কর্নেল নীলাদ্রি সরকার

কর্নেল নীলাদ্রি সরকার

 বিকেলে ভবানীপুরে গেলাম অনামিকার মামা হেমাঙ্গবাবুর খোঁজে। একটা জরাজীর্ণ বাড়ির ছাদে ছোট্ট ঘরে থাকতেন হেমাঙ্গবাবু। পুরনো এক বাসিন্দা বললেন, “বাউণ্ডুলে লোক ছিলেন স্যার! দিদিকে ছলেবলে ভুলিয়ে তার বাড়ি বেচে টাকাগুলো মেরে দিয়েছিলেন। তারপর হাওয়া! আমরা ওঁর দিদিকে সাহায্য করতাম। রোগে ভুগে মারা গিয়েছিলেন। আমরাই ওঁকে হাসপাতালে রেখে এসেছিলাম।”

আরেক ভদ্রলোক সন্দিগ্ধভাবে জানতে চাইলেন, হেমাঙ্গবাবুর বিরুদ্ধে কোনও কেস-টেসের তদন্তে এসেছি নাকি। তাকে বললাম, “নাহ্। উনি আমার পরিচিত ছিলেন। এ পাড়ায় একটা কাজে এসেছিলাম। হঠাৎ ওঁর কথা মনে পড়ল। তাই একবার দেখা করার ইচ্ছে ছিল।”

আমার গাড়িটা পুরনো আমলের ল্যান্ডরোভার। পৌরাণিক বীরের মতো স্থিতধী এবং শক্তিমান। কিন্তু কসবায় গৌরীদেবীর ফ্ল্যাটে পৌঁছুতে সাড়ে ছটা বেজে গেল। সারাপথ আজ বড্ড বেশি জ্যাম।

একটি কিশোরী দরজা খুলে অবাক চোখে তাকিয়ে রইল। বললাম, “তুমি নিশ্চয় মিম্মি?”

সে আরও অবাক হল। “আপনি আমাকে চেনেন?”

 “চিনি তা তো বুঝতেই পারছ।”

 “ইমপসিবল! আমি আপনাকে কখনও দেখিনি। আপনি কি ক্রিশ্চিয়ান ফাদার?”

 “নাহ্ মিশ্মি! খাঁটি বাঙালি।”

মিম্মি চোখে অবিশ্বাস রেখে বলল, “আপনি কার সঙ্গে দেখা করবেন?”

 “সমীরবাবুর মায়ের সঙ্গে। বলো, কর্নেল নীলাদ্রি সরকার এসেছেন।”

“দিদা এখন শুয়ে আছে।”

“আহা, গিয়ে তুমি বলল ওঁকে।”

মিম্মি আমার আপাদমস্তক দেখে নিয়ে ভেতরে গেল। একটু পরে ফিরে এসে বলল, “ভেতরে এসে বসুন। দিদা আসছে।”

সমীরবাবুর মা গৌরীদেবী এসে নমস্কার করে বললেন, “পুলিশের লাহিড়ি সায়েব আপনার কথা আমাকে বলেছেন। দুপুরে ফোন করেছিলেন।”

“ফোনের লাইন কাটা ছিল শুনেছি?”

গৌরীদেবী সোফায় বসে বললেন, “হ্যাঁ। নীচের বক্সে তার ছেঁড়া ছিল। মিম্মির দাদা সেরে দিয়েছে।”

বৃদ্ধাকে লক্ষ করছিলাম। অনেকটা সামলে উঠেছেন। তবে কণ্ঠস্বর ভাঙা। আড়ষ্ট। বললাম, “এ অবস্থায় আপনাকে বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত। কথা বলতে আপনার কষ্ট হচ্ছে না তো?”

গৌরীদেবী আস্তে মাথা নাড়লেন। “না। বলুন কী জানতে চান?”

“আপনারা একসময় এন্টালি এলাকায় থাকতেন?”

“হ্যাঁ।” একটু ইতস্তত করে গৌরীদেবী বললেন, “প্রশান্ত, বাসু ওরা সব একই পাড়াতে থাকত। দুজনেই সমীরের বন্ধু ছিল।”

“চারুলতা সেনও থাকতেন?”

“চারু খুব ভাল মেয়ে ছিল। তবে বড় বোকা। ওর ভাই এমন সর্বনাশ করবে বুঝতে পারেনি।”

“আপনি ওঁদের বাড়ি বিক্রির কথা বলছেন?”

“বাড়ি বিক্রি। তারপর চারুর মেয়ে ছিল একটা–অনি। অনিকে নিয়েও ঝামেলা। অনিও ভাল। কিন্তু মায়ের মতো বোকা।”

“অনির সঙ্গে সমীরের বিয়ের ব্যাপারটা বলুন?”

গৌরীদেবী একটু চুপ করে থেকে বললেন, “চারু আমার হাতে ধরে বলল। এদিকে সমীরেরও ইচ্ছে। কী করব?”

 “বিয়ের আগের রাতে অনিকে বাসুবাবু কিডন্যাপ করে–”

“না, না! বাসুও ভাল ছেলে। কিডন্যাপ কেন করবে? অনি পালিয়ে ছিল প্রশান্তর সঙ্গে।”

“আপনি ঠিক জানেন?”

 “জানি মানে আমার তা-ই সন্দেহ হয়েছিল। বাসু তো তখন জামশেদপুরে।”

“সমীরবাবুর মুখে অনি সম্পর্কে কিছু শুনেছেন?”

“সমীর বলত, অনি বাসুর সঙ্গে পালিয়েছিল। ক’বছর আগে সমীর একদিন বলল, অনি বাসুর কাছ থেকে পালিয়ে গেছে। আমি বিশ্বাস করিনি।” গৌরীদেবী মিম্মিকে বললেন, “লক্ষ্মী দিদি! কর্নেল সায়েবের জন্য এক কাপ চায়ের ব্যবস্থা করে দে। তোর মাকে গিয়ে বল্।”

বললাম, “না, না। আমি চা খাই না। আপনাকে ব্যস্ত হতে হবে না।”

গৌরীদেবী তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে। মিম্মি ফিক করে হাসল। “কোল্ড ড্রিংক?”

বললাম, “নাহ্। থ্যাংকস।”

 “কফি?”

হেসে ফেললাম। “খাব।

 মিম্মি চলে গেল। গৌরীদেবী বললেন, “মিম্মি না থাকলে আমার এবার কী যে হত ভেবে পাই না কর্নেলসায়েব! কোন জন্মে আমার খুব আপন কেউ ছিল মেয়েটা।”

“আচ্ছা, সমীরবাবুর কাছে অনির কোনও ছবি ছিল জানেন?”

“ছবি? অনির ছবি?”

 “হ্যাঁ, অনির ছবি। সমীরবাবুর অ্যালবাম নিশ্চয় আছে?”

“দেখাচ্ছি।” বলে গৌরীদেবী ভেতরে গেলেন। একটু পরে দুটো প্রকাণ্ড অ্যালবাম নিয়ে এলেন।

অ্যালবামের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে তরুণ সমীরবাবুর পাশে এক তরুণীর ছবি দেখতে পেলাম। ছবিটা দেখিয়ে বললাম, “ইনি কি আপনার বউমা?”,

গৌরীদেবী ছবিটা অনেকক্ষণ ধরে দেখে বললেন, “নাহ! অনির ছবি।”

দুটো অ্যালবাম ঘাঁটতে সময় লাগল; মিম্মি কফি আনল। সে আমার পাশে বসে ছবি দেখতে থাকল। একটা পোস্টকার্ড সাইজ ছবির ওপর আঙুল রেখে সে বলল, “এটা কার ছবি দিদা?”

আমি বললাম, “অনি নামে একটি মেয়ের।”

 “আপনি চেনেন? কে অনি?”

গৌরীদেবী দেখে নিয়ে বললেন, “হ্যাঁ, অনির ছবি।”

বললাম, “ছবিটা আমার দরকার। একটা প্রিন্ট করিয়ে নিয়ে ফেরত দেব।”

গৌরী বললেন, “নিন না। ফেরত দিতে হবে না। ও ছবি আমি কী করব?”

ছবিটা বের করে পকেটস্থ করলাম। মিম্মি বলল, “কে অনি, দিদা?”

“ওকে তুমি চিনবে না ভাই!”

মিম্মি আমার দিকে তাকিয়ে রইল। গৌরীদেবীকে বললাম, “আর একটা কথা। অনির মামাকে আপনি চিনতেন?”

 “কয়েকবার দেখেছি। লোকটা ভাল ছিল না। চারু ভাইকে বিশ্বাস করেই সর্বস্বান্ত হয়েছিল। অনি বলত শকুনিমামা।”

“গতকাল বাসুবাবুকে অনেক বছর পরে দেখলেন। চিনতে পেরেছিলেন?”

“প্রথমে চিনতে পারিনি। পরে চিনলাম। বাসু খুব ভাল ছেলে। বাসু আমাকে বলল, প্রশান্তের জন্যই নাকি সমীর সুইসাইড করেছে। কেন এ কথা বলল জানি না। জিজ্ঞেস করার মতো মনের অবস্থা ছিল না।”

কফি শেষ করে উঠে দাঁড়ালাম। “চলি! দরকার হলে আবার আসব। বিরক্ত হবেন না তো?”

গৌরীদেবী উঠে এসে দরজা খুলে দিয়ে আস্তে বললেন, “কর্নেলসায়েব! সমু কি সত্যি সুইসাইড করেছে?”

“কেন? আপনার কি মনে হচ্ছে ওঁকে কেউ খুন করেছে?”

গৌরীদেবী দ্বিধাজড়িত ভঙ্গিতে বললেন, “কে জানে! আমার সন্দেহ হচ্ছে। সমু পিস্তল কোথায় পাবে?

“পিস্তল নয়, রিভলভার।”

 “একই কথা। কর্নেলসায়েব! ইদানীং সমুর হাবভাব যেন বদলে গিয়েছিল। আমার ছেলেকে আমি ছাড়া কে বেশি চিনবে? সমু কেন যেন খুব ভয়ে-ভয়ে থাকত। প্রয়ই বলত, কেউ তার খোঁজে এসেছিল কি না। আরও সব কথাবার্তা ঠিক মনে করতে পারছি না।”

মিম্মি বলল, “সমুকাকু সুইসাইড করেনি।”

বললাম, “কেন বলো তো?”

 “সমুকাকু সুইসাইড করলে কিছু লিখে রাখত। কোনও কিছু না লিখে কেউ আজকাল সুইসাইড করে না। বাবা বলছিল।”

চুপচাপ চলে এলাম। সারাপথ আমাকে একটা চিন্তা অন্যমনস্ক করে দিচ্ছিল।

ড্রয়িংরুমে বসে অনির ছবিটা খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম। এই ছবিটা স্পষ্ট। অসামান্য সৌন্দর্য বললে কিছু বোঝায় না। এমন কোনও মেয়ে এই ধুলোমাটির জগতে যেন এক অমর্ত্য মায়া। একে নিয়ে তিন যুবকের লড়াই বাধতেই পারে।

রাত আটটায় চিত্রকর সুমিতবাবকে ফোন করলাম। “সুমিতবাবু! আপনার আঁকা কতদূর এগোল?”

“মর্নিংয়ে পেয়ে যাবেন।”

“সুমিতবাবু! ছবিটার দরকার হবে না। অকারণ আপনাকে পরিশ্রম করিয়েছি। ক্ষমা চাইছি।”

“সে কী!”

 “হ্যাঁ। আমি একটা ছবি পেয়ে গেছি। তাতেই কাজ হবে।”

“ঠিক আছে। তবে ছবিটা আমি শেষ করব। আমার স্টুডিওতে থাকবে। যে ছবি পেয়েছেন, মিলিয়ে নিতে পারেন। আমার ধারণা, আপনি অবাক হবেন।”

“অবাক নিশ্চয় হব। তবে আপনি ছবিটা স্টুডিওতেই রাখবেন।”

সুমিতবাবু নিশ্চয় নিরাশ হলেন। কী আর করা যাবে? ভাল নিখুঁত ফটো যখন পেয়ে গেছি, তখন হাতে আঁকা ছবির দরকার নেই।?

আধঘণ্টা পরে অরিজিতের টেলিফোন এল। “হাই ওল্ড বস্! দা মিস্ট্রি ইজ সলভড়।”

“কী ভাবে?”

“প্রশান্ত সান্যাল মার্ডারার। গত ২৩ সেপ্টেম্বর সে কলকাতা এসেছিল। দমদম এয়ারপোর্টের পেপার্স থেকে সেটা জানা গেছে।”

“অরিজিৎ! দেশে আরও ইন্টারন্যাশন্যাল ফ্লাইটের জন্য এয়ারপোর্ট আছে। বোম্বে এবং দিল্লির কথাই বলছি।”

একটু পরে অরিজিৎ বলল, “হ্যালো! আর ইউ দেয়ার?”

ইয়া।”

“আমরা বোম্বে-দিল্লিতে খোঁজ নিচ্ছি। তবে প্রশান্ত সান্যাল যে কিলার, এটা সিওর।”

“ছাড়ছি ডার্লিং!”

 ফোন রেখে আবার ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। পঁচিশ বছর আগের একটা চলচ্চিত্র। কোথাও-কোথাও অস্পষ্ট। তবু অনুমান করা যায় ঘটনাবলি।

রাত নটায় ফোন করলাম বৈশম্পায়ন রায়কে। ফ্ল্যাটে কেউ নেই। অনেকক্ষণ রিং হল। ফোন রেখে দিলাম। প্রথম দিন বাসুবাবুকে দেখে মনে হয়েছিল, ভেতরে একটা চাপা উত্তেজনা আছে। কেন এই উত্তেজনা এবং তাগিদ এতদিন পরে? পঁচিশ বছর আগের চলচ্চিত্রে অস্পষ্ট জায়গাগুলো অনুমান করছিলাম। সমীর রুদ্রের সঙ্গে অনির বিয়ের কথা পাকা হয়েছিল। হঠাৎ আগের রাতে অনি নিখোঁজ হয়ে যায়। সতের বছর পরে অনিকে প্রশান্ত সান্যালের স্ত্রীর ভূমিকায় দেখতে পাচ্ছি। তারপর অনির মৃত্যু হয়েছিল। প্রশান্ত পাড়ি জমালেন আমেরিকায়। ভয় পেয়ে পালিয়ে যাননি তো বিদেশে?

ষষ্ঠী এসে বলল, “বাবামশাই, খেতে দেরি হচ্ছে। আমার ঘুম পাচ্ছে খুব।”

বললাম, “টেবিলে খাবার রেখে তুই খেয়ে নে। নাক ডাকিয়ে ঘুমো।”

ষষ্ঠী বেজার হয়ে চলে গেল।

আবার চোখ বুজে চলচ্চিত্রটি দেখতে থাকলাম। অনির জীবনের সতেরটা বছরে অনেকগুলো সিকোয়েন্স থাকা সম্ভব। এই অংশটা একেবারে সাদা হয়ে আছে। তার মৃত্যু কি স্বাভাবিক মৃত্যু? এই প্রশ্নের জবাবটা এই কেসে সবচেয়ে জরুরি।

ফোন বাজল আবার। বিরক্তিকর। সাড়া দিয়ে বললাম, “কর্নেল নীলাদ্রি সরকার বলছি।”

তারপর হালদারমশাইয়ের কথা ভেসে এল। “কর্নেল স্যার! আইজ প্রোগ্রাম পোস্টপনড।”

“কিসের প্রোগ্রাম হালদারমশাই?”

“কম্পিটিশনের। অবধূতজি কইয়া দিছেন আগামীকাইল অমাবস্যা। অমাবস্যার রাত্রে স্কেলিটন সিগারেট টানবে।”

“আপনি কোথা থেকে ফোন করছেন?”

“কাঁটালিয়াঘাট থানা থেইক্যা।”

 “বড়বাবুর সঙ্গে ভাব জমিয়েছেন মনে হচ্ছে?”

“কী কইলেন? জোরে কন এটু। বড্ড ডিসটার্ব করছে।”

 “উইশ ইউ গুড লাক।”

“কর্নেলস্যার! আপনি জয়ন্তবাবুরে লইয়া আয়েন। ওনারে কইবেন, সব কাগজ থেইক্যা রিপোর্টার সঙ্গে লইয়া আইছেন প্রদীপবাবু। প্রচুর রহইস্য কর্নেলস্যার!”

“উইশ ইউ গুড লাক।”

 “কী কইলেন? হ্যালো, হ্যালো, হ্যালো”

লাইনটা কেটে গেল। জয়ন্তের ফ্ল্যাটে ফোন করলাম। জয়ন্ত সাড়া দিল। “রং নাম্বার!”

“এগেন রাইট নাম্বার ডার্লিং!”

জয়ন্তের হাসি শুনলাম। সে বলল, “হঠাৎ রাতদুপুরে হামলার কারণ কী বস্?”

“কাঁটালিয়াঘাটে তোমাদের কাগজের কেউ গেছে জানো?”

 “আমি যাইনি।”

 “তুমি যাওনি, তা তো বোঝা যাচ্ছে। কাকেও কি পাঠানো হয়েছে?”

“নাহ্। সত্যসেবক এ সব ব্যাপারে ইন্টারেস্টেড নয়। তা ছাড়া জেলার সদরে আমাদের স্থানীয় সংবাদদাতা আছে।”

“শোনো! এইমাত্র হালদারমশাই ট্রাংককল করেছিলেন। আগামীকাল অমাবস্যা তিথি। কাজেই লড়াইটা হবে আগামীকাল। সব কাগজ থেকে রিপোর্টার গেছেন। সম্ভবত প্রদীপ মিত্র পাবলিসিটি চান।”

 “আমাদের কাগজ গ্রাম-টাম এ সব ফালতু ব্যাপারে ইনটারেস্টেড নয়।”

‘তুমি সকাল-সকাল চলে এসো।”

 “আপনি কাঁটালিয়াঘাট যাবেন নাকি?”

“জানি না। তুমি অবশ্যই এসো। রাখছি। হ্যাভ আ নাইস স্লিপ, ডার্লিং!”

 “গুড নাইট ওল্ড বস!”…

আজ রাতে নিজের মনের চাঞ্চল্য দেখে নিজের অবাক লাগছিল। টেলিফোন করার জন্য আমার অদ্ভুত ব্যগ্রতা। আবার বৈশম্পায়ন রায়কে রিং করলাম। অনেকক্ষণ রিং হল। কেউ সাড়া দিল না। হঠাৎ কোনও জরুরি কাজে বাইরে গেছেন সম্ভবত। নাকি তার কোনও বিপদ হল?

অরিজিতের বাড়িতে রিং করলাম। সাড়া পেলাম। বললাম, “এত রাতে একটু জ্বালাতে হল। সরি ডার্লিং!”

অরিজিৎ বলল, “এনিথিং রং কর্নেল?”

 “অরিজিৎ! তোমার বন্ধু মিঃ রায়কে ফোনে পাচ্ছি না। রিং হচ্ছে। কেউ ধরছে না।”

 “হয়তো বাইরে গেছে। আমি ওকে বলে দিয়েছি, দা মিস্ট্রি ইজ সলভড়। তুমি এ নিয়ে আর চিন্তা কোরো না। আমরা প্রশান্তকে দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য হাই লেবেলে অ্যাপ্রোচ করছি।”

“অরিজিৎ! লেকটাউন থানাকে বলো, এখনই মিঃ রায়ের ফ্ল্যাটে গিয়ে খোঁজ নিক।”

“আই সি!”

 “ইট ইজ আর্জেন্ট, ডার্লিং! কী হল আমাকে জানাবে।”

ফোন রেখে চুরুট ধরালাম। ষষ্ঠী আবার এসে ডাকল, “বাবামশাই!”

 “তুই এখনও জেগে আছিস হতভাগা? তোকে বললাম-”

 “অনুগ্রহ করে আগে খেয়ে নিন।”

ষষ্ঠী বরাবর এরকম করে। কিন্তু আজ হঠাৎ মনে হল, মানুষের সঙ্গে মানুষের এই যে একটা সম্পর্ক, এটা নিশ্চয় কোনও মহত্তর মূল্যবোধের ব্যাপার। এইজন্যই কি মানুষ এখনও চমৎকার টিকে আছে পৃথিবীতে?

খাওয়ার পর আবার ড্রয়িংরুমে গেলাম। অরিজিতের ফোনের প্রতীক্ষা করছিলাম। ফোন এল রাত সাড়ে এগারোটায়। অরিজিৎ বলল, “বাসুর পাশের ফ্ল্যাটের ভদ্রলোকের কাছে জানা গেছে, বাসু বাইরে গেছে। ওঁকে বলে গেছে। আগামী পরশু-তরশু ফিরবে। ডোন্ট ওয়ারি বস! এবার শুয়ে পড়ুন।”

“আর একটা রিকোয়েস্ট।”

 “বলুন।”

“শেক্সপিয়ার সরণির ফ্ল্যাটের তিন নম্বরের ওনার ইন্দরজিৎ সিংকে মিট করতে বলল পার্ক স্ট্রিট থানাকে। এ-ও আর্জেন্ট। তুমি বলছিলে ওঁর ফোন খারাপ হয়ে আছে–”,

“কর্নেল! প্লিজ–আর ও নিয়ে মাথা ঘামাবেন না।”

 “অরিজিৎ! তুমিই আমাকে আসরে নামিয়েছ।”

“বাট দা গেম ইজ ওভার, কর্নেল!”

 “না অরিজিৎ! এতক্ষণে খেলার শুরু।”

 “বলেন কী?”

“ইন্দরজিৎকে এখনই মিট করা জরুরি।”

ফোন রেখে আবার অনামিকার ফটোটা দেখতে থাকলাম। আবার সেই পুরনো বিবর্ণ চলচ্চিত্র ভেসে উঠল।

রাত বারোটায় অরিজিৎ ফোনে জানাল, ইন্দরজিৎ সিং বাইরে গেছেন। দারোয়ানকে বলে গেছেন, বোম্বে যাচ্ছেন। ফিরতে দেরি হবে।

তা হলে সত্যিই কি আমি মরীচিৎকার দিকে দৌড়ে চলেছি?…

.

জয়ন্ত চৌধুরি

 আমার ফ্রেন্ড-ফিলজফার-গাইড কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের মাথায় একটা কিছু। ঢুকলে আর ছাড়াছাড়ি নেই। একবার নিছক একটা পাখির পেছনে ছোটাছুটি করে সারাদিন না-খাওয়া না-দাওয়া কাটাতে দেখেছি। জায়গাটা ছিল গহন জঙ্গল। বাঘ-ভালুক ছিল প্রচুর।

আমার ঘুম ভাঙতে দেরি হয়েছিল। কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টে পৌঁছুতে সাড়ে আটটা বেজে গেল। গিয়ে দেখি, একটু আগে উনি বেরিয়ে গেছেন। ষষ্ঠী বলল, “বাবামশাই বলে গেছেন, কাগজের দাদাবাবু এলে অপিখ্যে করতে বলিস।”

“তুমি অপিখ্যে করছ! ভাল কথা। আমি এবার অপিখ্যে করি।”

ষষ্ঠীচরণ খি খি করে হাসল। “দাদাবাবু! তা-ই করুন। এই ফাঁকে আমি বাজার করে আসি।”

সে চলে গেল বাজারের থলি-হাতে।

ন্যাশানাল জিওগ্রাফিক আমার প্রিয় পত্রিকা। কত অদ্ভুত-অদ্ভুত জায়গা আর তাজ্জব ঘটনার খবর দেয় পত্রিকাটি। সাহারা মরুভূমির বাসিন্দা তুয়ারেজ উপজাতির সচিত্র বিবরণে মন দিলাম। ষষ্ঠী মিনিটকুড়ি পরে ফিরল। সে আমাকে কফি আর স্ন্যাক্স পরিবেশন করল। কফিটা অর্ধেক খাওয়া হয়েছে, ডোরবেল বাজল। কর্নেল ফিরলেন।

বললাম, “আপনার অপিখ্যে করছি।”

কর্নেল হাসলেন না। মুখটা গম্ভীর। ইজিচেয়ারে বসে চুরুট ধরালেন। তারপর বললেন, “আর্টিস্ট সুমিতবাবু ফোন করেছিলেন। ওঁর বাড়ি গিয়েছিলাম। গিয়ে শুনি একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে।”

কর্নেল চুপ করলে বললাম, “অবধূতজির মিরাকল?”

 “কে জানে? চুরি।”

“চুরি? মানে, সুমিতবাবুর বাড়িতে চুরি? কী চুরি হয়েছে?”

“সেই ছবির একটা রি-টাচ করা ফটোকপি।”

 “কী করে চুরি গেল?”

“সুমিতবাবুও খুব অবাক হয়েছেন। ছবিটা দেয়ালে সাঁটা ছিল। নেই। পাশে ইজেলে ওটা দেখেই ছবি আঁকছিলেন। ওঁর আঁকা ছবিতে ধ্যাবড়া করে কেউ রঙ মাখিয়ে দিয়েছে। ছবিটা প্রায় শেষ করে এনেছিলেন।”

“তা হলে মিঃ রায়ের দেওয়া ফটোটা চুরি গেছে বলুন।”

“সেটা ওরিজিন্যাল। সুমিতবাবু ওটা থেকে একটা ফোটোকপি তৈরি করে নিয়েছিলেন। ওরিজিন্যাল ছবিটা অবশ্য আছে।”

“একটু সহজ ভাষায় বলুন না!”

কর্নেল একরাশ ধোঁয়ার মধ্যে বললেন, “সহজ ভাষায় বলেছি, ডার্লিং! আসলে আমার মাথার ভেতর কী একটা হয়েছে গতরাত থেকে। হ্যাঁ, মিঃ রায়ের দেওয়া ছবিটা আছে। কেন আছে, বোঝা যায়। এই ছবিটা ছিল ডার্করুমে অনেক ছবির তলায়। চোর সময় পায়নি খোঁজার। কিন্তু এই ছবি থেকে ফটো তুলে রিটাচ করে যে দ্বিতীয় ফটো তৈরি করেছিলেন সুমিতবাবু, সেটা দেখেই ছবি আঁকছিলেন। দ্বিতীয় ফটোটা নেই। এ দিকে আঁকা ছবিটায় লাল কালো রঙ মাখিয়ে দিয়ে গেছে চোর।”

“বুঝতে পারলাম। কিন্তু স্টুডিওতে চোর ঢুকল কী করে?”

“সুমিতবাবু বললেন, অন্যমনস্কতার ফলে স্টুডিওর দরজা খোলা ছিল সম্ভবত। আসলে শিল্পীরা বড় অন্যমনস্ক থাকেন। জয়িতা–ওঁর বোন কাঁটালিয়াঘাটে গুরুদেবকে দর্শন করতে গেছেন গতকাল। জয়িতাই রাত্রে দরজা বন্ধ আছে কি না চেক করেন। কারণ উনি খামখেয়ালি দাদার স্বভাব জানেন।” কর্নেল চোখ বুজে হেলান দিলেন। কিন্তু আরেকটা অদ্ভুত ব্যাপার হল, কাল সন্ধ্যায় এক শিখ। ভদ্রলোক গিয়েছিলেন ছবি কিনতে।”

চমকে উঠে বললাম, “ইন্দরজিৎ নন তো?”

“তা বলা কঠিন। ইন্দরজিৎ গতকাল বোম্বে গেছেন।”

 “যা-ই বলুন, ইন্দরজিৎ মিসটিরিয়াস ক্যারেকটার।”

“তুমি ওঁর ওপর এখনও রেগে আছ, জয়ন্ত!”

ষষ্ঠী কফি আনল বাবামশাইয়ের জন্য। উনি চোখ বুজে আছেন দেখে বলল, “কফি বাবামশাই!”

কর্নেল চোখ খুলে কফির পেয়ালা তুলে নিলেন। বললেন, “এগারোটার মধ্যে আমরা খেয়ে নেব। মনে আছে তো?”

ষষ্ঠী বলল, “মনে আছে। দাদাবাবুও খাবেন।”

সে চলে গেলে বললাম, “এত সকাল-সকাল খেয়ে কোথায় যাবেন?”

“কাঁটালিয়াঘাট। তুমিও যাবে।”

 “কী সর্বনাশ!”

 কর্নেল আস্তে বললেন, “হ্যাঁ, একটা সর্বনাশের আশঙ্কা আমিও করছি, জয়ন্ত! তবে তৈরি থাকো। তোমার কাগজের জন্য একটা চমৎকার স্টোরি পাবে।”

একটু ভেবে নিয়ে বললাম, “স্টোরির কথা পরে। কিন্তু শিখ ভদ্রলোক কী ছবি কিনতে গিয়েছিলেন?”

“যে-কোনও ছবি। উনি নাকি সুমিতবাবুর ভক্ত।”

 “ছবি কিনেছেন?”

“একটা ছবির দরদাম করে এসেছেন।” কর্নেল কফিতে চুমুক দিলেন। “আমি ন্যায়শাস্ত্রে অবভাসতত্ত্ব আওড়াই। সবসময় দুইয়ে দুইয়ে চার হয় না–এও বলি। কিন্তু ব্যাপারটা হয়তো কাকতালীয় নয়।”

“তার মানে, ইন্দ্রজিৎ সিংহই গিয়েছিলেন।”

“ওই তো বললাম, এটা বলা কঠিন। কিন্তু প্রশ্ন হল, কে চাইছে না অনামিকার ছবি আঁকা হোক? সে কে? কেন সে”।

কর্নেল হঠাৎ চুপ করলেন। বললাম, “শিখ ভদ্রলোক নিজের পরিচয় দেননি?”

“নিজেকে ইন্দ্রজিৎ বলেননি, এটা সুমিতবাবুর মনে আছে।”

“অনামিকার ছবিটা সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করেননি?”

কর্নেল একটু হেসে বললেন, “নাহ। তোমাকে বলেছি জয়ন্ত, উনি শুধু একটা ছবি কিনতে গিয়েছিলেন। যে ছবিটা ওঁর পছন্দ হয়েছিল, সেটা এক মৃত ব্যবসায়ীর পোর্ট্রেট। তার ছেলেরা বাবার ছবি দেখে চটে গিয়েছিল। নেয়নি। ছবিটা আমি দেখলাম। পোর্ট্রেট হিসাবে অসাধারণ। কিন্তু দেখলেই কেমন নিষ্ঠুর খুনী মানুষের মুখ মনে হয়। হ্যাঁ, মুখ দেখে মানুষের সত্যিকার পরিচয় পাওয়া যায় না। এ-ও ঠিক।”

কর্নেল চুপচাপ কফির পেয়ালা শেষ করে নিভে যাওয়া চুরুট ধরালেন। বললাম, “আপনি তো অনেক সময় ডাইনে-বাঁয়ে সামনে-পেছনে রহস্য নিয়ে হাঁটেন। ব্যবসায়ী ভদ্রলোকের ঠিকানা নিয়ে আসা উচিত ছিল। কিছু বলা যায় না। ওঁর ছবি কিনতেই বা কেন আগ্রহ হল শিখ ভদ্রলোকের?”

 “জয়ন্ত! লাল হেরিং মাছের পেছনে ছোটা আর মরীচিৎকার দিকে ছোটা একই ব্যাপার।” বলে হঠাৎ একটু উত্তেজিত হলেন কর্নেল। “ডার্লিং! জীবনে আমাকে কেউ বোকা বানাতে পারেনি। এই প্রথম আমাকে বোকা বানাতে চাইছে কেউ। এ যেন আমার সঙ্গে অঘোষিত যুদ্ধ!”

এই সময় ডোরবেল বাজল। কর্নেল হাঁকলেন, “ষষ্ঠী!”

ডিসি ডিডি অরিজিৎ লাহিড়ি এলেন। “জয়ন্তবাবু যে! গুরুশিষ্য দুজনেই এত গম্ভীর। কী ব্যাপার?”

আমি কথা বলতে যাচ্ছিলাম, কর্নেল আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “সুমিত গুপ্ত ফোন করেছিলেন তোমাকে?”

অরিজিৎ হাসলেন। “আপনার এ প্রশ্নে অবাক হচ্ছি না।”

 “ফোন করেছিলেন সুমিতবাবু?”

“হ্যাঁ। আমার মনে হয়, প্রশান্তেরই কীর্তি। সে এখনও কলকাতা ছেড়ে চলে যেতে পারেনি।

“কিন্তু অরিজিৎ, প্রশান্ত সান্যাল কেন অনামিকার ছবি নষ্ট করবেন কিংবা রিটাচ করা ফটো চুরি করবেন?”

অরিজিৎ মিটিমিটি হেসে বললেন, “ইউ নো দা পোলিস নেটওয়ার্ক। প্রশান্তের ভাই তাপসকে জেরা করে জানা গেছে, প্রশান্তই অনামিকা সেনকে এলোপ করেছিল। তাকে সাহায্য করেছিলেন অনামিকার মামা হেমাঙ্গ সেনগুপ্ত। সমীরবাবুকে ভদ্রলোক অপছন্দ করতেন।”

কর্নেল বললেন, “আমি বলছি। অনামিকাকে বিয়ে করলে হেমাঙ্গবাবু দিদির বাড়ি বেচে টাকা আত্মসাতের সুযোগ পেতেন না। সমীরবাবু বাধা দিতেন। তাই হেমাঙ্গবাবু নিজের ভাগনি এবং প্রশান্তকে কলকাতার বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। তারপর কিডন্যাপ কেস সাজিয়েছিলেন প্রশান্ত এবং বাসুবাবু দুজনেরই নামে। আমার এই থিওরি।”

“কারেক্ট।” অরিজিৎ জোর দিয়ে বললেন। “এন্টালি থানার পুরনো রেকর্ডে দুজনের নামেই এফ আই আর করার হদিস মিলেছে। অবশ্য বাসু নির্দোষ। কারণ ওইসময় সে সত্যি জামশেদপুরে ছিল। এদিকে প্রশান্ত অনামিকাকে নিয়ে নিখোঁজ হয়ে যায়। আটবছর আগে অনামিকা”

“অনামিকা তার মাকে চিঠি লিখে জানায়, সে ভাল আছে।”

 “আপনার তদন্তের এই অংশ ঠিক আছে।”

 “কোন অংশ ঠিক নেই?”

 “আপনি প্রশান্তকে ক্লিন সার্টিফিকেট দিচ্ছেন।”

 “আমি কাউকে কোনও সার্টিফিকেট দিইনি, অরিজিৎ!”

অরিজিৎ ঘড়ি দেখে বললেন, “কফি খাব না। উঠি।”

 “অনামিকা সেন ওয়জ মার্ডার্ড, অরিজিৎ!”

অরিজিৎ তাকালেন।

 “হ্যাঁ। আট বা সাত বছর আগের ফেরারি আসামীর রেকর্ড খুঁজে দেখা দরকার।”

আরিজিৎ হাসলেন। “অলরেডি খোঁজা হচ্ছে।”

 “বধূহত্যা সংক্রান্ত রেকর্ড খুঁজে দেখ।”

 অরিজিৎ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “কর্নেল! পুলিশ অত ফুলিশ নয়, ইউ নো দ্যাট। লোকে বলে পুলিশ ইচ্ছে করলে অনেক কিছু পারে। করে না। দ্যাটস্ রাইট। তবে ক্ষেত্র বিশেষে পুলিশ কী অসাধ্য সাধন করে, আশা করি জানেন।”

অরিজিৎ দরজার কাছে গেছেন, কর্নেল বললেন, “অরিজিৎ! আমরা আজ দুপুরের ট্রেনে কাঁটালিয়াঘাটে অবধূতদর্শনে যাচ্ছি।”

“অবধূত দর্শন! হোয়াটস্ দ্যাট?”

 “দ্যাটস্ দ্যাট, ডার্লিং!”

অরিজিৎ লাহিড়ি ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রইলেন।

কর্নেল বললেন, “আজ অমাবস্যার রাত্রে কালীপুজোর ধুমও দেখব। শুনেছি, কাঁটালিয়াঘাটের শ্মশানকালী জাগ্রত দেবী। তবে অবধূতজি একটা নর-সরি, নারীকংকালের মুখে সিগারেট টানা দেখাবেন। তাকে চ্যালেঞ্জ করতে গেছেন বিজ্ঞান প্রচার সমিতির প্রদীপ মিত্র। খুব জমজমাট লড়াই হবে।”

অরিজিৎ হাসতে হাসতে চলে গেলেন।

বললাম, “লাহিড়িসায়েব ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দিলেন না!”

কর্নেল মুচকি হেসে বললেন, “অরিজিৎ ইজ চেজিং আফটার আ রেড হেরিং। আমারই মতো। তবে আমি এখন সেটা টের পেয়েছি। ও পায়নি।”

একটু অবাক হয়ে বললাম, “অনামিকা খুন হয়েছে বললেন আপনি। বধূহত্যার পুরনো রেকর্ড খুঁজতে বললেন। এখন বলছেন, লাল হেরিংয়ের পেছনে দৌড়ুচ্ছেন। লাহিড়িসায়েব। আপনার এই এক অদ্ভুত স্বভাব বস্! হেঁয়ালি করা!”

“হ্যাঁ। হেঁয়ালি বলেই হেঁয়ালি করছি।”

বলে কর্নেল ড্রয়ার থেকে একটা ছবি বের করে আমার হাতে দিলেন। উনিশ । কুড়ি বছর বয়সের এক অসামান্য সুন্দরী তরুণীর ফটো। বললাম, “কার ছবি?”

“অনামিকা সেনের। সমীরবাবুর অ্যালবাম থেকে চেয়ে এনেছি।”

 “তা হলে সুমিতবাবুর স্টুডিওর চোর বোকা বনে গেল।”

“তা তো গেলই।”

“ভি রায়ের দেওয়া ছবিটার সঙ্গে মিলিয়ে দেখি। দিন তো?”

কর্নেল ড্রয়ার থেকে খামে ভরা ছবিটা বের করে দিলেন। মেলাতে গিয়ে মনে হল, দুটো ছবি কিছুতেই একজনের নয়। বললাম, “কর্নেল! আপনার ভুল হয়েছে। এ দুটো ছবি একজনের হতে পারে না।”

“একটা অস্পষ্ট বেরঙা ছবি। অন্যটা অক্ষত ছবি। কাজেই মিল হবে না। তাছাড়া সব ফোটোতে দেখবে, একই মানুষের ছবি একেক রকম। আলোর ত্রুটি, নেগেটিভ ডেভালাপের ত্রুটি, প্রিন্টের ত্রুটি, রিটাচ করার ত্রুটি–অসংখ্য ত্রুটি এর কারণ।”

 “তা ঠিক। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বড্ড বেশি গরমিল।”

কর্নেল টাকে হাত বুলিয়ে তারপর দাড়ি মুঠোয় ধরলেন। আস্তে বললেন, “মিঃ রায়ের দেওয়া ছবিতে কোনও কেমিক্যাল জিনিস দৈবাৎ পড়ে গিয়েছিল। এ ছবিটা অক্ষত থাকার কথা। কিন্তু যেন কোনও অ্যাকসিডেন্টে নষ্ট হয়ে গেছে।”

টেলিফোনে রিং হল। আমি টেলিফোনের কাছে। তাই সাড়া দিলাম। একটি মেয়ের গলা ভেসে এল। “কর্নেলদাদু?”

বললাম, “ধরুন দিচ্ছি।”

 কর্নেল ফোন নিয়ে বললেন, “বলছি।..ও! তুমি মিম্মি? কী ব্যাপার?..বলো কী! তা হলে তো চোর লোকটি সাধু!…সাধু নয়? হাঃ হাঃ হাঃ!..না, না! ব্যাগ নিয়ে আসার দরকার নেই। আমিই যাচ্ছি। এখনই যাচ্ছি।”

কর্নেল ফোন রেখে উঠে দাঁড়ালেন। বললাম, “কী ব্যাপার?”

 “ব্যাপার বুঝতে তোমার অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। চলো, ঘুরে আসি।”

“বুঝেছি। কসবায় সমীরবাবুর ফ্ল্যাট থেকে যে হ্যান্ডব্যাগটা চুরি গিয়েছিল, চোর সেটা ফেরত দিয়েছে।”..

কসবায় সমীরবাবুর ফ্ল্যাট কোথায় আমি জানি না। কর্নেলের নির্দেশ অনুসারে ড্রাইভ করছিলাম। শেষপর্যন্ত যেখানে কর্নেল থামতে বললেন, সেটা সংকীর্ণ রাস্তা। একটা পুকুরের পাশে বাড়িটা। গেটের ভেতর একচিলতে ফুলবাগিচা। বারো-তেরো বছরের একটি মেয়ে গেটে দাঁড়িয়ে ছিল। কর্নেলকে দেখে সে হইচই শুরু করল। গেটের ভেতর একটা পাতাবাহারের ঝোঁপ দেখিয়ে বলল, “এখানে! এই গাছটার ভেতর পড়েছিল। দিদা দেখতে পায়নি। আমি দেখতে পেয়েছি।”

সে আমাদের দোতলায় নিয়ে গেল। এক বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে ছিলেন ব্যালকনিতে। কর্নেল তাকে নমস্কার করলেন। আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। সমীরবাবুর মা গৌরী দেবী।

ঘরে ঢুকে আমরা বসতে না বসতে কিশোরী মেয়েটি একটা ছোট্ট হ্যান্ডব্যাগ নিয়ে এল। কর্নেল ব্যাগটা খুলে ভেতরটা দেখে বললেন, “কিছু নেই দেখছি। খালি ব্যাগ ফেলে দিয়ে গেছে চোর। মিম্মি! তুমি ঠিকই বলছিলে। চোর লোকটি সাধু নয়।”

মিম্মি হাসল। “পাঁচিল গলিয়ে ফেলে দিয়ে গেছে। কিন্তু আপনি ভেতরকার চেনটা খুলে দেখুন!” বলে সে নিজেই চেন খুলে একটা ময়লা ভাঁজকরা কাগজ বের করে দিল।

কর্নেল সেটা খুলে পড়ার পর আমাকে দিলেন। দেখি, মেয়েলি ছাঁদে লেখা একটা চিঠি। প্রেমপত্র নাকি?

 ‘সমীরদা,
বিপদে পড়ে চিঠিটা লিখছি। প্রশান্ত আমাকে আটকে রেখেছে। ওর পোষা গুণ্ডারা সবসময় আমাকে পাহারা দেয়। তুমি পুলিশকে জানালে এরা টের পাবে। তা হলে আমাকে মেরেই ফেলবে। তুমি গোপনে এসে আমাকে যেভাবে পারো, এখান থেকে নিয়ে যাও। তোমারও তো দলবল আছে। তুমি ছাড়া আমাকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। আমি যেমন ভুল করেছি, তেমনি তার প্রায়শ্চিত্ত করছি। আমার শকুনিমামাই ষড়যন্ত্র করে আমাকে প্রশান্তের হাতে তুলে দিয়েছিল। বিশ্বাসী একটা লোকের হাতে চিঠিটা পাঠালাম। সাক্ষাতে সব বলব।
ইতি অনি’

লেখা কোথাও কালিতে জেবড়ে গেছে। কোথাও অস্পষ্ট। তবে পড়া যায়। চিঠিটা পড়ে কর্নেলকে ফেরত দিলাম। কর্নেল বললেন, “মিম্মি! সত্যিই চোর লোকটা সাধু নয়। তবে সে এই চিঠিটা নেয়নি কেন, সেটাই অদ্ভুত!”

মিম্মি বলল, “চিঠি নিয়ে কী করবে? টাকাগুলো নিয়েছে।”

গৌরীদেবী বললেন, “ওতে সমীর খুচরো টাকাকড়ি রাখত। টেবিলে বা বিছানায় ফেলে রাখত। সেজন্যই আমার ওটার কথা মনে পড়েছিল। থিয়েটার রোডের ফ্ল্যাটে ব্যাগটা দেখিনি। তাই ভেবেছিলাম, বাড়িতে রেখেছে।”

কর্নেল চিঠিটা পকেটে ঢুকিয়ে বললেন, “পুলিশকে এটা জানানো দরকার। আমিই জানাব। শুধু একটা কথা। আপনি এই ঘটনা কাকেও জানাবেন না। মিম্মি! তুমিও কাউকে বলবে না কিন্তু।”

মিম্মি বলল, “আপনি ওটা নিচ্ছেন কেন?”

“তুমি চিঠি পড়েছ?”

মিম্মি মাথা দোলাল। গৌরীদেবী বললেন, “অনির চিঠিটা মিম্মি আমাকে পড়ে শুনিয়েছে। আমার খুব অবাক লেগেছে। সমু ইচ্ছে করলেই ওকে বাঁচাতে পারত। কেন বাঁচায়নি জানি না।”

“আপনার ধারণা অনি বেঁচে নেই?”

একটু দ্বিধার পর গৌরীদেবী বললেন, “সমু একবার বলেছিল যেন–অনিকে কেউ মার্ডার করেছে। প্রশান্ত মার্ডার করেছে বলেনি। প্রশান্তের সঙ্গে ওর শত্রুতা ছিল না। তবে ভেতরকার কথা কে জানে বলুন?”

কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “একটু পরেই কলকাতার বাইরে এক জায়গায় যাব। ইতিমধ্যে নতুন কিছু ঘটলে ডি সি ডি ডি লাহিড়িসায়েবকে ফোনে যোগাযোগ করবেন।”

মিম্মি গেট পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে এল। আবার বলল, “কর্নেলদাদু! আপনি চিঠিটা নিলেন কেন?”

কর্নেল আস্তে বললেন, “চোরটাকে ধরতে হবে তো?”

 মিম্মি অবাক চোখে তাকিয়ে রইল।…

পথে যেতে যেতে বললাম, “দা মিস্ট্রি ইজ সলভড়। তবু খামোকা ছুটোছুটি করে বেড়ানোর মানে হয় না।”

কর্নেল একটু হাসলেন। “খেলার দ্বিতীয় পর্যায়ে পৌঁছেছি জয়ন্ত! বাই দা বাই, তুমি রিয়ার ভিউ মিররে একটা কালো গাড়ি লক্ষ করেছ কি? গাড়িটা এলিয়ট রোড থেকে আমাদের পিছু নিয়েছিল। এখন আবার পিছু নিয়েছে।”

চমকে উঠে গাড়িটা দেখতে পেলাম। বিজন সেতু জোরে পেরিয়ে গিয়ে খানিকটা চলার পর স্যুইনহো স্ট্রিটে ঢুকলাম। গাড়িটা তখনও পেছনে। একটা বাঁকের মুখে কর্নেল থামতে বললেন। তারপর নেমে গেলেন।

আমিও নেমে গেলাম। কালো গাড়িটা আমাদের চাপা দেওয়ার ভঙ্গিতে জোরে ছুটে এল। দুজনে সরে দাঁড়ালাম। এক পলকের জন্য দেখলাম, গড়িটা ড্রাইভ করছে একজন শিখ সর্দারজি। ইন্দরজিৎ সিং?

কর্নেল বললেন, “শিগগির জয়ন্ত! ফলো করো।”

গড়িয়াহাট রোডে পৌঁছে হারিয়ে ফেললাম গাড়িটাকে। কর্নেল নোটবইয়ে নম্বর টুকে নিচ্ছিলেন। বললেন, “নাম্বারটা নিলাম বটে, তবে ফলস্ নাম্বার হওয়াই সম্ভব।”

“কর্নেল! লোকটা শিখ। ইন্দ্রজিৎ বলেই মনে হল।”

কর্নেল আস্তে বললেন, “আমার এতদিনে সত্যি বাহাত্তুরে ধরেছে, ডার্লিং! গতকাল আমি যেন এই গাড়িটাকে ভবানীপুর থেকে কসবা অব্দি ফলো করতে দেখেছিলাম। গ্রাহ্য করিনি। এতক্ষণে মনে হচ্ছে, আমার ওই থিওরিটা কত নির্ভুল।”

“কোন থিওরিটা?”

“অনেক সময় আমরা জানি না যে, আমরা কী জানি এবং অনেক সময় আমরা দেখি না যে, আমরা কী দেখছি।” বলেই কর্নেল স্টিয়ারিঙে হাত রাখলেন। “বাঁদিকে ঢোকো, জয়ন্ত কালো গাড়িটা আমাদের ফলো করার জন্য সামনের ক্রসিঙে ঘুরছে।”

খাপ্পা হয়ে বললাম, “দিনদুপুরে এই ভিড়ে এত সাহস!”

 “গোঁয়ার্তুমি কোরো না। আজকাল দিনদুপুরে অনেক কিছু ঘটে।”

অগত্যা বাঁদিকে ঢুকে ঘুরতে ঘুরতে শরৎ বোস রোড, তারপর চৌরঙ্গি হয়ে ঘুরে ফ্রিস্কুল স্ট্রিট হয়ে ইলিয়ট রোডে কর্নেলের বাড়িতে পৌঁছলাম। উত্তেজনায় আমার হাত কাঁপছিল। আমার বৃদ্ধ বন্ধু কিন্তু নির্বিকার।

কর্নেলের ড্রয়িংরুমে ঢুকে ধপাস করে বসে বললাম, “লাহিড়িসায়েবকে ঘটনাটা জানিয়ে দিন।”

কর্নেল হাত তুলে বললেন, “ছেড়ে দাও!”

 “ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না, কর্নেল! ইন্দরজিৎ সিং প্রশান্ত সান্যালের লোক। এটা অন্তত জানানো দরকার।”

কর্নেল হাসলেন। “হোক না! ওকে একটু খেলতে দেওয়া উচিত।”

.

বৈশম্পায়ন রায়

কে তুমি?

অনি।

 কেন এলে?

 তুমি কী সুখে আছ দেখতে এলাম।

আমি সুখেই আছি অনি! আমার অনেক টাকা। বাড়ি। গাড়ি। মানুষের একরত্তি জীবনে এ সবই তো অনেক বড় সুখ। এই সুখের জন্য সারা পৃথিবীর মানুষ ইঁদুরদৌড়ে নেমেছে।

তুমি সুখে নেই, বাসুদা!

 তা-ই বুঝি? কিসে বুঝলে?

 এই যে তুমি হঠাৎ-হঠাৎ ঝিম মেরে বসে থাকো। কোনও কাজে মন লাগে না। মধ্যরাতের বাতাস কিংবা বৃষ্টিতে তুমি ভুল শব্দ শোনো। ড্ডারবেল বাজলে তুমি চমকে ওঠ। সিঁড়িতে শোনো কার পায়ের শব্দ। রাস্তায় যেতে যেতে বারবার পিছু ফিরে দেখে নাও কেউ তোমাকে অনুসরণ করছে কি না। তুমি

অনি! তুমি আমাকে জ্বালিও না!

যতদিন তুমি বাঁচবে, তোমাকে এমনি করে জ্বালাতে আসব। তোমার সুখে কাঁটা হয়ে বিঁধব।

তুমি চলে যাও!

কী করে যাব? আমি তো তোমার মধ্যেই লুকিয়ে আছি, বাসুদা! মাঝেমাঝে এমনি করে উঠে আসব। তুমি ভয় পাবে। মধ্যরাতের বাতাসের শব্দে বৃষ্টির শব্দে–সিঁড়িতে পায়ের শব্দে। আমি তোমার পেছনের আততায়ী।

আমি তোমাকে ভুলে গিয়েছিলাম। হতভাগা সমীর—

 চুপ! চুপ! দেয়ালের কান আছে।

থাক। আমি মরিয়া হয়ে উঠেছি, অনি!

 বাসুদা! আমি তোমার নিয়তি। সতর্ক হও।…

 “স্যার!”

দেখলাম মিসেস অ্যারাথুন টেবিলের ওপাশে বসে আছে। ঘড়ি দেখলাম। “দ্যাটস্ অল, মিসেস অ্যারাথুন।”

“দা সেন্টেস্ ইজ নট ইয়েট কমপ্লিট স্যার!”

“ইউ ডু দ্যাট। ইউ কান ডু দ্যাট। ইজন্ট ইট, মিসেস অ্যারাথুন?”

পি এ মিসেস অ্যারাথুন এটা পারে। সে হাসিমুখে টাইপ করতে গেল। একটা সিগারেট ধরিয়ে টেবিলের সুইচ টিপে রাম সিংকে ডাকলাম। রাম সিং সেলাম দিল এসে। বললাম, “রাম সিং! তুম হামকো হাওড়া স্টেশন পঁহুচ দেনা আউর কার লেকে ঘুমনা। মেরা কার কর্তারজি কা গ্যারাজমে রাখ দেনা। ঠিক হ্যায়?”

“জি সাব।”

 “কারমে যাকে ব্যইঠো। হাম পাঁচ মিনটকে বাদ যাতা।”

রাম সিং চলে গেল। হেলান দিয়ে চোখ বুজলাম। আবার অনিকে দেখতে পেলাম। পরনে গেরুয়া শাড়ি। গলায় রুদ্রাক্ষের মালা। কপালে লাল তিলক। হাতে ত্রিশূল। ভৈরবী!

বাসুদা!

 বলো অনি!

কী দেখছ?

 তোমাকে অসাধারণ দেখাচ্ছে। দেবীর মতো!

আমি তো দেবীই। প্রশান্ত ভুল করেছিল। তুমিও, বাসুদা!

হ্যাঁ, তুমি দেবভোগ্যা! কারণ তুমি সত্যিই দেবী। এতদিনে জেনেছি।

দেবী আবার রক্ত চাইতে এসেছে। দাও।

 অনি! কেন তোমার এত রক্তের তৃষ্ণা?

 আজ আবার সেই অমাবস্যা। যে অমাবস্যার রাতে তুমি

 শাট আপ!

“স্যার?”

চোখ খুলে দেখি মিসেস অ্যারাথুন। বললাম, “থ্যাংকস্!”

 “ইওর সিগনেচার, স্যার!”

“সরি!” ওর হাত থেকে চিঠিগুলো নিয়ে সই করে দিলাম। ও চলে গেল। উঠে দাঁড়ালাম। ড্রয়ার থেকে পয়েন্ট আটত্রিশ ক্যালিবার রিভলভার বের করে ব্রিফকেসে ঢোকালাম।

নীচের রাস্তায় এসে মনে হল, ঠিক করছি না। গাড়ির কাছে গিয়ে বললাম, “রাম সিং! আভি পৌনে এগারা বাজ রহা। তুমকো যানে কা কৈ জরুরত নেহি। হামকো ঘর যানা পড়ে। আপিসমে যাও। আপনা কাম করো।”

রাম সিং গাড়ি থেকে বেরিয়ে সেলাম দিয়ে চলে গেল। লেকটাউনে ফিরে গেলাম। এক ঘণ্টা লেগে গেল। দিনে দিনে ট্র্যাফিক জ্যাম বাড়ছে। আমার নিয়তি।

হাওড়া স্টেশনে ফোন করলাম। এই ট্রেনটা ধরা যাবে না। পরের ট্রেন বিকেল চারটে পনের। ঘণ্টা পাঁচেকের জার্নি।

কাজের ছেলেটি আজও ফেরেনি। তাকে আর দরকার নেই। স্নান করে কিচেনে গেলাম। যেমন-তেমন একটা লাঞ্চ যথেষ্ট। কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না।

কে?

অনি।

 আবার কী?

কেমন সেজেছি দেখ বাসুদা।

 ফিল্মস্টারের মতো। তোমার ভৈরবীসাজ বদলে এলে কেন, অনি?

তোমাকে ছুঁতে পাব বলে।

 তুমি আমাকে ঘৃণা করতে!

এখনও করি।

 কেন অনি?

প্রথম সমুদ্র দেখার স্মৃতি। তুমি আমাকে ঘৃণা উপহার দিয়েছিলে। আমি দিয়েছিলাম প্রেম। ভেবেছিলাম সমুদ্র থেকে প্রেম নিয়ে ফিরব। ফিরেছিলাম ঘৃণা নিয়ে। সেই থেকে পুরুষ জাতটার ওপর আমার ঘৃণা।

প্রশান্তকে তুমি

না!

 প্রশান্তের সঙ্গে তুমি বিয়ের আগের রাতে

না!

 সতের বছর তুমি প্রশান্তের সঙ্গে

না! না! না!

তা হলে কি আমি ভুল বুঝেছিলাম?

সে তুমিই জানো!

কিন্তু আবার কেন জ্বালাতে এলে, অনি?

তুমি আমাকে ভোলোনি। ভোলো না। সমস্ত সময় তোমার সব ভাবনার তলা দিয়ে গোপনে আমি বয়ে চলেছি। তোমার ভাবনার তলায়, আমার শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসে, বাসুদা! আমাকে মাথা তুলতে দাও।

এই তো দিয়েছি।

 আমাকে দেখ!

এই তো দেখছি।

তা হলে কেন আজ বিকেলের ট্রেনে তুমি

শাট আপ!

প্রেসারকুকার শিস দিল। চমকে উঠলাম। কিছুক্ষণ শূন্য দৃষ্টে তাকিয়ে থাকলাম জানালার দিকে। তারপর লকেটটা দুহাতে তুলে ধরলাম। ক্ষমা করো প্রভু! তুমি আমাকে এতদিন শক্তি দিয়ে এসেছ। টার্গেটে পৌঁছুনো পর্যন্ত সাহস দাও।

কিছুক্ষণ পরে সামান্য একটু খেয়ে উঠে পড়লাম। খাদ্য এত বিস্বাদ হয়ে যাচ্ছে দিনে-দিনে। আমি সত্যিই সুখে নেই।

দুটোয় কর্নেল নীলাদ্রি সরকারকে ফোন করলাম। ওঁর কাজের লোকটি বলল, “বাবামশাই তো নেই। বাইরে গেছেন। ফিরতে দেরি হবে।”

অরিজিৎকে ফোন করলাম। অরিজিৎ বলল, “ডোন্ট ওয়ারি বাসু! প্রশান্তকে আমরা শিগগির পাকড়াও করে ফেলব। সে এখনও কলকাতা ছেড়ে পালাতে পারেনি। আর শোনো, পুরনো রেকর্ড ঘেঁটে একটা কেস পাওয়া গেল। অনামিকা সেনকে খুনের দায়ে প্রশান্তের নাম ওয়ান্টেড তালিকায় আছে।”

“অনি ওয়জ মার্ডার্ড? অরিজিৎ! কী বলছ তুমি!”

“হ্যাঁ। প্রশান্ত ওকে খুন করে অ্যামেরিকা পালিয়েছিল। কেসটা এখনও ঝুলছে। কাজেই দুটো খুনের অভিযোগ ঝুলছে তার নামে।”

“থ্যাংকস্ অরিজিৎ। বাই দা বাই, কর্নেল

 “কর্নেল গেছেন কাঁটালিয়াঘাটে এক সাধুর দর্শনে।”

 ফোন রেখে দিলাম।

.

কর্নেল নীলাদ্রি সরকার

 কাঁটালিয়াঘাটে অনেক বছর আগে একবার এসেছিলাম। শ্মশান এলাকায় তখন ঘন জঙ্গল ছিল। জগন্নাথ প্রজাপতির একটা ঝাকের খোঁজ পেয়েই আসা। ওড়িশায় এই প্রজাতির প্রজাপতি অনেক দেখেছি। এখন এখানে সেই জঙ্গল নেই। তাই জগন্নাথ প্রজাপতিও হয়তো আর নেই। কাঁটালিয়াঘাট রীতিমতো শহর হয়ে উঠেছে। ট্যুরিস্ট লজ শ্মশানের কাছাকাছি। কিন্তু সেখানে ঠাই নেই। অমাবস্যার জাগ্রত কালীদর্শনে সরকারি কর্তাদের বড় ভিড়। অগত্যা হোটেল সম্রাটে গিয়ে ঠাই পেলাম।

চারতলা নতুন হোটেল। একেবারে গঙ্গার ধারে। আশ্বস্ত হলাম শুনে যে, হোটেলক্যান্টিনে কফি অঢেল মেলে। চারতলায় উত্তর-পূর্ব কোণের ডাবলবেড স্যুট। এয়ারকন্ডিশনের ব্যবস্থা আছে। ব্যালকনিতে বসে গঙ্গার সৌন্দর্য দেখলাম কিছুক্ষণ। বাইনোকুলারে পাখি খোঁজার ব্যর্থ চেষ্টা করলাম। জয়ন্ত বলল, “হালদারমশাইয়ের খোঁজ করা উচিত ছিল।”

বললাম, “ওঁকে যথাসময়ে পেয়ে যাব। চিন্তা কোরো না।”

 উর্দিপরা হোটেলবয় কফি দিয়ে গেল। কফি খেতে খেতে জয়ন্ত বলল, “প্রদীপবাবুর দল কোথায় উঠেছে”।

“ডার্লিং! এখন ওসব কথা নয়। গঙ্গাদর্শনে মন দাও!”

জয়ন্ত হাসল। “আপনি চিন্তা-ভাবনার তালে আছেন। ওকে বস্! চুপ করলাম।”

জয়ন্ত ঠিকই ধরেছে। আমি ভাবতে চাইছিলাম। অনির চিঠিটা আমাকে ধাঁধায় ফেলেছে। চিঠির কাগজ আর কালি দেখে মনে হয় খুব পুরনো। সমীর এই চিঠি ব্যাগে রাখল কেন? আবার চোর সেই ব্যাগ চুরি করে একটা ফালতু কাগজও। ফেলে রাখল না, শুধু চিঠিটা রেখে দিল? সমস্ত পরিকল্পনাটা যেভাবে সাজিয়েছি থিওরির আকারে, শুধু এই জায়গাটুকুতে কঁচা হাতের কাজের ছাপ দেখা যাচ্ছে। এর কারণ কী। দ্বিতীয় ব্যক্তি’ কি ভয় কিংবা উত্তেজনায় আর মাথার ঠিক রাখতে পারছে না? ভুল করে বসছে? এরপর আরও ভুল করে বসবে?

বরাবর দেখেছি, এটাই হয়। খুনী নিজের অগোচরে নিজের ছাপ রেখে যায়। এই চিঠিটা কি আরেকটা রেড হেরিং? নাহ্? ঝট করে কোনও সিন্ধান্তে পৌঁছুনো ঠিক হবে না।

কফি শেষ করে উঠে পড়লাম। সূর্য ডুবতে চলেছে। বললাম, “চলো জয়ন্ত! বেরিয়ে পড়া যাক।”

একটা সাইকেলরিকশো নিয়ে অবধূতজির আশ্রমে গেলাম। শ্মশান এলাকা থেকে উত্তরে বেশ কিছুটা এগিয়ে সুন্দর আশ্রম। চারিদিকে পাঁচিল এবং তার ওপর কাঁটাতারের বেড়া। ভেতরে ফুলবাগিচা। বড়বড় গাছের গোড়া মসৃণ লাল সিমেন্টে বাঁধানো। ভিড় করে ভক্তরা বসে আছে এখানে-ওখানে। একটা নাটমন্দিরে সংকীর্তন চলেছে। মাইক্রোফোনের আওয়াজে কান ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছিল।

একজন লোককে জিজ্ঞেস করলে সে অবধূতজির ডেরা দেখিয়ে দিল। ধাপে-ধাপে লাল পাথরের সিঁড়ির ওপর চওড়া বারান্দা। হলঘর। বিশাল দরজা। হলঘরে একদল পুরুষ ও মহিলা করজোড়ে বসে আছে। শেষদিকটায় একটা লাল পাথরের বেদি। এখনই উজ্জ্বল আলো চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। বেদিতে বসে আছেন ধ্যানস্থ এক সন্ন্যাসী। দেখেই চিনতে পারলাম। এঁর ছবি লকেটে এবং সুমিতবাবুর ঘরে দেখেছি।

জয়ন্ত আমার পাঁজরে খোঁচা দিল। তার দিকে তাকালে সে সামনের দিকে চোখের ইশারা করল। দেখলাম, হালদারমশাই ধুতিপাঞ্জাবি পরে করজোড়ে বসে আছেন।

আমার চেহারায় কী আছে জানি না, অথবা লোকে আমাকে সায়েব ভাবে। একজন লোক এসে চাপাস্বরে বলল, “সামনে গিয়ে বসুন সার! আসুন! আমি নিয়ে যাচ্ছি।”

সামনের সারিতে একজোড়া সায়েব এবং মেমসায়েবও দেখতে পেলাম। যেমন-তেমন পোশাক। আজকাল সায়েবমেমরা দলেদলে এদেশে এসে সাধুসন্ন্যাসীদের ভক্ত হয়ে যাচ্ছে। সামনে গিয়ে বসে হালদারমশাইয়ের চোখে চোখ পড়তেই উনি একটু হেসে চোখের ইশারায় কী যেন বললেন, বুঝলাম না। বাইরে থেকে মাইক্রোফোনের শব্দ এসে কানে ধাক্কা দিচ্ছে। আমি মাইক্রোফোন একেবারে সহ্য করতে পারি না।

ধ্যানভঙ্গ হল প্রায় আধঘণ্টা পরে। অবধূতজি প্রসন্ন হেসে চোখ খুললেন। তারপর জলদগম্ভীর কণ্ঠস্বরে সংস্কৃত স্তোত্রপাঠ করলেন। তিনি হাত তুলে আশীর্বাদের ভঙ্গি করার সঙ্গে সঙ্গে হলঘরের সবাই মেঝেয় মাথা ঠেকাল। জয়ন্ত পর্যন্ত।

আমি মাথা নোয়াইনি সেটা অবধূতজির চোখে পড়েছিল। আমার দিকে তাকিয়ে চোখ নাচিয়ে সহাস্যে বললেন, “কী হে বিজ্ঞান প্রচার সমিতির সদস্য! লড়তে এসেছ? এখনও লড়ার সময় হয়নি। অমাবস্যালগ্নে লড়াই হবে। লৌকিক শক্তির সঙ্গে অলৌকিক শক্তির লড়াই।”

আমি করজোড়ে বললাম, “আজ্ঞে না। আমি একজন ট্যুরিস্ট।” বলেই মাথা লুটিয়ে প্রাণাম করলাম।

অবধূতজি খুশি হলেন। বললেন, “লৌকিকের মধ্যেই অলৌকিক লুকিয়ে আছে। একটা বীজ থেকে বিশাল মহীরুহ হয়। একটি ক্ষুদ্র গাছ থেকে সুন্দর নানা বর্ণের ফুল ফোটে। শূন্য থেকে পূর্ণ। আবার পূর্ণ থেকে শূন্য। সবই শূন্যের খেলা।” অবধূতজি শূন্যে হাত ঘুরিয়ে একটি জবাফুল সৃষ্টি করে আমার দিকে ছুঁড়ে দিলেন। দুহাতে কুড়িয়ে মাথায় ঠেকালাম।

উনি আবার গম্ভীর স্বরে স্তোত্রপাঠ করলেন। পাঠ শেষ করে বললেন, “এবার সব উঠে পড়ো বাবামায়েরা। আমি নিভৃতে পূজার আয়োজন করব। রাত বারোটায় লৌকিক-অলৌকিকের মহারণ হবে। মিনিস্টার, জঈসায়েব, এম পি, এম এল এ, পুলিশ অফিসার সবাই আসবেন। তাদের সামনে পরীক্ষা হবে আমার শক্তির। ওঠ, উঠে পড়ো সব।”

প্রণাম করে সবাই উঠে বেরিয়ে গেল। হালদারমশাই আমার দিকে তাকাচ্ছিলেন। অবধূতজি ধমক দিলেন, “মলোচ্ছাই! এটা দেখছি আঠায় সেঁটে গেছে যে! বেরো বলছি হতচ্ছাড়া!”

হালদারমশাই বেজার মুখে বেরিয়ে গেলেন।

বললাম, “আমার একটা গোপন কথা আছে,” বলে জয়ন্তকে চলে যেতে ইশারা করলাম। জয়ন্ত চলে গেল।

অবধূতজি হাসলেন। “তোমার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হবে। ভেবো না।”

“আপনি যে কংকালের মুখে সিগারেট”

 “চুপ! চুপ! অন্য কথা থাকে বলো।”

 “আমি একটা সমস্যায় পড়ে আপনার কাছে এসেছি।”

অবধূতজি বিরক্ত হয়ে বললেন, “সমস্যা মিটে যাবে। বলেই তো দিলাম মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হবে।”

“কথাটা আপনি শুনুন! আমি আপনার আশ্ৰমফান্ডে যথাসাধ্য টাকাকড়ি দেব। আপনার অলৌকিক ক্ষমতা সম্পর্কে আমার আস্থা আছে বলেই

“শিগগির বলো!”

“আমার এক ভাগনি বছর আটেক আগে নিখোঁজ হয়ে গেছে। গতরাতে স্বপ্নে আপনার দর্শন পেলাম। আপনি বললেন, আমার আশ্রমে এস। ভাগনির খোঁজ পেয়ে যাবে।”

অবধূতজি ভুরু কুঁচকে বাঁকা চোখে তাকালেন আমার দিকে। “কী নাম তোমার ভাগনির?”

“অনামিকা সেন।”

অবধূতজি চমকে উঠলেন। আস্তে বললেন, “কে আপনি?”

 “অধমের নাম কর্নেল নীলাদ্রি সরকার।” বলে পকেট থেকে অনামিকার ছবিটা ওঁকে দেখালাম।

উনি হাত থেকে ছবিটা ছিনিয়ে নিয়ে ফের বললেন, “আপনি কে?”

 “কর্নেল নীলাদ্রি সরকার।”

অবধূতজির চোখ দিয়ে জল গড়াতে দেখলাম। ভাঙা গলায় বললেন, “ছবিটা আমার কাছে থাক। আপনি পরে আসুন। রাত সাড়ে এগারোটায়।”

“আপনি কাঁদছেন কেন অবধূতজি?”

 “এই হতভাগিনীর জন্য।”

 “অনামিকাকে আপনি চিনতেন?”

অবধূতজি বেদি থেকে নেমে এলেন। আমি উঠে দাঁড়ালাম। উনি বললেন, “গৃহত্যাগ আর সংসারত্যাগ এক কথা নয়। আমি গৃহত্যাগী। কিন্তু সংসারত্যাগী নই। কে সংসারত্যাগী হতে পারে? কেউ না। এই আশ্রম আমার সংসার। আমি মহাশ্মশানে শবসাধনা করেছি। কিন্তু মায়াকে জয় করতে পারিনি। তাই আমার চোখে কান্না দেখছেন আপনি। আর ওই কথাটা বললেন, অনামিকাকে আমি চিনতাম কি না। চিনতাম। একজন তার মাথায় গুলি করে তাকে মেরেছিল। বলুন, আর কী জানতে চান?”

“হেমাঙ্গবাবু! আপনি–”

“চুপ! চুপ! আপনি যে-ই হোন, আমাকে শান্তিতে থাকতে দিন।” অবধূতজি চোখ মুছলেন। “যা অতীত, তা অতীত হয়েই থাক। অতীতকে জাগাতে নেই কর্নেলসায়েব!”

“কিন্তু আপনিই অতীতকে জাগিয়ে রেখেছেন হেমাঙ্গবাবু?”

“অতীত নিজে থেকেই জেগে আছে।”

“একটা কংকালের মধ্যে?”

 “একটা কংকালের মধ্যে।” বলে অবধূতজি ছবিটা দেখতে থাকলেন। একটু পরে ফের বললন, “আমি আট বছর ধরে এই দিনটির প্রতীক্ষায় ছিলাম। আমি জানতাম, এইদিন কেউ এসে এই হতভাগিনীর কথা জানতে চাইবে। কর্নেল সরকার! আপনি যে-ই হোন, রাত সাড়ে এগারোটায় আসুন। নিভৃতে কথা হবে।”

“হেমাঙ্গবাবু, কংকালটি কি অনামিকার?”

অবধূতজির চোখ জ্বলে উঠল। “আজ রাতে কংকাল বলবে, সে কে ছিল। তার মুখেই শুনবেন। এখন আপনি চলে যান!”

“আপনি আজ রাতে বিপন্ন!”

অবধূতজি বাঁকা হাসলেন। “অনামিকার আত্মা আমার রক্ষী। আপনি চলে যান। আমার পুজোয় বিঘ্ন ঘটাবেন না।”

পকেট থেকে অনির চিঠিটা বের কবে ওঁকে দিলাম। “এটা কি অনির হাতের লেখা?”

চিঠিটা পড়ার পর শ্বাস-প্রশ্বাসে মিশিয়ে অবধূতজি বললেন, “না। অনির হস্তাক্ষর নয়।”

“হেমাঙ্গবাবু! আপনি বিপন্ন।”

“আপনি চলে যান!”

“অনির খুনী বিজ্ঞান প্রচার সমিতিকে আপনার পরিচয় ফাস করতে পাঠিয়েছে। সমিতির প্রদীপ মিত্র আপনার পূর্বাশ্রমের সমস্ত কিছু জেনে গেছেন। অনির খুনী তাঁকে এক লক্ষ টাকা দেবে, যদি তিনি আপনার কাছে হেরে যান।”

“জানি, জানি। প্রদীপ দলবল নিয়ে এসেছে। চ্যালেঞ্জ লেটার পাঠিয়েছে। কিন্তু আপনি এতে নাক গলাতে আসবেন না। অনির আত্মা আজ জেগে উঠবে। সে এক ভয়ঙ্কর অলৌকিক শক্তি। সে তার হত্যাকারীকে শাস্তি দেবে।”

“কে সেই হত্যাকারী, হেমাঙ্গবাবু?”

“আপনি স্বচক্ষে সব দেখতে পাবেন। অনির আত্মা তাকে আকর্ষণ করে আনবে।”

“ছবি আর চিঠিটা ফেরত দিন। ওটা আদালতের একজিবিট। কারণ খুনীকে আমি কাঠগড়ায় তুলতে চাই। অনিকে খুনের মামলার মেয়াদ আইনত এখনও শেষ হয়নি।”

ছবি ও চিঠি ফেরত দিয়ে অবধূতজি পেছনের দরজা দিয়ে চলে গেলেন। আমি বেরিয়ে এলাম। জয়ন্ত ও হালদারমশাই একটা গাছের তলায় দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। আমাকে দেখে হালদারমাশাই বললেন, “কিছু বুঝলেন কর্নেলস্যার?”

“নাহ্। আপনি কোথায় উঠেছেন?”

“থানার সেকেন্ড অফিসার কেশব আমার রিলেটিভ। তার কোয়ার্টারে আছি।” হাঁটতে হাঁটতে হালদারমশাই বললেন। “সম্পর্কে পিসতুতো ভাই। কথায় কথায় কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে এল আর কী!”

জয়ন্ত বলল, “উপমাটা লাগসই হল না হালদারমশাই!”

 “অ্যাঁঃ?” হালদারমশাই অদ্ভুত শব্দে হাসলেন। “ক্যান হইল না?”

“সাপ বেরুনোর কথা বললেন!”

 “হঃ। অই হইল আর কি!”

বললাম, “খোঁজখবর কতটা এগোলো বলুন হালদারমশাই?”

হালদারমশাই একটিপ নস্যি নাকে খুঁজে বললেন, “অবধূতজি এখানে এসেছেন বছর আটেক আগে। সঙ্গে ওনার সাধনসঙ্গিনী ছিল।”

“সাধনসঙ্গিনী?”

“তা-ই হবে। মোটকথা একজন স্ত্রীলোক ছিল। খুব সুন্দরী স্ত্রীলোক।” হালদারমশাই আবার অদ্ভুত ফাঁচ শব্দে হাসলেন। “সাধনসঙ্গিনী কার সঙ্গে কাট করেছিল। অবধূতজি তান্ত্রিক শক্তির জোরে আকর্ষণ করেছিলেন। কিন্তু আকর্ষণের ডিগ্রি বড় বেশি হওয়ার তার বডি ফেরত পান। ডেডবডি কর্নেলস্যার! বুঝলেন তো?”

“বুঝলাম। তারপর?”

“তারপর বডির ওপর বসে শবসাধনা করে সিদ্ধিলাভ হল। যে কঙ্কাল সিগারেট টানে, সেটা সেই সাধনসঙ্গিনীর।”

“কিন্তু কংকালের সিগারেট টানা সম্পর্কে স্থানীয় লোকের বক্তব্য কী?”

হালদারমশাই থমকে দাঁড়ালেন। “কথায় বলে স্বভাব যার না মরলে। জীবদ্দশায় স্ত্রীলোকটি নাকি সিগারেট টানত। কেউ-কেউ স্বচক্ষে দেখেছে।” বলে হঠাৎ কণ্ঠস্বর নামিয়ে আনলেন। “হলঘরের পেছনে অবধূতজির ডেরা। কাল রাত্রে হলঘরে উনি যখন ভক্তদের জ্ঞান দিচ্ছেন, আমি ডেরায় ঢুকলাম। খাটের তলায় এটা পুরনো তোরঙ্গ ছিল। তালা ছিল না। সেটার ভেতর স্ত্রীলোকের কাপড়চোপড় দেখলাম। খানকতক লেটার ছিল। লেটারগুলি এনে আপনাকে দেখাচ্ছি। আপনি কোথায় উঠেছেন?”

“হোটেল সম্রাটের চারতলায়। স্যুট নম্বর বাইশ।”

“আপনারা চলুন! আমি আসছি।” বলে হালদারমশাই ডানদিকে একটা পোডড়া জমি দিয়ে শর্টকাট করতে গেলেন। ওদিকটা অন্ধকার। হালদারমশাই টর্চের আলোয়। লম্বা পা ফেলে হাঁটছিলেন।

কালীপুজোর রাত্রি। ভিড় এবং প্রচণ্ড মাইক চারদিকে। একটা সাইকেলরিকশো ডেকে হোটেলে ফিরলাম।

কিছুক্ষণ পরে ব্যালকনিতে বসে কফি খেতে খেতে জয়ন্ত জিজ্ঞেস করল, “অবধূতজির সঙ্গে কী কথা হচ্ছিল বলতে আপত্তি আছে?”

বললাম, “অবধূত বলে নিজেকে প্রচার করলেও উনি যথার্থ অর্থে অবধূত নন। এটুকু তোমার বোঝা উচিত।”

“বুঝলাম না!”

 “খাঁটি অবধূতের এরকম সভ্যভব্য আশ্রম থাকে না। ইনি মর্ডান গডম্যান।”

 জয়ন্ত একটু বিরক্ত হল। “ঠিক আছে। গডম্যানের সঙ্গে কী কথা হল?”

 চুরুট ধরিয়ে হাসতে হাসতে বললাম, “সমীরবাবুর ব্যাগে পাওয়া চিঠি আর অ্যালবামে রাখা অনামিকার ফটো দেখিয়ে জানতে চাইছিলাম, এই মেয়েটিই চিঠিটি লিখেছে কি না।”

“কী বললেন, উনি?”

 “সরি ডার্লিং। হাতের তাস এখন দেখাব না।”

জয়ন্ত কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর বলল, “তা হলে, এই অবধূতসরি, গডম্যান বুজরুক নন?”

“নাহ। খাঁটি গডম্যান। তান্ত্রিক সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেছেন।”

জয়ন্ত হেসে ফেলল। “ভ্যাট! আমি বিশ্বাস করি না। কংকালকে দিয়ে সিগারেট টানানো ম্যাজিক ছাড়া কিছু নয়। গডম্যান প্রদীপবাবুর কাছে হেরে ভুট হবেন।”

একটা চিন্তা আমাকে পেয়ে বসল। চিন্তা অথবা দুর্ভাবনা। হয়তো কোনও সাংঘাতিক বিয়োগান্ত নাটকের শেষ দৃশ্য আসন্ন। হ্যাঁ, জয়ন্ত ঠিকই বলেছে, ওটা ম্যাজিক। কিন্তু প্রদীপ মিত্রকে এমন করে লড়িয়ে দিল কে? কে চেয়েছে অবধূতের পূর্বাশ্রম এবং কীর্তিকলাপ ফাঁস হোক? তার মানে হেমাঙ্গবাবুকে অতীতের বিবর্ণ পর্দা ছিঁড়ে সামনে আনতে চাইছে কেউ। প্রশান্ত সান্যালই কি নেপথ্যের সেই নায়ক? কিন্তু এতে তার কী উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে? প্রশ্নের ঝক আমাকে ঘিরে ধরল। সুমিতবাবুর স্টুডিওতে যে ছবি ছিল, সেটা নষ্ট করার কারণই বা কী? প্রশান্ত সান্যাল কেন এ কাজ করবে? সমীরবাবুর ব্যাগে অনামিকার জাল চিঠিই বা কেন সে প্ল্যান্ট করল। এই সব কিছু যেন তার দিকেই সন্দেহের কাটাকে ঘুরিয়ে দিচ্ছে।

জয়ন্ত বলল, “কর্নেল! আমার মনে হচ্ছে, প্রদীপবাবু একটা সাংঘাতিক রিস্ক নিচ্ছেন।”

“হ্যাঁ। তা নিচ্ছেন।”

“গডম্যানের চেলাদের হাতে ধোলাই খাবেন প্রদীপবাবু! একেবারে রামপোলাই যাকে বলে।”

“এ সম্ভাবনা অস্বীকার করছি না। অন্তত একটা হুলস্থূল বেধে যাবে। সেই সুযোগে”,

আমি হঠাৎ থেমে গেলে জয়ন্ত বলল, “সেই সুযোগে কী হবে? আহ, বলুন না!”

“ডার্লিং! গডম্যান বিপন্ন।”

“আপনি ওঁকে একটু হিন্ট দেননি?”

“দিয়েছি।” চুরুটে একটা জোর টান দিয়ে অ্যাশট্রেতে রাখলাম। “হেমাঙ্গবাবু এই কেসে একজন ইমপট্যান্ট উইটনেস্। হয়তো তাঁর মুখ বন্ধ করার জন্যই এই আয়োজন, জয়ন্ত! একটা হুলস্থলের সুযোগ নিয়ে কেউ

জয়ন্ত আমার কথার ওপর বলল, “হেমাঙ্গবাবুকে কোথায় পেলেন?”

“সরি! অবধূতজি বা গডম্যান বলাই উচিত ছিল।”

জয়ন্ত খুব অবাক হয়ে বলল, “মাই গুডনেস! তাহলে অনির মামা হেমাঙ্গবাবুই এই গডম্যান? আশ্চর্য কর্নেল! কেন যেন এই কথাটা আমার মনে অস্পষ্ট ভেসে আসছিল। কিন্তু সত্যিই কি তা-ই?”

একটু হেসে বললাম, “দ্যাটস্ রাইট, ডার্লিং!”

 “আই সি। কিন্তু কী করে জানলেন এই গডম্যানই হেমাঙ্গবাবু?”

“আমার থিওরির সঙ্গে খাপ খায় বলে।”

 “কিন্তু থিওরির তো একটা ভিত্তি থাকবে?”

“বেদিতে যখন হেমাঙ্গবাবু বা গডম্যান বসে ছিলেন, তার পেছনের দেয়ালে এক ভৈরবীর ছবি ছিল। তুমি লক্ষ করোনি। ভৈরবীর মুখে অনামিকার মুখের আদল আমার চোখ এড়ায়নি।”

জয়ন্ত এত অবাক হল যে, কোনও কথা বলতে পারল না। আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। একটু পরে আস্তে বলল, “আপনার কাঁটালিয়াঘাটে ছুটে আসার পেছনে একটা কিছু বুঝতে পারছি।”

জবাব দিলাম না। হালদারমশাই এসে গেলেন এতক্ষণে। ব্যালকনিতে একটা বেতের চেয়ার এনে দিল জয়ন্ত। আলো জ্বেলে দিতে বললাম ওকে। হালদারমশাই তিনটে পুরনো চিঠি বের করে বললেন, “তিনখানা ইনল্যান্ড লেটারেই শ্রী হেমাঙ্গ সেনগুপ্ত অ্যাড্রেসি। কেয়ার অব শ্রীশ্রী ভুতানন্দ অবধূত, কাঁটালিয়াঘাটা। কী কারবার!”

চিঠিগুলো দ্রুত খুলে দেখে নিলাম। তারপর বললাম, “চিঠিগুলোর বদলে তোরঙ্গটা হাতিয়ে আনলে ভাল হত হালদারমশাই!”

হালদারমশাই ঝটপট নস্যি নিয়ে বললেন, “আনব। কিন্তু হেমাঙ্গ সেনগুপ্ত কেডা?”

জয়ন্ত বলে উঠল, “হালদারমশাইকে কেসটা জানিয়ে দিন না কর্নেল!”

 হালদারমশাইর চোখদুটো গোল হয়ে গেল। বললেন, “ক্যাস? কী ক্যাস?”

হুঁ, এবার পুরো কেসটা ওঁকে জানানো উচিত। সংক্ষেপে পুরো ঘটনা বললাম। শোনার পর উনি তড়াক করে উঠে দাঁড়ালেন। বললাম, “না হালদারমশাই, তোরঙ্গ হাতানোর রিস্ক আর নেওয়া ঠিক হবে না। বরং প্রদীপবাবুদের দলে গিয়ে ভিড়ুন। জানবার চেষ্টা করুন কে ওঁর পেছনে আছে। এক লাখ টাকার রিস্ক নিতে কে ওঁকে পোভোক করেছে, খুঁজে বের করুন। পারবেন না?”

“পারব।” বলে হালদারমশাই সবেগে প্রস্থান করলেন।

জয়ন্ত হাসতে হাসতে বলল, “এটা ভালই হল। নইলে হালদারমশাই তোরঙ্গ চুরি করতে গিয়ে হয়তো কেলেংকারি বাধাতেন।”

বললাম, “প্রদীপ মিত্রের ক্যাম্পে গিয়েও তা বাধাতে পাবেন। আসলে হালদারমশাই নাটকীয়তার পক্ষপাতী।”

জয়ন্ত উঠে গিয়ে ব্যালকনিতে ঝুঁকে গঙ্গাদর্শন করছিল। একটু পরে হঠাৎ ঘুরে বলল, “কর্নেল! আমার একটা থিওরি শুনুন।”

“বলো।”

 “হেমাঙ্গবাবু সম্ভবত জানেন, কে ওঁর ভাগনিকে খুন করেছিল।”

“জানাটা স্বাভাবিক। ভাগনিকে ভৈরবী সাজিয়ে আশ্রমে রেখেছিলেন। এই আশ্রমেই সে খুন হয়েছিল কি না সেটা অবশ্য বলা কঠিন। কারণ হালদারমশাই লোকের কাছে শুনেছেন, ভৈরবীর ডেডবডি ফেরত পেয়েছিলেন।”

“প্রশান্তই খুনী। প্রশান্তের কাছ থেকে অনামিকা চলে এসে মামার আশ্রমে ছিল। সমীরবাবুকে লেখা চিঠি পড়লে বোঝা যায়, সে প্রশান্তের কাছ থেকে পালিয়ে আসার জন্য সমীরবাবুর সাহায্য চেয়েছিল। সমীরবাবু হয়তো ছুটে এসেছিলেন এবং খুনের ঘটনার তিনিও ভাইটাল সাক্ষী। তাই তাকে মরতে হয়েছে।”

“জয়ন্ত! থিওরি নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। অনেক সময় ধূর্ত খুনী ভুল থিওরি গড়ে তোলার জন্য গোয়েন্দাকে অলক্ষ্যে থেকে সাহায্য করে। ফাঁদ ডার্লিং! ফাঁদ। সেই থিওরি আসলে একটা ফঁদ।”

“কী সর্বনাশ! আপনি সেই ফাঁদে পা দেননি তো?”

 “দিয়েছিলাম। এখন সরে এসেছি।”

 “কী করে টের পেলেন আপনি ফাঁদে পা দিয়েছিলেন?”

একটু হেসে বললাম, “টেলিফোন ডাইরেক্টরি আমাকে শেষ মুহূর্তে রক্ষা করেছে। নইলে লাল হেরিং মাছের পেছনে অনর্থক ছুটে বেড়াতাম।”

জয়ন্ত আবার ফ্যালফ্যাল করে তাকাল। “টেলিফোন ডাইয়রেক্টরি?”

 আস্তে বললাম, “দ্যাটস্ রাইট, ডার্লিং!”..

.

জয়ন্ত চৌধুরি

 ‘টেলিফোন ডাইরেক্টরি’ কথাটি আমার মাথার ভেতর অনেকক্ষণ মাছির মতো ঘুরল। তারপর মগজের কোনও স্নায়ুতে সেঁটে রইল। এ এক জ্বালাতন। সমস্যা হল, আমার প্রাজ্ঞ বন্ধুকে বরাবর এই রকম প্রস্তরমূর্তি হয়ে যেতে দেখেছি কোনও জটিল রহস্যের পর্দা তোলার পূর্বাভাস এটা। এ সময় প্রশ্ন করেও জবাব পাওয়া যায় না। যদি বা যায়, তা অসংলগ্ন এবং আরও ধাঁধার সৃষ্টি করে।

ঘরে বসেই ডিনার খেলাম আমরা। তখন রাত প্রায় সাড়ে নটা; তারপর ব্যালকনিতে গিয়ে রাতের গঙ্গা দেখতে দেখতে বললাম, “কখন বেরোবেন?”

কর্নেল চোখ বুজে চুরুট টানছিলেন। চোখ খুলে বললেন, “কোথায়?”

“কী আশ্চর্য! কংকালের সিগারেট টানা দেখতে যাবেন না?”

“ও! হ্যাঁ।” অন্যমনস্কভাবে জবাব দিলেন কর্নেল।

হাসতে হাসতে বললাম, “আপনাকে খুব চিন্তিত দেখাচ্ছে!”

“নাহ্। তত কিছু না।” কর্নেল যেন অনিচ্ছাসত্ত্বেও একটু হাসলেন। “আমি অনামিকার কথা ভাবছিলাম। জয়ন্ত! অনামিকা সেনের সম্পর্কে তোমার মনে কোনও ইমেজ ভেসে উঠছে না?”

“উঠছে বৈকি! খেলুড়েটাইপ মেয়ে। পাকা অভিনেত্রী।”

 “কেন অভিনেত্রী বলছ?”

 “অভিনেত্রী নয়? ভৈরবী সেজেছিল–আপনি ছবি দেখেছেন আশ্রমে।”

 “হু। আরও ব্যাখ্যা কর।”

 “আপনি আমাকে নিয়ে খেলতে বসেছেন কর্নেল! উদ্দেশ্য কী?”

 “অনামিকাকে আরও ভালভাবে জানতে চাই।”

“কিন্তু আমার কাছ থেকে কী করে জানা যাবে? পঁচিশ বছর আগে আমার বয়স ছিল পাঁচ।”

“হোপলেস, ডার্লিং! তুমি কিছু ইনফরমেশন হাতে পেয়েছ। সেই থেকে একটা ইমেজ নিশ্চয় তোমার মনে গড়ে উঠেছে।”

একটু ভেবে নিয়ে বললাম, “অনামিকার ছিল তিন-তিনটে বাঘা প্রেমিক।”

“প্রেমিকদের সম্পর্কে তোমার বিশেষণটা বড্ড বেয়াড়া।”

“বাঘা প্রেমিক বলতে আপত্তি কী? রূপের আগুনে পতঙ্গের ঝপ কথাটা ক্লিশে হয়ে গেছে।”

“হুঁ, বলো।”

বৃদ্ধ ঘুঘুমশাই কি এ ভাবে সময় কাটাতে চাইছেন? বললাম, “আর বেশি কিছু বলার মতো ইনফরমেশন আমার হাতে নেই।”

“কেন? তোমার মনে হয় না, অনামিকা তার মামার কথায় চলত?”

“হ্যাঁ। বুঝতে পারছি, আমাকে দিয়ে আপনি অনামিকাকে গড়ে তুলতে চাইছেন। আমি বোকা হতে পারি। তবে আপনার হয়ে চিন্তা করতে রাজি নই।”

কর্নেল চোখ বুজলেন। একটু পর বললেন, “তান্ত্রিক শক্তি বলে কিছু থাক বা না-ই থাক, অনামিকা তার মামার খুব বশীভূত ছিল। মামাকে কি সে ভয় পেত? এটাই প্রশ্ন।”

“বস্! এটা কতকটা বঙ্কিমচন্দ্রের কপালকুণ্ডলার গল্প হয়ে গেল! অবশ্য মডার্ন কপালকুণ্ডলা এবং মডার্ন তান্ত্রিক।”

কর্নেল একটু হাসলেন। “মর্ডান কপালকুণ্ডলা বলেই অনামিকা সিগারেট টানত।” বলে একরাশ চুরুটের ধোঁয়া ছেড়ে ঘড়ি দেখলেন। “ওঠ! বেরুনো যাক।”

হোটেল থেকে বেরুনোর সময় হালদারমশাইকে আসতে দেখলাম। আমাদের দেখে উনি গেটের কাছে থমকে দাঁড়ালেন। কাছে গেলে চাপাস্বরে বললেন, “প্রদীপ মিত্রের পেছনে কলকাতার এক বিজনেসম্যান আছে। প্রদীপবাবুর ওয়াইফ এসেছেন সঙ্গে। কী যেন নামটা”।

কর্নেল বললেন, “চিত্রা।”

“হঃ! চিত্রা দেবীর লগে পাঁচ কথা কইয়া ভাব জমাইলাম। ওনারে সাপোর্ট করলাম।”

কর্নেল বললেন, “ওঁরা কোথায় উঠেছেন?”

 “রানী বরদাসুন্দরী স্কুলে দুইখান ঘর পাইছে। স্কুলে পূজা ভেকেশন।”

“আপনি আর একবার যান চিত্রাদেবীর কাছে। তাঁকে বলুন আমি তার সঙ্গে কথা বলতে চাই। আমাকে উনি চেনেন।”

“হোটেলে ডাকব?”

“না। স্কুলের কাছাকাছি কোথাও। চলুন?”

স্কুলবাড়িটা রেললাইনের কাছাকাছি। নিরিবিলি জায়গা। চারদিকে গাছপালা আর একটা পুকুর। পুকুরের পাড়ে একটা বটতলায় আমরা দাঁড়িয়ে রইলাম। এখান থেকে স্কুলবাড়িতে আলো ও মানুষজন দেখা যাচ্ছিল।

মিনিট পনের কুড়ি পরে হালদারমশাই হন্তদন্ত হয়ে ফিরে এসে বললেন, “চিত্রাদেবী আপনারে ডাকলেন। হাজব্যান্ডেরে আপনার কথা কইয়া দিলেন, কী কাণ্ড! প্রদীপবাবু আপনারে চেনেন। উনিও কইলেন, কর্নেলসায়েরে লইয়া–” বলে হালদারমশাই ঘুরলেন। “ওই দ্যাখেন, প্রদীপবাবু আসছে!”

আমরা স্কুলের গেটে গেলাম। আমার বয়সী এক ভদ্রলোক কর্নেলকে নমস্কার করলেন। বেশ মারকুট্টে চেহারা। বুদ্ধিদীপ্ত চাউনি। একটু ঔদ্ধত্য আছে। ভাবভঙ্গিতে। বললেন, “চিত্রা এইমাত্র আমাকে বলল আপনার কথা। কী আশ্চর্য! একে বলে মশা মারতে কামান দাগা।”

চিত্রাকে আসতে দেখা গেল। এসেই কর্নেলের পায়ের ধুলো নিলেন। কর্নেল বললেন, “আমি আপনার ক্যাম্পে ঢুকব না প্রদীপবাবু! আমি শুধু একটা কথা জানতে চাই। কে আপনাকে এক লাখ টাকার রিস্ক নিতে প্রভোক করেছে?”

প্রদীপবাবুর চোখ দুটো জ্বলে উঠল। “আমাকে প্রোডোক করবে? আমি বিজ্ঞানী। যুক্তিবাদী। আপনাকে কে এমন উদ্ভট কথা বলল?”

চিত্রা বললেন, “আমি বলেছি।”

প্রদীপবাবু হাসলেন। “কর্নেলসায়েব! চিত্রার ধারণা, আমি অন্যের কথায় নাচি। একেবারে ভুল।”

কর্নেল বললেন, “আপনি এক লাখ টাকা বাজি ধরেছেন। যদি হেরে যান?”

“আমি হারব না। ওই ম্যাজিকটা আমি জানি। পুতুলনাচের টেকনিক প্রয়োগ করা হয়। অবধূতের হাতে থাকে কালো সুতোর গোছা। নীল আলোতে কালো সুতো দেখা যায় না। অবধূত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাত নাড়েন বা দাড়ি চুলকোন। ওটাই কৌশল।”

“তা হলে আপনি এসে দেখে গেছেন ব্যাপারটা?”

“নিশ্চয়। তা না হলে কোন সাহসে বাজি ধরব?”

আমি বললাম, “কঙ্কাল সিগারেট টানে। এর টেকনিকটা কী?”

“কঙ্কালের দাঁতের ফাঁকে সিগারেট আটকে দেওয়া হয়। ভেতরে সরু নল আছে। সেটা বেদির তলা দিয়ে পেছনের ঘরের মেঝেয় একটা হাপরের মুখে বসানো আছে। ইলেকট্রিক হাপর। তো”

কর্নেল বললেন, “হ্যাঁ। ম্যাজিক। কিন্তু আপনি তো এসেছেন আরেকটা উদ্দেশ্য নিয়ে। অবধূতজির পূর্বাশ্রমের গোপন তথ্য জনসমক্ষে ফাস করবেন।”

 “করব। কারণ আমার হাতে ডকুমেন্টারি এভিডেন্স আছে।”

“কী ভাবে তা সংগ্রহ করলেন বলতে আপত্তি আছে?”

প্রদীপবাবু যে সত্যিই অহঙ্কারী মানুষ, তা ওঁর হাসির ভঙ্গিতে বোঝা গেল। বললেন, “আপত্তি থাকবেই। কে বলতে পারে অবধূত আপনার মতো একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভকে আমার পেছনে লাগিয়েছেন কি না? আপনি ডাবল এজেন্ট নন, কে বলতে পারে?”

“আমি প্রাইভেট ডিটেকটিভ নই। আপনার স্ত্রী আমার কাছে গিয়েছিলেন। আপনার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে দিতে বলেছিলেন। কিন্তু আমি ওঁকে বলেছি, স্ত্রীই স্বামীর রক্ষাকবচ।”  

“কর্নেলসায়েব! আমি জানি আপনি কে। আমার অন্য সোর্স আছে জানার।”

 “সেই সোর্স কি বৈশম্পায়ন রায়?”

আমি চমকে উঠলাম। চিত্রাকেও দেখলাম খুব চঞ্চল এবং উত্তেজিত। চিত্রা কী বলতে যাচ্ছিলেন, তাকে থামিয়ে প্রদীপবাবু বললেন, “বলব না।”

 “মিঃ রায়কে আপনি নিশ্চয় জানাননি অবধূতজি কে ছিলেন?”

প্রদীপবাবু যেন একটু দমে গেলেন। “এ আমার প্রাইভেট সিক্রেট। কাকেও জানানোর প্রশ্ন ওঠে না।”

“জানিয়ে দিলে এক লাখ টাকার আশ্বাস পেতেন না।” কর্নেল নির্বিকারভাবে বললেন। “বাই দা বাই, আপনি সমীর রুদ্রকে চেনেন?”

চিত্রা বললেন, “আমি চিনতাম। সে তো আপনাকে বলেছি।”

 প্রদীপবাবু বললেন, “আজই চিত্রার কাছে তার কথা শুনেছি।”

কর্নেল চিত্রাদেবীকে বললেন, “বাই এনি চান্স, সমীরবাবুর সঙ্গে আপনার ইদানীং কি দেখা হয়েছিল?”

চিত্রা আস্তে বললেন, “আপনাকে বলেছিলাম, কসবার একই বাড়ির ফ্ল্যাটে আমার দিদি থাকেন। তার ঘরে সমীরবাবু আড্ডা দিতে যেতেন। কথায় কথায় সম্প্রতি এক ভদ্রমহিলার গল্প করছিলেন। তার সঙ্গে সমীরবাবুর নাকি বিয়ের কথা হয়েছিল। সে অনেক বছর আগের কথা।”

“অনামিকা সেন?”

“হ্যাঁ।” চিত্রা শ্বাস ছেড়ে বললেন, “অনামিকার মামা নাকি সাধুবাবা হয়েছেন। এবং সেই তান্ত্রিক সাধক কাঁটালিয়াঘাটে থাকেন।”

“সমীরবাবু বলেছিলেন?”

 “হ্যাঁ।”

 “সে কথা আপনার স্বামীকে আপনি বলেছিলেন?”

 চিত্রা তাঁর স্বামীর দিকে একবার তাকিয়ে মাথা দোলালেন।

প্রদীপবাবু বললেন, “আমার সময় নষ্ট হচ্ছে। এরপর যা বলার, যথাসময়ে যথাস্থানে বলব।”

কর্নেল বললেন, “ডকুমেন্টস্ আপনাকে সমীরবাবু দিয়েছিলেন, তাই না প্রদীপবাবু?”

প্রদীপ মিত্ৰ খেঁকিয়ে ওঠার ভঙ্গিতে বললেন, “বলব না, আই রিপিট; যথাসময়ে এবং যথাস্থানে মাইক্রোফোনে সব ঘোষণা করব।”

“প্রদীপবাবু, মিঃ রায় আপনাকে এক লাখ টাকার চেক দিয়েছেন কি?”

“বলব না।”

 “সেই চেকের তারিখ দেখে নিয়েছেন কি?”

“বলব না।”

 “চেকের তারিখ দেখে নেবেন।” বলে কর্নেল চলে এলেন।

আমরা রাস্তায় পৌঁছুলে উত্তেজিত হালদারমশাই বললেন, “রহইস্য! প্রচুর রহইস্য!”

কর্নেল বললেন, “প্রচুর রহস্যই বটে হালদারমশাই!”

 হালদারমশাই চাপাস্বরে বললেন, “অবধূতজিই সমীরবাবুকে মার্ডার করেনি তো কর্নেলস্যার?”

কর্নেল হাসলেন। “আপনার সন্দেহের কারণ আছে। এটুকু বলা চলে।”

বললাম, “একটা ব্যাপার বোঝা গেল। অবধূতজির ওপর অনামিকার তিন প্রেমিকেরই খুব রাগ। বলবেন, প্রশান্তবাবুর রাগের প্রমাণ এখনও পাওয়া : যায়নি। কিন্তু ওটা ধরে নিতেই হবে। অবধূতজি–মানে, হেমাঙ্গবাবু ভাগনিকে কপালকুণ্ডলা করে রাখতে চেয়েছিলেন। সেই নিয়েই প্রশান্তবাবুর সঙ্গে অনামিকার ঝামেলা বেধেছিল সম্ভবত। অনামিকা নিশ্চয় মামার খুব বশীভূত ছিলেন।”

কর্নেল বললেন, “দ্যাটস্ রাইট। তবে এখন ওসব নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। চলো, অবধূতজির আশ্রমে যাই।”

এবার রাস্তায় প্রচণ্ড ভিড়। মাইক্রোফোন এবং পটকার উপদ্রব। অবধূতজির আশ্রমেও জনারণ্য। আশ্রমের একধারে কালীমন্দির। সেখানে পুজোর প্রস্তুতি চলেছে। কিন্তু অবধূতজিকে দেখতে পেলাম না। আমাকে ও হালদারমশাইকে দাঁড় করিয়ে রেখে কর্নেল “আসছি” বলে ভিড়ে নিখোঁজ হয়ে গেলেন।

হালদারমশাই বললেন, “আইজকাল জনগণের মাথা বেবাক খারাপ হইয়া গেছে।”

“কেন বলুন তো?”

 “সি উইদ ইওর আইজ, জয়ন্তবাবু!” বলে নস্যি নিলেন হালদারমশাই। হাঁচবার চেষ্টা করে বললেন, “পূজা দ্যাখতে আই নাই। আইছে ম্যাজিক দেখতে।”

ভিড়ের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। হঠাৎ দেখি, ভিড় ঠেলে এগিয়ে যাচ্ছে সেই ইন্দরজিৎ সিং! চমকে উঠেছিলাম। বললাম, “ওই সর্দারজিকে ফলো করুন হালদারমশাই!”

হালদারমশাই তখনই ভিড় ঠেলে এগিয়ে গেলেন। কেন ফলো করতে হবে জিজ্ঞেসও করলেন না। আমাকে কিছু বলারও সুযোগ দিলেন না। আসলে এটা ওঁর বাতিক। কর্নেলের পাখি-প্রজাপতির পেছনে ছোটাছুটির বাতিক যেমন।

ভিড় ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছিল। তারপর দেখলাম একদল পুলিশ ঢুকল। গেটের দিকে পুলিশভ্যান দেখা যাচ্ছিল। একের পর এক ভি আই পিরা আসছেন বোঝ। গেল। কিন্তু তার জন্য এত পুলিশ কেন রে বাবা?

এক ভদ্রলোক গাছের গোড়ায় শানবাঁধানো চত্বরে বসেছিলেন। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “হাঙ্গামার ভয় আছে নাকি মশাই? এত পুলিশফোর্স কেন বলুন তো?”

বললাম, “জানি না।”

ভদ্রলোক সন্দিগ্ধ দৃষ্টে চারপাশটা দেখে নিয়ে একটু হাসলেন হঠাৎ। “বিজ্ঞানের সঙ্গে তন্ত্রশক্তির লড়াই। বলা যায় না, দুই ফোর্সের সংঘর্ষে কী ঘটে যায়। তাই থার্ড ফোর্স হিসেবে পুলিশ আমদানি।”

ভদ্রলোক রসিক। বললাম, “আপনি এর আগে কখনও কঙ্কালের সিগারেট খাওয়া দেখেছেন?”

“না মশাই। দেখব বলেই তো এসেছি। তবে বুঝলেন, হাঙ্গামা দেখলেই কেটে পড়ব। চাচা আপন প্রাণ বাঁচা!” ভদ্রলোক একটু রসেবশে আছেন মনে হল। “আজকের রাতে কারণবারি পান না করে থাকা যায় না। কাজেই দোষ নেবেন না মশাই!” বলে করজোড়ে আমাকে নমস্কারও করলেন।

আবার একদল বন্দুকধারী পুলিশ এল। তাদের দেখে ভদ্রলোক গেটের কাছে গিয়ে আরেকটা গাছের তলার বেদিতে বসলেন। বোঝা গেল, একটা কিছু ঘটলেই নিরাপদে পালাতে পারবেন।

কর্নেল কোথায় গেলেন কে জানে। বিরক্তি লাগছিল। হালদারমশাইও গেলেন তো গেলেন। আর আসার নাম করছেন না। কিন্তু ইন্দ্রজিৎ সিং এখানে কেন এল? ফ্রিল্যান্স জার্নালিজমের জন্য? যা ঘটতে চলেছে, অর্থাৎ বিজ্ঞান এবং তন্ত্রশক্তির ডুয়েল, বিদেশি কাগজে ভাল খাবে। কাজেই একজন ফ্রিলান্স জার্নালিস্ট আসতেই পারে। শুধু সুইহো স্ট্রিটে একই চেহারার একজন শিখ ভদ্রলোকের আচরণ উদ্বেগজনক। তবে এমনও তো হতে পারে, সেই ভদ্রলোক ইন্দরজিৎ সিং নন?

ভিড় সামলাচ্ছে পুলিশ। মন্দিরের হলঘরের সামনে ঘাসের ওপর এবং রাস্তার ওপর যে-যেখানে পারছে বসে পড়ছে। হলঘরের দরজা বিশাল। কাজেই ভেতরের দৃশ্য দেখতে অসুবিধা নেই। চারদিকে আলোর বন্যা। মাইক্রোফোনে শ্যামাসঙ্গীত এবং কখনও স্তোত্রপাঠ জলদগম্ভীর স্বরে।

 দাঁড়িয়ে থেকে পায়ে ব্যথা ধরে গেল। না কর্নেল না হালদারমশাই কেউ ফিরে এলেন। সিগারেটের প্যাকেট বের করে ধরাতে যাচ্ছি, একজন গেরুয়াধারী সাধু তেড়ে এলেন। “আশ্রমের ভেতর নো স্মোকিং! ওই দেখুন, আলোর অক্ষরে লেখা আছে।”

এই সাধু নিশ্চয় আশ্রমেরই লোক। তাই ওঁকে বললাম, “সরি সাধুজি! তো এত পুলিশ কেন? হাঙ্গামার আশঙ্কা আছে নাকি?”

“নাহ!” সাধুজি হাসলেন। “শোনেননি বিজ্ঞান প্রচার সমিতির প্রদীপ মিত্রদের পুলিশ স্টেশনে পাঠিয়ে দিয়েছে? এস পি সায়েব কড়া লোক। আশ্রমের পবিত্রতা রক্ষা করেছেন।”

 “কখন ওঁদের ফেরত পাঠিয়েছে পুলিশ।”

“এই তো কিছুক্ষণ আগে।”

হতাশ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। নাটকীয় ঘটনাটা ঘটল না। কোনও মানে হয়?”

.

কর্নেল নীলাদ্রি সরকার

 মন্দিরের পাশ দিয়ে অবধূতজির ঘরে যাচ্ছিলাম। দু’জন সাধু আমাকে বাধা দিলেন। বললাম, “ওঁর সঙ্গে দেখা করার কথা আছে।”

কথাটা একটু চড়া গলায় বলেছিলাম। অবধূতজি ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন। ইশারায় চেলাদের চলে যেতে বললেন। তারপর আমাকে ডাকলেন। কাছে গেলে আস্তে বললেন, “আপনার সময়জ্ঞান আছে। আসুন! তবে বেশি সময় দিতে পারব না। মাত্র পনের মিনিট।”

“তা-ই যথেষ্ট হেমাঙ্গবাবু!”

“চুপ! ও নামে ডাকলে আপনার সঙ্গে কথা বলব না। এমন কি–”

“ঠিক আছে।”

ঘরে ঢুকে ধূপ-ধুনোর সুঘ্রাণ পেলাম। একটা খাটে ফোমের গদি। তার ওপর গেরুয়া চাদর। অবধূতজি আসন করে বসলেন। আমি বসলাম একটা মোড়ায়।

অবধূতজি বললেন, “আগে আত্মপরিচয় দিন। কপটতা করবেন না।”

আমার নেমকার্ড দিলাম। উনি খুঁটিয়ে দেখার পর বললেন, “নেচারিস্ট কী?”

 “প্রকৃতিপ্রেমিক।”

অবধূতজি একটু হাসলেন। “নারীর মধ্যে প্রকৃতি আছে। কিন্তু নারীরা তা জানে না। আমার ভাগনি অনি জানত, তার মধ্যে প্রকৃতি আছেন। আমি তাকে জানিয়ে দিয়েছিলাম। আর দেখুন কর্নেল সায়েব, প্রকৃতির ভয়ঙ্করী শক্তি। আপনি প্রকৃতিকে দেখেছেন, চেনেননি।”

 দ্রুত বললাম, “সমীরবাবুকে আপনি চিনতেন। যে–”

“কাগজে পড়েছি সে আত্মহত্যা করেছে। অনিকে ছুঁতে গিয়েছিল ওই মস্তান শূকরশাবক। তার শাস্তি পেয়েছে।”

“আপনি কেন প্রশান্ত সান্যালের সঙ্গে অনির গোপনে বিয়ে দিয়েছিলেন?”

“আপনি কেন এসব কথা জানতে চান?”

 “অনির হত্যাকারীকে ধরিয়ে দিতে চাই বলে। মামলার মেয়াদ এখনও শেষ হয়নি অবধূতজি!”

অবধূত এক মিনিট তাকিয়ে রইলেন নিষ্পলক চোখে। তারপর শ্বাস ছেড়ে বললেন, “প্রশান্তর কাছ থেকে অনি পালিয়ে এসেছিল আমার এই আশ্রমে। এমনি কালীপুজোর রাতে তাকে কেউ ডেকে নিয়ে যায়। পরদিন মহাশ্মশানে তার মড়া পাওয়া গিয়েছিল। তাকে গুলি করে মেরেছিল প্রশান্ত।”

“প্রশান্ত মেরেছিল আপনি জানেন?”

“ধ্যানবলে জেনেছি।”

“অবধূতজি! আমার ধ্যানবল নেই। তদন্ত করে জেনেছি, প্রশান্ত অনিকে খুন করেনি।”

অবধূত ভুরু কুঁচকে তাকালেন।–”কে খুন করেছিল?”

“যে সমীর রুদ্রকে খুন করেছে।”

“কে সে?”

 “বলব। তার আগে আপনি বলুন কেন প্রশান্তর সঙ্গে অনির বিয়ে দিয়েছিলেন?”

অবধূত চুপ করে রইলেন।

 বললাম, “আমি বলছি। প্রশান্ত আপনাকে অনেক টাকা দিয়েছিল। আপনি আশ্রমের জমি কিনেছিলেন সেই টাকায়। অনির মায়ের বাড়ি বিক্রির টাকায় আপনার ওই মন্দির।”

অবধূতের চোখ জ্বলে উঠল। কিন্তু আত্মসংবরণ করে বললেন, “আপনি অনেক কিছু জানেন তা হলে।”

“জানি। এ-ও জানি, সেই অমাবস্যার রাতে সমীর এসে ডেকে নিয়ে যায় অনিকে। আপনি আমাকে মিথ্যা বলেছেন, চিঠিটা অনির লেখা নয়। অবধূতজি, চিঠিটা অনিরই লেখা। সমীর সম্ভবত ঠিক সময়ে বহরমপুর পৌঁছুতে পারেনি। তাই আপনার আশ্রমে এসেছিল অনির খোঁজে। আপনি তাকে শূকরশাবক বলছেন। কিন্তু সে আপনার আতিথ্যেই ছিল।”

অবধূতজির চোখে জল দেখতে পেলাম। আস্তে বললেন, “সমীর এসেছিল কালীপুজো দেখতে।”

“ওটা নিতান্ত ছল, অবধূতজি! তবে সমীর জানত না, যাকে সঙ্গে নিয়ে অনির খোঁজে এসেছে, সে আসলে অনিকে খুন করার উদ্দেশ্যে সমীরকে ব্যবহার করছে। শ্মশানের ওখানে যেতেই সে অনিকে গুলি করে পালিয়ে যায়। সমীরও পালাতে বাধ্য হয়। আপনি জানেন এসব কথা। সমীর আপনাকে চিঠি লিখে জানিয়েছিল। সে-চিঠি আমার হাতে এসেছিল।”

অবধূতজি খাট থেকে নেমে তলায় হাত ভরে তোরঙ্গ টেনে বের করলেন। তখন বললাম, “থাক্‌ অবধূতজি! আমার কথা শুনুন। তোরঙ্গ যেমন আছে থাক।”

তোরঙ্গ খুললেন অবধূত। গেরুয়া শাড়ি জামা দেখিয়ে বললেন, “এতে রক্ত লেগে আছে অনির। কিন্তু চিঠি আপনার হাতে গেল কী করে?”

“যে-ভাবে হোক, গেছে। আপনি দয়া করে বসুন।”

অবধূত বসলেন। বললেন, “আমি কিছু বুঝতে পারছি না। সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।”– “আপনি সমীরের চিঠিতে আপনার ভাগনির খুনীর নাম জেনেও কেন পুলিশকে তা বলেননি?”

অবধূত তাকালেন। নিষ্পলক চাহনি।

বললাম, “খুনী আপনাকে মাসোহারা দিতে চেয়েছিল। তার বদলে প্রশান্তের কাঁধে দায় চাপাতে বলেছিল। আপনি বুদ্ধিমান মানুষ। প্রশান্তকেও দোহনের সুযোগ পেয়েছিলেন। তার ঠিকানা যোগাড় করতে দেরি হয়েছিল অবশ্য। প্রশান্তও এরপর আপনাকে টাকা দিতে আসত। হয়তো এবারও এসে দিয়ে গেছে। সে ২৩ সেপ্টেম্বর এসেছিল। হ্যাঁ, সমীর আপনাকে সাহায্য করেছিল প্রশান্তের ঠিকানা দিয়ে। সে-চিঠিও আমার হাতে এসে গেছে।”

অবধূত চোখ মুছে বললেন, “এত যদি জানেন, খুনীর নাম বলছেন না কেন?”

“আপনি মর্ডান গডম্যান। আপনার তাই দামী বিদেশী গাড়ি আছে। আপনি রাজসিক সুখ ভোগ করেন। এই সুখের জন্য আপনার সুন্দরী ভাগনিকে টোপ হিসেবেই ব্যবহার করেছেন।”

অবধূত চাপা গর্জন করলেন, “বেরিয়ে যান। বেরিয়ে যান!”

এইসময় কেউ এসে দাঁড়াল দরজার বাইরে। এদিকটায় তত আলো নেই। দেশি-বিদেশি ফুলের ঝোঁপ, পাতাবাহার গাছ। ঘুরেই দেখলাম ইন্দরজিৎ সিং এসে দাঁড়িয়েছে। তার হাতে ফায়ারআর্মস্। মাত্র কয়েকটি সেকেন্ড। সে অবধূতের দিকে নয়, আমার দিকেই ফায়ারআর্মসের নল তাক করেছে। এক লাফে সরে গেলাম। গুলি গিয়ে লাগল দেয়ালে।

তারপর দেখলাম হালদারমশাই তার ওপর ঝাঁপ দিয়েছেন। ইন্দরজিৎ ধরাশায়ী হল। তার হাতের অস্ত্র ছিটকে পড়ল চৌকাঠের এধারে। অবধূত পাথরের মূর্তির মতো তখনও বসে আছেন। অস্ত্রটা কুড়িয়ে নিয়ে দরজার কাছে গেলাম। ইন্দরজিতের পিঠে বসে হাত দুটো মোচড় দিলেন হালদারমশাই। “হালার পো হালা! ঘুঘু দ্যাখছে, ফান্ দ্যাখে নাই।”

বেরিয়ে গিয়ে একটানে ইন্দরজিৎ সিংয়ের পাগড়ি খুলে ফেললাম। বললাম, “বৈশম্পায়ন রায়কে ছেড়ে দিন, হালদারমশাই!”

হালদারমশাই পিঠ থেকে নেমে তার জামার কলার ধরে ওঠালেন। কৃপাণটা খুলে নিতে ভুললেন না। “কী আশ্চইর্য!” বলে তার মুখের দিকে তাকালেন হালদারমশাই।

ততক্ষণে কয়েকজন সাধু এবং পুলিশ দৌড়ে এসেছে। বাজি-পটকার শব্দ এই আশ্রমে নেই। তাই গুলির শব্দ শোনা স্বাভাবিক। একজন পুলিশ অফিসারও দৌড়ে এলেন। বললাম, “এই ভদ্রলোকের নাম বৈশম্পায়ন রায়। একে অ্যারেস্ট করুন। এস পি সায়েবকে ফোনে বলে রেখেছি। ইনি দুটো মার্ডার করেছেন। আর একটা মার্ডারের অ্যাটে করেছেন।”

পুলিশ ঘিরে ফেলল বৈশম্পায়ন রায়কে। একটু পরে খবর পেয়ে এস পি বরেন্দ্র সোম এসে পড়লেন। চারদিকে উত্তেজনা। ভিড় হটাতে পুলিশকে মৃদু লাঠি চার্জও করতে হল।

হালদারমশাই বললেন, “জয়ন্তবাবু খাড়াইয়া আছেন। যাই গিয়া–”

 বললাম, “চলুন, আমিও যাচ্ছি।”

জয়ন্ত ভিড় ঠেলে এগিয়ে আসছিল। পুলিশ তাকে বাধা দিচ্ছিল। আমি গিয়ে বললাম, “চলো জয়ন্ত! হোটেলে ফেরা যাক।”

জয়ন্ত উত্তেজিতভাবে বলল, “কে একজন পাঞ্জাবি এক্সট্রিমিস্টি নাকি অবধূতজিকে গুলি করেছে?”

হাসতে হাসতে বললাম, “না ডার্লিং! এক্সট্রিমিস্ট বা টেররিস্ট নয়। নেহাত এক ভেতো বাঙালি। অবধূতজিকে সে গুলি করেনি। ওত পেতে আমাদের কথা শুনছিল ঝোঁপের আড়ালে।”

হালদারমশাই বললেন, “আমি জয়ন্তবাবুর কথায় হালারে ফলো করছিলাম। সময়মতো না ধরলে কর্নেলস্যারের বডি পড়ে যেত।”

জয়ন্ত চমকে উঠল। “সর্বনাশ! কে লোকটা?”

বললাম, “বৈশম্পায়ন রায়।”

 “আঁ?”

“হ্যাঁ।” ওর কাঁধে হাত রেখে বললাম, “গোড়া থেকেই তার প্রতি আমার সন্দেহ ছিল। আমাকে দিয়ে সে বুঝে নিতে চেয়েছিল, অনামিকা সেনকে খুন। করার মোডাস অপারেন্ডিতে কোনও ত্রুটি আছে কি না, যা তাকে ধরিয়ে দেবে। দৈবাৎ সমীর রুদ্রের মুখোমুখি না হলে সে আমার কাছে আসত না। আসার পরে সে সমীরকে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করেছে। তার প্রথম টার্গেট ছিল প্রশান্ত সান্যাল। তাই সে একই বাড়িতে ছদ্মনামে ছদ্মবেশে ফ্ল্যাট কিনেছিল। তার পক্ষে শিখ সাজা সোজা। মুখে দাড়ি তো আছেই। তবে ভি রায়ের ওপর আমার প্রথমদিনই সন্দেহ হওয়ার কারণ টেলিফোন ডাইরেক্টরি।”

জয়ন্ত বলল, “হ্যাঁ। বলছিলেন বটে।”

 “চলো। হোটেলে ফিরে কফি খেতে খেতে, বলব।”

হোটেলে ফিরে ব্যালকনিতে বসলাম। সারা কাঁটালিয়াঘাটে কোলাহল। মাইক্রোফোন। বাজি-পটকার আলো ও শব্দ। এই তুমুল কোলাহলের আড়ালে একটা আশ্চর্য নাটক ঘটে গেল।

কফি খেতে খেতে জয়ন্ত মনে করিয়ে দিল–”টেলিফোন ডাইরেক্টরি!”

বললাম, হ্যাঁ। সমীরকে ভি রায়ের নাকি দরকার। অথচ পাচ্ছে না। বিজ্ঞাপন দিতে চাইছে। কেন? টেলিফোন ডাইরেক্টরিতে সমীর রুদ্রের ঠিকানা সে সহজেই পেতে পারত। আজ সকালে মিম্মি আমার ফোন নাম্বার পেল কী করে? কারুর ঠিকানা খুঁজতে হলে–যদি সে মোটামুটি সচ্ছল লোক হয়, টেলিফোন ডাইরেক্টরিই আগে খুঁজবে।”

জয়ন্ত বলল, “বাপস্! মাথা ভোঁ ভোঁ করছে!”

হালদারমশাই হাসলেন। “মাথা ক্লিয়ার করনের জন্য নস্য লন।” বলে নস্যির কৌটো দিলেন। জয়ন্ত নিল না।

বললাম, “প্রশান্তর ওপর দায় চাপানোর জন্য বৈশম্পায়ন কত কৌশল করেছিল। ধুরন্ধর লোক। পয়সাখরচ করে প্লেনের টিকিট কিনেছিল পর্যন্ত। অনামিকা সেনের চিঠি হাতিয়েছিল সমীরের কাছে। সম্ভবত যে রাতে সমীরকে খুন করে, সেই রাতেই। কনফেস করলে জানা যাবে। আশ্চর্য ক্ষুরধার বুদ্ধি ভদ্রলোকের! জনি ওয়াকার মদের বোতল সাজিয়ে রাখা থেকে শুরু করে সবটাই রেড হেরিং সাজানো। সমীরের মায়ের সঙ্গে কসবা গিয়ে ফ্ল্যাট থেকে সমীরের হ্যান্ডব্যাগ চুরি! সেই হ্যান্ডব্যাগে অনির চিঠি প্ল্যান্টেড! এমন কি ফোন করে আমাকে তার তৈরি রেড হেরিংয়ের দিকে ছোটাতেও চেয়েছিল। স্বীকার করছি, আমি কিছুদূর ছুটেছিলামও বটে। ছ’খানা লাল চিঠির হুমকি তার নিজেরই লেখা। বলতে পারো অপারেশন রেড হেরিং। সমীর রুদ্রকে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করে সে আমার কাছে এসেছিল। অরিজিতের কাছেও গিয়েছিল।”

জয়ন্ত বলল, “তা হলে সমীরের সঙ্গে দৈবাৎ দেখা না হলে সে তাকে খুন করত না বলছেন?”

“করত না, যদি সমীর তাকে চিনতে না পারত। সমীর তার অনিকে খুনের প্রত্যক্ষদর্শী।”

“অনিকে খুনের মোটিভ কী?”

 “প্রতিহিংসা চরিতার্থ। মুখে যাই বলুক, বাসু অনির প্রেমে পড়েছিল।”

 হালদারমশাই অদ্ভুত শব্দে হাসলেন। “প্রাম-সরি! প্রেম কী ডেঞ্জারাস!”

“হ্যাঁ হালদারমশাই! প্রেম বড্ড ডেঞ্জারাস। তবে সত্যিকার প্রেম, খাঁটি প্রেম কোটিকে গুটিক দেখা যায়। এক্ষেত্রে প্রেম এবং প্রাম দুই-ই মিলেমিশে আছে।”

জয়ন্ত বলল, “বোগাস!”

“ডার্লিং! বৈশম্পায়নের মধ্যে খুনের ইচ্ছে জাগানোর প্রধান ফ্যাক্টর প্রশান্ত। সে সচ্ছল পরিবারের ছেলে। সে অনিকে পেয়েছে। এতে তার মতো নিম্নবিত্ত ঘরের ছেলের আঁতে প্রচণ্ড লেগেছিল। মানুষের মন ছকে ফেলে বিচার করা যায় না। অনিকে খুন করার পর সে প্রশান্তকে টার্গেট করেছিল। সুযোগ পাচ্ছিল না। গত ২৩ সেপ্টেম্বর প্রশান্ত হোটেলে উঠেছিল। তাই সে সুযোগ পায়নি। আমি গতরাতে ওয়াশিংটনে ট্রাঙ্ককল করে সব জেনেছি ওর কাছে। প্রশান্ত শিগগির এসে পড়ছে।”

হালদারমশাই বললেন, “ভি রায় এত উইপন পাইল কোথায়?”

“বিদেশঘোরা লোক সে। এ দেশে যেসব অস্ত্রপাচারকারী আছে, তাদের সঙ্গে তার ট্রেডিং কনসাল্ট্যান্সি ফার্মের যোগাযোগ থাকা স্বাভাবিক। ফিরে গিয়ে অরিজিৎকে লড়িয়ে দেব। আমার বিশ্বাস, কেঁচো খুঁড়তে এবার সত্যি সাপ বেরুবে।”

জয়ন্ত বলল, “অনির ছবিটা বাসু ইচ্ছে করেই নষ্ট অবস্থায় দিয়েছিল। তাই না?”

চুরুট ধরিয়ে বললাম, “আসলে অরিজিৎ ওকে অনির একটা ছবি দিতে বলেছিল। তাই ছবিটা দেওয়া। কিন্তু সে চায়নি ছবিটা আমি কাজে লাগাই। জয়ন্ত, ওর কালো অ্যাম্বাসাডার সারাক্ষণ আমাকে ফলো করেছে। সুমিতবাবুর বাড়ি পর্যন্ত। ফলো করেছিল। সেদিন অতটা নজর দিইনি। পরে দিতে বাধ্য হয়েছিলাম। যাই হোক, আর এসব কথা নয়।”

বলে গঙ্গাদর্শনের জন্য উঠে দাঁড়ালাম। গঙ্গায় আলো পড়ে ঝলমল করছে; বড় রহস্যময়ী এই নদী। অনামিকা সেনের মতো গভীরগোপন রহস্যে পূর্ণ। এ মুহূর্তে গঙ্গার মধ্যে কেন যেন তাকেই দেখতে পেলাম। মন খারাপ হয়ে গেল ….

.

বৈশম্পায়ন রায়

 কে?

আমি অনি।

 কেন এলে?

 তুমি কী সুখে আছ দেখতে এলাম।

আমি সুখেই আছি অনি! কারণ আমি এবার মরতে পারব। নিজে নিজেকে মেরে ফেলতে কষ্ট হত। জীবনের বড় মায়া। এখন আমাকে মেরে ফেলা হবে। সেই মৃত্যুর কোনও বাধা নেই আর। হাইকোর্ট আমার মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছে। না দিলে এ জীবন খুব কষ্টকর হত।

বাসুদা!

 বলো!

আমাকে কেন তুমি গুলি করে মেরেছিলে? আমি তো সমীরদার ডাকে আশ্রম ছেড়ে বাইরে যাইনি। তুমি ডেকেছ বলে গিয়েছিলাম। তুমি আমার কথা শোনার আগেই

চুপ করো অনি!

না। বলো!

আমি কুৎসিত সন্দেহ করেছিলাম। ভেবেছিলাম, তুমি তোমার মামার সাধনসঙ্গিনী!

ছিঃ বাসুদা! তুমি এত নীচ!

 হয়তো প্রেম মানুষকে এত নীচমনা করে।

 প্রেম নয়, কুৎসিত কামনা।

 তবে তা-ই। তুমি চলে যাও অনি! আমাকে সুখে মরতে দাও…