গল্প
উপন্যাস
পরিশিষ্ট

তুমি সন্ধ্যার মেঘ – ৬

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ – এক

শুক্লা চতুর্দশীর চাঁদ মধ্যরাত্রির পূর্বেই মধ্যগগনে আরোহণ করিয়াছে; তিথি জানা না থাকিলে মনে হইত পূর্ণিমার চাঁদ। স্বপ্নাকুল জ্যোৎস্না নগরের মাথার উপর বর্ষিত হইতেছিল, নর্মদার জলে টলমল করিতেছিল, রাজভবনের পাষাণগাত্রে সুধা-লেপন করিয়াছিল। পুরীর পশ্চাতে আম্রকুঞ্জে একটা বপ্‌পীহ পাখি বুক-ফাটা স্বরে ডাকিতেছিল— পিয়া পিয়া পিয়া!

কিন্তু চন্দ্রালোক বা পক্ষীকূজনের প্রতি মহারাজ লক্ষ্মীকর্ণের লক্ষ্য ছিল না। দিনের কর্ম শেষ করিয়া তিনি অপরিমিত পান-ভোজন করিলেন, তারপর ঈষৎ মদ-বিহ্বল অবস্থায় শয়ন করিতে চলিলেন। অদ্যই শেষ রজনী, কাল এই মহাযজ্ঞ সমাপ্ত হইবে; রাজারা সাঙ্গোপাঙ্গ লইয়া বিদায় লাইবেন। তখন পরিপূর্ণ বিশ্রামের সময় পাওয়া যাইবে।

পালঙ্কে শয়ন করিতে গিয়া তাঁহার একটা কথা মনে পড়িয়া গেল। আজ নানা কর্মের জালে আবদ্ধ হইয়া শিল্পকর্মের তত্ত্বাবধান করা হয় নাই। অথচ আজই শেষ দিন, আজ রাত্রির মধ্যে শিল্পবস্তুটি স্বয়ংবর সভায় প্রতিষ্ঠিত করা প্রয়োজন। মধুকর সাধু অবশ্য চতুর ব্যক্তি, তাহাকে কিছু বলিতে হয় না; কি করিতে হইবে সবই সে জানে। তবু—

লক্ষ্মীকর্ণ শিল্পশালায় গেলেন। দৌবারিক দাঁড়াইয়া আকাশ-পাতাল হাই তুলিতেছিল, মহারাজ তাহাকে বলিলেন— ‘তুই যা, এবার তোর ছুটি।’

দৌবারিক দীর্ঘকাল গৃহে যায় নাই, বসন্তরজনীতে মিলনোৎসুকা বধূর কথা স্মরণ করিয়া তাহার মন বড়ই কাতর হইয়াছিল; সে রাজার পদপ্রান্তে আভূমি নত হইয়া ‘জয় হোক মহারাজ’ বলিয়া দৌড় দিল।

মুখে প্রসন্ন বিহ্বল হাস্য লইয়া রাজা শিল্পশালায় প্রবেশ করিলেন। অনঙ্গ দীপ জ্বলিয়া মূর্তির অঙ্গে শেষ বারের মত প্রসাধন দিতেছিল। কবন্ধের উপর মুণ্ড বসাইয়া মূর্তিটি এখন পূর্ণাঙ্গ হইয়াছে। মহারাজ ঘুরিয়া ফিরিয়া মূর্তি পরিদর্শন করিলেন, তারপর দুই হস্তে পেট চাপিয়া নিঃশব্দে হাসিতে আরম্ভ করিলেন। হাসি একেবারে নিঃশব্দ নয়; মাঝে মাঝে তাঁহার বদনগহ্বর হইতে খট্টাশহাস্যের ন্যায় নিগৃহীত শব্দ বাহির হইতে লাগিল। তিনি মূর্তি দেখিয়া সন্তুষ্ট হইয়াছেন তাহাতে সন্দেহ নাই।

অনন্তর কৌতুক সংবরণ করিয়া মহারাজ অনঙ্গের পৃষ্ঠে সস্নেহ চপেটাঘাত করিলেন, বলিলেন— ‘সাধু! আজ থেকে তুমি আমার সভাশিল্পী। উপস্থিত এই পুরস্কার নাও।’ তিনি নিজের অঙ্গুরীয়ক খুলিয়া অনঙ্গকে দিলেন— ‘এখন মূর্তিটা স্বয়ংবর সভায় বসাতে হবে। তুমি একা পারবে?’

অনঙ্গ বলিল— ‘পারব মহারাজ। যদি না পারি, লোক যোগাড় করে নেব।’

‘ভাল। কিন্তু দেখো, বেশি জানাজানি না হয়।’ বলিয়া মহারাজ আর একবার পেট চাপিয়া হাস্য করিলেন, তারপর শয়ন করিতে গেলেন। স্বয়ংবরের সমস্ত আয়োজন সম্পূর্ণ হইয়াছে।

অনঙ্গ দু’দণ্ড অপেক্ষা করিল, তারপর প্রদীপ ঘরের কোণে সরাইয়া রাখিয়া বাহির হইল।

রাজভবনের জ্যোৎস্নাপ্লাবিত পুরঃপ্রাঙ্গণ শূন্য। নবগঠিত স্বয়ংবর সভা বিস্তীর্ণ ভূমির মাঝখানে বিপুলায়তন শুভ্র বুদ্বুদের ন্যায় শোভা পাইতেছে; সেখানেও লোকজন নাই। কিন্তু তোরণের প্রতীহার ভূমিতে প্রহরী আছে। অনঙ্গ সেখানে উপস্থিত হইলে একজন প্রহরী জিজ্ঞাসা করিল— ‘কে তুমি? কোথা যাও?’

অনঙ্গ বলিল— ‘আমি রাজশিল্পী মধুকর সাধু। একজন লোক ডাকতে যাচ্ছি।’

‘এত রাত্রে?’

‘হাঁ, রাজার আদেশ।’

‘রাজার আদেশ?’

‘হাঁ। এই দেখ রাজার অঙ্গুরীয়।’

অঙ্গুরীয় দেখিয়া প্রহরী বলিল— ‘রাজশিল্পী মহাশয়, আপনি যথা ইচ্ছা যেতে পারেন। কখন ফিরবেন?’

‘লোক পেলেই ফিরব। দু’তিন দণ্ড লাগবে।’

চন্দ্রালোকে অনঙ্গ নগরের দিকে চলিল। নগর নিদ্রালু, পথ জনবিরল। চতুষ্পথের উপর জ্যোতিষাচার্য রন্তিদেবের গৃহে দীপনির্বাণ হইয়াছে। অনঙ্গ দ্বারে করাঘাত করিল।

বিগ্রহপাল জাগিয়া ছিলেন। তিনি জানিতেন রাত্রে কোনও সময় অনঙ্গ আসিবে। দুই বন্ধু কণ্ঠলগ্ন হইলেন। রন্তিদেবও বোধ করি নিদ্রা যান নাই, তিনিও আসিয়া জুটিলেন।

অন্ধকার কক্ষে চুপি চুপি কথা হইল। বিগ্রহপাল প্রস্তুত হইলেন। অসময়ে কিছু খাদ্যপানীয় গলাধঃকরণ করিলেন। পেটরা হইতে অগ্নিকন্দুক বাহির করিয়া কবচের ন্যায় বক্ষে ঝুলাইয়া লইলেন। তারপর দুই বন্ধু রন্তিদেবের পদ বন্দনা করিলেন; হয়তো এ যাত্রা আর সাক্ষাৎ হইবে না। রন্তিদেব আশীর্বাদ করিলেন— ‘সর্বস্তরতু দুর্গাণি—। আমি সভায় উপস্থিত থাকব।’

রন্তিদেবের গৃহ হইতে নিষ্ক্রান্ত হইয়া দুইজনে রাজভবনে ফিরিয়া চলিলেন। নগর এতক্ষণে নিশুতি হইয়া গিয়াছে, চাঁদ পশ্চিমে ঢলিয়া পড়িয়াছে। দুইজনের পদশব্দ শূন্য পথে ধ্বনিত হইতে লাগিল।

রাজভবনের তোরণদ্বারে প্রহরীরা ঝিমাইতেছিল, অনঙ্গ ও তাহার সাথীর আগমনে চক্ষু তুলিয়া চাহিল। অনঙ্গকে চিনিতে পারিয়া নীরবে পথ ছাড়িয়া দিল।

দুইজনে প্রথমে শিল্পশালায় গেলেন। সেখান হইতে মূর্তি বহন করিয়া স্বয়ংবর সভায় প্রবেশ করিলেন।

দুই

কাক কোকিল ডাকার সঙ্গে সঙ্গে রাজপুরী জাগিয়া উঠিল। চারিদিকে হৈ হৈ হট্টগোল ছুটাছুটি আরম্ভ হইয়া গেল।

যৌবনশ্রী কাল বীরশ্রী ও বান্ধুলির সহিত অনেক রাত্রি পর্যন্ত পর্যঙ্কে বসিয়া জল্পনা কল্পনা করিয়াছিলেন; তারপর বীরশ্রী নিজ কক্ষে শয়ন করিতে গিয়াছিলেন, যৌবনশ্রীও শয়ন করিয়াছিলেন। বান্ধুলি তাঁহার পায়ের কাছে শুইয়া ঘুমাইয়াছিল। প্রভাত হইতে বীরশ্রী একদল সখী সঙ্গে লইয়া উপস্থিত হইলেন।

বীরশ্রী হাসিমুখে ডাকিলেন— ‘ওঠ্‌ যৌবনশ্রী, বিয়ের দিনে অত ঘুমতে নেই। গ্রহাচার্য বলেছেন, সূর্যোদয়ের সাড়ে সাত দণ্ড পরে শুভকর্মের লগ্ন।’

সখীরা কলকণ্ঠে হুলুধ্বনি করিল। যৌবনা শয্যাত্যাগ করিলেন। বীরশ্রী বান্ধুলিকে বলিলেন, ‘তুই বাড়ি যা। একেবারে সাজগোজ করে তৈরি হয়ে আসিস।’

ব্যবস্থা পূর্ব হইতে স্থির হইয়াছিল। বান্ধুলি চলিয়া গেল।

সখীরা যৌবনশ্রীর হাত ধরিয়া স্নানাগারে লইয়া গেল। সেখানে তাঁহাকে পীঠিকার উপর বসাইয়া প্রথমে গোধূমচূর্ণ ও দুধের সর দিয়া গাত্র-মার্জন করিয়া দিল; পরে চন্দন হরিদ্রা মিশ্রিত জলে গা ধুইয়া দিল; তারপর পুস্পসুবাসিত জলে স্নান করাইল। সঙ্গে সঙ্গে কত রঙ্গ-রস হাস্য পরিহাস চলিল। স্নানান্তে যৌবনশ্রী রক্ত পট্টাম্বর পরিধান করিলেন।

স্নানাগার হইতে প্রসাধন গৃহ। এখানে সোনার থালায় সজ্জিত বহু রত্নালঙ্কার তো ছিলই, উপরন্তু স্তবকে স্তবকে নানা জাতীয় পুষ্প পুঞ্জীকৃত হইয়াছিল; অশোক কর্ণিকার নবমল্লিকা চম্পা কুরুবক সিন্ধুবার কুন্দ কুসুম্ভ। বহু পৌরনারী বসিয়া মালা গাঁথিতেছিল। কেহ কাঞ্চনপাত্রে পুষ্প চন্দন অগুরু সাজাইতেছিল। একটি তরুণী মালিনী দূর্বাখচিত মধুকমালা রচনা করিতেছিল; এই মালা গলায় দিয়া রাজকন্যা স্বয়ংবর সভায় যাইবেন। বরমাল্য প্রস্তুত হইয়াছে; যূথীপুষ্পের ঘনসংবদ্ধ স্থূল মাল্য। ইহা একজন সখী সুবর্ণস্থালীতে লইয়া কন্যার পিছে পিছে যাইবে; কন্যা তাহার নিকট হইতে মাল্য লইয়া ঈপ্সিত বরের গলায় দিবেন।

যৌবনশ্রীকে প্রসাধন কক্ষে লইয়া গিয়া সখীরা তাঁহাকে মাঝখানে বসাইয়া সর্বাঙ্গে রত্নালঙ্কার পরাইল। কিন্তু আজ শুধু রত্নালঙ্কার নয়, পুষ্পভূষাও চাই। প্রতিটি রত্নালঙ্কারের সঙ্গে অনুরূপ পুষ্পাভরণ। সখীরা তাঁহার সিক্ত কেশ ধূপের ধুঁয়ায় শুকাইয়া কবরী রচনা করিল, চূড়াপাশে কুরুবকের গুচ্ছ আরোপ করিল, কর্ণে দিল যবাঙ্কুরের অবতংস। চক্ষে কজ্জল, ললাট ঘিরিয়া গণ্ড পর্যন্ত শ্বেতচন্দনের তিলক, কণ্ঠে মুক্তাহারের সঙ্গে দূর্বা-মধুকের মালা। বাহুতে মাণিক্যের সহিত চম্পার কেয়ূর, প্রকোষ্ঠে বজ্রমণির কঙ্কণের সহিত জড়িত কুন্দকলির মণিবন্ধ; কটিতে হিরন্ময় চন্দ্রহারের সমান্তরালে অশোকপুষ্পের রশনা। কেবল চরণে ফুলের অলঙ্কার নাই, অলক্তরাগের উপর সোনার গুঞ্জরী নূপুর। সুন্দরীর অঙ্গে ফুলের আভরণ যতই শোভাবর্ধন করুক, পায়ে সোনার মঞ্জীর না থাকিলে প্রতি পদক্ষেপে ঝঙ্কার উঠিবে কি করিয়া!

প্রসাধন সম্পূর্ণ হইলে যৌবনশ্রী সোনার বাণ হাতে উঠিয়া দাঁড়াইলেন, যেন পূর্বগগনে অরুণোদয় হইল। সখীরা ঘিরিয়া ঘিরিয়া হুলুধ্বনি করিল, শঙ্খ বাজাইল।

হঠাৎ অপ্রত্যাশিতভাবে মহারাজ লক্ষ্মীকর্ণ কক্ষে প্রবেশ করিলেন। মুহূর্তমধ্যে কল-কোলাহল শান্ত হইল। তিনি একবার কক্ষের চতুর্দিকে দৃষ্টি ফিরাইলেন, তারপর ইঙ্গিতপূর্ণ হস্তসঞ্চালন করিলেন; ইন্দ্রজালের ন্যায় কক্ষ শূন্য হইয়া গেল। কেবল যৌবনশ্রী রহিলেন।

সালঙ্কারা কন্যাকে দেখিয়া লক্ষ্মীকর্ণের হৃদয় গর্বে ভরিয়া উঠিল। হাঁ, স্বয়ংবর দিবার মত কন্যা বটে, রাজাগুলার মুণ্ড ঘুরিয়া যাইবে। তিনি কন্যার কাছে আসিয়া দাঁড়াইলেন। যৌবনশ্রী নতজানু হইয়া পিতাকে প্রণাম করিলেন।

যৌবনশ্রীর মস্তক আঘ্রাণ করিয়া লক্ষ্মীকর্ণ বলিলেন, ‘চিরায়ুষ্মতী হও। আজ তোমাকে দেখে তোমার মায়ের কথা মনে পড়ছে। তিনিও একদিন এমনি বেশে সজ্জিত হয়ে চেদিরাজ্যে এসেছিলেন।’

যৌবনশ্রী নতনেত্রে রহিলেন, তাঁহার ঠোঁট দুটি একটু কাঁপিয়া উঠিল।

লক্ষ্মীকর্ণ তখন বলিলেন— ‘কন্যা, আজ তোমার জীবনের এক সন্ধিক্ষণ। অনেক পাণিপ্রার্থীদের মধ্যে একজন যোগ্যপাত্রকে বেছে নিতে হবে। কিন্তু তুমি বালিকা। জীবনের কোনও অভিজ্ঞতাই তোমার নেই। তাই আমার কর্তব্য তোমাকে পরিচালন করা। যে রাজারা স্বয়ংবরে এসেছেন তাঁদের সকলকে আমি চিনি। তাঁদের মধ্যে তোমার পাণিগ্রহণের যোগ্য যদি কেউ থাকে তো সে কর্ণাটের যুবরাজ বিক্রমাদিত্য। তাঁর মত শক্তিধর যুবরাজ ভারতবর্ষে আর নেই। তিনি বয়সে প্রবীণ, চঞ্চলমতি যুবক নয়। তাঁর গলায় বরমাল্য দিলে তুমি সুখী হবে।’

যৌবনশ্রী এবারও নতনেত্রে রহিলেন। লক্ষ্মীকর্ণ পুনশ্চ বলিলেন— ‘রূপবান রাজপুত্র পৃথিবীতে অনেক আছে, কিন্তু তারা মহাকাল ফল; তাদের চাকচিক্য ছলাকলায় ভুলো না। — লগ্নের আরও দণ্ড দুই বাকি আছে, আমি সভায় চললাম রাজাদের অভ্যর্থনা করতে। তুমি যথাসময় সভায় যাবে। আমার কথা মনে থাকবে তো? কর্ণাটের যুবরাজ বিক্রমাদিত্য।’

যৌবনশ্রী উত্তর দিলেন না, পূর্ববৎ ভূমিলগ্ন নয়নে রহিলেন। মৌনং সম্মতিলক্ষণম্‌ মনে করিয়া লক্ষ্মীকর্ণ পরিতুষ্ট হইলেন। যৌবনশ্রী বড় ভাল মেয়ে, কখনও অবাধ্য হয় নাই। তিনি কন্যার পৃষ্ঠে সস্নেহে হাত বুলাইয়া প্রস্থান করিলেন।

তিন

বান্ধুলি গৃহে ফিরিয়া দেখিল গৃহের দ্বার খুলিয়াছে। সম্মুখে কেহ নাই। সে ভিতরে প্রবেশ করিয়া প্রথমে অনঙ্গের কক্ষের দ্বার ঠেলিল। কক্ষে অনঙ্গ নাই; শিল্পকর্মগুলি যেমন ছিল তেমনি সাজানো রহিয়াছে।

দরজা ভেজাইয়া দিয়া বান্ধুলি বেতসীর শয়নকক্ষে গেল। বেতসী রাত্রির বাসি কাপড় ছাড়িতেছিল। বান্ধুলি বলিল— ‘কুটুম কোথায়?’

বেতসী গাল ফুলাইয়া বলিল— ‘কুটুম সারা রাত্রি বাড়ি আসেনি। রাজকার্য।’

বান্ধুলি বেতসীর আরও কাছে গিয়া দাঁড়াইল। ধরা ধরা গলায় বলিল— ‘দিদি—’

বেতসী আঁচল কাঁধে ফেলিয়া বলিল— ‘তুই আজ সকালে এলি যে? স্বয়ংবরে থাকবি না?’

বান্ধুলি গলদশ্রু নেত্রে বলিল— ‘দিদি, আজ আমি চলে যাচ্ছি।’

‘চলে যাচ্ছিস?’ বেতসী সশব্দে নিশ্বাস টানিল।

‘জীবনে তোর সঙ্গে আর বোধ হয় দেখা হবে না’— বান্ধুলি দিদির কাঁধে মাথা রাখিয়া কাঁদিতে লাগিল।

বেতসী হ্রস্বকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল— ‘সব কথা আমায় বলবি?’

বান্ধুলি বলিল— ‘পরে সবই জানতে পারবি। এখন তোর শুনে কাজ নেই।’

এই সময় লম্বোদর দ্বার দিয়া উকি মারিল। সে সাঙ্গোপাঙ্গ সহ সমস্ত রাত্রি রাজাদের শিবিরের আনাচে কানাচে ঘুরিয়া এখন গৃহে ফিরিয়াছে। আবার স্বয়ংবর সভায় উপস্থিত থাকিতে হইবে। একটু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হইয়া লওয়া প্রয়োজন। শয়নকক্ষের দ্বারের কাছে আসিয়া সে বান্ধুলির কণ্ঠস্বর শুনিতে পাইল।

সে কক্ষে প্রবেশ করিয়া বলিল— ‘বান্ধুলি কাঁদছে কেন?’

বান্ধুলি চমকিয়া মুখ তুলিল, লম্বোদরকে দেখিয়া একেবারে কাঠ হইয়া গেল। বেতসী কিন্তু তৎক্ষণাৎ সামলাইয়া লইয়া বলিল— ‘তুমি এলে! বাবা ধন্যি রাজকার্য।’

লম্বোদর সন্দিগ্ধভাবে তাহাদের নিরীক্ষণ করিয়া আবার প্রশ্ন করিল— ‘কাঁদে কেন?’

‘আমি মেরেছি।’ বেতসী হাসিয়া উঠিল; পরক্ষণেই কণ্ঠস্বর গাঢ় করিয়া বলিল— ‘কাঁদবে না? আজ ওর প্রিয়সখীর স্বয়ংবর, কাল তিনি স্বামীর ঘরে চলে যাবেন। ইহজন্মে হয়তো আর দেখা হবে না। তাই কাঁদছে।’

কথাটা এমন কিছু অবিশ্বাস্য নয়, কিন্তু লম্বোদরের মনে প্রত্যয় জন্মিল না। ভিতরে ভিতরে কী যেন একটা ঘটিতেছে, একটা পারিবারিক ষড়যন্ত্র অলক্ষিতে ঘরের কোণে জাল বুনিতেছে। লম্বোদরের মন স্বভাবতই রহস্যভেদী, যেখানে অন্ধকার সেখানেই তার মন উঁকিঝুঁকি মারে; কিন্তু এখন এদিকে দৃষ্টি দিবার অবসর নাই। পরে ইহার নিরাকরণ করিতে হইবে। লম্বোদর উত্তরীয় এবং পাগ খুলিয়া বেশ পরিবর্তনের উপক্রম করিল। বান্ধুলি তাহাকে পাশ কাটাইয়া নিজের ঘরে চলিয়া গেল।

লম্বোদর বেশিক্ষণ রহিল না। বেশ পরিবর্তন করিয়া কিছু জলপান মুখে দিয়া বাহির হইয়া গেল। কেবল যাইবার পূর্বে বেতসীকে একটা প্রশ্ন করিল— ‘অতিথি এসেছিল?’

বেতসী বলিল— ‘কৈ না তো।’—

বান্ধুলি নিজের ঘরে গিয়া তাড়াতাড়ি সাজসজ্জা করিল। দৃষ্টি আকর্ষণ করে এমন কিছু পরিল না; সাধারণ মেঘডম্বর শাড়ি, বাসন্তীরঙের কাঁচুলি, সোনার চিল্‌মীলিকা, কানে সোনার ফুল। পায়ের নূপুর খুলিয়া ফেলিল। আর যে দুই চারিটি সোনার অলঙ্কার ছিল তাহা কর্পটে বাঁধিয়া কোমরে গুজিয়া লইল।

ঘরের বাহিরে আসিয়া সে দেওয়ালে মাথা ঠেকাইয়া গৃহদেবতাকে প্রণাম করিল। তারপর দিদির গলা ধরিয়া আর একবার কাঁদিল। তারপর রাজপুরীতে ফিরিয়া চলিল।

চার

স্বয়ংবর সভায় রাজারা আসিতে আরম্ভ করিয়াছেন। সভার প্রধান দ্বারে মহারাজ লক্ষ্মীকর্ণ জামাতা জাতবর্মা এবং অন্যান্য পারিষদবর্গকে লইয়া বিরাজ করিতেছেন; মাল্যচন্দনের থালা হাতে বহু কিঙ্করীও উপস্থিত আছে। প্রত্যেক রাজার আগমনের সঙ্গে তোরণ দ্বারে গিড়িগিড়ি শব্দে দুন্দুভি বাজিতেছে। রাজারা যানবাহন হইতে অবতরণ করিয়া একটি বা দুইটি বয়স্যসহ স্বয়ংবর সভার দ্বারে উপস্থিত হইলে মাল্যচন্দন দ্বারা অভ্যর্থিত হইতেছেন এবং সভামধ্যে আপন নির্দিষ্ট আসনে অধিষ্ঠিত হইতেছেন।

এইখানে স্বয়ংবর সভার একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা অপ্রাসঙ্গিক হইবে না।

সভামণ্ডপের গঠন অনেকটা মৎস্যাকৃতি। দুই প্রান্তে দুইটি প্রধান প্রবেশ দ্বার, তাছাড়া আরও কয়েকটি ছোট ছোট দ্বার আছে। মৎস্যমুখের দিকে যে দ্বার তাহার শোভা অধিক, এই দ্বার দিয়া রাজারা প্রবেশ করিবেন। ল্যাজের দিকের দ্বারটি অপেক্ষাকৃত সাদামাটা, এই পথে গণ্যমান্য নাগরিকেরা আসিয়া সভারূঢ় হইবেন। স্বয়ংবর সর্বজনগম্য অনুষ্ঠান, সকলে তাহা প্রত্যক্ষ করিবে ইহাই রীতি।

সভামণ্ডপের অভ্যন্তরে প্রবেশ করিলে দেখা যায় চতুর্দিকের দারু প্রাচীর নানা চিত্রকলায় শোভিত; হরপার্বতীর বিবাহের দৃশ্য, রামচন্দ্রের হরধনুভঙ্গ; দেব দেবী যক্ষিণী রক্ষিণী। তন্মধ্যে ইন্দ্রাণীর মূর্তি প্রধান; ইন্দ্রাণী স্বয়ংবরের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। দারু প্রাচীরের ঊর্ধ্বে শুভ্র বস্ত্রের আবরণ। বস্ত্রাবরণ ভেদ করিয়া উজ্জ্বল দিবালোক মণ্ডপ মধ্যে প্রবেশ করিতেছে। ভূমির উপর দূর্বাশ্যামল আস্তরণ। আস্তরণের উপর বীথি রচনা করিয়া দুই সারি ক্ষুদ্র মণ্ডপ সমব্যবধানে এক প্রান্ত হইতে অন্য প্রান্তে চলিয়া গিয়াছে; এগুলি রাজাদের বসিবার আসন। বীথি যেখানে শেষ হইয়াছে সেখানে নাগরিকদের বসিবার জন্য বিস্তৃত বেদী।

রাজাদের বসিবার মণ্ডপগুলি চূড়াযুক্ত মন্দিরের মত দেখিতে। তাহাদের মাথায় নানাবর্ণের কেতন উড়িতেছে। মণ্ডপের সম্মুখভাগ উন্মুক্ত, তিন ধাপ সোপান আরোহণ করিলে প্রশস্ত সিংহাসন। সিংহাসনে একাধিক লোক বসিতে পারে। মণ্ডপ ও সিংহাসন পুষ্পমালায় সজ্জিত।

রাত্রি প্রভাত হইবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে মণ্ডপে নাগরিক সমাগম আরম্ভ হইয়াছে; মঞ্চে তিল ধারণের স্থান নাই। স্বয়ংবর দর্শনের সৌভাগ্য ইতিপূর্বে অনেকেরই হয় নাই; সকলে বসিয়া চাপা উত্তেজনার সহিত জল্পনা করিতেছেন; মণ্ডপের এটা ওটা লইয়া আলোচনা হইতেছে। একটি মণ্ডপের সম্মুখে সূক্ষ্ম বস্ত্রের যবনিকা ঝুলিতেছে; ইহার মধ্যে কী আছে এই লইয়া অনেকের মধ্যে বিতণ্ডা চলিতেছে। কেহ বলিতেছেন স্বয়ং রাজকুমারী ওখানে লুক্কায়িত আছেন; কেহ বলিতেছেন, না ওখানে বসিয়া আছেন বীরশ্রীর স্বামী জাতবর্মা, যৌবনশ্রীও তাঁহাকেই মাল্যদান করিবেন। কিন্তু কাহারও অনুমান সন্তোষজনক হইতেছে না।

নাগরিকদের মঞ্চের এক পাশে প্রবেশ-পথের নিকটে লম্বোদর আসিয়া বসিয়াছে এবং নাগরিকদের কথাবার্তা শুনিতেছে। তাহার দলের অন্য চরেরাও নাগরিকদের মধ্যে ইতস্তত বসিয়া আছে। আজ স্বয়ংবর সভার অভ্যন্তর ভাগে দৃষ্টি রাখা তাহাদের কাজ।

লম্বোদরের চক্ষুকর্ণ যদি স্বয়ংবর সভার পরিধির মধ্যে আবদ্ধ না থাকিয়া সভার পশ্চাদ্ভাগে সঞ্চারিত হইত তাহা হইলে সে বিশেষ বিচলিত হইত সন্দেহ নাই। মণ্ডপের পিছন দিকে একটি নিভৃত স্থানে অনঙ্গ দাঁড়াইয়া ছিল; তাহার দুই পাশে দুইটি ঘোড়া, রোহিতাশ্ব এবং দিব্যজ্যোতি। অদূরে একটি লতাকুঞ্জের আড়ালে দাঁড়াইয়া বান্ধুলি সঙ্কেত ধ্বনির অপেক্ষা করিতেছিল। পুরপ্রাঙ্গণ হইতে বাহির হইবার এই দিকে একটি স্বতন্ত্র দ্বার আছে, ভৃত্যদের যাতায়াতের পথ।

ওদিকে সভার সম্মুখদিকে গিড়িগিড়ি দুন্দুভি বাজিতেছে; রাজারা একে একে আসিয়া স্বয়ংবর সভায় নির্দিষ্ট মণ্ডপে বসিতেছেন। সকলের দেহে বিচিত্র সজ্জা; অঙ্গদ কুণ্ডল কেয়ূর কাঞ্চি মুক্তাহার। সেকালে পুরুষ ও স্ত্রীলোকের বসনভূষণে বিশেষ পার্থক্য ছিল না। অবশ্য রাজারা সভারোহণ কালে কটিতে তরবারি ধারণ করিতেন।

যা হোক, রাজারা নিজ নিজ মণ্ডপে বসিয়া তাম্বূলচর্বণ করিতে করিতে বয়স্যের সঙ্গে মৃদুকণ্ঠে রসালাপ করিতে লাগিলেন। ক্রমে মণ্ডপগুলি পূর্ণ হইয়া উঠিল। সর্বশেষে আসিলেন কর্ণাটের বিক্রমাদিত্য। প্রৌঢ় বয়স্ক পুরুষ, কিন্তু রত্নালঙ্কারে তাঁর দেহের কঠিন পৌরুষ ঢাকা পড়ে নাই। তিনি কোনও দিকে ভ্রূক্ষেপ না করিয়া নিজ আসনে উপবিষ্ট হইলেন।

অতঃপর লগ্নকাল উপস্থিত হইলে স্বয়ংবর-কন্যার চতুর্দোলা সভার দ্বারে উপস্থিত হইল।

পাঁচ

রাজপুরীর সিংহদ্বার হইতে স্বয়ংবর সভার কদলীস্তম্ভ শোভিত প্রধান প্রবেশ-পথ যদিও মাত্র এক রজ্জু দূরে তথাপি রাজকন্যা চতুর্দোলায় আরোহণ করিয়া স্বয়ংবর সভায় আসিলেন। যাহা চিরাচরিত রীতি তাহা পালন করিতে হইবে। একদল সখী চতুর্দোলার অগ্রে ও পশ্চাতে লাজাঞ্জলি বর্ষণ করিতে করিতে আসিল। শঙ্খধ্বনি ও হুলুধ্বনিতে আকাশ পূর্ণ হইল।

রাজকুমারী সভাদ্ধারে চতুর্দোলা হইতে অবতরণ করিলেন, যেন মেঘলোক হইতে হিরন্ময়ী বিদ্যুল্লতা নামিয়া আসিল। রাজা লক্ষ্মীকর্ণ কন্যার বাহু ধরিয়া সভামধ্যে লইয়া গেলেন, জাতবর্মা রাজপুরোহিত ও ভট্ট প্রভৃতি সঙ্গে রহিলেন।

রাজগণ এযাবৎ শ্লথভাবে অবস্থান করিতেছিলেন, যৌবনশ্রীর আবির্ভাবে জ্যা-বদ্ধ ধনুর ন্যায় টান হইয়া বসিলেন, তাঁহাদের স্নায়ুতন্তু যেন টঙ্কার দিয়া উঠিল। তাঁহাদের সম্মিলিত চক্ষু একঝাঁক তীরের মত যৌবনশ্রীর উপর গিয়া পড়িল।

সভার অপরপ্রান্তে নাগরিকবৃন্দের মধ্যেও সাড়া পড়িয়া গিয়াছিল। তাঁহারা সারসের মত গলা উঁচু করিয়া একদৃষ্টে রাজকুমারীকে নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। একটি অস্ফুট হর্ষ-গুঞ্জন তাঁহাদের মধ্য হইতে উত্থিত হইল।

লক্ষ্মীকর্ণ এতক্ষণে কন্যাকে লইয়া রাজমণ্ডপ শ্রেণীর পুরোভাগে আসিয়া দাঁড়াইয়াছেন। তিনি পুরোহিতকে ইঙ্গিত করিলেন; পুরোহিত সম্মুখে আসিয়া গভীরকণ্ঠে মন্ত্রোচ্চারণপূর্বক স্বস্তিসূচনা করিলেন। তারপর রাজার ইঙ্গিতে সম্মুখে আসিলেন ভট্ট। সে সময় প্রত্যেক রাজার একজন করিয়া ভাট থাকিত, ভাটেরা ছিল রাজাদের বাক্প্রতিভূ। সদসি বাক্পটুতা সকল রাজার ছিল না, ভাটেরা রাজার বক্তব্য নিপুণভাবে প্রকাশ করিত। লক্ষ্মীকর্ণের ভাট একজন সৌম্যাকান্তি প্রৌঢ় ব্রাহ্মণ; মুণ্ডিত শীর্ষে সুপুষ্ট শিখা, স্কন্ধে উপবীত, অধরে একটু সরস হাস্য। ভাট মহাশয় প্রথমে রাজাদের সম্বোধন করিয়া রাজকুমারীর পরিচয় দিলেন, তাঁহার বংশগরিমা কীর্তন করিলেন; তারপর রাজকুমারীকে সম্বোধন করিয়া একে একে রাজাদের পরিচয় দিলেন। পরিশেষে মুখের একটি চটুল ভঙ্গি করিয়া বলিলেন— ‘রাজনন্দিনি, সকল রাজা ও রাজপুত্রের গৌরব-গরিমার কথা তোমাকে শুনিয়েছি, কেবল একটি রাজপুত্রের কথা এখনও বলা হয়নি। ওই যে আবরণের অন্তরালে মণ্ডপটি প্রচ্ছন্ন রয়েছে ওতে বিরাজ করছেন মগধের যুবরাজ পরম শ্রীমন্ত বিগ্রহপাল।’

যৌবনশ্রী অবিচলিত মুখে নির্দিষ্ট মণ্ডপের দিকে চাহিলেন। রাজারা একসঙ্গে সেইদিকে ঘাড় ফিরাইলেন। মণ্ডপের আবরণ ধীরে ধীরে সরিয়া যাইতেছে। রাজারা দেখিলেন, মণ্ডপের মধ্যে বসিয়া আছে এক নরাকৃতি মর্কটমূর্তি। তাহার সর্বাঙ্গ দীর্ঘ কপিশ লোমে আবৃত, কিন্তু মুখখানা সম্পূর্ণ বানরাকৃতি নয়। যাঁহারা বিগ্রহপালকে পূর্বে দেখিয়াছেন তাঁহাদের চিনিতে কষ্ট হইল না, মূর্তির মুখের সহিত মগধের যুবরাজের যথেষ্ট সাদৃশ্য আছে।

রাজারা এই উপাদেয় রসিকতা প্রাণ ভরিয়া উপভোগ করিলেন। কর্ণাটের বিক্রমাদিত্যের কঠোর অধরে একটু বক্র হাসি দেখা দিল; অন্য সকলে অট্টহাস্য করিয়া আকাশ বিদীর্ণ করিলেন।

অতঃপর রাজকীয় হর্ষোল্লাস প্রশমিত হইলে সভার মূল ক্রিয়া আরম্ভ হইল, রাজকন্যা পতিবরণে অগ্রসর হইলেন। আগে আগে চলিলেন ভট্ট, তাঁহার পিছনে যৌবনশ্রী; যৌবনশ্রীর পশ্চাতে হেমস্থালীতে বরমাল্য লইয়া এক সখী, তারপর নানা উপচার বহন করিয়া অন্যান্য সখীরা।

মহাকবি কালিদাস রঘুবংশের ষষ্ঠ সর্গে স্বয়ংবরের যে বর্ণনা রাখিয়া গিয়াছেন তাহার পর স্বয়ংবরের বর্ণনা লিখিতে যাওয়া ঘোরতর ধৃষ্টতা। তবু কালিদাস যে সময়ে লিখিয়াছিলেন তাহার পর কয়েক শতাব্দী কাটিয়া গিয়াছে, রীতি নীতি আচারের কিছু পরিবর্তন ঘটিয়াছে। কালিদাসের কালে পরিচারিকা স্বয়ংবর-কন্যার সঙ্গে থাকিয়া রাজাদের পরিচয় দিত, অধুনা ভট্ট সেই কাজ করিতেছেন। কিন্তু মোটের উপর আচার অনুষ্ঠান প্রায় একই প্রকার আছে। তাই, যাঁহারা ইন্দুমতীর স্বয়ংবর পড়িয়াছেন তাঁহাদের কাছে স্বয়ংবর সভার ক্রিয়াকলাপের বিস্তারিত বর্ণনা নিষ্প্রয়োজন।

লক্ষ্মীকর্ণ জাতবর্মা প্রভৃতি দাঁড়াইয়া রহিলেন, ভট্ট মহাশয় এক রাজার মণ্ডপ হইতে অন্য রাজার মণ্ডপের দিকে যৌবনশ্রীকে লইয়া চলিলেন। এবার রাজাদের পূর্ণ পরিচয় না দিয়া কেবল নামধামের উল্লেখ করিলেন; ক্ষণেক দাঁড়াইয়া যৌবনশ্রীর পানে তাকাইলেন; তারপর আবার অগ্রসর হইলেন। যে-রাজা পিছনে পড়িলেন তাঁহার মুখ অন্ধকার হইয়া গেল, যিনি সম্মুখে আছেন তাঁহার মুখ এখনও উজ্জ্বল হইয়া আছে। অন্ধকার রাত্রে কেহ যেন দীপ হস্তে রাজপথ দিয়া চলিয়াছে; সম্মুখে আলো, পিছনে অন্ধকার।

এইরূপে কয়েকটি রাজমণ্ডপ অতিক্রম করা হইল। কর্ণাটকুমার বিক্রমাদিত্য ও আরও কয়েকজন রাজার মণ্ডপ এখনও বাকি আছে, যৌবনশ্রী বিগ্রহপালের মণ্ডপ-সম্মুখে উপনীত হইলেন। নাগরিক সঙেঘর মধ্য হইতে একটি গুঞ্জন উত্থিত হইয়াই শান্ত হইল। ভট্ট মহাশয় বঙ্কিম হাসিয়া বলিলেন— ‘রাজকুমারি, ইনি পাটলিপুত্রের যুবরাজ বিগ্রহপাল।’ বলিয়া রাজকুমারীর মুখের পানে না চাহিয়াই সম্মুখে চলিতে আরম্ভ করিলেন।

রাজকুমারী কিন্তু চলিলেন না। তিনি কিছুক্ষণ মণ্ডপস্থ মর্কটমূর্তির পানে চাহিয়া রহিলেন, তারপর প্রধানা সখীর দিকে ফিরিয়া স্থালী হইতে বরমাল্য তুলিয়া লইলেন।

সভায় যেটুকু শব্দ ছিল তাহাও এবার নিস্তব্ধ হইয়া গেল। ভট্ট থমকিয়া পিছু ফিরিলেন। দূরে সভার দ্বারমুখে মহারাজ লক্ষ্মীকর্ণের বিরাট দেহ অকস্মাৎ কঠিন হইয়া উঠিল। তিনি চক্ষু কুঞ্চিত করিয়া চাহিলেন।

যৌবনশ্রী মূর্তির দিকে ফিরিয়া কম্পিত মৃদুস্বরে ডাকিলেন— ‘কুমার।’

মূর্তি নড়িয়া উঠিল, তারপর উল্টাইয়া পিছন দিকে পড়িল। রাজারা তড়িৎপৃষ্টের ন্যায় স্ব স্ব মণ্ডপে দাঁড়াইয়া উঠিলেন, দেখিলেন মূর্তির নিম্নভাগের শূন্য কোটর হইতে এক যুবাপুরুষ বাহির হইয়া যৌবনশ্রীর সম্মুখে দাঁড়াইল; যৌবনশ্রী তাহার গলায় বরমাল্য পরাইয়া দিলেন।

লোমহর্ষণ কাণ্ড! সমস্ত সভা একসঙ্গে কোলাহল করিয়া উঠিল। মহারাজ লক্ষ্মীকর্ণের ব্যাঘ্র-চক্ষুতে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ স্ফুরিত হইল। নাগরিকমণ্ডলীর ভিতর হইতে কে একজন তীক্ষ্ণোচ্চকণ্ঠে বলিয়া উঠিল— ‘ধন্য! রাজকুমারী সত্যকার বিগ্রহপালের গলায় মালা দিয়েছেন।’ বক্তা আর কেহ নয়, জ্যোতিষাচার্য রন্তিদেব।

কলরব আরও বাড়িয়া গেল। রাজারা মণ্ডপ হইতে নামিয়া অঙ্গভঙ্গি দ্বারা ক্রোধ প্রকাশ করিতে লাগিলেন। লক্ষ্মীকর্ণ দন্ত কড়মড় করিয়া একটানে কোষ হইতে তরবারি বাহির করিলেন, তারপর বৃষভ-গর্জন করিয়া বিগ্রহপালের প্রতি ধাবিত হইলেন। আজ আর কাহারও নিস্তার নাই। ওই অধম তস্করপুত্রটাকে তিনি বধ তো করিবেনই, কুলকজ্জল কন্যাটাকেও কাটিয়া ফেলিবেন।

লক্ষ্মীকর্ণকে কিন্তু অধিক দূর অগ্রসর হইতে হইল না। যৌবনশ্রী পিতাকে ছুটিয়া আসিতে দেখিয়া বিগ্রহপালের বুকের কাছে সরিয়া দাঁড়াইয়াছিলেন। বিগ্রহপাল মনস্থ করিয়াছিলেন— মূর্তির তলদেশে বসিয়া বসিয়া তিনি চিন্তা করিবার প্রচুর অবসর পাইয়াছিলেন— ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করিবার পূর্বে তিনি মহারাজ লক্ষ্মীকর্ণ ও সভাস্থ রাজবৃন্দকে সম্বোধন করিয়া একটি নাতিদীর্ঘ ভাষণ দিবেন; বলিবেন— ‘হে আর্যগণ, রাজকুমারী যৌবনশ্রী আর্যরীতি অনুসারে আমার কণ্ঠে বরমাল্য দান করিয়াছেন, সুতরাং আপনাদের রুষ্ট হওয়া উচিত নয়। রাজকুমারী যদি মর্কটের গলায় মালা দিতেন তাহাও আর্যরীতি অনুযায়ী সিদ্ধ হইত। আপনারা আমাদের আশীর্বাদ করুন এবং আনন্দিত মনে নিজ নিজ রাজ্যে প্রত্যাবর্তন করুন।’ কিন্তু মহারাজ লক্ষ্মীকর্ণ তরবারি উঁচাইয়া ছুটিয়া আসিতেছেন, রাজারাও লোচন ঘূর্ণিত করিতেছেন, এখন বক্তৃতা চলিবে না। বক্তৃতা শেষ হইবার পূর্বেই মস্তক স্কন্ধ্যচু্ত হইবে।

অগ্নিকন্দুকটি বুকের কাছে ঝুলিতেছিল, সেটি ডান হাতে লইয়া বিগ্রহপাল বাম হস্তে যৌবনশ্রীর স্কন্ধ বেষ্টন করিয়া লইলেন, চুপিচুপি বলিলেন— ‘ভয় পেও না।’ তারপর অগ্নিকন্দুকটি সবেগে মাটিতে আছাড় মারিলেন।

বিরাট ভূমিকম্পে যেন সভাগৃহ কাঁপিয়া উঠিল; কর্ণবিদারী শব্দের সঙ্গে মাটি হইতে এক ঝলক আগুন ছিট্কাইয়া উঠিল, তীক্ষ্ণ কটুগন্ধ ধূমে চারিদিক আচ্ছন্ন হইয়া গেল।

বিগ্রহপাল বলিলেন— ‘চল এবার পালাই।’ বলিয়া যৌবনশ্রীর হাত ধরিয়া পাশের একটি দ্বারের দিকে লইয়া চলিলেন।

ছয়

যৌবনশ্রী যখন সভাগৃহে প্রবেশ করেন তখন লম্বোদর নাগরিকমণ্ডলীর মধ্যে থাকিয়া লক্ষ্য করিয়াছিল যে অনুবর্তিনী সখীদের মধ্যে বান্ধুলি নাই। বান্ধুলি রাজকন্যার নিকটতমা সখী, সে উপস্থিত নাই কেন? কোথায় গেল? লম্বোদরের সন্দিগ্ধ মনে খটকা লাগিয়াছিল।

তারপর বিচিত্র ব্যাপার ঘটিতে আরম্ভ করিল। মৃন্মূর্তির তলা হইতে জীবন্ত মানুষ বাহির হইয়া আসিল। রাজকুমারী তাহার গলায় মালা দিলেন, এবং সর্বশেষে বিকট অপার্থিব শব্দ হইয়া সভা ধূমাচ্ছন্ন হইয়া গেল। লম্বোদর অতিশয় স্থিরবুদ্ধি মানুষ, কিন্তু তাহার মাথাটাও গোলমাল হইয়া গেল।

ওদিকে রাজাদের অবস্থা সত্যই শোচনীয় হইয়া উঠিয়াছিল। এরূপ গগনভেদী শব্দ তাঁহারা জীবনে শোনেন নাই, তাই শব্দ শুনিয়া তাঁহাদের হস্তপদ শিথিল হইয়া গিয়াছিল। যাঁহাদের চলচ্ছক্তি একেবারে লোপ পায় নাই তাঁহারা কেহ স্খলিতপদে কেহ জানু সাহায্যে সভাগৃহ হইতে নিষ্ক্রান্ত হইবার চেষ্টা করিতেছিলেন; রাজকন্যার পলায়মানা সখীরা চিৎকার করিতে করিতে তাঁহাদের ঘাড়ের উপর পাড়িতেছিল; কিন্তু কেহই ভ্রূক্ষেপ করিতেছিলেন না। কলিঙ্গের দুই রাজপুত্র দৃঢ়ভাবে পরস্পর আলিঙ্গন করিয়া ধরিয়াছিলেন। অভ্যাগত রাজাদের মধ্যে কেবল কর্ণাটের বিক্রম ধৈর্য হারান নাই, তিনি মুক্ত কৃপাণহস্তে নিজ মণ্ডপের সম্মুখে দাঁড়াইয়া ধূমজালের মধ্যে সতর্কভাবে চারিদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিতেছিলেন।

সর্বাপেক্ষা দুর্গতি হইয়াছিল মহারাজ লক্ষ্মীকর্ণের। ক্রোধান্ধ রক্তপিপাসু মন লইয়া ছুটিয়া আসিতে আসিতে হঠাৎ পৈশাচিক শব্দের আঘাতে তিনি মুখ থুবড়িয়া পড়িয়া গিয়াছিলেন; ক্রোধের স্থানে ভয় আসিয়া তাঁহার হৃদয় জুড়িয়া বসিয়াছিল। তিনি সেই অবস্থায় থাকিয়া ইতিউতি দৃষ্টিপাত করিতে লাগিলেন। কয়েকজন রাজা ও সখী তাঁহাকে পদদলিত করিয়া চলিয়া গেল। তিনি লক্ষ্য করিলেন না। পিশাচ! দীপঙ্করের পিশাচ এখানেও আসিয়া জুটিয়াছে।

নাগরিকমণ্ডলীর প্রতিক্রিয়া সম্বন্ধে কিছু বলা নিষ্প্রয়োজন। দলবদ্ধ জনতা এরূপ অবস্থায় যাহা করিয়া থাকে ইহারাও তাহাই করিয়াছিল। অগ্নিকন্দুকের শব্দ শুনিয়া তাহারা ক্ষণকাল বিমূঢ় অবস্থায় রহিল, তারপর বাঁধভাঙা জলস্রোতের ন্যায় হুড়মুড় শব্দে পিছনের দ্বার দিয়া বাহির হইতে লাগিল। ঠেলাঠেলি গুঁতাগুঁতিতে কয়েকজনের হাত-পা ভাঙিল কিন্তু কেহ তাহা গ্রাহ্য করিল না।

এই পলায়মান জনস্রোতের আবর্তে লম্বোদর পড়িয়া গিয়াছিল। প্রায় নিজের অজ্ঞাতসারেই সে বাহিরের দিকে চলিয়াছিল, কিন্তু দ্বারা দিয়া বাহির হইতে পারিল না। সেখানে বড় পেষাপেষি। ভাগ্যক্রমে সে জনতার পাশের দিকে ছিল, তাই দুই-চারিবার সজোরে কফোণি তাড়না করিয়া জনতার আলিঙ্গন হইতে মুক্ত হইল। অনতিদূরে ক্ষুদ্র একটি খিড়ক্কি দ্বার, লম্বোদর সেই পথ দিয়া সভা হইতে বাহির হইয়া পড়িল।

এদিকটা নির্জন, গণ-সম্বাধের ভিড় নাই। কিন্তু ও কি? লতাকুঞ্জের নিকটে দুইটা ঘোড়া দাঁড়াইয়া আছে; শিল্পী মধুকর লাল ঘোড়াটার পিঠের উপর বসিয়া আছে এবং বান্ধুলিকে টানিয়া নিজের কোলের কাছে তুলিতেছে। বান্ধুলি তিলমাত্র আপত্তি করিতেছে না, বরং সেও ঘোড়ায় চড়িবার জন্য বিশেষ আগ্রহশীলা।

পাগলের মত চিৎকার করিয়া লম্বোদর সেই দিকে ছুটিল। তাহার চিৎকারে অনঙ্গ ও বান্ধুলি দুইজনেই ঘাড় ফিরাইয়া দেখিল। ইত্যবসরে বান্ধুলি ঘোড়ার পিঠে উঠিয়া বসিয়াছে। সে অনঙ্গের গলা জড়াইয়া ধরিল, অনঙ্গ ঘোড়ার নিতম্বে কশাঘাত করিল; ঘোড়াটা হরিণের মত লাফ দিয়া নিমেষমধ্যে অন্তর্হিত হইল।

লম্বোদর দাঁড়াইয়া পড়িল। ঘোড়ার পিছনে ছুটিয়া সে পলাতকদের ধরিতে পরিবে না এ-জ্ঞান তাহার ছিল। সে বিমূঢ় চক্ষু ফিরাইয়া দ্বিতীয় ঘোড়াটার দিকে চাহিল। শ্বেতবর্ণ অশ্ব পাথরের মূর্তির মত দাঁড়াইয়া আছে। কাহার ঘোড়া? এখানে দাঁড়াইয়া আছে কেন? যাহার ঘোড়াই হোক, ইহার পিঠে চড়িয়া পলাতকদের তাড়া করিলে ধরা যাইবে কি? ধরিলেও আটকাইয়া রাখা যাইবে কি?

পিছনে শব্দ শুনিয়া লম্বোদর চকিতে ফিরিল। স্বয়ংবর সভার পাশের একটি দ্বার দিয়া যৌবনশ্রী বাহির হইয়া আসিলেন; তাঁহার সঙ্গে সেই যুবক যাহার গলায় তিনি মালা দিয়াছিলেন— বিগ্রহপাল! দুইজন হাত ধরাধরি করিয়া প্রায় দৌড়িতে দৌড়িতে এই দিকেই আসিতেছেন। মুহূর্তের মধ্যে লম্বোদরের মাথাটা পরিষ্কার হইয়া গেল। বান্ধুলিকে লইয়া মধুকর পলাইয়াছে, রাজকুমারীকে লইয়া বিগ্রহপাল পলায়ন করিতেছে। সাদা ঘোড়াটা ইহাদের জন্য অপেক্ষা করিতেছে! ষড়যন্ত্র! চক্রান্ত!

লম্বোদর আর চিন্তা করিল না, প্রহর্তুমুদ্যত ষণ্ড যেভাবে প্রতিদ্বন্দ্বীকে আক্রমণ করে সেইভাবে বিগ্রহপাল ও যৌবনশ্রীর দিকে ছুটিল। তাঁহাদের নিকটে গিয়া সে যৌবনশ্রীর পদতলে আছড়াইয়া পড়িল, দুই বাহু দিয়া সবলে তাঁহার পদদ্বয় জড়াইয়া ধরিয়া রাসভনিন্দিত কণ্ঠে চিৎকার করিতে লাগিল— ‘ধরো ধরো— শীঘ্র এস— পালাচ্ছে—’

যৌবনশ্রী চলৎশক্তিহীন; লম্বোদর এমনভাবে পা সাপ্টাইয়া ধরিয়াছে যে নড়িবার সামর্থ্য নাই। তিনি ব্যাকুল চক্ষে বিগ্রহপালের পানে চাহিলেন।

বিগ্রহপালের হাতে যদি তরবারি থাকিত নিঃসন্দেহে লম্বোদরকে হত্যা করিতেন। কিন্তু তিনি নিরস্ত্র, যৌবনশ্রীর হাত ধরিয়া টানিয়া লইয়া যাইবার চেষ্টা করিলেন। বৃথা চেষ্টা; লম্বোদর কর্কটের মত যৌবনশ্রীর পা আঁকড়াইয়া রহিল। বিগ্রহপাল তাহাকে পদাঘাত মুষ্ট্যাঘাত করিলেন; লম্বোদর আরও তারস্বরে চেঁচাইতে লাগিল— ‘বাঁচাও। কে আছ— শীঘ্র এস!’

এবার স্বয়ংবর সভার পাশের দ্বারা দিয়া লক্ষ্মীকর্ণ বাহির হইলেন। এতক্ষণে তাঁহার পিশাচ-ভয় কাটিয়াছে। তাঁহার পিছনে কয়েকজন রাজাও আছেন, সকলের হস্তে তরবারি। পৈশাচিক শব্দের পুনরাবৃত্তি হইল না দেখিয়া তাঁহাদের ক্ষাত্রতেজ আবার মাথা তুলিয়াছে। যৌবনশ্রী ও বিগ্রহপালকে দেখিয়া তাঁহারা রৈ রৈ শব্দে সেইদিকে ধাবিত হইলেন।

যৌবনশ্রী তাঁহাদের দেখিয়া ভয়ার্তকণ্ঠে বলিলেন— ‘কুমার, তুমি যাও, আর এখানে থেকো না। ওরা তোমাকে হত্যা করবে।’

বিগ্রহ বলিলেন— ‘আর তুমি?’

‘আমার যা হবার হবে, তুমি যাও।’

‘না।’

যৌবনশ্রী ব্যাকুলস্বরে বলিলেন— ‘কুমার, আমার কথা শোনো। পিতা আমাকে হত্যা করবেন না। আমি তোমার জন্য প্রতীক্ষা করে থাকব। তুমি আবার এসে আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেও।’

বিগ্রহপাল সম্মত হইলেন। নিরস্ত্র অবস্থায় সপ্তরথী বেষ্টিত হইয়া মৃত্যুবরণ করা মূঢ়তা। লক্ষ্মীকর্ণ ও রাজার দল তখন কাছে আসিয়া পড়িয়াছেন, বিগ্রহপাল তাহাদের দিকে বহ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া বলিলেন— ‘তাই হবে। আবার আমি আসব। কিন্তু এবার একলা আসব না।’

যৌবনশ্রীর হাত ছাড়িয়া তিনি ছুটিয়া দিব্যজ্যোতির পাশে গেলেন, এক লাফে তাহার পিঠে উঠিয়া বসিলেন। দিব্যজ্যোতি বিদ্যুচ্চমকের ন্যায় দৃষ্টিবহির্ভূত হইয়া গেল।

শিকার হাতছাড়া হইয়া গেল দেখিয়া লক্ষ্মীকর্ণ ব্যর্থ ক্রোধের হুঙ্কার ছড়িলেন, তারপর পাকশাট খাইয়া কন্যার দিকে ফিরিলেন; জলন্ত চোখে বলিলেন— ‘কুলকলঙ্কিনি, তোর মনে এই ছিল! বংশের মুখে কালি দিলি। আজ তোকে কেটে ফেলব।’

তিনি তরবারি তুলিলেন। কিন্তু কাটা হইল না, রাজারা নিবারণ করিলেন। নিন্দা-কলঙ্ক যাহা হইবার তাহা হইয়াছে; শুধু লক্ষ্মীকর্ণের নয়, নিমন্ত্রিত রাজাদেরও; নারীহত্যা করিলে তাহার মাত্রা কমিবে না। যৌবনশ্রীর মুখে রাগবিদ্বেষ লজ্জাভয় কিছুই নাই, তিনি মুকুলিত নেত্রে দাঁড়াইয়া আছেন। লম্বোদর এতক্ষণে কর্তব্যকর্ম সুচারুরূপে সম্পন্ন করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। কিন্তু তাহার পানে কেহ ফিরিয়া চাহিল না। তাহার প্রয়োজন শেষ হইয়াছে, সে অলক্ষিতে পিছনে সরিয়া গেল।

অতঃপর রাজারা একজোট হইয়া লক্ষ্মীকর্ণকে ভৎসনা করিলেন। তাঁহারা কিছু আর বলিতে বাকি রাখিলেন না। বিশেষত কর্ণাটকুমার বিক্রমের রসনার ধার তাঁহার অসির ধার অপেক্ষা কোনও গুণে কম নয়; তিনি বাছা বাছা কটুবাক্য ও ধিক্কার লক্ষ্মীকর্ণের শিরে বর্ষণ করিলেন। তুমি নির্লজ্জ ও নির্বোধ। যেমন তোমার হস্তীর মত আকার তেমনি হস্তিমূর্খ তুমি। যাহার কন্যা গুপ্তপ্রেমে লিপ্ত সে স্বয়ংবর সভা আহ্বান করে কোন লজ্জায়! যে নিজের অবরোধের উপর দৃষ্টি রাখিতে পারে না সে রাজ্যশাসন করিতে চায় কোন্‌ স্পর্ধায়! ইত্যাদি ইত্যাদি। অন্য রাজারা সঙ্গে সঙ্গে ঘৃতাহূতি দিলেন। মহারাজ লক্ষ্মীকর্ণ বক্ষে তুষানল জ্বালিয়া সব শুনিলেন, বাঙ্‌নিষ্পত্তি করিলেন না।

রাজারা হৃদয়ভার লাঘব করিয়া প্রস্থান করিবার পর লক্ষ্মীকর্ণ বজ্রমুষ্টিতে কন্যার হাত ধরিয়া তাহাকে রাজপুরীতে লইয়া চলিলেন।

সাত

অনঙ্গ ও বান্ধুলিকে পিঠে লইয়া রোহিতাশ্ব বায়ুবেগে নগর পার হইয়া গেল। ক্ষুরধ্বনিতে সচকিত নগরের পথচারীরা অদ্ভুত দৃশ্য দেখিল, এক ঘোড়ার পিঠে যুগলমূর্তি! তাহারা নানাবিধ জল্পনা করিল। এরূপ দৃশ্য পূর্বে এ নগরে দেখা যায় নাই। কালে কালে এ সব হইতেছে কী? কলি— ঘোর কলি।

নগর অতিক্রম করিয়া রোহিতাশ্ব যখন শোণ-ঘাটের পথ ধরিল তখনও অনঙ্গ তাহার গতি শ্লথ করিল না, কেবল মাঝে মাঝে ঘাড় ফিরাইয়া দেখিতে লাগিল বিগ্রহ যৌবনশ্রীকে লইয়া আসিতেছে কিনা। এ পর্যন্ত সমস্ত ব্যাপারই পরিকল্পিত পথে চলিয়াছে; অগ্নিকন্দুক ফাটিয়াছে, সভায় বিষম গণ্ডগোলের মধ্যে বিগ্রহ যৌবনশ্রীকে লইয়া নিশ্চয় পলায়ন করিতে পরিবে। কিন্তু লম্বোদরটা হঠাৎ কোথা হইতে আসিয়া জুটিল? সে কোনও প্রকার বিঘ্ন করিবে না তো? নাঃ, বিগ্রহকে লম্বোদর ঠেকাইতে পরিবে না। তবু অনঙ্গ মনে মনে একটু অস্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করিতে লাগিল।

রোহিতাশ্ব ছুটিয়া চলিয়াছে, নির্জন অশ্মাচ্ছাদিত পথে তাহার ক্ষুরধ্বনি প্রতিধ্বনিত হইতেছে। বান্ধুলি অনঙ্গের বুকের উপর ছিন্নমূল লতার মত পড়িয়া আছে, তাহার মুদিত অক্ষিপল্লব অল্প অল্প স্ফুরিত হইতেছে, মুখ রক্তহীন। অনঙ্গ তাহার পানে দৃষ্টি নামাইয়া হাসিমুখে ডাকিল— ‘বান্ধুলি!’

বান্ধুলির চোখ দুটি খুলিয়া গেল। অনঙ্গের মুখে হাসি দেখিয়া তাহার অধরেও একটু হাসি ফুটি-ফুটি করিল, কিন্তু ফুটিল না; অধর একটু কাঁপিল মাত্র। সে আবার চক্ষু মুদিত করিল। তাহার বাম বাহু আরও দৃঢ়ভাবে অনঙ্গের কণ্ঠ জড়াইয়া ধরিল।

অনঙ্গ তাহার কানের উপর মুখ রাখিয়া বলিল— ‘তোমার এখনো ভয় করছে?…আমার মনে হচ্ছে পক্ষীরাজে চড়ে স্বর্গে যাচ্ছি।’—

শোণের ঘাটে বণিকের নৌকা নাই, লোকজন নাই। কিন্তু গরুড় তাহার দলবল লইয়া উপস্থিত আছে। নৌকা পাড়ি দিবার জন্য প্রস্তুত।

অনঙ্গ বান্ধুলিকে ঘোড়া হইতে নামাইয়া নৌকায় তুলিল। তাহাকে রইঘরে বসাইয়া বাহিরে আসিল। বিগ্রহপালের এখনও দেখা নাই। এত দেরি হইতেছে কেন? এদিক ওদিক চাহিয়া অনঙ্গ দেখিল, জাতবর্মার নৌকা অদূরে বাঁধা রহিয়াছে, কিন্তু তাহাতে দাঁড়ী-মাঝি কেহ নাই, নৌক শূন্য। অনঙ্গ গরুড়কে জিজ্ঞাসা করিল— ‘ও নৌকার লোকজন গেল কোথায়?’

গরুড় বলিল— ‘আজ্ঞা, ওরা স্বয়ংবর দেখতে নগরে গিয়েছে।’

‘কেউ নেই?’

‘না। আমাদের বলে গেছে ওদের নৌকার উপর যেন দৃষ্টি রাখি।’

অনঙ্গ চিন্তা করিল; লক্ষ্মীকর্ণ নিশ্চয় তাড়া করিবে, ছাড়িবে না। ঘাটে আসিয়া যে-নৌকা পাইবে তাহাতে চড়িয়া তাড়া করিবে। জাতবর্মার নৌকায় এখন নাবিক নাই বটে, কিন্তু তাহারা শীঘ্রই ফিরিয়া আসিতে পারে; তখন জাতবর্মার নৌকায় চড়িয়া লক্ষ্মীকর্ণ পশ্চাদ্ধাবন করিবে। অতএব জাতবর্মার নৌকাটাকে বানচাল করিয়া দেওয়া প্রয়োজন।

অনঙ্গ গরুড়কে বলিল— ‘তুমি লোকজন নিয়ে ও নৌকায় যাও। যত দাঁড় আছে সব এ নৌকায় নিয়ে এস।’

গরুড় জিজ্ঞাসুনেত্রে একবার অনঙ্গের পানে চাহিল, কিন্তু প্রশ্ন না করিয়া আদেশ পালনে অগ্রসর হইল।

সব দাঁড়গুলি এ নৌকায় উঠিয়াছে এমন সময় দ্রুত অশ্বক্ষুরধ্বনি শোনা গেল। অনঙ্গ নৌকা হইতে লাফাইয়া তীরে নামিল। দিব্যজ্যোতির পিঠে বিগ্রহপাল আসিতেছেন। কিন্তু যৌবনশ্রী কোথায়?

ঘোড়া থামিবার পূর্বেই অনঙ্গ ছুটিয়া গিয়া তাহার বলগা ধরিল— ‘দেবী যৌবনশ্রী?’

বিগ্রহপাল অশ্বপৃষ্ঠ হইতে অবতরণ করিয়া উদ্‌ভ্রান্ত স্বরে বলিলেন— ‘তাকে আনতে পারলাম না।’

নৌকা ঘাট ছাড়িয়া চলিতে আরম্ভ করিয়াছে। বায়ু প্রতিকূল তাই পাল তোলা হয় নাই, ছয়জন দাঁড়ী দাঁড় ধরিয়াছে। নৌকা স্রোতের মুখে গিয়া পড়িল।

অনঙ্গ ও বিগ্রহপাল রইঘরের ছাদে দাঁড়াইয়া একদৃষ্টে ঘাটের দিকে চাহিয়া আছেন।

বান্ধুলি চুপিচুপি আসিয়া অনঙ্গের পাশে দাঁড়াইল, চুপিচুপি তাহার একটা আঙ্গুল মুঠিতে চাপিয়া ধরিয়া তীরের পানে চাহিয়া রহিল। তাহার চক্ষু দিয়া দরবিগলিত ধারা বহিতে লাগিল। এরূপ সময়ে কত বিচিত্র হৃদয়াবেগ নারীর চিত্ত জুড়িয়া বসে তাহার ইয়ত্তা নাই। অশ্রুধারাই তাহার একমাত্র অভিব্যক্তি।

ঘাটে জনমানব নাই। লক্ষ্মীকর্ণের দল এখনও আসে নাই, কিম্বা হয়তো আসিবে না; যৌবনশ্রীকে তাহারা ধরিয়াছে, না আসিতেও পারে। ঘাটে কেবল দুইটি অশ্ব তীরের অতি নিকটে আসিয়া গ্রীবা বাড়াইয়া নৌকার পানে নিষ্পলক চাহিয়া আছে। দিব্যজ্যোতি ও রোহিতাশ্ব। তাহারা কি বুঝিয়াছে যে তাঁহাদের প্রভু চলিয়া যাইতেছে, আর ফিরিবে না?

বিগ্রহপাল সুগভীর নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া ভগ্নস্বরে বলিলেন— ‘দিব্যজ্যোতি আর রোহিতাশ্বকেও ফেলে যেতে হল!’