লক্ষ্মী পুকুর
১
উত্তরবঙ্গের ও জায়গা বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি হলেও এ অঞ্চলের পরিবেশ বেশ শান্তই বলা যায়। সদ্য এ থানার দায়িত্ব নেওয়া দীপেন্দুর থানার কাগজপত্র দেখে তাই মনে হয়েছে। এ থানায় যে সব অভিযোগ জমা পড়ে তা সাধারণ প্রতিবেশীদের মধ্যে জমি-জমা সংক্রান্ত বিবাদ, দাম্পত্য কলহ বা ছোটখাটো হাতাহাতির মতো অভিযোগ। খুন, ডাকাতি, অপহরণ, ছিনতাই ইত্যাদি বড় ধরনের কোনো ঘটনা নিয়ে কোনো অভিযোগ এ থানাতে গত পাঁচ বছরের মধ্যে কেউ করেনি। কাজেই এ থানাকে মোটামুটি শান্তই বলা চলে। কাজেই কাজের চাপও এ থানায় বেশি নেই।
সকাল আটটা নাগাদ নিজের চেয়ারে বসে থানার পুরোনো ফাইল ঘাটছিলেন দীপেন্দু। থানায় জমা পড়া অভিযোগের মধ্যে কোনো কোনো ঘটনার নিষ্পত্তি এ থানা করতে পারেনি সে ব্যাপারে একটা রিপোর্ট তলব করা হয়েছে পুলিশ সুপারের অফিস থেকে। যদিও এই রিপোর্ট চাইবার ব্যাপারটা তেমন বিশেষ কোনো ঘটনা নয়। এস. পি. অফিস থেকে মাঝে মাঝেই এ ধরনের রিপোর্ট চাওয়া হয়ে থাকে থানাগুলোর কাছে।
হঠাৎ তার দরজার বাইরে দাঁড়ানো পুলিশ কনস্টেবলের গলা দীপেন্দুর কানে গেল। কাকে যেন সে বলছে, “তুমি আবার এসেছ? তোমাকে তো আগের ওসি সাহেবরা যা বলার বলে দিয়েছেন। শুধু শুধু বার বার কেন থানায় আসো?” যার উদ্দেশে কনস্টেবল কথাগুলো বলল, সে প্রত্যুত্তরে বলল, “নতুন সাহেব এসেছেন শুনলাম, যদি তিনি কোনো খোঁজ দিতে পারেন, তাই তার সঙ্গে দেখা করতে এলাম।”
কনস্টেবল সম্ভবত লোকটাকে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই দীপেন্দু হাঁক দিয়ে বললেন, “ওঁকে ঘরের ভিতরে নিয়ে আসুন। দেখি কী বলতে চান?”
কনস্টেবল যাকে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করল সে মাঝবয়সি একজন লোক। তার পরনে একটা লুঙ্গি আর শার্ট। সে দুটোই পুরোনো, বিবর্ণ। লোকটার পোশাক দেখেই বোঝা যায় যে সে গরিব মানুষ। কিছুক্ষণ আগেই বৃষ্টি হয়েছে বাইরে। তাই লোকটার জামা ভিজে আছে। সে দীপেন্দুর টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে হাত জড়ো করে নমস্কার করে বলল, “আমার নাম স্যার মাধব মণ্ডল, রিকশা চালাই।”
দীপেন্দু জানতে চাইলেন, “কী ব্যাপার বলুন?”
লোকটা বলল, “আমার ছেলে দু-বছর ধরে নিখোঁজ স্যার। আপনি যদি শীতল বিশ্বাসকে একটু চাপ দেন তাহলেই আমার ছেলে কোথায় আছে তা জানা যাবে।”
দীপেন্দু প্রশ্ন করলেন, “ছেলের বয়স কত? কবে থেকে নিখোঁজ? আর শীতল বিশ্বাসটাই বা কে? সব খুলে বলুন-”
ঠিক এই সময়ে ঘরে ঢুকলেন সাব ইন্সপেক্টর পরিতোষবাবু। বর্তমানে এ থানার সব থেকে পুরোনো কর্মী তিনি। দীপেন্দুর প্রশ্ন শুনে, পরিতোষবাবুকে দেখিয়ে মাধব মণ্ডল বলল, “এই স্যার সব ঘটনা জানেন। ছেলের নাম পল্টু, বারো বছর বয়স। গত দু-বছর ধরে নিখোঁজ সে। মা মরা ছেলে। তাকে মাছের আড়তদার শীতল বিশ্বাসের কাছে দিয়েছিলাম কাজ করার জন্য। মাছের হ্যাচারিও আছে তার বাড়িতে। সেখানেই সে থাকত, আড়তেও বসত। তারপর হঠাৎ একদিন থেকে তার খোঁজ মিলছে না। আমার মন বলে পল্টু কোথায় তা শীতল বিশ্বাস জানে। তাকে একটু ভালো করে চাপ দিলেই সত্যি কথাটা বাইরে আসবে।”
“আপনি থানাতে ঘটনাটার কথা লিখিতভাবে জানিয়েছিলেন, না কি মুখে জানিয়েছিলেন?”
প্রশ্ন শুনে মাধব মণ্ডল পকেট থেকে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া একটা কাগজ বার করে সেটা বাড়িয়ে দিল। দীপেন্দু কাগজটা হাতে নিয়ে দেখলেন, সেটা কমপ্লেনের রিসিভ কপি। থানার স্ট্যাম্প মারা আছে। কাগজের তারিখটা দেখে নিয়ে পরিতোষবাবুর দিকে তাকালেন দীপেন্দু। জানতে চাইলেন।
“ওই শীতল বিশ্বাস নামের লোকটাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেও কিছু মেলেনি। লোকটা জানিয়েছে, ছেলেটা কোথায় গেছে তা তার জানা নেই।”
মাধব মণ্ডল সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, “শীতল বিশ্বাস মিথ্যা কথা বলছে স্যার। ও ঠিক জানে।”
দীপেন্দু প্রশ্ন করলেন, “আপনার এমন ধারণার কারণ কী?”
লোকটা এবার চুপ করে থেকে বলল, “আমার মন তাই বলে। ওকে গারদে পুরুন স্যার। দু-ঘা দিন, সব সত্যি কথা বেরিয়ে আসবে।”
মাধব মণ্ডল লোকটা গরিব। পড়াশোনা না জানা চিকশাচালক। আইন তার জানা নেই। তাই দীপেন্দু তাকে বললেন, “এভাবে তো কাউকে নিছক সন্দেহের বশে ধরে এনে লকআপে পোরা যায় না। তার জন্য প্রমাণ লাগে। তেমন কোনো প্রমাণ আপনার কাছে আছে?”
লোকটা একটু চুপ করে থেকে জবাব দিল, “না, তা নেই। কিন্তু ছেলেটা হারিয়ে যাবার পর একদিন শীতল বিশ্বাস আমাকে ডেকে সাহায্যের নাম করে পাঁচ হাজার টাকা দিতে চেয়েছিল কেন? সে টাকা কিন্তু আমি নিইনি। আমার মন সবসময়ে বলে ওই শীতল বিশ্বাস আমার ছেলের খবর জানে।”
দীপেন্দু মাধব মণ্ডলের কথা শুনে আবারও বললেন, “আপনার কথার উপর ভিত্তি করে তো ওই লোকটার উপর আমরা কোনো অ্যাকশন নিতে পারি না। আমাদের মাথার উপর বড় কর্তারা আছেন, আইন আদালতও আছে। আইন দিয়ে আমাদের হাত-পা বাঁধা।”
কথাটা শুনে মাধব মণ্ডল কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল দীপেন্দুর দিকে। তারপর বিষণ্ণভাবে বলল, “আসলে গরিব বলে আমার পাশে কেউ নেই। যতবার থানায় আসি ততবার একই কথা শুনি। তবু আপনাকে জানিয়ে গেলাম যদি খুঁজে দেন আমার ছেলেকে।” এই বলে লোকটা পা বাড়াল ঘরের বাইরে যাবার জন্য। দীপেন্দু তার কাছ থেকে নেওয়া মিসিং ডায়রির রিসিভ কপিটা তার উদ্দেশে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “আপনার কাগজটা নিয়ে যান।”
কথাটা শুনে মাধব মণ্ডল মুহূর্তের জন্য দীপেন্দুর দিকে ফিরে তাকিয়ে বলল, “ওটা আপনার কাছেই রেখে দিন স্যার। ও কাগজের কি কোনো দাম আছে? থাকলে কি আমি ছেলের খোঁজ পেতাম না? আমি গরিব মানুষ তাই ও কাগজের কোনো দাম নেই।” এই বলে ঘর ছেড়ে চোখ মুছতে মুছতে বেরিয়ে গেল লোকটা।
মাধব মণ্ডলের শেষ কথাগুলো শুনে বেশ খারাপ লাগল দীপেন্দুর। হয়তো-বা মাধব মণ্ডলের কথাগুলো খুব মিথ্যা নয়। তার যদি টাকা থাকত তাহলে ওই ডায়রির স্লিপটা নিয়ে গিয়ে পুলিশ প্রশাসনের উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারত। নড়ে চড়ে বসত সবাই। হয়তো-বা ছেলেটাকে উদ্ধার করা যেত বা তার কোনো খোঁজ পাওয়া যেত৷
ডায়রির কাগজটা হাতে নিয়ে সাব ইনস্পেকটর পরিতোষবাবুর দিকে তাকিয়ে দীপেন্দু বললেন, “তাহলে এটাও একটা আনসলভড কেস। এ বিষয়ে আপনার কী মতামত বলুন তো?”
পরিতোষ বললেন, “আমার ধারণা ছেলেটা নিজেই কারওর সঙ্গে চলে গেছে। এমন কী কোনোভাবে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশেও চলে গিয়ে থাকতে পারে। ওই সময়ে আমরা আশপাশের সব জায়গাতে খোঁজ নিয়ে দেখেছিলাম। কোথাও কোনো ডেডবডি খুঁজে পাওয়া যায়নি।”
দীপেন্দু জানতে চাইলেন, “ওই শীতল বিশ্বাসের সম্বন্ধে খোঁজখবর কোথা থেকে পাওয়া যেতে পারে বলুন তো?”
পরিতোষবাবু বললেন, “কাছেই মাছবাজার স্যার। থানা থেকে হেঁটে গেলে দশ মিনিট আর গাড়িতে তিন চার মিনিট লাগে। তবে শীতল বিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলে নতুন কিছু পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। আমরা বেশ কয়েকবার ওর সঙ্গে কথা বলে দেখেছি।”
ছেলেটার সন্ধান পাওয়া যেতে পারে এমন কোনো বক্তব্য ফুটে উঠল না সাব ইনস্পেকটর পরিতোষবাবুর কথাতে। এরপর তিনি অন্য কাজের ব্যাপারে কিছু কথা বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
২
দীপেন্দু একলা বসে কিছুক্ষণ ধরে ভাবতে লাগলেন এ কাগজটা নিয়ে তার কী করা উচিত? অমীমাংসিত কেস হিসাবে এই ডায়রির নমুনাটা এস. পি. অফিসে পাঠিয়ে দেবেন? না কি তিনি নিজে একবার শেষ চেষ্টা করে দেখবেন পল্টু নামের ছেলেটার কোনো খোঁজ পাওয়া যায় কি না? মাধব মণ্ডল নামে গরিব রিকশা চালকের আকুতি আর যন্ত্রণা যেন শেষ পর্যন্ত দীপেন্দুকে এ কথাই বলল যে শেষ একবার চেষ্টা করে দেখা উচিত ছেলেটার কোনো খোঁজ মেলে কি না? দীপেন্দু সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন যে চেষ্টা তিনি করবেন। কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে নিজের কর্মপন্থা ঠিক করে নিলেন তিনি। দীপেন্দু সদ্য এসেছেন এই থানাতে। এখনও এ জায়গার সাধারণ লোকেরা তার মুখ চেনে না। তাছাড়া সাদা পোশাকেই আছেন তিনি। কাজেই নিজের পরিচয় গোপন করে পাবলিকের থেকে খবর সংগ্রহ করতে কোনো অসুবিধা হবে না তার। কনস্টেবলকে ডেকে দীপেন্দু একটা বাজারের ব্যাগ আনলেন। তারপর সেই ব্যাগ নিয়ে থানা থেকে বেরিয়ে রওনা হলেন মাছবাজারের দিকে। হাঁটতে হাঁটতে একটা লোককে জিজ্ঞেস করতেই সে দেখিয়ে দিল মাছ বাজার কোথায়? দীপেন্দু মাছবাজারে পৌঁছে গেলেন।
মাছবাজার যেমন হয় এ বাজারটাও তেমনই। বেশ বড় বাজার। ওই মফস্সল শহরের লোকেরা তো বটেই আশপাশের গ্রামের লোকেরাও এখানে মাছ কিনতে আসে। থলে হাতে বাজারে প্রবেশ করলেন দীপেন্দু। মাথার উপর টিনের ছাউনি দেওয়া মাছবাজার। তার একপাশে মাছের আড়ত। অর্থাৎ যেখানে মাছ রাখা হয়, মাছ বিক্রেতারা যেখান থেকে পাইকারি মাছ কেনে বিক্রি করার জন্য। আড়ত ঘরগুলো কোনোটা খোলা, আবার কোনোটা বন্ধ। মাছবাজারে সার সার লম্বা সিমেন্টের বেদি। তার উপর নানা ধরনের মাছ নিয়ে বসে আছে মাছ বিক্রেতারা। কেউ খদ্দেরদের হাঁক পাড়ছে মাছ বেচার জন্য, কেউ মাছ ওজন করছে, আবার কেউ-বা মাছ কাটছে খদ্দেরদের জন্য! এদিন রবিবার খদ্দেরদের বেশ ভিড় আছে। ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁক ডাক ঠেলাঠেলিতে মাছের বাজার সরগরম। দীপেন্দু যেন ভালো মাছ খুঁজছেন এমনভাবে কিছুক্ষণ প্রথমে বাজারে ঘুরে বেড়ালেন। মাছওলাদের চালাক বলে একটা দুর্নাম বা সুনাম আছে। দীপেন্দুকে খবর সংগ্রহ করতে হবে। বাজারের এক কোণে অন্যদের থেকে কিছুটা তফাতে বসে থাকা একজন মাঝবয়সি মাছ বিক্রেতাকে দেখে দীপেন্দুর তাকে একটু সহজ সরল লোক বলে মনে হল। দীপেন্দু লোকটার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই লোকটা বলল, “ভালো রুই মাছ আছে বাবু নিয়ে যান। লোকাল পুকুরের টাটকা মাছ। আড়াইশো টাকায় দিয়ে দেব।”
দীপেন্দুর নিজের খাবারের জন্যও মাছের প্রয়োজন ছিল। তাছাড়া তার থেকে খবর নেওয়াও প্রয়োজন। তিনি বললেন, “ঠিক আছে, এক কেজি রুই তবে দাও।” এ কথা বলে পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটার বের করে একটা সিগারেট ধরালেন দীপেন্দু। মাছ ওজন করার পর সেটা কাটতে শুরু করল লোকটা। দীপেন্দু তার উদ্দেশে বললেন, “আপনাদের বাজারটা বেশ বড় দেখছি। সঙ্গে আবার মাছের আড়তও আছে!”
লোকটা জবাব দিল, “হ্যাঁ, বড় বাজার। বাইরে থেকেও এখানে অনেকে মাছ কিনতে আসে। বাবুর কথা শুনে মনে হচ্ছে নতুন এসেছেন এখানে?”
দীপেন্দু বললেন, “হ্যাঁ। একটা ব্যাঙ্কে চাকরি নিয়ে ক-দিন হল এখানে এসেছি। এখানকার তেমন কিছুই চিনে ওঠা হয়নি এখনও।”
এ কথা বলার পর তিনি বললেন, “আমাদের ব্যাঙ্কেই একজনের মুখে শুনলাম, এখানে না কি শীতল বিশ্বাস নামের এক মাছ বিক্রেতা আছেন? ভালো মাছ পাওয়া যায় তার কাছে।”
মাছ কাটতে কাটতে লোকটা বলল, “হ্যাঁ, আছে। আগে যে আমাদের মতো খুচরো মাছ বিক্রি করত, এখন আড়তদার। এক পাল্লা অর্থাৎ পাঁচ কেজির নীচে মাছ বিক্রি করেন না সে।” এ কথা বলে লোকটা আঙুল তুলে দেখিয়ে বলল, “ওই তো ওর আড়ত মা-লক্ষ্মী মাগুর ভাণ্ডার নাম।”
দীপেন্দু তাকালেন সেই আড়ত ঘরটার দিকে। দোকানটার শাটার অবশ্য নামানো। মাথায় দোকানের নাম, আর মোবাইল নম্বর লেখা আছে একটা সাইন বোর্ডে। তার সঙ্গে মাগুর মাছের ছবিও আছে। দীপেন্দু জানতে চাইলেন, “দোকানটা বন্ধ কেন? খোলা হয় না না কি?”
মাছওলার মাছ কাটা হয়ে গেছিল। মাছের টুকরোগুলোকে একটা ক্যারি ব্যাগে ভরতে ভরতে বলল, “ভোর চারটেতে মাছ এনে আড়ত খোলে শীতল। তারপর আমাদের কাছে মাছ বেচে আড়ত বন্ধ করে সকাল সাতটার মধ্যে ফিরে যায়। অনেককটা হ্যাচারি আছে ওর। সেখানে যায়৷”
মাছওলার থেকে মাছ নিয়ে প্রথমে তার দাম মেটালেন দীপেন্দু। তারপর একটা সিগারেট বাড়িয়ে দিলেন। লোকটার দিকে। লোকটার মুখ দেখে বোঝা গেল সে খুশ হল সিগারেট পেয়ে। দীপেন্দু এরপর সেই বন্ধ আড়তটার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন, “—ওই সাইনবোর্ডটাতে অন্য সাইনবোর্ডগুলোর মতো রুই-কাতলা-চিংড়ি-ইলিশের বদলে মাগুর মাছের ছবি কেন? সে কি শুধু মাগুর মাছই বিক্রি করে?”
সিগারেট জ্বালিয়ে আয়েস করে তাতে টান দিতে দিতে লোকটা বলল, “না, এখন সব মাছই বিক্রি করে। ওটা পুরোনো সাইনবোর্ড। তবে মাগুরই ওর ঘরে লক্ষ্মী এনেছিল। তাই ও পুরোনো সাইনবোর্ডটাই রেখে দিয়েছে।”
দীপেন্দু প্রশ্ন করলেন, “মাগুর ঘরে লক্ষ্মী এনেছিল মানে?”
লোকটা বলল, “শীতল আগে এক সময় আমাদের সঙ্গে বসে খুচরো মাছ বেচত। তারপর একটা পুকুর ভাড়া নিয়ে হাইব্রিড মাগুরের চাষ শুরু করে। বিশাল বিশাল সব মাগুর। এক-একটা কোনো সময় পাঁচ-সাত কেজি ওজনেরও হত। গা ভর্তি মাংস। মাছ কাটলে ওদের গা থেকে গলগল করে মানুষের মতো রক্ত বেরোত। ওই মাছ দেদার বিক্রি হত সেই সময়। সে পয়সাতেই ও কিছুদিনের মধ্যে পুকুর কেনে, আড়ত বানায়, পয়সা করে। এখন ও বেশ কয়েকটা হ্যাচারিরও মালিক। এখন ওকে অনেকেই শীতলবাবু নামে ডাকে।”
দীপেন্দু বললেন, “তার মানে তো ওঁর এখন অনেক টাকা পয়সা। ওঁর বাড়িটা কোথায় বলুন তো?”
দীপেন্দু বার বার প্রশ্ন করছে দেখে হয়তো তার কারণ জানতে লোকটার মনে একটু কৌতূহল হল। তাই মাছওলা বলল, “হ্যাঁ, অনেক পয়সা। কিন্তু ওর বাড়ি জেনে আপনি কী করবেন?”
দীপেন্দু হেসে জবাব দিলেন, “আসলে ব্যাঙ্ক থেকে বড় বড় ব্যবসাদারদের খাতা খোলার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, লোনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তাই ঠিকানা জানতে চাইলাম। যদি প্রয়োজন হয় তবে লোকটার বাড়ি যাব।”
মাছ বিক্রেতা বলল, “শীতলের বাড়ি শিবপুর। কলকাতা যাবার রাস্তার পাশে। প্রাচীর ঘেরা বাড়ি আর পুকুর। রাস্তা থেকেই দেখা যায়। ওই বাড়ির পুকুরটাতেই প্রথমে মাছ চাষ শুরু করেছিল শীতল। পরে পুকুরটা কিনে নিয়ে ওখানেই বাড়ি বানায়। যে কোনো রিকশাওলা চেনে বাড়িটা।”
দীপেন্দু হয়তো লোকটাকে আরও কিছু কথা জিজ্ঞেস করতেন, কিন্তু ঠিক সময় দুজন খদ্দের এসে হাজির হল সেখানে। মাছওলা তাদের দেখে দীপেন্দুকে বলল, “বাবু আবার আসবেন।” এরপর আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা উচিত হবে না বুঝতে পেরে দীপেন্দু পা বাড়ালেন অন্যদিকে। তবে বাজার ছাড়ার আগে সাইনবোর্ড থেকে শীতলের নাম্বার টুকে নিলেন তিনি।
দীপেন্দু থানায় ফিরে এলেন। থানা সংলগ্নই তাঁর কোয়ার্টার। নিজের কোয়ার্টারে ঢুকে ব্যক্তিগত টুকিটাকি কাজ করতে করতে দীপেন্দু ভাবতে লাগলেন কী করা যায়। শেষ পর্যন্ত তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন একবার সরাসরি হাজির হবেন শীতল বিশ্বাসের সঙ্গে দেখা করার জন্য। তবে নিজের আসল পরিচয় নয়। ছদ্ম পরিচয়ে। যদি প্রয়োজন হয় তবে তিনি নিজের আসল পরিচয়ে দেবেন। শীতল বিশ্বাসের মোবাইল নম্বারটা নিজের মোবাইলে তুলে এনেছিলেন তিনি। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই নম্বরে ফোন করলেন। রিংটোন বাজতে শুরু করল গান–এসো মা লক্ষ্মী, বসো ঘরে…’
তারপর ওপাশ থেকে একটা ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠস্বর শোনা গেল, “হ্যালো! কে বলছেন?”
দীপেন্দু জবাব দিলেন, “আমার নাম দিব্যগোপাল ঘটক। ‘উত্তরের বার্তা’ —কাগজের নাম শুনেছেন হয়তো। আমি সেই কাগজের সাংবাদিক। আমি শীতলবাবুর সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।” দীপেন্দু যে কাগজের নাম বললেন সত্যিই সে নামে একটা বড় সংবাদপত্র আছে।
কণ্ঠস্বর বলল, “আমিই শীতল বিশ্বাস। কিন্তু আমার সঙ্গে সাংবাদিকের কী দরকার?”
দীপেন্দু বললেন, “আমরা আমাদের কাগজে একটা নতুন বিভাগ খুলতে চলেছি। সেখানে যারা ছোট থেকে নিজের পরিশ্রমে বড় ব্যবসাদার হয়েছেন তাদের ইন্টারভিউ ছাপা হবে। তাই আপনারও ইন্টারভিউ ছাপতে চাই আমরা।”
শীতল বিশ্বাস কথাটা শুনে বললেন, “কিন্তু আমি এখন কোথাও যেতে পারব না। আমার কয়েকটা হ্যাচারিতে সদ্য মাছের চারা ছাড়া হয়েছে, তাই নিয়ে সারাদিন খুব ব্যস্ত থাকতে হয়।”
দীপেন্দু বললেন, “না না, আপনাকে কোথাও আসতে হবে না। আপনার বাড়ির ঠিকানা আমি জেনে নিয়েছি। আপনি বললে চলে যাব। আজই যদি একটু সময় দিতে পারেন তবে ভালো হয়।”
শীতল বিশ্বাস প্রথমে বললেন, “আমি তো ভোর তিনটেতে বাড়ি থেকে বেরোই আর ফিরতে ফিরতে কোনোদিন সন্ধ্যাও হয়ে যায়।” তবে সংবাদপত্রে নিজের নাম দেখার ব্যাপারটা অধিকাংশ মানুষের পক্ষেই এড়ানো কঠিন হয়। তাই হয়তো এরপর শীতল বিশ্বাস বলল, “ঠিক আছে আপনি আজ বিকাল পাঁচটা-ছ’টা নাগাদ চলে আসুন আমার বাড়ি। কথা হবে।”
দীপেন্দু এরপর তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ফোনটা রেখে দিলেন। বাইরে আকাশে আবার বর্ষার কালো মেঘ জমতে শুরু করেছে। কোয়ার্টার থেকে থানার দিকে হাঁটতে হাঁটতে দীপেন্দু মনে মনে ভেবে নিলেন, ঝড় বৃষ্টি যাই হোক না কেন, যখন শীতল বিশ্বাসের সঙ্গে কথা হয়েছে তখন তিনি তাঁর বাড়ি যাবেন। সত্যি এরপর বৃষ্টি নামল। নিজের অফিসে বসে জানালা দিয়ে বাইরের বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে দীপেন্দু ভাবতে লাগলেন সত্যিই কি শীতল বিশ্বাস পল্টু নামে ছেলেটার অন্তর্ধানের ব্যাপারে কিছু জানে? না কি সেটা নিছকই সেই মনের কল্পনা।?
৩
বৃষ্টিটা হয়েই চলল, তার থামার কোনো বিরাম নেই। বেলা গড়িয়ে দুপুর হল, তারপর বিকাল, বৃষ্টি তো থামলই না বরং বিকাল থেকে তা যেন আরও বাড়ল। সন্ধ্যা না নামলেও যেন সন্ধ্যা নেমে এসেছে কালো মেঘে ছাওয়া আকাশে। অন্য কেউ হলে হয়তো এ সময় নিতান্ত কোনো গোলযোগ না হলে থানা থেকে বাইরে বেরোতেন না, কিন্তু দীপেন্দু একবার যে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন তার থেকে পিছু হটেন না। কাজেই পূর্ব পরিকল্পনা মতোই বিকাল পাঁচটা নাগাদ সাদা পোশাকে বর্ষাতি গায়ে দীপেন্দু বেরিয়ে পড়লেন গন্তব্যে যাওয়ার জন্য। বৃষ্টির মধ্যে একটাও লোক নেই রাস্তাতে। দোকানপাটও সব বন্ধ। দীপেন্দু খোঁজ নিয়ে জেনেছেন শীতল বিশ্বাসের বাড়িটা যেখানে, সেখানে হাঁটা পথে পৌঁছোতে মিনিট কুড়ি সময় লাগবে। হাঁটতে হাঁটতে তিনি চারপাশে তাকিয়ে দেখতে লাগলেন কোনো রিকশা পাওয়া যায় কি না? ভাগ্যক্রমে কিছুটা হাঁটার পরই পিছন থেকে একটা রিকশার হর্ন শুনে পিছনে তাকিয়ে দেখতে পেলেন রিকশাটাকে। চালকের গায়ে একটা ছেঁড়া বর্ষাতি, এক হাতে ধরা ছাতাটার জন্য লোকটার মুখও দেখা যাচ্ছে না। তাকে দেখেই দীপেন্দু হাত দেখিয়ে বলল, “শিবপুরের বড় রাস্তার পাশে এক জায়গায় যাব। যাবেন?”
রিকশাটা ব্রেক মেরে দাঁড়িয়ে পড়ল দীপেন্দুর সামনে। রিকশাচালক বৃষ্টির হাত থেকে নিজের মাথাকে ভালোভাবে বাঁচানোর জন্য একটা কালো প্লাস্টিকের ক্যারিব্যাগ কায়দা করে পরে নিয়েছে। ক্যারিবাগে দুটো ফুটো করা তা দিয়ে লোকটার চোখ দুটোই শুধু দেখা যাচ্ছে। সে হাতের ইশারায় দীপেন্দুকে তার রিকশাতে উঠে বসতে বলল। দীপেন্দু উঠে বসলেন হুড খোলা রিকশাতে। তারপর বললেন, “আমি ওখানে শীতল বিশ্বাসের বাড়ি যাব। বাজারে মাছের আড়ত আছে যার। তুমি চেনো তার বাড়ি?”
রিকশাচালক মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিল সে চেনে। বৃষ্টির ছাঁট থেকে বাঁচার জন্য সিটের সামনে টাঙানো প্লাস্টিকের পর্দাটা দীপেন্দু টেনে দিলেন। ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দে চলতে শুরু করল রিকশা। জনমানবহীন বর্ষণ সিক্ত সন্ধ্যার মতো আধো অন্ধকার বিকেলে চলতে চলতে রিকশা একসময় শহরের বাইরে কলকাতা যাবার বাস রাস্তা অর্থাৎ ন্যাশনাল হাইওয়েতে এসে উপস্থিত হল। সেই বড় রাস্তাতেও একটাও গাড়ি ঘোড়া নেই। সে রাস্তা ধরে কিছুটা এগোবার পর রাস্তার একপাশে কিছুটা দূরে বেশ অনেকটা জায়গা নিয়ে প্রাচীর ঘেরা একটা বাড়ি রিকশার পর্দার ফাঁক দিয়ে দীপেন্দুর চোখে পড়ল। বাড়িটার সামনে একটা অশ্বত্থ গাছ আছে। রাস্তা থেকে ঢাল বেয়ে নেমে কিছুটা এগিয়ে বাড়িটার কাছে পৌঁছোতে হয়। রাস্তা ছেড়ে নেমে রিকশা এগোল সেই বাড়িটার দিকে। দীপেন্দু বুঝতে পারলেন নির্জন পরিবেশে একলা দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িটাই তাঁর গন্তব্য। তবে ফেরার সময় এখান থেকে কোনো যানবাহন পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। তিনি নিজের পরিচয় গোপন করে এসেছেন, নইলে থানার গাড়ি ডেকে পাঠানো যেত।
রিকশাটা বাড়ির সামনে এসে উপস্থিত হল। দীপেন্দু রিকশা থেকে নেমে রিকশা চালককে বললেন, “আপনি যদি এখানে কিছু সময় দাঁড়ান তবে আমি আপনার সঙ্গে ফিরতে পারি। যা ভাড়া হবে দেব, চিন্তা করবেন না।”
রিকশাচালক ঘাড় নেড়ে বুঝিয়ে দিল সে অপেক্ষা করবে। রিকশার মুখ ঘুরিয়ে বাড়ির সামনের গাছটার তলায় নিয়ে গিয়ে চালকের আসন থেকে নেমে রিকশার হুডের মধ্যে উঠে বসল সে। আর দীপেন্দু এগোল বাড়িটার দিকে। বাড়িটা কিন্তু বেশি বড় নয়। একতলা বাড়ি তার দু-পাশের গাছের প্রাচীর আলাদা করে রেখেছে অনেকটা জায়গা। বাড়ির মাথায় একটা ফলকে লেখা আছে ‘লক্ষ্মী নিবাস’। বাড়িটাতে ঢোকার মুখে গ্রিল ঘেরা একটা ছোট বারান্দা আছে আর প্রাচীরের গায়েও একটা চওড়া গেট আছে। বড় গেটটা সম্ভবত বানানো হয়েছে মাছের গাড়ি ভেতরে ঢোকার জন্য। দীপেন্দু গ্রিলের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে হাঁক দিলেন— “শীতলবাবু বাড়ি আছেন?”
বারকয়েক হাঁক দেওয়ার পর বারান্দা সংলগ্ন ঘরের দরজা খুলে একজন মাঝবয়সি লোক বাইরে বেরিয়ে এল। মাথার চুল ছোট করে ছাঁটা, পরনে ধুতির উপর শার্ট, গলায় একটা কণ্ঠি আছে। অর্থাৎ লোকটা বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী।
দীপেন্দু লোকটার উদ্দেশে বললেন, “আমি খবরের কাগজের অফিস থেকে আসছি। আমার আসার কথা ছিল।”
লোকটা গ্রিল বারান্দার গেট খুলতে খুলতে হেসে বলল, “আমিই শীতল বিশ্বাস। আসুন।”
বারান্দায় উঠে দীপেন্দু চটি খুলতে যাচ্ছিলেন। লোকটার মনে যাতে কোনোরকম সন্দেহ না হয় সে জন্য পুলিশের জুতোর পরিবর্তে চটি পরেই এসেছিলেন তিনি।
কিন্তু শীতল বিশ্বাস বললেন, “কিছু খুলতে হবে না। চটি পায়েই আসুন।” লোকটার পিছন পিছন ঘরে প্রবেশ করলেন দীপেন্দু। বাইরে আলো কম বলে একটা টিউব জ্বলছে ঘরে।
দীপেন্দুর ঘরটা দেখে মনে হল সেটা অফিস ঘর। তার মাঝখানে একটা টেবিল ঘিরে কয়েকটা চেয়ার রয়েছে। টেবিল আর দেওয়ালের কুলুঙ্গির মতো জায়গাতে বেশ কিছু খাতাপত্র রাখা। এক পাশের দেওয়ালের গায়ে তিনটে ছবি ঝুলছে। দুটো ছবি লক্ষ্মী আর গণেশের। আর তৃতীয় ছবিটা ব্যতিক্রমী ধরনের। ফ্রেমে বাঁধানো কয়েকটা মাগুর মাছের ছবি। তিনটে ছবির ফ্রেমেই ধূপ জোড়া দেখে মনে হয় সদ্য জ্বালানো হয়েছে। টেবিলের এক পাশে একটা চেয়ার দেখিয়ে দীপেন্দুকে তাতে বসতে বলে টেবিলের অপর পাশে একটা চেয়ারে বসতে বসতে শীতল বিশ্বাস বলল, “মিনিট পনেরো আগে সবে বাড়ি ফিরলাম। তারপর স্নান সেরে ধূপধুনো দিয়ে সবে বসেছি। সারাদিন ধরে যা বৃষ্টি হচ্ছে, পুকুর-টুকুর সব ভাসিয়ে দিচ্ছে।”
দীপেন্দু বললেন, “হ্যাঁ, নেহাত কাজের দায়িত্ব বড় দায়িত্ব সেজন্য আপনাকে বিরক্ত করতে এলাম।”
শীতল বিশ্বাস বলল, “তবে আপনাকে আপ্যায়ন করার মতো কোনো ব্যবস্থা করতে পারছি না বলে আমি দুঃখিত। আসলে এ বাড়িতে আমি একাই থাকি। পরিবার থাকে শহরের মধ্যে একটা বাড়িতে। আর আমার বাড়িতে কোনো কর্মচারী নেই যে তাদের দিয়ে মিষ্টি আনাব।”
দীপেন্দু বললেন, “না না, এটা কোনো ব্যাপার নয়। আপনি যে ইন্টারভিউ দেবেন বলেছেন সেটাই যথেষ্ট।”
শীতল বিশ্বাস বলল, “কীভাবে ইন্টারভিউ নেবেন?”
দীপেন্দু পকেট থেকে মোবাইল ফোন বার করে বললেন, “আপনাকে কী কী প্রশ্ন করব সেটা আমি মোটামুটি ভেবে রেখেছি, আপনার কথা আমি মোবাইলে রেকর্ড করে নেব। পরে সেটা থেকে আমি লিখে নেব।”
শীতল বিশ্বাস বলল, “সেই ভালো। আপনি সাজিয়ে লিখে দেবেন। আমি আবার সব কথা হয়তো-বা গুছিয়ে নাও বলতে পারি। শুরু করুন তবে।”
দীপেন্দু মোবাইল ফোনের রেকর্ড সিস্টেম চালু করে সেটা শীতল বিশ্বাসের দিকে বাড়িয়ে ধরে বললেন, “শুরু করছি। আমি যতটুকু খোঁজ নিয়েছি তাতে আপনি মাছবাজারের একজন অতি সাধারণ মাছ বিক্রেতা ছিলেন। আর এখন আপনি বেশ কয়েকটা পুকুর-হ্যাচারির মালিক। মাছের আড়তও আছে আপনার। এই উত্থানের পিছনে রহস্যটা যদি আপনি পাঠকদের জানান। কী রহস্য এর পিছনে?”
শীতল বিশ্বাস হেসে বলল, “রহস্যের তেমন কোনো ব্যাপার নেই। বলতে পারেন এ সব মা লক্ষ্মীর কৃপা আর আমার পরিশ্রমের ফসল। বেশ কিছু বছর আগে আমার এক পরিচিত লোকের পরামর্শে ধার করে একটা পুকুর নিয়ে সেখানে হাইব্রিড মাছের চাষ করেছিলাম। প্রথম বারেই প্রচুর ফলন হল সেই মাছের। বিরাট বিরাট সব মাছ। দেশি মাগুরের তুলনাতে স্বাদের একটু পার্থক্য থাকলেও তাদের গায়ে মাংস বেশি আর দামে একটু কম বলে দেদার বিক্রি হতে লাগল সেই মাছ। লাভ আসতে শুরু করল আমার ঘরে। আমি তারপর পুরোপুরি মাগুরের ব্যবসায় নেমে গেলাম। লাভের টাকা খাঁটাতে শুরু করলাম অন্য পুকুরে। ধীরে ধীরে আমার ব্যবসা দাঁড়িয়ে গেল। মাগুরই আসার ঘরে লক্ষ্মী আনল।”
দীপেন্দু ভাবলেন, বাজারের মাছ বিক্রেতা থেকে যে কথা শুনেছিলাম, মোটামুটি একই কথা বলল শীতল বিশ্বাস। দীপেন্দু প্রশ্ন করলেন, “কোথায় ছিল সেই মাছ চাষের প্রথম পুকুরটা? কোনো বিশেষ উপায়ে কি আপনি ওই মাছগুলোর পরিচর্যা করতেন।?”
ঘরটার মধ্যে আরও দুটো দরজা আর একটা জানালা আছে। খোলা জানালা দিয়ে প্রাচীর ঘেরা জায়গার ভিতরের অংশটা কিছুটা দেখা যাচ্ছে। শীতল বিশ্বাস সেই জানালার বাইরের বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বললেন, “এ বাড়ির পিছন দিকে একটা পুরোনো পুকুর আছে সেখানেই আমি প্রথম মাগুর মাছের চাষ শুরু করি। তখন অবশ্য পুকুরটা ঘেরা ছিল না। আমি পরে জায়গাটা ঘিরে বাড়িটা বানাই। ওই আমেরিকান হাইব্রিড মাগুরের খাবার বলতে সাধারণ কিছু মাছের খাবার আর মুরগির ছাঁট। অর্থাৎ মুরগির মাংসের দোকানে যে সব নাড়িভুঁড়ি, পালকের সঙ্গে চামড়া লেগে থাকে সে সব জিনিস। ওটা ওরা ভালো খায়, যার ফলে ফলনও বাড়ে। এসবই খাওয়াতাম ওদের। তাতেই ওরা তরতর করে বাড়ত। ছয়-সাত কেজির মাগুরও তুলেছি আমি। দেখে মনে হত শোল বা বোয়াল মাছ। ওই পুকুরটাই আমাকে লক্ষ্মী এনে দিয়েছিল। মাগুর মাছগুলো ছিল আমার লক্ষ্মী। তাই আমি মাগুর মাছদের লক্ষ্মী বলে ডাকি আর পুকুরটাকে ডাকি লক্ষ্মী পুকুর নামে। এ বাড়ির নামও তাই দিয়েছি লক্ষ্মী নিবাস।”
“এখন ওই পুকুরে মাগুর চাষ হয়?” জানতে চাইলেন দীপেন্দু।
শীতল বিশ্বাস একটু চুপ করে থেকে জবাব দিল, “না, এখন আর হয় না। আসলে দেশি মাছের চাষে উৎসাহ বাড়াতে আর অন্য নানা কারণে সরকার থেকে কয়েকবছর আগে বেশ কিছু বিদেশি মাছের চাষ বন্ধ করা হয়েছে। তার মধ্যে ওই হাইব্রিড মাগুরও আছে।”
শীতল বিশ্বাস নামের লোকটা কেমন তা বোঝার জন্য প্রথমেই বাচ্চাছেলেটার ব্যাপারে প্রশ্ন না করে শীতলের ব্যবসা সংক্রান্ত ব্যাপারে, মাছ চাষের ব্যাপারে নানা প্রশ্ন করে যেতে লাগলেন দীপেন্দু। খুব সহজ সরল, শান্তভাবেই তার প্রশ্নের জবাব দিয়ে চলল লোকটা। আপাতদৃষ্টিতে তার কথাবার্তায় কোনো গোলযোগ আছে বলে দীপেন্দুর মনে হল না। একবার যেমন কথা প্রসঙ্গে দীপেন্দু তাকে বললেন, “আপনার ওই উত্থানের কারণে নিশ্চয়ই কিছু লোক আপনাকে হিংসা করে?”
শীতল বিশ্বাস জবাবে হেসে নিজের কণ্ঠী ছুঁয়ে বলল, ‘আমি পরম বৈষ্ণব। নিজে মাছ চাষ করলেও মাছ-মাংস কিছুই খাই না। আমাকে কেউ ঈর্ষা করলেও আমি তাদের কোনো ক্ষতি করতে চাই না। তাদেরও আমার মতো লক্ষ্মী লাভ হোক। শ্রীহরি তাদের মঙ্গল করুন।”
তাদের কথাবার্তা চলতে চলতেই দীপেন্দু খেয়াল করলেন বাইরে বৃষ্টি যেন একটু কমে আসতে শুরু করেছে। দীপেন্দু একটানা প্রায় আধঘণ্টা কথা বললেন লোকটার সঙ্গে। তারপর বৃষ্টিও থেমে গেল। দীপেন্দু এরপর মোবাইলটা বন্ধ করে দিয়ে বললেন, “আমার প্রশ্ন শেষ। আপনার লক্ষ্মী পুকুরটা একবার দেখে আসা যাবে? একটু কৌতূহল। আর তাছাড়া পুকুরটা একবার চোখে দেখলে ওর সম্পর্কে আমার ভাবনাটা আরও স্পষ্ট হবে। ভালো করে লিখতে পারব আমি।”
দীপেন্দুর প্রশ্ন শুনে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে শীতল বিশ্বাস বলল, “ওখানে তো আর মাগুর নেই। দু-চারটে রুই কাতলা আছে। আপনি যখন দেখতে চাইছেন তখন দেখিয়ে আনি।”
৪
ঘরের দুটো দরজার মধ্যে একটা দরজা খুলে দীপেন্দুকে নিয়ে বাইরে বেরোলেন শীতল বিশ্বাস। বাড়িটা থেকে কিছুটা দূরে প্রাচীর ঘেরা জায়গার মধ্যে বিশাল পুকুরটা এবার দেখতে পেলেন দীপেন্দু। মাঝারি আকৃতির কয়েকটা গাছও রয়েছে পুকুরটার পাড়ে। মেঘ কেটে গিয়ে বৃষ্টি থামলেও দ্রুত সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে এবার। দীপেন্দু লোকটার পিছন পিছন এগোলেন পুকুরটার দিকে। ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে শীতল বিশ্বাস বলল, “আমার পরিবার শহরের মধ্যে থাকলেও সত্যি কথা বলতে কী এই পুকুরটার জন্য আমি এই বাড়িটা ছাড়তে পারি না। আমার বড় মায়া জন্মে গেছে এই লক্ষ্মী পুকুরের ওপর।”
পুকুরটার দিকে এগোচ্ছিলেন তাঁরা, হঠাৎই কঁক কঁক করে বেশ কয়েকবার মুরগির ডাক শোনা গেল। কাছেই একটা টালির ছাউনি দেওয়া বেড়ার ঘর। বাইরে থেকে সে ঘরের ভিতরে কিছু দেখা না গেলেও দীপেন্দু বুঝতে পারলেন মুরগির ডাকটা ওই বেড়ার ঘরের থেকেই আসছে। হাঁটতে হাঁটতে তিনি বললেন, “আপনি মুরগিও পোষেন দেখছি!”
শীতল বিশ্বাস হেসে বলল, “আমি পুষি না। আমার কর্মচারীরা ফিস্টি করবে বলে মুরগি কিনে এখানে রেখে গেছে।”
শীতল বিশ্বাসের সঙ্গে পুকুরপাড়ে এসে দাঁড়ালেন দীপেন্দু। বেশ বড় পুকুর। তার তিন দিক প্রাচীরের সীমানার সঙ্গে যুক্ত। পুকুরের গা-গুলো সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো। যেন পুকুরটা বিরাট বড় ট্যাঙ্ক বা চৌবাচ্চা। দীপেন্দু যেখানে এসে দাঁড়ালেন সেখান থেকে পুকুরের জলতল অন্তত চারফুট নীচে। পুকুরের জল এ সময়ে কালো দেখাচ্ছে। হয়তো বা অন্ধকার নামতে চলেছে বলেই। পুকুরের কিনারে দাঁড়িয়ে শীতল বিশ্বাস বলল, “এই সেই লক্ষ্মী পুকুর। এ পুকুরই আমার ঘরে লক্ষ্মী এনেছে। আমার পেটে ভাত দিয়েছে, এখন আমার কর্মচারীদের পেটের ভাত জোগাচ্ছে।”
দীপেন্দু জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার কর্মচারীর সংখ্যা কত?”
শীতল বিশ্বাস জবাব দিল, “চারটে হ্যাচারি আর আড়ত মিলিয়ে জনা কুড়ি হবে।”
দীপেন্দু এবার তাঁর আসল প্রশ্নটা করলেন, ‘কিছু মনে করবেন না, আপনাকে একটা প্রশ্ন করছি। যদিও প্রশ্নটা ইন্টারভিউয়ের সঙ্গে যুক্ত নয়। তা নিয়ে কিছু লেখা হবে না। বাজারে আমি একজনের সঙ্গে আপনার ব্যাপারে কথা বলছিলাম। সে বলল, একটা বাচ্চা ছেলে আপনার এখানে কাজ করত। তারপর সে নাকি একদিন হঠাৎ হারিয়ে যায়! ঘটনাটা ঠিক কী হয়েছিল বলুন তো?”
দীপেন্দুর মুখে হঠাৎ এই অপ্রত্যাশিত প্রশ্ন শুনে শীতল বিশ্বাস কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। এর পরেই অবশ্য মুখে বলল, “হ্যাঁ কাজ করত। তারপর উধাও হয়ে যায়। ক-দিন ধরেই ছেলেটা বলছিল যে তার এখানে কাজ করতে ভালো লাগছে না। কিন্তু কাজ ছেড়ে বাড়ি ফিরে গেলে বাবা তাকে মারবে বলে যতসম্ভব সে বাড়ি ফিরতে পারছিল না। তারপর সে একদিন উধাও হয়ে যায়। আমার ধারণা ছেলেটা দুরে কোথাও পালিয়ে গেছে। অথবা কারওর সঙ্গে কোথাও চলে গেছে। এমনকী বাংলাদেশেও চলে গিয়ে থাকতে পারে।”
একথা বলে একটু থেমে শীতল বিশ্বাস আবার বলল, “ছেলেটার খোঁজে আমার কাছে বেশ কয়েকবার পুলিশ এসেছিল। আমাকে কিছু লোক হিংসা করে। তারাই ওর বাবাকে ভুল বুঝিয়ে পুলিশের কাছে পাঠিয়েছিল। কিন্তু আমি কী করে জানব ছেলেটা কোথায় গেল?”
দীপেন্দু এরপর এ প্রসঙ্গে তাকে কোনো একটা প্রশ্ন করতে যাচ্ছিলেন। ঠিক সেই সময়ে হঠাৎ একটা কণ্ঠস্বর কানে এল— “তুই জানিস আমার ছেলে কোথায় আছে? আর আমিও এখন জানি সে কোথায়।”
গলার শব্দটা শুনেই দীপেন্দু আর শীতল পিছন ফিরে তাকালেন। দীপেন্দু দেখলেন, কখন যেন তার রিকশাওলা বাড়ির ভিতর ঢুকে তাদের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে! শীতল লোকটাকে দেখে বলল, “কে তুমি? বাড়ির ভিতরে ঢুকেছ কেন?”
রিকশাচালক এবার তার মুখের ঢাকা দেওয়া প্লাস্টিকের ব্যাগটা খুলে ফেলল। দীপেন্দু অবাক হয়ে দেখলেন তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে পল্টু নামের ছেলেটার বাবা মাধব মণ্ডল। শীতল যেন মৃদু চমকে উঠল লোকটাকে দেখে। তারপর সে লোকটার উদ্দেশে বলে উঠল, “তুমি আবার এসেছ! আমি তো তোমাকে অনেকবার বলেছি সে কোথায় চলে গেছে তা আমি জানি না।”
কথাটা শুনে পল্টুর বাবা বলে উঠল, “পল্টু কোথাও যায়নি। সে এখানেই আছে। তুমি যখন জানতে ওইটুকু বাচ্চা ছেলে যদি জলে পড়ে যায়, তবে তার আর রক্ষা নেই, তখন কেন ওকে দিয়ে তোমার মাছেদের খাবার দেওয়াতে?”
শীতল বিশ্বাস বলল, “কী আজেবাজে বকছ তুমি! আমি মাছগুলোকে নিজে খাওয়াতাম। আর ছেলেটা নিখোঁজ হওয়ার বেশ কিছুদিন আগে থেকেই ও মাছের চাষ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।”
এবার মাধব মণ্ডলের মুখে যেন অদ্ভুত একটা হাসি ফুটে উঠল! সে বলল, “আমার ছেলেও এখানে আছে আর তারাও এখানে আছে।”
শীতল বিশ্বাস তার কথা শুনে বলল, “আজেবাজে লোকেরা নানা কথা বলে তোমার মাথাটা একদম খারাপ করে দিয়েছে। সে এ বাড়িতে কোথাও থাকলে তাকে খুঁজে দেখাও?
শীতলের কথায় মাধব মণ্ডল বলল, “হ্যাঁ দেখাচ্ছি।”
আর এ কথা বলেই সে একটা অদ্ভুত কাণ্ড করল। ছুটে এসে সজোরে ধাক্কা মারল পুকুরের কিনারে দাঁড়িয়ে থাকা শীতল বিশ্বাসকে। আর সেই ধাক্কায় শীতল বিশ্বাস ছিটকে গিয়ে পড়ল পুকুরের মধ্যে। শীতলের দেহটা প্রথম ডুবে গেল পুকুরে। তারপর ফুট দশেক দূরে ভেসে উঠল তার শরীরটা। পাড়ের কাছে পুকুরের জলের গভীরতা বেশি নয়। শীতলের বুকের নীচে জল। সে উঠে দাঁড়িয়েই কিন্তু দ্রুত একবার চেষ্টা করল পাড়ের দিকে আসার। কোনো অজানা আতঙ্কে যেন সে দীপেন্দুর উদ্দেশে বলে উঠল, “আমাকে পুকুর থেকে টেনে তুলুন। দীপেন্দু ঝুঁকে পড়ে হাত বাড়াতে যাচ্ছিলেন তাকে টেনে তোলার জন্য, ঠিক তখনই শীতলের চারপাশ ঘিরে জলের মধ্যে প্রচণ্ড তোলপাড় শুরু হল। জল থেকে লাফিয়ে উঠতে লাগল শীতলের লক্ষ্মীরা। তিন চার ফুট লম্বা বিশাল বিশাল সব হাইব্রিড মাগুর! তারা কামড়ে ধরতে লাগল শীতলের শরীর। তবুও তারই মধ্যে হাত-পা ছুঁড়ে পাড়ের দিকে আসার চেষ্টা করতে লাগল শীতল। সে দু-তিন পা এগোলও বটে। কিন্তু ঠিক এই সময়ে মাধব মণ্ডল চিৎকার করে বলে উঠল, “ওকে জলে টেনে রাখ পল্টু, উঠতে দিস না।”
মাধব মণ্ডলের মুখে স্পষ্ট আতঙ্ক ফুটে উঠেছে। এরপর সেই আলো-আঁধারির মধ্যে এক অবিশ্বাস্য ঘটনা প্রত্যক্ষ করলেন দীপেন্দু। জল থেকে দুটো ছোট হাত উঠে এসে পিছন থেকে চেপে ধরল শীতলের কাঁধ! শীতল চেষ্টা করল সেই হাত দুটো থেকে মুক্তি পাবার। কিন্তু পারল না। হাত দুটো যেন তাকে টেনে নিয়ে যেতে লাগল জলের গভীরে। ততক্ষণে সেই মাগুর মাছেরা ছিঁড়ে খেতে শুরু করেছে শীতলের দেহ। শেষ একটা চিৎকার বেরিয়ে এল শীতলের গলা থেকে। তারপর জলে ডুবে গেল তার মাথা। জায়গাটা ঘিরে শুরু হল মাগুর মাছেদের উল্লাস। ছিটকে উঠতে লাগল পুকুরের জল। এরপরই ঝুপ করে অন্ধকার নেমে এল। ধাক্কা খেয়ে শীতল বিশ্বাসের জলে পড়ে যাওয়া থেকে এ পর্যন্ত ঘটনা ঘটতে খুব বেশি হলে দেড় মিনিট সময় লাগল। দীপেন্দু পুলিশের চাকরি করতে এসে অনেক ঘটনা দুর্ঘটনা দেখেছেন, কিন্তু এমন অদ্ভুত অবিশ্বাস্য ঘটনা কোনোদিন দেখেননি। এতক্ষণ তাঁর চোখ আটকে ছিল জলের দিকে। কিন্তু এরপর তিনি পিছনে তাকাতেই দেখতে পেলেন মাধব মণ্ডল নেই!
দীপেন্দু ছুটলেন তার খোঁজে। যে পথে তিনি বাড়ির ভিতর ঢুকেছিলেন, সে পথেই তিনি বাইরে বেরিয়ে এলেন। দ্রুত গাঢ় অন্ধকার হতে শুরু করেছে চারপাশে। গাছটার নীচে ছুটে গিয়ে তিনি দেখলেন মাধব মণ্ডল বা তার রিকশাটা সেখানে নেই! এই অন্ধকারে মাধব মণ্ডল কোথায় পালাল তা দীপেন্দুর একার পক্ষে খুঁজে বার করা সম্ভব নয়। থানা থেকে ফোর্স ডাকতে হবে। তাছাড়া নিজেকেও ফিরতে হবে। দীপেন্দু তাই পকেট থেকে মোবাইল ফোন বার করলেন। আর ঠিক সেই সময়েই কাকতালীয়ভাবে তাঁর ফোন বেজে উঠল। থানার ফোন!
দীপেন্দু ফোনটা রিসিভ করতেই ও পাশ থেকে পরিতোষবাবু বললেন, “একটা খবর আছে স্যার। সকালবেলা মাধব মণ্ডল নামের যে লোকটা আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল সেই লোকটা সুইসাইড করেছে। নিজের ঘরে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলছিল। প্রতিবেশীরা দেখে থানায় খবর দেয়। একটু আগে পুলিশ গিয়ে বডিটা রিকোভারি করে এনেছে।”
দীপেন্দু কথাটা শুনে হতভম্ব হয়ে গেলেন। কোনোক্রমে তিনি শুধু তাকে বললেন কয়েকজন পুলিশকর্মীকে শীতল বিশ্বাসের বাড়ি পাঠিয়ে দিতে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই বেশ কয়েকজন পুলিশকর্মী হাজির হলেন সেখানে। দু’জন পুলিশকর্মীকে সেখানে পাহারায় রেখে দীপেন্দু রওনা হলেন ফেরার জন্য।
৫
পরদিন সকালে দীপেন্দু পুলিশ এবং প্রয়োজনীয় বেশ কিছু লোককে নিয়ে হাজির হলেন শীতল বিশ্বাসের বাড়িতে। তিনি গত সন্ধ্যায় যা দেখেছেন তা সবটা খুলে বলেননি তাঁর সহকর্মীদের। কারণ, তাতে তাঁরা সন্দেহ করতে পারেন যে থানার বড়বাবুর মাথা খারাপ হয়ে গেছে। তিনি শুধু জানিয়েছেন শীতল বিশ্বাস তার পুকুরের জলে ডুবে গেছে, বডিটা উদ্ধার করতে হবে। বাড়িতে ঢুকে তিনি যখন লোকজনদের নিয়ে পুকুরের দিকে এগোচ্ছেন তখন আবার সেই বেড়ার ঘর থেকে মুরগির ডাক শুনতে পেলেন। একজনকে তিনি নির্দেশ দিলেন মুরগিগুলোকে বার করতে। নির্দেশ পেয়ে একজন লোক বেশ কয়েকটা ব্রয়লার মুরগি বার করে আনল। দীপেন্দুর তখন স্থির বিশ্বাস হল মুরগিগুলোকে রাখা হয়েছিল লক্ষ্মী পুকুরের জন্য।
লোকজন নিয়ে পুকুরপাড়ে এসে দাঁড়ালেন দীপেন্দু। চারপাশে সূর্যের আলো। পুকুরের জল গত সন্ধ্যার মতো কালো না হলেও স্বচ্ছ নয়। দীপেন্দু একটা মুরগি নিয়ে ছুঁড়ে দিলেন পুকুরের মধ্যে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই জলে তোলপাড় শুরু হল। আর তারপরেই আবির্ভূত সেই বিরাট বিরাট মাগুরের দল। দেখতে না দেখতেই ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেল মুরগিটার শরীর। এরপর বাকি মুরগিগুলো ছুড়ে ফেলতে একই ঘটনা ঘটল। শীতল বিশ্বাসের লক্ষ্মী পুকুরের লক্ষ্মীরা হিংস্র উল্লাসে টুকরো টুকরো করে ফেলল মুরগিগুলোকে। দীপেন্দু পুলিশকর্মীদের সঙ্গে যাদের জোগাড় করে এনেছেন তাদের মধ্যে দু’জন মাছ চাষিও আছে। তাদের মধ্যে একজন দীপেন্দুকে বলল, “এ মাছ বড় ভয়ানক স্যার। যেমন হিংস্র, তেমন ওদের খিদে। কোনো পুকুরে এমন একটা মাছ ছাড়লে আর অন্য কোনো মাছ বাঁচে না। এজন্যই এ মাছ চাষ নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল সরকার। এ পুকুরে যে এখনও এ মাছ আছে জানতাম না।”
দীপেন্দু বললেন, “সরকারিভাবে এ মাছ চাষ নিষিদ্ধ হলেও শীতল বিশ্বাস তার পুকুরে রয়ে যাওয়া মাছগুলোকে মারেননি। কারণ এরাই তো ওর লক্ষ্মী ছিল। এদের টানেই মনে হয় শীতল বিশ্বাস এ বাড়িতে রয়ে গেছিল।”
কিছুক্ষণের মধ্যেই শ্যালো মেশিন দিয়ে পুকুরের জল ছেঁচে প্রাচীরের বাইরে ফেলা শুরু হল। ঘণ্টা চারেক সময় লাগল সেই কাজে। তারপর পুকুরের নীচে কাদামাটি দেখা গেল। সেখানে কিলবিল করছে, ছটফট করছে বিশাল আকারের বেশ কিছু হাইব্রিড মাগুর। জেলে লোকটা বলল, “বেশ কয়েকবছর জলে থাকতে থাকতে ওরা এমন দানবের মতো হয়েছে। জল একদম ছেঁচে ফেলার পর দেখা গেল একটা পূর্ণ বয়স্ক মানুষের কঙ্কাল। শীতল বিশ্বাসের কঙ্কাল। সাবধানে পুকুরে নেমে কয়েকজন লোক পাড়ে তুলল সেই কঙ্কালটাকে। এক টুকরো মাংস, এমনকী জামা কাপড়ের টুকরোও লেগে নেই তার গায়ে। এক রাতের মধ্যেই শীতল বিশ্বাসের শরীরটাকে ছেঁচে পুঁছে সাফ করে দিয়েছে তার লক্ষ্মীরা।
দীপেন্দু এরপর নির্দেশ দিলেন কাদার মধ্যে আরও কিছু পাওয়া যায় কি না তা খুঁজে বার করতে। কিছুক্ষণের মধ্যে কাদার নীচ থেকে উদ্ধার হল আরও একটা কঙ্কালের খণ্ডবিখণ্ড দেহাবশেষ! সেই খুলি হাড় দেখে বোঝা যায় সেটা কোনো বাচ্চার কঙ্কাল। দীপেন্দুর বুঝতে অসুবিধা হল না যে কঙ্কালটা কার। হয়তো খাবার দিতে গিয়ে অথবা অন্য কোনো কারণে পল্টু জলে পড়ে গেছিল। আর তারপর …
মুহূর্তের জন্য দীপেন্দুর চোখে ভেসে উঠল সেই দৃশ্য মাধব মণ্ডলের গলা, “ওকে জলে টেনে রাখ পল্টু। উঠতে দিস না।” আর তারপরই জল থেকে ছোট ছোট দুটো হাত উঠে এসে চেপে ধরল শীতল বিশ্বাসকে। সাধের লক্ষ্মী পুকুর ছেড়ে আর পাড়ে ওঠা হল না তার।
