সারপ্রাইজ
‘অনেকক্ষণ ওয়েট করছ?’ কাচের দরজা ঠেলে হন্তদন্ত হয়ে মলে ঢুকতেই অদ্রিকা মুখোমুখি হল প্রমিতের। কালো আর চকোলেটের একটা জমকালো কম্বিনেশনের লং ড্রেস পরেছে সে। পোশাকের ঘেরে ব্রোকেড বেনারসি পাড়। শিফন ফুলস্লিভের উপর ও নীচে দু-দিকেই ব্রোকেড বর্ডার অভিনবত্ব এনেছে পোশাকে। মাথার একদিক থেকে সরু সরু গোছা করে চুল নিয়ে পাকিয়ে হেয়ার পিন দিয়ে অন্যদিকে আটকানো। তারপর সবটুকু নিয়ে খোঁপা করা। মাঝে একটা ফ্যাশনেবল কাঁটা। প্রমিত হাঁ করে তাকিয়ে আছে অদ্রিকার দিকে। অনেক সুন্দরী দেখেছে সে জীবনে, কিন্তু এই সৌন্দর্যপ্রস্রবণের সামনে সবকিছুই ম্লান মনে হয়।
‘না না, এই তো দশ মিনিট।’ প্রমিতের ঠোঁটে হালকা হাসির রেখা। অদ্রিকার সঙ্গে প্রথম ডেটিংয়ে এসেছে, দশ মিনিট অপেক্ষা করতে হবে না? যদিও অপেক্ষা প্রমিতের পোষায় না, আর ঠাকুরের কৃপায় অপেক্ষা কখনো করতেও হয়নি তাকে, তবু আজকের দিনটা তো স্পেশাল। অদ্রিকার সঙ্গে কারো তুলনা হয় নাকি? মলের ভিতর দুজনে হালকা পায়ে হাঁটছে। এর আগে এই মলে প্রমিত কখনো আসেনি, অদ্রিকাও না। ইতস্তত হাঁটতে হাঁটতে বেশ অনেকটা এগিয়ে গিয়ে একটা খাওয়ার জায়গা দেখতে পেল ওরা। প্রচুর সোফা সাজানো আছে গোল করে। প্রত্যেকটা সোফার সঙ্গে একটা করে ডাইনিং টেবিল। টেবিলের উপরের অংশটা কাচের, সেখানে ঝকঝকে কাচের গ্লাস উপুড় করে রাখা, পাশে মেনু কার্ড। ‘চলো, ওখানেই বসি।’ প্রমিতের প্রস্তাবে দুজনে গিয়ে অপেক্ষাকৃত নির্জনে একটা সোফায় পাশাপাশি বসল। দুজনের মাঝে অদ্রিকা রাখল ওর ছোট্ট স্টাইলিশ লেদার ব্যাগটা।
‘কী খাবে বলো।’ প্রমিত এই প্রথম অদ্রিকার চোখে চোখ রাখল। হার্বাল কাজল দিয়ে আইলাইন-করা চোখ। লোয়ার লাইনে গাঢ় করে কাজল লাগানো। এতে স্বাভাবিকের থেকে চোখগুলো অনেক বড়ো দেখায়। লম্বা ঝোলা কানের দুল অনেকটা নেমে এসে মোহময়ী করে তুলেছে অদ্রিকাকে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে সে আদুরে গলায় উত্তর দিল, ‘খিদে নেই গো, যাহোক হালকা কিছু…’
‘তাহলে কফি হোক।’ প্রমিত বিড়বিড় করে বলল। অদ্রিকা আপত্তি না-করায়, ওয়েটারকে চোখের ইশারায় ডেকে নিয়ে দুটো কফির অর্ডার দিল প্রমিত। ওয়েটার কাচের গ্লাসে জল ঢালতে ঢালতে বলল, ‘ও.কে. স্যার।’
পার্ক সার্কাসে অদ্রিকার মাসির বাড়ি। প্রমিতের ডাকে সাড়া দিতে বর্ধমান থেকে সে মাসির বাড়িতে এসে উঠেছে। ওর মা-র শরীরটা ভালো নেই একদম, কালকেই আবার বাড়ি ফিরে যাবে সে। ‘আর-একটা দিন থেকে গেলে হয় না?’
প্রমিতের আর্তিটা বোঝে অদ্রিকা, ‘অমন করে না রনি! আমাদের কি আর দেখা হবে না? সারাজীবন পড়ে আছে…’
‘আমার মন খারাপ করবে খুব!’
‘ভালোবাসলে তো মন খারাপ করবেই, রনি। ভালোবাসারই তো আরেক নাম মন খারাপ!’
‘তবু…’
‘তবু ভালো যখন বেসেছি, জেনে রেখো, তোমার অদ্রিকা তোমাকে ছেড়ে কোনোদিন যাবে না।’ প্রমিতকে বলতে না দিয়েই আপন আবেগে কথাগুলো বলে ফেলল অদ্রিকা!
‘কেন ভালোবাসলে আমায়?’
‘এর উত্তর কি আমি জানি?’ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে আবার বলতে লাগল অদ্রিকা, ‘তবে এটুকু জানি, যে ভালোবাসায় কোনো পরিণতির লক্ষ্য থাকে না, সে ভালোবাসা হয় নিঃস্বার্থ। আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই তো প্রকৃত ভালোবাসা!’
‘একদম ঠিক!’ প্রমিত সমর্থন করল।
‘যদি তুমি বিবাহিত না হতে, হয়তো আমাদের ভালোবাসাটাই একদিন স্বার্থের চক্করে পড়ে ফ্যাকাশে প্রাণহীন হয়ে যেত!’
ওয়েটার কফি দিয়ে গিয়েছে অনেকক্ষণ। সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই প্রমিতের। সে অদ্রিকার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি সারাজীবন আমাকে ভালোবাসবে?’
‘ওই যে বললাম, তোমার কাছ থেকে তো আমার পাওয়ার কিছু নেই। সব জেনেশুনেই তো ভালোবেসেছি। জাস্ট ভালো না বেসে পারব না বলেই তো ভালোবেসেছি…’
প্রমিত দেখল, আবেগ লুকোতে অদ্রিকা কফিতে চিনি মেশাতে শুরু করল, ‘বেশি চিনি দিলাম না, বেশি চিনি খাওয়া ঠিক নয়।’
‘একদম।’ প্রমিত স্থির তাকিয়ে আছে অদ্রিকার মুখের দিকে।
‘জানো, এই শপিং মলটা থেকে আমার মাসির বাড়ি মাত্র আড়াই কিলোমিটার, তবু কখনো আসা হয়নি আগে। আজ তোমার সঙ্গেই প্রথম…’ অদ্রিকা মৃদু হাসল।
চতুর্দিকের সোফায় নানা পোশাকের নর-নারী নানারকম খাবার খাচ্ছে। প্রমিতেরও খাবার ইচ্ছে হল কিছু, ‘আর কিছু অর্ডার করি?’
‘না গো, আমি আর খাব না কিছু। তুমি কিছু খাও-না প্লিজ…’
‘না না, তা কী করে হয়!’ প্রমিত কফি মগ সরিয়ে রাখল, ‘নেক্সট দিন কিন্তু অনেকটা সময় নিয়ে আসবে। আমরা অনেকক্ষণ একসঙ্গে কাটাব।’
‘নিশ্চয়ই, প্রে করো, আমার মা যেন তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে যায়।’
‘তোমার মা খুব তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে যাবেন।’
‘আসলে কী বলো তো, আমিই একমাত্র সন্তান, বাবা মারা গিয়েছে সে অনেক বছর হল…’
‘বুঝতে পেরেছি। মা-কে ভালো করে তোলার দায়িত্বটা সম্পূর্ণই তোমার।’
‘একটা চাকরির খুব দরকার। চেষ্টা চালাচ্ছি। দেখি কতদূর কী…’
‘যে দায়িত্বটা তোমার, সেটা তো আল্টিমেটলি আমারই, কারণ তুমি মানুষটাই তো আমার।’ প্রমিত লাজুক হাসল।
‘তুমি আমাকে লড়াই করার মনোবলটুকু দিয়ো। ব্যাস, আর কিছু দরকার নেই।’ অদ্রিকা ফিসফিস করে বলল, ‘মাঝে মাঝে বড়ো একা লাগে। সব সময়ে পাশে থেকো। তুমি আমার বিরাট বড়ো একটা মেন্টাল সাপোর্ট, রনি।’
সন্ধে গড়িয়ে রাত নেমেছে প্রকাণ্ড শপিং মলের করিডোরে। আর বোধহয় দেরি করা উচিত নয়। তবু ছেড়ে যেতে মন চায় না কারো। ‘তোমাকে হোয়াটসঅ্যাপে না পেলে মন খারাপ হয়ে যায় খুব। সব সময়ে অন থেকো কিন্তু।’ অদ্রিকার আবদারে সম্মতির হাসি হাসল প্রমিত। কফির বিল মিটিয়ে ধীরপায়ে অনেকটা হেঁটে ভারী কাচের গেট ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এল দুজনে। অদ্রিকাকে একটা অটোয় তুলে দিয়ে, নিজের গাড়িতে উঠে বসল প্রমিত।
দুই
‘কেমন দেখলি?’ অবিন ভীষণ কৌতূহলী।
‘সে তো অনেক আগেই হয়ে গিয়েছে, ইয়ার!’ প্রমিত অবিনের পাশে এসে বসল।
‘শোন, ফেসবুকে দেখা আর বাস্তবে দেখায় অনেক তফাত।’ অবিন বাজি ধরার ভঙ্গিতে বলল, ‘এমন অনেক ফেসবুক-সুন্দরী আছে, বাস্তবে হাজির হলে-না আমাদের ময়না-পেঁচির কাছেও হার মেনে যাবে!’
‘অদ্রিকাকে ফেসবুকে যেমন দেখেছিস,’ প্রমিত গম্ভীর হয়ে বলল, ‘ও তার চেয়েও সুন্দরী!’
‘আরে ইয়ার, এ তো দারুণ খবর! আর মনটা? মনটা কেমন দেখলি? এটাই তো আসল প্রশ্ন! ও কি সত্যিই ভালোবেসেছে তোকে? ফেসবুকের গোলা-গোলা কথাগুলো কি সত্যি সত্যিই ভালোবেসে বলা?’
অদ্রিকা যেদিন ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছিল প্রমিতকে, সেদিন থেকেই অবিন সমস্ত ঘটনার সাক্ষী। আজ পর্যন্ত অদ্রিকার সমস্ত মেসেজ প্রমিত দেখিয়েছে অবিনকে। ইন ফ্যাক্ট, এই সম্পর্ক তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যাপারটায় অবিনই প্রমিতের প্রধান পরামর্শদাতা। অবিন জানে, কেন মেয়েরা প্রমিতের জন্য পাগল। এই পাগলামির এক এবং একমাত্র কারণ, প্রমিতের বিশাল অর্থনৈতিক প্রতিপত্তি। হাওড়া জেলার অন্যতম ধনী ব্যবসায়ী সে! বাবার আমলে তাদের ব্যাবসা উন্নতির শিখর স্পর্শ করেছিল। সম্প্রতি পিতৃবিয়োগের পর উত্তরাধিকারসূত্রে এখন সমস্ত কিছুর মালিক এই প্রমিত সেন। যদিও বাবার মতো অভিজ্ঞতা কিংবা তীক্ষ্ন বুদ্ধি কোনোটাই প্রমিতের নেই, আর কোনোদিন হবেও না, তবু তল্লাটের পরিচিত প্রায় সব মেয়েই তাকে স্বামীরূপে পাওয়ার বাসনায় ব্যাকুল। আর এখানেই যত বিপত্তি। প্রমিত সেন ঠকবার পাত্র নয়। মেয়েরা তার টাকাকে বিয়ে করবে, তাকে নয়— এটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারবে না। তাই বিগত দু-আড়াই বছর ধরে যতগুলো প্রেম করেছে প্রমিত, কিংবা তার মা যতগুলো সম্বন্ধ ঠিক করেছেন, কোনোটাই শেষ পর্যন্ত বিয়ের পিঁড়িতে নিয়ে যায়নি সে, কারণ প্রতি ক্ষেত্রেই তার মনে হয়েছে, প্রেমিকা বা হবু পাত্রী তাকে নয়, ভালোবাসে তার টাকাকে। শেষমেশ অবিনই বুদ্ধি জুগিয়েছিল, ‘তুই এক কাজ কর, এরপর থেকে যেসব মেয়ে তোর প্রতি অনুরক্ত হবে, তাদের সব্বাইকে বলবি, তুই বিবাহিত। যাদের বিয়ের ধান্দা থাকবে, তারা দেখবি, নিমেষে কেটে পড়বে। যারা কাটবে না, জানবি তারা ভালো বন্ধু। এই ভালো বন্ধুদের মধ্যে থেকেই তোকে ভালো বউ খুঁজে নিতে হবে।’
মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে ছিল প্রমিত, তারপর হাত দুটো চেপে ধরে বলেছিল, ‘ফ্যান্টাস্টিক! আজ থেকে তুই আমার গুরু রে, অবিন! তোর তুলনা নেই!’ সেই থেকে সত্যি সত্যিই অবিনকে গুরু বানিয়ে ফেলেছে প্রমিত।
সেন্টার টেবিল থেকে সিনেমার ম্যাগাজিনটা হাতে তুলে নিয়ে প্রমিত বলল, ‘আরে, ফেসবুকে ওই গোলা-গোলা কথাগুলো তো অদ্রিকা আমায় ম্যারেড জেনেও পাঠিয়েছিল! সবই তো জানিস! তোর থিয়োরিমতো, তাহলে তো ওর কোনো ধান্দা নেই, এগুলো ভালোবেসেই বলা!’ অবিনকে নিরুত্তর দেখে সে আবার বলতে লাগল, ‘মেয়েটা সত্যিই ভালোবাসে আমায়; ওর হাবভাব, চাউনি, কথাবার্তা—সবই তা-ই বলে। ও বলেছে, যে ভালোবাসায় কোনো লক্ষ্য বা গোল থাকে না, সেই ভালোবাসাই হয় প্রকৃত। তাই আমি ম্যারেড হলেও ও আমাকে ভালোবাসে, কারণ এটা ট্রু লাভ!’
‘অদ্রিকা যে শিয়োরলি জানে তুই ম্যারেড, এটা কী করে স্যাঙ্গুইন হলি?’
‘মানে?’
‘এমনও তো হতে পারে, অদ্রিকা কোনোভাবে জানে তোর প্ল্যানটা!’
‘এরকম কোনো পসিবিলিটি নেই।’
‘আলবাত আছে! কারণ, ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টটা ও-ই পাঠিয়েছিল, তুই না।’
‘তা ঠিক, কিন্তু আমাদের যারা কমন ফ্রেন্ড আছে, তারাও আমাকে সেভাবে চেনে না, সকলেই বাইরের। আর অদ্রিকা তো বর্ধমানের মেয়ে। আমি বা আমাদের বিজনেস সম্পর্কে ওর কোনো পূর্বধারণা ছিল না।’
‘তাহলে বলছিস, সঠিক জীবনসঙ্গী পেয়ে গিয়েছিস?’
‘আমার তো তা-ই মনে হচ্ছে।’ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রমিত উত্তর দিল।
‘কিন্তু এখনই বলিস না কিছু। আরও একটু বাজিয়ে নে।’ অবিন বিজ্ঞের মতো বলল, ‘আমি ঠিক সময়ে ঠিক কী করতে হবে, বলে দেব, বুঝলি?’ প্রমিত সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ল।
তিন
রাত্রি দশটা বাজে। তাড়াতাড়ি ডিনার সেরে চ্যাটে এসেছে প্রমিত। অদ্রিকা পিং করেই রেখেছে, ‘লাভ ইউ। ডার্লিং!’
‘সরি, একটু দেরি হল। লাভ ইউ টু।’ প্রমিত উত্তর দিল।
‘বউ কী করছে? তুমি আমার সঙ্গে সময় কাটালে বউ রাগ করবে না?’
‘শতরূপা আমার পার্সোনাল ব্যাপারে কম ইন্টারফেয়ার করে। যথেষ্ট স্পেস দেয় আমাকে।’
‘ওলে বাবা লে! তোমার কাছে চলে যাই তাহলে? দেখব কেমন স্পেস দেয়!’
‘সে আসতেই পারো, তবে আমার বউ এখন বাপের বাড়ি।’
‘সেটা কোথায় গো?’
‘এখানেই। কদমতলাতেই!’
‘ও আচ্ছা, পাশাপাশি বাড়ি?’
‘না, কিছুটা দূরে। আচ্ছা, আমাদের কি আলোচনার আর কোনো বিষয় নেই?’
‘আচ্ছা বলো।’
‘কাকিমা কেমন আছেন?’
‘ভালো নেই গো!’
‘কোনো ইমপ্রূভমেন্ট?’
‘না!’ অদ্রিকা অফলাইন হল। মিনিট দশেক পর ফিরে এসে লিখল, ‘সরি, মা-কে ওষুধ খাওয়াতে গিয়েছিলাম। তোমার ডিনার হল?’
‘হ্যাঁ, অনেকক্ষণ। তোমার?’
‘আমারও। তোমাদের বিজনেস কেমন চলছে?’
‘চলছে একরকম…’ এ কথা লিখেই প্রমিতের মনে হল, অদ্রিকাকে তো বিজনেসের খুঁটিনাটি বিষয়ে অবহিত করা উচিত! আজ না হোক কাল, তাকে তো সব শিখিয়ে-পড়িয়ে নিতে হবে। প্রকৃত সহধর্মিণী তো সহকর্মিণীও হয়! তা ছাড়া অবিন বলে, শুধু অবিন কেন, সবাই বলে, প্রমিতের ব্যাবসায়িক বুদ্ধিশুদ্ধি খুবই কম! বাবার মতো চারিত্রিক সততাও তার নেই যে, স্রেফ ওই একটা জিনিসে ভর করে বিজনেস গুডউইল অক্ষুণ্ণ রাখতে পারবে! যেকোনো উপায়ে প্রফিট করাই যে বিজনেসের গোল নয়, অস্থিরমতি প্রমিত সেন তা জানে না। বাবার মৃত্যুর পর পরই একবার খুব খারাপ মানের মেটিরিয়াল এনে প্রমিতকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছিল। সুনামও যথেষ্ট নষ্ট হয়েছে বিজনেসের।
হাওড়ার পঞ্চাননতলার জনৈক সুপ্রতিম বাগচি বাড়ির জানালার গ্রিল, সিঁড়ি ও ছাদের রেলিংয়ের জন্য প্রমিতদের দোকান থেকে তিন লক্ষ বাইশ হাজার টাকার স্টেনলেস স্টিল কিনেছিলেন। কিন্তু স্টিলের কাজ শেষের কয়েক মাসের মধ্যেই তাতে মরচে ধরে যায়। এ ব্যাপারে সুপ্রতিমবাবু প্রমিতকে জানানোর পরেও, সে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে, নানা অজুহাতে বিষয়টা এড়িয়ে যায়। হাল ছাড়েননি সুপ্রতিমবাবু। বাড়ির ওই স্টিলের নমুনা তিনি পরীক্ষা করান কলকাতার এক সরকার অনুমোদিত ল্যাবরেটরিতে। সেখানে প্রমাণিত হয়, এই স্টিলের মান অত্যন্ত খারাপ। এরপরই ক্রেতা সুরক্ষা আদালতে মামলা করেন সুপ্রতিমবাবু। জেলা ক্রেতা সুরক্ষা আদালত উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর, তিন লক্ষ বাইশ হাজার টাকা চল্লিশ দিনের মধ্যে সুপ্রতিমবাবুকে ফেরত দেওয়ার জন্য প্রমিত সেনকে নির্দেশ দেয়। এরপরেও প্রায় এক বছর কেটে গিয়েছে, সে টাকা আজও ফেরত দেয়নি প্রমিত। উলটে সে-ই আবার উচ্চতর আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে ওই নির্দেশের বিরুদ্ধে। প্রমিত জানে, এটা ঠিক করেনি, অন্যায় করেছে, তবু সে নিজেকে সংশোধন করতে পারে না। আর এই চারিত্রিক অসততাই তাদের ব্যাবসায়িক সুনাম একটু একটু করে নষ্ট করতে শুরু করেছে, আর একদিন তা চিরতরে শেষও করে দেবে মনে হয়। আজ বাবা বেঁচে থাকলে, টাকা ফেরত না-দেওয়া তো অনেক দূরের ব্যাপার, নিম্নমানের স্টিল দোকানে ঢুকতেই দিতেন না। অথচ প্রমিত জেনেবুঝেই সমস্তটা করেছে, করেছে অতিরিক্ত লাভের জন্য। সাত-পাঁচ ভেবেই সে কথাটা পাড়ল অদ্রিকার কাছে। পুরো ব্যাপারটা হালকা করে ছুঁয়ে দিয়ে সে লিখল, ‘কেস চলছে, প্রচুর খরচ হয়ে যাচ্ছে। সুপ্রতিমবাবুকে টাকাটা দিয়ে দিলেই বোধহয় ভালো করতাম!’
‘না, করতে না।’ প্রমিতকে অবাক করে মেসেজ এল অদ্রিকার!
‘কেন?’
‘যা শুনছি, এটা তো একটা প্রেস্টিজ ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। তোমার সম্মানটা তো আগে বাঁচাতে হবে। আর আমার কাছে সেটার দাম সব চেয়ে বেশি!’ মেসেজটা পড়ে মুগ্ধ হয়ে গেল প্রমিত। সে বেশ কয়েকটা ঠোঁটের ছবি পাঠাল। উত্তর এল, ‘ধৈর্য ধরে কেস চালিয়ে যাও, তুমি জিতবেই।’ এরপর ফের কয়েকটা স্মাইলি!
চার
সুপ্রতিমকে টাকা ফেরত না-দেওয়ার জন্য প্রমিতের আদালতের শরণাপন্ন হওয়াটা কেউ সমর্থন করেনি। শুধু একজন করল, অদ্রিকা। গর্বে বুকটা ভরে উঠেছে প্রমিতের। কেউ তার পাশে না থাকলেও, অদ্রিকা আছে। একেই বোধহয় বলে সত্যিকারের ভালোবাসা! আর এক মুহূর্ত দেরি করতে চায় না প্রমিত। সে এক্ষুনি অদ্রিকাকে বলে দিতে চায়, সে আর কারো নয়, শুধু অদ্রিকার। অদ্রিকাকে সে ঘরনি করে নিয়ে আসতে চায় যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। এত রাতেই সে অবিনকে ফোন করল, ‘শোন অবিন, আমি আর দেরি করতে চাই না, এক্ষুনি অদ্রিকাকে সব বলে দিতে চাই! তুই পারমিশন দে।’
‘তুই নিশ্চিত? ও তোকে সত্যিই ভালোবাসে?’
‘হান্ড্রেড পার্সেন্ট।’
‘ইটস ও.কে.! তুই কাল সকালে ওকে ফোন করে বল, তুই ওর সঙ্গে মিট করতে চাস। একটা সারপ্রাইজ আছে। এসব কথা কি ফোনে বলে, বুদ্ধু?’
‘ও.কে. ইয়ার! থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ…’
সারারাত উত্তেজনায় কেটেছে প্রমিতের। একটুও ঘুম হয়নি। এর আগে অনেকবার প্রেমে পড়েছে প্রমিত, কিন্তু এরকম অভিজ্ঞতা আগে কখনো হয়নি। এবার যেন সবকিছুই অন্যরকম। সকাল সকাল সে অদ্রিকাকে রিং করল। উত্তেজনায় কাঁপছে তার গলা, ‘শোনো ডার্লিং, তোমার জন্য একটা দারুণ সারপ্রাইজ আছে!’
‘ওয়াও! বলো কী?’
‘এ কথা ফোনে বলা যায় না! উইশ টু মিট ইউ! যত তাড়াতাড়ি সম্ভব!’
‘রনি, আমি মা-কে নিয়ে একটু বাইরে যাচ্ছি। খুব তাড়াতাড়ি! ফিরে এসে তোমার সঙ্গে মিট করব।’
‘কোথায় যাচ্ছ?’
‘চেন্নাই। একটা সার্জারি করাতেই হবে। এ ছাড়া কোনো উপায় নেই গো।’
‘কবে যাচ্ছ?’
‘টিকিট পেয়ে গেলেই! মেসোমশাই নেটে সার্চ করছেন কাল থেকে, মনে হয়, জেট এয়ারওয়েজে খুব তাড়াতাড়ি পেয়ে যাব।’
‘কীরকম খরচ সার্জারিতে?’
‘মোটামুটি সাড়ে তিন! তার বাইরে আনুষঙ্গিক যা খরচ, সেটা মেসোমশাই দেখছেন।’
‘আর ওই সাড়ে তিন?’
‘আমার কিছু গয়না আছে।’ অদ্রিকা নিচু গলায় বলল, ‘বাবার স্মৃতি! কিন্তু মা যে আরও অনেক বেশি দামি!’
‘আর আমার বুঝি কোনো দাম নেই?’
‘মানে?’
‘বাবার দেওয়া গয়নাগুলো বিক্রি করে দিতে পারো, আর ওই সামান্য টাকাটা আমার কাছে নিতে পারো না?’
‘তুমি তো আছই রনি… তুমি আমার বিরাট সাপোর্ট।’
‘তবে আর কথা বোলো না, টাকাটা কীভাবে পাঠাব বলো।’
‘প্লিজ রনি, আমি ম্যানেজ করে নেব। যেদিন পারব না, সেদিন সত্যিই তোমাকে বলব, আই প্রমিস!’
‘তুমি যদি এই সামান্য হেল্পটুকু করার সুযোগ না দাও আমায়, তাহলে জানব, আমাদের ভালোবাসা মিথ্যে! আমি তোমার কেউ না।’ প্রমিত ছদ্মরাগ দেখাল!
অদ্রিকা গলে গেল এইবার, ‘আচ্ছা বাবা, তুমি আমার মাসিমণির অ্যাকাউন্টেই ড্রপ করো! কী রাগ ছেলের। পাগল একটা! সত্যি পাগল!’ অদ্রিকার মিষ্টি হাসি আর আদুরে সম্বোধনে আনন্দে আত্মহারা হল প্রমিত। সে কিছুক্ষণের মধ্যেই অদ্রিকার দেওয়া সুদক্ষিণা রায়ের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সাড়ে তিন লাখ টাকা আর.টি.জি.এস. করল মোবাইল ব্যাঙ্কিংয়ের মাধ্যমে।
পাঁচ
অবিন এসেছে হন্তদন্ত হয়ে। মুখ-চোখ থমথমে। প্রমিতের মুখোমুখি হতেই সে বলল, ‘একটা ব্যাড নিউজ আছে!’
‘মানে? কী হয়েছে?’
‘আমার মনে হচ্ছে, তুই চিটেড হয়েছিস!’
‘হোয়াট ডু ইউ মিন?’
‘অদ্রিকার ছবিটা একবার বের কর।’ অবিন ব্যাকুল হয়ে তাকিয়ে আছে প্রমিতের ফোনের দিকে। প্রমিত ফেসবুক থেকে সেভ করা অদ্রিকার ছবিগুলো গ্যালারি খুলে একের পর এক দেখাতে লাগল অবিনকে। অবিন বেশ উত্তেজিত গলায় বলে উঠল, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, এই মেয়েটাকেই আমি দেখলাম! নির্ঘাত এই মহিলাই! আমার ভুল হতে পারে না ইয়ার, আয়্যাম ড্যাম শিয়োর…’
‘মানে? কী বলছিস? কোথায় দেখলি?’
‘অ্যান্ড শি ইজ ম্যারেড। নট অনলি দ্যাট, তার একটা বাচ্চাও আছে! পুঁচকে।’
‘একদম বাজে বকিস না অবিন! ভাল্লাগে না।’
‘বিশ্বাস কর তুই।’
‘কোথায় দেখেছিস? কবে দেখেছিস?’
‘এই কিছুক্ষণ আগে। রিলায়েন্সের শপিং মলে!’
‘অদ্রিকা এখন প্লেনে! শি ইজ গোয়িং টু চেন্নাই।’
‘হতে পারে না! ভদ্রমহিলা বেশ কিছু জিনিসপত্র কিনলেন। আমি ফলো করছিলাম। শেষে যখন বিল মেটাচ্ছেন, আমি ঠিক পিছনে গিয়ে দাঁড়িয়েছি। কাউন্টারের লোকটা নাম জিজ্ঞেস করলেন ক্যাশ মেমোতে টাইপ করার জন্য। উনি বললেন…’
‘উনি কী বললেন? কী নাম বললেন উনি?’ অবিনকে শেষ করতে না দিয়েই লুকোনো উত্তেজনা প্রকাশ করে ফেলল প্রমিত।
‘মিসেস সুদক্ষিণা!’
‘হায় ভগবান! সুদক্ষিণা রায় অদ্রিকার মাসির নাম।’ ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল প্রমিতের।
‘কিন্তু দুটো মানুষের এত মিল? এ কি সম্ভব?’ অবিনের চোখে-মুখে তখনও অবিশ্বাস।
‘হতেই পারে! মাসি-বোনঝির চেহারায় মিল থাকা কি খুব অসম্ভব?’ প্রমিত কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল, ‘মনে হচ্ছে, তোকে আর গুরুদেবের আসনে রাখা যাবে না, বুঝলি অবিন?’
অবিন আমতা আমতা করে বলল, ‘কিন্তু তুই যে বলেছিলি হাওড়ায় অদ্রিকাদের কেউ নেই! ওর মাসির বাড়ি যে হাওড়ায়, সেটা তো আমায় বলিসনি!’
‘হাওড়াতে নয় তো! মিসেস সুদক্ষিণার বাড়ি পার্ক সার্কাস। তোকে বলেছিলাম না?’
‘কলকাতার পার্ক সার্কাস?’ অবিন যেন আকাশ থেকে পড়ল, ‘সেখান থেকে হাওড়ার ছোট্ট শপিং মলে শপিং করতে আসে কেউ? আসা সম্ভব? এইটুকু কমন সেন্স নেই তোর?’
‘হয়তো এখানে রিলেটিভ আছে। থাকতেই পারে।’ তাচ্ছিল্যের হাসি প্রমিতের ঠোঁটে।
‘আমার তবু খটকা লাগছে রে! তুই এক কাজ কর, এক্ষুনি অদ্রিকাকে ফোন কর, কথা বল।’
প্রমিত মোবাইলটা বের করে রিং করার চেষ্টা করল। ফোন সুইচড অফ। তারপর অবিনের দিকে তাকিয়ে গোল-গোল চোখ করে বলল, ‘প্লেনে কেউ ফোন খুলে রাখে? শুনেছিস?’
‘ও আচ্ছা, কখন নামবে?’
‘এখনও মিনিট পনেরো ধর।’
‘তুই ফেসবুকে একটা মেসেজ করে রাখ।’
‘অদ্রিকা নেমেই আমায় জানাবে।’
‘তবু…’
‘কী লিখব?’
‘যা ইচ্ছে।’
নেট অন করে প্রমিত ফেসবুকে এল। খুলতে চেষ্টা করল অদ্রিকার প্রোফাইলটা। এ কী! কোথায় অদ্রিকা? তাকে দেখা যাচ্ছে না কেন? পরদা জুড়ে লেখা—”কনটেন্ট নট অ্যাভেলেবল”! এ লেখা তো বড়ো বিপজ্জনক! প্রমিত জানে, এ লেখা কেন আসে, কখন আসে! ‘প্লেনে থাকলে কি প্রোফাইল দেখা যায় না নাকি?’ হালকা শ্লেষের ভঙ্গিতে অবিন প্রশ্ন ছুড়ে দিল। প্রমিতের মুখে কথা নেই। তার হাতের তালু ঘামছে! তবে কি সত্যিই অদ্রিকা ব্লক করল প্রমিতকে? কেন করল? অবিনের ধারণাই কি তবে ঠিক? সে কি প্রমিতের সঙ্গে খেলছিল? খেলা শেষ হয়ে গেল? এত তাড়াতাড়ি? কিন্তু কেন? কেন এই প্রতারণা?
ছয়
ততক্ষণে কুরিয়ার সার্ভিস থেকে চিঠি এসেছে প্রমিতের নামে। ছোট্ট একটা খাম। প্রমিত শান্ত হাতে খামটা খুলতেই বেরিয়ে এল একটা চেক, আটাশ হাজার টাকার। সঙ্গে একটা চিঠি, হাতে লেখা…
‘প্রমিতবাবু,
আপনি আর আমাকে কী সারপ্রাইজ দেবেন? সারপ্রাইজ তো আমি দেব আপনাকে! ঘি যখন সোজা আঙুলে ওঠে না, তখন কী করতে হয়, আপনি জানেন নিশ্চয়ই। আমি সেটাই করেছি মাত্র। আমাদের প্রাপ্য তিন লাখ বাইশ হাজার টাকা কেটে নিয়ে, বাকি আটাশ হাজার টাকা ফেরত দিলাম। টাকা অনেক কষ্ট করে উপার্জন করতে হয়, প্রমিতবাবু। আপনার মতো চুরিবিদ্যা তো আমরা জানি না, তাই এ ছাড়া আমার আর কোনো উপায় ছিল না।
অদ্রিকাকে ভুলে যান, অদ্রিকা মায়া! আসলে সে সুদক্ষিণা, সুদক্ষিণা বাগচি! সুপ্রতিমের স্ত্রী। পার্ক সার্কাসে আমার বাপের বাড়ি। যে অ্যাকাউন্টে আপনি টাকা পাঠিয়েছেন, সেটা আমার বিবাহ-পূর্ববর্তী অ্যাকাউন্ট।
ভালো থাকবেন,
শুভেচ্ছাসহ,
সুদক্ষিণা রায় বাগচি,
পঞ্চাননতলা, হাওড়া।’
