১৬৩তম অধ্যায়
কর্ম্মাধীন জীবের সৎপুরুষকার সার্থকতা
যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! এই জীবলোকে হতভাগ্য মনুষ্য বলবান হইলেও কদাচ অর্থলাভ করিতে পারে না। আর যে ব্যক্তি ভাগ্যবান, সে নিতান্ত দুর্ব্বল ও বালক হইলেও অর্থলাভ করিতে সমর্থ হয়, সন্দেহ নাই। লাভের সময় উপস্থিত না হইলে যত্ন করিলেও অর্থ হস্তগত হয় না; কিন্তু লাভকাল উপস্থিত হইলে অনায়াসেই বিপুল বিত্ত হস্তগত হইয়া থাকে। অনেকে বহু যত্ন করিয়াও কিছুই লাভ করিতে পারে না, আবার অনেকে অনায়াসে প্রভূত ধনের আধিপত্য লাভ করে। যদি মনুষ্য যত্নবান হইলেই সমুদয় ফললাভ করিতে পারিত, তাহা হইলে বিদ্বান ব্যক্তিরা — জীবিকানির্ব্বাহের নিমিত্ত কখনই মূর্খের উপাসনা করিতেন না। যখন মনুষ্য যত্ন করিয়াও ফললাভ করিতে সমর্থ হয় না, তখন নিশ্চয়ই বোধ হইতেছে, অদৃষ্টে অর্থলাভ না থাকিলে উহা লাভ করা কাহারও সাধ্যায়ত্ত নহে। কোন ব্যক্তি অর্জ্জনস্পৃহার অধীন হইয়া প্রভূত আয় সত্ত্বেও অর্থলাভের চেষ্টা করিয়া দুঃখভোগ করে এবং কোন ব্যক্তি অর্থান্বেষণে বিরত হইয়াও পরমসুখে কালাতিপাত করিয়া থাকে, কোন কোন নির্দ্ধন ব্যক্তি নিরন্তর অসৎকার্য্যের অনুষ্ঠান করিয়াও ধনবান এবং কোন কোন ধনাঢ্য ব্যক্তি সতত সৎকাৰ্য্যের অনুষ্ঠান করিয়াও নিৰ্দ্ধন হইতেছে।
“কেহ কেহ প্রযত্নসহকারে নীতিশাস্ত্র অধ্যয়ন করিয়াও নীতিজ্ঞ হইতে পারে না, আবার কেহ কেহ নীতিশাস্ত্র স্পর্শ না করিয়াও মন্ত্রিত্বলাভে সমর্থ হয়। কখন কখন বিদ্বান ও মূর্খ উভয়কেই ধনবান, আবার কখন কখন ঐ উভয়কেই নির্দ্ধন হইতে দেখা যায়। যদি বিদ্যালাভ করিলেই লোকের সুখলাভ হইত, তাহা হইলে বিদ্বান ব্যক্তিরা জীবিকানিৰ্ব্বাহের নিমিত্ত কখনই মূর্খের আশ্রয় গ্রহণ করিতেন না। জলদ্বারা যেমন লোকের পিপাসাশান্তি হয় তদ্রূপ যদি বিদ্যাবলেই লোকের সমুদয় কাৰ্য্যসাধন হইত, তাহা হইলে বোধ হয়, কেহ বিদ্যোপার্জ্জনে অযত্ন করিত না। আয়ুঃসত্ত্বে শতবাণে বিদ্ধ হইলেও লোকের প্রাণবিয়োগ হয় না, কিন্তু আয়ুঃক্ষয় হইলে লোকে তৃণাগ্রদ্বারা বিদ্ধ হইয়াও প্রাণপরিত্যাগ করিয়া থাকে। সুতরাং আপনার উন্নিতসাধনের নিমিত্ত মনুষ্যের কর্ত্তব্য কি? এই বিষয়ে আমি সংশয়ারূঢ় হইয়াছি, অতএব আপনি উহা আমার নিকট কীর্ত্তন করুন।”
ভীষ্ম কহিলেন, “ধর্ম্মরাজ! যে ব্যক্তি বহু যত্ন করিয়াও ধনলাভ করি না পারে, কঠোর তপানুষ্ঠান করা তাহার অবশ্য কর্ত্তব্য। বীজবপন না করিলে কেহই ফলভোগের অধিকারী হয় না। মণীষিগণ কহিয়া থাকেন, মনুষ্য দানদ্বারা ভোগশীল, বৃদ্ধগণের শুশ্রূষাদ্বারা মেধাবী ও অহিংসদ্বারা দীর্ঘায়ু হয়। অতএব মনুষ্য সতত প্রিয়বাদী, লোকের হিতানুষ্ঠাননিরত, বিশুদ্ধস্বভাব ও হিংসাবিহীন হইয়া যাত্রা পরিত্যাগ, দান ও ধার্ম্মিকগণের পূজা করিবে। দংশকীট ও পিপীলিকা প্রভৃতি ক্ষুদ্র প্রাণীগণকে স্ব স্ব কর্ম্মরূপ সুখ ও দুঃখ ভোগ করিতে হয়। অতএব প্রাণীমাত্রকেই কর্ম্মের অধীন বিবেচনা করিয়া অনুতাপ পরিত্যাগ কর।”
