আশ্রয় – রজতশুভ্র মজুমদার

আশ্রয়

দরজার মুখে দাঁড়িয়ে তোর্সা দেখল, ঠিক উলটোদিকের ঘরেই সোজা ঢুকে গেল শিপ্রামাসি, তারপর আধখানা চাঁদের মতো ছোট্ট নীল রঙের মশারিটা সরিয়ে, আড়াই-তিন মাসের বেবিটার পাশে শুয়ে পড়ল সটান। বেবিটা এতক্ষণ মড়ার মতো পড়ে ছিল, এইমাত্র সে নড়তে চড়তে শুরু করেছে। হাত-পাগুলো মৃদু নড়াতে নড়াতেই ঠোঁট দুটো ঈষৎ ফাঁক করে সে তার কাঙ্ক্ষিত জিনিসটি খুঁজছে, তোর্সা বুঝল। শিপ্রামাসি ব্লাউজের হুক খুলে দুধসাদা ব্রা-র ভিতর থেকে অমৃতফলটি টুপ করে বের করে বোঁটাটি ঢুকিয়ে দিল বেবির মুখে। তারপর কাছে টেনে নিয়ে তার গায়ে-মাথায় আদর বিলোতে লাগল একমনে। তোর্সা ভাবল, মায়ের দুধ সেরা দুধ। যত খাবে, তত পাবে। পরক্ষণেই তার মনে হল, দিন দশ আগে কি বেবিটা দুধ পেত? সে তখন কী করত? তোর্সা আজই এসেছে এখানে। এসে থেকেই সে দেখছে, শুধু দেখছে, সবকিছু দেখছে। এখনও থিতু হতে পারেনি একটুও। কিছুক্ষণ আগেই সে শুনেছে, শিপ্রামাসি সাত দিন হল জয়েন করেছে এখানে, তার আগে সে ছ-মাসের ছুটিতে ছিল।

প্রসবের পর শিপ্রামাসির বুকের থেকে প্রথম দু-তিন দিন যে হলুদ রঙের দুধ বের হত, ডাক্তারি ভাষায় যাকে বলে ‘কলস্ট্রাম’, সে জিনিসটা কি এই বেবিটা পেয়েছে কখনো? অথচ এই কলস্ট্রামই তো শিশুর প্রথম টিকা—খুবই কম পরিমাণে এটা বের হয় আর মাত্র কয়েক ফোঁটাতেই একটি সদ্যোজাত মানুষ-শাবকের দিন চলে যায়। পুষ্টির দিক থেকেও এই সামান্য পরিমাণ কলস্ট্রামই শিশুর পক্ষে অত্যন্ত জরুরি। জীবাণুজনিত রোগ প্রতিরোধ করার জন্য এই কলস্ট্রাম অ্যান্টিবডির কাজ করে। কলস্ট্রাম থেকে শিশু সরাসারি অ্যান্টিবডি পায় বলে একে ডাক্তারি বিদ্যায় টিকা আখ্যা দেওয়া হয়ে থাকে। যে আড়াই মাসের বেবিটাকে শিপ্রামাসি পরম আদরে দুধ খাওয়াচ্ছে, সে তো কলস্ট্রাম পায়নি! বৃষ্টিবাদলার রাতে একদিন আঁস্তাকুড় থেকে যখন এই বেবিটাকে তুলে আনা হয়েছিল, তার ধারেপাশে কোনো মানুষ ছিল না, একটা ল্যাজ-গোটানো ডোরাকাটা নেড়িকুত্তি তার চারপাশে ঘুরঘুর করছিল, সম্ভবত তাকে আগলে রাখার চেষ্টা করছিল অনাগত বিপদ থেকে। এ গল্প তোর্সা এসেই শুনে নিয়েছে আজ। ফলে বেবিটাকে ঘিরে তার কৌতূহলের শেষ নেই! বেবিটার জন্য তোর্সার যতই দুঃখকষ্ট হোক, সে তো বেশ আমোদেই পা নাচাচ্ছে এখন। আর কলস্ট্রাম? ও জিনিসটা না পেয়েও তো বেশ নাদুসনুদুস হয়ে উঠেছে সে। ঘন চুল গজিয়েছে মাথায়, চোখগুলো গোল-গোল, নাকটাও খাড়া। শিপ্রামাসিকে নাক তুলতেও হয় না। আর যে বেবিটা প্রচুর প্রোটিন, ভিটামিন-এ পেল, বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধী হিউম্যান ইমিউনো গ্লোবিউলিন পেল, পেল গ্রোথ প্রসেসিং ফ্যাক্টর, বিফিটাস ফ্যাক্টর… এইসব, শিপ্রামাসির কলস্ট্রাম কি তাকে বাঁচাতে পারল?

কলস্ট্রামের আর দোষ কী? কামড়ে, খামচে, চিমটি কেটে, বিড়ির ছ্যাঁকা দিয়ে… হাজাররকম অত্যাচার চালিয়ে কাজ হাসিল করে তার জন্মদাতা বাবা তো এখন গারদের অন্ধকারে। একটা ফ্যামিলিতে কি একটাও মানুষ থাকতে নেই? শিপ্রামাসির শ্বশুর-শাশুড়ি-দেওর-ননদ… কেউই চায়নি বেবিটা বেঁচে থাক। শিপ্রামাসি পুলিশকে সবটাই জানিয়েছিল। কিন্তু একজনকেই তো ধরে নিয়ে গেল, বাকিদের কিছুই হল না!

তাও তো একজনকে ধরেছে পুলিশ, লকআপে রেখেছে, কেস চলছে, চার্জশিটও দেবে। কিন্তু বড়োলোকদের ঘরে? সব্যসাচী মুখার্জি তো আজ থেকে বছর বারো আগে ঠিক একই অপরাধ করেছিলেন। বরং একটু বেশিই করেছিলেন! স্ত্রী-র কথা না হয় ছেড়েই দিলাম, আড়াই বছর আর এক বছরের দু-দুটো ফুটফুটে মেয়ের উপর কম অত্যাচার করতেন তিনি? বংশে বাতি দেবার লোক চাই, মেয়েরা বাতি দেবে? ফলত, অত্যাচারের ডোজ বাড়তেই থাকল! যেদিন ওদের মা বুঝে গিয়েছিল, কোনোভাবেই আর বাঁচানো সম্ভব নয় মেয়ে দুটোকে, সেদিন চরম পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছিল সে বেচারি। বড়োমেয়ে আর মায়ের নীল হয়ে-যাওয়া ন্যাতানো শরীর দুটো তাও পাওয়া গিয়েছিল শেষমেশ, ঘটা করে দাহকাজও হয়েছিল, কিন্তু ছোটোটার তো কোনো হদিশই মেলেনি আর। কে জানে, হয়তো শেয়াল-কুকুর-শকুনে ছিঁড়ে খেয়েছে মেয়েটাকে। কিন্তু কী শাস্তি হয়েছে সব্যসাচী মুখার্জির? পুলিশ তাঁর টিকিটিও ছুঁতে পেরেছে কোনোদিন? ড্যাং ড্যাং করে বিয়ে করেছেন আবার, একটা ছেলেও হয়েছে। ইলেকশনে লড়েছেন। জিতেছেন। বিধায়ক হয়েছেন। এখন নিরাপত্তারক্ষী ঘিরে থাকে তাঁকে। সবাই স্যার-স্যার করে। প্রথম পক্ষের স্ত্রী, দেশের বাড়ি, ফুটফুটে মেয়ে দুটো… বারো বছর আগের সব স্মৃতিই এখন তিনি ডিলিট করে দিয়েছেন মেমরি থেকে।

 তোর্সা দেখল, বেবিটা আবার ঘুমিয়ে পড়েছে। শিপ্রামাসি তার মুখ থেকে বোঁটাটা ছাড়িয়ে বুকের ফলটা সন্তর্পণে পুরে নিল নির্দিষ্ট জায়গায়, তারপর ছোট্ট মশারিটায় তাকে সযত্নে ঢেকে দিয়ে যেই বেরিয়ে এল ঘর থেকে, তোর্সার সঙ্গে চোখাচোখি হল তার। ‘তুমিই তোর্সা?’ শিপ্রামাসির ঠোঁটের কোণে একচিলতে পোশাকি হাসি।

 ‘হ্যাঁ, আজই এসেছি।’

 ‘শুনেছি আমি। কেমন লাগছে?’

 ‘খুব ভালো।’ তোর্সাও ভদ্রতা করতে ভুল করে না।

 ‘তুমি তো নতুন! সমস্যায় পড়লে বলবে আমায়, কেমন?’

 ‘বলব।’

 ‘তা ছাড়া তুলিদি আছে, তনুশ্রীদি আছে, সঞ্চয়িতা ম্যাম আছেন। যখনই কোনো সমস্যা হবে…’

 ‘আর ওই যে ওই তিনতলার সাইডের ঘরটা—ওটায় কে থাকেন?’

 ‘ওটাই তো ডালুদার ঘর—তোমরা কাকু বলবে। উনিই মালিক, খুব ভালো মানুষ। সক্কলকে আপন করে নেন। কোনো অহংকার নেই মানুষটার। রোজ আসেন না। সপ্তাহে দু-একরাত থাকেন। খুব ব্যস্ত মানুষ তো!’

 তোর্সার মনে পড়ে যায় নিজের কাকুর কথা। কী ভালোই না বাসত তোর্সাকে! হরিহরপুরের অবিনাশ দত্ত ছিল এক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী। বেড়ানো ছিল নেশা। ছেলে অনুজ, স্ত্রী অনন্যা আর দাদার ফ্যামিলি—মানে দাদা, বউদি আর তোর্সা—এই ছজন মিলে একের পর এক ট্যুর। তোর্সার মা-বাবা অতটা পছন্দ করত না বেড়াতে! না করলে কী হবে, অবিনাশ দত্ত ছাড়বে নাকি? গত ডিসেম্বরেই কনকনে ঠান্ডায় ওড়িশার কুলডিহার জঙ্গল হল, তারপর হল সুন্দরবন, আর সব শেষে কেদার-বদরি। গেল মাসের ১২ তারিখে কলকাতা স্টেশন থেকে ট্রেন ধরে রওনা হল ওরা। সে কী আনন্দ তোর্সার! ১৫ তারিখে হরিদ্বারের একটা এ.টি.এম. থেকে টাকা তুলে ওরা রওনা দেয় শোনপ্রয়াগের দিকে। সেখান থেকে গৌরীকুণ্ডের দিকে যাওয়ার সময়েই প্রবল বৃষ্টি। গৌরীকুণ্ড থেকে রামওয়াড়া জঙ্গলচটি হয়ে কেদারনাথ—১৪ কিলোমিটারের এই পথ পায়ে হেঁটে পেরোনো মুখের কথা নয়। ১৬ তারিখে আবার আকাশভাঙা বৃষ্টি, ধস নামে। ১৭ তারিখ সকালের হড়পা বানে মুছে গেল রামওয়াড়ার জনপদ। কী আশ্চর্য, পাঁচ-পাঁচটা জলজ্যান্ত মানুষের কোনো হদিশ পাওয়া গেল না, শুধু অচৈতন্য তোর্সা উদ্ধার হল অলৌকিকভাবে!

তোর্সার এক দূর সম্পর্কের মামা অনেক খোঁজাখুঁজি করেছিল। আরও দু-তিনজনকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল উত্তরাখণ্ড। জলি গ্র্যান্ট এয়ারপোর্ট, সহস্রধারা হেলিপ্যাড, হৃষীকেশ বাসস্ট্যান্ড… প্রায় সব জায়গায় নিখোঁজের সন্ধানে রাখা কয়েক হাজার ছবির মধ্যে তোর্সার বাবা-মা, কাকু-কাকিমা আর অনুজের ছবিও রেখে এসেছিল। কয়েক হাজার মানুষের ভিড় ঠেলে সকালে-বিকেলে প্রশাসনের টাঙানো মৃতদের তালিকায় হন্যে হয়ে খুঁজেছে পাঁচজনের নাম। অনুসন্ধানকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থেকে থেকে কোমরে ব্যথা ধরে গিয়েছে। ২৭ তারিখ সেনাবাহিনীর প্যারাট্রুপাররাও যখন জানিয়ে দিল, তল্লাশিতে আর কোনো বডি মেলেনি, তখন ফিরে আসা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না ওদের। তোর্সার চোখের কোণে জমে-থাকা জলটা গড়িয়ে পড়ার আগেই, শিপ্রামাসি হাতটা ধরে প্রায় টানতে টানতে সিঁড়ি দিয়ে নামিয়ে নিয়ে গেল ওকে, ‘চল, তোকে রান্নাঘরটা দেখিয়ে দিই…’

 ‘আমার খিদে পায়নি শিপ্রামাসি।’

 ‘বললেই হল? মুখটা শুকিয়ে একেবারে…’ প্রায় ধমকের সুরে বলে উঠল শিপ্রামাসি।

 তোর্সা দেখল, বিশাল রান্নাঘরে মাটির উপর ত্রিপল পেতে তিন-চারজন মিলে বাটনা বাটছে, কুটনো কুটছে, একটা মোটাসোটা ঘেমো লোক উনুনে ডাল ফোটাচ্ছে একটা পেল্লায় কড়ায়, আর আঙারগুলো ক্রমাগত খোঁচাচ্ছে একটা প্রমাণ সাইজের কাঠ দিয়ে। অন্য একটা উনুনে একটা মাঝবয়সি মেয়ে লুচি বানাচ্ছে। কপাল দিয়ে দরদর করে ঘাম গড়িয়ে নামছে তার। হাতে ঝাঁজরি, আঁচলটা ঘুরিয়ে জড়ানো আছে কোমরে। ঘাড়-গলা কাঠের গুঁড়ির মতো। আর আছে মস্ত একটা ভুঁড়ি। কোনোদিকে তার ভ্রূক্ষেপ নেই। যে হারে সে লুচি বানাচ্ছে তার সঙ্গে সমানে পাল্লা দিয়ে মুখে পুরে নিচ্ছে গোটা গোটা প্রোডাক্ট। গরম ফুলকো লুচি পেলে তার সঙ্গে আর তরকারির কী দরকার? শিপ্রামাসি ঝুড়ি থেকে কয়েক পিস খপ করে তুলে নিয়ে তোর্সার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘নে, খা।’ তোর্সা স্বভাবসিদ্ধ আপত্তি তুলতেই, দু-পিস তার হাতে গুঁজে দিয়ে বাকিগুলো নিজের মুখে পুরতে লাগল শিপ্রামাসি। চিবোতে চিবোতেই তোর্সা দেখল, কেমন বিকৃত গলায় শিপ্রামাসি হাঁসুর মা-কে জিজ্ঞেস করছে, ডিম ছাড়ানো হয়েছে কি না! ও মা, মুখ ভরতি ডিম নিয়ে হাঁসুর মা এমনই হাঁসফাঁস করছে, যে তার কথা বলার অবস্থা নেই। কোনোরকমে ইশারা করে সে বোঝাল, কাজ চলছে। এতগুলো ডিম সে একা ছাড়াচ্ছে, সে তো আর মেশিন নয় যে, চোখের পলক ফেলতে ফেলতেই কাজ হয়ে যাবে! শিপ্রামাসি খানপাঁচেক সেদ্ধ ডিম তুলে এনে এ হাত-ও হাত করতে করতেই তোর্সা দেখল, ডিম শেষ। অবশ্য তাকে একটা নেওয়ার কথা প্রথমেই বলেছিল শিপ্রামাসি, ততোধিক ভদ্রতায় তোর্সা রিফিউজ করেছিল সে প্রস্তাব। সে ভাবছে, এখানকার মানুষগুলো এত ক্ষুধার্ত কেন? কেনই বা চুরি করে খায় এরা? এদের কি নীতি-নৈতিকতা বলে কিছু নেই?

দূরের কোনো ঘর থেকে কারো কান্নার শব্দ পেয়ে তোর্সা কিছুটা বিচলিত হয়ে উঠতেই, শিপ্রামাসি তাকে রান্নাঘর থেকে বের করে এনে বি ব্লকের দিকে নিয়ে যেতে চাইল। ওদিকের ব্লকে তোর্সার এখনও যাওয়া হয়নি। আর হবেই বা কেন, ওদিকটা তো ছেলেদের। শিপ্রামাসি বলল, ‘চল, ওদিকে একটা ছোট্ট ভাই আছে, আড়াই বছর বয়স… দেখবি কী ডানপিটে!’

‘কে কাঁদছে শিপ্রামাসি? টুয়াদি নাকি?’

‘টুয়ার সঙ্গে আলাপ হয়েছে?’

‘হ্যাঁ, ও খুব ভালো। ও কাঁদছে কেন?’

‘ওষুধ খাবে না, তাই।’

‘কেন কী হয়েছে ওর?’

‘জ্বর।’

‘কই, আমাকে তো বলল না। ওর সঙ্গে কত কথা হল, একবারও মনে হয়নি ও অসুস্থ।’ তোর্সা বিস্ময় প্রকাশ করল। সে বুঝল, শিপ্রামাসি কিছু একটা লুকোচ্ছে। একছুটে সে সিঁড়ি ভেঙে উঠে গেল উপরে। টুয়া যে ঘরে থাকে তার বাইরের বারান্দায় এসে দাঁড়াল চুপিচুপি। বন্ধ ঘরের ভিতর, সে স্পষ্ট শুনতে পেল, তুলিমাসি তাকে জোর করে ওষুধ খাওয়াচ্ছে। কিছুতেই খেতে চাইছে না টুয়াদি। কেন খেতে চাইছে না? কী হয়েছে ওর? শিপ্রামাসি তোর্সাকে হেঁড়ে গলায় ডেকে নিল নীচে থেকে। তোর্সা বুঝল, প্রথম দিনেই সে বোধহয় একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে। তাকে এখানে টিকতে হবে। মামি তাকে রাখবে না, সে খুব ভালো করেই জানে। মামা এ ব্যাপারে অসহায়! এখানে আসার আগেই পইপই করে মামা বুঝিয়ে দিয়েছিল, ‘সবাইকে আপন করে নিয়ে থাকবি, বড়োদের কথা শুনে চলবি, মন দিয়ে পড়ালেখা করবি…’ এইসব।

তোর্সা শিপ্রামাসির হাত ধরে বি ব্লকের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। যেতে যেতে হঠাৎই একতলার বাঁদিকের ঘর থেকে তনুশ্রীমাসির গলার আওয়াজ পেল সে। তনুশ্রীমাসি বলছে, তোর্সা শুনল, ‘লিপি, তোর ক-দিন রে? তোর তো বোধহয় অফ চলছে!’

লিপি বলছে, ‘আজ থেকে অন হবে।’

‘নে, ধর।’

‘আরে বিপাশা, তোর কি তিন সপ্তাহ খাওয়া হয়ে গিয়েছে?’

‘না, কাল শেষ হবে।’ বিপাশা বলছে।

‘নে, ধর।’

‘তোর?’ তনুশ্রীমাসি মানালিকে বলছে, তোর্সা কান খাড়া করে শুনল।

‘সবে তো তিন দিন খেলাম গো!’

‘নে, ধর।’

কৌতূহলী তোর্সা শিপ্রামাসির কাছে ব্যাপারটা জানতে চাওয়ার আগেই, তনুশ্রীমাসি ঘর থেকে বেরিয়ে এসে মুখ খুলল, ‘এখানে মেয়েদের রোজ আয়রন ট্যাবলেট দেওয়া হয়, বুঝলি?’

‘কিন্তু অফ-অন, তিন সপ্তাহ… এসব কী?’ নিষ্পাপ মুখে প্রশ্ন করল তোর্সা। এখানে এসে সবার আগে তার আলাপ হয়েছে তনুশ্রীমাসির সঙ্গেই। তারপর তুলিমাসি আর সব শেষে শিপ্রামাসি। তুলিমাসিকে তার বেশ রাশভারী বলে মনে হয়েছে, তুলনায় তনুশ্রীমাসি ও শিপ্রামাসি অনেক মিশুকে ও আমুদে। তোর্সা তার প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার আগেই, এ থেকে বি ব্লকে যাওয়ার পথে রাস্তার সঙ্গে কানেক্টিং যে প্যাসেজ, সেখান থেকে মানসী আর ঊর্মি প্রায় ছুটে এসে ‘হাই’ বলে পিঠে একটা হালকা টোকা মারল তার। তোর্সা খুব অল্প সময়ে আপন হয়ে গিয়েছে এদের। সকালবেলা এই দুজনের সঙ্গেই তো তার আলাপ জমে উঠেছিল ক্ষীরের মতো! ‘কেমন আছ তোর্সা?’ বেশ আন্তরিক সুরে প্রশ্ন করল ঊর্মি।

‘তোমরা পড়তে গিয়েছিলে?’ পালটা প্রশ্ন করল তোর্সা।

‘হ্যাঁ। চলো আমাদের ঘরে। গল্প করব এখন।’ ঊর্মি প্রস্তাব দিল। মানসী শিপ্রামাসিকে খানিক নরম গলায় বলল, ‘আমরা ওকে একটু নিয়ে যাই, কেমন?’

মানসী আর ঊর্মি থাকে একই ঘরে। ঘরটা সুন্দর করে গোছানো। দু-দিকে দুটো চৌকি পাতা। চৌকির উপর মোটা কাঁথা, তার উপর ফুল-তোলা বেডকভার। একখানা ছাল-ওঠা পুরোনো টেবিল দুজনেই শেয়ার করে। টেবিলের উপর একটা সবজে ওড়না বিছিয়ে রেখেছে ওরা। সেখানে বইপত্তর, জলের বোতল, পেপারওয়েট। তোর্সা ঘরে ঢুকতেই তাকে মানসীর বিছানায় বসাল ওরা। ‘জল খাবে?’ ঊর্মি প্রশ্ন করল।

তোর্সা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘খাব।’

জলের বোতলটা এগিয়ে দিয়ে মানসী বলল, ‘তুমি কোন ক্লাসে পড়ো?’

‘ক্লাস সেভেন।’

‘ও মা তা-ই!’ প্রায় একসঙ্গে বলে উঠল ঊর্মি আর মানসী। তোর্সা বুঝল, ওরাও ক্লাস সেভেনেই পড়ে। ‘তবে আর তুমি-তুমি কেন? আমরা আজ থেকে বন্ধু, সহপাঠী। তিনজনই তিনজনকে তুই বলে ডাকব।’ ঊর্মির প্রস্তাবে সমস্বরে সম্মতি জানাল মানসী আর তোর্সা। তিনজনে জম্পেশ আড্ডা দিচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। গল্পের বিষয়বস্তু বিবিধ— কোন ছেলেটা টিউশনে প্রোপোজ করেছে মানসীকে, শিপ্রামাসির বর কোথায় আছে, হাঁসুর মা কতগুলো ডিম খেতে পারে একসঙ্গে, নিজের বাবাকে ঊর্মি কতটা ঘেন্না করে, কেদারনাথে ধস নামার সময়ে সেই যে তোর্সা জ্ঞান হারাল, তারপর কখন চোখ খুলে দেখল সে হসপিটালের বেডে, লিপিদি কেমন খোলামেলা পোশাক পরতে পছন্দ করে, রাস্তায় সুন্দর ছেলে দেখলে বিপাশাদি কেমন স্টাইলে চোখ মেরে দিতে পারে, টুয়াদি ক্লাস এইটে পড়লেও কী করে ক্লাস টেনের ধিঙ্গি মেয়ে মানালিদির অঙ্ক কষে দেয়… এইসব। ওদের গল্পের যেন শেষ নেই।

 কথাপ্রসঙ্গে উঠল ডালুকাকুর কথাও। কাকু ডাকটা শুনলেই তোর্সার নিজের কাকুর কথা মনে পড়ে যায়। বাবা-মা জন্ম দিলে কী হবে, তোর্সার আসল বাবা তো অবিনাশ দত্তই। অবিনাশ দত্তর বোধহয় এমন কিছুই ছিল না, যা অনুজ পেয়েছে কিন্তু তোর্সা পায়নি, তা সে একটা সামান্য বলপেনই হোক, একটা নতুন ডায়েরি কিংবা বুকের সবটুকু ভালোবাসা। অবিনাশ দত্ত বলত, ‘আমার বড্ড মেয়ের শখ। তোর্সাই আমার মেয়ে।’ নিজে হাতে অঙ্ক কষাত, ইংরেজি পড়াত, ড্রয়িং করাত। আপিস থেকে ফেরার পথে তোর্সার জন্য ক্যাডবেরি আনা ছিল রুটিন ডিউটি। তোর্সার প্রিয় খাদ্য চকোলেট, তাই অবিনাশ দত্তকে সেটা আনতেই হবে, মাস্ট। গতকাল ডালুকাকু এসেছিলেন এখানে, কিন্তু হঠাৎ একটা জরুরি কাজ পড়ে যাওয়ায় মাঝরাতে তাঁকে ফিরে যেতে হয়েছিল। তুলিমাসি, তনুশ্রীমাসির মুখে তোর্সা শুনেছে, আজ আবার আসছেন ডালুকাকু। রাত্রে এখানেই থাকবেন। তিনতলায় নিজের চেম্বারে। তোর্সার বুকের ভিতরটা হু হু করে ওঠে। তার বড়ো ইচ্ছে কাকুকে একবার দেখার। ‘তোরা ডালুকাকুর ঘরে গিয়েছিস কখনো?’ অত্যুৎসাহী তোর্সা প্রশ্ন করল।

তার বোকা-বোকা প্রশ্নে মানসী হাসল, ‘উনি মস্ত বড়ো নেতা। কত প্রভাব-প্রতিপত্তি! এ এলাকায় বাঘে-গোরুতে এক ঘাটে জল খায় ডালুকাকুর কথায়। অথচ দেখে বোঝাই যায় না, উনি অত বড়ো মানুষ! কী সুন্দর কথা বলেন, সব্বাইকে নিজের করে নিতে পারেন সহজে। অবশ্য আমাদের মেশার সুযোগ হয়নি সেভাবে…’

মানসীকে প্রায় থামিয়ে দিয়ে ঊর্মি বলে উঠল, ‘উনি যাদেরকে চেম্বারে ডাকেন, তারাই কেবল ও ঘরে ঢুকতে পায়। আমাদের আজ পর্যন্ত ডাকেননি তো, তাই যাওয়া হয়ে ওঠেনি কখনো। তবে কিছুদিন আগে আমাদের স্কুলের একটা অনুষ্ঠানে উনি প্রধান অতিথি হয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে আমার আর মানসীর সম্পর্কে কত ভালো ভালো কথা বললেন! আমরা তো অবাক! মানসী অনুষ্ঠান শেষ হলে কাকুকে সাহস করে বলেছিল, ”আমাদের চেনেন আপনি?” কাকু ওর গাল টিপে দিয়ে কী বলেছিলেন জানিস? বলেছিলেন, ”তোদের চিনব না মানে? তোরা তো আমারই মেয়ে!” সেই থেকে আমরা দুজনেই কাকুর ফ্যান হয়ে গিয়েছি।’ ”তোরা তো আমারই মেয়ে” কথাটা স্ট্রাইক করল তোর্সার মনে। ডালুকাকুকে দেখার ইচ্ছেটা তার আরও বেড়ে গেল। আজই তো ডালুকাকু আসছেন এখানে! যে করেই হোক একবার দেখা করতেই হবে তাঁর সঙ্গে, সে ভাবছে। তার অবচেতনে কাজ করছে অবিনাশ দত্তর মুখটা—পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পুরুষ—যে তার নরম তুলতুলে গালে খোঁচা খোঁচা মায়াবী দাড়ি ঘষে দিয়ে বলছে, ‘হোমটাস্ক করেছিস মা? যদি কোথাও আটকে থাকে, নিয়ে আয়, আমি দেখিয়ে দিচ্ছি।’ কাকুর চোখের অসুখ, রাত্রে দেখতে সমস্যা হয়, তবু তোর্সার জন্য অবিনাশ দত্ত সবকিছু পারত। তোর্সা মনে মনে হারিয়ে যায় অতীতে।

‘কী ভাবছিস অত?’ হাঁটুতে ঝাঁকুনি দিয়ে ঊর্মি প্রশ্ন করে।

 ‘কিছু না।’

 ‘তবে যে চুপ করে আছিস?’

 ‘আচ্ছা, ডালুকাকু কখন আসবেন রে?’

 ‘কেন? কী করবি?’

 তোর্সা কোনো উত্তর দেয় না। ঊর্মি প্রসঙ্গ পালটে প্রশ্ন করে, ‘দোলার সঙ্গে আলাপ হয়েছে তোর?’

 ‘না, আলাপ হয়নি এখনও, তবে দেখেছি দূর থেকে।’ তোর্সা ফিসফিস করে বলে, ‘আলাপ করিয়ে দিবি আমার সঙ্গে?’ দোলা কাল রাত থেকেই সম্ভবত দুটো ব্লকের সমস্ত রুমের আলোচনার হট টপিক। সে থাকে এইদিকের একেবারে নীচের তলার কোনার রুমে। সেই মেয়েকে কাল রাত এগারোটা-সাড়ে এগারোটা নাগাদ কে নাকি দেখেছে এ ব্লকের তিনতলা থেকে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে নেমে আসতে। এরকম একটা খবর, তা সে রটনা হোক আর যাই হোক, ছড়িয়ে পড়তে বিশেষ সময় লাগে না, বিশেষ করে যেখানে ডালুকাকু স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন। তাঁর উপস্থিতিতে এরকম একটা ঘটনা… জাস্ট ভাবা যায় না। ওই ঘটনার পরই তাঁর গাড়ির শব্দ শোনা যায়। একটা জরুরি কাজে তিনি বেরিয়ে যান এখান থেকে। কেউ কেউ বলছে, ডালুকাকুই ডেকেছিলেন দোলাকে। পড়াশোনার প্রোগ্রেস নিয়ে তাকে নাকি অনেক বকাঝকা করেছেন তিনি। করতেই পারেন। সে অধিকার তাঁর আছে। কিন্তু দোলা সেটা স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেনি। তাই রিঅ্যাক্ট করে ফেলেছে।

কেউ কেউ আবার বাজারে এমনও ছড়াচ্ছে, দোলা একটা ছেলের সঙ্গে প্রেম করে। ছেলেটা বয়সে অনেকটাই বড়ো, সে এখনই বিয়ে করতে চাইছে। কিন্তু দোলার সবে তেরো প্লাস। সে ক্লাস এইটে পড়ে। এটা কি বিয়ের বয়স? তা ছাড়া আইনগত বাধাও আছে। তাই দোলা অপেক্ষা করতে বলায়, ছেলেটা নাকি তাকে রিফিউজ করেছে। আর সেই যন্ত্রণাতেই দোলা সুইসাইড করতে গিয়েছিল কাল রাতে। কিন্তু এ গল্পটা একেবারেই বিশ্বাস হয় না মানসী-ঊর্মিদের। তার প্রথম এবং প্রধান কারণ, এই বয়সে দোলা প্রেম করতেই পারে না। সে এখানকার সব চেয়ে ইন্টেলিজেন্ট ও পার্সোনালিটি-সম্পন্ন মেয়ে। সে যখন এখানে আসে, তখন কোথায় ঊর্মি-মানসীরা? মাত্র এক বছর বয়সে তার আগমন এখানে। তখন ডালুকাকুই বা কোথায়? মালিক ছিলেন অন্য—হরনাথ মালাকার। তাঁর আমলে এত রমরমা ছিল না, মাত্র সাত-আটটা ছেলে-মেয়ে নিয়ে শুরু হয়েছিল এই অরফ্যান হোম। ডালুকাকু তো এসেছেন বছর চারেক হল! মালিকানা বদলের পর থেকেই অবশ্য সম্পদে-সমৃদ্ধিতে ভরে উঠতে লাগল হোম। লাখ লাখ টাকা আসছে সরকার থেকে, নতুন নতুন ঘর উঠছে, টিউবওয়েল বসছে, ল্যাট্রিন হচ্ছে। আরও কত কী!

 দোলার সুইসাইড তত্ত্বে মানসী-ঊর্মির আস্থা না-রাখার দ্বিতীয় তথা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে, সুইসাইড করতে সে ওই সময়ে তিনতলায় যাবে কেন? বিশেষ করে যখন মালিক স্বয়ং সেখানে উপস্থিত? সে কি জানত না ডালুকাকু প্রেজেন্ট আছেন? নিশ্চয়ই জানত। কাকুর ঘরে আলো জ্বলছিল, এসি চলছিল, নীচে তাঁর গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল। দোলা অত্যন্ত ইন্ট্রোভার্ট প্রকৃতির মেয়ে। সে প্রায় কারো সঙ্গে ঠিকঠাক মেশে না। এমনকী, তনুশ্রীমাসি-তুলিমাসি-শিপ্রামাসি, যারা নিরবচ্ছিন্ন সেবা করে চলেছে মেয়েদের— তোর্সা তো নিজের চোখেই দেখেছে, কী যত্নে বুকের দুধটুকু পর্যন্ত শিপ্রামাসি খাওয়াচ্ছে পরের মেয়েকে—তাদের সঙ্গেও দোলার কেমন একটা আড়ো আড়ো-ছাড়ো ছাড়ো সম্পর্ক। এখানকার প্রায় সবাই জানে, দোলা কারো বন্ধু না। সে একা, সম্পূর্ণরূপে একা। তোর্সার মায়া হয় দোলার জন্য। ভাবে, একবার দেখা করতেই হবে তার সঙ্গে। যেভাবেই হোক। কিন্তু ঊর্মি-মানসীরা ওকে বোঝায়, কোনো লাভ নেই।

 সন্ধে গড়িয়ে কখন রাত নেমেছে কারো খেয়াল নেই। এই হোমটা লোকালয় থেকে বেশ দূরে, নির্জন নিরিবিলি জায়গায়। দুটো ব্লকের মাঝে রাস্তার সঙ্গে কানেক্টিং একটা প্যাসেজ। ওই প্যাসেজের দু-ধারে সারি সারি গাছ। রাত নামলে গাছগুলো কেমন নিবিড় হয়ে ফিসফিস করে। বেশ লাগে তোর্সার। মানসী-ঊর্মির সঙ্গে সে ওই জায়গাটা দেখতে গিয়েছে এখন। মিষ্টি সুন্দর একটা হাওয়া দিচ্ছে। পাতায় পাতায় ধাক্কা লেগে গাছেদের অন্তরঙ্গ কথাকলি ভারী রোমান্টিক লাগছে তোর্সার। একটু দূরে একটা মায়াবী আলো জ্বলছে। ওই আলোয় অপরূপ দেখাচ্ছে পুরো বিল্ডিংটা। কোথাও কোনো কোলাহল নেই। ধু ধু সাদা রাস্তা শুনশান। ততক্ষণে ডিনারের ডাক পড়েছে। তিনজনে রান্নাঘরের দিকে হাঁটা লাগায়। যেতে যেতে তোর্সার চোখ পড়ে একটা পরিত্যক্ত বাথরুমের দিকে। দরজায় তালা। কৌতূহলী হয়ে সে মানসী-ঊর্মিকে প্রশ্ন করতেই, মুখোমুখি এসে দাঁড়ায় শিপ্রামাসি। মৃদু হেসে শিপ্রামাসি বলে, ‘আজ থেকে বছরখানেক আগে একটা মেয়ে ওখানে গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যা করেছিল। তারপর থেকে ডালুদা ও জায়গাটা ব্যবহার করতে মানা করেন।’ গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে তোর্সার। ইস, একটা জলজ্যান্ত মেয়ে ওইটুকু ঘরে আগুনের মধ্যে পুড়ে…! সে আর ভাবতে পারে না। কী হয়েছিল মেয়েটার? কেন পুড়ে মরতে গেল সে? এইসব প্রশ্ন মনের মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে। সে পালটা প্রশ্ন করার আগেই শিপ্রামাসি গড়গড় করে বলে দেয়, ‘মেয়েটার নাম দীপালি। ওর মাথার গোলমাল ছিল। ডাক্তারবাবু বলেছিলেন, মানসিক ভারসাম্যহীন।’ শিপ্রামাসির বলার স্টাইলটা একদম ভালো লাগে না তোর্সার। তাকে ভীষণ মেকি, মিথ্যেবাদী, কপট বলে মনে হয়।

কথা না বাড়িয়ে রান্নাঘরের দিকে এগোয় তোর্সা। তক্ষুনি কানে আসে গাড়ির হর্ন। একটা দুধসাদা মার্সিডিজ এসে দাঁড়াল গেটের কাছে। আর সঙ্গে সঙ্গে সাজো সাজো রব পড়ে গেল চতুর্দিকে। তোর্সা বুঝল, ডালুকাকু ঢুকছেন। নীল রং করা তেতলার ঘরটা ততক্ষণে কেউ খুলে দিয়েছে। লাইট অন করে দিয়েছে। তোর্সা একছুটে কাউকে কিছু না বলে সোজা ঢুকে গেল ডালুকাকুর চেম্বারে। ইস, কী অপূর্ব ঘর! মার্বেলের মেঝের উপর নীল কার্পেট পাতা। দেওয়ালগুলো ঝকঝকে-তকতকে। দেওয়ালের গায়ে সারদা মায়ের ছবি। পাশে রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ। জানালা-দরজার পরদাগুলো পর্যন্ত দেওয়াল আর বিছানার রঙের সঙ্গে ম্যাচ করে লাগানো। ঘরের একপাশে সুন্দর একটা খাটের উপর নরম গদির বিছানা পাতা। অন্য পাশে বিরাট টেবিল। টেবিলে কাগজপত্র, খেলনা পিস্তল, সমুদ্রনীল পেপারওয়েট, বোগেনভেলিয়া…

তোর্সার মনে হল, এ কাকু তার অবিনাশকাকুর মতো নয়। এ লোকটা বড়ো গুছুনে, অবিনাশ দত্ত ঠিক এর উলটো। সে বড়ো অগোছালো ছিল। যা ইনকাম করত সবটাই বেড়িয়ে, খেয়ে আর হইহই করে উড়িয়ে দিত। একটা বাড়ি পর্যন্ত করে যেতে পারেনি। চাল নেই, চুলো নেই, ভাড়াবাড়িতে থাকত আর তোর্সা-অনুজকে নিয়েই সময় কাটিয়ে দিত। আর বাবার তো সেরকম কোনো কাজই ছিল না প্রকৃতার্থে। বাবার ছিল মনের রোগ, ডাক্তারবাবু বার বার পরামর্শ দিতেন চেঞ্জে যেতে। কাকুর এত বেড়ানোর পিছনে বাবাকে সারিয়ে তোলার একটা প্রচ্ছন্ন প্রচেষ্টা সব সময়ে কাজ করত। তোর্সা সেটা অনুভব করতে পারত, আর কেউ না পারুক। কিন্তু ওই বেড়ানোটাই শেষ পর্যন্ত কাল হল। তোর্সা জানে, এ ঘরে পারমিশন ছাড়া ঢুকতে নেই। যেকোনো সময়ে ধরা পড়ে যেতে পারে। কিন্তু ডালুকাকুকে দেখার লোভ সে কিছুতেই ছাড়তে পারছে না। বুদ্ধি করে সে একটু নিচু হয়ে ঢুকে গেল বিরাট টেবিলটার তলায়। সেখানে ঘাপটি মেরে বসে থাকতে থাকতেই দেখল, নিবারণজেঠু আর তুলিপিসি একটা জলের বোতল আর ডালুকাকুর চামড়ার ব্যাগটা নিয়ে ঘরে ঢুকল। পিছন পিছন ঢুকছেন ডালুকাকু।

 সুট-কোট-টাই-পরিহিত স্মার্ট, হ্যান্ডসাম ডালুকাকু চেয়ারে বসেই ল্যাপটপ খুলে নিবিষ্টমনে কাজ করতে শুরু করলেন। তুলিপিসি আর নিবারণজেঠু ততক্ষণে বেরিয়ে গিয়েছে ঘর থেকে। ঘরের দরজা-জানলা বন্ধ, এসি চলছে। তোর্সা একদম চুপ। দীর্ঘক্ষণ পর সে শুনল, ডালুকাকু বেল বাজিয়ে কাউকে ডাকলেন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তনুশ্রীমাসি এসে হাজির। ডালুকাকু কী বলছেন তনুশ্রীমাসিকে? কান খাড়া করে তোর্সা শুনল ডালুকাকু বলছেন, ‘একেবারে বাঘের বাচ্চা তো! প্রথম দিনেই কী করেছে দেখ আমার হাতে!’ তোর্সা ভাবছে কে বাঘের বাচ্চা? কী করেছে ডালুকাকুর হাতে? ডালুকাকু তনুশ্রীমাসিকে হাতের আঙুলের গভীর ক্ষত দেখাচ্ছেন। ‘ও মা’ বলে বিস্ময় প্রকাশ করছে তনুশ্রীমাসি। ডালুকাকু বলছেন, ‘কেমন দাঁত বসিয়েছে দেখেছিস? নেহাত সি.এম.-এর সঙ্গে হঠাৎ মিট করার একটা চান্স পেয়ে গেলাম তাই সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে যেতে হল। না হলে… যাক গে, শোন, আজ ওকে ঘুমের ইঞ্জেকশন দিয়ে নিয়ে আয় এখানে। দেখছি ওর কত ক্ষমতা!’

 তনুশ্রীমাসি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতেই কেমন গা শিরশির করে উঠল তোর্সার। কিছুক্ষণ পরে সে দেখল, তনুশ্রীমাসি আর শিপ্রামাসি দুজনে ধরাধরি করে ঘরের মধ্যে নিয়ে এল অচৈতন্য দোলাকে। তাকে খাটের উপর শুইয়ে দিয়ে দুজনে চলে গেল ঘর ছেড়ে। তোর্সার সারা গা যেন ডিপ ফ্রিজের জলের বোতল। বুকটা ধকধক করছে রেলগাড়ির মতো। ‘শালি, তুই খুব বেড়েছিস না? আমিও সব্যসাচী মুখার্জি বটে’ বলে শুয়োরের মতো ঘোঁত ঘোঁত করতে করতে, তোর্সা দেখল, ডালুকাকু বিছানায় উঠে দোলার জামা আর ব্রেসিয়ার খুলে বুক দুটো চটকাতে শুরু করলেন দানবের মতো। তারপর প্রায় ছিঁড়ে ফেললেন নিম্নাঙ্গের পোশাক। প্যান্টি সরিয়ে দু-পা চিরে যখন জল্লাদের উল্লাসমঞ্চ খুঁজে পেয়েছেন তিনি, ঠিক তখুনি, বিস্ময়-বিস্ফারিত চোখে শিহরিত হয়ে কীরকম একটা আর্তনাদ করে পিছিয়ে এলেন নিজেই! কী দেখলেন সব্যসাচী মুখার্জি? জড়ুল? জন্মদাগ? তাঁর হারিয়ে-যাওয়া এক বছরের মেয়েরও কি ঠিক এরকমই জন্মদাগ ছিল যৌনাঙ্গের পাশে? তবে কি…

তোর্সা এসব কিছু জানে না। কিন্তু সে এখন জানতে পারছে, আয়রন ট্যাবলেটগুলো আসলে কী, পরিত্যক্ত ল্যাট্রিনের ভিতর কেন দীপালিকে পুড়তে হয়েছিল দাউদাউ, কেন টুয়াদিদি ডুকরে কেঁদে উঠেছিল শেষ-বিকেলের রক্তাভ আলোয়, কিংবা কলস্ট্রাম না হোক, বুকের দুধ দিয়ে কী জন্য পাশের ঘরের বেবিটাকে তিলে তিলে বড়ো করে তুলছে শিপ্রামাসি! সমস্তটাই তোর্সার কাছে পরিষ্কার হয়ে যায় দিনের আলোর মতো। তার মাথা ঘুরছে বনবন করে, গা গুলোচ্ছে, দু-চোখে অন্ধকার। তবু দাঁতে দাঁত টিপে বেঁচে আছে সে। এক্ষুনি সেন্সলেস হয়ে পড়ে গেলে, ভগবানও আর বাঁচাতে পারবেন না তাকে। সিংহের গুহা থেকে ভালোয় ভালোয় তাকে এখন বেরিয়ে আসতেই হবে। বাঁচাতে হবে হোমের সমস্ত মেয়েকে। সে-ই তো এখন সমস্ত মেয়ের আশ্রয়! বিরাট দায়িত্ব তার কাঁধে এখন। সে দায়িত্ব তাকে পালন করতেই হবে। দু-চোখে আগুন জ্বলে ওঠে তোর্সার। এ আগুন তার একার নয়, এ আগুন হোমের সমস্ত নির্যাতিত মেয়ের জ্বলে ওঠার আগুন, এ আগুন পৃথিবীর সমস্ত অপমানিত নারীর সম্মান পুনরুদ্ধারের আগুন, এ আগুন আবার পৃথিবীতে নারীর বাসস্থানের অধিকার প্রতিষ্ঠার আগুন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *