অত্যয় – রজতশুভ্র মজুমদার

অত্যয়

‘হ্যালো, স্বাগত? শোন-না, আমি কলকাতা এসেছি। তোর সঙ্গে দেখা হবে?’

 ‘আরে নিখিলেশ! কী মনে করে? এতদিন পর!’

 ‘তুই কোথায়?’

 ‘আমি তো বস, বেঙ্গালুরুতে। একটা কাজে এসেছি। কালই ফেরা।’

 ‘ওহো… তাহলে দেখা হবে না।’

 ‘কোনো দরকার ছিল? বল-না!’

 ‘না, আসলে…’

 ‘বল!’

 ‘তোর রাজারহাটের ফ্ল্যাটটায় একটা রাত থাকা যাবে?’

 ‘আরে ইয়ার! তোকে কতবার বলেছি, যখন প্রয়োজন হবে বলবি! ওটা তো ফাঁকাই পড়ে থাকে। আমি নিজে এখনও একটা দিনও ওখানে থাকিনি, জানিস তো? শোন, ইকো পার্কের অপোজিটের রাস্তাটা ধরে নর্থের দিকে টানা আট কিলোমিটার চলে যাবি। ওখানে দেখবি, সুখবৃষ্টি বলে একটা বিশাল আবাসন আছে…’

 ‘সুখবৃষ্টির কোন ফ্লোর? কত নম্বর ফ্ল্যাট?’

 ‘সুখবৃষ্টির ঠিক পাশেই জি প্লাস সেভেনটিন যে আবাসনটা আছে, ওটারই দক্ষিণমুখী বি ব্লকের দশতলার ঠিক বাঁদিকের ফ্ল্যাটটাই আমার। তুই এক কাজ কর, নিউটাউন রাজারহাটে পৌঁছে সুখবৃষ্টির পাশে আমাদের আবাসনটার গা ঘেঁষে সোজা পশ্চিমদিকে মিনিট তিনেক হেঁটে দেখবি, পর পর কয়েকটা আনাজপাতির দোকান পাবি। ওখানে গিয়ে খোঁজ করবি, বাবলুর দোকান কোনটা! আমার নাম করে ওর কাছ থেকে ফ্ল্যাটের চাবি নিয়ে নিবি। ও-ই তোকে সব বুঝিয়ে দেবে।’

 ‘ও.কে. বস!’

 এরপর স্বাগত যে কথাগুলো বলেছিল, সেগুলোকে একটুও গুরুত্ব দেয়নি নিখিলেশ। স্বাগত জানিয়েছিল, আবাসনটা খুবই ফাঁকা-ফাঁকা, বেশিরভাগ ফ্ল্যাটেই এখনও লোক আসেনি। যারা এসেছে, তারাও থাকে না পাকাপাকিভাবে। একদিন-দু-দিন থাকে, আবার চলে যায়। আশপাশের পরিবেশটাও বেশ নির্জন। দশতলার ব্যালকনি থেকে রাতের আকাশটা সম্পূর্ণ অন্যরকম দেখায়, রাস্তার দিকে তাকালে গা ছমছম করে। গেটে সিকিউরিটি আছে ঠিকই, কিন্তু…

 নিখিলেশ বরাবরই ডাকাবুকো স্বভাবের। স্বাগতর কাছে যে বিষয়টা ভয়ের উদ্রেক করে, সেটা তার কাছে নিতান্তই হাস্যকর। স্বাগতর কখনো সাহস হয়নি নিজের ফ্ল্যাটে একা একটা রাত কাটাতে। নিখিলেশ সহজেই বাবলুর কাছে হাজির হয়ে যায়, ‘না না, তোমাকে যেতে হবে না, আমি একাই যেতে পারব।’

 ‘আপনার সাহস আছে, স্যার। বি ব্লকের দশতলার একটা ফ্ল্যাটও কমপ্লিট হয়নি এখনও!’

 ‘তো?’

 ‘বাবু বলেছেন, আশপাশের ফ্ল্যাটে লোকজন চলে এলে তবেই বউদিমণিকে নিয়ে এসে রাত কাটাবেন।’

 ‘আমার নিরিবিলিই ভালো লাগে।’

 ‘কোনো সমস্যা হলে সিকিউরিটিকে ফোন করবেন।’ বাবলু সিকিউরিটির ফোন নম্বর-লেখা একটা চিরকুট ধরাল নিখিলেশকে।

 ‘সমস্যা আর কী হবে! সঙ্গে খাবার আর জল নিয়ে নিয়েছি। রাত্রিটুকু তো থাকা। সকাল হলেই কেটে পড়ব।’ নিখিলেশ কয়েক সেকেন্ড থেমে বলল, ‘সকালে দোকান খুলবে ক-টায়? তোমাকে তো চাবি ফেরত নিতে হবে।’

 ‘আমি খুব সকাল সকাল চলে আসব, স্যার। তখন আপনার ঘুম ভাঙবে না।’

 ‘তুমি কি প্রথম থেকেই এই ফ্ল্যাটের দেখাশোনা করো?’

 ‘না না, এই তো কয়েক মাস হল। তার আগে অন্য একজন ছিল। সে মারা গেল, অমনি বাবু আমায় জোর করলেন। না করতে পারলাম না। খুব ভালো মানুষ! অনেক উপকার করেন কিনা!’

 ‘হ্যাঁ, সত্যিই স্বাগত খুব ভালো ছেলে। আমার ক্লাসমেট ছিল। আমরা দু-বছর পড়েছি একসঙ্গে। কোলা ইউনিয়ন হাই স্কুলে।’

 ‘সেটা কোথায়, স্যার?’

 ‘পূর্ব মেদিনীপুরের কোলাঘাট বাজারে। ওখানেই ওদের বাড়ি ছিল তো! দেশের বাড়ি।’

 ‘ওহো, আচ্ছা আচ্ছা। আপনিও ওখান থেকেই আসছেন?’

 ‘ওরা জমি-জায়গা সব বেচে দিয়ে শ্যামবাজারে বাড়ি কিনল।’ আপনমনে বলে চলেছে নিখিলেশ, ‘এখন ব্যাবসা ফুলেফেঁপে উঠেছে।’

 ‘আচ্ছা।’

 ‘আমি তো আর আসতে পারিনি, ওখানেই থেকে গিয়েছি।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলল নিখিলেশ।

বাবলু বুঝতে পারল, নিখিলেশ সুখে নেই। সে আর কথা বাড়াল না। নিখিলেশই কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘কোলাঘাটের বাড়িটা বিক্রি করে এখন মেচেদায় একটা ছোট্ট বাসা বানিয়েছি। ওখান থেকেই আসছি, বুঝলে বাবলু?’

 ‘বাবু সিকিউরিটিকে ফোন করে দিয়েছেন। আপনি নিজের পরিচয় দিয়ে সোজা ঢুকে যান স্যার, কাল সকালে আবার কথা হবে।’ বাবলু দোকান বন্ধ করার উপক্রম করতে লেগেছে। নিখিলেশ বাবলুকে বিদায় জানিয়ে সোজা আবাসনের দিকে হাঁটা লাগাল।

দুই

তালা খুলে ফ্ল্যাটে ঢুকেছে নিখিলেশ। ১৬০০ স্কোয়্যার ফিটের থ্রি বি. এইচ.কে ফ্ল্যাট। উচ্চমানের মার্বেলে মোড়া মেঝে। বিশাল ডাইনিং হল। প্রত্যেকটা ঘরের সঙ্গে লাগোয়া ঝুলবারান্দা। দুটো বাথরুম, দুটো অ্যান্টিরুম, কিচেন। আসবাবপত্র খুব কমই আছে। দেখলেই বোঝা যায়, এ বাড়ির সঙ্গে মালিকের শোয়াশুয়ির সম্পর্ক এখনও তৈরি হয়নি সেভাবে। ওই আড়ো আড়ো-ছাড়ো ছাড়ো প্রেমই চলছে। ডাইনিংয়ে একটা নরম গদির সোফা। সেখানে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসল নিখিলেশ। ততক্ষণে ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে বাইরে। সঙ্গে শোঁ শোঁ হাওয়া। নিখিলেশ ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল। জমাট সন্ধে নেমেছে নিউটাউনের আকাশে। ঘন কালো মেঘে চারদিক ঢাকা। হালকা মেঘের গর্জন। থেকে থেকে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। প্রকৃতির কী অপার মহিমা! কিছুক্ষণ আগেও মেঘের লেশমাত্র ছিল না, আকাশ ছিল উজ্জ্বল। কেউ ভাবতে পেরেছিল, রাজারহাট জুড়ে বৃষ্টি নামবে এখনই? নিখিলেশের গায়ে বৃষ্টির ফোঁটা এসে লাগছে। সে দরজা বন্ধ করে ঘরে ঢুকে গেল। সদর দরজা লক করেছে কি না একবার চেক করে, সোজা চলে গেল উলটোদিকের বেডরুমটায়। একমাত্র এই ঘরটাতেই খাটের উপর বিছানা পাতা আছে। সাদা ধবধবে চাদর। নরম বালিশ। একজোড়া পাশবালিশ। নিখিলেশ গা এলিয়ে দিল। ভীষণ ভালো লাগছে তার এখন। সারাদিনের ক্লান্তিনাশের এত মনোরম বিছানা সে আগে কখনো দেখেনি। আলো জ্বালেনি নিখিলেশ। আলো একদম পছন্দ করে না সে। এসি নেই। মাথার উপর ফ্যান ঘুরছে বনবন করে। ছোট্ট টুলের উপর বিশাল চীনামাটির ফুলদানিতে রাখা প্লাস্টিকের ফুলের পাপড়ি ঈষৎ কেঁপে কেঁপে উঠছে হাওয়ায়। জানালা খোলেনি নিখিলেশ। ফলে বাইরের বৃষ্টির গতি জরিপ করার একমাত্র উপায় মেঘের ডাক শোনা। সে ডাক এমনই ক্রমবর্ধমান যে, ইচ্ছে করলেও তাকে উপেক্ষা করা যায় না। তবু নিখিলেশের দু-চোখ বুজে আসে।

 খুব কাছে একটা মৃদু শব্দে ঘুম ভেঙে যায় নিখিলেশের। ধড়ফড়িয়ে উঠে বসেই সে দেখে, সামনে ছায়ামূর্তির মতো কেউ একজন দাঁড়িয়ে। কালো কুচকুচে গায়ের রং, পেটানো চেহারা, মাথার চুলে কদমছাঁট, দাড়ি-গোঁফ পরিষ্কার করে কামানো, চোখ দুটো কোটরে ঢোকা কিন্তু ঘন, কালো, উজ্জ্বল। নিখিলেশ কিছু বলার আগেই মুখে অকৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে লোকটা বলে উঠল, ‘দাদাবাবু আমায় পাঠিয়েছেন আপনার দেখভাল করতে।’

 ‘কী নাম তোমার?’ নিখিলেশ নরম গলায় জিজ্ঞেস করল।

 ‘আজ্ঞে ভীম।’

 ‘এই বৃষ্টিতে এলে কী করে? ভিজে যাওনি তো?’

 ‘আজ্ঞে বাবু, আমরা ভিজি না।’

 ‘সে কী!’ নিখিলেশ হো হো করে হেসে উঠল লোকটার কথায়। সে কিছু বলার আগেই লোকটা খুব বিনীত গলায় জানতে চাইল, ‘বাবু, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?’

 ‘হ্যাঁ বলো।’

 ‘আমার হাতে খেতে আপনার কোনো আপত্তি নেই তো?’

 ‘মানে? আপত্তি থাকবে কেন?’

 ‘না মানে…’ লোকটা ইতস্তত করতে লাগল।

 ‘পরিষ্কার করে বলো, আমি বুঝতে পারছি না।’

 ‘আমি খুব ভালো রান্না করতে পারি গো বাবু। খাওয়াতে ভীষণ ভালোবাসি! কিন্তু কেউ আমার হাতে খায় না।’

 ‘আরে কেন খায় না, সেটা তো বলবে।’

 ‘আমি ম্লেচ্ছ, বাবু। আমার পদবি ডোম।’

 ‘অস্পৃশ্য? আনটাচেবল?’ আবার হো হো করে হাসতে লাগল নিখিলেশ। হাসতে হাসতেই বলল, ‘শোনো, তোমার নামেই আরেকজন ভদ্রলোক ছিলেন। তিনিও অস্পৃশ্য। তাঁর হাতেও কেউ খেত না। ছেলেবেলায় সে যখন স্কুলে পড়ত, বন্ধুরা কেউ বসত না পর্যন্ত তার পাশে। প্রচণ্ড গ্রীষ্মে তেষ্টায় ছাতি ফেটে যেত, কিন্তু স্কুলের কুয়ো থেকে জল তুলে খাওয়ার অধিকারটুকুও ছিল না তার। বন্ধুরা দল বেঁধে জল খেতে যেত, ভীম বসে থাকত ক্লাসের ভিতর এককোণে, মাথা নিচু করে। শেষে কোনো একজন বন্ধু একটা মাটির পাত্রে তার জন্য জল নিয়ে আসত। কিন্তু সে জল খাবে কী করে ভীম? সে তো অস্পৃশ্য! বন্ধু তখন অনেকটা উঁচু থেকে ভীমের হাঁ-করা মুখে জল ঢেলে দিত, যাতে তার শরীরের সঙ্গে পাত্রের কোনোরকম সংস্পর্শ না ঘটে। এমনই জীবন ছিল ভীমের।’

লোকটা মুগ্ধ হয়ে শুনছে নিখিলেশের কথা। নিখিলেশ একনিশ্বাসে বলে চলেছে, ‘আর-একবার কী হয়েছিল, জানো? ভীম তার বাবার সঙ্গে দেখা করবে, ভীষণ জরুরি দরকার। কিন্তু রাস্তায় যানবাহন পাচ্ছে না কিচ্ছু। গুরগাঁও যেতে হবে, অনেকখানি পথ। শেষে একটা গোরুর গাড়ি পেল সে। ভাড়া ঠিক হল। ভীম উঠে বসল গাড়িতে। এমন সময়ে গাড়ির চালক জানতে পারল, ভীম অস্পৃশ্য, হরিজন। সঙ্গে সঙ্গে ভীমকে অপমান করে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়েছিল চালক, ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল তার মালপত্তর।’

 ‘হ্যাঁ বাবু, আমারও ঠিক এমন অবস্থাই হয়েছিল।’

 ‘কীরকম?’

 ‘আমি ভালো রান্না করতে পারি বলে দাদাবাবু একবার আমাকে একটা হোটেলে কাজে লাগিয়ে দিয়েছিলেন। আমি জানি, আমার পদবি বললে ওরা আমায় কাজে নিত না, তাই পদবি লুকিয়েই কাজে লেগে গিয়েছিলাম। কিন্তু সত্যিটা ফাঁস হয়ে গিয়েছিল বাবু। আর তাতেই আমাকে মেরেধরে বের করে দিয়েছিল হোটেল থেকে। এই দেখুন, এখনও দাগ আছে শরীরে!’ ভীম তার ঢোলা পাজামা গুটিয়ে হাঁটুর নীচের ক্ষতচিহ্ন দেখাল।

 ‘তারপর?’

 ‘তারপর আর কী! মানুষ যা চায়, তা কি পায়? আমার স্বপ্ন ছিল ভালো ভালো পদ রান্না করা। রান্না করে মানুষকে খাইয়ে তৃপ্তি দেওয়া। কিন্তু কেউ কোনোদিন আমার হাতে খেতে চায় না, বাবু। বাধ্য হয়ে দাদাবাবুকে বললাম, একটা কাজ দেখে দিন যাহোক, না হলে তো খেতে পাব না দু-মুঠো। দাদাবাবু দেবতার মতো, শেষে উনিই কাজ দেখে দিলেন একটা।’

 ‘কী কাজ?’

 ‘ট্যাক্সি চালাই আমি। কলকাতার রাস্তায় ট্যাক্সি চালাই। দাদাবাবুই সব ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। কিন্তু এ কাজটা আমার একদম ভাল্লাগে না, বাবু। পেটের দায়ে করি। আর এই ফ্ল্যাটটা দেখাশোনা করি। দাদাবাবুরা এখানে একদিনও থাকেননি এখনও। কিন্তু এই যে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন দেখছেন… এগুলো আমারই কাজ।’

 ‘বাঃ, তুমি তো বেশ কাজের লোক!’ নিখিলেশ স্বগতোক্তি করল।

 ‘কিন্তু আপনি তো বললেন না, আমার হাতের রান্না খাবেন কি না!’ ভীম পুরোনো প্রসঙ্গটা ফের উত্থাপন করল।

 ‘আমাকে দেখে তোমার কী মনে হয়, বলো তো!’ নিখিলেশ মুচকি হাসল।

 ‘তাহলে বলুন, আপনি কী খেতে ভালোবাসেন?’ নিখিলেশের প্রশ্রয়ে-আহ্লাদে আটখানা হল ভীম।

 ‘আমি তো সর্বভুক। সবরকম খাবারই আমার ভালো লাগে। কিন্তু কিছুই তো জোটে না কপালে।’

 ভীম দেখল, কথাগুলো বলার সময়ে করুণ হয়ে গেল নিখিলেশের মুখটা। বড়ো মায়া হল তার। খুব আন্তরিক গলায় সে জিজ্ঞেস করল, ‘কিছুই জোটে না কেন, বাবু?’

নিখিলেশ কথা ঘোরানোর চেষ্টা করল, ‘হ্যাঁ, জোটে না তো! এই তো আজ যেমন তুমি খাওয়াতে চাইছ, কিন্তু আমার কপালে তো নেই সেই খাবার। এখানে ঢোকার আগেই আমি খাবার কিনে নিয়েছি। তখন তো জানতাম না, তুমি আসবে।’

 ‘সে খাবার এতক্ষণে ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে, বাবু। ও আপনি খেতে পারবেন না।’

 ‘কিন্তু উপায়? খাবার কি ফেলে দেওয়া যায়?’

 ‘কেন ফেলবেন? আমি খেয়ে নেব। বলুন, আপনার কী খেতে ইচ্ছে করছে?’

 ‘তা কী করে হয়? তুমি রান্না করবে আমার জন্য আর নিজেই খাবে না সে খাবার?’

 ‘কেন খাব না? নিশ্চয়ই খাব। আপনার কেনা খাবারটা রাতে খাব আর আমার রাঁধাটা নিয়ে যাব কালকের জন্য।’ সাদা ধবধবে দাঁতগুলো বের করে কালো কুচকুচে লোকটা চওড়া হাসল। ভারী সুন্দর এই হাসিটা। নিখিলেশ মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। ঘুটঘুটে অন্ধকারে হাসিটুকুই শুধু দেখা যায়। কিন্তু যতটা দেখা যায়, অনুভব করা যায় তার চেয়েও অনেক বেশি।

 ভীম ডোম রান্নাঘরে চলে গিয়েছে ততক্ষণে। নিখিলেশের প্রিয় পাঁঠার মাংস আর পরোটা রাঁধছে সে। বাইরে অবিশ্রান্ত বৃষ্টি আর তেমনই মেঘের গর্জন। সঙ্গে বজ্রপাত। বিদ্যুৎচমকে ফালা ফালা হয়ে যাচ্ছে আকাশ। মাঝে মাঝে তার উদ্ভাস এসে লাগছে জানালার কাচে। নিখিলেশ পরমানন্দে বসে আছে খাটের উপর। পা গুটিয়ে। কোনোদিকে তার কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। সমস্ত পৃথিবী যেন তার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে আজ। এই বিচ্ছিন্নতায় সে মহাখুশি।

 ‘বাবু ঘুমিয়ে পড়বেন না।’ রান্নাঘর থেকে চিৎকার করল ভীম।

 ‘আরে না না, তোমার হাতে না খেয়ে আমার ঘুম হবে নাকি?’

 ‘আমি ঝটপট নামিয়ে ফেলব,’ তৃপ্তির হাসি হাসল ভীম।

 ‘আমার কোনো তাড়া নেই।’ নিখিলেশ আশ্বস্ত করল।

 ‘খিদে পাবে তো! সেই কখন খেয়েছেন।’ মাংসটা কষতে কষতেই কথা বলছে ভীম। নিখিলেশ কোনো সাড়া দিল না। শুধু মনে মনে ভাবল, ‘আমার কথাও কেউ ভাবে?’ সত্যিই তার খিদে-তেষ্টা-ভালো লাগা-মন্দ লাগা নিয়ে যে কারো মাথাব্যথা হতে পারে, নিখিলেশ কোনোদিন কল্পনাই করতে পারে না। সে বিছানা থেকে উঠে রান্নাঘরে এল। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার, কোথাও কিছু দেখা যায় না। ওই তো ভীম একমনে রান্না করছে। আভেনের আলোয় চকচক করছে তার কপালটা, চোখ-দুটো। আর কী অপূর্ব ঘ্রাণ! এই ঘ্রাণ সে কত যুগ পায়নি! সেই ছোটোবেলায় মা যখন মাংস রাঁধত, এইরকম গন্ধ পেত নিখিলেশ। তারপর একটু বড়ো হতেই মাংস বন্ধ হয়ে গেল। একে অভাবের সংসার, তার উপর বাবার রেড মিট নিষিদ্ধ হল ডাক্তারবাবুর নির্দেশে। বাবার ছিল হার্টের প্রবলেম, কিশোরবেলাতেই বাবাকে হারাতে হয়েছিল। তারপর একদিন মা-ও চলে গেল। নিখিলেশের পৃথিবীটা সেই যে অন্ধকার হয়ে গেল…

 ‘বাবু, এখানে এলেন কেন? খুব খিদে পেয়েছে? আর দেরি নেই। মাংসটা নামিয়েই পরোটা তৈরি করে ফেলব।’

 ‘তোমার সঙ্গে দুটো কথা বলতে এলাম।’

 ‘আমি আবার একটা কথা বলার মানুষ!’ করুণ হাসি ভীমের ঠোঁটে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম মুক্তোর মতো ছড়িয়ে। হাতে খুন্তি। চোখে অদ্ভুত একটা মায়া মাখানো আছে। সে মায়ায় দুনিয়া জয় করে নেওয়া যায়। অন্তত নিখিলেশ তা-ই ভাবল। সে খুব মৃদুস্বরে বলল, ‘খুব ছোটোবেলায় মা এইরকমভাবে মাংস রাঁধত।’

 ‘মা নেই আপনার?’

 ‘না গো, আমার কেউ নেই।’

 ‘সে কী! অমন কথা কেন বলছেন বাবু? ইস্ত্রি, ছেলে-মেয়ে…’

 ‘আমার ছেলে-মেয়ে নেই।’

 ‘আর?’

 ‘আমার স্ত্রী অন্য ধরনের মানুষ। আমাদের মধ্যে কোনো ভালোবাসা নেই।’ নিখিলেশ বলব না-বলব না করেও বলে ফেলল কথাটা, ‘ওর শুধু টাকা চাই। অনেক টাকা। আমি গরিব মানুষ। সামান্য একটা কাজ করি। চাকরিবাকরি পাইনি। ওর অত চাহিদা মেটাব কী করে?’ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বলতে লাগল নিখিলেশ, ‘জানো ভীমদা, আমাকে ঠিকমতো খেতেও দেয় না! কতদিন না খেয়ে শুয়ে পড়ি, ওর কিছুই যায়-আসে না!’ কথাগুলো বলতে বলতেই চোখ ছলছল করে উঠল নিখিলেশের।

 ‘না খেয়ে খেয়ে শরীরের কী অবস্থা করেছেন!’ ভীম আটা মাখছে।

 ‘ওকে টাকা দিতে পারলেই আমি ভালো। পারি না বলেই আমায় খেতে দেয় না।’

 ‘খেতে তো হবেই। বাইরে বেরিয়ে খাবেন।’

 ‘ক-টাকা আর রোজগার করি! আমার কাছে অত টাকা থাকে না, ভীমদা!’

 ‘তা-ই বললে হবে? না খেলে রোজগার করবেন কী করে?’

 ‘বাবার ভিটেটাই বিক্রি করে দিতে হল টাকার জন্য। শেষে মেচেদায় একটা ছোট্ট মাথা গোঁজার ঠাঁই করলাম। ওর চাই বড়ো বাড়ি, গাড়ি, দামি গয়না…’ নিখিলেশ দীর্ঘশ্বাস ফেলল, ‘আসলে ভুল লোককে বিয়ে করেছে ঋতা, আমি ওর যোগ্য নই।’

 ‘টাকাপয়সাই কি জীবনে সব, বাবু? মানুষের মনটাই আসল। আপনি অনেক বড়ো মনের মানুষ!’

 নিখিলেশ যেন দীর্ঘদিনের অব্যবহারে জং পড়ে-যাওয়া লোহা! ”বড়ো মনের মানুষ” কথাটায় তার হৃদয় বিগলিত হল। কেউ যে তাকে এত বড়ো সার্টিফিকেট দিতে পারে, তা নিখিলেশের দূর কল্পনাতেও আসে না। সে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে ভীম ডোমের দিকে। ভীম অবাক হয়ে বলে, ‘কী দেখছেন, বাবু?’

 ‘কিছু না।’

 ‘খাবার রেডি। চলুন ও ঘরে।’

 ‘চলো।’

 গরমাগরম কষা মাংস আর পরোটা বেড়ে দিয়েছে ভীম। একটা ছোট্ট বাটিতে পেঁয়াজ কুচি, কাঁচালঙ্কা। গ্লাসে ঠান্ডা জল। পরম তৃপ্তিতে খাচ্ছে নিখিলেশ। জীবনের চরম প্রাপ্তি তার। ‘রান্না ভালো হয়েছে, বাবু?’ ভীম জিজ্ঞেস করল।

 ‘দারুণ!’

 ‘নুন ঠিক আছে তো?’

 ‘একদম।’

 ‘ঝাল হয়েছে?’

 ‘ঠিকঠাক।’ নিখিলেশ মুখ তুলে বলল, ‘এত ভালো খাবার জীবনে কখনো জোটেনি।’ তারপর স্বগতোক্তি করল, ‘দু-মুঠো রাঁধা ভাতের জন্য এত লড়াই, এত তিতিক্ষা… কী অদ্ভুত এই জীবন!’

 ভীম ডোম একদৃষ্টে চেয়ে আছে নিখিলেশের মুখের দিকে। তৃপ্তি কি তারও কিছু কম হচ্ছে আজ? কাউকে খাইয়ে এত সুখ, এত তৃপ্তি সে তো সারাজীবনে পায়নি কখনো। আজ তার পরম প্রাপ্তির দিন। দুজনে দুজনের মুখোমুখি। কেউ কোনো কথা বলছে না। বাইরে অনিবার বৃষ্টিতে ধুয়ে যাচ্ছে রাজারহাটের রাস্তাঘাট, বাড়িঘর। জগতে যেন কেউ নেই, কিছু নেই, শুধু দুজন দুজনের তৃপ্তির দিকে আকুল চেয়ে আছে।

তিন

তীব্র বেগে গাড়ি চালাচ্ছে স্বাগত। এত জোরে গাড়ি সে সাধারণত চালায় না। কিন্তু মনের মধ্যে ঝড় বয়ে গেলে, গাড়ি কি আর আস্তে আস্তে চালানো যায়? সেই ভোরবেলা দমদম বিমানবন্দরে নামতে নামতেই ফোনটা এসেছিল, ‘হ্যালো স্বাগত, তোর চাবি রিটার্ন করে দিয়েছি। রাত্রিটা দারুণ কাটল রে! কোনোদিন ভুলব না। আর তুই যে লোকটাকে পাঠিয়েছিলি, ওই যে ভীম ডোম—লোকটার তুলনা নেই। খুব ভালো মানুষ। আমি তো ওর প্রেমে পড়ে গিয়েছি! কী রান্না মাইরি! জাস্ট ফাটাফাটি। লাইফের শেষ দিন অবধি মনে থাকবে। এনিওয়ে, এখন রাখছি, পরে কথা হবে। বাই, টা টা…’

 ‘শোন নিখিলেশ… হ্যালো… হ্যালো…’ ততক্ষণে ফোন কেটে দিয়েছে নিখিলেশ। তারপর থেকে অন্তত পঞ্চাশবার স্বাগত ফোন করেছে তাকে, প্রতিবারই শুনেছে, ‘দিস টেলিফোন নাম্বার ডাজ নট এগজিস্ট।’ ফোনটা পাওয়ার পর কয়েক মুহূর্ত কান-মাথা ভোঁ ভোঁ করছিল স্বাগতর। বিমানবন্দরের বাইরেই কয়েক মিনিটের জন্য চুপ করে বসে পড়েছিল সে। তারপর বেশ কয়েকবার রিং ব্যাক করেও যখন পেল না নিখিলেশকে, তখনই সিদ্ধান্ত নিল মেদিনীপুর যাওয়ার। এ ছাড়া তার কোনো উপায় ছিল না। কারণ ওই প্রচণ্ড ঝড়টা বুকের মধ্যে অনির্দিষ্টকাল লালন করা স্বাগতর পক্ষে সম্ভব ছিল না, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঝড়টা থামাতে হত। আর সেটা করতে গেলে নিখিলেশের মুখোমুখি হওয়া ছাড়া দ্বিতীয় রাস্তা ছিল না। কারণ নিখিলেশ যে মানুষটার কথা বলেছে কিছুক্ষণ আগে, সেই ভীম ডোম কয়েক মাস আগেই কলকাতার ভয়াবহ উড়ালপুল দুর্ঘটনায় চিরতরে পৃথিবী ছেড়ে চলে গিয়েছে। ভীম গরিব মানুষ। আজন্ম অকৃতদার এই মানুষটার শেষকৃত্য স্বাগত নিজে দাঁড়িয়ে থেকে করেছে। সেই ভীমকে নাকি স্বাগত পাঠিয়েছে নিখিলেশের কাছে? এর মানে কী? কী বলতে চাইছে নিখিলেশ? কী করেই বা সে জানল, ভীম ফাটাফাটি রান্না করে?

 যতক্ষণ পর্যন্ত না এই রহস্যের সমাধান হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তার মনে শান্তি নেই। তাই বিমানবন্দর থেকে বাড়ি পৌঁছেই সোজা গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছে মেচেদার উদ্দেশে। তাকে জানতেই হবে, কেন নিখিলেশ ওই কথাগুলো বলল! কী তার উদ্দেশ্য! এত অল্প সময়ে কলকাতা থেকে টানা ৫৭ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়া মুখের কথা নয়। কিন্তু কোনোদিকে কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই তার। কোলাঘাট বাজারে তার শৈশব কাটলেও, মেচেদার ঠিক কোন জায়গায় নিখিলেশ বাড়ি বানিয়েছে, স্বাগতর জানা নেই। নিখিলেশদের আগের বাড়িটা সে চেনে, গিয়েছেও বেশ কয়েকবার, কিন্তু সে বাড়ি তো বিক্রি হয়ে গিয়েছে কবে! স্বাগত জানালার কাচ খুলে দু-একজনকে জিজ্ঞেস করল। কিন্তু কেউ সঠিক দিশা দেখাতে পারল না। তবে কি সে নিখিলেশদের কোলাঘাট বাজারের পুরোনো বাড়িটায় একবার যাবে? ও বাড়িটা যারা কিনেছে, তারা নিশ্চয়ই বলে দিতে পারবে, মেচেদার ঠিক কোন জায়গায় নতুন বাড়ি করেছে নিখিলেশ। এইসব ভাবতে ভাবতেই রাস্তার বাঁদিক দিয়ে হেঁটে-চলা এক বৃদ্ধকে টার্গেট করল স্বাগত, ‘কাকু, নিখিলেশ রায়চৌধুরীর বাড়িটা কোথায় বলতে পারবেন?’

 ‘আপনি তো ঠিক জায়গাতেই এসেছেন। গাড়িটা ছেড়ে বাঁদিকের গলিতে ঢুকে যান। পুরোটা হেঁটে ডানদিকে ঢুকেই বাঁ হাতের তিন নাম্বার বাড়িটা।’ ভদ্রলোক এত সুন্দর পথনির্দেশ করেছেন, যেকোনো অন্ধ মানুষও পৌঁছোতে পারবে এবার। অবশ্য স্বাগত পূর্ব মেদিনীপুরেরই ছেলে, কোলাঘাটে জন্ম, পড়েছে কোলা ইউনিয়ন হাই স্কুলে, তাই এসব এলাকার নাড়িনক্ষত্র তার জানা। না হলে সে কি এত সহজে ঠিক জায়গায় আসতে পারত? এইসব ভাবতে ভাবতে বৃদ্ধকে ধন্যবাদ জানিয়ে, স্বাগত গাড়িটা পার্ক করল একটা ফাঁকা জায়গায়। তারপর হনহন করে হাঁটা লাগাল।

বাড়ির দরজায় পৌঁছে গিয়েছে সে। বুকটা ঢিপঢিপ করছে। অসম্ভব উত্তেজনা মনের মধ্যে। নিখিলেশ যদি ইয়ারকিও মেরে থাকে তার সঙ্গে, সে জানল কী করে, ভীম ডোম খুব ভালো মানুষ? ফাটাফাটি রান্না করে? ইন ফ্যাক্ট, তার পক্ষে তো ভীম ডোমের নাম জানাই সম্ভব নয়। এমনকী, ভীম ডোমের নাম বা তার সম্পর্কে ডিটেল ইনফর্মেশন দিতে পারে নিখিলেশকে এমন কাউকেই চেনে না স্বাগত। বাবলু? বাবলু জানে যে একজন লোক ফ্ল্যাটের দেখাশোনা করত তার আগে। কিন্তু ওইটুকুই! কী নাম তার, সে রান্না করতে পারত কি না—এসব কিছুই তার জানার কথা নয়। সে মারা গিয়েছে তাই বাবলু এখন দায়িত্বপ্রাপ্ত, এটুকুই জানে সে। তাহলে কাল ওই শেষ-বিকেলে ঢুকে আজ ভোরের মধ্যে এত কিছু জানল কী করে নিখিলেশ? তাও কাল বিকেল থেকেই সারারাত বৃষ্টি হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। বৃষ্টি বলে বৃষ্টি! এত প্রবল বৃষ্টি গত পাঁচ বছরে দেখেনি বাংলার মানুষ। যদিও এখন আকাশ পরিষ্কার, কিন্তু স্বাগতর গাড়ির চাকায় কাদা, রাস্তায় জল, নিখিলেশদের বাড়ির গলিতে পুকুর! স্বাগতর প্যান্ট হাঁটু অবধি গোটানো, জুতো হাতে ধরা। বাড়ির দরজায় টোকা মারতেই তার খেয়াল হল, এত্ত বড়ো একটা তালা ঝুলছে গেটে। ও মা, বাড়ি তো বন্ধ! তবে কি এখনও ফেরেনি সে কলকাতা থেকে? বাড়ির লোকজনই বা কোথায় গেল? স্বাগত এখন কী করবে? বুদ্ধি করে সে পাশের বাড়িতে টোকা মারল। নিখিলেশদের বাড়িটা খুব ছোট্ট। খুবই সামান্য জায়গার উপর তৈরি। পাশের বাড়িটার সঙ্গে এই বাড়িটার মাঝের স্পেস খুবই কম। পৌরসভা সাধারণত এত কম স্পেস রাখার পারমিশন দেয় না। একমাত্র দুটো বাড়ির মধ্যে ঘনিষ্ঠ বোঝাপড়া থাকলে, তবেই এটা সম্ভব। এ থেকেই স্বাগতর ধারণা হল, ওরা নিখিলেশের সম্পর্কে নিশ্চয়ই সঠিক তথ্য পরিবেশন করবে—কোথায় আছে, কখন ফিরবে, আর কোনো ফোন নম্বর আছে কি না তার, ওই ফোনটাই বা কেন বিগড়ে গিয়েছে, বাড়ির লোক কোথায়… এই সব।

 স্বাগত কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে ফের টোকা মারল দরজায়। এবার এক ভদ্রমহিলা সামনে এসে দাঁড়াল—চুড়িদার পরা, ছোটো চুল, বয়স সাতাশ-আটাশ, একটু থপথপে, রং শ্যামলা, ‘কাকে চাই?’

 ‘ওই বাড়িতে একটু দরকার ছিল। কিন্তু লকড…’ পাশের বাড়ির দিকে আঙুল দেখিয়ে স্বাগত আমতা আমতা করে বলল।

 ‘বউদি তো থাকেন না এখানে।’

 ‘আমি কলকাতা থেকে আসছি।’

 ‘আপনি বউদির কে হন?’

 ‘কেউ না, আমি নিখিলেশের খোঁজে এসেছি।’

 ‘মানে?’ প্রায় ভূত দেখার মতো চমকে উঠল ভদ্রমহিলা, ‘কে আপনি? কী নাম?’

 ‘আমি নিখিলেশের বন্ধু।’

 ‘কীরকম বন্ধু? আপনি জানেন না পোস্তার বিবেকানন্দ উড়ালপুল দুর্ঘটনায় নিখিলেশ মারা গিয়েছে?’

 ‘হোয়াট?’ স্বাগত পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে গেল, মুখ দিয়ে আর কথা সরছে না তার, চোখের পাতা পড়ছে না, ঠোঁট দুটোও কিঞ্চিৎ ফাঁক হয়ে আছে। ভদ্রমহিলা ফের জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার নাম কী?’

কথা বলার ক্ষমতা নেই স্বাগতর। চোখে অন্ধকার দেখছে সে, জিভ শুকিয়ে কাঠ। পিঠ দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে যাচ্ছে যেন! অতি কষ্টে কোনোরকমে উচ্চারণ করল, ‘স্বাগত মিত্র। একটু জল দেবেন?’

 ‘কী বললেন? স্বাগত মিত্র? কোলা ইউনিয়ন হাই স্কুল?’

 ‘হুম,’ স্বাগত ঘাড় নাড়ল।

 ‘আপনি ভিতরে আসুন, দাদা। আমি ঝুমকি। ওর মাসতুতো বোন। সেদিন খাওয়ার থালা ফেলে আমার দাদা উঠে গিয়েছিল। খাবার দিয়েই বউদি শুরু করত অপমান করতে। যা নয় তা-ই বলত। অথচ ডিভোর্স দিত না। খুব খারাপ মেয়ে! ও-ই আমার দাদাটাকে মারল। পোস্তায় আমার দিদির বাড়ি। রাগ করে ওখানেই যাচ্ছিল।’ ভদ্রমহিলা ঝরঝর করে কাঁদছে, ‘আসলে মৃত্যু ওকে টানছিল। না হলে ও তো দিদির কাছে যাবে বলে বেরোয়নি। দিদি-জামাইবাবু যখন লাশ নিয়ে এল এখানে, একটা কথাই বার বার বলছিল দিদি, দাদা নাকি ওকে ফোন করে বলেছিল, ”শোন রুমকি, আমি কলকাতায় এসেছি। আজ রাতটা তোর ওখানেই থাকব রে! জানি তোর স্পেস প্রবলেম, ঘর কম। কিন্তু কী করব বল, স্বাগতর ফ্ল্যাটে থাকব ভেবেই এসেছিলাম, কিন্তু কিছুতেই ওকে ফোনে পাচ্ছি না…”’

 ঝুমকির গলা বুজে এসেছে এবার। ওরা দুজনে বাড়ির ভিতরে এসেছে। স্বাগত জল খাচ্ছে। প্রায় অবশ হয়ে-যাওয়া শরীরটা কোনোরকমে সোফায় ঠেলে দিয়ে স্বাগত ভাবছে, এই ব্রহ্মাণ্ডে কিছু কিছু জিনিস আছে, সত্যিই তার ব্যাখ্যা হয় না কোনো।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *