১৫৯তম অধ্যায়
কৃষ্ণকর্ত্তৃক বিপ্রপূজা প্রশংসা
যুধিষ্ঠির কহিলেন, “বাসুদেব! পিতামহ তোমার মাহাত্ম্য সবিশেষ পরিজ্ঞাত আছেন; অতএব ব্রাহ্মণগণের পূজা করিলে কিরূপ ফললাভ হয়, তুমি তাহা কীর্ত্তন কর।”
বাসুদেব কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! আমি ব্রাহ্মণের গুণসমুদয় সবিস্তর কীর্ত্তন করিতেছি, অবহিতচিত্তে শ্রবণ করুন। একদা দ্বারাবতী নগরে প্রদ্যুম্ন ব্রাহ্মণের প্রতি ক্রূদ্ধ হইয়া আমার নিকট আগমনপূর্ব্বক আমাকে সম্বোধন করিয়া কহিল, “পিতঃ! ব্রাহ্মণগণ কি নিমিত্ত ইহলোক ও পরলোকের ঈশ্বর বলিয়া অভিহিত হয়েন এবং তাঁহাদিগের পূজা করিলেই বা কি ফললাভ হয়, এই বিষয়ে আমার নিতান্ত সংশয় উপস্থিত হইয়াছে; অতএব আপনি উহা কীর্ত্তন করুন।’
“প্রদ্যুম্ন এই কথা কহিলে, আমি তাহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলাম, বৎস! ‘ব্রাহ্মণগণের অর্চ্চনা করিলে যে ফললাভ হয়, আমি তোমার নিকট তাহা কীর্ত্তন করিতেছি, অবহিতচিত্তে শ্রবণ কর। ধৰ্ম্ম, অর্থ ও কামের অনুশীলন, মোক্ষলাভের উদ্যোগ, যশ ও শ্রীলাভ, রোগশান্তি এবং দেবতা ও পিতৃগণের পূজা করিবার সময় ব্রাহ্মণগণকে পরিতুষ্ট করা অবশ্য কর্ত্তব্য। ব্রাহ্মণগণ চন্দ্রের ন্যায় জগতের আনন্দজনক এবং উভয়লোকে সুখদুঃখদাতা। ব্রাহ্মণগণ হইতে সমুদয় কল্যাণ লাভ হইয়া থাকে। উঁহাদের অর্চ্চনা করিলে আয়ু, কীর্ত্তি, যশ ও বল পরিবর্দ্ধিত হয়। উঁহারাই সকলের আদি ও ব্রহ্মাণ্ডের ঈশ্বর বলিয়া অভিহিত হইয়া থাকেন। সুতরাং আমি স্বয়ং ঈশ্বর মনে করিয়া কখনই উঁহাদিগকে অনাদর করিতে পারি না। এক্ষণে তাঁহাদিগের প্রতি ক্রোধ করা তোমার কোন মতেই কর্ত্তব্য নহে। ব্রাহ্মণগণ সর্ব্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ, তাঁহাদিগের অগোচর কিছুই নাই। তাঁহারা ক্রূদ্ধ হইলে সমুদয় জগৎ ভস্মসাৎ করিয়া নূতন লোক ও লোকেশ্বর-সমুদয়ের সৃষ্টি করিতে পারেন। অতএব পরম তেজস্বী জ্ঞানবান্ মহাত্মারা সৰ্ব্বদা তাঁহাদিগের উপাসনা করিবেন।
রুক্মিণীসহ কৃষ্ণের দুর্ব্বাসা ঋষির সেবা
‘পূৰ্ব্বে চীরবাসা, বিশ্বদণ্ডধারী, দীর্ঘকলেবর, দীর্ঘশ্মশ্রু, কৃশাঙ্গ, মহাত্মা দুর্ব্বাসা মনুষ্যলোক ও দেবলোকের সমুদয় চত্বর ও সভাতে এই কথা কহিয়া পরিভ্রমণ করিয়াছিলেন যে, আমি দুর্ব্বাসা, বাসার্থী হইয়া নানাস্থানে বিচরণ করিতেছি; অতএব আমাকে স্বীয় গৃহে বাস করাইতে যাহার বাসনা থাকে, ব্যক্ত কর। কিন্তু অণুমাত্র অপরাধ দেখিলেই আমার ক্রোধ উপস্থিত হয়, সুতরাং যে ব্যক্তি আমাকে আশ্রয় দান করিবে, তাহাকে সতত সাবধান থাকিতে হইবে। মহর্ষি দুর্ব্বাসা এইরূপ কহিয়া পরিভ্রমণ করাতে কেহই তাহাকে আশ্রয়দান করিতে সম্মত হইল না। তখন আমি তাঁহাকে পরম যত্নসহকারে আহ্বানপূর্ব্বক আত্মগৃহে বাস করাইলাম।
‘ঐ মহাত্মা কোন দিন বহু সহস্র ব্যক্তির ভোজ্য, কোন দিন অতি অল্পমাত্র ভক্ষ্য ভোজন করিতেন এবং কোন দিন বা আমার আবাস হইতে বহির্গমনপূৰ্ব্বক আর প্রত্যাগমনও করিতেন না। তিনি অকস্মাৎ হাস্য ও অকস্মাৎ রোদন করিতেন। একদা তিনি স্বীয় শয়নমন্দিরে প্রবেশপূৰ্ব্বক শয্যা, আস্তরণ ও নানালঙ্কারসমলস্কৃত কন্যাগণকে দগ্ধ করিয়া পুনৰ্ব্বার তথা হইতে বিনির্গত হইয়া আমাকে কহিলেন, “বাসুদেব! আমি পরমান্ন ভোজন করিতে নিতান্ত অভিলাষী হইয়াছি, অতএব অবিলম্বে আমাকে উহা প্রদান কর।”
‘আমি ইতিপূর্ব্বেই তাঁহার মনোবৃত্তি পরিজ্ঞাত হইয়া পরিজন দিগেরদ্বারা বিবিধ ভোজ্য ও পানীয় বস্তু প্রস্তুত করাইয়াছিলাম, এক্ষণে তাঁহার আজ্ঞামাত্র উত্তপ্ত পায়স আনয়ন করিয়া তাঁহাকে প্রদান করিলাম। তখন তিনি সেই পায়স ভোজন করিয়া আমাকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, “বাসুদেব! তুমি অবিলম্বে আপনার সর্ব্বাঙ্গে এই পায়স লেপন কর।” দুর্ব্বাসা ঐরূপ আজ্ঞা করিবামাত্র আমি অবিচারিতচিত্তে সর্ব্বাঙ্গে ও মস্তকে তাঁহার উচ্ছিষ্ট উত্তপ্ত পায়স লেপন করিলাম। ঐ সময় তোমার জননী রুক্মিণী সেই স্থানে সমুপস্থিত ছিলেন, মহর্ষি তাঁহাকে দর্শন করিয়া সহাস্যবদনে তাঁহার গাত্রে পায়স লেপনপূৰ্ব্বক তাহাকে রথে নিয়োজিত করিয়া আমার আবাস হইতে বহির্গত হইলেন এবং সারথি যেমন বাহনদিগকে প্রহার করে, তদ্রূপ আমার সমক্ষেই প্রতোদ্বারা তাঁহাকে নিপীড়িত করিতে লাগিলেন। এইরূপে রুক্মিণীকে কষ্ট প্রদান করিলেও আমার কিছুমাত্র দুঃখ উপস্থিত হইল না।
‘অনন্তর মহর্ষি সেই রথে সমারূঢ় হইয়া রাজমার্গে প্রস্থান করিলেন। ঐ সময় কতিপয় যদুবংশীয় ব্যক্তি সেই অদ্ভুত ব্যাপার দর্শনে নিতান্ত দুঃখিত হইয়া পরস্পর কহিতে লাগিলেন, “এই ভূমণ্ডলে যেন ব্রাহ্মণ ভিন্ন অন্য কোন বর্ণ জন্মগ্রহণ না করে। ব্রাহ্মণের অতি অদ্ভুত প্রভাব। ব্রাহ্মণ ভিন্ন কোন্ ব্যক্তি মহানুভবা রুক্মিণীকে রথে যোজিত করিয়া জীবিত থাকিতে পারে? আশীবিষের বিষ তীক্ষ্ণ; কিন্তু ব্রাহ্মণকে তাহা অপেক্ষা তীক্ষ্ণ বলিতে হইবে। যে ব্যক্তি ব্রাহ্মণস্বরূপ আশীবিষ কর্ত্তৃক নিপীড়িত হয়, তাহার চিকিৎসক কেহই নাই।” পরমদুর্দ্ধর্ষ মহর্ষি দুর্ব্বাসা এইরূপে রথারূঢ় হইয়া রাজমার্গে ধাবমান হইলে তোমার জননী পথিমধ্যে বারংবার স্থলিতপদ হইতে লাগিলেন। মহর্ষি তাহাতেও ক্ষান্ত না হইয়া তাঁহাকে পুনঃ পুনঃ কশাঘাত করিতে আরম্ভ করিলেন। পরিশেষে যখন রুক্মিণী কোনরূপেই গমন করিতে পারিলেন না, তখন তিনি ক্রোধাবিষ্টচিত্তে রথ হইতে অবতীর্ণ হইয়া কুৎসিত পথ অবলম্বনপূৰ্ব্বক দক্ষিণদিকে ধাবমান হইলেন। আমিও পায়সদিগ্ধকলেবরে তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ ধাবমান হইয়া কহিতে লাগিলাম, “ভগবন্! আপনি আমার প্রতি প্রসন্ন হউন।”
দুৰ্ব্বাসার নিকট কৃষ্ণ-রুক্মিণীর বরলাভ
“তখন সেই মহাত্মা প্রসন্নচিত্তে আমার প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া কহিলেন, ‘বাসুদেব! তুমি ক্রোধকে একেবারে পরাজিত করিয়াছ; তোমার কোন বিষয়েই কিছুমাত্র অপরাধ লক্ষিত হইলা না, এক্ষণে আমি তোমার প্রতি অতিশয় প্রসন্ন হইয়া তোমাকে এই বর প্রদান করিতেছি যে, অন্ন যেমন দেবতা ও মনুষ্যদিগের প্রিয়, তুমিও তদ্রূপ সমুদয় লোকের প্রিয়পাত্র হইবে। কোন লোকে তোমার পবিত্র কীৰ্ত্তি অপ্রচারিত থাকিবে না এবং তুমি সৰ্ব্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ও সকলের প্রিয় হইবে। তোমার যেসমুদয় বস্তু দগ্ধ ও ভগ্ন হইয়াছে, তুমি তৎসমুদয় পূৰ্ব্ববৎ বা পূৰ্ব্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট দর্শন করিতে পারিবে। ঐ পায়স লেপন করাতে তোমার মৃত্যুভয় থাকিবে না। তুমি যতকাল ইচ্ছা জীবিত থাকিতে সমর্থ হইবে। তুমি কেবল স্বীয় পদতলে পায়স লেপন2 না করিয়া আমার অপ্রিয়কার্য্যের অনুষ্ঠান করিয়াছ।
“ভগবান্ দুব্বাসা প্রীত হইয়া আমাকে এইরূপ কহিলে, আমি স্বীয় শরীরকে অপূৰ্ব্ব রূপসম্পন্ন দেখিলাম। অনন্তর মহর্ষি দুর্ব্বাসা রুক্মিণীকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ভদ্রে! তুমি ইহলোকে স্ত্রীজাতির মধ্যে উৎকৃষ্ট যশ ও কীৰ্ত্তিলাভ করিতে পারিবে। জরা, ব্যাধি ও বিবর্ণতা তোমাকে স্পর্শও করিতে পারিবে না। তুমি পবিত্ৰগন্ধবিশিষ্ট হইয়া তোমার পতি কেশবের শুশ্রূষা ও তাঁহার সালোক্য লাভ করিবে। বাসুদেব ষোড়শসহস্র বধূর মধ্যে তোমার প্রতিই নিতান্ত অনুরক্ত হইবেন। অগ্নির ন্যায় তেজঃপুঞ্জকলেবর মহাত্মা দুর্ব্বাসা রুক্মিণীকে এই কথা কহিয়া পুনৰ্ব্বার আমাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, ‘বাসুদেব! তুমি ব্রাহ্মণগণের প্রতি এইরূপে ভক্তিপরায়ণ হইয়া পরমসুখে কাল হরণ কর।’
“ভগবান্ দুর্ব্বাসা এই বলিয়া অন্তর্হিত হইলে আমি ‘ব্রাহ্মণগণের আজ্ঞা কদাচ লঙ্ঘন করিব না’ বলিয়া প্রতিজ্ঞা করলাম। তৎপরে তোমার জননীর সহিত মৌনব্রত অবলম্বনপূর্ব্বক প্রীতমনে স্বীয় গৃহে আগমন করিয়া দেখিলাম, মহর্ষি দুর্ব্বাসা যেসমুদয় বস্তু দগ্ধ ও ভগ্ন করিয়াছিলেন, তৎসমুদয় পূর্ব্ববৎ যথাস্থানে সন্নিবেশিত রহিয়াছে। আমি তৎকালে সেই আশ্চর্য্য ব্যাপার দর্শনে নিতান্ত বিস্ময়াবিষ্ট হইয়া মনে মনে ব্রাহ্মণকে অগণ্য ধন্যবাদ প্রদান করিতে লাগিলাম।’
“হে ধর্ম্মরাজ! আমি প্রদ্যুম্নের নিকট মহাত্মা দুর্ব্বাসার মাহাত্ম্য যেরূপে কীর্ত্তন করিয়াছিলাম, এক্ষণে আপনার নিকট তাহা কহিলাম। অতএব আপনি ব্রাহ্মণের প্রতি নিতান্ত ভক্তিপরায়ণ হইয়া তাঁহাদিগকে গোসমুদয় ও ধন প্রদানপূৰ্ব্বক তাঁহাদিগের অর্চ্চনা করুন। মহাত্মা ভীষ্ম আমার মহিমা যেরূপ কীর্ত্তন করিলেন, তাহার কিছুই মিথ্যা নহে। কিন্তু আমি ব্রাহ্মণগণের প্রসাদেই, ঐ মাহাত্ম্য লাভ করিয়াছি।”
