আজকের লুম্বিনী ও চীনা পরিব্রাজকদের লুম্বিনী

আপনারা সিদ্ধার্থের জন্মের কাহিনি পড়লেন। কাহিনির ঘনঘটা অনেকটাই স্তিমিত করে দেখলেও পাঠক বুঝতে পারছেন যে কয়েক শতাব্দী ধরে জমতে থাকা কিংবদন্তি যখন বৌদ্ধ গ্রন্থে লেখা হয় তখন তার মধ্যে অনেক অতিলৌকিক অংশ থাকবেই। বুদ্ধের মৃত্যুর তিন শতাব্দীরও বেশি সময় পর্যন্ত বৌদ্ধ ধর্মের প্রাথমিক ধর্মগ্রন্থগুলি লেখা হয়নি তবে মৌখিক আখ্যান হিসাবে বিভিন্ন কিংবদন্তি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে এসেছে। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে লুম্বিনী উদ্যানে প্রাপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান, বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থের পাঠ্য বর্ণনা, বিভিন্ন পরিব্রাজকদের বিবরণ, ধর্মীয় স্থাপত্যের কাঠামো এবং দেহাবশেষের প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণগুলি করে দেখতে হবে যে সেগুলি নেপালের লুম্বিনী উদ্যানে শাক্যমুনি বুদ্ধের জন্মগ্রহণ করাকে সমর্থন করে কিনা।
সুনৌলি থেকে রওনা দিয়ে আমাদের গাড়ি লুম্বিনী এসে পৌঁছেছে। বুদ্ধের সময়ে এই স্থান লুম্বিনী নামে বিখ্যাত হলেও এই উদ্যান বা বনের আরও বেশ কিছু নাম ছিল- যেমন লাবণী, রুম্মিনদি (কোলিয় রাজা অঞ্জনের রানি লুম্বিনীদেবীর নামানুসারে), প্রমোদবন, চিত্তলাটবন, পারাদিমোক্ষ (মুক্তির স্থান বা নির্বাণ) এবং মোক্ত (আবুল ফজলের লেখা অনুযায়ী)। ১৮৯৬ সালে জেনারেল খড়গ সামসের ও ফিউরার(Alois Anton Führer। জার্মান ভারতত্ত্ববিদ। উনিশ শতকে ভারতীয় পুরাতত্ত্ববিভাগের কর্মী ছিলেন। পুরাতাত্ত্বিক খনন ও গবেষণায় জালিয়তি ও অন্যের কাজ দখল করবার জন্য নিন্দিত এক পণ্ডিত।) লুম্বিনীকে নতুন করে আবিষ্কার করার সময়ে সেখানে ধ্বংসস্তূপের ওপরে রুম্মিন মাতার একটি ছোটো মন্দির দেখেছিলেন। স্থানটির নাম ছিল রুম্মিনদেঈ আর তাই সেখান থেকে পাওয়া অশোক স্তম্ভটি রুম্মিনদেঈ স্তম্ভ বলেই বিখ্যাত। রুম্মিনদেঈ বলে নেপালে আরেকটি স্থানেরও সন্ধান পাওয়া গেছে।
লুম্বিনীর ভেতরে জন্মস্থানটি স্থানীয় ভাবে মায়াদেবীর মন্দির বলেই বিখ্যাত। পৃথিবীর বিভিন্ন অংশ থেকে মানুষেরা অবিরাম আসছে এই পবিত্র স্থানটি দর্শনে। বৌদ্ধ ধর্মীদের মধ্যে তো এর গুরুত্ব অসীম কিন্তু ধর্মের টান ছাড়াও এই স্থানের একটা আলাদা আকর্ষণ আছে। একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে বুদ্ধ আমাদেরকে সর্বদাই আকর্ষিত করে থাকেই। তাই তাঁর জন্ম যেখানে হয়েছে সেই স্থানটি দেখতে পাওয়া একটি অভিজ্ঞতা। বর্তমানে বিরাট অঞ্চল নিয়ে মন্দির প্রাঙ্গন। প্রবেশদ্বার থেকে একটু এগিয়েই জ্বলছে ‘শান্তির অনল শিখা।’ লুম্বিনীর পবিত্র স্থানটি একটি সংরক্ষিত অঞ্চল বলা যেতে পারে যেখানে শুধুমাত্র মন্দির ছাড়া আর কিছুই নির্মাণ করা যায় না। এই অঞ্চলটি দুই ভাগে বিভক্ত, পূর্ব এবং পশ্চিম। পূর্ব দিকের অঞ্চলে আছে থেরাবাদীদের মন্দির আর পশ্চিমে আছে মহাযান এবং বজ্রযান শাখার মন্দিরগুলি। এই দুই অঞ্চলকে আলাদা করে রেখেছে একটি দীর্ঘ প্রণালী। জলে ভরা এই প্রণালী পার হওয়ার জন্যে মাঝে মাঝে আছে সেতু। প্রণালীর জলের ওপর দিয়ে নৌকোবিহার করতে পারেন তবে ওই পরিবেশে যন্ত্রচালিত নৌকোর সশব্দ উপস্থিতি বড়োই বেমানান।

মায়াদেবীর মন্দির যাওয়ার পথে পড়ে একটি খুব মিষ্টি শিশু বুদ্ধের মূর্তি। সেখান থেকে একটু এগিয়ে টিকিট কেটে (ভারতীয় মুদ্রা গ্রহণ করে) এগোলেই পড়বে মন্দিরের প্রবেশ দ্বার। জুতো খুলে ঢুকলেই আপনার সামনে খুলে যাবে এক অন্য পৃথিবী। মায়াদেবীর মন্দির ও সংলগ্ন অতীতের লুম্বিনী উদ্যানের অঞ্চল এক ‘বিশ্ব ঐতিহ্য স্মারক’ অর্থাৎ এটি পুরো পৃথিবীর অহংকার। মায়াদেবীর মন্দিরের এলাকায় ঢুকলেই আপনার নজরে আসবে সাদা রঙের সিনেমা হলের মতো একটি পাকা বাড়ি যা একটি আধুনিক স্থাপত্য। এর ভেতরে খনন করে মিলেছে বুদ্ধদেবের জন্মস্থান চিহ্নিত করে রাখা একটি পাথর ও জন্মক্ষণের মূর্তি। বাইরের বাগান পেরিয়ে ঢুকতে হয় সেই হলঘরে। ভেতরে ছবি তোলা মানা। ভেতরে ঢুকতেই আপনি পৌঁছে যাবেন অন্য এক জগতে। অতি প্রাচীন সব ধ্বংসাবশেষের মধ্যে দিয়ে একটি একটি কাঠের উচ্চ পথ চলে গেছে। প্রত্নতাত্ত্বিক খনন থেকে জানা গেছে যে এইসব ধ্বংসাবশেষগুলি কোনো একটি সময়ের অঙ্গ নয়। বিভিন্ন পর্যায়ে মায়াদেবী মন্দিরের নির্মাণ ও পুনঃস্থাপন হয়েছিল আর এই কাঠামোগুলি সেই লম্বা সময় ধরে এই স্থানের পবিত্রতার স্বীকৃতির উদাহরণ।

কাঠের পথ একসময় আপনাকে এইসব ধ্বংসাবশেষের ঠিক মধ্যস্থলে একটি স্থানে পৌঁছে দেবে যেখানে রয়েছে একটি বিশেষ বস্তু। বুদ্ধের ঠিক যেখানে জন্ম হয়েছিল সেই স্থানটিকে চিহ্নিত করে রাখা একটি পাথর। বুলেটপ্রুফ কাচের আবরণীতে সংরক্ষিত সেই পাথরের সামনে দাঁড়ানো আমার কাছে ছিল এক দুর্লভ ঘটনা যার জন্যে আমি সারা জীবন অপেক্ষা করেছিলাম। সেই অসাধারণ মুহূর্তে আবেগ যেন বাঁধ মানে না, চোখের কোল ভিজে আসবেই।
সম্রাট অশোক তাঁর রাজ্যাভিষেকের ২০ তম বর্ষে অর্থাৎ ২৪৯ সাধারণ পূর্বাব্দে লুম্বিনী দর্শন করতে এসেছিলেন। প্রাচীন বৌদ্ধ সাহিত্য অনুসারে লুম্বিনীতে তীর্থদর্শনে এসে সম্রাট অশোক এই জন্মস্থান চিহ্নকরণ পাথর (marker stone) এবং যে গাছের নীচে মায়াদেবী সিদ্ধার্থকে জন্ম দিয়েছিলেন, সেই গাছের সুরক্ষার জন্য তার চারদিকে পাকা ইট ব্যবহার করে একটি মঞ্চ তৈরি করে দিয়েছিলেন। জন্ম-চিহ্ন পাথরটি ছাড়া সম্রাট অশোক একটি ব্রাহ্মী লিপির অভিলেখ দেওয়া স্তম্ভও স্থাপন করেছিলেন। সেই স্তম্ভের ঠিক সামনের এলাকাটি পূর্বে পুরানো মায়াদেবী মন্দিরের স্থান ছিল।

১৮৯৬ সালে জেনারেল খড়্গ ও ডঃ ফিউরার যৌথভাবে লুম্বিনী আবিষ্কার করেছিলেন। এরপরের বিভিন্ন সময়ে এখানে খনন হয়েছিল। স্থানীয় প্রশাসক কেশর শামসের ১৯৩৯ সালে মন্দিরটি ঢেকে একটি একটি হলঘর আকৃতির কাঠামো তৈরি করেছিলেন। ১৯৯২ সালে মন্দিরের নীচে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের জন্য সেই হলঘরটি ভেঙে ফেলা হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে খননের সঙ্গে দুই প্রত্নতাত্ত্বিক জড়িত ছিলেন, জাপানের সাতোরো উয়েসাকা এবং নেপালের বাবু কৃষ্ণ রিজাল। তাঁদের খননের ফলেই প্রমাণ হয় যে শাক্যমুনির জন্মস্থানেই এই মন্দিরটি প্রাচীনকালেই গড়ে উঠেছিল।
প্রত্নতাত্ত্বিকরা মায়াদেবী মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ প্রায় ৫ মিটার অবধি খনন করে দেখেছেন যে সাধারণ পূর্বাব্দের ৬ষ্ঠ শতাব্দী থেকে সাধারণ অব্দের ১৫শ শতাব্দী অবধি মন্দির হিসেবে কাঠামোটি নির্মিত হয়েছিল। পূর্ব-পশ্চিমে ৫ টি সারিতে ও উত্তর-দক্ষিণ দিকে ৩টি সারিতে সাজানো মোট ১৫টি কক্ষ আবিষ্কার হয়েছিল। সম্পূর্ণ মন্দিরটি ঘিরে ছিল সীমানা প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত একটি প্রদক্ষিণ পথ। ধ্বংসাবশেষের মধ্যে সাধারণ পূর্বাব্দের তৃতীয় শতাব্দীর একটি ইটের তৈরি মঞ্চ খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল। প্রত্নতাত্ত্বিকরা সাত স্তর ইট বিছানো সেই মঞ্চের ওপরে গর্ভের আকৃতির একটি পাথরের ফলক খুঁজে পান, যা বুদ্ধের সঠিক জন্মস্থানটিকে চিহ্নিত করে রেখেছিল। এটাই ছিল প্রাচীন মন্দিরের পবিত্র গর্ভগৃহ। এই জন্ম-চিহ্ন পাথরটির কারণেই আজ আমরা জানতে পেরেছি
যে লুম্বিনীর ঠিক কোনখানে সিদ্ধার্থের জন্ম হয়েছিল। জন্ম-চিহ্ন পাথরটি হচ্ছে শিবালিক পাহাড়ের একটি কংগ্লোমারেট বেলেপাথর যা লম্বায় ৭০ সেন্টিমিটার
, চওড়ায় ৪০ সেন্টিমিটার ও উচ্চতায় ১০ সেন্টিমিটার।

১৯৯৬ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারি, নেপালের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এই যুগান্তকারী আবিষ্কারটি ঘোষণা করেছিলেন। তারপর থেকে সাধারণ মানুষ পাথরটির কাছ অবধি গিয়ে দেখার সুযোগ পাচ্ছে। ১৯৯৬ সালে খনন কাজ শেষ হওয়ার পর থেকে মন্দিরটি জনসাধারণের জন্য বন্ধ করে রেখে দেওয়া ছিল। এরপর ২০০১ সাল অবধি অস্থায়ীভাবে ক্ষেত্রটি ঢেকে রেখে খননের কাজ অনিয়মিতভাবে চলছিল। ২০০৩ সালে লুম্বিনী ডেভেলপমেন্ট ট্রাস্ট বর্তমান মায়াদেবী মন্দিরটি র্নির্মাণ করেছে যা ২৬ শে মে, ২০০৩ সালে বুদ্ধপূর্ণিমার দিন সর্বসাধারণের জন্যে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল।
বুদ্ধের জন্ম-চিহ্ন পাথরটির আবিষ্কারের সঙ্গে আরেকটি তথ্য সামনে এসেছিল যে মৌর্য যুগের কাঠামো বা নির্মাণের আগেও একই স্থানে আরও প্রাচীন কাঠামোর অস্তিত্ব ছিল। প্রোফেসর সুদর্শন রাজ তিওয়ারির মতে সর্বনিম্ন স্থাপত্যটি একটি ‘বৃক্ষ চৈত্য’-এর কাঠামো যেখানে একটি গাছের চারপাশে একটি পাথরের বাঁধানো মঞ্চ এবং একপাশে একটি বেদির উপস্থিতি ছিল বলে মনে হয়। এই ধরনের কাঠামো মৌর্য যুগের স্তূপের আগে নির্মাণ করা হত। ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল অবধি আরেকটি খননে অংশ নিয়েছিল নেপালের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, লুম্বিনী ডেভেলপমেন্ট ট্রাস্ট এবং ডারহাম ইউনিভার্সিটি (UK)। এই খননের ফলে এখানে সাধারণ পূর্বাব্দের ৬ষ্ঠ শতাব্দীর একটি কাঠের মন্দিরের নিদর্শন পাওয়া যায়। খননের সময় বর্তমান দৃশ্যমান ধ্বংসাবশেষের নীচে থেকে একটি প্রাক-মৌর্য যুগের ইটের কাঠামো খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল। সেখানে বৃহৎ আকারের (৪৯×৩৬×৭ সেমি) ইটও পাওয়া গিয়েছে যার ওজন প্রায় ২০ কিলোগ্রাম। খনন থেকে পাওয়া এইসব প্রমাণ বুঝিয়ে দেয় যে প্রথম মায়াদেবী মন্দিরটি লুম্বিনীতে বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের পরপরই বা তাঁর জীবনকালেই নির্মিত হয়েছিল।
মায়াদেবী মন্দিরের ভেতরে গিয়ে ধ্বংসাবশেষের মাঝে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নবস্তু আছে তা হল জন্ম–ভাস্কর্য (nativity sculpture)(আগের অধ্যায়ের প্রথম ছবিটি) যা রাজকুমার সিদ্ধার্থের জন্ম দৃশ্য দেখাচ্ছে। মূর্তিটি লম্বায় ১৬৭ সেন্টিমিটার আর চওড়ায় ১০৬ সেন্টিমিটার। ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এই মূর্তিটি জন্ম-চিহ্ন পাথরের পাশেই একটি প্রাচীন দেওয়ালের ওপরে স্থাপিত। ভাস্কর্যে দেখা যাচ্ছে যে মায়াদেবী একটি গাছের (সম্ভবত শাল) নীচে দাঁড়িয়ে আছেন। রানির ডানহাত গাছের ডাল ধরে আছে আর বাঁহাত রয়েছে কোমরে। মায়াদেবীর মাথার দুইপাশ দিয়ে কেশরাজি নেমে এসেছে। তিনি সালংকারা, হাতে বালা পরা, পায়ে পাইজোর জাতীয় পাদাভরণ। মায়াদেবীর পাশে আরেকজন মহিলা বা ধাত্রী তাঁর ডান কোমরের স্থানে ঝুঁকে রানিকে প্রসবে সাহায্য করছেন। অনেক তাঁর ডিম্বাকৃতি মুখ এবং কোঁকড়া চুল এবং রানির ঘনিষ্ঠ ভাবে অবস্থান দেখে মনে করেন যে তিনি মায়াদেবীর বোন মহাপ্রজাপতি গৌতমী হবেন। মায়াদেবীর ডান দিক থেকে সদ্য জন্ম নেওয়া শিশু সিদ্ধার্থ ভাস্কর্যের নীচের দিকে একটি পদ্মের পিঠে দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁর মাথার চারপাশে প্রভামণ্ডলের আভাস পাওয়া যায়। মায়াদেবীর বিপরীতে আরও দুইজনকে দেখা যাচ্ছে। বৌদ্ধ সাহিত্য বা কিংবদন্তি অনুযায়ী (আগেই উল্লেখ করেছি) সিদ্ধার্থের জন্মের সময়ে দেবরাজ ইন্দ্র ও ব্রহ্মা উপস্থিত হয়েছিলেন তাই সামনে করণ্ডমুকুট পরিহিত মূর্তিটি ব্রহ্মার হবে যিনি নবজাতক রাজকুমার সিদ্ধার্থকে হাত বাড়িয়ে গ্রহণ করছেন। তাঁর হাতের ওপরে মনে হয় একটি কাপড় রয়েছে। ব্রহ্মার পিছনে কিরীটমুকুট পরিহিত ইন্দ্র সিদ্ধার্থের জন্ম লক্ষ করছেন। ১৮৯৬ সালে ফিউরার এই ভাস্কর্যটির কথা উল্লেখ করেছিলেন। ডঃ হোয়ে (Dr. Hoey) তাঁর পরিদর্শনের সময়ে এই মূর্তিটির কথা বলেছিলেন। ১৮৯৯ সালে পি সি মুখার্জি খননের সময় ভাস্কর্যটিকে শনাক্ত করেছিলেন। আর ২০০৩ সালের মে মাসে নতুন মায়াদেবী মন্দির গঠন হওয়ার পরে একে জন্ম–চিহ্ন পাথরের পাশে স্থাপনা করা হয়েছিল। বিখ্যাত নেপালি শিল্পী, চন্দ্র মান মাস্কে ১৯৫৬ সালে জন্ম ভাস্কর্যটির প্রকৃত রূপ অনুমান করে নির্মাণ করেছিলেন। দুইটি ভাস্কর্যেরই ছবি আগেই দেওয়া হয়েছে যাতে পাঠক ভাস্কর্যটিকে পরিপূর্ণভাবে অনুমান করে নিতে পারেন।
জন্ম–ভাস্কর্য কোন সময়ে তৈরি তা নিয়ে বিস্তর মতভেদ আছে। পি সি মুখার্জির মতে এই ভাস্কর্যটি মৌর্য যুগের, কারণ সেই সময়ের পাটলিপুত্রের যক্ষ ও দ্বারপাল মূর্তিগুলির উপাদান ও শৈলীর সঙ্গে তিনি এর সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছিলেন। ভি এস আগরওয়াল বলেছেন যে জন্ম–ভাস্কর্যটি কুষাণ যুগের কারণ মায়াদেবীর কাপড় পরার ধরন, গৌতমীর লুটিয়ে পড়া কুন্তল, দেবতাদের উচ্চ মুকুট
সবই সেই যুগের শৈলীকে বর্ণনা করছে। দেবলা মিত্র আবার ভাস্কর্যটিকে গুপ্ত যুগের বলে রায় দিয়েছেন। কৃষ্ণ দেবের মতো পণ্ডিত মানুষের কাছে ভাস্কর্যটি চতুর্থ শতাব্দীর। তারানন্দ মিশ্র অবশ্য ভাস্কর্যের সময় নির্ধারিত করেছেন তৃতীয় শতাব্দী। অনেকে বলেন যে লুম্বিনীর অশোকস্তম্ভের অভিলেখে উল্লিখিত “শিলা বিগড়ভিচা কালাপিত” বলতে আসলে জন্ম–ভাস্কর্যটিকেই বোঝানো হয়েছে। ভিক্ষু সুদর্শনও এই মতের স্বপক্ষে ছিলেন।
চীনা পরিব্রাজক জি সেংজাই (সেং ত্সাই) ২৫০ থেকে ৩৭৫ সাধারণ অব্দে ভারত ভ্রমণ করেছিলেন এবং তিনি লুম্বিনী ভ্রমণ করেছিলেন। তিনি বলেছেন যে, “বুদ্ধের জন্মের সময় রানি মায়া অশোক নামের একটি বিস্ময়কর গাছ আঁকড়ে ধরেছিলেন। ল্যাপিস লাজুলি পাথর খোদাই করে রাজা অশোক রানির একটি মূর্তি তৈরি করেছিলেন, যেখানে তাঁর সেই গাছটি আঁকড়ে ধরে রাজকুমারের জন্ম দেওয়ার মুহূর্তটি চিত্রিত করেছিল।” এর থেকে দুটি তথ্য পাই; প্রথমত,
তিনি লুম্বিনীতে এই ভাস্কর্যটি দেখেছিলেন বলে উল্লেখ করেছেন যার ফলে বোঝা যায় যে তাঁর সফরের পূর্বেই অর্থাৎ তৃতীয় শতাব্দীতে এই ভাস্কর্যের অস্তিত্ব ছিল এবং দ্বিতীয়ত হল যে অশোকের দ্বারা এই ভাস্কর্যের নির্মাণ ও স্থাপনা হওয়ার একটি সম্ভাবনা রয়েছে।
আমরা জানি যে মোটামুটি প্রথম শতাব্দী থেকে বুদ্ধের জন্মদৃশ্যের ভাস্কর্য নির্মাণ শুরু হয়েছিল। প্রধানত মথুরা ও গান্ধার থেকে এমন সব ভাস্কর্য তৈরি হয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ত। লুম্বিনীর লাল বেলেপাথরের ভাস্কর্যটি মথুরা ভাস্কর্যের ঘরানায় (Mathura School of Art) খোদাই করা বলে অনেক পণ্ডিতের মত। দ্বিতীয়-তৃতীয় শতাব্দীর এই ভাস্কর্য ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত সমস্ত জন্ম-ভাস্কর্যের মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন নমুনা।
মায়াদেবী মন্দির থেকে বেরোবার রাস্তাটি আলাদা। যেখান থেকে আমরা ঢুকেছিলাম তার একদম বিপরীত দিক দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার রাস্তা। নামে মন্দির হলেও সেখানে প্রাচীন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ দর্শন করা একটা আলাদা অভিজ্ঞতা। ব্যবস্থাপনাও আমার বেশ ভালো লেগেছে বিশেষ করে কাঠের উঁচু পথের মাধ্যমে পুরো স্থানটি দেখে নেওয়া যায়, কিন্তু প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের কাছাকাছি যাওয়া যায় না। এর ফলে কাঠামোগুলি অনেকটাই নিরাপদে থাকছে।
এখান থেকে বেরোবার পথ আমাদের এনে উপস্থিত করল আরেক ধ্বংসাবশেষ-পূর্ণ স্থানে। মায়াদেবী মন্দির ঘিরে রয়েছে এমন অনেক ধ্বংসাবশেষ যা বিভিন্ন যুগে নির্মিত স্তূপ, বৌদ্ধ বিহার ও মন্দিরের অবশেষ। মায়াদেবীর মন্দিরে আমরা যা দেখে এলাম তা ছিল জন্মস্থানের ওপরে তৈরি মন্দিরের বিভিন্ন পর্যায় আর এখন আমরা যেসব ধ্বংসাবশেষ দেখছি সেগুলি হল লুম্বিনীতে বুদ্ধের জন্মস্থানকে ঘিরে থাকা বিভিন্ন প্রাচীন ধর্মীয় স্থাপত্যের কাঠামোর অবশেষ।

আমরা যদি প্রাচীন লুম্বিনী উদ্যানকে মনে মনে কল্পনা করে নিই তাহলে দেখব যে এইসব স্থাপনাগুলি সেই পবিত্র উদ্যানে অবস্থিত আদি জন্মস্থান মন্দিরের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব দিকেই অবস্থান করছে। মন্দিরের পাশে এদের মধ্যে প্রাচীনতম স্থাপনার নির্মাণ হয়েছিল সাধারণ পূর্বাব্দের তৃতীয় শতাব্দী নাগাদ। সেখান থেকে শুরু হয়ে নবম শতাব্দী অবধি নির্মাণ চলেছিল, অর্থাৎ মৌর্য, কুষাণ ও গুপ্ত সাম্রাজ্যের সময়েও স্থাপত্যকারদের আনাগোনায় লুম্বিনী ব্যস্ত ছিল। দীর্ঘ সময় ধরে একই স্থানে নির্মাণ চললে যা হয় আরকি! একটি স্থাপত্যের গায়ে আরেকটি স্থাপত্য এসে পড়েছিল, বা একটি স্থাপত্য পরের যুগে পুনর্নির্মিত হয়ে আকার বদলে ফেলেছিল ইত্যাদি ঘটনার হদিশ এখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কাঠামোগুলির ভিত্তি দেখলে বোঝা যায়। অনেকে আবার লুম্বিনীতে তীর্থে এসে ছোটো স্মারক স্তূপ বানিয়ে দিয়েছে। এমন votive stupa অনেক রয়েছে মন্দিরের প্রাঙ্গণে।

এই ধর্মীয় স্থাপত্যের কাঠামোগুলির মধ্যে দুটি গোষ্ঠী রয়েছে। ‘ক’ গোষ্ঠীটি এইসব কাঠামোগুলির পূর্ব ধারের নিদর্শন নিয়ে গঠিত এবং ‘খ’ গোষ্ঠীটি পশ্চিম ধারের। ‘ক’ গোষ্ঠীটি মূলত ছিল একটি আবাসিক অঞ্চল যেখানে ভিক্ষুদের আবাসস্থল অর্থাৎ থাকার ঘর আছে, একটি প্রার্থনা করার মতো বড়ো হলঘর আছে, দুটি ইটের স্তূপ আছে যার মধ্যে একটি বর্গাকার ও অন্যটি বৃত্তাকার এবং বিহারের আঙিনায় একটি কূপ পাওয়া গেছে। এই অংশের নির্মাণকাল মোটামুটি শুঙ্গ ও কুষাণ যুগ, অর্থাৎ সাধারণ পূর্বাব্দের দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে সাধারণ অব্দের দ্বিতীয় শতাব্দী পর্যন্ত। অন্যদিকে ‘খ’ গোষ্ঠীর ধর্মীয় কাঠামোগুলি ধ্বংসাবশেষের পশ্চিম দিকে অবস্থিত হলেও আদি উদ্যানের হিসেব মতো এগুলি মায়াদেবী মন্দিরের দক্ষিণ-পূর্ব কোণ বরাবর অবস্থান করছে। এই গোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে ৩১ খানি কক্ষের নিদর্শন। গোষ্ঠীর পূর্ব ধারে রয়েছে একখানি বড়ো প্রার্থনা কক্ষ আর এর চার ধারে আছে চারখানি বড়ো বড়ো আবাস কক্ষ এবং পশ্চিম দিকে আছে একটি বারান্দা। এই গোষ্ঠীর পশ্চিম দিকে গেলে দেখতে পাবেন জল সংরক্ষণ করে রাখার জন্যে দুটি জলাধার ও একটি ছোটো কক্ষ যা মনে হয় রান্নাঘর ছিল। এই গোষ্ঠীর নির্মাণকাল শুরু হয়েছিল মৌর্য যুগে আর চলেছিল গুপ্ত যুগ অবধি। সুতরাং এখানে সাধারণ পূর্বাব্দের তৃতীয় শতাব্দী থেকে সাধারণ অব্দের চতুর্থ শতাব্দী পর্যন্ত নির্মাণ, পুনর্নির্মাণ ইত্যাদি কার্যকলাপ চলছিল। মায়াদেবী মন্দিরের আধুনিক
কাঠামোর সঙ্গে লাগোয়া একটি বিরাট বড়ো হলঘরের অবশেষ পাওয়া যায় যা সভাকক্ষ নামে পরিচিত। এই কক্ষের নির্মাণ প্রথম হয় সাধারণ পূর্বাব্দের ২য় শতাব্দীতে শুঙ্গ যুগে আর তারপর বিভিন্ন সময়ে এর পরিবর্তন ও পুনর্নির্মাণ হয়েছিল। অনুমান করা যায় যে কোনো বড়ো ধর্মোপদেশ অনুষ্ঠান, আলোচনা কিংবা তীর্থযাত্রীদের অভ্যর্থনার কারণেই হয়তো এই ঘরের নির্মাণ।

ধর্মীয় ভবনগুলি ছিল মূলত বিহার ও প্রার্থনা কক্ষের সঙ্গে আবাসিক অঞ্চল। সেখানে দুয়েকটি স্তূপ পাওয়া গেলেও সেগুলি সম্পূর্ণভাবে সেই বৃহত্তর ধর্মীয় স্থাপনারই অঙ্গ ছিল। এই স্তূপগুলি ছাড়াও আরও কয়েকটি প্রাচীন স্তূপের অবশেষ এখানে রয়েছে যেগুলি সম্পূর্ণভাবেই আলাদা স্থাপনা। লুম্বিনী উদ্যানে একত্রিশ খানি স্তূপ পাওয়া গেছে যার মধ্যে উনত্রিশটি হল স্মারক বা votive স্তূপ। বাকিদের মধ্যে একটি হল দেহাবশেষ রক্ষিত স্তূপ এবং আরেকটি ধম্ম স্তূপ। উদ্যান ও তার আশপাশে এত বিপুল সংখ্যক প্রাচীন স্তূপ বুঝিয়ে দেয় লুম্বিনীর গুরুত্ব কতখানি ছিল, এবং বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের পর সবচেয়ে পবিত্র বৌদ্ধ তীর্থস্থানগুলির মধ্যে লুম্বিনী স্থান পেয়েছিল। ধর্মীয় স্থাপনাগুলির মতোই এই স্তূপগুলি এখানে সাধারণ পূর্বাব্দের তৃতীয় শতাব্দী থেকে সাধারণ অব্দের নবম শতাব্দী পর্যন্ত মৌর্য, শুঙ্গ, কুষাণ ও গুপ্ত যুগে নির্মিত হয়েছিল। বিভিন্ন যুগে যেমন স্তূপগুলির নির্মাণ করা হয়েছিল তেমনই তাদের ধরন, নকশা এবং শৈলীও বিভিন্ন প্রকারের, কোনোটার ভিত্তি বর্গাকার তো কোনোটার আয়তাকার আবার কোনোটার বৃত্তাকার। একটি বড়ো আকারের বর্গাকার স্তূপ আছে যা ধারণা করা হয় যে শুঙ্গ যুগে (সাধারণ পূর্বাব্দের ২য় শতাব্দী) নির্মিত হয়েছিল, যদিও প্রত্নতাত্ত্বিক টি এন মিশ্র অনুমান করেন যে এটি অশোকের সময়ের অর্থাৎ সাধারণ পূর্বাব্দের ৩য় শতাব্দীতে নির্মিত হয়েছিল। উদ্যানে খনন করে পাওয়া স্তূপগুলির মধ্যে একটি হল ধম্ম স্তূপ। এটিও বর্গাকার, যা চার দিক থেকে ধাপে ধাপে উঠে এসেছে। এই স্তূপের চারপাশ থেকে খননে ১৯ খানি পোড়ামাটির সিলমোহর পাওয়া গিয়েছিল যার থেকে বোঝা গেছে যে এই স্তূপটি আদতে একটি ধম্ম স্তূপ যেখানে বৌদ্ধরা ও তীর্থে আসা মানুষেরা ভগবান শাক্যমুনি বুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেন। প্রত্নতাত্ত্বিক মিশ্র বলেছেন যে এই স্তূপটি মৌর্য যুগের (সাধারণ পূর্বাব্দের ৩য় শতাব্দী) কারণ শুঙ্গ (সাধারণ পূর্বাব্দের ২য় শতাব্দী) ও কুষাণ (সাধারণ অব্দের ১ম থেকে ২য় শতাব্দী) যুগের স্তূপগুলিতে বৃত্তাকার ও সরল বর্গাকার ভিত্তি লক্ষ করা যায়। এখনও পর্যন্ত লুম্বিনী উদ্যানে পাওয়া স্তূপগুলির মধ্যে দেহাবশেষের ওপরে নির্মিত স্তূপের সংখ্যা মাত্র একটি যাকে ‘শারীরিক স্তূপ’ বলা হয়ে থাকে। ১৯৭৫ সালে প্রথম এই স্তূপটি খুবই ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল। তখন এই স্তূপের যেসব ভগ্নাবশেষ আসেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল সেইসব ভাঙা ইটের টুকরো দিয়ে স্তূপটিকে যথাসম্ভব সংস্কার করার চেষ্টা করা হয়েছিল। স্তূপের ইটের চরিত্র দেখে বোঝা যায় যে স্তূপটি মৌর্য যুগের (সাধারণ পূর্বাব্দের ৩য় শতাব্দী)। খননের সময় স্তূপের মেঝেতে একটি সোনার তৈরি চোঙাকার মঞ্জুষার শুধুমাত্র ঢাকনা আর তার সঙ্গে কয়েকটি দগ্ধ হাড়ের টুকরো এবং কিছু আচারের সামগ্রী পাওয়া গিয়েছিল। এই উপাদানগুলিই নিশ্চিত করেছিল যে স্তূপটি প্রকৃতপক্ষে একটি শারীরিক স্তূপ। ১৯৫৭ সালের দেবলা মিত্রের খননে উঠে এসেছিল ১৬খানি স্তূপের একটি গুচ্ছ যেগুলি পরে ১৯৭৬-৭৭ সালের খননে সংস্কার করে পুনর্নির্মাণ করা হয়। স্তূপগুলি গুপ্ত (৭ম–৮ম শতাব্দীতে) যুগে নির্মিত স্মারক স্তূপ। মায়াদেবী
মন্দিরের উত্তর ও উত্তর–পূর্ব দিকে আছে ছয়খানি স্তূপ। এই স্তূপগুলিও ১৯৫৭ সালে দেবলা মিত্র খনন করে পেয়েছিলেন এবং ১৯৭৬-৭৭ সালের খননের সময়ে এগুলিকে পুনর্নির্মাণ করা হয়। স্তূপগুলি সাধারণ পূর্বাব্দের ৩য়-২য় শতাব্দী সময়কালের অর্থাৎ শুঙ্গ যুগের স্থাপত্য। আরেকটি গুচ্ছ-স্তূপ রয়েছে এখানে যেগুলি প্রত্নতাত্ত্বিক টি এন মিশ্রের মতে সাধারণ পূর্বাব্দের ১ম শতাব্দী থেকে সাধারণ অব্দের ৫ম শতাব্দী পর্যন্ত অর্থাৎ কুষাণ থেকে গুপ্ত যুগ অবধি বিস্তৃত সময়কাল ধরে নির্মিত হয়েছিল।

এতক্ষণ ঘোরাঘুরিতে ক্লান্ত হয়ে পা দুটো যেন একটু বিশ্রাম চাইছে। সঙ্গের সাথীরা একটু বসতে চায়। আমারও বসতে আপত্তি নেই কিন্তু বসার জন্যে একটি জায়গা তো চাই! আর পবিত্র পুষ্করিণী ছাড়া এমন পছন্দের জায়গা তো আর পাব না! তাই স্তূপ
–বিহার ইত্যাদির মাঝ দিয়ে জলের আভাস পেতেই সবাইকে নিয়ে আমি হাজির পুষ্করিণীর ধারে।

বৌদ্ধ সাহিত্যে এই পুষ্করিণীর স্থান অনেক উচ্চ। বলা হয় যে সিদ্ধার্থের জন্মের আগে মায়াদেবী এই পুষ্করিণীতে স্নান করেছিলেন। স্নান করার পর তিনি ২০/২৫ পা ফেলে পৌঁছেছিলেন সেই শাল বৃক্ষের নীচে যেখানে বোধিসত্ত্বের জন্ম হয়েছিল। আবার জন্মের পর নবজাত শিশু সিদ্ধার্থকে এই পুষ্করিণীতেই স্নান করান হয়েছিল। তাহলেই বুঝতে পারছেন যে বুদ্ধদেবের জীবনের সঙ্গে এই পুষ্করিণী কতোটা জড়িয়ে আছে আর সেই কারণেই বৌদ্ধদের কাছে এই পুষ্করিণী অতীব পবিত্র এক স্থান। সেই সময়ে হয়তো এই পুষ্করিণীতে পদ্মও ফুটত কারণ বুদ্ধের জন্মের বর্ণনায় বুদ্ধের সাত পদক্ষেপ নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পদ্ম বিকশিত হওয়ারও বর্ণনা আছে যা একমাত্র এই সরোবরেই সম্ভব।
বীর্যবলৌপেতা বজ্রাত্মিকা মেদিনী সংস্থিতা (ভূতদা)
পদ্মু রুচিরচিত্রু অভ্যুদ্গতো যত্র (চক্রাঙ্গচিত্রেভিঃ)
পদ্ভ্যাং স্থিতো নায়কঃ
সপ্ত পদ ক্রমিত্ব ব্রহ্মস্বর মুঞ্চি ঘোষোত্তমং
জরামরণবিঘাতি বৈদ্যোত্তম ভেষ্যি সত্ত্বোত্তমঃ
– ললিতবিস্তার ৭.২৮
যেখানে বীর্য ও বলযুক্ত ভগবান দণ্ডায়মান ছিলেন সেখানে হীরকের মতো নির্মল ও কঠিন অভেদ্য হইয়া পৃথিবী সুস্থির হইল, যেস্থানে চক্রপদ্মাদি চিহ্নিত চরণতলের সহিত নায়ক সাত পা চলিয়া ব্রহ্মস্বরে উত্তম ঘোষণা করিয়াছিলেন যে “জরা, মরণ, নায়ক, শ্রেষ্ঠ বৈদ্য ও শ্রেষ্ঠ সত্ত্ব আমি হইব” – সেই স্থলে সুন্দর কমল উদ্গত হইল।
কিংবা
পাদৌ নিক্ষিপতে যত্র ভূমৌ পদ্মবরাঃ শুভাঃ
অভ্যুদ্গচ্ছংস্ততো মহ্যাং সর্বরত্নবিভূষিতাঃ
– ললিতবিস্তার ৭.৩৩
ভূমিতে যেস্থানে ভগবান চরণন্যাস করিয়াছিলেন – সেই সেই স্থানে সকল রত্ন সজ্জিত শুভ ও উত্তম কমল নির্গত হইল।
বৌদ্ধ ধর্মে ও চিহ্নতত্ত্বে পদ্ম ফুলের ভূমিকা বিশাল। পদ্মফুলকে পবিত্রতা এবং বোধির প্রতীক হিসেবে ব্যক্ত করা হয়। বুদ্ধের জন্মমুহূর্তে যে পদ্ম ফুল ফুটে ওঠার কাহিনি দেখালাম সেই ঘটনাটি বৌদ্ধ শিল্প ও সাহিত্যে বিভিন্ন ভাবে চিত্রিত করা হয়েছে।
সিদ্ধার্থের জন্মের মুহূর্ত থেকেই যেন তাঁর পবিত্রতা ও বোধি লাভের সম্ভাবনা এখানে প্রতীকী রূপে দেখানো হয়েছে। লুম্বিনীতে তীর্থ করতে আসা মানুষেরা মনের পবিত্র স্থলকে উন্মোচিত করে জ্ঞানার্জনের আশায় এই পুষ্করিণীর প্রান্তে এসে দু-দণ্ড ধ্যানে বসেন। অনেকে আবার এই পবিত্র পুষ্করিণীর কাছে বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠান করে, প্রার্থনা করে পুণ্যলাভ করতে চান। হাজার হাজার বছর ধরে এই পুষ্করিণী বিশ্বের কত দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষদের শ্রদ্ধা ও ভক্তির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। এই পুষ্করিণী ছাড়া লুম্বিনী উদ্যান দর্শন সম্পূর্ণ হয় না।
চীনা পরিব্রাজক ফা-হিয়েন ও হিউয়েন সাঙ এর মতো পরিব্রাজকরা এই পুষ্করিণীর কথা ও তার মাহাত্ম্য উল্লেখ করে গেছেন। তাঁদের বর্ণনায় আরও জানা যায় যে মায়াদেবী মন্দিরের ভেতরে অবস্থিত জন্মস্থানের দূরত্ব ওই ২৫ পদক্ষেপের মতোই ছিল আর সেই হিসাবে বোঝা যায় পূর্বে এই পুষ্করিণীর আকার আজকের তুলনায় অনেক বড়ো ছিল এবং গভীরও ছিল। এখন পুষ্করিণীর আকার আগের তুলনায় অনেকটাই ছোটো, লম্বায় ২৪.৯০ মিটার, চওড়ায় ২৪.৮৫ মিটার ও গভীরতায় ৪.৮৩ মিটার। বৌদ্ধ সাহিত্য থেকে বুঝতে পারা যায় যে রাজকুমার সিদ্ধার্থের জন্মের আগে থেকেই পুষ্করিণীটি বিদ্যমান ছিল এবং এর আকার ছিল সম্ভবত ডিম্বাকৃতির। ১৯৩৩-৩৯ সালের খননের সময় ইট দিয়ে পুষ্করিণীটিকে বাঁধিয়ে একদম নতুন রূপ দেওয়া হয়েছিল। প্রত্নতাত্ত্বিক দেবলা মিত্র তাঁর ১৯৭২ সালের খননে এবং ১৯৮৩ সালের খননে মিঃ বি কে রিজাল পবিত্র পুষ্করিণীটির উল্লেখ ও বর্ণনা করেছিলেন। পরে ১৯৯৬ সালে পুষ্করিণীটি পরিষ্কার করার সময় এর উত্তর-পূর্ব এবং দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে দুটি কূপ পাওয়া গিয়েছিল।
এবারে আমরা এসে দাঁড়িয়েছি মায়াদেবী মন্দিরের লাগোয়া চারদিক দিয়ে ঘেরা একটি পাথরের স্তম্ভের সামনে। লুম্বিনীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দ্রষ্টব্য বস্তুর মধ্যে একটি হল এই স্তম্ভটি যা রুম্মিনদেঈ অশোক স্তম্ভ বলে বিখ্যাত হয়ে আছে। স্তম্ভটিকে কুখ্যাত বললেও কিছু ভুল বলা হয় না। কারণ এর আবিষ্কর্তা, ডঃ ফিউরারের জালিয়াতি পূর্ণ পেশাগত জীবনের কারণে এই স্তম্ভটি নিয়ে জলঘোলা কিছু কম হয়নি বা এখনও হচ্ছে যা লুম্বিনী সহ খোদ বুদ্ধদেবের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে। ১৮৯৬ সালের পয়লা ডিসেম্বর ফিউরার ও জেনারেল খড়গ সামসের স্তম্ভটি লুম্বিনীতে খুঁড়ে বার করেছিলেন। বেলেপাথরের তৈরি এই
স্তম্ভটি যখন প্রথম স্থাপন করা হয়েছিল তখন প্রায় ৪০ ফুট লম্বা ছিল এবং মূলত এর তিনটি অংশ ছিল
–

১) একটি পাথর কেটে বানানো স্তম্ভ,
২) একটি পদ্ম বন্ধনী (lotus bracket or cyma)
৩) একটি স্তম্ভ শীর্ষ যেখানে সম্ভবত ঘোড়ার মূর্তি ছিল।
পাথরের স্তম্ভটি ভাঙা অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল এবং এর কিছু অংশ আর পাওয়া যায়নি। বর্তমান পাথরের স্তম্ভটি ৩০ ফুট ১০.৫ ইঞ্চি (৯.৪১ মিটার) লম্বা এবং ওজনে প্রায় ৩৭ টন। স্তম্ভের মাঝের অংশ ‘পদ্ম বন্ধনী’ আলাদা করে স্তম্ভের কাছে একটি ইটের চাতালে স্থাপন করা হয়েছে।

হিউয়েন সাঙ উল্লেখ করেছেন যে স্তম্ভের শীর্ষে ছিল একটি ঘোড়ার মূর্তি যার কোনো হদিশ এখন পাওয়া যায় না। স্তম্ভের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তার ওপরে খোদিত লিপি। লুম্বিনী উদ্যানের অশোক স্তম্ভের লেখ যা রুম্মিনদেঈ-এর লঘু স্তম্ভলেখ বলে প্রসিদ্ধ (Minor Pillar Inscription of Rummindei)। ব্রাহ্মী লিপি ও প্রাকৃত ভাষায় পাঁচখানি পংক্তি খোদাই করা আছে।

দেবান পিয়েন পিয়দসিন লাজিন বীসতিবসাভিসিতেন
অতন আগাচ মহীয়িতে (,) হিদ বুধে জাতে সক্যমুনীতিতে
সিলবিগডভী চা কালাপিত সিলাথভে চ উসপাপিতে
হিদ ভগবং জাতে তি লুংমিনিগামে উবলিকে কটে
অঠ ভাগিয়ে চ (।)
মূল পাঠের সংস্কৃত অনুবাদ-
দেবানাং প্রিয়েণ (দেবপ্রিয়েণ) প্রিয়দর্শিনা রাজ্ঞা বিংশতি বর্ষাভিষিক্তেন
আত্মনা আগত্য মহীয়িতং, ইহ বুদ্ধঃ জাতঃ শাক্যমুনিঃ ইতি।
শিলাবি(ষ্কৃত) গডিভী চ কারিতা শিলাস্তস্ত চ উচ্ছাপিতঃ।
ইহ ভগবান্ জাতঃ ইতি লুংবিনীগ্রামঃ উদবলিক কৃতঃ আষ্টভাগিকঃ চ।
বাংলা অনুবাদ –
দেবপ্রিয় প্রিয়দর্শী রাজা অভিষেকের কুড়ি বছরে এই স্থানে এসে নিজেই পূজা করেছেন। যেহেতু শাক্যমুনি এই স্থানে জন্মগ্রহণ করেছেন সেইজন্য এইস্থানে প্রস্তর প্রাচীর স্থাপিত হল এবং শিলাখণ্ড উত্থাপিত (উৎকীর্ণ) হল। ভগবান্ (বুদ্ধ) এই স্থানে জন্মগ্রহণ করেছিলেন সেই কারণে লুম্বিনীগ্রাম নিষ্কর (উবলিকে = উদ্ + বলি + ক) ও অষ্টভাগী কর হল (অর্থাৎ উৎপন্ন দ্রব্যের শুধুমাত্র আটভাগের একভাগ কর নিধারিত হল)। (রায় আচার্য- ২০১৪, ৩১৩)
অনুবাদের একটি বিশেষ শব্দ নিয়ে বিতর্কের সীমা নেই। শব্দটি হল ‘সিলভিগডভী।’ বিভিন্ন পণ্ডিত বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আমরা এখানে সিলভিগডভী শব্দের ‘প্রস্তর প্রাচীর’ অর্থ দিয়েছি (শিলা + বিগড + ভীচা = শিলা + বিকট + ভিত্তি)। বিভিন্ন পণ্ডিত এই শব্দের ভিন্ন ভিন্ন অর্থ খুঁজে পেয়েছেন
যেগুলি লেখের বিভিন্ন পাঠের সঙ্গে দেওয়া হল পরিশিষ্ট
‘ক’-তে।
এ বার্থ এবং আর বসাক সিলভিগডভীকে ব্যাখ্যা করেছেন ‘স্তম্ভশীর্ষ হিসাবে গাধার একটি প্রস্তর মূর্তি’ বলে। পিশেল এবং জি বুহলার বলেছেন ‘গাধার মত খারাপ কিছু নয়’ বরং ‘সূক্ষ্মভাবে পালিশ করা’ কিছু হবে। ডঃ বি সি ল, ভি এ স্মিথ এবং জে চার্পেনলিয়ার বলেছেন ‘গাধা নয়, একটি পাথরের ঘোড়া ছিল স্তম্ভ শীর্ষে’ বা ‘ঘোড়া বহনকারী একটি পাথর।’ পরে পিশেল বলেছেন ‘পাথরের একটি নিখুঁত খণ্ড’ যা থেকে ওই স্তম্ভটি তৈরি করা হয়েছিল। জে এফ ফ্লিট বলেছেন ‘ঘিরে থাকা একটি পাথরের প্রাচীর এবং একটি জালিকা।’ পি থিমে বলেছেন ‘একটি পালকবিহীন ঘোড়া’ অর্থাৎ পক্ষীরাজ ঘোড়া নয়। কেনেথ আর নরম্যান বলেছেন ‘পাথর দিয়ে বানানো প্রাচীর অথবা পাথর দিয়ে অলঙ্কৃত প্রাচীর।’
আবার আর কে মুখার্জি এটিকে ‘চিত্র খোদাই করা একটি পাথর’ বলে ব্যাখ্যা করেছেন। রাজবালি পান্ডে, অমূল্যচন্দ্র, দীনেশ চন্দ্র সরকার, রোমিলা থাপার ও জনার্দন ভট্ট শব্দটি ‘পাথরের রেলিং’ হিসাবে ব্যাখ্যা করেছেন যার ওপরে ঘোড়া, হাতি ও অন্যান্য মূর্তি ছিল। নেপালের ভিক্ষু সুদর্শন মহাস্থবির বলেছেন যে সিলভিগডভী শব্দের মাধ্যমে জন্ম-ভাস্কর্যকেই বোঝানো হয়েছে। আমি এখানে
‘পাথরের প্রাচীর’ অনুবাদ দিয়েছি। পাথরের প্রাচীর, রেলিং ইত্যাদি ছিল মৌর্য স্থাপত্যের একটি অঙ্গ আর তাই ধারণা করা হয় যে অশোক সেই রকম কিছু স্থাপনা করে গিয়েছিলেন হয়তো যা কালের প্রভাবে হারিয়ে গেছে। আমরা দেখব যে জন্মস্থানের মন্দির যুগে যুগে কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছিল। আবার স্তম্ভ শীর্ষে পাথরের ঘোড়া হওয়ার সম্ভাবনা আছে কারণ আমরা অনেক অশোক স্তম্ভের মাথায় বিভিন্ন পশুর মূর্তি দেখেছি আর হিউয়েন সাঙ তাঁর লুম্বিনী পরিদর্শনের বিবরণে স্তম্ভের ওপরে একটি অশ্বের মূর্তির কথা উল্লেখ করেছিলেন। বুদ্ধকে বহুদিন ধরে হাতির (বিশেষ করে ষড়দন্ত) রূপে দেখা হত কারণ মায়াদেবী স্বপ্নে বোধিসত্ত্বকে হাতির রূপে তাঁর গর্ভে প্রবেশ করতে দেখেছিলেন আর তাই জন্ম স্থানের স্তম্ভ শীর্ষে হাতির মূর্তি থাকাও অবিশ্বাস্য কিছু নয়।
তবে আমার মনে অন্য একটি চিন্তাও আসে তা হল জন্ম-চিহ্ন পাথরের কথা। আমরা জানি যে সিদ্ধার্থের জন্ম স্থান নির্দিষ্ট করতে একটি জন্ম–চিহ্ন পাথর খননে পাওয়া গেছে। এই জন্ম-চিহ্ন পাথরটিকে একটি উঁচু বেদির ওপর স্থাপন করা হয়েছিল। সাত স্তর ইট বিছিয়ে বেদিটি তৈরি করা হয়েছিল। এই বেদির পূর্বদিকে দুটি বেলেপাথর দিয়ে নির্মিত একটি খিলানযুক্ত কুলুঙ্গি পাওয়া গেছে এবং সমগ্র স্থাপত্যটির মধ্যে মৌর্য শৈলীর বৈশিষ্ট্য ভীষণ মাত্রায় প্রকট, অর্থাৎ এই স্থাপত্যটি সম্রাট অশোকের সময়ে নির্মাণ করা হয়েছিল সেই নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই (Vaidya T R, Lumbini the Peace-Shrine of Pilgrimage)। আবার এইসব স্থাপত্যের ওপরে ছিল বুদ্ধের জন্ম নেওয়া ভাস্কর্যটি যা আদিতে মনে হয় পাথরের কুলুঙ্গিটিতে রক্ষিত ছিল। পাথরের জন্ম-ভাস্কর্য ও জন্ম–চিহ্ন পাথরটি মিলে লুম্বিনীর সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ স্থানটি নির্দেশ করে, ঠিক যেখানে সিদ্ধার্থ গৌতম জন্মগ্রহণ করেছিলেন। আর তাই অশোক স্তম্ভে খোদিত ‘সিলভিগডভী’ শব্দটি আমার ধারণা যে কোনো পাথরের মূর্তিও নয় আবার পাথরের রেলিং বা মঞ্চও নয়, সেটি হল বুদ্ধের জন্মস্থান সূচিত করে জন্ম-চিহ্ন পাথরের খণ্ডটির স্থাপনা। তাই এই মহান কাজটি করে সম্রাট অশোক সেটি তাঁর স্তম্ভে খোদাই করে লিখে যাবেন না সেটা ভাবা যুক্তিযুক্ত নয়।
শুধু ‘সিলভিগডভী’ শব্দটি নয়, আরেকটি শব্দ নিয়েও সন্দেহ জাগে, সেই শব্দটি হল “অঠ ভাগিয়ে।” সাধারণ ভাবে বেশিরভাগ পণ্ডিতদের মত হল যে এখানে লুম্বিনী গ্রামের কর কমিয়ে ‘এক-অষ্টমাংশ’ করা হয়েছিল। এই প্রসঙ্গে হ্যারি ফক একটি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন উঠিয়েছেন (Falk: 1998, 18)। তাঁর মতে অশোকের রাজ্যে প্রচলিত এক-ষষ্ঠাংশ কর থেকে এক-অষ্টমাংশ কর কমিয়ে এবং সেই অতি, সামান্য, অনুগ্রহ স্তম্ভে লিখে রেখে যাওয়া একটি অতি হীন অর্থকেন্দ্রিক মানসিকতার পরিচয় দিচ্ছে যা কখনোই সম্ভব নয়। তাই ফকের মতে এই শব্দটি প্রকৃতপক্ষে ‘অষ্টভোগতেজস্বম্য’ শব্দের হ্রস্ব রূপ যার অর্থ হচ্ছে যে জমি থেকে পাওয়া আট প্রকারের সম্পদের (যেমন জল, শস্য, পাথর ইত্যাদি) অধিকার এবার থেকে গ্রামবাসীদেরই থাকবে।
যার হাত দিয়ে লুম্বিনীর অশোক স্তম্ভটি আবিষ্কার হয়েছিল সেই ডঃ ফিউরারের কার্যকলাপ বড়োই অন্ধকারে ঘেরা। তিনি একাধিক প্রত্নবস্তু জালিয়াতির অভিযোগে দোষী হয়ে চাকরি হারিয়েছিলেন। তাঁর আবিষ্কৃত বহু প্রত্নবস্তু নকল বলে প্রমাণিত হয়েছিল। এমন অবস্থায় লুম্বিনীর অশোক স্তম্ভটিকে নিয়েও স্বাভাবিকভাবে অনেক প্রশ্ন উঠেছে। অশোক স্তম্ভটিকে পরীক্ষা করে বিখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক দেবলা মিত্র রায় দিয়েছিলেন যে অন্যান্য বেশ কিছু অশোক স্তম্ভের মতো এই স্তম্ভটিও চুনার বেলেপাথরের তৈরি এবং এর ওপরে মৌর্য শৈলীর পালিশ রয়েছে (Mitra: 197)। অর্থাৎ দেবলা মিত্রের মতে স্তম্ভটি আসল। চীনা পরিব্রাজকদের লেখায় স্তম্ভের উল্লেখ থাকলেও তাঁরা কোন স্তম্ভটি দেখেছিলেন সে বিষয়ে জানা সম্ভব নয় তবে আরেকটি প্রমাণ আছে যা বুঝিয়ে দেয় যে লুম্বিনীর অশোক স্তম্ভটি আসল। অশোক স্তম্ভের পূর্ব দিকের সবচেয়ে ওপরের অংশে চতুর্দশ শতাব্দীর শুরুর দিকের একটি শিলালিপি রয়েছে। পশ্চিম নেপালের নাগরাজা রাজবংশের রাজপুত্র রিপু মল্ল লুম্বিনীতে তীর্থ করতে এসে
স্তম্ভের ওপরে তাঁর নাম এবং একটি প্রার্থনা খোদাই করিয়ে ছিলেন। লেখটিতে লেখা আছে:

ওম্ মণি পদ্মে হুম্
শ্রী রিপু মল্ল চিদম জয়তু
সংগ্রাম মল্ললেখের প্রথম বাক্যাংশটি একটি মহাযান বৌদ্ধ প্রার্থনা- ওঁ মণি পদ্মে হূঁ যার অর্থ হল “পদ্মের মাঝে ইচ্ছাপূরণকারী রত্ন।” অভিলেখে থাকা এর পরের বাক্যাংশটির অর্থ হল: ‘রিপু মল্ল দীর্ঘ বিজয়ী হোক।’ রিপু মল্ল নেপালের খস রাজবংশের রাজা ছিলেন যিনি ১২৩৪ শকাব্দে অর্থাৎ ১৩১২ সালে লুম্বিনীতে তীর্থযাত্রা করেছিলেন এবং তখন অশোক স্তম্ভের ওপরে তাঁর সেই তীর্থ দর্শনের কথা খোদাই করে রেখে গিয়েছিলেন। অভিলেখের অস্তিত্ব বোঝায় যে রিপু মল্লের সময় পর্যন্ত লুম্বিনী ভগবান বুদ্ধের জন্মস্থান হিসাবে ব্যাপকভাবে পরিচিত ছিল। তারপর লুম্বিনী প্রায় পাঁচ শতাব্দীর জন্য জঙ্গলে হারিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু রিপু মল্লের সাক্ষ্য প্রমাণ করে দেয় যে ১৮৯৬ সালে আবিষ্কার হওয়ার আগে এই স্তম্ভটির অস্তিত্ব ছিল।
লুম্বিনীর অশোক স্তম্ভ যে আসল তাই নিয়ে আমার মনে কোনো সংশয় নেই তার কারণ পি সি মুখার্জির রিপোর্ট। হিউয়েন সাঙ দেখেছিলেন যে লুম্বিনীর অশোক স্তম্ভটি মাঝখান থেকে ফেটে গিয়েছিল। পি সি মুখার্জি ফিউরারের দু’বছর পর সেখানে গিয়ে ফাটা স্তম্ভই দেখেছিলেন। মুখার্জি স্তম্ভের চারদিক বেষ্টন করে থাকা ইটের দেওয়াল দেখেছিলেন যার ইট দেখে বোঝা যায় যে সেই দেওয়াল বিভিন্ন সময়কালে ও আলাদা আলাদা শৈলীতে নির্মাণ করা হয়েছিল। বেষ্টনীর দেওয়ালের পাশে তিনি খননও করেছিলেন এবং মাটির নীচে দেওয়ালের ধারাবাহিকতা ও তারও নীচে ইটের স্থাপনা দেখতে পেয়েছিলেন। তিনি সেখানে ভেঙে পড়া পদ্ম বন্ধনী দেখেছিলেন যার ওপরের ভাস্কর্য ক্ষয়ে যাওয়া ছিল। ফিউরার যদি ফাটা স্তম্ভ বানিয়ে আনেন কিংবা তার সঙ্গে ভাঙা পদ্ম বন্ধনীও, তবুও তার ফাটা অংশে কিংবা পদ্ম বন্ধনীর ভাস্কর্যে কয়েক হাজার বছরের আবহবিকারের ক্ষয় নকলভাবে গড়ে তোলা অসম্ভব ব্যাপার। দ্বিতীয় কারণ হল বেষ্টনীর দেওয়াল (আজ আর নেই)।সেখানে বিভিন্ন সময়কালের ইট ও শৈলী দিয়ে প্রাচীন দেওয়াল গাঁথা আর মাটির নীচে তার ধারাবাহিকতা রাখা কিংবা মাটির গভীরে স্তম্ভের প্রতিষ্ঠা বেদি তৈরি করা এক কথায় অসম্ভব। তবুও অনেক লোকই (এর মধ্যে পণ্ডিতেরাও আছেন) একে সন্দেহের ঊর্ধ্বে রাখেন না। পাঠক এই প্রসঙ্গে মুখার্জির খনন রিপোর্ট পড়লে আমার যুক্তির সারবত্তা বুঝতে পারবেন। আমি সেই রিপোর্টের কিছু প্রয়োজনীয় অংশ তুলে দিলাম।
“লেখযুক্ত স্তম্ভ- রুম্মিন দেঈ মন্দিরের উত্তর-পশ্চিম কোণ থেকে প্রায় ৪৫’ পশ্চিমে এবং ধ্বংসস্তূপের শীর্ষ থেকে ২৫’ ফুট নীচে একটি লেখযুক্ত স্তম্ভ দাঁড়িয়ে আছে যার চারপাশে ইটের বেষ্টনীর মতো কিছু আছে। ঘেরা অংশের ভেতরে স্তম্ভের গোড়ার চারপাশ ধরে আমি প্রায় ৫-১/২’ নীচে খনন করেছিলাম কিন্তু তবু তার ভিত্তি অবধি পৌঁছাতে পারিনি। স্তম্ভের নীচের অংশের পরিধি ৭’ ৯” আর ২’ ৭-১/৪” ব্যাস। স্তম্ভটি সাধারণ হলদে শক্ত বেলেপাথরের আর ২১’ মতো উঁচু।
“স্তম্ভশীর্ষ- এর উপরাংশ নেই আর যেটুকু আছে তাও ওপর থেকে দুভাগ হয়ে আছে। প্রায় মাঝখান অবধি ফাটলের রেখা এসেছে। স্তম্ভশীর্ষ যেমন হয় তেমনই ঘণ্টা আকৃতির যার গোড়ার দিকটা আবার ভেঙে দুই টুকরো হয়ে মন্দিরের প্রাঙ্গণে পড়ে আছে। আসলে হয়েছে কী স্তম্ভটি তো গোটা ছিল তারপর এক দিন বজ্রপাতে ওপর থেকে এটি দুই ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছিল আর যতদূর মনে হয় যে তখন থেকে তা মাটিতেই পড়ে আছে। স্তম্ভশীর্ষে শোভিত করে থাকা পাথরের ঘোড়াটি স্তম্ভের উপরিভাগের সঙ্গেই উধাও হয়ে গেছে। স্তম্ভশীর্ষের বিরাট পদ্মের অংশের (cyma) ওপরে প্রচলিত ঝলন মালা (festoon) দেখা যায়। এর নীচে ঠিক কেন্দ্রে,
১’ গভীর ও ৫” ব্যাসের একটি ছিদ্র আছে যাতে তামার দণ্ড (mortice) ঢুকিয়ে স্তম্ভের ওপরে লাগানো হত।
“ইটের রেলিং-বেষ্টনী দেওয়া স্থানটি স্তম্ভ থেকে ১’ ৬” দূর দিয়ে গেছে। বেষ্টনীর দেওয়ালে বিভিন্ন যুগের স্থাপনা দেখা গেছে। একদম নীচের গাঁথনির ইটগুলি বেশ বড়ো আকারের। এগুলির শৈলী সবচেয়ে প্রাচীন। এই অংশটি দেওয়ালের শীর্ষ থেকে ৫’ ৬” নীচে অবস্থিত যেখানকার দেওয়ালে দাঁতের (dentils) মতো খোপ খোপ আছে। দেওয়ালের মাঝের অংশ নিচ থেকে ২’ ৮” উঁচুতে অবস্থিত। এরপরের অংশ পরবর্তী কালের। দেওয়ালের একদম ওপরের অংশ আরও পরের সময়ের, যাতে দাঁতের মতো খোপ খোপ আছে যেগুলি প্রায় ৮” চওড়া ও এক-একটি খোপ দুটি করে ইট দিয়ে তৈরি। দাঁতের মতো খোপের ওপরে ও নীচে ইটের দুই স্তর প্রায় এক ইঞ্চির মতো কমে গেছে। ওপরে ও নীচে আবার গঠন ওপরের প্রান্তে সমান হয়ে গেছে। অধিকতর খনন এবং একটি ইটের বেদি উন্মুক্ত হয়েছিল: পশ্চিম দিকে যেখানে দেওয়াল পড়ে গেছে সেখানে দেওয়াল আরও ৩’ উঁচুতে উঠে গেছে। বেষ্টনীর দেওয়ালের বাইরে আমি উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণ দিকে খনন করেছিলাম। উত্তরের পরিখাতে ইটের টুকরোর মোটা স্তর পেয়েছিলাম এবং আমি বেশি নীচ অবধি গিয়ে দেখতে পারিনি যে প্রকৃত কাঠামো সেদিকে কতটা বিস্তৃত। পশ্চিম পরিখায় স্তম্ভ থেকে ৪’ দূরে একটি দেওয়ালের ৩’ ৭” লম্বা অংশ বেরিয়ে এসেছিল। আর দক্ষিণের পরিখায় ইটের টুকরো বোঝাই এক মোটা স্তর কেটে তারপরও ৬” গভীরে একটি ইটের বেদি পেয়েছিলাম যা অন্য দিকগুলোয় বিস্তৃত ছিল, আমি জানি না কতদূর। সময় কম আর আর দিনের বেলায় গরমের কারণে বাকি সব খননের সঙ্গে এর খননও থামিয়ে আমায় সফর বন্ধ করতে হয়েছিল।” (Mukherji: 1901, 34-36)।
অশোক স্তম্ভের লেখ পড়ে বোঝা যায় যে অশোক তাঁর অভিষেকের ২০ বছর পর অর্থাৎ প্রায় ২৫০ সাধারণ পূর্বাব্দ নাগাদ লুম্বিনী ভ্রমণ করেছিলেন। এই লেখ ছাড়া অশোকাবদান গ্রন্থেও (Strong: 120) উল্লেখ আছে যে অশোক তাঁর গুরু উপগুপ্তের সঙ্গে লুম্বিনী পরিদর্শন করেছিলেন। তাঁরা সেখানে বুদ্ধদেবের জন্ম যে বৃক্ষের নীচে হয়েছিল তার দেখা পেয়েছিলেন এবং উপগুপ্তের আহ্বানে বৃক্ষবাসী যক্ষ এসে তাঁদের বুদ্ধজন্মের কাহিনি বর্ণনা করেছিলেন।
আপনি তাঁর জন্মের সাক্ষী এবং দেখেছেন
তাঁর শরীর (পবিত্র) চিহ্নে শোভিত ছিল!
আপনি তাঁর পদ্মের মতো প্রশস্ত চোখের দিকে তাকিয়েছিলেন!
আপনি এই বৃক্ষের মধ্যে থেকে শুনেছেন
সেই মহামানবের
প্রথম আনন্দদায়ক শব্দ
আমাকে বলুন, দেবী, কেমন ছিল – সেই পবিত্র জন্মের অপূর্ব মুহূর্ত?
এবং দেবী উত্তর দিয়েছিলেন:
আমি সত্যিই মহত্তম পুরুষের জন্ম প্রত্যক্ষ করেছি,
সেই কনকবর্ণ আচার্যের,
আমি তাকে সাত পদক্ষেপ এগিয়ে যেতে দেখেছি,
ইন্দ্রের ত্রৈমাত্রিক জগতে,
সেখানে একটি অলৌকিক আলো জ্বলে উঠল,
স্বর্ণবৎ যা চোখে দেখলে পুলকিত হতে হয়।
সাগর দিয়ে ঘেরা পৃথিবী ও তার পর্বতমালা
কেঁপে উঠেছিল, যেমন এক সমুদ্রের ঢেউ কাঁপিয়ে তোলে জাহাজকে।
দিব্যাবদান গ্রন্থে লুম্বিনীর জন্মস্থানে একটি মন্দির নির্মাণের কথাও উল্লেখ আছে, যার জন্য অশোক ১০০০ ভরি সোনা দান করেছিলেন এবং স্তম্ভের লেখ অনুসারে জমির করও কমিয়ে দিয়েছিলেন। যেহেতু অশোক লুম্বিনীর কর নিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তাই ধরে নেয়া যায় যে সেই অঞ্চল অশোকের রাজ্যেই অবস্থিত ছিল। অশোকের শাহবাজগড়ি শিলালিপিতে ‘নভাক’ নামের একটি প্রদেশের কথা পাওয়া যায়। আবার ফা-হিয়েনের বর্ণনায় কপিলাবস্তুর নিকটে তিনি ক্রকুছন্দ (পূর্ববর্তী) বুদ্ধের শহরে গিয়েছিলেন আর তিনি সেই স্থানের নাম উল্লেখ করেছেন, ‘না-পি-কী’ (সমাদ্দার: ২০২৪, ১০০) বলে যা অশোকের অধীনের নভাক প্রদেশের সঙ্গে সাদৃশ্য আছে। নাভাক নামের এক বৈদিক ঋষি ছিলেন যিনি ঋগ্বেদের কিছু সূক্ত (৮.৩৯, ৮.৪০, ৮.৪১, ৮.৪২) রচনা করে গেছেন। এমন হতে পারে যে শাক্যভূমি বা হিমালয়ের তরাই অঞ্চল পরে নভাক নামে পরিচিত হয়েছিল। কারণ আমরা বিষ্ণুপুরাণে পাই যে নাভি নামে একটি জাতি হিমালয়ের নীচে রাজত্ব করত। যেখানে বলা হয়েছে যে সয়ম্ভুব মনুর পুত্র ছিলেন প্রিয়ব্রত। প্রিয়ব্রতর ছিল দশ পুত্র – অগ্নিধ্র, অগ্নিবাহু, বপুষ্মত, দ্যুতিমত, মেধ, মেধাতিথি, ভব্য, সবল, পুত্র এবং জ্যোতিষ্মত। অগ্নিবাহু, পুত্র ও মেধ সন্ন্যাসীর জীবন বেছে নিয়েছিলেন। প্রিয়ব্রত তাই বাকি সাত পুত্রের মধ্যে সমগ্র পৃথিবী ভাগ করে দিয়েছিলেন আর অগ্নিধ্র পেয়েছিলেন জম্বুদ্বীপ বা ভারত উপমহাদেশ। অগ্নিধ্র-র ছিল নয়টি পুত্র, নাভি, কিম্পুরুষ, হরিবর্ষ, ইলাবৃত, রম্য, হিরণ্মত, কুরু, ভদ্রাশ্ব, এবং কেতুমাল। অগ্নিধ্র-র থেকে নাভি পেয়েছিলেন হিমালয়ের দক্ষিণ অংশ। নাভি-র রানির নাম ছিল মেরুদেবী ও পুত্রের নাম ছিল ঋষভদেব (বিষ্ণু পুরাণ, ২.১.২-২৬)। সম্ভবত ‘নাভি’ নাম থেকেই সেই অঞ্চলের নাম নভাক হয়েছিল।
অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দশক থেকে যখন ভারতের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ইতিহাসের কথা জানা যাচ্ছে তখন অনেক পণ্ডিত এই নিয়ে আগ্রহী হয়েছিলেন। স্যার উইলিয়াম জোনস এবং সমমনস্ক কয়েকজন মিলে ১৭৮৪ সালে সালে ‘এশিয়াটিক সোসাইটি’ গঠন করেন। প্রাথমিক পর্যায়ে এই সংস্থার তত্ত্বাবধানে জেমস প্রিন্সেপ, এ ক্যানিংহাম এবং আরও কিছু ব্যক্তি ভারতের প্রাচীন সাংস্কৃতিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যকে খুঁজে বার করতে চেষ্টা করেছিলেন। ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ লুম্বিনীর সম্ভাব্য অবস্থান অনুসন্ধান করতে শুরু করেছিল। তখন নেপালে শাসন করতেন রানারা এবং তাঁরা সেখানে বিদেশী পণ্ডিতদের এসে সাংস্কৃতিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলিতে অনুসন্ধান করার অনুমতি দিতেন না। ১৮৯৫ সালের মার্চ মাসে, ফিউরারকে নেপালগঞ্জের কাছে বৈরাটে একটি অশোক স্তম্ভের শিলালিপির ছবি তোলার জন্য পাঠানো হয়েছিল। তিনি গিয়ে অশোক স্তম্ভটি খুঁজে পাননি, তবে তৌলিওয়ায় নিগালী
সাগরের ধারে খোদাই করা লেখযুক্ত এক অশোক স্তম্ভের দুটি ভাঙা টুকরো পাওয়া যায়। স্থানীয় লোকজনের মাধ্যমে খবর পেয়ে জেনারেল খড়গ শমসেরের নেতৃত্বে একটি নেপালি দল এরপর এখানে খননকাজ শুরু করে দেয়। স্তম্ভের চারপাশে কয়েক মিটার অবধি মাটি খনন করা ফেলা হয়েছিল। ১৮৯৩ সালে মেজর সিং এবং তরাইয়ের অনেক নেপালি বাসিন্দা এই স্তম্ভটিকে ১৮৯৬ এর খননের আগে দেখেছিলেন।
১৮৯৬ সালের নভেম্বরের শেষের দিকে, ফিউরার খননকার্যের তদারকি করতে নিগালী সাগরে গিয়েছিলেন। পদেরিয়া গ্রামের কাছে ভগবানপুরে জেনারেলের ক্যাম্পে তিনি রানা খড়গ সামসেরের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। তাঁর বিবরণ মতো, শিবিরের কাছেই ছিল চারটি স্তূপের ধ্বংসাবশেষ আর তার মাঝে একটি স্তম্ভের ভাঙা অংশ মাটি থেকে উঠেছিল। সেদিনটা ছিল ১৮৯৬ সালের ১লা ডিসেম্বর। ফিউরার যখন স্তম্ভটি দেখেন তখন সেটির তখন একটি ছোট অংশ, এই সাড়ে তিন মিটার মতো মাটি থেকে বেরিয়ে ছিল আর তার ওপরে ছিল অজস্র তীর্থযাত্রীদের দেওয়া বিভিন্ন বস্তু।
স্তম্ভের লিপিটির ঐতিহাসিক তাৎপর্য যে কতোটা তা সেই বছরে ২৩শে ডিসেম্বর প্রকাশিত এক প্রবন্ধে জানা গেল। তারপর তো ফিউরারের অন্যান্য জালিয়াতির খবর আসাতে এই স্তম্ভটিকে নিয়েও সন্দেহ ছড়িয়ে পড়ে। যদিও ওয়াডেল মন্তব্য করেছিলেন যে “…ডঃ ফিউরার এই কাজের সূচনা করেননি; তিনি কেবল শিলালেখের একটি অনুলিপি নিয়েছিলেন। আসল কাজটি নেপালের কর্মকর্তারা করেছিলেন।”
ফিউরার জন্ম-ভাস্কর্য এবং মন্দির সম্পর্কে লিখে গিয়েছিলেন। ফিউরারের বিবরণ অনুসারে, তাঁর লুম্বিনী পরিদর্শনের প্রায় ছয় বছর আগে (অর্থাৎ ১৮৯০ সালে) একজন হিন্দু সন্ন্যাসী সেখানে এসে জন্ম ভাস্কর্যটির ওপরে একটি মন্দির বানিয়ে সেখানে থাকতে শুরু করেছিলেন।
এরপরে, ডাঃ হোয়ে-ও লুম্বিনী পরিদর্শন করেছিলেন এবং জন্ম-ভাস্কর্য দেখে তার একটি বিবরণ দিয়েছিলেন। ১৮৯৮ সালে পি সি মুখার্জি ইটের মন্দির এবং তার আশপাশের কয়েকটি ছোট চৈত্য খনন করেছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুসারে, সপ্তরথ শিখর শৈলীতে তৈরি ইটের মন্দিরটি পূর্ব দিকে একটি মুখ্য মণ্ডপের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল।
হিউয়েন সাঙের লুম্বিনীর বর্ণনা এই রকম –
“শরকূপের ৮০/৯০ লি উত্তরপূর্ব দিকে অগ্রসর হইয়া আমরা লুম্বিনী উদ্যানে পৌঁছাই। শাক্যগণের স্নানের পুষ্করিণী এই উদ্যানে অবস্থিত। ইহার জল দর্পণের ন্যায় উজ্জ্বল ও স্বচ্ছ এবং পুষ্করিণীর উপরিভাগ নানা প্রকার পুষ্পদ্বারা আচ্ছাদিত।
“ইহার ২৪/২৫ পদ দূরে একটি মৃত অশোক বৃক্ষ। এইস্থানে বোধিসত্ত্ব বৈশাখ মাসের দ্বিতীয়পক্ষের অষ্টম দিবসে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। স্থবির সম্প্রদায় বলেন যে বৈশাখ মাসের দ্বিতীয়পক্ষের পঞ্চদশ দিবসে বোধিসত্ত্ব জন্মগ্রহণ করেন। এই স্থান হইতে পূর্ব দিকে যে স্থানে দৈত্যগণ রাজপুত্রের শরীর ধৌত করিয়াছিলেন, তথায় রাজা অশোক নির্মিত স্তূপ আছে। বোধিসত্ত্ব জন্মগ্রহণ করিয়া বিনা সাহায্যে পৃথিবীর চতুর্দিকেই সপ্তপদ করিয়া অগ্রসর হইয়া বলিয়াছিলেন স্বর্গ ও পৃথিবীর আমিই একমাত্র প্রভু; আমি আর পুনর্জন্ম গ্রহণ করিব না। যে যে স্থানে তাঁহার পদদ্বয় ভূমি স্পর্শ করিয়াছিল,সেই সকল স্থানেই পদ্ম পুষ্প প্রস্ফুটিত হইয়াছিল। অধিকন্তু দুইজন দৈত্য আকাশে থাকিয়া একজন উষ্ণ ও অন্যজন শীতল জলে রাজপুত্রকে ধৌত করিয়াছিল। এই স্তূপের দক্ষিণে দুইটি উৎসের নিকট দুইটি স্তূপ নির্মিত হইয়াছে। এই স্থানেই দুইজন দৈত্য ভূগর্ভ হইতে আবির্ভূত হইয়াছিল। বোধিসত্ত্বের জন্মগ্রহণের পরক্ষণেই পরিচারকগণ শিশুর ব্যবহারার্থ জলের জন্য ইতস্তত ধাবিত হইয়াছিল। ঠিক এই সময়েই সম্মুখেই ভূগর্ভ হইতে উষ্ণ ও শীতল বারি পরিপূর্ণ দুইটি উৎস প্রবাহিত হইতে লাগিল এবং এই জলদ্বারা রাজপুত্রকে স্নান করান হইল।
“ইহারই দক্ষিণে অন্য একটি স্তূপ। এই স্থানে দেবাধিপতি শক্র বোধিসত্ত্বকে আলিঙ্গন করিয়াছিলেন। বোধিসত্ত্বের জন্মগ্রহণের পরেই, দেবাধিপতি শক্র তাঁহাকে সুন্দর ও স্বর্গীয় বস্ত্রে আবৃত করিয়াছিলেন। যে স্থানে স্বর্গীয় নৃপতি-চতুষ্টয় বোধিসত্ত্বকে ক্রোড়ে করিয়াছিলেন, সেই স্থানচতুষ্টয় নির্দেশের জন্য চারটি স্তূপ নির্মিত হইয়াছে। বোধিসত্ত্ব যখন মাতার দক্ষিণ কুক্ষি হইতে জন্মগ্রহণ করেন তখন স্বর্গীয় দেবচতুষ্টয় তাঁহাকে সুবর্ণখচিত কার্পাস বস্ত্রে আবৃত করিয়া সুবর্ণসিংহাসনোপরি স্থাপন করিয়া, তাঁহার মাতার নিকট আনয়ন করিয়া বলিলেন ‘এই প্রকার সর্বগুণান্বিত পুত্রের জন্মে রানি অবশ্যই আহ্লাদিত হইতে পারেন।’
“এইসকল স্তূপের নিকটেই রাজা অশোক নির্মিত প্রস্তর স্তম্ভের ঊর্ধ্বদেশ অশ্বের মূর্তি রহিয়াছে। পরে, দুষ্ট দৈত্য কর্তৃক ইহার মধ্যদেশ ভগ্ন হইয়া ভূমিসাৎ হইয়াছে। নিকটে দক্ষিণ পূর্বাভিমুখী একটি ক্ষুদ্র স্রোতস্বতী আছে। অধিবাসীরা ইহাকে তৈলনদী বলে। বুদ্ধের জন্মের পর রাজ্ঞীর স্নানের জন্য দেবতাগণ এই স্রোতস্বতী প্রবাহিত করিয়াছিলেন। বর্তমানে ইহা পরিবর্তিত হইয়া জলপূর্ণ নদী হইলেও, ইহার জল এইক্ষণেও তৈলযুক্ত।” (সমাদ্দার: ২০২১, ১১০-১১১)
অর্থাৎ হিউয়েন সাঙের সময়েই অশোক স্তম্ভটি ভেঙে গিয়েছিল। ফা-হিয়েনের বর্ণনায় লুম্বিনী বড়োই সংক্ষিপ্ত আর সেখানে পুষ্করিণীর উল্লেখ ছাড়া তেমন কিছুই নেই-
“নগর হইতে ৫০লি পশ্চিমে লুম্বিনী নামক উদ্যানে রাজ্ঞী পুষ্করিণীতে অবগাহন করিয়াছিলেন। পুষ্করিণীর উত্তর দিক দিয়া রাজমাতা নির্গতা হইয়া কুড়ি পদ অগ্রসরান্তে, তিনি তাঁহার হস্তোত্তোলন পূর্ব্বক বৃক্ষের শাখা ধারণ করিয়া ও পূর্ব্বাভিমুখিনী হইয়া যুবরাজকে প্রসব করেন। কুমার ভূমিষ্ঠ হইবামাত্র, তাঁহার মাতা সাতপদ অগ্রসর হয়েন। দুই জন দৈত্যরাজ তাঁহার গাত্র ধৌত করেন। যে স্থানে তাঁহারা তাঁহার গাত্র ধৌত করেন, সেই মুহূর্তে সেই স্থান কূপে পরিণত হয়। এই কূপ ও পূর্বোক্ত পুষ্করিণী হইতে ভিক্ষুগণ সদাসর্বদা পানার্থ জলগ্রহণ করেন।”(সমাদ্দার- ২০২৪, ১০৩)
ফা-হিয়েন আবার লুম্বিনীতে পুষ্করিণীর সঙ্গে
কূপও দেখেছিলেন। আপনারা আগেই পড়েছেন যে ১৯৯৬ সালে পুষ্করিণীটি পরিষ্কার করার সময় এর উত্তর-পূর্ব এবং দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে দুটি কূপ পাওয়া গিয়েছিল। ললিতবিস্তরে সিদ্ধার্থের জন্মের কাহিনির বর্ণনায় পুষ্করিণীর সঙ্গে কূপের উল্লেখও কিন্তু আছে।
ইতি হি ভিক্ষভো জাতে বোধিসত্ত্বে মাতুঃ কুক্ষিপার্শ্বমক্ষতমনুপহতমভবদ্যথা পূর্বং তথা পশ্চাত্
ত্রিতবিষ্যন্দাম্বুকূপাঃ প্রাদুরভূবন অপি চ সুগন্ধতৈলপুষ্করিণ্যঃ
হে ভিক্ষুগণ, বোধিসত্ত্ব জন্মগ্রহণ করার পরে মাতা মায়াদেবীর কুক্ষির পার্শ্বদেশ যেমন ক্ষতহীন অবিকৃত ছিল, পরেও সেইরূপ হইয়াছিল। তিনটি স্রোতের (বিষ্যন্দ) জলযুক্ত কূপ ও সুগন্ধিতৈলের পুষ্করিণী আবির্ভূত হইল।
এই দুই পরিব্রাজকের আগে জি সেংজাই (সেং ত্সাই) লুম্বিনী ভ্রমণ করেছিলেন। তিনি যা দেখেছিলেন তা হল-
“বুদ্ধের জন্মের সময় রানি মায়া অশোক নামের একটি বিস্ময়কর গাছ আঁকড়ে ধরেছিলেন। ল্যাপিস লাজুলি পাথর খোদাই করে রাজা অশোক রানির একটি মূর্তি তৈরি করেছিলেন, যেখানে তাঁর সেই গাছটি আঁকড়ে ধরে রাজকুমারের জন্ম দেওয়ার মুহূর্তটি চিত্রিত করেছিল। যখন পুরানো গাছটি নতুন অঙ্কুর উত্পাদন বন্ধ করে দেয়, তখন সন্ন্যাসীরা পুরানো কাণ্ডটি নিয়ে তা প্রতিস্থাপন করেন এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি পুনরুত্থিত হতে থাকে। গাছের ডালপালা, এখনও অক্ষত, পাথরের মূর্তিকে আশ্রয় দেয়। যেখানে রাজকুমার সাতটি পদক্ষেপ নিয়েছিলেন সেই চিহ্নগুলিও সংরক্ষিত আছে, রাজা অশোক তার দুই পাশে ল্যাপিস লাজুলি দিয়ে বাঁধিয়ে দিয়েছিলেন এবং ঐ পাথরের একটি লম্বা পট্ট দিয়ে ঢেকে দিয়েছিলেন। তার ওপরে আবার স্থানীয়রা ভারী সুতির জাজিম বিছিয়ে রাখে তবুও সাতটি পায়ের ছাপের রূপরেখা এখনও দৃশ্যমান আছে এবং এমনকি আগের চেয়ে আরও উজ্জ্বল।” (L Petech: 1950, 35-36)।
চীনা পরিব্রাজকদের বিবরণ বিশেষ করে ফা-হিয়েন ও হিউয়েন সাঙের বর্ণনা ভালো করে লক্ষ করলে উভয়ের মধ্যে বেশ গরমিল দেখা যায়। ফা-হিয়েন ও হিউয়েন সাঙ উভয়েই একমত যে পুষ্করিণীর উত্তর দিকে ২০ থেকে ২৫ পদক্ষেপ দূরেই ছিল সেই বৃক্ষটি যার নীচে সিদ্ধার্থের জন্ম হয়েছিল। হিউয়েন সাঙ বলেছেন যে জন্ম-বৃক্ষটি ছিল অশোক গাছ যদিও ফা-হিয়েন বৃক্ষের পরিচিতি দেননি। মন্দিরের কাছ দিয়ে হিউয়েন সাঙ একটি নদী বয়ে যাওয়ার কথা (তৈল নদী বা তেলের নদী) বলেছেন অথচ তার উল্লেখ ফা-হিয়েন করেননি। আজও লুম্বিনীর কাছেই ‘তেলার নদী’ (27.477887256174736, 83.2875890944493) নামে একটি ছোটো নদী দেখতে পাওয়া যায় আর আজকের তেলার নদী এবং হিউয়েন সাঙের বর্ণিত তেলের নদী যে একই ধারা তা বুঝতে কোনো অসুবিধা হয় না।
ফা-হিয়েনের পরে হিউয়েন সাঙ লুম্বিনী ভ্রমণ করলেও তিনি অশোক স্তম্ভের উল্লেখ করে গিয়েছেন অথচ ফা-হিয়েন এই বিষয়ে আশ্চর্যজনক ভাবে নীরব। যদিও গুপ্ত যুগে (যখন ফা-হিয়েন ভারতে এসেছিলেন) লুম্বিনী পরিত্যক্ত হয়নি বরং সেখানে যে তখনও মন্দির পুনর্গঠন হয়েছিল তা আমরা পরে আলোচনা করব। বুদ্ধদেব তাঁর মৃত্যুর সময়ে যে চারটি অবশ্য দ্রষ্টব্য তীর্থের নাম বলেছিলেন তার মধ্যে প্রথমটি হল লুম্বিনী (বাকিগুলি হচ্ছে, বোধগয়া, সারনাথ ও কুশিনগর) আর সেখানে লুম্বিনী ভ্রমণের পর ফা-হিয়েনের অতি-সংক্ষিপ্ত লুম্বিনী ভ্রমণের বর্ণনা এবং তার ভেতরে বেশ কিছু অসঙ্গতি (ওপরে উল্লিখিত) দেখে বড়োই সন্দেহ জাগে। দুই চীনা পরিব্রাজকের লেখায় এমন অসঙ্গতি যে কত পেয়েছি তা ভাবা যায় না।

এতক্ষণে আমরা দেখেছি যে লুম্বিনীতে অতীতের তীর্থযাত্রীরা কী কী দেখেছিলেন এবং এখন আমরা কী কী দেখতে পাই। আমরা যা দেখতে পাই তা অবশ্যই লুম্বিনীতে হওয়া অনেকগুলি খননে উঠে আসা স্থাপত্য। যা চোখে দেখা যায় তা ছাড়া কিন্তু অনেক কিছু আবার চোখের বাইরে থেকে যায়। তাই আমরা এবারে দেখে নেব যে লুম্বিনীতে কবে-কবে খনন হয়েছিল আর সেখানে কী পাওয়া গিয়েছিল। বিশেষ করে আমাদের নজর থাকবে জন্ম স্থানের মন্দিরের ওপরে। সেখানে কবে থেকে মন্দির নির্মাণ হয়েছিল আর সেগুলি কীরকম ছিল।
