জেলের লপসি
সদর দরজা খুলেই বিশ্বরূপবাবু বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। একটা আস্ত এসি সমেত এসি লাগানোর লোক দাঁড়িয়ে তাঁর সামনে। লোকটা ভেবেই পাচ্ছে না বিশ্বরূপবাবু তাকে ঘরে ঢুকতে না বলে দরজা আটকে দাঁড়িয়ে আছেন কেন! তবে কি সে ভুল বাড়িতে এসেছে? বিশ্বরূপবাবুর চোখে-মুখে বিস্ময়ের অব্যক্ততা এত বেশি যে লোকটা কিছু বলতেও সাহস পাচ্ছে না। বেশ অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর সে আমতা আমতা করে বলল, ‘আপনিই বিশ্বরূপবাবু তো?’
‘হ্যাঁ, তো?’
‘আর. পি. ইলেকট্রনিকস থেকে পাঠিয়েছে আমায়। আপনার বাড়িতে এসি ফিট করতে।’
‘ইয়ারকি হচ্ছে?’
‘না, মানে… আপনিই বিশ্বরূপ ঘটক তো?’
‘এই শোনো, তোমার ওই আর. পি. ইলেকট্রনিকসকে বলো, আমি একদিনে পর পর দুটো এসি ফিট করতে অর্ডার করিনি!’
‘মানে? কী বলছেন আপনি?’
‘একটু আগেই তো এসি লাগিয়ে দিয়ে গেলে বাছা! আবার এই নাটক কেন?’
‘এসি লাগিয়ে দিয়ে গেলাম? মানে?’
‘কেন ন্যাকামি করছ হে? এখনও চার ঘণ্টাও হয়নি তিন-তিনটে লোক দু-ঘণ্টা ধরে বাড়িতে তাণ্ডবনৃত্য করে আর. পি. থেকে এসি লাগিয়ে দিয়ে গেল… আবার বলে কিনা…’
‘স্যার, কোথাও ভুল হচ্ছে আপনার। আপনি একটু শান্ত হোন।’
‘ভুল আমার হয়নি, ভাই। আমার এই চুয়ান্ন কমপ্লিট হয়ে গেল! ভুল তোমাদের। আর তার খেসারত আমি দিতে পারব না। তুমি এখন আসতে পারো।’ বিশ্বরূপবাবু দরজা বন্ধ করতে উদ্যত হলেন। হঠাৎই তাঁর মোবাইলটা বেজে উঠল, ‘মি. ঘটক, আপনার বাড়ি এসি পাঠিয়ে দিয়েছি। এক্ষুনি পৌঁছে যাবে। ছেলেটার নাম অমিত। ও-ই লাগিয়ে দেবে। খুব এফিশিয়েন্ট। একটু দেখে নেবেন কাইন্ডলি।’
‘মানে? এসি তো অলরেডি লাগিয়ে দিয়ে গিয়েছে দুপুরবেলা।’
‘সে কী! আমি তো এইমাত্র পাঠালাম, স্যার। সকালেই তো আপনাকে বললাম, আপনি যে মডেলটা চাইছেন, একটু দেরি হতে পারে, তবে আজকের মধ্যে ফিট করবই।’
বিশ্বরূপবাবুর মনে পড়ে গেল সকালের কথোপকথনটা। হাওড়া-ব্যান্ডেল লোকাল ট্রেনে উঠে বসেছিলেন। গাড়ি ছাড়তে বেশ অনেকটা দেরি করেছিল। ফলে ভিড়ও বাড়ছিল একটু একটু করে। জানালার ধারে বসেছিল বাবলি, তারপরেই তিনি। বাবলিকে তিনি খুবই বকাঝকা করছিলেন। খুব মানে, যাকে বলে মাত্রাতিরিক্ত আর কী! শেষ কবে বাবলিকে এত বকেছেন, মনে পড়ে না বিশ্বরূপবাবুর। দু-হাতের তালুতে মুখটা গুঁজে দিয়ে, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল বাবলি। সোমত্ত বয়সের একটা মেয়ে পাবলিক প্লেসে অত করুণভাবে কাঁদছিল বলে, লোকজন বেশ কৌতূহলের চোখেই তাকাচ্ছিল সেদিকে। হালকা ফিসফিসানি শুরু হয়ে গিয়েছিল অত্যুৎসাহীদের মধ্যে। ততক্ষণে একদল ডেলি প্যাসেঞ্জার উঠেছে কামরায়। কুড়ি থেকে ত্রিশ বছর বয়সি। ওই চ্যাংড়াগুলোই বেশি উৎসাহ দেখাচ্ছিল। কেউ একজন এগিয়ে এসে বলল, ‘এই যে কাকু, কী হয়েছে?’
‘কিছু না, পারিবারিক।’ দেঁতো হাসি হেসে বিশ্বরূপবাবু বলছিলেন।
‘তা পারিবারিক বিষয়টা পাবলিক প্লেসে ডিসকাস না করলেই নয়?’ বেশ গম্ভীর গলায় আরেকজন বলল।
‘ইট’স ওকে। আর হবে না।’ বিশ্বরূপবাবু বুঝে গিয়েছিলেন, কাজটা ঠিক হয়নি। তবে চ্যাংড়াগুলো যে এভাবে রিঅ্যাক্ট করবে, স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি তিনি। পরিস্থিতি যতটা সম্ভব স্বাভাবিক করার চেষ্টা করতে শুরু করলেন এরপর। কিন্তু ভবি ভোলবার নয়। একজন গোঁফওয়ালা, কিছুটা মোটাসোটা লোক পিছন থেকে বেশ ভারী গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘মেয়েটি কে হয় আপনার?’
‘আমার মেয়ে। বাবলি।’
‘আপনার মেয়ে?’ লোকটার গলায় চূড়ান্ত অবিশ্বাস।
‘হেঁ হেঁ, আমার মেয়ে।’ বিশ্বরূপবাবু একটুও রাগ করেননি।
চ্যাংড়াগুলোর কেউ একজন ডিরেক্ট বাবলিকে প্রশ্ন করল, ‘কে হন উনি? তোমার বাবা?’ বাবলি কোনো উত্তর না-দেওয়ায় সন্দেহ প্রকট হল।
একজন ডেলি প্যাসেঞ্জার তো সোজাসুজি বাবলির সামনে এসে দাঁড়িয়ে গেল, ‘কী নাম রে তোর? বাবলি?’
‘হ্যাঁ।’ বাবলি ঘাড় নাড়ল।
‘উনি তোর কে হন?’ লোকটা আঙুল দেখাল বিশ্বরূপবাবুর দিকে।
বাবলি আবার নিরুত্তর। তার মৌনতা সন্দেহের পারদ চড়াতে সময় নিল না। লোকটা এইবার গলা চড়িয়ে বলল, ‘কী ব্যাপার! তুই কথা বলছিস না কেন?’
‘তোমার কোনো ভয় নেই। আমরা আছি।’ আরেকজন অভয় দেওয়ার চেষ্টা করল।
‘তুই কাঁদছিস কেন?’
‘তুমি যদি সত্যিটা না বলো, আমরা ব্যাপারটা বুঝব কী করে? আর না বুঝলে তোমাকে বিপদ থেকে উদ্ধারই বা করব কী করে?’ খুব নরম করে বলল একজন। বাবলির পাতলা ছিপছিপে শরীর, পানপাতার মতো মুখ। চোখ দুটো লাল হয়ে আছে কেঁদে কেঁদে। পরনে চুড়িদার। কচি কলাপাতা রঙের। হাতে একটা বড়ো ব্যাগ আছে। চোখের জলের ফোঁটা ব্যাগের যে জায়গায় পড়েছে, সে জায়গাটা ভিজে একশা হয়ে আছে, ঠিক যেরকম ছাদ চুঁইয়ে-পড়া বৃষ্টিতে গরিবের বিছানা স্যাঁতসেঁতে হয়ে থাকে সারা বর্ষা জুড়ে। বিশ্বরূপবাবু ইশারা করতেই, দু-দিকে বিনুনি করা চুল নাড়িয়ে বাবলি বলে উঠল, ‘উনি আমার বাবা হন।’
এরপর আর কোনো কথা থাকতে পারে না। বাবলির এককথায় চ্যাংড়া ডেলি প্যাসেঞ্জারের দল মিয়োনো বিস্কুটে পরিণত হল। এতক্ষণ যারা জি.আর.পি.-তে ফোন করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, নিমেষে গর্তে সেঁধিয়ে যাওয়া ছাড়া তাদের আর কোনো বিকল্প রইল না। শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে গোলগাল চেহারার বিশ্বরূপবাবু পা ভাঁজ করে বসলেন। ঠিক তখনই তাঁর মনে হল, আর.পি.-কে একবার ফোন করে তাগাদা দেওয়া উচিত। দু-দিন আগেই একটা এসি লাগানোর কথা বলেছিলেন, অথচ দোকান থেকে এখনও অবধি কেউ কোনো উচ্চবাচ্যই করল না। মোবাইলটা বের করে সরাসরি রিং করলেন দোকানের ল্যান্ড ফোনে, ‘ম্যানেজারদা বলছেন? গুড মর্নিং… বিশ্বরূপ ঘটক বলছি।’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, গুড মর্নিং স্যার। এইমাত্র দোকান খোলা হয়েছে, বলুন।’ তখন সকাল দশটা বাজে। ঠিক সময়েই বিশ্বরূপবাবু ফোনটা করেছিলেন। দু-পাঁচ মিনিট আগে করলেও হয়তো পেতেন না। বেশ অনুযোগের সুরে বিশ্বরূপবাবু বললেন, ‘দেখুন, দু-দিন আগে একটা এসি-র অর্ডার করেছি। এখনও অবধি তো পেলাম না। শুধু পেলাম না নয়, একটা ফোন করে জানালেনও না, কবে নাগাদ পেতে পারি, বা আদৌ পাব কি না!’
‘ছি ছি, এ কী কথা বলছেন স্যার! আপনাদের পরিষেবা দেওয়ার জন্যই তো আমরা… সরি স্যার, সরি। আপনাকে জানানো আমার উচিত ছিল।’
‘কী জানানো উচিত ছিল?’
‘আরে আপনি যে মডেলটা চাইছেন, ওই মডেলটার ফাইভ স্টার সেট ছিল না আমাদের কাছে। আজই মাল ঢুকছে। একদম চিন্তা করবেন না। মাল পৌঁছোতে যদি দেরিও হয়, টেনশন নেবেন না। আমি কথা দিচ্ছি, আজ আপনাকে এসি-র হাওয়া খাইয়েই ছাড়ব।’
বিশ্বরূপবাবু মডেলের নাম, স্টার রেটিং, ওজন—সমস্ত আরেকবার গড়গড় করে বলে দিলেন। সেই সঙ্গে বললেন, ‘বিলটা বানিয়ে পাঠিয়ে দেবেন, আমি সঙ্গে সঙ্গে পেমেন্ট করে দেব।’
‘আরে ওসব নিয়ে চিন্তা করছি না। আপনি তো আমাদের পুরোনো কাস্টমার। শুধু লোকেশনটা আরেকবার বলুন।’ বিশ্বরূপবাবু প্রাঞ্জল করে বাড়ির ঠিকানাটা বুঝিয়ে দিলেন। বালি-বাদামতলার পেট্রোল পাম্পের বাঁদিকের গলিতে ঢুকে, ডান হাতে মেরুন রঙের যে বাড়িটার লোকেশন তিনি বোঝালেন, আর.পি. ইলেকট্রনিকসের এসি মিস্ত্রি কেন, যেকোনো চতুষ্পদ প্রাণীই ঠিকঠাক চলে আসতে পারবে চিনে।
সকালের কথোপকথনে বুঁদ হয়ে ছিলেন বিশ্বরূপবাবু। তাঁকে অনেকক্ষণ চুপ থাকতে দেখে ও প্রান্তের গলা কিছুটা কর্কশ হল, ‘আপনি মশাই আমাদের অর্ডার করে আবার অন্য দোকান থেকে মাল লাগিয়ে নিলেন?’
‘না না, তা কেন হবে? আমি তো আর কাউকেই বলিনি।’
‘বলেননি তো ভূতে এসে এসি ফিট করে গেল? অদ্ভুত লোক মশাই।’
‘দাঁড়ান দাঁড়ান, আমাকে একটু ভাবতে দিন প্লিজ।’
‘আর কী ভাববেন?’
‘আমাকে একটু রসিদটা দেখতে দিন…’
‘দেখুন। একটু তাড়াতাড়ি করবেন, আমার ছেলে দাঁড়িয়ে আছে।’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি এক্ষুনি দেখেই আপনাকে কল করছি। আর ওই অমিত না কী যেন নাম বললেন, ও আমার বাড়িতে এসে বসুক-না!’ বিশ্বরূপবাবু ফোনটা কেটে দিয়ে অমিতকে ঘরে আসতে বললেন। অমিত স্বভাবতই রাজি হল না। পেল্লায় এসি-টা চাপানো আছে রিকশায়। রিকশাওয়ালা মুখ হাঁড়ি করে দাঁড়িয়ে আছে। বিশ্বরূপবাবু ঘরে ঢুকে ওয়ারেন্টি কার্ড সমেত ক্যাশ মেমোর খামটা খুলে ফেললেন। পাকা রসিদের লেটারহেডে চোখ পড়তেই মাথা ঘুরে গেল তাঁর। গোটা গোটা অক্ষরে লেখা ‘লাহা ইলেকট্রনিকস, উত্তরপাড়া’। নীচে দোকানের সম্পূর্ণ ঠিকানা, ফোন নম্বর—সবকিছুই জ্বলজ্বল করছে।
কিন্তু কেন এমন হল? কে এমন করল? তিনি তো জীবনে লাহা ইলেকট্রনিকসের নামই শোনেননি। সেখানে এসি অর্ডার করলেন কী করে? এ কি সম্ভব? তা ছাড়া এসি লাগানোর পর লিডার গোছের ছেলেটা যখন তাঁকে খামবন্দি কাগজপত্র দিল, তখনই বা কেন তিনি সেগুলো খুঁটিয়ে দেখে নিলেন না? ক্যাশ পেমেন্ট করার সময়ে একবারও কেন তাঁর মনে হল না, ক্যাশ মেমোটা পরীক্ষা করা উচিত? তাহলেই তো ধরা পড়ে যেত। অবশ্য ক্যাশ দেওয়ার সময়ে এগজ্যাক্ট অ্যামাউন্টটা তো তিনি মিলিয়ে দেখে নিয়েছিলেন রসিদের সঙ্গে। কিন্তু লেটারহেডের দিকে একবারও চোখ পড়েনি। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লেন বিশ্বরূপবাবু। বাবলির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘দেখেছিস কাণ্ড!’
‘হ্যাঁ, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। তুমি একবার ওই দোকানে ফোন করে দেখবে?’
‘হ্যাঁ, ঠিক বলেছিস, এক্ষুনি লাহা ইলেকট্রনিকসে ফোন করা উচিত।’
বাবলির বুদ্ধিকে তারিফ করে বিশ্বরূপবাবু লাহা ইলেকট্রনিকসের নম্বরে ফোন করলেন, ‘আচ্ছা, এটা কি লাহা ইলেকট্রনিকস?’
‘আজ্ঞে, কাকে চাইছেন?’
‘ম্যানেজারবাবু আছেন?’
‘বলছি। আপনি কে বলছেন?’
‘আজ দুপুরবেলা বালি-বাদামতলায় একটা এসি ফিট করেছেন তো!’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ স্যার, করেছি।’
‘ওটা কে কিনতে গিয়েছিলেন বলতে পারবেন?’
‘এক মিনিট।’ এক মিনিটের অনেক আগেই ম্যানেজারবাবু বলে ফেললেন, ‘বিশ্বরূপ ঘটক। কিন্তু আপনি কে বলছেন স্যার?’
‘অমিই বিশ্বরূপ ঘটক। কিন্তু…’
‘কোনো প্রবলেম হচ্ছে, স্যার?’
‘না না, প্রবলেমটা অন্য জায়গায়, এসি ঠিকই চলছে।’
‘তবে?’
‘এসি-টা আমার নামে কেনা হলেও, যে ব্যক্তি আপনার দোকানে গিয়ে এসি-টা কিনে এনেছেন, আমি তার পরিচয় জানতে চাই।’
‘ভারী মুশকিল, স্যার। আপনিই তো এলেন। বললেন, ক্যাশ নিয়ে আসেননি, কাছে এ.টি.এম. কার্ডও নেই, কাগজপত্র বানিয়ে দোকানের লোক দিয়ে পাঠিয়ে দিলেই বাড়ি গিয়ে পেমেন্ট করে দেবেন। যেমন কথা তেমন কাজ। আপনি তো এক টাকাও কম দেননি, স্যার। আমার ছেলেরাও এতক্ষণ খেটে আপনার বাড়ি এসি ফিট করে এসেছে!’
‘সবই ঠিক আছে, কিন্তু…’
‘আপনার বাড়িতে কমপ্রেসর অনেক দূরে লাগিয়েছেন। অত বড়ো কর্ড ছিল না। দোকানে এসে এক্সট্রা কর্ড নিয়ে গিয়েছে ছেলেটা…’ বিশ্বরূপবাবুকে কোনোরকম বলার সুযোগ না দিয়েই ম্যানেজারবাবু বলে চলেছেন নিজস্ব স্টাইলে, ‘তারপরেও এসব প্রবলেম কেন হচ্ছে বলুন তো!’
‘আমি আপনাদের পরিষেবা নিয়ে কোনো প্রশ্নই তুলছি না। জাস্ট জানতে চাইছি, কে এসি-টা কিনতে গিয়েছিলেন আপনার দোকানে।’
‘ভারী অদ্ভুত প্রশ্ন, মশাই। হয় আপনি নিয়ে গিয়েছেন, নয় আপনি যাকে পাঠিয়েছিলেন, তিনিই নিয়ে গিয়েছেন। নাম জিজ্ঞেস করাতে বললেন, বিশ্বরূপ ঘটক। ব্যাস। ওই পর্যন্তই। আমরা কি তাঁর ঠিকুজিকুষ্ঠি নিয়ে রাখব? সাদা জামা, কালো প্যান্ট, বয়স ২৮-৩০, নর্মাল হাইট, ছিপছিপে, চুল কার্লি…’
বিশ্বরূপবাবুর বুঝে নিতে অসুবিধে হল না, এসি ফিট করতে-আসা তিনটে লোকের মধ্যে যে ছেলেটা সমস্তটা তদারকি করছিল, আসল কালপ্রিট সে-ই। বেশ অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে তিনি বললেন, ‘আচ্ছা ম্যানেজারবাবু, আপনি আমাকে একটু সাহায্য করবেন প্লিজ? যে ছেলেগুলো এসি-টা লাগিয়েছিল আমার বাড়ি, তাদের সঙ্গে আমার একটু যোগাযোগ করিয়ে দেবেন?’
‘আমার দোকান থেকে দুজন গিয়েছিল। একজন দোকানেরই কর্মী, বিনয়; অন্যজন এসি মিস্ত্রি গোরাচাঁদ। দুজনই বাচ্চা ছেলে। বিনয় এখন দোকানে নেই, আপনি সময় করে দোকানে আসবেন, কথা বলবেন। আর গোরাচাঁদ এই এলাকার অনেক বাড়িতেই এসি লাগায়, অনেক দোকানের সঙ্গেই যুক্ত, ঠিক আমার কর্মী নয়। তবে দেখা হলে আমি ওকে জিজ্ঞেস করব, ব্যাপারটা ঠিক কী! আপাতত রাখি। দোকানে ভিড় আছে। কেমন?’ ম্যানেজারবাবু আলতো শব্দে রিসিভারটা নামিয়ে রাখলেন।
বিশ্বরূপবাবু এখন কী করবেন? কোনো কিছু না ভেবেই ফোন করলেন আর.পি.-র নম্বরে। লজ্জাবনত কণ্ঠে ক্ষমা চাইলেন নিঃশর্তে, ‘কোথাও কোনো মারাত্মক ভুল হয়ে গিয়েছে ম্যানেজারদা। আমাকে ক্ষমা করে দিন।’
‘আপনি আমাদের পুরোনো কাস্টমার। আপনার কাছে এটা আশা করিনি।’
‘আমি আপনার সঙ্গে বেইমানি করিনি, ম্যানেজারদা। কে বা কারা আমাকে ঠকিয়েছে, সেটা এখনও ধরা পড়েনি। ধরা পড়লেই আপনাকে সব জানাব।’
‘আরে ছাড়ুন তো!’ তাচ্ছিল্যের সুর ম্যানেজারদার গলায়। বিশ্বরূপবাবু ভাবলেন, স্ত্রী-র অসুস্থতার কথাটা পাড়বেন কি না! আজ পাঁচ দিন হল শুচিস্মিতা কলকাতার নার্সিং হোমে ভরতি। বাড়িতে একা বিশ্বরূপবাবু। এই অবস্থায় কি মাথার ঠিক থাকে কারো? স্ত্রী নার্সিং হোম থেকে ফিরলে তাকে একটু আরামে রাখতে হবে। এই কারণেই মূলত এসি-টা কেনা। সেই এসি নিয়েই ঘটে গেল যত বিপত্তি! বিশ্বরূপবাবুকে নীরব থাকতে দেখে ম্যানেজারদা বললেন, ‘শুনুন, এসি-র আপ-ডাউনের ভাড়াটা অমিতের হাতে দিয়ে দিন। তারপর ওকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ছাড়ুন।’ কথাটা বলেই ফোনটা কেটে দিলেন তিনি। বিশ্বরূপবাবুর ‘নিশ্চয়, নিশ্চয়ই…’ উত্তরটা হাওয়াতেই ভাসতে লাগল গন্তব্যহীনভাবে।
অমিতের হাতে রিকশা ভাড়ার টাকা গুঁজে দিয়ে বিশ্বরূপবাবু আপশোসের ঢঙে বললেন, ‘কোথা থেকে যে কী হয়ে গেল, কিছুই বুঝলাম না। মাঝখান থেকে তোমরা আমায় ভুল বুঝলে।’
‘না না, ঠিক আছে।’ অমিত বিনয় করল।
‘আচ্ছা ওরা বলল, এসি-টা লাগিয়েছে যে মিস্ত্রি তার নাম গোরাচাঁদ। তুমি কি গোরাচাঁদকে চেনো?’
‘গোরা দাশ? দাঁড়ান… দাঁড়ান… হ্যাঁ, চিনি তো! উত্তরপাড়া স্টেশনের কাছেই বাড়ি ওর। ও আমার থেকে অনেক ছোটো। আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি ইলেকশনের সময়ে।’
‘চেনো তুমি? চেনো ওকে?’ চকচক করে উঠল বিশ্বরূপবাবুর চোখ দুটো।
‘হ্যাঁ চিনি। দাঁড়ান, এক্ষুনি ধরছি ওকে।’ পকেট থেকে মোবাইল বের করে অমিত গোরাচাঁদের নম্বরটা খুঁজে বের করল। তারপর ডায়াল করতেই ও প্রান্ত থেকে সাড়া এল, ‘বলো।’
‘শোন গোরা, তুই আজ দুপুরে বাদামতলার যে বাড়িতে এসি লাগিয়েছিস…’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, বিশ্বরূপবাবুর বাড়ি। কী হয়েছে?’ অমিতকে শেষ করতে না দিয়েই কৌতূহল প্রকাশ করল গোরাচাঁদ।
‘এসি-টা যিনি কিনতে গিয়েছিলেন, তাঁর নাম কী রে?’
‘তা তো জানি না।’
‘সে কী রে! বিশ্বরূপবাবু তো বলছেন, যতক্ষণ ধরে এসি-টা লাগিয়েছিস তোরা, ততক্ষণই ভদ্রলোক তোদের সঙ্গে ছিলেন! আবার কাজ সারা হলে তোদের সঙ্গে বেরিয়েও গিয়েছেন। অথচ নামটা…’
‘নাম জানি না দাদা, তবে বলেছিলেন, উনি বিশ্বরূপবাবুর শালাবাবু।’
শালাবাবু? বিশ্বরূপবাবুর আবার শালাবাবু কবে জন্মাল? শুচিস্মিতার মা-বাবা দুজনেই পটোল তুলেছেন তা বেশ কয়েক বছর হয়ে গেল! কই, তাঁদের কোনো পুত্রসন্তান আছে বলে তো তিনি জানেন না! তাঁদের তো একটাই কন্যাসন্তান! শালাবাবুর কথা শুনে বিশ্বরূপবাবু যত-না আমোদ অনুভব করলেন, তার চেয়ে ঢের বেশি অসহিষু� হয়ে পড়লেন তাঁর বিরুদ্ধে পরিকল্পিত চক্রান্তের গন্ধ পেয়ে! এমন শ্লেষের ইঙ্গিত, এমন বিদ্রুপাত্মক ইশারা, বিশ্বরূপবাবুর চকিতে মনে পড়ে গেল, তিনি তো পেয়েছিলেন সকালবেলার আপ লোকালে! ডেলি প্যাসেঞ্জার চ্যাংড়াগুলো তো এইরকম ভাষাতেই নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা চালাচ্ছিল তাঁকে নিয়ে। তাদেরই কেউ এই এসি-চক্রান্তে জড়িত নয় তো? মুখগুলো কিছুতেই মনে পড়ছে না বিশ্বরূপবাবুর। প্রায় সব ছেলেই অ্যাভারেজ দেখতে—কেউ একটু মোটা, কেউ কিঞ্চিৎ রোগা, কারো চাপ দাড়ি, কেউ ক্লিনলি শেভন, কিন্তু প্রত্যেকেই নর্মাল লুকিং। তাই তাদের আলাদা করে আইডেন্টিফাই করা বিশ্বরূপবাবুর পক্ষে নেক্সট টু ইমপসিবল!
সকাল সাড়ে ন-টার লোকাল ছেড়েছিল দশটা দশে। বাবলির মোক্ষম জবাবে ডেলি প্যাসেঞ্জারগুলো কিছুক্ষণের জন্য দমে গেলেও, বিশ্বরূপবাবু আর.পি.-তে ফোনটা করার পর ফের যখন বাবলির দিকে একপ্রস্থ কটমট করে তাকাচ্ছিলেন, চ্যাংড়াগুলো আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছিল কিছুটা। আবার সংযত হতে হয়েছিল বিশ্বরূপবাবুকে। দেঁতো হেসে কথা বলতে হয়েছিল বাবলির সঙ্গে। মনে মনে অবশ্য মেয়েটার প্রতি তীব্র রাগে ফেটে পড়ছিলেন তিনি। সুযোগ পেলেই রক্তচক্ষু দেখাতে ভুলছিলেন না। এখন বুঝতে পারছেন, কাজটা কত বড়ো ভুল হচ্ছিল। বাবলি সোমত্ত মেয়ে, ঘিয়ের গন্ধ পেলে আগুন তো তিড়িংবিড়িং করে উঠবেই। নন্দিনী কাঁদলে এই চুয়ান্ন বছর বয়সেও তাঁর রোম খাড়া হয়ে ওঠে; ইচ্ছে করে, দুনিয়া ডুবে যাক, নন্দিনীকে কাঁধে নিয়ে সাত সাগর তেরো নদী পেরিয়ে চলে যেতে সকলের ধরাছোঁয়ার বাইরে। কাল রাতেও নন্দিনীকে হোয়াটসঅ্যাপ করেছিলেন বিশ্বরূপ ঘটক, ‘নন্দিনী, তোমার আর আমার মাঝে আর শুধু একটা রাত, শুধু কয়েকটা ঘণ্টা! তারপর সূর্য উঠবে, পাখি ডাকবে, ফুল ফুটবে…’
নন্দিনী অবশ্য এরকম রহস্যময় বার্তার মাথামুন্ডু কিছুই বোঝেননি। তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘তোমার আর আমার মাঝে কোনোদিন কোনো বাধা ছিল না, আজও নেই। তুমি শুধুই আমার।’ নন্দিনী বোঝেন, সব বিয়েতে যেমন ভালোবাসা থাকে না, তেমনি সব ভালোবাসা বিয়েতেই শেষ হয় না। বিয়ে তো একটা সংস্কারমাত্র। ভালোবাসা অন্য জিনিস। তাই স্বামী মারা গেলেও, তিনি নিজেকে বিধবা মনে করেন না। এহেন নন্দিনীর প্রেমে হাবুডুবু-খাওয়া বিশ্বরূপ ঘটকের একদমই মাথায় আসেনি, একটা ষোলো-সতেরো বছরের মেয়েকে পাবলিক প্লেসে এতটা টর্চার করলে, প্রেমের জন্য ছোঁকছোঁক করা ছেলেছোকরার দল কিছুতেই ভালোভাবে নেবে না। নেয়ওনি। এখন ঠ্যালা সামলাও। মনে মনে সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লেন বিশ্বরূপবাবু। তাঁর মনে পড়ে গেল, বেলা সাড়ে বারোটা নাগাদ শালাবাবুর নেতৃত্বে টিম লাহা ইলেকট্রনিকস আর.পি.-র ছদ্মবেশে এসি লাগাতে এলে, বাবলিকেই তো তিনি দায়িত্ব দিয়েছিলেন কোন ঘরে কোথায় কীভাবে এসি ফিট করা হবে, তার যাবতীয় খুঁটিনাটি বুঝিয়ে দিতে। এরপর টানা দু-ঘণ্টা দোতলার শোবার ঘরে বাবলি ওদের সঙ্গেই ছিল। মাঝখানে মিনিট পাঁচেকের জন্য তিনি ভিজিট করতে গিয়েছিলেন একবার। পাশের বাড়ি থেকে অবজেকশন আছে বলে কমপ্রেসরটাকে যত বেশি সম্ভব দূরে বসানোর ফরমায়েশ করে এসেছিলেন তখনই। একবারও ভাবেননি, বাবলিকে অতক্ষণ একা পেয়ে… ওই কুচক্রীটা…
সর্বনাশ হয়ে গেল না তো? ভয়ে শিউরে উঠলেন বিশ্বরূপবাবু। তবে কি বাবলিকে আর-একদফা জেরা করা উচিত? এখনই? না না, থাক। সারাদিন ব্যাপক টর্চার হয়েছে মেয়েটার উপর। আজ আর নয়। ওকে বুঝিয়েসুঝিয়ে নরমে-গরমে কাজটা হাসিল করতেই হবে। যেভাবেই হোক। প্রথম চাপটা মিস হয়ে গিয়েছে, কী আর করা যাবে। নেক্সট চাপটায় সাকসেস চাই-ই। আড়াইটে-পৌনে তিনটে নাগাদ টিম লাহা ইলেকট্রনিকস বেরিয়ে গেলে, ঘণ্টা দেড়-দুই এসি-র হাওয়া খেতে খেতে ভালোরকম মগজধোলাই তো হয়েছে বাবলির! নিশ্চয়ই ফল ফলবে এবার! ‘কনফিডেন্স হারিয়ো না বিশ্বরূপ, কনফিডেন্স হারিয়ো না।’ নিজেকেই নিজে বোঝাচ্ছেন বিশ্বরূপবাবু।
পরক্ষণেই বিশ্বরূপবাবু নিজেকে দুষছেন, এসি ফিট করে বেরিয়ে যাওয়ার ঘণ্টা দুই-আড়াই পরে, মোটামুটি পাঁচটা নাগাদ, এসি-টা কেমন চলছে দেখার ছল করে শালাবাবু যখন ফের মিনিট পাঁচেকের জন্য এ বাড়িতে এসে সোজা এসি ঘরে ঢুকেছিল, তখনও তিনি তাকে সন্দেহ করলেন না কেন! সে যদি আর.পি. ইলেকট্রনিকসের লোকও হত, তবু কেন এসি কেমন চলছে, দেখতে আসবে দু-আড়াই ঘণ্টা পর? এরকম আবার হয় নাকি? অথচ বিশ্বরূপবাবু সরল মনে তার সঙ্গে হেঁ হেঁ করে কথা বললেন। বলে দিলেন, বারো দিন ধরে জ্বর না-ছাড়ায় ডাক্তারবাবুর নির্দেশে কলকাতার কোন নার্সিং হোমে শুচিস্মিতাকে ভরতি করা হয়েছে— এইসব খুঁটিনাটি বৃত্তান্ত। শালাবাবুও যেন ভাজা মাছটি উলটে খেতে জানে না এমন মুখ করে জিজ্ঞেস করল, ‘কী কারণে জ্বর ছাড়ছিল না কাকিমার?’
‘ডাক্তারবাবু বললেন, টাইফয়েড। আর বাড়িতে রাখা ঠিক হবে না।’
‘খুব ভালো করেছেন। এখন কেমন আছেন উনি?’
‘এখন একটু বেটার। এই তো বাবলি ছিল দু-দিন। আজ সকালেই নিয়ে এসেছি ওকে। আবার কাল দিয়ে আসব।’
‘মেয়ে কাছে না থাকলে আপনার তো মুশকিল।’
‘একদম তা-ই। হোটেলে খেতে হচ্ছে দু-বেলা। আজ বাবলি রাঁধবে। হোটেলের খাবার একদম স্যুট করে না, কিন্তু কী করব! রুগির কাছেও তো একজনকে রাখতে হয়। মেয়ে কাছে থাকলে মায়ের সুবিধে।’
‘সেই।’
কুচক্রীটা কেন এসেছিল সেকেন্ড টাইম? কী উদ্দেশ্য ছিল ওর? একবারও ভাবল না, যদি ধরা পড়ি! এত ডাকাবুকো! যত ভাবছেন, বিশ্বরূপবাবুর গায়ে কাঁটা দিচ্ছে তত। সমস্ত বিপত্তির মূলে এই এসি-টা। তবে কি ভেঙে ফেলে দেবেন এসি-টা? অনেকগুলো করকরেü নোট খরচ হয়েছে এটা লাগাতে। তা ছাড়া এসি-টা খুলে সরিয়ে দিলেই কি সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? যা হবার তা তো হয়েই গিয়েছে। এখন আর কিছু করার নেই তাঁর। কিন্তু উদ্দেশ্যটা কী শালাবাবুর? কেন এমন করল সে? কিছুই বিশ্বরূপবাবুর বোধগম্য নয়। তিনি ভাবতে পারছেন না, জাস্ট ভাবতে পারছেন না আর।
ইতিমধ্যে একজন মহিলা পুলিশ সমেত তিনজন উর্দিধারীর প্রবেশ ঘটেছে বাড়িতে। ভয়ে বুক ধড়ফড় করছে বিশ্বরূপবাবুর। ঝলমলে রাত নেমেছে বাদামতলা বাজারে। ‘অপরাধী ধরা পড়েছে।’ হাসতে হাসতে এগিয়ে এলেন ইনস্পেকটর। অপ্রস্তুত বিশ্বরূপবাবু সকলকে দোতলায় নিয়ে গিয়ে বসিয়েছেন এসি ঘরে। ইনস্পেকটর সাহেব পকেট থেকে একটা দামি মোবাইল সেট বের করে এগিয়ে দিলেন, ‘দেখুন তো বিশ্বরূপবাবু, এটা আপনার কি না?’
বিশ্বরূপবাবু অবাক বিস্ময়ে বলে উঠলেন, ‘হ্যাঁ, আমারই তো! এই ফোনটাতেই তো আমি নেট করি।’
‘কনফার্ম তো?’
‘কনফার্ম মানে? এই ঘরের এই টেবিলের ড্রয়ারে থাকে এটা।’ বিশ্বরূপবাবু টেবিল থেকে ড্রয়ার টেনে দেখালেন। তারপর কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বললেন, ‘এই ফোনটা ক্যারি করি না, কল করার জন্য অন্য একটা হ্যান্ডসেট ব্যবহার করি।’ সব সময়ের ব্যবহার্য সেটটা পকেট থেকে বের করে দেখালেন বিশ্বরূপবাবু।
‘আপনার বাড়িতে এসি লাগাতে এসে এই ফোনটা চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল একজন।’ ইনস্পেকটর দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করলেন।
‘একদম সঠিক, ইনস্পেকটর সাহেব।’ আহ্লাদে ডগমগ হলেন বিশ্বরূপ ঘটক।
‘আর এই জিনিসটা সে ইচ্ছে করে ফেলে গিয়েছিল আপনার ঘরে, বিকেল পাঁচটা নাগাদ ফিরে নিয়ে গিয়েছে।’ ইনস্পেকটর একটা ছোট্ট যন্ত্র বের করলেন।
‘কী এটা?’ বিশ্বরূপবাবু কিঞ্চিৎ ঝুঁকে পড়ে দেখতে চাইলেন যন্ত্রটা।
‘তেমন কিছু না, এটা একটা আইপড। ডিজিটাল মিউজিক প্লেয়ার। সঙ্গে ভয়েস রেকর্ডিং সিস্টেম আছে। ফোর জি.বি. ইনবিল্ট। এই যন্ত্রটা টানা দেড় ঘণ্টা মানুষের কথা রেকর্ড করতে পারে।’ বলতে বলতেই ইনস্পেকটর যন্ত্রটার ইউ.এস.বি. জ্যাক টেবিলে রাখা কম্পিউটারের ইউ.এস.বি. সকেটে সংযুক্ত করে, সেটা চালাতে বললেন বিশ্বরূপবাবুকে।
বিশ্বরূপবাবু শুনছেন তাঁর নিজেরই গলা— ‘বাবলি, শোন, এদিকে আয়। তুই বুঝি খুব রাগ করেছিস আমার উপর?’
‘না না’ বাবলি বলছে।
‘করেছিস তো! আমি বুঝি কিছু বুঝি না? নে, একটু বডিটা মাসাজ করে দে তো! এসি-র হাওয়াটা বড্ড মিষ্টি, বল?’
‘পা টিপব?’
‘হ্যাঁ দুটো পা-ই ভালো করে টেপ দেখি। বড্ড ব্যথা করছে। তারপর পিঠটা ডলে দিবি ভালো করে।’
‘তুমি যা বলবে, আমি তা-ই করে দেব, বাবা। কিন্তু যে কাজটা আমাকে দিয়েছিলে, ওটা আর করতে বোলো না, আমি পারব না। সবাই কি সবকিছু পারে?’
এই অবধি শোনার পর যন্ত্রটা বন্ধ করার জন্য তীব্র জোরাজুরি করতে লাগলেন বিশ্বরূপবাবু। কিন্তু পুলিশ কি কারো কাকুতিমিনতিতে কান দেয়, না আজ পর্যন্ত দিয়েছে কখনো? বিশ্বরূপবাবুর নিষ্ফল রোদনে পুলিশের কিছুই যায় আসে না। আবার শোনা যাচ্ছে বিশ্বরূপবাবুর গলা— ‘কাজটা তোকে করতেই হবে, বাবলি। এ ছাড়া কোনো উপায় নেই।’
‘বাবা গো, আমার মা-বাবা, বাড়িঘর কোথাও কিছু নেই। তোমরাই আমার বাবা-মা। মা আমাকে খুব ভালোবাসে। তাকে আমি কিছুতেই খুন করতে পারব না। তুমি বরং আমাকে মেরে ফেলো।’ বাবলির কান্নার জোর আওয়াজ আসছে।
অবিচলিত ভঙ্গিতে বিশ্বরূপবাবু বলে চলেছেন, ‘তোকে আমি সব শিখিয়ে-পড়িয়ে নার্সিং হোমে পাঠালাম। পুরিয়াতে বিষটা পর্যন্ত পুরে দিলাম। জাস্ট ওষুধে মিশিয়ে দিতে বললাম। এইটুকু করতে পারলি না আমার জন্য? কে তোকে এত বছর ধরে খাওয়ায়-পরায় রে? নিমকহারাম, খুব নিমকহারাম তুই।’
‘তুমি আমাকে যা বলবে বলো…’ অঝোরে কাঁদছে বাবলি।
‘গতকাল রাতে কিন্তু তুই কাজটা করে দিবি বলেই ঠিক ছিল!’
‘না বাবা, এরকম কোনো কথা আমি তোমায় কোনোদিন দিইনি।’
‘এমন সুযোগ আর পাবি না বাবলি, আমি দোষটা পুরোপুরি নার্সিং হোমের ঘাড়ে চাপিয়ে দেব। তোকে কেউ সন্দেহ পর্যন্ত করবে না। আর হ্যাঁ, এক লাখ টাকা দেব তোকে। আর কারো বাড়ি কাজ করতে হবে না। মানুষের মতো বাঁচবি।’
‘লোভ দেখিয়ো না বাবা, আমাকে মেরে ফেলো তুমি।’
‘বোকা মেয়ে কোথাকার! তোকে আমি বকাঝকা করি ঠিকই, কিন্তু কোনোদিন তোর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছি, বল? কোনোদিন গায়ে হাত দেওয়ার চেষ্টা করেছি তোর? চিরটা কাল মেয়ের মতো দেখেছি তোকে। আজ বাবার একটা অনুরোধ রাখবি না তুই?’
‘বললাম তো, তুমি আমাকে যা বলবে তা-ই করব। কিন্তু মা-কে মারতে পারব না।’
‘তোকে করতেই হবে। না হলে ওই বিষের পুরিয়া সমেত তোকে আমি পুলিশে দেব। বলব, তুই খুন করতে গিয়েছিলি।’
‘তুমিই তো আমায় দিয়েছ ওসব!’
‘কেউ বিশ্বাস করবে না। পুলিশ তোকে হাতেনাতে ধরবে। তারপর গারদের অন্ধকারে কাটাবি সারাজীবন… বুঝবি কত ধানে কত চাল।’
এইবার কান্নায় ভেঙে পড়েছে বাবলি। অমানুষিক টর্চার সে আর নিতে পারছে না কিছুতে। বিশ্বরূপবাবু নতুন চাল চালছেন তখন, ‘শোন বাবলি, কাঁদিস না। ডাক্তারবাবু একরকম জবাবই দিয়েছে। তোর মা-কে এমনিতেই বাঁচানো যাবে না। শুধু দু-দিন আগে আর পরে! তুই যদি কাল কাজটা করে দিস, মানুষটাকে আর কষ্ট পেতে হয় না। তোকেও জেলের ঘানি টানতে হয় না।’
এই সময়ে বাবলির মধ্যে কিছু পরিবর্তন লক্ষ করে আহ্লাদিত হলেন বিশ্বরূপবাবু। বাবলি কাঁদতে কাঁদতে বলছে, ‘মা বাঁচবে না, বলেছে ডাক্তারে? খুব ভালো হয়েছে গো, খুব ভালো হয়েছে। মায়ের আর না বাঁচাই ভালো।’
‘তবে আর বলছি কী! তুই তো বুদ্ধিমতী যথেষ্ট।’ এরপর বিশ্বরূপবাবু আর ঘাঁটাতে চাননি। ওষুধে কাজ হয়েছে ভেবে প্রসঙ্গান্তরে গিয়েছেন তিনি। লেবু কচলানোর একটা সময়সীমা থাকে। বিশ্বরূপবাবু খুব ভালো করে সেটা জানেন।
পুলিশও খুব ভালো করেই জানে নিজের কাজ। কম্পিউটার থেকে আইপডটা বিচ্ছিন্ন করেই ইনস্পেকটর সাহেব বলে দিলেন, ‘আপনাকে অ্যারেস্ট করা হল।’ বিশ্বরূপবাবু অনেক আগে থেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। ইনস্পেকটর বলে চলেছেন, ‘শখের গোয়েন্দা অনিন্দ্য সেনগুপ্ত আজ সকাল সাড়ে ন-টার হাওড়া-ব্যান্ডেল লোকালে বিশ্বরূপ ঘটককে চিহ্নিত করেন। ডেলি প্যাসেঞ্জার বন্ধুদের অনুরোধে তাঁর সন্দেহজনক কার্যকলাপের তদন্তভার নিজের হাতে তুলে নেন অনিন্দ্যবাবু। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি যা করেছেন, তা সমস্ত প্রশংসার ঊর্ধ্বে। মোবাইলটি হস্তগত করে প্রথমেই তিনি নন্দিনী লাহিড়ীর সঙ্গে বিশ্বরূপের অবৈধ সম্পর্কের সমস্ত তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করেন। তারপর বিশ্বরূপ ঘটকের গলা রেকর্ড করে পরিকল্পিত খুনের চক্রান্তের প্রমাণ সংগ্রহ করেন। বাবলি মেয়েটির সীমাহীন ধৈর্য আর নির্লোভ চরিত্রেরও প্রশংসা করতেই হয়। শত প্রলোভন ও চাপের কাছেও সে নতিস্বীকার করেনি। আবার দুপুরবেলা অনিন্দ্যবাবু যখন তাকে একা পেয়ে বার বার চেপে ধরেছেন সত্য প্রকাশের জন্য, তখনও একজন সামান্য ”এসি মিস্ত্রি”র কাছে বাবার বিরুদ্ধে একটি কথা বলাও সমীচীন মনে করেনি সে। দীর্ঘদিন এ বাড়ির নুন খেয়ে মালিকের প্রতি চরম দায়বদ্ধতাই মালিকের বিরুদ্ধে তাকে সহজে মুখ খুলতে দেয়নি। আমরা আপাতত বাবলির জন্য হোমের ব্যবস্থা করছি, আর বিশ্বরূপ ঘটকের জন্য জেলের লপসি।’
