শাক্যবংশ ধ্বংস হল কীভাবে
যুবরাজ সিদ্ধার্থ মাত্র ২৯ বছর বয়সে সত্যের সন্ধান করতে কপিলাবস্তু নগর ত্যাগ করেছিলেন এবং তপস্যা করে বোধি লাভ করেন। বোধি লাভ করে বুদ্ধ হওয়ার পর তিনি আর কপিলাবস্তুতে বসবাস করতে ফিরে আসেননি। বুদ্ধদেবের জীবদ্দশায় শাক্য বংশ ধ্বংস হয়ে যায়। কথিত আছে যে কোশলের রাজা প্রসেনজিতের পুত্র বিরূঢ়ক হত্যালীলা চালিয়ে শাক্য বংশ ধ্বংস করে দেন। সে ঘটনার বীজ লুকিয়ে আছে অনেক দিন আগের এক ষড়যন্ত্রের ভেতরে।
শাক্য রাজপুত্র সিদ্ধার্থ তখনও বুদ্ধ হয়ে ওঠেননি। তখন কোশলের রাজা ছিলেন প্রসেনজিত। একদিন প্রসেনজিত শাক্যদের রাজসভায় দূত পাঠিয়ে জানালেন যে তিনি কোনো শাক্য রাজকুমারীকে তাঁর মহিষী করে নিয়ে যেতে চান। শাক্যরা নিজেদের সম্পর্কে কোশলদের তুলনায় খুবই উচ্চ ধারণা পোষণ করতেন আর তাই কোশলরাজকে তাদের মেয়ে দিতে মোটেই আগ্রহী ছিলেন না। আবার এদিকে কোশল রাজ্য ছিল ভীষণ শক্তিশালী এক রাজ্য।
তাকে ফিরিয়ে দিলে ফল বিরূপ হবেই সুতরাং সেদিকেও ছিল বিপদ। তখন মহানাম নামে একজন অভিজাত শাক্য একটি পরিকল্পনার কথা বললেন। তাঁর ঘরে একটি সুন্দরী কন্যা ছিল যার নাম ছিল বাসবক্ষত্রিয়া। মেয়েটির মা ছিলেন মহানামের একজন দাসী যার নাম ছিল নাগমুন্ডা। তিনি সম্ভবত নাগ জাতির মানুষ ছিলেন। দাসীর কন্যা হলেও বাসবক্ষত্রিয়ার আচার ব্যবহার অভিজাতদের তুল্য ছিল। বাসবক্ষত্রিয়াকে নিয়ে তাঁরা এক ফন্দি আঁটলেন যে তাকে শাক্য
রাজকুমারী সাজিয়ে কোশল রাজার সঙ্গে বিবাহ সম্পন্ন করে দেওয়া হবে। রাজার সায় পেয়ে সেই মতো কাজ এগোতে লাগল। ।
.
বার্তা নিয়ে আসা কোশল রাজার দূতের যাতে কোনো সন্দেহ না হয় তার জন্যে একটি জবরদস্ত পরিকল্পনা করা হয়েছিল। দাস-দাসীদের সঙ্গে কেউ এক পাত্রে খাবার খেতেন না। বাসবক্ষত্রিয়াকে রাজকন্যা হিসেবে প্রমাণ করতে মহানাম ও বাসবক্ষত্রিয়া একসঙ্গে কোশলের দূতের সামনে খেতে বসেছিলেন। তারপর, শেষমুহূর্তে পরিকল্পনামাফিক মহানামকে এক জরুরি কাজ দেখিয়ে ডেকে আনার ব্যবস্থা করা হয়েছিল যাতে বাসবক্ষত্রিয়ার সঙ্গে তাঁকে একাসনে কিছু খেতে না হয়। কোশলের দূত এই ছলনা ধরতে পারেননি এবং বিশ্বাস করেছিলেন যে মেয়েটি আসলে একজন শাক্য রাজকন্যা।
বাসবক্ষত্রিয়াকে রাজকুমারী হিসেবে দেখিয়ে অর্থাৎ সম্পূর্ণ মিথ্যে কথা বলে কোশলরাজ প্রসেনজিতের সঙ্গে বিবাহ দিয়ে দেওয়া হল। এই প্রতারণার দাম শাক্যদের খুবই সাঙঘাতিক ভাবে পরিশোধ করতে হয়েছিল।
প্রসেনজিতের রানি হয়ে গেলেন বাসবক্ষত্রিয়া। দুজনেই ছিলেন বুদ্ধের ভক্ত। এঁদের কোল আলো করে এক পুত্রসন্তান জন্মাল। সন্তানের জন্মের পর রাজা তাঁর ঠাকুমার কাছে পছন্দসই নাম জানতে লোক পাঠালেন। বার্তা নিয়ে যাওয়া মানুষটি ছিলেন কানে একটু খাটো। কথায় কথায় ঠাকুমা বাসবক্ষত্রিয়া সম্বন্ধে বলেছিলেন যে তিনি রাজার ‘বল্লভ।’ কানে খাটো বার্তাবহ বল্লভ-কে শুনে বসলেন ‘বিডূডভ’ (পালি ভাষায়। সংস্কৃত ভাষ্যে তা ‘বিরূঢ়ক’) আর ভাবলেন যে সেটি পরিবারের কোনো পরম্পরাগত নাম হবে। তাই রাজপুত্রের নাম হয়ে গেল বিডূডভ(পালি ভাষ্য) কিংবা বিরূঢ়ক(সংস্কৃত পাঠান্তর)। রাজকুমার একটু বড়ো হতেই বারবার বায়না ধরত, মামার বাড়ি বেড়াতে যাবে। তার বয়সী অন্য বাচ্চাদের সে দেখেছে, মামার বাড়ি বেড়াতে গিয়ে সেখান থেকে কী সুন্দর সব উপহার নিয়ে আসে তারা। কিন্তু তার মা কিছুতেই রাজি হয় না। বাসবক্ষত্রিয়া তো সব বিষয়টাই জানে তাই সে কী করে এই ঝুঁকিটা নেয়! কিন্তু বিরূঢ়ক ষোল বছর হতে তাকে আর থামানো গেল না। এক বড়োসড়ো দল নিয়ে সে পৌঁছে গেল কপিলাবস্তু।
কপিলাবস্তুতে বিরূঢ়কের উপস্থিতি শাক্যদের কাছে ছিল বেশ অস্বস্তিকর। দাসীর পুত্র হলেও সে তখন কোশলের রাজকুমার। তাদের অবস্থা তখন ‘মান রাখি না কূল রাখি’ গোছের। যাইহোক শাক্যরা এক পরিকল্পনা ছকে বিরূঢ়কের চেয়ে বয়সে ছোটো সমস্ত বাচ্চাদের অন্য স্থানে সরিয়ে ফেলল যাতে তাদের বিরূঢ়ককে প্রণাম না করতে হয়। বাকি যারা রইল তাঁরা বিরূঢ়কের তুলনায় বয়সে বড়ো তাই গুরুজন হিসেবে বিরূঢ়ক তাদের প্রণাম করবে। এইভাবে দাসীপুত্রকে প্রণাম করার বিড়ম্বনা আটকানো গেলো। বিরূঢ়কের থাকার জন্যে একটি আলাদা বাড়িও রাখা হয়েছিল। সব ঠিকঠাক গেলেও যাওয়ার দিন ঘটে গিয়েছিল এক কাণ্ড। বিরূঢ়কের দলের একজন শুনে ফেলল একটি নির্দেশ যেখানে এক দাসীকে বলা হচ্ছে যে বিরূঢ়ক যাওয়ার পর তাঁর বসার স্থান যেন দুধ ও জল দিয়ে ধুয়ে শোধন করা হয়। বিরূঢ়ক বিষয়টি জানতে পারলেন এবং এতদিনের লুকিয়ে রাখা গোপন কথাটিও তাঁর অজানা রইল না। আরেক তথ্য মতে বিরূঢ়ক কপিলাবস্তুতে এসেছিলেন যখন বুদ্ধ তার গৃহত্যাগের দশ বছর পর তার পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে সেখানে এসেছিলেন। শাক্যরা বুদ্ধকে স্বাগত জানানোর জন্য একটি বিশাল, সুন্দর বেদি স্থাপন করে ফুল দিয়ে সেটিকে সাজিয়ে তুলেছিল। বিরূঢ়ক খেলতে খেলতে এই বেদির ওপরে উঠে যায়। বিরূঢ়ককে সেই পবিত্র বেদির ওপরে দেখে সকলে তাঁকে দাসীপুত্র বলে বের করে দিয়েছিল এবং বেদিকে নতুন করে রঙ করে শোধন করা হয়েছিল। আবার অনেকে বলেন যে বিরূঢ়ক ফিরে যাওয়ার সময় তাঁর দলবলের একজন দেখে যে সে তার বর্শা ভুলে রেখে এসেছে। বর্শা নিতে তিনি আবার কপিলাবস্তুতে ফিরে গিয়ে দেখেছিলেন যে দাসদাসীরা বিরূঢ়কের ব্যবহার করা সমস্ত আসবাবপত্র পরিষ্কার করছে। তাদের জিজ্ঞেস করতে সৈন্যটি আসল কারণ জানতে পেরেছিলেন যে বিরূঢ়কের মা আসলে একজন দাসী ছিলেন, রাজকন্যা ছিলেন না।
গোটা ঘটনায় বিরূঢ়ক ভীষণভাবে মানসিক আঘাত পান এবং শপথ নিয়েছিলেন যে তিনি এর উপযুক্ত প্রতিশোধ নেবেন। শোনা যায় যে বিরূঢ়কের মুখে পুরো ঘটনা শুনে রাজা প্রসেনজিত তাঁর রানি ও পুত্রের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করেছিলেন। দুজনকেই তিনি অন্তঃপুর থেকে বার করে দাসদাসীদের এলাকায় পাঠিয়ে দিয়েছিলেন কিন্তু পরে বুদ্ধের হস্তক্ষেপে তিনি তা শুধরে নেন। শাক্যদের থেকে পাওয়া মানসিক অশান্তির সঙ্গে যোগ হয়েছিল তার বাবার অপমান। এর ফলে বিরূঢ়কের অন্তরে শাক্যদের সঙ্গে তাঁর পিতা প্রসেনজিতের সম্পর্কেও একটি ঘৃণার জন্ম হয়েছিল।
এর অনেক বছর পর প্রসেনজিতের পাটরানি মল্লিকার মৃত্যু হলে রাজা খুবই ভেঙে পড়েন এবং আগের মতো আর রাজকার্যে মন দিতে পারেন না। তখন শ্রাবস্তীর দুর্নীতিগ্রস্ত অভিজাত ও মন্ত্রীরা সুযোগ নিতে শুরু করেন। এর মধ্যে একমাত্র রাজার সেনাপতি বন্ধুল রুখে দাঁড়ান। বন্ধুল ছিলেন কুশিনারা-মল্লদের একজন অভিজাত ব্যক্তির পুত্র। তিনি লিচ্ছবি রাজপুত্র মহালী ও প্রসেনজিতের সঙ্গে তক্ষশীলায় শিক্ষাগ্রহণ করেছিলেন। তক্ষশীলা থেকে নিজের দেশে ফিরে তিনি জানালেন যে তিনি মল্লবাসীদের বিশেষত অভিজাতদের সামনে তাঁর তরবারি কৌশল দেখাতে ইচ্ছুক। মল্লের অভিজাতরা তখন এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন। সেখানে ৬০ খানি করে বাঁশের লাঠির এক একটি আঁটি বেঁধে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বন্ধুল যদি তরবারির এক এক কোপে পুরো আঁটি কেটে ফেলতে পারেন তবেই তাঁকে ‘বীর’ বলে মানা হবে। অনুষ্ঠানের দিন প্রস্তুত হয়ে বন্ধুল তার তরবারি নিয়ে হাজির ছিলেন। অর্জিত জ্ঞানকে স্মরণ করে বাঘের মতো হাওয়ায় লাফ দিয়ে উঠে তরবারি দিয়ে একের পর এক আঘাত করলেন এক একটি বাঁশের আঁটিকে কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে বন্ধুল একটি লাঠির আঁটিও কাটতে সমর্থ হননি। ক্ষিপ্ত বন্ধুল তাঁর এই হার মানতে পারলেন না। তিনি তো এর তুলনায় অনেক কঠিন পরীক্ষা সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়ে এসেছেন। পরে বন্ধুল জানতে পেরেছিলেন যে তাঁর মানহানি করার জন্যে এক ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল। প্রত্যেকটি বাঁশের বাণ্ডিলের মধ্যে এক একটি লোহার শলাকা লুকিয়ে রাখা হয়েছিল আর তাই তিনি সেগুলিকে কাটতে অসমর্থ হয়েছিলেন। নিজের আত্মীয়দের বিশ্বাসঘাতক হিসেবে দেখতে পেয়ে রাগে বন্ধুল মল্লদের হত্যা করতে চাইলেন কিন্তু তাঁর পিতামাতা তাঁকে কোনো রকমে নিরস্ত করেছিলেন। অনেক দুঃখে বন্ধুল তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে গৃহত্যাগ করে বন্ধু প্রসেনজিতের কাছে শ্রাবস্তীতে চলে যান আর প্রসেনজিত এই কুশলী যোদ্ধাকে পেয়ে তাঁকে কোশলের সেনাপতি হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন।
প্রসেনজিতের বদলে নিজেই দুর্নীতিগ্রস্ত মন্ত্রী ও অন্যান্য রাজকর্মচারীদের দমন করে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা করলেও বন্ধুল তাদের পুরোপুরিভাবে নিষ্ক্রিয় করে উঠতে পারেননি। তাঁরা বন্ধুলের নামে মিথ্যা কথা বলে বলে প্রসেনজিতের মনকে বিষাক্ত করে তুলেছিলেন। তখন প্রসেনজিতও ভাবতে শুরু করেছিলেন যে বন্ধুল হয়তো তাঁকে সরিয়ে কোশলের রাজা হওয়ার ফন্দি আঁটছে। বন্ধুলের ওপরে সন্দেহ হলেও তাকে কোনো শাস্তি দেওয়া মোটেই সহজ ছিল না, এমনকি প্রসেনজিতের পক্ষেও তা ছিল অসম্ভব তার কারণ ছিল বন্ধুলের জনপ্রিয়তা। তখন প্রসেনজিত আরেকটি পরিকল্পনা বানালেন। কয়েকজন ভাড়াটে সৈনিক লাগিয়ে একদিন তিনি কোশল আক্রমণ করালেন। পরিকল্পনা মতো কাজ এগোল আর রাজ্যে আক্রমণের খবর পেয়ে প্রসেনজিত তা দমন করতে বন্ধুল ও তাঁর ৩২ জন পুত্রকে পাঠালেন। বন্ধুলের সৈন্যদের মধ্যে মিশে ছিল রাজা ও তাঁর দুর্নীতিপরায়ণ মন্ত্রীদের পাঠানো গুপ্তঘাতকের দল। বন্ধুল ও তাঁর পুত্ররা যখন আক্রমণকারীদের খুঁজতে ব্যস্ত তখন সেই গুপ্তঘাতকদের হাতে একে একে মারা পড়লেন তাঁরা সবাই।
বন্ধুলের স্ত্রী ছিলেন মল্লিকা। প্রসেনজিতের স্ত্রী রানি মল্লিকা থেকে তাকে আলাদা করার জন্য তিনি বন্ধুল-মল্লিকা নামে বেশি পরিচিত। তিনি তখন বুদ্ধের দুই প্রধান শিষ্য (একটি সূত্র মতে স্বয়ং বুদ্ধও উপস্থিত ছিলেন সেখানে) সমেত প্রায় পাঁচশ বৌদ্ধ ভিক্ষুকে আপ্যায়ন করছিলেন। এমন সময়ে একটি চিরকুটের মাধ্যমে মল্লিকার কাছে বন্ধুল ও তাঁর পুত্রদের হত্যার খবর আসে। মল্লিকা বার্তাটি পড়ে, শান্ত মুখে সেই চিরকুটটিকে তাঁর পোশাকের ভাঁজে গুঁজে আবার যে কাজ করছিলেন তাতে ব্যস্ত হয়ে গেলেন। খাবার পরিবেশনের সময় সেই চিরকুটটি মল্লিকার অজান্তে পড়ে যায় আর বুদ্ধের এক প্রধান শিষ্য সারিপুত্ত সেটিকে পেয়ে খুলে পড়েন। বার্তাটি পড়ে সারিপুত্ত স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন আর ভাবছিলেন যে মল্লিকা কী ধাতুতে গড়া যে এমন এক সংবাদ পেয়েও সে তার আচরণে একদম স্বাভাবিক ছিল। সারিপুত্ত মল্লিকাকে ডেকে তার মানসিক দৃঢ়তার ভূয়সী প্রশংসা করলেন এবং উপদেশ দিলেন। এরপর মল্লিকা তার পুত্রবধূদের ডেকে পাঠালেন এবং তাদেরকে পুরো ঘটনাটি জানিয়ে অনুরোধ করেছিলেন যে তাঁরা যেন তাঁদের রাজার বিরুদ্ধে মনে কোনো অসন্তোষ পোষণ না করে। মল্লিকার ঘরেও রাজার গুপ্তচর ছিল যারা পুরো ঘটনার ওপরে নজর রাখছিল। তারা মল্লিকার এহেন আচরণের সবকিছুই রাজাকে জানাল। মল্লিকার শান্ত আচরণ বিশেষ করে রাজার প্রতি তখনও তার আনুগত্য দেখে রাজা খুবই আবেগতাড়িত হয়ে পড়েছিলেন। প্রসেনজিত নিজে যে বড়ো বোকামো করে ফেলেছিলেন তিনি তখন সেটি বুঝতেও পেরেছিলেন। তাই তিনি মল্লিকাকে ডেকে সমস্ত বিষয়ের জন্যে ক্ষমা চেয়েছিলেন এবং নিজের কৃতকর্মের বদলে মল্লিকার জন্যে কিছু করতে চেয়েছিলেন। মল্লিকা তখন আর কোশলে থাকতে চাইলেন না। তিনি তাঁর বত্রিশ জন পুত্রবধূকে নিয়ে কুশিনারায় ফিরে যেতে চেয়েছিলেন আর প্রসেনজিত সে ইচ্ছেয় বাধা দেননি।
বন্ধুলের মৃত্যুর পর দীর্ঘকারায়নকে কোশলের সেনাপতি নিযুক্ত করা হয়েছিল। দীর্ঘকারায়ন ছিলেন বন্ধুলের ভাগ্নে। সেনাপতি হলেও বন্ধুলের প্রতি এই বিশ্বাসঘাতকতার জন্যে প্রসেনজিতকে তিনি কখনও ক্ষমা করেননি। আর একদিন দীর্ঘকারায়নের প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ এসেও গেল।
একবার প্রসেনজিত গিয়েছিলেন নগরক নামের ছোটো এক শাক্য জনপদে। তাঁর সঙ্গে ছিল মাত্র দীর্ঘকারায়নের নেতৃত্বে কয়েকজন মাত্র রক্ষী। বুদ্ধ তখন ছিলেন নাগরকের মাত্র ১৪/১৫ কিলোমিটার (৩ লীগ) দূরে মেদাতালুম্পা নামক গ্রামে। প্রসেনজিত যখন জানতে পারলেন যে বুদ্ধদেব কাছেই অবস্থান করছেন তখন তিনি তাঁকে দেখার জন্যে শীঘ্র মেদাতালুম্পায় গিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন। ধম্মপদ আবার সেই স্থানের নাম উলুম্পা বলেছে। অন্যদিকে, মঝিমা ভাষ্য সেই স্থানের নাম নিশ্চিত করেই মেদাতালুম্পা বলেছে কারণ সেখানে নাকি মাটির ওপরেই মেদাবাণ পাথর দেখা যেত যা মনে হয় শ্বেতপাথরের ন্যায় কোনো সাদা রঙের পাথর (মেদাবাণ পাসান কিরেত্থ উস্সান্ন অহেসুম, তস্মা মেদাতালুম্পান তি শঙ্খম গতং) হবে। বুদ্ধের মতোই প্রসেনজিতের তখন প্রায় আশি বছর বয়স। বৃদ্ধ রাজা বুদ্ধের উপদেশ শুনে শান্তি পেতে চেয়েছিলেন। যাইহোক প্রসেনজিতের মনের বাসনা পূর্ণ হয়েছিল, তিনি মেদাতালুম্পায় গিয়ে বুদ্ধের দর্শন করতে পেরেছিলেন কিন্তু সেটিই ছিল তাঁর জীবনের শেষ বুদ্ধ দর্শন।
নগরক থেকে মেদাতালুম্পা যাওয়ার পথে দীর্ঘকারায়নের সঙ্গে প্রসেনজিতের একটু কথা কাটাকাটি হয়েছিল। দীর্ঘকারায়ন সরাসরি প্রসেনজিতকে বন্ধুলের হত্যাকারী বলে দায়ী করেছিলেন। মেদাতালুম্পা পৌঁছে বুদ্ধের কাছে উপস্থিত হওয়ার আগে রীতি অনুযায়ী প্রসেনজিত তাঁর সমস্ত রাজকীয় প্রতীক (insignia) খুলে ফেলে একজন সাধারণ মানুষের মতো হয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। তাই তিনি তাঁর জুতো, আতপত্র (রাজার মাথায় ধরা ছোটো ছাতা বিশেষ), ব্যজনের চামর, মুকুট ও তরবারি খুলে দীর্ঘকারায়নের হাতে দিয়ে শুধুমাত্র একটি দাসীকে সঙ্গে নিয়ে বুদ্ধের কাছে গিয়েছিলেন।
রাজকীয় প্রতীকগুলি ছিল একজন রাজার পরিচয় প্রকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সব বস্তু। দীর্ঘকারায়ন সেগুলি পেয়ে মনে মনে খুবই উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর মনে বন্ধুলের হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার ইচ্ছেটা যে লুকিয়ে ছিল তা যেন এই রাজকীয় প্রতীকগুলি দেখে দীর্ঘকারায়নকে উদ্বেল করে তুলল। তিনি ভাবলেন যে এমন সুযোগ আর আসবে না। রাজার প্রতীকগুলি নিয়ে শ্রাবস্তী গিয়ে প্রসেনজিতের বদলে অন্য কাউকে রাজা বানাবার সুযোগ যেন ভগবান নিজে তাঁর হাতে তুলে দিয়েছেন। প্রসেনজিতের জায়গায় নতুন রাজা হিসেবে একজনকে তিনি তখন তাঁর মানস চক্ষে দেখতেও পাচ্ছেন। সে আর কেউ নয় বিরূঢ়ক। প্রসেনজিত তার ওপরেও অত্যাচার কিছু কম করেননি।
যেমন ভাবা তেমন কাজ। প্রসেনজিতের রাজকীয় প্রতীক অর্থাৎ কোশল রাজ্যের সর্বোচ্চপ্রতীক নিয়ে তাঁর দলবল সহ সোজা রওনা দিলেন শ্রাবস্তীর উদ্দেশ্যে। এমনকি রাজার রথটিও রাখা হল না প্রসেনজিতের জন্যে। বুদ্ধের পায়ের কাছে বসে থাকা প্রসেনজিত তখনও জানেন না যে তাঁর বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ঘটতে চলেছে। দীর্ঘকারায়ন শ্রাবস্তী এসেই বিরূঢ়কের হাতে তুলে দিয়েছিলেন রাজকীয় প্রতীক আর তাকে অনুরোধ করেছিলেন কোশলের রাজা হওয়ার জন্যে।
পাঠক ঘটনার ধারাবাহিকতা দেখে বুঝতে পারছেন যে হঠাৎ ঘটে যাওয়ার মতো বিষয় এটি ছিল না। আমার মনে হয় যে দীর্ঘকারায়ন ও বিরূঢ়ক মিলে এই ষড়যন্ত্রের জাল অনেকদিন আগে থেকেই বুনতে শুরু করেছিলেন এবং অপেক্ষা করছিলেন কখন সুযোগ আসে। কোশলের রাজা না হতে পারলে শাক্যদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিয়ে বিরূঢ়ক তাঁর প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে পারছিলেন না। এছাড়া প্রসেনজিত তাঁকে ও তাঁর মা বাসবক্ষত্রিয়ার প্রতিও অন্যায় করেছিলেন। দুজনকেই রাজপ্রাসাদ থেকে বিতাড়িত করেছিলেন। শেষে বুদ্ধের হস্তক্ষেপে প্রসেনজিত তাঁদের ফিরিয়ে আনলেও ততক্ষণে বিরূঢ়কের মনে প্রসেনজিতের প্রতি ঘৃণার বীজ রোপিত হয়ে গিয়েছিল। সুতরাং প্রসেনজিতকে সরিয়ে রাজা হতে পারলে বিরূঢ়কের দুই প্রতিশোধের আগুন একসঙ্গে নেভানো সম্ভব। আবার এদিকে বন্ধুলের হত্যার জন্যে দীর্ঘকারায়নও প্রসেনজিতকে কোনোদিনও ক্ষমা করে উঠতে পারেননি। তিনিও এর প্রতিশোধ নিতে চাইছিলেন। উভয়ের পথ মিশেছিল একই বিন্দুতে এসে, তা হল কোশলের সিংহাসন থেকে প্রসেনজিতকে সরাতে হবে।
ওইদিকে বুদ্ধের দর্শন সেরে বাইরে এসে কাউকে দেখতে না পেয়ে প্রসেনজিত বুঝতে পারলেন যে তাঁকে ছেড়ে দীর্ঘকারায়ন তাঁর লোকজনকে নিয়ে চলে গেছেন। শুধুমাত্র একজন দাসীকে রেখে গিয়েছিলেন দীর্ঘকারায়ন আর তার হাতে রাখা ছিল একটি পত্র, যাতে লেখা ছিল, “প্রাণে বাঁচতে হলে আমাদের পিছু নিও না।”
রাজকীয় প্রতীক নিয়ে দীর্ঘকারায়নের চলে যাওয়া আর এই পত্রের অর্থ যে কী তা বুঝতে প্রসেনজিতের দেরি হয়নি। তাঁর এবারে চিন্তা হল নিজের প্রাণ বাঁচানোর। শ্রাবস্তীতে যে তাঁর জন্য খোলা তলোয়ার হাতে লোকে অপেক্ষা করে রয়েছে তা বুঝতে পেরে প্রসেনজিতের লক্ষ্য ছিল অন্য কোথাও পালিয়ে নিজের প্রাণ বাঁচানো। তিনি ঠিক করলেন যে রাজগৃহে যাবেন।
মগধের রাজধানী ছিল রাজগৃহ আর সেখানে তখন রাজত্ব করছেন অজাতশত্রু। অজাতশত্রু ছিলেন প্রসেনজিতের জামাই ও ভাগ্নে দুটোই। প্রসেনজিতের বোন কোশলা দেবীর সঙ্গে বিবাহ হয়েছিল অজাতশত্রুর পিতা বিম্বিসারের। কোশলরাজ তাদের বিবাহে যৌতুক হিসেবে কাশী নগরকে তুলে দিয়েছিলেন মগধের হাতে। বিম্বিসারকে হত্যা করে অজাতশত্রু মগধের সিংহাসন অধিকার করে নিলে প্রসেনজিত রেগে গিয়ে কাশী দখল করে নেন। অজাতশত্রু একে মেনে নিতে পারেননি এবং তখন কোশল ও মগধের যুদ্ধ লাগে। যুদ্ধে প্রসেনজিত অজাতশত্রুকে পরাজিত করলেও তাঁকে মুক্ত করে দিয়েছিলেন। শুধু মুক্তই করেননি, নিজের মেয়ে বজ্জিরার সঙ্গে অজাতশত্রুর বিবাহও দিয়েছিলেন। সেই থেকে দুজনের বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। প্রসেনজিত সেই ভরসায় পায়ে হেঁটে রাজগৃহের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেলেন। একে তো বৃদ্ধ বয়সে দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে পার হওয়া আর তার সঙ্গে টাকা–পয়সা না থাকায় রাস্তায় নিকৃষ্ট খাদ্য গ্রহণ তাঁকে অত্যন্ত দুর্বল করে ফেলেছিল। গভীর রাতে যখন প্রসেনজিত রাজগৃহে গিয়ে পৌঁছেছিলেন তখন নগরের প্রবেশদ্বার বন্ধ হয়ে গেছে। প্রসেনজিত অনেকবার প্রহরীদের নিজ পরিচয় দিয়ে দ্বার খোলার নির্দেশ দিলেও তাঁর কাছে রাজকীয় প্রতীক না থাকায় কেউই তাঁর কথা বিশ্বাস করল না। দীর্ঘ পদযাত্রায় ক্লান্ত প্রসেনজিত প্রবেশদ্বারের কাছেই এক সরাইখানায় হতাশ হয়ে রাত কাটাবার উপক্রম করলেন। সেই রাতেই অসম্ভব অসুস্থ (কোনো মতে কলেরা হয়েছিল) হয়ে পড়েছিলেন তিনি। তাঁর সঙ্গে থাকা দাসী অনেক সেবা করলেও বৃদ্ধ রাজা তখন শারীরিক ও মানসিক উভয় দিকেই ভেঙে চৌচির হয়ে গিয়েছিলেন। চরম মর্যাদাহীন ভাবে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। পরের দিন সকালে রাজার দাসী যখন মৃতদেহ নিয়ে বিলাপ করছিলেন, “কাশী ও কোশলের মহারাজার কী দুর্দশা যে রাস্তার ধারে তাঁকে ভবঘুরের মতো মৃত্যু বরণ করতে হল,” তখন কিছু মানুষ রাজপ্রাসাদে খবর দেয়। খবর পেয়ে অজাতশত্রু সেই সরাইখানায় এসে যখন প্রসেনজিতের মৃতদেহের পাশে পুরো ঘটনাটি দাসীর কাছে শুনলেন তখন তাঁর আর কিছুই করার ছিল না, তখন প্রসেনজিতের রাজ্য ও প্রাণ দুইই চলে গিয়েছে।
রাজকীয় প্রতীক দখল করেই বিরূঢ়ক কোশলের মহারাজা হয়ে বসলেন। অজাতশত্রু একবার ভেবেছিলেন যে প্রসেনজিতের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে তিনি কোশল আক্রমণ করবেন কিন্তু তাঁর মন্ত্রীরা তাঁকে নিরস্ত্র করলেন। তাঁদের যুক্তি ছিল যে প্রসেনজিতের মৃত্যুর পর বিরূঢ়ক স্বাভাবিক ভাবেই মহারাজা হয়েছেন, এক্ষেত্রে তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার জন্যে যুদ্ধযাত্রা করা মোটেই যুক্তিযুক্ত কাজ নয়। তখন অজাতশত্রু কোশল থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন।
ওদিকে রাজা হওয়ার পর বিরূঢ়ক চুপচাপ বসে নেই। তিনি তাঁর প্রতিশোধের কথা ভুলতে পারেননি। তাঁর রাজা হওয়ার প্রকৃত উদ্দেশ্যই তো ছিল শাক্যদের শিক্ষা দেওয়া, সুতরাং সে কাজ তো তিনি অধরা রাখতে পারেন না! এদিকে প্রসেনজিতের আরেক পুত্র রাজকুমার জেতা কোনোভাবেই শাক্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সায় দিলেন না সুতরাং যা হওয়ার তাই হয়েছিল। বিরূঢ়ক তখন রাজকুমার জেতাকে হত্যা করে বিরাট এক সৈন্যবাহিনী সাজিয়ে শাক্য দেশ আক্রমণ করতে বেরিয়ে গেলেন। বুদ্ধদেব বিরূঢ়কের পরিকল্পনা জানতে পেরেছিলেন। আমার তো মনে হয় যে বিরূঢ়ক রাজা হওয়ার পর থেকেই বুদ্ধ তাঁর ওপরে নজর রেখেছিলেন সে কখন বাহিনী নিয়ে এগোবে। বিরূঢ়কের থেকে বুদ্ধিতে এগিয়ে থাকা বুদ্ধ কপিলাবস্তুর সীমানায় একটি শুকনো গাছের নীচে ধ্যানমগ্ন হয়ে বসে রইলেন। বিরূঢ়ক সেখানে আসার পর তিনি বুদ্ধকে দেখলেন এবং সম্মানের সঙ্গে প্রশ্ন করলেন যে “কোনো ছায়া-শীতল বৃক্ষ ছেড়ে ভগবান কেন এই মৃত গাছের নীচে রৌদ্রে বসে আছেন?” বুদ্ধ জবাব দিলেন, “আত্মীয়দের সঙ্গে সম্পর্কই কাউকে শীতল রাখতে পারে।” বুদ্ধের কথার প্রকৃত অর্থ বিরূঢ়ক বুঝতে পেরেছিলেন আর তাই তিনি সৈন্যবাহিনীকে শ্রাবস্তীতে ফিরিয়ে এনেছিলেন।
সর্বমোট তিনবার বিরূঢ়ক কপিলাবস্তু আক্রমণ করতে গিয়েছিলেন আর প্রতিবার তিনি সেই গাছের নীচে বুদ্ধকে দেখতে পেয়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁকে প্রণাম করে বাহিনী প্রত্যাহার করে ফিরে আসেন।
তারপর ছিল চতুর্থ বারের অভিযান। এবারে বুদ্ধ আর শাক্যদের সহায়তা করতে আসেননি। তিনি তখন ছিলেন শ্রাবস্তীর জেতবন বিহারে। ওদিকে বিরূঢ়ক সৈন্য নিয়ে হানা দিলেন কপিলাবস্তু। বৌদ্ধগ্রন্থে বলে, বুদ্ধ দিব্যনেত্রে ভবিষ্যৎকে দেখেছিলেন, তাই সেযাত্রা বিরূঢ়ককে আর আটকাতে আসেননি। আসলে বিরূঢ়ক তখন বুদ্ধের ওপরে নজর রেখে, সুবিধা বুঝে আক্রমণ করেছিলেন।
বিরূঢ়কের সৈন্য দেখে শাক্যদের মনোবল ভেঙে গিয়েছিল। বিরূঢ়ক তাঁর সৈন্যদের আদেশ দিয়েছিলেন যে শুধুমাত্র তাঁর মাতামহ মহানাম ও তাঁর সঙ্গে থাকা মানুষজন ছাড়া সমস্ত শাক্যদের যেন নির্বিশেষে হত্যা করা হয়। বিরূঢ়কের সেনাবাহিনী যেন পাগলা কুকুরের মতো ধেয়ে গেল শাক্যদের ওপরে। মহিলা, শিশু কাউকে রেয়াৎ করা হয়নি। পুরো কপিলাবস্তু ঢেকে গিয়েছিল রক্তে। শাক্যদের রক্তে আবার ধোয়া হয়েছিল সেই মঞ্চ, যা আগে বিরূঢ়ক ছুঁয়েছিলেন বলে দুধ দিয়ে ধুয়ে শোধন করা হয়েছিল।
.
বিরূঢ়কের মাতামহ মহানামকে জীবিত অবস্থায় বন্দী করা হয়েছিল। তাঁকে নিয়ে বিরূঢ়ক রওনা হয়েছিলেন কোশলের দিকে। রাতে শিবির ফেলা হয়েছিল এক সরোবরের ধারে। সকাল হতে তাঁকে আনা হয়েছিল বিরূঢ়কের সামনে। সেখানেই আনা হয়েছিল প্রাতরাশের খাবারদাবার। বিরূঢ়ক তখন মহানামকে তাঁর সঙ্গে একসঙ্গে বসে খাওয়ার আদেশ করলেন। পাঠকের নিশ্চয় মনে আছে যে বিরূঢ়কের মায়ের সঙ্গে খাবার না খেয়ে মহানাম কোশলের দূতকে প্রতারিত করেছিলেন আর এখন দাসীপুত্রের সঙ্গে তাঁকে খাবার খেতে বলে বিরূঢ়ক আরেক চাল খেললেন। মহানাম জানতেন যে বিরূঢ়কের আদেশ পালন না করলে কী হবে। বিরূঢ়ক মহানামকে জীবিত বন্দী বানাতে বলেছিলেন শুধুমাত্র এই প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে। তাই মহানামের তখন উভয় সঙ্কট। মহানাম তখন এক ইচ্ছে জানালেন, “বিরূঢ়ক, আমি তো স্নান না করে খাদ্য গ্রহণ করি না। তুমি যদি একটু অপেক্ষা কর তো আমি সরোবরে একটা ডুব দিয়ে আসি।” বৃদ্ধের এই শেষ ইচ্ছের বিরুদ্ধে বিরূঢ়ক গেলেন না, তাঁকে স্নান করার অনুমতি দেওয়া হল।
স্নানের আগে মহানাম তাঁর লম্বা চুলের বিনুনি খুলে তার শেষে একটি গিঁট দিয়ে দিলেন, তারপর দুই হাতের বুড়ো আঙুল চুলের ভেতরে রেখে জলে ডুব দিলেন। মহানাম ঠিক করেছিলেন যে তিনি জলে ডুবে আত্মহত্যা করবেন কিন্তু তিনি সাঁতার জানেন তাই তাঁর পক্ষে জলে ডোবা সম্ভব নয়। তাই তিনি জলে ডুবে তিনি বুড়ো আঙুল দিয়ে চুলের কুণ্ডলী খুলে তার ভেতরে নিজের পা ফাঁসিয়ে দিয়েছিলেন যাতে তাঁর পা অকেজো হয়ে গিয়ে সাঁতার কাটতে না পারেন। বৌদ্ধ সূত্র অনুযায়ী জলের ভেতর থেকে নাগেরা নাকি তাঁকে উদ্ধার করে নাগদের রাজ্যে নিয়ে যান যেখানে মহানাম বারো বছর বেঁচে ছিলেন। মনে হয় নাগ জাতিদের এলাকা ছিল সেই স্থানটি আর মহানাম ডুবসাঁতার দিয়ে কোনো আড়ালে গিয়ে পৌঁছাবার পর তারা মহানামকে উদ্ধার করে। ভুলে যাবেন না যে মহানামের সঙ্গে নাগজাতির আগে থেকেই ভালো সম্পর্ক ছিল। বিরূঢ়কের মা নিজেই ছিলেন নাগজাতির মহিলা আর মহানামের ঔরসে তাঁর গর্ভে জন্ম হয়েছিল বাসবক্ষত্রিয়ার। সুতরাং নাগজাতি এখানে মহানামের ত্রাণকর্তা হিসেবে উপস্থিত হলে আশ্চর্যের কিছু নেই।
এদিকে সরোবরের তীরে রাজা বিরূঢ়ক তাঁর পিতামহের প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় ছিলেন। অনেকক্ষণ কেটে যাওয়ার পরও যখন মহানামের কোনো চিহ্ন দেখা গেল না তখন বিরূঢ়ক বুঝতে পেরেছিলেন যে পরিস্থিতি মোটেই স্বাভাবিক নয়। খোঁজাখুঁজি করতে করতে যখন সূর্য ঢলতে আরম্ভ করেছে তখন বিরূঢ়ক তাঁর লোকেদের আদেশ দেন সরোবরে নেমে জলের তলায় অনুসন্ধান করতে। সৈন্যরা ঝাঁপিয়ে পড়ল সরোবরে। জল তোলপাড় করে খুঁজেও কোনো লাভ হল না, মহানামের কোনো সন্ধান পাওয়া গেল না। ততক্ষণে সন্ধে নামতে শুরু করেছে। বিরূঢ়কের লোকেরা আলো নিয়ে আশপাশের অঞ্চলও খুঁজে এসে খবর দিল যে মহানাম অদৃশ্য হয়ে গেছেন। বিরূঢ়ক তখন বুঝতে পারল যে সে মহানামের বুদ্ধির কাছে পরাজিত হয়েছে। শিবির গুটিয়ে সে শ্রাবস্তীর পথ ধরল।
চলতে চলতে অচিরবতি (আজকের রাপ্তী) নদীর ধারে রাত হল। নদীর অপর পাড়েই শ্রাবস্তী নগরী কিন্তু এত রাতে নদী পার করে নগরে প্রবেশ করা সমীচীন নয় ভেবে বিরূঢ়ক নদীর ধারেই রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। ক্লান্ত সৈন্যরা কেউ নদীর তীরে বালির ওপরেই আশ্রয় নিল, কেউ বা আবার উঁচু জমিতে।
কিন্তু তাদের শয্যা সুখের হল না। কোথা থেকে হাজারে হাজারে উইপোকা এসে তাদের ব্যতিব্যস্ত করে তুলল। কারো একটু চোখ লেগেছে কি লাগেনি অমনি পোকারা তাদের নাকে, মুখে ঢুকে অস্থির করে মারছে। পোকার হাত থেকে বাঁচতে তারা তখন জলের ধারে এসে কোনোরকমে শরীর থেকে তাদের ছাড়াচ্ছে। এইসব গণ্ডগোলে কেউ খেয়াল করতে পারেনি যে আকাশ জুড়ে কালো মেঘের আনাগোনা শুরু হয়েছে। হঠাৎ আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল আর অকস্মাৎ অচিরবতি নদীর দুই কূল ছাপিয়ে বন্যার জল ফুঁসে উঠে গ্রাস করল বিরূঢ়ক ও তাঁর দলবলকে। সেই ভীষণ মহাপ্লাবনে রাজা, সৈন্য, ঘোড়া, হাতি সব মুহূর্তের মধ্যে ভেসে গেল। তারপর থেকে বিরূঢ়ককে আর কেউ দেখেনি।
অবদানকল্পলতার একাদশ পল্লবে একই রকম কাহিনি আছে। বিরূঢ়ক মোট ৭৭ হাজার শাক্যকে হত্যা করেছিলেন এবং আশি হাজার বালক-বালিকাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিলেন। শাক্য মেয়েরা তাঁর প্রতি খারাপ আচরণ করেছে বলে তিনি তাদের মৃত্যুর আদেশ দিয়েছিলেন। বৌদ্ধ গ্রন্থগুলিতে শাক্য সংহারের সঙ্গে আগের জন্মের কর্মফলকে একত্র করে একটি কাহিনি বলা আছে।
শাক্যমুনি বুদ্ধের জন্মের আগে একবার কপিলাবস্তু শহর এক চরম খরার কবলে পড়েছিল। শহরের কাছে একটি গ্রাম ছিল এবং সেখানে একটি বড়ো পুকুর ছিল। সেই গ্রামটি ছিল জেলেদের দ্বারা অধ্যুষিত। প্রচণ্ড খরার কারণে ধীরে ধীরে পুকুরটি শুকিয়ে যাচ্ছিল এবং তখন পুকুরের সমস্ত মাছ গ্রামবাসীরা ধরে ধরে খেয়ে ফেলছিল। ক্রমশ একটি মাছ ছাড়া পুকুরের সব মাছ শেষ হয়ে গেল। শেষ মাছটি ছিল বিশাল বড়ো কিন্তু সেও একদিন ধরা পড়ল। মাছটিকে মারার আগে একটি বাচ্চা ছেলে মাছটির মাথাটি জোরে জোরে তিনবার ঠুকে দিয়েছিল, যদিও সে মাছটি খায়নি।
পরবর্তীতে, এই বাচ্চা ছেলেটি শাক্যমুনি বুদ্ধ রূপে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন আর সেই বড়ো মাছটি ছিল বিরূঢ়ক। পুকুরের প্রত্যেকটি মাছ ছিল বিরূঢ়কের সৈন্যবাহিনীর এক একজন সদস্য। গ্রামের জেলেরা পরের জন্মে কপিলাবস্তুর শাক্য হয়ে জন্ম নিয়েছিল। আগের জন্মের কর্মফল অনুসারে পরের জন্মে তাদের হত্যা করা হয়েছিল। ছোটো বাচ্চাটি মাছের মাথাটিকে তিনবার ঠুকে দিয়েছিল বলে শাক্য সংহারের দিন থেকে তিনদিন বুদ্ধ অসম্ভব মাথা যন্ত্রণা ভোগ করেছিলেন।
আমরা আন্দাজ করতে পারি যে বুদ্ধের সময়কালের পর ধীরে ধীরে শাক্য দেশের অধঃপতন শুরু হয়। দীর্ঘ সময়ের জন্য কপিলাবস্তু একেবারে নির্জন
এবং পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়েছিল। বিস্মৃতির অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে গিয়েছিল কপিলাবস্তু। এরপর ক্রমে তা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ফা-হিয়েন ও হিউয়েন সাঙের কপিলাবস্তু ভ্রমণবৃত্তান্ত আপনারা পড়েছেন এবং দেখেছেন যে উভয় পরিব্রাজকই কপিলাবস্তুকে একটি জনশূন্য রাজ্য বলেছেন। ফা-হিয়েন তো নগরে বন্য পশু ঘুরে বেড়ানোর কথাও উল্লেখ করেছেন –
(“কপিলাবস্তু রাজ্যটি এখন নির্জন ও পরিত্যক্ত। কয়েকজন এখানে অনেক দূরে দূরে বাস করে। রাস্তায় শ্বেতহস্তী ও সিংহ ঘুরে বেড়ায়, তাই সতর্ক হয়ে চলতে হয়”)। হিউয়েন সাঙও কপিলাবস্তুকে পরিত্যক্ত দেখেছিলেন (“এখান (শ্রাবস্তী) থেকে দক্ষিণ–পূর্ব দিকে ৫০০ লি গিয়ে পৌঁছেছিলাম কিএ-পি-লো-ফা-স্সে-তি (কপিলাবস্তু) রাজ্যে। রাজ্যটির পরিসীমা প্রায় ৪০০০ লি। রাজ্যে প্রায় দশখানি সম্পূর্ণভাবে পরিত্যক্ত নগরের ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাওয়া যায়। রাজধানী একেবারে ভূপতিত ও জনমানবশূন্য। নগরের পরিসীমা সঠিক ভাবে নির্ণয় করা অসাধ্য।”) আরেক চীনা পরিব্রাজক জি সেংজাইয়ের লেখায় কপিলাবস্তুর একই ছবি ধরা পড়েছিল (“চ্লা-উয়েল-লা-ইউয়ে (কপিলাবস্তু) রাজ্যে এখন কোনো রাজা নেই। শহর ও তার পুষ্করিণী সব পরিত্যক্ত আর ময়লায় ভরা। চারিদিকে খালি শূন্যতা। কয়েকটি স্তূপ রয়েছে মাত্র। রাজা শুদ্ধোদনের বংশধর এমন কুড়িটির মতো শাক্য পরিবার সেখানে বাস করে।”) ।
.
কোনো কোনো পণ্ডিত মনে করেন যে কপিলাবস্তু পরিত্যক্ত হবার পর বেঁচে থাকা শাক্যরা পিপরাওয়াতে গিয়ে ‘নয়া কপিলাবস্তু’ স্থাপিত করেছিলেন। এ অনুমান করা যেতেই পারে। বহুক্ষেত্রেই দেখা যায়, পরিযানের পর মানুষেরা নতুন জায়গায় বসতি স্থাপন করে তাঁদের ছেড়ে আসা স্থানের নামে বসতির নাম রাখে। এটি মানুষের মনোগত প্রবৃত্তি কিন্তু এমন অনুমানকে তো আর বিনা প্রমাণে আমরা সত্য বলে ধরে নিতে পারি না। পাথুরে প্রমাণ বলছে যে পিপরাওয়া হল কপিলাবস্তু এবং তিলৌরাকোট ছিল একটি নিগম।
শাক্যদের ধ্বংসলীলার স্থানটি কপিলাবস্তুর ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে, তাই দেখে নেওয়া যাক যে চীনা পরিব্রাজকদের ভ্রমণ বৃত্তান্তে এই স্থানটি কীভাবে আছে। ফা-হিয়েন স্থানটি দেখেছেন কিন্তু তিনি দক্ষিণ দ্বার থেকে ঘড়ির কাঁটা বরাবর ঘুরতে ঘুরতে এই স্থানটি দেখেছিলেন। তাঁর ভাষায় –
“যেখানে রাজা বৈদূর্য শাক্য বংশ ধ্বংস করেন আর মৃত্যুর পর তারা সকলেই (শাক্যরা) শ্রোতপন্ন (এক জাতীয় ঋষি) হয়ে যান। শেষ স্থানটিতে একটি স্তূপ ছিল যা আজও বর্তমান।”
ফা-হিয়েনের বর্ণনায় কোথাও স্থানটির অবস্থান ঠিক যে কোনোখানে তা পরিষ্কার করে বলা নেই, এমনকি কপিলাবস্তুর কোনো দিকে যে এই স্থানটি ছিল তাও উল্লিখিত নেই। যেহেতু তিনি দক্ষিণ দ্বার থেকে বেরিয়ে একের পর এক স্থান দেখতে দেখতে (যার মধ্যে এই সংহারের স্থানটিও আছে) উত্তরপূর্বে যেখানে সিদ্ধার্থ একটি গাছের ছায়াতলে বসে হলকর্ষণ উৎসব দেখেছিলেন সেইখানে গিয়ে পৌঁছেছিলেন। আমরা ধরে নিতে পারি যে সংহারের স্থানটি হয়তো কপিলাবস্তুর উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। তাহলে ফা-হিয়েন সংহারের স্থানে মাত্র একটি স্তূপ দেখেছিলেন।
এবারে আমরা যদি হিউয়েন সাঙের বিবরণ দেখি তাহলে দেখব যে তিনি স্থানটি ঘুরেছেন এবং অভিমুখ সহ অবস্থান লিখেছেন।
“রাজধানীর উত্তর-পশ্চিমে শত-শত হাজার-হাজার স্তূপ আছে যা শাক্য জাতির মানুষদের সংহারের স্থানটি সূচিত করছে। বিরূঢ়ক রাজা শাক্যদের পরাজিত করে ৯৯০০ জনকে বন্দী করেছিলেন। তাদের মধ্যে থেকে অসংখ্য জনকে তিনি হত্যা করার আদেশ দিয়েছিলেন।
মৃতদেহগুলিকে তাঁরা খড়ের স্তূপের মতো গাদা করে রেখেছিল আর রক্তের জলাশয় বানিয়েছিল। দেবতারা মানুষের করুণা উদ্রেক করে তাদের দেহাস্থি সংগ্রহ করে সমাধি দিয়েছিলেন।”

হিউয়েন সাঙ কপিলাবস্তুর উত্তর-পশ্চিমেই শাক্য সংহারের স্থানটি দেখেছিলেন আর সেই সূত্র ধরে ফিউরার তিলৌরাকোটের উত্তর-পশ্চিমে সাগরওয়া নামক একটি স্থানে সেই শাক্য সংহারের স্থানটি চিহ্নিত করা হয়েছিল। এমনকি আজও নেপালের পক্ষ থেকে সাগরওয়াকে শাক্য সংহারের জায়গা বলে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। সেই স্থানটিকে শনাক্ত করেছিলেন যিনি তাঁকে আপনারা চেনেন। তিনি হলেন ডঃ ফিউরার। আর ফিউরার যখন জড়িত ছিলেন তখন কি আর এমনি এমনি মেনে নেওয়া যায়! চলুন একটু উল্টেপাল্টে দেখা যাক কাগজপত্র কী বলছে। আপনারা দেখেছিলেন যে ১৮৯৮ সালে পেপ্পে যখন পিপরাওয়ার খনন চালিয়ে মঞ্জুষাটি পেয়েছিলেন তখন তিনি তাঁর আবিষ্কারের ঘটনাটি জানিয়ে দুটি চিঠি লিখেছিলেন, একটি স্মিথকে আর অন্যটি ফিউরারকে। স্মিথ কয়েকদিনের মধ্যে পিপরাওয়াতে এসে পৌঁছালেও ফিউরার তখন সাগরওয়াতে খনন করছিলেন বলে আসতে পারেননি। ফিউরারের এই খনন ছিল নেপাল সরকারের পক্ষ থেকে আমন্ত্রণমূলক এবং সেখান থেকে পাওয়া যাবতীয় বস্তু তিনি তিনি নেপাল সরকারকে জমা করেছিলেন।
২৮শে জানুয়ারি (১৮৯৮ সাল), পেপ্পে ও স্মিথ ঘোড়ায় চড়ে সাগরওয়া গিয়ে ফিউরারের সঙ্গে দেখা করেন। স্মিথের এই যাত্রা ভারত ইতিহাসের জগতে একটি গুরুত্বপূর্ণ যাত্রা হয়ে রইল। স্মিথ গিয়ে ফিউরারের পাওয়া কিছু বস্তু ও কয়েকটি পাত্র দেখেছিলেন যেগুলিতে কোনো ধরনের লেখ ছিল না। স্মিথের সাগরওয়া যাত্রা না হলে ফিউরার অনায়াসে সেইসব পাত্রের ওপরে কোনো জাল লেখ তৈরি করে ফেলতে পারতেন কারণ তিনি বলেছিলেন যে সাগরওয়াতে পাওয়া কলসগুলিতে শাক্যদের নাম খোদাই করা আছে যদিও স্মিথ একটিতেও তা খুঁজে পাননি। আমি নিশ্চিত যে স্মিথ সাগরওয়া না গেলে আমরা আরেক জালিয়াতির মুখোমুখি হতাম।
ফিউরার সাগরওয়াতে খননের নামে যথেচ্ছভাবে গর্ত খুঁড়ে প্রত্নবস্তুর লুটপাট করার চেষ্টা করেছিলেন। এই নিয়ে তাঁর রিপোর্টেও তিনি বিভিন্ন বানানো কাহিনি বলেছেন। সমস্ত স্থাপত্যগুলির শেষ ইট অবধি মাটি থেকে উৎপাটন করে ফেলা হয়েছিল। ফিউরারের খননের এক বছর পর পি সি মুখার্জি নেপালে তাঁর খনন ও জরিপের সময়ে সাগরওয়া গিয়েছিলেন। তিনি সেখানে গিয়ে সমস্ত বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নজর করে একটি ছোটো বর্ণনা তুলে ধরেছিলেন (Mukherji: 1901, 25-28)। তিনি যা দেখেছিলেন তা হল জলপূর্ণ বিভিন্ন আকারের গর্ত। ফিউরার সব নষ্ট করে দিয়ে যাওয়ার পর সেইসব গর্তে জল জমে ছোটো বড়ো নানান আকারের জলাশয় হয়ে ছিল। মুখার্জির যে কাজটি সবচেয়ে প্রশংসার দাবি রাখে তা হল তিনি ফিউরারের নকশাকার (draftsman) বাবু ভৈরব বক্সকে খুঁজে বার করে তার স্মৃতি থেকে সাগরওয়ার খননের এক একটি তথ্য তুলে এনে লিপিবদ্ধ করেছিলেন।
ফিউরারের মতে সাগরওয়ার এইখানেই বিরূঢ়কের আদেশে শাক্যদের ওপরে ধ্বংসলীলা চালানো হয়েছিল। ফিউরার এখানে ১৭খানি বর্গাকার কাঠামো পেয়েছিলেন যেগুলি তিনি প্রত্নবস্তুর লোভে একদম ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিলেন। ফিউরার দাবী করেছিলেন যে সাগরওয়ার সতেরোটি স্তূপ থেকে তিনি শাক্য বীরদের মঞ্জুষা পেয়েছেন যার ওপরে প্রাক-অশোক লিপিতে তাদের নাম লেখা আছে। সাগরওয়াতে খনন করে ফিউরার কিছু পাত্র ও বিভিন্ন রকমের বস্তু পেয়েছিলেন বটে কিন্তু সেগুলির ওপরে কোনো নাম লেখা ছিল না। স্মিথ ঠিক সময়ে না পৌঁছালে হয়তো ফিউরার নামগুলি খোদাই করার সুযোগ পেয়ে যেতেন।
স্মিথ বা মুখার্জি ফিউরারের জালিয়াতির বিষয়ে অবগত থাকলেও তাঁরা দুজনেই মত দিয়েছিলেন যে সাগরওয়াতেই শাক্যদের ওপরে হত্যালীলা চালানো হয়েছিল এবং সেখানকার কাঠামোগুলি হল; শাক্য শহীদদের স্মৃতিতে নির্মিত স্তূপ। তাঁদের এই বিশ্বাসের পিছনে সবচেয়ে একটি কারণ ছিল এখান থেকে খননে পাওয়া কিছু পাত্র যার ভেতরে ছিল দেহাস্থি-র টুকরো এবং সোনা, রূপা ও অন্যান্য মণি-রত্নের খণ্ড।
এই বস্তুগুলির চরিত্রও পিপরাওয়ার স্তূপ থেকে পাওয়া বস্তুগুলির মতোই, ক্ষুদ্র নাগ, পুঁতি, ফুল, পাতা ইত্যাদি। ফিউরারের কথা মতো পাত্রগুলিতে দেহাস্থি থাকলেও খননের সময়ে যে কী পাওয়া গিয়েছিল তা কিন্তু কেউ দেখেনি। যেহেতু এটি ফিউরারের কাজ ছিল আর তাই এইসব সন্দেহ তো মনে জাগবেই। স্মিথ যেদিন সাগরওয়া গিয়েছিলেন তখন ফিউরার সেখানে ৫ নং স্তূপের খননে ব্যস্ত ছিলেন। স্মিথের কথামতো সেদিন তিনি একটি ছোটো পাত্রের ভেতরে কয়েকটি মাত্র সোনার তারা দেখেছিলেন (অর্থাৎ দেহাস্থি দেখেননি)। এবারে যতটুকু ভরসা করা যায় ততটুকু করুন।

সাগরওয়াতে ফিউরারের খনন করা কাঠামোগুলি বড়োই অদ্ভুত। ফিউরার সমস্ত স্থাপত্যগুলি নষ্ট করে দিলেও তার জায়গা থেকে মুখার্জি যে তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন সেই হিসেবে দেখা যায় যে সেখানকার কাঠামোগুলির ভিত্তি ছিল বর্গাকার। বৌদ্ধ স্তূপের
ভিত্তি আমরা বর্গাকার দেখলেও বুদ্ধের সময়কালের স্তূপে এমন বৈশিষ্ট্য ছিল না। প্রত্নক্ষেত্র থেকে অনেক এই ভিত্তিভূমির একদম নীচের ইটগুলি ছিল একদম অন্য রকমের। সেখানে মাঝে একটি পদ্মের খোদাই করা ইটের চারিদিক ঘিরে ইটগুলির ওপরে বিভিন্ন ধরনের চিহ্ন আঁকা রয়েছে। বেশ কিছু ক্ষেত্রে এই চিহ্নগুলির সঙ্গে নানারকম অস্ত্রের মিল আছে। সেই কারণে স্মিথ মনে করতেন যে এগুলি সেই বীরদের সমাধি যাঁরা যুদ্ধে অস্ত্রের আঘাতে মারা গেছেন। স্মিথ ও মুখার্জির ধারণায় শাক্য ধ্বংসযজ্ঞ যে সাগরওয়াতেই হয়েছিল তার আরেকটা কারণ ছিল এই চিহ্নগুলি।

সাগরওয়ার কাঠামোগুলির ধ্বংসাবশেষ থেকে প্রচুর কারুকার্যময় ইট পাওয়া গেছে যদিও কুডানের স্তূপে এমন কারুকার্যময় ইটের দেখা পাওয়া গিয়েছে তবুও বর্গাকার ভিত্তি ও বিভিন্ন চিহ্ন আঁকা ভিত্তির ইটের সঙ্গে এগুলিকে মেলালে স্তূপ নয়, যেন অন্য কোনো কিছুর ইঙ্গিত দেয়। সতেরোটা কাঠামোর মধ্যে তেরোখানির নীচে পাত্র পাওয়া গেছে। এই পাত্রগুলি মূলত বিভিন্ন আকারের ঘট ছাড়া আর কিছুই নয়। আবার এই তেরোখানির মধ্যে বারোখানিতেই (১, ২, ৩, ৫, ৬, ৮, ৯, ১০, ১২, ১৩, ১৪ ও ১৫ নং) ঘটগুলি ইটের সজ্জার একদম মাঝের পদ্ম নকশার ইটের নীচে ছিল। একটির ক্ষেত্রে (৪ নং) বস্তুগুলি মাঝের ইটের মধ্যে একটি গর্ত করে রাখা ছিল।
দেবলা মিত্রের মতে সাগরওয়ার কাঠামোগুলি কোনো স্তূপ নয়, বরং মন্দির। মন্দির প্রতিষ্ঠায় কী কী কাজ করতে হয় তার বিবরণ আছে অগ্নিপুরাণের ৪১তম বা ‘পাতালযোগ’ অধ্যায়ে। সেখানে একবার দেখা যেতে পারে যে ভিত্তিভূমির নীচে ঘটের স্থাপনা ও তার সঙ্গে পদ্ম নকশার ইটের কোনো সম্পর্ক আছে কি না।
অরপ্রমাণা শ্রেষ্ঠা স্যাচ্ছিলাপ্যথ শিলামযে ।
নব কুম্ভাংস্তাম্রমযান্ স্থাপযেদিষ্টকাঘটান্॥৪॥
অদ্ভিঃ পঞ্চকষায়েণ সর্ব্বৌষধিজলেন চ ।
গন্ধতোযেন চ তথা কুম্ভৈস্তোয়সুপূরিতৈঃ॥৫॥
হিরণ্যবৃহিসংযুক্তৈর্গন্ধচন্দনচর্চিতৈঃ ।
আপো হিষ্ঠেতি তিসৃভিঃ শন্নো দেবীতি চাপ্যথ॥৬॥
তরত সমন্দীরিতি চ পাবমানীভিরেভ চ ।
উদুত্তমং বরুণমিতি কয়ানশ্চ তথৈভ চ॥৭॥
বরুণস্যেতি মন্ত্রেণ হংসঃ শুচিষদিত্যপি ।
শ্রীসূক্তেন চ তথা শিলাঃ সংস্থাপ্য সংঘটাঃ॥৮॥
– অগ্নি পুরাণ ৪১.৪-৮
প্রস্তরখণ্ডের ক্ষেত্রে এক হাত (দৈর্ঘ্যে) পরিমাপ করা পাথর সবচেয়ে ভালো হবে। নয়টি তামার কলস ও ইট বসাতে হবে। কলসগুলি পঞ্চকষা (জম্বু, শাল্মলী, বট, বকুল, বদর), সমস্ত ভেষজ এবং সুগন্ধি জলের জল দিয়ে পূর্ণ করা উচিত। অতঃপর জলে পরিপূর্ণ ( যেগুলির অভ্যন্তরে সোনা ও চাল যুক্ত এবং সুগন্ধি চন্দন দ্বারা অভিষিক্ত করা হয়েছে) কলসগুলি এবং প্রস্তর খণ্ডগুলি এই মন্ত্র উচ্চারণের সঙ্গে স্থাপন করতে হবে—তিসৃভিঃ চরণবিশিষ্ট আপ হি স্থা, শন্নো দেবী, তরত সমন্দীঃ, পাবমানী, উদুত্তম বরুণ, কয়া নঃ, বরুণস্য, হংস শুচিষত, শ্রীসূক্ত।
অগ্নিপুরাণে দেখতে পাচ্ছি যে মন্দিরের ভিত্তিভূমি স্থাপন করার সময়ে বেশ কিছু কলস স্থাপনা করা হয়। পুরো অনুষ্ঠানের বর্ণনায় (৪০ ও ৪১ অধ্যায়) দেখা যায় যে প্রথমে মাটির ওপরে ইট বিছানো হয়ে থাকে এবং পুজোর আগে কলসে সোনা, রূপার বস্তু ইত্যাদি দেওয়া হয়। তারপর সেই সব কলসে জল ভরে স্থাপনা করার বিধান দেওয়া আছে। সুতরাং মন্দির স্থাপনার আগে ভিত্তিভূমিতে সোনা-রূপার বস্তু সমেত কলস পুঁতে রাখার উল্লেখ শাস্ত্রে আছে। এবারে আমাদের লক্ষ্য পদ্ম নকশার ইট নিয়ে।
পদ্মং চৈব মহাপদ্মং মকরং কচ্ছপং তথা।
কুমুদঞ্চ তথা নন্দং পদ্মং শঙ্খঞ্চ পদ্মিনীম্॥ ১৪॥
– অগ্নি পুরাণ ৪১.১৪
পদ্ম, মহাপদ্ম, মকর, কচ্ছপ, কুমুদ, নন্দ, পদ্ম, শঙ্খ এবং পদ্মিনী।
এবং
উত্পলাদ্ভির্জযন্তঞ্চ দ্বিপদস্থং পতাকযা ।
মহেন্দ্রঞ্চৈককোষ্ঠস্থং সর্ব্বরক্তৈঃ পদে রবিম্॥৩॥
– অগ্নি পুরাণ ৪০.৩
দেবতা জয়ন্ত, যিনি পদ্ম (ফুল) এবং জল দিয়ে দুটি বর্গাকার স্থান ধারণ করেন (পূজা করা হয়) এবং ভগবান মহেন্দ্র, যিনি একটি কেতন সহ একটি চত্বরে থাকেন (পূজা করা হয়)। সমস্ত লাল জিনিস সহ একটি বর্গক্ষেত্রে সূর্য দেবতা (পূজা করা হয়)।
ওপরের দুটি শ্লোকে আপনারা দেখলেন যে নয়জনের বন্দনার কথা বলা হয়েছে তার মধ্যে পদ্ম ও মহাপদ্ম রয়েছে প্রথমেই। এছাড়া মন্দিরের ভিত্তিপুজার ‘অর্ঘদান’ অনুষ্ঠানে দেবতা জয়ন্তের পূজা করা হয় যাকে একটি বর্গাকার ইটে পদ্ম দিয়ে ও একটিতে জল দিয়ে স্থাপন করা হয়।
কুম্ভান্ন চালয়েত্তেষু ন্যসেদষ্টেষ্টকাঃ ক্রমাত্।
ঈশানান্তাশ্চ পূর্ব্বাদাবিষ্টকাং প্রথমং ন্যসেত্॥ ১৫॥
শক্তয়ো বিমলাদ্যাস্তু ইষ্টকানান্তুক দেবতাঃ।
ন্যসনীয়া যথাযোগং মধ্যে ন্যস্যা ত্বনুগ্রহা॥ ১৬॥
অব্যঙ্গে চাক্ষতে পূর্ণে মুনেরঙ্গিরসঃ সুতে।
ইষ্টকে ত্বং প্রয়চ্ছেষ্টং প্রতিষ্ঠাং কারয়াম্যহম্।॥ ১৭॥
মন্ত্রেণানেন বিন্যস্য ইষ্টকা দেশিকোত্তমঃ।
গর্ভাধানং ততঃ কুর্য্যান্মধ্যস্থানে সমাহিতঃ॥ ১৮॥
কুম্ভোপরিষ্টাদ্দেবেশং পদ্মিনীম্ ন্যসেদে দেবতাম্।
মৃত্তিকাশ্চৈব পুষ্পাণি ধাতবো রত্নমেব চ॥ ১৯॥
লহানি দিকপতেরস্ত্রং যজেদ্বই গর্ভভাজনে।
দ্বাদশাঙ্গুলবিস্তারে চতুরঙ্গুলকোচ্ছ্রয়ে॥ ২০॥
পদ্মাকারে তাম্রময়ে ভাজনে পৃথিবীং যজেত্।
একান্তে সর্বভূতেশে পর্বতাসনমণ্ডিতে॥ ২১॥
– অগ্নি পুরাণ ৪১.১৫-২১
কলসগুলি সরানো অনুচিত। পূর্ব দিক থেকে শুরু করে উত্তর-পূর্ব দিক দিয়ে শেষ হওয়া যথার্থভাবে আটটি ইট রাখতে হবে।
নারী শক্তি বিমলা এবং অন্যান্যরা হলেন এই ইটের প্রাথমিক দেবতা, তাদের সঠিক কলসগুলিতে আহ্বান করা উচিত। শক্তি অনুগ্রহকে কেন্দ্রীয় কলসে আহ্বান করা উচিত।
“হে নিখুঁত, অবিচ্ছিন্ন, পূর্ণাঙ্গ ইট, ঋষি অঙ্গিরস কন্যা, আমি তোমাকে প্রতিষ্ঠা করছি। তুমি আমাকে কাঙ্খিত বস্তুটি দাও।”
হে কর্মবিধানদাতা, এই মন্ত্রের সঙ্গে ইট স্থাপন করে গর্ভধান করছি। বারো আঙ্গুল প্রস্থ ও চার আঙুল গভীর ছিদ্রে দেবী পদ্মিনীকে আবাহন করে, মাটি, ফুল, মণিক, রত্ন এবং লোহার টুকরো এবং দেবতাদের অস্ত্রগুলিকে (স্থাপিত করতে হবে)।
পদ্মের মতো আকৃতির তামার পাত্রে পৃথিবীর পূজা করতে হবে। হে একান্ত, সমস্ত প্রাণীর দেবী, পর্বতের আসনে বিভূষিত।
পদ্মের প্রসঙ্গ এখানেও করা হয়েছে। এছাড়া মন্দিরের ভিত্তিভূমির ইটে গর্ত করে মণি, রত্ন, ধাতু ইত্যাদি রাখার উল্লেখ করা আছে। সাগরওয়ার একটি কাঠামোর মাঝের ইটে এমনই গর্ত করে তার ভেতরে নানা ধরনের বস্তু রাখা ছিল যার মধ্যে মণি, রত্ন, ধাতু ইত্যাদিও ছিল। আরেকটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উল্লেখ করা হয়েছে যা হল দেবতাদের অস্ত্রদের স্থাপনা করা। সাগরওয়ার কাঠামোগুলিতে মাঝের পদ্ম ইটটি ছাড়া যে আরও আটটি ইট ছিল আর তাদের প্রত্যেকটির ওপরে যে চিহ্নগুলি আঁকা ছিল সেগুলি দেবলা মিত্রের মতে আট দিকের দ্বারপালদের প্রতীক (Mitra: 1972, p. 237)। এই নিয়ে আলোচনার আগে আমরা বরং আট দিকপাল ও তাদের প্রতীকগুলির বিষয়ে অল্প জেনে নিই।
দিকপালরা হল অভিমুখ বা স্থানের প্রতিনিধি। প্রধান চার দিক, মধ্যবর্তী দিকগুলি ধরলে আটটি এবং ওপর ও নিচ ধরলে দশটি দিক হয়। হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈন বাস্তু শাস্ত্র অনুযায়ী প্রত্যেকটি দিকের জন্যে চার, আট এবং দশটি দেব-দেবী রয়েছেন। ইন্দ্র পূর্বের (পূর্ব), যম দক্ষিণের (দক্ষিণ), পশ্চিমের (পশ্চিম) বরুণ এবং উত্তরের (উত্তর) কুবের বা সোম। মধ্যবর্তী দিকগুলিতে অগ্নি, নির্ঋতি, বায়ু এবং ঈশান। ব্রহ্মা ও বিষ্ণু যথাক্রমে ঊর্ধ্ব (উপর) ও অধঃ (নিচ) দিকের দেবতা (Kayastha: 2015, 53-67)।
অষ্ট দিকপালের প্রত্যেক দেবতাকে সূচিত করতে একটি করে বিশেষ প্রতীকের সাহায্য নেওয়া হয়ে থাকে যা সারণীতে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্রহ্মার স্থান ঊর্ধ্বে তাই এঁকে মাঝে রাখা হয়। ব্রহ্মার প্রতীক পদ্ম তাই অনেক সময়ে একটি অষ্টদল (আটটি পাপড়ির)পদ্মের ওপরে আট দিকপালের অধিষ্ঠান হয়। আবার অন্যদিকে দেখুন সাগরওয়ার কাঠামোগুলিতে ঠিক মাঝে পদ্ম রাখা হয়েছে আর সেই পদ্মগুলিও সব অষ্টদল। দুইটি ধারণা যে একই উৎস থেকে উৎপত্তি হয়েছে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। প্রাচীন মন্দির-ভাস্কর্য থেকে অষ্ট দিকপালের ছবি ও সেখানে তাদের প্রতীকটিকে চিহ্নিত করে দেখানো হয়েছে। পাঠক প্রতীকগুলির গঠন ভালো করে খেয়াল করবেন কারণ পরের তুলনামূলক আলোচনায় এটি প্রয়োজনীয়।

এবারে আমরা অষ্ট দিকপালের প্রতীকের ভিত্তিতে সাগরওয়ার কাঠামোগুলির ভিত্তিভূমির ইটগুলিকে পরীক্ষা ও বিশ্লেষণ করব। প্রথমে আমরা ৮ নং কাঠামোর ইটগুলিকে দেখি। একটি ইটের ওপরে দড়ির ফাঁস দেখেই চেনা যাচ্ছে যা বাস্তু মতে হল বরুণের পাশ আর তাহলে এই ইটটি পশ্চিম দিকের হওয়া উচিত কারণ পশ্চিম দিক হচ্ছে বরুণের দিক।
এবারে দেখব যে এই ইটটিকে যদি পশ্চিমে রাখি তাহলে বাকি ইটগুলিতে আঁকা প্রতীকগুলি দিকপালদের হিসেব অনুযায়ী হচ্ছে কি না। বরুণের ঠিক উল্টোদিকে অর্থাৎ পূর্ব দিকের ইটটি তাহলে হিসেবমত ইন্দ্রের ইট হবে। ইন্দ্রের প্রতীক বজ্র আর এখানেও ইটের ওপরে বজ্র খোদাই করা আছে। এবারে আসি দক্ষিণ দিকে। দক্ষিণ দিকের দিকপাল হলেন যম যার প্রতীক হল দণ্ড।


কাঠামোর দক্ষিণ দিকের ইটেও একটি দণ্ডের ছবি খোদাই করা। উত্তরের দিকপাল হচ্ছেন কুবের এবং দক্ষিণের উল্টো দিকের ইটে কুবেরের প্রতীক গদা খোদাই করা আছে। এবারে আসব উত্তর-পূর্ব দিকের প্রসঙ্গে, অর্থাৎ ইন্দ্র ও কুবেরের মাঝে যা ঈশানের দিক। ঈশানের প্রতীক হল ত্রিশূল আর এখানেও একটি ত্রিশূলের ছবি খোদাই করা আছে। উত্তর-পশ্চিম দিক হল বায়ুর, যার প্রতীক হল ধ্বজা বা পতাকা। এখানে কুবের ও বরুণের মাঝে সত্যিই পতাকা খোদাই করা আছে। নির্ঋতি হলেন দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের দেবী যার প্রতীক হল খড়গ। এখানে বরুণ ও যমের মাঝে অর্থাৎ দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের ইটে একটি খড়গ বা তলোয়ারের ছবি খোদাই করা আছে। ইন্দ্র ও যমের মাঝে দক্ষিণ-পূর্ব দিকের দিকপাল হলেন অগ্নি যার প্রতীক হচ্ছে (অগ্নি) শিখা ও শূল। এখানে ঠিক সেই ইটটিতে একটি ত্রিকোণ আঁকা আছে যা শিখার রূপ হতে পারে আবার শূলের ফলাও হতে পারে। পাঠক এখানে ছবি ও প্রতীকের সম্বন্ধ বুঝতে অষ্ট দিকপালদের মূর্তিগুলিতে যে তাঁদের প্রতীকগুলি চিহ্নিত করা হয়েছে, সেগুলি আরেকবার দেখে নিতে পারেন।

এমন সাদৃশ্য শুধুমাত্র ৮ নং কাঠামোর সঙ্গে যে রয়েছে তা নয়, ৬ নং কাঠামোর ভিত্তিভূমির ইটগুলি পরীক্ষা করলে দেখা যাবে যে সেখানেও একই ক্রমে অষ্ট দিকপালদের প্রতীকগুলি এসেছে। শুধু এখানে দক্ষিণ-পূর্ব দিক অর্থাৎ অগ্নির ক্ষেত্রে শিখার বা শূলের অগ্রভাগের বদলে সমগ্র শূলের ছবি স্পষ্টভাবে খোদাই করা হয়েছে। আমরা আগেই দেখেছি যে অগ্নির প্রতীক দুটি হতে পারে তাই এক্ষেত্রে শূলের ব্যবহার যুক্তিযুক্ত।

বাস্তু শাস্ত্র অনুযায়ী মন্দিরের ভিত্তি নির্মাণে মাঝে পদ্মের আকারের ইট দেওয়া বিধান। এবং একই সঙ্গে এদের নীচে কলসে রত্ন জাতীয় বস্তু দিয়ে মাটির তলায় পুঁতে দিতে হবে।
বন্দা ভদ্রা জয়া পূর্ণা বিজয়া পঞ্চমী শিলা।
মঙ্গলা হ্যজিতাঽপরাজিতা চ ধরণীভবা।
শিলাং নিবেশযেত্পূর্বী পশ্চাত্পীঠনিবন্ধনম্।
জক্তায়াং শিখরে চৈব বেদিকা কলশান্তরে।
শিলোপরি সমস্তং তচ্ছিলাধশ্চোপপীঠকম্।
ইতি যুক্তির্বিধাতব্যা শিলানাং শুভলক্ষণা।
অধঃখাতে সম্পুটেষু নিধিকুম্ভাংশ্চ যোজয়েত্।
পদ্মশ্চাথ মহাপদ্মঃ শঙ্খো মকরকচ্ছপণে।
– অপরাজিতপৃচ্ছা ১৫৩.১৫-১৮
বন্দা, ভাদ্র, জয়া, পূর্ণা, বিজয়া ও পঞ্চমী নামের পাথরগুলি শুভ এবং বিজয়ের সঙ্গে সম্পূর্ণ। একে মঙ্গলা, অপরাজিত এবং অপরাজেয় বলে গণ্য করা হয়।
পাথরগুলি স্থাপন করার আগে, পূর্ব এবং পশ্চিম দিক একটি মঞ্চের সঙ্গে রাখতে হবে। এছাড়াও, শিখর এবং ভিত্তিটি একটি সীমানা দিয়ে চিহ্নিত করা উচিত।
পাথর এবং তার ভিত্তির চারপাশে, একটি উত্থিত মঞ্চ তৈরি করা উচিত। পাথরের শুভ লক্ষণগুলি চিহ্নিত করার জন্য এটি উপযুক্ত পদ্ধতি।
নীচে পদ্ম, বড়ো পদ্ম, শঙ্খ, কুমির এবং কচ্ছপ সহ ধন ভরা পাত্র রাখতে হবে।

সুতরাং ভিত্তিভূমির নয়টি ইটের রহস্যের কিছুটা হলেও সমাধান পাওয়া গেল। আটটি দিকপাল এবং কেন্দ্রে একটি পদ্ম ইট রেখে তার তলায় কলস স্থাপন করতে হবে। এর থেকে বোঝা যাচ্ছে যে এটি একটি মন্দির চত্বর ছিল যেখানে অনেকগুলি ছোটো ছোটো মন্দির ছিল। মুখার্জির রিপোর্টে রয়েছে যে সাগরওয়াতে তিনি ৪৯ ভাগে বিভক্ত জমি দেখেছিলেন।
চতুঃষষ্টিপদং কার্য দেবতা উতনং সদা। দ্বারং চ মধ্যমং তস্মিন্ সমদিক্রম্যং প্রবস্যত্
মন্দিরের স্থানটি সবসময় ৬৪ বর্গে ভাগ করা উচিত। এর মধ্যের দরজাটি চারটি দিকের মধ্যে অবস্থিত হলে অত্যন্ত শুভ।
মন্দির প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে বরাহ মিহির বলেছেন যে মন্দিরের জমিকে ৬৪ টি বর্গাকার ভাগে ভাগ করে নেওয়া উচিত। অর্থাৎ ৮ খানি সারি ও ৮ খানি স্তম্ভে সেগুলি সাজানো থাকবে। অনেকটা দাবা খেলার ছকের মতো। সাগরওয়াতে মুখার্জি ৪৯ খানি বর্গাকার ভাগ দেখেছিলেন অর্থাৎ ৭ খানি সারি (row) ৭ খানি স্তম্ভ (column)। আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে সেখানে মন্দির প্রতিষ্ঠার নিয়ম অনুযায়ী ৬৪ খানি ভাগই করা হয়েছিল। একটি সারি ও স্তম্ভ কোনো কারণে হয় খনন করা হয়নি বা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। মুখার্জির আঁকা সাগরওয়ার নকশা দেখেও সেটিকে মন্দির চত্বর বা temple complex-এর মতোই লাগে।

সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে যে এগুলি কোনো স্তূপ নয়, মন্দির। দেবলা মিত্রের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। বাস্তু শাস্ত্রের বিধান মতোই এখানে পদ্ম ইটের নীচে ঘট বা কলস পুঁতে রাখা হত তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। এমনকি ৫ নং কাঠামোর ভিত্তিভূমিতে পাঁচটি পদ্ম ইটের সমাহার দেখা গেছে। সেখানে কোনো দিকপালের প্রতীক নেই এবং সেখানে প্রত্যেকটি ইটের নীচেই একটি করে কলস পাওয়া গেছে।
এই নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে সাগরওয়ার কাঠামোগুলি আদৌ কোনো স্তূপ নয় এবং আদতে সেই স্থানটি শাক্যদের সংহার ক্ষেত্র কি না তাই নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। এইদিক দিয়ে তিলৌরাকোটের কপিলাবস্তু হওয়ার সম্ভাবনা আরেকটু কমল কারণ কপিলাবস্তু যদি পিপরাওয়ার আশপাশে হয় তাহলে শাক্যদের সংহারের স্থানও তার আশপাশে আর চীনা পরিব্রাজকদের ওপরে বিশ্বাস করলে তার উত্তর-পশ্চিমে হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

এই প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয় মনে হতে পারে যে, সাগরওয়া যদি শাক্য সংহারের স্থান নাও হয় এমন তো হতেই পারে যে এর আশপাশে হয়তো স্থানে শাক্য সংহার হয়েছিল আর তার ধ্বংসস্তূপ আদৌ খনন করা হয়নি। এই বিষয়ে আমাদের মুখার্জির শরণ নেওয়া ছাড়া আর কোনো গতি নেই কারণ তিনি ঐ স্থানটি প্রকৃতপক্ষে একজন প্রত্নতাত্ত্বিকের দৃষ্টিতে জরিপ করেছিলেন আর তেমন ধ্বংসস্তূপ থাকলে তাঁর সময়ে সেটি নজরে আসতোই। সাগরওয়ার ধ্বংসস্তূপ আদতে মন্দির হলেও আশপাশে কোনো বৌদ্ধ স্তূপের মতো ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেলেও আমরা কপিলাবস্তু হিসেবে তিলৌরাকোটকে কিছুটা সন্দেহাবসর (benefit of doubt) দিতে পারতাম কিন্তু এখানেও কোনো আলাদা ফলাফল এলো না। সাগরওয়া নিয়ে লেখার শেষভাগে তিনি বলেছেন যে সাগরওয়ার চতুর্দিকে কয়েক মাইল ঘুরেও তিনি নিজে কোনো ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাননি (Besides what are detailed above I could not find any other mounds either in the thick forest or in the open, though I walked several times and in different directions. Mukherji: 1901, 28)
কপিলাবস্তুর মতো শাক্য সংহারের স্থানও আজ রহস্যের আড়ালে রয়েছে। শাক্য সংহারের বিষয়টাই বড়ো অদ্ভুত, অভাবনীয় এক কাণ্ড। বুদ্ধের জীবনকালেই তাঁর নিজের জাতির এমন গণসংহারে তাঁর মনে নিশ্চয়ই ব্যথা লেগেছিল এই নিয়ে সন্দেহ নেই। বলা হয় যে তিন দিন তিনি যন্ত্রণায় মাথা তুলতে পারেননি। যদিও তিনি বলেছিলেন যে শাক্যরা তাদের পাপের কর্মফল ভোগ করেছে। আবার বিরূঢ়কের মৃত্যুর পর বুদ্ধ তাঁর অনুগামীদের বলেছিলেন যে এমন ঘটনা আগেও ঘটতে দেখা গেছে যে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকা গ্রাম হঠাৎ প্লাবনের জলে ভেসে গেছে। সবই কর্মফল।
পুপ্ফানি হেব পচিনন্তং
ব্যাসত্তমনসং নরং
সুত্তং গামম মহোঘোব
মচ্চুআদায় গচ্ছতি।
ফুটে ওঠা পুষ্প যেমন ঝরে যায়
পাষাণ হৃদয়ও যায় ভেসে।
ক্ষিপ্র ঘোড়া হোক বা বলিয়ান হাতি
সবাইকে যেতেই হবে শেষে।
যে ব্যক্তি পছন্দের ফুল কুড়ায়, যে ব্যক্তি ইন্দ্রিয়সুখের জন্য লোভ করে, যা পায়নি তার জন্য আকাঙ্খা করে এবং যা পেয়েছে তাকে আঁকড়ে থাকে, মৃত্যু তাকে চারটি দুঃখজনক অবস্থার সাগরে নিয়ে যায়। ঠিক একইভাবে যে গ্রামগুলো কখনও নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকে, সেগুলোও মহাপ্লাবনে ভেসে যায় সাগরে।
