চিলেকোঠার সেপাই – ১৪

চিলেকোঠার সেপাই – ১৪

‘আকবর ভায়ের ব্যাটা? দাঁড়াও, ভালো করা দেখ্যা নেই।’ আনোয়ারের মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর খয়বার গাজী তাকে বসতে বলে, তার পাশে জালাল মাস্টার। তারপর ১টি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে খয়বার গাজী অনুযোগ করে, তোমরা বাপু বাপদাদার ভিটাত আসবারই চাও না, একবার ফুচকিও পাড়ো না! তোমার মামু আর বছর জাতীয় পরিষদে কনটেস্ট করলো, আমার এখানে আসছিলো। আমার কুটুম্ব, ভায়ের সম্বান্ধী, আবার তোমার চাচীরও কি রকম ভাই হয়। তো কল্যাম, সিরাজ ভাই, আমার কিছু কওয়ার দরকার নাই। আমার ইউনিয়নের মেম্বর এগারোটা -একটা জোলা আর একটা কৈবর্ত-বাকি নয়টা ভোট আপনের। তা ফুল মার্কার টিকেট নিবার পারলেন না?-ওয়াদা দিলাম। কিন্তু বাবা জামানা খারাপ, মানুষ হলো মোনাফেক। মানুষের ঈমান নাই। ভোটের আগের রাতে মটোর সাইকেল নিয়া দুইজন মানুষ আসলো, ভটভটিওয়ালারা টাকার বস্তা নিয়া আসছিলো, সব ভোট পড়লো ফুল মার্কাত। আমার ভোটটা নষ্ট হলো একটি প্রসঙ্গ থেকে আরেকটি এসে পড়ে। কোনোটাই ভালোভাবে শেষ হয় না। খয়বার গাজী কথা বলে একটু ধীরে, বিলম্বিত লয়ে, কিন্তু লোকটা খুব স্টেডি, থামে না। মাঝে মাঝে বিরতি দিলেও এমন একটা ভঙ্গি করে যেন তার বাক্য অসম্পূর্ণ রয়েছে, ঠিক পরবর্তী সময়টিও তার জন্যেই নির্ধারিত, অন্য কারো তাতে ভাগ বসাবার সুযোগ থাকে না। কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে সে সিগ্রেটে টান দেয় বা তার সামনে লাঙ্গল-কাধে মাঠের-দিকে-রওয়ানা হওয়া কিষানের উদ্দেশে নির্দেশ পাঠায় বা সশব্দে থুথু ফেলে বা উচ্চকণ্ঠে আল্লার নাম নেয়। এরকম ১টি ফাঁক পেয়ে আনোয়ার বলে ফেলে, ‘জী। বেসিক ডেমোক্র্যাটদের প্রায় সবাই টাকা নিয়ে ভোট দিয়েছে, সব জায়গাতেই তাই হয়েছে।’
মুখে একটু জর্দা পুরে ডান হাত তুলে খয়বার গাজী তাকে থামিয়ে দেয়, তারপর বলে, বাপু, বেসিক ডেমোক্র্যাসিকও আর আর এ্যাঁডাল্ট ফ্র্যানচাইজ কও, আইয়ুব খান কও আর শেখ মুজিব কও, দ্যাশের মানুষের ঈমান ঠিক নাই। ঈমান না থাকলে কেডা কি করবো। না কি কও? হঠাৎ ভেতর বাড়ির দিকে মুখ করে লোকটা হুঙ্কার ছাড়ে, ক্যারে সাকাত আলি, নাশতা হলো?
আনোয়ার ক্ষীণকণ্ঠে একটু ভদ্রতা করার চেষ্টা করে, না, নাশতা থাক। বাড়িতে বলে আসিনি, নাশতা করে রাখবে, আপনি আর কষ্ট করবেন না। খয়বার গাজী হাসে। এই হাসিতে আনোয়ারের প্রতি নাশতা খাওয়ার স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে।
একটু অস্বস্তিকর হলেও লোকটাকে আনোয়ারের খারাপ লাগছে না। জালাল মাস্টারের অনুরোধেই আসতে হয়েছে, কাল সন্ধ্যায় জালাল ফুপা বার বার বলছিলো, দ্যাখে বাপু, চ্যাংড়া প্যাংড়ার কথাত কৰ্ণপাত করো না। খয়বার গাজীর সাথে বিবাদ করলে চেংটু কও আর অর বাপ কও, কারো পরিণতি ভালো হবার পারে না। কারণ কি? কারণটাও ব্যাখ্যা করে সে নিজেই। নাদু পরামাণিক ও তার ছেলে চেংটুর নামে খয়বার গাজী যে ফৌজদারী মামলা করেছে তাতে অপরাধ প্রমাণিত হলে বাপব্যাটার ৭ থেকে ১৪ বছরের জেল একেবারে অনিবার্য। নাদু কি মামলার খরচ যোগাতে পারবে? আরো, খয়বারের কি? ১৫ দিন পরপর সে টাউনে যায়, চাঁদে চাদে তার মোকদ্দমা। এর সঙ্গে নাদুর নামে ১টা মামলা জুড়ে দিলে তার কি এসে যায়? আনোয়ার গিয়ে যুদ খয়বার গাজীকে একবার বলে তো সে মামলাটা তুলে নিতে পারে। আনোয়ার তবু আসতে চায়নি। চেন্টুর কথা না হয় ছেড়েই দিলো, ছোড়াটা মনে হয় সব সময় টং হয়ে আছে, কিন্তু জালাল মাস্টার, এমন কি নাদু পরামাণিকের কথাতেও বোঝা যাচ্ছে যে, খয়বার গাজী লোকটা বিপজ্জনক। ১টা সুযোগ এসে পড়েছে, এখনি চিরকালের জন্য এদের উৎখাত করা সম্ভব। চারদিকে মানুষের ভাব যা দ্যাখ্যা যাচ্ছে তাতে মামলা যারা করে তারা তো নস্যি, মামলার রায় দেনেওয়ালারাই টেকে কি-না দ্যাখো!
কিন্তু ঝামেলা বাধায় নাদু পরামাণিক, চাচামিয়া’ দ্যাখেন, গরীব মানুষ হামরা, বেন্ন্যা মানুষ, আপনাগোরে পায়ের তলাতে পড়া আছি বাপদাদার আমল থাকা। হামার তিনকাল যায়া এখন এককালোতে ঠেকছে, হামি তো বুঝি বাপজান, হামি সোগলি বুঝি।’
বাপের বিবেচনাবোধে চেন্টুর আস্থা নাই, হু! তুমি কি বোঝো? নাদু জবাব দেয় আনোয়ারের দিকে তাকিয়ে, চ্যাংড়াপ্যাংড়ার ইগল্যান, নাফপাড়া ব্যারাম কয়দিনের, কন? যিগল্যান ইশকুল কলেজোত পড়ে দুইদিন বাদে সিগল্যান ব্যামাক যাবো টাউনেত, অদেক যাবো জেলের ভাত খাবার। খয়বার গাজী তখন হামাক মাটির তলাত পুত্যা খুবো, মাটির উপরে ঘাস জালাবো, কেউ ফুচকি দিয়াও দেখবো না।
তারপর সে খয়বারের সঙ্গে আনোয়ারের বড়োচাচার আত্মীয়তার কথা বলে, বড়োচাৰ্চী ডালেপালায় খয়বারের মামাতো বোন। আনোয়ার কথাটা বললে গাজী তাকে না করতে পারবে না। হাজার হলেও ভদ্রলোক, আর যা-ই হোক খয়বার গাজীর বংশ তো ভালো। ছোটলোকের বাচ্চারা মেম্বার হয়ে ওয়ার্কস প্রোগ্রামের গম মেরে বড়োলোক হয়, খয়বার তো সেরকম লোক নয়। কতো পুরানো বংশ, নইলে আনোয়ারদের সঙ্গে তাদের আত্মীয়তা হয় কি করে?
বুঝলাম তো তা গোরু চুরির সোম্বাদ নিয়া তুমি থানাত গেলে তার গাওত লাগে কিসক?
চেংটুর এই অভিযোগ নাদু ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে দাঁড়াতে গেলে আনোয়ার তাকে থামিয়ে দিয়েছিলো, তারপর চেংটু যখন তার ভাইপোকে কুকুর ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে তখন আপনিও রামদা হাতে তার সঙ্গে ছিলেন,—এই কথাটা খয়বার গাজী থানায় গিয়ে বললে৷ কি করে, বলেন?
জবাব না দিয়ে নাদু মাথা নিচু করে থাকে। সে বসেছিলো হাঁটু ভেঙ্গে,-আর দশজন চাষা যেভাবে বসে,—তার বড়ো পাকা দাড়ি এলোমেলোভাবে ছড়ানো, শীতে সেগুলো কেমন খাড়া খাড়া হয়ে গেছে, এতো ঘন দাড়িতেও তাই চেহারায় সৌম্য ভাব আসে না। তার দীর্ঘ দেহ সর্বদাই নোয়ানো, আনোয়ারের কথা শুনতে শুনতে তার ঘাড় এতোটা নুয়ে পড়ে যে, মনে হয় খয়বার গাজীর সমস্ত অপরাধের জন্যে দায়ী সে একা। আনোয়ারের দিকে সে মাঝে মাঝে আড়চোখে তাকায়, পরশু জালাল মাস্টারের কাছে সে তার পর্যবেক্ষণ জানিয়ে দিয়েছে যে, আনোয়ারের দাদাজীর সঙ্গে আনোয়ারের চেহারার সাদৃশ্য খুব স্পষ্ট। তা তার পূর্বপুরুষের আমলের এক চাকরের প্রতি সে কি তার মরহুম দাদাজীর মতো একটু করুণাহাদয় হতে পারে না? খয়বার গাজীর কাছে একবার যেতে তার আপত্তিটা কি? আবার জালাল মাস্টারও বারবার চাপ দেয়। এ লোকটার কথা ফেলা মুশকিল। স্থানীয় হাই স্কুলে কুাস এইট পর্যন্ত ৪০ বছর ধরে বাঙলা পড়বার পর লোকটা এখন ঘরেই বসে থাকে। সংসার দ্যাখে, মানে শ্বশুরের দেওয়া কয়েক বিঘা জমির তদারকি করে। মাসে দুমাসে বিষাদ-সিন্ধু, মোস্তফা-চরিত, কাসাসুল আম্বিয়া বা তাপস-চরিতমালা ও রবি ঠাকুরের চয়নিক পড়ে বাঙলা ভাষার চর্চাটা চাগিয়ে রাখার চেষ্টা করে। এই ভাষার ওপর দখল বোঝা যায় তার কথাবার্তায়, খয়বার গাজীর সহনশীলতার অভাব আছে, কিন্তু তার হৃদয় পরিষ্কার। আর তোমার বড়ো চাচীর তাই সাক্ষাৎ আত্মীয়, সম্পর্কে ফুফাতো ভাই। আর তোমার পিতার সাথে তার হৃদ্যতা কি এক আধ বৎসরের? চল্লিশ পঞ্চাশ বৎসরের বন্ধুত্ব, প্রায় সমবয়স্ক, ইস্কুলে সহপাঠী না হলেও খেলার সাখী। শৈশবের বন্ধুত্বের কাছে আত্মীয়তা কুটুম্বিতা কিছু নয়। তুমি একটা আবদার করলে গাজী কি হেলা করবার পারে?
কিন্তু খয়বার গাজীর বৈঠকখানার বারান্দায় বসে জালাল মাস্টারের বাকপটুতার নিদর্শন পাওয়া যাচ্ছে না। বারান্দার ধার ঘেঁষে শেফালি গাছ, টুপটাপ ফুল পড়ে শিশির-ভেজা সাদাটে সবুজ ঘাসের জমিতে নক্সী কাথা বোনা হয়ে চলেছে, জালাল মাস্টার তাই দ্যাখে। সামনের এই খালি জমির পর ঘাট-বাধানো পুকুর, শীতের পুকুরে স্থির পানির ওপর আবছা ধোঁয়া, জালালউদ্দিন তাও দ্যাখে। একটু পশ্চিমে আনোয়ারদের বাড়ি যাওয়ার রাস্তায় শিমুল গাছের মাথায় লালেচ রোদ হলদে হয়ে আসছে, লোকটা তাও দ্যাখে। তাহলে আনোয়ার কথাটা পড়ে কিভাবে?
লুঙ্গি পরা ১টি ছেলে এসে দাঁড়ালে খয়বার গাজী আনোয়ারকে বলে, চলো বাবা, ঘরে নাশতা করি। গরিবের বাড়িতে আসছে বাবা, কি দিয়া যত্ন করি? একটা খবর দিয়া আসা লাগে, গায়ের মদ্যে থাকি, বুঝলা না?—উপস্থিত কিছু পাওয়া যায় না।
না নাকি যে বলেন। নানা, তাতে কি? আনোয়ারের এসব বাকপ্রয়াস খয়বার গাজীর বিপুল বিনয়ের তোড়ে কোথায় ভেসে যায় তার আর কোনো চিহ্ন পাওয়া যায় না।
বৈঠকখানায় শতরঞ্চি পাতা তক্তপোষে দস্তরখান বিছানো। গোলাপি ও বেগুনি রঙের বড়ো বড়ো ফুলপাতা-আঁকা মোটা ও বড়ো চীনেমাটির প্লেটে প্রথমে পরোটা ও পায়রার গোশতের ভুনা খাওয়া হলো। তারপর মুড়ি দিয়ে পায়েস। পায়েস খেতে খেতে জালাল মাস্টারের বারবার ইঙ্গিত সত্ত্বেও আনোয়ার কথাটা তুলতে পারে না। শেষ পর্যন্ত মাস্টার বলে, ‘ভাইজান, এই চ্যাংড়া আপনার কাছে একটা অনুরোধ, একটা আবদার নিয়া আসছে।’ খয়বার গাজী সাড়া না দিয়ে তার পায়েসমাখা আঙুল চোষে। সবগুলো আঙুল পরিষ্কার করে হঠাৎ বলে, কি বাবা? কও, কও।’
জালাল মাস্টার বলে, নাদু পরামাণিক ধরেন এদের বাড়িতে আজ সুদীর্ঘ-। চিলমচিতে হাত ধুতে ধুতে খয়বার গাজী তাকে থামিয়ে দেয়, জালাল মিয়া কন ক্যা? এই চ্যাংড়া নাকি কবো। তাকই কবার দ্যান না!
আনোয়ার অনেকক্ষণ থেকে মনে মনে রিহার্সেল দিচ্ছিলো। এবার বলেই ফেলে, নাদুর বিরুদ্ধে মামলাটা তুলে নিলে ভালো হতো। বেচারা খুব ভেঙে পড়েছে। গরিব লোক, শরীর খারাপ, সেরকম খাটতেও পারে না। লোকটা এমনিতে খুব ভালো, অনেস্ট লোক-।
‘না, নাদু তো মানুষ খারাপ না, অপরিবর্তিত গলায় খয়বার গাজী বলে, ছোটো জাতের মদ্যেও আল্লা ইশজ্ঞান দেয়, নাদুরও হুশজ্ঞান কম নাই। কিন্তু তার ব্যাটা? উই যে অকামটা করছে আর শালার কথাবার্তা যেমন শুনি, এখন তার সাথে কি করি কও তো? বিশ পঁচিশ বছর আগে হলেও বাপজানের দোনলা বন্দুকখান বার করা শালাক গাঙের কিনারে নিয়া ফালায়া দিল্যামনি তা বাপু দিনকাল এখন খারাপ। এখন সোগলি শালা বড়োলোক, -চাষাভুষা-জোলা-নাপিত কৈবর্ত-কামার-কুমার-সোগলিক তোয়াজ করা চলা নাগে। চেংটুক নিয়া এখন কি করি কও তো বাপু জালাল মিয়াই কন তো, চেংটুর লাকান একটা শয়তানের সাথে কি করি? আজ লাই দিলে কাল আপনার মাথাত লাথি মারবো। এ্যাঁক নিয়া কি করি আপনেই কন?
চেংটুর ব্যাপারে জালাল মাস্টারও খয়বার গাজীর সঙ্গে একমত। ছেলেপিলে আদব কায়দা ভুলে যাচ্ছে। যার যা প্রাপ্য তাকে তা দিতে চায় না।
আল্লা সব মানুষকে সমান মনোযোগ দিয়ে সৃষ্টি করেছে এ কথা অবশ্য ঠিক। সব মানুষের প্রতি আল্লার প্রীতি ভালোবাসাও সমান। কিন্তু হাতে পাঁচটা আঙুল যেমন সমান হয় না, এক বাপের পাঁচটা ছেলে যেমন সমান বুদ্ধি-বিবেচনা পায় না, সমাজের সব মানুষ তেমনি একই আসন পেতে পারে না। এই যে চেংটু, একে একা দোষ দিয়ে লাভ কি? আজকাল এই বয়সের সব ছেলেই এরকম হচ্ছে। প্রয়োজনীয় শিক্ষার অভাবেই এর কারণ বলে জালাল মাস্টার মনে করে। উপযুক্ত জ্ঞানলাভ না হলে আদবকায়দা রপ্ত করা অসম্ভব, আদবকায়দা হলো শিক্ষার ১টি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে নাদুটা মানুষ খুব ভালো। মনিবের হিত ছাড়া তাই কোনোদিন অহিত চায় নাই, মিয়াদের ইষ্ট ছাড়া তাই কোনো দিন অনিষ্ট করে নাই।’
খয়বার গাজী একটু বিরক্ত হয়, খবর কি আমি কম রাখি? আপনি জামাই মানুষ, উদিনক্যা আসছেন, আপনে কি জানেন? এর দাদার আমল থাকা এই বাবাজীদের বাড়িতে যারা কাম করে সবাইকে আমি চিনি।
বারান্দায় বসে পান খেতে খয়বার গাজী আনোয়ারকে বলে, তুমি একটা আবদার নিয়া আসছে, আমি কি না করবার পারি? চেংটুক কয়ো একবার আমার সাথে যেন দ্যাখা করে। চেংটুর কথা শুনবো, আমার ভাইস্তা আফসারের কথাও শোনা দরকার। চেংটু বেয়াদবি করছে আফসারের সাথে, আমার সামনে আফসারের কাছে যদি মাফ চায়, আফসার যদি মাফ করে তো আমি মামলা তুল্যা নেবো। একটু থেমে সে বলে, আফসারেক আমি বুঝায়। বলবো, চ্যাংড়া প্যাংড়া একটা ভুল করা বসছে, আফসার মাফ করা দেবে।
এতো সহজে কাজ হবে আনোয়ার ধারণা করতে পারেনি। জালাল মাস্টারের অনুমান তাহলে অভ্রান্ত, সে একবার দ্যাখা করলে খয়বার গাজী অস্বীকার করতে পারবে না। হাজার হলেও আব্বার ছেলেবেলার খেলার সার্থী। কিন্তু খয়বার গাজী মামলা তুলে নেওয়ার এই সিদ্ধান্তে জালাল মাস্টারকে একটুও খুশি মনে হচ্ছে না। কেন? গ্রামের লোকদের আবেগ প্রকাশের ব্যাপারটা আনোয়ারের কাছে বড়ো এলোমেলো ঠেকে।
পাঞ্জাবির পকেট থেকে কোটা বার করে মুখে জর্দা ফেলে খয়বার গাজী বলে, বাবাজী, তুমি আসছো আমার এই গরিবখানায় এক সন্ধ্যা ডালভাত খাওয়া লাগবে। কিন্তু না, দুইটা ডালভাত খায়া যাবা। ওয়াদা করা যাও, ঐ্যা?
আনোয়ার কি রাজি না হয়ে পারে? সে কেবল এদিক ওদিক দ্যাখে। শেফালি গাছের নিচে ফুল এখন মাত্র কয়েকটি। ওরা খেতে বসলে কেউ এসে নিয়ে গেছে। পুকুরের বাধানো ঘাটের দুই পাশে মস্ত ২টো গাছ, ১টা তো বকুল, আরেকটা কি? কনক-চাপা হতে পারে, হাটখোলা রোডের ১টা বাড়িতে এরকম গাছ দেখিয়ে ওসমান একদিন ওটা কনক-চাপা বলে সনাক্ত করেছিলো। পুকুরের বা পাশে নতুন খড়ের টাটকা হলুদ রঙের গাদা। তার নিচে নতুন একটি সাদা বাছুর কচি মুখে খড়ের একটি গাছা নিয়ে খেলা করে। কচি নরম রোদ এসে পড়েছে বারান্দা জুড়ে।
পুকুরের ওপর পাতলা ধোঁয়া আস্তে হারিয়ে যায়, সেখানকার নতুন রোদের কাপন যেন ঢেউ তুলছে খয়বার গাজীর ভরা গলায়, এই যে পুষ্করনি, তোমার বাপের কয়ো ভাই সাতার শিখছে এটি। তোমার দাদা বড়ো শক্ত মানুষ ছিলো গো, ছেলেপেলেক ইদারার তোলা পানি ছাড়া গোসল করবার দেয় নাই। বড়োমিয়া বিছনা ছাড়ছে রাত থাকতে, বেলা ওঠার আগে বাড়ির ছেলেপেলে সব কয়টাক উঠায়া দিছে। নামাজ পড়া লাগছে বাড়ির সব মানষেক জায়গির, কিষান, চাকরপাট-সোগলি নামাজ পড়ছে তার বাড়িত। নামাজ পড়া হলে তিন ব্যাটাক পড়বার বসায়া তার অন্য কাম। তোমাদের বাড়িতে দুইজন তিনজন জায়গির থাকছে বারো মাস। সকালবেলা তোমার বাপচাচাগোরে পড়া দাখায়া দিছে তারাই। এই তো জালাল মিয়াও ছিলো। ক্যাগো, আকবর ভায়েক আপনে পড়ান নাই?
‘না, আমি যখন আসি আকবর ভাই তখন কলকাতার কলেজে পড়ে। ‘ছ। আপনে তাহলে এই চ্যাংড়ার ছোটোচাচাক পড়াচ্ছেন, না? জালাল মাস্টারের জবাবের অপেক্ষা না করে সে নিজেই মনে করতে পারে, না, আপনে পড়বেন ক্যামন করা? জাহাঙ্গীর তো তখন ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিবো।’
জালাল মাস্টারকে একটু ছোটো করার এই সংক্ষিপ্ত তৎপরতা কিন্তু খয়বার গাজীর স্মৃতি-আপ্লুত আচ্ছন্নতায় এতোটুকু চিড় ধরায় না, তার গলা নেমে আসে খাদে, সে বিড়বিড় করেই চলে, দেখতে দেখতে দিন গেলো! সময়ের দ্রুতগতির কথা ভেবে সে ১টি দীর্ঘশ্বাস ফেলে, এই দীর্ঘশ্বাস দীর্ঘতর হয় তার কথায়, দিন কি বস্যা থাকে? এই বারান্দার উপর বস্যা কতো গপ্পো, কতো খেলা, কতো গান শোনা, মনে হয় সেদিনকার কথা কলকাতা গেলো, কলেজ ছুটি হলে বাড়িতে আসছে, ছুটির মধ্যে সারাটা দিন বস্যা থাকছে এই বারান্দায়, এই বৈঠকখানায়, ঐ পুকুরের ঘাটে। ছুটির মধ্যে আসা খালি গান শুনছে। আকবর ভায়ের ছিলো গান শোনার নেশা।
লোকটা বলে কি? আনোয়ার ওর বাবাকে গান শুনতে দেখতো বটে, কিন্তু তাকে ঠিক নেশা বলা যায় না।
খয়বার আলি বলে, তোমার দাদা ছিলো কড়া মুসল্লি মানুষ, গান বাজনা আমোদ ফুর্তি ছিলো তার দুই চোক্ষের বিষ। আমার বাপজান আছিলো খুব হাউসআলা মানুষ, মাসের মধ্যে না হলেও পনেরো দিন টাউনে থাকছে। বাড়িত থাকলে একদিন দুইদিন অন্তর খাসি জৰো করো, পোলাও-কোৰ্মা খাও। এই থানার মধ্যে প্রথম কলের গান কেনে বাপজান, পদুমশহরের জগদীশ সেন কিনলো তার ছয় মাস পর। তোমার বাপ করছে কি-? বলতে বলতে খয়বার হাসে, গান-পাগলা মানুষ, করছে কি ছুটির সময় কলকাতা থাকা নতুন নতুন রেকর্ড নিয়া আসছে। সায়গল, আঙুরবালা, কমলা ঝরিয়ার যতো রেকর্ড আমার বাড়িতে আছে সব তোমার বাপের কেনা। আব্বাসউদিনের রেকর্ড প্রথম কিন্যা আনলো আমার বাপজান। ১টি মহাকৌতুককর বিষয় বর্ণনার ভঙিতে খয়বার হাসে, আকবর ভাই আবার ঐ রেকর্ডই নিয়া আসলো পুজার ছুটির সময়।
খয়বার গাজীর বিরামহীন সংলাপে আনোয়ারের কাছে তার বাবা ক্রমেই ঝাপশা মানুষ পরিণত হয়। আনোয়ার তো কোনোদিন আব্বাকে একটা রেকর্ডও কিনতে দ্যাখেনি। অথচ ওদের স্টোরিও রেকর্ড-প্লেয়ারের জন্য ভাইয়া-ভাবী মাসে অন্তত একটা লংপ্লে কেনে, এমন কি সিক্সটি ফাইভ পর্যন্ত কলকাতা থেকেও মাঝে মাঝে রেকর্ড আসতো। ঝাপশা বাবাকে শপষ্ট করার জন্য আনোয়ার জিগ্যোস করে, আব্বা রেকর্ড কিনতেন?
হ্যাঁ বাপু, এবার বলে জালাল মাস্টার, খয়বার ভায়ের বাবার ঢালাও আদেশ ছিলো, নতুন গান বার হলেই নিয়া আসবা, অর্থ যা লাগে চিন্তা করব না। মরহুম পিতার প্রসঙ্গ তোলায় খয়বার গাজী জালাল মাস্টারের ওপর একটু প্রসন্ন হয়, জালাল মিয়া ঠিক কথা কছেন। বাপজান হাউস করা হরমোনিয়াম কিনছে, তাই নিজে গান করছে ছয়মাসে নয়মাসে একবার। হারমোনিয়াম বাজাছে আকবর ভাই, একোটা গান একবার, বড়েজোর দুইবার শুনলে ঠিক তুল্য নিবার পারতো, তাই না জালাল মিয়া?
ঠিক কছেন। তার স্মরণ শক্তি ছিলো অসাধারণ একবার একটা পুস্তক পড়লে’আরে আপনে কি দেখছেন? খয়বার গাজী তাকে থামিয়ে দেয়, তোমার দাদার হাউস ছিলো এক ব্যাটাক উকিল বানাবো। বড়ো ব্যাটা, তোমার বড়োচাচার শরীরটা নরম, কলকাতার হোস্টেলের খাবার সহ্য হলো না, আইএ পাস করা বাড়িতে আসলো। আর গেলো না, সংসার দ্যাখা আরম্ভ করলো। মানুষের নসিব! তোমার বাপ বিএ পাস করা ল’য়েত ভর্তি হলো, পরের বছর বড়ো মিয়া মারা গেলো। তোমার বড়োচাচা পড়ার খরচ কুলাবার পারে না। ল’ পড়ার জন্যেই আকবর ভাই বিয়া করলো, কি মনে করা এক বছর বাদে পড়া বাদ দিলো, চাকরি নিলো। আকবার ভাই উকিল হলে এই তামাম ডিস্ট্রিষ্ট্রের মধ্যে তার সাথে পারে কেডা?
আনোয়ার ভাবে উকিল না হয়েও আব্বা এমন কি খারাপ করেছে? পার্টিশনের সময় পাকিস্তানে অপশন দিয়ে এসেই ওয়ারিতে বাড়ি কিনেছে, ব্যাংকে টাকা যা রেখে গেছে তাই নিয়ে ব্যবসা করে ভাইয়া দিব্যি রাজনীতি ও সংস্কৃতি চর্চা চালিয়ে যাচ্ছে।
‘আকবর ভায়ের ছোটোভাইটা জাহাঙ্গীরও খুব মেধাবী ছাত্র ছিলো। জালাল মাস্টার এই মন্তব্য করে ফের খয়বার গাজীর ধমক খায়, জাহাঙ্গীরকে আপনে আর কয়দিন দেখছেন? এই চাচাটিকে আনোয়ার অবশ্য একেবারেই দ্যাথেনি, জাহাঙ্গীর হোসেন মারা গেছে তার জনের আগে। আব্বা তার সম্মন্ধে খুব একটা কথা বলতো না, আম্মাও না। বড়োচাচার বোধ হয় বেশ দুর্বলতা আছে, ভাইয়া পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করে চিঠি লিখলে বড়োচাচা জবাবে লিখতো, তোমার নিকট আমাদের প্রত্যাশা অনেক। জাহাঙ্গীর জীবিত থাকিলে আজ বড়ো আনন্দিত হইত। উহার মেধার লক্ষণ বংশে কেবল তোমার মধ্যে লক্ষ করা যায়। আজ খয়বার গাজীও তার প্রসঙ্গে উচ্ছসিত হয়ে উঠলো, হ্যাঁ, জাহাঙ্গীর ছিলো স্কলার ছাত্র। একটা স্টুডেন্ট বটে। ওরকম তুখোড় ছাত্র এই গোটিয়া, পদুমশহর, দরগাতলা, চন্দনসহ, কর্ণিবাড়ি-এই অঞ্চলে জন্ম হয় নাই। এমনকি পার্টিশনের আগে, তখন মোসলমানের স্থান কোটে? সেই সময় হিন্দুগোরে মধ্যেও এরকম মেরিট এই অঞ্চলে একটাও আছিলো না গো। জাহাঙ্গীর হোসেন সম্পর্কে খয়বার গাজীর দীর্ঘ প্রশস্তিমূলক বিবৃতি আর শেষ হয় না। কুস সিক্সে পড়ার সময় সে ম্যাট্রিক ক্লাসের টেস্ট পেপার দেখে অঙ্ক করতো। ‘ক্সাস নাইনে যখন পড়ে, এবার জালাল মাস্টার প্রায় জোর করে স্মৃতি ঘটে, হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক কেশব মিত্রের ফেয়ার-অয়েল বস্তৃতা করলো ইংরাজিত, যারাই শুনছে তারাই বলছে, মনে হলে বিলাত থাকা সদ্য আগত ইংরাজ ভাষণ দিতেছে! তো সেই ছেলে, ঐ বয়সে অতো মেধা, —মুরুব্বিদের কেউ কেউ বলতো এতোটা ভালো নয়। সন্দেহ করতো, খয়বার গাজী বলে, চ্যাংড়ার সাথে তেনাদের কেউ আছেন। না হলে এই বয়সের চ্যাংড়া এতো বুদ্ধি পায় কোটে? তেনারা মানে কারা?–আনোয়ার বুঝতে পারে না।-আরে আগুনের জীব! তবুও বোঝে না! খয়বার গাজী বিরক্ত হয়, জীন জীন চেনো না?—মুরুব্বিদের অনুমান কি ভুল হতে পারে? ম্যাট্রিকে ২টো লেটার পেলো, ডিস্ট্রিক্টে ফাস্ট, তখন বাপু হিন্দুরা আছিলো, পরীক্ষা দিলাম আর পাস করলাম-অতো সোজা না! কলেজে ভর্তি হলো কলকাতায়। আকবর ভাই তখন পরিবার নিয়ে কলকাতায় থাকে, জাহাঙ্গীর তার বাসায় থেকে কলেজ করতে লাগলো। বছর না ঘুরতে জাহাঙ্গীরকে গ্রামে নিয়ে আসা হলো, তার হাতে পায়ে শিকল পরানো, তার মাথা কামানো। চোখজোড়া তার অষ্টপ্রহর লাল, মানুষ দেখলে চিৎকার করে, না দেখলেও আকাশের দিকে তাকিয়ে বিকট শব্দে কার উদ্দেশে গালাগালি করে। কি ব্যাপার? জোনপুরের মৌলবি সাহেবের ভাগ্নে,—জবরদস্ত পীরসায়েব, নৌকা করে যমুনার শাখানদী বাঙালি দিয়ে যাচ্ছিলো মুরিদ বাড়ি, নাদু পরামাণিকের কাছে খবর পেয়ে আনোয়ারের বড়োচাচা নিজে গিয়ে নৌকা থামিয়ে পীরসায়েবের হাতে পায়ে ধরে। পীরসায়েব এসে জাহাঙ্গীরের রোগ সনাক্ত করে ফেললো। কলকাতায় কোথায় কোন অজায়গায় দাঁড়িয়ে পেচ্ছাব করছিলো, সঙ্গেকার জীন তাই খেপে গিয়ে একটা বদম্বভাব জীনকে তার ওপর আসর করিয়ে দিয়ে নিজে সরে পড়েছে। বদ জীন ঝেড়ে ফেলা পীরসায়েবের কাছে ভালভাত, জাহাঙ্গীরকে বেঁধে কয়েকটা আয়াত পড়তে পড়তে ঝাড়ুর বাড়ি মারলে শয়তানটা বাপ বাপ করে পালাবে। কিন্তু পীরসায়েব তা করতে নারাজ; কারণ তাতে ভালো জীন অসম্ভষ্ট হয়।
জীন হলো ফেরেস্তাদের মতো, তাকে অসন্তুষ্ট করার ঝুঁকি পীরসায়েব নেয় কি করে? —তা কলকাতায় গিয়ে জাহাঙ্গীরের মতিভ্রম ঘটেছিলো বৈ কি। কয়েকটা হিন্দু কমুনিস্টের সঙ্গে তার মেলামেশা শুরু হয়। এতো পরহেজগার পরিবারের ছেলে, সে নাকি নামাজ পড়া ছেড়ে দিয়েছিলো, আল্লা রসুল নিয়ে ঠাট্টা পর্যন্ত করতো!—আহারে, হিন্দু কমু্যনিস্টদের পাল্লায় পড়ে পাগল না হলে জাহাঙ্গীর এই এলাকা কি, এই জেলার একটা মাথা হতে পারতো। এই নিয়ে খয়বার গাজী ও জালাল মাস্টারের পালা করে আক্ষেপ প্রকাশের আর শেষ হয় না। কতোক্ষণ চলতো কে জানে? ১টি মোটর সাইকেলের আওয়াজে ২জনেই থামে এবং তাকিয়ে থাকে রাস্তার দিকে। শিমুল গাছের নিচে এলে হোল্ডা আরোহীকে দু’জনেই চিনতে পারে, জালাল মাস্টার বলে, ফকিরগোরে আসমত না?
খয়বার গাজী সেদিক থেকে চোখ ফেরায় আনোয়ারের দিকে, কয়টা দিন থাকবা তো বাবা? ‘জী, কলেজ তো আজকাল প্রায় বন্ধই থাকে। কোনো অজুহাত পেলেই গভমেন্ট একেবারে অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত— ?
‘শিক্ষার বিস্তার হয় কেমন করা? জালাল মাস্টার শিক্ষাবিস্তারে বাধাবিপত্তি নিয়ে তার বক্তব্য শুরু করেছিলো, হোন্ডা এসে পড়ায় তাকে থামতে হয়। হোন্ডার আরোহী হোল্ডা দাঁড় করাতে করাতে বলে, মাস্টার সায়েব সকালবেলা কি দরবার নিয়া আসছেন?
কিন্তু খয়বার গাজীর সঙ্গে তার জরুরি আলাপ, তাই প্রশ্নের জবাব না শুনেই সে এগিয়ে আসে, ওদিককার খবর শুনছেন? হোসেন চাচামিয়া খবর পাঠাচ্ছে। কথা আছে।’
খয়বার তাকে বৈঠকখানায় বসতে বলে নিজে উঠে দাঁড়ায়। আনোয়ার ও জালালের সঙ্গে সে বারান্দা থেকে নিচে নামে। আনোয়ারের পিঠে হাত রেখে বলে, বাবা, কথাটা যেন মনে থাকে। একদিন অ্যাসা ভাত খায়া যাওয়া লাগবো। আকবর ভায়ের ব্যাটা, আমার নিজের ঘরের মানুষ, তোমাকে আমি মুখে না কলেও তোমার একদিন আসা লাগে। তার মুখের জর্দা ও পানের গন্ধ আনোয়ারের মাথার ভেতরে ঢুকে তাকে একটু আচ্ছন্ন করে, তার হাতের মস্ত থাবা দিয়ে আনোয়ারের পিঠ সে আলগোছে চাপ দেয়। খয়বার গাজীর হাতের মধ্যে দিয়ে বহুকাল আগেকার বাপের-ভয়ে-তটস্থ গান-পাগল ১টি তরুণ আনোয়ারের শিরদাঁড়ায় সারেগামা সাধে, আনোয়ারের পিঠ শিরশির করে।
বারান্দার নিচে শুকনো শিশিরের দাগ লাগা ঘাসের ধারালো রেড়ে গলা-বসানো শেফালি ফুল আস্তে আস্তে কুঁকড়ে যাচ্ছে।
শিমুলগাছের কাছাকাছি এসে জালাল মাস্টার পেছনে তাকায়। ঐ সঙ্গে তাকায় আনোয়ারও। হোন্ডাওয়ালা ছেলেটির সঙ্গে খরবার গাজী কথা বলছে, কথা বলতে বলতে ২জনে এগিয়ে যাচ্ছে পুকুর ঘাটের দিকে।
আরো কয়েক পা ইটার পর জালাল বলে, ‘খালি খালি কষ্ট করলা, কোনো কাম হলো না বাপু।
আনোয়ার ঠিকমতো শুনতে পায় না। তার চোখের ঠিক সামনে মস্ত শিমুলগাছ জুড়ে টকটকে লাল রঙ। এর উপর নীল আকাশ। হাঙ্কা ফেনার মতো মেঘ উড়ে বেড়ায় নির্ভার শরীরে। এই লাল, ঐ নীল ও সাদা দেখে দেখে আশ আর মেটে না। কতোকাল আগে আনোয়ারের বাপও এই রাস্তায় এই রঙবাহার দেখতো? ছোটোচাচার হাতের শিকল বড়ো হতে হতে সমস্ত দৃশ্যে কালোর দাপট বিস্তার করলে আনােয়ারের বড়ো অগস্তি লাগে। জালাল মাস্টার এই অস্বস্তি থেকে তাকে একরকম উদ্ধার করে, খালি পথশ্ৰম। খালি খালি আসা হলো।
কেন? আনোয়ার অবাক হয়, মামলা তুলে নেবে বললেন তো’। তুমি বুঝবার পারো নাই আনোয়ার, গাজীর শর্ত পালন করা দুঃসাধ্য। শর্ত? জিগ্যেস করতে করতে আনোয়ারের মনে পড়ে, চেন্টুর আসার কথা বলছেন তো? চেন্টু মাফ চাইবে না?
কথা তো তা নয় বাবা, দিনকাল ততো সুবিধার নয়, খয়বার গাজী চট করা কিছু করবার পারতিছে না। না হলে চেন্টু যা করছে কোনদিন তার লাশ পড়া থাকতো। চেংটুক বাড়ির সীমানার মধ্যে পালে পরে কি করবো তা অকল্পনীয়। নিজে কিছুই করবো না, হয়তো সামনে থাকবেই না, আফসার গাজীকে হাত তুলব্যার মান করা দিবো। দুইজনে ঘরের মধ্যে থাকা খালি ইশারা করবো, কাম সারবো বাড়ির কামলাপাট।

আনোয়ারের মাথায় ভেতরকাল বিন্যাস ফের এলোমেলো হয়ে পড়ে। খয়বার গাজীর মুখ ও একটানা সংলাপ ক্রমেই ঝাপশা হয়, প্রতি পদক্ষেপে তার সঙ্গে দূরত্ব বাড়ে। হাটতে হাটতে সে বারবার জালাল মাস্টারকে দ্যাখে। নিজেই একটা সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করে, আচ্ছা, আমিও যদি চেন্টুর সঙ্গে থাকি?
এ্যাঁ?
ধরেন আপনি আর আমি যদি চেন্টুকে নিয়ে আসি? এতে কাজ হবে না? জালালউদ্দিন জবাব দেয় না জেলা বোর্ডের রাস্তার ২ দিকে ধান জমি। ধান কাটা হয়ে গেছে, ন্যাড়া মাঠ শরীর এলিয়ে রোদ পোহায়। একটু দূরে আলুর জমি। একনাগাড়ে কয়েক বিঘা জমিতে আলুর চাষ করা হয়েছে, ৩/৪ জন কিষান আলুর জমিতে কাজ করে, তাদের মাথার পেছনে ও পিঠে আৰ্দ্ৰতাশূন্য রোদ পিছলে পিছলে পড়ে। জালাল মাস্টার চোখের ওপর হাত রেখে রোড আড়াল করে ওদের মধ্যে কাউকে খুঁজছে। সে জোরে হাক দেয়, ক্যারে, করমালি আছে? জবাব আসে, নাই।’-আনোয়ারের দিকে মনোযোগী না হয়ে জালাল মাস্টারের তখন আর উপায় থাকে না। এসব ছেলেদের নিয়ে মুশকিল,—শহরে জন্ম, শহরে মানুষ, এখানকার সমস্যা এরা বুঝবে কোথেকে? চেংটুও থাকবে, খয়বার গাজীও থাকবে, জালাল মাস্টার সেখানে স্পষ্টভাবে চেংটুর পক্ষ নিয়ে কথা বলবে-একি হতে পারে? এতোবড়ো মানী মানুষটাকে কি ছোটো করা যায়? চেংটুকে বিশ্বাস করা মুশকিল, কি বলতে যে কি বলে ফেলবে, তখন তার ধকল সামলাবে কে? জালাল মাস্টার সংক্ষেপে বলে, চেংটু যাবো না। ছোড়া ভারি বেয়াদব!’
আমরা যদি ভালো করে বুঝিয়ে বলি?
‘দ্যাখা যাক!

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *