4 of 4

১৫৮. ধৰ্ম্মকথনে ভীষ্মের বিশ্রাম—কৃষ্ণমাহাত্মকীর্ত্তন

১৫৮তম অধ্যায়

ধৰ্ম্মকথনে ভীষ্মের বিশ্রাম—কৃষ্ণমাহাত্মকীর্ত্তন

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! আপনি কিরূপ ফল ও কিরূপ উন্নতিলাভের প্রত্যাশা করিয়া ব্রাহ্মণগণের অর্চ্চনা করেন?”

ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! এই মহামতি বাসুদেব তোমার নিকট ব্রাহ্মণগণের পূজা করিলে যেরূপ ফল ও উন্নতিলাভ হয়, তাহা কীর্ত্তন করিবেন। দেখ, অদ্য আমার বাক্য, মন, চক্ষু ও কর্ণ নিতান্ত দুর্ব্বল হইয়াছে এবং আমার জ্ঞানেরও তাদৃশ স্ফূৰ্ত্তি নাই। বোধ হইতেছে, আমার মৃত্যুর আর অধিক বিলম্ব নাই; অতি অল্পদিনমধ্যেই সূর্য্যের উত্তরায়ণ হইবে। অতঃপর আর আমি তোমাকে কিছুই কহিতে সমর্থ হইতেছি না। তোমার নিকট ব্রাহ্মণ, বৈশ্য ও শূদ্রের ধর্ম্ম প্রায় সমুদয়ই কীর্ত্তন করিয়াছি, এক্ষণে যাহা অবশিষ্ট আছে, তাহা এই বাসুদেবের মুখে শ্রবণ কর।

“আমি এই বাসুদেবকে বিলক্ষণ অবগত আছি। ইহার পূর্ব্বতন বলও আমার অবিদিত নাই। এক্ষণে তোমার ধৰ্ম্মসংশয় উপস্থিত হইলে ইনিই তাহা নিরাকরণ করিবেন। এই কৃষ্ণ স্বর্গ ও আকাশের সৃষ্টি করিয়াছেন, ইঁহার দেহ হইতে পৃথিবী সম্ভূত হয় এবং ইনিই বরাহমূর্ত্তি ধারণপূর্ব্বক ভূমণ্ডলের উদ্ধারসাধন করেন। দিঙ্মণ্ডল ও অন্তরীক্ষের উপরিভাগে ইহার আসন প্রতিষ্ঠিত। ইহা হইতে এই সমস্ত বিশ্ব নিঃসৃত হইয়াছে। এই বাসুদেবের নাভিমণ্ডল হইতে একটি পদ্ম উৎপন্ন হইয়াছিল। সেই পদ্যে স্বয়ং ব্রহ্মা জন্মগ্রহণ করিয়া গাঢ়তর অসীম অন্ধকার নিরাকৃত করিয়াছিলেন। এই কৃষ্ণ সত্যযুগে ধৰ্ম্মস্বরূপে, ত্রেতাযুগে জ্ঞানরূপে, দ্বাপরে বলরূপে ও কলিতে অধৰ্ম্মরূপে আবির্ভূত হয়েন। ইনিই দৈত্যগণকে বিনাশ করিয়াছেন। ইনিই বলিরূপে দানবগণের আধিপত্য বিস্তার করিয়াছিলেন।

“এই বাসুদেব হইতে ভূত সমুদয় উৎপন্ন হইয়াছে ও হইবে। ইনি এই জগতের রক্ষক; যখন ধৰ্ম্মের পীড়া উপস্থিত হয়, তখনই ইনি দেবতা ও মনুষ্যরূপে আবির্ভূত ও ধর্ম্মনিরত হইয়া লোক সমুদয়কে রক্ষা করেন। ইনি অসুরসংহারার্থ কাৰ্য্য ও অকাৰ্য্যের হেতু নির্দ্দেশ করিতেছেন, করিয়াছেন ও করিবেন। ঐ অসুরগণের মধ্যে যাহারা ইঁহার শরণাপন্ন হয়, ইনি কদাচ তাঁহাদিগকে বিনাশ, করেন না। ইনি সাক্ষাৎ চন্দ্র-সূৰ্য্য, রাহু ও ইন্দ্রস্বরূপ। এই বাসুদেব বিশ্বকৰ্ম্মা, বিশ্বরূপ, বিশ্বসংহারক। ইনি শূলধারী, মনুষ্যরূপী ও ভীমমূৰ্ত্তি। লোকে ইহার অদ্ভুত কৰ্ম্মপ্রভাব অবগত হইয়া ইহাকে স্তব করিয়া থাকে। রাক্ষস, গন্ধৰ্ব্ব, অপ্সরা ও দেবগণও প্রতিনিয়ত ইঁহার স্তব করেন। ইনি ধনের পুষ্টিকর্ত্তা ও একমাত্র বিজিগীষু। যজ্ঞকালে ঋত্বিগণ ইহার স্তব করিয়া থাকেন। সামবেদ ইঁহারই স্তুতিবাদ করিতেছে এবং ব্রাহ্মণগণ ব্রহ্মমন্ত্রদ্বারা ইঁহারই গুণানুবাদ করেন। যজ্ঞে ইঁহার নিমিত্ত হবির্ভাগ কল্পনা করিতে হয়। ইন্দ্রাদি দেবগণ গোবর্দ্ধনোৰ্দ্ধারণকালে ইঁহার স্তব করিয়াছিলেন। ইঁনি গবাদি পশুর অধিপতি। ইঁনি ব্রহ্মরূপ পুরাতন গুহাতে প্রবিষ্ট হইয়া পৃথিবাদি মহাভূত সমুদয়ের প্রলয় দর্শন করিয়াছিলেন।

“এই বাসুদেব অসুরগণকে বিক্ষোভিত করিয়া পৃথিবীর উদ্ধারসাধন করেন। লোকেইঁইহাকেই নানাপ্রকার ভোজ্য নিবেদন এবং ইঁহাকেই সমরবিজয়ী বলিয়া নির্দ্দেশ করিয়া থাকে। পৃথিবী, আকাশ ও স্বর্গ ইঁহারই হস্তগত। ইনিই কুম্ভমধ্যে রেতঃসৃষ্টি করিয়া ঐ রেত হইতে মহর্ষি বশিষ্ঠকে উৎপাদন করেন। ইনি বায়ু, অশ্ব, হস্তী, প্রভামণ্ডলসম্পন্ন সূৰ্য্য ও আদিদেব। ইনি পদক্ষেপে ত্রিভুবন আক্রমণ করিয়াছিলেন। ইনি দেবগণ, পিতৃগণ ও মনুষ্যদিগের সমক্ষেই প্রাদুর্ভূত থাকেন। ইনিই যাজ্ঞিকদিগের যজ্ঞস্বরূপ বলিয়া অভিহিত হয়েন। ইনি সূৰ্য্যরূপে প্রতিদিন নভোমণ্ডলে উদিত হইয়া কাল বিভাগ করেন। ইঁহারই দক্ষিণায়ন ও উত্তরায়ণ হইয়া থাকে। ইঁহারই করজাল ঊর্দ্ধভাগ, অধঃপ্রদেশ ও তিৰ্য্যগ্‌ভাবে সঞ্চরণ এবং জীবলোকে আলোক প্রদান করে।

“বেদবিৎ ব্রাহ্মণেরা ইঁহার সেবা করিয়া থাকেন। সূৰ্য্য ইঁহারই কিরণলাভ করিয়া ভূমণ্ডলে করজাল বিস্তার করেন। ইনি প্রতি মাসে যজ্ঞানুষ্ঠান করেন। ইনি বেদরূপী। বেদবিৎ ব্রাহ্মণেরা যজ্ঞানুষ্ঠানকালে ইঁহারই মাহাত্ম্য পাঠ করিয়া থাকেন। ইনি শীত, উত্তাপ ও বৃষ্টিরূপ তিন নাভিযুক্ত সংবৎসরাত্মক কালচক্রকে বহন করিয়া শীত, গ্রীষ্ম ও বর্য্যার সৃষ্টি করিতেছেন। ইনি মহাতেজস্বী, সর্ব্বগামী ও সকলের শ্রেষ্ঠ। ইনি একাকীই সকল লোককে ধারণ করিয়া রহিয়াছেন।

“হে যুধিষ্ঠির! এক্ষণে তুমি এই সৃষ্টিকৰ্ত্তা বাসুদেবের শরণাপন্ন হও। ইনি একদা হতাশনমূৰ্ত্তি পরিগ্রহ করিয়া খাণ্ডবপ্রস্থে তৃণরাশিতে 
অবস্থানপূর্ব্বক তৃপ্তিলাভ করিয়াছিলেন। ইনিই উরগ ও রাক্ষসগণকে পরাজিত করিয়া অগ্নিতে সমুদয় বস্তু আহুতি প্রদান করেন। ইনি অর্জ্জুনকে শ্বেতবর্ণ অশ্ব প্রদান করিয়াছেন। ইনিই অশ্বগণের সৃষ্টিকর্ত্তা। সত্ত্ব, রজ ও তম এই তিন গুণ যে রথের চক্র, ঊর্দ্ধ, মধ্য ও অধঃপ্রদেশে যাহার গতি, কাল, অদৃষ্ট, ইচ্ছা ও সরু এই চারিটি যাহার অশ্ব এবং শুক্ল, কৃষ্ণ ও রক্ত এই তিনটি যাহার বর্ণ সেই সংসাররথ ইঁহারই অধিকৃত। ইনিই বিশ্বসংসারের পুষ্টিসংহারকারক। ইনি অরণ্য ও পর্ব্বত সমুদয়ের সৃষ্টি করিয়াছেন।
 

“এই বাসুদেব নদী লঙ্ঘনপূৰ্ব্বক বজ্রপ্রহরণোদ্যত শত্রুকে পরাভব করিয়াছিলেন। ইনিই ইন্দ্রিয়স্বরূপ। ব্রাহ্মণেরা যজ্ঞস্থলে ঋকসহস্র দ্বারা ইঁহারই স্তব করিয়া থাকেন। ইনি ব্যতিরেকে আর কেহই মহর্ষি দুর্ব্বাসাকে গৃহে অবস্থাপন [বাস করাইতে] করিতে সমর্থ হয়েন নাই। ইনি একমাত্র পুরাতন ঋষি।

‘ইনি আপনা হইতে সমুদয়ের সৃষ্টি করিতেছেন। ইনি বেদজ্ঞ। ইনি প্রাচীন বিধিসমুদয় লঙ্ঘন করেন না। ইনি বৈদিক ও লৌকিক কর্ম্মের ফলস্বরূপ। ইনি শুক্ল, জ্যোতি, তিন লোক, তিন লোকের পালক, তিন অগ্নি ও তিন ব্যাহৃতি [ভূঃ, ভূবঃ স্বঃ] বলিয়া নির্দ্দিষ্ট হইয়া থাকেন। ইনি সংবৎসর, ঋতু, অর্দ্ধমাস, অহোরাত্র, কলা, কাষ্ঠা, মাত্রা, মুহূর্ত্ত, লব ও ক্ষণ। ইহা হইতেই চন্দ্র, সূৰ্য্য, গ্রহ, নক্ষত্র, তারা, পৰ্ব্বত, পূর্ণিমা-নক্ষত্র, যোগ ও ঋতু-সমুদয় উৎপন্ন হইয়াছে। ইনি রুদ্র, আদিত্য, বসুগণ, অশ্বিনীকুমারদ্বয়, বিশ্বদেবগণ, সাধ্যগণ, মরুদগণ, প্রজাপতিগণ, দেবমাতা অদিতি, দিতি ও সপ্তর্ষিগণের সৃষ্টিকর্ত্তা।

‘ইনি বায়ুমূৰ্ত্তি পরিগ্রহ করিয়া সমস্ত বস্তু বিক্ষিপ্ত করিতেছেন; অগ্নিমূর্ত্তি ধারণ করিয়া দগ্ধ করিতেছেন; সলিলস্বরূপ হইয়া সমুদয় বস্তু নিমগ্ন করেন এবং ব্রহ্মা হইয়া সমুদয়ের সৃষ্টি করিয়া থাকেন। ইনি সাক্ষাৎ বেদস্বরূপ হইয়াও বেদপ্রতিপাদ্য বিষয়সমুদয় জ্ঞাত হইতেছেন। ইনি বিধিস্বরূপ হইয়াও ধৰ্ম্ম, বেদ ও বলবিষয়ে যে সমস্ত বিধি বিহিত হইয়াছে, তৎসমুদয় অবলম্বন করেন। ইনি চরাচর বিশ্ব। ইনি জ্যোতিঃস্বরূপ হইয়া প্রভা দ্বারা প্রকাশিত হইতেছেন। ইনি পূৰ্ব্বে সলিল সৃষ্টি করিয়া পরে বিশ্ব সৃষ্টি করিয়াছিলেন। ইনি ঋতু, উৎপাত, বিবিধ অদ্ভুত পদার্থ, মেঘ; বিদ্যুৎ, ঐরাবত ও স্থাবরজঙ্গমাত্মক সমুদয় ভূত। ইনি বিশ্বের আধারস্বরূপ। ইনি নির্গুণ ও জীবম্বরূপ। ইনি বাসুদেব, সঙ্কৰ্ষণ, প্রদ্যুম্ন ও অনিরুদ্ধ। ইনি সকলকে স্ব স্ব কাৰ্য্যে নিয়োগ করিতেছেন। ইনি এই পঞ্চভূতাত্মক বিশ্ব সৃষ্টি করিবার অভিলাষে পৃথিব্যাদি পঞ্চ মহাভূতের সৃষ্টি করিয়াছেন। ইনি আপনার মহিমায় দেবতা, অসুর, মনুষ্য, ঋষি ও পিতৃগণকে জীবিত রাখিয়াছেন। ইনি বর্ত্তমান, ভূত ও ভবিষ্যৎ। ইনি প্রাণীগণের অন্তকালে মৃত্যুমুখে আবির্ভূত হয়েন। এই জীবলোকে যাহা প্রশস্ত, পবিত্র, শুভ ও অশুভ, ইনিই তৎসমুদয়স্বরূপ। ইনি অচিন্তনীয়, ইহা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ কল্পনা জল্পনামাত্র।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *