4 of 4

১৬০. কৃষ্ণের রুদ্রপ্রভাববর্ণন—দক্ষযজ্ঞধ্বংস

১৬০তম অধ্যায়

কৃষ্ণের রুদ্রপ্রভাববর্ণন—দক্ষযজ্ঞধ্বংস

যুদ্ধিষ্ঠির কহিলেন, “মধুসূদন! তুমি মহর্ষি দুর্ব্বাসার প্রসাদবলে যে বিজ্ঞান প্রাপ্ত এবং মহাত্মা মহাদেবের মাহাত্ম্য ও নামসমুদয় অবগত হইয়াছ তাহা জ্ঞাত হইবার নিমিত্ত আমার পরম কৌতুহল উত্থিত হইয়াছে, অতএব তুমি উহা কীর্ত্তন কর।”

তখন বাসুদের কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! আমি দুর্ব্বাসার প্রসাদবলে যাহা লাভ করিয়াছি এবং প্রতিদিন প্রাতঃকালে গাত্রোত্থানপূর্ব্বক প্রযতভাবে যাহা পাঠ করিয়া থাকি, এক্ষণে ভগবান্‌ ভুতপতিকে কৃতাঞ্জলিপুটে নমস্কার করিয়া তাঁহার সেই মাহাত্ম্য কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর।

“প্রজাপতি ব্রহ্মা বহুকাল তপস্যা করিয়া ঐ মাহাত্ম্য প্রকটিত করিয়াছেন। ভগবান ভূতভাবন ভবানীপতিই এই স্থাবরজঙ্গমাত্মক পৃথিবী সৃষ্টিকর্ত্তা তাহা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ আর কেহই নাই। তিনি এই ত্রিলোকের আদি-কারণ। এই ত্রিলোকমধ্যে তাঁহার সমকক্ষ বা তাঁহার সম্মুখে অবস্থান করিতে কেহই সমর্থ নহেন। তিনি রোষাবিষ্ট হইয়া সমরাঙ্গনে অবস্থান করিলে শত্রুগণ তাঁহার গাত্রগন্ধেই ভীত, কম্পিত, সংজ্ঞাহীন ও পঞ্চত্বপ্রাপ্ত হইয়া থাকে। মেঘগর্জ্জনের ন্যায় তাঁহার ঘোরতর সিংহনাদ শ্রবণ করিলে রণস্থলে দেবগণেরও হৃদয় বিদীর্ণ হইয়া যায়। তিনি ক্রোধাবিষ্ট হইয়া বিকটমূর্ত্তি ধারণপূৰ্ব্বক দেব, দানব, গন্ধৰ্ব্ব বা পন্নগগণের প্রতি দৃষ্টিপাত করিলে তাঁহারা পৰ্ব্বতগুহামধ্যে প্রবেশ করিয়াও নিশ্চিন্ত হইতে পারেন না।

“প্রজাপতি দক্ষ অতি সুবিস্তীর্ণ যজ্ঞ আরম্ভ করিয়া তাঁহার ভাগ কল্পনা না করাতে তিনি রোষভরে শরাসনে শরসংযোগপূৰ্ব্বক সিংহনাদ পরিত্যাগ করিয়া সেই যজ্ঞ বিদ্ধ করিয়াছিলেন। সহসা দক্ষযজ্ঞ বিদ্ধ হইতে দেবগণের সুখলাভ করা দূরে থাকুক, তাঁহাদিগের দুঃখের পরিসীমা রহিল না। ঐ সময় মহাদেবের জ্যাশব্দে সমুদয় লোক সমাকুল, দেবতা ও অসুরগণ বিষণ্ন, জল সংক্ষুব্ধ ও বসুন্ধরা বিকম্পিত হইয়া উঠিল। পর্ব্বতসমুদয় চতুর্দ্দিকে ধাবমান ও আকাশমণ্ডল এককালে বিনষ্ট হইল। সূৰ্য্য ও গ্রহনক্ষত্রাদির কিছুমাত্র প্রভা রহিল না এরং লোকসমুদয় গাঢ় অন্ধকারে সমাচ্ছন্ন হইল। ঐ সময় ঋষিগণ একান্ত ভীত হইয়া সমুদয় জগতের হিতকামনায় স্বস্ত্যয়ন করিতে লাগিলেন।

“অনন্তর প্রবলপরাক্রম রুদ্রদেব দেবগণের প্রতি ধাবমান হইয়া ভগের নয়নদ্বয় উৎপাটিত ও পদাঘাতদ্বারা পুষার দন্তপংক্তি বিপাটিত করিয়া ফেলিলেন। তখন দেবগণ রুদ্রের সেই ভীষণ কাৰ্য্য দর্শনে ভীত হইয়া কম্পিতকলেবরে তাঁহাকে প্রণাম করিতে লাগিলেন; কিন্তু পিনাকপাণি তাঁহাতেও ক্ষান্ত না হইয়া পুনরায় শরাসনে শরসংযোগ করিলেন। তদ্দর্শনে দেবতা ও ঋষিগণ আপনাদিগকে নিতান্ত বিপদগ্রস্ত বোধ করিয়া শতরুদ্রীয় মন্ত্র জপ এবং কৃতাঞ্জলিপুটে মহাদেবের স্তব করিতে লাগিলেন। পরিশেষে দেবাদিদেব তাঁহাদিগকে নিতান্ত ভীত দেখিয়া তাঁহাদের প্রতি প্রসন্ন হইলেন। তখন দেবগণ মহাদেবকে শান্তমূৰ্ত্তি অবলোকন করিয়া, তাঁহার শরণাপন্ন হইয়া তাঁহার নিমিত্ত উত্তমরূপে যজ্ঞভাগ কল্পিত করিলেন। ভগবান্ ভূতভাবন তদ্দর্শনে পরম পরিতুষ্ট হইয়া যজ্ঞকে পুনরায় যথাস্থানে সংস্থাপিত করিয়া তাহার যেসমুদয় অঙ্গ অপহৃত হইয়াছিল, তৎসমুদয় যথাস্থানে সন্নিবেশিত করিলেন।

ত্রিপুরাসুর-প্রভাবপ্রসঙ্গে ইন্দ্রের বাহুস্তম্ভ

“পুৰ্ব্বে অসুরগণের লৌহ, রজত ও সুবর্ণময় তিন পুরী ছিল। দেবরাজ ইন্দ্রও স্বীয় সমুদয় অস্ত্রশস্ত্রদ্বারা ঐ অসুরপুরী বিদীর্ণ করিতে সমর্থ হয়েন নাই। অনন্তর দেবতারা সকলে সমবেত হইয়া রুদ্রদেবের শরণ গ্রহণপূর্ব্বক কহিলেন, “দেবাদিদেব! দুর্দ্দান্ত দৈত্যগণ আমাদিগের সমুদয় কাৰ্য্যেই উপদ্রব করিবে, অতএব আপনি অনুগ্রহপূৰ্ব্বক দৈত্যগণের পুরত্রয়ের সহিত উহাদিগকে বিনাশ করিয়া আমাদিগকে পরিত্রাণ করুন।

“দেবগণ এই কথা কহিলে, ভগবান্ ভূতপতি তাঁহাদিগের বাক্যে সম্মত হইয়া বিষ্ণুকে উৎকৃষ্ট শর, অনলকে শল্য, সূৰ্য্যপুত্র যমকে পুঙ্খ, চারি বেদকে শরাসন, সাবিত্রীদেবীকে জ্যা এবং ব্রহ্মাকে সারথি করিয়া পৰ্ব্বত্রয়সংযুক্ত ত্রিশূলদ্বারা অসুরদিগের সহিত সেই পুরত্রয় বিদীর্ণ ও দগ্ধ করিয়া ফেলিলেন। অনন্তর ভগবান্ ভূতভাবন পঞ্চশিখাসংযুক্ত বালকের বেশ ধারণ করিয়া সহসা পার্ব্বতীর ক্রোড়দেশে উপবেশন করিলেন। তখন পার্ব্বতী দেবগণকে জিজ্ঞাসা করিলেন, এ বালকটি কে? ঐ সময় দেবরাজ ইন্দ্র পার্ব্বতীর ক্রোড়ে এই বালককে উপবিষ্ট দর্শন করিবামাত্র ঈর্ষাপরবশ হইয়া তাহাকে বজ্রপ্রহার করিতে উদ্যত হইলে, ভগবান ভূতপতি সহসা তাঁহার সেই বজ্ৰসংযুক্ত পরিঘাকার বাহু স্তম্ভিত করিলেন। তদ্দর্শনে ব্রহ্মাদি দেবগণ একান্ত বিস্ময়াবিষ্ট হইলেন। অনন্তর প্রজাপতি ব্রহ্মা যোগবলে সেই বালককে ভুবনেশ্বর বলিয়া অবধারণ করিলে, দেবগণ সকলেই তাঁহাকে ও পাৰ্ব্বতীকে প্রসন্ন করিতে লাগিলেন। তখন দেবরাজ ইন্দ্রের বাহু পূর্ব্বের ন্যায় প্রকৃতিস্থ হইল।

“ঐ মহেশ্বর তেজঃপুঞ্জকলেবর দুর্ব্বাসার রূপ পরিগ্রহ করিয়া বহুকাল আমার দ্বারকাপুরীতে অবস্থানপূর্ব্বক বিবিধ উপদ্রব করিয়াছিলেন। কিন্তু আমি অবিকৃতচিত্তে তৎকৃত সমুদয় উপদ্ৰবই সহ্য করিয়াছিলাম। তিনি রুদ্র, শিব, অগ্নি, সৰ্ব্ব, সৰ্ব্বজিৎ, ইন্দ্র, বায়ু, অশ্বিনীকুমার, বিদ্যুৎ, চন্দ্র, সূৰ্য্য, বরুণ, ঈশান, কাল, অনন্ত, মৃত্যু, ভব, দিবা, রাত্রি, মাস, পক্ষ, ঋতু, সায়ংকাল, প্রাতঃকাল, সংবৎসর, ধাতা, বিধাতা, বিশ্বকৰ্ম্মা, সৰ্ব্বজ্ঞ, গ্রহ, নক্ষত্র, দিক, বিদিক, বিশ্বমূর্ত্তি ও অমেয়াত্মা। তিনি কখন একধা, কখন দ্বিধা, কখন সহস্ৰধা, কখন শতসহস্ৰধা ও কখন বা তদপেক্ষা বহুধা বিভক্ত হইয়া থাকেন। এক শত বৎসরেও কেহ তাহার সমুদয় গুণ কীর্ত্তন করিতে সমর্থ হয় না।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *