গজমোতি
‘অফিসার, আমিই কাল সন্ধেয় ফোন করেছিলাম আপনাকে। অধমের নাম শ্রীকুমার রায়।’ বসার বেঞ্চি থেকে উঠে দাঁড়িয়ে দুই করতল যুক্ত করে নমস্কার করল লোকটা। পরনে সাদা ধবধবে পাঞ্জাবি-পাজামা, চোখে মোটা কাচের চশমা, চুল ব্যাকব্রাশ করে আঁচড়ানো। পোশাকে, কথাবার্তায় খাঁটি বাঙালিয়ানার ছাপ থাকলেও, লোকটার ছোটোখাটো শরীরী গঠনে কিংবা মুখের আদলে পাহাড়ি হাবভাব স্পষ্ট। ‘আসুন আমার চেম্বারে।’ নিজের ঘরের দিকে হাঁটতে হাঁটতে অফিসার সঞ্জয় শ্রীবাস্তব দেখলেন, পিছন পিছন আসছে লোকটা।
‘আমি অনেকক্ষণ এসেছি, স্যার।’ লোকটার ঠোঁটে মৃদু হাসি।
‘এতক্ষণ অপেক্ষা করানোর জন্য দুঃখিত। আসলে একটা কাজে আটকে পড়েছিলাম। তা কোথায় থাকা হয়?’ নিজের চেয়ারে বসতে বসতে চশমার ফাঁক দিয়ে লোকটাকে একঝলক নিরীক্ষণ করে নিলেন অফিসার সঞ্জয় শ্রীবাস্তব, ‘বসুন। কফি চলবে?’
‘না না স্যার, কিচ্ছু দরকার নেই।’ লোকটা অফিসারের উলটোদিকের চেয়ারে বসল, ‘শিলিগুড়ি শহরেই বাড়ি। বাপ-ঠাকুরদার বাস এখানেই। এ মাটি আমার রক্ত।’ তারপর গড়গড় করে একটা ঠিকানা আওড়ে গেল।
অফিসার নিচু গলায় প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি চেনেন রুদ্রপ্রসাদকে? কী যেন পদবি…’
‘চিনি স্যার, রুদ্রপ্রসাদ গেলাল, ডুয়ার্সের দিকে বাড়ি। কিন্তু লোকটা যে এত বড়ো ঠগ, ঘুণাক্ষরেও জানতাম না।’
‘আপনি কাল ফোনে গল্পটা আমায় বলায়, আমিও বেশ এক্সাইটেড। এর একটা বিহিত করতেই হবে।’ অফিসার বিড়বিড় করে বললেন।
‘আপনি ইচ্ছে করলে সবকিছুই পারেন স্যার।’
‘তা লোকটার সঙ্গে আপনার কতদিনের আলাপ-পরিচয়?’
‘আলাপ-পরিচয় তেমন কিছু নয়, স্যার। দুজনে দুজনকে চিনি। ব্যাস, এই পর্যন্তই। আসলে শিলিগুড়ি শহরে আমাদের একটা ট্রাভেল এজেন্সি আছে। চোদ্দোখানা গাড়ি আছে আমাদের, চারটে ভলভো, ছ-টা টাটা সুমো আর চারটে…’
‘তার মানে বিজনেস পার্টনার?’ লোকটাকে থামিয়ে দিয়েই প্রশ্ন করলেন অফিসার।
‘না না, একেবারেই না, লোকটা কিছুদিন কাজ করেছিল এই এজেন্সিতে। ব্যাস এটুকুই।’
‘আর ওই বিপুল দাশ? যার ফোন নাম্বার দেওয়া আছে বিজ্ঞাপনে? তাকে চেনেন?’
‘না স্যার, চিনি না।’
‘বিজ্ঞাপনটা আমাকে একবার দেখান তো!’
কুমার রায় মোবাইলে ইন্টারনেট অন করল। তারপর ফেসবুকে ঢুকে রুদ্রপ্রসাদের প্রোফাইলটা খুলে, অফিসারের দিকে ফোনটা এগিয়ে দিল, ‘এটাই হচ্ছে গেলালের প্রোফাইল, স্যার। এই যে এই দেখুন… এই পোস্টটা।’ অফিসার খুব মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগলেন বিজ্ঞাপনটা। আশ্চর্য, গেলাল নিজে অবাঙালি হলেও, বিজ্ঞাপনটা আছে বাংলায়। এবং যে ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ফোন নাম্বার দেওয়া রয়েছে, সেই ব্যক্তিও একজন বাঙালি—বিপুল দাশ। বিজ্ঞাপনে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, গেলালের কাছে আছে সত্যিকারের গজমোতি। একবার যদি কেউ তা কিনতে পারে, কপাল খুলে যাবে তার। হাতির মাথার ভিতরে নাকি থাকে আসল মুক্তো। গেলালের কাছে আছে সেই দুর্মূল্য মণি! রাতারাতি ফকির থেকে রাজা করে দেবে সে। সেই গজমোতি কিনতে হলে, চাই মাত্র এক কোটি টাকা।
বন দপ্তরের অফিসার সঞ্জয় শ্রীবাস্তব খুব ভালো করেই জানেন, রূপকথার গল্পে যে গজমোতির উল্লেখ থাকে, তা নিতান্তই কাল্পনিক বস্তু। ওইসব গল্পে শোনা যায়, লাখে একটা হাতির মাথায় অমন মুক্তো মেলে। এর ওষধি এবং জাদুক্ষমতা নাকি অবিশ্বাস্য, আর তাই এই মণি দুর্মূল্য! কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, হাতির মাথায় কোনো মুক্তো কখনোই তৈরি হতে পারে না। হাতি কেন, কোনো প্রাণীর শরীরেই এমনটা সম্ভব নয়। এমনকী, ঝিনুকের শরীরে কোনো বালিকণা ঢুকলে, তার উপর দেহরসের আবরণ দিয়ে যে মুক্তো বানায় ঝিনুক, তাও কি আসলে মুক্তো? অথচ মানুষ বোঝে না এসব। গজমোতির নেশায় কত টাকাওয়ালা লোক ফোন করবে বিপুল দাশকে, আর লোক ঠকিয়ে রাতারাতি রাজা হয়ে যাবে রুদ্রপ্রসাদ। এ কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। তা ছাড়া, সব চেয়ে বড়ো কথা, বন্যপ্রাণীর দেহাংশ দাবি করে কিছু বিক্রির চেষ্টা করে লোক ঠকানোর এই পরিকল্পনায় উদাসীন থাকা সঞ্জয় শ্রীবাস্তবের মতো একজন নীতিবান সৎ বন আধিকারিকের পক্ষে একপ্রকার অপরাধেরই নামান্তর। গম্ভীর গলায় অফিসার জিজ্ঞেস করলেন, ‘ফোন করেছিলেন?’
‘আজ্ঞে স্যার, ফোন করেছিলাম, কিন্তু কেউ রেসপন্ড করেনি। কাল আপনাকে জানালাম যে!’
‘হ্যাঁ, বলেছিলেন তো, ঠিকই।’
‘তারপর স্যার বেশি রাতে ওই নাম্বার থেকে রিং ব্যাক করেছিল বিপুল দাশ।’
‘এটা তো আমায় বলেননি!’ অফিসার বিস্মিত গলায় প্রশ্ন করলেন, ‘কী বলল?’
‘আমি আর অত রাতে আপনাকে ডিস্টার্ব করতে চাইনি, স্যার। ভাবলাম, আজ সকালে তো দেখা হচ্ছেই।’
‘ফোন করে কী বলল?’ অফিসার ফের প্রশ্ন করলেন।
‘আজ্ঞে স্যার, বিপুল দাশ জানতে চাইল, আমি কী কারণে ফোন করেছিলাম। আমি বললাম আমার নাম সর্বানন্দ চৌধুরী। ভাগ্য ফেরাতে চাই, তাই ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দেখে ফোন করেছিলাম।’
‘তারপর?’ অফিসারের গলা অতি উৎসাহী।
‘তারপর আর কী, খানিক গম্ভীর গলায় সে বলল, তার কাছে বেশ কয়েকটা গজমোতি আছে, এক-একটার দাম এক কোটি করে। আমি একটা কিনতে ইচ্ছুক বলাতেই, মহানন্দে একটা ঠিকানা বলে দিল। সেখানেই দেখা করতে বলল সামনের রোববার ঠিক বিকেল পাঁচটায়।’
‘ঠিকানাটা বলুন।’ অফিসার একটা চিরকুটে ঠিকানাটা লেখার প্রস্তুতি নিলেন। কুমার রায় শান্ত গলায় বলল, ‘ভক্তিনগর চেকপোস্ট এলাকায় যে শপিং মল আছে…’
‘ভক্তিনগর চেকপোস্ট এলাকায় তো দুটো মল আছে।’ কুমার রায়কে কথা শেষ করতে না দিয়েই অফিসার বলে উঠলেন।
‘আজ্ঞে স্যার, সামনেরটা, মানে যে মলটা অপেক্ষাকৃত বড়ো, তারই পিছনের দিকের গাড়ি বারান্দায় নীল শার্ট-প্যান্ট আর নীল ব্লেজার পরে ঠিক পাঁচটার সময়ে অপেক্ষা করবে বিপুল দাশ।’
‘ফাইন!’ অফিসার কাগজের টুকরোটা পকেটে ভরে, কুমার রায়ের চোখে চোখ রেখে বললেন, ‘আর সর্বানন্দ চৌধুরী? তার ড্রেস কোড?’
‘আজ্ঞে স্যার, একটা কথা বলছিলাম…’
‘কী কথা?’
‘সর্বানন্দ চৌধুরীটা কে সাজবে?’
‘অবভিয়াসলি আপনি!’
‘বলছিলাম কী…’ কুমার রায় আমতা আমতা করে বলল, ‘রুদ্রপ্রসাদ গেলাল তো আমাকে চেনে, তাই আমি যদি স্পটে না গিয়ে… ইয়ে মানে, আপনি যদি সর্বানন্দর রোলটা…’
‘কোনো চিন্তা নেই আপনার, আমি থাকব আপনার, মানে সর্বানন্দ চৌধুরীর অ্যাসিস্ট্যান্ট হয়ে, হাতে টাকার সুটকেস। মলের বাইরে আমার সহকর্মীরা লুকিয়ে থাকবেন।’ অফিসার কুমার রায়কে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বললেন, ‘গেলাল ওখানে থাকবে না, আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন। আমরা বিপুল দাশকে গ্রেপ্তার করে, তার কাছ থেকে তথ্য নিয়ে, পরবর্তী সময়ে ধরব আসল লোককে। তখন তো আপনি পগারপার!’
‘বেশ বেশ, তাহলে কোনো অসুবিধে নেই।’ কুমার রায়ের চোখ চকচক করে উঠল।
‘আপনি ওই নাম্বারে ফোন করে জানিয়ে দেবেন আপনার ড্রেস কোড। আর বলবেন, আপনার সঙ্গে থাকবে আপনার সহকারী সুজয় রায়।’
‘আজ্ঞে স্যার।’
দুই
নেপাল, ভুটান এবং ডুয়ার্সসহ উত্তরবঙ্গের কিছু কিছু জায়গায় চোরাশিকারিদের দাপট এতটাই প্রবল হয়ে উঠেছে সম্প্রতি, যে ভারতের ওয়াইল্ডলাইফ ক্রাইম কন্ট্রোল বোর্ডের দুঁদে গোয়েন্দারাও হিমশিম খাচ্ছেন অপরাধীদের ধরতে। কিছুদিন আগে জলপাইগুড়ি জেলার মালবাজার মহকুমায় চিতাবাঘের মৃতদেহ উদ্ধারকে কেন্দ্র করে সামনে এসেছে দুই কুখ্যাত চোরাশিকারির পরিচয়। প্রথমে বন দপ্তরও ঘটনার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারেনি। তাদের ধারণা ছিল, ওদলাবাড়ি চা-বাগানে যে চিতাবাঘের মৃতদেহ উদ্ধার হয়, তার পিছনে কোনো চোরাশিকারের কাহিনি নেই। চা-বাগান-লাগোয়া বাবুজোতের বসতি থেকে একটা ধাড়ি শুয়োর তুলে নিয়ে গিয়ে দুই চিতাবাঘে মাংস ভাগাভাগির লড়াই করে। সেই লড়াইয়ে প্রাণ যায় অপেক্ষাকৃত কম বয়সি চিতাবাঘটার। প্রাপ্তবয়স্ক চিতাবাঘটার সঙ্গে অল্পবয়সিটি পেরে ওঠেনি আর কী! যে এলাকায় ঘটনাটি ঘটেছিল সেখানে সদ্য চা-বাগানের গাছের কলম কাটার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। শুকনো চা-পাতার ডালের ফাঁকে ফাঁকে চিতাবাঘের লোমও মিলেছিল প্রচুর। স্বাভাবিকভাবেই বনকর্মীদের ধারণা হয়েছিল, দুই চিতাবাঘের লড়াইয়ে ওই লোম ঝরে পড়েছে।
কিন্তু যখন প্রায় ছ-ফুট দীর্ঘ প্রাপ্তবয়স্ক চিতাবাঘটার সদ্য ছাড়ানো টাটকা চামড়া সমেত ধরা পড়েছিল পাহাড়ের কুখ্যাত চোরাশিকারি পবন ভুটিয়া, তখন সব তালগোল পাকিয়ে গিয়েছিল বনকর্মীদের। পবন ধরা পড়ার পর পাচারচক্রের মূল পান্ডার নাম সামনে আসে—নেপালের সোনম খটকি! সে-ই আসল লোক। তার আন্ডারেই কাজ করত পবন। সোনমের বাড়ি নেপালের ঝাঁপা জেলায়। পবনের উপর দায়িত্ব ছিল চিতার চামড়া নেপালের ঝাঁপা হয়ে চীনে পাচার করে দেওয়ার। কিন্তু যেকোনো কারণেই হোক, বাচ্চা চিতার চামড়া পবন সংগ্রহ করতে পারেনি। কিংবা হয়তো ইচ্ছে করেই রেখে গিয়েছিল বাচ্চা চিতাটাকে, সোনমকে এটা প্রমাণ করতে যে, সে অপারেশনে ব্যর্থ হয়েছে, কারণ যে চামড়া তার দায়িত্ব ছিল নেপালের ঝাঁপা হয়ে চীনে পাঠিয়ে দেওয়ার, সেই চামড়া, সে গদ্দারি করে, নিজেই ঝেঁপে দেওয়ার চেষ্টায় ছিল। ধরা পড়ার পর পবন এ কথা স্বীকারও করেছে গোয়েন্দাদের কাছে। সে বলেছে, দুই চিতাবাঘের লড়াইয়ের পরিবেশ তৈরি করে একদিকে সে যেমন বনকর্মীদের ধোঁকা দিতে চেষ্টা করেছিল, অন্যদিকে তেমনি ছোটো বাঘটাকে ফেলে রেখে গিয়ে সোনমকে এই বার্তা দিতে চেয়েছিল যে, এবারকার মতো সে তার কর্মসম্পাদনে ব্যর্থ হয়েছে, পুলিশের তাড়া খেয়েই হোক, বা যেকোনো কারণেই হোক।
কিন্তু সোনমকে বোকা বানানো কি অতই সহজ? ঘটনার সত্যতা জানার পর থেকে প্রায় তিন মাস হয়ে গেল, সে গুলি খাওয়া বাঘের মতো ফুঁসছে। পারলে পাতাল থেকে তুলে এনেও সে বিশ্বাসঘাতককে শাস্তি দেয়! কিন্তু পাবে কোথায় পবনকে? সে তো পুলিশের নিরাপদ আশ্রয়ে। তার গ্রেপ্তারির খবরটাও সযত্নে লুকিয়ে রেখেছে পুলিশ। তাই সোনম জানেও না যে, পবন কারাগারে। জানলে হয়তো খানিক শান্তি পেত, অবিশ্যি সেক্ষেত্রে তার নিজের ধরা পড়ার ভয়ও পেয়ে বসত তাকে। তবে পবন বা সোনমের মতো অতি কুখ্যাত চোরাশিকারিদের ধরা খুব সহজ কাজ নয়। পবন কি আর এমনি এমনি ধরা পড়ত? কোনো পুলিশের সাধ্যি ছিল নাকি তাকে ধরার? ধরেছে তো তেজীয়ান বেলজিয়ান ম্যালিনোয়া। বন্যপ্রাণী সংক্রান্ত অপরাধ নিয়ে সক্রিয় একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার মাধ্যমে সদ্য যুবক তিনটি কুকুর সম্প্রতি এসেছে গোয়েন্দাদের হাতে। তাদেরই একজন বেলজিয়ান ম্যালিনোয়া—ধনুকের মতো বাঁকানো পিঠ, ছিপছিপে, টানটান, হঠাৎ আছড়ে-পড়া কালচে সোনালি ঝড় যেন—সকালে খায় দুধ-ভাত, লাউ-কুমড়া-পালং শাক-বিট-গাজরের আনাজপাতি; বিকেলে ডালিয়া আর ডিম; রাতে খাসির মাংস। বিভিন্ন সামগ্রীর মধ্যে লেপার্ডের ছাল কোথায় রয়েছে, শুঁকে শুঁকে খুঁজে বের করে ফেলার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা তার! এই ম্যালিনোয়াই হাতেনাতে পাকড়াও করেছে পবনকে।
তিন
রবিবার বিকেল পাঁচটা। ভক্তিনগর চেকপোস্ট এলাকা জমজমাট। ছুটির দিনে সামনের শপিং মলে বিশাল ভিড়। পিছনের গাড়িবারান্দায় নেভি ব্লু ড্রেসে বিপুল দাশ অপেক্ষা করছে। তার চুল উসকোখুসকো, কপালে অল্প ভাঁজ। কুমার রায়ের অন্বেষী চোখ তাকে খুঁজে নিতে সময় নেয় না। পিছনে সঞ্জয় শ্রীবাস্তব, হাতে টাকার সুটকেস। মলের বাইরে লুকিয়ে আছেন বন দপ্তরের কয়েকজন কর্তাব্যক্তি। বেশ একটা উত্তেজক পরিবেশ! চোখের ইশারায় কুমার রায় ডেকে নিল বিপুল দাশকে। বিপুল হ্যান্ডশেক করতে হাত বাড়াল, ‘চলুন-না, তিনতলায় রেস্টুরেন্ট আছে।’
‘হ্যাঁ চলুন, ওখানেই বসা যাক।’ কুমার রায় হাত ধরল।
‘নমস্কার, আমি সুজয়, স্যারের অ্যাসিস্ট্যান্ট।’ সুটকেসটা দু-পায়ের ফাঁকে চেপে, সঞ্জয় শ্রীবাস্তব সব দাঁত বের করে দু-হাতের করতল যুক্ত করতে উদ্যত হলেন।
‘আচ্ছা আচ্ছা, নমস্কার।’ বিপুল দাশ প্রতিনমস্কার করতে করতে মৃদু হেসে বলল, ‘আর আমি হলাম গে গেলাল স্যারের অ্যাসিস্ট্যান্ট।’
‘উনি আসেননি?’
‘উনি বাইরে আছেন। ওঁর ইম্পর্টেন্ট কাজগুলো এখন আমিই সামলাই।’ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বিপুল দাশ উত্তর দিল। কুমার রায় বেশ অনেকটা স্বস্তি অনুভব করল মনে মনে—যাক গে, গেলালের মুখোমুখি তো হতে হল না! অফিসার শ্রীবাস্তব যেমনটা বলেছিলেন, তেমনটাই তাহলে হতে চলেছে। আজ বিপুলকে ধরা হলেও, সেই সূত্র ধরে পরে যখন গেলালকে ধরা হবে, তখন তো আর তাকে থাকতে হচ্ছে না সামনে! তার মানে, গেলাল জানতেও পারবে না সর্বানন্দর আসল পরিচয়।
তিনতলার রেস্তরাঁয় তিনজনে বসেছে আয়েশ করে। অর্ডারের কফিও এসে গিয়েছে। কুমার রায় ওরফে সর্বানন্দ চৌধুরী কফি খায় না, তার জন্য ফ্রুট জুস। এ কথা-সে কথায় বেলা গড়াচ্ছে। আসল কথাটা পাড়লেন সঞ্জয় শ্রীবাস্তব ওরফে সুজয়ই, ‘বলি কী, আপনার সঙ্গে ক-টি গজমোতি আছে?’
‘আপনারা তো একটিই চেয়েছেন!’ কফি মগটা তুলতে তুলতে বিপুল দাশ উত্তর দিল।
‘হ্যাঁ ঠিকই, কিন্তু…’ সর্বানন্দ চৌধুরী দ্বিধাগ্রস্ত চোখে তাকাল।
‘এনি হেজিটেশন?’ বিপুল দাশের গলা আত্মবিশ্বাসী।
‘না মানে, একাধিক থাকলে আমরা একটু পছন্দ করতে পারতাম… এই আর কী!’ সঞ্জয় শ্রীবাস্তব দেঁতো হাসি হাসলেন।
‘সে ব্যবস্থাও আছে স্যার, রিল্যাক্স। একদম চিন্তা করবেন না। গেলাল স্যার অত কাঁচা কাজ করেন না।’ বিপুল দাশ ঈষৎ ঝুঁকে পড়ে ছোট্ট বাদামি চামড়ার ব্যাগ থেকে তিন-তিনটে গজমোতি বের করল।
‘ওয়াও, হাউ বিউটিফুল!’ সর্বানন্দ উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল।
ছোটোখাটো পোল্ট্রি ডিমের সাইজের তিনটে পাথর। একটা সাদা। বাকি দুটো হালকা বাদামি রঙের। একটা রুমালের উপর পাথরগুলো রেখে সেগুলো নাড়াতে নাড়াতে মন্ত্রমুগ্ধের মতো বিপুল দাশ বলতে লাগল, ‘এগুলো সব হাতির মাথার ভিতরের পাথর। পুরাণে যাকে বলা হয় গজমোতি। দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের ”ঠাকুরমার ঝুলি” পড়েছেন? কিংবা অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ”ক্ষীরের পুতুল”? সেখানেও হুবহু এই জিনিসের উল্লেখ আছে। একেবারে বিশুদ্ধ গজমোতি। নিন, চয়েস করুন।’ পাক্কা বিজনেসম্যানের মতো কথাগুলো বলে, কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল বিপুল দাশ। ঠিক ওই মুহূর্তেই সুজয় রায় ওরফে সঞ্জয় শ্রীবাস্তব নিজের পরিচয়পত্র বের করে, বিপুলকে একঝলক দেখিয়ে, তার গ্রেপ্তারির আয়োজন করতে উদ্যত হলেন। তাঁরই নির্দেশে তাঁর সহকর্মীরাও ততক্ষণে ঘিরে ফেলেছেন শপিং মলের ছোট্ট আলো ঝলমলে রেস্তরাঁ। অন্য খরিদ্দাররা বিস্ময়ের চোখে তাকিয়ে আছে এদিকে। বেশ একটা নাটকীয় পরিবেশ। সঞ্জয় শ্রীবাস্তব পাথরগুলো প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে এক সহকর্মীকে ধরতে দিলেন, ‘এগুলো পরীক্ষার জন্য ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হবে।’
‘কিন্তু ল্যাবে প্রমাণের আগেই আমাকে অ্যারেস্ট করা যায় কি, স্যার?’ বিনীতস্বরে বিপুল দাশ প্রশ্ন করল।
‘এগুলো খাঁটি না ভেজাল, সে তো আলাদা প্রসঙ্গ।’ সঞ্জয় শ্রীবাস্তব গম্ভীর গলায় বললেন, ‘কোনো ব্যক্তি যদি বন্যপ্রাণীর দেহাংশ দাবি করে কিছু বিক্রির চেষ্টা করে, তাহলেই বন্যপ্রাণ আইনে তাকে আমরা গ্রেপ্তার করতে পারি।’
‘বুঝলাম,’ বিপুল দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।
‘আপনি যদি গজমোতির নাম করে লোক ঠকিয়ে থাকেন, তার তদন্ত পুলিশ করবে, বুঝতে পেরেছেন?’
‘কিন্তু স্যার…’ বিপুল তোতলাতে শুরু করল, ‘আমি তো নিমিত্তমাত্র…’
‘বলুন রুদ্রপ্রসাদ গেলালের ঠিকানা। কোথায় আছেন তিনি? দেরি করবেন না, এক্ষুনি বলুন।’ রীতিমতো ধমকের সুর সঞ্জয় শ্রীবাস্তবের গলায়।
চার
পবন ভুটিয়া ধরা পড়ার পর নানাভাবে গোয়েন্দাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিল। প্রথমত সে বোঝাতে চেষ্টা করেছিল, ওই ছ-ফুট দীর্ঘ পুরুষ চিতাবাঘটাকে সে হত্যা করেনি। যে এলাকায় বাচ্চা বাঘের মৃতদেহটি উদ্ধার হয়েছিল, তার খুব কাছেই তার ঘেরা রেঞ্জের গজলডোবা বিটের জঙ্গল। সেখান থেকেই চিতা দুটো এলাকায় ঢুকে পড়েছিল বলে সে জানিয়েছিল। ওইদিকের কিছু এলাকায় শীতকালে হামলা থেকে বাঁচতে, চিতাবাঘ পিটিয়ে মারারও নজির আছে। এরকম নজির তুলে ধরে সে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিল যে, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সে কোনোভাবেই জড়িত ছিল না। শীতের সন্ধে একটু ঘনালেই বসতির খোলা জায়গাগুলো ফাঁকা হয়ে যায়। তখন চিতাবাঘ নিশ্চিন্তে ঢুকে শুয়োর, ছাগল, হাঁস তুলে নিয়ে যেতে পারে। এমনকী, তারা ঘরবাড়িরও খুব কাছে চলে আসায়, বিপদ থেকে বাঁচতে অনেক সময়ে চিতাবাঘ পিটিয়ে মারা হয় সত্যি সত্যিই। কিন্তু এক্ষেত্রে হত্যাকারী যে পবন নিজেই, এমন তথ্যপ্রমাণ গোয়েন্দাদের হাতে এসেছিল। এমনকী, সোনম খটকিকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে, সে ওই চামড়ার দামও ঠিক করে ফেলেছিল। যেখানে সোনমের অর্ডার ছিল নেপাল হয়ে চীনে চামড়া পাচার করার, সেখানে অপেক্ষাকৃত অনেক কম দামে সে দেশের ভিতরেই চামড়ার দর কষাকষি শুরু করে দিয়েছিল। ভুটিয়ার মোবাইল বাজেয়াপ্ত করে গোয়েন্দারা এমন তথ্যপ্রমাণও হাতে পেয়েছেন যে, পাঁচ লক্ষ টাকায় ওই চামড়া বিক্রির প্রাথমিক কথাবার্তা হয়ে গিয়েছিল পাচারচক্রে যুক্ত আরও দু-একজনের সঙ্গে। গোয়েন্দারা তাদেরকেও খুঁজছেন হন্যে হয়ে। তবে সবার আগে প্রয়োজন সোনম খটকিকে। পালের গোদা তো সে-ই। তাকে একবার পাকড়াও করতে পারলে, বাকিরা খুব সহজেই ধরা পড়ে যাবে।
ভুটিয়া নিজের নামবিভ্রাট তৈরি করেও গোয়েন্দাদের বিপথে চালিত করার চেষ্টা করেছিল। সে সচিত্র পরিচয়পত্র বের করে দেখিয়ে দিয়েছিল যে, এই পবন ভুটিয়া সেই পবন ভুটিয়া নয়। পৃথিবীতে কি দুটো পবন ভুটিয়া থাকতে পারে না? তা ছাড়া এই পবন ভুটিয়ার ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট আছে যে নামে, সেই ব্যক্তির ফ্রেন্ড লিস্টে অপরাধজগতের লোকজন তো কেউই নেই। বাঙালি-অবাঙালি নির্বিশেষে শিক্ষিত রুচিশীল মানুষের ভিড় সেখানে। এইসব নানা ছলচাতুরীর আশ্রয় নিয়ে গোয়েন্দাদের ঘোল খাওয়ানোর চেষ্টা করলেও, সম্পূর্ণ ব্যর্থমনোরথ হয়ে সে এখন সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে গোয়েন্দাদের দিকে। আর তাতেই তদন্তের যারপরনাই অগ্রগতি হয়েছে সম্প্রতি। ভারতের ওয়াইল্ডলাইফ ক্রাইম কন্ট্রোল বোর্ডের গোয়েন্দারা মনে করছেন, খুব তাড়াতাড়ি পুরো চক্রটাই ধরা পড়ে যাবে তাঁদের হাতে।
পাঁচ
সঞ্জয় শ্রীবাস্তবের মোবাইল ফোন বেজে উঠল চাপাস্বরে। ফোনে সম্ভবত কেউ ওঁকে বললেন বিপুল দাশকে গ্রেপ্তার না করতে। অফিসার রূঢ় গলায় বললেন, ‘মানে? হোয়াট ডু ইউ মিন? কে বলছেন আপনি?’ ও প্রান্ত থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে সঞ্জয় শ্রীবাস্তব ফের বলে উঠলেন, ‘হাতেনাতে ধরা পড়েছে যে, তাকে গ্রেপ্তার করব না? আপনার নিজের পরিচয় দিন আগে।’ ততক্ষণে বিপুল দাশ বুকপকেট থেকে নিজের পরিচয়পত্র বের করতেই, বিস্ময়-বিস্ফারিত চোখে সঞ্জয় শ্রীবাস্তব কয়েক সেকেন্ডের জন্য যেন পাথর হয়ে গেলেন। মুহূর্তে গোটা রেস্তরাঁর দখল নিয়ে নিয়েছে পুলিশ। ইন্ডিয়ান ওয়াইল্ডলাইফ ক্রাইম কন্ট্রোল বোর্ডের দুঁদে অফিসার বিপুল দাশ ওরফে তুহিনশুভ্র চ্যাটার্জির আদেশে সর্বানন্দ চৌধুরী ওরফে কুমার রায় ওরফে সোনম খটকি সবেমাত্র গ্রেপ্তার হয়েছে। মুখে কোনো কথা নেই তার। ঘটনার আকস্মিকতা তখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি সে। গোটা রেস্তরাঁ জুড়ে নিশ্ছিদ্র নীরবতা। মুখ খুললেন তুহিনশুভ্রবাবুই, ‘কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার একটা পরিকল্পনা করেছিলাম আমরা। সেই পরিকল্পনা একশো শতাংশ সফল।’ কফিতে শেষ চুমুক দিয়ে তুহিনশুভ্র চ্যাটার্জি সগর্বে বলতে লাগলেন, ‘সোনমকে বিট্রে করার পর থেকেই পবন ওর চক্ষুশূল ছিল। যেকোনো মূল্যে সে পবনকে মারতে বা ধরিয়ে দিতে চাইছিল। সোনমের ওই প্রতিশোধস্পৃহাটাকে টার্গেট করেই আমরা পবনের ফেসবুক প্রোফাইলে গজমোতির বিজ্ঞাপন দিই। পবন রুদ্রপ্রসাদ গেলাল নামে এবং সোনম কুমার রায় নামে ফেসবুকে পরিচিত। সেখানে প্রথম থেকেই তারা পরস্পরের বন্ধু। আমাদের বিশ্বাস ছিল, বিজ্ঞাপনটা দেখামাত্র পবনকে ধরিয়ে দেওয়ার এমন সুবর্ণসুযোগ সে লুফে নেবে। আর আমরাও বিজ্ঞাপনটা ”পাবলিক” না করে ”এডিট প্রাইভেসি”তে ”অনলি কুমার রায়” করে রেখেছিলাম, যাতে এক এবং একমাত্র ফোন এলেই আমরা বুঝতে পারি, পাখি ফাঁদে পা দিয়েছে।’
অনেকক্ষণ একটানা বলার পর তুহিনশুভ্র চ্যাটার্জি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। তারপর আত্মবিশ্বাসী গলায় ফের বলতে শুরু করলেন, ‘একটাই সংশয় ছিল, নিজে ধরা পড়ার ভয়ে সোনম পিছিয়ে যাবে না তো! সেজন্যই আমরা গেলালকে সামনে না এনে, সব দায়িত্ব বিপুল দাশের হাতে ছেড়ে দিয়েছিলাম। গেলাল সামনে না এলে সোনমকে চিনে ফেলার আর কোনো সম্ভাবনাই ছিল না। ফলে সে অনেক নিশ্চিন্তে এখানে আসতে পেরেছে, কারণ সে জানত, আজ বিপুল দাশ গ্রেপ্তার হলেও, কাল যখন তার আসল উদ্দেশ্য সাধিত হবে, অর্থাৎ রুদ্রপ্রসাদ গেলাল ওরফে পবন ভুটিয়া গ্রেপ্তার হবে, তখন তো আর তাকে সামনে থাকতে হচ্ছে না! পবন এটুকুই জানবে, গজমোতিকাণ্ডে যে তাকে ধরিয়ে দিয়েছে, তার নাম সর্বানন্দ চৌধুরী যাকে কস্মিনকালেও সে চেনে না। আর সর্বানন্দ চৌধুরীর আড়ালে কুমার রায় ওরফে সোনম খটকি নিজের উদ্দেশ্য সাধন করে, আবার সূচিভেদ্য অন্ধকারে গা-ঢাকা দেবে, যেখানে পুলিশ-প্রশাসন-বন দপ্তর-গোয়েন্দা বিভাগ কেউ কোনোদিন প্রবেশ করতে পারবে না।’
পুলিশের নিশ্ছিদ্র প্রহরায় শপিং মলের তিনতলা থেকে কাপড়ে মুখ-ঢাকা সোনমকে যখন নামিয়ে আনা হচ্ছে, শুক্লপক্ষের চাঁদ তখন গোল হয়ে জ্বলে উঠেছে ভক্তিনগর চেকপোস্টের মাথায়।
