3 of 4

৪.৪১ আলেকজান্দ্রা শহরের ধনী যুবকের কাহিনী

আলেকজান্দ্রা শহরে একটি যুবক বাস করতো। উত্তরাধিকারী সূত্রে পিতার কাছ থেকে সে প্রচুর ধনরত্ন এবং বিষয় সম্পত্তি লাভ করে। এর মধ্যে ছিলো পর্যাপ্ত জলের সরবরাহযুক্ত অপর্যাপ্ত জমি, অগুনতি পাকা ইমারত ইত্যাদি। শিশুকাল থেকে সে স্নেহ-ভালোবাসার মধ্যে দিয়ে মানুষ হয়, তা সত্ত্বেও পবিত্র ধর্মগ্রন্থে মানুষের যে কটি গুণের কথা বলা হয়েছে তার সব কটিই তার মধ্যে বিদ্যমান ছিলো। ঈশ্বর প্রেরিত মানুষকে সে ভালোবাসতো, প্রয়োজনে মানুষকে সাহায্য করতে পারলে সে আর কিছু চাইতো না।

এই বিপুল ধনসম্পত্তি পেয়ে যুবকটি চিন্তায় পড়ে গেলো, কেমন করে এই বিষয় সম্পত্তি সবচেয়ে সুন্দরভাবে কাজে লাগানো যায়! অবশেষে সে স্থির করলো, একজন সত্যকার জ্ঞানী লোকের পরামর্শ নেবে। জানাশোনার মধ্যে তার পিতার এক শেখ বন্ধু ছিলেন, যুবকটি তার কাছেই যাবে বলে মনস্থ করলো।

যুবকটি শেখের কাছে তার বক্তব্য পেশ করে। শেখ ঘণ্টাখানেক গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে থাকেন, তারপর তিনি বলতে শুরু করলেন,-আবদূর রহমানের পুত্র! আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুন। শোনো, ধনরত্ন দুঃখীদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া নিঃসন্দেহে পুণ্যকর্ম, আল্লাহ এতে খুশী হন। কিন্তু একাজ তো যে-কোন ব্যক্তিই করতে পারে! নিজের প্রয়োজনের অতিরিক্ত ধনসম্পত্তি অন্যকে বিলিয়ে দিতে গেলে মস্ত বড় গুণের অধিকারী হতে হয় না, এ অত্যন্ত স্বাভাবিক কাজ। দান আরো এক রকমের আছে, সে হলো নিজের বুদ্ধি শক্তি, নিজের জ্ঞান অন্যকে বিতরণ। পৃথিবীতে যারা চির অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে আছে তাদের যে আলোর পথ দেখাতে পারে সেই আমার মতে সবচেয়ে পুণ্যবান ব্যক্তি। আর মনে রেখো, একমাত্র সত্যিকার জ্ঞানী ব্যক্তিই এই পুণ্যের অধিকারী। প্রকৃত জ্ঞান আহরণ করতে হলে গভীরভাবে অধ্যয়ন করতে হয়, গভীর ধ্যানে নিজেকে নিমজ্জিত রাখতে হয়। বৎস! সম্পদে নয়, তুমি তোমার মনকে সত্যকার ধনী করে তোলো, তুমি একজন দানবীর হয়ে ওঠ, মানুষকে আলোর পথ দেখাও, এই আমি চাই। আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, এর চেয়ে ভালো পরামর্শ আমি তোমায় দিতে পারবো না।

ধনী যুবকটি আরো ব্যাখ্যা জানতে চাইবার ইচ্ছা করলো কিন্তু শেখকে দেখে তার মনে হয় শেখ আর কিছু বলতে রাজী নন। অগত্যা সে ফিরে আসে। শেখের সুপরামর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সে একদিন বই-এর বাজারে খোঁজ করতে গেলো। সমস্ত পুস্তক বিক্রেতাকে সে একত্রিত করে, (এদের মধ্যে কিছু কিছু সত্যকার দুর্লভ বই ছিলো, এগুলি সেই বিশেষ লাইব্রেরীর বই যেগুলি খৃষ্টানরা পুড়িয়ে ফেলে, যখন আমর বিন অল অস আলেকজান্দ্রিয়া শহরে প্রবেশ করেন।) এবং তাদের কাছে যত দ্রুত দুষ্প্রাপ্য-মূল্যবান গ্রন্থ ছিলো সবগুলিকে তার গৃহে পৌঁছে দিতে অনুরোধ জানায়। পুস্তক ব্যবসায়ীরা বই নিয়ে এলে সে সকলকে প্রকৃত মূল্য দিয়ে খুশী করে। কিন্তু মাত্র এই কটিতে তার অনুসন্ধিৎসা পূর্ণ হলো না, সে তখন কায়রো, দামাস্কাস, বাগদাদ, পারস্য, মরক্কো এবং হিন্দুস্তানে দূত প্রেরণ করলো, এমন কি খ্রিস্টানদের দেশেও সে লোক পাঠাতে ভোলে না। প্রত্যেককে সে নির্দেশ দিয়ে দিলো যে, যে কোন মূল্যে সত্যিকার কোনো সুগ্রন্থ তারা যেন ছেড়ে

আসে। দূতরা একে একে বই-এর বোঝা সাথে নিয়ে ফিরে আসে। যুবকটি প্রতিটি গ্রন্থ সযত্নে সাজিয়ে রাখে একটি প্রকাণ্ড গম্বুজের অভ্যন্তরে। গম্বুজের প্রধান ফটকের মাথায় সে নীল আর সোনালী অক্ষরে সুন্দর করে লিখে দেয়—গ্রন্থ-গম্বুজ!

ভোর হয়ে আসে, শাহরাজাদ গল্প থামিয়ে চুপ করে বসে থাকলো।

 

নয়শত বাহাত্তরতম রজনী :

সে আবার বলতে শুরু করে :

যুবকটি যত্ন ও মনোেযোগ সহকারে বই-পাঠে মনোনিবেশ করে। সুন্দর স্মৃতিশক্তি থাকায় সে সহজেই জ্ঞান আহরণ করতে থাকে। অল্প কিছুদিনেই সে সমসাময়িক যে-কোন মহাজ্ঞানী ব্যক্তিকে আপন মেধায় অতিক্রম করে যায়। সমৃদ্ধ চিন্তাশক্তি অন্যের সাথে সমানভাগে ভাগ করে নেবার জন্য সে তার বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, ক্রীতদাস, অতিথি সকলকে আমন্ত্রণ করতে থাকে তার গ্রন্থ-গম্বুজে। ভিক্ষুকরা তার দরজায় সমাগত হলে, সে সকলকে প্রথমে পানাহারে তৃপ্ত করে তুলতো, তারপর তাদের মধ্যে উপস্থিত হয়ে বলতে শুরু করতো—আমার প্রিয় মেহেমান, এসো আজ রাতে শুধুমাত্র নাচগানে মন না দিয়ে আমরা কিছু জ্ঞান আহরণ করি! একজন সুধী ব্যক্তি বলে গেছেন? তোমার জ্ঞানের বাণী বিতরণ করে সকলের কানকে তৃপ্ত কর। যে সত্যিকার জ্ঞানকে আহরণ করতে পারে সেই প্রকৃত ধনী। ঈশ্বরকে যে খুশী করতে চায়, তাকে সত্যিকার জ্ঞানী হয়ে উঠতেই হবে, কারণ তার বাণীই সকল জ্ঞানের উৎস।কিন্তু দুঃখের কথা তার খুব কম সন্তানই এই সত্যকে সম্যক উপলব্ধি করতে পেরেছে।

এছাড়া আল্লাহ তার পয়গম্বর বা দেবদূতদের মুখ দিয়ে অনেকবার বলেছেন যে,—সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ তোমার যে বস্তু, দান করলে তাই দান কর। দান করে কখনও গর্ব বোধ করো, কারণ একজন দাম্ভিক দাতা একটি পাথরের পাহাড়ের মতো, যে পাথরের ওপর মাটির আবরণ খুবই সামান্য। যখন বৃষ্টি হয় তখন খুব সহজেই তার মাটির আবরণ ধুয়ে মুছে যায়, পড়ে থাকে শুধুমাত্র নিঃসার পাথরের টুকরো। এই সমস্ত লোক দান করে কোনই পূণ্য সঞ্চয় করতে পারে না। কিন্তু যারা নিজেদের আত্মাকে তৃপ্ত করার জন্য দান করে থাকে তারাই সত্যকার দাতা। তাদের জ্ঞানে পাহাড়ে প্রতিটি দান যেন এক একটি বৃক্ষ রোপণের মত। যখন বৃষ্টি হয় প্রতিটি বৃক্ষ ধীরে ধীরে সঞ্জীবিত হয়ে ওঠে, ফুলে ফলে সমৃদ্ধ হয়ে উঠতে থাকে। একমাত্র এরাই আমার স্বর্গোদ্যানে প্রবেশের রাস্তা খুঁজে পায়।

এইজন্য আজ আমি তোমাদের এখানে ডেকে এনেছি। এতদিন আমি যা কিছু শিখেছি, তা আমি নিজের মধ্যে বন্ধ করে রাখতে চাই না, তোমাদের সবার সাথে আমি তা সমান ভাগে ভাগ করে নিতে চাই। কতটুকু আমার জ্ঞান এতে শুধু তারই পরীক্ষা হবে, আর কিছু নয়।

এসো বন্ধুগণ, আজ আমরা ইতিহাস উদ্যানের মধ্য দিয়ে একটুখানি বাইরের দিকে চেয়ে দেখবো। অতীতের সুন্দর সমৃদ্ধশালী দিনগুলি আমাদের চোখের সামনে দিয়ে হেঁটে চলে যাবে, আমাদের আত্মাকে সঞ্জীবিত করে নিয়ে যাবে তাদের মধুর রসে। আমাদের সেই জ্যোতির্ময় আলোর পথে পা পা করে এগিয়ে যেতে পারবো। আমেন।

সমগ্র অতিথিবৃন্দ তাদের হাত তুলে জবাব দেয়, আমেন। যুবকটি নিঃশব্দে বসে পড়ে, কিছুক্ষণ সুগভীর চিন্তার পর সে আবার বলতে শুরু করে।

-বন্ধুগণ, কি ভাবে বলতে শুরু করবো জানি না। সেই মহান বীরত্বপূর্ণ যুগে আমাদের পিতা-প্রপিতামহরা কেমন জীবন যাপন করতেন আমি তারই দু’একটা নমুনা তুলে ধরতে চাই তোমাদের সামনে। তারা ছিলেন তাঁদের মাটি মায়ের সুযোগ্য আরব-সঙন! কত শক্তিশালী কবি ছিলেন তখন, যারা না জানতেন লিখতে, না জানতেন পড়তে। অদম্য প্রেরণাই ছিলো তাদের একমাত্র সম্পদ। তাদের না ছিলো কালি, না ছিলো ছিলো কলম, না ছিলো সমঝদার শ্রোতা, অথচ তারাই দিনে দিনে গড়ে দিয়ে গেছেন আমাদের এই আরব-ভাষা, যে ভাষা আল্লাহ নিজে বেছে নিয়েছেন। পয়গম্বরের বাণী পাঠাতে তিনি তো এই ভাষাই ব্যবহার করেন! আমেন।

অতিথি সমবেত স্বরে হাত তুলে জবাব দেয়, আমেন।

যুবকটি তখন বলে, সেই মহান বীরত্বপূর্ণ যুগের সহস্র গল্পের মধ্যে একটি গল্প আমি আজ তোমাদের বলছি।

যুবকটি গুছিয়ে বসে গল্প শুরু করে।

কবি দরাইদ বিন সিমাহ ছিলেন বানী জুশাম উপজাতির একজন শেখ। সেই মহান বীরত্বপূর্ণ যুগের প্রথম আমলের লোক ছিলেন তিনি। যোদ্ধা হিসেবে তার যত সুনাম ছিলো, কবি হিসাবে তার যশ ছিলো ততোধিক। অগুনতি তাঁবুর মালিক ছিলেন তিনি। তাছাড়া তার ছিলো প্রচুর তৃণাচ্ছাদিত জমি ও গৃহপালিত পশুর পাল।

বানী-ফিরাস উপজাতির সাথে তাদের চির অসন্তোষ লেগেই ছিলো। রাবিয়াহ মরুভূমিতে অমন নামজাদা যোদ্ধা আর জন্মায়নি। একদা দরাইদ সেই বাণী-ফিরাসদের আক্রমণ করবেন স্থির করলেন। বাছা বাছা কিছু যোদ্ধা বেছে নিয়ে তিনি যাত্রা শুরু করলেন। যেতে যেতে তারা একটা উপত্যকায় এসে পৌঁছলেন, এটি ছিলো তাদের শত্রুপক্ষের দখলে। হঠাৎ দূর দিগন্তে তার চোখে পড়লো একটি লোক পায়ে হেঁটে এগিয়ে যাচ্ছেন, তার পিছনে একটি উট, উটে চেপে বসে আছে একটি মহিলা। দরাইদ তার একজনকে ডেকে বললেন,—ঐ লোকটিকে আক্রমণ কর।

ঘোড়সোয়ার যোদ্ধাটি ঘোড়া ছুটিয়ে এগিয়ে যায়। লোকটির কাছাকাছি পৌঁছতে চিৎকার করে ওঠে,বাঁচতে চাও তো মেয়েটিকে ফেলে এখনই পালাও। তিনবার সাবধান বাণী উচ্চারণ করে যোদ্ধাটি। বিজ্ঞ লোকটি তাতে কর্ণপাত করে না, শান্ত পদক্ষেপে হেঁটে যেতে থাকে। যোদ্ধাটি খুব কাছাকাছি এসে পড়তেই তিনি উটটিকে থামিয়ে একটি সুমধুর গান ধরলেন–

চলরে ছুটে ঘোড়সোয়ার
চিত্ত রেখে ভাবনাহীন।
প্রশান্ত দিন সামনে তোমার
গর্ব তোমার আকাশে লীন।
দেখাই যখন হলো মাঝে
বন্ধু এমন অকস্মাৎ
তলোয়ার কেন খাপে ঢাকা থাকে
যুদ্ধ হোক না আজ একহাত!

বলতে বলতে চকিতে তিনি বর্শা চালান, মুহূর্তে দরাইদের সেই যোদ্ধার মৃতদেহ ধুলায় লুটিয়ে পড়ে। চালকহীন ঘোড়ায় তিনি তখন চেপে বসেন। মহিলাটির প্রতি ঈষৎ কুর্ণিশ করে তিনি আবার এগিয়ে যেতে থাকেন, পিছনে পিছনে অনুসরণ করতে থাকে উটটি। লোকটির মধ্যে বিন্দুমাত্র চাঞ্চল্য দেখা যায় না।

ইতিমধ্যে ভোর হয়ে আসে, গল্প থামিয়ে শাহরাজাদীও চুপ করে বসে থাকে।

 

নয়শত তিয়াত্তরতম রজনী :

আবার সে বলতে শুরু করে : দরাইদ যখন দেখতে পেলেন তাঁর যোদ্ধাটি আর ফিরে এলো না, তখন তিনি আরো একজনকে পাঠালেন। দ্বিতীয় যোদ্ধাটি ঘোড়া চালিয়ে ছুটতে ছুটতে দেখতে পায় তার বন্ধুর মৃতদেহ মাটিতে পড়ে আছে, তখন সে সেই খুনী লোকটিকে ধাওয়া করে। প্রথম যোদ্ধার মত সেই একই সাবধানবাণী উচ্চারণ করে তিনবার, কিন্তু লোকটি কিছুতেই কর্ণপাত করেন না, শান্তভাবে তাঁর নতুন পাওয়া ঘোড়ায় চেপে এগিয়ে যেতে থাকেন। কাছাকাছি আসতেই তিনি উটটিকে থামিয়ে দেন এবং এই গানটি গাইতে গাইতে ঘোড়া চালিয়ে যোদ্ধাটির দিকে ছুটে আসেন।

নিয়তি যখন এই পথে আজ
পাঠাল তোমায় বন্ধু মোর
সত্য কথাটি জেনে যাও শুধু
যেমন সত্য এ মরুভূমি ধু-ধু
রবিয়াহর হাতে বর্ষা যখন
হেসে ওঠে তাতে অনেক জোর!

রবিয়াহর বর্শা আবার চকিতে ঝলসে ওঠে, দ্বিতীয় যোদ্ধার মৃতদেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে মুহূর্ত মধ্যে, আত্মরক্ষার কোন সুযোগই সে পায় না। রবিয়াহ বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না, শান্তভাবে ঘোড়া চালিয়ে এগিয়ে যেতে থাকলেন।

দ্বিতীয় যোদ্ধাটিও যখন ফিরে এলো না দরাইদ তখন চিন্তায় পড়ে গেলেন। তৃতীয় এক যোদ্ধাকে তিনি তখন পাঠিয়ে দিয়ে অপেক্ষা করতে থাকলেন। এই লোকটিও কিছুদূর গিয়ে তার বন্ধুদের মৃতদেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে থাকতে দেখতে পেলো। মৃতদেহ দুটি ডিঙিয়ে সে এগিয়ে যায়, দেখতে পায় উটে চেপে একটি মহিলা চলেছেন, তার সামনে ঘোড়ায় চেপে একটি পুরুষ, তার হাতে তাচ্ছিল্যের সাথে ধরা রয়েছে একটি বর্শা।

শয়তান কুকুর, তোর যোগ্য শাস্তি এবার নে। যোদ্ধাটি চিৎকার করে তার দিকে ছুটে আসতে থাকে। রবিয়াহ্ বিচলিত হন না, উটটি থামিয়ে বিদ্যুৎ বেগে ঘুরে দাঁড়ান, মুখে তার এখনও গান :

ফিরে দেখ ভাই সাথিরা তোমার
ধূলায় লুটায় শকুনীর আশে
শিক্ষা যখন হলো না তোমার
ঠাঁই হোক তব সাথিদেরই পাশে!

দরাইদের তৃতীয় যোদ্ধার বুক তিনি বার বার বিদ্ধ করে দিতে থাকেন, তাঁর আক্রমণের আকস্মিকতায় তৃতীয় যোদ্ধাও হাত তোলার অবসর পায় না। কিন্তু এই বারবার আক্রমণে রবিয়াহর বর্শাটি ভেঙে যায়। তিনি বুঝতে পারেন যে, তাঁর নিজস্ব উপজাতির তাঁবু খুব কাছেই এসে পড়েছে। একটুও বিচলিত না হয়ে তিনি তাই এগিয়ে চললেন, মৃত শত্রুর অস্ত্রটি খুলে নেবার কথা তিনি চিন্তাও করলেন না।

দরাইদ যখন দেখতে পেলেন তার কোন যোদ্ধাই ফিরে এলো না, তখন তিনি নিজেই এগিয়ে গেলেন। কিছুদূর গিয়ে তিনি দেখতে পেলেন পর পর তিনজন যোদ্ধার মৃতদেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আছে। দরাইদ তার সাথীদের মৃত্যুতে গভীর দুঃখ প্রকাশ করতে লাগলেন। এদিকে রবিয়াহ ততক্ষণে একটি টিলার আড়ালে চলে গেছিলেন, তিনি আড়াল থেকেই জুশাম-কবিকে চিনতে পারলেন। বাণী-ফিরাসের শেখের তখন হাত কামড়াতে ইচ্ছা হচ্ছিল, কেন তিনি তার মৃত শত্রুর দেহ থেকে অস্ত্রটি খুলে নিলেন না! কিন্তু তিনি ভয় পেলেন না, বর্শার কাঠের হাতলটি হাতে নিয়েই তিনি দরাইদের মুখোমুখি হবার জন্য প্রস্তুত হলেন।

দরাইদ যখন দেখতে পেলেন রবিয়াহ নিরস্ত্র, তখন তার শত আক্রোশ সত্ত্বেও তাকে আক্রমণ করতে পারলেন না। চিৎকার করে রবিয়াহকে জানালেন, বন্ধু ঘোড়সোয়ার! তোমার মত একজন নিরস্ত্র লোককে আমি খুন করতে পারবো না। কিন্তু আমার দল প্রতিহিংসা বুকে নিয়ে অপেক্ষা করছে। তারা তোমাকে একা নিরস্ত্র অবস্থায় দেখতে পেলে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলবে। তুমি আমার এই বর্শাটি নিয়ে যাও, আমি আমার লোকদের মাঝে ফিরে যাচ্ছি, ওদের আমি ফিরিয়ে নিয়ে যাব কথা দিচ্ছি।

বর্শাটি রবিয়াহর দিকে ছুঁড়ে দিয়ে তিনি ফিরে চললেন। তাঁর দলের লোকদের তিনি বোঝালেন, লোকটির অসীম সাহস! আমাদের তিনজন যোদ্ধাকেও পরাস্ত করেছে, তাদের মৃতদেহ এখন বালিতে লুটিয়ে পড়ে আছে, আমার সাথে তীব্র যুদ্ধের পর আমার অস্ত্রও ওর আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। এমন শক্তিশালী শত্রুকে আক্রমণ করে কাজ নাই। চলো, আমরা ফিরে যাই।

লোকজন নিয়ে তিনি নিজেদের অঞ্চলে ফিরে এলেন, রবিয়াহুকে তিনি সেবারের মত অব্যাহতি দিলেন।

বছর ঘুরে যেতে লাগলো, রবিয়াহ্ একদিন মৃত্যুবরণ করলেন। একজন বীর যোদ্ধার মতই তিনি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করলেন। দরাইদের উপজাতির সাথে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে তিনি শেষ পর্যন্ত প্রাণ হারালেন।

তার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে ফিরাস-যোদ্ধাগণ বাণী-জুশামদের ওপর নতুন এক আক্রমণ শুরু করলো। রাত্রির অন্ধকারে তারা তাঁবু আক্রমণ করে, হঠাৎ আক্রমণে শত্রুকে পর্যুদস্ত করে ফেলে সহজেই। বেশ কিছু সংখ্যক যোদ্ধাকে তারা বন্দী করে নিয়ে যায়। সাথে নেয় কিছু লুষ্ঠিত ধন-সম্পদ আর কয়েকটি মহিলা। বন্দীদের মধ্যে ছিলেন শেখ দরাইদ।

শত্রুদের মধ্যে এসে পড়ে দরাইদ নিজের নাম প্রকাশ পেতে দিলেন না, সযত্নে গোপন করে রেখে দিলেন। শত্রুরা জানলো না যে, তারা কাকে বন্দী করে এনেছে। শক্ত প্রহরায় তাদের রেখে দেওয়া হলো।ফিরাস-রমণীরা তাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলো, কেউ কেউ তাকে প্রলুব্ধ করতে শুরু করলো। দরাইদ অস্বস্তিতে পড়ে গেলেন। তখন একজন মহিলা চিৎকার করে ডেকে উঠলেন, ফিরাসের বোকা যোদ্ধারা, তোমরা কাকে ধরে এনেছে জান? ইনি একদিন তোমাদের সাহায্যেই এগিয়ে এসেছিলেন। নিরস্ত্র রবিয়াহকে হাতের মুঠোয় পেয়েও খুন করেননি, অথচ তার অল্পক্ষণ পূর্বে রবিয়াহু এদের দলের তিনজনকে হত্যা করেন, নিরস্ত্র রবিয়াহকে ইনি বর্শা দান করে ফিরে যান।

মহিলাটি তার বোরখার একাংশ দরাইদের দিকে ছুঁড়ে দেন, অর্থাৎ দরাইদকে তিনি রক্ষা করতে চান। তারপর দলের যোদ্ধাদের দিকে ফিরে তাকিয়ে তিনি আবার বলতে শুরু করেন, ফিরাসের যোদ্ধারা, তোমাদের এই বন্দীটিকে তোমরা আমায় দিয়ে দাও।

যোদ্ধারা তখন কবি দরাইদকে ঘিরে ধরে, তার নাম জানতে চায়। —আমি দরাইদ বিন সিমাহ, তিনি উত্তর দেন,—কিন্তু এই মহিলাটি কে? মহিলাটি নিজেই উত্তর দেন, আমি রেয়তা, গিজল অল তিয়নের কন্যা। সেদিন সেই উটের পিঠে আমিই চেপেছিলাম। রবিয়াহ আমার স্বামী।

তিনি তার দলের যোদ্ধাদের প্রতিটি তাঁবুতে গিয়ে বললেন,—ফিরাসের যোদ্ধারা, সিমাহ-পুত্রের সেই মহানুভবতার কথা স্মরণ আছে তো? রবিয়াহকে খুন না করে ইনি তার নিজের বর্শা দান করেছিলেন। আজ তোমরা সুযোগ পেয়েছ, এর যোগ্য উত্তর দিতে ভুল করো না। নয়তো ফিরাসদের নামে লোকে একদিন থুতু ছুঁড়বে।

দরাইদকে তারা মুক্ত করে দেয়, রেয়তা তখন তার মৃত স্বামীর অস্ত্রটি কবি দরাইদকে ফিরিয়ে দিলেন।

দরাইদ তার নিজের উপজাতির মধ্যে ফিরে আসেন, কৃতজ্ঞতা-স্বরূপ বাণী ফিরাসদের তিনি আর কোনদিন আক্রমণ করেননি। বছরের পর বছর কেটে যেতে থাকে, দরাইদের বয়সও বেড়ে চলে, কিন্তু তার কবিত্ব শক্তি কমে, উত্তরোত্তর বেড়েই চলে।

বানী-সোলাইম উপজাতিদের মধ্যে আম্র কন্যা সুন্দরী তুমাদির অল খানসা বাস করতো। তুমাদির ছিলো সুবিখ্যাত কবি। মরুভূমির চারদিক তার সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিলো। একদিন দরাইদ ঘোড়ায় চেপে ঘুরতে ঘুরতে সোলাইমদের তাঁবুর কাছে এসে পড়েন। এক টিলার আড়াল থেকে তিনি দেখতে পান নির্জনে বসে তুমাদির তার পিতার একটি উটকে পরিচর্যা করছে। গ্রীষ্মের দুর্দান্ত দাহ থেকে মুক্তি পেতে সে যৎসামান্য পোষাকে নিজেকে আবৃত করে রেখেছে। চারিদিক সম্পূর্ণ নির্জন, সে আপন মনে তার প্রিয় উটের পরিচর্যা করতে থাকে সযত্নে। দরাইদ আড়াল থেকে এই অপরূপ স্বগীয় রূপ দেখে বিমোহিত হয়ে পড়েন। তার মনে সুমধুর সংগীত গুঞ্জরন করতে থাকে। সময় বয়ে চলে, দরাইদ বিমোহিত চিত্তে সংগীত রচনা করে চলেন….।

পরদিন দরাইদ তার দলের কয়েকজন লোককে সাথে নিয়ে তুমাদিরের পিতার সাথে দেখা করলেন। তিনি বিনীতভাবে তুমাদিরের পাণি প্রার্থনা করলেন। বৃদ্ধ আর উত্তর দেন,-মহান দরাইদ! আপনার এই প্রস্তাবে আমি গর্বিত বোধ করছি। কিন্তু আপনি নিশ্চয়ই জানেন আমার

তুমাদির যথেষ্ট বুদ্ধিমতী ও চিন্তাশক্তি সম্পন্ন মেয়ে।

রাত ভোর হয়ে আসে। আমরের ভাষা অসমাপ্ত রেখেই শাহরাজাদ চুপ করে যায়।

 

নয়শত চুয়াত্তরতম রজনী :

সে আবার বলতে শুরু করে :

আমর বলতে থাকেন, আপনি তো জানেন, মেয়েদের মধ্যে এই গুণগুলি সচরাচর দেখা যায়। আমি তাই তুমাদিরের স্বাধীন চিন্তায় কোন বাধা দিই না। আপনার এই প্রস্তাব আমি ওকে জানাবো চাই কি তাকে অনুরোধও করতে পারি। কিন্তু ওর প্রাণ যা চায়, আমি তার বিরুদ্ধে যেতে পারবো না।

দরাইদ তাকে ধন্যবাদ জানায়। আর তখন তুমাদির অল খানসার তাঁবুতে এসে তাকে বললেন, খানসা, বানী জুশামের সুবিখ্যাত বীর মহানুভবদরাইদ এসেছেন আমাদের কাছে। তিনি এসেছেন তোর জন্য বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। যদিও আজ তার বয়স হয়ে গেছে, তবুও তার বীরত্বের গল্পও তুই জানিস, আবার তার কবিত্ব শক্তির কথাও তোর অবিদিত নয়। তোরা একত্রিত হলে আমি গর্ব অনুভব করবো, কিন্তু তোর আপন ইচ্ছার ওপর আমি জোর খাটাতে চাই না, তোর কি মত তুই আমাকে নিঃসঙ্কোচে জানাতে পারিস।

তুমাদির উত্তর দেয়, বাবা আমাকে সময় দিন, আমি ভালো করে ভেবে দেখি তারপর জবাব দেব।

আমর দরাইদের কাছে ফিরে এসে জানান,-খানসাকে আপনার প্রস্তাব জানিয়েছি, সে কিছু সময় চেয়েছে। আমার মনে হয় ও শেষ পর্যন্ত মত দেবেই।

দরাইদকে তার লোকজন সমেত বিশ্রামের জন্য একটি তাঁবু দেওয়া হয়। যোগ্য সম্মানের সাথে তাদের আপ্যায়ন করা হতে থাকে। দরাইদ তার উত্তরের জন্য ফিরে এলে আম্র পুনরায় কন্যার তাঁবুতে এলেন, পাশেই সেই তাঁবু। তুমাদির আমরকে জানায়, আমি চিন্তা করে দেখলাম পিতা! সোলাইম জাতির বাইরে আমি বিয়ে করতে রাজি আছি কিন্তু ঐ বৃদ্ধ দরাইদকে কোনমতেই পতিত্বে বরণ করে নিতে পারবো না। কাল কিম্বা পরশু হয়তো ওর পেচক সদৃশ বৃদ্ধ আত্মাটি দেহমুক্ত হয়ে চলে যাবে! না,

আমি বরং বাদী হয়ে দিন কাটাতেও রাজী আছি কিন্তু ওর মত একজন লোলচর্ম বৃদ্ধকে সহ্য করতে পারবো না।

পাশের তাঁবুতে বসে দরাইদ সবই শুনতে পেলেন। তুমাদিরের এই ঘৃণাভরা উক্তিতে তার পৌরুষবোধ আহত হলো। কিন্তু বানী সোলাইমদের সামনে তিনি মুখ খুললেন না, শান্ত সৌজন্যের আড়ালে নিজেকে ঢেকে রাখলেন। তারপর স্বজনদের মধ্যে ফিরে এসে তুমাদিরের সেই নিষ্ঠুর ভাষ্যের জবাব দিলেন একটি সুন্দর ব্যঙ্গাত্মক গাঁথা রচনা করে?

বৃদ্ধ হয়েছে দরাইদ আজি
একথা প্রথম শুনি তোর কাছে!
আমি কি বলেছি, গতকাল আমি
এসেছিনু এই পৃথিবীর মাঝে?
তুই যে কি চাস, সে আমি বুঝেছি
চাস তুই এক নবীন ভৃত্য;
বিগলিত ভাঁড়, দোলাবে চামর,
সেবা পেলে তব করিবে নৃত্য!
দরাইদ সম বীর যুবা যদি
পথ ভুলে কভু আসে তোর দ্বারে;
সম্মান দিস, ভয় পাস তার!
মালা দিস নাকো, ফিরাস তাহারে।
কুসুম কোমল বিছানাই শুধু
সার কথা নয় পুরুষের কাছে;
সত্য সাহসী বীর হলে তার
পৃথিবীতে আরো বড় কাজ আছে।
তাই ফের বলি, বেছে নিস কোনো
বিগলিত ভঁড়, পরম ভৃত্য।
পদসেবা করে পূজিবে সে তোরে,
সেবা পেলে তব করিবেনৃত্য!
বৃদ্ধ হয়েছে দরাইদ আজি
একথা প্রথম শুনি তোর কাছে।
আমি কি বলেছি, গতকাল আমি
এসেছিনু এই পৃথিবীর মাঝে?

দরাইদ-এর এই গাথাটি খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে! লোকমুখে তা ক্রমশঃ বিভিন্ন উপজাতির মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। অবশেষে তা বাণী সোলাইমদেরও কানে এসে পৌঁছয়। সকলে তুমাদিরকে পরামর্শ দেয় দরাইদকে পতিত্বে বরণ করে নিতে। কিন্তু তুমাদির তাতে বিচলিত হয় না, সে একবার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাতেই অচল হয়ে থাকে।

তুমাদিরের ভাই মোরাইয়া একজন বীর যোদ্ধা ছিলো। কিন্তু মুরিদ উপজাতির সাথে এক ভয়ানক যুদ্ধে সে প্রাণ হারায়। ভাই-এর মৃত্যুতে তুমাদির একটি সুদীর্ঘ গাথা রচনা করে। এই গাথাটি তাকে সমগ্র আরবে প্রসিদ্ধ করে তোলে।

সুবিখ্যাত কবি নাবিগাহ অল ধোবিয়ানী এবং আরবের অন্যান্য খ্যাতনামা সকল কবিই তার এই গাথাটির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। ওফাজের এক বাৎসরিক কবি-সম্মেলনে নাবিগাহ বলেন, তুমাদির তার কবিতায় বিশ্বের সকল কবিকে জড়িয়ে গেছেন।

তুমাদির আরবে ইসলাম ধর্ম প্রবর্তনের পরও বেঁচেছিলো। হিজরতের অষ্টম বর্ষে তুমাদির তার পুত্র আব্বাসকে নিয়ে মুহম্মদের নিকট দীক্ষা নিতে আসে। পুত্র আব্বাস তখন বানী সোলাইমদের প্রধান পদে আসীন। মুহম্মদ তাকে সসম্মানে গ্রহণ করেন এবং তার মুখে স্বরচিত বিভিন্ন গাথা শুনে তৃপ্ত হন।

কবি দরাইদ ও কবি তুমাদিরের গল্পটি এখানেই শেষ। সেই যুবকটি তখন তার অতিথিদের একটি নতুন গল্প শোনাতে শুরু করে।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *