4 of 4

১৬৭. স্বর্গারোহণিকপর্ব্বাধ্যায়—ভীষ্মের স্বর্গারোহণ

১৬৭তম অধ্যায়

স্বর্গারোহণিকপর্ব্বাধ্যায়—ভীষ্মের স্বর্গারোহণ

বৈশম্পায়ন কহিলেন, অনন্তর ধর্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির পৌর ও জানপদগণকে যথোচিত সম্মান প্রদর্শনপূর্ব্বক গৃহগমনে অনুমতি প্রদান করিয়া যাহাদিগের পতি-পুত্রাদি যুদ্ধে নিহত হইয়াছে, তাহাদিগকে প্রার্থনাধিক অর্থদান সহকারে সান্ত্বনা করিলেন। তৎপরে তিনি রাজ্যে অভিষিক্ত হইয়া প্রজাদিগের সম্মানবর্দ্ধন এবং ব্রাহ্মণ, বলপ্রধান ও নগরবাসীদিগের আশীর্ব্বাদ গ্রহণপূৰ্ব্বক সেই হস্তিনায় বাস করিতে লাগিলেন। অনন্তর কিয়দ্দিন অতীত হইলে ধর্ম্মনন্দন সূৰ্য্যের উত্তরায়ণ হইয়াছে দেখিয়া, ভীষ্মের মৃত্যুকাল উপস্থিত বিবেচনা করিয়া যাজকগণসমভিব্যাহারে হস্তিনাপুর হইতে নির্গত হইবার উদ্যোগ করিতে লাগিলেন এবং সর্ব্বাগ্রে ভীষ্মের মৃতদেহ সংস্কার করিবার নিমিত্ত মাল্য, বিবিধ মহামূল্য রত্ন, ঘৃত, গন্ধদ্রব্য, ক্ষৌম, চন্দন, অগুরু ও কালীয়ক 
প্রেরণপূর্ব্বক পশ্চাৎ ভীষ্মের সংস্কৃতাগ্নিবাহক, পুরোহিত, ধৃতরাষ্ট্র, গান্ধারী, কুন্তী ও ভ্রাতৃগণকে অগ্রবর্ত্তী করিয়া রথারোহণে পুর হইতে নির্গত হইলেন। ঐ সময় মহাত্মা জনার্দ্দন, ধীমান্ বিদুর, যুযুৎসু ও যুযুধান তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিতে লাগিলেন। রাজযোগ্য পরিচারকগণ তাঁহার সমভিব্যাহারে চলিল এবং বন্দীরা তাঁহাকে স্তব করিতে লাগিল।
 

ভীষ্মের মৃত্যুকালে যুধিষ্ঠিরাদির আগমন

মহাত্মা ধৰ্ম্মনন্দন এইরূপে সুররাজ ইন্দ্রের ন্যায় সেই পুরী হইতে নিষ্ক্রমণপূর্ব্বক অনতিবিলম্বে কুরুক্ষেত্রে শান্তনুতনয়ের সমীপে সমুপস্থিত হইয়া দেখিলেন, মহাত্মা ভীষ্ম শরশয্যায় শয়ন করিয়া রহিয়াছেন। মহর্ষি বেদব্যাস, দেবর্ষি নারদ ও অসিতদেবল তাঁহার নিকট উপবেশন করিয়া আছেন এবং নানাদেশ-সমাগত হতাবশিষ্ট রাজা ও অন্যান্য রক্ষিগণ তাঁহার চতুর্দ্দিক রক্ষা করিতেছেন। তখন তিনি ভ্রাতৃগণের সহিত রথ হইতে অবতীর্ণ হইয়া, পিতামহকে প্রণাম করিয়া দ্বৈপায়ন প্রভৃতি ব্রাহ্মণগণকে অভিবাদন করিলেন। তখন দ্বৈপায়ন প্রভৃতি তত্ৰত্য সমুদয় মহাত্মা তাঁহাকে যথোচিত অভিনন্দন করিতে লাগিলেন। পরে তিনি সেই ঋষিগণপরিধৃত ভীষ্মকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, “পিতামহ! আপনার শ্রবণশক্তি ত’ অপ্রতিহত আছে? আমি যুধিষ্ঠির, আপনাকে নমস্কার করিতেছি। এক্ষণে আজ্ঞা করুন, আমাকে আপনার কি কার্য্যের অনুষ্ঠান করিতে হইবে। আমি আপনার মৃত্যুকাল উপস্থিত বিবেচনা করিয়া অগ্নি গ্রহণপূর্ব্বক আগমন করিয়াছি। আর আচার্য্য, ব্রাহ্মণ, ঋত্বিক ও আমার ভ্রাতৃগণ, কুরুজাঙ্গলবাসী হতাবশিষ্ট ভূপতিগণ, মহাত্মা বাসুদেব এবং আপনার পুত্রস্বরূপ রাজা ধৃতরাষ্ট্র এই স্থানে উপস্থিত হইয়াছেন। এক্ষণে আপনি নয়নদ্বয় উন্মীলিত করিয়া আমাদিগের সকলকে অবলোকন করুন। আপনার মৃত্যুর পর যে যে দ্রব্যের আবশ্যক হইবে, আমি তৎসমুদয় প্রস্তুত করিয়াছি।”

যুধিষ্ঠিরাদির প্রতি ভীষ্মের শেষ উপদেশ

ধৰ্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির এই কথা কহিলে মহাত্মা ভীষ্ম চক্ষু উন্মীলনপূৰ্ব্বক দেখিলেন, তাঁহার আত্মীয়স্বজন সকলেই তাঁহাকে বেষ্টনপূর্ব্বক অবস্থান করিতেছে। তখন তিনি ধৰ্ম্মরাজের হস্তধারণপূৰ্ব্বক মেঘের ন্যায় গম্ভীরস্বরে তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, “বৎস! এক্ষণে উত্তরায়ণ সমুপস্থিত হইয়াছে, আমি তোমাকে অমাত্যগণের সহিত আগমন করিতে দেখিয়া নিতান্ত প্রীত হইলাম। আমি অষ্টপঞ্চাশৎ দিবস এই সমুদয় নিশিতশরনিকরে শয়ান রহিয়াছি। ঐ অষ্টপঞ্চাশৎ দিবস আমার শতবর্ষের ন্যায় বোধ হইতেছে। যাহা হউক, এক্ষণে সৌভাগ্যবশতঃ পবিত্র মাঘমাস ও শুক্লপক্ষ সমাগত হইয়াছে।”

মহাত্মা ভীষ্মদেব যুধিষ্ঠিরকে এইরূপ কহিয়া অন্ধরাজা ধৃতরাষ্ট্রকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, “মহারাজ! তোমার সমুদয় ধৰ্ম্মতত্ত্ব সুনির্ণীত হইয়াছে। তুমি অনেক দিন বহুশ্রুত ব্রাহ্মণগণের সেবা করিয়াছ; সূক্ষ্ম দেবশাস্ত্র ও ধর্ম্ম তোমার অবিদিত নাই; অতএব শোক পরিত্যাগ করা তোমার অবশ্য কর্ত্তব্য। কেহই ভবিতব্যের অন্যথা করিতে পারে না। তুমি ভগবান্ বেদব্যাসের নিকট তৎসমুদয় ধৰ্ম্মরহস্য শ্রবণ করিয়াছ। ধৰ্ম্মানুসারে পাণ্ডবগণ তোমার পুত্রস্বরূপ। অতএব তুমি ধৰ্ম্মপরায়ণ হইয়া গুরুশুশ্রূষানিরত পাণ্ডবগণকে প্রতিপালন কর। গুরুবৎস সরলস্বভাব বিশুদ্ধচিত্ত যুধিষ্ঠির সর্ব্বদা তোমার আজ্ঞানুবর্ত্তী হইয়া থাকিবেন। তোমার আত্মজগণ নিতান্ত ক্রোধান্বিত, লোভপরায়ণ, ঈর্ষাভিভূত ও দুরাত্মা ছিল; অতএব তুমি তাহাদিগের নিমিত্ত কিছুমাত্র শোক করিও না।”

কৃষ্ণের নিকট ভীষ্মের সুগতি কামনা

মহাত্মা ভীষ্ম ধৃতরাষ্ট্রকে এই কথা কহিয়া ভগবান্ বাসুদেবকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, “ভগবন্! তুমি দেবদেবেশ, সুরাসুরনমস্কৃত, ত্রিবিক্রম, শঙ্খচক্রগদাধারী, বাসুদেব, হিরণ্যাত্মা, পরমপুরুষ, সবিতা, বিরাটরূপী, জীবম্বরূপ, অণুরূপ, পরমাত্মা ও সনাতন। এক্ষণে আমি একাগ্রচিত্তে তোমাকে নমস্কার করিতেছি, তুমি আমাকে পরিত্রাণ ও তোমার একান্ত অনুগত পাণ্ডবগণকে, রক্ষা কর। আমি পূর্ব্বে মন্দবুদ্ধি দুৰ্য্যোধনকে কহিয়াছিলাম যে, যেখানে কৃষ্ণ, সেইখানেই ধর্ম্ম এবং যেখানে ধর্ম্ম সেইখানেই জয়। অতএব তুমি এক্ষণে বাসুদেবের সাহায্যে পাণ্ডবগণের সহিত সন্ধিস্থাপন কর; সন্ধি করিবার এমন সুযোগ আর পাইবে না। হে কৃষ্ণ! আমি দুৰ্য্যোধনকে ঐরূপ কথা বারংবার কহিলেও সে তৎকালে দুর্ব্বুদ্ধিবশতঃ আমার বাক্য রক্ষা করিল না, সেই নিমিত্তই এক্ষণে তাহাকে কালকবলে নিপতিত হইতে হইল। ঐ দুরাত্মার দোষেই পৃথিবী বীরশূন্য হইয়াছে। আমি তোমাকে পুরাণপুরুষ বলিয়া পরিজ্ঞাত আছি। আমি তপোধনাগ্রগণ্য নারদ ও বেদব্যাসের মুখে শুনিয়াছি যে, তুমি ও অর্জ্জুন তোমরা উভয়ে পূৰ্ব্বে নর-নারায়ণরূপে অবতীর্ণ হইয়া বদর্ষ্যাশ্রমে বাস করিয়াছিলে। এক্ষণে আমার দেহত্যাগের প্রকৃত সময় উপস্থিত হইয়াছে, অতএব তুমি অনুমতি কর, আমি যেন দেহান্তে পরমগতি লাভ করিতে পারি।”

ভীষ্মের প্রতি কৃষ্ণের আশ্বাসবাক্য

মহাত্মা ভীষ্ম এইরূপ অনুনয় করিলে বাসুদেব তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, “মহাত্মন্! আমি আপনাকে অনুজ্ঞা করিতেছি, আপনি কলেবর পরিত্যাগ করিয়া নিশ্চয়ই বসুলোক লাভ করিবেন। আপনার পাপের লেশমাত্রও নাই। আপনি মার্কণ্ডেয়ের ন্যায় পিতৃভক্ত। মৃত্যু ভৃত্যের ন্যায় আপনার অনুগত রহিয়াছে।”

মহামতি বাসুদেব এই কথা কহিলে মহাত্মা ভীষ্ম ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডবগণ ও অন্যান্য সুহৃদ্‌গণকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, “বৎসগণ! এক্ষণে আমি প্রাণত্যাগ করিতে বাসনা করিতেছি, অতএব তোমরা আমাকে অনুজ্ঞা কর। সত্য হইতে তোমাদিগের বুদ্ধি যেন কখন বিচলিত না হয়। সত্যের তুল্য পরম আর কিছুই নাই। সংযতাত্মা, তপানুষ্ঠাননিরত, ধৰ্ম্মশীল ও ব্রাহ্মণভক্তিপরায়ণ হওয়া তোমাদের সর্ব্বতোভাবে বিধেয়।”

শান্তনুতনয় এই বলিয়া সুহৃদগণকে আলিঙ্গনপূৰ্ব্বক পুনৰ্ব্বার যুধিষ্ঠিরকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, “বৎস! তুমি প্রতিদিন জ্ঞানবান ব্রাহ্মণ, আচার্য্য ও ঋত্বিগণের সবিশেষ সৎকার করিবে।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *