দুঃস্বপ্নভূমি – ৩০

ত্রিশ

পায়ের পাতা আলতোভাবে মাটি স্পর্শ করল আমার।

গরম বাতাস পরশ বোলাল মুখে। ঝিমঝিম করছে মাথা। দেহ দুলছে। দাঁড়িয়ে থাকা বড্ড কঠিন কাজ মনে হচ্ছে।

প্রবল বাতাসের বেগটা নেই, তবে এখনও গায়ের চামড়ায় অনুভূতিটা রয়ে গেছে।

বুক ভরে দম নিয়ে ধরে রাখলাম। চাইলাম চারপাশে। ওই যে, কিশোর।

‘মুসা? কোথায় তুমি? ঠিক আছ তো?’

‘ম-মনে হয়।’ আমার একটু পেছনে দাঁড়িয়ে ও, ঘূর্ণিবায়ুর ভয়াল অভিজ্ঞতা রীতিমত কাঁপিয়ে দিয়েছে ওকে। ‘খাইছে, কোথায় আমরা?’

পাঁই করে ঘুরলাম। এবং ডেমি মুরকে দেখলাম। ছায়া নয়। ও আর রয় চেয়ে রয়েছে পরস্পরের দিকে, প্রথমটায় মুখের চেহারা আতঙ্কিত দেখালেও পরে স্বস্তির হাসি ফুটল।

‘হুররে!’ চিৎকার ছাড়ল ডেমি।

‘ফিরে এসেছি!’ চেঁচাল রয়।

ইমন মুখের সামনে দু’হাত মেলে ধরল।

‘হাত দেখতে পাচ্ছি! আমি আর অদৃশ্য নই! ইয়াহু!’

জেরির ঘাড়ে ওর নিজের মাথাটা দেখামাত্রই হৈ-হৈ করে উঠলাম সবাই। অ্যাণ্ডিনা আর নেলীর কাঁপাকাঁপি থেমেছে। এবং রায়ানের এখন একটাই মাত্র মুখ।

‘আমরা আগের মত স্বাভাবিক! আমরা ফিরে এসেছি!’

আমরা এক পার্কিং লটে দাঁড়িয়ে রয়েছি, ব্যাপারটা উপলব্ধি করার আগেই উদ্যাপন শুরু করলাম। সবুজ-বেগুনী এন্ট্রান্স সাইনটা দেখতে পাচ্ছি, আমাদের কাছ থেকে কয়েক সারি দূরে।

‘এটা হররল্যাণ্ড!’ চিৎকার ছাড়ল কিশোর, বাতাসে মুঠোজোড়া ছুঁড়ল।

হ্যাঁ। আমরা হররল্যাণ্ডের পার্কিং লটে দাঁড়িয়ে। আরও আনন্দ-উল্লাস করতে যাব, তার আগেই আমাদের অভিভাবকরা হাজির হলেন।

গাড়ির সারির কাছ থেকে এদিকেই হেঁটে আসছেন তাঁরা। বাবা হাতঘড়ি দেখলেন।

‘দেরি করে ফেলেছিস,’ বললেন। ‘কোথায় ছিলি তোরা?’

‘তোমরা কোথায় ছিলে?’ হড়বড় করে বলে ফেললাম।

কপাল কুঁচকে গেল মার।

‘ওরা তোদেরকে বলেনি? আমাদের সবাইকে ওরা হোটেলে নিয়ে গিয়েছিল। খুব ভাল সময় কেটেছে। অনেকের সাথে পরিচয় হয়েছে।’

ভ্রূ কোঁচকালেন বাবা।

‘কিন্তু আমরা এখানে এতক্ষণ তোদের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি। বাসায় যেতে হবে না?’

চারধারে চোখ বুলিয়ে পুনর্মিলনী দেখছি। বাবা-মারা ছেলে- মেয়েদেরকে বুকে জড়িয়ে ধরছেন, পিঠ চাপড়ে দিচ্ছেন।

কিশোরের কানে-কানে ফিসফিসিয়ে বললাম, ‘কারও বিন্দুমাত্র ধারণা নেই আমরা কীসের মধ্য দিয়ে গেছি। সবাই কত হাসিখুশি। যদি জানত…..

‘না জানাই ভাল!’ বলল কিশোর। ‘জানলেও তো বিশ্বাস করবে না!’

এক সবুজ বেগুনী হরর এতক্ষণ একপাশে দাঁড়িয়ে আমাদেরকে দেখছিল। মুখে হাসি।

হেঁটে গেলাম ওর কাছে।

‘আপনি ম্যাকনামারা, তাই না?’ জিজ্ঞেস করলাম।

হাসিটা চওড়া হলো ওর।

‘তোমাদের কাছে দানব এক্স!’ জানাল।

‘ধন্যবাদ,’ বললাম। ‘আমাদের সবার তরফ থেকে!

‘চলে এসো তোমরা তিনজন,’ হাঁকলেন বাবা। ‘সামনে লম্বা সফর।’ একটু পরে, আমাদেরকে মৃদু ঠেলা দিয়ে নিয়ে চললেন গাড়ির কাছে।

‘রবিন, তোর চুল এরকম উষ্কখুষ্ক হয়ে আছে কেন রে?’ বলে, মা আমার মাথায় হাত বোলালেন।

‘উম…খুব ফাস্ট একটা রাইডে চড়েছিলাম তো,’ বললাম।

সেরাতে, নিজের বেডরুমে ফিরে কী খুশিটাই না হলাম! কিশোর আর মুসা চলে গেছে যার-যার বাসায়।

কিন্তু আনপ্যাক করার সময়, মাথা থেকে তাড়াতে পারলাম না প্যানিক পার্কের চিন্তা।

সেই ছোট্ট আবছায়া মেয়েটির কথা ভাবলাম, দূরাগত কণ্ঠে বলছে: আমাকে খুঁজে নাও… আমাকে দেখতে পাচ্ছ? দেখতে পাচ্ছ?

সাদা-কালো পৃথিবীটা ভেসে উঠল কল্পনায়…কালো, ফাঁকা বাড়ি…রাইড, দোকান আর রেস্তোরাঁগুলো, সব বন্ধ, সব ধূসর, রঙহীন। অন্য কোন জগতের দৃশ্য যেন।

এবং আবারও দেখতে পেলাম পার্কটা ক্রমেই ছোট হয়ে যাচ্ছে…ছোট, আরও ছোট। এতটাই ক্ষুদ্র-শেষমেশ স্রেফ মিলিয়ে গেল ভোজবাজির মতন।

গোটা একটা পার্ক। আস্ত একটা জগৎ। বুদ্বুদের মত ফেটে শেষ।

হাই উঠল। এতটাই ক্লান্তি ভর করেছে শরীরে, চোখ খোলা রাখা শক্ত।

সুটকেস থেকে জিন্সের প্যান্ট বের করলাম। এখনও ভাঁজ করা। পরার সুযোগ হয়নি।

আরে, এটা কী? শক্ত কী যেন ঠেকল হাতে। বড়সড় কিছু।

সুটকেস দখল করে রেখেছে জিনিসটা।

কটা টি-শার্ট একপাশে সরাতেই চমকে উঠলাম।

‘ওহ, না।’

কেস থেকে বের করলাম ওটাকে। এক ভেন্ট্রিলোকুইস্ট পুতুল।

ওটার রঙ করা চুলে হাত বোলালাম। কাঠের ঠোঁটে কী বিশ্রী হাসি পুতুলটার!

‘এটা আমার সুটকেসে এল কীভাবে?’ বিড়বিড় করে বললাম।

এবার অস্ফুট আর্তনাদ করে উঠলাম, পুতুলটার চোখজোড়া ঝট করে যেই খুলে গেল। ওটার ভয়ঙ্কর হাসিটা আরেকটু ছড়াল।

‘বাহ্, রবিন, বাহ্, ক্ষীণ, কর্কশ স্বরে বলে উঠল। ‘চমৎকার দেখাচ্ছে তোমাকে।’

চোখ পিটপিটিয়ে আমার দিকে চাইল।

‘এরপর নতুন কাহিনী, হ্যাঁ? তুমি তৈরি তো? তখন টের পাবে ভয় কাকে বলে! হাহাহাহাহা!’

***