লুম্বিনীর প্রত্নতত্ত্ব কি বুদ্ধদেবের হদিশ দেয়?

লুম্বিনীর প্রত্নতত্ত্ব কি বুদ্ধদেবের হদিশ দেয়?

লুম্বিনীর খনন ও পদ্ধতিগতভাবে এর অতীতকে খুঁজে বার করার প্রথম প্রচেষ্টা করেছিলেন বাঙালি প্রত্নতত্ত্ববিদ পূর্ণ চন্দ্র মুখার্জি বা পি সি মুখার্জি। তিনি ১৮৯৯ সালে কপিলাবস্তুকে খুঁজে বার করার প্রচেষ্টায় লুম্বিনীর কাছে তিলৌরাকোটে একটি প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ চালিয়েছিলেন ও খনন করেছিলেন। তিনি রুম্মিনদেঈ বা লুম্বিনীতে এসেছিলেন এবং সেখানেও খনন করেছিলেন। আবিষ্কারের অল্প সময়ের মধ্যেই ফিউরারের অন্যান্য কাজের মধ্যে জালিয়াতি ধরা পড়ে এবং ফিউরারের চাকরি যায়। পরবর্তীকালে পূর্ণ চন্দ্র মুখার্জীকে লুম্বিনী, সাগরওয়া (তথাকথিত শাক্য হত্যাকাণ্ডের স্থান), কুদান সহ তরাইয়ের একটি বিস্তৃত অঞ্চল জরিপ ও খননের জন্য নিযুক্ত করা হয়েছিল।

১৮৯৯ সালে মুখার্জি লুম্বিনীতে খনন করেছিলেন। তিনি মায়াদেবী মন্দিরের দক্ষিণ দিকে খনন চালিয়েছিলেন আর উত্তর ও পশ্চিম দিকের মতোই সেখানে কারুকার্যময় ইটের তৈরি ভিত্তিভূমি পেয়েছিলেন। তিনি প্রত্যেকটি দিকে সাতখানি করে ‘রেখ’-এর মতো এগিয়ে থাকা অংশ দেখেছিলেন যা তাঁর মতে শিল্পশাস্ত্র অনুযায়ী সপ্তরথ মন্দির স্থাপত্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তিনি জন্ম–ভাস্কর্যটি উদ্ধার করে সেটিকে সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করতে চেষ্টাও করেছিলেন।

লুম্বিনীতে খননের পাশাপাশি মুখার্জি তখনকার ধ্বংসাবশেষের যে অবস্থায় দেখেছিলেন তার একটি সুস্পষ্ট বর্ণনা দিয়েছিলেন ও সেগুলির ছবি এঁকেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তাঁর খনন ও তদন্তের ফলাফল বুদ্ধের জন্মস্থান নিয়ে গবেষণা ও অধ্যয়নের প্রাথমিক ভিত্তি হয়ে ওঠে। ফিউরারের আবিষ্কার করা অশোক স্তম্ভের নীচের অংশের খনন চালিয়েছিলেন পি সি মুখার্জি আর তখনই সেই স্তম্ভের নীচে থাকা বর্গাকার স্থাপত্যের কথা জানা যায় যার ওপর স্তম্ভটি খাড়া করে দাঁড় করিয়ে রাখা ছিল। একই সঙ্গে তিনি মায়াদেবী মন্দির ও তার আশপাশের কিছু স্থানে খনন করেছিলেন। এর ফলস্বরূপ আমরা প্রথম মায়াদেবীর মন্দিরের কাঠামো এবং তার উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণ প্রান্তে কারুকার্যময় ইট দিয়ে তৈরি মন্দিরের ভিত্তির বিষয়ে জানতে পারি। গুপ্ত যুগের মায়াদেবী মন্দিরের বিষয়ে তাঁর বর্ণনা খুবই আকর্ষণীয়। তাঁর খনন থেকেই আমরা মন্দিরের চার ধারে থাকা পবিত্র স্তূপগুলির বিষয়ে জানতে পারি।

লুম্বিনীর প্রত্নতত্ত্ব
লুম্বিনীর প্রত্নতত্ত্ব

এরপর বহুদিন লুম্বিনীতে কোনো প্রকারের প্রত্নতাত্ত্বিক খোঁজ চালানো হয়নি। ১৯৩২ থেকে ১৯৩৯ পর্যন্ত, মায়াদেবী মন্দির এবং এর আশপাশের এলাকায় খনন করেছিলেন কেশর সামশের জে বি রানা। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল লুম্বিনীর ধ্বংসাবশেষের প্রকৃত অবস্থা বুঝে সেগুলিকে পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা চালানো, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তাঁর কাজের ও সমীক্ষার ফলাফল আজ অবধি প্রকাশ করা হয়নি। যাইহোক, তাঁর নেওয়া মায়াদেবীর মন্দিরের উন্মুক্ত অংশের ছবিগুলি দেখে অনেকটা ধারণা পাওয়া যায় বিশেষ করে স্তম্ভের নীচের বেদিটির। একই সঙ্গে খননকাজের সময় লুম্বিনী পরিদর্শন করে যাওয়া সেন্নোসুকে ওকাদা (Sennosuke Okada) এবং সুশো ব্যোডো (Tsusho Byodo) এবং খননকাজের পরে ঘুরে যাওয়া শিন্ডো ইয়ামামোতো (Shindo Yamamoto)-র নেওয়া ছবিগুলি তখনকার লুম্বিনীর বিষয়ে বাড়তি তথ্য সংযোজন করে।

তবে কেশর-এর খননে পি সি মুখার্জি যে কারুকার্যময় ইটগুলির কথা লিখেছিলেন সেগুলিকে আরও স্পষ্টভাবে দেখা গেল। এইসব ছবিগুলি থেকে আরও বোঝা গেল যে ভিত্তিভূমির ওপরের অংশের সঙ্গে আদি মায়াদেবী মন্দিরের আদৌ কোনো যোগ নেই। ভিত্তির চারপাশ জুড়ে ইটের তৈরি বর্গাকার ছোটো ছোটো কক্ষ ছিল যেগুলির ভেতরে মাটি ফেলে সমান হয়ে দেওয়া হয়েছিল। অতএব, এবারে স্পষ্ট হয়ে গেল যে আদি মায়াদেবী মন্দিরটির ভিত্তির ওপরের অংশে একাধিক ছোটো ছোটো কক্ষ নির্মাণ করা হয়েছিল। দুটি কক্ষের মধ্যে তফাত শুধু একটি ইটের দেওয়ালের। অশোক স্তম্ভের আশপাশেও কয়েকটি ছোটো ছোটো স্তূপ পাওয়া গিয়েছিল। তবে কেশরের কাজটি নিয়ে বেশ বিতর্কের জন্ম হয়েছিল।

১৯৬২ সালে বিখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ দেবলা মিত্র এখানে খনন করেছিলেন। অশোক স্তম্ভের ভিত্তি নির্ণয় করার জন্য তাঁর খনন মূলত স্তম্ভের পশ্চিম দিকে সীমাবদ্ধ ছিল। তিনি চুনার বেলেপাথর দিয়ে তৈরি স্তম্ভটিতে মৌর্য শৈলীর পালিশ বা মসৃণতা লক্ষ করেছিলেন। তিনি স্তম্ভের গোড়া অবধি পৌঁছতে চেয়েছিলেন যাতে এটির অমসৃণ অংশটি যে কতোটা তা দেখা যায় কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। তিনি পালিশ করা অংশের মাত্র ৫১ সেন্টিমিটার নীচে অবধি যেতে পেরেছিলেন তারপর স্তম্ভটি অল্প হেলে যাওয়ার কারণে নেপালি কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত খননে আপত্তি জানিয়েছিল। যাইহোক, তিনি লুম্বিনীতে কেশর শমসের রানা দ্বারা খনন করা বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নবস্তুর একটি তালিকা প্রস্তুত করে যেতে পেরেছিলেন। কিন্তু লুম্বিনী নিয়ে দেবলা মিত্রের পর্যবেক্ষণ খুব একটা সদর্থক ছিল না। তিনি অভিযোগ করেছিলেন যে লুম্বিনীর স্থাপত্যগুলিকে রক্ষা করতে মূলত কোনো কাজই করা হয়নি (Mitra: 1972, p. 196)। তিনি এমনও বলেছিলেন যে ১৯৫৭ সালে পরিদর্শনের সময় তিনি যে ১৬টি ছোট স্মারক বা ভোটিভ স্তূপের একটি গুচ্ছ দেখেছিলেন, তা সম্পূর্ণরূপে ভেঙে ফেলা হয়েছিল এবং ১৮৯৯ সালে মুখার্জির খননে পাওয়া বেশ কয়েকটি কাঠামো একদম অদৃশ্য হয়ে গেছে। কেশর শমসের রানার খননকাজেরও সমালোচনা করে দেবলা মিত্র বলেছিলেন যে অবৈজ্ঞানিক ভাবে খননের ফলে অনেক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত এবং ধ্বংস হয়েছে (পড়ুন ‘করা হয়েছে’)। এমনকি কেশর শমসের রানার খননের সময় পাওয়া বেশ কিছু প্রত্নবস্তু এক বৌদ্ধ ভিক্ষুর রান্নাঘরে পড়ে থাকা অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। তিনি লুম্বিনী ধর্মোদয় কমিটির একজন সদস্য ছিলেন এবং তাঁর কোনো ধারণা ছিল না যে সেই সব অমূল্য বস্তু কোথা থেকে পাওয়া গিয়েছিল (Mitra: 1972, p. 197)

পরবর্তীকালে, ১৯৭০ ও ১৯৭১ সালে লুম্বিনীতে নেপালের প্রত্নতত্ত্ব দপ্তর দ্বারা খনন কাজ আবার শুরু করা হয়েছিল। সেবারে প্রধান উদ্দেশ্য ছিল অশোক স্তম্ভলেখে উল্লিখিত লুম্বিনী গ্রামটিকে শনাক্ত করা। খননে দেখা যায় সে গ্রামের অস্তিত্ব ছিল আজকের পুলিশ থানার আশপাশের অঞ্চলে এবং সেখানকার আদি বসতির সময়কাল সম্ভবত সাধারণ পূর্বাব্দের ষষ্ঠ শতাব্দীর। একই সঙ্গে আগের খননে উঠে আসা কাঠামোগুলির রক্ষণাবেক্ষণে জোর দেওয়া
 হয়েছিল। এই খননে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বি কে রিজাল ও টি এন মিশুরা। মায়াদেবী মন্দিরের আশপাশের এলাকা থেকে বেশ কতকগুলি স্তূপ ও বিহার খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল। ১৯৬৭ সালে জাতিসংঘের মহাসচিব ইউ থ্যান্ট লুম্বিনী ভ্রমণ করেন এবং লুম্বিনীকে একটি আন্তর্জাতিক কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। ১৯৭২ সালে  জাপানি স্থপতি কেনজো ট্যাংগে-কে একটি মাস্টারপ্ল্যান বানাবার জন্যে দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেই কাজ শেষ
 হয়েছিল ১৯৭৮ সালে।
 

লুম্বিনীর পুনর্গঠনের জন্য জাপান বৌদ্ধ ফেডারেশনের অত্যন্ত আগ্রহ ছিল এবং তারা এই বিষয়ে জাতিসংঘকে সমর্থন করেছিল। তখন ঠিক করা হয়েছিল যে ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সালের মধ্যে গড়ে ওঠা মায়াদেবী মন্দিরটিকে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে ফেলা হবে। পি সি মুখার্জির রিপোর্ট ও কেশর রানার ছবিগুলোর ভিত্তিতে মায়াদেবীর মন্দিরের আদি ভিত্তিভুমি ও তার পরিকল্পনার সম্বন্ধে বোঝার কাজ শুরু হয়েছিল। আর তখনই খুলে যেতে শুরু করল অন্ধকার পর্দার পিছনে থাকা মায়াদেবী মন্দিরের অতীত।

লুম্বিনীর প্রত্নতত্ত্ব

লুম্বিনীতে খননের একটি লম্বা ইতিহাস আছে। প্রাথমিকভাবে বোঝা গিয়েছিল যে মায়াদেবী মন্দিরটি দীর্ঘ সময়কালে সাতটি পর্যায়ের মধ্যে দিয়ে গেছে। সেগুলো হল প্রাক অশোক (চতুর্থ সাধারণ পূর্বাব্দ), অশোক(তৃতীয় সাধারণ পূর্বাব্দ), শুঙ্গ(দ্বিতীয়-প্রথম সাধারণ পূর্বাব্দ), কুষাণ(প্রথম-দ্বিতীয় শতক), আদি গুপ্তযুগ, অন্ত্য গুপ্তযুগ(তৃতীয়–নবম শতক), মল্ল(নবম-ত্রয়োদশ শতক) (The Archaeological Activities in Lumbini। Tara Nanda Mishra। Ancient Nepal. Journal of Department of Archaeology, Govt of Nepal. Issue 139, Jun 1996 pp36) এই পর্যায়গুলোর আবার কিছু ক্ষেত্রে কিছু উপ-পর্যায় দেখা যায়।

আদি বেদিটি মূলত আয়তাকার। এর বাইরের দিকের পূর্ব–পশ্চিমের দেওয়াল ছিল ২৬ মিটার লম্বা আর উত্তর-দক্ষিণের দেওয়াল ২১ মিটার লম্বা। ভেতরে একটি বর্গাকার কক্ষকে ঘিরে রেখেছে চারটি দেওয়াল যার পূর্ব–পশ্চিমের দৈর্ঘ্য ২০.৪০ মিটার এবং উত্তর-দক্ষিণে ১৫.৭০ মিটার। এই গর্ভগৃহের মূল খুঁটিগুলি ছিল পশ্চিম ও পূর্ব দিকে। গর্ভগৃহের ভেতরে তিনটি সারিতে বিন্যস্ত ১৫খানি ক্ষুদ্র কুঠুরি ছিল যার পূর্ব–পশ্চিম বরাবর ৫টি ও উত্তর-দক্ষিণ বরাবর ৩টি কুঠুরি। সব কয়টি কুঠুরি ইটের তৈরি। এই কুঠুরিগুলিও বিভিন্ন সময়ে নির্মিত হয়েছিল আর পশ্চিম দিকের কুঠুরিগুলি বেশি পুরনো।

দ্বিতীয় পর্যায়ে, এই গর্ভগৃহের ওপরে একটি ছোটো কক্ষ বানানো হয়েছিল। তৃতীয় পর্যায়ে ৭ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি বর্গাকার বেদি তৈরি হয়েছিল। চতুর্থ পর্যায়ে এই কাঠামোগুলির অল্পস্বল্প পরিবর্তন ও সংস্কার ছাড়া তেমন কিছু উল্লেখযোগ্য বদল করা হয়নি। এরপর পঞ্চম পর্যায়ে মূল বেদিটিকে বাড়িয়ে আয়তাকার রূপ দেওয়া হয়েছিল (পূর্ব–পশ্চিমে ১৭.৫০ মিটার ও উত্তর–দক্ষিণে ১৫.৪০ মিটার।) ষষ্ঠ পর্যায়ে বুদ্ধকে উৎসর্গ করে বেদির ওপরে একটি বুরুজ (tower) নির্মাণ করা হয়েছিল। এই বুরুজ ভেঙে পরার পর সপ্তম পর্যায়ের মন্দির নির্মিত হয়েছিল। একটি বিষয় কিন্তু বলতেই হবে যে প্রথম থেকে সপ্তম পর্যায় পর্যন্ত যেভাবেই মন্দির নির্মাণ হোক না কেন, গর্ভগৃহের (কক্ষ ২) মাঝে থাকা একটি পাথরের টুকরো বা জন্ম–চিহ্ন পাথরটিকে কেন্দ্র করেই খুব সতর্কতার সঙ্গে মন্দিরগুলির পরিকল্পনা করা হয়েছিল সেই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

মায়াদেবী মন্দিরটি ভেঙে ফেলার পর যে অনুসন্ধান চালানো হয়েছিল তাতে এই সব চমকে দেওয়ার মতো তথ্য পাওয়া যায়। একদম আদি মন্দিরে কিন্তু পাথরের ব্যবহার হয়েছিল। উত্তর দিকের শিবালিক পাহাড় থেকে বেলেপাথর নিয়ে এসে সেগুলিকে মোটামুটি ৭০ সেমি X ৪০ সেমি X ১০ সেমি আকারে কেটে গর্ভগৃহে রাখা হয়েছিল এগুলি কিন্তু অশোকের সময়ের আগের স্থাপনা। তাহলে বোঝা যাচ্ছে যে অশোকের সময়ের আগেই সেখানে একটি মন্দির (আমরা পরে দেখব যে সেটি আজকের উন্মুক্ত ‘থান’ জাতীয় অর্চনাস্থল ছিল) ছিল যেখানে জন্ম–চিহ্ন পাথরটি দিয়ে চিহ্নিত করা ছিল।

লুম্বিনীর প্রত্নতত্ত্ব

এই ধারণার পক্ষে বলিষ্ঠ প্রমাণ হচ্ছে যে জন্ম-চিহ্ন পাথরটিও এইসব প্রাচীন স্থাপনার পাথরের মতো শিবালিক বেলেপাথর, অশোকের সময়ে ব্যবহৃত চুনারের বেলেপাথর নয়। দ্বিতীয় পর্যায় থেকে কুঠুরিগুলিতে অশোক স্তম্ভে ব্যবহৃত পাথরের টুকরো (কক্ষ ২), উত্তরের মসৃণ কৃষ্ণপাত্রের অবশেষ, লাল পাত্র, পোড়ামাটির বস্তু (কক্ষ ৫ ও ৮) ইত্যাদি পাওয়া গেছে। যার থেকে মনে হয় যে অশোকের সময়ে হয়তো আগের মন্দিরের চলে আসা পাথরটিকেই জন্ম–চিহ্ন পাথর হিসেবে স্থাপনা করা হয়েছিল।

জন্ম–চিহ্ন পাথরটি রাখা ছিল গর্ভগৃহ বা সাবেক ২ নং কক্ষে। সেই কক্ষের পশ্চিম দিকের দেওয়াল যখন ভেঙে পড়েছিল তখন সেখান থেকে অশোক স্তম্ভে ব্যবহৃত বাড়তি পাথরের বড়ো বড়ো খণ্ড পাওয়া গিয়েছিল। সেইসব পাথরের খণ্ডগুলি সরিয়ে ফেলতেই দেখা মিলেছিল জন্ম–চিহ্ন পাথরটির। প্রথম বা দ্বিতীয় পর্যায়ে নির্মিত ৮ নং কক্ষ থেকে পাওয়া নমুনার কার্বন ডেটিং বলছে যে তাদের বয়স প্রায় সাধারণ পূর্বাব্দের দ্বিতীয় শতাব্দী। অবাক করা বিষয় হল যে ৮, ২ ও ৫ নং কুঠুরিগুলি থেকে অশোক স্তম্ভের পাথরের টুকরো, উত্তরের মসৃণ কৃষ্ণপাত্রের অবশেষ, লাল পাত্র ইত্যাদি সব বিভিন্ন সময়কালের বস্তু একসঙ্গে পাওয়া গেছে। অর্থাৎ আগের মন্দিরটিকে অশোকের সময়ে ভালোভাবে সংস্কার করা হয়েছিল। সেই সময়ে গর্ভগৃহটিকে নবরূপ দান করে সেখানে আগের জন্ম–চিহ্ন পাথরটিকে ভালোভাবে স্থাপনা করা হয়েছিল।

২০১১ থেকে ২০১৩ অবধি ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়, লুম্বিনী উন্নয়ন ট্রাস্ট ও নেপাল প্রত্নতত্ত্ব দপ্তরের খননে এক অবিশ্বাস্য আবিষ্কার সামনে এল। তাঁরা এখানে মৌর্য যুগের আগের স্থাপনার প্রমাণ নিয়ে এলেন যার একটিই অর্থ হয় যে অশোকের আগেই এখানে মন্দির ছিল। শুধুমাত্র প্রাক মৌর্য যুগের নয়, তাঁরা এখানে লৌহ যুগের জনপদেরও হদিশ পেয়েছেন (Coningham et al: 2013)। আমরা বরং দেখে নিই যে এখানে কোন কোন সময়কালের সাংস্কৃতিক উপাদান পাওয়া গেছে।

লুম্বিনীর প্রত্নতত্ত্ব

প্রথম প্রাক-মৌর্য পর্যায়

লুম্বিনীতে সাম্প্রতিক খননে ১৩০০ সাধারণ পূর্বাব্দের লৌহ যুগের অবশেষ পাওয়া গেছে। সবচেয়ে প্রাচীন নমুনা পাওয়া গেছে লুম্বিনী গ্রামের ধ্বংসাবশেষে (Lumbini Village Mound)। এখানে একটি খননের স্থানে ১৩০০ থেকে ৬০০ সাধারণ পূর্বাব্দ অবধি সময়কালের অবশেষ পাওয়া গেছে। প্রাচীনতম বসতির স্তরটির সময়কালের সঙ্গে 
নিকটবর্তী গোঠিহওয়াতে স্তূপের আশপাশে পাওয়া বসতির স্তরের সময়ের কাছাকাছি। এর থেকে বোঝা যাচ্ছে যে কৃষিজীবি সম্প্রদায়ের মানুষেরা সাধারণ পূর্বাব্দের প্রথম সহস্রাব্দেই তরাই অঞ্চলে এসে বসতি স্থাপন করেছিল। বন্যা বিধৌত ভূমির ওপরে একটি অনুচ্চ মাটির ঢিবির ওপরে সেই আদি জনপদ গড়ে উঠেছিল। জরিপ ও গবেষণায় মায়াদেবী মন্দির চত্বরের উত্তর-পশ্চিম দিকে প্রবাহিত সেই সময়ের একটি পলি দিয়ে জমে যাওয়া প্রাচীন নদী খাতেরও অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এই সময়ে মন্দির অঞ্চলে কোনো বসতির চিহ্ন পাওয়া না গেলেও এখানকার মাটির মাইক্রোমরফোলজি (soil micromorphology) পরীক্ষার ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে যে লুম্বিনী উদ্যান অঞ্চলটি সম্ভবত প্রাচীন সেই জনপদবাসীদের কৃষিকার্যের জায়গা ছিল।

দ্বিতীয় প্রাক-মৌর্য পর্যায় 

গ্রামের ধ্বংসাবশেষ থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে সেখানে সাধারণ পূর্বাব্দের ষষ্ঠ শতাব্দী অবধি মানুষ বাস করত। এই পর্যায়ে এসে প্রথম মায়াদেবী মন্দিরে স্থাপনার কাজের প্রমাণ পাওয়া গেল, দেখা গেল যে সেখানে পলিমাটি দিয়ে একটি অনুচ্চ ঢিবি বানানো হয়েছিল। ঢিবির মধ্যে দিয়ে একটি রেখা বরাবর খুঁটি পোঁতার গর্ত পাওয়া গেল। ঢিবির মাটির মাইক্রোমরফোলজি পরীক্ষার ফলাফল ভীষণ কৌতূহলোদ্দীপক, যা বলছে যে একটি ছোটো ক্ষেত্র ঘিরে কাঠের বেড়া বা পরপর কিছু খুঁটি পোঁতা ছিল। খুঁটি বা বেড়া দিয়ে ঘেরা সেই ক্ষেত্রের মধ্যে কোনো কিন্তু স্থাপনা ছিল না। এমন যত্নে ঘিরে রাখা স্থানে কি তাহলে কিছুই ছিল না? একদম যে কিছুই কিছু ছিল না তা নয়, তবে কোনো স্থাপত্য ছিল না। মাটির স্তর ও বিভাগ (stratigraphy and soil sections) পরীক্ষায় জানা গেল যে সেই ঘিরে থাকা অংশে ছিল একটি গাছ, তার শিকড়ের উল্লেখযোগ্য নিদর্শন পাওয়া গেছে। কার্বন ডেটিঙে এর সময়কাল পাওয়া গেছে ৮০১ থেকে ৫৪৬ সাধারণ পূর্বাব্দ পর্যন্ত। এখানেই শেষ নয়, প্রাচীন পোড়ামাটির পাত্রের অজস্র ভাঙা টুকরো (Furthermore, ceramics recovered from the earliest cultural deposits included Cord Impressed Ware, which is found within regional Iron Age ceramic assemblages) ও কাঠকয়লা বুঝিয়ে দিচ্ছে যে সেই গাছটি যথেষ্ট পবিত্র ছিল। লুম্বিনীর প্রথম মন্দিরে আপনাকে স্বাগত, হে পাঠক।

তৃতীয় প্রাক-মৌর্য পর্যায়

লুম্বিনীর প্রত্নতত্ত্ব

অনেক দিন মন্দিরটি এমনই খোলামেলা ছিল, তারপর সেই উন্মুক্ত স্থানের চারপাশে ইটের প্রাকার (kerb) দেওয়া হয়েছিল। ধানের ভুসি মাটিতে মিশিয়ে বানানো সেই ইটগুলিকে ‘বাহুবলী’ বললে ভুল বলা হয় না, এক একটি ইটের দৈর্ঘ্য হল ৫২ সেমি, প্রস্থ ৩৮ সেমি ও বেধ ৭.৫ সেমি; ওজন প্রায় ১৯ কেজি। ইটগুলির এক দিকে আঙুলের ছাপ দেওয়া রয়েছে, আর এত গভীর সে দাগ যে মনে হয় ইটগুলি বানানোর সময়ে কোনো আচার পালন করা হয়েছিল। যদিও বেশিরভাগ ইটই ভাঙা অবস্থায় পাওয়া গেছে।

লুম্বিনীর প্রত্নতত্ত্ব

খননে দেখা গিয়েছিল যে ইটের প্রাকার আগের প্রাচীন মন্দিরকে ঘিরেই নির্মিত হয়েছিল। পূর্ব–পশ্চিমে প্রায় ২১ মিটার ও উত্তর–দক্ষিণে প্রায় ২৬ মিটার ক্ষেত্র ঘিরে এই প্রাকার বিস্তৃত ছিল। মাটির মাইক্রোমরফোলজি পরীক্ষায় দেখা যাচ্ছে যে তখনও কিন্তু মাঝের উন্মুক্ত স্থানটিতে কোনো স্থাপত্য বা ইটের কোনো স্থাপনা গড়া হয়নি সেই অংশটি যেমন ফাঁকা ছিল তেমনই রয়েছে। ইটের প্রাকার অনেক দিন ছিল। তিনবার সেই প্রাকারের পুনর্গঠন ও সংস্কার হয়েছিল। কিছু স্থানে প্রাকারের ওপরে পলেস্তারার নিদর্শন মিলেছে। 

লুম্বিনীর প্রত্নতত্ত্ব

মৌর্য যুগের মন্দির

লুম্বিনীর অন্যতম উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য হল অশোক স্তম্ভ, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ২৪৯ সাধারণ পূর্বাব্দে সম্রাট অশোকের লুম্বিনী পরিদর্শনের সঙ্গে সঙ্গে লুম্বিনীর মন্দিরের পুনর্গঠন করিয়েছিলেন। এবারেই প্রথম মন্দিরের রূপ অনেকটা পরিবর্তন হয়েছিল। আবার অশোকের তীর্থযাত্রা ঘটনাটি প্রাক মৌর্য মন্দিরের অস্তিত্বের যথেষ্ট প্রমাণ দেখায় কারণ তাহলে বোঝা যায় যে অশোকের সময়ের আগে থেকেই লুম্বিনী পবিত্র স্থান বা তীর্থ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। মন্দির ছাড়াও অশোক লুম্বিনীতে একটি বিহার, স্তম্ভ ও অনেকগুলি স্তূপের নির্মাণ করিয়েছিলেন যেগুলির কথা আমরা আগেই পড়েছি। মৌর্য যুগে নির্মিত মন্দিরের দুইটি পর্যায় আছে।

প্রথম পর্ব – অশোকের সময়ে আগের মন্দিরের আমূল পরিবর্তন ঘটেছিল। মন্দির ঘিরে দুইটি ইটের প্রাচীর ছিল। মন্দিরের বাইরে চাতাল বানানো হয়েছিল আর ভেতরে ইট বিছিয়ে মেঝে নির্মাণ করা হয়েছিল। সেই মেঝের ওপরে নয়টি কুঠুরি নির্মাণ করা হয়েছিল, তিনটি কুঠুরি এক একটি সারিতে রেখে সেইরকম মোট তিনখানি সারি ছিল। দেড় মিটার গভীর কুঠুরিগুলির মধ্যে আটখানার ভেতরে মাটি দিয়ে ভরাট করে রাখা হয়েছিল। শুধু একটি কুঠুরির (২নং) মধ্যে ছিল ইট দিয়ে গঠিত স্তরে স্তরে সাজান বেদির মতো স্থাপনা আর তার ওপরে রাখা ছিল শিবালিক কংগ্লোমারেট বেলেপাথরের টুকরোটি সম্ভবত যা বুদ্ধদেবের জন্মের স্থানকে চিহ্নিত করেছিল। মন্দিরকে ঘিরে রাখা ভেতরের ও বাইরের প্রাচীরের ভিত খুঁড়ে তাতে ভাঙা ইট ফেলে কাঠামো স্থাপনার উপযুক্ত করে তোলা হয়েছিল। মন্দিরের উত্তর ও পশ্চিম দিকে একপ্রস্থ ইট V এর মতো করে সারি বেঁধে বিছিয়ে (A single course of bricks was laid in a herringbone pattern) চাতাল তৈরি করা হয়েছিল। মন্দিরের ভেতরেও ছিল একই ধরনের মেঝে।

দ্বিতীয় পর্ব – অশোকের মন্দির তৈরি হওয়ার অল্প কিছুদিন পরেই মন্দিরকে পুনর্গঠন করাতে হয়েছিল। এত অল্প সময়ের মধ্যে এই কাজ কেন জরুরি হয়ে পড়েছিল তা সঠিকভাবে না জানা গেলেও মন্দিরের নতুন নির্মাণের খুঁটিনাটি দেখে বিশেষজ্ঞদের ধারণা যে আগের নকশার কিছু কাঠামোগত সমস্যা ছিল। তাই সেগুলি ঠিক করতে এবং ওই এলাকায় আসা নিয়মিত বন্যা থেকে মন্দিরকে স্থায়িত্ব দিতে এইসব পরিবর্তনগুলি করা হয়েছিল। মন্দিরের ভেতরে পূর্ব ও পশ্চিম দিকে ৩ টি কুঠুরি যুক্ত করে মোট কুঠুরির সংখ্যা ৯ থেকে বাড়িয়ে ১৫ করা হয়েছিল (আগেই আলোচিত)। মন্দিরের মেঝেটাকেও কিছুটা উঁচু করা হয়েছিল। এইসময় একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছিল, ২ নং কক্ষের জন্ম-চিহ্ন পাথরটিকে ইট দিয়ে ঢেকে ফেলা হয়েছিল। মনে হয় পাথরটির সুরক্ষার কারণেই এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। দুইটি সীমানা প্রাচীরকে অবলম্বন দিয়ে মাঝে মাঝে ইটের স্থাপনা দেওয়া হয়েছিল।  সাম্প্রতিক খননে জানা গেছে যে অশোকের মন্দির নির্মাণের এই পর্বে পোড়ামাটির ছাউনি টালির (
ceramic roof tiles) ব্যবহার হয়েছিল। মন্দিরের সীমানা বরাবর বহির্ভাগের অংশে এই টালির ভগ্নাবশেষ পাওয়া গেছে যা দেখে মনে হয় যে শুধুমাত্র মন্দিরের বাইরের প্রান্তে টালি দেওয়া ছাদ ছিল এবং মন্দিরের মাঝের অংশটি আগের মতোই উন্মুক্ত ছিল৷ এটি শুধুমাত্র অনুমান নয় কারণ উন্মুক্ত অংশের মাটির মাইক্রোমরফোলজি পরীক্ষা সেখানে বড়ো বড়ো প্রাচীন গাছের শিকড়ের প্রমাণ পেয়েছে।(The absence of any tile fragments in the central areas in particular suggests that only the outer edges of the temple were roofed and that the central portion was open to the elements. This hypothesis has been supported by the examination of soil micromorphology, which has yielded evidence of large roots in antiquity.)। এছাড়াও, দ্বিতীয় পর্যায়ের মন্দিরের অনেক অংশ থেকে পলেস্তারার নিদর্শন পাওয়া গেছে যার মধ্যে কিছু চিত্রিত ছিল বলে মনে হয়।

শুঙ্গ যুগের মন্দির

লুম্বিনীর প্রত্নতত্ত্ব

শুঙ্গ যুগে লুম্বিনীতে বিহার ও কয়েকটি স্তূপ নির্মাণ করা হয়েছিল। পুরনো স্থাপত্যগুলি সংস্কার করা হয়। মায়াদেবীর মন্দিরের গর্ভগৃহে অর্থাৎ ২ নং কক্ষে একটি পরীক্ষামূলক গর্ত খুঁড়ে দেখে নেওয়া হয়েছিল যে জন্ম-চিহ্ন পাথরটি যথাস্থানে আছে কি না। তারপর, গর্তটি বুজিয়ে তার ওপরে চারখানি নতুন বেলেপাথর রেখে সেটিকেই জন্ম-চিহ্ন পাথরের মতো করে রাখা হয়েছিল। শুঙ্গ যুগে মন্দিরে বৃক্ষের অস্তিত্ব বোধহয় আর ছিল না কারণ মন্দিরে দ্বিতীয় পর্বের নির্মাণ কাজে জন্ম-চিহ্ন পাথরের ওপরে একটি স্তূপ জাতীয় কিছু নির্মিত হয়েছিল। ২ মিটার মতো উঁচু স্থাপনাটির ভিত্তি ছিল বর্গাকার যার এক এক দিক ছিল ৭ মিটার লম্বা। ভেতরে পাঁচটি কক্ষ বানানো হয়েছিল; চার কোণে চারখানি আর মাঝে একটি, ঠিক জন্ম-চিহ্ন পাথরের ওপরে। এরপর সমগ্র স্থাপনাটির ওপরে ছাদ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল। তবে সেটি সমতল ছাদ ছিল না অন্য কিছু ধরনের ছিল তা জানার কোনো উপায় আজ আর নেই।

কুষাণ যুগের মন্দির

কুষাণ যুগে লুম্বিনীর খুব শ্রীবৃদ্ধি হয়েছিল। নতুন বিহার, স্তূপ ইত্যাদি নির্মাণের পাশাপাশি প্রাচীন স্থাপত্যগুলি সংস্কার ও আয়তনে বাড়ানো হয়েছিল। কুষাণ যুগে তিনটি পর্বে মায়াদেবী মন্দিরের কিছু অদলবদল করা হয়েছিল। প্রথম পর্বে শুঙ্গ যুগের বর্গাকার মন্দিরের চারপাশে একটি প্রশস্ত ইট ও মাটির চত্বর নির্মাণ করা হয়েছিল। এই পর্বে কিছু পয়ঃপ্রণালীও বানানো হয়েছিল।

দ্বিতীয় পর্বে, মন্দিরের চত্বরের ধার ঘেঁষে ইটের দেওয়াল গেঁথে সেটিকে স্থায়ীত্ব দেওয়া হয়েছিল। মন্দিরের পূর্ব দিকে প্রবেশ করার জন্যে একটি পলেস্তারা দেওয়া সিঁড়ি নির্মিত করা হয়েছিল। তৃতীয় পর্বে মন্দিরের গর্ভগৃহে জন্ম-চিহ্ন পাথরটির ওপরে একটি বর্গাকার ছোটো বেদি বানানো হয়েছিল। লম্বায় ৪ মিটার ও চওড়ায় ৩.১ মিটার সেই বেদিটি তৈরি হয়েছিল ইট ও সুরকি দিয়ে। এর ওপরে ইট দিয়ে একটি প্রায় বর্গাকার (১.৫ মি X ১.৩ মি X .৪৫ মি) বেদি তৈরি করা হয়েছিল।

গুপ্ত যুগের মন্দির

গুপ্ত যুগের স্থাপত্য আগের সবগুলির থেকে স্বতন্ত্র। ৮ম–৯ম শতাব্দীর এই যুগেও নতুন বিহার, স্তূপ নির্মাণ ও আগের কাঠামোগুলির সংস্কার করা হয়েছিল। এই সময়ে মায়াদেবী মন্দিরের দক্ষিণ দিকে দুইটি মন্দির নির্মাণ করা হয়েছিল কিন্তু তাদের চিহ্নটুকু ছাড়া আর কিছুই মেলে না। গুপ্ত যুগে মায়াদেবী মন্দিরে দুই পর্বে কাজ হয়েছিল। প্রথম পর্বে, মন্দিরের বাইরের চত্বরকে আরেকটু উঁচু করে মূল মন্দিরের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। দ্বিতীয় পর্বে, চত্বরের ওপরে কারুকার্যময় ইট দিয়ে একটি ছোটো মন্দির নির্মাণ করা

হয়েছিল। এই মন্দিরের বাইরের ধ্বংসাবশেষ দেখে পূর্ণ চন্দ্র মুখার্জী একে ‘সপ্তরেখ সপ্তরথ’ মন্দির বলেছিলেন। মন্দিরে দুইটি কক্ষ ছিল, গর্ভগৃহ ও মণ্ডপ। কুষাণ যুগে যে বর্গাকার বেদিটি নির্মিত হয়েছিল, তার তুলনায় এখনকার গর্ভগৃহের মেঝে একটু উঁচুতে ছিল। এই মন্দিরের গর্ভগৃহে জন্ম ভাস্কর্যটিকে রাখা হয়েছিল।

লুম্বিনীর প্রত্নতত্ত্ব

মধ্যযুগে মন্দির

মধ্যযুগে লুম্বিনীতে কিছু ছোটো ছোটো স্মারক স্তূপের নির্মাণ হলেও মন্দিরের সংস্কার ছাড়া তেমন কিছু কাজ করা হয়নি। মন্দিরের অবস্থাও ভাল ছিল না। তবে লুম্বিনী যে তখনও একটি পবিত্র স্থান হিসেবে বিবেচিত হত তার প্রমাণ পাওয়া যায় ১৩১২ সালে রিপু মল্লের লুম্বিনীতে তীর্থযাত্রা করতে আসায়।

লুম্বিনীর আলোচনা শেষের পথে আর এই লম্বা রাস্তায় চলতে চলতে আমরা বুদ্ধের জন্ম, পরিচয়, বংশ ইত্যাদি সব বিশ্লেষণ করে দেখেছি। খননের ইতিহাস আর তার সঙ্গে পাথুরে প্রমাণ থেকে মায়াদেবী মন্দিরের রূপান্তরের একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণীও আমরা দেখেছি। খননের ফলে কিন্তু বেশ গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য উঠে এসেছে যার মাধ্যমে হয়তো ইতিহাসের পাতাগুলি নতুন করে লেখা হবে।

সাম্প্রতিক বিভিন্ন খননে দেখা গেছে যে ১৪০০ সাধারণ পূর্বাব্দ নাগাদ (Strickland K M et al: 2015) অর্থাৎ তাম্রাশ্মীয় যুগ ও লৌহ যুগের সন্ধিক্ষণে লুম্বিনী অঞ্চলে একটি কৃষিজীবী সম্প্রদায় এসে বসতি স্থাপন করেছিল। তারা সেখানে বসতি নির্মাণ করলেও প্রথমদিকে লুম্বিনী উদ্যানের স্থানে কোনো পবিত্র স্থান বা মন্দির গড়ে উঠেনি। সেখানে প্রথম মন্দির নির্মাণের নিদর্শন রয়েছে সাধারণ পূর্বাব্দের অষ্টম শতাব্দী নাগাদ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল যে একটি বৃক্ষ বা গাছকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল সেই আদি মন্দিরটি এবং এক দীর্ঘ সময় ধরে (কুষাণ যুগের আগে পর্যন্ত) সেই গাছটিকে পবিত্র মানা হত। আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল যে একটি পাথর দিয়ে কোনো একটি নির্দিষ্ট স্থানকে চিহ্নিত করা হয়েছিল আর সেই প্রথা বরাবর চলে এসেছে। অশোকের লেখ দেখে আমরা বুঝতে পারছি যে সেই বিশেষ স্থানটি হল বুদ্ধদেবের জন্ম স্থান। জন্ম স্থানটিকে চিহ্নিত করে যে পাথরটি রয়েছে তার চরিত্র দেখে বোঝা যায় যে অশোকের সময়ের অনেক আগেই পাথরটিকে সেই বিশেষ জায়গায় এনে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল। বুদ্ধদেবের জন্মের কাহিনির সঙ্গে এই বৃক্ষ-মন্দিরের অস্তিত্ব এবং একটি বিশেষ স্থানকে চিহ্নিত করে রাখা সবই সোচ্চারে জানাচ্ছে যে বুদ্ধের জন্মের কাহিনি কোনো গল্প নয়, এইখানে সেই মহামানব ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন।

তবুও সমস্যা আছে। মায়াদেবীর মন্দিরের ভেতরে অর্থাৎ সেই পবিত্র স্থানের আশপাশের বস্তুর কার্বন ডেটিঙের ফল পরিশিষ্ট–খ তে দেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী মন্দিরের স্থাপনা হয়েছিল সাধারণ পূর্বাব্দের অষ্টম শতাব্দী নাগাদ। আর এখানেই রয়েছে খটকা। যদি ধরেই নিই যে বুদ্ধের দেহান্তের সঙ্গে সঙ্গে লুম্বিনীতে আদি মন্দিরটি গড়ে উঠেছিল তাহলে মায়াদেবীর মন্দিরে খননে পাওয়া নিদর্শনের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নির্ণীত কালগণনার ভিত্তিতে বুদ্ধের সময়কাল ২০০ থেকে ৩০০ বছর প্রাচীন হয়ে দাঁড়াচ্ছে (সাধারণ পূর্বাব্দের অষ্টম শতাব্দী)। যদিও এই খননকারী দলের নেতা রবিন কনিংহাম বলেছেন যে তাঁদের খনন থেকে প্রমাণ হচ্ছে যে লুম্বিনীতে সাধারণ পূর্বাব্দের ষষ্ঠ শতাব্দীতে স্থাপত্য ছিল (“Very little is known about the life of the Buddha, except through textual sources and oral tradition,” said archaeologist Professor Robin Coningham of Durham University, U.K., who co-led the investigation. Some scholars, he said, have maintained that the Buddha was born in the third century B.C. “We thought ‘why not go back to archaeology to try to answer some of the questions about his birth?’ Now, for the first time, we have an archaeological sequence at Lumbini that shows a building there as early as the sixth century B.C.” Science Daily November 15, 2013)। বুদ্ধের সময় পিছিয়ে গেলে আরও অনেক ধাঁধার জন্ম হবে যেমন তাঁর সময়ে থাকা বাকি রাজাদের কাল, অন্যান্য প্রত্নক্ষেত্রগুলি থেকে পাওয়া তথ্য ইত্যাদি। সুতরাং কনিংহাম এক্ষেত্রে ভেবেচিন্তেই মন্দিরের ডেটিঙের তথ্য অগ্রাহ্য করে বুদ্ধের কাল সাধারণ পূর্বাব্দের ষষ্ঠ শতাব্দীতেই আবদ্ধ রেখেছেন।

তাহলে খননের তথ্য থেকে যা বোঝা হাচ্ছে তা হল হয়তো ১০০/২০০ বছর উপেক্ষা করতে হবে নয়তো বুঝতে হবে যে বুদ্ধের কালের আগে থেকেই সেখানে একটি মন্দির ছিল। এই প্রসঙ্গে আমাদের ধারণা কিন্তু লুম্বিনীর মন্দিরের সঙ্গে দিব্যি মানানসই। আগেই বলেছি যে দশ মাসের অন্তঃসত্ত্বা মায়াদেবী লুম্বিনীতে প্রসূতি বিশেষজ্ঞ বৈদ্য দেখাতে এসেছিলেন। এখানে আরেকটি প্রশ্ন আসে যে তেমন অবস্থায় বৈদ্যকে রাজপ্রাসাদে ডেকে আনাই বেশি যুক্তিযুক্ত বিশেষত শুদ্ধোদনের মতো রাজা-রাজড়ার মতো মানুষদের ক্ষেত্রে। এমন হতে পারে যে সেই বৈদ্যদের কাছেই সংকটপূর্ণ প্রসবের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো ছিল। মায়াদেবীর লুম্বিনীতে যাওয়ার আরেকটি কারণ থাকতে পারে যে লুম্বিনীতে হয়তো একটি মন্দির ছিল, প্রসুতিদের নিরাপদে প্রসব সংক্রান্ত কোনো দেবী বা যক্ষিণীর, অনেকটা আমাদের মা ষষ্ঠীর থানের মতো (Falk: 1998, 2)। অথবা দুটি কারণই সত্যি অর্থাৎ প্রসূতি বা সদ্যোজাত শিশুদের সেই মন্দির কেন্দ্রিক যে পুরোহিতরা ছিলেন তাঁরাই বৈদ্যের কাজ করতেন (তখনকার দিনে এমনই হত) আর মায়াদেবী সেই মন্দির বা বৈদ্যদের কাছে গিয়েছিলেন দুটি উদ্দেশ্য নিয়ে, দেবীর আশীর্বাদ গ্রহণ ও নির্বিঘ্নে প্রসব করা। লুম্বিনী নামের উৎস বা লুম্বিনীর স্থানীয় নাম হল রুম্মিনদেঈ যা রূপম কিংবা রুম্মিন কিংবা লুম্বিন/লুম্বিনী কিংবা লবনী কিংবা লম্বনি নামের কোনো দেবীর নাম থেকে আসতেই পারে। মহাভারতে লুম্বিনী/লম্বিনী নামে এক মাতৃকার উল্লেখ আছে(পরিশিষ্ট ঘ)। ওয়াটার্স বলেছেন যে হিউয়েন সাঙ লুম্বিনীকে লা–ফা-নি বলেছেন যা প্রকৃতপক্ষে ‘লাবণী’ বা ‘সুন্দর মহিলা’-র অপভ্রংশ (Watters: 1905, Vol II, 15)। পাঠক ভুলে যাবেন না যে অশোকাবদান গ্রন্থেও উল্লেখ করা আছে যে অশোক তাঁর গুরু উপগুপ্তের সঙ্গে যখন লুম্বিনী পরিদর্শন করেছিলেন তখন তাঁরা বুদ্ধদেবের জন্ম বৃত্তান্ত বৃক্ষরূপী যক্ষের কাছ থেকেই শুনেছিলেন এবং প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন যক্ষী কারণ তাঁকে দেবী সম্বোধন করা হয়েছিল (অশোকাবদানের সংশ্লিষ্ট অংশ আগেই দেওয়া হয়েছে)। আর পূর্ণ চন্দ্র মুখার্জি যখন লুম্বিনী পৌঁছেছিলেন তখন ধ্বংসাবশেষের ওপরে তিনি একটি মন্দির দেখেছিলেন, রূপাদেবীর মন্দির। তিনি আরও বলেছিলেন যে রূপা নামটি রুম্মিন নামের অপভ্রংশ এবং তরাই অঞ্চলের অন্যান্য স্থানেও তিনি এই দেবীর মন্দির দেখেছেন (Mukherjee: 1901, 34)। মন্দিরটি আধুনিক হলেও সেটি প্রাচীন কোনো দেবীর ঐতিহ্য কি না তা বিষয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।

রুম্মিনদেঈতে যে একটি প্রাচীন মন্দির ছিল তা আগেও বলা হয়েছে। কোসম্বী (Kosambi: 1960) বলেছেন যে লুম্বিনীতে যেখানে বুদ্ধের জন্ম হয়েছে আর লুম্বিনী গ্রামের (বর্তমানের পুলিশ থানার কাছে) মধ্যে দূরত্ব এক মাইলেরও বেশি। যার অর্থ হচ্ছে, গ্রামের প্রান্তে জঙ্গলের মধ্যে থাকা সেই স্থানটি পবিত্র স্থান ছিল। দীর্ঘদিন ধরে সেখানে পাথরের ওপরে সিঁদুরের প্রলেপ ও মুরগি বলি দেওয়া হয়ে আসছিল, যা বৌদ্ধ ধর্মের আচরণের সঙ্গে কোনোভাবেই খাপ খায় না। সেগুলি নিশ্চয়ই মাতৃকা পূজার প্রাচীন প্রথার অঙ্গ হবে। রুম্মিন দেঈয়ের আবিষ্কারের সময়ে আরেকটি প্রথা দেখা গিয়েছিল যে স্থানীয় মানুষেরা বিশ্বাস করত যে সেই মন্দিরটিতে স্থাপিত পাথরের মূর্তি থেকে ভেঙে পড়া টুকরো খেলে নাকি বন্ধ্যাত্ব নিরাময় হয় (Women from surrounding villages have come here over the centuries to seek protection in childbirth and healthy children, customarily coating the images with a red paste made from vermilion mixed with oil. The ingestion of stone particles from the statuary is believed to cure infertility, a practice that accounts for the advanced state of erosion of the images. The worship included animal sacrifice until this was outlawed in the 1920s. Shaw: 2006, 54)।

সুতরাং বোঝা যাচ্ছে যে প্রাচীন সেই স্থানটি প্রসব ও বন্ধ্যাত্ব-সম্পর্কিত ছিল আর এই সংক্রান্ত বিশ্বাসটি বুদ্ধের জন্মস্থানের পরেও বজায় ছিল। আর এটি কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় ছিল না কারণ মুখার্জি দেখেছিলেন যে তরাই অঞ্চল জুড়ে রুম্মিন মাতার জনপ্রিয়তা বা পূজা ছিল (This is the sacred site of Rummin-dei, who is known throughout the Tarai as a local goddess of some celebrity. The Paharies, hill-men, call her Rupa-dei. She is believed to grant the prayers of her devotees, who bring her offerings of eatables, goats, and fowls, that are sacrificed, and fed here with great ceremony. And hence her popularity has increased amongst the simple folk of the Tarai. (Mukherji: 1901, 34)। শুধু তাই নয়, মুখার্জি যে শুধুমাত্র আরেকটি রুম্মিন দেঈয়ের সন্ধান পেয়েছিলেন (Mukherji: 1901, 4)। যার থেকে বোঝা যায় যে এককালে বেশ জনপ্রিয় ছিল রুম্মিন মাতা।

লুম্বিনীর প্রত্নতত্ত্ব

তাহলে দেখলাম যে রুম্মিন দেঈতে প্রসবের দেবী বা তার মন্দিরের প্রসঙ্গ কিন্তু আমার কল্পনা নয়। লুম্বিনীর বৃক্ষের নীচে থাকা সেই দেবীর ‘থান’-এর সামনে বুদ্ধের জন্ম হয়েছিল। পরবর্তী কালে স্বাভাবিক ভাবে আদিম দেবীর অপেক্ষা বুদ্ধের জন্মস্থান হিসেবেই জায়গাটির পরিচিতি বাড়ে। এই বিষয়ে আমাদের অন্যান্য গ্রন্থে দেখতে হবে যে আর কোথাও কোনো উল্লেখ যদি পাওয়া যায়।

হিউয়েন সাঙের বর্ণনায় এমন একটি উল্লেখ পেয়েছি যা এই তত্ত্বটিকে সম্পূর্ণভাবে সমর্থন করে। কপিলাবস্তু ভ্রমণের সময় হিউয়েন সাঙ শহরের পূর্ব দ্বারের বাইরে, রাস্তার ধারে, ‘ঈশ্বরদেব’-এর একটি মন্দির দেখেছিলেন। মন্দিরটি বৌদ্ধদের কাছে বিখ্যাত ছিল কারণ লুম্বিনী থেকে শিশু সিদ্ধার্থকে নিয়ে শুদ্ধোদন যখন কপিলাবস্তু আসছিলেন তখন রাস্তার পাশে এই মন্দিরটি পড়েছিল। মন্দিরটি দেখেই শুদ্ধোদন বলেছিলেন, “মন্দিরের দেবতা বড়োই জাগ্রত, বহু অলৌকিক কাণ্ড এখানে হয়। শাক্য সন্তানদের এখানে এনে মঙ্গল কামনা করলে কখনও তা ব্যর্থ হয়নি। রাজকুমারকে মন্দিরে নিয়ে গিয়ে পুজো দেওয়া উচিত।” সিদ্ধার্থকে কোলে নিয়ে ধাত্রী মন্দিরে প্রবেশ করতেই মন্দিরের পাথরের মূর্তি জীবন্ত হয়ে উঠে তাঁকে প্রণাম করেছিল আর সিদ্ধার্থ মন্দির ত্যাগ করতেই আবার নিজের রূপে ফিরে গিয়েছিল। (Outside the gate is the temple of Isvara-deva. In the temple is a figure of the Deva made of stone, which has the appearance of rising in a bent position. This is the temple which the royal prince when an infant (in swaddling clothes) entered. King Suddhodana was returning from the Lumbini (Lavani La-fa-ni) garden, after having gone to meet the prince. Passing by this temple the king said, “This temple is noted for its many spiritual exhibitions (miracles). The Sakya children who here seek divine protection always obtain what they ask; we must take the royal prince to this place and offer up our worship.” At this time the nurse (foster-mother), carrying the child in her arms, entered the temple; then the stone image raised itself and saluted the prince. When the prince left, the image again seated itself. Beal: 1884, Vol II, 23)

তাহলে দেখা যাচ্ছে যে শিশুদের দেবতার মন্দির তখনকার কপিলাবস্তুতে ছিল। ওয়াটার্স (Thomas Watters) তাঁর অনুবাদে একই কথা বলেছেন (Outside this gate, the pilgrim continues, was a temple of Isvara-Deva containing a stone image of the god in the attitude of rising and bowing. This was the temple into which the infant prince (the P’usa), on the way from the place of his birth to the palace, was carried by command of the king his father (who was present with the party) to be presented to the god according to the custom of the Sakyaa. As the baby was borne into the temple the stone image descended to pay respect to him, returning to its place when the baby prince (the P’usa) was carried away. Watters: 1905, Vol II, 13) মন্দিরটির আরাধ্য একজন দেবতা ছিলেন- একথা হিউয়েন সাঙ বলেছেন; তবে আমার মনে হয় যে তা দেবী বা যক্ষী হবেন যা আমরা বিবেচনা করে নিতেই পারি। আমার মনে হয় যে এই মন্দিরটি হয়তো প্রাচীন লুম্বিনী মন্দিরটিই হবে। সেই দেবীর নাম রূপা বা লুম্বিনী হওয়াও আশ্চর্যের কিছু নয় কারণ পি সি মুখার্জি যখন লুম্বিনীতে পৌঁছেছিলেন তখন সেখানে একটি রূপা দেবীর মন্দির ছিল আর স্থানীয়রা সেখানে মুরগি বলিও দিতেন (Mukherji: 34)।

তাহলে প্রশ্ন জাগবে যে জন্মস্থান মন্দির ও তার আগের ঐতিহ্যের প্রসূতি/সদ্যোজাত শিশুর মন্দিরের মধ্যে কোনোটির অস্তিত্ব তখন ছিল? আমি বলব যে দুটোরই। বৌদ্ধ তীর্থ হিসেবে লুম্বিনীর প্রসার লাভের পর প্রাচীন প্রসূতি/শিশুদের মন্দিরের মূর্তিটিকে হয়তো অল্প দূরে সরিয়ে এনে রাস্তার ধারে আরেকটি মন্দির বানিয়ে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল। মন্দিরের মূর্তিটি কেমন ছিল জানলে আমাদের সব সংশয়ের মীমাংসা হয়ে যাবে। মন্দিরের মূর্তির বর্ণনায় হিউয়েন সাঙ লিখেছেন যে, “ঈশ্বর যেন একটু ঝুঁকে উঠছিলেন।” চীনা ভাষায় এই বিশেষ শব্দটিকে বিল (Samuel Beal) তাঁর অনুবাদে আলাদা করে ফুটনোট দিয়ে বুঝিয়েছেন, “This is, as it seems, the meaning of the passage, literally, “the appearance of rising, bendingly, i.e., rising and bending.” (Beal: 1884, Vol II, 23)। অর্থাৎ মন্দিরের মূর্তিটিতে ঈশ্বর একটু ঝুঁকে এমন ভাবে দাঁড়িয়েছিলেন যে দেখে মনে হচ্ছিল যে তিনি বসে থাকা অবস্থা থেকে উঠছেন। মন্দিরের মূর্তির ভঙ্গীটি বড়োই স্বতন্ত্র যা সাধারণ ভাবে বিরল। পি সি মুখার্জি বলেছেন যে মূর্তির এমন এক ভঙ্গীর অর্থ তাঁর বুদ্ধিতে কুলাচ্ছে না (And how could she rise in a bent position–a sculptural phenomenon–could not see or understand. Mukherji: 29)। মুখার্জি ভঙ্গীটি না বুঝলেও এটি ঠিক বুঝেছিলেন যে মূর্তিটি দেব নয় দেবী, যদিও কোন প্রসঙ্গে তাঁর এই ধারণা হয়েছিল তা আমাদের অজানা। আমাদের কাছে এই ভঙ্গী কিন্তু খুব চেনা আর সদ্যোজাত শিশুর মন্দিরে এমন মূর্তি দেখে আমরা আশ্চর্য হব না। অনুমান করে নেয়া যায় যে সদ্যোজাত শিশুর মঙ্গল কামনায় মূর্তিটির দেবীর ভঙ্গীটি ছিল দাঁড়িয়ে প্রসব করার ‘দণ্ডায়মান ভঙ্গী’ বা ‘উৎকট কোণাসন।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *