বর্ষা ঢুকল… – রজতশুভ্র মজুমদার

বর্ষা ঢুকল…

ঝাড়খণ্ড-বিহারের অনেকটা অংশ বর্ষার বৃত্তে চলে এলেও, এই মধ্য জুনেও বর্ষার দেখা নেই দক্ষিণবঙ্গে। মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় দানা বাঁধার ইঙ্গিত ছিল। আবহবিদরা বলেন, মৌসুমি বায়ুর কেরল হয়ে মূল ভারতীয় ভূখণ্ডে ঢোকার জন্য বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরের মধ্যে উষ্ণতা, বায়ুচাপ প্রভৃতি উপাদানের ভারসাম্য প্রয়োজন হয়; কিন্তু বঙ্গোপসাগরের ঘূর্ণিঝড় সেই ভারসাম্য নষ্ট করেছে। ফলে কেরলেই বর্ষা ঢুকেছে বেশ অনেকটা দেরিতে! বেলা যত বাড়ছে, গরমের তেজ ততই বাড়ছে। তীব্র গরমটাকে এড়ানোর জন্য নবকুমার সন্ধের মুখে ঢুকেছে এখানে। বেলা বারোটায় ঢোকার কথা ছিল, সেইমতো লাঞ্চ রেডি করে রেখেছিল জগন্নাথ ঘড়াই। এখন একটা ছেলেকে পাঠিয়ে দিয়েছে নবকুমারের ঘরে। সে হাসিমুখে জিজ্ঞেস করল, ‘স্যার কিছু খাবেন?’

‘কী খাওয়া যায় বল তো? খিদেয় তো ছুঁচোয় ডন মারছে পেটে।’

‘আপনি তো স্যার অনেক দেরি করে এসেছেন।’ ছেলেটা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল, ‘আপনার জন্য লাঞ্চের ব্যবস্থা করে রেখেছিলাম আমরা।’

‘তা-ই? কী ছিল লাঞ্চে? ভাত?’ নবকুমার মুখ তুলল।

‘হ্যাঁ স্যার, ভাত। খুব গরম কিনা তাই হালকা মেনু ছিল। তবে ইস্পেশাল।’

‘কী কী ছিল বল তো?’ নবকুমার ভোজনরসিক, খিদের মুখে খাবারের নাম শুনলেও কিছুটা তৃপ্তি।

‘গরম ভাত, গিমে শাক, পাতলা ডাল, করলা-কুমড়োর ছেঁচকি আর কসুরি মেথি দিয়ে চিকেন।’

‘আরিব্বাস! দুর্দান্ত মেনু তো!’ নবকুমারের জিভে জল।

‘আপনার জন্যই স্যার এই মেনু করিয়েছিলেন বাবু…’ দাঁতগুলো সব বেরিয়ে গেল ছেলেটার।

‘তা-ই বুঝি?’ নবকুমার মৃদু হাসল।

‘চা খাবেন স্যার?’

‘সঙ্গে টোস্ট আনিস। খিদে পেয়েছে বললাম যে! চা খেয়ে কি পেট ভরবে?’ হালকা ধমকের সুরে কথাগুলো বলে নিজেকে সামলে নিল নবকুমার। তারপর বিড়বিড় করে বলল, ‘অবশ্য মাথাটা ছাড়বে।’ ছেলেটা বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম করতেই নবকুমার বলল, ‘শোন…’

‘হ্যাঁ স্যার।’

‘ডিনারে কী মেনু আছে, জানিস?’

‘না স্যার, তা তো জানি না।’ ছেলেটা মাথা চুলকে বলল, ‘বাবুকে জিজ্ঞেস করে আসব?’

‘না থাক।’

‘ক-টা নাগাদ ডিনার হয়, বলতে পারিস?’

‘আপনার একটু তাড়াতাড়ি চাই, বুঝতে পেরেছি।’

‘সেই চেষ্টাই করিস।’

‘আজ্ঞে স্যার। এখন যাই?’

‘হুম।’ নবকুমার ঘাড় নাড়ল। দরজাটা এইবার বন্ধ করবে নবকুমার, এমন সময়ে ছেলেটা আবার হাজির, ‘স্যার, একটা কথা জিজ্ঞেস করা হয়নি!’

‘বলো।’ রাগতস্বরে বলল নবকুমার।

‘ডিনারে ভাত খাবেন না রুটি?’

‘ডিনারের আগে তোকে একটা খাবার আনতে বলেছি তো, না বলিনি?’

‘হ্যাঁ স্যার, চা-টোস্ট!’

ছেলেটা সারা ঘরে চোখ চালাচ্ছে, নবকুমার বুঝতে পারল। ওইটুকু ছেলে তবু বেশ শার্প! নিশ্চয় নজরদারি করছে তার উপর। নবকুমার মনে মনে হাসল। তারপর চোখে চোখ রেখে গম্ভীরস্বরে বলল, ‘তাহলে?’ ছেলেটা বুঝল, নবকুমারের দৃষ্টিতে তিরস্কারের ইঙ্গিত স্পষ্ট। সে আর কথা না বাড়িয়ে, লজ্জা-লজ্জা মুখ করে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।

নবকুমার এইবার বাথরুমে যাবে। হঠাৎই ছেলেটার তৃতীয়বার প্রবেশ, ‘স্যার…’

‘আবার?’ নবকুমার লম্বা করে উচ্চারণ করল।

‘হয়েছে কী স্যার, আপনি ডিম-টোস্ট খাবেন, না বাটার—সেটা জানা হয়নি।’ আমতা আমতা করে বলল ছেলেটা।

‘এটা না জানলে কি একান্তই চলত না?’ শান্ত অথচ কঠিনস্বরে বলল নবকুমার।

‘আসলে স্যার, কেউ বাটার খেতে চায় না, কারো আবার ডিমে অ্যালার্জি।’ ছেলেটার চোখ ঘুরছে।

‘আমার যা খিদে পেয়েছে না, এখন তোকে পেলেও খেয়ে নেব।’ নবকুমার কটমট করে তাকাল। দেখল, ভয় পাওয়া তো দূরের কথা, ছেলেটার ঠোঁটে উথলে-ওঠা দুধের মতো হাসি। নিজেকে সংযত করে নবকুমারও হেসে উঠল, ‘যা, যেটা খুশি নিয়ে আয়।’

‘এক্ষুনি স্যার।’ ছেলেটা ছুটে বেরিয়ে গেল।

‘আর আসবি না তো?’ গলা তুলে বলল নবকুমার।

‘হ্যাঁ স্যার, আসব, তবে চা-টোস্ট নিয়ে।’ যেতে যেতেই উচ্চারণ করল ছেলেটা।

নবকুমার একটা সিগারেট বের করল। সেটা ঠোঁটে গুঁজে পকেট থেকে লাইটারটা বের করতে করতেই এগোল বাথরুমের দিকে। ঠিক তখনই বেজে উঠল ল্যান্ডফোনটা। নবকুমার ফোন ধরতেই, ও প্রান্ত থেকে মিহি গলার আওয়াজ, ‘আমি ম্যানেজারদা বলছি।’

‘ওহো আচ্ছা, বলুন জগন্নাথদা।’

‘একটা কথা ছিল আপনার সঙ্গে।’ খুব বিনয়ের সঙ্গে বলল জগন্নাথ।

‘হ্যাঁ বলুন!’ নবকুমারের বিশ্বাসী গলা।

‘আপনি যে টাকাগুলো দিলেন…’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ, কী হয়েছে?’

‘না মানে, সব নোটেই সামান্য সামান্য দাগ আছে…’

‘হা হা হা, আপনার নকল টাকা মনে হচ্ছে নাকি?’ খুব জোরে হাসল নবকুমার।

‘আরে না না, নকল কেন হবে?’ জগন্নাথও হাসছে, ‘ওই দাগগুলো আপনি দেখেছেন কি?’

‘আসলে কী বলুন তো, আমরা তো প্রেসের লোক, চব্বিশ ঘণ্টা প্রেসেই কাজ। একটা হালকা নীল কালি… তাও সব নোটে হবে না দেখুন! ভীষণ অস্পষ্ট… ও নিয়ে চিন্তা করবেন না… ওরকম কত হয়! কেউ তো কিছুই বলেনি কোনোদিন, এই আপনিই প্রথম বললেন।’

‘না না, সব ক-টাতেই দাগ আছে। তবে খুবই আবছা এটা সত্যি,’ জগন্নাথ সত্যিই খুব খুঁতখুঁতে, ‘দুটো নোটে দাগ একটু বেশি আছে… আপনি ওই দুটো অন্তত…’

‘আচ্ছা আচ্ছা, ঠিক আছে, ও দুটো না-হয় আমি এক্সচেঞ্জ করে দেব। ডোন্ট মাইন্ড। তবে খুব বেশি টাকা তো নেই কাছে, তাই দুটোর বেশি পারব না।’

‘ঠিক আছে স্যার, আপনি রেস্ট করুন।’ জগন্নাথ কিছুটা আশ্বস্ত হল।

‘আপনি পরিষেবাটা ঠিকঠাক দিন, আপনার কোনো চিন্তা নেই।’

‘পরিষেবা আপনি ”দ্য বেস্ট”ই পাবেন স্যার। ও নিয়ে কোনো কথা হবে না।’

‘ব্যাস। থ্যাঙ্ক ইউ।’

‘আচ্ছা স্যার, আপনি ডিনারে রুটি খান না ভাত?’

‘দুটোই চলে।’

‘বেশ বেশ। আমি তাড়াতাড়ি পাঠিয়ে দেব, নন্দ আমায় বলেছে।’

‘ইট’স ওকে। থ্যাঙ্ক ইউ।’

‘ওয়েলকাম।’ খটাস করে ফোন রেখে দিল জগন্নাথ।

দুই

জগন্নাথ টাকাগুলো ক্যাশ বাক্স থেকে বের করে ফের একদফা নিরীক্ষা করতে শুরু করল, আর মনে মনে সান্ত্বনা লাভ করল এই ভেবে যে, দাগগুলো নিতান্তই অস্পষ্ট ও ক্ষুদ্র। যখন টাকাগুলো সে নিয়েছিল হাতে ধরে, তখন তো বুঝতেই পারেনি কিছু, এতটাই উপেক্ষণীয় সে দাগ। তা ছাড়া যে দুটো নোটে দাগ অপেক্ষাকৃত স্পষ্ট ও বেশি, সে দুটো তো স্যার পালটেই দেবেন বলেছেন। জগন্নাথ মোবাইলটা বের করে পঞ্চানন দাশের নম্বরটা টাইপ করল। অনেকক্ষণ রিং হবার পর ফোনটা ধরল বাপ্পা, ‘কাকু, বাবা একটু ব্যস্ত আছে, কিছু বলতে হবে?’

‘না, ঠিক আছে।’ জগন্নাথ জানে, পঞ্চানন খুব ব্যস্ত আজ। তবু সকাল থেকে যতবার ফোন করেছে সে, ততবারই পঞ্চানন ফোন ধরেছে, প্রয়োজনীয় নির্দেশও দিয়েছে। ইন ফ্যাক্ট, পঞ্চাননের নির্দেশ ছাড়া জগন্নাথ কোনো কাজই করে না।

‘একটু পরে বাবা তোমায় রিং ব্যাক করে নেবে।’ ঢোঁক গিলে বলল বাপ্পা।

তার কথায় জগন্নাথ খুশি হল, ‘ঠিক আছে। তা-ই হবে। ওদিকে সব ঠিক তো?’

‘সব ঠিক আছে, কাকু। অতিথি-অভ্যাগতরা এক-এক করে আসতে শুরু করেছেন। বউ সাজানো হচ্ছে একটা ঘরে। আটটা নাগাদ খাওয়াদাওয়া শুরু হয়ে যাবে।’

‘বাঃ বাঃ, বেশ, আমি ওই দশটা নাগাদ যাব।’

‘সে তুমি বাবার সঙ্গে কথা বলে নিয়ো। বাবা যেমন বলবে…’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক আছে।’

জগন্নাথ ফোনটা রেখে দিতে যাচ্ছিল এমন সময়ে বাপ্পা বলে উঠল, ‘ওই তো বাবা! দাঁড়াও দাঁড়াও। এক মিনিট। এই নাও কাকু, বাবাকে দিচ্ছি।’ বাপ্পা ফোনটা বাবার হাতে দিয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘জগন্নাথকাকু।’

পঞ্চানন ফোনটা কানে লাগিয়ে রাশভারী গলায় উচ্চারণ করল, ‘জগন্নাথ!’

‘হ্যাঁ দাদা।’

‘টাকাগুলোর ব্যবস্থা হল?’

‘চিরন্তন স্যার ওই দুটো নোট পালটে দেবেন বলেছেন।’

‘আর বাকিগুলো?’

‘চিন্তা করবেন না, বাকিগুলো প্রায় বোঝাই যায় না। উনি প্রেসের লোক তো, তাই হয়তো কালি-হাতে টাকা ধরেছেন… অন্য কিছু না,’ জগন্নাথ সান্ত্বনা দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল, ‘আজকের দিনে আপনি চাপ নেবেন না একদম, সামান্য একটা ব্যাপার!’

 ‘সবক-টাই পালটে দিতে বললে না কেন?’

 ‘বলেছিলাম। ওঁর কাছে অত টাকা নেই। তা ছাড়া…’

 ‘কী তা ছাড়া?’ ধমকের সুর পঞ্চাননের গলায়।

 ‘যে ভদ্রলোকের নাম করে চিরন্তন স্যার এখানে এসেছেন, তাতে চিন্তার কিছু নেই দাদা। আপনি অযথা টেনশন করছেন। চিরন্তন স্যার বলেছেন, প্রবুদ্ধ স্যার ওঁকে পাঠিয়েছেন। তারপরে আবার চিন্তা কীসের?’

‘প্রবুদ্ধ স্যার মানে প্রবুদ্ধ দাশগুপ্ত?’ পঞ্চানন চমকে উঠল।

‘হ্যাঁ হ্যাঁ। উনি প্রথম এসেছিলেন আজ থেকে প্রায়…’

‘বাপ্পার ফুলশয্যার রাতে।’ জগন্নাথের মুখের কথা টেনে নিয়ে বলল পঞ্চানন।

‘ঠিক। তারপর তো বহুবার এসেছেন উনি। বড়ো অমায়িক মানুষ।’

‘তা সেটা তো আমায় আগে বলবে।’ পঞ্চানন নিশ্চিন্ত হল। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে পঞ্চানন জিজ্ঞেস করল, ‘প্রবুদ্ধ দাশগুপ্ত এখন কোথায় থাকেন? অনেকদিন আসেননি তো!’

 ‘তা প্রায় বছর তিনেক হবে।’ জগন্নাথ গলা নামিয়ে বলল, ‘আমি চিরন্তন স্যারের কাছে ওঁর খবর নিয়ে নেব।’

‘চিরন্তন স্যারের আপ্যায়নে যেন কোনো ত্রুটি না হয়, দেখো!’

‘আপনি চিন্তা করবেন না দাদা, আমি আছি তো।’ জগন্নাথ আশ্বস্ত করল।

ক্রমশ ভিড় বাড়ছে পঞ্চানন দাশের বাড়িতে। আসর গমগম করছে। কাপাসএড়া সংলগ্ন উত্তর কাশিমনগর গ্রামের বেশিরভাগ লোকই গরিব খেটে-খাওয়া মানুষ, তবু আজ উৎসবের দিনে উপহার হাতে তাদের হাজিরায় খামতি নেই একটুকু। পঞ্চানন দাশ জানে, তাকে সহজে কেউ উপেক্ষা করতে পারে না। পঞ্চান্ন বছরের যুবক পঞ্চানন সদর্পে ঘোরাঘুরি করছে সারা বাড়ি, তদারকি করছে সমস্ত কিছুর। অতিথিদের আপ্যায়নে যাতে কোনোরকম ত্রুটি না হয়, সেদিকে সদাসতর্ক সে। আতিথেয়তায় তাকে যোগ্য সহযোগিতা করার জন্য তৈরি গানের সঙ্গে সংগতিযুক্ত বাজনার মতোই মানানসই ছ-বছরের ছোটো পূর্ণিমা দাশ। চওড়া লালপেড়ে শাড়ি, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, কপালে ভারী সিঁদুরের ফোঁটায় বেশ অন্যরকম লাগছে গিন্নিকে। তারই বয়সি এক ভদ্রমহিলা এগিয়ে এল, ‘দিদি, বাপ্পার বউভাত তো হোটেলে হয়েছিল, টুম্পার বেলায় এখানে কেন?’

‘ওর বাবা চেয়েছিল, নিশিযাপনেই হোক। আমিই বাড়িতে করতে চাইলাম।’ একটু ভেবে পূর্ণিমা বলল, ‘অবশ্য ফুলশয্যাটা ওখানেই হবে।’

‘তা ভালো। খাওয়াদাওয়া সেরে বর-কনেকে নিয়ে যাওয়া হবে তো?’

‘হ্যাঁ। ওখানে ঘর সাজানো আছে।’

‘বউ দেখলাম। কী সুন্দর মুখটা! কী নাম গো বউমার?’

‘ঝিমলি, ঝিমলি নাম ওর।’

‘বাঃ, ভারী মিষ্টি নাম। খুব হালকা বয়স। একেবারে ছেলেমানুষ।’

‘এই তো সবে মাধ্যমিক পাশ করল। ষোলো বছর বয়স।’

‘বড়োবউমাও ওইটুকুই ছিল যখন আসে…’ ভদ্রমহিলা বলে ফেলেই কিঞ্চিৎ সংকোচ বোধ করল যেন।

‘ওর কথা আর বোলো না দিদি। সর্বনাশা মেয়ে। অমন বউ যেন কোনো পুরুষমানুষের না হয়!’ পূর্ণিমার চোখে-মুখে ক্রোধের কালি।

‘সে এখন বাপের বাড়িতে থাকে তো!’ আরেকজন বলল।

‘তা নয়তো কি এখানে থাকবে? মিথ্যে মামলা করে আমাদের সবাইকে ফাঁসিয়েছে। ঈশ্বর ওকে যোগ্য শাস্তি দেবেন!’

‘বাপ্পার বিয়ে দেবে না?’ আরেকজন খোঁচা মারল।

‘কেন দেব না? নিশ্চয়ই দেব। তোমরা সক্কলে শুনে রাখো, সোমা আমাদের জেল খাটিয়েছে। এর যোগ্য জবাব আমরা দেব।’ পূর্ণিমা বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়েছে। তাকে ঘিরে গোল হয়ে দাঁড়িয়েছে পাড়া-প্রতিবেশীরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে ভেবে, পঞ্চানন অকুস্থলে হাজির যথাসময়ে। এতক্ষণ যেসব মহিলা পূর্ণিমাকে উত্তেজিত করে মজা পাচ্ছিল, তারা সবাই মুখে কুলুপ এঁটে ফেলেছে। পঞ্চানন বেশ শান্তভাবে বলল, ‘আজকের দিনে পুরোনো কথা তুলে কী লাভ? উৎসবের দিনে আনন্দ করুন-না! ওই দেখুন, ওখানে ফুচকার স্টল বসেছে।’ গোয়ালবাড়ির দিকে আঙুল দেখাল পঞ্চানন।

 খারাপ স্মৃতি পছন্দ করে না পঞ্চানন। ভুলে থাকাই সে শ্রেয় মনে করে। কিন্তু ভুলে থাকব বললেই কি ভুলে থাকা যায়? আজ থেকে পাক্কা চার বছর আগে বাড়ি ছেড়েছে সোমা। তখন তার বয়স উনিশ। ঠিক ঝিমলির মতোই ষোলো বছর বয়সে এ বাড়ির বড়ো বউ হয়ে এসেছিল। নিশিযাপনে লোক খাওয়ানো হয়েছিল। তারপর ওখানেই ফুলশয্যা। সোমা লক্ষ্মীমন্ত ছিল, এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। যেদিন এ বাড়িতে পা রাখল, সেদিন থেকেই লক্ষ্মীর ভাঁড়ার উপচে পড়তে লাগল পঞ্চাননের। বেশ কাটছিল দিনগুলো। তারপর কেন যে মাথার পোকা নড়ে উঠল মেয়েটার! এখন থাক কেমন থাকিস! বড়োলোক শ্বশুর ছেড়ে গরিব বাবার গলার কাঁটা হয়ে থাক! দেখ কতদিন ভালো লাগে! ওই বাবাও একদিন দূর দূর করে তাড়িয়ে দেবে ঘর থেকে। এই আমি বলে রাখলুম! আর তখনই তোর উপযুক্ত শাস্তি হবে! সুখে খেতে ভূতে কিলোল! পঞ্চানন সহজে রাগে না। আবার রেগে গেলে কোনো জ্ঞান থাকে না। আজ আনন্দের দিনে মনের মধ্যে ক্রোধ একদম ঠিক না। সে পাস্ট চ্যাপটার থেকে অতি সন্তর্পণে বের করে আনল নিজেকে। ওই দূরে গোলার মাথায় গোল হয়ে চাঁদ উঠেছে। একটু নির্জনে দাঁড়িয়ে-থাকা বাপ্পার পিঠে হাত রাখল পঞ্চানন, ‘তোর এখন সবে ত্রিশ। সারাজীবন পড়ে আছে, বাবা। আজ আনন্দের দিনে মন খারাপ করিস না। ঝুটঝামেলাগুলো সব মিটে যাক, আমি তোর আবার বিয়ে দেব। চিন্তা করিস না।’

‘আমি চিন্তা করিনি, বাবা। তুমি থাকতে আমার আবার চিন্তা কী!’

একটু দূরে টুম্পা ভীষণ ব্যস্ত। হালকা ঘিয়ে রঙের একটা তসরের পাঞ্জাবিতে দারুণ মানিয়েছে তাকে। তবে রূপে ঝিমলির পাশে বেমানান না লাগলেও, বিদ্যেয় বউয়ের পাশে বেশ অনেকটা খাটো সে। পঞ্চম শ্রেণির পর আর পড়াশোনায় এগোতে পারেনি। মা-বাবা-দাদার আদরে বাঁদর টুম্পা পড়াশোনার প্রয়োজনীয়তাটাই কখনো উপলব্ধি করেনি সেভাবে। পঞ্চানন নিজেও কি করেছে কখনো? বাপ্পা বা টুম্পা কাউকেই তো পড়ায়নি সে। পঞ্চানন জানে, হলদিয়া-মেচেদা ৪১ নম্বর জাতীয় সড়কের উপর দু-দুটো হোটেল, নিশিযাপন আর আরব্য রজনি—যদিও আরব্য রজনির বাজার এখন ডাউন, হোটেলটা বন্ধ রাখা আছে আপাতত—বাপ্পা আর টুম্পাকে দিয়ে গেলে, পায়ের উপর পা তুলে দু-তিন প্রজন্ম হেসেখেলে কাটিয়ে দিতে পারবে! পড়ালেখা করে হবেটা কী ? কেউ কোনোকালে বড়োলোক হয়েছে পড়াশোনা করে? পঞ্চানন নিজেও তো ক-অক্ষর গোমাংস, পেটে লাথি মারলেও বিদ্যে বেরোবে না; কিন্তু টাকার জাহাজ বললেও বোধহয় কম বলা হয় তাকে। আর অর্থ যার, প্রতিপত্তি তার! এ কথা কে না জানে? পঞ্চানন ঘড়ির দিকে তাকাল। আজ অনেক দায়িত্ব তার। সবকিছু সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে হবে। কোথাও এতটুকু ত্রুটি হয়ে গেলেই আর কাজ হাসিল হবে না।

তিন

সময় যত গড়াচ্ছে, উত্তেজনার পারদ তত চড়ছে নবকুমারের। একটু আগে চা-টোস্ট দিতে এসেও ছেলেটা বেশ সন্দেহের চোখে তাকাচ্ছিল। জগন্নাথের স্পাইটা কেন সন্দেহ করছে তাকে? নাকি নবকুমারেরই মনের ভুল? অবশ্য পরশু রাতে যখন নিশিযাপনের ল্যান্ড নম্বরে প্রথম ফোন করেছিল নবকুমার, তখনই তো জগন্নাথের সন্দেহটা সে টের পেয়েছিল। প্রবুদ্ধ দাশগুপ্তর নাম করার পর গলাটা অবশ্য অনেক সরল হল। না হলে কি সে হোটেল পেত আজ? নবকুমার যখন বলেছিল, ‘দাদা, পরশু একটা রুম পাওয়া যাবে?’ জগন্নাথ কেমন যেন নিস্পৃহভাবে উত্তর দিয়েছিল, ‘না না, রুম ফাঁকা নেই।’ তারপর কৌতূহলী গলায় প্রশ্ন করেছিল, ‘ফোন নম্বর কোত্থেকে পেলেন আমাদের?’

‘প্রবুদ্ধদার কাছে, প্রবুদ্ধ দাশগুপ্ত। উনিই দিয়েছেন।’

‘ওহো, আচ্ছা আচ্ছা। কী নাম আপনার?’

‘চিরন্তন হাইত।’ নবকুমার সাবলীলভাবে বলেছিল।

‘প্রবুদ্ধ স্যার আমাদের নিয়মিত কাস্টমার ছিলেন। খুব ভালো মানুষ।’

‘প্রবুদ্ধদা বলেছেন, ওঁর নাম করলেই একটা কিছু…’

‘ব্যবস্থা হয়ে যাবে, তা-ই তো?’ জগন্নাথ হাসি-হাসি ভাব করেছিল।

ওই হাসিতেই সম্মতি লুকোনো আছে, ঢের বুঝেছিল নবকুমার। গলা ঝেড়ে নবকুমার বলেছিল, ‘টাকাপয়সা নিয়ে কোনো প্রবলেম হবে না, দাদা।’

‘বুঝেছি।’

‘থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ।’

‘দশ হাজার লাগবে পাক্কা, একরাত।’

‘জিনিস কেমন পাব?’

‘কোনো কথা হবে না। প্রবুদ্ধ স্যারকে জিজ্ঞেস করবেন। পরিষেবার ব্যাপারে আমরা কম্প্রমাইজ করি না, স্যার।’

‘আমার কিন্তু একেবারে আনকোরা চাই।’

‘ওরে বাবা! কচি? সে তো অনেক খরচ।’

‘আমি তো প্রথমেই বলেছি দাদা, টাকাপয়সা নিয়ে সমস্যা হবে না। কিন্তু আমার টাটকা মাল চাই। ষোলো-সতেরো! আমিই প্রথম খোসা ছাড়াব। বুঝতে পারছেন?’

নবকুমার গলা নামিয়ে বলেছিল, ‘পোষ-মানা পাখি আমার চাই না, আমার চাই একটু বুনো টাইপের, কিছুতেই রাজি হবে না, কামড়ে-খামচে দেবে… ছুটে পালিয়ে যেতে চাইবে… কিন্তু দরজা খুলতে পারবে না… অনেকক্ষণ ঝাপটাঝাপটি করে শেষে ক্লান্ত হয়ে পড়বে… জোরে জোরে নিশ্বাস পড়বে… ঘেমেনেয়ে একাকার হবে… আর তখনই…’

‘উফ! আপনি স্যার রসিক লোক আছেন মাইরি। তা আপনাকে তেমন ব্যবস্থাই করে দেওয়া হবে, চিন্তা করবেন না।’

‘বাঁচালেন দাদা। দশটা-পাঁচটা অফিস করে জীবন একদম একঘেয়ে! তাও আবার প্রেসের কাজ। আর পারা যায় না!’

‘পঁচিশ হাজার লাগবে।’

‘জিনিস ঠিকঠাক হবে তো?’

‘যেমনটি চেয়েছেন, ঠিক তেমনটিই পাবেন। এই জগন্নাথ ঘড়াইয়ের কথার দাম মানুষের জীবনের থেকেও বেশি, এটা জেনে রাখবেন।’

‘তাহলে ওই কথাই রইল।’

‘পরশু বেলা বারোটা থেকে বুক করে দিলাম। ঢোকার সময়ে পনেরো জমা করবেন, বেরোনোর সময়ে দশ।’

‘পাক্কা।’

‘রাখি, স্যার?’

‘একদম।’

নবকুমারের কেমন যেন ভয়-ভয় করছে। এরকম অভিজ্ঞতা তার চল্লিশ বছরের জীবনে এই প্রথম। দরজা খুলে সংলগ্ন ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল সে। নীচে হলদিয়া-মেচেদা ৪১ নম্বর জাতীয় সড়কের উপর হু হু ছুটে যাচ্ছে লরি। মাথার উপর ঢলানি চাঁদ টলটলে। দু-একটা তারা ফুটে আছে আশপাশে। ব্যালকনির জং-ধরা গ্রিল থেকে হাত সরিয়ে নবকুমার দেখল দু-হাত ভরতি ময়লা। বহু পুরোনো এই হোটেলগুলোর বাইরেটা ঝকঝকে-চকচকে হলেও, ভিতরটা একদম ম্রিয়মাণ। ঘরের দেওয়ালগুলো বিবর্ণ, মাথার উপর পাখা যেন হাজার বছরের পাপ মেখে ভারী, থপথপে হয়ে আছে। বিছানার চাদর পরিষ্কার হলেও, তোশকের ভিতরে ছারপোকার সন্ধান পেয়েছে নবকুমার। একটা কাঠের আলমারি আছে প্রাগৈতিহাসিক যুগের। নন্দ বলে গিয়েছিল, ওখানে জামাকাপড় রাখবেন, হ্যাঙার আছে ভিতরে। নবকুমার ছুঁয়েও দেখেনি সে আলমারি। জানালার কাচে একটা দীর্ঘ ফাটল আছে। ফাটলটা এঁকেবেঁকে শেষ প্রান্তে চওড়া হয়ে ফণা-তোলা সাপের রূপ নিয়েছে! নবকুমার ঘরে ঢুকল। ততক্ষণে নন্দ ডিনার নিয়ে এসেছে, ‘স্যার, তাড়াতাড়ি এনেছি কিন্তু!’

‘বকশিশ চাই?’ নবকুমার একগাল হাসল।

‘এখন না, স্যার। চলে যাওয়ার সময়ে দেবেন,’ একটা জীর্ণ টি-টেবিলে খাবারগুলো নামাতে নামাতে বলল নন্দ।

‘কী এনেছিস দেখি?’ নবকুমার খাবারের ঢাকা খুলেই বিস্ময় প্রকাশ করল, ‘আরিব্বাস! এ তো বিয়ের ভোজ!’

‘হ্যাঁ স্যার, আজ বড়োবাবুর ব্যাটার বউভাত কিনা! ওখান থেকেই এসেছে।’

‘বড়োবাবু? কে সে? জগন্নাথদা?’

‘না গো স্যার, বড়োবাবু মানে পঞ্চানন দাশ, এই হোটেলের মালিক।’ বুকটা গর্বে ফুলে উঠল নন্দর, ‘খুব ভালো মানুষ! এই আপনাকে খাইয়ে এবার আমরা খেতে যাব।’

‘তা কোথায় হচ্ছে ভোজটা?’

‘বড়োবাবুর বাড়িতেই। উত্তর কাশিমনগর গ্রাম।’ একটুক্ষণ চুপ করে থেকে নন্দ বলল, ‘এই নিশিযাপনেই ফুলশয্যা হবে। দোতলার একটা ঘর খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। দেখবেন নাকি?’

‘না না থাক, আমি দেখে কী করব?’ নন্দর উৎসাহে জল ঢেলে দিল নবকুমার।

চার

রাত প্রায় দশটা। পঞ্চানন দাশের বাড়ি ফাঁকা হয়ে গিয়েছে। শেষ ব্যাচে খেতে বসেছে নবদম্পতি। সঙ্গে সস্ত্রীক পঞ্চানন দাশ, জগন্নাথ ঘড়াই আর বাপ্পা। কবজি ডুবিয়ে খাচ্ছে ওরা, সকলেই হাসিঠাট্টায় মশগুল। পঞ্চাননের পাশেই বসেছে জগন্নাথ। ওরা ফিসফিসিয়ে কিছু আলোচনা সেরে নিচ্ছে। ‘চিরন্তন স্যারের খাবার চলে গিয়েছে অনেকক্ষণ। ঠিকঠাক পৌঁছে দিয়েছ তো ওঁর ঘরে?’ পঞ্চাননের নজর সব দিকে।

‘উনি এতক্ষণে খাওয়াদাওয়া সেরে ফেলেছেন।’ জগন্নাথ আশ্বস্ত করল।

‘টুম্পা আর বউমাকে নিয়ে তুমি চলে যাও নিশিযাপনে। আমরা একটু পরে যাচ্ছি। কিছু আচার-অনুষ্ঠান আছে ওখানে। ঠিকঠাক দেখে নিয়ো সবটা।’

‘আপনি একদম চিন্তা করবেন না।’

‘সাজানোটা কেমন হয়েছে?’

‘অপূর্ব হয়েছে, দাদা। টাটকা গোলাপ বলে কথা! সারা ঘর ম-ম করছে গন্ধে।’

‘নন্দকে বোলো ঘরের বাইরে পাহারায় থাকতে। ও যেন আবার ঘুমিয়ে না পড়ে।’ পঞ্চানন মাংসে কামড় বসাল।

‘ওকে পাখি পড়ানোর মতো করে বোঝানো আছে।’

‘তুমিও ঘুমিয়ো না আজ। কখন কী হয়, কিছু তো বলা যায় না।’

‘আপনি বড্ড বেশি চিন্তা করেন, দাদা। এই জগন্নাথভাইয়ের ওপর ভরসা রাখুন, আপনার কোনো বিপদ হবে না।’

‘তুমি আছ বলেই তো… না হলে…’ পঞ্চানন জানে, কখন কাকে কী বলতে হয়।

‘যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিন আপনার সেবা করে যাব। যার নুন খেয়েছি, তার গুণ তো গাইবই।’ তেল-খাওয়া মেশিনের মতো তাজা হয়ে উঠেছে জগন্নাথ। আড়চোখে সে তাকাল পূর্ণিমার দিকে। পূর্ণিমাও তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হল, ‘সত্যি, জগন্নাথের কোনো তুলনা হয় না।’ নতুন বউয়ের দিকে তাকিয়ে বাপ্পা বলল, ‘জগন্নাথকাকুকে দেখছ তো? বাবার পরেই ওঁর জায়গা আমাদের জীবনে।’ ঝিমলি কোনো কথা বলল না, মিষ্টি করে হাসল। সে হাসিতে যত-না মুগ্ধতা, তার চেয়ে ঢের বেশি আনুগত্য ফুটে উঠল। প্যান্ডেলের কাপড় কাঁপিয়ে শিরশিরে একটা হাওয়া এল এদিকে। তবে কি দূরে কোথাও বৃষ্টি হয়েছে? মৌসুমি বায়ু কি ঢুকছে পশ্চিমবঙ্গে? অসহ্য গ্রীষ্মের দাহ মানুষ আর নিতে পারছে না কিছুতে। বৃষ্টি চাই, বৃষ্টি। সমগ্র কাপাসএড়া এলাকার মাটি ফালা ফালা হয়ে আছে। একটুখানি বৃষ্টির জন্য হাপিত্যেশ করে আছে কাশিমনগরের মানুষ। এই শিরশিরে হাওয়া কি তবে সেই আকাঙ্ক্ষিত বর্ষারই পূর্বাভাস?

পাঁচ

নিশিযাপনের দোতলার বাঁদিকের ঘরটা সাজানো হয়েছে ফুল দিয়ে। এই ঘরটা অন্য ঘরগুলোর থেকে আয়তনে বড়ো, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, দেয়াল পলেস্তারা-খসা নয়, কাচে কোনো ফাটল নেই। ঝিমলি বসে আছে খাটের উপর, পায়ের কাছে গোলাপ। টুম্পাকে নিয়ে জগন্নাথ গিয়েছে হোটেলের ছাদে। ঝিমলিকে বলে গিয়েছে, ‘এক্ষুনি আসছি।’ ততক্ষণে নন্দ এসেছে নবকুমারকে নিয়ে। নবকুমারকে ঘরে ঢুকিয়ে দিয়েই বাইরে থেকে দরজা লক করে দিল নন্দ। অপ্রস্তুত ঝিমলি কিছু বোঝার আগেই নবকুমার হেসে উঠল ঘর ফাটিয়ে।

‘কে আপনি? এখানে কেন?’ মৌহূর্তিক কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা কাটিয়ে, ঝিমলির গলা উচ্চগ্রামে। যত অনভিজ্ঞ কিংবা অপরিণতই হোক, মেয়েদের একটা সিক্সথ সেন্স কাজ করে সব সময়ে। ঝিমলিও ব্যতিক্রম নয়। নবকুমার কোনো উত্তর দিল না, সে সমানে হেসে চলেছে। উত্তেজিত ঝিমলি ফের বলল, ‘আপনি যে-ই হোন, এটা আমার শ্বশুরমশাইয়ের হোটেল, নিশ্চয়ই নাম শুনেছেন—পঞ্চানন দাশ। এই কাপাসএড়া এলাকার প্রত্যেকটা মানুষ তাঁকে চেনে! এখানে আমার সঙ্গে অসভ্যতা করতে এলে…’

 নবকুমার ভাবতে পারেনি, হোটেল কর্তৃপক্ষ শেষ মুহূর্তে তার রুম চেঞ্জ করে দেবে। কিছুক্ষণ আগে যখন জগন্নাথ ঘড়াইয়ের ফোনটা এল, ‘স্যার, আপনাকে দোতলার বড়ো ঘরে পরিষেবা দেব, রেডি থাকুন,’ প্রথমটায় ঘাবড়ে গিয়েছিল সে। একটু থতমত খেয়ে বলেছিল, ‘মানে… তাহলে কি আমি সব গুছিয়ে নেব? একটু সময় লাগবে তো!’

‘আরে না না, যেখানে যা আছে থাক, শুধু আপনিই শিফট করবেন, আবার ভোর হলে নিজের রুমে চলে আসবেন।’

‘ওহো আচ্ছা। তাহলে লক করে দেব?’

‘কিচ্ছু করতে হবে না, যা করার আমরা করব, স্যার। আপনি রেডি থাকুন, নন্দকে পাঠাচ্ছি, ও আপনাকে পৌঁছে দেবে।’

নবকুমার আরও কাছাকাছি গেল ঝিমলির। মুখে কিছু বলছে না। ঝিমলিই মুখ খুলল, ‘আর এক-পা-ও এগোবেন না… কপালে কষ্ট আছে আপনার!’

‘কী করবে? মারবে আমাকে?’ নরম করে বলল নবকুমার।

‘দেখবেন, কী করব?’ ঝিমলি গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে শুরু করল, ‘বাঁচান… আমাকে বাঁচান।’ ঝিমলি গলা ছিঁড়ে ডাকছে, ‘জগন্নাথকাকু… ও জগন্নাথকাকু… তোমরা কোথায়?’ ক্রমাগত দরজায় ধাক্কা মেরে চলেছে সে। দরজাটা বাইরে থেকে কে লাগাল? কেন লাগাল? ঝিমলি কিছুই বুঝতে পারছে না, তার পক্ষে বোঝা সম্ভবও নয়।

নবকুমার শান্তভাবে বলল, ‘কেউ দরজা খুলবে না। দরজা যদি খুলবেই তো বাইরে থেকে লাগাল কেন? এটুকু বুদ্ধি নেই তোমার মাথায়?’

‘মানে? কী বলতে চাইছেন আপনি?’ ঝিমলির মুখে তীব্র ভয়ের ছাপ, গোটা কপাল জুড়ে ঘাম, বেনারসিটা বিধ্বস্তপ্রায়।

‘আমি কিছুই বলছি না, তুমি একটু শান্ত হও। বোসো এখানে। ভালো করে ভেবে দেখো, নিজেই বুঝতে পারবে!’

‘আমাকে ছেড়ে দিন প্লিজ।’ কান্নায় ভেঙে পড়ল ঝিমলি। কয়েক মুহূর্ত আগেও তার যে তেজ, যে প্রতিবাদ, যে বিদ্রোহ তা যেন চরম বিশ্বাসহীনতায়, করুণ অসহায়তায় পর্যবসিত হল। তার গা-ভরতি গয়না, সিঁথি ভরতি সিঁদুর, বিছানা ভরতি গোলাপ যেন প্রতিরোধহীন অট্টহাসিতে ভরিয়ে তুলল এই ঘর, তার জীবন, একটা চির-আকাঙ্ক্ষিত রাত।

নবকুমার খাটের উপর এসে বসল, তারপর ধীরে ধীরে নিচু গলায় বলতে লাগল, ‘তোমার শ্বশুরমশাই একটা নরপিশাচ। যে ফ্যামিলিতে তোমার বিয়ে হয়েছে, তার সদস্যরা প্রত্যেকে পরিকল্পনা করে তোমাকে বিক্রি করে দিয়েছে এই চিরন্তন হাইতের কাছে। একরাতের জন্য। আবার কাল বিক্রি করবে আরেকজনের কাছে, পরশু আরও একজনের কাছে। এটাই ব্যাবসা ওদের। এভাবেই লক্ষকোটি টাকার মালিক ওরা…’

‘চিরন্তনবাবু, আমাকে আপনি বাঁচান।’ ঝিমলি করজোড়ে মিনতি করল।

‘তুমি সোমা দাশের নাম শুনেছ? তোমার বড়োজা। ষোলো বছরের সোমাকে তার বিয়ের রাতে ঠিক এক কায়দায় বিক্রি করে দিয়েছিল এক প্রবুদ্ধ দাশগুপ্তর কাছে। তারপর পাক্কা তিন বছর ধরে তাকে নিয়মিত খদ্দেরের কাছে যেতে বাধ্য করত এই পঞ্চানন-বাপ্পারা। যখনই প্রতিবাদ করত, কপালে জুটত পৈশাচিক অত্যাচার। একবার পূর্ণিমা দাশ বাঁশ দিয়ে মেরে পা ভেঙে দিয়েছিল… তারপরেই তো জানাজানি, থানাপুলিশ! উনিশ বছরের সোমাকে উদ্ধার করে হোমে পাঠাল পুলিশ, আর ওরা পুরো ফ্যামিলি অ্যারেস্ট হল। পরে অবশ্য সোমাকে ওর বাবা গ্রহণ করেছে।’

‘তারপর?’ গলা দিয়ে স্বর বেরোচ্ছে না ঝিমলির, চোখে ভূতগ্রস্ত স্তব্ধতা।

‘জেলা আদালত তিনজনের তিন বছরের কারাদণ্ডের নির্দেশ দেয়। কিন্তু উচ্চ আদালতের নির্দেশে ওরা সকলেই এখন জামিনে মুক্ত।’ নবকুমার নিজের খেয়ালে বলে চলেছে, ‘কিছুদিন আগে এই পঞ্চানন মালিকেরই আর-একটা হোটেলে ছ-জন দুষ্কৃতী ডাকাতির উদ্দেশে ঘাঁটি গেড়েছিল। দুষ্কৃতী ধরতে গিয়ে এক কনস্টেবল খুন হয়। তারপরই তো এই দেহব্যাবসার ব্যাপারটা ফের সামনে আসে। টাকাপয়সা খরচ করে অনেকবার পঞ্চানন প্রতিকূল পরিস্থিতি সামলে নিয়েছে… কিন্তু এবার আর…’

‘আমাকে বাঁচান চিরন্তনবাবু।’ নবকুমারকে শেষ করতে না দিয়েই ফের কাতর আর্তি ঝিমলির। তার শুকিয়ে পাংশু হয়ে-যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে নবকুমার বলল, ‘আমি কি চিরন্তন নাকি? বোকা মেয়ে!’

‘কে আপনি?’

‘আমি পুলিশের লোক। ইনস্পেকটর নবকুমার সরকার।’

‘আমার ঈশ্বর।’ মুহূর্তে ওই সন্ত্রস্ত চোখে অপার মুগ্ধতা ঝিমলির।

‘না। তোমার ঈশ্বর সোমা! সে না ঝাঁপিয়ে পড়লে তুমি আজ বাঁচতে না।’ নবকুমার নিজস্ব ভঙ্গিতে বলে চলেছে, ‘গত পরশু হঠাৎ করেই সে টুম্পার বিয়ের খবরটা পেয়ে যায়। তখনই তার মাথায় আগুন জ্বলে ওঠে—আর-একটা মেয়ের জীবনটাও তবে তার মতো হয়ে যাবে? কোনো কিছু না ভেবে সোজা ছুটে যায় মহিষাদল থানায়। সেখানে পুলিশ তার অভিযোগ নেয়নি। তারপর সে যোগাযোগ করে তার পুরোনো হোমে, সেখানে কেউ পুলিশ সুপারের নম্বর দেয় তাকে। বেপরোয়া সোমা সরাসরি পুলিশ সুপারকে সব জানায়। মহিষাদল থানার দুর্ব্যবহার সম্পর্কেও জানায়। তারপর তো তড়িৎ গতিতে কাজ। সমগ্র নিশিযাপন এখন ঘিরে ফেলেছে পুলিশ। তুমি দেখো জানালা খুলে, আমার কথা যদি বিশ্বাস না হয়!’ নবকুমার হাসছে, ‘জগন্নাথকে যে ত্রিশটা পাঁচশো টাকার নোট দিয়েছি, সবক-টাতে বিশেষ রঙের কালি লাগানো আছে, এক্ষুনি সেগুলো উদ্ধার হয়ে যাবে। পরশু যে ফোনটা করে এখানে হোটেল বুক করেছি, তার কল রেকর্ডিং আমার মোবাইলেই রয়েছে, তুমি ইচ্ছে করলে শুনতে পারো। তবে প্রবুদ্ধ দাশগুপ্তর নামটা না নিলে এখানে আমি ঢুকতেই পারতাম না, ওই স্কাউন্ড্রেলটার নামও সোমাই আমাকে জানিয়েছে। তাই এই অপারেশনের সমস্ত কৃতিত্বই সোমাদেবীর।’

 ঝিমলি কাঁদছে। খুব কাঁদছে। কাঁদতে কাঁদতেই নবকুমারের হাত চেপে ধরল সে। বঙ্গোপসাগরের ঘূর্ণিঝড় সরে যেতেই, তার কাজলকালো দু-চোখ দিয়ে এই মধ্য জুনের মধ্যরাতে দক্ষিণবঙ্গে বর্ষা ঢুকল!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *