4 of 4

১৫৪. ক্ষত্রিয় হইতে ব্রাহ্মণ প্রভাবের প্রাধান্য নির্ণয়

১৫৪তম অধ্যায়

ক্ষত্রিয় হইতে ব্রাহ্মণ প্রভাবের প্রাধান্য নির্ণয়

“তখন বায়ু পুনরায় কার্ত্তবীর্য্যকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘মহারাজ! পূৰ্ব্বে মহীপাল অঙ্গ যজ্ঞানুষ্ঠান করিয়া ব্রাহ্মণগণকে এই পৃথিবী দান করিতে অভিলাষী হইয়াছিলেন। পৃথিবীর অধিষ্ঠাত্রী দেবতা ঐ বৃত্তান্ত অবগত হইয়া চিন্তা করিলেন, “আমি ব্রহ্মার কন্যা, সকল প্রাণীকে ধারণ করিয়া আছি, এই মহীপাল আমাকে প্রাপ্ত হইয়া নিরপরাধে আমাকে ব্রাহ্মণসাৎ করিতে অভিলাষী হইয়াছেন। অতএব যাহাতে ইনি রাজ্যের সহিত উৎসন্ন হয়েন, আমাকে তাহার চেষ্টা করিতে হইবে। এক্ষণে আমি এই অধিষ্ঠানভূত ভূমিকে পরিত্যাগপূৰ্ব্বক ভগবান্ ব্রহ্মার নিকট গমন করি।’

ভগবতী ধরিত্রী মনে মনে এইরূপ চিন্তা করিয়া অচিরাৎ ব্রহ্মলোকে গমন করিলেন। তখন মহর্ষি কশ্যপ পৃথিবীর অধিষ্ঠাত্রী দেবতাকে ব্রহ্মলোকে প্রতি জানিতে পারিয়া যোগবলে স্বীয় দেহ পরিত্যাগপূৰ্ব্বক তৎক্ষণাৎ ভূমির অভ্যন্তরে প্রবিষ্ট হইলেন। কশ্যপ ভূমির মধ্যে প্রবেশ করাতে উহার পুৰ্ব্বাপেক্ষা সমধিক সমৃদ্ধি হইল। উহা হইতে প্রচুর পরিমাণে তৃণ ও ওষধি উৎপন্ন হইতে লাগিল এবং ভয় ও অধৰ্ম্ম তিরোহিত হইয়া গেল। মহর্ষি কশ্যপ ত্রিংশৎ সহস্র বৎসর সেই ভূমির মধ্যে অবস্থান করিলেন। তখন পৃথিবী ব্রহ্মলোক হইতে প্রত্যাগমনপূর্ব্বক মহর্ষি কশ্যপকে নমস্কার করিয়া তাঁহার কন্যাত্ব স্বীকার করিলেন।

‘হে মহারাজ! মহর্ষি কশ্যপ এইরূপ তপোবলসম্পন্ন ব্রাহ্মণ ছিলেন। অতএব বল দেখি, সেই কশ্যপ হইতে কোন্ ক্ষত্রিয় শ্রেষ্ঠ?

“ভগবান্ সমীরণ কশ্যপের এইরূপ প্রভাব কীর্ত্তন করিলে মহারাজ কার্ত্তবীৰ্য্য তাঁহার বাক্য শ্রবণপূৰ্ব্বক তূষ্ণীম্ভাব অবলম্বন করিয়া রহিলেন। তখন পবন পুনরায় তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, মহারাজ! এক্ষণে অঙ্গিরার পুত্র মহর্ষি উতথ্যের বিষয় কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। ভগবান্ চন্দ্রের এক সর্ব্বাঙ্গসুন্দরী কন্যা ছিল। চন্দ্র অনেক অনুসন্ধানের পর মহর্ষি উতথ্যকেই ঐ কন্যার অনুরূপ পাত্র বলিয়া স্থির করিয়াছিলেন। ঐ কন্যাও উতথ্যকে আপনার উপযুক্ত বিবেচনা করিয়া তাঁহার সহিত পরিণীত হইবার অভিলাষে অতি কঠোর তপানুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হইলেন। কিয়দ্দিন পরে মহর্ষি অত্রি উতথ্যকে আহ্বানপূৰ্ব্বক চন্দ্রের সেই কন্যাটি তাঁহার হস্তে প্রদান করিলেন; উতথ্যও বিধানানুসারে তাঁহার পাণিগ্রহণ করিলেন। জলাধিপতি বরুণের পূর্ব্বাবধিই ঐ সোমকন্যার পাণিগ্রহণের অভিলাষ ছিল। এক্ষণে তাঁহার সেই ইচ্ছা পূর্ণ না হওয়াতে তিনি নিতান্ত দুঃখিত হইলেন এবং একদা ঐ কন্যাকে যমুনাজলে অবগাহন করিতে দেখিয়া তথায় আগমনপূর্ব্বক তাঁহাকে গ্রহণ করিয়া স্বীয় পুরমধ্যে আনয়ন করিলেন। ঐ পুরী ছয়লক্ষ হ্রদে সুশোভিত, বিবিধ প্রাসাদসমাকীর্ণ ও সর্ব্বকামসম্পন্ন। উহা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট পুরী আর কুত্রাপি নাই। জলেশ্বর বরুণ সেই রমণীরত্নকে সেই পুরমধ্যে সমানীত করিয়া তাঁহার সহিত পরম সুখে বিহার করিতে লাগিলেন।

‘এদিকে দেবর্ষি নারদ ঐ বৃত্তান্ত অবগত হইয়া উতথ্যের কর্ণগোচর করিলেন। উতথ্য নারদের মুখে স্বীয় পত্নীহরণ-সংবাদ শ্রবণ করিয়া কহিলেন, “নারদ! তুমি অবিলম্বে বরুণের নিকট গমন করিয়া বল যে, হে জলেশ্বর! তুমি কি নিমিত্ত উতথ্যের ভাৰ্য্যা অপহরণ করিয়াছ। তুমি লোকপালক, লোকের ত’ বিলোপক নহ? ভগবান চন্দ্র উতথ্যকে কন্যা সম্প্রদান করিয়াছেন: তুমি কেন সেই কন্যা অপহরণ করিলে? যাহা হউক, তুমি উতথ্যকে তাঁহার ভাৰ্য্যা প্রত্যর্পণ কর।” উতথ্য এইরূপ আদেশ করিলে দেবর্ষি নারদ তাঁহার বাক্যানুসারে বরুণের নিকট গমন করিয়া! কহিলেন, “জলেশ্বর! তুমি মহর্ষি উতথ্যের পত্নী অপহরণ করাতে তিনি তোমার উপর অত্যন্ত বিরক্ত হইয়াছেন। তুমি কি নিমিত্ত তাঁহার ভার্য্যা অপহরণ করিলে?” বরুণ তাঁহার মুখে ও এইরূপ বাক্য শ্রবণ করিয়া কহিলেন, “নারদ! তুমি আমার বাক্যানুসারে সেই মহর্ষিকে কহিও যে, এই সর্ব্বাঙ্গসুন্দরী নারী আমার নিতান্ত প্রিয়। আমি ইহাকে কদাচ পরিত্যাগ করিতে পারিব না।” জলধিপতি এই কথা কহিলে, মহর্ষি নারদ অচিরাৎ উতথ্যের নিকট গমনপূর্ব্বক অপ্রফুল্লমনে তাঁহাকে কহিলেন, “তপোধন! বরুণের নিকট গমনপূৰ্ব্বক তাঁহাকে তোমার ভাৰ্য্যা প্রতার্পণ করিতে সবিশেষ অনুরোধ করিয়াছিলাম, তাহাতে সে ক্রোধাবিষ্ট হইয়া আমাকে গলহস্ত প্রদানপূৰ্ব্বক বিদায় করিয়াছে। সে কিছুতেই তোমাকে প্রদান করিবে না। অতঃপর তোমার যাহা কর্ত্তব্য হয়, কর।” দেবর্ষি নারদ এই কথা কহিবামাত্র মহর্ষি উতথ্য বরুণের প্রতি নিতান্ত ক্রূদ্ধ হইয়া অচিরাৎ সলিল সমুদয় স্তম্ভনপূর্ব্বক পান 
করিতে আরম্ভ করিলেন। ঐ সময় নীরাধিপতি বরুণ উতথ্যকর্ত্তৃক সলিল-সমুদয় পীয়মান দেখিয়া এবং সুহ্যৃদগণকর্ক্তৃক বারংবার তিরস্কৃত হইয়াও সেই সোমকন্যাকে পবিত্যাগ করলেন না।
 

‘অনন্তর মহর্ষি উতথ্য ক্রোধভরে ভূমিকে আহ্বানপূৰ্ব্বক কহিলেন, “ধরিত্রি! এখন তোমার সেই ছয় লক্ষ হ্রদযুক্ত স্থান কোথায়?” মহর্ষি উতথ্য এই কথা কহিবামাত্র সমুদ্র তৎক্ষণাৎ বরুণের পুর হইতে অপসৃত হইল এবং সেই স্থান ঊষরক্ষেত্রের ন্যায় নিরীক্ষিত হইতে লাগিল। তখন মহর্ষি উতথ্য সরস্বতীকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, “ভদ্রে! তুমি অবিলম্বে এই স্থান হইতে অপসৃত হইয়া মরুদেশে প্রবাহিত হও। এই স্থানটি তোমাকে পরিত্যক্ত হইয়া অপবিত্র হউক।” স্রোতস্বতী উতথ্যের এইরূপ আদেশ প্রাপ্ত হইবামাত্র তৎক্ষণাৎ তথা হইতে অপসৃত হইলেন। তখন বরুণ স্বীয় পুরী নিতান্ত জলশূন্য দেখিয়া ভীতচিত্তে সেই সোমকন্যাকে গ্রহণপূৰ্ব্বক উতথ্যকে প্রদান করিয়া তাঁহার শরণাগত হইলেন। মহর্ষি উতথ্য ভাৰ্য্যাকে পুনরায় প্রাপ্ত হইয়া প্রসন্নভাব ধারণপূৰ্ব্বক সমুদয় জগৎকে জলকষ্ট হইতে ও বরুণকে এই বিপজ্জাল হইতে নিম্মুক্ত করিয়া দিলেন।

“অনন্তর তিনি বরুণকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, ‘জলধিরাজ! এই আমি স্বীয় তপোবলে তোমাকে নিতান্ত বিষণ্ণ করিয়া স্বীয় ভাৰ্য্যা প্রত্যাহরণ করিলাম। অতঃপর আর তোমার ইহার নিমিত্ত রোদন করা বৃথা।’ মহর্ষি উতথ্যের এইরূপ প্রভাব ছিল, এক্ষণে বল দেখি, কোন্ ক্ষত্রিয় তাহা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ?’ ”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *