কপিলাবস্তুর অবস্থানের প্রমাণ

কপিলাবস্তুর অবস্থানের প্রমাণ

কোনো সন্দেহ নেই যে কপিলাবস্তু শনাক্তকরণের দৌড়ে পিপরাওয়া এগিয়ে থাকবে কারণ এখানে পাথুরে প্রমাণ পাওয়া গেছে। তিলৌরাকোটকে কপিলাবস্তু বলার প্রসঙ্গে সবাই প্রধান যুক্তি হিসেবে দেখান যে পিপরাওয়ার ধ্বংসাবশেষে যেখানে স্তূপ বিহারের স্থাপত্য নজরে পড়ে সেখানে তিলৌরাকোট অনেকটাই প্রাকার ঘেরা রাজপ্রাসাদের মতো। বিভিন্ন বৌদ্ধ গ্রন্থ পড়ে জানা যায় যে কপিলাবস্তুতে শুদ্ধোদনের রাজপ্রাসাদ বিশাল ও জাঁকজমকপূর্ণ ছিল। সেখানে কপিলাবস্তু নগরের সম্বন্ধে যা লেখা আছে তা সমসাময়িক শ্রেষ্ঠ নগরীদের সঙ্গে পাল্লা দেয়। আবার চীনা পরিব্রাজকরা যখন কপিলাবস্তু এসেছিলেন তখন তার ধ্বংসাবশেষ দেখলেও তাঁরা তার প্রাকার ইত্যাদির কথা বলেছেন।

আবার একথাও ঠিক যে তিলৌরাকোটের ধ্বংসাবশেষ থেকে পাওয়া নগরীর চরিত্র একটি প্রাকার ঘেরা কেল্লা নগরীর মতো। এখানে ইটের আকারও বেশ বড়ো কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে যে এমন বড়ো আকারের ইটের ব্যবহার হত মৌর্য যুগে (Falk Harry: The Ashes of the Buddha) আর তাই তিলৌরাকোটের প্রাসাদ, প্রাকার ইত্যাদির নিদর্শন মোটেই বুদ্ধের সময়কালের নয়।

বৌদ্ধ গ্রন্থগুলি বুদ্ধের জীবনকালের অনেক পরবর্তী সময়ে লেখা হয়েছে আর সেখানে বুদ্ধ ভগবান। সুতরাং তাঁর নগর, প্রাসাদ সবই বর্ণনার সময়ে যে অতিরঞ্জিত হয়ে যাবে সেটাই স্বাভাবিক। বাস্তবে সাধারণ পূর্বাব্দের পঞ্চম শতাব্দীতে, তরাই অঞ্চলে বসবাসকারী জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে একটি ছিল শাক্য। এই গোষ্ঠীর মধ্যে থেকে বুদ্ধের জন্ম না হলে হয়তো শাক্যদের কথা ইতিহাসে নামকেওয়াস্তে থাকত। বুদ্ধ ছাড়া শাক্যদের কোনো গুরুত্ব ছিল না। ত্রিপিটকে ও অন্যান্য গ্রন্থে যে প্রধান ষোড়শ মহাজনপদগুলির নাম আছে তাতে শাক্যদের উল্লেখ নেই। প্রকৃতপক্ষে শাক্য বলতে কোনো স্বাধীন রাজ্যই ছিল না, এটি কোশল রাজ্যের একটি সামন্ত রাজ্য ছিল আর তাই বিভিন্ন প্রসঙ্গে স্বয়ং বুদ্ধ পর্যন্ত নিজেকে কোশল রাজ্যের বলে পরিচয় দিয়েছেন। যেমন বিম্বিসারকে নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে বুদ্ধ এই বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করেছিলেন।

ভিক্ষু বলিলেন, মহারাজ! হিমালয়ের পাদদেশে কোশল রাজ্যের অধীনে একটি ক্ষুদ্র জনপদ আছে। সেই স্থানের বাসিন্দারা ধন-সম্পদশীল ও বীর্যবান। তাহারা জাতিতে ক্ষত্রিয়, শাক্য বংশীয় ও আদিত্য গোত্রের। আমি সেই দেশ ও সেই কুল হইতে আসিয়াছি। সংসারের সুখ ভোগে বীতশ্রদ্ধ হইয়া আমি প্রব্রজ্যা গ্রহণ
 করিয়াছি৷  ৷৷ ১৮-১৯ ৷৷

ভোগের দুর্দশা ও ত্যাগের শান্তি উপলব্ধি করিয়া, জগতের দুঃখ নিরসনের জন্য আমি বাহির হইয়াছি। ইহাই আমার জীবনের মূল উদ্দেশ্য॥২০॥

– পবজ্জাসুত্ত ১৮-২০

মূলত কৃষি ছিল শাক্যদের জীবিকা। শুদ্ধোদনকে যতই রাজা হিসেবে দেখানো হোক না কেন তিনি প্রকৃতপক্ষে ছিলেন কোশল রাজ্যের এক সামন্ত। বিভিন্ন সূত্র থেকে আমরা দেখি যে বীজবপনের উৎসবে (বপ্পমঙ্গলম্) শাক্য রাজা সোনার পাতে মোড়া লাঙ্গল চালাতেন। সিদ্ধার্থও কৃষিজমিতে গিয়ে পাশে গাছতলায় বসে ধ্যান করতেন। একবার তিনি চাষের সময় লাঙ্গলের ফলায় পোকামাকড়দের মরতে দেখে কষ্ট পেয়েছিলেন। শুদ্ধোদনের চার ভাই ছিলেন – ধৌতোদন, শক্যোদন, শুক্লোদন, ও অমৃতোদন (পালি উচ্চারণে- ধোতদন, শক্যদন, শুক্যদন, অমিতদন)। লক্ষ করে দেখুন যে চার জনের নামই ‘ওদন’ অন্ন (ভাত) সম্পর্কিত। কোনো দুর্জয়, বিক্রমশালী, সিংহহৃদয় গোছের নাম না রেখে তাঁদের নাম রাখা হয়েছিল ‘শুদ্ধ-অন্ন’, ‘পরিষ্কৃত-অন্ন’, ‘শুভ্র-অন্ন’ ও ‘অমৃত-অন্ন।’ এই কৃষি প্রধান জাতির শাসন ব্যবস্থা চলত গণ রাজ্যের নিয়মে অর্থাৎ একটি সঙ্ঘাগারে হোমরাচোমরা লোকেরা বসে নিয়ম শৃঙ্খলা ঠিক করতেন। তাই প্রথম থেকেই মাথায় রাখবেন যে সেই সময়ে কপিলাবস্তু মোটেই একটি নগর ছিল না যে সেখানে মোটা প্রাকার সহ সুরক্ষিত বিশাল কিছুর নিদর্শন পাওয়া যাবে। বুদ্ধের নির্বাণের প্রাককালে তাঁর প্রিয় শিষ্য আনন্দ ওই অঞ্চলের যে যে বৃহৎ নগরগুলির নাম উল্লেখ করেছিলেন তার মধ্যে কিন্তু কপিলাবস্তুর নাম ছিল না।

এইরূপ উক্ত হইলে আয়ুষ্মান আনন্দ ভগবানকে কহিলেন, দেব, এই ক্ষুদ্র, পরিত্যক্ত, শাখানগরে যেন ভগবান পরিনিবৃত না হন। অন্যান্য মহানগর সমূহ বিদ্যমান, যথা-চম্পা, রাজগৃহ, শ্রাবস্তী, সাকেত, কৌশাম্বি, বারাণসী। এই সকলের যে কোনো স্থানে ভগবানের পরিনির্ব্বাণ হউক, এই সকল স্থানের বহু ক্ষত্রিয়, ব্রাহ্মণ ও গৃহপতি মহাশালগণ তথাগতে অভিপ্রসন্ন, তাঁহারা তথাগতের শরীর পূজা করিবেন।

– মহাপরিনির্বাণ সূত্র ৫.১৭

সুতরাং শাক্যদের রাজধানী বলতে যে বিশাল কিছুর হদিশ পাওয়া যাবে না তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই আবার তাই বলে সেটি যে একদম পল্লীগ্রাম হবে তাও ভাবা যায় না। কপিলাবস্তুর তকমা নিয়ে তিলৌরাকোট আর পিপরাওয়ার দ্বন্দ্ব অনেকটাই প্রসার লাভ করেছে। বিষয়টি নেপাল ও ভারতের মধ্যে একটি বড়ো মতানৈক্য তৈরি করেছে। বিষয়টি শুধু মাত্র দুই দেশের নয় বরং অনেকটাই সম্প্রসারিত হয়ে আন্তর্জাতিক হয়ে উঠেছে কারণ পৃথিবীর বৌদ্ধ সমাজের কাছে কপিলাবস্তুর গুরুত্ব অপরিসীম।

অপরদিকে তিলৌরাকোটে আমরা কেল্লার মতো ইটের স্থাপত্য দেখেছি। কিন্তু কেল্লা বা প্রাসাদের মতো কাঠামোটি মৌর্য যুগের হলেও শুধুমাত্র শক্তপোক্ত ইটের বিশাল স্থাপত্য আছে বলেই তো সেটি কপিলাবস্তু হয়ে যাবে না। বুদ্ধের সময়ে কপিলাবস্তুতে যে কেল্লার মতো মোটা সীমানা প্রাকার ছিল তার একটিমাত্র উল্লেখ আছে মহাবস্তু অবদানের (দ্বিতীয় খণ্ড, ১১.৭৫) যেখানে বলা হয়েছে যে কপিলাবস্তুতে সাতখানা সীমানা প্রাকার ছিল। সাতখানা সীমানা প্রাচীর! আপনার এটি অতিরঞ্জিত মনে হয় না কি?

“তেন হস্তিনাগেন এভাং নগরদ্বারমোরুদ্ধং ন চ তং দেবদত্তো শক্নোতি অতঃ নগরদ্বারতো অপকর্ষয়িতুং লঙ্ঘয়িত্বা অতিক্রান্তো॥ সো দানি হস্তিনাগো সুন্দরনন্দেন যানাতো অবতরিত্ত্বা তত্তো দ্বারাতো সপ্ত পদাং কড্ঢিতো।  দৃষ্ট্বা মহাজনকাযেন হক্কারো মুক্তো। অহো কুমারস্য
 সুন্দরনন্দস্য উৎসাহো॥সুন্দরনন্দো পি তং হস্তিনাগং দ্বারতো সপ্ত পদানি অপকর্ষিত্বা অতিক্রান্তো॥বোধিসত্বো মহতা সমৃদ্ধীয়ে অনুপ্রাপ্তঃ॥বোধিসত্বো পৃচ্ছতি। কিস্য এষ নগরদ্বারে মহাং জনকায়সমাগমো॥তে আহন্সুঃ॥কুমার দেবদত্তো চ কপিলাবস্তুতো নির্ধাবতি ভ্রান্তো চ হস্তিনাগো প্রবিশতি নগরদ্বারং অভিমুখো দেবদত্তস্য আপতিতো। তেন রুষিতেন সো হস্তিনাগো একায় তলপ্রহারায়ে নিহতো সো এষো হস্তিনাগো নগরদ্বারং ওরুন্ধিত্বা
 পতিতো চ। দেবদত্তো ন শক্নোতি অতঃ নগরদ্বারাতো অপকর্ষিতুং লঙ্ঘিত্বা অতিক্রান্তো। সুন্দরনন্দেন সপ্ত পদানি কড্ঢিতো। তদেষ জনকাযো সংপিণ্ডায়ে কথাং পি নির্ধাবতি॥তেন কালেন তেন সময়েন কপিলাবস্তু সপ্তহি প্রাকারেহি পরিক্ষিপ্তো অভূষি॥বোধিসত্বেন যানাতো অবতরিত্ত্বা মাতাপিতৃকেন বলেন তং হস্তিনাগং অতো নগরাতো তেষাং সপ্তানাং প্রাকারাণাং পরতরেণ ক্ষিপ্তো॥তং বোধিসত্বস্য উৎসাহং দৃষ্ট্বাঃ অনেকেহি দেবমনুষ্যসহস্রেহি হক্কারা
”

সেই হস্তী নগরদ্বার আটকে দিয়েছিল, দেবদত্ত তাকে সরাতে পারেনি, তবে লাফিয়ে তা অতিক্রম করেছিলেন। এরপর সুন্দরনন্দ তাঁর রথ থেকে নেমে হাতিটিকে সাত পা টেনে নিয়ে গেলেন। জনতার ভিড় দেখে চিৎকার করে উঠল, “বাহ! দেখো কুমার সুন্দরনন্দের শক্তি, যিনি হাতিটিকে সাত পা টেনে নিয়ে গিয়ে নগরদ্বার অতিক্রম করেছেন।” মহাসমৃদ্ধি সহকারে বোদ্ধিসত্ত্ব সেখানে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, “নগরদ্বারে এই বিশাল জনসমাগম কেন?” তারা উত্তর দিল, “হে কুমার, দেবদত্ত কপিলাবস্তু থেকে বেরিয়ে আসছিলেন এবং একটি ঘুরতে থাকা হাতি দরজা দিয়ে প্রবেশ করে তার দিকে তেড়ে আসে। রাগে, দেবদত্ত এক আঘাতে হাতিটিকে হত্যা করেন, যা পড়ে গিয়ে নগরদ্বার আটকে দেয়। কিন্তু দেবদত্ত সেটিকে সরাতে পারেননি এবং লাফিয়ে অতিক্রম করেন। কিন্তু সুন্দরনন্দ হাতিটিকে সাত পা টেনে নিয়ে যান। এখন এখানে জনতার বিশাল ভিড় জমেছে। তারা কীভাবে বাইরে যাবে?” সেই সময়ে এবং সেই অবস্থায়, কপিলাবস্তু সাতটি প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত ছিল। বোদ্ধিসত্ত্ব তাঁর রথ থেকে নেমে নিজের শক্তি দিয়ে হাতিটিকে নগরের বাইরে সাতটি প্রাচীর অতিক্রম করে ছুঁড়ে ফেললেন। বোদ্ধিসত্ত্বের শক্তি দেখে বহু দেবতা ও মানুষ প্রশংসায় মগ্ন হয়েছিল।

কপিলাবস্তু যে কোথায় ছিল এই নিয়ে রাজনীতি জড়িয়ে গেলেও একটি বিষয় তো পরিষ্কার যে পিপরাওয়াতে পাওয়া মুদ্রাঙ্কিত মোহরগুলির ওপরে ‘কপিলাবস্তু’ লেখা পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিচ্ছে যে কপিলাবস্তুর সঙ্গে পিপরাওয়ার যোগ ছিল। আবার এটিও সত্যি যে পিপরাওয়া এবং গনওয়ারিয়া উভয় প্রত্নক্ষেত্রই স্তূপ, ছোটো ছোটো কক্ষ, বারান্দা, প্রশস্ত প্রবেশদ্বার ইত্যাদি নিয়ে একদম বৌদ্ধ বিহার–সঙ্ঘারাম চরিত্রের। পিপরাওয়া থেকে পাওয়া মোহরেও এর সমর্থন আছে কারণ সেখানে কপিলাবস্তু ভিক্ষুসঙ্ঘ লেখা আছে। তখনকার যুগে কপিলাবস্তু তো এমন কিছু বিশাল স্থান জুড়ে ছিল না আর কপিলাবস্তুর আশপাশে গড়ে ওঠা সঙ্ঘারামকেই নিশ্চয়ই ‘কপিলাবস্তু ভিক্ষুসঙ্ঘ’ বলে উল্লেখ করা হবে। সুতরাং সাধারণ শতাব্দীর ১ম–২য় শতকেও পিপরাওয়া পরিচিত ছিল কপিলাবস্তু হিসেবে, আর এর চেয়ে বড়ো প্রমাণ আর কি বা হতে পারে। এ যে পাথুরে প্রমাণ যাকে অগ্রাহ্য করা অসম্ভব (Jones, Vol 2, 72-র অনুবাদ)

এমন নয় যে তিলৌরাকোটে একাধিক খননে কোনো ধরনের লেখ পাওয়া যায়নি, সেখানেও পিপরাওয়ার মতোই এখানেও দুই প্রকারের লেখযুক্ত মুদ্রাঙ্কিত মোহর পাওয়া গিয়েছে। তিলৌরাকোটের ৮ নং ধ্বংসস্তূপ থেকে জাপানের রিস্সো বিশ্ববিদ্যালয়ের খননে পাওয়া প্রথম প্রকারের মোহরে সাধারণ পূর্বাব্দের দ্বিতীয় শতাব্দীর অশোক পরবর্তী ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা। (The legend is written in the character of the late Ashokan Brahmi script, dated to c.second century B.C. Rijal: 1979, 36) “সা-কা-না-স্য” যা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় বা প্রথম শতাব্দী পর্যন্ত এই স্থানটি শাক্যদের অঞ্চল ছিল (The discovery of the terrakotta token from the Mound VII in Tilaurakot with the legend Sa-ka-na-sya clearly proves the occupation of the site by the Sakyas as late as up to second or first century B.C. ibid, 36)।

তাহলে প্রথম মোহর থেকে জানা গেল যে তিলৌরাকোট শাক্যদের রাজ্যেই অবস্থিত ছিল। বেশ, এবারে দেখি যে দ্বিতীয় মোহরে আরও কোনো বাড়তি তথ্য লুকোনো আছে কি না। এই ধরনের মোহরও একই সময়কালের অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় বা প্রথম শতাব্দীর। এখানে একই ধরনের লিপিতে বৃত্তাকারে লেখা আছে ‘নেগামা’, ‘নেগামেয়া’ ইত্যাদি (ibid, 37)। ২০১৬ সালের খননে আরেকটি ‘নেগামেয়া’ লেখা মোহর পাওয়া গিয়েছিল তবে এবারে অক্ষরগুলি সব একটি পংক্তিতে সজ্জিত ছিল (Falk: The Ashes of the Buddha)। পাঠকের মনে আছে যে আমরা ষোড়শ মহাজনপদের আলোচনায় বলেছিলাম যে সেই সময়ের বড়ো বড়ো বাণিজ্যকেন্দ্রগুলিকে ‘নিগম’ বলা হত। বিভিন্ন পালি গ্রন্থগুলিতে শাক্যদের রাজ্য বা প্রাচীন কপিলাবস্তুর রাজ্যের অন্তর্গত প্রধান শহরগুলি ছিল কাতুমা, খোমদুস্স, সমাগম, দেবদহ, শীলাবতী, নগরক, মেদাতালুম্প, সাক্ষার, উলুম্পা ইত্যাদি (Law: 1937, 183)যার মধ্যে অন্তত পাঁচটি নিগম (বাজার)-এর উল্লেখ রয়েছে।

কপিলাবস্তুর অবস্থানের প্রমাণ

তাহলে তিলৌরাকোট শহরের যে চরিত্র আমাদের সামনে এলো তা হল এটি শাক্য রাজ্যের অন্তর্গত একটি নিগম বা বাণিজ্য কেন্দ্র ছিল। তিলৌরাকোট শহরের কেল্লার মতো সুরক্ষা ব্যবস্থা ও ভেতরে অঢেল জায়গা সমস্ত ইঙ্গিত করে যে এটি একটি সুরক্ষিত বাণিজ্য কেন্দ্রই ছিল। সর্বোপরি মোহরে ছাপা লেখাকে তো আর অগ্রাহ্য করা যায় না, সেখানে যে পরিষ্কার ‘নিগম’ লে      
খা। নিগমে প্রবেশদ্বার অতিক্রম করে অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে, বিশেষ করে রাত্রে দ্বার বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর, এমন মুদ্রাঙ্কিত মোহর বেশ প্রচলিত ছিল। এখন প্রশ্ন হচ্ছে যে কোনো রাজ্যের রাজধানী কি নিগম হতে পারে না? নিশ্চয়ই পারে, কারণ আমরা তেমন মোহর ‘বৈশালী’ থেকে পেয়েছি কিন্তু সেইসব স্থানগুলি সেই উচ্চতায় পোঁছাতে সময় নিয়েছিল, প্রায় গুপ্ত যুগ অবধি (Falk: The Ashes of the Buddha)। আপাতত কপিলাবস্তু নামের মোহর যেখান থেকে পাওয়া গেছে সেই প্রমাণকেই স্বীকৃতি দেওয়া উচিত।

গনওয়ারিয়া স্থান নামটির সঙ্গে ‘গণ’ শব্দটির সাদৃশ্য নিয়ে ভাবনার এক নতুন দিক খুলে দেয়। শাক্য রাজ্য ছিল গণরাজ্য আর হয়তো সেই নামের অবশেষ লুকিয়ে আছে গনওয়ারিয়া নামের মধ্যে।

কপিলাবস্তুর অবস্থানের প্রমাণ

পিপরাওয়াকে কপিলাবস্তু বলে মানতে যাঁদের অসুবিধা তাদের একটি বড়ো যুক্তি হচ্ছে যে ফা-হিয়েন বা হিউয়েন সাঙ যখন কপিলাবস্তু পরিদর্শন করে তার ভ্রমণ বর্ণনা লিখেছেন তখন পিপরাওয়ার এমন এক বিশাল স্তূপকে কীভাবে অগ্রাহ্য করে যেতে পারেন। এটি নিয়ে কোনো মতান্তর নেই যে উভয় পরিব্রাজকের বর্ণনায় এই বিরাট আকারের স্তূপের উল্লেখ নেই। আবার যদি আমরা ধরে নিলাম যে কপিলাবস্তু বলতে উভয় পরিব্রাজকই তিলৌরাকোট গিয়েছিলেন তাহলেও সমস্যা কম নয়। আজকে তিলৌরাকোটের উত্তর প্রাকার থেকে এক/দেড় কিলোমিটার দূরে পরপর দুটি স্তূপ আছে যার মধ্যে একটির আকার বেশ বড়ো আর অন্যটি তুলনামূলকভাবে একটু ছোটো। দুই চীনা পরিব্রাজকের বর্ণনায় কিন্তু এই দুই যমজ স্তূপের কোনো উল্লেখ নেই। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে চীনা পরিব্রাজকদের কপিলাবস্তুর বর্ণনা দিয়ে কোনো কিছু প্রমাণ করানো দুঃসাধ্য। আমরা যদি ফা-হিয়েন ও হিউয়েন সাঙের বর্ণনা থেকে কপিলাবস্তুর একটি করে মানচিত্র বানাই তাহলে দেখতে পাব যে দুইজনের বর্ণনায় মিলের তুলনায় অমিলটাই বেশি।

আবার ফা-হিয়েন ও হিউয়েন সাঙের মধ্যবর্তী সময়কালের অন্তর্গত ৪৫০ সাধারণ অব্দ নাগাদ চীনের লিও সাঙ (Liu Song dynasty) রাজবংশের শাসনকালে শি-ঝি-মেঙ্গ (Shi Zhi Meng) কপিলাবস্তু ঘুরে গিয়ে বলেছেন যে সেখানে তিনি নির্বাণ স্তূপ দেখেছিলেন যার অভ্যন্তরে না কি বুদ্ধের দাঁত, চুল ও খুলির অংশ ছিল (Huijiao: 2022, 131)। স্তূপের ভেতরে কী ছিল তা তো আর শি-ঝি-মেঙ্গ দেখেননি কিন্তু তাঁর লেখা পড়ে মনে হয় সেটি দেহাবশেষের ওপরে নির্মিত নির্বাণ স্তূপই ছিল। তিনি মনে হয় লুম্বিনীও গিয়েছিলেন কারণ তিনি না কি বুদ্ধের পদচিহ্ন দেখেছিলেন (ibid, 131) যা মনে হয় লুম্বিনীতে ছিল কারণ আমরা জি সেংজাইয়ের বর্ণনায় দেখেছি যে রাজা অশোক লুম্বিনীতে বুদ্ধের পদ চিহ্ন বাঁধিয়ে দিয়েছিলেন।

ফা-হিয়েন ও হিউয়েন সাঙের কপিলাবস্তুর দ্রষ্টব্য স্থানগুলির নকশা দেখলে পরিষ্কার বোঝা যায় যে দুই পরিব্রাজকের বর্ণনায় বেশ অমিল আছে। তাহলে সঙ্গতভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে যে একই স্থানে গিয়ে দুইজনে আলাদা আলাদা স্তূপ, বিহার, সঙ্ঘারাম ইত্যাদি কেমন করে দেখেছিলেন। যেহেতু দুই পরিব্রাজকের সময়ের মধ্যে কয়েক শতাব্দীর পার্থক্য আছে সেই হেতু বলা যায় যে ভবিষ্যতের পরিব্রাজক আগের তুলনায় অনেক নতুন নতুন স্থাপত্য দেখতে পাবেন যেগুলো হয়তো দুইজনের মধ্যবর্তী সময়ে নির্মিত হয়েছিল কিন্তু এখানে তো বিষয়টি একদমই ভিন্ন। ফা-হিয়েন কপিলাবস্তুতে যেখানে যেখানে স্থাপত্য দেখে গিয়েছিলেন তার সঙ্গে হিউয়েন সাঙের দেখা স্থাপত্যের অনেক অমিল।

এই ধারণার ওপরে ভিত্তি করে কিছু বিকল্প মতবাদও তৈরি হয়েছে, যেমন ভিনসেন্ট স্মিথ ভাবতেন যে প্রকৃতপক্ষে ফা-হিয়েন ও হিউয়েন সাঙ দুজনে দুটি ভিন্ন স্থানকে কপিলাবস্তু হিসেবে দেখেছিলেন। তার মতে কপিলাবস্তু হিসেবে ফা-হিয়েন পিপরাওয়াকে দেখেছিলেন আর হিউয়েন সাঙ দেখেছিলেন তিলৌরাকোটকে (“At last a process of reasoning such as I have sketched above suddenly brought me to the unexpected conclusion that Piprahwa is the Kapilavastu of Fa-Hien, whereas the city round Tilaurakot is the Kapilavastu of Hiuen Tsang”. Prefatory to Mukherji’s book: 1901, 10) যদিও স্মিথ এই নিয়ে যে নিসংশয় ছিলেন তাও বলা যায় না কারণ পরক্ষণেই তিনি লিখছেন যে, “এর কারণ আমার জানা নেই যে ৪০৬ সাধারণ অব্দ নাগাদ পিপরাওয়াকে কেন কপিলাবস্তু বলে ধারণা করা হত আবার ৬৩৫ সাধারণ অব্দে বাণগঙ্গা (তিলৌরাকোটের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদী) কীভাবে সেই একই স্থান রূপে বিবেচিত হতে শুরু করেছিল। সিধা কথা হল যে ‘কারণটি আমার জানা নেই’ আর পনেরশো বছর আগের কোনো ঘটনা সম্পর্কে অজ্ঞতা ক্ষমার যোগ্য (“If I am asked the reason why, in or about A.D. 406, Piprahwa was regarded as representing Kapilavastu, whereas in A.D. 635 the city on the Banganga was regarded as representing the same place, I can only reply that I do not know the reason, and plead ignorance concerning events which occurred fifteen hundred years is excusable “ibid)।”

কপিলাবস্তুর অবস্থানের প্রমাণ

ডঃ হোয়ে কিন্তু স্মিথের মতকে উড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন যে যদি ধরে নিই যে দুইজন পরিব্রাজকের দেখা ক্রকুচ্ছন্দ্র ও কনকমুনি বুদ্ধের স্থানদুটি একই ছিল তাহলে দুইটি কপিলাবস্তুর ধারণা ক্ষীণ। এবারে রঙ্গমঞ্চে আবির্ভাব রিস ডেভিডস (Rhys Davids)-এর যিনি নিয়ে এসেছিলেন আরেকটি নতুন ভাবনা। তিনি বলেছিলেন যে বিডূডভ (পাঠান্তরে বিরূঢ়ক) শাক্য বংশ ধ্বংস করার পর হয়তো তারা তার কাছাকাছি কোনো নতুন শহর স্থাপন করে সেখানেই স্তূপ নির্মাণ করেছিল। এই স্তূপটিই হল পিপরাওয়া-র স্তূপ (“The old Kapilavastu was probably at Tilaurakot. But Dr. Peppé’s important discoveries at the Sakya Tope at Piprahwa may be on the site of a new Kapilavastu, built after the old city was destroyed by Vidudabha”. Davids: 1903, p. 18)। আবার হ্যারি ফক তো বলেছেন যে হিউয়েন সাঙ আদৌ কপিলাবস্তু যাননি (Falk: The Ashes of the Buddha)। সুতরাং বোঝা
 গেল যে এই নিয়ে মতের অন্ত নেই। 

বিমলাচরণ লাহা আরেকটি অসামঞ্জস্য উল্লেখ করেছেন। বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে আমরা জানি যে কপিলাবস্তুর শাক্য ও রামগ্রামের কোলিয়দের মধ্যে বয়ে যাচ্ছিল রোহিণী নদী। এই নদীর জলের বাঁটোয়ারা নিয়ে দুই জাতির মধ্যে বিবাদ স্বয়ং বুদ্ধদেব মিটমাট করিয়েছিলেন। দুই চীনা পরিব্রাজক লুম্বিনী থেকে রামগ্রাম গিয়েছিলেন কিন্তু উভয়ের বিবরণে রোহিণী নদীর কোনো উল্লেখ নেই যা যথেষ্ট ভাবনার বিষয় (Law: 1954, 192)।

বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে কপিলাবস্তুর কিছু বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে জড়ো করে দেখার চেষ্টা করেছিলেন পি সি মুখার্জি (Mukherji: 1901, 48)। যেগুলি ছিল,

১) সাকেত বা পোতল বা অযোধ্যা থেকে নির্বাসিত হয়ে শাক্য রাজকুমাররা উত্তর দিকে যাত্রা করেছিলেন এবং এক শাল গাছের জঙ্গলে ঘেরা অঞ্চলে এসে পৌঁছেছিলেন। সেখানে কপিল মুনির আশ্রমের কাছে তাঁরা নগর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

২) এই স্থানটি হিমালয়ের দক্ষিণ ঢালের কাছে ছিল (পাহাড় থেকে ঠিক কত দূরে তা অবশ্য বলা হয়নি), যেখানে ভাগীরথী নামে একটি নদী প্রবাহিত ছিল এবং সেখানে একটি বড়ো জলাশয় ছিল

(সম্ভবত আজকের দিনে তরাই অঞ্চলে যাকে সাগর বলা হয়)।

৩) কোলি বা দেবদহ নামে কপিলাবস্তুর সমসাময়িক আরেকটি নগর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। দুই নগরের মাঝে রোহিণী বা রহিতা নামের একটি ছোটো নদী বয়ে যেত যা মনে হয় আজকের রুম্মিনদেঈ-এর কয়েক মাইল পূর্বের রোহিন নদী।

৪) চীনা পরিব্রাজকদের বিবরণ পড়ে জানা যায় যে কপিলাবস্তুর এক দিকে ছিল শ্রাবস্তী ও বিপরীত দিকে ছিল লুম্বিনী, রামগ্রাম ও কুশিনগর।

৫) হিউয়েন সাঙের বর্ণনা অনুযায়ী শ্রাবস্তীর প্রায় ৫০০ লি দক্ষিণ-পূর্বে হল কপিলাবস্তু রাজ্য আর তার থেকে ৩০০ লি পূর্বদিকে হল রামগ্রাম, ফা-হিয়েনের বিবরণ বলছে যে কনকমুনি বুদ্ধের স্থান থেকে ১ যোজন পূর্ব দিকে ছিল কপিলাবস্তু নগর কিন্তু হিউয়েন সাঙের বিবরণে ক্রকুচ্ছন্দ্র বুদ্ধের স্থানের অবস্থান থেকে কপিলাবস্তুর দূরত্ব ৫০ লি দক্ষিণে এবং কনকমুনি বুদ্ধের স্থান ৩০ লি দক্ষিণ-পশ্চিমে।

৬)  মিঃ টি ওয়াটার্স
, ১৮৯৮ সালের রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নালে কপিলাবস্তু সম্পর্কিত প্রবন্ধে (পৃষ্ঠা ৫৩৬-৭), বিভিন্ন চীনা উত্স থেকে শাক্য নগরের সম্পর্কে বেশ কয়েকটি তথ্য দিয়েছেন। একটি সূত্র মতে কপিলাবস্তু থেকে শ্রাবস্তী পৌঁছাতে তিন দিন লাগতো। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হল যে কৌশাম্বী থেকে সাকেত পর্যন্ত রাস্তাটি শ্রাবস্তী থেকে সেতব্য, কপিলাবস্তু, কুশিনগর, পাওয়া ও বৈশালী হয়ে গিয়েছিল। প্রায় ৪৩৫ সাধারণ অব্দে ভারতে আসা চিঽ মেং (Chih Meng) নামের একজন চীনা তীর্থযাত্রী কপিলাবস্তুকে কিশা (কৈলাস?) থেকে প্রায় ২৬০ মাইল (১৩০০ লি) দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত বলেছেন।

৭) বুদ্ধের জীবনী থেকে দেখা যায় যে কপিলাবস্তু থেকে তিনটি প্রধান শহরের দূরত্ব ছিল এই প্রকার, রামগ্রামের কাছে অনুপমা ছিল ১২ যোজন (আবার অশ্বঘোষ একে ৩ যোজন বলেছেন), রাজগৃহ ছিল ৬০ যোজন যা বুদ্ধ পদব্রজে ৬০ দিনে পার হয়েছিলেন এবং বৈশালী ছিল ৫১ যোজন। কিন্তু যোজনের মান স্থান ও কাল ভেদে পরিবর্তিত হতে থেকেছে।

পিপরাওয়া ও তিলৌরাকোট উভয়ের ক্ষেত্রেই এই তালিকার ১ থেকে ৪ নং তথ্যগুলি সত্যি। উভয় স্থান অযোধ্যা থেকে উত্তরে অবস্থিত এবং হিমালয়ের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে দুই স্থানের দূরত্ব বেশি নয়। দেবদহের অবস্থান কপিলাবস্তুর চেয়েও রহস্যময় কারণ এই নামে দুইটি স্থান আছে। শাক্য রাজ্যে যে দশটি বড়ো বড়ো জনপদ ছিল তাঁদের নাম হল কপিলাবস্তু, কাতুমা, সমাগম, উলুম্পা, সাক্ষার, শীলাবতী, দেবদহ, খোমাদুসা(বিকল্পে খোমদুস্স), নগরক ও মেদাতালুম্পা(বিকল্পে মেদাতালুম্প)। এর মধ্যে একটি জনপদের নাম হল দেবদহ। আবার কোলিয়দের রাজ্যের রাজধানীর নাম অনুসারে সেই রাজ্যকেও কখনও সখনও দেবদহ বলা হত। কোলিয়দের ছয়টি বড়ো বড়ো জনপদের নাম হল – উত্তর, করকাপথ, কুন্ডধাবন, সাজ্ঞেল, হল্দিভাসন ও দেবদহ বা রামগ্রাম। তাহলে এখানেও একটি দেবদহ আছে (Rijal: 1979, 25)। সুতরাং দেবদহের অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা আছে। বর্তমানের রোহিন নদী হয়তো সেই সময়ের রোহিণী নদী হবে আর এই নদী রামগ্রাম এবং পিপরাওয়া বা তিলৌরাকোট উভয়ের মাঝেই বয়ে যাচ্ছে।

চীনা পরিব্রাজকদের ভ্রমণ বৃত্তান্ত নিয়ে কোনো স্থানকে খুঁজে বার করার যে অসুবিধা আমার মনে হয় তা হল আজকের দিনের সঙ্গে তখনকার ভ্রমণের পার্থক্য। আমরা কখনই ধরে নিতে পারি না যে এই বিপুল সময়ে তারা ভবিষ্যতের মানুষদের জন্যে একদম নিখুঁত দিক, অভিমুখের পরিবর্তন ও দূরত্ব লিপিবদ্ধ করতে করতে এতদিন ধরে পা ফেলে আসছিলেন। দ্বিতীয়ত, তখন তাঁদের বিভিন্ন পন্থায় এগোতে হচ্ছিল। কখনও জলপথে, কখনও তখনকার কোনো খারাপ অঞ্চলকে পাশ কাটিয়ে, কখনও সেই মুহূর্তে হয়তো কোনো পথ অগম্য হয়েছিল (সে বন্যা, ডাকাতের ভয়, পথপ্রদর্শক যে রাস্তাটি ভালো চেনে ইত্যাদি কোনো কিছুই হতে পারে)। তাই পরিব্রাজকের দূরত্ব ও অভিমুখ ক্রমশ বদলে যেতেই পারে আর সেটি অস্বাভাবিক কিছু নয়। একই ভাবে বৌদ্ধ গ্রন্থগুলি থেকে যাত্রাপথের সময় ও দূরত্ব বার করা অসম্ভব কারণ গ্রন্থ ভেদে তা পৃথক হয়ে পড়ে।

আবার কোনো পরিব্রাজক যে ঠিক কোনো স্থানটি নিজে গিয়েছিলেন তাই নিয়ে সন্দেহ আছে তার কারণ হচ্ছে কোনো স্থানের বিষয়ে শুনে সেটিকে কাহিনিতে লিখে রাখার প্রবণতা দেখা যায়। হ্যারি ফকের মতে হিউয়েন সাঙ আদৌ কপিলাবস্তু আসেননি। এই নিয়ে একটি সুন্দর আলোচনা করে (Falk: The Ashes of the Buddha) তিনি দেখিয়েছেন যে হিউয়েন সাঙের পরপরই (৬৭১-৬৯৫ সাধারণ অব্দ) ভারত ঘুরে যাওয়া ই-ত্সিং (I-Tsiṅ) তাঁর আগে ভারত ঘুরে যাওয়া চীনা পরিব্রাজকদের যে তালিকা দিয়েছিলেন তাতে একজনও লুম্বিনী-কপিলাবস্তু ভ্রমণ করেননি। চীনা পরিব্রাজকদের প্রিয় স্থানগুলি ছিল বোধগয়া, নালন্দা এবং রাজগীর। যদি কেউ উত্তর বিহারে যাওয়ার উদ্যোগ নেয়, তবে বৈশালী এবং বড়োজোর কুশিনগর। শ্রাবস্তীও ব্যতিক্রম ছিল। হিউয়েন সাঙের ভ্রমণের স্থানগুলি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করলে তো ফা-হিয়েনকেও সন্দেহের ঊর্ধ্বে রাখা যায় না কারণ তিনিও তো শ্রাবস্তী, কপিলাবস্তু ও লুম্বিনী ভ্রমণ করেছিলেন। এখানে ফক একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এনেছেন যে ফা-হিয়েনের কপিলাবস্তু ভ্রমণের পিছনে প্রকৃত কারণ কী ছিল তাই নিয়ে। চীনে ফা-হিয়েনের সঙ্গে বুদ্ধভদ্র নামের একজন শ্রমণের পরিচয় হয়েছিল মহাপরিনির্বাণ সূত্রের অনুবাদ প্রসঙ্গে। বুদ্ধভদ্র প্রকৃতপক্ষে ছিলেন বুদ্ধদেবের কাকা অমৃতোদনের বংশের সূত্র ধরে শাক্য রাজবংশের একজন উত্তরাধিকারী। চীনা গ্রন্থ অনুযায়ী বুদ্ধভদ্রের জন্ম হয়েছিল ‘নক্সুলী’ বা ‘নহৌলি’ নামে একটি শহরে যা মনে হয় ‘নগরী’ শব্দটির অপভ্রংশ হবে। হয়তো বুদ্ধভদ্র ফা-হিয়েনের সঙ্গে ভারতে এসেছিলেন আর তাই দুজনে কপিলাবস্তু গিয়েছিলেন। নয়তো চীনে বুদ্ধভদ্রের কাছ থেকে কপিলাবস্তুর সম্বন্ধে শুনে হয়তো ফা-হিয়েন এমন আলাদা পথ বেছে নিয়েছিলেন।

তিলৌরাকোটের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বাণগঙ্গা নদীটিকে কোনো বৌদ্ধ গ্রন্থে উল্লিখিত ‘ভাগীরথী’ বলে অনেকে ভাবেন। ভাবা হয় যে যখন নদীর নামে ‘গঙ্গা’ আছে যা ‘ভাগীরথী’-রই আরেক নাম। অপরদিকে এই প্রসঙ্গে শ্রীবাস্তব লিখেছেন (Srivastava: 1980, 11) যে, “সব বৌদ্ধ গ্রন্থে কপিলাবস্তু যে নদীর তীরে অবস্থিত তা বলা নেই। শাক্য ও কোলিয়দের মধ্যে সবসময় রোহিণী নদীর জল নিয়ে বিবাদ ছিল, যা এই দুই জাতির এলাকার মধ্যে সীমানা হিসেবে কাজ করত। একমাত্র দুল্ব পিটকেই (তিব্বতীয় গ্রন্থ) বলা হয়েছে যে কপিলাবস্তুর পাশ দিয়ে ভাগীরথী বয়ে যেত। ভাগীরথীর সঙ্গে বাণগঙ্গার সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়ার ভিত্তিও পরিষ্কার নয়। পিপরাওয়া-র পাশ দিয়ে একটি ছোটো নদী বয়ে যাচ্ছে যার নাম সিসওয়া আর দুটি বড়ো জলাশয়ও আছে যাঁদের নাম হল সিসওয়া ও মাঝোলি। এও বলা হয়েছে যে কপিলাবস্তু একটি জলাশয়ের পাশে অবস্থিত। কপিলাবস্তু যার নাম থেকে এসেছে সেই কপিল মুনি সম্বন্ধে মালাশেখর (Dictionary Of Pali Proper Names: G. P. Malalasekera) লিখেছেন যে, “ওক্কাকা-র ছেলেরা যখন স্বেচ্ছায় নির্বাসনে গিয়ে একটি শহর স্থাপন করার জন্যে জায়গা খুঁজতে থাকে, তখন তারা হিমাভায় (হিমালয়ে) একটি হ্রদের ধারে কপিল মুনির আশ্রমে আসে। এসব ছাড়া চীনা পরিব্রাজকরা কপিলাবস্তুর ধারে কোনো নদীর কথা উল্লেখ করেননি। কপিলাবস্তু নিয়ে আলোচনায় বৌদ্ধ গ্রন্থে উল্লিখিত রাপ্তি নদীর অবস্থান সম্পূর্ণরূপে পিপরাওয়ার সঙ্গে মিলে যায়। বিভিন্ন গ্রন্থ অনুসারে শাক্য রাজ্যের উত্তরে ছিল হিমালয়, পূর্বে রোহিণী নদী এবং পশ্চিম ও দক্ষিণ প্রান্ত রাপ্তি দ্বারা বেষ্টিত ছিল। তিলৌরাকোটের অবস্থান এই বর্ণনার সঙ্গে মেলে না।”

মনে হয় যে কপিলাবস্তুর অবস্থানের চরিত্র অনেক বৃহৎ। শাক্য জাতির অঞ্চলকে শাক্য রাজ্য বললেও বহুবারই আমরা গোটা রাজ্যটিকে কপিলাবস্তু বলে উল্লেখ করতে দেখেছি। হিউয়েন সাঙের কথাই ধরুন না কেন, তিনি কপিলাবস্তু পৌঁছাবার সময়ে লিখছেন যে, “এখান থেকে দক্ষিণ–পূর্ব দিকে ৫০০ লি (২০০ কিলোমিটার) গিয়ে পৌঁছেছিলাম কিএ-পি-লো-ফা-স্সে-তি (কপিলাবস্তু) রাজ্যে। রাজ্যটির পরিসীমা প্রায় ৪০০০ লি।” তাহলে শাক্য রাজ্য বা কপিলাবস্তু রাজ্যের পরিধি ছিল ১৬০০ কিলোমিটার। এই কারণেই কপিলাবস্তু বলতে কখন যে রাজ্যের উল্লেখ হয়েছে আর কখন যে নগরের উল্লেখ হয়েছে তাই নিয়ে অনেকটা ভ্রম তৈরি হয়। আর এই কারণেই বিভিন্ন গ্রন্থে উল্লিখিত কপিলাবস্তুর রাজ্যের সীমানাকে আমরা কপিলাবস্তু নগরের ভেবে ভুল করে বসছি।

সুতরাং দেখা গেল যে কপিলাবস্তুর অবস্থান নির্ণয় করতে বেশ কিছু তথ্য নিয়ে সমস্যা আছে। এক্ষেত্রে তথ্যগুলির সঙ্গে পিপরাওয়ার যেমন সাদৃশ্য আছে তেমন আছে তিলৌরাকোটের। কিন্তু পিপরাওয়ার ক্ষেত্রে পাথুরে প্রমাণ আছে যা তিলৌরাকোটের ক্ষেত্রে নেই। কপিলাবস্তুর সীমানা যেমন বিশাল অঞ্চল জুড়ে বলা হয়েছে তাতে বোঝা যায় যে এখানে শাক্য রাজ্য হিসেবে কপিলাবস্তুর উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে কোলিয়দের রাজধানী হিসেবে দেবদহকেও কোলিয়দের রাজ্য হিসেবে বহু জায়গায় উল্লেখ করা হয়েছে। এমন বিষয় নতুন নয়, সমসাময়িক কাশীর মতো রাজ্যই তো রাজধানীর নামে পরিচিত ছিল।

আগেই বলেছি যে পিপরাওয়া ও গনওয়ারিয়ার খননে উঠে আসা কাঠামোগুলির চরিত্র অনেকটাই বিহার বা সঙ্ঘারাম গোত্রের। সেটি মনে হয় বুদ্ধের নির্বাণ স্তূপের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে। অবধারিত ভাবে বুদ্ধের দেহাবশেষের ওপরে নির্মিত নির্বাণ স্তূপের একটি আলাদা ধর্মীয় চরিত্র আছে আর তাই তার আশপাশে সেই ধরনের স্থাপনা হওয়ারই কথা। এবারে আমরা খুঁজে দেখতে পারি যে স্তূপটি নির্মাণের জন্যে ঠিক কোনো স্থানটি বাছা হয়েছিল, তাতে যদি কপিলাবস্তুর অবস্থান সংক্রান্ত রহস্যের কোনো গ্রন্থিমোচন হয়।

বুদ্ধ তাঁর মৃত্যু সমীপে দেখে বেশ কিছু উপদেশ দিয়েছিলেন তার মধ্যে একটিতে ছিল তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া নিয়ে। সেখানে তিনি তাঁর অন্যতম প্রধান শিষ্য আনন্দকে বলেছিলেন যে তাঁর দেহ যেন চিতায় দাহ করা হয় আর তারপর চারটি রাস্তার সংযোগ পথে (মোড়ে) যেন তাঁর দেহাস্থির ওপরে স্তূপ নির্মাণ করা হয়।

“কিন্তু, দেব, তথাগতের শরীরের সম্বন্ধে কি কর্তব্য?”

“আনন্দ, রাজচক্রবর্তীর শরীর সম্বন্ধে যাহা কৃত হয়, তথাগতের শরীর সম্বন্ধেও তাহাই কর্তব্য।”

“দেব, চক্রবর্তী রাজার শরীর সম্বন্ধে কিরূপ কৃত হয়?”

“আনন্দ, রাজচক্রবর্তীর দেহ নূতন বস্ত্রে আচ্ছাদিত হয়, পরে বিহত কার্পাস দ্বারা এবং তৎপরে নুতন বস্ত্র দ্বারা আচ্ছাদিত হয়। এইরূপে পাঁচশত বস্ত্র খণ্ড দ্বারা রাজচক্রবর্তীর দেহ আচ্ছাদিত করিয়া লৌহ নিৰ্ম্মিত তৈল দ্রোণীতে নিক্ষেপ পূর্ব্বক ঐরূপ অপর দ্রোণীদ্বারা উহা আবৃত করিয়া সর্বপ্রকার সুগন্ধ কাষ্ঠে নির্মিত চিতায় রাজচক্রবর্তীর দেহ দাহ করা হয়। চতুৰ্ম্মহাপথে রাজচক্রবর্তীর স্তূপ নিৰ্ম্মিত হয়।”

“আনন্দ, রাজচক্রবর্তীর শরীর সম্বন্ধে যে বিধি অবলম্বিত হয়, তথাগতের শরীর সম্বন্ধেও সেই বিধি অবলম্বন করিতে হইবে। চতুৰ্ম্মহাপথে তথাগতের স্তূপ নির্মাণ করিতে হইবে। যাহারা উহাতে মালা, গন্ধ অথবা রঞ্জনোপকরণ স্থাপন করিবে, উহাকে অভিবাদন করিবে, অথবা উহাতে প্রসন্নচিত্ত হইবে, তাহাদের উহা দীর্ঘকাল হিত ও সুখবিধায়ক হইবে।”

– মহাপরিনির্বাণ সূত্র ৫.১১

আমরা দেখেছি যে কুশিনগরের রামাভার স্তূপের স্থানে বুদ্ধের দাহকার্য হয়েছিল।  বেঠদীপের ব্রাহ্মণ সমাজ বুদ্ধের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করিয়েছিলেন আর সেই কারণে তারাও বুদ্ধের দেহাস্থি-র ভাগ পেয়েছিলেন। তাহলে এ নিয়েও কোনো সন্দেহ নেই যে বুদ্ধের পরের ইচ্ছে অর্থাৎ রাজপথের চৌমাথায় তাঁর দেহাস্থি-র
 ওপরে স্তূপ নির্মিত হয়েছিল। সেই স্তূপটি তাঁর নিজের জাতি অর্থাৎ শাক্যদের হওয়ার সম্ভাবনা বেশি আর তা হলে সেই স্তূপটি হল পিপরাওয়ার স্তূপ। এবারে জানতে হবে যে বুদ্ধের সময়ে কোনো রাজপথ কপিলাবস্তু দিয়ে পার হত কি না
, যদি হত তাহলে বোঝা যাবে যে নির্বাণ স্তূপের নির্মাণ কপিলাবস্তুর ধারেকাছেই হয়েছিল। আর যদি কপিলাবস্তু দিয়ে পার হয়ে যাওয়া তেমন কোনো রাজপথের সন্ধান না পাওয়া যায় তাহলে বুঝতে হবে যে বুদ্ধের নির্বাণ স্তূপ কপিলাবস্তু থেকে দূরে নির্মিত হয়েছিল।

আমরা দেখেছি যে কপিলাবস্তু সেই সময়ে একটি ছোটো জনপদ ছিল এবং সেই কারণে রাজপথ দিয়ে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। ষোড়শ মহাজনপদের সময়ে যে সব বাণিজ্য পথের সন্ধান পাওয়া যায় তার মধ্যে একটি বিস্তৃত ছিল উত্তর থেকে দক্ষিণ-পূর্ব অবধি। এই পথের বিবরণ (Davids: 1903, 103) অনুযায়ী পথটি দুই প্রাচীন নগর শ্রাবস্তী ও রাজগৃহকে যুক্ত করেছিল। তরাই অঞ্চল ধরে রাস্তাটি বৈশালীর উত্তর অবধি গিয়ে তারপর দক্ষিণে গঙ্গার অভিমুখে বেঁকে গিয়েছিল।

একটি প্রশ্ন জাগে যে পশ্চিম থেকে পূর্বে যাওয়ার জন্যে হঠাৎ উত্তরে গিয়ে একটি বৃত্তাকার রূপ নিয়ে রাস্তাটি আবার নীচে নেমেছিল কেন। এর কারণ ছিল অনেকগুলি নদী অতিক্রম করা। রাস্তাটি বেঁকে ওপরে গিয়েছিল তরাই অঞ্চলে নদীগুলির অগভীর অংশ দিয়ে সেগুলিকে সহজে পার হয়ে যাওয়া যায়। সুত্তনিপাত গ্রন্থের পারায়ন বগ্গের বত্থু গাথায়
 (৩৬-৩৮) উল্লেখ আছে যে- 

“অস্মক রাজ্য ছাড়িয়া তাঁহারা মাহিষ্মতী, উজ্জয়িনী, গোণদ্ধ, বিদিশা, বনসহ্বয়, কোসম্বি, কুশীনগর, বৈশালি, পাবা, মগধ, সেতব্য, কপিলাবস্তু অতিক্রম করিয়া একসময় সাকেতের অন্তর্গত পুরশ্রেষ্ঠ শ্রাবস্তীতে পৌঁছিলেন। শ্রাবস্তীর মনোরম উদ্যানে অবস্থিত বিহারে তাঁহারা উপস্থিত হইলেন।”

তাহলে দেখা যাচ্ছে যে এই পথের উল্লেখযোগ্য স্থানগুলির মধ্যে কপিলাবস্তু আছে। পথটি মনে হয় গয়া অবধি
 বিস্তৃত ছিল যেখানে সেটি তাম্রলিপ্ত থেকে কাশী অবধি বিস্তৃত অন্য পথের সঙ্গে গিয়ে মিশত। সেই সময়ের দক্ষিণাপথের একটি অংশ ছিল এই বাণিজ্যপথটি। 

এই পথটি নিয়মিত ভাবে কপিলাবস্তু ও বৈশালীর মাঝে যাতায়াতের জন্যে ব্যবহৃত হত। মহাপ্রজাপতি গৌতমী এই পথ ধরেই সরাসরি বুদ্ধের কাছে প্রব্রজ্যা নেওয়ার আর্জি জানাতে এসেছিলেন।

“অথ খো ভগবা রাজগহে যথাভিরন্তং বিহরিত্বা যেন বেসালী তেন চারিকং পক্কামি। তেন খো পন সময়েন ভিক্খু সুচিকং পি সত্থকং পি ভেসজ্জং পি পত্তেন আদায় গচ্ছন্তি।

অথ খো মহাপজাপতী গোতমী কেসমস্সুং ওহারেত্বা কাসায়রসেন বত্থং পারুপিত্বা অনেকসতায় সাকিয়ানাং মাতুগামানাং সদ্ধিং যেন বেসালী তেন চারিকং পক্কামি; যেন বেসালী যেন মহাবনং যেন কুটাগারসালা তেনুপসঙ্কামি।”

– বিনয়পিটক, চুলবর্গ, ১০.১.২

ভগবান কপিলাবস্তুতে যথারুচি অবস্থান করে বৈশালী অভিমুখে পর্যটনে যাত্রা করলেন। ক্রমান্বয়ে পর্যটন করতে করতে বৈশালীতে গমন করলেন। ভগবান বৈশালীতে অবস্থান করতে লাগলেন, মহাবনে, কুটাগার শালায়। মহাপ্রজাপতি গৌতমী কেশ ছেদন করে কাষায় বস্ত্রে দেহ আচ্ছাদিত করে বহুসংখ্যক শাক্য মহিলা সহিত বৈশালী অভিমুখে যাত্রা করলেন। ক্রমান্বয়ে বৈশালীর মহাবন কুটাগার শালায় উপস্থিত হলেন।

শ্রাবস্তী থেকে কুশীনগর আসতে গেলে অবশ্যম্ভাবী ভাবে পিপরাওয়া আসবেই। এখন আমরা জানতে পারলাম যে কপিলাবস্তুর পাশ দিয়ে একটি বড়ো বাণিজ্যপথ গিয়েছিল। তাহলে সেই পথের ধারেই কোথাও নিশ্চয়ই বুদ্ধের শেষ ইচ্ছা অনুসারে তাঁর নির্বাণ স্তূপ স্থাপিত হয়েছিল কিন্তু তার জন্যে আমাদের আরেকটি পথের সন্ধান করতে হবে কারণ বুদ্ধের ইচ্ছামত নির্বাণ স্তূপের স্থানকে চৌমাথা হতে হবে। আর এর জন্যে আমরা আবার ফিরে যাব কপিলাবস্তু পত্তনের কিংবদন্তীতে।

কপিলাবস্তুর অবস্থানের প্রমাণ

কপিলাবস্তুর দক্ষিণে ছিল একটি বড়ো শহর, অযোধ্যা। কথিত আছে যে অযোধ্যা থেকেই শাক্য রাজকুমাররা উত্তরের দিকে অগ্রসর হয়ে কপিল মুনির আশ্রমে পৌঁছেছিলেন ও তার আশপাশেই কপিলাবস্তু নগর নির্মাণ করেছিলেন। তাহলে বোঝা গেল যে অযোধ্যা থেকে উত্তরে একটি রাস্তা ছিল। সেটি হয়তো বাণিজ্যপথের মতো অতো গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা ছিল না কিন্তু নিশ্চয়ই সেই অঞ্চলের যোগাযোগের একটি অত্যাবশ্যক মাধ্যম ছিল।

আবার আমরা জেনেছি যে কপিলাবস্তু থেকে কোলিয়দের রাজধানী দেবদহ যাওয়ার জন্য একটি রাস্তা ছিল। মায়াদেবী তো সেই রাস্তায় পিত্রালয়ে যাওয়ার সময়ে লুম্বিনী উদ্যানের সৌন্দর্য দেখে নেমে গিয়েছিলেন। মায়াদেবীর যাত্রার আগে শুদ্ধোদন সেই রাস্তার মেরামতও করিয়েছিলেন। দেবদহের অবস্থান আমরা না জানলেও লুম্বিনীর তো জানি আর তাই অযোধ্যা থেকে লুম্বিনী অবধি যাওয়ার পথটিকে চিহ্নিত করা প্রয়োজন। অযোধ্যা ও লুম্বিনী এই দুইয়ের স্থানই আজ আমরা জানি। আমি গুগ্ল ম্যাপে আজকের রাস্তার ভিত্তিতে এই যাত্রাপথটিকে নির্দেশিত করবার চেষ্টা করেছিলাম আর তার সঙ্গে রেখেছিলাম দক্ষিণাপথের অংশ শ্রাবস্তী থেকে কুশীনগর অবধি পথটিকেও। যে ফল এসেছিল তা আমায় আশ্চর্য করে দিয়েছে। প্রকৃতপক্ষেই এই দুটি পথ একে অপরকে অতিক্রম করে যাচ্ছে আর সেই চৌমাথাটি হচ্ছে আজকের পিপরাওয়ার স্তূপের স্থান।

কপিলাবস্তুর অবস্থানের প্রমাণ

সুতরাং দেখা গেল যে পূর্ব-পশ্চিম বরাবর শ্রাবস্তী থেকে গয়ার বাণিজ্যপথের সঙ্গে উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত অযোধ্যা থেকে লুম্বিনী (প্রকৃতপক্ষে এই রাস্তা অযোধ্যা থেকে উত্তরের তরাই অঞ্চলের যোগসূত্র ছিল। হয়তো রাজপথের মতো বড়ো নয় কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা ছিল এটি। কারণ হিমালয়ের পাদদেশ থেকে গাঙ্গেয় সমভূমি যাওয়ার এটি ছিল এক প্রধান মাধ্যম) যাওয়ার রাস্তা কপিলাবস্তুর ধারেকাছে কোথাও পরস্পরকে ছেদ করত।
 সেটিই ছিল আমাদের কাঙ্খিত চার মাথার মোড়। এই নিয়ে আর কোনো সন্দেহ নেই যে শাক্য জাতিজনেরা কপিলাবস্তুতে বুদ্ধদেবের ইচ্ছানুসারে চার মাথার মোড়ে তার দেহাবশেষের ওপরে যে নির্বাণ স্তূপটির স্থাপনা করেছিলেন সেটি নিঃসন্দেহে পিপরাওয়ার স্তূপ। মগধ থেকে লুম্বিনী আসতে হলে শ্রাবস্তীর রাস্তায় এসে কপিলাবস্তু থেকে ডান দিকে বেঁকে লুম্বিনী পৌঁছাতে হবে। খুব সম্ভবত সম্রাট অশোকও তাঁর রাজ্যাভিষেকের ২০ তম বর্ষে যখন তীর্থদর্শনে
 এসেছিলেন তখন তিনিও এই পথ ধরেই এসেছিলেন। আর সেই কারণে তাঁকে পিপরাওয়া আসতেই হয়েছিল। এই পাথুরে প্রমাণ ছাড়াও আমরা বুদ্ধদেবের শেষ ইচ্ছে বা নির্দেশ মতো তথ্যের বিশ্লেষণ করে যে অবস্থান পেয়েছি তাও পিপরাওয়ার স্তূপের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। সুতরাং কপিলাবস্তু যে পিপরাওয়ার কাছাকাছি ছিল তা  নিয়ে আর কোনো দ্বৈধতা নেই।

আমি কপিলাবস্তুর নগরের অবস্থান নিয়ে যে প্রসঙ্গে সন্দিহান তা হল প্রত্নতাত্ত্বিক অবশেষের চরিত্র নিয়ে। কোনো জনপদের অবশেষ আর পিপরাওয়া বা গনওয়ারিয়ার খননে উঠে আসা অবশেষের কিছু পার্থক্য আছে। তাই মনে হয় যে হয়তো চারটি রাস্তার মিলনস্থানে নির্বাণ স্তূপ ও বিহার তৈরি হয়েছিল আর কপিলাবস্তু জনপদ ছিল তারই আশপাশে। পি সি মুখার্জি (Mukherji: 1901, 43 & 47) আজ থেকে প্রায় ১২৫ বছর আগে পিপরাওয়ার আশপাশে অনেকগুলি ধ্বংসস্তূপ দেখে আন্দাজ করেছিলেন যে সেখানে শাক্যদের একটি বিশাল বসতি ছিল। যতদূর মনে হয় এমন সব ধ্বংসস্তূপের নীচে কপিলাবস্তু জনপদ হয়তো আজও দিনের আলো দেখার অপেক্ষায় রয়েছে আর নয়তো এতদিনে মানুষের নির্বিচার লোভের কারণে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আমরা তার পুরোটা উদ্ধার করে উঠতে না পারলেও তাকে অনুভব করতে পেরেছি।

“This group of important ruins is in British territory, near the 41st boundary pillar. It consists of a big stupa, monastery, and other buildings in the neighborhood. In the Mouza of Aligurh, and near the Sisva tank, is a mound of bricks; and on the east of that tank is another. In the village of Ganaria is a brick mound; and about a furlong east of it is a very large elevated spot, on which are several mounds. I have heard of several other ancient sites in the Birdpur and Chandrapar estates, which I could not find time to see. Only the Dhih at Rumin-dei, about 4 miles west of Shohratganj, I saw on my return journey”. (Mukherji: 1901, 43)

মুখার্জি যখন পিপরাওয়ার আসেপাশে জরিপ করেছেন তখনও অবশ্য পেপ্পের আবিষ্কার নিয়ে ততটা জানা যায়নি আর শ্রীবাস্তবের আবিষ্কার তো তার প্রায় ৮০ বছর পর হয়েছিল তাই মুখার্জি অনেকটা রিস ডেভিডসের পথে হেঁটে আন্দাজ করেছিলেন যে বিরূঢ়কের হাতে শাক্য বংশ ধ্বংস করার পর বেঁচে থাকা মানুষজন কপিলাবস্তু পরিত্যাগ করে পিপরাওয়াতে এসে নতুন শহর স্থাপন করেছিল।

কপিলাবস্তুর কাহিনি এখানেই শেষ কিন্তু শাক্যদের কাহিনি নয়। তাঁদের ধ্বংসের কাহিনি না জানলে কপিলাবস্তুর পুরো ইতিহাস অধরা থেকে যাবে তাই এবার আমাদের নৌকো ভেসে যাবে আরেক গন্তব্যে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *