4 of 4

১৫৫. ব্রাহ্মণপ্রভাব-প্রসঙ্গে অগস্ত্যাদির বিভূতি

১৫৫তম অধ্যায়

ব্রাহ্মণপ্রভাব-প্রসঙ্গে অগস্ত্যাদির বিভূতি

“হে ধৰ্ম্মরাজ! ভগবান্ সমীরণ এই কথা কহিলে নরপতি কার্ত্তবীর্য্য মৌনাবলম্বন করিয়া রহিলেন। তখন পবনদেব পুনরায় তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘রাজন! এক্ষণে আমি মহর্ষি অগস্ত্যের মাহাত্ম্য কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। পূৰ্ব্বে অসুরগণ দেবতাদিগকে পরাস্ত করিয়া তাঁহাদিগের যজ্ঞ, পিতৃগণের স্বধা ও মানবগণের কর্ম্মকাণ্ডসমুদয় বিলুপ্ত করিলে, দেবগণ ঐশ্বৰ্য্যবিহীন হইয়া ভূমণ্ডলে পরিভ্রমণ করিতে লাগিলেন। একদা তাঁহারা ইতস্ততঃ সঞ্চরণ করিতেছেন, এমন সময়ে তেজঃপুঞ্জকলেবর ভাস্কর প্রতিম মহাতপাঃ মহর্ষি অগস্ত্য তাঁহাদের নেত্রপথে নিপতিত হইলেন। তখন দেবগণ ঐ মহর্ষিকে দর্শন করিবামাত্র তাঁহাকে অভিবাদনপূর্ব্বক কুশলপ্রশ্নান্তে কহিলেন, “ভগবন্! দানবগণ আমাদিগকে পরাস্ত ও ঐশ্বৰ্য্যভ্রষ্ট করিয়াছে। অতএব আপনি আমাদিগকে এই উপস্থিত ভয় হইতে পরিত্রাণ করুন।”

“দেবগণ এই কথা কহিলে মহাতেজস্বী মহর্ষি অগস্ত্য তাঁহাদের অসুরহস্তে পরাভববৃত্তান্ত-শ্রবণে ক্রোধে কল্পান্তকালীন অনলের ন্যায় প্রজ্বলিত হইয়া উঠিলেন। তখন মহর্ষির সেই ক্রোধানলপ্রভাবে অসংখ্য দানব দগ্ধ হইয়া অন্তরীক্ষ হইতে নিপতিত হইয়া শমনসদনে গমন করিতে লাগিল। ঐ সময় যেসকল দানব পৃথিবী ও পাতালতলে অবস্থান করিয়াছিল, কেবল তাঁহারাই জীবিত রহিল। নরপতি বলি ঐ সময় পাতালতলে অবস্থানপূর্ব্বক অশ্বমেধযজ্ঞের অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন।

“এইরূপে অগস্ত্যের প্রভাবে স্বর্গস্থ দানবগণ দগ্ধ হইলে দেবগণ পুনরায় স্ব স্ব স্থানে গমন করিলেন; মহর্ষি অগস্ত্যেরও ক্রোধানল নির্ব্বাপিত হইল। অনন্তর দেবগণ পুনরায় তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘ভগবন্! আপনি ভূমিস্থিত অসুরগণকে পরাজিত করুন। তখন মহর্ষি তাঁহাদিগকে কহিলেন, ‘হে দেবগণ! আমি তোমাদের অনুরোধে স্বর্গস্থ অসুরগণকে বিনষ্ট করিয়াছি, কিন্তু আর এক্ষণে আমি অসুরবিনাশে সম্মত নহি; কারণ, বারংবার দানবদলন করিলে আমার তপোবল ক্রমশঃ ক্ষয়প্রাপ্ত হইবে।

“হে মহারাজ! এই আমি তোমার নিকট মহর্ষি অগস্ত্যের মাহাত্ম্য কীর্ত্তন করিলাম। তিনি এইরূপে স্বীয় তেজঃপ্রভাবে দানবগণকে মুগ্ধ করিয়াছিলেন। এক্ষণে বল দেখি, কোন্ ক্ষত্রিয় অগস্ত্য হইতে শ্রেষ্ঠ?

“ভগবান সমীরণ এই কথা কহিলে মহাবীর কার্ত্তবীৰ্য্য তাঁহার বাক্যশ্রবণে মৌনাবলম্বন করিয়া রহিলেন। তখন বায়ু পুনরায় তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘রাজন্‌! এক্ষণে আমি মহর্ষি বশিষ্ঠদেবের মাহাত্ম্য কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। পূৰ্ব্বে দেবতাগণ মানসসরোবরতীরে যজ্ঞানুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হইলে খলীনামে পর্ব্বতাকার দানবসমুদয় উহা দর্শন করিয়া যাজ্ঞিকগণকে বিনাশ করিতে উদ্যত হইয়াছিল। ঐ দানবগণের মধ্যে যাহারা কোনক্রমে বিনষ্ট হইত তাহারা তাহাদের আত্মীয়কর্ত্তৃক ঐ মানসসরোবরে নিক্ষিপ্ত হইবামাত্র ব্রহ্মদত্ত বরপ্রভাবে তৎক্ষণাৎ জীবিত হইয়া ভীষণাকার পৰ্ব্বত ও বৃক্ষসমুদয় গ্রহণপূৰ্ব্বক সেই শতযোজনসমুত্থিত সলিলরাশি বিলোড়িত করিতে করিতে তীরে গাত্রোত্থান করিত। ঐ দৈত্যগণ বলগৰ্ব্বে মত্ত হইয়া দেবগণের প্রতি ধাবমান হইলে তাঁহারা ভয়ে পলায়নপূৰ্ব্বক ইন্দ্রের আশ্রয় গ্রহণ করিলেন। তখন দেবরাজ ইন্দ্রও তাহাদের পরাক্রমপ্রভাবে একান্ত ব্যথিত হইয়া মহর্ষি বশিষ্ঠদেবের শরণাপন্ন হইলেন। তখন মহাত্মা বশিষ্ঠদেব দেবগণকে নিতান্ত দুঃখিত বোধ করিয়া দয়ার্দ্রচিত্তে তাঁহাদিগকে অভয়প্রদান এবং অবলীলাক্রমে স্বীয় তেজঃপ্রভাবে সেই দৈত্যদিগকে এককালে ভস্মসাৎ করিলেন।

‘ঐ সময় ঐ মহর্ষির তপপ্রভাবে মহানদী গঙ্গা মানসসরোবর ভেদ করিয়া তথায় উপস্থিত হইয়াছিলেন। ঐ নদীদ্বারা সরোবর বিদীর্ণ হওয়াতে উহার নাম সরযূ হইয়াছে। যে-স্থানে সেই খলীনামে দৈত্যসমুদয় নিহত হইয়াছিল, ঐ স্থান অদ্যাপি খলীন নামে প্রসিদ্ধ রহিয়াছে।

‘হে মহারাজ! এই আমি তোমার নিকট মহর্ষি বশিষ্ঠের মাহাত্ম্য কীর্ত্তন করিলাম। তিনি এইরূপে ব্রহ্মার বরে একান্ত গর্ব্বিত দানবগণকে নিহত করিয়া ইন্দ্রাদি দেবগণের রক্ষা করিয়াছিলেন। এক্ষণে বল দেখি, কোন্ ক্ষত্রিয় বশিষ্ঠদেব অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ?”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *