চিলেকোঠার সেপাই – ১৩

চিলেকোঠার সেপাই – ১৩

ইউনিভারসিটির যে ছেলেটি আজ পুলিসের গুলিতে মারা গেছে খিজির তাকে দ্যাখেনি। পুলিসের দিকে ইট-পাটকেল ছোড়ার তাগিদে যদি মেডিক্যাল কলেজে ঢুকে না পড়ে তাহলে ঐ সময়টা সে থাকে ঢাকা হল আর পিজির মাঝামাঝি। ছেলেটা গুলিবিদ্ধ হয় ওখানেই। ধরো, খিজির আলি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে না চুকে মিছিলের সঙ্গে যদি থাকতো, তাহলে? পুলিসের লরি ছিলো পিজির পাশে রশিদ বিল্ডিঙের সামনে। গুলি করা হয়েছে ওখান থেকেই। ধরো, খিজির ওর পাশেই আছে, শ্লোগান দিতে দিতে চলেছে, এমন সময় গুলি এসে ওর হাত ঘেঁষে ঢুকলো ওর পাশের ছেলেটির বুকে। এমন তো হতে পারতো যে, গুলিবিদ্ধ ছেলেটি ওর গায়েই ঢলে পড়লো। লোকজন সবাই দৌড়াচ্ছে, সেও দৌড়াচ্ছে, গুলিবিদ্ধ তরুণের মৃতদেহ কোলো নিয়ে দৌড়াতে তার একটুও অসুবিধা হচ্ছে না। –তাহলে? এই সব ভাবতে ভাবতে কাচা গুয়ের গন্ধ নাকে ঝাপ্টা মারলে বোঝা যায় যে, তাদের বস্তি এসে গেছে। —কিন্তু তার হাউস কি কেউ দমিয়ে রাখতে পারে-আচ্ছা তার গায়েও তো এই গুলি লাগতে পারতো! পুলিসের বুলেট কি শিক্ষিত অশিক্ষিতে, ধনী গরীবে, ছাত্র মজুরে ভেদ করে?–নাঃ! বুকে গুলি লাগানো ঠিক হবে না। কয়েকটাকে সাফ না করে এখন মরাটা ঠিক নয়। ঠিক আছে, ধরে বা পায়ে গুলি লাগলে এমন কিছু অসুবিধা হয় না। অনেকদিন রিকশা চালিয়ে পা ২টো তার লোহার পিলার। আবার এখন স্কুটার চালায়, রিকশা চালানো ছেড়ে দেওয়ায় পিলারজোড়ায় বাত ঢুকেছে, বৃষ্টি বাদলায় ভিজলে পা ২টো টনটন করে। ১টা গুলি লাগলে রক্ত বেরিয়ে বাতের ব্যথা চিরকালের মতো সারতো।
ঘরের বাপ তুলে ঢোকার পরও শ্লোগান, গুলিবর্ষণ ও টিয়ার গ্যাসের শব্দমুখর চান খার পুল ও নিমতলী এলাকা মাথার মধ্যে গমগম করে। মেঝেতে বসে গপ গপ করে ভাত খাওয়ার পর থালে হাত ধুচ্ছে, বিছানার ওপর থেকে জুম্মনের মা বলে, ব্যাকটি খাইলা?
‘তুই খাস নাই? জিগাইছিলা? জিন্দেগিতে জিগাইছো? আছে খালি নিজের প্যাটখান লইয়া। খালি হান্দাও আল্লা রে আল্লা, এই হাড্‌ডি কয়খানের মইদ্যে মনে লয় দুই তিনখান ঠিলা ছুপাইয়া রাখছে!’
বিছানার এদিকে বসতে বসতে খিজির বলে, তর মহাজনের প্যাটের মইদ্যে কলতাবাজারের পানির টাঙ্কি ফিট কইরা রাখছে। মাহাজনের প্যাট থাইকা দুই চার ঠিলা তুই লইয়া আইছস ?
বলতে বলতে খিজির বিছানার এক প্রান্তে শোয়, ডানদিকের বগল চুলকাতে চুলকাতে ভাবে, এই বাহু দিয়ে গুলিটা ঠেকাতে পারলে ইউনিভারসিটির ছেলেটা আজ মরে না। কিন্তু এখন ঝামেলা জুম্মনের মা, রাত্রে এর প্যাচাল পাড়া বন্ধ করে কে?
অক্কর্ম। ভ্যাদাইমা মরদ একখান! আউজকা গাড়ি লইয়া বারাইছিলা, গাড়ি চালাইছো? ঘরের খরচ চালাইবো তোমার বাপে?
এবার খিজিরের মেজাজ একেবারে খিচড়ে যায়, বলে আমার বাপে চালাবো ক্যালায়? তর মাহাজন বাপের লগে রাইত ভইরা ডাংগুলি খেলবার পারলি না? এখানে আইলি ক্যালায়? রাইত বাজে একটা আর খানকি মাগী অহন কলের গান একখান ছাড়লো।
এবার জুম্মনের মায়ের কলের গান চলে দারুণ স্পীডে, মাহাজন কার বাপ লাগে মহল্লার ব্যাকটি মানু জানে আমার মায়েরে মাহাজনে জিন্দেগিতে দেখছে? আমাগো বাপ থাকে একজন!
খিজির ভাবে মিছিলের জায়গাটা অমন করে ছেড়ে দৌড় দেওয়াটা ঠিক হয়নি। একটা চিলও তো সে পুলিসের গায়ে লাগাতে পারলো না।
গাড়ি লইয়া বারাও, রাস্তার মইদ্যে গাড়ি ছাইড়া দিয়া টাঙ্কি মারবার যাও, না? খিজির এবার অবাক হয়, এ বেটি জানলো কিভাবে? বলে, ‘তরে এইগুলি কইলো ক্যাঠায়? তর মহাজন বাপে, না? তর মহাজনের মাথার উপরে ঠাঠা পড়বো, বুজলি?
আস্তে কও, আস্তে কও। মাহাজনের ঘরে থাকো আবার তারে উল্টা-পাল্টা কথা কও, শরম করে না?
মাগনা থাকি? ভাড়া দেই না? কিন্তু জুম্মনের মা বারবার একই প্রসঙ্গে তোলে, সকালবেলা বেবি ট্যাকসি নিয়ে সে বেরুলো, আর মানুষের পাগলামি দ্যাখার জন্যে গাড়ি ছেড়ে দিলো মাঝপথে? এসবের মানে কি? মহাজন না হয় লোক খারাপ। তাই সই। কিন্তু আলাউদ্দিন মিয়া খিজিরের এই বান্দর নাচ দ্যাখার পাগলামি সহ্য করবে কদিন?
খিজির ফের জিগ্যেস করে, আমি জিগাই, তবে এই চাপাগুলি ছাড়ছে ক্যাঠায়? বলার লোকের কি অভাব? আজ বিকালবেলা আলাউদ্দিন মিয়া নিজেই গিয়েছিলো রহমতউল্লার বাড়ি। গিয়েই বলে, মামু, ইউনিভারসিটির ইস্টুডেন মরছে, পুলিসে গুলি চালাইছিলো। ইট্‌ হুঁশিয়ার হইয়া থাইকেন পাবলিকে আইয়ুব খানের উপরে যা চেতছে না! মোনেম খানের মাতম আরম্ভ হইয়া গেছে!’
তোমরা আইয়ুব খানের বালটা ছিড়বা’ রহমতউল্লা রাগ করে, আর কয়টার লাশ ফালায়া দিলেই এই হাউকাউ বন হইয়া যাইবো।
আলাউদ্দিন কিন্তু রাগ করে না, স্বাভাবিক কণ্ঠেই বলে, মনে হয় না। ইউনিভারসিটি ছাত্ৰ মইরা নূরুল আমিন খতম হইয়া গেছে না? আপনে এটু হুঁশিয়ার থাইকেন। আমলিগোলার মুসলিম লীগ অফিস ভাইঙ্গা দিছে।’
রহমতউল্লা মেয়েকে হাক দিয়ে চা দিতে বলে, মেয়ে গেছে পাশের বাড়িতে বেড়াতে। চা নিয়ে আসে জুম্মনের মা। টেবিলে বাকেরখানি, পনির ও চা রেখে সে চলে যাচ্ছিলো, আলাউদ্দিন বলে, খিজিরে এইগুলি কি করে? বেবি ট্যাকসি লইয়া বারাইয়া রাস্তার মইদ্যে গাড়ি দিয়া গেছে আরেকজনেরে। গাড়ি লইয়া ঐ হালায় যুদি পলাইতো!
মহাজন একটু রাগ ও একটু অভিমানে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর বলে, তোমরা তো আমার ইজ্জত রাখবা না! তুমি অরে খেদাইয়া দিলে পরের দিনই আমি খানকির বাচ্চাটারে লাথি দিয়া বাইর কইরা দেই! আমার জুম্মনের মায়েরে আবার বিয়া দিমু কামরুদিনের লগে।
‘কামরুদিন? উই বিয়া করবো? ‘পসা দিলে করবো না? দোলাই খালের রাস্তা করতাছি, মিস্ত্রী আমার কম লাগে? মহাজন খিজিরের নামে কতো অভিযোগ করে। তারই খেয়ে মানুষ হলো, আর সে কি-না ভিক্টোরিয়া পার্কে তারই গিবত করে! মিয়া, বোঝো তো, দিন খারাপ। নইলে এইগুলি কীড়া উড়ারে পায়ের একখান উঙলি দিয়া এক্কেরে মাটির মইদ্যে হান্দাইয়া দিবার পারি।
মামা ভাগ্লের কথা শুনতে শুনতে জুম্মনের মা বেশ ভয় পেয়েছে জুম্মনকে কি এজন্যেই মহাজন আজ পাঠিয়ে দিলো মালীবাগে কামরুদ্দিনকে খুঁজতে?
আজ সন্ধ্যাবেলা আলাউদ্দিন মিয়া খিজিরকে একটু বকেছে। যাকে তাকে এভাবে গাড়ি দেওয়া সে পছন্দ করে না। খিজিরের অবশ্য মনে হলো গাড়িটা সে নিজেই গ্যারেজে রেখে গেলে পারতো। দিনকাল ভালো না, গাড়ি নিয়ে কে কোথায় উধাও হয় তার ঠিক আছে? ১টি বেবি ট্যাকসি হারালে সায়েবের কতোগুলো টাকা নষ্ট নীলখেতে ইউনিভারসিটির সামনে ছেলেদের ভীড় দেখে সে মাথা ঠিক রাখতে পারেনি। নিউ মার্কেট থেকে প্যাসেঞ্জার নিয়ে যাচ্ছিলো কমলাপুর স্টেশন, নীলখেতে ছেলেদের মিছিল দেখে তার ইচ্ছা করছিলো, এক্ষুনি এদের সঙ্গে ভীড়ে যায়। খুব শ্লোগান চলছে তখন, মিছিল যাচ্ছে ফুলার রোডের দিকে। পেছনে মেয়েদের হলের সামনে পুলিসের গাড়ি, রাস্তায় পুলিসের কাটাতারের ব্যারিকেন্ড। কমলাপুরে প্যাসেঞ্জার নামিয়ে খালি গাড়ি নিয়ে রওয়ানা হয়েছিলো গ্যারেজের দিক, গ্যারেজের আশেপাশে রঙ্গু, করিম, হোসেন-এরা সব ঘুরঘুর করছে, এদের কাউকে বেবি ট্যাকসি দিয়ে ৫টা টাকা নেবে, বিকালে এদের কাছ থেকে টাকা তুলে সায়েবকে দিলেই চলবে। সারাদিন গাড়ি চালালো কে আলাউদ্দিন কি আর তাই তদন্ত করতে যাবে? কিন্তু মতিঝিলে স্টেট ব্যাঙ্কের সামনে দ্যাখে আদম আলি দাঁড়িয়ে রয়েছে বাসের জন্যে। বেচারার গাল টাল বসে গিয়েছে, খোঁচা খোঁচা দাড়ির অর্ধেকের বেশি পাকা। বছর খানেক আগেও আলাউদিনের বেবি ট্যাকসি চালাতো, কাজ ছেড়ে গ্রামে চলে গিয়েছিলো চাষ করতে করতে। মাঝখানে খিজির একদিন দ্যাখে মাথায় তরকারির ঝাকা নিয়ে আলু পটল কাচামরিচ শুটকি’ বলে চ্যাচাতে চাচাতে কে এম দাশ লেন ধরে হাঁটছে। আজ স্টেট ব্যাঙ্কের সামনে আদম আলিকে ডেকে ওর পাশে বসিয়ে খিজির বলে, ‘গাড়ি চালাইবি?’ কৃতজ্ঞতায় হালার গেরাইম্যাটা কথা বলতে পারে না। গুলিস্তানের কাছে নেমে খিজির বলে, পাঁচটা টাকা দে, বাকি পসা দিবি রাইত আটটা বাজলে, গ্যারেজের সামনে থাকুম। আবার সায়েবরে কইস না!
ড্রাইভারের সিটে বসে আদম আলি লাইসেন্স চায়, পুলিস ধরলে আবার কিছু পয়সা খসবে!
পুলিসের মায়েরে বাপ! ব্যাকটি পুলিস অহন ইউনিভারসিটির মইদ্যে’
খিজির পুলিসকে গালি দেয় কিন্তু আদম আলির হাতে লাইসেন্স বা বুক দিতেও রাজি হয় না, কিয়ের লাইসেন্স, তুই যা গিয়া!
খানিকটা বাসে এবং বেশির ভাগ হেঁটে ও দৌড়ে খিজির মিছিল ধরলো শহীদ মিনারের সামনে। শহীদ মিনারে মিটিং চলছিলো বলে মিছিলটা ধরতে পারলো। মিছিলের সঙ্গে এগিয়ে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের দক্ষিণ গেটে এসেছে, দ্যাখে হাসপাতালের ভেতর থেকে ছেলেরা পুলিসের দিকে ঢ়িল ছুড়ছে। রেলিঙ টপকে খিজিরও ইটপাটকেল ছুড়তে শুরু করে। গুলি চলার সঙ্গে সঙ্গে খিজির মেডিক্যাল কলেজের ভেতর দিয়ে ঢুকে পড়ে পিজি হাসপাতালে। কিছুদিন আগেও এখানে ইউনিভারসিটি ছিলো। মহল্লার ২টো মেয়েকে রিকশায় নিয়ে খিজির এখানে নিয়মিত আসতো। লোকজন সব উল্টেদিকে দৌড়াচ্ছে, আর সে কিনা পাগলের মতো ছোটে পিজির গেটের দিকে। গেঠে পুলিসের মস্ত ৩টে লরি। ফের পেছনে গিয়ে বেলতলার ধারে পুকুরের পাশ দিয়ে ঘুরে উঠে দাঁড়ালো রশিদ বিল্ডিঙের শেষ মাথায়। পুলিস ও ইপিআরের ট্রাক এখন চলে যাচ্ছে নাজিমুদিন রোডের দিকে। খিজিরের চারদিকে পলায়মান মানুষের প্রচণ্ড চাপ। গুলি, গুলি’, ‘মারা গেছে, না মরেনি, রিডিং হচ্ছে, হাসপাতালে নিয়ে গেছে’-এই সব সংলাপের মধ্যে মানুষ এলোপাথাড়ি দৌড়ায়। টিবি ক্লিনিক থেকে এগিয়ে আসছে লাল গাড়িটা। এবার শুরু হলো কাদুনে গ্যাস ছোড়া। ঢাকা হলের ছাদ থেকে ইটপাটকেল ও বোতল এসে পড়ছে পুলিসের ওপর। পুলিস পিছে হটছে, তারা ঢুকে পড়ছে রেললাইনের ধারে বস্তিতে। মোটামুটি নিরাপদ দূরত্বে এসে পুলিস ও ইপিআরের লোকজন বস্তির ভেতর এলোপাথাড়ি মারধোর শুরু করলো। পুলিস ও ইপিআরের সম্মিলিত শক্তিতে বস্তি জুড়ে শুরু হলো তছনছ কাণ্ড। এই সব ইট-চাপা ও হার্ডবোর্ডের বাড়ি ভাঙার জন্য তাদের বুলডোজার ব্যবহার করতে হয় না।-রাইফেলের বঁটই যথেষ্ট। এক পাল হাতি যেন দৌড়ে চলে যাচ্ছে বস্তির ওপর দিয়ে। বাড়িঘর সব টপাটপ পড়ে যায়। এর ওপর মানুষের পিঠে, বুকে, পাছায় ও মাথায় রাইফেলের বাটের বাড়ি।
‘আল্লা গো, মা গো’, ‘বাবা আমরা গরিব মানুষ, কিছু জানি না’, ‘বাবা আপনে আমার ধর্মের বাপ!—নারী-পুরুষ-বালক-বালিকার আর্তনাদ ও কাকুতি-মিনতি, বস্তির মানুষের ছোটাছুটি, আবার ওদিক থেকে টিয়ার গ্যাসের শেল ফাটার শব্দ। খিজির দৌড়াচ্ছে। তার কানে তখন শ্লোগান-পিপাসা। শ্লোগান শুনলেই বুঝবে যে, মানুষ পুলিসকে রুখে দাঁড়িয়েছে। রেল লাইনে লম্বা লম্বা পা ফেলে দৌড়াচ্ছে, এমন সময় দ্যাখা গেলো জুম্মনকে, জুম্মন দৌড়াচ্ছিলো উল্টোদিকে। জুম্মনকে ডাকতে খিজির একটু দাঁড়ায়, সঙ্গে সঙ্গে ওর ঘাড়ে পড়ে রাইফেলের বাটের বাড়ি। খিজিরকে ফের দৌড়াতে হয়। পুলিসের লোক ঘরে ঘরে ঢুকে ঘর ভেঙে দিচ্ছে, মাটির কলসি হাড়িকুড়ি ভাঙার আওয়াজ ক্রমে বেড়েই চলে। এরই মধ্যে সব অমূল্য রত্নসামগ্রী সরাবার জন্য কেউ কেউ ভাঙা ঘরে মাথা ঢুকিয়ে পাছায় ও পিঠে রাইফেলের বাটের গুতো খায়। জুম্মনকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না।
এখানে এতোক্ষণে মনে হলো, আরে জুম্মন তো বিছানায় নাই। খিজির জিগ্যেস করে, জুম্মনে কই?
আইবো না। জুম্মনের মা জবাব দেয়, অর বাপেরে মাহাজনে মানা কইরা দিছে।’ কি? মিস্ত্রীরে ডাইকা কইছে, পোলায় থাকবো বাপের কাছে। তোমারে আমি থাকবার জায়গা দিমু|
ক্যামনে? মাহাজনে তোমারে এহানে থাকবার দিবো না। কয় আমার বাড়ি থাইকা আমার লগে দুশমনি করবো! ঠিকই তো। মাহাজনে সইজ্য করবো ক্যালায়?’
সন্ধ্যাবেলা আজ জুম্মন ও জুম্মনের মায়ের সামনেই বাড়িওয়ালা কামরুদিনের সঙ্গে কথাবার্তা বলেছে, মিয়া নিজের বিবি পোলা লইয়া থাকে। ঐ নিমকহারামটারে আমি খাদাইয়া দেই! দোলাই খালের উপরে রাস্তার কাম চলে পুরাদমে, তোমার কামের অভাব হইবে না।’
কামরুদিন জবাব দেয়নি। জুম্মনের মা তখন পাকা উঠানের এক কোণে কলপাড়ে বাসন মাজছিলো আর তার দিকে বারবার দেখছিলো। –
বাড়িওয়ালার খুব রাগ, অর রোয়াবিটা দেখছোঁ? মিটিঙের মইদ্যে আমার নামে গিবত করে, বুঝলা? খানকির পয়দা-আর কি হইবো, কও? থাকতি কান্দুপটির মইদো, মায়ের ভাউরা হইয়া থাকতি বইনের ভাউরা হইয়া থাকতি মায়ের বইনের কাস্টমারের লাথি চটকানা খাইয়া দিন গুজরান করতি, ভালো হইতো না? আমি থাকবার জায়গা দিচ্ছি, খাওন দিয়া বড়ো করছি, খানকির পুতের আহন পাখনা গঙ্গাইছে! এইসব শুনতে শুনতে জুম্মনের মায়ের ছাইমাখা খড়-ধরা কালো হাত চলছিলো অতিরিক্ত দ্রুতবেগে।
তুই কি কইলি? খিজির আলি বৌকে জিগ্যেস করে, তুই কিছু কইলি না? জুম্মনের মা মাঝে মাঝে মিথ্যা কথা বলে, কিন্তু কোনো কথা বাড়িয়ে বলতে পারে না। তবে খিজির আলি সম্বন্ধে বাড়িওয়ালার গালিগুলো এতোটা হুবহু না বললেও তো পারতো। সুযোগ পেয়ে মাগী নিজেই কি তাকে গাল দিয়ে সুখ করে নিচ্ছে?
খিজির বলে, আমি মাহাজনের নামে গিবত কি করছি? মহল্লার মানু ঐদিন তারে ধইরা ছেইচা ফলাইতো না? আমি ঝুটা কথা কইছি? অর আপন ভাইগ্লাই তো আমাগো সর্দার, আমরা তো আলাউদ্দিন মিয়ার লগেই আছি। ভাইগ্রামিটিং করতাছেন? মিছিল করতাছে না? কার লগে ভূমি কার বিচার করো? কৈ তার ভাইগ্না, সায়েব মানু, দুইদিন বাদে বলে মাহাজনে নিজের মাইয়ার লগে বিয়া দিবো। গোলাম হইয়া তুমি তার সাথে এক লগে নাম ল্যাখাও? হায়রে মরদ কৈ মহারানী, কৈ চুতমারানী’
খিজিরের ইচ্ছা করে একটা ঘুষিতে মাগীর চোপাখান ফলাফালা কইরা ফালায়। কিন্তু তার সুযোগ না দিয়ে জুম্মনের মা বলে, এই মিছিল উছিলের হাউকাউ দেইখা মাহাজন খামোশমাইরা রইছে, নাইলে তোমারে উঠাইতে তার কতোক্ষণ?
উঠাইয়া দিলে যামু গিয়া। ঢাকার শহরের মইদ্যে জায়গার অভাব? আমারে কাম দিবো? তোমারে উঠাইয়া দিয়া মাহাজনে মিস্ত্রীর লগে আমারে বিয়া না দিয়া কাম দিবো?
এহানে কাম করবি না। কাম করলে কামের অভাব আছে? ‘আরে বাবা! মরদের লাহান কথা কইলা একখান মাহাজনে আমার পোলারে রিকশা কইরা দিবো, আমারে থাকতে দিবো। এইগুলি ছাইড়া তোমার সিনার মইদ্যে গিয়া ছুপাইয়া থাকুম, না? তাও তো খালি হাড্‌ডি কয়খান আছে। ঐ হাড্‌ডির খাঁচার মইদ্যে আমারে রাখতে পারবা? ভাদাইমা মরদ একখান!
এর মধ্যে গলা ভরে টালমাটাল গান নিয়ে পাশের ঘরে ঢুকলো বজলু। ছুকেই দরজায় বসে হড়হড় করে বমি করতে লাগলো। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো বজলুর বৌয়ের চিৎকার, রাইতে গু-গবর খাইয়া বাড়ি আইছে, অহন এইগুলি সাফ করে ক্যাঠায়? এইগুলি ধোয় কাঠায়? এরপর বমি করার আওয়াজ সাঙ্গ হলে আওয়াজ ওঠে মারধোর করার। ১টা চড়ে মেয়েটা চেচিয়ে ওঠে, দ্বিতীয় চড়ে চুপ। তারপর বজলু তাকে মেঝেতে ফেলে দমাদম লাথি মারে। লাথির প্রবাহে বিরতি পড়তেই বজলুর বৌ বিড়বিড় করে, পুলিসের বাড়ি খাইয়া চোট্টাটার ত্যাজ বাড়ছে, না? জবাব বজলুফের লাথি মারতে শুরু করে। মেয়েটা ভয়ানক তাড়া, মার খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে সংক্ষিপ্ত মন্তব্য যা করে মাতালকে উস্কে দেওয়ার জন্য তাই যথেষ্ট। এদিকে জুম্মনের মা বিড়বিড় করে, হায়রে। পাঁচ মাসের পোয়াতিটা হায়রে! তারপর পুরনো প্রসঙ্গ তুলে সে প্রায় মিনতির স্বরে বলে, তুমি না, বুজলা, মাহাজনেরে কও, মাহাজনেরে ভালো কইরা কইলেই—?
কিন্তু তার কোনো কথা খিজিরের কানে যায় না। পোয়াতি বৌকে বজলু লাথি মারছে। খিজিরের চোখের ভেতর থেকে রক্তের একটানা স্রোত বেরিয়ে কোনো একটি দালানের সিঁড়ির তলা ভাসিয়ে দেয়, রক্তের মধ্যে শরীর ডুবিয়ে পড়ে থাকে বজলুর বৌ।
খিজির এক লাফে উঠে বাইরে যায়। মাতালটাকে ফেলে দেওয়ার জন্য ১টা লাথিই যথেষ্ট। মাটিতে চিৎপটাং হয়ে শুয়ে বজলু জড়ানো গলায় গাল দেয়, তুই কাঠা? নিজেরটারে তামাম দিন বন্ধক রাখস মাহাজনের কাছে, রাইতে আইছস আমারটারে ধরতে, না? তরে ফালাইয়া একদিন টেংরি দুইখান না ভাঙছি তো আমি হালায় বাপের পয়দা না। মাহাজনেভি হুকুম দিছে। খানকির বাচ্চাটারে একদিন এক্কেরে মাইরা বস্তার মইদ্যে বাইদা হালায় ফালাইয়া রাখুম ম্যানহোলের মইদ্যো খাড়া’ বজলুর জড়ানো কথা কিন্তু সব বোঝা যায়।
জুম্মনের মা ঘুমিয়ে পড়েছে। খিজির একটু রাস্তায় এসে দাঁড়ায়। ওদিকে শ্যাওলা-পড়া, খয়েরি রঙের দোতলা তিনতলা বাড়ির ফাঁক দিয়ে দ্যাখা যায় মস্ত বড়ো চাদ। ফাঁকা রাস্তা জুড়ে ময়লা আবর্জনা চাদের আলোতে জড়ানো। খিজিরের বুক ভয়ানক ফাঁকা ফাঁকা ঠেকে। মহাজন কি বজলুকে তার পেছনে লেলিয়ে দিয়েছে? শরীরটা শীতশীত করছে। ঘরে ঢোকা দরকার। কাল হরতাল। এখান থেকে মিছিল নিয়ে যেতে হবে ইউনিভারসিটি। আলাউদ্দিন মিয়া ঐ বেবি ট্যাকসি নিয়ে বকবিকি করার পর বারবার বলে দিয়েছে খিজির যেন রিকশাওয়ালাদের নিয়ে সকাল বেলাতেই অফিসের সামনে হাজির হয়। শ্লোগান কি হবে সায়েব তাও ঠিক করে দিয়েছে। নাঃ! এখন ঘুমানো দরকার, কাল ভোরে উঠতে হবে।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে রাখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *