পর পর সাত দিন
‘আজ কিছু করিস না ভুলু, মন খুব খারাপ আছে।’
‘সে তো মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে! তা কী হয়েছে তোর?’ টুম্পার বুকের খাঁজে নাক ডুবিয়ে দিল ভুলু।
‘তুই জেনে কী করবি? তোর তো শরীরটা নিয়ে কাজ! মনের খবরে তোর কী?’
‘এমন কথাটা তুই বলতে পারলি, টুম্পা? আমি তোকে ভালোবাসি না বুঝি? বুকে হাত দিয়ে বল তো, আমি তোকে ভালোবাসি না!’ টুম্পার ব্লাউজ খুলে বুকে হাত দিল ভুলু।
টুম্পা আজ বড়ো বেরসিক। মনটা তেতো হয়ে আছে বিষণ্ণতায়। কাল সকালের ট্রেনেই কলকাতা ফিরে যেতে হবে। কাকা-কাকিমা যে কী করছে, কে জানে! দুজনেই তো পাগল হয়ে গেছে প্রায়! পাঁচ দিন হয়ে গেল, পাক্কা পাঁচ দিন! থানা-পুলিশ-প্রশাসন কেউ কোনো কূলকিনারা করতে পারল না। এরকম অবস্থায় ওদের ছেড়ে আসতে একদম মন চায়নি টুম্পার, কিন্তু আধার কার্ড বড়ো বালাই। সরকার যা আরম্ভ করেছে! আধার কার্ড না থাকলে হয়তো দেশছাড়াই করে দেবে! ‘আমার সত্যি ভালো লাগছে না আজ।’ টুম্পা আবার আপত্তি করল।
‘আবার কবে দেখা হবে তার ঠিক নেই, অমন করিস না টুম্পা।’ টুম্পার নাকে নাক ঘষল ভুলু।
ভুলুর চুলে বিলি কাটতে কাটতে টুম্পা চাপা গলায় বলল, ‘ও বাড়ির মেয়েটা আজ পাঁচ দিন হল নিরুদ্দেশ। কাকা-কাকিমা বিছানা নিয়েছে।’
‘তাতে তোর কী? ওরা তোর কে হয়? কাজের লোক কাজের লোকের মতো থাকবি! বেশি আদিখ্যেতা করতে গেলেই মরবি!’ রাগে গজগজ করে উঠল ভুলু।
‘ও মা, এত বছর ধরে ওদের বাড়িতে আছি! এ কী কথা! তা ছাড়া ওরা কেউ আমাকে কাজের লোক মনে করে না! আমিও ওদেরই একজন।’ টুম্পা ব্লাউজ পরতে পরতে উঠে দাঁড়াল, ‘আর কক্ষনো এরকম কথা বলবি না। ওরা আমার আপনজন, বুঝলি?’
‘বেশ, বলব না।’ ভুলু এক হ্যাঁচকায় টুম্পাকে বুকে টেনে নিয়ে আবার ব্লাউজটা খুলে দিল। তারপর সিক্সটির ছিপি খুলে ঢকঢক করে উড়িয়ে দিল কিছুটা। নেশা করলে ভুলু অন্য মানুষ—তখন সে দয়াবান, পরোপকারী, সত্যবাদী। এই ভুলুকে টুম্পা ভালোবাসে।
‘আমার তো কেউ কোথাও নেই, ও বাড়িটাই আমার নিজের বাড়ি রে।’ ব্রেসিয়ারের নীচে থেকে একটা স্তন বের করে বোঁটাটা ভুলুর মুখে গুঁজে দিল টুম্পা। সে জানে, ভুলু অনেক খারাপ কাজের সঙ্গে যুক্ত। ভুলুর বউ-বাচ্চা আছে। তবু ভুলু কিছু চাইলে, না করতে পারে না টুম্পা। ভুলুর খিদে মেটাতে মেটাতে সে ছিনালি করে বলল, ‘আচ্ছা, তুই ও বাড়ির মেয়েটাকে খুঁজে দিবি? সারাজীবন তোর কেনা বাঁদি হয়ে থাকব।’
‘শম্পু? সে এখন কোথায় পাচার হয়ে গিয়েছে, তার ঠিক আছে?’ হো হো করে হেসে উঠল ভুলু।
‘মানে? তুই কী করে জানলি, শম্পা পাচার হয়ে গিয়েছে?’ খেঁকিয়ে উঠল টুম্পা।
‘জানি জানি, সব জানি।’
টুম্পা জানে, পেটে মাল পড়লে কথা বেরিয়ে আসে ভুলুর। তবে কি ভুলু সত্যিই জানে মেয়েটার খবর? কারা অপহরণ করল তাকে? কোথায় পাচার হয়েছে শম্পা? ‘কী জানিস, শুনি?’ প্রায় শেষ হয়ে-আসা বোতলটা ভুলুর হাতে ধরিয়ে দিল টুম্পা।
‘বলব কেন?’
‘তোর মুরোদ নেই, তাই বলতে পারবি না!’
‘কী বললি? মুরোদ নেই?’ আত্মাভিমানে লেগেছে ভুলুর।
‘তবে বল, শুনি। তোর মুরোদ দেখা?’ সায়ার দড়ি খুলতে লাগল টুম্পা।
‘শম্পু এখন দিঘার কোনো একটা হোটেলে আছে। এর বেশি কিছু জানি না। তবে দু-একদিনের মধ্যেই ওকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।’ বোতলের তলানিটুকু মুখে উপুড় করে, বীরের মতো কথাগুলো বলে ফেলল ভুলু। বলেই ভাবল, কাজটা ঠিক হল না। নেশার ঘোরে অমন কথা বলে সে বড়ো সর্বনাশ করে ফেলেছে। ভয়ে হাত-পা কাঁপছে তার, মাথা ঘুরছে অল্প অল্প। সে নগ্ন টুম্পাকে ধীরে ধীরে বিছানা থেকে তুলে খুব শান্ত ভঙ্গিতে বলল, ‘শোন, খবরটা নেহাতই অনুমান, কতদূর সত্যি তা জানি না। তবে তোকে কথা দিচ্ছি, আমি শম্পুকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করব।’
‘তুই খবরটা কোথা থেকে পেয়েছিস?’
‘বললাম তো খবরটা সত্যি না-ও হতে পারে, তবে দেখছি কী করা যায়!’ ভুলু পাজামাটা পায়ে গলিয়ে নিল।
‘তুই কোথা থেকে পেয়েছিস খবরটা?’
ভবি ভোলবার নয়। ভুলু বুঝল, পরিস্থিতি বেগতিক। নেশা কখন জানালা দিয়ে বেরিয়ে রেললাইন পেরিয়ে চলে গিয়েছে! অথচ ওই নেশার ঘোরেই একটু আগে কী কাণ্ডটাই না করে ফেলেছে সে! এখন পরিস্থিতি সামাল দিতে মাথায় একটা জবরদস্ত আইডিয়া এল। টুম্পার গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে সে নিচুস্বরে বলল, ‘খবরটা কোথায় পেয়েছি, সেটা জানা দরকার, না শম্পুকে উদ্ধার করা—কোনটা বেশি দরকার বল!’
‘উদ্ধার করে দে, আমি আর কিচ্ছুটি চাই না, শম্পা আমার বোন। মায়ের পেটের না হোক, ও আমার নিজের বোনের মতোই।’
‘ঠিক আছে, আমি দায়িত্ব নিচ্ছি!’
‘কবে, কখন উদ্ধার করবি, আমায় বল! তোকে বলতেই হবে!’
‘দেখছি!’
‘ওসব দেখছি-টেখছিতে চিঁড়ে ভিজবে না।’ টুম্পা নাছোড়।
‘চল তবে কালই আমার সঙ্গে, দেখি, কী করতে পারি!’ ভুলুর গলায় কপট আত্মবিশ্বাস।
‘কোথায়?’
‘দিঘা।’
দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামছে দাসপুর গ্রামে। মেয়ে ফিরবে স্কুল থেকে এইবার। বউ গিয়েছে বাপের বাড়ি, পাশের গ্রামে। তারও ফেরার কথা সন্ধেয়। টুম্পাকে আর এ বাড়িতে রাখা নিরাপদ নয় ভুলুর পক্ষে। কাল সকালে উঠেই দুজনে ছুটবে দিঘায়। সকালের ট্রেনে কলকাতা যাওয়া আর হল না টুম্পার। তা না হোক, মেয়েটাকে যদি উদ্ধার করা যায়, তার থেকে ভালো আর কিছু হয় না। ভুলুর সঙ্গে অনেক সমাজবিরোধীর যোগাযোগ। নিশ্চয়ই তাদের কারো কাছেই কোনোভাবে শম্পার খবরটা পেয়েছে সে। খবর যেখান থেকেই পাক, টুম্পার কিছু এসে যায় না, মেয়েটাকে ফিরে পাওয়া গেলেই হল। অনেক আশা নিয়ে ভুলুকে গুডবাই করে, টুম্পা বেরিয়ে গেল নিজের বাসার দিকে।
দুই
পরদিনই দাসপুর গ্রামে একটা বড়োসড়ো বিপর্যয় ঘটে গেল। অঝোরে কাঁদছে সবিতা মিস্ত্রি। তাকে থানায় নিয়ে এসেছে পাড়ার লোকেরা। সকাল থেকে সোনাই নিরুদ্দেশ। এখন বেলা গড়িয়ে সূর্য ঢলে পড়েছে। সেই যে সকালে টিউশন পড়তে গেল মেয়েটা, আর ফিরল না। বাবা নেই বাড়িতে। পড়শিদের সাহায্য নিয়ে মা সারাদিন খুঁজেছে গোটা গ্রাম, কোথাও কোনো সন্ধান না পেয়ে শেষে থানায় এসেছে ডায়েরি করতে। ‘কোনো ছেলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল?’ দারোগাবাবু মুখ তুলে তাকালেন।
‘না স্যার, মেয়ে আমার পড়াশোনা ছাড়া কিছু বোঝে না।’
‘কোন ক্লাসে পড়ে?’ গম্ভীর গলা দারোগবাবুর। রাজ্যের অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ বিভাগ আয়োজিত কন্যাশ্রী বিষয়ক কবিতা লেখার প্রতিযোগিতায় কিছুদিন আগেই সপ্তম শ্রেণির সোনাই কবিতা লিখে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল স্কুলে। জেলা বা রাজ্যস্তরে কোনো পজিশন পায়নি ঠিকই, কিন্তু বিদ্যালয় থেকে ওর কবিতাই শ্রেষ্ঠ বিবেচনা করে পাঠানো হয়েছিল উপরমহলে। মিষ্টি স্বভাব আর পড়ালেখায় প্রবল আগ্রহের জন্য স্যার-ম্যাডামদের নয়নের মণি সোনাই। পড়শিরাও একবাক্যে স্বীকার করে, সোনাইয়ের মতো মেয়ে হয় না। ‘ক্লাস সেভেন, স্যার।’ সবিতা মিস্ত্রি শাড়ির আঁচলে চোখের জল মুছল।
‘মেয়ে কি মোবাইল ব্যবহার করত?’
‘না স্যার।’
‘আপনার সঙ্গে কোনো রাগারাগি হয়নি তো?’
‘না স্যার।’
‘ছবি এনেছেন মেয়ের?’
বেরোনোর সময় এক পড়শি ভদ্রলোক বুদ্ধি করে সবিতা মিস্ত্রিকে মেয়ের ছবি সঙ্গে নিতে বলেছিলেন। সবিতা মিস্ত্রি সোনাইয়ের একটা সাদা-কালো পাসপোর্ট ছবি দারোগাবাবুর দিকে এগিয়ে দিল, ‘এই নিন স্যার।’
‘মেয়ে কী পোশাক পরেছিল টিউশন যাওয়ার সময়ে?’
‘হালকা সবুজ রঙের সালোয়ার-কামিজ আর সাদা ওড়না।’
‘জি.ডি.-তে লিখেছেন তো সব কথা?’ দারোগাবাবু চোখ থেকে চশমা খুললেন। সবিতা মিস্ত্রি ধনঞ্জয় পোদ্দারের দিকে তাকাল।
ধনঞ্জয়বাবু মৃদু হেসে বললেন, ‘হ্যাঁ স্যার, সব লিখে দিয়েছি।’
‘মেয়ের বাবার নামটা কী বললেন যেন?’
‘শংকর মিস্ত্রি।’ পড়শিদের মধ্যে কেউ একজন উত্তর দিলেন।
‘তিনি আসেননি কেন?’
বলতে বলতেই থানায় প্রবেশ শংকর মিস্ত্রির। চোখ-মুখ শুকিয়ে পাংশু হয়ে গিয়েছে, কপালে বলিরেখা স্পষ্ট, চুল উসকোখুসকো। চোখ দুটো কোটরে ঢুকে আছে। কাজের চাপে ফোনটা সারাদিন বন্ধ রেখেছিল, বাড়ি ফিরেই অপ্রত্যাশিত দুঃসংবাদে লোকটা যেন উন্মাদ হয়ে গিয়েছে। বাড়ি থেকে সোজা এসেছে থানায়, ‘হ্যাঁ স্যার, আমিই শংকর মিস্ত্রি। আমার মেয়েকে খুঁজে দিন স্যার, না হলে আমরা মরে যাব।’ পাগলের মতো করছে শংকর মিস্ত্রি।
‘আপনি বসুন, একটু শান্ত হোন!’
‘স্যার, আমার মেয়েটা বেঁচে আছে তো স্যার?’ অসহিষু� উতরোল শংকর মিস্ত্রির।
‘এত ভয় পাচ্ছেন কেন, আমরা তো আছি! আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করব!’
‘স্যার প্লিজ, আমার মেয়েকে ফিরিয়ে দিন।’
‘এটা আমাদের দায়িত্ব। আমাদের কাজ করতে দিন, নিশ্চয়ই মেয়েকে ফিরে পাবেন।’
‘স্যার, আমি মরে যাব, সোনাই না থাকলে আমি মরে যাব। ও আমার প্রাণ…’ ছটফট করছে শংকর মিস্ত্রি।
‘আপনি প্লিজ শান্ত হোন, আমাদের কাজ করতে দিন।’ শংকর মিস্ত্রির কাঁধে হাত দিয়ে দারোগাবাবু তাকে চেয়ারে বসিয়ে দিলেন, ‘আচ্ছা, আপনি কি কাউকে সন্দেহ করেন?’
‘সন্দেহ? না স্যার, আমাদের কোনো শত্রু নেই।’
‘কখনো কোনো ছেলের এগেনস্টে মেয়ে কমপ্লেন করেছিল? এই যেমন ধরুন, রাস্তায় পিছু নেওয়া, কটু মন্তব্য করা…’
‘না স্যার, কখনো না, আমার সোনাই তো বাচ্চা মেয়ে, এই সেদিন জন্মাল। কাপড় চাপা দিয়ে যখন ওর মা ঘরে নিয়ে এল…’ শংকর মিস্ত্রি আর শেষ করতে পারল না বাক্যটা, দলা-পাকানো কান্নায় গলাটা বুজে গেল।
‘জল খাবেন?’
‘হ্যাঁ,’ শংকর মিস্ত্রি ঘাড় নাড়ল।
কেউ একজন জল এনে দিলে, কিছুটা জল খেয়ে সে বাকি জলে চোখ-মুখ ধুয়ে নিল খানিক তফাতে গিয়ে। ফিরে এসে চোয়াল শক্ত করে বলল, ‘স্যার, আপনি আপনার কাজ করুন। আমি আর ডিস্টার্ব করব না।’
‘একদম। আমাদের উপর ভরসা রাখুন। জোর আনুন মনে। ভেঙে পড়লে কিছু হয় না, ভেঙেই যায়।’
‘আপনার কথা মনে রাখব, স্যার।’
‘হুম। আর প্রয়োজন হলেই আপনাকে ডেকে নেব।’
তিন
পরদিনই সন্ধেবেলা থানা থেকে ফোন এল শংকর মিস্ত্রির, ‘আমি বড়োবাবু বলছি, একবার কাইন্ডলি থানায় আসুন।’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি এক্ষুনি আসছি। কিছু সূত্র পাওয়া গেল নাকি স্যার?’
‘হ্যাঁ মানে অজ্ঞাতপরিচয় এক তরুণীর দেহ মিলেছে…’
‘কোথায় স্যার?’ আঁতকে উঠল শংকর মিস্ত্রি।
‘দিঘার ঝাউবনে।’ অফিসার ঢোঁক গিলে বললেন, ‘নার্ভাস হবেন না। নিয়ম অনুযায়ী, অজ্ঞাতপরিচয় কোনো দেহ পাওয়া গেলে, তার ছবি বিভিন্ন থানায় পাঠানো হয়। এক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে আর কী! আপনি আসুন।’ এরপর শংকর মিস্ত্রি আর কথা বলতে পারেনি, ভিতর থেকে কিছু বলতে চাইলেও, মুখ দিয়ে স্বর বেরোয়নি।
একবুক উত্তেজনা নিয়ে থানায় ঢুকল শংকর মিস্ত্রি। বড়োবাবু অপেক্ষা করে আছেন তারই জন্য। শংকর মিস্ত্রিকে বসতে বলে দারোগাবাবু ছবি বের করলেন, ‘ছবির যা অবস্থা, মনে হয় না কিছু বুঝতে পারবেন! তবু দেখুন।’ সত্যিই মৃতদেহের ছবি এতটাই বিকৃত ও অস্পষ্ট যে, কোনো মানুষের পক্ষেই তা শনাক্ত করা সম্ভব নয়।
তবু অনেকক্ষণ নেড়েঘেঁটে, ছিন্নভিন্ন মুখের আদলে সামান্য হলেও কোথাও যেন কিঞ্চিৎ মিল খুঁজে পেল শংকর, ‘স্যার, আমি কিছু বুঝতে পারছি না। আমাকে ক্ষমা করুন। শুধু মুখটা দেখে কেন জানি না আমার মনে হচ্ছে, এ আমার সোনাইয়েরই মুখ! আমি জানি না স্যার, আমি ঠিক বলছি কি না!’ খুব কাঁদছে শংকর মিস্ত্রি। কাঁদতে কাঁদতে টেবিলে মাথা ঠুকতে লাগল সে।
‘একদম কাঁদবেন না, আমি বলছি, ও আপনার মেয়ে নয়।’ দারোগবাবু সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেন।
‘যদি আমার মেয়েই হয় অফিসার? আমার কী হবে?’ মুখ তুলল শংকর।
‘বাবার মন তো, তাই সব চেয়ে খারাপটাই আশঙ্কা করছেন। কিন্তু বাস্তবটা দেখবেন ভিন্ন। সতেরো বছরের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। আপনি চুপ করুন। শান্ত হোন।’
‘আমার কী করণীয় এখন, স্যার?’
‘আপনি কাল সকালেই দিঘা থানায় চলে যান। সঙ্গে স্ত্রী-কেও নিয়ে যাবেন।’
‘সবিতা অসুস্থ, স্যার। বিছানাগত। কখনো জ্ঞান থাকছে, তো কখনো থাকছে না।’
‘চিকিৎসা করাচ্ছেন তো?’
‘হুঁ, ডাক্তারবাবু এসেছিলেন। ঘুমের ইঞ্জেকশন দিয়েছেন।’
‘দুজনেই ভেঙে পড়লে হবে না শংকরবাবু, একজনকে শক্ত হতেই হবে।’
‘আমি চেষ্টা করছি স্যার, আমি চেষ্টা করছি।’ কোনোরকম দুর্বলতাকে প্রশ্রয় না দিয়ে গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল শংকর মিস্ত্রি। তার এখন অনেক কাজ, অনেক দায়িত্ব! সে দায়িত্ব তাকেই পালন করতে হবে। সবিতার মতো ঘুমের ইঞ্জেকশন নিয়ে পড়ে থাকলে চলবে না। দারোগাবাবুর কথাগুলো যেন অমোঘ শক্তি জোগাল তাকে। সেই শক্তিতেই বলীয়ান হয়ে, বড়োবাবুকে নমস্কার করে, থানা থেকে বেরিয়ে গেল শংকর।
চার
‘বাবা হয়ে নিজের মেয়েকে চিনতে পারব না?’ পরদিনই কাঁথি হাসপাতাল মর্গে ক্ষতবিক্ষত তরুণীর দেহ দেখে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করল শংকর মিস্ত্রি। তবু দিঘা থানার আই.সি. বড়ো খুঁতখুঁতে, ‘দেখুন শংকরবাবু, মৃতদেহের নাক থেকে মুখের নীচে পর্যন্ত অংশ সম্পূর্ণ থেঁতলে গিয়েছে। কোনো মানুষের পক্ষেই…’
‘তা ছাড়া দেহ যে পরিমাণ ফুলেছে…’ আরেকজন পুলিশ অফিসার ইতস্তত করছিলেন।
কিন্তু শংকর মিস্ত্রি নাছোড়, ‘আমি কেন অন্যের মৃতদেহ নিজের বলে নিতে যাব বলতে পারেন?’
‘ছি ছি, তা কেন হতে যাবে? অমন কথা বলবেন না। আমরা আসলে বলতে চাইছি, আপনার তো এই পরিস্থিতিতে মাথা কাজ করছে না, তাই যদি কোনো ভুল করে ফেলেন…’
‘আমি ভুল করছি না, অফিসার।’ শংকর নিজের অবস্থানে অবিচল।
‘তা ছাড়া আমার তো মনে হয়…’ আই.সি. আরও কিছু বলতে উদ্যত হলেন।
‘আবার কী মনে হয়…’
‘যে মেয়েটির দেহ আপনি সোনাইয়ের বলে শনাক্ত করেছেন, তার সঙ্গে আপনার মেয়ের বয়সের যথেষ্ট ফারাক আছে!’
‘অফিসার, মৃতদেহের বুকের ওই জড়ুল আমাকে চিনিয়ে দিয়েছে সব। বুঝেছেন?’ শংকর আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারল না, হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। তার অকাট্য যুক্তি ফেলে দিতে পারল না পুলিশও। শরীরে জড়ুল বা কোনো বিশেষ চিহ্নের অবস্থান দেখে মৃতদেহ শনাক্তকরণ, সবাই জানে, শনাক্তকরণের সব থেকে নিরাপদ ও সঠিক পদ্ধতি। তাই দেহ হস্তান্তরে পুলিশ আর বিলম্ব করল না।
পাঁচ
পরদিনই সৎকার হয়ে গেল সোনাইয়ের। আগুনে ছাই হয়ে গেল বারো-তেরো বছরের ছোট্ট জীবন! বইপত্তর, ড্রয়িং, কবিতার খাতা, কাপড়চোপড়, নাকছাবি, পুঁতির মালা… পড়ে রইল যেখানে যেমন! ট্রাঙ্কের মধ্যে ভরা থাকল পুরোনো সোয়েটার, সেলাই খুলে-যাওয়া সালোয়ার; খাতার ভিতর চাপা রইল বাসি হোমটাস্ক, অস্পষ্ট হিজিবিজি; মেঝে ভরতি পায়ের ছাপ, ঘর ভরতি হাসিকান্না, জীবন ভরতি চুপকথা নিয়ে সোনাইয়ের আত্মা শংকর-সবিতার দু-কুঠুরি পর্ণকুটিরে ঈশ্বর হয়ে বেঁচে থাকার ছাড়পত্র অর্জন করল। স্কুল ছুটি হয়ে গেল এক মিনিট নীরবতা পালন করে; দাসপুর থানার দারোগাবাবু এলেন শংকরের ঘরে, টুপি খুলে হাতে ধরা, চোখের কোনায় জলের ইশারা; মেঘ-ভাঙা বৃষ্টি নামল রাতে, আর প্রশ্নাতীত শীতলতায় স্নাত হল গোটা গ্রাম, গাছপালা, একটা অকালমৃত্যু! কিন্তু কে খুন করল একটা ফুলের মতো ফুটফুটে মেয়েকে? কেন করল? তার বিচার কী হবে? অপরাধী ধরা পড়বে না? কী করছে পুলিশ? অমীমাংসিত যন্ত্রণার দমচাপা আবহে গোটা গ্রাম দাঁতে দাঁত চেপে অপেক্ষায় রইল অজ্ঞাতপরিচয় আততায়ীর উপযুক্ত শাস্তির।
ছয়
গ্রামসুদ্ধ মানুষকে হতভম্ব করে পরদিনই সোনাই ঘরে ফিরে এল সশরীরে। তার অপ্রত্যাশিত আবির্ভাবে অলৌকিকতার তত্ত্বকে দূরে সরিয়ে, সবিতা মিস্ত্রি আনন্দে আত্মহারা। আত্মহারা শংকর মিস্ত্রিও। কিন্তু তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে পরের মেয়েকে সৎকার করে ফেলার অপরাধবোধ। কাঁচুমাচু মুখে সে পড়শিদের বলল, ‘দেহটা আরও ভালো করে দেখা উচিত ছিল আমার। যাদের মেয়েকে দাহ করলাম, তারা এইবার জানতে চাইলে, কী জবাব দেব আমি?’
‘বাবা হয়ে মেয়েকে চিনতে ভুল করলে ভাই?’ কেউ একজন কটাক্ষ করল।
‘মেয়েকে ভূতে ভর করল কি না, সেটাও তো দেখতে হবে!’ আরেকজন বলল।
শংকর মিস্ত্রি কী জবাব দেবে? তার কি কিছু বলার আছে? দোষটা তো সম্পূর্ণভাবেই তার! এত বড়ো একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তার কি দুবার ভাবা উচিত ছিল না? পুলিশ তো তাকে বার বার সচেতন করেছিল, যে মানুষের দেহ সে দাহ করেছে, তার সঙ্গে সোনাইয়ের বয়সের বিস্তর ফারাক! ‘তোমরা আমাকে ক্ষমা করে দাও, আমার ভুল হয়ে গিয়েছে।’ হাত জোড় করে বলল শংকর।
‘আমরা ক্ষমা করার কে? যাদের মেয়েকে দাহ করেছ, তাদের কাছে গিয়ে ক্ষমা চাও গে যাও।’ পড়শিরা বলল। কিন্তু কাদের মেয়ে খুন হয়েছে? সে রহস্যের কিনারা হল কই? সোনাইকেই বা কে অপহরণ করেছিল? কোথায় ছিল সে এই ক-দিন? কাদের সঙ্গে ছিল? কী করছিল? কৈখালি থেকে পুলিশ আজ সোনাইকে উদ্ধার করেছে। কিন্তু তার মুখ থেকে একটি কথাও বের করতে পারেনি এখনও। রীতিমতো ট্রমায় সে! বার বার শুধু একটা কথাই বলছে, ‘নিজের ইচ্ছেতেই আমি ঘর ছেড়েছিলাম। কেউ আমাকে আটকে রাখেনি।’
কিন্তু কেন নিজের ইচ্ছেয় ঘর ছেড়েছিল সোনাই? এ প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই তার কাছে! ঝগড়াঝাঁটি হয়েছিল মায়ের সঙ্গে? সাংঘাতিক কোনো অভিমান? বাবার সঙ্গে রাগারাগি? বকাবকি করেছিল বাবা-মা? না, এসবের কোনো কিছুই হয়নি। সোনাইকে কোনোদিনই মা-বাবা বকে না, বকার প্রয়োজনই পড়ে না। তবে কি প্রেমে পড়েছিল সোনাই? প্রেমে পড়ে ঘর ছেড়েছিল? না না, এসবের প্রশ্নই ওঠে না! শারীরিক ও মানসিকভাবে এখনও সে ছোট্টটি! প্রেম আর সোনাইয়ের মধ্যে যোজন যোজন দূরত্ব! টিপিক্যাল ভালো মেয়ে বলতে যা বোঝায়, সোনাই তা-ই। পড়াশোনা অন্ত প্রাণ! বন্ধুবান্ধবও বিশেষ নেই। স্কুল, টিউশন আর বাড়ি—এটুকুই তার পৃথিবী! পড়াশোনার বাইরে বাড়ির কাজ করে প্রচুর, মা-কে সাহায্য করে—ঘর মোছে, বাসন মাজে, রান্নাবান্নাও করে টুকটাক। মায়ের অপারেশন হয়েছে সদ্য, তাই মা ভারী কাজ করতে গেলেই সেখানে হাজির হয় মেয়ে, ‘মা তুমি বোসো, আমি তো আছি।’
‘তুই পড়।’
‘হোমটাস্ক হয়ে গিয়েছে মা, তুমি ভেবো না তো!’
‘তুই অনেক পড়ালেখা করবি, তারপর চাকরি করে মায়ের দুঃখ ঘোচাবি।’
‘মা, তোমার কীসের এত দুঃখ? আমাদের চেয়েও তো গরিব মানুষ আছে পৃথিবীতে!’ কথাটা বলেই নিজেকে সংযত করে নেয় সোনাই। মা যদি বলে, ‘হ্যাঁ, গরিব মানুষ অনেক আছে ঠিকই, কিন্তু কতজনকে এভাবে লাথিঝাঁটা খেয়ে বেঁচে থাকতে হয় বল দেখি?’ তখন কী উত্তর দেবে সে? মা-কে কি মানুষের মতো বাঁচার অধিকার দিয়েছে বাবা? কোনো সম্মান? ন্যূনতম ভালোবাসা? অত বড়ো মেয়ের সামনেও তো প্রায় রোজদিন মা-কে মারে বাবা, চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে দরজার বাইরে বের করেও তো দিয়েছে কতবার! কী করতে পেরেছে সে? বন্ধ করতে পেরেছে মায়ের অপমান? ঘোচাতে পেরেছে মায়ের দুঃখ? এখন মা যদি স্বপ্ন দেখে, সোনাই বড়ো হয়ে মায়ের দুঃখ ঘোচাবে, তাতে অন্যায়টা কী?
সাত
পরদিন সোনাই কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠলে, পুলিশ তাকে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করে ধরে ফেলল দেবদাস সাহা, খায়ের ইসলাম আর গোলাম মুর্শেদকে। তিনজনেই গ্রেপ্তার হল সোনাইকে অপহরণ ও নারীপাচারকারী দলের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে। সেদিন সকালবেলা টিউশন যাওয়ার রাস্তা থেকে সোনাইকে অপহরণ করেছিল এই তিন দুষ্কৃতী। ‘ঠিক কী ঘটেছিল, সোনাই?’ দারোগাবাবু নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন।
‘আমার নাকে একটা রুমাল চেপে ধরল কেউ একজন। সঙ্গে সঙ্গে মাথাটা ঘুরে গেল। অমনি সব অন্ধকার। তারপর আর কিছু জানি না। যখন জ্ঞান ফিরল, দেখলাম, বিছানায় শুয়ে আছি। একটা ঘুপচি ঘরে আমি বন্দি।’
‘তারপর?’
‘তারপর ওরা এসে বলল, তোর কোনো চিন্তা নেই। কোনো ক্ষতি করব না তোর। তুই আমাদের বোনের মতো। আমাদের দাদা ডাকবি।’
‘স্ট্রেঞ্জ!’
‘ওরা কোনোদিন গায়ে হাত দেয়নি আমার। কোনোদিন না।’
‘খাওয়াদাওয়া?’
‘ঠিকঠাক সময়ে খাবার দিয়ে যেত। ভাত-মুড়ি-ছাতু…’
‘তারপর?’
‘একদিন খুব কাঁদতে কাঁদতে ওদের হাতে পায়ে ধরে বলেছিলাম, আমি আর পারছি না, এবার আমাকে মুক্তি দাও! ওরা বলল, ঠিক আছে, আর দু-একদিনের মধ্যেই তোকে ছেড়ে দেব।’ কৈখালির একটা নিরিবিলি জায়গায় সোনাইকে ছেড়ে দিয়েছিল দেবদাস। বলেছিল, ‘যেতে পারবি তো? আমার পক্ষে আর এগোনো নিরাপদ নয়।’
‘হ্যাঁ, আমি ঠিক পৌঁছে যাব। তুমি চলে যাও।’
সোনাই তখন যেকোনো প্রকারে ওদের হাত থেকে মুক্তি চাইছিল। তাই কৈখালি থেকে কীভাবে সে বাড়ি পৌঁছোবে, সেখান থেকে বাড়ির দূরত্বই বা কতটা, এসব ভাবার অবকাশ ছিল না তার। ছাড়া পেয়ে কৈখালি বাস স্ট্যান্ডের কাছে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ঘুরছিল সে। হঠাৎ নজরে পড়ে পুলিশের। পুলিশ তো ক-দিন থেকেই হন্যে হয়ে খুঁজছে তাকে। তাই কৈখালি বাস স্ট্যান্ডের কাছে তাকে দেখামাত্র পুলিশ আর বিলম্ব করেনি। ‘তবে কাল কেন বলতে চাইছিলি না অপহরণের ব্যাপারটা?’ দারোগাবাবু মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘দাদাগুলোকে বাঁচানোর জন্য?’
‘ওরা বলেছিল, পুলিশকে ওদের কথা বললে আমাকে ফের ধরে নিয়ে যাবে। পাখি পড়ানোর মতো করে বুঝিয়ে দিয়েছিল, আমি যেন বলি, স্বেচ্ছায় বাড়ি থেকে পালিয়েছিলাম।’ সোনাই দৃপ্তকণ্ঠে বলল, ‘কিন্তু আজ আপনি যখন বললেন কোনো ভয় নেই, ওরা আর কিচ্ছু করতে পারবে না, তখন মনে সাহস এল…’
তিন দুষ্কৃতীর নিখুঁত শারীরিক বর্ণনা ছাড়াও, সোনাই পুলিশকে আরও যে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে তা হল, শম্পা নামের একটা মেয়ের উপর ওই দুষ্কৃতীদের নিপীড়ন। একই বাড়িতে দুজনেই বন্দি ছিল তারা। শম্পা নামের মেয়েটাকে অজস্রবার ধর্ষণের উপর্যুপরি ইঙ্গিত পেলেও, সোনাই জানে না, কেন তাকে একবারের জন্যও স্পর্শ করেনি কেউ। দুজনকে একই বাড়িতে বন্দি রাখা হলেও, কখনো শম্পার সঙ্গে কথা বলতে দেওয়া হয়নি সোনাইকে। শম্পার উপর অত্যাচার বন্ধ করতে সোনাইয়ের অসহায় আবেদনে কখনো কর্ণপাত করেনি তারা। এমনকী, সোনাইয়ের বুঝতে অসুবিধে হয়নি, নিকটবর্তী বিশেষ কোনো হোটেলেও একাধিকবার শম্পাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে খরিদ্দার সামলাতে। দুষ্কৃতীদের কথোপকথন থেকে সে এমনও আভাস পেয়েছে, নিকট ভবিষ্যতেই শম্পাকে পাচার করে দেওয়া হবে বাংলাদেশে। মূলত শম্পাকে বাঁচানোর জন্যই, জীবনের ভয় তুচ্ছ করেও সে পুলিশকে এই সমস্ত তথ্য সরবরাহ করল। গতকাল পর্যন্ত যে সাহস সে অর্জন করতে পারেনি, মনের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন দ্বন্দ্বে আজ সেই সাহসই তাকে শক্তি জুগিয়েছে সত্যের দুর্গম পথে পা রাখতে।
সোনাইয়ের অলৌকিক প্রত্যাবর্তন আজকের সব খবরের কাগজে খবর হয়েছে। টনক নড়েছে পুলিশের। কাঁথির এস.ডি.পি.ও.-র কাছে ধমক খেয়েছেন দিঘা থানার আই.সি., ‘একজনের বডি আরেকজনকে দিয়ে দিলেন? আপনাকে তো মশাই পুরস্কৃত করা উচিত!’
‘কী করব স্যার, শংকরবাবু মৃতদেহ শনাক্তকরণে ভুল করে ফেলেছেন। আমরা সাবধান করা সত্ত্বেও, উনি নিজের দাবিতে অনড় ছিলেন। এক্ষেত্রে আমার কী-ই বা করার ছিল!’ পুলিশের যা করার ছিল, তা অবশ্য পুলিশ করেছে। অজ্ঞাতপরিচয় মৃতদেহের ভিসেরা-নখ-রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে রাখা হয়েছে, যাতে প্রয়োজনে ডি.এন.এ. পরীক্ষা করা যায়। ওই সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষা করেই অজ্ঞাতপরিচয় মহিলার পরিচয় অনুসন্ধানের চেষ্টা শুরু হবে এইবার।
তিন দুষ্কৃতীকে গ্রেপ্তারের সঙ্গে সঙ্গেই শম্পাকে উদ্ধার করা হয়েছে দিঘার হোটেল থেকে। মূলত সোনাইয়ের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই দেবদাস, খায়ের ও গোলামকে জেরা করে শম্পাকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। উদ্ধার করেই তাকে ভরতি করা হয়েছে হাসপাতালে। শারীরিক ও মানসিকভাবে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত শম্পা তবু পুলিশকে সাহায্য করতে উদগ্রীব, ‘আমাকে যে লোকটা কিডন্যাপ করেছিল, তাকে আমি চিনি, ইনস্পেকটর।’
‘কে সে? নামটা বলুন।’
‘নাম তো আমি জানি না।’ জড়ানো গলায় উত্তর দিল শম্পা।
‘তাহলে কী জানেন?’
‘লোকটার সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল টুম্পাদি। বলেছিল, ওর দাদা। সে বছরখানেক আগের কথা। নাম বলতে পারব না, তবে অপহরণের দিন তাকে চিনতে আমার অসুবিধে হয়নি একটুও।’
সেদিন কলেজ যাওয়ার পথে পাড়ার মোড়ের ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে লোকটাকে উদবিগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সত্যি সত্যিই চিনতে সমস্যা হয়নি শম্পার—ডান হাতে ঘড়ি, লম্বা চুল, পান-খাওয়া মুখে কথার খই ফুটছে অনর্গল। সম্ভবত লোকটার শারীরিক গঠন, অঙ্গভঙ্গি কিংবা আচরণগত কিছু বিশেষত্বের জন্য তার অবয়বটা মনে গেঁথে ছিল শম্পার। না হলে এক বছর আগে দেখা লোকটাকে শম্পাই কেন আগ বাড়িয়ে বলতে যাবে, ‘কী ব্যাপার, আপনি এখানে?’
‘আরে, তোমাদের বাড়িই তো আসছি। বোনের বাড়ি দাদা আসবে না? তা আবার একটা না, দু-দুটো বোন!’
‘চলুন তবে, আপনাকে আগে পৌঁছে দিয়ে আসি, তারপর কলেজ যাব।’ শম্পা হাসল।
‘আসলে…’ লোকটা ইতস্তত করছে, ‘তোমার বউদিও এসেছে তো!’
‘ও মা, তা বলবেন তো, কোথায় সে?’ শম্পা আহ্লাদে আটখানা হয়ে বলল, ‘আমার কাছে এত সংকোচের কী আছে? টুম্পাদি আমার নিজের দিদির থেকে কোনো অংশে কম নয়, বুঝেছেন?’
‘ও আসলে ওইদিকে আছে… একটু লজ্জা পাচ্ছে… তুমি যদি গিয়ে একটু… মানে…’ লোকটা বাঁ হাত দিয়ে মাথা চুলকে নিল।
‘কই, চলুন তো দেখি! বাবা বলেন অতিথি নারায়ণ, সঙ্গে আবার লক্ষ্মী!’ শম্পা লোকটার দেখানো পাশের সংকীর্ণ গলিপথ দিয়ে গটগট করে হেঁটে গেল। সেখানে একটা রংচটা ট্যাক্সি। ট্যাক্সির কাছে যেতেই, লোকটা একটা রুমাল বের করে শম্পার নাকে চেপে ধরল। ‘আমি বুঝতে পারছিলাম, ইনস্পেকটর, আমাকে পাঁজাকোলা করে ট্যাক্সিতে তোলা হল, আমার ফোনটা কেড়ে নিয়ে সিমটা বের করে ভেঙে ফেলে দেওয়া হল, কিন্তু আমি এতটাই আচ্ছন্ন…’ শম্পা প্রায় আর্তনাদ করে উঠল।
‘আর রোগীকে বিরক্ত করা ঠিক হবে না স্যার, ডক্টর মানা করেছেন।’ সিস্টার পুলিশকে বাইরে যেতে বললেন। পুলিশ ততক্ষণে যথেষ্ট ক্লু পেয়ে গিয়েছে।
ইনস্পেকটর শম্পার আঙুল ছুঁয়ে আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বললেন, ‘টুম্পাও তো আজ ছ-দিন ধরে নিরুদ্দেশ। ডোন্ট ওয়ারি, আমরা খুব তাড়াতাড়ি অপরাধীকে ধরে ফেলব। আপনি সুস্থ হয়ে উঠুন।’
কলকাতা পুলিশ ও জেলা পুলিশ একযোগে কাজ করছে। এখন শম্পা-অপহরণের মূল চক্রীকে ধরে ফেলা শুধু সময়ের অপেক্ষা। মধ্যরাতে দাসপুরে টুম্পার তথাকথিত দাদার বাড়িতে পৌঁছোল পুলিশ। ততক্ষণে দেবদাস-গোলামরা ফাঁস করে দিয়েছে টুম্পা খুনের খবরটা! ভুলুই তাকে নৃশংসভাবে খুন করে দিঘার ঝাউবনে ফেলে দিয়েছে। উদ্দেশ্য? খুব স্পষ্ট! টুম্পা কোনোভাবে জেনে ফেলেছিল, শম্পার অপহরণের সঙ্গে ভুলু প্রত্যক্ষভাবে জড়িত! এরপর টুম্পাকে সরিয়ে দেওয়া ছাড়া ভুলুর আর কোনো উপায় ছিল না। কারণ সে খুব ভালো করেই জানত, শম্পার জন্য টুম্পা সবকিছুই করতে পারে! টুম্পার কেউ কোথাও নেই! একটা ছোট্ট ভিটে আছে ঘাটালের দাসপুর গ্রামে। ভুলুর বাড়ির কাছাকাছিই। বিয়ে হয়েছিল ছোটোবেলায়। বর নেয়নি। এরকম একজন বেওয়ারিশ মানুষকে মেরে ফেললে সম্ভবত পুলিশ কিছুই টের পাবে না, ভুলু ভেবেছিল। পরক্ষণেই তার মনে হয়েছিল, শম্পার বাড়ির লোকেরা কি ছেড়ে দেবে তাকে? তারা তো নিজেদের মেয়ের অন্তর্ধান-তদন্তের স্বার্থেই টুম্পার ব্যাপারটা নিয়েও মাতামাতি করবে নিশ্চিত। পেশাদার অপরাধী ভুলুর বুঝতে অসুবিধে হয়নি, টুম্পার লাশটা পেলেই পুলিশ সবকিছু বের করে ফেলবে! তার হাতে সময় ছিল কম। খুব তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, লাশটাই গায়েব করে ফেলতে হবে। ফোনে খায়েরকে পরামর্শ দিয়েছিল, ‘শোন, কাল সকালে তোরা সোনাইকে কিডন্যাপ কর!’
‘কী বলছ গুরু?’
‘মোড় ঘুরিয়ে দে। এ ছাড়া কিছু করার নেই। তারপর টুম্পাকে মেরে লাশটা আমি সোনাইয়ের বলে পুড়িয়ে দেব। পুলিশের বাবাও কিছু করতে পারবে না। দেখিস যেন সোনাই যত্নে থাকে। ওর কোনো ক্ষতি হলে, তোদের সবক-টাকে আমি জ্যান্ত পুড়িয়ে দেব কিন্তু!’
শংকর মিস্ত্রি, ওরফে ভুলুকে যখন হাতকড়া পরিয়ে পুলিশ নিয়ে গেল, তখন দাসপুরের আকাশ জুড়ে লাল টুকটুকে চাঁদ উঠেছে।
