হারানো সুর – ১২

বারো

‘রহস্য নিয়ে মাথা ঘামাতে আমার ভাল্লাগছে না,’ বলল মুসা। ‘কাল ছোটদের অর্কেস্ট্রার অডিশন। তারচেয়ে বাসায় গিয়ে প্র্যাকটিস করি।’

‘চলো, আমরাও যাই,’ প্রস্তাব করল নথি। ‘তুমি বাজাবে আমরা শুনব।’

হেক্টরের কামরা থেকে দল বেঁধে বেরিয়ে এলিভেটরে চাপল ওরা।

হোটেলের বাইরে, বাস ছাড়ার একটু আগে স্টপেজে পৌঁছল। বাসে বসার পরে ডন বলল, ‘মুসাভাইয়ের বাজনা শোনার বুদ্ধিটা ভাল।’ এবার অন্যদের দিকে চেয়ে বলল, ‘কেন, জান?’

‘ভাল বাজনা শুনলে মানুষের মাথা খোলে,’ বলল কিশোর। ‘সিম্ফনির বাজনা শোনার সময় তোমার মাথায় যেমন ভুয়া চিরকুটগুলোর ব্যাপারে আইডিয়া এসেছিল।’

‘ঠিক তাই,’ বলল ডন।

কিন্তু এবার আর এল না। মুসা যখন বাজাচ্ছে, ও আর অন্যরা লিভিংরুমে গোল হয়ে বসল। একটু পরেই মাথা থেকে সব চিন্তা দূর হয়ে গেল ডনের। আর সবারও। মুসার বাজনায় মুগ্ধ ওরা সবাই। রীতিমত গর্ব অনুভব করছে ওর জন্য।

‘এখন বাজাব ‘সং অভ দ্য উইণ্ড’,’ বলল মুসা।

নোটগুলো একের পর এক এল, আলাদা, স্পষ্ট এবং তারপরও সব মিলেমিশে একাকার-স্বছন্দে, অবাধে বয়ে চলা নদীর বুকে ফোঁটায়-ফোঁটায় ঝরে পড়া জলবিন্দুর মতন।

মুসা ওদের সব কটা পছন্দের বাজনা বাজিয়ে শোনাল, এমনকী ‘টুইঙ্কল, টুইঙ্কল, লিট্ল স্টার’ পর্যন্ত।

ওর বাজানো শেষ হলে রবিন বলল, ‘অডিশনে কী বাজাবে, মুসা?’

‘এখনও জানি না,’ বলল ও। ‘সিম্ফনিকে জিজ্ঞেস করব ভাবছি।’

ডিনারের পর, ডন আর সু কির ঘরে তৈরি বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে জ্যাক নানাকে অর্কেস্ট্রা শোনাল ছেলে-মেয়েরা। উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলেন তিনি। তারপর মুসাকে বাজাতে বললেন। বিকেলের চাইতেও ভাল বাজাল এবার মুসা।

‘বাহ, এভাবে বাজাতে পারলে ছোটদের অর্কেস্ট্রায় ঠিকই জায়গা করে নিতে পারবে তুমি,’ জ্যাক নানা বললেন।

‘তারপর আমরা সেলিব্রেট করব,’ বলল ডন। মাথা ঝাঁকিয়ে সায় জানালেন জ্যাক নানা।

‘নিশ্চয়ই। কাল সন্ধেয় আমার সাথে হোটেলে দেখা কোরো, আমরা একসাথে ডাইনিং রুমে ডিনার করব।’

‘খাইছে, কিন্তু আমি যদি বাছাইয়ে বাদ পড়ি?’ মুসা জিজ্ঞেস করল।

‘পড়বে না,’ জোর গলায় বলল সু কি।

মুসা কথাটা বিশ্বাস করতে চায়, কিন্তু সন্দেহ যাচ্ছে না মন থেকে। কঠিন প্রতিযোগিতা হবে। ও বিছানায় গেল যথাসাধ্য চেষ্টা করবে এই সঙ্কল্প নিয়ে।

‘তারপর যা হয় হবে,’ নিজেকে বলল।

পরদিন সকালে, ওরা সিভিক সেন্টারে গিয়ে দেখে অডিটোরিয়াম প্রায় কানায় কানায় ভর্তি এবং সবার মধ্যে তুমুল উত্তেজনা।

সিম্ফনি সবার মনোযোগ চাইলেন।

‘যন্ত্রশিল্পীরা সবাই সামনের সারিতে চলে এসো, নির্দেশ দিলেন।

সবার শুভেচ্ছা নিয়ে আইল ধরে দ্রুত এগিয়ে গেল মুসা।

সমবেত বাজিয়েদের বিভিন্ন যন্ত্র অনুসারে ভাগ করলেন সিম্ফনি। প্রথমে বেহালার পালা।

মুসা তৃতীয়। মঞ্চে, সাবধানে কেস থেকে বেহালা বের করল ও। ওটাকে যথাস্থানে ঠেকিয়ে তারের ওপর ছড় বোলাল সুর ঠিক আছে কিনা নিশ্চিত হওয়ার জন্য। তারপর আবারও ঠিকঠাক করে নিল। এবার গভীর শ্বাস টেনে সিম্ফনির তালিকা থেকে বাছাই করা পিসগুলো বাজাল।

প্রথম কটা নোটের পর শরীরে ঢিল পড়ল কিশোর, রবিন, ডন আর সু কির। মুসা ভাল বাজাচ্ছে নিঃসন্দেহে এবং ক্রমেই আরও উন্নতি করছে।

দুপুরে, রিসেপশন হল-এ অর্কেস্ট্রার জন্য মনোনীত শিল্পীদের তালিকা সাঁটা হলো। বুলেটিন বোর্ড ঘিরে মানুষজনের ভিড়, দেখে কার সাধ্য। খুদে ডন ফাঁক গলে সামনে গিয়ে, পায়ের পাতায় ভর দিয়ে তালিকাটা পড়ল। বেহালা শাখার শুরুর দিকেই রয়েছে মুসার নাম।

‘হুররে!’ চিৎকার ছেড়ে, ভিড় ঠেলে ফিরে এল ডন। ‘মুসাভাই, তুমি আছ!’ বলে, জড়িয়ে ধরল ওকে।

একটু পরে, মুসা ছুটল জ্যাক নানাকে ফোন করতে। অন্যরা অপেক্ষা করছে ওর জন্য, কিশোর এক ছাপা কনসার্ট শিডিউল তুলে নিল।

‘ছোটদের রিহার্সাল কখন?’ রবিন জানতে চাইল।

‘কাল সকালে। আর কনসার্ট শনিবার বিকেলে।’

‘আর আসল অর্কেস্ট্রা?’ ডনের প্রশ্ন। ‘তারা কখন বাজাবে?’

‘শুক্রবার রাতে।’

‘তারমানে কালকে!’ বলে উঠল সু কি।

দীর্ঘশ্বাস পড়ল ডনের।

‘সময় খুব কম।’

সবাই জানে ও রহস্যটা সমাধানের কথাই বোঝাচ্ছে। তিন গোয়েন্দা কি কনসার্টের আগে হারানো স্বরগ্রামটা খুঁজে বের করতে পারবে, ডিসপ্লে দেয়ার জন্য?