শাক্য রাজবংশের উদ্ভব ও সিদ্ধার্থের বংশ পরিচয়
লুম্বিনীতে সিদ্ধার্থের জন্ম নিয়ে আমরা এতক্ষণে যে তথ্যগুলি পড়লাম সেগুলি সবই বৌদ্ধ সাহিত্য অবলম্বনে গঠিত। বুদ্ধদেবের মৃত্যুর কয়েক শতাব্দী বাদে এগুলি লিপিবদ্ধ করা শুরু হয়েছিল আর তাই বিভিন্ন কিংবদন্তি এর মধ্যে প্রবেশ করেছে। এছাড়া তীর্থযাত্রা করার পর লুম্বিনীর বৃত্তান্ত লিখে রাখা চীনা পরিব্রাজকদের গ্রন্থে আরও কিছু বাড়তি তথ্য পাওয়া যায়। যেগুলি থেকে পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় যে তাঁরা সেই স্থানে বৌদ্ধ শ্রমণ, স্থানীয় অধিবাসী বা তাঁদের পথপ্রদর্শকদের কাছ থেকে শুনেছিলেন। আমরা সংক্ষিপ্ত আকারে সেগুলিও একটু জেনে নিই।
এখনও পর্যন্ত যা জানা গেছে তা হল, চীনের চিন সাম্রাজ্যের (২৬৫ – ৪২০ সাধারণ অব্দ) জি সেংজাই (সেং ত্সাই) [Zhi Sengzai (Seng Tsai)] প্রথম চীনা পরিব্রাজক যিনি ৩৫০-৩৭৫ সাধারণ অব্দ নাগাদ লুম্বিনী ভ্রমণ করেছিলেন। শুই-চিং-চু (শুইজিং-জু) [Shui-Ching-Chu (Shuijing-zhu)] তাঁর বর্ণনায় জি সেংজাইর লুম্বিনী ভ্রমণ নিয়ে বলেছেন যে সিদ্ধার্থের জন্ম হওয়ার পর পরই নাগদের দুই রাজা তাঁর কাছে এসে একজম বামদিকে এবং অন্যজন ডানদিকে দাঁড়িয়ে তাঁকে বারিধারা দিয়ে তাকে স্নান করিয়েছিলেন। একজন নাগরাজা ঠান্ডা জল এবং অপরজন উষ্ণ জল ঢেলেছিলেন আর তাই সেখানে তখনও দুইটি পুষ্করিণী দেখা যেত যার একটির জল ঠান্ডা ও আরেকটির জল গরম।
শুই-চিং-চু-এর বিবরণে মায়াদেবী যে বৃক্ষটির নীচে দাঁড়িয়ে প্রসব করেছিলেন সেটি ছিল একটি অশোক বৃক্ষ। আরও বলা হয়েছে যে, যখন পুরোনো গাছটি মৃত্যুর দিকে যাওয়ার পর বৌদ্ধ শ্রমণরা তার থেকে শাখা নিয়ে সেটিকে রোপণ করে নতুন গাছের জন্ম দিতেন। তাঁর ভ্রমণ অবধি এমনভাবে নতুন বৃক্ষ রোপণ অনেকবার করা হয়েছিল আর তার ফলেই বৃক্ষটিকে তখনও দেখা যেত (Petech, 1950, p. 35-36)। এখানে আমরা দেখলাম যে বৃক্ষের চরিত্র বদলে গেল, প্রচলিত শাল বৃক্ষের জায়গায় তিনি অশোক বৃক্ষ দেখেছিলেন। জন্মের পর সিদ্ধার্থকে স্নান করানো হয়েছিল যেখানে তিনি দুইখানি পুষ্করিণী দেখেছিলেন।
ফা-হিয়েন ৩৯৯ থেকে ৪১২ সাধারণ অব্দে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ভ্রমণ করেছিলেন যার মধ্যে দশ বছর খালি ভারতেই ছিলেন। ভারত ভ্রমণের সময় তিনি লুম্বিনী পরিদর্শন করেছিলেন আর সেখান থেকে বুদ্ধের জন্ম সংক্রান্ত যে কাহিনি শুনেছিলেন। সেই কাহিনির যে বর্ণনা তিনি দিচ্ছেন তাতে বলছেন যে
, “লুম্বিনী নামক উদ্যানে রাজ্ঞী পুষ্করিণীতে অবগাহন করিয়াছিলেন। পুষ্করিণীর উত্তর দিক দিয়া রাজমাতা নির্গতা হইয়া কুড়ি পদ অগ্রসরান্তে, তিনি তাঁহার হস্তোত্তোলন পূর্বক বৃক্ষের শাখা ধারণ করিয়া ও পূর্বাভিমুখী হইয়া যুবরাজকে প্রসব করেন। কুমার ভূমিষ্ঠ হইবামাত্র, রাজমাতা সাতপদ অগ্রসর হয়েন। দুই জন দৈত্যরাজ (নাগ) তাঁহার গাত্র ধৌত করেন। যে স্থানে তাঁহারা তাঁহার গাত্র ধৌত করেন, সেই মুহূর্তে সেই স্থান কূপে পরিণত হয়।” (সমাদ্দার: ২০২৪: ১০৩)
তাহলে ফা-হিয়েনের দেখা লুম্বিনীতে বুদ্ধের জন্ম হয়েছিল যেখানে তার কুড়ি পদক্ষেপ দূরে ছিল একটি পুষ্করিণী আর কাছেই একটি কূপ ছিল। প্রসবের পূর্বে মায়াদেবী পুষ্করিণীতে স্নান করেছিলেন আর জন্মের পর সিদ্ধার্থকে কূপের জলে স্নান করানো হয়েছিল। লুম্বিনীতে কূপের নিদর্শনও পাওয়া গেছে।
আরেক নামকরা পরিব্রাজক হলেন হিউয়েন সাঙ। ৬৩০ সাধারণ অব্দে তিনি ভারতে এসে প্রায় পনেরো বছর ভ্রমণ, পড়াশোনা ইত্যাদি সেরে দেশে ফিরে গিয়েছিলেন। তাঁর ভ্রমণ বৃত্তান্ত তৎকালীন ভারতকে জানার জন্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তিনিও লুম্বিনী গিয়েছিলেন এবং তাঁর শোনা সিদ্ধার্থের জন্মের বর্ণনা হল, “শাক্যদের স্নানের পুষ্করিণী এই উদ্যানে অবস্থিত…ইহার ২৪/২৫ পদ দূরে একটি মৃত অশোক বৃক্ষ। এইস্থানে বৈশাখ মাসের দ্বিতীয়পক্ষের অষ্টম দিবসে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। স্থবির সম্প্রদায় বলেন যে বৈশাখ মাসের দ্বিতীয়পক্ষের পঞ্চদশ দিবসে বোধিসত্ত্ব জন্মগ্রহণ করেন। এই স্থান হইতে পূর্ব দিকে যে স্থানে দৈত্যগণ (নাগ) রাজপুত্রের শরীর ধৌত করিয়াছিলেন, তথায় রাজা অশোক নির্মিত স্তূপ আছে। বোধিসত্ত্ব জন্মগ্রহণ করিয়া বিনাসাহায্যে পৃথিবীর চতুর্দিকেই সপ্তপদ করিয়া অগ্রসর হইয়া বলিয়াছিলেন স্বর্গ ও পৃথিবীর আমিই একমাত্র প্রভু; আমি আর পুনর্জন্ম গ্রহণ করিব না।
যে যে স্থানে তাঁহার পদদ্বয় ভূমি স্পর্শ করিয়াছিল, সেই সকল স্থানেই পদ্ম, পুষ্প প্রস্ফুটিত হইয়াছিল। অধিকন্তু দুইজন দৈত্য (নাগ) আকাশে থাকিয়া একজন উষ্ণ ও শীতল জলে রাজপুত্রকে ধৌত করিয়াছিল। …বোধিসত্ত্ব যখন মাতার দক্ষিণ কুক্ষি হইতে জন্মগ্রহণ করেন তখন স্বর্গীয় দেবচতুষ্টয় তাঁকে সুবর্ণখচিত কার্পাস বস্ত্রে আবৃত করিয়া সুবর্ণসিংহাসনোপরি স্থাপন করিয়া, তাঁহার মাতার নিকট আনয়ন করিয়া বলিলেন, এই প্রকার সর্বগুণান্বিত পুত্রের জন্মে রানি অবশ্যই আহ্লাদিত হইতে পারেন” (সমাদ্দার, ২০২১: ১১০-১১১)।
হিউয়েন সাঙের বর্ণনার সঙ্গে শুই-চিং-চু-এর একটি তথ্যের বেশ মিল আছে। উভয়েই লুম্বিনীতে গিয়ে একটি অশোক বৃক্ষ দেখেছিলেন যার নীচে সিদ্ধার্থের জন্ম হয়েছিল। তিনজন পরিব্রাজকই বলেছেন যে সিদ্ধার্থের জন্মের পর তাঁকে স্নান করানো হয়েছিল একটি পুষ্করিণীর জল দিয়ে যার অবস্থান ছিল জন্মস্থানের বৃক্ষ থেকে প্রায় ২০ থেকে ২৫ পদক্ষেপের মতো অর্থাৎ দুটি স্থানের মধ্যে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ ফুট দূরত্ব হবে। মায়াদেবী পূর্ব দিকে মুখ করে প্রসব করেছিলেন এবং সিদ্ধার্থ তাঁর ডান দিক হতে ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন। জন্মের মুহূর্তে দেবতাগণের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করেছেন আর বুদ্ধের জন্মের দিনটি নিয়ে মতান্তরেরও প্রসঙ্গ এসেছে। সিদ্ধার্থকে নিয়ে এইসব কিংবদন্তি নিয়ে এবারে একে একে আমরা একটু বিস্তারিত আলোচনায় যেতে পারি।
সিদ্ধার্থের জন্ম যে কোন কূলে হয়েছিল সেই নিয়ে একটি বিভ্রান্তি আছে। ধর্মানন্দ কোসম্বী এই নিয়ে আলোচনা করেছিলেন (কোসম্বী: ১৯৮০, ৮০) কিন্তু তিনি কোনো সমাধানে পৌঁছাতে পারেননি। আমরা এই নিয়েও আলোচনা করব আর তার জন্যে প্রথমে আসব তাঁর নাম সংক্রান্ত যে জটিল ধারণা আছে তাই নিয়ে। অমরকোষে বোধিসত্ত্বের নাম প্রসঙ্গে বলে হয়েছে যে
স শাক্যসিংহঃ সর্বার্থসিদ্ধঃ শৌদ্ধোদনিশ্চ সঃ।
গৌতমশ্চার্কবন্ধুশ্চ মায়াদেবীসুতশ্চ সঃ॥
– স্বর্গবর্গ, ৭
সুতরাং অমরকোষে বুদ্ধের মোট ছয়টি নাম পাওয়া গেল। এই ছয় নামের মধ্যে তিনটি নাম হল ‘শাক্যসিংহ’, ‘শৌদ্ধোদনি’ ও ‘মায়াদেবীসুত’ যা তাঁর গোষ্ঠী (শাক্য), পিতা (শুদ্ধোদনের অপত্য) ও মায়ের (মায়াদেবীর পুত্র) সঙ্গে জড়িত। কোসম্বীর মতে ‘অর্কবন্ধু’ নামটি হল বোধিসত্ত্বের গোত্রের নাম। তাহলে বাকি দুটি নাম অর্থাৎ ‘সর্বার্থসিদ্ধ’ ও ‘গৌতম’-এর মধ্যে তাঁর প্রকৃত নাম কোনোটা ছিল তাই নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। ললিতবিস্তরে এক স্থানে বলা আছে যে
তত রাজ্ঞঃ শুদ্ধোদনস্য এতদভূত – কিমহং কুমারস্য নামধেয়ং করিষ্যামীতি / ততোঽস্যেতদভূত – এস্য হি জাতমাত্রেণ মম সর্বার্থাঃ সংসিদ্ধাঃ / যন্ন্বহমস্য সর্বার্থসিদ্ধ ইতি নাম কুর্যাম / তত রাজা বোধিসত্ত্বং মহতা সত্কারেণ সত্কৃত্য সর্বার্থসিদ্ধোঽয়ং কুমারো নাম্না ভবতু ইতি নামাস্যাকার্ষীৎ।
– ললিতবিস্তর ৭.৪৫
তারপর রাজা শুদ্ধোদনের (মনে) এইরূপ (ভাব) হইল – ‘আমি কুমারের কী নাম করিব (দিব)? তারপর তাঁহার এইরূপ (মনে) হইল – “এই বালকটি জন্মানমাত্রই আমার সর্ব প্রয়োজন (অর্থ) সিদ্ধ হইয়াছে- ইহাতে আমি ইহার সর্বার্থসিদ্ধ এই নাম করিতে পারি।” তারপর রাজা শুদ্ধোদন বোধিসত্ত্বকে অনেক আদর করিয়া “এই কুমার সর্বার্থসিদ্ধ নামে খ্যাত হউক” – (এইরূপ বলিয়া) তাহার নামকরণ করিলেন।
তাহলে দেখা যাচ্ছে যে বোধিসত্ত্বকে প্রথমে ‘সর্বার্থসিদ্ধ’ নাম দেওয়া হয়েছিল। যদিও পরে সিদ্ধার্থ নামেই তিনি সবসময় উল্লিখিত হয়েছেন, এমনকি ললিতবিস্তরেও। আবার আরেক প্রাচীন গ্রন্থ মহাবস্তু অপাদানে বোধিসত্ত্বের প্রথম নাম হিসেবে ‘দীপঙ্কর’ বলা হয়েছে।
“তে দানি ব্রাহ্মণা রাজ্ঞার্চিমেন উচ্যন্তি। ইয়ং কুমারস্য নামং অনুরূপং তং করোথ। তে ব্রাহ্মণা আহনসু। মহারাজ কুমারে জায়মানে দীপো প্রাদুর্ভূতো মহাং ওভাসো তস্মাত্ কুমারো দীপংকরো নাম ভবতু। এবং কুমারস্য শুদ্ধাবাসেহি দেবেহি ব্রাহ্মণবেশং নির্মিণিত্বা দীপকরো তি নাম কৃতং।”
– মহাবস্তু অপাদান ১১.২২৭
এখন সেই ব্রাহ্মণেরা রাজা অর্চিমৎ কর্তৃক অভিহিত হইলেন, “কুমারের যে নাম অনুরূপ হয় আপনারা সেই নাম তাহার রাখুন।” সেই ব্রাহ্মণেরা বলিলেন,“হে মহারাজ! কুমার জন্মগ্রহণ করিলে পর, একটি মহান অবভাস (জ্যোতিঃ) স্বরূপ দীপ (আলো–মতান্তরে ‘দ্বীপ’) আবির্ভূত হইয়াছে – অতএব, কুমার দীপংকর – নামযুক্ত হউক।” এইভাবে ব্রাহ্মণবেশ সৃষ্টি করিয়া তৎপরিহিত শুদ্ধাবাস নামক দেবেরা দীপংকর বলিয়া কুমারের নাম রাখিলেন।
তাহলে দেখা যাচ্ছে যে বোধিসত্ত্বের বিভিন্ন নাম রাখা হয়েছিল যার মধ্যে সর্বার্থসিদ্ধ ও দীপঙ্করও ছিল কিন্তু ভবিষ্যতে সিদ্ধার্থ নামটিই সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়। বৌদ্ধ গ্রন্থসমূহে বিভিন্ন নাম ব্যবহার হলেও ধারাবাহিকভাবে সিদ্ধার্থ (সিদ্ধত্থ) নামটিরই ব্যবহার চোখে পড়ে। তবে সিদ্ধার্থের মতোই বোধিসত্ত্বের “গৌতম’ নামটিও বেশ প্রচলিত ছিল। থেরিগাথায় আমরা গৌতম নামেই যে বোধিসত্ত্ব জন্ম নিয়েছিলেন তার প্রমাণ পাচ্ছি।
বহুনং বত অত্থায় মায়া জনয়ি গোতমং।
ব্যাধিমরণতুন্নাং দুকখকখন্ধং ব্যপানুদি॥
গৌতম (গোতম)-কে জন্ম দিয়ে মায়া (দেবী) অনেকের কল্যাণের কারণ হয়েছেন। গৌতম অসুস্থতা এবং মৃত্যুতে নিমজ্জিত মানুষদের দুঃখের অবসান ঘটালেন।
এখানে আমার মনে হয় যে গৌতম তাঁর আর পাঁচটা নামের মতো নাম ছিল না। তবে তাঁর নাম আর গোত্র নিয়ে সংশয় তিনি নিজেই সৃষ্টি করে গিয়েছিলেন। যেমন ধরুন পব্বজ্জাসুত্তের কথা, তিনি ওখানে একবার বলেছেন যে তিনি শাক্যপুত্র গৌতম।
যেন আপনং নাম অঙ্গুত্তরাপাণং নিগমো তদবসরি, অস্সোসি খো কেণিও জটিলো সমণো খুলু ভো গোতমো সক্যপুত্তো সক্যকুলা পব্বজিতো অঙ্গুত্তরাপেসু চারিকং চরমানো মহতা ভিক্খুসঙ্ঘেন সদ্ধিং অড্ডহতে সেহি ভিক্খুসতেহি আপনং অনুপ্পত্তো।
– পবজ্জাসুত্ত, ৩.৭ সেলা সুত্তম
আবার আরেক স্থানে বলছেন যে তাঁর জাতি শাক্য ও গোত্র আদিত্য অর্থাৎ সূর্য।
উজুং জানপদো রাজা হিমাবন্তস্স পস্সতো,
ধনভিরিয়েন সম্পন্নো কোসালেসু নিকেতিনো।
আদিচ্চা নাম গোত্তেনা সাকিয়া নাম জাতিয়া,
তম্হা কুলা পব্বজিতোমহি রাজা ন কামে অভিপত্থয়ং
– পবজ্জাসুত্ত, ৩.১, ৪২৪-৪২৫
এখানে পরিষ্কারভাবে বোঝা যাচ্ছে যে সিদ্ধার্থের জাতি হল শাক্য এবং তাঁর গোত্র ছিল আদিত্য। আবার বুদ্ধদেবের প্রসঙ্গে বহু স্থানে ‘গোতমো গোত্তেন’ বা ‘গোতমো নাম গোত্তেন’ উল্লেখ করা হয়েছে যার অর্থ দাঁড়ায় যে সিদ্ধার্থের গোত্র ছিল গৌতম। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল মহাপদানসুত্ত, যেখানে (মহাপদানসুত্ত, ৫-১২) সাতটি বুদ্ধের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে সপ্তম হলেন সিদ্ধার্থ যার নাম ও গোত্র উভয়ই ‘গোতম’ বা গৌতম বলে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। পাঠকের সুবিধার জন্যে সেখানে উল্লিখিত সাত বুদ্ধের তথ্য দিলাম যেখানে সিদ্ধার্থের নাম ছাড়া বাকিদের তথ্য শুধুমাত্র সংস্কৃত রূপে দেওয়া হল।

বিষয়টি যা দাঁড়াল তা হল যে সিদ্ধার্থের জাতি বা কূল শাক্য হলেও তাঁর গোত্র ছিল গৌতম। শাক্যদের সঙ্গে পার্শ্ববর্তী কোলিয়দের আত্মীয়তা ছিল। শুদ্ধোদনের যেমন কোলিয় রাজবংশের সঙ্গে বিবাহ হয়েছিল তেমনই সিদ্ধার্থেরও বিবাহ হয়েছিল কোলিয় বংশে। আবার এই কোলিয়রাও ছিলেন গৌতম গোত্রের। শুদ্ধোদনের শ্বশুর বা কোলিয় রাজা অঞ্জনের দুই কন্যার কনিষ্ঠ জনের নাম ছিল মহাপ্রজাপতি। শুদ্ধোদনের সঙ্গে এঁরও বিবাহ হয়েছিল। মহাপ্রজাপতি নাম হলেও গৌতম গোত্র থেকে তাঁর নাম হয়েছিল গৌতমী এবং তিনি সেই নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন।
অনেকে বলেন যে মায়াদেবী মারা যাওয়ার পর গৌতমী সিদ্ধার্থকে পালন করেছিলেন বলেই সিদ্ধার্থকে গৌতম বলা হয়ে থাকে কিন্তু এই তথ্যের পিছনে কোনো যুক্তি নেই। গৌতমী নাম যে কারণে হয়েছে ঠিক সেই কারণেই সিদ্ধার্থের নাম গৌতম হওয়ার সম্ভাবনা অর্থাৎ দুজনেই গৌতম গোত্রের অন্তর্গত। আজও আমরা দেখা থাকি যে অনেকেই নামের শেষে পদবী হিসেবে গোত্রের নাম দেয় যেমন ভরদ্বাজ, বশিষ্ঠ ইত্যাদি। বুদ্ধদেবের সময়ে পদবীর চল ছিল না আর তাই গোত্রকে বা জাতিনামকে নাম হিসেবে ব্যবহার দেখা যায়। একই বিষয় পি সি মুখার্জিও লিখে গেছেন (These Sakyas were of the Kshattriya caste of the clan of Gautama; whence the Buddha is sometimes known as Gautama, vulgarised in Burmese as “Gaudama.” For the same reason, his step-mother, Prajapati, is also called Gautami. Mukherji: 1901, 6)।
সিদ্ধার্থের গৌতম নাম নিয়ে যে জটিলতা তার সমাধান হলেও সিদ্ধার্থের আদিত্য গোত্রের প্রসঙ্গ নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েই গেল। একটি মানুষের তো আর দুটি গোত্র হতে পারে না আর আমরা আগেই দেখছি যে বুদ্ধদেব যখন বিম্বিসারকে তাঁর পরিচয় দিয়েছিলেন সেখানে তিনি নিজেকে আদিত্য গোত্রের অন্তর্গত বলেছিলেন (আগে উল্লিখিত পবজ্জাসুত্ত)। অমরকোষেও (স্বর্গবর্গ, ৭) এই বিষয়টি টেনে এনেছে আর তাই সিদ্ধার্থের নাম হিসেবে ‘অর্কবন্ধু’ বা ‘সূর্যের মিত্র’ বলা হয়েছে। এই বিষয়টি পণ্ডিতদের মধ্যে বেশ খানিক বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে। স্বয়ং কোসম্বী বলেছেন যে, “একই কালে কাহারো আদিত্য এবং গোতম, এই দুইটি গোত্র থাকা সম্ভবপর বলিয়া মনে হয় না। যেহেতু বৌদ্ধ সাহিত্যে সুত্তনিপাত সর্বাপেক্ষা প্রাচীন গ্রন্থ, সেইজন্য শাক্যদের প্রকৃত গোত্র ‘আদিত্য’ বলিয়া মানা ঠিক হইবে। পূর্বে অমরকোষ হইতে যে শ্লোকটি উদ্ধৃত হইয়াছে, তাহাতে বুদ্ধের এক নাম অর্কবন্ধু, এইরূপ বলা হইয়াছে। ইহা তাঁহার গোত্রনাম বলিয়া বুঝা সমীচীন হইবে; কারণ এই ব্যাখ্যাই ‘আদিচ্চা নাম গোত্তেন’ এই বাক্যের সহিত সুন্দর মিলিয়া যায়।
“বোধিসত্ত্বের প্রকৃত নাম ছিল গোতম এবং বুদ্ধপদ লাভ করার পর তিনি এই নামেই বিখ্যাত হইয়াছিলেন। ‘সমণো খলু ভো গোতমো সক্যকুলাপব্বজিতো,’ এইরূপ উল্লেখ সুত্তপিটকের কত জায়গাতেই না রহিয়াছে।”
প্রাচীন গ্রন্থগুলিতে সিদ্ধার্থকে আদিত্য বা সূর্য গোত্রের বলা হয়েছে বলে কোসম্বী সিদ্ধান্ত্বে এসেছিলেন যে সিদ্ধার্থের প্রকৃত নাম ছিল গৌতম ও তাঁর গোত্র ছিল আদিত্য কিন্তু সিদ্ধার্থের প্রকৃত নাম যে অন্য ছিল এবং গৌতম যে তাঁর গোত্র নাম ছিল তা আমরা দেখেছি। এবারে আমরা আলোচনা করব আদিত্য বা সূর্যের সঙ্গে সিদ্ধার্থের সম্পর্ক নিয়ে। অমরকোষের ত্রিকাণ্ড–চিন্তামণি নামক টীকায় আগে উল্লিখিত স্বর্গবর্গের ৬ ও ৭ নং শ্লোকটির ব্যাখ্যায় এই রহস্যের সমাধান দেওয়া হয়েছে। ব্যাখ্যাটি এই প্রকার –
এতে সপ্ত শাক্যবংশাবতীর্ণে বুদ্ধমুনিবিশেষে। শাকেষু ভবো বিদ্যমানো বা দিগাদিত্বাৎ যৎ শাক্যম্পার্সো মুনিশ্চেতি সমাসঃ। ইক্ষ্বাকুকুলসম্ভবাঃ কেচন রাজপুত্রাঃ পিত্রা বনে বাসায়োপ- দিষ্টান্তে বনে কপিলমুনেরাশ্রমে শাকনামবৃক্ষেষু কৃতবসতয়ো গৌতম শিষ্যাঃ বহুবঃ। উক্তঞ্চ সৌন্দরনন্দচরিতে, “শাকবৃক্ষপ্রতিচ্ছত্রং বাসং যম্মাৎ প্রচক্রিরে। তম্মাদিক্ষাকুবংশ্যান্তে ভুবি শাক্যা ইতি শ্রুতাঃ।” শাক্যসিংহঃ শাক্যশ্রেষ্ঠ। … উক্তঞ্চ সৌন্দরনন্দচরিতে, “গুরুগোত্রাদতঃ ভবন্তি স্ম গৌতমা” ইতি অর্কোবন্ধুরস্য সূর্যবংশ্যত্বাৎ। মায়াদেবীনাম্নী মাতাস্য।
শাক্যদের মধ্যে বুদ্ধ বিশিষ্ট। শাক্য বংশের মধ্যে তাঁর প্রজ্ঞার কারণে এবং সর্বদিকে তাঁর নেতৃত্বের কারণে তিনি শাক্যমুনি নামে পরিচিত। ইক্ষ্বাকু বংশে জন্মগ্রহণকারী কিছু রাজপুত্র বনে বাস করতেন, এবং তাদের মধ্যে গৌতম, যিনি ন্যায়বৃক্ষের ছায়ায় ছিলেন, তাঁর শিষ্য ছিলেন, যাদের অনেকেই জ্ঞানী হয়েছিলেন। সৌন্দরনন্দ চরিত গ্রন্থে বলা হয়েছে, ‘শাক বৃক্ষের ছায়ায় এক ভিক্ষু বাস করে ধর্ম প্রচার করতেন। শোনা যায় সেই ইক্ষ্বাকু বংশের শাক্যদের মধ্যে শাক্যমুনি বুদ্ধ অগ্রগণ্য।’
সৌন্দরনন্দ চরিতে আরো বলা হয়েছে, ‘গুরুর বংশ থেকে, তিনি গৌতম নামে পরিচিত হয়েছিলেন। সূর্যের বংশ থেকে তিনি অর্কবন্ধু। তাঁর মা দেবী মায়া নামে পরিচিত ছিলেন।’
তাহলে দেখা গেল যে সিদ্ধার্থের গোত্র গৌতম হলেও শাক্য রাজবংশ ছিল ইক্ষ্বাকু রাজবংশের শাখা। ইক্ষ্বাকু রাজবংশ ছিল সূর্য বংশীয় আর সেই কারণে তিনি ছিলেন আদিত্য বা সূর্য বংশের সন্তান। এই জন্যেই তিনি বিভিন্ন স্থানে নিজেকে সূর্যবংশীয় বলে পরিচয় দিয়েছেন। ইক্ষ্বাকু বংশ ক্ষত্রিয়ের বংশ আর তাই সিদ্ধার্থ সেই বংশের সন্তান হয়ে ক্ষত্রিয়ই হয়েছেন। এছাড়া শাক্যরা বা সিদ্ধার্থ যে ক্ষত্রিয় ছিলেন তার উল্লেখ বহু জায়গায় আছে। মহাপরিনির্বাণ সূত্রে (ষষ্ঠ ভাণবার, ২৪ সূত্র) রয়েছে যে কুশিনগরে মল্লদের রাজ্যে বুদ্ধদেবের মৃত্যুর পর মগধরাজ অজাতশত্রু এবং লিচ্ছবি, শাক্য, বুলি ও কোলিয়রা তাঁর দেহাস্থি বা পার্থিব অবশেষের ভাগ দাবি করেছিলেন। এর পক্ষে তাঁদের যুক্তি ছিল, যেহেতু বুদ্ধদেব ক্ষত্রিয় তাই ক্ষত্রিয় হিসেবে তাঁদের এই ভাগ প্রাপ্য:
“মগধরাজ অজাতশত্রু বৈদেহী-পুত্র শ্রবণ করিলেন যে ভগবান কুশিনারায় পরিনির্ব্বাণে প্রবেশ করিয়াছেন। তখন তিনি কুশিনারার মল্লগণের নিকট দূত প্রেরণ করিয়া তাহাদিগকে জানাইলেন: ‘ভগবানও ক্ষত্রিয়, আমিও ক্ষত্রিয়, আমিও ভগবানের অস্থির অংশ পাইবার উপযুক্ত, আমিও ভগবানের অস্থি সমূহের ওপর স্তূপ নির্মাণ করিব এবং মহা-উৎসবের অনুষ্ঠান করিব।’
“বৈশালির লিচ্ছবিগণ শ্রবণ করিল ভগবান কুশিনারায় পরিনির্ব্বাণ প্রাপ্ত হইয়াছেন। তখন তাঁহারা কুশিনারার মল্লগণের নিকট দূত প্রেরণ করিয়া তাহাদিগকে জানাইলেন: ‘ভগবানও ক্ষত্রিয়, আমরাও ক্ষত্রিয়, আমরাও ভগবানের অস্থির অংশ পাইবার উপযুক্ত, আমরাও ভগবানের অস্থিসমূহের ওপর স্তূপ নির্মাণ করিব এবং মহা-উৎসবের অনুষ্ঠান করিব।’
“কপিলাবস্তুর শাক্যগণ শ্রবণ করিলেন, ভগবান কুশিনারায় পরিনির্বাণে প্রবেশ করিয়াছেন। ইহা শ্রবণ করিয়া শাক্যগণ কুশিনারার মল্লদিগের নিকট দূত প্রেরণ করিয়া তাহাদিগকে জানাইলেন: ‘ভগবান আমাদের জাতি-শ্রেষ্ঠ। আমরাও ভগবানের অস্থির অংশ পাইবার উপযুক্ত, আমরাও ভগবানের অস্থি সমূহের ওপর স্তূপ নির্মাণ করিব এবং মহা-উৎসবের অনুষ্ঠান করিব।’
“অল্পকল্পের বুলিগণ শ্রবণ করিল, ভগবান কুশিনারায় পরিনিবৃত হইয়াছেন। তৎশ্রবণে বুলিগণ কুশিনারার মল্লদিগের নিকট দূত প্রেরণ করিয়া জানাইল: ‘ভগবানও ক্ষত্রিয়, আমরাও ক্ষত্রিয়, আমরাও ভগবানের অস্থির অংশ পাইবার উপযুক্ত, আমরাও ভগবানের অস্থিসমূহের ওপর স্তূপ নির্মাণ করিব এবং মহা-উৎসবের অনুষ্ঠান করিব।’
“রামগ্রামের কোলিয়গণ শ্রবণ করিল, ভগবান কুশিনারায় পরিনিবৃত হইয়াছেন। তৎশ্রবণে তাঁহারা কুশিনারার মল্লদিগের নিকট দূত প্রেরণ করিয়া জানাইলেন: ‘ভগবানও ক্ষত্রিয়, আমরাও ক্ষত্রিয়, আমরাও ভগবানের অস্থির অংশ পাইবার উপযুক্ত, আমরাও ভগবানের অস্থি সমূহের ওপর স্তূপ নির্মাণ করিব এবং মহা-উৎসবের অনুষ্ঠান করিব।’ ”আমাদের কাছে এখন গোত্র, বংশ, জাতি ও বর্ণ ইত্যাদি আলাদা আলাদা নির্দিষ্ট অর্থ নিয়ে এলেও এই শব্দগুলি প্রাচীন গ্রন্থে অনেক সময়ই একে অপরের স্থানে ব্যবহার করা হয়েছে। রামায়ণ, বিষ্ণুপুরাণ, মৎস্যপুরাণ ও ভাগবত পুরাণে ইক্ষ্বাকু বংশের তালিকা দেওয়া আছে এবং গ্রন্থ অনুসারে তার অল্প হেরফেরও দেখা যায়।
ব্রহ্মার পুত্র মরীচি। মরীচি-র পুত্র কশ্যপ। কশ্যপের পুত্র বিবস্বান সূর্য, বিবস্বানের পুত্র বৈবস্বত। বৈবস্বত মনু ছিলেন নিঃসন্তান। সন্তান লাভের আশায় তিনি মিত্র বরুণের যজ্ঞ করে দশ পুত্র লাভ করেছিলেন যার মধ্যে জ্যেষ্ঠপুত্র ছিলেন সত্যব্রত বা ইক্ষ্বাকু। ইক্ষ্বাকু প্রথম সাকেত বা অযোধ্যায় রাজধানী স্থাপন করে রাজত্ব স্থাপন করেছিলেন। বৈবস্বত মনুর পিতা বিবস্বান সূর্যের নামে একে সূর্যবংশও বলা হয়ে থাকে। রামচন্দ্র ছিলেন এই বংশের ৮০-তম রাজা। রামের পর ৫০-তম রাজা ছিলেন বৃহদ্বল যিনি কুরু–পাণ্ডবদের সমকালীন ছিলেন। বৃহদ্বল কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কৌরব পক্ষে যোগদান করে যুদ্ধ করেছিলেন এবং অভিমন্যুর হাতে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। যদিও তাঁকে কোশলের রাজা বলা হয়েছে আবার শাক্যরাও কোশলের অন্তর্গত ছিল। বুদ্ধদেব নিজেই বিম্বিসারকে বলেছেন যে তিনি কোশলের অন্তর্গত শাক্য জাতির মানুষ। পুরাণগুলিতে বৃহদ্বলের পর থেকে ইক্ষ্বাকু বংশের যে তালিকা আছে সেখানে শুদ্ধোদন, সিদ্ধার্থ ও রাহুলের (সিদ্ধার্থের পুত্র) আছে যদিও শাক্য সেখানে কোনো জাতি নয় বরং একজন ব্যক্তি। সুতরাং আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি যে সিদ্ধার্থ ছিলেন সূর্য রাজবংশের সন্তান আর তাই তাঁর সেই পরিচয় অনেক সময়ই গবেষকদের বিভ্রান্ত করেছে। যদি আমরা সিদ্ধার্থের প্রাথমিক তথ্যগুলি একত্র করি তাহলে পাব-
সিদ্ধার্থের বংশ ও গোত্রের এই রহস্য মনে হয় প্রাচীন পণ্ডিতদেরও ভাবিয়েছিল আর তাই সমাধানও খুঁজে বার করা হয়েছিল। ইক্ষ্বাকু বংশ ও গৌতম গোত্রের মেলবন্ধন জড়িয়ে আছে তিব্বতীয় বিনয় পিটক বা ‘দুল্ব’ পিটকের একটি কাহিনিতে (f433-439, translated by Rockhill: 1884, 9-10)। সেই কাহিনি অনুযায়ী বারাণসীরাজ মহেশ্বরসেন (Dbang-phyug tclwn-poi sde, ডাং-ফিউগ ত্স্ল্যান-পই স্দে)-এর উত্তরপুরুষরা কুশিনগর ও পোতলে (Gru-hdjin, গ্রু-হদ্জিন) রাজত্ব করতেন। তাঁদের বংশে এক রাজা জন্মেছিলেন যার নাম ছিল কর্ণিক (Rna-ba-chari, র্না-বা-চারি) যার দুই পুত্র ছিল, গৌতম ও ভরদ্বাজ। কর্ণিকের মৃত্যুর পর গৌতম নিজে রাজা না হয়ে ভরদ্বাজকে রাজা করেন ও নিজে ঋষি কৃষ্ণবর্ণ (Krichnavarna, ম্দোগ-নগ)-এর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে সন্ন্যাসী হয়ে যান। একবার কোনো একটি কারণে গৌতম তাঁর গুরু কৃষ্ণবর্ণকে নিজের তপস্যার ক্ষমতার প্রভাবে সোনার আভাযুক্ত করে দিয়েছিলেন এবং তারপর থেকে তাঁর নাম কৃষ্ণবর্ণ থেকে ‘কনকবর্ণ’ (গ্সের-গি-ম্ডগ) হয়ে যায়।
এদিকে ভরদ্বাজের কোনো পুত্র সন্তান না থাকায় পোতল রাজবংশ লোপ পাওয়ার উপক্রম হওয়াতে কনকবর্ণ যোগবলে গৌতমের শরীরে বৃষ্টিপাত করিয়ে ও তীব্র বাতাসের ঝাপটে প্রথমে তাঁকে শুদ্ধ করে তারপর তাঁর শরীরে দিব্য শক্তির সঞ্চার করিয়েছিলেন। সেই শক্তির প্রভাবে গৌতমের দেহ থেকে দুই ফোঁটা বীর্য রক্তের সঙ্গে মিশে নিঃসৃত হয়েছিল। কিছুক্ষণ পরে, সূর্যের তাপে এই দুটি ফোঁটা ডিমে পরিবর্তিত হয়ে গেল, এবং ক্রমশ সেই ডিম ফুটে দুটি বাচ্চা বেরিয়ে এসে কাছের একটি আখের বাগানে প্রবেশ করেছিল। এদিকে নষ্টবীর্য ঋষি গৌতম দিন দিন শুকিয়ে মারা যান। ঋষি কনকবর্ণ সেই দুই শিশুকে গৌতমের পুত্র হিসেবেই লালন পালন করেছিলেন। সূর্য উদিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জন্ম নেওয়া এবং সূর্যের রশ্মির দ্বারা উদ্ভূত হওয়ার কারণে তাদের বংশের নাম হয় ‘সূর্যবংশ।’
আবার, গৌতমের সন্তান হওয়ার কারণে তারা ‘গৌতম’ নামে পরিচিত ছিল এবং তারা গৌতমের কোমর থেকে জন্মেছিল বলে তাঁদের তৃতীয় নাম হল ছিল ‘অঙ্গিরস’ (Tan-lag skyes, তান-ল্যাগ স্ক্যাস)। আর তাঁদের আরেকটি নাম ছিল, ‘ইক্ষ্বাকু’ (বু-রাম শিং-পা) কারণ তাদের ‘আখের (ইক্ষু) বাগানে’ পাওয়া গিয়েছিল।
সিদ্ধার্থ যে ইক্ষ্বাকু বংশের সন্তান ছিলেন তা বোঝা গেলেও আমাদের আলোচনা পরিপূর্ণ হতে পারে না যতক্ষণ না আমরা সাকেত বা অযোধ্যা থেকে তরাই অঞ্চলে সূর্য বংশের বিস্তারের কোনো সূত্র দিতে পারব। এক্ষেত্রে ‘মহাবস্তু অবদান’ নামক প্রাচীন গ্রন্থ আমাদের সহায় হবে। সেই গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে ‘রাজবংশ’ বলে একটি অধ্যায় আছে যেখানে এই কাহিনিটির বিস্তারিত বিবরণ আছে। কাহিনিটি অবশ্যই কিংবদন্তি নির্ভর আর এইসব ক্ষেত্রে পুরো বিষয়গুলিই এই রকম কিংবদন্তিগুলির ওপরেই ভিত্তি করে আছে। আমরা এই কাহিনিটি পরে কপিলাবস্তু সংক্রান্ত অধ্যায়ে বিস্তারিত ভাবে পড়ব, যেখানে সাকেত বা অযোধ্যার রাজা সুজাত তাঁর দেওয়া কথা রাখতে তাঁর প্রথম রানির সন্তান, পাঁচ রাজকুমার ও রাজকুমারীকে রাজ্য থেকে নির্বাসনে পাঠিয়েছিলেন। তাঁরা তরাই অঞ্চলে গিয়ে কপিলাবস্তু নগর তৈরি করেছিল এবং সেখানে নিজেদের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পাঁচ ভাই (রাজকুমাররা) তাঁদের পাঁচ বোনকে (রাজকুমারীদের) বিবাহ করেছিলেন। সেই খবর অযোধ্যার রাজা সুজাতের কাছে পৌঁছাতে তিনি ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন যে এমন কাজ নীতিবিরুদ্ধ কিনা আর তখন ব্রাহ্মণরা জানিয়েছিলেন যে, “ ‘হে মহারাজ, এরূপ কার্য ‘শক্য’ অর্থাৎ ইহা করিতে পারা যায় এবং সেই কারণে কুমারেরা কোনো প্রকার দোষ দ্বারা লিপ্ত হইবে না।’ রাজা সুজাত ব্রাহ্মণ পণ্ডিতগণের কথা শুনিয়া হৃষ্ট, তুষ্ট ও আত্মমনা (অত্যুল্লাসিতচিত্ত) হইয়া এইরূপ একটি উদান (উচ্চবাক্য) উচ্চারিত করিলেন, ‘হে ভদ্রগণ, কুমারগণ শক্য হইল (অর্থাৎ) করণীয় কর্মই করিতে পারিয়াছে)।’ সেই অবধি সেই কুমারদিগের শক্য বা শাকিয়া এইরূপ সমাখ্যা (নাম) ও সম্রাজ্ঞা (অভিধান) ও প্রজ্ঞপ্তি (সংজ্ঞা বা লক্ষণ) উৎপন্ন হইল।”
অম্বট্ঠ সুত্রেও একই ধরনের তথ্য পাচ্ছি। যেখানে অম্বট্ঠের কাছে বুদ্ধ নিজে শাক্যদের পরিচয় জানাচ্ছেন –
“অম্বট্ঠ, তোমার মাতা-পিতার পুরাতন নামগোত্র অনুসরণ করিলে শাক্যেরা তোমার আর্যপুত্র হয়, তুমি শাক্যদিগের দাসীপুত্র হও। শাক্যগণ রাজা ইক্ষ্বাকুকে পিতামহরূপে গ্রহণ করেন। অম্বট্ঠ, পূর্ব্বকালে ইক্ষ্বাকু প্রিয়া মনোহারিণী মহিষীর পুত্রকে রাজ্যের উত্তরাধিকারী করিবার অভিপ্রায়ে জ্যেষ্ঠ কুমারগণকে রাষ্ট্র হইতে নির্ব্বাসিত করিয়াছিলেন; তাহাদের নাম-ওক্কামুখ (ইক্ষ্বাকুমুখ?), করণ্ডু (করন্ধু/করন্ড?), হত্থিনিক (হস্তিনীক?) এবং সিনিপুর (শ্রীনিপুর?)। তাহারা রাজ্য হইতে নির্বাসিত হইয়া হিমালয়ের পার্শ্বদেশে এক পুষ্করিণীর তীরের যেইখানে এক বিশাল শাক বৃক্ষ ছিল সেইস্থানে বাস করিয়াছিল। তাহারা জাতির বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্য স্বীয় ভগ্নীগণের সহিত পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হইয়াছিল।
“একদিন রাজা ইক্ষ্বাকু অমাত্য পরিষদবর্গকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘কুমারগণ এক্ষণে কোথায়?’
‘দেব, হিমালয়ের পার্শ্বদেশে এক পুষ্করিণীর তীরের যেখানে এক বিশাল শাক বৃক্ষ আছে সেইস্থানে কুমারগণ এক্ষণে অবস্থিতি করিতেছেন। তাঁহারা জাতির বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্য স্বীয় ভগ্নীগণের সহিত পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হইয়াছেন।’ইহা শুনিয়া রাজা ইক্ষ্বাকুর মুখ হইতে প্রশংসার উচ্ছ্বাস নির্গত হইল, ‘কুমারগণ সত্যই শাক্য, তাহারা পরম শাক্য।’ ” (অম্বট্ঠ সুত্র, ১৬)
অম্বট্ঠ সূত্র অনুযায়ী সিদ্ধার্থ ছিলেন ইক্ষ্বাকু বংশের সন্তান এবং শাক্য নামকরণের প্রশ্নে এখানে দুইখানি তথ্য রয়েছে, ১) শাল (শাক) গাছে পরিপূর্ণ একটি অঞ্চলে তাঁরা স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করেছিলেন এবং ২) মহাবস্তু অবদানের মতো তাদের কাজকে নীতিপূর্ণ বোঝাতে ‘শাক্য’ শব্দের প্রয়োগ। এই প্রসঙ্গে অশ্বঘোষ তাঁর সৌন্দরনন্দ গ্রন্থে (প্রথম সর্গ) বলেছেন,
অথ তেজস্বিসদনং তপঃক্ষেচং তমাশ্রমং।
কেচিদিষ্ট্বাকবো জগ্মূ রাজপুত্রা বিবত্সবঃ॥১৮
সুবর্ণস্তম্ভবমীণঃ সিংহোরস্কা মহাভুজাঃ।
পাচং শব্দস্য মহতঃ শ্রিয়াং চ বিনয়স্য চ॥১৯
অর্হরূপা হ্যনর্হস্য মহাত্মান চলাত্মনঃ।
প্রাজ্ঞাঃ প্রজ্ঞাবিমুক্তস্য ভ্রাতৃব্যস্য যবীয়সঃ॥২০
মাতৃশুল্কাদুপগতাং তে বিয়ং ন বিষেহিরে।
ররক্ষুচ্চ পিতুঃ সত্যং যস্মাছ্ছিথিয়িরে বনং॥২১
তেষাং মুনিরুপাধ্যায়ো গীতমঃ কপিলো ঽভবত্।
গুরুগোচাদতঃ কোত্সাস্তে ভবন্তি স্ম গীতমাঃ॥২২
একপিচোর্যথা ভ্রাচোঃ পৃথগ্গুরুপরিগ্রহাত্।
রাম এবাভবঙ্গাগ্যোং বাসুভদ্রোঽপি গোতমঃ॥২৩
শাকবৃক্ষপ্রতিচ্ছচং বাসং যস্মাছ্চ চক্রিরে।
তস্মাদিষ্ট্বা কুভংশ্যাস্তে ভুবি শাক্যা ইতি স্মৃতাঃ॥২৪
একদিন তেজস্বী পুরুষের বাসভূমি, তপস্যার আশ্রয় সেই আশ্রমে বাস করতে ইচ্ছুক হয়ে এলেন ইক্ষ্বাকুর পুত্রগণ।॥১৮॥
স্বর্ণনির্মিত স্তম্ভের মত উজ্জ্বল তাঁদের দেহ, সিংহের মত বক্ষ, বিশাল বাহু, মহিমায় ও আচরণে তাঁরা বিখ্যাত।॥১৯॥
তাঁরা ছিলেন যোগ্য, উদার এবং প্রাজ্ঞ, তাঁদের কনিষ্ঠ বৈমাত্রেয় ভ্রাতা ছিলেন অযোগ্য, নীচাশয় এবং মূর্খ। তাই সেই ভ্রাতার মাতার বিবাহ-যৌতুক রূপে যে সম্পদ তাঁদের কাছে এসেছিল তাঁর ওপর তাঁরা শক্তি প্রয়োগ করেননি; তারা পিতৃ-সত্য রক্ষার্থেই বনে এসেছিলেন।॥২০-২১॥
ঋষি গৌতম হলেন তাঁদের গুরু; সুতরাং গুরুর গোত্রানুযায়ী তাঁরা কৌৎস থেকে ‘গৌতম’ রূপে পরিচিত হলেন।॥২২॥
যেমন, একই পিতার পুত্র এবং পরপর ভাই হয়ে পৃথক গুরুর শিষ্য হওয়ায় বলরাম হলেন গার্গ এবং কৃষ্ণ হলেন গৌতম।॥২৩॥
শাকবৃক্ষের ছায়ায় তাঁরা বাসগৃহ নির্মাণ করেছিলেন বলে এই ইক্ষ্বাকুবংশীয়গণ শাক্যরূপে পৃথিবীতে পরিচিত হলেন।॥২৪॥
অশ্বঘোষ বিষয়টি অনেক সহজ করে দিয়েছেন। তরাই অঞ্চলে কপিল মুনির আশ্রমের আশপাশে শাক্য বংশের প্রথম জনপদ তৈরি হয়। কপিল তাঁদের গুরু ছিলেন এবং তাঁর নামেই নগরের নাম হয়েছিল ‘কপিলাবস্তু।’
এই কপিল কিন্তু সাংখ্য দর্শনের কপিল মুনি নন, ইনি ছিলেন গৌতম গোত্রের এক মুনি (গৌতমঃ কপিলো নাম মুনির্ধর্মভৃতাং বরঃ। বভূব তপসি শ্রান্তঃ কাক্ষীবানিব গৌতমঃ, ঐ, প্রথম সর্গ, প্রথম শ্লোক)। “গুরুর গোত্রানুযায়ী তাঁরা কৌৎস থেকে ‘গৌতম’ রূপে পরিচিত হলেন।”
তাহলে শাক্য বংশের গৌতম গোত্র হওয়ার রহস্য বোঝা গেল। অশ্বঘোষ শাক্য নামকরণের সূত্র হিসেবে বলেছেন যে তাঁরা শাল (শাল গাছের আরেক নাম শাক) গাছের জঙ্গল কেটে বসতি স্থাপন করেছিলেন বলে তাঁদের নাম শাক্য হয়েছিল।
শাক্য নামকরণের এই মতটি অর্থাৎ শেষের শ্লোকটি অম্বট্ঠ সুত্রকেও সমর্থন করছে আর তাই শাক্য নামকরণের এটাই প্রকৃত কারণ হওয়ার সম্ভাবনা। এই শ্লোকটি অমরকোষের টীকাকার ভরতও ব্যবহার করেছেন।
গোত্রের বিষয়ে বিভিন্ন কাহিনি থেকে আমরা তরাই অঞ্চলে সূর্য বংশের বিস্তার নিয়ে যেমন জানতে পারলাম তেমনই ইক্ষ্বাকু বা সূর্য বংশের এই শাখাকে শাক্য কেন বলা হয় তার কারণও জানতে পারলাম। তিনটি পুরাণে শাক্যদের উল্লেখ আছে। আমরা প্রথমে মৎস্য পুরাণে বর্ণিত ইক্ষ্বাকু বংশতালিকায় বৃহদ্বলের পরবর্তী রাজাদের নামগুলি দেখি-
বৃহদ্বলশ্য দায়াদো বীরো রাজা হ্যুরুক্ষয়ঃ।
উরুক্ষয় সুতশ্চাপি বৎসদ্রাহো মহাযশাঃ।
বৎসদ্রোহাৎ প্রতিব্যোমস্তস্য পুত্রো দিবাকরঃ।
তসৈব মধ্যদেশে তু অযোধ্যানগরী শুভা।
দিবাকরস্য ভবিতা সহদেবো মহাযশাঃ।
সহদেবাচ্চ ভবিতা ধ্রুবাশ্বো বৈ মহামনাঃ।
তস্য ভাব্যো মহাভাগঃ প্রতীপাশ্বশ্চ তৎসুতঃ।
প্রতীপার্শ্বসুতশ্চাপি সুপ্রতীপো ভবিষ্যতি।
মরুদেবঃ সুতস্তস্য সুনক্ষত্রস্ততোঽভবৎ।
কিন্নরাশ্বঃ সুনক্ষত্রাভবিষ্যতি পরন্তপঃ।
কিন্নরাশ্বদন্তরীক্ষো ভবিষ্যতি মহামনাঃ।
সুষেণশ্চান্তরীক্ষাচ্চ সুমিত্রশ্চাপ্যমিত্রজিৎ।
সুমিত্রজো বৃহদ্রাজো বৃহদ্রাজস্য বীর্য্যবান্।
পুত্রঃ কৃতঞ্জয়ো নাম ধাৰ্ম্মিকশ্চ ভবিষ্যতি।
কৃতঞ্জয়সুতো বিদ্বান ভবিষ্যতি রণেজয়ঃ।
ভবিতা সঞ্জয়শ্চাপি বীরো রাজা রণেজয়াৎ।
সঞ্জয়স্য সুতঃ শাক্যঃ শাক্যাচ্ছুদ্ধৌদনো নৃপঃ।
শুদ্ধোদনস্য ভবিতা সিদ্ধার্থঃ পুষ্কলঃ সুতঃ।
প্রসেনজিত্ততো ভব্যঃ ক্ষুদ্রকো ভবিতা ততঃ।
ক্ষুদ্রকাৎ কুলকো ভাব্যঃ কুলকাৎ সুরথঃ স্মৃতঃ।
সুমিত্রঃ সুরবাজ্জাতেো অন্যস্তু ভবিতা নৃপঃ।
এতে চৈক্ষাকবঃ প্রোক্তা ভবিষ্যা যে কলৌধুগে।
বৃদ্ধলাম্ববায়ে তু ভবিষ্যাঃ কুলবর্দ্ধনাঃ।
অত্রানুবংশশ্লোকোঽয়ং বিপ্রৈর্গীতঃ পুতাতনৈঃ।
ইক্ষ্বাকূণাময়ং বংশঃ সুমিত্রান্তো ভবিষ্যতি।
সুমিত্রং প্রাপ্য রাজানং সংস্থাং প্রাপ্যতি বৈ কলৌ।
– মৎস্য পুরাণ, ২৭১.৪-১৬
বৃহদ্বলের দায়াদ রাজোপাধিধারী বীর উরুক্ষয়। তৎপুত্র মহাযশ বৎসদ্রোহ; তৎপুত্র-প্রতিব্যোম; তৎপুত্র-দিবাকর; মধ্যদেশে অযোধ্যা নাম্নী শোভমানা নগরী এই মহাত্মারই ছিল। দিবাকরপুত্র,- অতুলকীর্ত্তি সহদেব; তৎপুত্র মহামনা ধ্রুবাশ্ব; তৎপুত্র-মহাভাগ ভাব্য; তৎপুত্র প্রতীপার্শ্ব; তৎপুত্র-সুপ্রতীপ; তৎপুত্র- মরুদেব; তৎপুত্র-সুনক্ষত্র; তৎপুত্র- কিন্নরাশ্ব; তৎপুত্র-অন্তরীক্ষ, তৎপুত্র- সুমিত্র ও সুষেণ, সুমিত্র-তনয়-বৃহদ্রাজ; বৃহদ্রাজের বীৰ্য্যবান পুত্র-কৃতঞ্জয়, তিনি পরম ধাৰ্ম্মিক। কৃতঞ্জয় তনয়-রণেজয়; তৎপুত্র-সঞ্জয়। তৎপুত্র-শাক্য; তৎপুত্র-শুদ্ধৌদন; তৎপুত্র-সিদ্ধার্থ; তৎপুত্র-প্রসেনজিৎ; তৎপুত্র-ক্ষুদ্রক; তৎপুত্র-কুনক; তৎপুত্র-সুরথ; তৎপুত্র-সুমিত্র। এতদ্ব্যতীত আরও বহু রাজা এই সূর্য্যবংশে জন্মগ্রহণ করেন। ইহারা সকলেই এই কলিযুগে ঐক্ষাকব আখ্যায় প্রসিদ্ধি লাভ করিয়া বৃহদ্বলান্বয়ে সূর্য্যবংশের বংশধররূপে জন্মগ্রহণ করেন। পুরাতত্ত্ববিদ বিপ্রগণ এই সূর্য্যবংশানুযায়ী একটা শ্লোক কীর্ত্তন করিয়াছেন যে, ইক্ষ্বাকু কূলদিগের এই বংশ সুমিত্র পৰ্য্যন্তই বিস্তৃত হইবে। এই বংশ রাজা সুমিত্রকে পাইয়াই বিশ্রাম লাভ করিবে।
মৎস্যপুরাণে উল্লিখিত রাজাদের তালিকা তাহলে এই রকম–
বৃহদ্বল > উরুক্ষয় > বৎসদ্রোহ > প্রতিব্যোম > দিবাকর > সহদেব > ধ্রুবাশ্ব > ভাব্য > প্রতীপার্শ্ব > সুপ্রতীপ > মরুদেব > সুনক্ষত্র > কিন্নরাশ্ব > অন্তরীক্ষ > সুমিত্র > বৃহদ্রাজ > কৃতঞ্জয় > রণেজয় > সঞ্জয় > শাক্য > শুদ্ধৌদন > সিদ্ধার্থ > প্রসেনজিৎ > ক্ষুদ্রক > কুনক > সুরথ > সুমিত্র
তাহলে দেখা যাচ্ছে যে বৃহদ্বলের পর ২১-তম পুরুষ হলেন সিদ্ধার্থ আর এক পুরুষের সময়কালের বিস্তৃতি যদি ৩০ বছর ধরে নিই তাহলে পৌরাণিক তথ্য অনুযায়ী বৃহদ্বল ও সিদ্ধার্থের মধ্যে ছিল প্রায় ৬০০ বছরের দূরত্ব।
মহাভারত অনুযায়ী বৃহদ্বল কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। যুদ্ধের কাহিনি সত্যি হোক বা না হোক আমরা ধরে নিতে পারি যে তিনি ছিলেন পাণ্ডবদের সমসাময়িক। কুরু রাজবংশের রাজধানী বা মহাভারতের সঙ্গে যুক্ত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নক্ষেত্র হচ্ছে হস্তিনাপুর, যার খনন করেছিলেন ডঃ বি বি লাল (Lal B B: 1985) এবং সেখানে সর্বনিম্ন স্তরের সময়কাল প্রায় ১২০০ সাধারণ পূর্বাব্দেরও আগের (ibid, page no. 23)। তাহলে মোটামুটি সেখান থেকে হিসেব করলে সিদ্ধার্থের সময়কাল ৬০০ সাধারণ পূর্বাব্দ দাঁড়ায়। এই হিসাব অনেকটাই বর্তমান ধারণার সঙ্গে মিলে যায়।
তবে একে আমরা প্রামাণ্য কোনো তথ্য হিসেবে মান্যতা দিতে পারি না কারণ পৌরাণিক তথ্যের মধ্যে অনেকটাই গোঁজামিল থাকে এবং এক্ষেত্রেও আছে। ওপরে দেওয়া মৎস্যপুরাণের রাজাদের তালিকার সঙ্গে কিন্তু বিষ্ণুপুরাণ ও ভাগবতের অনেক অমিল এবং সবচেয়ে বড়ো বিষয়টি হল, এই দুই পুরাণে সিদ্ধার্থের নামই নেই।
এবারে আমরা আরেকটি পুরাণের তালিকা দেখে নিই। ভাগবত পুরাণের নবম স্কন্দের দ্বাদশ অধ্যায়ে রামের বংশতালিকা বর্ণনা করা হয়েছে (ইতি শ্রীমদ্ভাগবতে মহাপুরাণে পারমহংস্যাং সংহিতায়াং বৈয়াসিক্যাং নবমস্কন্ধে শ্রীরামবংশানুকীৰ্ত্তনং দ্বাদশোহধ্যায়ঃ)। সেখানে বৃহদ্বলের পর থেকে ইক্ষ্বাকু বংশের যে বিবরণ পাই তা হল-
এতে হীক্ষাকুভূপালা অতীতাঃ শৃণুনাগতাম্।
বৃহদ্বলস্য ভবিতা পুলো নাম্না বৃহদ্রণঃ॥৯৷৷
উরুক্রিয়ঃ সুতস্তস্য বৎসবৃদ্ধো ভবিষ্যতি।
প্রতিব্যোমস্ততো ভানুদিবাকো বাহিনীপতিঃ॥১০৷৷
সহদেবস্ততো বীরো বৃহদশ্বোহথ ভানুমান।
প্রতীকাশ্বো ভানুমতঃ সুপ্রতীকোহথ তৎস্থতঃ॥১১৷৷
ভবিতা মরুদেবোহথ সুনক্ষত্রোহথ পুষ্করঃ।
তস্তান্তরীক্ষস্তৎপুত্রঃ সুতপাস্তদমিত্রজিৎ॥১২৷৷
বৃহদ্রাজস্তু তস্যাপি বহিস্তস্মাৎ কৃতঞ্জয়ঃ।
রণঞ্জয়স্তস্থ্য সুতঃ সঞ্জয়ো ভবিতা ততঃ॥১৩৷
তস্মাচ্ছাক্যোহথশুদ্ধোদো লাঙ্গলস্তৎস্থতঃ স্মৃতঃ।
ততঃ প্রসেনজিৎ তস্মাৎ ক্ষুদ্রকো ভবিতা ততঃ॥১৪৷৷
রণকো ভবিতা তস্মাৎ সুরথস্তনয়স্ততঃ।
সুমিত্রো নাম নিষ্ঠান্ত এতে বার্হদ্বলান্বয়াঃ।১৫॥
ইক্ষাকূণাময়ং বংশঃ সুমিত্রান্তো ভবিষ্যতি।
যতস্তং প্রাপ্য রাজানং সংস্থাং প্রাপ্যতি বৈ কলৌ॥১৬৷৷
– ভাগবত পুরাণ, ৯.১২.৯-১৬
হে রাজন! উল্লিখিত ব্যক্তিগণ ইক্ষ্বাকুবংশীয় অতীত নরপতি, পরে যাঁহারা হইবেন, তাঁহাদের কথা শ্রবণ কর। বৃহদ্বলের বৃহদ্রণ নামে পুত্র হইবেন।(৯) বৃহদ্রণের পুত্র বৎসবৃদ্ধ হইবেন, ইনি সুমহৎ ক্রিয়া-কলাপ করিবেন, বৎসবৃদ্ধের পুত্র প্রতিব্যোম, তাঁহা হইতে ভানু, তাঁহা হইতে সেনাপতি দিবাকরের জন্ম হইবে(১০) দিবাকরের পুত্র সহদেব, তাঁহার পুত্র বৃহদশ্ব, তাঁহার পুত্র ভানুমান, ভানুমানের পুত্র প্রতীকাশ্ব, তাঁহার পুত্র সুপ্রতীক।(১১) সুপ্রতীকের মরুদেব নামে পুত্র হইবে, তাঁহার পুত্র সুনক্ষত্র, সুনক্ষত্রের পুত্র পুষ্কর হইবেন, পুষ্করের পুত্র অন্তরীক্ষ, তাঁহার পুত্র সুতপা, তাঁহার পুত্র অমিত্রজিৎ।(১২) অমিত্রজিৎ হইতে বৃহদ্রাজ, তাঁহা হইতে বর্হি, বর্হি হইতে কৃতঞ্জয়, তাঁহার পুত্র রণঞ্জয়, তাঁহা হইতে সঞ্জয় জন্মগ্রহণ করিবেন।(১৩) সঞ্জয়ের পুত্র শাক্য, তাঁহার পুত্র শুদ্ধোদ, তাঁহার পুত্র লাঙ্গল, তাঁহার পুত্র প্রসেনজিৎ, তাঁহার পুত্র ক্ষুদ্রক হইবেন। ক্ষুদ্রক হইতে রণক হইবেন, তাঁহার সুরথ নামে পুত্র হইবে, তাঁহার পুত্র সুমিত্র উৎপন্ন হইবেন, এই স্থানেই এই বংশ সমাপ্ত হইবে, ইঁহারা বৃহদ্বনের বংশ।(১৪-১৫) হে রাজন! ইক্ষ্বাকুগণের এই বংশ সুমিত্রান্ত হইবে অর্থাৎ এই বংশে সুমিত্র শেষ রাজ। হইবেন, যেহেতু সুমিত্রক রাজ্য প্রাপ্ত হইলে কলিকালে ঐ বংশ ধ্বংস হইয়া যাইবে।(১৬)
সব পুরাণেই সূর্য বংশের শেষ রাজা হিসেবে যার নাম উল্লিখিত আছে তিনি হলেন সুমিত্র। সুতরাং ভাগবত অনুযায়ী তালিকা এই রকমের-
বৃহদ্রণ > বৎসবৃদ্ধ > প্রতিব্যোম > ভানু > দিবাকর > সহদেব > বৃহদশ্ব > ভানুমান > প্রতীকাশ্ব > সুপ্রতীক > মরুদেব > সুনক্ষত্র > পুষ্কর > অন্তরীক্ষ > সুতপা > অমিত্রজিৎ > বৃহদ্রাজ > বর্হি > কৃতঞ্জয় > রণঞ্জয় > সঞ্জয় > শাক্য > শুদ্ধোদ > প্রসেনজিৎ > ক্ষুদ্রক > রণক > সুরথ > সুমিত্র
আমরা যদি বিষ্ণুপুরাণের তথ্য দেখি তাহলে দেখব যে বৃহদ্বলের পুত্র বৃহৎক্ষণ থেকে সূর্য বংশের তালিকা এই প্রকার –
বৃহৎক্ষণ > গুরুক্ষেপ > বৎস > বৎসব্যূহ > প্রতিব্যোম > দিবাকর > সুপ্রতীক > মরুদেব > সুনক্ষত্র > কিন্নর > অন্তরীক্ষ > সুপর্ণ > অমিত্রজিৎ > ধর্মী > কৃতঞ্জয় > রণঞ্জয় > সঞ্জয় > শাক্য > শুদ্ধোদন
তাহলে দেখা যাচ্ছে যে রাজাদের নাম নিয়ে পুরাণে পুরাণে মতভেদ রয়েছে। দুই পুরাণে সিদ্ধার্থের নাম না থাকলেও সঞ্জয় নামের এক রাজার পুত্র যে শাক্য ছিলেন এই বিষয়ে তিনটি পুরাণ একমত। মৎস্যপুরাণ ছাড়া বাকি পুরাণের রায় হল যে শাক্যের পুত্র ছিলেন শুদ্ধোদন। বৃহদ্বলের পর ২৩ তম পুরুষ হল শুদ্ধোদন আর বিষ্ণুপুরাণে তিনি হলেন ১৯ তম পুরুষ। অগ্নি পুরাণে বংশ তালিকা না থাকলেও সেখানে উল্লেখ করা আছে যে শুদ্ধোদনের পুত্র হলেন বুদ্ধ (অগ্নি পুরাণ, ১৬.২)।
ভাগবতের আরেক স্থানে বুদ্ধের উল্লেখ আছে এবং সেখানে তিনি কীকট দেশের অধিবাসী অঞ্জনার পুত্র বলা হয়েছে।
ততঃ কলৌ সম্প্রবর্ত্তে
সম্মোহায় সুরদ্বিষাম্
বুদ্ধো নাম্নাঞ্জনাসুতঃ
কীকটেষু ভবিষ্যতি
– ভাগবত পুরাণ, ১.৩.২৪
তারপর কলিযুগের প্রারম্ভে যারা দেবতাদের প্রতি ঈর্ষান্বিত তাদের বিভ্রান্ত করার জন্য, অঞ্জনার পুত্র বুদ্ধ কীকট প্রদেশে আবির্ভূত হবেন।
এখানে বুদ্ধের ‘নাস্তিক’(বেদ-নির্দেশিত যজ্ঞাদির বিরোধী পথ) ধর্মের প্রসঙ্গ আনা হয়েছে যার বিস্তারিত উল্লেখ অগ্নিপুরাণ করেছে এবং আমরা তা পরে আলোচনা করব। এখানে বুদ্ধ সম্পর্কে দুটি তথ্য পাওয়া গেছে। একটি হল যে তাঁর মা অঞ্জনা ও দ্বিতীয়টি হল যে তিনি কীকট দেশের বাসিন্দা। অনেকেই এই তথ্যের বলে বলীয়ান হয়ে বলেন যে প্রকৃতপক্ষে গৌতম বুদ্ধ বলে কেউ ছিলেন না। যিনি ছিলেন তিনি হলেন সুগত বুদ্ধ যার মা ছিলেন অঞ্জনা ও দেশ ছিল গয়া (কীকট)।
গৌতম বুদ্ধের মা ছিলেন মায়াদেবী যাঁর পিতার নাম ছিল অঞ্জন। ব্যাকরণগত ভাবে অঞ্জনের কন্যা হিসেবে মায়াদেবীকে অঞ্জনা বলা যায় না। অঞ্জনের কন্যা হিসেবে মায়াদেবীকে আঞ্জনেয়ী বলা যায়। তাহলে বুদ্ধ হবেন ‘আঞ্জনেয়ীসূত,’ কিন্তু আমরা দেখছি যে রয়েছে অঞ্জনাসূত।
হয়তো এটি একটি ছোটো ভুল অথবা ছন্দের মাত্রা ঠিক রাখতে আঞ্জনেয়ীসূতকে একটু হ্রস্ব করে দেওয়া হয়েছিল। ওখানে নিশ্চিতভাবেই মায়াদেবীকে বোঝানো হয়েছে নয়তো অঞ্জনা নামের কোনো পৃথক মহিলার পুত্র হিসেবে আরেকজন বুদ্ধের কল্পনা করা আরও ভুল হবে। এই বিষয়টি আমার কষ্টকল্পনা নয়, বিখ্যাত ভাষাবিদ দীনেশচন্দ্র সেনও একই মত পোষণ করেছেন-
“বুদ্ধের মাতামহের নাম অঞ্জন ছিল। এইজন্য শ্রীমদ্ভাগবতের ১ম স্কন্ধের ৩য় অধ্যায়ে বুদ্ধমাতা মায়াদেবীকে ‘অঞ্জনা’ বলা হইয়াছে।” (বৃহৎ বঙ্গ, ১১৬)।
পণ্ডিত শ্যামাকান্ত তর্কপঞ্চানন বিষয়টি অন্যভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। ভাগবত মতে বিষ্ণুর অবতার কুড়িটি। অঞ্জনা-পুত্র বুদ্ধকে তিনি ভবিষ্যতের বুদ্ধ মনে করেছেন। তিনি এই শ্লোকের অর্থে বলেছেন,
“তৎপরে কলিযুগ আরম্ভ হইলে – দৈত্যগণের মোহনার্থ তিনি মগধদেশে অঞ্জন-তনয় (অথবা জিন-তনয়) বুদ্ধ নামে একবিংশ অবতার গ্রহণ করিবেন।”
এবারে আসি কীকট দেশের প্রসঙ্গে। কীকট দেশ যে ঠিক কোথায় তাই নিয়ে অনেক সংশয় আছে। মগধের সঙ্গে কীকটের উল্লেখ থাকায় অনেকে বলেন সেই দেশ ছিল আজকের বিহারে, আর তাই এই শ্লোকের অর্থে অনেকেই এই দেশের নাম মগধ অথবা গয়া বলেন। বুদ্ধ গয়ার কাছেই বোধি লাভ করেছিলেন আর তাই হয়তো বুদ্ধের বোধিপ্রাপ্তির স্থানকে এখানে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু বিষয়টি এতটা সহজ নয় কারণ কীকট দেশের অবস্থান নিয়ে মতভেদ আছে। কারো মতে পশ্চিম উত্তর প্রদেশ তো কেউ বলেন হরিয়ানায়। ঋগ্বেদে একটি মন্ত্রে কীকটের উল্লেখ আছে। এটিই কীকট দেশের সবচেয়ে প্রাচীন প্রসঙ্গ।
কিং তে কৃণ্বন্তি কীকটেষু গাভো নাশিরং দুহ্রে ন তপন্তি ঘর্মম্।
আ নো ভর প্রমগন্দস্য বেদো নৈচাশাখং মঘবন্মন্ধয়া নঃ।
– ঋগ্বেদ ৩.৫৩.১৪
কীকট সমূহের মধ্যে গাভী সকল তোমার কি করবে? ওরা সোমের সঙ্গে মিশ্রিত হবার যোগ্য দুগ্ধ দান করে না, দুগ্ধ প্রদান দ্বারা পাত্রকেও দীপ্ত করে না। ওদের আমাদের নিকট আন, প্রমগন্দের ধন আন। হে মঘবন! নীচবংশীয়দের ধন আমাদের প্রদান কর।
যাস্ক এর ব্যাখ্যা করেছেন তাঁর নিরুক্ততে (৬.৩২)। সেখানে মন্ত্রের প্রসঙ্গে যাস্ক কীকট দেশের মূল বৈশিষ্ট্য বুঝিয়ে দিয়েছেন যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন,
“[হে ইন্দ্র], কীকটেষু (অনার্য্য দেশবাসিসমূহের মধ্যে) গাবঃ (গাভীসকল) কিং তে কৃণ্বন্তি (তোমার কি উপকার করে)? আশিরং (সোমের সহিত মিশ্রিত করিবার দধি অর্থাৎ দধির প্রকৃতিভূত দুগ্ধ) ন দুহ্রে (প্রদান করে না), ঘর্মং (প্রবর্জ্যকর্ম্মের প্রধান হব্য দুগ্ধ পাক করিবার মহাবীরনামক পাত্র) ন তপন্তি (উত্তপ্ত করে না), প্রমগন্দস্য (প্রমগন্দের অর্থাৎ কুসীদজীবিকূলোৎপন্ন ব্যক্তির) বেদঃ (খন) নঃ (আমাদের জন্য) আভর (আনয়ন কর), মঘবন্ (হে মখবন্), নঃ (আমাদের জন্য) নৈচাশাখং [বেদঃ] (নীচবংশীয়দিগের ধন) রন্ধয় (সংসাধিত অর্থাৎ আমাদের আয়ত্ত কর)
‘কৗকট’ শব্দ অনবগত; ইহার অর্থ-কীকট নামক অনার্য্যনিবাস দেশ অথবা তদ্দেশবাসী। মাদকতা নিবারণ করিবার জন্য সোমের সহিত দধি মিশ্রিত করা হয়; এই দধির নাম আশির্ (আশী)। সোমযাগে অধিকার লাভার্থ তৎপূর্ব্বে তিন দিন অনুষ্ঠেয় কর্মের নাম প্রবর্গ্যকৰ্ম্ম; এই কর্মে প্রধান হব্যের নাম ঘর্ম – মহাবীরনামক মৃত্তিকাভাণ্ডে গোদুগ্ধ ও ছাগদুগ্ধ মিশ্রিত করিয়া পাক করিয়া ইহা প্রস্তুত করা হয়। এই মহাবীর- পাত্রকেও ঘর্ম বলে। ঋষি বলিতেছেন-হে ইন্দ্র, অনার্য্য দেশবাসীদিগের মধ্যে যে সবল গাভী আছে তাহারা তোমার কোনোই উপকার সাধন করে না; কারণ, অনার্য্য দেশবাসীগণ যজ্ঞহীন। তাহাদের গাভীর দুগ্ধে আশির্ ও হয় না, ঘর্মও হয় না-তাহাদের গাভীর দুগ্ধ উত্তপ্ত বা পক্ক করিবার জন্ম মহাবীর-পাত্র উত্তপ্ত হয় না। যাহারা কুসীদজীবী, যাহারা নীচবংশীয়, তাহারা কেহই যজ্ঞ করে না, উদরপূর্তিতে এবং বিলাসব্যসনে তাহাদের অর্থ ব্যয়িত হয়। সেই সকল অর্থ আমাদিগকে প্রদান কর, যজ্ঞাদি করিয়া আমরা তাহার যথার্থ উপযোগ করিব।” (Thakur: 2003, 811)।
তাহলে সংক্ষেপে যা বোঝা গেল তা হল কীকট দেশের অধিবাসীরা বৈদিক যাগযজ্ঞ মোটেই অনুসরণ করতেন না। অন্যদিকে তখনকার বৌদ্ধ ধর্মকে বা বুদ্ধের দর্শনকে দেখুন তা ঠিক কীকট দেশের অধিবাসীদের মতোই। তারাও বৈদিক যাগযজ্ঞে বিশ্বাস রাখত না। অর্থাৎ বুদ্ধ ছিলেন কীকট দেশের অধিবাসীদের ন্যায়।
বুদ্ধের মতবাদের সঙ্গে যজ্ঞকেন্দ্রিক বৈদিক মতবাদের বিরোধ যে ছিল তা বুদ্ধদেব তাঁর বিভিন্ন বক্তৃতায় অনেকবার স্পষ্ট করেছেন। ভাগবতের একটি স্থানে বুদ্ধের কাছে প্রার্থনা করা হয়েছে যে তিনি যেন বেদ-বিরোধীতা ও বেদ বিমুখিতা থেকে রক্ষা করেন।
দ্বৈপায়নো ভগবানপ্রবোধা- বুদ্ধস্ত পাষণ্ডগণপ্রমাদাৎ।
কল্কিঃ কলেঃ কালমলাৎ প্রপাতু ধর্মাবনায়োরুকৃতাবতারঃ॥
– ভাগবত পুরাণ ৬.৮১৯।
ভগবান্ দ্বৈপায়ন অজ্ঞান হইতে আমাকে রক্ষা করুন। আর ভগবান বুদ্ধদেব পাষণ্ডগণ নিমিত্তক প্রমাদ হইতে রক্ষা করুন, এবং ভগবান্ কল্কি যিনি ধৰ্ম্মরক্ষার্থ মহৎ অবতার স্বীকার করিয়াছেন, তিনি কল্কির মলস্বরূপ কাল হইতে আমাকে রক্ষা করুন।
এখানে পাষণ্ডগণ নিমিত্তক প্রমাদ বলতে “বেদবিরুদ্ধ আচরণ এবং আলস্যবশতঃ বেদবিহিত অনুষ্ঠান বিষয়ে বিমুখতারূপ” বোঝানো হয়েছে অর্থাৎ বুদ্ধদেবের বেদ বিরোধী নীতির উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু তাও বুদ্ধদেবকে অস্বীকার করা যায়নি, অনেক স্থানেই তাঁকে বিষ্ণুর নবম অবতার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মহারুদ্রাদিদেবৈস্ত অনাদিনিধনোহরিঃ। ধৰ্ম্মসংরক্ষণার্থায় অধৰ্ম্মাদিবিনষ্টয়ে।
দৈত্যরাক্ষসনাশার্থৎ মৎস্যপূর্ব্বৎ যথা ভবৎ। কুৰ্ম্মোবরহোনূহরির্ব্বা মনোরামঊর্জিতঃ।
যথা দাশরথীরামঃ কৃষ্ণোবুদ্ধোর্থ কল্প্যপি। তথা ব্যক্তোঽব্যক্তরূপী আসীদাদির্গদাধরঃ।
– গরুড় পুরাণ ১.৮৬.১০-১১
যেমন অনাদি নিধন হার ধর্ম্মরক্ষা, অধৰ্ম্মবিনাশ ও দৈত্য রাক্ষসাদির সংহারার্থ মহারুদ্রাদিদেবগণের সহিত যুগে যুগে মৎস্য, কুৰ্ম্ম, বরাহ, নৃসিংহ, বামন, পরশুরাম, শ্রীরাম, বলরাম, কৃষ্ণ, বুদ্ধ ও কল্কি রূপে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন, সেইরূপ লোক পরিত্রাণার্থ অব্যক্ত গদাধর গয়াতে ব্যক্তরূপে আবির্ভূত হইয়াছেন।
মৎস্যঃ কূর্মো বরাহশ্চ নরসিংহোথ বামনঃ
রামো রামশ্চ কৃষ্ণশ্চ বুদ্ধঃ কল্কীতি চ ক্রমাত॥
– মৎস্য পুরাণ ২৮৫.৬-৭
গরুড় পুরাণের দেওয়া ক্রম, মৎস্য পুরাণ অনুসরণ করলেও ভাগবত পুরাণ (৬.৮.১২-২০) অনুযায়ী বুদ্ধ ভগবান বিষ্ণুর কুড়ি জন অবতারের একজন। পুরাণের মাধ্যমে বুদ্ধকে হিন্দু ধর্মের অন্তর্গত করা হয়েছে, এমন কি রাম বা কৃষ্ণের সঙ্গে সমান আসন দিয়ে তাঁকে বিষ্ণুর অবতারের একজন বলে স্বীকৃত করা হলেও সে প্রক্রিয়া মনে হয় অনেকটাই পরে হয়েছিল। প্রাচীন বৌদ্ধ গ্রন্থগুলি সংকলিত হয়েছিল বুদ্ধের মৃত্যুর কয়েক শতক পরে আর তখনই সত্যের আবরণে বিভিন্ন কিংবদন্তি ঢুকে পড়েছিল। পুরাণের সময়ে সে প্রক্রিয়ায় আরও অস্বচ্ছতা এসেছিল। তবে আমাদের আরেকটি বিষয় মনে রাখতে হবে যে এই সমস্ত গ্রন্থগুলির রচনাকারদের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল, তাঁরা কেউ ইতিহাস রচনা করতে বসেননি। সেইজন্য কখনও পরস্পর বিরোধিতাও দেখা যায় আর সে কাণ্ড বুদ্ধের সঙ্গেও হয়েছে। যেমন মৎস্য পুরাণের একটি স্থানে রয়েছে যে ধর্ম ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা ও অসুরদের ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে বিষ্ণু নবম অবতারে বুদ্ধ রূপে এসেছিলেন।
কর্তুং ধর্মব্যবস্থানমসুরানাং প্রনাশম্
বুদ্ধো নবমকো জজ্ঞে তপসা পুশকরেক্ষণঃ
দেবসুন্দররূপেণ দ্বৈপায়ন পুরঃসরঃ
– মৎস্য পুরাণ ৪৭.২৪৭
ধর্ম ব্যবস্থা ও অসুর ধ্বংস করিবার উদ্দেশ্যে বিষ্ণুর দ্বৈপায়ন অবতারের পরবর্তী নবম অবতার – পুষ্করেক্ষণ বুদ্ধদেব।
আবার অগ্নিপুরাণে বলছে যে ভগবান বিষ্ণু অসুরদের বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত করতেন যাতে তারা সরাসরি নরকে যেতে পারে। এখানে বুদ্ধকে তো অবতারের মর্যাদা দেওয়া হল কিন্তু প্রশংসার ছলে বৈদিক ধর্ম ত্যাগী বৌদ্ধধর্মীদের নিন্দা করাই হয়েছে।
বক্ষ্যে বুদ্ধাবতারঞ্চ পঠতঃ শৃণ্বতোর্থদম।
পুরা দেবাসুরে যুদ্ধে দেত্যৈর্দেবাঃ পরাজিতা॥
রক্ষ রক্ষেতি শরণং বদন্তো জগদীরীশ্বরম।
মায়ামোহস্বরূপোসৌ শুদ্ধোদনসুতো’ভবত॥
মোহয়ামাস দৈত্যাংস্তাংস্ত্যাজিতা বেদধর্মকম।
তে চ বৌদ্ধা বভূভুর্হি তেভ্যোন্যে বেদবর্জিতাঃ॥
আর্হতঃ সো’ভবত পশ্চাদার্হতানকরোত্পরান।
এবং পাষাণ্ডিনো জাতা বেদধর্ম্মাদিবর্জিতাঃ॥
নারকারহং কর্ম চক্রুর্গ্রহীষ্যন্ত্যধমাদপি।
সর্বে কলিযুগান্তে তু ভবিষ্যন্তি চ সঙ্করাঃ॥
দস্যবঃ শীলহীনাশ্চ বেদো বাজসনেয়কঃ।
দশ পঞ্চ চ শাখা বৈ প্রমাণেন ভবিষ্যতি॥
– অগ্নিপুরাণ ১৬.১-৬
অগ্নি বললেন, এখন বুদ্ধের অবতার সম্বন্ধে বর্ণনা করছি। এটি পড়লে বা শুনলে লাভ হয়। প্রাচীনকালে দেবতা ও অসুরের মধ্যে যুদ্ধ হয়। তারপর দানবেরা পরাজিত হয়ে ঈশ্বরের সামনে গিয়ে তাঁকে স্মরণ করে বলেন আমাদের রক্ষা করো, রক্ষা করো। এভাবেই তাঁরা দীনভাব ফুটিয়ে তোলেন। তখন মায়া ও মোহস্বরূপ ভগবান, শুদ্ধোদনের ছেলে হয়ে জন্মান। পরে তিনিই বুদ্ধরূপে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। তাঁর মায়ায় দানবেরা বেদধর্ম ছেড়ে বৌদ্ধধর্ম নিল। এভাবেই বেদধর্ম পরিত্যাগকারী একদল পাষণ্ডের সৃষ্টি হল। তারা সবসময়েই নরকের কাজগুলো করত। কলিযুগের অন্তে সবাই বেদ ছেড়ে সঙ্কর, ধর্মকঞ্চুকী, দস্যু ও অধর্মলিপ্সু হবে। বাজসনেয় বেদের (শুক্ল যজুর্বেদ) মাত্র পনেরটি বিভাগ বিদ্যমান থাকবে।
বুদ্ধ সম্পর্কে অগ্নিপুরাণের এই দৃষ্টিভঙ্গি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বৈদিক রীতিনীতি না মানা বুদ্ধকে যে জোর করে মেনে নিতে হয়েছিল তার প্রমাণ ছত্রে ছত্রে রয়েছে। ভাগবতে যে বুদ্ধকে অবৈদিক রীতি অনুসারীদের নেতা বলা হয়েছে তা আমরা আগে দেখেছি। ভাগবতের আরেক স্থানেও অক্রুরের প্রার্থনায় বলা হচ্ছে যে বুদ্ধ “দৈত্য–দানবমোহনকারী” ছিলেন। অর্থাৎ বার্তা সেই এক, বৌদ্ধ ধর্ম অনুসারী সব দৈত্য–দানব।
নমো বুদ্ধায় শুদ্ধায় দৈত্যদানবোহিনে।
ম্লেচ্ছপ্রায় ক্ষত্রহন্তে নমস্তে কল্কিরূপিণে॥
– ভাগবত পুরাণ, ১০.৪০.২২
যাইহোক, আবার আমরা মূল আলোচনায় ফিরে আসি। পুরাণের তালিকার সঙ্গে মহাবস্তু অবদান গ্রন্থের কাহিনির তুলনা করতে গিয়ে মনে হল যে পুরাণের সঞ্জয় নামের রাজাকেই মহাবস্তু অবদান উল্লেখ করেছে সুজাত নামে আর তার পুত্র ছিলেন শাক্য যিনি কপিলাবস্তুতে রাজত্ব স্থাপন করেছিলেন। মহাবস্তু অবদান অনুযায়ী সেই পুত্রের নাম ছিল ওপুর এবং তিনিই ছিলেন শাক্য বংশের প্রতিষ্ঠাতা পুরুষ। দুটি পুরাণে শাক্যের পুত্র হিসেবে শুদ্ধোদনের উল্লেখ আছে যা সত্য নয় কারণ বৌদ্ধ গ্রন্থ থেকে আমরা জানি, শুদ্ধোদনের পিতার নাম ছিল সিংহহনু বা সিংহনু বা সীহহনু, ও পিতামহের নাম ছিল জয়সেন। এক্ষেত্রে তাঁকে শাক্যবংশের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব বলে বুঝতে হবে।
আবার শ্রীলঙ্কার গ্রন্থ মহাবংশম (রাজা মহাসম্মতের বংশ নামের দ্বিতীয় অধ্যায়) অনুযায়ী কপিলাবস্তুতে শাক্য রাজ্য প্রতিষ্ঠাকারী প্রথম রাজা (নির্বাসনে আসা কুমারদের মধ্যে অগ্রজ) থেকে সিদ্ধার্থের পিতামহ বা শুদ্ধোদনের পিতা জয়সেনের মধ্যে ৮২০১০ টি প্রজন্ম বা রাজা আছে এবং একই তথ্য পি সি মুখার্জি বলেছেন (Mukherji: 1901, 7)। এই তথ্যটি আমার কাছে অতিশয়োক্তি মনে হচ্ছে কারণ এক একজন রাজার রাজত্বকাল মাত্র দশ বছর ধরলেও পুরো সময়কাল কয়েক লক্ষে গিয়ে দাঁড়ায়। তবে মহাবস্তু অবদান গ্রন্থ অনুযায়ী রাজা সুজাতের পুত্র যিনি প্রথম শাক্য রাজা হয়েছিলেন তাঁর নাম ছিল ওপুর। ওপুরের পুত্রের নাম ছিল নিপুর। নিপুরের পুত্র করণ্ডক আবার তাঁর পুত্র ছিলেন উল্কামুখ। উল্কামুখের পুত্র হস্তিকশীর্ষ এবং তাঁর পুত্র ছিলেন রাজা সিংহহনু। সিংহহনুর চার পুত্র ও এক কন্যা ছিল। পুত্রদের নাম ছিল শুদ্ধোদন, ধৌতোদন, শুক্লোদন, ও অমৃতোদন এবং কন্যার নাম ছিল অমিতা।
আবার মহাবংশম (দ্বিতীয় অধ্যায়) অনুযায়ী এই বংশ তালিকা একটু ভিন্ন। বুদ্ধদেবের বংশের আদি পুরুষের নাম সেখানে মহাসম্মত (মহা সম্রাট), যিনি ছিলেন জগতের প্রথম রাজা। তাঁর থেকে বংশের রাজারা হলেন-
মহাসম্মত > রোজ > বররোজ > কল্যাণ > বড়োকল্যাণ > উপোসথ > মান্ধাতা > চরক > উপচরক > চেতিয় > মুচল > মহামুচল > মুচুলিন্দ > সাগর > সাগরদেব > ভরত > অঙ্গিরস > রুচি > সুরুচি > পতাপ > মহাপতাপ > পনাদ > মহাপনাদ > সুদশ্শন > মহাসুদশ্শন > নেরু > মহানেরু > অচ্চিমা। তাঁদের বংশের এই ২৮ জন রাজাদের তিনটি রাজধানী কেন্দ্রিক রাজত্ব ছিল – কুশাবতী (কুশীনগর), রাজগৃহ ও মিথিলা। এঁদের পর ২২ টি গোষ্ঠীর ২৫,২,৪০৩ জন রাজা হয়েছিলেন যাদের শেষ জন ছিলেন রাজা ওক্কাকা (ইক্ষ্বাকু)।ইক্ষ্বাকুর পর রাজা হয়েছিলেন ইক্ষ্বামুখ। ইক্ষ্বামুখের পুত্র ও পৌত্রগণের নাম হল, নিপুণ, চন্দিম, শিবিসঞ্জয়, মহারাজ, বেসসান্তর, জালি, সীহবাহন, সীহসসর ইত্যাদি। রাজা সীহসসরের পুত্র ও নাতিদের সংখ্যা ছিল ৮২ হাজার আর তাদের মধ্যে কনিষ্ঠ ছিলেন বুদ্ধদেবের প্রপিতামহ জয়সেন। জয়সেনের পুত্র ছিলেন সীহহনু এবং তাঁর পুত্র ছিলেন শুদ্ধোদন। তাঁরা সকলে ছিলেন কপিলাবত্থুর (কপিলাবস্তুর) শাক্য রাজা।
অম্বট্ঠ সূত্র অনুযায়ী যে চার রাজকুমার নির্বাসনে গিয়ে শাক্য রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তাঁরা হলেন, ওক্কামুখ, করণ্ডু, হত্থিনিক এবং সিনিপুর।
আমরা ভারতীয় বৌদ্ধ গ্রন্থ থেকে সিদ্ধার্থ অবধি শাক্য বংশের ধারা দেখলাম আবার শ্রীলংকার মহাবংশম গ্রন্থ থেকেও সেখানে প্রচলিত বংশ তালিকা দেখলাম। এবারে আমরা দেখব যে তিব্বতীয়/চীনা সূত্র থেকে এই বিষয়ে কী কী তথ্য পেতে পারি।
তিব্বতীয় বিনয় পিটক বা দুল্ব পিটকে লেখা (f439-445, translated by Rockhill: 1884, 11-13) আছে যে পোতলের রাজা ভরদ্বাজের পুত্র সন্তান না থাকায় তাঁর বড়ো ভাই গৌতমের পুত্রদের (আগেই এর কথা বলা হয়েছে) মধ্যে অগ্রজকে রাজা করা হয়েছিল। তিনি নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যাওয়ার পর তাঁর কনিষ্ঠ ভাইকে রাজা করা হয়েছিল এবং তিনি ইক্ষ্বাকু নাম নিয়েছিলেন। তাঁর একশো বংশধর পোতলে রাজত্ব করেছিলেন, যার মধ্যে শেষ ছিলেন ইক্ষ্বাকু বিরূঢ়ক (ফ্যাগ্স-স্কিট্স-পো)। এর পরের কাহিনি অনেকটাই ভারতীয় গ্রন্থের মতো, যেখানে বিরূঢ়ক ছিলেন রাজা সুজাত। বিরূঢ়ক তাঁর ছোটো রানির পুত্র রাজ্যানন্দ (র্গ্যাল-স্রিদ্ ডগালি)-কে রাজা বানিয়েছিলেন আর বড়ো রানির চার পুত্র ও কন্যাদের নির্বাসনে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। সেই চার পুত্রের নাম ছিল উল্কামুখ (স্কার-ম্দাহ্ গদং), করকর্ণ (লাগ্ র্না), হস্তিঞ্জক (গ্লাঙ-পো চে হ্দুল), ও নুপুর (র্কাং-গডিব্-চান)। বিরূঢ়কের চার পুত্র নিজেদের বোনদের বিবাহ করেন এবং কপিলাবস্তু নগর স্থাপন করে শাক্য রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। রাজবংশ অনেক বড়ো হয়ে ওঠায় তার থেকে একটি শাখা বেরিয়ে দেবদহকে রাজধানী বানিয়ে কোলিয় রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেছিল। ওদিকে বিরূঢ়কের মৃত্যুর পর রাজ্যানন্দ পোতলের রাজা হয়ে বসলেও তিনি নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যান। তখন বড়ো রানির চার পুত্র ক্রমানুযায়ী পোতলে রাজা হয়েছিলেন কারণ প্রত্যেকেই নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যাচ্ছিলেন। নুপুরের পুত্র ছিলেন বশিষ্ঠ (ঙাস-হ্জোগ), এবং তাঁর উত্তরসূরি ছিলেন সংখ্যায় ৫৫০০০ জন যারা কপিলাবস্তুতে রাজত্ব করেছিলেন (পোতল ও কপিলাবস্তু একই ধরা হয়েছে বা দুই রাজ্য মিশে যায়)। এদের মধ্যে শেষ ছিলেন ধন্বদুর্গ (গ্জু-ব্র্তারি), যার দুটি পুত্র ছিল – সিংহহনু (সেঙ্গ-গে ফিগ্রাম) ও সিংহনাদ (সেঙ্গ-গে ই স্গ্র)। সিংহহনুর চার পুত্রের নাম হল, শুদ্ধোদন (জাস্-গ্তসাঙ), শুক্লোদন (জাস্-ডকার), দ্রোনদন (ব্রে-বো জাস্), ও অমৃতোদন (ত্স’দ-মেদ জাস্) এবং চার কন্যার নাম হল সুদ্ধা (গ্তসাঙ-মা), সুক্লা (ডকার-মো), দ্রোনা (ব্রে-বো-মা) ও অমৃতা (ত্স’দ-মেদ মা)। শুদ্ধোদনের দুই পুত্র, ‘মহামতি’ (বুদ্ধদেবকে বোঝাচ্ছে) ও আয়ুযুত নন্দ (ডগাহ-বো) [ইনি মহাপ্রজাপতি গৌতমীর পুত্র]।
চারটি উৎসের তথ্য মোটামুটি সাজালে শাক্য বংশের যে তালিকা পাওয়া যায় তা এই রকম –

বিভিন্ন গ্রন্থে শাক্য বংশের রাজার সংখ্যা অনেক অতিরঞ্জিত করে দেখানো হলে কতকগুলি তথ্য পরিষ্কার যে তাঁদের মধ্যে কোনো এক পুরুষ (কয়েক ভাই একসঙ্গে) কপিলাবস্তুতে রাজ্য স্থাপন করা ইক্ষ্বাকু বংশের প্রথম রাজা ছিলেন যাকে আবার পুরাণে শাক্য বলে বলা হয়েছে। মহাবস্তু অবদানে তাঁর নাম দেওয়া আছে ওপুর। দুল্ব পিটকে প্রথম রাজার নাম উল্কামুখ। এই উল্কামুখ হয়তো মহাবংশমের ‘ইক্ষ্বামুখ’ বা অম্বট্ঠ সূত্রে “ওক্কামুখ” হয়েছেন। মহাবস্তু অবদান শুদ্ধোদনের পিতার নাম হস্তিকশীর্ষ বলেছে আর মহাবংশমের মতে তা জয়সেন যখন দুল্ব পিটকের মতে তিনি ছিলেন সিংহহনু। মহাবস্তু অবদান যেখানে সিংহহনুর চার পুত্র ও এক কন্যা ছিল বলেছে সেখানে মহাবংশমে একটি পুত্র ও একটি কন্যা অতিরিক্ত যোগ করা হয়েছে। মহাবংশম মতে সীহহনুর পাঁচ পুত্র, শুদ্ধোদন, ধোতদন, শক্যদন, শুক্যদন ও অমিতদন এবং দুই কন্যা, অমিতা ও পমিতা। দুল্ব পিটকে শুদ্ধোদনের চার পুত্র ও চার কন্যা।
বুদ্ধদেবের জন্মনাম, বর্ণ, জাতি, গোত্র ইত্যাদির সন্ধান করা মোটামুটি আমাদের হয়ে গেছে। ওপরের বিস্তৃত আলোচনায় আমরা সিদ্ধার্থের এইসব তথ্যগুলিকে প্রয়োজনীয় প্রমাণ সহ স্থাপন করতে পেরেছি। তথ্যগুলি নিয়ে যা ধোঁয়াশা ছিল তা আশা করি দূর হয়েছে।
