সিদ্ধার্থের জন্ম, অতিলৌকিকের আবরণে সত্য  

সিদ্ধার্থের জন্ম, অতিলৌকিকের আবরণে সত্য  

এবারে আমাদের আলোচনা হবে সিদ্ধার্থের জন্মের বিষয় নিয়ে। লুম্বিনী নিয়ে আলোচনায় সিদ্ধার্থের জন্মের প্রসঙ্গ না এলে লুম্বিনীর সার্থকতা থাকে না। সিদ্ধার্থের জন্মের কাহিনি আপনারা পড়েছেন। জন্মের কাহিনি বড়োই অলৌকিকতার মোড়কে পরিবেশন করা আর তার ফলে বুদ্ধদেবের সমস্ত কাহিনির ওপরেই একটি অবাস্তবতার ছাপ পড়ে যায়। পি সি মুখার্জি এই প্রসঙ্গে সঠিক ভাবেই বলেছেন যে বুদ্ধের জন্মের অলৌকিকতার খোলস ছাড়ালে আমরা একজন নারীর দ্বারা প্রসব ছাড়া বিশেষ কিছু পাব না-

Orientalists are in the habit of discrediting the life of the Buddha, because it contains  legendary matters. When a story verges on the miraculous, whatever substratum of truth it contains is thrown away as not worth consideration. But we do not throw away wheat, because it contains chaff. What
 we do is first to separate the wheat from the chaff and utilize it. Now, analysing the Life of the Buddha and taking out the legends, which we can safely relegate to the region of folklore, we find the residue as quite prosaic and common, each event being in its proper place in the natural sequence of cause and effect. All took place in natural order. There is nothing strange, for example, in the
 fact of a pregnant woman (Mayadevi) paying a visit to her father’s garden, where she had spent her childhood, and delivering a son suddenly and quite unprepared. This is an ordinary occurrence of human life. Mukherji: 1901, 8)
।

কিন্তু সেই প্রসব কোনো সাধারণ ঘটনা ছিল না। একে তো তার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বুদ্ধদেবের মতো চরিত্র, অপরদিকে প্রসবের সঙ্গে জুড়ে আছে কিছু অস্বাভাবিক ঘটনা যা একে অতিলৌকিক করে তুলেছে।

লুম্বিনী উদ্যানে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে মায়াদেবীর আকস্মিক প্রসবের কাহিনি বিশ্বাসযোগ্য নয়। সিদ্ধার্থের জন্ম মোটেই আকস্মিক হয়নি, এমনকি তখন যে মায়াদেবী প্রস্তুত ছিলেন না তাও মনে করি না। কিন্তু এই প্রসঙ্গে প্রায় সমস্ত বৌদ্ধ গ্রন্থ একই ঘটনার একটু হেরফের করে বর্ণনা দিয়েছে যার থেকে মায়াদেবীর প্রসবের মূল তথ্যগুলিকে আমরা কল্পনা বলে উড়িয়ে দিতে পারি না। সিদ্ধার্থের জন্মের বর্ণনা আমরা পড়েছি তাই পুরো অংশটি পুনরাবৃত্তি না করে জন্মের মূল তথ্যগুলির একটি তালিকা বরং বানিয়ে ফেলা যাক। এতে আমাদের আলোচনা করতে সুবিধে হবে।

১) মায়াদেবীর যখন গর্ভাধান হয়েছিল তখন তাঁর বয়স ছিল পঞ্চান্ন বছর চার মাস (Sayadaw: 1990, 216), তাহলে প্রসবের সময় বয়স হবে ছাপ্পান্ন বছর দুই মাস।

২) মায়াদেবীর শরীরে গর্ভাবস্থার চিহ্ন খুবই কম ছিল।

৩) গর্ভাধানের ঠিক দশ মাসের মাথায় মায়াদেবী প্রসব করেছিলেন।

৪) প্রসবের দিন মায়াদেবী পিতৃগৃহে যাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করাতে শুদ্ধোদন কপিলাবস্তু থেকে দেবদহ যাওয়ার রাস্তা সংস্কার করিয়েছিলেন।

৫) প্রসবের দিন মায়াদেবী পিতৃগৃহে যাওয়ার সময় লুম্বিনী উদ্যানে নেমে যান।

৬) লুম্বিনী উদ্যানে তিনি একটি পুষ্করিণীতে স্নান করেছিলেন।

৭) স্নান সেরে তিনি ২০/২৫ পদ হেঁটে একটি গাছের তলায় দাঁড়ান, গাছের নুইয়ে পড়া একটি ডাল তিনি শক্ত করে ধরেছিলেন।

৮) প্রসবের আগে তিনি হাই তুলছিলেন।

৯) প্রসবের সময় তাঁর গর্ভের ওপরে সোনালি আভা দেখা গিয়েছিল। 

১০) গাছের তলায় দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় মায়াদেবীর প্রসব হয়েছিল।

১১) মায়াদেবীর গর্ভের ডান দিক থেকে সিদ্ধার্থ সরাসরি বেরিয়ে এসেছিলেন।

১২) ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরেই সিদ্ধার্থ সাত পা হেঁটে গিয়েছিলেন।

১৩) দুইজন নাগ প্রসবের সময় জলের ধারা দিয়েছিলেন।

১৪) আরও দুই পুরুষ সেই সময়ে পাশে ছিলেন যাঁদের ইন্দ্র ও ব্রহ্মা বলা হয়েছে। লুম্বিনীতে পাওয়া প্রাচীন ভাস্কর্যে দেখা যায় যে মায়াদেবীর পাশে আরেকজন নারী তাঁকে প্রসবে সাহায্য করছিলেন।

১৫) প্রসবের সময়ে গর্ভমল নির্গত হয়নি।

১৬) প্রসবের পর সাত দিন সিদ্ধার্থ লুম্বিনী উদ্যানেই ছিলেন।

১৭) প্রসবের পর সাত দিন মায়াদেবী অসুস্থ ছিলেন।

১৮) প্রসবের সাত দিন পর মায়াদেবীর মৃত্যু হয়েছিল।

প্রসব

লুম্বিনী উদ্যানে জন্মস্থান থেকে সিদ্ধার্থের জন্ম দৃশ্য খোদাই করা একটি প্রাচীন ভাস্কর্য পাওয়া গেছে যাকে জন্ম ভাস্কর্য বলা হয়ে থাকে। এই ভাস্কর্যের বিষয়ে আমরা পরের অধ্যায়ে বিস্তারিত জানব। এখানে এই ভাস্কর্যটিকে দেওয়ার উদ্দেশ্য হল যে পাঠক যেন প্রসবের মুহূর্তে ঠিক কেমন অবস্থানে সবাই ছিলেন তার একটি ধারণা পান। বৌদ্ধ গ্রন্থ অনুযায়ী আমরা দেখেছি যে মায়াদেবী লুম্বিনী উদ্যানে একটি গাছের নীচে প্রসব করেছিলেন। সেখানে তখন দুই প্রধান দেবতা ইন্দ্র ও ব্রহ্মা উপস্থিত ছিলেন যারা একটি রেশমের কাপড়ের ওপরে বোধিসত্ত্বকে গ্রহণ করেছিলেন। এই ভাস্কর্যে তাঁদের দেখা যাচ্ছে, আর সঙ্গে থাকা মহিলাটি মনে হয় ধাত্রী আবার অনেকে মায়াদেবীর বোন মহাপ্রজাপতি গৌতমী বলে মনে করে থাকেন।

সিদ্ধার্থের জন্মের বিষয়টি বেশ অলৌকিক ও রহস্যময়তায় যে ঘেরা তা পাঠক তার বর্ণনা পড়ে সহজেই বুঝতে পারছেন। হঠাৎ লুম্বিনী উদ্যানে প্রবেশ করে একটি গাছের নীচে দাঁড়িয়ে একটি ডাল ধরে মায়াদেবী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্রসব করে ফেলেছিলেন এবং সিদ্ধার্থ ভূমিষ্ঠ হয়ে হেঁটেছিলেন তা ভাবলেই কেমন অস্বাভাবিক লাগে আর সেইজন্যই অনেকে সিদ্ধার্থের জন্মকেই প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছেন যে লুম্বিনীতে আদৌ তেমন কোনো ঘটনা ঘটেনি, অথচ কয়েকটি বিষয়ে সমস্ত প্রাচীন বৌদ্ধ তথ্যগুলি একস্বরে বলে থাকে যে মায়াদেবী দণ্ডায়মান অবস্থায় প্রসব করেছিলেন। সেসব সুত্রগুলি এই বিষয়েও একমত যে মায়াদেবীর তখন দশ মাসের গর্ভ ছিল, জন্মের পর সিদ্ধার্থ হেঁটেছিলেন এবং প্রসবে গর্ভমল নির্গত হয়নি, এবং সিদ্ধার্থের জন্মের সাত দিন বাদে মায়াদেবীর মৃত্যু হয়েছিল।

আমরা প্রথমে মায়াদেবীর দণ্ডায়মান অবস্থায় প্রসবের (মহাপদানসুত্ত ২৪, মহাবস্তু অবদান ১১.২১৭, বুদ্ধ চরিত ১.২৪) বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করব কারণ জন্মের কাহিনির মধ্যে এটি অন্যতম এক অলৌকিক বিষয় বলে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। ধর্মানন্দ কোসম্বী এই নিয়েও ক্ষুরধার বিশ্লেষণ করেছেন এবং এই প্রসঙ্গে খুব যুক্তিগ্রাহ্য মত দিয়েছিলেন যে, “মহাপদানসুত্তে এইরূপ বর্ণিত হইয়াছে যে, বোধিসত্ত্ব মাতৃগর্ভে প্রবেশ করার পর হইতে আরম্ভ করিয়া, জন্মগ্রহণ করার পর, সাতদিন পর্যন্ত, মোট ষোলদিন অলৌকিক ঘটনা (ধম্মতা) ঘটিয়াছিল। ইহাদের মধ্যে নবমটি হইতেছে এই যে, বোধিসত্ত্বের মা ঠিক ঠিক দশমাস গর্ভধারণের পর, বোধিসত্ত্বকে জন্ম দিয়াছিলেন; দশমটি এই যে, তিনি দাঁড়াইয়া থাকা কালেই, তাঁহার প্রসব হইয়াছিল; এবং অষ্টমটি এই যে, বোধিসত্ত্বের জন্মের সাতদিন পর, তাহার মা মৃত্যুমুখে পতিত হন। এই তিনটি অনন্যসাধারণ ঘটনা গোতম বোধিসত্ত্বের জীবনচরিত হইতে গৃহীত হইয়া থাকিবে। কিন্তু বাকি সব-কয়টি কল্পনাপ্রসূত ও ধীরে ধীরে গোতমের জীবনচরিতে ঢুকিয়াছিল বলিয়া মনে হয়। সংক্ষেপে আমার বক্তব্য এই যে, বোধিসত্ত্বের মা দাঁড়াইয়া থাকা কালেই তাঁহার জন্ম হইয়াছিল, এবং তাঁহার জন্মের সাতদিন পর, তিনি পরলোকগামী হইয়াছিলেন, এইরকম মানার বিরুদ্ধে কোনো আপত্তি নাই। জাতকের নিদানকথাতে লিখিত আছে যে, শালবৃক্ষের নীচে তাঁহার প্রসব হইয়াছিল, আর ললিতবিস্তরে লিখিত হইয়াছে যে, প্লক্ষ গাছের নীচে তাঁহার প্রসব হইয়াছিল। শালবৃক্ষের নীচে হউক অথবা প্লক্ষ বৃক্ষের নীচে হউক, লুম্বিনীগ্রামে শুদ্ধোদনের গৃহের বাহিরে, কোনো বাগানে বেড়াইবার সময়, তাঁহার প্রসব হইয়াছিল। এই বিবরণের মধ্যে এইটুকু তথ্য আছে বলিয়া বুঝিতে হইবে যে, দণ্ডায়মান অবস্থাতেই তাঁহার প্রসব হইয়াছিল” (কোসম্বীঃ ১৯৮০, ৭৮-৭৯)।

মায়াদেবীর যখন গর্ভাধান হয়েছিল তখন তাঁর বয়স ছিল অনেকটাই বেশি (১ নং তথ্য) এবং তারপর বিপদ আছে জেনেও দশ মাসের মাথায় অর্থাৎ প্রসবের দিন তাঁর পিতৃগৃহে যাওয়ার বিষয়টি বড়োই অবিশ্বাস্য (৩ ও ৪ নং তথ্য)। কপিলাবস্তু থেকে মায়াদেবীর পিতৃগৃহ অবধি রাস্তা শুদ্ধোদন সংস্কার করিয়েছিলেন সুতরাং বোঝা যাচ্ছে যে ঐরকম খারাপ রাস্তায় সড়কপথে বেশি বয়সী অন্তঃসত্ত্বা রানিকে পাঠানো কোনো ভাবেই যুক্তিযুক্ত ছিল না। কোসম্বী ভরণ্ডু কালাম সুত্ত (অঙ্গুত্তর নিকায়-এর তিক নিপাত, ১৩.৩.৪) উদ্ধৃত (যেখানে বলা হয়েছে যে এক সময়ে কোশল ভ্রমণ করতে করতে বুদ্ধ কপিলাবস্তুতে এসে পৌঁছেছিলেন আর রাত্রিবাসের জন্যে একটি স্থান খুঁজে দেওয়ার জন্যে মহানামকে বলেছিলেন।  কোনো উপযুক্ত স্থান খুঁজে না পেয়ে শেষে বুদ্ধের পুরনো ব্রহ্মচারী বন্ধু ভরণ্ডু কালামের আশ্রমে
 তাঁকে থাকতে হয়েছিল) করে বলেছেন যে বুদ্ধকে থাকার জায়গা না পাওয়ার কারণ ছিল এই যে শুদ্ধোদন প্রকৃতপক্ষে কপিলাবস্তুর রাজা তো দূর
, সেখানকার বাসিন্দাই ছিলেন না। তিনি লুম্বিনীর এক ছোটো জমিদার ছিলেন (কোসম্বীঃ ১৯৮০, ৭৩)। তাই মায়াদেবী প্রকৃতপক্ষে কোনো স্থানেই যাননি, তাঁর নিজের গৃহ লুম্বিনীতেই তাঁর প্রসব হয়েছিল।

তাঁর এই মত কোনোভাবেই মানা যায় না কারণ সেই সূত্র থেকে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে সেইবার বুদ্ধ কোনো গৃহীর বাড়িতে রাত কাটাতে চাননি। তাছাড়া, একটিমাত্র সুত্রের পরোক্ষ প্রমাণ দিয়ে এই বিষয়টির মান্যতা পাওয়া সম্ভব নয়; কারণ, একাধিক গ্রন্থে বহুবার উল্লিখিত হয়েছে যে শুদ্ধোদন কপিলাবস্তুতেই থাকতেন।এমনকি জন্মের পর থেকে মহানিষ্ক্রমণ অবধি সিদ্ধার্থের বিভিন্ন ঘটনার সাক্ষী ছিল কপিলাবস্তু। বুদ্ধদেবের নিজের জবানীতেই রয়েছে যে,

নগরং কপিলবত্তু মে রাজা শুদ্ধোদনো পিতা

ময়ং জনেত্তিকা মাতা মায়া দেবী তি উচ্চতি।

একূনাতিম্সবস্সানি আগারং আজ্হ আহং বাসিং

রামো সুরামো সুভাতো তায়ো পাশাদমুত্তমা।

চত্তারীসসাহস্সানি নারিও সমলঙ্কতা

ভদ্দকচ্চা নাম নাড়ী রাহুলো নাম আত্রজো।

– বুদ্ধবংশ ২৬.১৩-১৫

আমার শহর কপিলাবত্থু (কপিলাবস্তু), রাজা শুদ্ধোদন আমার পিতা, আমার জননী এবং মাতা পরিচিত রানি মায়া নামে। আমি ঊনত্রিশ বছর সংসার জীবন কাটিয়েছি। (আমার) তিনটি চমৎকার প্রাসাদ ছিল রম্ম, সুরম্ম, সুভকা। সেখানে চল্লিশ হাজার সুন্দরভাবে সজ্জিত নারী ছিল। আমার স্ত্রীর নাম ছিল ভদ্রকচ্ছা, আমার পুত্রের নাম রাহুল।

সুতরাং শুদ্ধোদন বা সিদ্ধার্থ যে কপিলাবস্তুতে বাস করতেন না এই দাবীটি একেবারেই বাস্তবসম্মত বলে মনে হয় না। সেক্ষেত্রে আমার কাছে এই সমস্ত ধাঁধার একটিই সমাধান মনে হয় যে মায়াদেবী ওই সংকটজনক সময়ে লুম্বিনী যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। এমন একটা অবস্থায় তাঁকে সেখানে যেতে হয়েছিল সম্ভবত সেই কারণে, যে কারণে একালের প্রসূতিরা হাসপাতালে যান, অর্থাৎ ঝুঁকিপূর্ণ প্রসবের জন্য বিশেষ সুবিধাযুক্ত বৈদ্য/বৈদ্যদের কর্মস্থল ও সূতিকাগারের উপস্থিতি। 

এইবারে আসি সিদ্ধার্থের প্রসবের প্রসঙ্গে। দাঁড়ানো অবস্থায় প্রসব করা নিয়ে ভাবলে আজকের দিনে আমাদের চোখ কপালে উঠে গেলেও আপনি জেনে আশ্চর্য হবেন যে এটি শুধু যে একটি প্রসবের পরীক্ষিত ভঙ্গি (posture) তাই নয়, দীর্ঘদিন ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জনজাতিরা এই পদ্ধতি অনুসরণ করে দিব্যি বেঁচে আছে। তাঁর অনেকদিনের অভিজ্ঞতা ও তথ্য নিয়ে জর্জ জুলিয়াস এঙ্গেলম্যান (George Julius Engelmann) ‘আদিম জনজাতির প্রসব’ (Labor among Primitive Peoples) বলে অসাধারণ একটি বই লিখেছিলেন। ১৮৮৩ সালে প্রকাশিত সেই বইটি এই বিষয়ের একটি আকর গ্রন্থ। সেখানে তিনি আদিম জনজাতিদের প্রসব ভঙ্গিগুলির তালিকা বানাতে গিয়ে সর্বপ্রথমে রেখেছেন দণ্ডায়মান ভঙ্গি (Engelmann: 1883, 61)। ঊনবিংশ শতাব্দীতে বসে ফ্রান্সে, মধ্য ইউরোপের কিছু অংশে (Sclavonians in the mountaneous region of upper Silesia), মধ্য আফ্রিকা থেকে অন্তরীপ অবধি অঞ্চলের জনজাতিদের মধ্যে, ফিলিপিন্সে, কানাডার কিছু জনজাতির মধ্যে, জাপানে, মেক্সিকোতে, আফ্রিকার নীলনদের উপত্যকা-কেন্দ্রিক জনজাতিদের মধ্যে, অস্ট্রেলিয়ার একটি জনজাতিতে, আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ানদের মধ্যে, ফিনল্যান্ড ও রাশিয়ার কিছু অংশে, ব্রাজিলে, জার্মানিতে দণ্ডায়মান পদ্ধতির তিন রকম ভঙ্গি তিনি নথিভুক্ত করেছিলেন।

প্রসব

শুধু ঐতিহাসিক সময়েই নয়, প্রাগৈতিহাসিক শৈলচিত্রে আমরা দণ্ডায়মান ভঙ্গিতেই প্রসবের ছবি পেয়ে থাকি। পৃথিবীর প্রসবের ইতিহাসে সবচেয়ে সুবিধাজনক ভঙ্গি হিসেবে প্রথমেই যে কয়টির নাম নিতে হবে তার মধ্যে প্রথমেই আসবে দণ্ডায়মান ভঙ্গির নাম।

প্রসব

এসব বিদেশের প্রসঙ্গ তো অনেক হল কিন্তু আমাদের জানতে হবে যে ভারতে এমন পদ্ধতি আদৌ অনুসরণ করা হত কি না। ভারতেও প্রাগৈতিহাসিক শৈলচিত্রে দণ্ডায়মান ভঙ্গীতে প্রসবের নিদর্শন পাওয়া গেছে হাজারিবাগের ইসকো গুহায়। ভারতীয় জনজাতিদের মধ্যে এই প্রসব নিয়ে এঙ্গেলম্যানের মন্তব্য দেখে নেওয়া যাক-

“The Hindoos, especially upon the eastern coast of India and in the vicinity of Madras, are delivered in an erect, standing posture, supported by an assistant under each shoulder – the midwife attending to her duties, being seated in front of the patient, and whether rare or not at the present day the position is certainly traditionary, as bas- reliefs still exist upon the ancient Indian monuments which represent the act of delivery in this very same way”. (ibid, p-62)

অর্থাৎ উনবিংশ শতাব্দীতেও উত্তর ভারতের উপকূলবর্তী জনজাতি এবং দক্ষিণ ভারতের জনজাতির মধ্যে দণ্ডায়মান ভঙ্গীতে প্রসবের রীতি চালু ছিল। দণ্ডায়মান ভঙ্গি নিয়ে আলোচনা করার আগে একটি বিষয় জানিয়ে দেওয়া প্রয়োজনীয় যে প্রসবের দণ্ডায়মান ভঙ্গি মানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা যেভাবে সোজা দাঁড়িয়ে থাকি তা কিন্তু নয়। প্রসবের সময় অন্তঃসত্ত্বা মা-কে যোনিদেশ প্রসারিত করে জরায়ুতে চাপ সৃষ্টি করতে হয় আর তাই তাঁকে পা ফাঁক করে অল্প বসার ভঙ্গীতে দাঁড়াতে হয়। দুই পা প্রসারিত করে কোনো অদৃশ্য উঁচু চেয়ারে বসে থাকার সময় যেমন দেখতে লাগবে অনেকটা সেইরকম, একে squat position বলে, যোগাসনের ভাষায় যা হল উৎকট কোণাসন। লিখবার সুবিধার জন্যে আমরা ‘দণ্ডায়মান ভঙ্গি’ ব্যবহার করব।

 বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় দেখা গেছে যে দণ্ডায়মান ভঙ্গীতে যোনিদেশের প্রসারণ প্রায় ৩০% বেড়ে যায় আর তার ফলে প্রসবকালীন চাপ দিতে যেমন সুবিধা হয় তেমনই প্রসবের ব্যথাও অনেকটাই লাঘব হয়ে থাকে (Modrzejewska Elżbieta et al: 2019)। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের অধীনস্থ ব্যবস্থাদির বাইরে প্রসবের এই পদ্ধতিটিকে সবচেয়ে জনপ্রিয় বললে ভুল বলা হয় না। এ বিষয়ে একটি প্রবন্ধের লেখার অংশ বিশেষ আমি না উল্লেখ করে পারছি না-

“The squatting birth position is widely used for “natural” birth or in countries where childbirth occurs in non-medical facilities…. At the beginning of the nineteenth century, (Engelmann et al) observed that women not influenced by Western conventions mainly adopted the squatting birth position in the first and second phases of labor. This position remains widely used in countries where childbirth occurs in non-medical facilities, as demonstrated by previous studies and notably in the European region,

where medicalization of birth is prevalent. However, its usage is rare in countries with significant medical intervention during childbirth occurs in non-medical facilities (38.9% in Nepal in 2012). According to Atwood, the squatting position is categorized among vertical positions. Vertical positions, including squatting, are known to offer obstetrical benefits, such as reducing the time to delivery and decreasing the need for obstetrical intervention. One hypothesis explaining these benefits suggests that the vertical position, like squatting, aligns closely with the theoretically optimal birthing position. This alignment enables the axis of progression to be perpendicular to the superior pelvic inlet plane, encountering fewer obstacles by flattening the dorsal hinge or with kyphosis. To achieve these optimal conditions, the pelvic inlet plane should be close to perpendicular to the lumbar spine, as per obstetrical theory” (Desseauve et al: 2019)

বিশ্বের অন্যান্য স্থানের মতোই আমাদের দেশেও প্রাচীন কাল থেকেই দণ্ডায়মান ভঙ্গীতে প্রসবের রীতি যে প্রচলিত ছিল তাই নয় অনেক আদিম জনজাতি আজও সেই একই পদ্ধতিতে প্রসব করিয়ে থাকে। আগেই বলেছি যে হাজারিবাগের ইসকো গুহার অভ্যন্তরে শৈলচিত্রে দণ্ডায়মান ভঙ্গীতে প্রসবের চিহ্ন পাওয়া গেছে যেগুলি আজ থেকে ১০ হাজার বছর আগে হয়তো আঁকা হয়েছিল। ছত্তিসগড়ের বস্তার অঞ্চলে আদিম জনজাতির মধ্যে সমীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে যে তাঁরা সাধারণত দণ্ডায়মান প্রসব ভঙ্গিতেই বাচ্চার জন্ম দিয়ে থাকেন (Sengupta: 2019)।

শুধু এই একটা সমীক্ষা নয়, পাঁচ বছর ধরে ভারতের জনজাতিদের ওপরে একটি বড়ো সমীক্ষা হয়েছিল আর সেখানেও দেখা গেছে যে প্রসব বেদনা শুরু না হওয়া পর্যন্ত অন্তঃসত্ত্বা মায়েরা কাজ করেছেন এবং প্রসবের সময়ে তাঁরা দণ্ডায়মান (স্কোয়াটিং) ভঙ্গী বেছে নিয়েছেন (They worked until labor pain starts and preferred birthing in squatting position and believed it facilitates natural birth and prevents perineal injuries. Sengupta et al: 2020)।

১৯৮৭ সালের এপ্রিল মাস থেকে ১৯৮৮ সালের মে মাস অবধি পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের ১৫ জন অন্তঃসত্ত্বা মহিলার ওপরে একটি সমীক্ষা হয়েছিল এবং সেখানে বেশির ভাগ মহিলাই দণ্ডায়মান ভঙ্গী পছন্দ করেছিলেন (Bhardwaj et al: 1991)। আরেকটি ক্ষেত্রে ২১২ জন অন্তঃসত্ত্বা নারীর ওপরে সমীক্ষায় সেই একই ফল পাওয়া গেছে যা দেখে গবেষকেরা লিখেছেন যে, “While comparing normal delivery in squatting position versus lying down position, squatting position for second stage of labour was found much convenient for mothers’ in terms of less duration of second stage of labour, less need of oxytocin administration, lesser extension of episiotomy and greater maternal satisfaction on VAS”. Shedmake & Wakode: 2021)

প্রসব

শুধুমাত্র ভারতের জনজাতিদের মধ্যেই নয়, প্রাচীন ভারতে বিভিন্ন সভ্যতাতেও দণ্ডায়মান প্রসব ভঙ্গী অনুসরণ করা হত আর তার প্রমাণ ছড়িয়ে আছে বিভিন্ন মন্দিরের ভাস্কর্যে। তামিলনাড়ুর বিখ্যাত ঐরাবতেশ্বর মন্দিরের বয়েস এক হাজার বছর। সেই মন্দিরে আমরা একটি ভাস্কর্য দেখতে পাই যেখানে একটি অন্তঃসত্ত্বা নারী প্রসবে দুইজন মহিলা সাহায্য করছেন। তামিলনাড়ুর আরেকটি প্রাচীন মন্দির পুঙ্গম্পাদি শিব মন্দিরে দুইটি অসাধারণ ভাস্কর্য আছে যেখানে দণ্ডায়মান নারীর প্রসবকালীন দৃশ্য খোদিত আছে। কর্ণাটকের ভাটকাল মন্দিরেও একটি দণ্ডায়মান ভঙ্গীতে প্রসবের দৃশ্য খোদাই করা আছে। দিল্লীর ন্যাশনাল মিউজিয়ামে রক্ষিত প্রায় ১২০০ বছর আগের অর্থাৎ অষ্টম শতাব্দীর একটি কাঠের মূর্তিতে দণ্ডায়মান প্রসবের ভারী সুন্দর দৃশ্য দেখানো হয়েছে যেখানে অন্তঃসত্ত্বা নারী (বোধহয় পার্বতী) দুই জন সহায়িকার সাহায্যে প্রসবে রত। তামিলনাড়ুর আরেক শহর নানজানগুদুতে রাখা একটি ঊনবিংশ শতাব্দীর কাঠের রথের ওপরে দণ্ডায়মান প্রসবের ছবি আছে। তামিলনাড়ুর তিরুভানাই কাভালের জম্বুকেশ্বর মন্দিরের একটি ভাস্কর্যে আজ থেকে হাজার বছর আগের দণ্ডায়মান প্রসব ভঙ্গী দেখানো হয়েছে। তামিলনাড়ুতে উইলিয়ানুর থিরুকামিসুভারার থিরুকোভিল মন্দিরের গায়েও দণ্ডায়মান প্রসবের মূর্তি আছে যার বয়স প্রায় ৮০০ বছর। এমনকি গুজরাটের মধেরায় অবস্থিত ১২০০ বছরের প্রাচীন সূর্য মন্দিরের গায়েও দণ্ডায়মান প্রসব খোদাই করা আছে।

তাহলে বোঝা যাচ্ছে যে দণ্ডায়মান ভঙ্গীতে প্রসবের মধ্যে কোনো অলৌকিক বিষয় নেই বরং প্রাচীন কালে এটিই ছিল সর্বাধিক পচ্ছন্দের প্রসব-ভঙ্গি কারণ বেশ কিছু চিকিৎসা সংক্রান্ত সুবিধা ছাড়াও এই ভঙ্গীতে যোনিদেশ বেশি প্রসারিত হয়ে থাকে, জরায়ুতে চাপ দিতে মায়ের সুবিধা হয়, প্রসব বেদনা কম হয়, মাধ্যাকর্ষণ নবজাত শিশুকে বেরিয়ে আসতে অনেকটাই সাহায্য করে থাকে এবং সবচেয়ে বড়ো বিষয় হল যে মা তাঁর শিশুকে জন্ম নিতে দেখতে পান যা তাঁকে প্রতিবর্ত ক্রিয়ার মাধ্যমে প্রসব করতে বাধ্য করে, মনকে খুশি রাখে এবং নিজে প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারেন (Koenig: 2023 ও Jissa Donel et al: 2023)। পেরু তো তাদের দেশে দণ্ডায়মান পদ্ধতিকে একটি মূল প্রসব ভঙ্গী হিসেবে রেখেছে আর এই প্রসঙ্গে বলেছে যে, “Western science is unaware of the priorities and needs of women, particularly rural women, who consider childbirth a natural event and do not think changes to the traditional vertical delivery are needed,” the ministry said in a small book extolling the benefits of standing during childbirth (Palomino: 2008)।

প্রসব

আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৌলতে যে শুয়ে প্রসব করার ভঙ্গী (lithotomy)-র প্রসার ও প্রচার হয়েছে সেই নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই (Jissa Donel et al: 2023) এবং তার আগে দণ্ডায়মান ভঙ্গীতে প্রসব ছিল একটি সাধারণ প্রসব প্রক্রিয়া। সুতরাং মায়াদেবীকে যে গাছের নীচে দণ্ডায়মান ভঙ্গীতে প্রসব করানো হয়েছিল (৭ নং তথ্য) তার যথেষ্ট কারণ আছে আর তখন ভারসাম্য ও অবলম্বন রাখতে মায়াদেবীর মতো জনজাতি সমাজের মায়েরাও গাছের ডাল ধরে দণ্ডায়মান ভঙ্গীতে প্রসব করে থাকে (In the history of midwifery, the fact of an instinctive admission by the women, the most comfortable for them, so-called vertical positions during childbirth, which include standing, kneeling, sitting or squatting, is commonly known and confirmed. Numerous ancient paintings found on the walls of caves or grottos show women giving birth in a vertical position. Some of them depict women sitting, leaning back against the wall, with her legs which are spread wide, or women who are standing and holding on, for example, a tree. Modrzejewska et al: 2019)। সবচেয়ে বড়ো কথা হল এই যে এমন প্রসব ভঙ্গির ব্যবহার নেপালে পরম্পরাগত প্রসবে ৩৮.৯% ক্ষেত্রে আজও ঘটে থাকে (Desseauve et al: 2019)।

তাহলে আমরা দেখলাম যে মায়াদেবীর দণ্ডায়মান ভঙ্গীতে প্রসব খুবই স্বাভাবিক ছিল, বিশেষত যখন তাঁর প্রসবকালীন বয়স বেশি (১ নং তথ্য) এবং হয়তো পুষ্টিজনিত সমস্যা ছিল (২ নং তথ্য)। মায়াদেবীর প্রসব যে অত্যন্ত সংকটপূর্ণ ছিল তা প্রসবের সময়ে মায়াদেবী হাই তুলছিলেন বলে উল্লেখ (মহাবস্তু অবদান দ্বিতীয় খণ্ড, ১১.২১৭, ললিতবিস্তর ৭.২২) করা দেখে বোঝা যায়। এইক্ষেত্রে আমার মনে হয় যে লুম্বিনীর বৈদ্য ও ধাত্রীদের নির্দেশেই মায়াদেবী জৃম্ভা ত্যাগ করছিলেন বা হাই তুলছিলেন কারণ চরক সংহিতায় উল্লেখ করা আছে যে-

সা চেদাবীভিঃ সংক্লিশ্যমানা ন প্রজায়েতাথৈনাং ক্রয়াৎ উত্তিষ্ঠ মুষলমন্যতরঞ্চ গৃহ্লীষানেনৈতদুলূখলং ধান্যপূর্ণং মুহূরভিজাহ মুহূর্মুহুরবস্ব চংক্রমস্ব চান্তরান্তরা ইত্যেবমুপদিশন্ত্যেকে।

– চরক সংহিতা, শারীর স্থানম, ৮.৩৭

গর্ভিণী যদি প্রসববেদনায় অত্যন্ত কাতর হয় এবং প্রসব না হয়, তাহা হইলে তাহাকে বলিবে; -উঠ, মুষলদ্বয়ের মধ্যে কোনো একটি মুষল গ্রহণ কর এবং ঐ মুষল দ্বারা ধান্যপূর্ণ উদ্খলে বারংবার আঘাত কর, মুহূর্মুহঃ জৃম্ভাত্যাগের ন্যায় হস্তাদি প্রসারণ কর, ও মধ্যে মধ্যে ইতস্ততঃ ভ্রমণ কর। এইরূপ কেহ কেহ উপদেশ দিয়া থাকেন।

অর্থাৎ মায়াদেবীর প্রসব বেদনা বেশি ছিল এবং প্রসবে অসুবিধা হচ্ছিল- তাই লুম্বিনীর বৈদ্য(দের)নির্দেশে তাঁকে চলাফেরা করাতে পুষ্করিণী থেকে ২০/২৫ পদক্ষেপ চলতে হয়েছিল(৭ নং তথ্য)। লুম্বিনীতে মায়াদেবীর কার্যকলাপ দেখে মনে হয় যে তাঁর সংকটপূর্ণ প্রসবের চিকিৎসার জন্যে বৈদ্যরা যথাসম্ভব চেষ্টা করেছিলেন। প্রসবে সঙ্কট মায়াদেবীর মৃত্যুর সঙ্গেও কিছুটা জড়িত থাকলেও থাকতে পারে যদিও আমার মনে হয় যে মায়াদেবীর মৃত্যুর মূল কারণ জড়িয়ে আছে গর্ভমল না বেরনোর তথ্যের (১৫ নং) সঙ্গে। প্রসবের পর মায়ের শরীর থেকে অপরা (placenta) বেরিয়ে আসে যাকে প্রসবের তৃতীয় দশা বলা হয়ে থাকে কিন্তু যদি এই অপরা জরায়ু থেকে না নির্গত হয় তাহলে মায়ের জীবন বিপন্ন হয়। আমরা সমস্ত বৌদ্ধ গ্রন্থে দেখেছি যে সিদ্ধার্থের জন্মের সময়ে কোনো গর্ভমল নির্গত হয়নি আর এখানেই সন্দেহ তৈরি হয় যে গর্ভমল বলতে হয়তো এখানে অপরার কথা বলা হয়েছে এবং তার ফলে মায়াদেবী সাত দিন অসুস্থ ছিলেন ও শেষে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। দুঃখের বিষয় এই যে মায়াদেবীর অসুস্থতার কোনো লক্ষণ নথিভুক্ত নেই… বিশেষত তাঁর রক্তক্ষরণের কথা… তাই চেষ্টা করা যাক যে অন্যান্য কোনো সূত্র থেকে জানতে পারা যায় কি না সেই সময়ে তাঁকে কী ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল।

শুশ্রুত সংহিতায় ‘শারীর স্থানম’ পর্বের দশম অধ্যায়ের সপ্তদশতম শ্লোকে বলা হচ্ছে যে অপরা যদি প্রসবের সময়ে না নির্গত হয় তাহলে কটুকা, অলদভু, এবং কৃতবেধনা সরিষার তেলের সঙ্গে মিশিয়ে প্রলেপ দিতে এর সঙ্গে আরও অনেক জড়িবুটি বেটে হাতে পায়ে লাগাতে হবে। আর সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক পদ্ধতি হল – একটি সাপের চামড়া পুড়িয়ে তাঁর ধোঁয়া দিতে হবে। এই ক্ষেত্রে ধোঁয়া দিয়ে চিকিৎসার বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ, 
যাকে আয়ুর্বেদে ‘ধুপনকর্ম’ বলা হয়। আমিও ব্যক্তিগত ভাবে আয়ুর্বেদ চিকিৎসকদের সঙ্গে আলোচনা করে দেখেছি যে এই ধরনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন জড়িবুটির ধোঁয়া যোনিদেশে দেওয়া নিয়ম, একে “যোনি ধূপন” বলা হয়ে থাকে (Anita et al: 2020)। এই বিষয়ে চরক আরও বিস্তারিত বলেছেন-

যদা চ প্রজাতা স্যাৎ তদৈনামবেখেত কাচিদস্যা অপরা প্রপন্না বা প্রপন্নানেতি। তম্যাশ্চেদমরা ন প্রপন্না স্যাদথেনামন্যতমা স্ত্রী দক্ষিণেন পাণিনা নাভেরুপরিষ্টাদ্বলবন্ নিপীড্য সব্যেন পাণিনা পৃষ্ঠত উপসংগৃহ্য তাং সুনির্দ্ধতং নির্দ্ধ মুয়াৎ। অথাস্যাঃ পাঞ্চ্যা শ্রোণীমাকোটয়েদস্যাঃ স্ফিচাৰূপসংগৃহ্য সুপীড়িতং পীড়য়েৎ। অথাস্যা বালবেণ্যা কণ্ঠতালু পরিমৃশেৎ। ভূর্জ্জপত্রকাচমণিসর্প নির্মোকৈশ্চাস্যা যোনিং ধূপয়েৎ। কুষ্ঠ তালাশকল্কং বল্বজযুষে মৈরেয়সুরামণ্ডে বা কৌলখে বা মণ্ডুকপণীপিপ্পলীকাথে বা সংপ্লাব্য তথা পায়য়েদেনাম্।

– চরক সংহিতা, শারীর স্থানম, ৮.৪১

প্রসব করার পরে গর্ভিণীকে বিশেষরূণে পর্যবেক্ষণ করিবে। তাহার অপরা (ফুল) পতিত হইয়াছে কি না হইয়াছে কোনো স্ত্রীলোক তাহা লক্ষ্য করিবে। যদি তাহার অপরা পতিত না হয়, তবে একজন স্ত্রীলোক দক্ষিণ হস্তদ্বারা গর্ভিণীর নাভির উপরিভাগে সবলে চাপিয়া চাপিয়া ধরিবে, এবং বাম হস্তদ্বারা তাহার পৃষ্ঠদেশ ধরিয়া বিশেষরূপে কাঁপাইবে। পাঞ্চি দ্বারা তাহার শ্রোণীফলক কুট্টিত করিবে অর্থাৎ নিতম্বের উপরিভাগে বারংবার গোড়ালির আঘাত করিবে, এবং নিতম্বন্বয় চাপিয়া ধরিয়া পীড়ন করিবে। তাহার কণ্ঠ ও তালুদেশে তাহার কেশবেণী প্রবেশ করাইয়া দিবে। অর্থাৎ কণ্ঠ ও তালুর মধ্যে কেশ ঘর্ষণ করাইয়া বমনবেগ উৎপাদন করিবে। ভূর্জপত্র, কাচ ও সাপের খোলস দ্বারা তাহার যোনিতে ধূপ (ধোঁয়া) প্রদান করিবে। কুড় ও ভালীশপত্রের কল্ক, উলুঘাসের কাখের সহিত, অথবা মৈরেয় মন্ড বা সুরামণ্ডের সহিত, কিংবা কুলখযুষের সহিত, অথবা খুলকুড়ী ও পিপুলের ক্বাথের সহিত মিশ্রিত করিয়া, তাহাকে পান করাইবে।

চরকের বিধান মতে অপরা না নির্গত হলে ধাত্রীকে হাত দিয়ে মায়ের নাভির ওপরে এবং বাম হাত দিয়ে মায়ের পিঠে চাপ দিতে বা ডলতে বলা হয়েছে। পাঠককে অনুরোধ করব যে আগে দেওয়া লুম্বিনী থেকে পাওয়া সিদ্ধার্থের জন্ম দৃশ্যের যে ভাস্কর্যটির ছবি আরেকবার দেখতে। সেখানে মায়াদেবীর পাশে থাকা ধাত্রী বা তাঁর বোন ঠিক সেই কাজগুলিই করে যাচ্ছিলেন। বৌদ্ধ গ্রন্থগুলিতে সিদ্ধার্থ ও মায়াদেবীকে বিভিন্ন ধরনের অনুলেপ লাগানো যে হয়েছিল সে নিয়ে বলা আছে কিন্তু আমার মনে হয়েছে যে স্বাভাবিক প্রসবের ক্ষেত্রেও তাই হয়ে থাকে আর সেই কারণে আমি সেই তথ্যগুলিকে অগ্রাহ্য করেছি। কিন্তু অপরা নির্গত না হওয়ার জন্যে চরক এবং সুশ্রুত উভয়েই বলেছেন যে সাপের চামড়ার ধোঁয়া বা ধূপ দিতে হবে এবং আমাদের কাছে সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। আর অবাক করার মতো বিষয় হল যে একদম সেই পদ্ধতির মতোই সিদ্ধার্থের প্রসবের সময়ে ধোঁয়া দেওয়া হয়েছিল

দীর্ঘকাল উদগ্রাশ্চ সুরমুরয়াগ্রধূপন

প্রমুচিপু বিভপার্থ তস্য উত্তমবুদ্ধিন

– মহাবস্তু অবদান, ১১.২১৬.৯

সেই উত্তমবুদ্ধি (বোধিসত্ত্ব) বিভূষার্থ বা শোভার্থ উদগ্র বা আনন্দচিত্তে সুরমুখ্যগণ দীর্ঘকাল ব্যাপিয়া শ্রেষ্ঠ ধূপন প্রমোচন করিতে লাগিলেন।

মনে রাখতে হবে যে সিদ্ধার্থ বুদ্ধদেব হওয়ার অনেক পর এই গ্রন্থগুলি লেখা হয়েছিল এবং তাই সব কিছুতেই এক দৈব বা ঐশ্বরিক পরিবেশ আনার চেষ্টা হয়ে থাকবেই। তবে গর্ভমল নির্গত না হওয়ার বিষয় (১৫ নং তথ্য) এবং প্রসবের পর মায়াদেবীর সাত দিন ধরে অসুস্থ থাকা ও মৃত্যুর ঘটনা (১৭ ও ১৮ নং তথ্য) সমস্ত গ্রন্থেই উল্লিখিত আছে। কিংবদন্তী থেকে বীজটি বার করে নিলে তা বুঝিয়ে দেয় যে অপরা জরায়ুতে থেকে যাওয়ার ফলেই (Retained placenta after vaginal delivery) মায়াদেবীর মৃত্যু হয়েছিল।

জন্মের পর পরই সিদ্ধার্থের সাত পা হেঁটে যাওয়া (১২ নং তথ্য) যে সম্পূর্ণ অবাস্তব তাই নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই কিন্তু আমার মনে হয়েছে যে একটি বিশেষ কারণবশত হয়তো এই কিংবদন্তির জন্ম হয়েছিল। সিদ্ধার্থ হয়তো উল্টোভাবে জন্মগ্রহণ করেছিলেন যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে breech delivery বলে থাকে। সেক্ষেত্রে সিদ্ধার্থের পা প্রথমে মাটিতে পড়েছিল এবং যেহেতু মায়াদেবী দণ্ডায়মান ছিলেন তাই সিদ্ধার্থ যেন দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় জন্ম নিয়েছিলেন মনে হতেই পারে আর এই থেকেই এমন কিংবদন্তির সৃষ্টি হওয়া অসম্ভব কিছু নয়।

সিদ্ধার্থের জন্ম-সংক্রান্ত আলোচনা শেষের পথে। আমরা দেখলাম যে সিদ্ধার্থের জন্মের মধ্যে যে অতিলৌকিকতার উপাদান এসে সমগ্র বিষয়টিকে এবং একই সঙ্গে মানুষটির অস্তিত্ত্বকে যে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেয় তার আদৌ কোনো ভিত্তি নেই। কিংবদন্তিগুলির আবরণ ছাড়িয়ে ফেললে দেখা যায় যে মায়াদেবীর প্রসব সংকটজনক ছিল আর তাই তাঁকে লুম্বিনীতে বৈদ্যদের কাছে যেতে হয়েছিল। প্রসবের পর মৃত্যু অবধি সদ্যোজাত সিদ্ধার্থকে নিয়ে মায়াদেবীর লুম্বিনী অবস্থান করেছিলেন আর এতে প্রমাণ হয় যে লুম্বিনীতে থাকার মতো আয়োজন (বৈদ্যাগার ও সূতিকাগার) ছিল এবং সঠিক চিকিৎসা পাবেন বলেই সেখানে মায়াদেবীকে রাখা হয়েছিল। নয়তো তাঁকে কপিলাবস্তু নিয়ে আসা হত।

গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে প্রসবের সময়ে দুই নাগ তাঁকে বারিধারা দিয়েছিলেন (১৩ নং তথ্য)। নাগবংশীয়রা এক নির্দিষ্ট জনজাতি; শাক্যদের রাজ্যে তাঁদের উপস্থিতি ছিল। আমরা পরে দেখব যে শাক্য অভিজাত মহানামের ঔরসে নাগবংশীয় কন্যার গর্ভে যে পুত্র সন্তানের জন্ম হয়েছিল সে শাক্যবংশ ধ্বংস করেছিল। আবার মহানামকে নাগবংশীয়রাই মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছিল। রামগ্রামের মল্লদের নাগবংশীয় রাজা বলা হয়েছে। সুতরাং লুম্বিনীর বৈদ্যরা নাগবংশীয় হলেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।

লুম্বিনীর ভাস্কর্যে যে দুইজন পুরুষকে দেখা যাচ্ছে তাঁদের ইন্দ্র ও ব্রহ্মা বলে উল্লেখ করা হয়েছে বৌদ্ধ গ্রন্থে (১৪ নং তথ্য)। এখানে সুস্পষ্টভাবে বৈদিক উপাদান প্রবেশ করানো হয়েছে এবং বুদ্ধদেবের মাহাত্ম্য বোঝাতে দুই মহান বৈদিক দেবতা ইন্দ্র ও ব্রহ্মার আগমন করাতে হয়েছে কিন্তু তা যে প্রক্ষিপ্ত সেটা দেবতাদের চরিত্র বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়। প্রসব ও সদ্যোজাত শিশুর দেবতা হিসেবে পূষণের নাম অথর্ববেদে উল্লিখিত আছে। পূষণের এই ভুমিকায় আসার দুটি অর্থ হতে পারে। এক, পূষণ ছিলেন পুষ্টির দেবতা। দুই, পূষণ আবার পথের দেবতা বা পথপ্রদর্শক। সুতরাং শিশুর পুষ্টি কামনা করে, এবং মাতৃগর্ভ থেকে পৃথিবীতে নিরাপদ যাত্রার জন্য, প্রতীকীভাবে, পূষণকে আহ্বান করা হত। প্রকৃতপক্ষে বৈদিক দেবতাকে সিদ্ধার্থের প্রসবের সময়ে দেখাতে হলে পূষণের সঙ্গে  সূষাদেবীকে দেখানো যেত কারণ সদ্যোজাত শিশুকে আবরণ থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য দেবী সূষার প্রার্থনা করা হত। আমার এই প্রসঙ্গ উত্থাপনের উদ্দেশ্য হল বৈদিক দেবতাদের উল্লেখ এখানে মোটেই শাস্ত্র অনুযায়ী নয় তা বোঝাতে
, অর্থাৎ এই দুইজন পুরুষ দেবতার অপেক্ষা দুইজনের পরিচয় প্রসূতি সংক্রান্ত বৈদ্য হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

বষটতে পূষন্নস্মিনৎসুতাবর্যমা হোতা কৃণোতু বেধাঃ

সিস্রতাং নার্যৃত প্রজাতা বি পর্বাণি জিহতাং সূতবা উ॥

চতস্রো দিবঃ প্রদিশশ্চতস্রো ভূম্যা উত।

দেবো গর্ভং সমৈরয়ন্ তং ব্যূর্ণুবন্তু সূতবে॥

সূষা ব্যুর্ণেতু বি যোনিং হাপয়ামসি

শ্রথয়া সূষনে ত্বমব ত্বং বিষ্ফলে সৃজ॥

– অথর্ব বেদ ১.১১.১-৩

প্রাণীসকলের পোষণকারী পুষাদেব, দেবগণের আহ্বাতা এই উপাসক, অর্যমা (প্রাণীগণের প্রেরক দেব) ও বিধাতার (জগতের নির্মাতার) সঙ্গে একচিত্ত হয়ে এ জগতের পুনর্জন্ম নিবৃত্তি বিষয়ে কল্যাণপ্রদ বষটমন্ত্র উচ্চারণের দ্বারা তোমার উদ্দেশে ভক্তিরূপ হবি অর্পণ করছে। গর্ভিণী নারী যেমন সন্তানবতী হয়ে প্রসবজনিত ক্লেশ থেকে বিমুক্ত হয়, সেরূপ আপনার কৃপায় সকলে মায়ামোহরূপ বন্ধন থেকে মুক্তি লাভ করুক। ১৷ দ্যুলোক ও ভূলোকের চার দিক ও চার বিদিকের দেবগণ জন্মগ্রহণের মূলে গর্ভকে সংযত করুক, তারা পুনর্জন্ম নিবৃত্তি বিষয়ে জীবকে মুক্ত করুক। (বিভিন্ন দিকে অবস্থিত দেবগণ মুক্তিমার্গের সহায় হোক, তারা আমাদের জন্মগতি রোধ করে দিক।)। ২। জ্ঞানদাত্রী (সূস্থা) দেবতা অজ্ঞানাবরণ অপসারণ করুক। হে দেবতে, তুমি আমার উৎপত্তি- মূলকে বিমুক্ত কর অর্থাৎ আমার কর্ম দ্বারা আমার উৎপত্তিমূল যেন আর দৃষ্ট না হয়। হে উদ্ধারকারিণি দেবতে, তুমি আমার বন্ধন সকলকে মুক্ত কর। হে কালরূপিণি দেবতে (বিষ্কৃলে), তুমি আমাকে তোমাতে লীন কর অর্থাৎ আমি যেন তোমার সঙ্গে মিলিত হই। ৩॥

কুয়াশার আবরণ সরিয়ে আমরা এখন বলতে পারি যে সিদ্ধার্থের জাতি, কূল নিয়ে কোনো সংশয় নেই। আমরা সঠিক ভাবে তাঁর জাতি, গোত্র, বর্ণ ইত্যাদি নির্ধারণ করতে পেরেছি। আবার তাঁর জন্ম নিয়ে যে রহস্য ঘনীভূত ছিল তার সমাধানও হয়েছে। আমরা এখন জানি যে একজন নির্দিষ্ট মানুষের জন্ম লুম্বিনীর একটি গাছের তলায় খুব কঠিন পরিস্থিতিতে হয়েছিল এবং তার সাত দিন বাদেই তিনি মাতৃহারা হয়েছিলেন। এবারে আমাদের লক্ষ্য হবে যে লুম্বিনীতে এই বর্ণনা মত স্থানগুলি দেখতে পাওয়া যায় কিনা আর প্রত্নতত্ত্ব কী বলছে, অর্থাৎ সিদ্ধার্থের জন্মের কোনো পাথুরে প্রমাণ খননে পাওয়া গেছে কিনা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *