ঈর্ষা
ভাগ্যিস নির্ধারিত সময়ের ঘণ্টা দুই আগে এখানে পৌঁছেছিলেন শতরূপ, না হলে তো জিপই পেতেন না। অথচ কাল সন্ধেবেলা হোটেলে ঢোকার পর থেকে আজ সকাল অবধি হোটেলের ম্যানেজার থেকে শুরু করে ঘর সাফ করার ছেলেটা পর্যন্ত সকলে পইপই করে বলে দিয়েছিল, ‘জিপ এখনই বুক করে নিন স্যার, না হলে ওখানে গিয়ে বিপদে পড়বেন। জঙ্গল সাফারির জিপের বড়োই ক্রাইসিস।’ স্রেফ গাফিলতির কারণে সবকিছু উপেক্ষা করা শতরূপের জন্মগত স্বভাব। হোটেলের ইয়াং হ্যান্ডসাম বাঙালি ম্যানেজার নিজে গুগল খুলে দেখিয়ে দিয়েছিল কীভাবে রাজাজি পার্কের জিপ বুক করতে হয়। এমনকী, একটা ফোন নম্বরও সে দিয়েছিল শতরূপকে, ‘দেখুন তো এখানে ফোন করে বুক করা যায় কি না!’
না না, শতরূপের সময় হয়নি বুকিং করার। তিনি ওই গঙ্গা-লহরির সৌন্দর্যেই সবকিছু ভুলে গিয়েছিলেন। আগেও হরিদ্বার এসেছেন শতরূপ, কিন্তু এত ভালো হোটেল পাননি কখনো। গঙ্গার বুকের উপর আলোকোজ্জ্বল গঙ্গা-লহরি, ঘরের লাগোয়া বারান্দায় প্রবহমান মা গঙ্গা—মন বড়ো অন্যরকম হয়ে যায়। এসে থেকে তো ওই বারান্দাতেই আস্তানা গেড়েছেন তিনি—অথচ এই হেমন্তের মরশুমে বড়ো শীতল গঙ্গার হাওয়া, মাঝে মাঝে কেঁপে কেঁপে উঠছে শরীর। ওখান থেকে ঢিল-ছোড়া দূরত্বেই হর-কি-পৌরি। হোটেল থেকে মাত্র চার কিলোমিটারের হাঁটা-পথ।
হোটেলটা সত্যিই ফাটাফাটি। ভরা বাজারের মধ্যে অবস্থান। হলে কী হবে, বিপুল কোলাহলের মধ্যেও এক ধ্যানগম্ভীর মৌনতা যেন গঙ্গা-লহরিকে আর পাঁচটা সাধারণ হোটেলের থেকে আলাদা করে রেখেছে। ঘরগুলোও যথেষ্ট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর। সবরকম আধুনিক ব্যবস্থায় সজ্জিত। বাথরুম বিশাল। পর্যাপ্ত গরম ও ঠান্ডা জল। সকালে জিম ও যোগার পৃথক ব্যবস্থা। খাবার তো এককথায় অতুলনীয়। হোটেলের নিজস্ব রেস্তরাঁয় যে নিরামিষ খাদ্য তৈরি হয়, শতরূপ একরাতেই বুঝে গিয়েছেন, তার তুলনা কলকাতার ফাইভ স্টার হোটেলের নিরামিষ খাবারের সঙ্গেও হতে পারে না। তাই দাম যতই বেশি হোক, কলকাতার ধনী ব্যবসায়ী শতরূপ সান্যাল যে ক-টা দিন হরিদ্বারে থাকবেন, হোটেলের রেস্তরাঁ থেকেই লাঞ্চ-ডিনার সারবেন বলে মনস্থ করেছেন; যদিও অন্য অনেক আবাসিক, এখানে খাবারের উচ্চমূল্যের কারণে, বাইরে থেকে লাঞ্চ-ডিনার সেরে আসেন।
স্ত্রীবিয়োগের পর থেকেই শতরূপ ভ্রমণে পারদর্শী হয়ে উঠেছেন। এই ছ-বছরে ভারতবর্ষের কোথায় না ঘুরেছেন! বিশেষ করে জঙ্গল—দেশের সব জঙ্গলই বোধহয় ঘোরা হয়ে গিয়েছে তাঁর। অথচ এমন নয় যে, ছোটো থেকেই বন্যপ্রাণী তাঁকে টানে—বরং ওয়াইল্ডলাইফ থেকে একটু দূরত্ব বজায় রাখতেই বরাবর সচেতন ছিলেন শতরূপ। সবকিছু বদলে গেল সুতনুকা চলে যাওয়ার পর থেকে। মানুষটাই বদলে গেলেন সম্পূর্ণ। আগে ছিলেন কাজ অন্ত প্রাণ—বিজনেস ছাড়া কিছু বুঝতেন না; আর এখন কর্মচারীরাই লুটেপুটে নিচ্ছে সব, কোনো ভ্রূক্ষেপ আছে সেদিকে? তিনি দেশ ঘুরে বেড়াচ্ছেন! ভারতবর্ষের বিভিন্ন জঙ্গলে অভয়ারণ্যে ঘুরে ঘুরে কেমন যেন পাগলাটে হয়ে গিয়েছেন! গঙ্গা-লহরির বারান্দায় চিরপ্রবাহিণী গঙ্গার ছলচ্ছল জলতরঙ্গের কাছে এসে তবে কি তিনি শান্ত হলেন একটু? জুড়োল ভিতরের আগুন?
জিম করবেট ন্যাশনাল পার্ক দেখতে এসে আগের বার যখন হরিদ্বার ছুঁয়ে গিয়েছিলেন একরাতের জন্য, কিংবা তারও আগে ডাক্তার-বন্ধু মৃণাল সেনশর্মার জোরাজুরিতে বাধ্য হয়েছিলেন এখানে আসতে, কই, তখন তো গঙ্গা এভাবে টানেনি তাঁকে? মোহিনী গঙ্গা তার মায়া জাদুবলে তখন তো এভাবে আবিষ্ট করেনি শতরূপকে? গঙ্গা ভালোবাসতেন সুতনুকা, কিন্তু কখনো তাঁকে গঙ্গার কাছে নিয়ে আসার সময় হয়েছিল শতরূপের? আজ কি তবে সেই গঙ্গাই মনে করিয়ে দিচ্ছে তাঁর ছ-বছর আগের সীমাহীন দাম্পত্য উপেক্ষাকে? আট বছরের দাম্পত্যজীবনে কী দিয়েছেন তিনি সুতনুকাকে? টাকাপয়সা-গাড়ি-বাড়ি-বিলাসসামগ্রী? এগুলোই বুঝি সব? এগুলো দিয়েই বুঝি কিনে নেওয়া যায় নারীর মন, ভালোবাসা?
রাজাজি ন্যাশনাল পার্কে ঢোকার অনেকগুলো প্রবেশপথ আছে—চিলা, মোতিচুর, রানিপুর, ঝিলমিল। হোটেলের ম্যানেজার বলেছিল, চিলাগেটই হল সব চেয়ে সুবিধেজনক ও জনপ্রিয়। ওয়াইল্ডলাইফ দেখার জন্য বেশি সংখ্যক পর্যটক এই পথটিই বেছে নেন। কারণ প্রথমত, এই পথে ঢুকলেই বন্যপ্রাণীদের সব চেয়ে ভালোভাবে দর্শন পাওয়া যায়; দ্বিতীয়ত, এই চিলাগেটেই সব চেয়ে বেশি সংখ্যক জঙ্গল সাফারির জিপ পাওয়া যায়। বেশি হলে কী হবে, জিপের জন্য হাহাকার এখানে লেগেই আছে! যেহেতু অনেকক্ষণ আগে এসেছেন শতরূপ, তাই কোনোরকমে একটা জিপ বুক করতে পেরেছেন। এখানে জিপ বুক করতে খরচ পড়ে দেড় হাজার টাকা। এরপর জিপ এন্ট্রান্স ফি তিনশো টাকা। আর জনপ্রতি টিকিট দেড়শো টাকা করে।
কিছুক্ষণ হল, একটি মেয়ে শতরূপের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ফেলেছে। কারণে-অকারণে চোখ চলে যাচ্ছে তার দিকে। খুব যে সুন্দরী তা হয়তো নয়, নয় সীমাহীন লাস্যময়ী বা লাবণ্যবতীও। বয়স একুশ-বাইশ হবে। সঙ্গে পাঁচ-পাঁচটা ছেলে। বেশ শক্তপোক্ত চেহারার ছেলেগুলো। বয়স আঠারো থেকে ত্রিশের ভিতরে—অর্থাৎ সব থেকে কম বয়সি ছেলেটি আঠারোর কম এবং সব থেকে বেশি বয়সি ছেলেটি ত্রিশের বেশি হবে না কিছুতেই। ছেলেগুলো খুবই সাধারণ। নিম্নবিত্ত পরিবারের বলেই মনে হয়। কিন্তু মেয়েটির মধ্যে এমন কিছু একটা আছে যা শতরূপের মতো পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই মানুষকেও টলিয়ে দিয়েছে কিঞ্চিৎ।
বেশ অনেকক্ষণ হল শতরূপ এখানে এসেছেন। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই গেট খুলে যাবে। মেয়েটি ও তার সঙ্গীরা এসেছে তাও কম করে আধ ঘণ্টা হল। কিন্তু এই আধ ঘণ্টার চেষ্টায় তারা জিপ বুক করতে পারেনি। তবে কি দলটা… শতরূপের মায়া হল খুব। ওদের ডেকে নিলে হয় না? শতরূপের জিপে তো আর কেউই নেই, তিনি ছাড়া বাকি সব আসনই তো শূন্য! এমনকী, কোনো পেশাদার গাইডও তিনি নেননি, যদিও ডজনখানেক গাইড অপেক্ষা করছেন গেটে। শতরূপ যে কোনো গাইড নেননি, তার একমাত্র কারণ হোটেলের বাঙালি ম্যানেজার। সে-ই শতরূপকে বুঝিয়েছিল, ‘জঙ্গল সাফারির জিপ ড্রাইভাররাই এক-একজন গাইড। ওদের চেয়ে ভালো গাইড আর কোথাও পাবেন না, স্যার।’
কিন্তু এই জিপগুলোর ম্যাক্সিমাম ক্যাপাসিটি তো ছয়! মানে ছজনের বেশি যাত্রী তো ধরে না কোনো জিপে! তাহলে উপায়? শতরূপ কিছুক্ষণ ভাবলেন, তারপর জিপ ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘নাম কেয়া হ্যায় তুমহারা?’
‘আমি বাঙালি আছি, নাম আমার সনাতন।’
‘উরিব্বাস! বাঙালি আজ সারা পৃথিবীর প্রতিটা কোণে।’ শতরূপ উচ্ছ্বসিত, ‘তাহলে ভাই, আমার একটা উপকার করতে হবে।’
‘বলুন স্যার, কী করতে হবে?’ ছেলেটার ঠোঁটে মুচকি হাসি।
‘আমরা মোট সাতজন, উই আর সেভেন…’
‘এই যে একটু আগে বললেন, আপনি সিঙ্গল!’ সনাতনের চোখে বিস্ময়।
‘না মানে ওই যে ছজনের একটা দল—ওরা জিপ পায়নি, তাই ভাবছিলাম…’ শতরূপ ছেলে-মেয়েগুলোর দিকে আঙুল দেখালেন।
‘আপনি তো বিরাট উপকারী মানুষ আছেন… দরদি মানুষ।’ সনাতন তাকাল শতরূপের মুখের দিকে, ‘আপনারা অ্যাডজাস্ট করতে পারলে তো ভালোই, আমার কোনো অসুবিধে নেই, স্যার।’
শীত আসছে। বছরের এই সময়টায় গেট খুলে যায় ঠিক দুটোয়। তারপর আড়াই-তিন ঘণ্টার জার্নি। গ্রীষ্মকাল হলে সময়সীমা তিনটে থেকে ছ-টা। ভিতরে মোটামুটি পঁয়ত্রিশ কিলোমিটার রাস্তা। বিশেষ বিশেষ জায়গায় থামতে হয়। ড্রাইভারদের তাড়া থাকে খুব—পাঁচটায় বেরোতেই হবে। শতরূপ দ্বিধা জয় করে ছজনের দলটার মুখোমুখি এসে দাঁড়ালেন, ‘তুম লোগোকো জিপ নহি মিলি?’
‘কহাকি সারি বুক হো গয়ি।’ সব চেয়ে লম্বা ছেলেটা লাজুক মুখে উত্তর দিল।
‘ফির কেয়া করে?’
‘ব্যাড লাক!’ অন্য একটা ছেলে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।
শতরূপ মেয়েটির দিকে তাকালেন। কী স্নিগ্ধ মুখ! কী অপরূপ এক মায়াবী প্রশ্রয় যেন প্রবাহিণী গঙ্গার মতোই চিরপ্রসন্ন চপলতায় আঁকা রয়েছে দিঘল দু-চোখে! হ্যাঁ, এই প্রশ্রয়ই তো শতরূপ পেয়েছেন গঙ্গা-লহরির অপ্রতিরোধ্য বারান্দায় অন্তরাত্মা ছুঁয়ে-যাওয়া গঙ্গার ঢেউয়ে। ছ-বছরের দাউদাউ আগুন কি তবে নির্বাপিত হতে এল এই ঢেউয়ের কাছে? এই চোখের কাছে? শতরূপ কী বলবেন? তাঁর তো কথা ফুটছে না মুখে! মেয়েটিই মুখ খুলল, ‘আপকো জিপ মিলি?’
‘হাঁ, মুঝে মিল গয়ি। ম্যায় অকেলাহি হুঁ। তুমলোগ জাওগে মেরে সাথ?’ শতরূপের স্বতঃস্ফূর্ত অকপট আহ্বানে সম্মোহিত হল ছজনের দল। ঘনঘোর বর্ষার আকাশে বিদ্যুৎঝলকের মতো কৃতজ্ঞতার হাসি খেলে গেল মেয়েটির ঠোঁটে, ‘আপ লে চলেঙ্গে হমলোগোকো?’
‘আপকো কোই দিক্কত তো নহি হোগি?’ অপেক্ষাকৃত কম বয়সি একটা ছেলে বলল।
‘অসলমে হমে ইয়াহাঁ পঁহোচনেমে বহোত লেট হো গয়ি। ইসি লিয়ে ইয়ে ঝঞ্ঝট।’ আরেকজন মন্তব্য করল। সব চেয়ে ছোটো যে ছেলেটা, সে কয়েক পা এগিয়ে এসে জানাল, বাড়ি থেকে তারা ঠিক সময়ে বেরোলেও, রাস্তায় গাড়ির টায়ার পাংচার হওয়ার কারণেই এখানে পৌঁছোতে এত দেরি! গেট খোলার অন্তত দু-ঘণ্টা আগে না আসতে পারলে, চিলা থেকে জঙ্গল সাফারির জিপ পাওয়া প্রায় অসম্ভব। ‘তুমলোগ অ্যাডজাস্ট করকে বৈঠ সকোগে না?’ শতরূপ হাসলেন।
‘জরুর। কোই দিক্কত নহি হোগি।’ সকলে প্রায় সমস্বরে বলে উঠল।
‘ইউ আর গ্রেট।’ লম্বা ছেলেটা কৃতজ্ঞতা জানাল। মৃদু গুঞ্জনে বাকিরা সায় দিল তার কথায়।
জঙ্গল সাফারি শুরু হয়ে গিয়েছে। ছজনের দলটি খুশিতে ডগমগ। জিপ ভাড়া লাগেনি তাদের। শুধুমাত্র নশো টাকার টিকিট লেগেছে। ইচ্ছে থাকলেও তারা শতরূপকে বলতে পারেনি জিপ ভাড়ার অংশ নিতে। এতে যে দরদি মানুষটার অপমান হবে, বিলক্ষণ বোঝে ছেলেগুলো। তা ছাড়া এই ঋণ কি টাকাপয়সায় শোধ করা যায়? শতরূপ এতক্ষণে জেনে নিয়েছেন ছেলে-মেয়েগুলোর নাম। সব চেয়ে লম্বা ছেলেটা রোহণ, সব চেয়ে কম বয়সি ছেলেটা ললিত, তুলনামূলকভাবে সব চেয়ে ফরসা যে ছেলেটা, তার নাম ধীমান, যে ছেলেটার চিবুকে কাটা দাগ, ভুরুর পাশে আঁচিল, তার নাম মোহিত এবং ঝাঁকড়া চুলের ছেলেটার নাম দীপেশ। দলের এক এবং একমাত্র মেয়েটি উদিতা। পাঁচ-পাঁচটা পুরুষ সঙ্গীর সঙ্গে সে অত্যন্ত সাবলীল। কোনোরকম জড়তা বা অস্পষ্টতা ছেলেগুলোর সঙ্গে তার ব্যবহারে খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু তার প্রেমিক কে? পাঁচজনের মধ্যে কোনো একজনকে তো সে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে না, সকলেই তার কাছে সমান, শতরূপ দেখছেন। ভাবতে ভাবতে তিনি প্রায় দিশাহারা—তবে কি দলের কেউই তার প্রেমিক নয়? তা-ই বা কী করে হয়? উদিতার আচরণ বলছে, তার চোখ-মুখ বলছে, এই দলটার মধ্যেই সে খুঁজে পায় প্রাণের আরাম, মনের শান্তি, বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য।
শতরূপ আরও বিস্মিত হলেন, কিছুক্ষণ পর পরই মেয়েটি তার আসন পরিবর্তন করছে দেখে। যেহেতু গাড়িতে সর্বমোট ছ-টিই যাত্রী আসন, তাই তার অবস্থান ছেলেগুলোর কোলে। এইমাত্র সে মোহিতের কোল থেকে উঠে ধীমানের কোলে গিয়ে বসল। এর আগে ললিতের কোলেও কিছুক্ষণ বসেছে সে। কিন্তু কী আশ্চর্য, ছেলেগুলোর মধ্যে কোনো হিংসা-ঈর্ষার লেশমাত্র নেই! বরং তারা নিজেরাও পারস্পরিক বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ। কী করে এমন হয়? শতরূপের মাথায় ঢোকে না। কিন্তু সময় যত এগোচ্ছে, তাঁর কৌতূহল তীব্রতর হচ্ছে। প্রাথমিক আলাপচারিতায় শতরূপ শুধু এটুকুই জেনেছেন, ছেলে-মেয়েগুলো এসেছে দেরাদুন থেকে। সুতরাং তাদের স্থানীয় মানুষই বলা চলে। দেরাদুন উত্তরাখণ্ডের রাজধানী শহর। দূরত্ব এমন কিছুই নয়। ছেলেগুলোই বলেছে, যে রুটে তারা এসেছে এই চিলাগেটে, ঠিকঠাক চাকা ঘুরলে, দেরাদুন থেকে সময় লাগা উচিত দু-ঘণ্টারও কম। ছাপ্পান্ন কিলোমিটার রাস্তা মোটে। ওদের গাড়ি বিগড়েছিল বলেই, ঘটেছিল বিপত্তি।
সে যা-ই হোক, ছেলেগুলোর সঙ্গে মেয়েটার সম্পর্ক কী? প্রেমের সম্পর্ক হলে, পাঁচজনের সঙ্গেই একই রকমভাবে মিশবে কী করে? আর বন্ধুত্বের সম্পর্ক হলে, তার সীমারেখা কতদূর? এতটা ঘনিষ্ঠভাবে কি বন্ধুদের সঙ্গে মেশা যায়? মেশা উচিত? শতরূপ কল্পনাও করতে পারেন না। আর পারবেনই বা কী করে? তিনি তো পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই বিপত্নীক বাঙালি! এই মুহূর্তে শতরূপ লক্ষ করলেন, উদিতা ধীমানের কোলে অবস্থান করলেও, তার একটা হাত রোহণের কাঁধে, অন্য হাতের আঙুলগুলো নিয়ে মোহিত খেলছে। একটু দূরেই বেশ কয়েকটা হাতি। হাতির জন্যই এই অরণ্য বিখ্যাত। সনাতন বলল, ‘সব সময়ে বাঘের দেখা মেলে না, কিন্তু হাতি অল টাইম।’
‘তার মানে বাঘ দেখাবে না, তা-ই তো?’ শতরূপ মৃদু হাসলেন।
‘আপনার কপাল, স্যার।’
‘সেটা তো সাংঘাতিক!’ স্বগতোক্তি করলেন শতরূপ।
‘আসলে কী বলুন তো, রাজাজির জন্য বেস্ট টাইম হল এপ্রিল টু জুন।’
‘কেন কেন?’
‘গরমের সময়ে বাঘের জলপিপাসা পায় বেশি। জলের খোঁজে গভীর জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসে ওরা। তাই লেপার্ড এবং টাইগার ওই সময়ে পর্যটকদের ক্যামেরায় ধরা দেবেই, স্যার।’
‘আচ্ছা আচ্ছা, বুঝলাম।’
সনাতন দেখাল, একটু দূরেই একটা মাদি হাতিকে তিনটে পুরুষ হাতি ঘিরে আছে। কোনটা তবে প্রকৃত প্রেমিক? তিনটে হাতির মধ্যে তো কোনো ঈর্ষা নেই! শতরূপ একমনে ভাবছেন। কিন্তু কোনো থই পাচ্ছেন না। ভাবতে ভাবতেই দেখলেন, উদিতাকে নিয়ে ছেলেগুলো হাসি-ঠাট্টা-গল্পে মশগুল হয়ে আছে। মোহিত উদিতাকে জিজ্ঞেস করছে, তার খিদে পায়নি তো! উদিতা খুব হাসছে, ‘ভুখ কিঁউ লগেগি? অন্দর আনে সে পহেলে রোহণনে পেট ভরকে খিলায়া না?’
‘উয়ো তো বহোত সময় হো গয়া।’ দীপেশ বলল।
‘বহোত দের হুই ভি তো কেয়া করে? ইয়াহাঁ ক্যায়সে খায়ে, বুদ্ধু?’ উদিতা খলখলিয়ে হেসে উঠল।
‘ম্যায় তো ভুলহি গয়া থা কি ইয়াহাঁ খানা মানা হ্যায়।’ মোহিত হাসল।
‘জানতি হুঁ।’ উদিতা মোহিতের গাল টিপে দিল।
ওই দূরে একঝাঁক পাখি। রংবেরঙের পাখিগুলোর দিকে তাকালেই মন ভালো হয়ে যায়। ‘সনাতন, ওগুলো কী পাখি?’ শতরূপ একটা বিশেষ প্রজাতির পাখির দিকে আঙুল দেখালেন।
‘প্যারাকিট, স্যার।’ সনাতন একটু থেমে ফের বলল, ‘আর ওই যে সাদা বুকের পাখিগুলো দেখছেন, ওগুলো হল মাছরাঙা। আমাদের বেঙ্গলে এই মাছরাঙা পাবেন না স্যার।’
‘সত্যিই তো, দারুণ!’
‘আর ওই দেখুন ময়ূর!’
‘ইস, অপূর্ব!’ শতরূপ দেখলেন, ছেলেমেয়েগুলোও ময়ূর দেখছে হাঁ করে। ভারতের জাতীয় পাখিই নাকি উদিতার সব চেয়ে প্রিয় পাখি! সে বলছে, তার ময়ূর পোষার বড়ো শখ। ময়ূর কি পোষা যায়? যায় না। সেটাই নরম করে তাকে বুঝিয়ে দিল পুরুষ সঙ্গীরা। শতরূপ মনে মনে ভাবছেন, উদিতা কত ভাগ্যবতী! পাঁচ-পাঁচজন সঙ্গীই কত কেয়ারিং, কত ভালোবাসে তাকে! বিপুল এই পৃথিবীতে ভালোবাসার বড়ো অভাব, যত্নের, আদরের বড়ো অভাব। ছেলেগুলোর সঙ্গে উদিতার যে সম্পর্কই থাক-না কেন, ওর প্রতি তাদের যত্নে তো কোনো খামতি নেই! সনাতন একে একে চেনাচ্ছে কোনটার নাম গ্রেট হর্নবিল, কোনটাকে বলে কালো কাঁধের চিল, কোনটা বকবক-করা পাখি, কোনটা গান-গাওয়া পাখি, কোনটাই বা গুপ্ত কথা ফাঁস করা পাখি! সত্যি, পাখিদের মধ্যেও কত বৈচিত্র্য! ‘স্যার, এখানে কম করে দুশো প্রজাতির পাখি আছে।’ সনাতন জানাল।
‘তা-ই?’ শতরূপ বিস্ময় প্রকাশ করলেন।
‘সব চেয়ে মনোরম দৃশ্য হল বৃষ্টি হলে ময়ূরের নাচ।’
‘তাহলে তো বর্ষাকালে আসতে হয়।’
‘বর্ষায় রাজাজি বন্ধ থাকে, স্যার। পর্যটকদের জন্য এই পার্ক খোলা থাকে নভেম্বরের পনেরো থেকে জুনের পনেরো পর্যন্ত।’
বেশ অনেকটা রাস্তা অতিক্রম করে ফেলেছে জিপ। শতরূপ এই মুহূর্তে গম্ভীর হয়ে বসে আছেন। অনেকক্ষণ কথা বলেননি তিনি। কী ভাবছেন শতরূপ? সুতনুকা কি সত্যিই ভালোবেসে ফেলেছিলেন রবিউলকে? রবিউল কি এতটা বিশ্বাসঘাতকতা… না না, গত ছ-বছর ধরে এইসব প্রশ্ন তাঁকে আর সেভাবে বিব্রত করে না, কারণ এই প্রসঙ্গ, এই সন্দেহ সম্পূর্ণ অর্থহীন, অবান্তর, অপ্রয়োজনীয়। কেন তবে অভিশপ্ত অতীত আজ তাঁর চিন্তাকে নাড়া দিচ্ছে এত? কেন এই সুন্দর আনন্দ মুহূর্তে ওইসব চির-অমীমাংসিত প্রশ্নগুলো মাটি ফুঁড়ে উঠে আসছে ভয়ংকর যত দত্যিদানোর মতো?
তিনি তো নিজের চোখে দেখেছিলেন, সুতনুকার হাত দুটো চেপে ধরে আছে রবিউল, চোখে অপ্রতিরোধ্য কামনা তার। ওই দৃশ্য দেখার আগে তিনি নিজে তো অন্ধ হয়ে যেতে পারতেন! রবিউলকে কি সাবধান করা উচিত ছিল তাঁর? ছি ছি, একটা কাজের লোক—যাকে বলে চাকর, ভৃত্য—তাকে সাবধান করবে মনিব, ‘আমার স্ত্রী-র সঙ্গে মিশো না?’ এ কি হয়? এ কি সম্ভব? তবে কি সুতনুকাকে বলা উচিত ছিল? তা-ই বা কী করে হয়? ‘তুমি আমার ড্রাইভারের সঙ্গে প্রেম কোরো না,’ এই ইচ্ছে প্রকাশ করা মানে নিজেকে কত নীচে নামানো, সে ধারণা বিলক্ষণ ছিল শতরূপের। তা ছাড়া সবকিছু কি মুখে বলে সমাধান করা যায়? তিনি বললেই কি সুতনুকা ছেড়ে দিতেন ড্রাইভারের সঙ্গে মেলামেশা? হয়ে যেতেন সতীসাধ্বী স্ত্রী?
হ্যাঁ সত্যি কথা, শতরূপ তাঁকে সময় দিতে পারেননি। হয়তো সেভাবে ভালোবাসতেও পারেননি। দিতে পারেননি সন্তান। কিন্তু তা-ই বলে ড্রাইভারের সঙ্গে সম্পর্ক? ওই সম্পর্কে ঠিক কতটা এগোতে চেয়েছিলেন সুতনুকা? কতটাই বা চেয়েছিল রবিউল? রবিউলকে তো তিনি রাস্তা থেকে কুড়িয়ে এনে জীবন দিয়েছিলেন! মা-বাবা বাড়িঘর… কিছুই তো ছিল না তার! কুকুরের জীবন থেকে তাকে মানুষের জীবনে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শতরূপ। এই তার প্রতিদান? অন্যমনস্ক শতরূপ দেখলেন, উদিতা তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে, ‘আঙ্কল আপ বেঙ্গল কব লৌটেঙ্গে?’ ”আঙ্কল” ডাকটায় একটু অস্বস্তি হলেও, মুহূর্তেই সামলে নিলেন শতরূপ। তারপর শান্তভাবে জানালেন, রিজার্ভেশন করা থাকলেও, খুব তাড়াতাড়ি তিনি এখন ফিরছেন না। কারণ, চিলাগেট থেকে ন-দশ কিলোমিটার দূরে গঙ্গাবক্ষে তিনি এমন একটা হোটেলে উঠেছেন, যে হোটেলের পরিবেশ, বিশেষত মা গঙ্গা এবং অদূরের হর-কি-পৌরি তাঁর মনকে আবিষ্ট করেছে। ওই সৌন্দর্যের কাছে তিনি সমর্পণ করে দিয়েছেন নিজেকে। সেখানে তিনি এখন কতদিন কাটাবেন, তিনি নিজেও তা জানেন না।
‘বড়া আজিব আদমি হ্যায়।’ উদিতা স্বগতোক্তি করল।
‘তুমহে এক সওয়াল পুছুঁ?’ শতরূপ আড়ষ্টতা কাটিয়ে চোখে চোখ রাখলেন উদিতার, ‘ইন সারে লড়কোমে কেয়া সবহি তুমহারে দোস্ত হ্যায়?’
‘হাঁ দোস্ত হি হ্যায়। বহোত করিবি দোস্ত।’
‘তুমলোগ পড়তে হো?’
‘হম সব শাদিশুদা হ্যায়,’ খলখল করে হেসে উঠল উদিতা।
‘শাদিশুদা? তুমহারা হাজবেন্ড কৌন হ্যায়?’
‘হমারি এক বেবি ভি হ্যায়।’ উদিতা ঘাড় ঘুরিয়ে ছেলেগুলোর দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, ‘ইয়ে জো দেখ রহে হ্যায় রোহণ, ধীমান, মোহিত, দীপেশ, ললিত—ইয়ে সব মেরে হাজবেন্ড হ্যায়।’
‘মতলব? হোয়াট ডু ইউ মিন?’ শব্দগুলো বেরোল না মুখ দিয়ে, গলার ভিতরেই আটকে রইল শতরূপের। সত্যিই মুখ দিয়ে কথা বেরোচ্ছে না তাঁর। উদিতা কি মজা করছে তাঁর সঙ্গে? কিন্তু কেনই বা সে এমন করবে? তবে কি সে এ যুগের দ্রৌপদী? পাঁচ-পাঁচটা স্বামী? এও কি সম্ভব? কী করে সম্ভব?
নীরবতা ভাঙল সনাতন। জিপ থামিয়ে সে দেখাল বাঘের পায়ের ছাপ। একেবারে টাটকা দাগ—মানে, নিকটেই বাঘ আছে—কিছুক্ষণ আগেই সে এখানে ছিল। এ এক দুর্লভ মুহূর্ত! কেমন একটা নিশ্ছিদ্র নীরবতা বিরাজ করছে এখানে। অরণ্যের গা-ছমছমে বিকেল ঢলে পড়ছে সন্ধের বুকে। মৌহূর্তিক নীরবতাকে খান খান করে আর্ত সাইরেনের মতো কিছু একটা বেজে উঠল অনতিদূরে। ‘কীসের শব্দ সনাতন?’ শতরূপের গলা শুকিয়ে গিয়েছে। এ কি সুতনুকার আর্তনাদ? কেন এরকম মনে হচ্ছে তাঁর? এমন তো হওয়ার কথা নয়। মাথা ঝিমঝিম করছে শতরূপের, চোখে অন্ধকার। কে তাঁকে বাঁচাবে এখন? কোথায় গঙ্গা? তার ছলচ্ছল জলতরঙ্গে তো সব বুকচাপা আগুন নিভে যাওয়ার কথা! গঙ্গা-লহরির বারান্দা তো শতরূপকে সেই প্রতিশ্রুতিই দিয়েছিল কাল। আর আজ? আজকেও তো উদিতার চিরস্নিগ্ধ দু-চোখে সর্বংসহা গঙ্গার নিভৃত উপস্থিতি! তবে কেন ভয়? কীসের ভয়? ‘শম্বর ভীষণ সচেতন, সে ল্যাজ উঁচিয়ে সকলকে সাবধান করে দিচ্ছে বাঘ সামনেই।’ সনাতন বলল। শতরূপ একটু দূরেই হরিণ দেখে নিশ্চিন্ত হলেন, ওই আর্ত চিৎকার তারই। ‘আর দাঁড়ালে হবে না স্যার, এখনও ঢের রাস্তা বাকি।’ সনাতন তাড়া মারল।
‘চলো।’ মুহূর্তের বিপন্নতা কাটিয়ে প্রায় স্বাভাবিক হয়ে-ওঠা শতরূপ জিপ ছাড়ার সবুজ সংকেত দিলেন।
উদিতা বসেছে ললিতের কোলে। শতরূপ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন, ‘আচ্ছা কেয়া তুমলোগ একসাথ হি রহতে হো?’
‘হম একসাথ একহি মকানমে রহতে হ্যায়।’ উদিতা হাসল।
‘কোই প্রবলেম নহি হোতি?’
‘পহেলে পহেলে থোড়ি হিচকিচাহাট হোতি থি। অব কুছ নহি হ্যায়। মেরে পাঁচো পতিকো হি ম্যায় এক জ্যায়সা মওকা দেতি হুঁ।’
উদিতা শতরূপকে জানাল, পাঁচ ভাইয়ের এক ভাই ধীমানের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছিল বছর চারেক আগে। বিয়েটা হয়েছিল উভয় পক্ষের অভিভাবকদের দেখাশোনার মাধ্যমেই। যাকে বলে অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ! কিন্তু বিয়ের পরই উদিতা বুঝতে পারে, পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। তখনই তার মনে হয়, ভাইয়ে-ভাইয়ে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাবে না তো? ধীমান তো বউকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে, তখন অবিবাহিত ভাইদের সঙ্গে তার ভ্রাতৃত্ববন্ধন শিথিল হয়ে পড়বে না তো? তখনই উদিতার মাথায় আসে দ্রৌপদীর দৃষ্টান্ত। সে পাঁচ ভাইকেই বিয়ে করার ব্যাপারে স্বামীর সঙ্গে আলোচনায় বসলে, ধীমান লুফে নেয় তার প্রস্তাব। ফলে একে একে সব্বাইকে বিয়ে করে উদিতা। সে জানায়, তার মা-ও নাকি তিন ভাইকে বিয়ে করেছিলেন! তিন স্বামী নিয়ে তিনি কখনো কোনো সমস্যায় পড়েননি। শতরূপ প্রশ্ন করলেন, ‘তুমহারি বেবি কিসকে পাস হ্যায়?’
‘উয়ো ঘরমে হ্যায়, হমারে রিলেটিভসকে পাস।’ উদিতা ঢোঁক গিলে বলল, ‘উসে ইয়াহাঁ লাতি তো উয়ো ডর জাতি।’
‘উসকা পিতা কৌন হ্যায়?’
‘ম্যায় সচমে নহি জানতি উসকা পাপা কৌন হ্যায়! ইন পাঁচোমে সে কোই ভি হো সকতা হ্যায়, ইস বাতকো লে কর হমে কোই হেডেক নহি হ্যায়।’
শতরূপ স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তাহলে পরিবারে কোনো অশান্তিও হয় না স্ত্রী-র শারীরিক অধিকার নিয়ে? উদিতা তাঁকে জানিয়েছে, তাদের পরিবার ছোটো না হলেও, অর্থবান না হলেও, পরিবারে অশান্তির কোনো লেশ নেই। সে পাঁচ ভাইয়ের প্রত্যেকের সঙ্গেই আলাদা আলাদাভাবে রাত্রিযাপন করে—ওদের ঘরে কোনো বিছানাও নেই, মাটির উপর পুরু করে কম্বল পেতে ওরা শুয়ে পড়ে। এই নিয়ে ওদের মধ্যে কোনো যৌন ঈর্ষাবোধ হয় না।
শতরূপের মাথা ঘুরছে বনবন করে। আবার দু-চোখে অন্ধকার দেখছেন তিনি। আবার বুকের ভিতরে সেই অব্যক্ত কষ্টটা। উদিতা তখনও বলে চলেছে, ‘দুসরি শাদিশুদা লড়কিয়োঁসে বহোত জাদা পেয়ার মিলতি হ্যায় মুঝে।’ সমস্বরে তাকে সমর্থন করছে পাঁচ ভাই! কী নিবিড় ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ তারা! সত্যিই তো, জীবনে ভালোবাসাটুকুই সব। বাদবাকি সব মিথ্যে, অর্থহীন, অপ্রয়োজনীয়! ভালোবাসার স্থান যে যৌন ঈর্ষা বা যৌনহিংসার অনেক উপরে, তার জাজ্বল্যমান প্রমাণ বসে আছে শতরূপের সামনেই। অথচ সামান্য সন্দেহের বশবর্তী হয়ে কী নৃশংসভাবেই না তিনি তড়িদাহত করে দু-দুটো প্রাণকে নিকেশ করে দিয়েছিলেন নিমেষে! তাঁর সুনিপুণ হত্যালীলার ন্যূনতম কোনো কিনারা করতে পারেনি পুলিশ, সামান্যতম সন্দেহ পর্যন্ত করেনি তাঁকে। সেই শতরূপ আজ ধরা দিয়েছেন উদিতার কাছে, উদিতা তাঁকে ধরে ফেলেছে! বাঘের পদশব্দে আতঙ্কিত শম্বরের আর্ত চিৎকারের মতো সুতনুকার বাঁচতে চাওয়ার শেষতম আর্তনাদটি হারিয়ে-যাওয়া ভালোবাসার মতোই ফালা ফালা করে দিয়েছে শতরূপের বুক! এই ভালোবাসাই তো উদিতার চোখ! এই ভালোবাসাই তো গঙ্গা-লহরির গঙ্গা! একবার না একবার, জীবনে একবার না একবার, এই ভালোবাসার কাছে ফিরতেই হবে পৃথিবীর প্রতিটা মানুষকে। শতরূপের আর পথ নেই পালাবার। তিনি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কলকাতায় ফিরে যাবেন। তাঁকে যে থানায় যেতে হবে একবার, যেতেই হবে।
