লুম্বিনীর কিংবদন্তী- মায়াদেবীর স্বপ্ন- বুদ্ধের জন্ম
গোরখপুর ভ্রমণ সাঙ্গ হয়েছে। এবারে আমরা চলেছি নেপালে, বুদ্ধের জন্মস্থান দেখতে। লুম্বিনী যেতে গেলে গোরখপুর হয়ে যাওয়াই ভালো। নেপাল ও ভারতের সীমান্তে অনেকগুলি আসা-যাওয়ার রাস্তা থাকলেও সব জায়গা দিয়ে গাড়ি পার করার সুবিধা নেই। সেইজন্যে গোরখপুর দিয়ে লুম্বিনী যাওয়ার জন্যে ‘সুনৌলি’ দিয়ে সীমান্ত পার করা সবচেয়ে সুবিধার। গোরখপুর থেকে আপনি
ভারতীয় গাড়ি নিয়ে সুনৌলি হয়ে নেপালে প্রবেশ করতে পারেন। আমিও সেভাবে গিয়েছিলাম। যেভাবেই যাবেন না কেন আপনাকে প্রথমে আসতে হবে সুনৌলি। সুনৌলি ভারতের উত্তর প্রদেশের মহারাজগঞ্জ জেলার একটি শহর। সুনৌলির অবস্থান একদম ভারত-নেপাল সীমান্তের ওপরেই আর এখানকার অর্থনীতির প্রায় পুরোটাই সীমান্ত-বাণিজ্য বা সেই সংক্রান্ত লেনদেন নিয়েই চলে। মহারাজগঞ্জ জেলা সদর থেকে সুনৌলির দূরত্ব প্রায় ৭৫ কিলোমিটার আর গোরখপুর থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার। সুনৌলি থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে নৌতনওয়া রেলওয়ে স্টেশন নামে একটি রেলওয়ে স্টেশন আছে যেখানে কয়েকটি দুরপাল্লার ট্রেন এসে থামেও। তবে আমার অভিজ্ঞতা মতে রেলপথ, সড়কপথ বা আকাশপথে গোরখপুর চলে এসে তারপর সেখান থেকে সড়কপথে সুনৌলি চলে আসা সবচেয়ে ভালো। গোরখপুরে একদিন থাকলে গোরক্ষনাথের মঠও ঘুরে নিতে পারবেন।
গোরখপুর থেকে সুনৌলি আসার জন্যে ট্যাক্সি সবথেকে ভালো যাতায়াতের মাধ্যম হবে। দুই থেকে আড়াই ঘণ্টার মতো সফর। সুনৌলি ও গোরখপুরের মাঝে বাসও চলে তাই কেউ যদি নিজের গাড়ি না নিয়ে আসতে চান তাহলে সেটিও অসম্ভব নয়। সুনৌলিতে রাত কাটানোর মতো দুয়েকটি হোটেল আছে যার মধ্যে একটি হল উত্তর প্রদেশ ট্যুরিজমের; কিন্তু সেগুলি সব মধ্যম মানের। যারা একটু ভালো হোটেল খুঁজবেন তাঁদের জন্যে সীমান্ত পার হয়ে গাড়ি নিয়ে একটু এগিয়ে হোটেল নেওয়া ভালো হবে। সুনৌলি থেকে সীমান্ত পার হওয়া কোনো ঝঞ্ঝাটের ব্যাপার নয়, আপনি দিনে-রাতে যখন খুশি পায়ে হেঁটে সীমান্ত পার করতেই পারেন শুধু সঙ্গে আধার বা নির্বাচনী পরিচয়পত্র থাকলেই হবে। ভারতীয় গাড়ি রাত্রে পার হয় না। ভারতীয় গাড়ি নিয়ে লুম্বিনী বা নেপালে যেতে হলে আপনাকে সীমান্ত পার করে পৌঁছাতে হবে বেলহিয়াতে। সেখানে নেপালি রাজস্ব দপ্তরের কাউন্টারে গিয়ে প্রয়োজনীয় টাকা জমা দিয়ে pass বানাতে হবে যাকে নেপালি ভাষায় বলে ‘ভান্সার।’ ভারতীয় রেজিস্ট্রেশনের গাড়ি নিয়ে নেপালে প্রবেশ করতে হলে এই ভান্সারের প্রয়োজন হয় যেখানে আপনি গাড়ি নিয়ে কোথায় যাবেন তার উল্লেখ থাকে আর সেই কারণে আপনি সময় করে একটু এদিক সেদিক গিয়ে আরও একটি দুটি জায়গা ঢুঁ মারতে পারবেন না। আরেকটি অসুবিধা হল যে আপনাকে সেই একই সীমান্ত দিয়ে গাড়ি নিয়ে ফিরতে হবে।

আপনি লুম্বিনী দেখে অন্য কোনো স্থান দিয়ে সীমান্ত পার করতে পারবেন না। নেপালি কর্তৃপক্ষ এতে আপত্তি না করলেও ভারতীয় সীমান্তে প্রহরারত ‘সশস্ত্র সীমা বল’ এইভাবে পারাপার করতে দেবে না। সুনৌলি সীমান্ত দিয়ে আপনি পায়ে হেঁটে পার হয়ে নেপালে প্রবেশ করেই একটি ট্যাক্সি স্ট্যান্ড পাবেন আর সেখান থেকে নেপালি গাড়ি দরদাম করে ভাড়া নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
বেলহিয়া থেকে লুম্বিনী মাত্র ৩৫ কিলোমিটারের মতো পথ। সেখান থেকে নেপালে অবস্থিত কপিলাবস্তু আরও ৩০ কিলোমিটার। হিমালয়ের পাদদেশের তরাই অঞ্চলে অবস্থিত ছিল শাক্যদের প্রাচীন রাজ্য। রাজ্যের পশ্চিম ও পূর্বে ছিল যথাক্রমে কোশল এবং কোলিয় রাজ্য। কপিলাবস্তু ছিল এই রাজ্যের রাজধানী। মহাবস্তু অবদান এবং ললিতবিস্তার অনুসারে, শাক্য প্রশাসনের কেন্দ্র ছিল তার পরিষদ যার সভা বসত কপিলাবস্তুর সংস্থাগার বা সমাবেশ ভবনে যা অনেকটা আজকের বিধানসভা বা লোকসভার মত। গৌতম বুদ্ধের সময়ে শাক্য সংস্থাগার হিসেবে একটি নতুন ভবন নির্মিত হয়েছিল, যার উদ্বোধন করেছিলেন স্বয়ং বুদ্ধদেব। শাক্য পরিষদের নেতৃত্বে ছিলেন একজন নির্বাচিত রাজা, যিনি সভায় সভাপতিত্ব করতেন। বিভিন্ন বৌদ্ধ গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে গৌতম বুদ্ধের সময়ে সেখানকার রাজা ছিলেন তাঁর পিতা শুদ্ধোদন এবং তখন এটি একটি সমৃদ্ধ রাজ্য হিসাবে পরিচিত ছিল। শুদ্ধোদনের পিতার নাম ছিল সীহানু এবং মাতার নাম কাঞ্চনা। ধৌতোদন, শক্যোদন, শুক্লোদন, ও অমৃতোদন (পালি উচ্চারণে- ধোতদন, শক্যদন, শুক্যদন, অমিতদন) নামে তাঁর চার ভাই ছিল এবং দুই বোনের নাম ছিল অমিতা ও পমিতা (মহাবংশম, ২.১৭-২০)। বৌদ্ধ সাহিত্যে, শুদ্ধোদনকে প্রায়ই রাজা শুদ্ধোদন হিসাবে বর্ণনা করা হলেও অনেক পণ্ডিতের মতে তাঁর পুরোদস্তুর রাজকীয় মর্যাদা ছিল না। অনেকেরই মতে শাক্যদের দেশ একটি রাজ্য নয়, বরং কোশলের একটি সামন্ত রাজ্য হিসাবে বিবেচিত করা হত। সে হিসেবে শুদ্ধোদনকে শাক্য বংশের একজন নির্বাচিত প্রধান বলে মনে করা হয় যিনি রাজা (general term) হিসাবে পরিচিত ছিলেন। প্রশাসনে তাঁর দক্ষতা ছিল। তবে তাঁর সামরিক দক্ষতা ছিল লা-জবাব আর এও মানতে হবে যে তিনি একজন জনপ্রিয় নেতা ছিলেন। শুদ্ধোদন নাকি অসাধারণ তলোয়ার চালাতে পারতেন এবং যুদ্ধবিদ্যায় বেশ পারদর্শী ছিলেন। একটি যুদ্ধ জিতে আসার পর তাঁর পিতা সীহানু তাঁকে কিছু উপহার দিতে চেয়েছিলেন। তখন তিনি মহামায়া এবং মহাপ্রজাপতি গৌতমী নামে দুই বোনকে বিয়ে করার অনুমতি চেয়েছিলেন। এই দু’জন ছিলেন পাশের দেবদহ নামক অঞ্চলে বসবাসকারী কোলিয় বংশের রাজা অঞ্জন এবং রানি সুলক্ষণার কন্যা।
সেদিন ছিল আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের নবমী তিথি। প্রতিবছর নবমী থেকে চতুর্দশী তিথি অবধি উত্তরাষাঢ় উৎসব উপলক্ষ্যে কপিলাবস্তুর সবাই মেতে ওঠে আনন্দে। সমস্ত কপিলাবস্তু সাজানো হত ফুল, সুগন্ধী আর তোরণ দিয়ে। পবিত্র এই কয়েকটি দিন কেউ আসব (সুরা) গ্রহণ করত না। সেই মাসের পূর্ণিমার দিন মায়াদেবী খুব সকালে উঠেই সুগন্ধী জলে স্নান সেরে নিয়েছেন। উপবাস ভঙ্গ করার আগে মন্দিরে দান-ধ্যান করে তারপর চলে গিয়েছিলেন গুরুদেব দেবিলের কাছে। গুরুদেবের কাছ থেকে অষ্টশীলের পুথি নিয়ে এসে সারাদিন মায়াদেবীর কেটে গেল সেই পুথি পড়ে। পড়তে পড়তেই কখন তাঁর চোখ লেগে এসেছিল বুঝতেই পারেননি, ওখানেই তিনি নিদ্রায় ঢলে পড়েছিলেন। আর সেই নিদ্রায় দেখেছিলেন এক অদ্ভুত স্বপ্ন।
চতুর্মহারাজ দেবতা (চার দিকপতি) তাঁকে তাঁর পালঙ্ক সমেত তুলে হিমালয়ের অনোতত্ত হ্রদে (বৌদ্ধ ধর্ম অনুযায়ী হিমালয়ের সাত পবিত্র হ্রদের একটি। বাকি ছয়টি হ্রদ হল কন্নমুন্দ, রথকার, ছদ্দন্ত, কুনাল, মন্দাকিনী এবং সিহপ্পাতা) নিয়ে যান। তারপর তাকে সাত যোজন উঁচু একটি শাল গাছের ছায়ার নীচে ষাট যোজন লম্বা এক বিশাল হরিতালের পট্টের ওপরে নামিয়ে রাখলেন। তারপর চাতুর্মহারাজ দেবতাদের সঙ্গীরা এগিয়ে এসে মায়াদেবীকে নিয়ে অনোতত্ত হ্রদে গিয়ে নামলেন।
রানিকে ভালো করে স্নান করিয়ে তাঁর শরীরে স্বর্গীয় অঙ্গরাগ লেপন করে তাঁকে এক স্বর্গীয় বস্ত্র পরিধান করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। স্বর্গের নন্দনকাননের পুষ্প দিয়ে সাজানো হয়েছিল তাঁকে। তারপর হ্রদের অদুরে একটি রূপালী পর্বতের ভেতরে থাকা সোনার প্রাসাদের মধ্যে তাঁকে নিয়ে গিয়ে সেখানে এক পালঙ্কে তাঁকে পূর্ব দিকে মাথা রেখে শুইয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেই মুহূর্তে তার স্বপ্নে তিনি ছয় বিষাণ (দাঁত) ও মনোহর ভুজযুক্ত(পা)একটি হাতিকে একটি সোনার পর্বতের চারপাশে চরে বেড়াতে দেখেছিলেন। সেই হাতির রঙ দুধ-সাদা হলেও মাথা ছিল রক্তিম আর চলন ছিল বজ্রের মত। মায়াদেবী যে রূপালী পর্বতের ভেতরে সোনার প্রাসাদে ঘুমিয়েছিলেন সেই পর্বতের কাছেই ছিল সোনার পর্বতটি। তারপর সেই শ্বেতশুভ্র হাতিটি সোনার পর্বত পার করে রূপালী পর্বতে পৌঁছে তার ভেতরের সোনার প্রাসাদে প্রবেশ করেছিল। মায়াদেবী যে পালঙ্কে শুয়েছিলেন সেই পালঙ্কের চারপাশে দক্ষিণাবর্তে ঘুরে হাতিটি রানির ডান দিক হতে তাঁর গর্ভে প্রবেশ করেছিল।
মায়াদেবী যখন স্বপ্ন দেখছিলেন তখন বুদ্ধদেব বোধিসত্ত্ব রূপে তুষিত স্বর্গে (স্বর্গের এক ধাপ যেখানে বুদ্ধ হিসেবে জন্মের আগে বোধিসত্ব বিরাজ করে থাকেন) বাস করছিলেন। তখন তিনিই শ্বেতহস্তী রূপে স্বর্গচ্যুত হয়ে মায়াদেবীর পদ্মের মতো গর্ভমধ্যে প্রবেশ করেছিলেন। “হিমাদ্রির ন্যায় ধবল, বৃহৎ ষড়-বিষাণযুক্ত মদবাসিতানন দ্বিরদের রূপ ধারণ করিয়া, তিনি বসুধাপতি শুদ্ধোদনমহিষীর কুক্ষিমধ্যে জগতের দুঃখদূরীকরণের জন্য, প্রবেশ করিয়াছিলেন” (বুদ্ধচরিত, ১.২০)। এই অলৌকিক ঘটনাটি ঘটেছিল বৃহস্পতিবারের সকালে। সেদিন ছিল আষাঢ় মাসের পূর্ণিমা আর পূর্ণচন্দ্রের উদয় হয়েছিল উত্তরাষাঢ় নক্ষত্রের সমন্বয়ে। পৃথিবী কেঁপে উঠেছিল এক দারুণ ভূমিকম্পে আর বুদ্ধের আবির্ভাবের ভবিষ্যৎবাণী মুলক ৩২ খানি শুভ সূচনামূলক ঘটনা ঘোষণা করেছিল যে ‘এক মহামানব আসছেন।’
পরের দিন সকালে রাজা শুদ্ধোদন চৌষট্টি জন ব্রাহ্মণকে আমন্ত্রণ করে নিয়ে এসে, আসনে বসিয়ে সোনার পাত্রে পায়েস, মধু ইত্যাদি পরিবেশন করে তাদের সেবা করেছিলেন। তাঁদের নতুন বস্ত্র, গাভী ইত্যাদি উপঢৌকন দিয়েছিলেন। তারপর রাজা ও রানি মিলে ব্রাহ্মণদের সেই অদ্ভুত স্বপ্নের উল্লেখ করে তার অর্থ জানতে চেয়েছিলেন। ব্রাহ্মণরা রাজাকে ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন যে, “মহারাজ, আপনারা কোনো উদ্বেগ করবেন না। রানির গর্ভধারণ হয়েছে। গর্ভের শিশুটি অবশ্যই পুত্র সন্তান। যথা সময়ে আপনার একটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করবে। তিনি যদি রাজকীয় জীবনযাপন করতে উৎসাহী হন তাহলে পৃথিবীর চার মহাদেশের (বৌদ্ধ রীতি অনুসারে পৃথিবী চারটি খণ্ডে বিভক্ত। পূর্ববিদেহ পূর্বে, জম্বুদ্বীপ কেন্দ্রে, অপরগোদানী পশ্চিমে ও উত্তরকুরুদ্বীপ উত্তরে) রাজচক্রবর্তী সম্রাট হয়ে উঠবেন। আর যদি তিনি গৃহ ত্যাগ করে সন্ন্যাসী হয়ে যান তবে তিনি সর্ব জ্ঞানের আধার
‘বুদ্ধ’ হয়ে তিনটি জগতের (আকাঙ্খার পৃথিবী বা কামধাতু, সূক্ষ্ম রূপের পৃথিবী বা রূপধাতু, এবং অরূপ পৃথিবী বা অরূপ্যধাতু) দুঃখ–কষ্ট নিবারণ করবেন।”
ললিতবিস্তরে এর সার অর্থ পাই, “হে নৃপতি, ব্রত, তপস্যা এবং পুণ্যযুক্ত, ত্রিলোকপূজ্য মৈত্রী তথা করুণার প্রাপক, পবিত্র জ্ঞানরূপবারি দ্বারা, মহাত্মা বোধিসত্ত্ব তুষিত ভবন হইতে অবতীর্ণ হইয়া আপনার পুত্ররূপে মায়াদেবীর গর্ভে প্রবিষ্ট হইয়াছেন(৬.৪)।”
যেদিন থেকে মায়াদেবীর গর্ভধারণ হয়েছিল সেদিন থেকে চার দিকপতি তলোয়ার হাতে দিনরাত মায়াদেবীর চারপাশে অদৃশ্য রূপে থেকে প্রহরা দিয়ে যাচ্ছিলেন যাতে ভূত-প্রেত সহ কোনো ধরনের অশুভ শক্তি বোধিসত্ত্ব ও মায়াদেবীর আশপাশে না আসতে পারে।
এর মধ্যে সবচেয়ে ভয় বেশি ছিল ‘মার’ বা শয়তানকে নিয়ে। বোধিসত্ত্বকে ভ্রূণ অবস্থাতেই হত্যা করে দিতে পারলে সবচেয়ে লাভবান হবে মার।
মায়াদেবী গর্ভধারণ করেছেন শুনে দূর দূরান্তের রাজ্য থেকে উপহার এসে পৌঁছানো শুরু হয়েছিল। গর্ভধারণ করলেও মায়াদেবীর কোনো কষ্ট ছিল না বরং বলা যায় যে বোধিসত্ত্ব তাঁর মাতাকে গর্ভাবস্থায় কোনো যন্ত্রণা দেননি।
আবার গর্ভাবস্থার পরিণত পর্যায়ে মায়াদেবী তাঁর গর্ভস্থ ভ্রূণকে লক্ষ্য করতে পারছিলেন, ঠিক যেন একটি উজ্জ্বল, চিত্রাভ রেশমের পর্দার মধ্য দিয়ে কোনো দৃশ্য দেখার মতো।
তিনি দেখেছিলেন ভ্রূণাবস্থায় বোধিসত্ত্ব আড়াআড়িভাবে মায়ের মেরুদণ্ডে হেলান দিয়ে রয়রছেন। যেন তিনি এক ধর্ম সিংহাসনে আসীন হয়ে উপদেশ দিচ্ছেন; যদিও বোধিসত্ত্ব তাঁকে দেখতে পেতেন না কারণ তখনও তাঁর চোখ ফোটেনি (চক্কু-বিনাণা)।
গর্ভধারণের ঠিক ২৯৫ দিন পর মায়াদেবী তাঁর পিত্রালয় অর্থাৎ দেবদহে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। সেইমত রাজা শুদ্ধোদনকে জানানো হলে তিনি যে শুধু অনুমতি দিয়েছিলেন তাই নয় কপিলাবস্তু থেকে দেবদহ যাওয়ার পুরো রাস্তা তিনি সংস্কার করার ব্যবস্থা করেছিলেন যাতে রাস্তায় মায়াদেবীর কষ্ট না হয়।
বড়ো বড়ো পাত্রে বিভিন্ন গাছ লাগিয়ে সেগুলিকে রাস্তার দুই ধারে রাখা হয়েছিল। রাস্তা জুড়ে নানা রঙের ধ্বজা স্বর্গীয় সুষমা এনে দিয়েছিল। একটি সোনার পালকিতে বসে মায়াদেবী রওনা দিয়েছিলেন বাপের বাড়ির উদ্দেশ্যে।
কপিলাবস্তু থেকে দেবদহের পথে ছিল শাল গাছে ঘেরা মনোরম এক উদ্যান যার নাম ছিল লুম্বিনী (উদ্যান বলে পরিচিত হলেও এটি মানুষের হাতে গড়া বাগান নয়, প্রাকৃতিক এক উপবন বলা যেতে পারে) যেখানে শাক্য ও কোলিয় উভয় রাজ্যের মানুষেরাই মনোরঞ্জনের কারণে যেতেন (এই চড়ুইভাতি, প্রমোদভ্রমণ, বিশ্রাম নিতে আরকি)। মায়াদেবী লুম্বিনী পৌঁছে তার শোভা দেখে মোহিত হয়ে গেলেন। প্রতিটি গাছ জুড়ে ছিল ফুলে ভরা। নিচ থেকে একদম ওপরের শাখা অবধি ছিল ফুল দিয়ে ঢাকা। রঙবেরঙের মৌমাছি, ভ্রমরের দল গুনগুন করে ফুলে ফুলে ঘুরে মধু সংগ্রহে ব্যস্ত। বিভিন্ন রকমের পাখির মিষ্টি ডাক সুরের ঝর্ণা তৈরি করেছিল। সব মিলিয়ে সেদিন লুম্বিনী যেন নন্দনকাননের রূপ নিয়েছিল।
বিভূষিতা বালজনাতিচালিনী
বিভূষিতাঙ্গী বনিতেব মালিনী
সদা জনান নয়নালিমালিনী
বিলুম্পিনীভাতিবিরোচি লুম্বিনী।
বালিকার ন্যায় অতি চঞ্চলা,
স্ত্রীর ন্যায় মালায় সুসজ্জিতাঙ্গী,
ভ্রমরনয়নাদিগের মাল্যে ভূষিতা আকর্ষণীয়া লুম্বিনী
জনগণের কাছে সর্বদা অতিমাত্রায় শোভা পায়।

লুম্বিনী উদ্যানের এমন দীপ্ত শোভা দেখে মায়াদেবী আর থাকতে পারলেন না। তিনি পালকি থামিয়ে একবার উদ্যানের ভেতরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। মায়াদেবীর দলবল থেমে গেল আর মায়াদেবী ধীরে ধীরে উদ্যানে প্রবেশ করলেন। যে মুহূর্তে মায়াদেবী লুম্বিনীতে প্রবেশ করলেন, ব্রহ্মাণ্ডের দশ হাজার বিশ্ব (বৌদ্ধ সৃষ্টিতত্ত্ব অনুযায়ী সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডে দশ হাজার বিশ্ব আছে) জুড়ে দেবতাদের আনন্দের উল্লাস প্রতিধ্বনিত হতে লাগল, মহান মানবের জন্ম যে হতে যাচ্ছে আজ।
উদ্যানে প্রবেশ করে তিনি একটি পুষ্পাবনতা শাল গাছের একটি শাখা ধরবার ইচ্ছে দমন করতে পারলেন না (অন্যমতে প্লক্ষ বৃক্ষ বা পাকুড় গাছ)। গাছটির কাণ্ড সোজা হয়ে উঠে গিয়েছিল। সেখান থেকে একটি শাখা একটু ঝুঁকে এমনভাবে নেমে এসেছিল যাতে রানির তা ধরতে অসুবিধা না হয়। দেখে মনে হল যেন গাছের শাখাটি নিজে থেকে রানির করতলে ধরা দিল। দক্ষিণ হস্তে গাছের শাখা ধরে মায়াদেবী দাঁড়িয়েছিলেন আর মনে হচ্ছিল যেন কোনো স্বর্গের অপ্সরা বৃক্ষতলে দাঁড়িয়ে আছেন। সেই মুহূর্তে মায়াদেবী বুঝলেন যে গর্ভস্থ শিশুর জন্ম আসন্ন। তিনি তাড়াতাড়ি তাঁর পরনের কাপড় পা অবধি টেনে নিলেন। তাঁর সঙ্গিনীরা বুঝতে পেরে কাপড় দিয়ে স্থানটিকে ঢেকে ফেললেন। আর তখনই তাঁর পুত্রের জন্ম হয়েছিল।
শাখামালম্বমানায়াঃ পুষ্পভারাবলম্বিনীম্।
দেব্যাঃ কুক্ষিং বিভিদ্যাশু বোধিসত্ত্বো বিনির্যয়ৌ॥
ততঃ প্রসন্নশ্চ বভূব পুষ্যস্তস্যাশ্চ দেব্যা ব্রতসংস্কৃতায়াঃ।
পার্শ্বাত্সুতো লোকহিতায় যজ্ঞে নির্বেদনং চৈব নিরাময়ং চ॥
– বুদ্ধচরিত, ১.২৪-২৫
দেবী যখন এক পুষ্পভারাবনত শাখা অবলম্বন করিয়া দণ্ডায়মান ছিলেন, তখন বোধিসত্ত্ব তাঁহার কুক্ষিভেদ করিয়া অবিলম্বে বিনির্গত হইলেন। সেই সময় পুষ্য নক্ষত্র প্রসন্ন হইল। ব্রতসংস্কৃতা দেবীর পার্শ্বদেশ হইতে, বিনা বেদনায়, নিরাময়ে, এক পুত্র, লোকহিতের জন্য জন্মগ্রহণ করিলেন॥
বৈশাখী পূর্ণিমার দিনে পবিত্র লুম্বিনী উদ্যানে বোধিসত্ত্বের জন্ম হল। দেবরাজ ইন্দ্র, ব্রহ্মা ও অন্যান্য দিকপতিরা সেই পুণ্যক্ষণে উপস্থিত ছিলেন। চতুর্দিক হতে সুগন্ধী জল ও পুষ্পের বর্ষণ হচ্ছিল। সমস্ত দেবতারা উপস্থিত হয়ে মহামানবকে অতি যত্নে গ্রহণ করেছিলেন। উজ্জ্বল সূর্যের প্রভার মতো বোধিসত্ত্ব দণ্ডায়মান মায়াদেবীর গর্ভের ডান পাশ থেকে অলৌকিক উপায়ে সরাসরি ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন। অলৌকিক ভাবে বলার কারণ যে সিদ্ধার্থ নাকি পেট থেকে সরাসরি ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন আর সাধারণ প্রসবের মতো রক্ত, নাড়ি ইত্যাদি (গর্ভমল) কিছুই প্রকাশ পায়নি।
স পরিপূর্ণানাং দশানাং মাসানামত্যয়েন মাতুর্দক্ষিণপার্শ্বান্নিষ্ক্রমতিস্ম।
স্মৃতঃ সংপ্রজানন্ননুপলিপ্তো গর্ভমলৈর্যথা নান্যঃ কশ্চিদুচ্যতেঽন্যেষাং গর্ভমল ইতি।
– ললিতবিস্তর ৭.২৩
যাহাতে অন্য কেহ তাঁহাকে (সাধারণ) অন্য লোকের মোট গর্ভমল (গর্ভের মল) বলিতে না পারে তাই গর্ভস্থ (শোণিত, পূয, বসা প্রভৃতি) মলের দ্বারা লিপ্ত না হইয়াই মাতার কুক্ষির দক্ষিণভাগ হইতে বাহির হইলেন।
ভূমি স্পর্শ করেই শিশু দণ্ডায়মান হয়ে পূর্ব দিকে চেয়ে দেখেছিলেন। সেইখান থেকে শুরু করে তিনি একে একে দশ দিক পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। তারপর উত্তর দিকে মুখ করে সাত পদক্ষেপ গ্রহণ করে এগিয়ে গিয়েছিলেন (অন্য মতে তিনি চার দিকেই সাত পা হেঁটেছিলেন)। বোধিসত্ত্বের পা যেখানে যেখানে ভূমি স্পর্শ করছিল সেখানেই একটি করে পদ্ম ফুটে উঠছিল। কোনো দেবতা তাঁর ওপরে ছাতা ধরেছিলেন তো কেউ চামর দুলিয়ে বাতাস করছিলেন। সপ্তম পদক্ষেপের পর বোধিসত্ত্ব সিংহের ন্যায় গর্জন করে বলে উঠেছিলেন –
অগ্গো হং অস্মি লোকস্স!
জেট্ঠো হং অস্মি লোকস্স!
সেট্ঠো হং অস্মি লোকস্স!
অয়ং অন্তিমা জাতি!
নত্থি দানি পুনব্ভবো!
– মঝ্ঝিম নিকায় ১২৩/দীঘ নিকায় ২.২৯
তিন জগতের জীবের মধ্যে আমিই শ্রেষ্ঠ! তিন জগতের জীবের মধ্যে আমিই সর্বশ্রেষ্ঠ! তিন জগতের জীবের মধ্যে আমিই অনুত্তর! এটাই আমার শেষ জন্ম! আমার আর পুনর্জন্ম নেই!
এই মহান ভবিষ্যৎবাণী উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে চন্দ্রকিরণের মতো দুটি বারিধারা আকাশ থেকে বোধিসত্ত্বের মস্তকে ঝরে পড়তে লাগল। পদ্ম ফুটে উঠেছিল। তাঁর প্রভাবে দেবগণ নতশির হয়ে তাঁকে অভিবাদন করেছিলেন। বোধিসত্ত্ব তাঁর জন্মের পরপরই যা বলেছিলেন তার অর্থ হল যে শুধুমাত্র রাজকুমার সিদ্ধার্থ হিসাবে এটিই যে ছিল তাঁর শেষ অস্তিত্ব শুধু তাই নয়, তিনি মহোসধ বা শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী এবং বিশ্বান্তর (ভেস্সান্তর)বা জাতক-বর্ণিত শেষ রাজা হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।
সিদ্ধার্থকে জন্মদান করে মায়াদেবী ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। সাত দিন ধরে যমে-মানুষে টানাটানির পর মায়াদেবীর মৃত্যু হয়। আর এই সাত দিন শাক্যতনয় লুম্বিনী উদ্যানেই ছিলেন। সিদ্ধার্থের জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর মায়ের মৃত্যু যাতে কোনো অশুভ প্রতীক হিসেবে না ধরা হয় সেইজন্যে একে বিধির বিধান বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
ইতি হি ভিক্ষভঃ সপ্তরাত্রজাতস্য বোধিসত্ত্বস্য মাতা মায়াদেবী কালমকরোত্ / সা কালগতা ত্রায়ত্রিংশতি দেবেষূপপদ্যত / স্যাত্ খলু পুনর্ভিক্ষভো যুষ্মাকমেভাম্ বোধিসত্ত্বাপরাধেন মায়াদেবী কালগতেতি? ন খল্বেভাম্ দ্রষ্টভ্যম্ / তত্কস্মাদ্ধেতোঃ/ এতত্ পরমং হি তস্যা আয়ুষ্প্রমাণমভূত্ / অতীতানামপি ভিক্ষভো বোধিসত্ত্বানাং সপ্তরাত্রজাতানাং জনেত্র্যঃ কালমকুর্বন্ত / তত্কস্মাদ্ধেতোঃ/ বিবৃদ্ধস্যহি বোধিসত্ত্বস্য পরিপূর্ণেন্দ্রিয়স্যাভিনিষ্ক্রামতো মাতুর্হৃদয়মস্ফুটৎ।
– ললিতবিস্তর ৭.৫৫
এইভাবে, ভিক্ষুগণ, বোধিসত্ত্বের জন্মের সাতদিন পরে তাঁহার মাতা মায়াদেবী কালগ্রস্তা হইলেন। মরণের পর (আক্ষরিক-কালক্রিয়ার পর) তিনি ত্রয়স্ত্রিংশলোকে দেবগণের মধ্যে উৎপন্ন হইলেন। হে ভিক্ষুগণ, তোমাদের মনে এইরূপ (সন্দেহ) হইতেও পারে যে বোধিসত্ত্বের দোষের জন্যই মায়াদেবীর কাল হইল। কিন্তু এইরূপ ভাবিবে না। কেন? না-তাঁহার আয়ু ঐ পর্যন্তই পূর্ণ হইয়াছিল। হে ভিক্ষুগণ, অতীত বোধিসত্ত্বদের মাতৃগণও (জননীরাও) (তাহাদের জন্মের) সাতদিন পরে কালগ্রস্তা হইয়াছিলেন। তাহা কি কারণে? (এই কারণে যে) বয়স্ক ও পরিপূর্ণেন্দ্রিয় বোধিসত্ত্বের (=বোধি-সত্ত্বের বয়ঃপ্রাপ্তির পর) অভিনিষ্ক্রমণের সময় (=ঘর ছাড়িয়া চলিয়া যাইবার সময়) কোথাও মাতার হৃদয় না ভগ্ন (স্ফুটিত) হইয়া যায়। (প্রাপ্তবয়স্ক পুত্র প্রব্রজ্যা লইলে শোকে মাতার হৃদয় বিদীর্ণ হইয়া যায়-এক্ষেত্রে তাহা বাঞ্ছনীয় নয়-তাই পুত্রের বয়ঃপ্রাপ্তির পূর্বেই মাতার কালকবলতা প্রাপ্তি)।
মায়াদেবীর মৃত্যুর পর সিদ্ধার্থকে কে লালন পালন করবে তাই নিয়ে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়ে গিয়েছিল। মাতৃহারা দুধের বাচ্চাকে মানুষ করার জন্যে পাঁচশ শাক্য মহিলা প্রস্তুত হয়েছিলেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাজকুমারের মাসী মহাপ্রজাপতি গৌতমীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
তত্র তে বৃদ্ধবৃদ্ধাঃ শাক্যাঃ সংনিপত্য এইবং মতং চারয়ন্তি স্ম – কা নু খলু সমর্থা বোধিসত্ত্বং গোপায়িতুং কেলায়িতুং মমায়িতুং হিতচিত্ততয়া মৈত্রচিত্ততয়া গুণচিত্ততয়া সৌম্যচিত্ততয়া চেতি। তত্র পঞ্চমাত্রাণি শাক্যবধূশতানি। একৈকা এবমাহূঃ – অহং কুমারমুপস্থাস্য ইতি। তত্র মহল্লকমহল্লিকাঃ শাক্যা এবমাহূঃ – সর্বা এতা বধূকা নবা দহ্নাস্তরুণ্যঃ রূপযৌবনমদমত্তাঃ নৈতাঃ সমর্থা বোধিসত্ত্বং কালেন কালমুপস্থাপযিতুম। অথ চ পুনরিয়ং মহাপ্রজাপতী গৌতমী কুমারস্য মাতৃষ্বসা। এষা সমর্থা কুমারং সম্যক্ষুখেন সংবর্ধযিতুং, রাজাং চ শুদ্ধোদনমভিধারয়িতুম।
– ললিতবিস্তর ৭.৫৫
পাঠক লক্ষ করবেন যে এখানে গৌতমীকে সিদ্ধার্থের মাতৃষ্বসা বা মাসী বলা হয়েছে কিন্তু বিমাতা বলা হয়নি। সুতরাং মনে হয় যে সিদ্ধার্থকে কপিলাবস্তু নিয়ে আসার পর মা–হারা শিশুকে মানুষ করতে শুদ্ধোদন মায়াদেবীর বোন, মহাপ্রজাপতি গৌতমীকে বিবাহ করেছিলেন। গৌতমী নিজেই সেই কথা স্বীকার করেছিলেন।
থেরি অপদানের দীর্ঘতম অপদান হল মহাপ্রজাপতি গৌতমীর অপদান। বড়ো বিষাদ-মেদুর সেই কবিতা যেখানে তিনি বলছেন যে–
আমার পিতা অঞ্জনশাক্য ও আমার মাতা সুলক্ষণা। একদিন (আমি) কপিলাবস্তুতে শুদ্ধোদন রাজার ঘরে গিয়েছিলাম। বাকি সবাই শাক্যকূলে শাক্যদের ঘরে ঘরে জন্মগ্রহণ করেছিল। আমি তাদের সকলের চেয়ে বিশিষ্টা হয়েছিলাম। আমি ছিলাম জিনের লালন-পালনকারিণী। (থেরি- ২.২১৪-২১৫)।
