ভুয়ো
‘আমি তো ভাবতেই পারছি না জামাইবাবু,’ দেবাংশু বিষাদগ্রস্ত গলায় বলল, ‘একজন ডাক্তারবাবু এত নীচে নামতে পারেন?’
‘অপারেশনটা কবে হয়েছে?’ শান্ত গলায় প্রশ্ন করলাম।
‘গতকাল।’
‘তখন কিছু বুঝতে পারিসনি?’
‘না গো, এত বড়ো ডাক্তার, এত নামডাক!’
‘সত্যিই।’ দু-আঙুলের ফাঁকে ধরা জ্বলন্ত সিগারেটটা আমার অন্যমনস্কতার সুযোগে এমনি এমনিই বাষ্পীভূত হচ্ছিল দেখে, অনেকক্ষণ পর ফের একটা টান মেরে বললাম, ‘কী করে বুঝলি?’
‘আরে বাবার তো একটা চোখ আগে…’
‘এখানেই?’ দেবাংশুকে প্রায় থামিয়ে দিয়েই প্রশ্ন করলাম।
‘না না, কলকাতায়। এবারও কি এখানে করাতাম? একমাত্র শ্যামল চক্রবর্তীর মতো নামকরা ডাক্তার এখানে এসেছেন বলেই…’
‘কথাবার্তা খোলাখুলি হয়েছিল? সেখানে কোনো অস্পষ্টতা ছিল না তো?’ এবারও কথা শেষ করতে দিলাম না দেবাংশুকে। এই এক বাজে স্বভাব আমার! কোনো উত্তেজক বিষয়ে আলোচনা হলে, কৌতূহল চেপে রাখতে পারি না একদম। কত তাড়াতাড়ি বিষয়টার সম্পূর্ণ মহিমা অনুধাবন করতে পারি, সে ব্যাপারে মরিয়া চেষ্টা চালাতে শুরু করি। দেবাংশু আমাকে প্রাঞ্জল করে বোঝাতে লাগল, ‘শোনো…’
‘হ্যাঁ বল।’
‘সকালে যখন কাউন্টারে টাকা জমা দিই, তখন খুব স্পষ্ট ভাষায় ওদের সঙ্গে আমার কথা হয়ে গিয়েছিল। টোটাল ষোলো হাজার টাকার প্যাকেজ। অনেকগুলো লেন্সের কথা বলেছিল—শেষে আমি ষোলোহাজারি প্যাকেজের লেন্সটাই ফাইনাল করি। এটা ফেকো সার্জারিরই প্যাকেজ। ওরা পরিষ্কার করে বলেছিল, এই লেন্স দিয়েই মাইক্রো করে নিলে, খরচ পড়বে সাড়ে আট হাজার মতো। কিন্তু মাইক্রো আমি থোড়ি করাব?’
‘আচ্ছা।’
‘বন্ধুরা আমায় পইপই করে বলে দিয়েছিল, মাইক্রো করাস না, মাইক্রো এখন আর চলে না। ওতে অনেকটা কাটে, শুকোতে বড্ড দেরি হয়। সারতে অনেক বেশি সময় লাগে।’
‘তা ছাড়া মাইক্রো তো হাতের কাজ, ফেকো মেশিনের।’
‘ঠিক। এস.আই.সি.এস.-ই যদি করাব, তো আগের বার কলকাতা ছুটলাম কেন?’
‘এস.আই.সি.এস.-টা কী?’ কিঞ্চিৎ বিস্মিত হলাম।
‘আরে ওটাকেই তো মাইক্রো বলে। তুমি না! সত্যি!’ দেবাংশু কিঞ্চিৎ রাগতস্বরে বলল।
দেবাংশুর দোষ নেই। আমি যদি নেত্রনীড়ের মালিক হয়ে এস.আই.সি.এস.-এর মানে না বুঝি, রাগ করবে না দেবাংশু? অবশ্য দেবাংশু খুব ভালো করেই জানে, নেত্রনীড় আমি চালাই না, ওটার সবকিছুই দেখে ভোলা, আমার ভাই। ভোলা অত্যন্ত ভালো ছেলে, আমার ভাই বলেই বলছি না। মূলত ওরই উদ্যোগে আমরা দু-ভাই মিলে সেবামূলক আদর্শে এই নেত্রনীড় খুলেছিলাম। এখান থেকে আমরা কেউ সংসার চালাই না, আমাদের আদর্শে বাধে। তা ছাড়া, ঈশ্বরের কৃপায়, কখনো তেমন প্রয়োজনও পড়েনি আমাদের। বাবা রেখে গিয়েছেন, যতটুকু পেরেছেন। তার বাইরে লিখে যতটুকু ইনকাম করি, তাতেই আমার দু-বেলা পেট চলে যায়, জুটে যায় সিগারেটটাও। নয় নয় করে দিনে তিন প্যাকেট সিগারেট লাগে আমার! গর্ব করছি না, এ তো লজ্জার কথা! কিন্তু লজ্জা নিবারণ করতে পারছি কই? আর ভোলা? সে তো আমার থেকে অনেক বেশি ধনী লোক! তিনখানা ডাম্পার আছে তার, দুটো সুমো। এগুলো ভাড়া খাটায়, চিপসের ব্যাবসা করে, আরও অনেক কিছু… কিন্তু নেত্রনীড়কে সে কোনোদিনই ব্যাবসার জায়গা বলে মনে করে না। ভোলা চিরদিনই ভোলাভালা। ওর ব্যাবসাগুলো দেখে কর্মচারীরা। আর নিজে বেশিরভাগ সময়টাই কাটায় নার্সিং হোমে। নার্সিং হোমটা ওর ভালোবাসা। প্রথমে ছিল ছোট্ট দু-কুঠুরি বাড়ি, সেটাই আজ যে জায়গায় দাঁড়িয়েছে… জাস্ট কথা হবে না! আগে শুধু ছানি অপারেশন হত, এখন ক্রিটিক্যাল অপারেশনও হয়! বাইরে থেকে বড়ো ডাক্তারবাবু আসে সপ্তাহে একদিন, মাসে এক-দু-দিন করে আরও একজনকে আনার প্ল্যান চলছে, আর লোকাল ডাক্তারবাবু তো আছেই সর্বক্ষণের জন্য! গ্রাউন্ড ফ্লোরে বিভিন্নরকম টেস্ট হয়, মানে, যে টেস্টগুলো অপারেশনের জন্য জরুরি আর কী—যেমন, ই.সি.জি., ব্লাড এইসব। চার-পাঁচজন অপ্টোমেট্রিস্ট রেখেছে ভাই আমার—তারা অহরহ চোখের পাওয়ার পরীক্ষা করছে! চশমার দোকানটা হয়েছে দোতলায়। খুব বেশি দিন হয়নি, এরই মধ্যে হরেক কিসিমের ফ্রেম আর সানগ্লাসও আমদানি করে ফেলেছে ভোলা। আর ওষুধের দোকানটা হল এই তো সেদিন। কত ধুমধাম করে উদবোধন হল! এক ছাদের তলায় এত সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা এই মফসসল শহরে ভাবা যায়? আমাদের শুভার্থীরা তো বলে, ‘এক টুকরো কলকাতা!’
অবশ্য নেত্রনীড়ের জনপ্রিয়তার গ্রাফ এই মুহূর্তে, দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বেশ নিম্নগামীই। ভোলার এই সাজানো বাগান কেউ তছনছ করে দিলে, আমরা তো তাকে ছেড়ে কথা বলব না! শ্যামলবাবু বড়ো ডাক্তার, গোটা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে তার নাম, সবই ঠিক আছে—তাই বলে যা খুশি তা-ই করবে? আমাদের গুডউইল নষ্ট করে দেবে? আর আমরা তা-ই মেনে নেব? আমি বেশ গম্ভীর হয়ে দেবাংশুকে প্রশ্ন করলাম, ‘তা’লে তুই নিশ্চিত যে ফেকো করেনি, মাইক্রোই করেছে?’
‘অবশ্যই।’ দেবাংশুর গলা আত্মবিশ্বাসী।
‘এনি এভিডেন্স?’
‘যেসব নিয়মকানুন, মানে, ডুজ অ্যান্ড ডোন্টসের কথা বলেছেন, সেগুলোই তো এভিডেন্স!’
‘যেমন?’
‘যেমন ধরো, এক মাস চান করতে মানা করেছেন, কোনোভাবেই চোখে জল লাগানো যাবে না এক মাস!’
‘এক মাস?’
‘কিন্তু ডান চোখটায় যখন ফেকো করিয়েছিলাম কলকাতায়, তখন ডাক্তারবাবু এক সপ্তাহ মাত্র স্নান করতে মানা করেছিলেন। তাহলেই বোঝো! শুধু কি তা-ই, এই যে প্রতিদিন স্টেরিলাইজড কাপড় দিয়ে চোখ পরিষ্কার করা, গৃহবন্দি থাকা, দিনের বেলা ডার্ক গ্লাস ইউজ করা, ঘুমের সময়ে প্লাস্টিক আই গার্ড… সবকিছুরই নির্দেশিত সময়সীমা আগের বারের থেকে অনেক অনেক বেশি!’
‘বুঝেছি।’
‘ডান চোখ অপারেশনের পর কলকাতার ডাক্তারবাবু বলেছিলেন, সাত দিন পর সবকিছু করতে পারবেন। সত্যি সত্যিই বাবা সাত দিনে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গিয়েছিলেন।’
‘ড্রপ দেয়নি?’
‘হ্যাঁ দিয়েছেন। দুটো। একটা অ্যান্টিবায়োটিক, আরেকটা—প্রেশারটা যাতে নর্মাল থাকে, তার ওষুধ।’ দেবাংশু নিচু গলায় বলল, ‘এগুলো নিয়ে তো প্রবলেম নেই আপাতত। প্রবলেমটা হল, করাতে গিয়েছি ফেকো, টাকা নিয়েছে ফেকোর আর করেছে মাইক্রো!’
‘ডুজ অ্যান্ড ডোন্টসগুলো যখন রেকমেন্ড করল, তখন সরাসরি প্রশ্ন করলি না কেন? বড়ো ডাক্তারবাবু বলে প্রশ্ন করা যাবে না?’
‘না না, তা না, প্রবলেমটা হল, প্রথম থেকে আমিই ছিলাম বাবার কাছে, কিন্তু বিকেলে ডিসচার্জের সময়ে আমার একটা জরুরি কাজ পড়ে যাওয়ায় ইন্দ্রাণী গিয়েছিল। ও অতশত…’ দেবাংশু আমতা আমতা করতে লাগল।
‘তুই রাত্রে বাড়ি ফিরে নিশ্চয়ই জেনেছিস!’
‘হ্যাঁ তা-ই তো!’
‘তারপর?’
‘তারপর আজ সকালে গিয়েছিলাম নেত্রনীড়ে। কিন্তু শ্যামল ডাক্তার তো আসবেন আবার নেক্সট ওয়েডনেসডে।’
‘ওহো, তাই তো!’
‘অনেক দেরি।’
‘ভোলার সঙ্গে দেখা হল?’ কথাটা বলতে বলতেই মনে পড়ে গেল, ভাই তো বিশাখাপত্তনমে। বেশ ক-দিন হল গিয়েছে সে। ফিরবে পরের সপ্তাহে। নিজেকে সংশোধন করে নিয়ে বললাম, ‘দেখা আর হবে কী করে, সে তো বাইরে আছে!’
‘হ্যাঁ, ম্যানেজারদা তা-ই বললেন।’
‘ম্যানেজারকে বলেছিস তো সবটা?’
‘হুঁ। ম্যানেজারদা বললেন, একটা রিটন কমপ্লেন্ট জমা দিতে হবে। ডাক্তার চক্রবর্তীর এগেনস্টে। ওটা জমা দিয়েই তোমার কাছে আসছি।’
‘খুব ভালো করেছিস।’ সিগারেটের পিছনটা অ্যাশট্রেতে জমা দিয়ে উদাসীনভাবে বললাম, ‘চা খাবি?’
‘না।’
‘চিন্তা করিস না, আমি তো আছি! দেখছি কী করতে পারি!’
দেবাংশু উঠে গেলেও, আমার মনে কিন্তু জাঁকিয়ে বসেছে ডাক্তার চক্রবর্তীর কাঁটাটা। আফটার অল আমি এই নার্সিং হোমের অন্যতম মালিক! ভাই বাইরে! তাই কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারি না। তা ছাড়া দেবাংশু আমার রিলেটিভ! আমার শ্বশুরমশাইয়ের পিসতুতো ভাইয়ের ছোটোছেলে সে। ওর কমপ্লেন্ট আমার কাছে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এইসব ভাবতে ভাবতেই ফের একখানা সিগারেট ধরালাম। সিগারেট টানলে হয় কী, মাথাটা ফ্রেশ হয়ে যায় নিমেষে। তখন বিভিন্ন ডায়মেনশনে ভাবনাটা ছড়িয়ে পড়তে পারে, ঠিক যেভাবে পেঁজা তুলোর মতো মেঘ মাঝে মাঝে ছড়িয়ে পড়ে শরতের আকাশে। শুধু তো দেবাংশু না, আজকাল ডাক্তার চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে নানারকম অভিযোগ কানাঘুষো শুনছি এখানে-সেখানে। অথচ প্রথম যখন চক্কত্তি এখানে এল, কী ভিড়টাই না হতে শুরু করেছিল! রুগি উপচে পড়ছিল নেত্রনীড়ে! একটামাত্র লোকাল ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে ঝিমিয়ে-পড়া, জীবন্মৃত নেত্রনীড়ে প্রাণসঞ্চার করেছিল চক্রবর্তী। একদিন ভোলা বলল, ‘দাদা, নেত্রনীড় আবার বেঁচে উঠেছে! এর থেকে আনন্দের আর কিছু হতে পারে না!’
‘তোর উপর আমার বিরাট ভরসা, ভাই।’
‘আমি কিছুই না গো, সবই ডাক্তার চক্রবর্তীর ক্রেডিট।’
‘অত বড়ো ডাক্তার এনেছিস! গোটা শহর জুড়ে, আশপাশের গ্রামগুলোতে এত মাইকিং করেছিস… হবে না? তোর মেধা আর পরিশ্রমের ফল তো ফলবেই!’
প্রথম থেকেই ডাক্তার চক্রবর্তী বসত বুধবার। রবি, সোম, মঙ্গল—এই তিন দিন নাম লেখানো হত। প্রথম প্রথম এমন অবস্থা হয়েছিল, চারটে লোকে হিমশিম খেত নাম লিখতে। ভোর চারটে থেকে মানুষের লাইন। মফসসলের মানুষ ধন্য করেছিল ভাইকে। এই অভাবিত সাফল্য দেখেই, ভোলা সিদ্ধান্ত নিল চশমার দোকানটা খোলার, পরে ওষুধের দোকানটা। সবই ঠিকঠাক চলছিল, কিন্তু ছ-মাস ঘুরতে-না ঘুরতেই, পরিস্থিতি পালটে গেল। জোয়ারের পর যেমন ভাটা আসে, মানুষ সেইভাবে মুখ ফিরিয়ে নিল ডাক্তার চক্রবর্তী তথা নেত্রনীড় থেকে। এই তো গত সপ্তাহেই একজন বলল, ‘নেত্রনীড় তো পুরো ফাঁকা! ডাক্তার চক্রবর্তীর কাছে কোনো রুগিই হয় না।’
‘কীরকম?’
‘নাম লেখাই ছিল। নির্ধারিত সময়ের অনেক আগে হঠাৎ ম্যানেজারদা ফোন করে ডাকলেন, এক্ষুনি আসুন। নাম পেরিয়ে গেলে তখন সন্ধে হয়ে যাবে।’ বাঁকা হাসি হেসে লোকটা বলল, ‘পড়ি-মরি করে গিয়ে দেখলাম, কোথাও কোনো রুগি নেই, শুধুই আমি।’ লোকটা মিথ্যে কথা বলছে—এটা আমার একবারও মনে হয়নি। ডাক্তার চক্রবর্তী নাকি তাকে দেখার পর, বাইরের বারান্দা অবধি সি অফ করতে এসেছিল! সেটা নিয়েও হাসাহাসি করেছে লোকটা, ‘বাবার জন্মে শুনিনি, কোনো ডাক্তার চেম্বার ছেড়ে রুগিকে সি অফ করতে আসছেন!’
‘কী মনে হয়, চক্রবর্তীর ফিজ বেশি বলে রুগি হচ্ছে না?’ প্রশ্নটা ছুড়ে দিয়ে পাবলিক ওপিনিয়ন পরখ করতে চাইলাম। আমাকে প্রায় বাউন্ডারি হাঁকিয়ে লোকটা উত্তর দিল, ‘একেবারেই না। এ শহরের মানুষ ভালো পরিষেবা পেলে, টাকার জন্য পিছিয়ে আসে না।’ বিলক্ষণ সত্যি কথা! আমিও মনেপ্রাণে এটাই বিশ্বাস করি। না হলে প্রথম দু-তিন মাস এত ভিড় হত না! কিন্তু প্রবলেমটা ঠিক কোথায়?
সেদিন সবজি বাজারে একজন বলল, ‘ডাক্তার কাগুজে বাঘ।’ হতে পারে নামডাক অনেক, কিন্তু রুগির মন জয় করতে পারছে না। এটাও মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু ফেকোর টাকা নিয়ে মাইক্রো? এ তো জালিয়াতি! জোচ্চুরি! একজনের কাছে তো এমন কথাও শুনলাম, তার এক আত্মীয়-রুগিকে যে ড্রপটা দিয়েছিল চক্কত্তি, সেটা লাগাতেই চোখ ফুলে, চুলকে… সে যাচ্ছেতাই কাণ্ড! ভদ্রলোক তো কলকাতা গিয়ে, ভালো ডাক্তার দেখিয়ে, নার্সিং হোমে দু-দিন ভরতি থেকে সুস্থ হয়। ডাক্তার চক্রবর্তীর ওষুধ লেখা নিয়ে এরকম আরও কমপ্লেন্ট আছে বিস্তর। ওর ওষুধে নাকি—ক-দিন আগে তো জবার মা-ই বলছিল—খুব কম মানুষেরই কোনো সাইড এফেক্ট হয় না! বেশিরভাগ ওষুধেই নাকি চোখ লাল হয়ে যায়, পিঁচুটি কাটে! অবশ্য মানুষ তো প্রচারসর্বস্ব জীব! কেউ একবার খারাপ কিছু প্রচার করে দিলেই, সেটা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে আজকাল! কেউ কেউ আবার উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেও এসব ছড়ায়। ডাক্তারের শত্রু আছে, আমাদের শত্রু আছে, ইন ফ্যাক্ট, বন্ধু না থাক, শত্রু সব মানুষেরই আছে! তবে আমার মনে হয় না, এই শহরের মানুষ এতটা খারাপ কাজ করতে পারে! আমার জন্মভূমি বলেই বলছি না, এই মফসসলের মানুষগুলো বড়ো সরল, সাধারণ, আবেগসর্বস্ব! এরা নিজেরা যেমন সদ্ভাবে বাঁচে, অন্যের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তেমনি কুচক্রী ষড়যন্ত্রী জোচ্চোর জালিয়াতদের বিরুদ্ধে কোমর বেঁধে নেমে পড়তেও ভয় পায় না একবিন্দু। ডাক্তার চক্কত্তি যদি জালিয়াত প্রমাণিত হয়, বা ভুয়ো ডাক্তার হয়, এখানকার মানুষ ওকে ছেড়ে কথা বলবে না, এই আমি বলে দিচ্ছি।
এই যে এতরকমভাবে ভাবতে পারছি—আর ভাবতে পারছি বলেই তো পরবর্তী পদক্ষেপগুলো নিতে পারব—তার একমাত্র কারণ আমার এই সিগারেট! লোকে শুধু ক্যান্সার-ক্যান্সার করেই চিল্লায়, ভালো দিকটার কথা একবারও বলে না! যাক গে যাক, আমি বিলক্ষণ বুঝি, সিগারেট খাওয়া কমিয়ে দিতে হবে আমাকে! এবং, শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে, খুব শীঘ্রই সেটা আমি করে দেখাব! তবে এখনকার মতো আরেকখানি না ধরালেই নয়, কারণ এই ডাক্তার চক্কত্তির ব্যাপারে একটা হেস্তনেস্ত না করে আমি ছাড়ছি না, হ্যাঁ! ভেবেছিলাম, বিশাখাপত্তনমে ভোলাকে আর বিরক্ত করব না, কিন্তু প্রায় বাধ্য হয়েই, ওকে ফোনে ধরলাম, ‘ভালো আছিস ভাই?’
‘হ্যাঁ, তোমরা?’
‘ঠিক আছি।’ একটু ইতস্তত করেই বললাম, ‘আচ্ছা শোন, শ্যামল চক্কত্তির ব্যাপারে বড্ড কমপ্লেন্ট আসছে, বুঝলি?’
‘হ্যাঁ দাদা, আমি জানি। আমাকে একবার ফিরে যেতে দাও, তারপর কেসটা দেখছি।’
‘আমার শ্যালক ওর বাবার ক্যাটারাক্ট…’
‘হ্যাঁ আমি শুনেছি।’ সে আমাকে থামিয়ে দিয়েই বলে উঠল।
‘আচ্ছা। তা আমি বলি কী, ও ভুয়ো ডাক্তার নয় তো?’
‘ভুয়ো ডাক্তার? কী বলছ?’ ভোলার গলায় যারপরনাই বিস্ময়।
‘জানি না বাপু, তা নিয়োগের আগে তুই ভালো করে বাজিয়ে দেখে নিয়েছিলিস তো?’
‘বাজিয়ে দেখে… না… মানে…’ ও প্রান্তের গলা যেন মিয়োনো বিস্কুট।
‘সে কী! এটা তোর অবশ্যকর্তব্য ছিল! আজ চক্রবর্তী ভুয়ো ডাক্তার প্রমাণিত হলে, পাবলিক আমাদের ছেড়ে দেবে?’
‘আমরা কী করব, কেউ যদি কাগজপত্র জাল করে?’
মুখে এ সমস্ত বললেও বুঝলাম, ভাই আমার ভয় পেয়েছে! মনে হল, ওর মধ্যেও সংশয় আছে, ডাক্তার চক্রবর্তী ভুয়ো নয় তো? আজকাল তো খবরের কাগজে, টেলিভিশনের পরদায় ভুয়ো ডাক্তারের ছড়াছড়ি। কেউ এইট পাশ, কেউ মাধ্যমিক! ধরা পড়ার পর সুড়সুড় করে ঢুকে পড়ছে শ্রীঘরে! আবার কখন বেরিয়েও পড়ছে টাকাপয়সা খরচ করে—সেসব আর মিডিয়া হারগিস দেখাচ্ছে না! যা-ই হোক, ভোলা বড়ো ইনোসেন্ট। ওর মুখটা চিন্তা করে মায়া হল। ওকে সাহস দিয়ে বললাম, ‘আমি একটু খোঁজখবর লাগাচ্ছি। তুই একদম চিন্তা করিস না।’
‘তোমাকে কিছু করতে হবে না, দাদা! এমনিতেই তোমার শরীর ভালো নেই। তার উপর আবার এক্সট্রা প্রেশার। আমি ফিরি, তারপর যাহোক কিছু একটা করব। তুমি টেনশন নিয়ো না।’ ভোলা এরকম বললেও, কেন জানি না, আমার মনে হল, সে চাইছে, আমি একটা কিছু সুরাহা করে রাখি। ফিরে তাহলে ছেলেটা নিশ্চিন্তে বিশ্রাম নিতে পারবে দু-দিন। খুব ছোটো থেকেই দেখে আসছি, ভাই টেনশন সহ্য করতে পারে না একদম! বেচারি বিদেশ-বিভুঁইয়ে টেনশন করে মরবে!
নেট সার্চ করে জানলাম, প্রতি শুক্রবার ডাক্তার শ্যামল চক্রবর্তী বসে চন্দননগরের শুশ্রূষায়। শুশ্রূষার ঠিকানা, ফোন নম্বর নিয়ে নিলাম। ধৈর্য আমার এমনিতেই বড়ো কম। রাতটা কোনোরকমে জেগে ঘুমিয়ে, ভোরবেলা স্নান সেরে বেরিয়ে পড়লাম চন্দননগরের উদ্দেশে। শুশ্রূষা বড়ো চমৎকার জায়গা। একটা বড়ো হলঘরের ভিতর পার্টিশন দিয়ে পাঁচটা ছোটো ছোটো খোপ বানানো। প্রত্যেকটায় একজন করে অপ্টোমেট্রিস্ট। তারা মনের আনন্দে রুগি দেখছে। বাইরে একজন কম্পাউন্ডার গোছের লোক। সে অনায়াসে পাঁচটা অপ্টোমেট্রিস্টের প্রায় পঞ্চাশজন দস্যি রুগি আর তাদের আরও কম-বেশি জনা পঞ্চাশেক ততোধিক ব্যস্তবাগীশ অভিভাবককে সামলাচ্ছে একা হাতে। দোতলায় চেম্বার ডাক্তার শ্যামল চক্রবর্তীর। সে এখনও উপস্থিত হতে পারেনি। কলকাতা থেকে আসছে তো, এখনও নির্ঘাত রাস্তায়! অনেকক্ষণ বসলাম। কম্পাউন্ডার মুখের কাছে মুখ নিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, ‘কত নম্বরে নাম?’
‘আজ্ঞে আমি রুগি না।’
‘তা’লে এখানে কী করতে?’
‘দরকার আছে ডাক্তারবাবুর সঙ্গে।’
‘কী দরকার?’
‘পার্সোনাল।’
‘কোত্থেকে আসা হচ্ছে?’
নাম-ঠিকানা বললাম। ততক্ষণে ডাক্তারবাবুর প্রবেশ।
আমাদের নেত্রনীড়ে একদিন এক ঝলক দেখেছিলাম ডাক্তার চক্রবর্তীকে। তার সঙ্গে তো কোনো মিলই নেই এই ডাক্তারবাবুর চেহারায়! এই ডাক্তারবাবু লম্বা, সে ঠিকঠাক; এই ডাক্তারবাবু কিঞ্চিৎ রোগা-পাতলা, সে গোলগাল; এই ডাক্তারবাবুর গোঁফ নেই, তার তো হালকা গোঁফ ছিল, যদ্দূর মনে পড়ে! উত্তেজনায় আমার বুক ঢিপঢিপ করছে। তবে কি সে ব্যাটা ভুয়োই? আমার সন্দেহই তবে সত্যি? কম্পাউন্ডারের পারমিশন নিয়ে ঢুকে পড়লাম ডাক্তারবাবুর চেম্বারে। খানিক ইতস্তত করে বলেই ফেললাম, ‘আমি রুগি নই ডাক্তারবাবু, এসেছিলাম একটা ছোট্ট প্রস্তাব নিয়ে।’
‘কে আপনি? কোথা থেকে আসছেন?’ ডাক্তারবাবুর মিহি গলা। নিজের এবং নেত্রনীড়ের পরিচয় দিয়ে বললাম, ‘আপনি যদি মাসে একটা দিন নেত্রনীড়ে বসেন, ওখানকার মানুষ বড়ো উপকৃত হয়, ডাক্তারবাবু।’ ডাক্তারবাবু সবিনয়ে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন। সেই সঙ্গে আমায় নিশ্চিত করলেন, জীবনে কোনোদিন আমাদের মফসসল শহরে আসেননি তিনি ইতিপূর্বে। এমনকী, আমাদের জেলাতেই সারাজীবনে তাঁর পদার্পণ ঘটেছে সাকুল্যে দু-তিনবার! একবারের ঘটনা তাঁর বেশ মনে আছে, জেলা হাসপাতালে একটি বিশেষ মেডিক্যাল যন্ত্রের উদবোধনে তাঁকে আনা হয়েছিল। জেলার মানুষের প্রশংসা করতে ভুললেন না তিনি। আমাকেও ধন্যবাদ জানালেন এমন একটি প্রস্তাব নিয়ে এতদূর থেকে আসার জন্য। তিনি যে সে প্রস্তাবে সম্মত হতে পারছেন না, সেজন্য মৃদুভাষী বিনয়ী মানুষটি আমার কাছে ক্ষমাও চেয়ে নিলেন। আমি ঘামছি। বেশি কথা বলার ইচ্ছে বা মানসিকতা কোনোটিই আর অবশিষ্ট নেই। প্রতিনমস্কার ও সৌজন্যমূলক দু-চার কথা বিনিময় করে, ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলাম দ্রুত। অবশ্য সমস্ত কথোপকথনটা মোবাইলে রেকর্ড করে নিতে ভুলিনি!
বাড়ি ফিরে লোকাল থানায় পুরো ব্যাপারটাই জানালাম। দারোগাবাবু পরামর্শ দিলেন, সামনের বুধবার পর্যন্ত একেবারে সেঁটে যেতে, যাকে বলে স্পিকটি নট! মুখ যেন কোনো অবস্থাতেই না খুলি। এমনকী, আমার ভাইকেও বিরক্ত না করতে পরামর্শ দিলেন তিনি! এইটুকু সময় নাকি পুলিশের লাগবে! এবং এই ক-দিনের গোপনীয়তাটুকুও। সেটুকু যদি আমি প্রোভাইড করতে পারি, ওঁরা ভুয়ো ডাক্তারকে জেলের ঘানি টানিয়েই ছাড়বেন! আমি ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আচ্ছা, ভুয়ো ডাক্তারের আশ্রয়দাতা হিসেবে আমার ভাইও কি আইনত…’
‘আরে না না, একদম চিন্তা করবেন না।’ আমার মুখ-চোখ বেয়ে সারা শরীরে নেমে-আসা সংশয়ের কালো ছায়াটা সম্ভবত স্পষ্ট পড়ে নিতে পেরেছেন দারোগাবাবু, ‘কেউ কাগজপত্র জাল করলে আপনার ভাই কী করবেন? তিনি কেন দোষী হবেন?’
‘বাঁচালেন স্যার।’ ভিতর থেকে বেরিয়ে এল শব্দ দুটো।
‘আপনি নিশ্চিন্তে বাড়ি যান।’
বুধবার সকাল দশটা। নেত্রনীড়ে ডাক্তার চক্রবর্তীর চেম্বারের বাইরে বেশ ভিড়। এত ভিড় কেন? রুগি তো আজকাল হয় না এ ডাক্তারের ! বোঝা গেল, মানুষজন এসেছে অভিযোগের ঝাঁপি নিয়ে। কারো অভিযোগ, ওষুধে কাজ হচ্ছে না; কারো অভিযোগ সাইড এফেক্টের—এর চোখ লাল হয়ে যাচ্ছে, ওর চোখে জ্বালা করছে, চুলকোচ্ছে! বেশিরভাগই আশপাশের গ্রাম থেকে আসা মানুষ—যারা খেটে খায়, গরিব, সঞ্চয়ের সবটুকু দিয়ে ভালো ডাক্তারবাবুর কাছে চিকিৎসা করিয়েছিল ভালো ফলের জন্য। কিন্তু ভালো চিকিৎসা তো দূরের কথা, শ্যামল ডাক্তার তাদের হাতে হ্যারিকেন ধরিয়ে ছেড়ে দিয়েছে! যে অবস্থায় তারা রুগিকে এখানে নিয়ে এসেছিল, চিকিৎসা কিংবা অপারেশনের পর, রুগির সে অবস্থার উন্নতি তো দূরের কথা, আরও অবনতি হয়েছে! কেউ ছুটেছে বর্ধমান-দুর্গাপুর-কলকাতা, কেউ টাকার অভাবে কোথাও নিয়ে যেতে পারেনি—তাদের রুগি মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে বিছানায়। এইসব মানুষ ছেড়ে দেবে ডাক্তার চক্রবর্তীকে? একটা আদ্যন্ত অসৎ, ভুয়ো লোক ডাক্তার সেজে এইভাবে এত এত মানুষের জীবনের বিনিময়ে নিজের অর্থলিপ্সা চরিতার্থ করে চলেছে দিনের পর দিন—ভাবা যায়? সুঠাম চেহারার কিছু ডাকাবুকো যুবককেও ঘোরাফেরা করতে দেখলাম এদিক-ওদিক। স্থানীয় লোকজনও প্রচুর। শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে। দেবাংশু-ইন্দ্রাণীকেও দেখলাম একটু আগে। কথা হল। দেবাংশু বলল, ‘বাবার চোখের অবস্থা খুব খারাপ হয়েছিল।’
‘মানে?’
‘দারুণ ব্যথা আর সোয়েলিং!’
‘তারপর?’
‘ব্যারাকপুরে নিয়ে গিয়েছিলাম। এখন একটু বেটার।’
আমরা দু-ভাইয়ের কেউই এইসব লিটিগেশন নিতে পারি না। ভোলা ক্রমাগত নখ খাচ্ছে। ও পুলিশের ব্যাপারটা জানে না। মানে, ওকে জানানো হয়নি ! আই.সি. আমাকে ইশারায় ডেকে, ডাক্তার চক্রবর্তীর ঘরে ঢুকলেন। ‘তুমি পুলিশে খবর দিয়েছিলে?’ ভোলা অবাক।
‘আসছি, দাঁড়া।’ আমার কথা বলার সময় নেই। পুলিশের পিছন পিছন ঢুকলাম চক্রবর্তীর চেম্বারে। কী আশ্চর্য, লোকটার কোনো হেলদোল নেই! হাসতে হাসতে সে কিছু কাগজপত্র ব্যাগ থেকে বের করে পুলিশকে দেখাচ্ছে, ‘আমি সব সময়ে অরিজিনাল কাগজপত্র সঙ্গে রাখি, বুঝেছেন? যা দিনকাল পড়েছে!’ পুলিশের মুখে কোনো রা নেই। চক্কত্তি আঙুল দেখাল একটা বিশেষ কাগজের দিকে, ‘এই যে, এইটেই আমার রেজিস্ট্রেশন।’ কাগজপত্র পরীক্ষা করে আই.সি. মিনমিন করে বললেন, ‘আপনি তাহলে…’
‘কী তাহলে?’ চক্রবর্তীর গলায় কোনো উত্তেজনা নেই।
‘এই যে এটা দেখুন।’ আই.সি. নিজের মোবাইলে গুগল সার্চ করে কলকাতার বিখ্যাত ডাক্তার শ্যামল চক্রবর্তীর ছবি ও পরিচিতি দেখালেন।
‘ইনস্পেকটর, একই নামে কি দুজন ডাক্তারবাবু থাকতে পারেন না? বিখ্যাতদের আড়ালে অখ্যাতরা তো চাপা পড়েই থাকেন, এটাই দস্তুর। কিন্তু তাঁরা ভ্যানিশ হয়ে যান না, তাঁরা থাকেন।’ ডাক্তার চক্রবর্তীর গলা নির্লিপ্ত।
‘কিন্তু এখানে তো প্রচার করা হয়েছে…’
‘সেটা কি আমি করেছি? প্রমাণ দেখাতে পারবেন?’
‘না মানে…’ আই.সি. আমতা আমতা করতে লাগলেন। ততক্ষণে অভিযোগকারীরা ঢুকে পড়েছে হুড়মুড়িয়ে, ‘আমরা ওসব কাগজপত্র মানি না। টাকা নিয়ে চিকিৎসা করেছেন, রুগিরা সেরে উঠছে না কেন? জবাব দিন!’
‘আমি প্রত্যেকের অভিযোগের জবাব দেব, কিন্তু একে একে, শান্তভাবে প্লিজ…’ ডাক্তারবাবু যেন স্রোতস্বিনী স্বচ্ছতোয়ার জল।
হাতে লেন্সের খোলা প্যাকেট আর প্রেসক্রিপশন নিয়ে প্রথমেই এগিয়ে এল দেবাংশু, ‘কেন আপনি মাইক্রোসার্জারি করেছেন বাবার? আমি তো ফেকোর জন্য টাকা জমা দিয়েছিলাম।’
‘আপনি শান্তভাবে কথা বলুন, দেবাংশুবাবু।’ চক্রবর্তী দেবাংশুর হাত থেকে প্রেসক্রিপশন আর পরিত্যক্ত প্যাকেটটা নিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে বিস্ময়ে কেঁপে উঠল যেন, ‘এ প্যাকেট আপনি কোত্থেকে পেলেন? এটা তো হাইড্রোফোবিক অ্যাক্রিলিক ফোল্ডেবল থ্রি সিক্সটি ডিগ্রি স্কোয়্যার এজ ইন্ট্রাকুলার লেন্স। এ লেন্স তো অনেক দামি! যতদূর মনে পড়ে, আপনার বাবাকে খুব নর্মাল লেন্স দেওয়া হয়েছে।’
‘আমাকে এই প্যাকেটটাই ডিসচার্জের সময়ে দেওয়া হয়েছে রিসেপশন থেকে।’
‘এ জিনিস এখানে আসে না, দেবাংশুবাবু। এই দামি মোড়কের ভিতরে, আমি নিশ্চিত, আসল জিনিস ছিল না মোটেও।’ ডাক্তারবাবুর চোখ যেন জ্বলে উঠল মুহূর্তে, ‘আর ফেকোর কথা বলছেন? ফেকো সার্জারি তো এখানে হয়ই না! ওই মেশিনও এখানে আসেনি এখনও।’ এরপর আরও কয়েকজন অভিযোগকারীর ব্যবহৃত ওষুধের শিশি কিংবা প্যাকেট পরীক্ষা করে চক্রবর্তী যা নিদান দিল, তাতে আমি বিস্ময়ে, অপমানে, যন্ত্রণায় পাথর হয়ে গেলাম—’এই ওষুধগুলো তো ভেজাল! কোনোটা ডেট এক্সপায়ার্ড! মানুষের জীবন নিয়ে এখানে ছিনিমিনি খেলা চলছে তো! ছি ছি! আমি আগে জানলে…’
ডাক্তার চক্রবর্তীর বাকি কথাগুলো আমার কানে আর ঢুকছে না। আমার সারা শরীর অবশ, দু-চোখে জমাট অন্ধকার। ততক্ষণে লুকিয়ে-পড়া ভাইটাকে খুঁজে বের করে বেদম পেটাচ্ছে শক্তপোক্ত লোকগুলো—কিল, চড়, লাথি, ঘুষি! ওদের হাত থেকে ছাড়িয়ে ইনস্পেকটর দত্তগুপ্ত যখন ভোলাকে গাড়িতে তুলে থানায় নিয়ে যাচ্ছেন, নিজের ব্যর্থ লেখক-জীবনকে ধিক্কার জানিয়ে স্বগতোক্তি করলাম, ‘একজন লেখকের সব চেয়ে বড়ো কাজ মানুষ চেনা। হায়, আমি নিজের ভাইকেই চিনতে পারিনি!’
