হয় এখানেও কোনো প্রাক-বুদ্ধ যুগের অর্চনার স্থান ছিল। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যেখানে তরাই অঞ্চলটিকে বেশ ভালোভাবে জরিপ করা গেছে তখন লুম্বিনীর আশপাশে আরেকটি নতুন স্তূপ ও আরেকটি নতুন অশোক স্তম্ভের সন্ধান করে বার করে আনা বড়োই কঠিন কাজ। পি সি মুখার্জি আবার নিগালী থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে অরৌরাকোট স্থানটিকে কনকমুনি বুদ্ধের জন্মস্থান বলে অনুমান করেছিলেন এবং এটি শুধুমাত্র অনুমান কারণ সেখানে একটি দুর্গের মতো কাঠামো পাওয়া গেলেও কনকমুনি বুদ্ধের সঙ্গে তার সম্পর্কের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
আমার মতো আপনাদেরও নিশ্চয়ই মাথা বোঁ বোঁ করে ঘুরছে। ঠিক এই কারণে ক্রকুচ্ছন্দ্র বুদ্ধ ও কনকমুনি বুদ্ধের স্থান দুইটিকে কপিলাবস্তুর অবস্থান নির্ণয়ে আমি তেমন গুরুত্ব দিচ্ছিনা। আগে দেওয়া স্থানগুলির মধ্যবর্তী দূরত্বের সারণীতে অনেক স্থানেই সেই দূরত্ব সরাসরি হতে পারে না কারণ পরিব্রাজকরা সেই স্থানে সোজাসুজি যাননি আর তাই সোজাসুজি দূরত্ব হিসেব করলেও বিষয়টি মোটেই সোজা নয়। দুই পরিব্রাজকের বর্ণনা অনুযায়ী তাঁদের ঘুরে আসা লুম্বিনী ও কপিলাবস্তু অঞ্চলের স্থানগুলির একটি রেখাচিত্র আঁকলে কেমন দাঁড়াবে দেখা যাক।


তাহলে দেখা যাচ্ছে যে পরিব্রাজকদের বর্ণনা পড়ে যে সন্দেহ দানা বেঁধেছিল তার যৌক্তিকতা আছে, ফা-হিয়েন ও হিউয়েন সাঙের যাত্রাপথ অনুসারে কপিলাবস্তু ও তার আশপাশের স্থানগুলির অবস্থান নিয়ে অনেক ধোঁয়াশা আছে। কনকমুনি ও ক্রকুচ্ছন্দ্র বুদ্ধের স্থান দুটির রহস্য যে বেজায় জটিল তাও আমরা দেখেছি। শরকূপের বিষয়টি সম্পূর্ণই আমাদের আয়ত্ত্বের বাইরে কারণ এখনও পর্যন্ত এমন কোনো স্থানের হদিশ পাওয়া যায়নি। আর বাকি রইল কপিলাবস্তু যার সন্ধান করা হবে আমাদের পরবর্তী লক্ষ্য। আমরা এক্ষেত্রে শ্রাবস্তী ও লুম্বিনীকে ধ্রুবক ধরে নিয়েছি কারণ এই দুই স্থানের বর্তমান নাম ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ অনেকটাই স্থানগুলিকে চিহ্নিত করতে সাহায্য করে। তবুও পরিব্রাজকদের বর্ণনা নিয়ে কাজ করতে গেলে সেগুলিকে প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ দিয়ে মিলিয়ে নিলে ভালো হয়। যেমন তিন চীনা পরিব্রাজকের লুম্বিনী বর্ণনার উল্লেখযোগ্য তথ্যগুলি যদি চিত্রে রূপান্তরিত করি তাহলে যা পাওয়া যায় তা হল অনেকটা এমন –


তাহলে দেখলেন যে লুম্বিনীতে তিন চীনা পরিব্রাজক কী কী দেখেছিলেন এবং আজ মায়াদেবী পবিত্র উদ্যানে (Mayadevi Sacred Garden) যেসব কাঠামো দেখতে পাওয়া যায় তার ছবি। এঁদের মধ্যে একমাত্র হিউয়েন সাঙ শুধু অশোক স্তম্ভের কথা উল্লেখ করলেও তার অবস্থান বর্তমানে যেখানে আছে তিনি ঠিক তার উল্টোদিকে বলেছেন। অশোক স্তম্ভের নীচে ভিত্তিবেদি পাওয়া গেছে সুতরাং এক হতে পারে যে হিউয়েন সাঙের হিসেবে ভুল হয়েছিল অথবা হিউয়েন সাঙের বর্ণনায় ছিল শুধু মাত্র ভেঙে পড়া অশোক স্তম্ভের খণ্ডটি যেটি হয়তো কেউ অন্যদিকে নিয়ে গিয়েছিল। জি সেংজাই ও ফা-হিয়েনের ক্ষেত্রে আমার মনে হয় যে তাঁদের কাছে বুদ্ধদেবের জন্মস্থান দর্শন করাটাই অগ্রাধিকার ছিল আর তাই তাঁরা অন্যান্য কিছু দেখলেও সেগুলিকে গুরুত্ব দেননি।
আমরা লুম্বিনী, ক্রকুচ্ছন্দ্র বুদ্ধের স্থান ও কনকমুনি বুদ্ধের স্থান নিয়ে আলোচনা করলেও আমাদের সবচেয়ে challenging কাজটি বাকি আছে যা হল কপিলাবস্তুকে খুঁজে বার করা। এবারে আমরা তার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ব।

