ষোড়শ মহাজনপদের ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব
অযোধ্যা পার হয়ে গেলাম। অনেক চেষ্টা করেও ট্রেনে রিজার্ভেশন না পেয়ে অগত্যা বাসই ভরসা। দিল্লী থেকে চলেছি ‘কানফাটা’ যোগীদের নগরে। প্রথমেই এমন শব্দে ভ্যাবাচাকা খেয়ে যাবেন না। গোরখপুর শহরটি যার নাম থেকে হয়েছে সেই গোরক্ষনাথ ছিলেন কানফাটা যোগী। লুম্বিনী ও কপিলাবস্তু খুঁজতে বেরিয়ে আপনাকে গোরখপুর থেকে ব্যবস্থা করে এগোলে সুবিধা হবে। হ্যাঁ যা বলছিলাম, কানফাটা যোগীরা যে শুধু একটি সম্প্রদায় তা নয়, বর্তমান ভারতে এঁদের সবচেয়ে বড়ো কেন্দ্রের মোহান্ত একজন ধুরন্ধর রাজনীতিবিদ এবং ভারতের সর্বাধিক মানুষের মুখ্যমন্ত্রী, যোগী আদিত্যনাথ। মুখ্যমন্ত্রী ছাড়াও তাঁর আরেকটি পরিচয় হল যে তিনি গোরক্ষপুরের মঠের শীর্ষ মোহান্ত। এই মঠের স্থাপন গোরক্ষনাথের হাতে। এই মঠের অনুসারী সম্প্রদায়ের অনেকগুলি নাম – যোগী, গোরক্ষপুরী, দর্শনা এবং কানফাটা। প্রথম ও দ্বিতীয় নামের তাৎপর্য সহজেই বোঝা যায় – তাঁরা যথাক্রমে হঠযোগ পালন করেন এবং গোরক্ষনাথের অনুগামী। তৃতীয় ও চতুর্থ নামের অর্থ বেশ আলাদা। আপনারা যারা যোগী আদিত্যনাথের ছবি একটু খুঁটিয়ে দেখেছেন তাঁরা লক্ষ করেছেন যে তাঁর কানে কুণ্ডল পরা থাকে। কানে কুণ্ডল পরা আবার সেটিও ধর্মানুসারী যোগীদের কাছে তেমন বড়ো বিষয় না, কিন্তু আপনারা যদি সেই কুণ্ডলটিকে আরেকটু পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে দেখেন তাহলে দেখবেন যে প্রথাগত ভাবে সেই কুণ্ডল কানের লতি ছিদ্র করে লাগানো হয়নি। এই কুণ্ডল বা ‘দর্শন’ লাগানো হয় যোগীর কানের মাঝে উপাস্থি ছিদ্র করে আর তাই কুণ্ডলের নামানুসারে এঁদের নাম ‘দর্শনা’ আর কান ফাটিয়ে কুণ্ডল পরানো হয় বলে নাম ‘কানফাটা।’
আমাদের বাস ঢুকে গেল গোরখপুরের বাস টার্মিনাসে। এবারে আমাদের যাত্রা আরও দূরে, সিদ্ধার্থের নগর লুম্বিনী ও কপিলাবস্তুর সন্ধান করতে নেপালেও যেতে হবে। তার আগে বরং গোরখপুরের ইতিহাস একটু জেনে নেওয়া যাক।
গোরখপুরের ইতিহাস বেশ প্রাচীন। গোরখপুর নামকরণের আগে, এই অঞ্চলটি ঘিরে জনপদের উত্থান ঘটেছিল এবং ধর্ম, সংস্কৃতি, ও রাজনৈতিক ওঠাপড়ার সাক্ষী ছিল গোরখপুর। অতীতে এই স্থান কোশল রাজ্যের অধীনে ছিল। মহাকাব্য অনুযায়ী এই অঞ্চলটি অযোধ্যার রাজবংশের তথা রামচন্দ্রের শাসনের অন্তর্গত ছিল। বুদ্ধদেবের জীবনের অনেকটা অংশ জুড়ে আছে এই এলাকা। ভগবান বুদ্ধের দেহান্তের পরে এখানে বৌদ্ধদের পতন ও শৈবদের উত্থান হয়। পরবর্তীকালে এই গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলটি চন্দ্রগুপ্ত দ্বিতীয় বিক্রমাদিত্য এবং রাজা হর্ষের সাম্রাজ্যের অংশ ছিল।
গোরখপুরের স্থানীয় কিংবদন্তি অনুসারে, এক দম্পতি দুটি জলাশয় নির্মাণ করেছিলেন যাঁদের নাম ছিল মানসরোবর ও কৌলাদহ। মানসরোবর নাম রাখা হয়েছিল মানসেনের নামে আর কৌলাদাহ রাখা হয়েছিল তাঁর স্ত্রী কৌলবতীর নামে।
আবার এই অঞ্চলটি ডোমকাটার নামে পরিচিত একটি গোষ্ঠী দ্বারা শাসিত হয়েছিল, যারা রাপ্তি এবং রোহিন নদীর সঙ্গমস্থলে ডোমিনগড় দুর্গ তৈরি করেছিল। আরেকটি কাহিনিমতে রুদ্রপুরের (দেওরিয়া জেলার) রাজা বিশ্রাম সিং নিঃসন্তান ছিলেন। তিনি উনভালের (গোরখপুর জেলার) রাজকুমার মঙ্গল সিংকে দত্তক নেন। মঙ্গল সিং গুরু গোরক্ষনাথের উপাসনালয়ের দক্ষিণে গোরখপুর নামে একটি ছোট শহর স্থাপন করেন। শহরের বসতির ইতিহাস নিয়ে প্রত্নতত্ত্ব কী বলছে তাও একবার জেনে রাখা উচিত।
২০১০/১১ সালের ঘটনা। গোরখপুর থেকে মাত্র ২৫ কিলোমিটার দূরে আছে বসডীলা টিলাটার গ্রাম। সেই গ্রামে চলছিল একটি পুকুরের সংস্কার ও পরিবর্ধনের কাজ। গ্রামবাসীরাই NREGA-র scheme এ নিজেরাই করছিলেন সেই কাজ। মাঝারি আকারের পুকুরটি লম্বায় প্রায় ৬৫ মিটার আর চওড়ায় প্রায় ৫৫ মিটার। কাজ করার সময়ে মাটি সরাতে সরাতে হঠাৎ পুকুরের পশ্চিম পাড়ের দিকে মাটির তলা থেকে বেরিয়ে এল মোটা মোটা কতকগুলি শাল কাঠের গুঁড়ি। এলোমেলো করে ছড়িয়ে থাকা কাঠের গুঁড়ি নয়, বরং কাঠের গুঁড়িগুলি দিয়ে যেন কোনো একটি কাঠামোর
মতো কিছু বানানো হয়েছে। ভালো কথা এই যে গ্রামের প্রধান সেগুলিকে টানাহ্যাঁচড়া না করে গোরখপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে খবর দিয়েছিলেন।
এরপর প্রত্নক্ষেত্রটির গুরুত্ব বিবেচনা করে ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণের কাছে খনন করার একটি প্রস্তাব পেশ করা হয়েছিল এবং তা গ্রাহ্যও হয়েছিল। খননকার্য পরিচালনা করেছিলেন দীনদয়াল উপাধ্যায় গোরখপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব ও সংস্কৃতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডঃ শীতলা প্রসাদ সিং। খননের তত্ত্বাবধানে ছিলেন একই বিভাগের প্রধান অধ্যাপক বিপুলা দুবে এবং এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন ইতিহাস, সংস্কৃতি ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক এবং প্রাক্তন প্রধান জে এন পাল। যেখানে কাঠের কাঠামোখানি পাওয়া গিয়েছিল সেইখানে মোট চারখানি পরিখা খোঁড়া হয়েছিল – A1, A2, B1 এবং B2

একটু নীচে যেতেই মাটির তলা থেকে কাঠের গুঁড়িগুলির ওপরে লাগানো ছিল যে কাঠের তক্তাগুলি সেইগুলির নিদর্শন পাওয়া যেতে লাগল। মোটামুটি ৪০ সেমি চওড়া তক্তাগুলি বিভিন্ন দৈর্ঘ্যের হলেও সবগুলির প্রান্তে পরস্পরের সঙ্গে জুড়বার জন্যে কাটা অংশ ছিল। সবশুদ্ধ ১৭ খানি কাঠের তক্তার অবশেষ পাওয়া গিয়েছিল। কাঠের কাঠামোটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২.৯০ মিটার এবং প্রস্থ ১.৩২ মিটার। কাঠের তৈরি একটি বিশাল প্রাসাদের অবশেষ ছিল ঐ কাঠামোটি। অত্যন্ত মোটা ও শক্ত শাল গাছের গুঁড়ির তৈরি কাঠামো কাদামাটির মধ্যে এমনভাবে গেঁথে গিয়েছিল যে তার অনেকটা অংশ পচে না গিয়ে সংরক্ষিত হয়ে গিয়েছিল। খননের সময়ে একদম তলদেশে উত্তরের মসৃণ কৃষ্ণপাত্রের (NBPW) অবশেষ পাওয়া গিয়েছে। মাটির বিভিন্ন স্তরে পাওয়া গিয়েছিল শঙ্খ, কাঠকয়লা, ভাঙা পাত্র, উৎকৃষ্ট লাল পাত্রের উদাহরণ স্বরূপ একটি ছোটো ঘটি, পোড়া মাটির পিণ্ড, পোড়া কাঠ এবং পাতার ছাপ দেওয়া মাটির তাল, পোড়া কাঠ, পশুর হাড়ের টুকরো, লাল গলাযুক্ত পাত্র, দড়ি দিয়ে বাঁধা ছোট পাত্র, বেলেপাথরের শিল-বাটা এবং কিছু ধূসর ও লাল পাত্র। এছাড়া পাওয়া গিয়েছিল ছুরি, তিরের ফলা ও পেরেক, যেগুলি সব ছিল লোহার তৈরি। আরও ছিল অনেক মাছের কাঁটা, কচ্ছপের খোলা ও পাখির হাড়।

এই এলাকা থেকে এবং বসডীলা টিলাটার গ্রামের প্রায় ২ কিলোমিটার পূর্বদিকে একটি উঁচু জমিতে পরীক্ষামুলক খনন করার সময় কুষাণ যুগের পোড়া ইট পাওয়া যায় এবং উত্তরের মসৃণ কৃষ্ণপাত্রের সময়কাল থেকে গুপ্ত যুগের শুরু পর্যন্ত বসতির নিদর্শন পাওয়া গিয়েছিল।
বর্তমানে দেখা গেছে যে ১২০০ সাধারণ পূর্বাব্দে উত্তরের মসৃণ কৃষ্ণপাত্রের উদ্ভব হয়েছিল যদিও এর ব্যবহার ছিল মোটামুটি ৭০০ থেকে ৩০০ সাধারণ পূর্বাব্দ অবধি।
অর্থাৎ মহাজনপদের বিকাশের সঙ্গে উত্তরের মসৃণ কৃষ্ণপাত্রের যোগ ছিল। আমি আগেই বলেছি যে গোরখপুর কোশল মহাজনপদের অন্তর্গত ছিল। এখানে খনন করে দেখা গেছে যে উত্তরের মসৃণ কৃষ্ণপাত্রের পর্বের প্রথম দিকে এখানে জনপদের গঠন হয়েছিল এবং শুঙ্গ-কুষাণ যুগ পার হয়ে গুপ্ত যুগ পর্যন্ত সেই জনপদে অবিরাম মানুষের বসত ছিল। অর্থাৎ প্রায় ৬০০ সাধারণ পূর্বাব্দ থেকে সাধারণ অব্দের ৩য় বা ৪র্থ শতাব্দী পর্যন্ত এখানে মানুষ বাস করে এসেছিল (Dubey Vipula et al)।
গোরখপুরের এই ইতিহাস আরেক মহামানবের সঙ্গে যুক্ত, তিনি হলেন বুদ্ধদেব। গৌতম বুদ্ধের কর্মকাণ্ডের অনেকটাই ঘটেছিল ষোড়শ মহাজনপদের সমকালীন এই এলাকা কেন্দ্র করে আর তাই আমরা সেই সময়ের উত্তরের মসৃণ কৃষ্ণপাত্রের বসতি দেখতে পাই গোরখপুরের মতো নাথযোগীদের শহরেও। নাথ সম্প্রদায়ের যোগীরাও আগে বৌদ্ধ ছিল বলে একটি মত আছে। এই মতানুসারে নাথযোগীরা বৌদ্ধ থেকে পরে শৈব হয়েছিলেন। আবার অনেকেই এই মতের বিরোধিতা করেছেন। আমরা দেখেছি যে পরবর্তী যুগে বৌদ্ধ ধর্মের ওপরে তন্ত্রের প্রভাব পড়েছে বেশ ভালভাবেই। একই রকম ভাবে নাথযোগীদের পন্থায় তন্ত্রের ছায়া পড়েছে। এখান থেকে এগিয়ে যাওয়ার আগে আমাদের একটু মহাজনপদগুলি সম্বন্ধে জেনে নেওয়া ভালো। এতে আমরা পরবর্তী সময়ে আসা বিভিন্ন নাম ও স্থান সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল থাকব। ১৩০০ সাধারণ পূর্বাব্দ নাগাদ সিন্ধু সভ্যতার বিলীন হয়েছিল ধরে নিলেও সিন্ধু
সভ্যতার মৌলিক ভাবনা ক্ষীণ হতে শুরু করেছিল পরিণত হরপ্পা পর্যায় শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অর্থাৎ ১৯০০ সাধারণ পূর্বাব্দ নাগাদ। এই বিলীয়মান ‘মৌলিক ভাবনা’র মধ্যে অবশ্যই থাকবে বিশাল ইট নির্মিত নগর নির্মাণ ও স্থাপত্যবিদ্যা। সিন্ধু সভ্যতার পর ভারত ভূখণ্ডে আবার ইটের নগর স্থাপনার কৃতিত্ব সম্পূর্ণভাবেই মহাজনপদগুলির।
এরই সঙ্গে সঙ্গে মহাজনপদের যুগের রাজনৈতিক ধারণাতেও এক গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। গোষ্ঠী বা জাতিগত আনুগত্য যেন এ-সময় একটি আঞ্চলিক আনুগত্যের দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করেছিল। আর তার ফলে গোষ্ঠীর বা জাতিগত শাসনব্যবস্থার পথ ধরে এক একটি পৃথক রাজনৈতিক – ভৌগোলিক পরিচয় তৈরি হতে শুরু করেছিল উত্তর ভারত জুড়ে, এবং পরিষ্কার বোঝা যায় যে রাজ পরিবারগুলির প্রতি সাধারণ মানুষের আনুগত্য তখন অনেকাংশেই পরিবর্তিত হচ্ছিল। এই নতুন ধরনের রাজনৈতিক ধারণায় রাজার সঙ্গে রাজপরিবার বা রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রস্থলে এই পরিবারতন্ত্রের পরিবর্তে একটি অন্য ধরনের রাষ্ট্র পরিচালনার model দেখা যাচ্ছিল যা হল ’গণ-শাসন।’ তবে এমন ভাববেন না সব স্থানেই এই সমীকরণ চালু হয়ে গিয়েছিল।
সাধারণ পূর্বাব্দের ষষ্ঠ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে মহাজনপদগুলির অস্তিত্ব নজরে আসতে শুরু করেছিল। এমন ষোলখানি জনপদ বা রাজ্যের বিষয়ে জানা যায় বলে সব কয়টিকে একত্রে ‘ষোড়শ মহাজনপদ’ বলা হয়ে থাকে। প্রত্যেকটি রাজ্যের সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক পরিচিতি ছিল, অর্থাৎ রাজ্যের যেমন একটি নির্দিষ্ট সীমানা ছিল তেমনই শাসনকার্য পরিচালনা করার জন্যে নির্দিষ্ট প্রথাও ছিল। রাজ্যের রাজধানী বা মহাজনপদটি গ্রামীণ ছিল না। রাজ্যগুলির সেনাবাহিনী ছিল এবং পরিকল্পিত কর ব্যবস্থার উল্লেখ পাওয়া যায়। সোজা কথায় বলা যেতে পারে যে গৌতম বুদ্ধ বা মহাবীরের ধর্ম প্রচারের আগে থেকেই সুসংহত রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্ম হয়ে গিয়েছিল ভারতে।
এই রাজ্যগুলির অবস্থান বা ভৌগোলিক সীমানার বিষয়ে যা জানতে পারা যায় তা অনেকটাই সাহিত্য থেকে। বিভিন্ন পালি ও প্রাকৃত গ্রন্থে এবং জাতকে আমরা মহাজনপদগুলি সম্বন্ধে জানতে পারি যেখানে এগুলিকে বিভিন্ন নামে বোঝানো হয়েছে যেমন জনপদ, মহাজনপদ, রত্থ, অন্তর্রত্থ, তিরোরত্থ, দেস, পদেস, জনপদপদেস, মহাপদেস, গণ, সংঘ প্রভৃতি।
সেই সমস্ত অঞ্চলে খননের ফলে জনপদের অস্তিত্বের পাথুরে প্রমাণও পাওয়া গেছে। জনপদ শব্দটি এমন একটি অঞ্চলকে বোঝায় যেখানে মানুষ বহু প্রজন্ম ধরে বসবাস করে এবং তাদের একটি স্বতন্ত্র রীতিনীতি, ধর্মীয় আচার এবং ভাষা-উপভাষা আছে। মহাজনপদের মধ্যে থাকে এক বা একাধিক নগর, নিগম (বাণিজ্য কেন্দ্র) এবং গ্রাম। এখানে এক ধরনের গোষ্ঠীকেন্দ্রিক বন্ধন দেওয়া সমাজ (gemeinschaft) লক্ষ করা যায়। আবার রত্থ শব্দের অর্থ হল ‘একটি সুশৃঙ্খল রাজ্য,’ যেখানে বিভিন্ন গোষ্ঠী মিলে একটি সমাজ গঠন করে ও সেখানে শাসনকার্যই প্রধান (proto-gesellschaft)। জনপদের তুলনায় রত্থ ছিল অনেক বেশি সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত, সীমানা দেওয়া, নিয়মের বাঁধনে শাসিত সমাজ। বিদেশী রাজ্যকে বলা হত তিরোরত্থ আর অন্তর্রত্থ ছিল তার অধীনস্থ বা সামন্ত রাজ্য। দেস (দেশ) বলতে আমরা রাষ্ট্র বুঝলেও তখন এর অর্থে এমন কোনো ভূখণ্ড বোঝাত যার সুনির্দিষ্ট সীমানা বলতে কিছু নেই। এর একটি ভাল উদাহরণ হল মঝ্ঝিমদেস (মধ্য দেশ)। বুদ্ধের সময়কালে ষোলটি মহাজনপদের মধ্যে চৌদ্দটি ছিল মঝ্ঝিমদেসের অন্তর্ভুক্ত। মঝ্ঝিমদেস বিস্তৃত ছিল পূর্বে কজঙ্গল (বিহারের কাঁকজোল) শহর পর্যন্ত যার পরে ছিল মহাশালা; দক্ষিণ-পূর্ব দিকে সালালাবতী নদী পর্যন্ত; দক্ষিণ-পশ্চিমে সাতকান্নিকা শহর অবধি; পশ্চিমে ব্রাহ্মণদের গ্রাম থুনা (হরিয়ানার থানেশ্বর); আর উত্তরে উসিরাদ্ধজা পর্বত পর্যন্ত। একটি দেস-এর ভেতরে আবার কিছু বিভিন্ন পারম্পরিক গোষ্ঠীবদ্ধ অঞ্চল অনুযায়ী ভাগ ছিল যেমন পদেস (জেলা, অঞ্চল), মহাপদেস (প্রদেশ), জনপদপদেস (একটি গ্রামীণ জেলা) ইত্যদি। পালি ও প্রাকৃত গ্রন্থে গণ ও সঙ্ঘ শব্দগুলি প্রজাতন্ত্রী সরকারের অর্থে ব্যবহৃত হলেও এগুলির মধ্যে অনেকগুলি প্রকৃত অর্থে ছিল গোষ্ঠীতন্ত্রী (oligarchies)। বিনয় পিটক বৌদ্ধ সংঘের সংগঠন সম্পর্কে বহু অমূল্য তথ্য সরবরাহ করে যার নিয়ম ও বিধানগুলি বুদ্ধ ও মহাবীরের সময়ের গণরাজ্যগুলি থেকে গৃহীত হয়েছিল; সংক্ষেপে, এ ছিল আলোচনার মাধ্যমে চালিত একটি সরকার। সাধারণ পূর্বাব্দের ষষ্ঠ শতাব্দীর সময়কালের বিখ্যাত সংস্কৃত বৈয়াকরণ পাণিনি তাঁর অষ্টাধ্যায়ী গ্রন্থে ‘জনপদ’ শব্দের উল্লেখ দুই প্রসঙ্গে করেছেন – অঞ্চল এবং সংস্কৃতি তাঁর লেখা অনুসারে জনপদ হল সেই রাজ্য যার একটি নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। এছাড়া তাঁর লেখায় আমরা আরও দুই প্রকারের অঞ্চল দেখতে পাই, বিষয় ও গণ বা সঙ্ঘ। বিষয় বলতে তিনি কোনো দেশকে বুঝিয়েছেন আর গণ বা সঙ্ঘ বলতে তিনিও এমন রাজ্যের কথা বুঝিয়েছেন যাদের প্রশাসনিক কার্য ছিল প্রজাতন্ত্রী। পাণিনি ৩৩ খানি গণরাজ্যের কথা বলে গেছেন যেগুলি সব মহাজনপদের তালিকায় পড়ে না। পরবর্তী সময়ে কাত্যায়ণ (সাধারণ পূর্বাব্দের চতুর্থ শতাব্দী) ও পতঞ্জলি (সাধারণ পূর্বাব্দের দ্বিতীয় শতাব্দী) এই গণরাজ্যগুলির তালিকা আরও বাড়ান। কাত্যায়ণ আরও ৪ খানি নাম ও পতঞ্জলি ৪১ খানি নাম যুক্ত করেছিলেন। আবার তাঁরা উভয়ে পাণিনির কিছু নাম বাতিলও করেছিলেন। অর্থাৎ জনপদ অনেকগুলি থাকলেও তাদের মধ্যে রাজনৈতিক ক্ষমতাবান ও বৃহৎ জনপদগুলিকেই ‘মহাজনপদ’ আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। নানা সূত্র অনুযায়ী এই মহাজনপদগুলির নামের পার্থক্য আছে তবে বিভিন্ন পালি গ্রন্থ অনুযায়ী বুদ্ধের সময়ে যে ১৬ খানি মহাজনপদ ছিল বা বিখ্যাত ‘ষোড়শ মহাজনপদ’-এর তালিকা এই রকম-
১)অবন্তী, ২)অস্মক ৩)অঙ্গ ৪)কম্বোজ ৫)কাশী ৬)কুরু ৭)কোশল ৮)গান্ধার ৯)চেদি রাজ্য ১০)বজ্জি অথবা বৃজি ১১)বৎস রাজ্য ১২)পাঞ্চাল ১৩)মগধ ১৪)মৎস্য অথবা মচ্ছ ১৫)মল্ল রাজ্য ১৬)শূরসেন
ওপরের তালিকার মধ্যে চৌদ্দটি মঝ্ঝিমদেসের অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং কম্বোজ ও গন্ধার ছিল উত্তরপথ-এর অন্তর্গত(সংযুক্ত নিকায় অনুসারে। পুস্তানির মানচিত্র দ্রষ্টব্য)। দীঘ নিকায়ের সূত্রে মাত্র দশটি মহাজনপদের নাম দেয়া হয়েছে এবং ওপরের তালিকার প্রথম দুটি এবং শেষ চারটি সেখানে নেই।
চুলনিদ্দেসা গ্রন্থে কলিঙ্গকে এই তালিকার সঙ্গে জুড়ে মহাজনপদের সংখ্যা সতের করা হয়েছে। আবার সেখানে গান্ধারের পরিবর্তে যন বা যবন-কে যুক্ত করা হয়েছে। আবার দীঘ নিকায়-এ কয়েকটি মহাজনপদকে জোড়ায় জোড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে যেমন, কাশী-কোশল, বজ্জি-মল্ল, কুরু-পাঞ্চাল এবং মৎস্য-শূরসেন। পরবর্তী কালের একটি গ্রন্থ জৈন ভগবতী সূত্র বা ব্যাখ্যা ভগবতী গ্রন্থে যে ষোড়শ মহাজনপদের তালিকা দিয়েছে তার বেশিরভাগের নাম কিছুটা আলাদা। সেগুলি ছিল –
১)অঙ্গ ২)ভঙ্গ(বঙ্গ) ৩)মগহ(মগধ) ৪)মলয় ৫)মালব ৬)অচ্ছ ৭)ভচ্ছ(বৎস) ৮)কচ্ছ ৯)লধা(লতা বা রাধা বা রাঢ়) ১০)পদ(পান্ড্য বা পৌণ্ড্র) ১১)ভজ্জি (ভজ্জি) ১২)মোলি(মল্ল) ১৩)কাশি(কাশী) ১৪)কোশল ১৫)আভা ১৬)সম্ভূতর(সুহ্ম)
মহাগোবিন্দ সুত্রান্ত উল্লেখ করেছে যে, রাজা রেনুর ব্রাহ্মণ ধর্মগুরু ছিলেন মহাগোবিন্দ। তিনি তাঁর সাম্রাজ্যকে নিম্নলিখিত সাতটি পৃথক রাজ্যে বিভক্ত করেছিলেন যেগুলির পৃথক রাজধানী ছিল।
১)কলিঙ্গ – দন্তপুর ২)অস্মক-পোতন ৩)অবন্তী – মাহিষ্মতী ৪)সৌবীর – রোরুকা ৫)বিদেহ – মিথিলা ৬)অঙ্গ – চম্পা ৭) কাশী
– বারাণসী
বিভিন্ন গ্রন্থ অনুযায়ী মহাজনপদগুলির আলাদা তালিকা দেখে বোঝা যায় যে যুগে যুগে জনপদগুলির নাম ও পরিচয়ের পরিবর্তন হয়েছে। আবার এর মধ্যে অন্যান্য বিষয়ের ছাপও পড়েছে, যেমন ধরুন পুরাণ ও বৌদ্ধ তালিকার প্রসঙ্গ। অনেকটা সাদৃশ্য থাকা সত্ত্বেও এই দুই তালিকার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। মহাকাব্য, পুরাণ ইত্যাদিতে বর্ণিত বংশচরিতের শুরুর দিকটি সম্পূর্ণভাবেই পৌরাণিক। আবার শেষের দিকটি অনেকটাই ঐতিহাসিক। এবারে এই দুইয়ের মধ্যবর্তী অংশটির প্রামাণ্যতা নিয়ে বড়োই ধোঁয়াশা রয়েছে। পরীক্ষিত, যিনি মহাভারতের যুদ্ধের পরে কুরুদের রাজা হয়েছিলেন বলে মনে করা হয়, তাঁর পুত্র জনমেজয় এবং বিদেহের রাজা জনক- এঁরা হয়তো বাস্তবে ছিলেন এবং হয়তো সাধারণ পূর্বাব্দের ৯ম থেকে ৭ম শতকের কোনো সময়ে রাজত্ব করতেন।
তবে এটি নিশ্চিত নয়; যদিও প্রত্নতত্ত্ব অনুযায়ী এমনটা ঘটবার সম্ভাবনা আছে। এই ষোড়শ মহাজনপদ বা সাধারণ পূর্বাব্দের ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে উত্তর ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের রূপরেখা অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং বিভিন্ন গ্রন্থে উল্লিখিত রাজা ও ধর্মীয় প্রচারকদের সত্যিকারের এক-একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। তবে বিভিন্ন সময়কালের সঙ্গে গ্রন্থকারের আগ্রহ ও বিশেষ মতের প্রতি ঘনিষ্ঠতা এইসব তালিকাকে প্রভাবিত করেছিল। বৌদ্ধ ও জৈন গ্রন্থে বজ্জি ও মল্লের উল্লেখ থাকলেও তাদের নাম পৌরাণিক গ্রন্থে পাওয়া যায় না কারণ এই দুটি রাজ্যই ছিল ভিন্নধর্মী সম্প্রদায়ের কেন্দ্র।
এই মহাজনপদগুলি ছাড়া বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে কয়টি গুরুত্বপূর্ণ গণ বা সঙ্ঘের নাম পাওয়া যায়। গণের শাসনকার্যে জড়িত মানুষরা বংশগত ভাবে নির্বাচিত হতেন না। বরং তাঁরা ছিলেন জনগণের প্রতিনিধি। তাঁরা গণপতি বা গণরাজা নামে পরিচিত ছিলেন।
গণরাজ্যগুলিকে পর্যবেক্ষণ করলে একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য চোখে পড়বেই। তা হল এঁদের অবস্থান। মোটামুটিভাবে রাজ্যগুলি সব পূর্ব ভারতের তরাই অঞ্চল বা হিমালয়ের পাদদেশে বা তার কাছাকাছি ছিল।
গণের প্রতিনিধিরা, সন্থাগার (সংস্থা+আগার) নামের একটি বড়ো গৃহে বসে আলোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমে কোনো সিদ্ধান্ত নিতেন। শলাকা (কাঠের টুকরো) ব্যবহার করে প্রত্যেক প্রতিনিধি নিজের নিজের ভোট দিতে পারতেন। সালাকা-গহাপক (ভোট সংগ্রহকারী) শলাকাগুলি একত্র করে সৎ ও নিরপেক্ষভাবে কোন পক্ষ জয়ী তা ঘোষণা করতেন।
এই রাজ্যগুলি সমসাময়িক যুগে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল কারণ মহাবীর এবং বুদ্ধ উভয়েই গণরাজ্যগুলিতে অবাধে প্রচার করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তখনকার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গণরাজ্য ছিল এগুলি –
১)বৈশালীর লিচ্ছবি ২)মিথিলার বিদেহ
৩)কপিলাবস্তুর শাক্য
৪)রামগ্রামের কোলিয়
৫)পিপ্পলিবনের মৌর্য ৬) কুশিনগরের (কুশিনারা) মল্ল
৭)পাওয়া(Pawa)-র মল্ল
৮)কেশপুত্র-র(কেসাপুত্ত) কালাম
৯)অল্লকপ্পর বুলি
১০)শিশুমারগিরির ভগ্গ (ভর্গ)
১১)কুণ্ডলপুর (কুণ্ডপুর)-এর নয়া
এই প্রজাতন্ত্রগুলির মধ্যে শুধুমাত্র মল্লদের একটি অংশের উল্লেখ ‘ষোড়শ মহাজনপদ’-এর তালিকায় রয়েছে। তালিকার বাইরের রাজ্য/জাতিগুলি ষোড়শ মহাজনপদের অন্তর্ভুক্ত নয়, এমনকি বুদ্ধদেবের বংশের শাক্যরা পর্যন্ত। সাধারণ পূর্বাব্দের ষষ্ঠ শতাব্দীতে সবচেয়ে শক্তিশালী রাজ্য ছিল মগধ, কোশল, বৎস এবং অবন্তী। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজ্যগুলির মধ্যে আভ্যন্তরীণ সম্পর্ক ওঠানামা করেছিল আর বিভিন্ন যুদ্ধ, যুদ্ধবিরতি এবং সামরিক জোটও ঘটেছিল। বিভিন্ন রাজবংশের মধ্যে বিবাহ একটি আপাত মিত্রতা আনলেও রাজনৈতিক কারণে তা প্রায়ই দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকত না।
এবারে আমরা ষোড়শ মহাজনপদগুলির প্রত্যেকটিকে অল্প করে জেনে নিই। এখানে শুধুমাত্র গৌতম বুদ্ধের সময়ের সুত্রগুলি থেকে মহাজনপদগুলির চরিত্র নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
অঙ্গ – মহাভারত অনুযায়ী অঙ্গরাজ্যের অবস্থান ছিল বর্তমান বিহারের ভাগলপুর ও মুঙ্গের জেলা। মহাজনপদ হিসেবে অঙ্গ-এর অবস্থান ছিল মগধের পূর্বে এবং বর্তমান বিহার রাজ্যের বেগুসরাই, সহর্সা ও পূর্ণিয়া জেলা নিয়ে। দুই রাজ্যের সীমানায় বয়ে চলত চম্পা নদী যার বর্তমান নাম চন্দন নালা। আবার, দিলীপ চক্রবর্তী মনে করেন যে সম্ভবত কিউল নদী এই সীমানা তৈরি করেছিল। রাজ্যের উত্তরে ছিল গঙ্গা নদী। অঙ্গের রাজধানীর নাম ছিল চম্পা যদিও পুরাণ অনুযায়ী এর রাজধানী ছিল মালিনি। মিথিলা থেকে ৬০ যোজন দূরে, চম্পা ও গঙ্গা যেখানে মিশেছে সেই স্থানে, গঙ্গার দক্ষিণ তীরে ছিল চম্পার অবস্থান। আজকের হিসেবে তা মনে হয় ভাগলপুরের নাথনগর এলাকা। দীঘ নিকায়-এর মতে তখনকার সময়ে ভারতের ছয়টি বৃহৎ শহরের মধ্যে একটি ছিল চম্পা এবং সে এমনই সমৃদ্ধ শহর ছিল যে বণিকেরা একে ‘সুবর্ণভূমি’ বলে উল্লেখ করত। চম্পা ছাড়া অঙ্গের আরও দুইটি শহরের নাম পাওয়া যায় যেগুলি হল ভদ্রিকা ও অশ্বপুর। অনেক বৌদ্ধ গ্রন্থে (মূলত ভাষ্যগুলিতে) আবার অঙ্গকে রত্থ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরেকটি রাজ্যের কথা পাওয়া যায় যার নাম ছিল অঙ্গুত্তরাপ। মাহী নদীর ধারে অবস্থিত এই এলাকাটি বর্তমানের বেগুসরাই জেলার অংশ। সংযুত্ত নিকায় অনুযায়ী ‘অপান’ ছিল অঙ্গ রাজ্যের অন্তর্গত একটি উল্লেখযোগ্য নিগম বা ব্যবসায়কেন্দ্র। সুতরাং মনে হয় প্রথমে এটি ছিল অঙ্গের অংশ কিন্তু পরে এটি স্বতন্ত্র হয়ে যায় আর তখন এর রাজধানীর নাম ছিল অপান। অনেক সময়েই দেখা গেছে যে অঙ্গুত্তরাপ ও অপানের নাম একই সঙ্গে বা একে অন্যের পরিপূরক রূপে উল্লিখিত হয়েছে যার থেকে মনে হয় যে অঙ্গুত্তরাপ অঞ্চলের একমাত্র উল্লেখযোগ্য নগর ছিল অপান। বুদ্ধের সময়ে অঙ্গরাজ ছিলেন একজন ধনী সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি। তাঁর সম্বন্ধে এইটুকুই জানা যায় যে তিনি একজন ব্রাহ্মণকে ভাতা দিয়েছিলেন। সেই সময়ের গ্রন্থে অঙ্গ ও মগধের জনগণকে সাধারণত একসঙ্গে উল্লেখ করা হয়ে থাকে।
মগধ – সাধারণ পূর্বাব্দের ষষ্ঠ শতকের সবকয়টি রাজ্যের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ও গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য ছিল মগধ। এর অবস্থান ছিল আজকের পশ্চিম-মধ্য বিহার। পৌরাণিক গ্রন্থগুলিতে মগধের বিভিন্ন রাজপরিবারের বিস্তারিত উল্লেখ আছে। মগধে শাসন চালিয়েছে এমন আটখানি রাজবংশের কথা সেখানে আছে। এমন বিস্তারিত বর্ণনা আমরা অন্য কোনো মহাজনপদের ক্ষেত্রে পাই না। তবে পুরাণের বর্ণনায় অনেক গোঁজামিল আছে। যেমন বলা হয়েছে যে
বৃহদ্রথ বংশের পরে প্রদ্যোত বংশ শুরু হয়েছিল যাদের পতন ঘটিয়েছিল বারাণসীর রাজা শিশুনাগ। শিশুনাগের পর আরও তিন উত্তরাধিকারীর পর আসেন বিম্বিসার। এদিকে প্রদ্যোত বংশ ছিল অবন্তীতে আর সেই হিসেবে তাদের মগধ আসা অযৌক্তিক। বৃহদ্রথ রাজবংশের শেষ রাজা ছিলেন রিপুঞ্জয়
, যিনি পুলিকা নামে তাঁর এক মন্ত্রীর হাতে নিহত হন। রিপুঞ্জয়ের মৃত্যুর পর বিম্বিসার সিংহাসনে বসেছিলেন এবং হর্ষঙ্ক রাজবংশের পত্তন করেছিলেন। অনেক স্থানেই পাওয়া যায় যে রিপুঞ্জয়কে হত্যা করে তাঁর মন্ত্রী নিজের পুত্র প্রদ্যোতকে রাজা করেছিলেন। আমার মনে হয় যে সেই রাজা প্রদ্যোতকে সরিয়ে বিম্বিসার ক্ষমতায় আসেন। রাজা প্রদ্যোতের সঙ্গে একই নামের অবন্তীর প্রদ্যোত রাজবংশের কোনো সম্পর্ক নেই আর রাজা প্রদ্যোতের শাসনও অল্প কিছুদিনেরই ছিল তাই তাঁর উল্লেখ তেমন নেই। শিশুনাগ হর্ষঙ্ক বংশের বিম্বিসার পরবর্তী এক রাজা। সিংহলি গ্রন্থ ‘মহাবংশ’ অনুসারে নন্দদের পূর্ববর্তী রাজারা হলেন:- ১) বিম্বিসার, ২) অজাতশত্রু, ৩) উদয়ভদ্র, ৪) অনুরুদ্ধ, ৫) মুণ্ড, ৬) নাগদাসক, ৭) সুসুনাগ, ৮) কালাশোক (অশোকাবদান অনুসারে কাকবর্ণ), ৯) কালাশোকের দশ পুত্র। আবার পুরাণানুসারে রাজাদের তালিকা হল:- ১) সিসুনাগ, ২) কাকবর্ণ, ৩) ক্ষেমাধর্মণ, ৪) ক্ষত্রৌজস, ৫) বিম্বিসার, ৬) অজাতশত্রু, ৭) দাতিক, ৮) উদয়িন, ৯) নন্দীবর্ধন ও ১০) মহানন্দি।
বুদ্ধঘোষের মতে, মগধ নামটি নাকি এসেছিল মগধ নামের এক ক্ষত্রিয় গোষ্ঠী থেকে। প্রথমে মগধের রাজধানী ছিল সাত পাহাড়ের মধ্যে অবস্থিত গিরিব্রজ বা রাজগৃহ বা রাজগীর। পরে তা স্থানান্তর হয়ে যায় গঙ্গা ও শোন নদীর মিলনস্থল, পাটলিপুত্তে (পাটলিপুত্র)। মগধ রাজ্যের মূল অংশ ছিল গঙ্গার দক্ষিণ দিকে থাকা আজকের বিহার রাজ্যের অংশ। বুদ্ধের সময়, মগধ মহাজনপদের দক্ষিণে ছিল বিন্ধ্য পর্বত, পশ্চিমে শোণ নদী, উত্তরে গঙ্গা এবং পূর্বে চম্পা নদী। চম্পা নদীর অপর পাড়ে ছিল অঙ্গ রাজ্য।
শোণ নদ আবার মগধ আর লিচ্ছবিদের মধ্যে সীমানা ছিল। তার ওপরে উভয় রাজ্যেরই ছিল সমান অধিকার। বেশিরভাগ প্রাক-বৌদ্ধ ব্রাহ্মণ্য গ্রন্থে, মগধকে বৈদিক সংস্কৃতির বাইরের এলাকা বলে যে শুধু দেখানো হয়েছে তাই নয়, এর অধিবাসীদের বেশ অবজ্ঞার চোখে দেখা হয়েছে। এক জাতকের মতে, মগধ রাজ্য প্রাথমিকভাবে অঙ্গের অধীনস্থ ছিল। প্রাচীন বৌদ্ধ গ্রন্থ অনুসারে, আশি হাজার গ্রাম নিয়ে মগধ ও অঙ্গ গঠিত হয়েছিল আর এর পরিধি ছিল তিনশ যোজনের মতো।
মগধ ছিল খুব সমৃদ্ধ রাজ্য। এর খেত সব ছিল উর্বর আর তাতে সোনার ফসল ফলত। এখানে নাকি এক বিশেষ জাতের রসুন পাওয়া যেত। বৌদ্ধ যুগের প্রাথমিক পর্যায়ে মগধ একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র ছিল এবং উত্তর ভারতের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এখানে বাণিজ্য ও শিক্ষার কারণে উপস্থিত হতেন। সংযুক্ত নিকায়ের ভাষ্য সরত্থপ্পাকাসিনীতে উল্লেখ করা হয়েছে যে অঙ্গ ও মগধে প্রতি বছর দেবতা মহাব্রহ্মার উদ্দেশ্যে একটি যজ্ঞ করার প্রথা ছিল। সেই যজ্ঞে ষাটটি গোরুর গাড়ি বোঝাই কাঠ দিয়ে কুণ্ড জ্বালানো হত। এই দুই মহাজনপদের মানুষেরা বিশ্বাস করতেন যে যজ্ঞের আগুনে যা নিক্ষেপ করা হবে, ভবিষ্যতে তার হাজার গুণ ফেরত আসবে।
ভারতের দুটি প্রধান ধর্ম, জৈন ও বৌদ্ধধর্মের উৎপত্তি ও বিস্তারে উল্লেখযোগ্য ভুমিকা নিয়েছিল মগধ। বুদ্ধের প্রধান শিষ্য সারিপুত্ত ও মৌদ্গল্যায়ন মগধের অধিবাসী ছিলেন। মৌর্য সাম্রাজ্য এবং গুপ্ত সাম্রাজ্যের মতো দুই মহান সাম্রাজ্যের অঙ্কুর মগধ থেকে উদ্ভূত হয়েছিল।
কাশী – তিনশত যোজন বিস্তৃত কাশী রাজ্য ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য। শুরুর দিকে কাশী রাজ্যের খুবই প্রভাব ও ক্ষমতা ছিল যা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। কাশীর রাজধানী ছিল বারাণসী যা আজকের বেনারস। বারাণসীর উত্তর ও দক্ষিণে দুইটি নদী প্রবাহিত হত যাদের নাম ছিল বরুণা ও অশি। বারাণসীকে বেষ্টন করে রাখা এই দুই নদীর নাম থেকেই শহরের নাম হয়েছিল বারাণসী। বারাণসীকে কেন্দ্র করে গঙ্গা ও গোমতী নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল এই রাজ্য। বর্তমান উত্তর প্রদেশের বালিয়া, আজমগড়, গাজিপুর, বারাণসী এবং জৌনপুর ও মির্জাপুর জেলার কিছু অংশ নিয়ে গঠিত হয়েছিল এই রাজ্য। কাশী রাজ্য খুবই সমৃদ্ধশালী ছিল কারণ এর অবস্থান ছিল নদীবিধৌত সমভুমিতে। এখানকার জমি ছিল উর্বর ও সুফলা। বুদ্ধের সময়ে এই রাজ্য বস্ত্রশিল্প ও ঘোড়া ব্যবসায়ের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। জাতক অনুসারে কাশীর কিছু রাজা রাজনৈতিক মর্যাদা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় কোশল রাজ্যের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জড়িয়ে পড়েছিলেন। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল। শুধুমাত্র কোশলই নয়, অঙ্গ ও মগধের সঙ্গেও কাশী রাজ্য মাঝে মধ্যে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছিল। পরে, উত্তর ভারতের শক্তিশালী রাজ্যগুলির মধ্যে অন্যতম রাজ্য কাশী কোশল রাজ্যের অধীনে চলে গিয়েছিল।
কোশল – বর্তমান উত্তর প্রদেশের অযোধ্যা-সন্নিহিত এলাকায় অবস্থিত কোশলের তিনদিক ঘিরে ছিল নদী আর একদিকে পাহাড়। রাজ্যের পূর্বে ছিল সদানীরা নদী (বর্তমানের গন্ডক নদী) যা এই রাজ্যকে বিদেহ থেকে পৃথক করেছিল, পশ্চিমে গোমতী নদী, দক্ষিণে সর্পীকা বা স্যন্দিকা (বর্তমানের সই নদী) এবং উত্তরে ছিল নেপালের পাহাড়। সরযূ নদী কোশল রাজ্যকে উত্তর ও দক্ষিণ অংশে বিভক্ত করেছে। শ্রাবস্তী (বর্তমান সাহেত-মাহেত) ছিল উত্তর কোশলের রাজধানী এবং কুশাবতী ছিল দক্ষিণ কোশলের রাজধানী। উত্তর কোশল রাজ্যই ছিল কোশল মহাজনপদ। শ্রাবস্তী ছাড়া এই রাজ্যের অন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ শহর ও রাজনৈতিক কেন্দ্র ছিল সাকেত ও অযোধ্যা। এছাড়াও আরও কয়েকটি ছোটো শহরের নাম পাওয়া যায় যথা সেতব্য, উক্কত্থ এবং কিটাগিরি।
কাশী জয় করার পর কোশলের শক্তি অত্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছিল। পরবর্তীকালে, কপিলাবস্তুর শাক্যদের ওপর এবং সম্ভবত কেসাপুত্তের কালাম ও আশপাশের অন্যান্য রাজ্যের ওপর কোশল তার ক্ষমতা প্রসারিত করে। তাঁর জীবনকালে
বুদ্ধ অনেক বর্ষাকাল শ্রাবস্তীতে কাটিয়েছেন। বুদ্ধের সমসাময়িক কোশলের রাজা হিসেবে পসেনদি বা প্রসেনজিৎ-এর উল্লেখ পালি গ্রন্থে প্রায়শই মেলে। কোশলের রাজা প্রসেনজিৎ ও মগধরাজ বিম্বিসারের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্কের ফলে কোশল ও মগধ মিত্রতার সম্পর্কে আসে কিন্তু বিম্বিসারের মৃত্যুর পর দুটি রাজ্যের মধ্যে সম্পর্ক ক্রমশ তিক্ত হতে শুরু করেছিল।
বজ্জি – বজ্জি (বৃজি) রাজ্যের অবস্থান পূর্ব ভারতে। গঙ্গার উত্তর ভাগ থেকে নেপালের পাহাড় পর্যন্ত এই রাজ্য বিস্তৃত ছিল। বজ্জি রাজ্য একটি সঙ্ঘ ছিল। বুদ্ধঘোষের ‘সুমঙ্গলাবিলাসিনি’ গ্রন্থ থেকে বজ্জি রাজ্যের অট্ঠকুলিকদের বিষয়ে জানা যায় আর সেখান থেকে অনেকে মনে করেন যে এবং আটখানি গোষ্ঠী এর শাসনকার্যের ভার সামলাত। আবার অনেকের মতে অট্ঠকুলিক-এর অর্থ আটটি গোষ্ঠী নয় বরং এর মাধ্যমে বৈশালীর আটটি অভিজাত শাসক পরিবারের সমন্বয়ে গঠিত একটি সংস্থা হতে পারে। বজ্জি সঙ্ঘের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গোষ্ঠীরা ছিল বজ্জি, লিচ্ছবি, বিদেহ এবং ন্যায়। এছাড়া আরও কিছু গোষ্ঠী ছিল যেমন উগ্রস, ভোগস, কৌরব এবং অক্ষভাক। অন্যান্য অনুষঙ্গী গোষ্ঠী সম্পর্কে আমরা খুব কমই জানি। লিচ্ছবি এবং বজ্জি সঙ্ঘের রাজধানী ছিল বৈশালী যার অবস্থান ছিল আজকের বিহার রাজ্যের বাসঢ় শহর। বৌদ্ধ গ্রন্থে প্রায়ই লিচ্ছবিদের উল্লেখ পাওয়া যায়। মগধের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়লেও লিচ্ছবিদের সঙ্গে কোশল এবং মল্লদের ভালো সম্পর্ক ছিল। বজ্জি সংঘের নেতৃত্বে ছিলেন চেতক, যিনি ছিলেন ত্রিশলার (মহাবীরের মা) ভাই এবং মগধের রাজা বিম্বিসারের স্ত্রী চেল্লনার পিতা।
মল্ল – বজ্জিদের পশ্চিমে অবস্থিত মল্ল রাজ্যও ছিল একটি সঙ্ঘ এবং এর শাসনকার্য চালাত নয়টি গোষ্ঠী। মল্ল রাজ্যের সীমানা নিয়ে সুনির্দিষ্ট ধারণা এখনও পাওয়া যায়নি। মল্ল রাজ্য দুটি স্বয়ংশাসিত অঞ্চলে বিভক্ত ছিল। এক অঞ্চলের রাজধানী ছিল কুশিনারা ও অপর অংশের পাওয়া। এই দুই মল্ল অঞ্চলকে বিভক্ত করে প্রবাহিত হত হিরণ্যবতী নদী। উত্তর প্রদেশের গোরখপুর শহর থেকে প্রায় ৭৭ কিলোমিটার পূর্বে ছোট গণ্ডক নদীর তীরে অবস্থিত বর্তমানের কাসিয়া শহরটি হল সেই তখনকার কুশিনারা। আবার উত্তর প্রদেশের বর্তমান ফাজিলনগর হচ্ছে মল্লদের পাওয়া নগর। বজ্জি এবং মল্লরা মিত্র ছিল বলে মনে হয়, যদিও তাদের মধ্যে কিছু দ্বন্দ্ব ছিল।
চেদি – চেদি রাজ্যটি যমুনা নদীর দক্ষিণে মধ্য ভারতের বুন্দেলখণ্ডের পূর্ব অংশে কেন নদীর পাশে অবস্থিত ছিল। কুরু ও বৎসের মাঝে ছিল চেদি রাজ্য। অর্থাৎ আধুনিক বুন্দেলখন্ড এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চল মিলে ছিল চেদি রাজ্য। চেতিয়া জাতক অনুযায়ী চেদি রাজ্যের রাজধানী শহর ছিল সোত্থিবতিনগর। আবার এর রাজধানী হিসেবে শুক্তিমতী বা শুক্তিসহব্যর নামও মহাভারতে পাওয়া যায়। চেদি রাজ্যের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শহরের মধ্যে রয়েছে সহজাতি এবং ত্রিপুরী।
এলাহাবাদ থেকে দশ মাইল দূরে ভিটা নামক স্থানে পাওয়া
পোড়ামাটির সিলের ওপরে থাকা চিহ্নের ভিত্তিতে একে চেদি রাজ্যের একটি বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। চেদি রাজ্যকে কোনো কোনো স্থানে রত্থ হিসেবে বলা হয়েছে। অঙ্গুত্তর নিকায় গ্রন্থে আমরা দেখতে পাই যে মহাচুন্দ নামের ভিক্ষু চেদি রাজ্যের সহজাতি শহরে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার করেছিলেন। উড়িষ্যার খারভেলার হাতিগুম্ফা শিলালিপি থেকে জানা যায় যে চেদি বংশের একটি শাখা সেখানে গিয়ে রাজত্ব স্থাপন করেছিল।
বৎস-বৎস বা বংশ রাজ্যের অবস্থান ছিল গঙ্গা–যমুনার দোয়াব অঞ্চলে (আধুনিক এলাহাবাদের কাছাকাছি)। কোশল রাজ্যের দক্ষিণে ও অবন্তীর উত্তরে অবস্থিত বৎস রাজ্যের প্রতিবেশী ছিলেন চেদিরা। সূক্ষ্ম সুতিবস্ত্র উৎপাদনের জন্য বৎস বিখ্যাত ছিল। বৎস রাজ্যের রাজধানীর নাম ছিল কৌশাম্বী। যমুনার ডান তীরে অবস্থিত আজকের কোসাম গ্রামের স্থানে ছিল সেই প্রাচীন নগরী। কিংবদন্তি বলে যে বৎসের রাজা উদয়ন এবং অবন্তীর রাজা প্রদ্যোতের মধ্যে ভীষণ শত্রুতা ছিল। প্রদ্যোতের কন্যা ছিল বাসবদত্তা। রাজা উদয়ন ভালোবেসে ফেলেন বাসবদত্তাকে এবং একের পর এক দুঃসাহসিক কাজ এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে, উদয়ন অবশেষে বাসবদত্তাকে বিবাহ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। অঙ্গ ও মগধের রাজ পরিবারদের সঙ্গেও উদয়ন বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন বলে মনে হয়।
কুরু-বৌদ্ধ গ্রন্থগুলি বলে, যুধিথিলা গোত্তের রাজারা কুরু রাজ্য শাসন করত রাজধানী ইন্দাপট্ট থেকে- অর্থাৎ ইন্দ্রপ্রস্থ থেকে যুধিষ্ঠিরের বংশ। বুদ্ধের সময়ে কুরু রাজ্যের বোলবোলাও মহাভারতে যেমন দেখা যায় তার ধারে কাছেও ছিল না। তখন সেটি ছিল কোরাব্য নামের একজন গোষ্ঠীপতি দ্বারা শাসিত একটি ক্ষুদ্র রাজ্য যার তেমন কোনো রাজনৈতিক শক্তি ছিল না। জাতকে যুধিষ্ঠিরের বংশের এক রাজা হিসেবে ধনঞ্জয়ের নাম পাওয়া যায় যিনি হয়তো কুরু রাজ্যেরই শাসক ছিলেন। জৈন উত্তরাধ্যায়ণ সূত্রে বলছে যে ইষুকার (তির নির্মাতা) নামে একজন রাজা কুরু রাজ্য শাসন করতেন। যাদব, ভোজ এবং পাঞ্চালদের সঙ্গে কুরুরা বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিল। বুদ্ধের সময় পর্যন্ত, কুরুরা রাজতন্ত্র ছিল; পরবর্তীকালে, তারা একটি সঙ্ঘে পরিণত হয়ে গিয়েছিল।
পাঞ্চাল – পাঞ্চাল রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল রোহিলখণ্ড এলাকা এবং মধ্য দোয়াব অঞ্চলের কিছু অংশ। গঙ্গা নদী এই রাজ্যকে দুই ভাগে বিভক্ত করে প্রবাহিত হত। উত্তর পাঞ্চালের রাজধানী ছিল অহিচ্ছত্র যার অবস্থান হল বর্তমান উত্তর প্রদেশের বেরিলি জেলার রামনগর গ্রামে। দক্ষিণ পাঞ্চালের রাজধানী ছিল কাম্পিল্য যা অবস্থিত ছিল বর্তমান উত্তর প্রদেশের ফারুখাবাদ জেলার কম্পিল শহরের স্থানে। উত্তর পাঞ্চাল অঞ্চলটি মনে হয় কুরু এবং দক্ষিণ পাঞ্চালের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্বের কারণ ছিল এবং প্রায়শই এর দখল দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির মধ্যে পরিবর্তন হয়েছিল। পাঞ্চাল রাজ্যেরই অন্তর্গত ছিল অতীতের বিখ্যাত শহর কান্যকুব্জ বা কনৌজ। বেশ কিছু প্রাচীন গ্রন্থ যেমন রামায়ণ, মহা-উম্মগ্গ-জাতক, উত্তরাধ্যায়ন সূত্র, স্বপ্ন-বাসবদত্তা-তে চুলানি ব্রহ্মদত্ত নামে পাঞ্চাল রাজ্যের এক রাজার উল্লেখ আছে। অর্থশাস্ত্র অনুসারে, পরবর্তীকালে পাঞ্চালরা একটি গোষ্ঠীতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় চলে গেছে বলে মনে হয়।
মৎস্য – রাজস্থানের জয়পুর, আলওয়ার এবং ভরতপুর জেলার অনেকটা অঞ্চল জুড়ে মৎস্যদের রাজত্ব বিস্তৃত ছিল। ইন্দ্রপ্রস্থের দক্ষিণ বা দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং শূরসেনের দক্ষিণে ছিল মৎস্য দেশ। রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা রাজা বিরাটের নামানুসারে তাদের রাজধানী ছিল বিরাটনগর যা আজকের বৈরাট জনপদ। বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থগুলি মৎস্যদের সাধারণত শূরসেনদের সঙ্গে উল্লেখ করে থাকে। বিদুর পণ্ডিত জাতক বলেছে যে পুন্নাক (সংস্কৃত নাম পূর্ণক) এবং কুরুর রাজার মধ্যে পাশার খেলার সময় মৎস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
শূরসেন – মৎস্যদের মহাজনপদের সঙ্গে উল্লেখ করা হত শূরসেনদের। শূরসেনের অবস্থান ছিল কুরু মহাজনপদের দক্ষিণে যা আজকের উত্তর প্রদেশের মথুরা-আগ্রা অঞ্চল এবং তার সন্নিহিত রাজস্থানের ভরতপুর ও সওয়াই মাধোপুরের মধ্যবর্তী এলাকা জুড়ে ছিল। শূরসেনদের রাজধানী ছিল যমুনার তীরে মথুরায় (মধুরা নামেও পরিচিত)। অনেক সময় এই শহরকে উত্তরমধুরা বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। বৌদ্ধ গ্রন্থে বলা হয়েছে যে শূরসেনদের রাজা অবন্তিপুত্র ছিলেন বুদ্ধের শিষ্য। এই রাজার নামের আক্ষরিক অর্থ হল ‘অবন্তীর পুত্র’ যা বোঝাচ্ছে যে শূরসেন এবং
অবন্তীর মধ্যে একটি বৈবাহিক সম্পর্ক হয়তো তৈরি হয়েছিল। মথুরা অঞ্চলের শাসকদেরকে মহাভারত এবং পুরাণে যদু বা যাদব বলে উল্লেখ করেছে
, যাদের অন্তর্ভুক্ত ছিল বৃষ্ণিরা। কৃষ্ণের জন্ম হয়েছিল এই গোষ্ঠীতেই। মধুরা সম্ভবত মঝ্ঝিমদেসের একমাত্র শহর যার সম্পর্কে বুদ্ধ কিছুটা অপ্রীতিকর মন্তব্য করেছিলেন। বুদ্ধের মতে, এই শহরে খুব বেশি ধুলো, এবড়োখেবড়ো মাটি, অনেক কুকুর ও পাশবিক দোষযুক্ত যক্ষ ছিল এবং সেখানে ভিক্ষার অভাব ছিল। অনেকেই মনে করেন যে মথুরায় জৈন আধিপত্যের কারণে এমন মন্তব্য করা হয়েছিল।
অস্মক – অষ্টাধ্যায়ী, মার্কন্ডেয় পুরাণ, বৃহৎসংহিতা এবং গ্রীক বিবরণগুলি থেকে বোঝা যায় যে অস্মক/অশ্মক/অশ্বক রাজ্য উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত ছিল। আবার বৌদ্ধ গ্রন্থের অস্মক নিশ্চিতভাবে গোদাবরী নদীর ওপর অবস্থিত ছিল। বৌদ্ধ অস্মক রাজ্যের রাজধানী ছিল পোটানা/পোদানা বা পোটালি, যার অবস্থান ছিল এখনকার তেলেঙ্গানা রাজ্যের বোধন শহরে। অস্মক রাজ্যের প্রতিবেশি রাজ্য ছিল মুলকা বা অলকা যার রাজধানী ছিল আজকের পৈঠান শহর, তখন যার নাম ছিল প্রতিষ্ঠান। দুই রাজ্যের মাঝখানে প্রবাহিত হত গোদাবরী নদী। জাতক কাহিনি থেকে জানা যায় যে অস্মক হয়তো কোনো এক সময়ে কাশীর অধীনস্থ হয়েছিল এবং অস্মক কখনও কলিঙ্গ জয় করেছিল।
অবন্তী – মধ্য ভারতের মালব অঞ্চলে ছিল অবন্তী মহাজনপদ। বিন্ধ্য পর্বত রাজ্যটিকে উত্তর এবং দক্ষিণ অংশে বিভক্ত করে রেখেছিল। এই রাজ্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ শহর ছিল মাহিষ্মতী যা আজকের মহেশ্বর এবং উজ্জয়িনী। প্রাচীন গ্রন্থগুলিতে অবন্তীর রাজধানী হিসেবে এই দুই শহরেরই নাম পাওয়া যায়। অবন্তীর এই দুটি শহরের অবস্থান ছিল ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ কারণ উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের বাণিজ্যপথ এবং পশ্চিম উপকূলের বন্দরগুলির সঙ্গে সংযোগ রক্ষাকারী পথগুলি এই দুই শহর হয়েই গিয়েছিল। প্রদ্যোত ছিলেন অবন্তীর একজন বিখ্যাত রাজা, যাঁর রাজত্বকালে বৎস, মগধ এবং কোশলের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল অবন্তী।
গান্ধার – গান্ধার রাজ্য পাকিস্তানের আধুনিক পেশোয়ার এবং রাওয়ালপিন্ডি জেলা এবং কাশ্মীর উপত্যকা নিয়ে গঠিত। কাশ্মীর-গান্ধার হিসেবে দুই দেশকে সবসময় একসঙ্গে উল্লেখ করা হত। গান্ধারের রাজধানী তক্ষশীলা (তক্ষশিলা) ছিল শিক্ষার একটি প্রধান কেন্দ্র। বাণিজ্যের জন্যেও তক্ষশীলার গুরুত্ব ছিল। বুদ্ধের সমকালীন সময়ে গান্ধারের রাজা ছিলেন রাজা পুক্কুসাতি বা পুষ্করসারিন। তিনি অবন্তীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জয়লাভ করেছিলেন এবং মগধের রাজা বিম্বিসারের সঙ্গে তার সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। আখিমেনিড সম্রাট দারিয়ুসের বেহিসতান শিলালেখ অনুযায়ী সাধারণ পূর্বাব্দের ৬ষ্ঠ শতাব্দীর শেষের দিকে গান্ধার পারস্যের অধিকারে আসে।
কম্বোজ – প্রাচীন গ্রন্থ এবং শিলালিপিগুলিতে অনেকাংশেই গান্ধার রাজ্যের সঙ্গে কম্বোজ রাজ্যের উল্লেখ আছে। মঝ্ঝিমদেস পার হয়ে উত্তরাপথের অন্তর্গত ছিল গান্ধার ও কম্বোজ। কম্বোজরা ছিল ইরানের মানুষ যারা ভারতীয় ভূখণ্ডের সীমান্তবর্তী ইরানি উপজাতি সমৃদ্ধ অঞ্চলে কম্বোজ রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেছিল। পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের হাজারা জেলা থেকে সম্ভবত কাফিরিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এই রাজ্য। প্রধান ভারতীয় মহাকাব্য মহাভারতে গ্রীক, গান্ধার, ব্যাক্ট্রিয়ান এবং ইন্দো-সিথিয়ানদের পাশাপাশি কম্বোজদেরও উল্লেখ রয়েছে। অঙ্গুত্তর নিকায় বুদ্ধের জীবদ্দশায় ভারতীয় উপমহাদেশের ষোলটি মহাজনপদের মধ্যে কম্বোজদের অন্তর্ভুক্ত করেছে। তাদের রাজধানী ছিল রাজাপুর বা রাজাপুরম (অর্থাৎ ‘রাজার শহর’) কিন্তু এর অবস্থান কোথায় ছিল তা এখনও জানা সম্ভব হয়নি। ইরানিদের মতোই, কম্বোজরা ঘোড়ার প্রজননে দক্ষ ছিল এবং এটা মানা হত যে যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ছিল তাদের ঘোড়া। বুদ্ধের সময়ে কম্বোজে রাজতন্ত্র থাকলেও পরবর্তীকালে সম্ভবত সেখানে প্রশাসনিক ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়েছিল কারণ অর্থশাস্ত্রে তাদের একটি সঙ্ঘ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বুদ্ধের সময়কালে উল্লিখিত ষোড়শ মহাজনপদ নিয়ে সংক্ষিপ্ত আকারে আলোচনা আমাদের সারা হল। এবারে আমরা আরও কয়েকটি রাজ্য নিয়ে আলোচনা করব যারা ষোড়শ মহাজনপদের অন্তর্গত না হলেও বুদ্ধের সময়কালের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল।
লিচ্ছবি – বুদ্ধের সময়কালে লিচ্ছবিরা বজ্জি মহাসঙ্ঘের (confedaration) অন্তর্গত একটি শক্তিশালী রাজ্য ছিল। বুদ্ধের মতোই লিচ্ছবিরা ক্ষত্রিয় ছিলেন বলে বুদ্ধের দেহাবসানের পর লিচ্ছবিরা তাঁর দেহাস্থি-র অংশ দাবি করেছিল। কোশলের রাজা প্রসেনজিতের সঙ্গে লিচ্ছবিদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল বলেই মনে হয়। অন্য দিকে লিচ্ছবি আর মগধ রাজ্যের সম্পর্ক মোটেই বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল না।
মগধের রাজা অজাতশত্রুর একটি বড়ো সাফল্য ছিল লিচ্ছবিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তাঁর বিজয়। লিচ্ছবিরা গণ বা সঙ্ঘ রাজ্য ছিল যেখানে এক বা কয়েকজনের পরিবর্তে জনগণের থেকে প্রেরিত প্রতিনিধির মাধ্যমে রাষ্ট্রের শাসনকার্য চলত। বুদ্ধের সময়ে লিচ্ছবি রাজ্য ছিল বৃহত্তম প্রজাতন্ত্র। তাদের রাজধানী ছিল বর্তমানের বিহারের বৈশালী এবং আদতে তারা বজ্জি জোটের (confederacy) অংশ ছিল।
বিদেহ – বজ্জি মহাসঙ্ঘের (confedaration) অন্তর্গত আরেক শক্তিশালী জনপদ বিদেহ-র সীমানা ছিল পশ্চিমে সদানিরা নদী, পূর্বে কৌশিকী নদী, দক্ষিণে গঙ্গা নদী এবং উত্তরে হিমালয় পর্বতমালা। সদানিরা নদীর পশ্চিমে, বৈদেহদের প্রতিবেশি ছিল কোশল রাজ্য। বিদেহর রাজধানী ছিল মিথিলা। বিদেহর জনগণকে বৈদেহ বলা হত। বিদেহ প্রথমে একটি রাজতন্ত্র হিসেবে গঠিত হয়েছিল কিন্তু পরে একটি গণসঙ্ঘে (গোষ্ঠীতান্ত্রিক) রূপান্তরিত হয় যা বজ্জি জোটের এক অংশ হিসেবে বিদেহ প্রজাতন্ত্র নামে পরিচিত ছিল। বিদেহ প্রজাতন্ত্রের পরিধি ছিল প্রায় সাত যোজন।
শাক্য – বুদ্ধের জন্ম শাক্য বংশে না হলে রাজনৈতিক ভাবে শাক্য বংশ কতোখানি গুরুত্ব পেত সেই নিয়ে সন্দেহ আছে। শাক্যদের মধ্যে সম্ভবত অনেকগুলি গোষ্ঠী (clan) বা গোত্ত (গোত্র) ছিল। বুদ্ধ নিজেই গোতমগোত্তের অন্তর্গত ছিলেন। সাধারণ পূর্বাব্দের ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষ ভাগে শাক্যরা কোশলের অধীনে চলে আসে। শেষে তো কোশলের রাজা প্রসেনজিতের পুত্র বিরূঢ়ক শাক্য বংশে হত্যালীলা চালিয়ে ধ্বংস করে দেন। শাক্যরা বলতেন যে তাঁরা নাকি সূর্যকূলের ইক্ষ্বাকু বংশের অন্তর্গত আর নিজেদের কোশলের ভূমিপুত্র বলে পরিচয় দিতেন, আর সেই কারণেই কোশলের রাজা প্রসেনজিত নিজেকে গৌতম বুদ্ধের সহ-নাগরিক বলে উল্লেখ করতেন। শাক্য রাজ্যের উত্তরে ছিল হিমালয়, পূর্বে রোহিণী নদী, দক্ষিণে ও পশ্চিমে রাপ্তি নদী আর তাদের রাজধানী ছিল কপিলাবস্তু। কপিলাবস্তুর অবস্থান ঠিক কথায় ছিল সেই নিয়ে সংশয় আছে। নেপালের তিলৌরাকোট এবং ভারতের পিপরাওয়া স্থানদুটি কপিলাবস্তু হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে আছে যা নিয়ে আমরা আলোচনা করব। রাজধানী কপিলাবস্তু ছাড়াও শাক্যদের বেশ কয়েকটি বৃহৎ জনপদের নাম পাওয়া যায় যার মধ্যে নয়টির নাম বৌদ্ধ গ্রন্থে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, কাতুমা (Catuma), খোমদুস্স (Khomadussa), সমাগম (Samagama), দেবদহ (Devadaha), শীলাবতী (Silavati), নগরক (Nagaraka), মেদাতালুম্প (Medatalumpa), সাক্ষার (Sakkhara) ও উলুম্পা (Ulumpa) [Law: 1937, 183]। পালি গ্রন্থগুলিতে শাক্যদের অন্তত পাঁচটি নিগম(বাজার)-এর উল্লেখ রয়েছে। শাক্যরা আশি হাজার পরিবার নিয়ে গঠিত ছিল বলে বলা হয় যার অর্থ দাঁড়ায় যে শাক্যদের জনসংখ্যা প্রায় পাঁচ লক্ষের মতো ছিল। অনেক স্থানে বলা হয়েছে যে শাক্যরা ছিল উদ্ধত জাতি। শাক্যরা খেলাধুলার প্রতি খুব অনুরাগী ছিল এবং একটি ভেদনা নামক তিরন্দাজি শেখানোর বিদ্যালয়ের উল্লেখ আছে। সিদ্ধার্থকেও জ্ঞানের পরীক্ষার পাশাপাশি খেলাধুলাতেও দক্ষতা দেখিয়ে তবেই যশোধরাকে লাভ করতে হয়।
আবার তিব্বতীয় বৌদ্ধধর্মের চারটি প্রধান দর্শনের শাখার মধ্যে একটির নাম শাক্য। শাক্য (Sa’gya) নামে তিব্বতের একটি শহরও আছে। অতীশ দীপঙ্কর এই শহরের মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন। এই শহরে আছে শাক্য মঠ। খোন খোনচক গ্যালপো ৪১৩ সাধারণ অব্দে শাক্য মঠ নির্মাণ করেছিলেন। মঠটিকে তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের
শাক্য (বা শাক্যপা) দর্শনের প্রধান পীঠ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। ১৩শ ও ১৪শ শতাব্দীতে তিব্বত সাম্রাজ্যের পতনের পর তিব্বত চলে গিয়েছিল মঙ্গোল ইউয়ান রাজবংশের অধীনে। এই সময় প্রকারান্তে শাক্য লামারা তিব্বতের শাসক হয়ে গিয়েছিলেন যতক্ষণ না কাগ্যু এবং গেলুগ নামক তিব্বতি বৌদ্ধ ধর্ম-দর্শনের অন্য শাখাগুলির উত্থান হয়ে তারা শাক্যদের হটিয়ে দেয়।
কোলিয় – রামগ্রামের কোলিয়দের রাজত্ব ছিল শাক্যদের পূর্বে, রোহিণী নদী পার হয়ে। রোহিণী নদীর জল উভয় রাজ্যই সেচের জন্যে ব্যবহার করত এবং তা নিয়ে দুই রাজ্যের মধ্যে কখনও কখনও ঝঞ্ঝাট এসে উপস্থিত হত। এমনই এক বিবাদের ঘটনায় উল্লেখ আছে যে কোলিয়রা শাক্যদের বিদ্রুপ করে বলেছে যে শাক্যরা নাকি নিজের বোনকে বিবাহ করে। অনেক গ্রন্থের মতে শাক্য ও কোলিয়দের মধ্যে রক্তের সম্পর্ক ছিল।
ভগ্গ – ভগ্গদের রাজ্য ছিল গঙ্গা ও যমুনার মাঝখানে। ভগ্গদের উত্তরের প্রতিবেশি রাজ্য ছিল কোশল। সংস্কৃত সাহিত্যে উল্লিখিত ভর্গ জাতিগোষ্ঠীর পালি নাম হল ভগ্গস বা ভগ্গ। মহাভারত এবং হরিবংশ অনুযায়ী বৎস এবং ভর্গদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ভগ্গরা ছিল বৎস রাজ্যের ওপর নির্ভরশীল এবং, হয়তো তাদেরই অধীনে একটি অঞ্চল যার শাসনের অনেকটাই ছিল বৎসের নিয়ন্ত্রণে। সম্পূর্ণ সার্বভৌম না হলেও ভগ্গদের একটি প্রজাতন্ত্র হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছিল। বৎসের একজন রাজকুমার ভগ্গ রাজ্যের রাজধানী শিশুমারগিরিতে বৎস রাজার প্রতিনিধি রূপে থাকতেন। বোধি লাভের কিছু পরেই বুদ্ধ তাঁর ধর্মপ্রচারের কারণে ভগ্গ রাজ্যে এসেছিলেন। কোনো কোনো পণ্ডিতের মতে শিশুমারগিরি হল চুনার দুর্গ।
মৌর্য – দীঘ নিকায়, মহাবংশ এবং দিব্যাবদানের মতো বৌদ্ধ গ্রন্থে, মৌর্যদের মোরিয় বা মৌর্য নামক ক্ষত্রিয় বংশের অন্তর্গত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গোষ্ঠীতন্ত্র অনুসরণ করা প্রজাতন্ত্র ছিল মৌর্য রাজ্য। মৌর্য রাজ্য ছিল কোশলের উত্তর-পূর্বে। তাদের পশ্চিমের প্রতিবেশি ছিল কোলিয়রা। পূর্বে ছিল মল্ল রাজ্য এবং সরযূ নদী ছিল তাদের দক্ষিণ সীমান্ত। মৌর্যদের রাজধানী ছিল পিপ্পলিবন। চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ তাঁর লেখায় পিপ্পলিবনকে ন্যগ্রোধবন (বটগাছের বন) নামে উল্লেখ করেছিলেন।
মল্ল (পাওয়া[Pawa]) – পাওয়া-র মল্লরা ‘পাবেয়ক-মল্ল’ নামে পরিচিত ছিল। দীঘ নিকায়-এর সঙ্গীত সুত্তে, বুদ্ধ তাদের ভাসেষ্ঠা (অর্থাৎ বশিষ্ঠ গোত্রীয়) বলে সম্বোধন করেছিলেন। জৈন কল্পসূত্র গ্রন্থে ‘পাওয়া’-র বিশদ উল্লেখ করা হয়েছে কারণ পাওয়ার ষষ্ঠীপাল মল্ল(হস্তিপাল মল্ল)-র প্রাসাদে থাকার সময় মহাবীর নির্বাণ লাভ করেছিলেন। আবার পাওয়াতেই চুন্দ কর্মকারের বাড়িতে বুদ্ধ তাঁর শেষ খাবার খেয়েছিলেন। বর্তমান সময়ে এর অবস্থান নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। কেউ কেউ এটিকে উত্তরপ্রদেশের কুশিনগর জেলার চেতিয়াওঁ কিংবা ফাজিলনগর হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। আবার কেউ কেউ এটিকে বিহারের পাটনার রাজগীরের কাছে পাওয়াপুরী বলে মনে করেন। বৈশালীর বজ্জি বা লিচ্ছবি জোটের অংশ হয়ে পাওয়ার মল্লরা মগধের বিরোধিতা করেছিলেন এবং অজাতশত্রুর হাতে পরাজিত হয়ে মগধের অধীনে চলে আসে।
কালাম – কালাম নামটির উৎপত্তি সম্ভবত কোনো গোষ্ঠী, গোত্র বা পরিবার থেকে। এঁরা ক্ষত্রিয়। রাজধানী ছিল গাঙ্গেয় সমভূমিতর কেসাপুত্তা (কেশপুত্র) নামক স্থানে। কালাম রাজ্যের উত্তরে ছিল সরযূ নদী ও মল্লদের রাজ্য, দক্ষিণে গঙ্গা, দক্ষিণ-পশ্চিমে বারাণসী এবং পশ্চিমে কোশল রাজ্য। কালামদের অঞ্চল শুধুমাত্র কেসাপুত্তা শহর ও তার চারপাশের গ্রামাঞ্চল জুড়ে ছিল। বুদ্ধের সময়কালে, কালামরা বোধহয় কোশলের রাজা প্রসেনজিতের অধীনে ছিল এবং বুদ্ধ তাঁর ধর্মপ্রচারের সময় এই রাজ্যে ঘুরে গিয়েছিলেন। বুদ্ধের একজন শিক্ষক ছিলেন আলারা কালাম যিনি এই জাতির মানুষ ছিলেন। আবার, বুদ্ধের শিষ্য ছিলেন ভরণ্ডু কালাম।
বুলি – অল্লকপ্প প্রাচীন ভারতের মঝ্ঝিমদেসে অবস্থিত একটি প্রজাতন্ত্রী রাজ্যের নাম। এর অধিবাসীদের বুলি বা বুলায়া বলে পরিচিত ছিল। বুদ্ধের সময়কালীন রাজনীতিতে এই রাজ্যের তেমন কোনো গুরুত্ব ছিল বলে মনে হয় না কারণ পালি সাহিত্যে বুলি সম্পর্কিত উপাদান খুবই নগণ্য। মহাপরিনির্বাণ সূত্র বলছে যে, বুদ্ধের নির্বাণের পর বুলিরা তাঁর দেহাবশেষের একটি অংশ পেয়েছিলেন এবং তাঁরা তার ওপরে একটি স্তূপও নির্মাণ করেছিলেন।
নয়া – নয়াদের প্রজাতন্ত্র, যাকে প্রায়ই নয়া-ক্ষত্রিয় বা জনতা-ক্ষত্রিয় হিসাবে উল্লেখ করা হয়। নয়ারা ছিলেন লিচ্ছবিদের খুব ঘনিষ্ঠ এবং বজ্জি জোটের অন্তর্গত। নয়াদের রাজ্য সম্পর্কে জানা যায় যে সেটি ছিল বৈশালীর উত্তর-পূর্বে অবস্থিত একটি ছোটো অঞ্চল আর এর রাজধানীর নাম ছিল কুণ্ডপুর বা কুণ্ডলপুর। নয়া রাজ্য আদতে বজ্জিদের শাসনাধীন একটি অঞ্চল হতে পারে। নয়াদের সম্পর্কে খুবই কম লেখা হয়েছে আর যেটুকু হয়েছে তাও জৈন গ্রন্থে কারণ জৈনদের শেষ তীর্থঙ্কর মহাবীরের জন্ম হয়েছিল নয়া ক্ষত্রিয় বংশে।
ভারতের ইতিহাসে ৬০০ থেকে ৩০০ সাধারণ পূর্বাব্দ পর্যন্ত ব্যাপ্ত থাকা তিনশো বছর সময়কালকে ‘দ্বিতীয় নগরায়ণ’ নামে বলা হয়ে থাকে। প্রথম নগরায়ণ নিঃসন্দেহে সিন্ধু সভ্যতা যেখানে ইটের তৈরি সুপরিকল্পিত নগরের গঠন দেখা গিয়েছিল। সিন্ধু সভ্যতার প্রায় এক হাজার বছর পর সাধারণ পূর্বাব্দের ষষ্ঠ শতাব্দীর নাগাদ আবার আমরা শহর এবং নগর জীবন আবির্ভূত হল তা দেখতে পেলাম আর সে সম্ভব হয়েছিল ষোড়শ মহাজনপদের সময়কালে। নগরায়নের এই দ্বিতীয় পর্বের ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটে অনেকটাই বদলে গিয়েছিল। প্রথম নগরায়ণ ছিল সিন্ধু–ঘগ্গর নদীর অববাহিকা জুড়ে। সেখান থেকে দ্বিতীয় নগরায়ণে স্থান পরিবর্তন হয়ে চলে আসে গঙ্গা নদীর অববাহিকায়, যা একটি লক্ষ্যণীয় পরিবর্তন ছিল। মহাজনপদের সময়ে শহর ও শহরের উত্থান সবসময় একই পথ ধরে কিছু শহর, যেমন হস্তিনাপুর, রাজগৃহ, শ্রাবস্তী, কৌশাম্বী ইত্যাদি একদম রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসাবে গড়ে উঠেছিল। এগুলিকে সেই যুগের ক্ষমতার কেন্দ্র বলা যেতে পারে। অন্যদিকে বাকি শহরগুলি ছিল বাণিজ্যের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ এক একটি কেন্দ্র। এগুলির অবস্থান ছিল এক দেশ থেকে অন্য দেশে চলে যাওয়া বাণিজ্য পথের ওপরে যেখানে বিভিন্ন দ্রব্যের আদানপ্রদান হত বিশেষত লবণ ও শস্য। আবার কোনো কোনো শহর ছিল দামি পণ্যের ব্যবসার ঘাঁটি, যেমন উজ্জয়িনী। কোনো শহর ধর্মের দৃষ্টিতে পবিত্র ছিল আর তার ফলে মানুষ সেখানে তীর্থের কারণে বা আচার পালনে যেত যেমন বারাণসী, উজ্জয়িনী ইত্যাদি।
বিভিন্ন গ্রন্থের লেখাপত্রগুলি দেখে বোঝা যায় যে প্রায়শই বিভিন্ন শিল্প, যেমন, ধাতু, মৃৎশিল্প, দারুশিল্প, তাঁত ইত্যাদি পেশায় যুক্ত মানুষদের একাধিক গ্রাম যুক্ত হয়ে এই সব শহরগুলির বীজ বপন করে দিয়েছিল। শিল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকা কারিগররা সবসময় এমন কোনো জায়গায় বসতি তৈরি করে বা অন্যান্য স্থান থেকে সেই স্থানে এসে জড়ো হয় যেখানে তার শিল্পের উপযুক্ত কাঁচামাল ও বিক্রি করার বাজার আছে। ক্রমশ জনপদের ঘনত্ব ও বিস্তার বেড়ে তা শহরের রূপ নেয় এবং একটি বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে পরিগণিত হয়। বৈশালী, শ্রাবস্তী, চম্পা, রাজগৃহ, কৌশাম্বী এবং কাশীর মতো শহরগুলি এই ধরনের বাণিজ্যিক কেন্দ্রের উদাহরণ। আবার বাণিজ্যকে সুষ্ঠুভাবে চালানোর কারণে আরও কিছু জনপদের পত্তন হয়। এইভাবে উজ্জয়িনী, তক্ষশীলা এবং ভারুচ বন্দরের মতো শহরগুলি গঙ্গা সমভূমির বাইরে ভৌগোলিক প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে উঠেছিল। এইভাবে, আমরা দেখতে পাই যে বিভিন্ন কারণে এই সমস্ত শহরগুলির উত্থান হয়েছিল, কখনও রাজনৈতিক শক্তিকেন্দ্র হিসেবে, কখনও বাণিজ্যের কারণে আবার কখনও শিল্পের কেন্দ্র হিসেবে আবার কখনও এমন দুই তিনটি কারণ এক সঙ্গে মিলেমিশে গিয়ে।
ষোড়শ মহাজনপদের অনেকগুলি বসতি চিহ্নিত করে সেগুলিকে খননের আওতায় আনা হয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিক খননে তখনকার নগর পরিকল্পনার রকম-সকম জানা গেছে। দেখা গেছে যে শহরটিকে সুরক্ষিত করার জন্যে প্রায়শই একটি পরিখা বা প্রাচীর দ্বারা ঘিরে রাখা হত। কখনও মাটি জমাট করে বেঁধে প্রাচীর বানানো হত যেমন পাওয়া গেছে রাজঘাটে আবার কখনও কৌশাম্বীর মতো ইট দিয়ে প্রাকার তৈরি করা হয়েছিল। শুধুমাত্র শত্রুর আক্রমণ থেকে বাঁচা নয়, এমন মজবুত প্রাচীর শহরগুলিকে পাশের নদীর বন্যার জল থেকেও রক্ষা করত।
আমাদের মনে প্রশ্ন আসতে পারে যে শহরের এতটা সুরক্ষার প্রয়োজন কেন হত। সেই সময়ের শহরগুলি শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক কেন্দ্রই ছিল না, আশপাশের বিস্তৃত অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা রাজস্ব সেখানকার কোষাগারে জমা থাকত। সম্পদ থাকলেই তাকে রক্ষা করার জন্যে প্রতিরক্ষা কাঠামোর প্রয়োজন হয়ে পড়ে। আমি আগেই বলেছি যে শহরগুলি এক একটি বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করত আর তাই সেখানে বাণিজ্যের কারণে আমদানি ও রপ্তানি করা পণ্যের ওপরে কর আদায় করা হত। শহরকে যদি নিশ্ছিদ্র প্রাচীর দিয়ে না মুড়ে ফেলা যায় তাহলে তো যেখান–সেখান দিয়ে বণিকেরা কর ফাঁকি দিয়ে পালাবে। তাই প্রবেশদ্বার দেওয়া প্রাচীর হত আর সেই দ্বারে রাজকর্মচারী করের পাওনা বুঝে নিতেন। খননের ফলে আমরা নগরায়ণের অন্যান্য বৈশিষ্ট্যও দেখতে পেয়েছি যেমন ধরুন পোড়া ইট, পয়ঃপ্রণালী, গোলাকার বেড় দেওয়া কুয়ো, উঠোন দেওয়া বাড়ি, বাঁধানো রাস্তা, দোকানঘর ইত্যাদি।
এমন সব ব্যবস্থা সিন্ধু সভ্যতার নগরেও দেখা গেলেও এখানকার চরিত্র ছিল কিছুটা আলাদা। ষোড়শ মহাজনপদের সময়কালে ঘটা নগরায়ণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য হল এই সময়কালের সঙ্গে যুক্ত থাকা এক ধরনের বিশেষ মৃৎপাত্র যার নাম উত্তরের মসৃণ কৃষ্ণপাত্র (NBPW)।
এই সময়ের ঐতিহাসিক শহরগুলিতে অধিকাংশ প্রত্নতাত্ত্বিক খনন থেকে দেখা যায় যে উত্তরের মসৃণ কৃষ্ণপাত্র যেন দ্বিতীয় নগরায়ণের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে ছিল। দিল্লীর পুরনো কেল্লাতে খনন করে সাধারণ পূর্বাব্দের ৪র্থ-৩য় শতাব্দীর সময়কালের উত্তরের মসৃণ কৃষ্ণপাত্র পাওয়া গিয়েছে। একইভাবে, হস্তিনাপুরের ৩য় পর্যায়ের স্তর থেকে সুপরিকল্পিত নগরের অবশেষ, পোড়া ইটের স্থাপত্য, বেড় দেওয়া কুয়ো পাওয়া গেছে, আর পাওয়া গেছে উত্তরের মসৃণ কৃষ্ণপাত্র।


