মানি অর্ডার – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

মানি অর্ডার

১

দিনদুয়েক আগে কাঞ্চন পোস্টমাস্টার হয়ে এসেছে গ্রামের এই পোস্ট অফিসে। অফিসে লোক বলতে মাত্র দু’জন। সে আর এক পুরোনো পিয়ন।

আজকাল চিঠিপত্র লেখার চল প্রায় উঠে গেছে ঠিকই, তবে মানি অর্ডার আসে। গ্রামের অনেকে জীবিকার সন্ধানে ভিন রাজ্যে থাকে। মাসের মাঝামাঝি সময়ে তাদের মানি অর্ডারগুলো এসে পৌঁছোয়। ওই সময়টা ছাড়া না কি খুব একটা কাজ থাকে না এই সাব-পোস্ট অফিসে।

পোস্ট অফিসের গায়ে এক চিলতে কোয়ার্টারে কাঞ্চনের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। নিজেই রেঁধে খায় কাঞ্চন। পিয়ন অফিসে আসার সময় বাজার করে আনে। সমস্যা বলতে একটাই, রাতে ইলেকট্রিসিটির ভোল্টেজ কম থাকার কারণে বাতি ম্যাট ম্যাট করে জ্বলে, সিলিং ফ্যান ঘটর ঘটর করে। তবে বাঁচোয়া যে, পোস্ট অফিস আর কোয়ার্টারটা মাঠটার একদম লাগোয়া।

বিশাল মাঠটা সারাদিন পড়ে পড়ে রোদে পোড়ে। তবে বিকেল বেলা আলো মরে আসার পর থেকে মৃদু বাতাস বইতে শুরু করে। সন্ধ্যায় ছেলের দল মাঠ থেকে খেলা সেরে ফিরে গেলে অনেকে এই গরমের সময় মাঠে গিয়ে বসে। আবার সাড়ে সাতটা-আটটার মধ্যে ফিরেও যায় যে যার ঘরে। কাঞ্চনও গ্রীষ্মের গুমোট ভাব থেকে মুক্তি পেতে দু’দিন ধরে রাতে মাঠে গিয়ে বসছে। ঘণ্টাখানেক মাঠে বসে থাকার পর, যখন তার ঘুম ঘুম ভাব আসে তখন ঘরে এসে ঘুমিয়ে পড়ে।

রাত যত বাড়ে বাতির তেজ তত কমে আসে। তাছাড়া কাজও তো বিশেষ নেই তাই রাত আটটা নাগাদই খাওয়া সেরে ফেলে নতুন পোস্টমাস্টার কাঞ্চন। সেদিনও ব্যতিক্রম ঘটল না। খাওয়া সেরে বেরিয়ে পড়ল। বাইরে বেরিয়ে কয়েক পা এগিয়ে মাঠের কিনারে গিয়ে বসল। আকাশে ক্ষীণ চাঁদের আভা। বিশাল বিস্তৃত মাঠটা যেন অন্ধকারে ডুবে আছে। মাঠটার তিন দিক ঘিরে কোথাও ঝোপঝাড়, কোথাও বাঁশবাগান আবার কোথাও দু-চারটে ঘরবাড়ি। পশ্চিম দিকে রেললাইন। অবশ্য সে সবই এখন ডুবে আছে অন্ধকারে।

শূন্য মাঠে অন্ধকারে বসে নানান কথা ভাবতে লাগল কাঞ্চন। হঠাৎ একটা মৃদু টুং-টাং শব্দ কানে এল তার। শব্দটা সে আগেও একদিন মাঠে বসে থাকতে-থাকতে পেয়েছে। খানিকক্ষণ বাদে সে দেখল, দূর থেকে একবিন্দু আলো যেন মাঠ পেরিয়ে তার দিকেই এগিয়ে আসছে! আর তার সঙ্গে-সঙ্গে এগিয়ে আসছে সেই শব্দটা!

কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই শব্দ আর আলোটা আরও কাছে এগিয়ে গেল। শব্দটা যে ঘুঙুরের এবার কাঞ্চন তা বুঝতে পারল। লোকটা এসে দাঁড়াল তার সামনে। পরনে ফতুয়া আর ধুতি, একটা পায়ে ঘুঙুর বাঁধা। লোকটার গলা থেকে একটা ঝুড়ি ঝুলছে। তার গায়ে কয়েকটা কৌটো। কুপি বাঁধা। ঝুড়ির ভিতর চানাচুর রাখা আছে। আর সেই চানাচুরের মধ্যে বসানো আছে জ্বলন্ত অঙ্গার-পূর্ণ একটা পিতলের ঘটি

কুপির আলোতে যতটুকু বোঝা যায় লোকটা মধ্যবয়সি। দাড়ি-গোঁফহীন নিরীহ মুখমণ্ডল, মাথার চুল ছোট করে ছাঁটা, গলায় কণ্ঠি আছে। লোকটা কাঞ্চনকে বলল, “ঘটিগরম চানাচুর খাবেন বাবু? পাপড়িওয়ালা মুচমুচে চানাচুর?”

এ চানাচুর আগে অন্যত্র খেয়েছে কাঞ্চন। বেশ ভালো খেতে। কিন্তু তার রাতের খাওয়া হয়ে গেছে। সে মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিল চানাচুর কিনবে না।

লোকটা এরপর ঘুঙুরের শব্দ তুলে ফিরে যেতে গিয়েও হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। তারপর একবার পোস্ট অফিসের দিকে তাকিয়ে নিয়ে কাঞ্চনকে প্রশ্ন করল, “আপনি কি নতুন মাস্টারবাবু? শুনলাম না কি নতুন মাস্টারবাবু এসেছেন পোস্ট অফিসে?”

কাঞ্চন জবাব দিল, “হ্যাঁ, আমিই নতুন মাস্টার।”

লোকটা এবার নিজের কপালে হাত ঠেকিয়ে কাঞ্চনকে প্রণাম করে বলল, “আমার একটা কাজ করে দেবেন বাবু? মানি অর্ডারের ক-টা টাকা পাঠাতে হবে, পাঠিয়ে দেবেন? আমার নাম মাধব বিশ্বাস। রেললাইনের ওপাশে একটা ঝুপড়িতে থাকি। দেশের বাড়ি নদিয়া জেলার হাঁসখালি। পরিবার থাকে সেখানে। ওখানেই টাকা পাঠাব।”

কাঞ্চন কথাটা শুনে মৃদু হেসে বলল, “কেন পাঠাব না? ওটাই তো আমাদের কাজ। কাল সকাল দশটায় অফিস খুলবে। এসো, পাঠিয়ে দেব।”

কাঞ্চনের কথা শুনে একটু চুপ করে থাকার পর লোকটা একটু ইতস্তত করে বলল, “আমি সারাদিন ট্রেনে বাদাম, চানাচুর ফেরি করি। তারপর সন্ধেবেলায় ঘটিগরম বেচতে এই মাঠে আসি। আমি যদি এ সময় এসে আপনাকে টাকা দিয়ে যাই, আপনি টাকাটা পাঠিয়ে দেবেন?”

“সরকারি কাজ কি এভাবে করা যায়? রিসিট না দিয়ে আমি তোমার থেকে টাকা নেব কীভাবে? তাছাড়া ফর্ম ভরার ব্যাপার আছে।”

মাধব বিশ্বাস অনুনয়ের সুরে বলল, “আমি মুখ্যু মানুষ বাবু, লেখাপড়া জানি না। কাগজ আপনি আমাকে পরে দেবেন। আগের মাস্টারমশাইকেও আমি রাতে এসে টাকা দিয়ে যেতাম। তিনি আমার টাকা পাঠিয়ে দিতেন। দিনের বেলা ট্রেনে না উঠলে পঞ্চাশটা টাকা আমার মার যাবে।” এই বলে লোকটা চেয়ে রইল কাঞ্চনের দিকে।

গরিব মানুষ। পঞ্চাশ টাকার অনেক দাম তার কাছে। মাধব বিশ্বাসের অসহায়তার কথা জেনে কাঞ্চন শেষ পর্যন্ত বলল, “কত টাকা? নিয়ে এসো তবে। আমি ব্যবস্থা করে দেব।”

লোকটার মুখে এবার হাসি ফুটে উঠল। সে বলল, “পাঁচ হাজার টাকা মতো। আমার তিন মাসের সঞ্চয়। তিন মাস পর পর আমি বাড়িতে টাকা পাঠাই। ঘরে বউ আছে, ছেলেমেয়ে আছে। এই টাকাটার জন্য পথ চেয়ে বসে থাকে ওরা। আপনি কাজটা করে দিলে বড় উপকার হবে বাবু।”

কাঞ্চন বলল, “আমি এই সময়টা এখানে এসে বসি। কাল এসো তুমি। আমি সঙ্গে ফর্ম আনব। তুমি টিপ ছাপ করে দিও। আমি বাকি ফর্ম ভরে দেব।”

কাঞ্চনের কথায় লোকটা দু’হাত কপালে ঠেকিয়ে প্রণাম জানিয়ে বলল, “ঠিক আছে। কাল আমি টাকা নিয়ে আসব বাবু। রাধা মাধব আপনার মঙ্গল করুন! এবার আমি যাই।” এ কথা বলে ঘুঙুরের শব্দ তুলে ফেরার পথ ধরল লোকটা।

দূরে ক্রমশ হারিয়ে যেতে লাগল সেই ঘুঙুরের শব্দ। যেদিকে রেললাইন সেদিকে একসময় মাধব বিশ্বাসের কুপির আলোকবিন্দু মিলিয়ে গেল।

২

পরদিন সকালে যথারীতি অফিসে বসল কাঞ্চন। বেলা বারোটা নাগাদ সদর পোস্ট অফিসের পোস্টমাস্টারের কাছ থেকে ফোন এল। তিনি তাকে ডেকেছেন। এ গ্রাম থেকে দশটা স্টেশনের পর মহকুমা সদর। ঘণ্টা দেড়েক সময় লাগে পৌঁছোতে। টেলিফোন আসার পর পিয়ন রামলালের হাতেই ডাকঘরের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে কাঞ্চন রওনা হল রেলস্টেশনের দিকে।

বেলা তিনটে নাগাদ সে পৌঁছোল সদর পোস্ট অফিসে। বড় মাস্টার কি একটা কাজে ব্যস্ত ছিলেন তাই তার ডাক এল আরও ঘণ্টাখানেক পর। কাঞ্চন হাজির হল তার চেম্বারে। নতুন জায়গা কেমন লাগছে তার খোঁজখবর নিয়ে তিনি তাকে বললেন, “আজ মাসের দশ তারিখ। আর তিন-চার দিন পর থেকেই আপনার ডাকঘরের ঠিকানায় টাকা আসা শুরু হবে। এ গ্রামের বহু মানুষ ভিন রাজ্যে শ্রমিকের কাজ করে। তারাই টাকা পাঠায়। রোজ ক্যাশ গাড়ি গিয়ে টাকা দিয়ে আসবে।”

কাঞ্চন বলল, “জানি স্যার। পিয়ন আমাকে কথাটা বলেছে।”

সদরের মাস্টার বললেন, “এ সময় কোনো কোনো দিন দু-তিন লাখ টাকাও পাঠানো হবে। এ সময়টা একটু সতর্ক থাকবেন।”

কাঞ্চন জানতে চাইল, “কী ধরনের সতর্কতা?”

প্রশ্ন শুনে বড় সাহেব একটু চুপ করে থেকে বললেন, “ওই একটু সাবধানে থাকা আর কী। ইতিপূর্বে এ সময়টায় বেশ কয়েকবার ডাকাতি হয়েছে ওখানে। তাই আপনাকে কথাটা জানিয়ে রাখলাম।”

মহকুমা পোস্ট অফিসের কর্তার কথা শুনে কাঞ্চন বেশ কিছুটা ঘাবড়ে গিয়ে বলল, “কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়? থানা পুলিশে জানিয়ে রাখব?”

বড় কর্তা একটু ভেবে নিয়ে বললেন, “তাতে বিশেষ লাভ হবে বলে মনে হয় না। কারণ, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না পেলে ব্যাপারটাতে তারা গুরুত্ব দেবেন না। তবে আপনি যে কাজটা করতে পারেন…আগের পোস্টমাস্টার এমনটাই করতেন। তাতে তার সময় ডাকাতিতে ভাঁটা পড়েছিল।”

“কী কাজ?” জানতে চাইল কাঞ্চন।

“দিনের বেলাতে আপনার তেমন ভয় নেই। সব ডাকাতির ঘটনাগুলোই ঘটেছিল রাতের বেলাতে। আপনার আগের পোস্টমাস্টার গ্রামেরই কয়েকজনকে এ সময় ক-দিনের জন্য নিয়োগ করতেন। রাতে পোস্ট অফিসের বাইরে পাহারা দেবার জন্য। আপনিও তাই করতে পারেন। অবশ্য তাদের খরচ আপনাকেই বহন করতে হবে।”

“ঠিক আছে, তাই করব। রামলালকে বলব এমন লোক জোগাড় করে আনার জন্য।” এরপর বড়কর্তার সঙ্গে আরও কিছু কথা বলার পর কাঞ্চন সদর পোস্ট অফিস ছেড়ে ফেরার জন্য রওনা হয়ে গেল। বেশ অনেকটা সময় লেট করল ট্রেনটা। সদরের পোস্টমাস্টারের বলা কথাগুলো বেশ ভাবিয়ে তুলেছে তাকে।

ট্রেন থেকে নেমে প্রথমেই সে স্টেশন লাগোয়া বাজারে ঢুকল। পোস্ট অফিসের নিজস্ব তালা থাকলেও আরও নিরাপত্তার বন্দোবস্ত করতে সে বেশ কয়েকটা তালা কিনল দোকান থেকে। তারপর নিত্য প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র কিনে সে যখন বাড়ি ফিরলে তখন প্রায় রাত আটটা বেজে গেছে। ফ্রেশ হয়ে রাতের খাওয়ার পাট মেটাতে আরও একটা ঘণ্টা সময় লেগে গেল। তারপর অভ্যাসমতো সে যখন তার ঘর থেকে বেরিয়ে মাঠের ধারে খোলা বাতাসে বসল তখন ঘড়ির কাঁটা রাত ন-টা ছুই ছুই।

মাঠে বসার পরই তার মনে পড়ে গেল গতরাতের সেই ঘটিগরম চানাচুরওয়ালার কথা। লোকটা কি তার খোঁজে এসেছিল? আজ মাঠে এসে বসতে বেশ খানিকটা দেরি হয়ে গেছে। কাঞ্চন চারপাশে ভালো করে দেখে নিল। কিন্তু অন্ধকার মাঠে কাঞ্চন চানাচুরওয়ালা মাধব বিশ্বাসকে দেখতে পেল না।

কাঞ্চন কিছুতেই মন থেকে দুশ্চিন্তাটা তাড়াতে পারছিল না। ডাকাতি এড়াতে কী কী সতর্কতা নেওয়া যেতে পারে, সে কথাই ভাবতে লাগল বসে বসে।

বেশ কিছুক্ষণ এভাবে কেটে গেল। হঠাৎ অন্ধকার ফুঁড়ে দু’জন মানুষকে তার দিকে এগিয়ে আসতে দেখল কাঞ্চন। লোক দুটো এসে দাঁড়াল তার সামনে। আধো-অন্ধকারে যতটুকু দেখা যায় তাতে তাদেরকে বেশ শক্ত-সমর্থ বলেই মনে হল। দুজনেই জোড়হাত করে প্রণাম জানাল কাঞ্চনকে। তারপর একজন কাঞ্চনের উদ্দেশে বলল, “আপনার সঙ্গেই দেখা করতে এলাম মাস্টারবাবু।”

কাঞ্চন প্রশ্ন করল, “আপনারা কারা?”

প্রশ্নকর্তা জবাব দিল, “আমার নাম কার্তিক বাগদি, আর এ হল গণেশ কাহার। এ গ্রামেই থাকি। রাতে পাহারার ব্যাপারে আপনার সঙ্গে কথা বলতে এলাম। মানে, ডাকাতরা যাতে লুঠ না করতে পারে সে জন্য পাহারা দেবার ব্যাপারে কথা বলতে এসেছি।”

কথাটা শোনার সঙ্গে-সঙ্গেই কাঞ্চন সোজা হয়ে বসে বলল, “ডাকাতের ব্যাপারটা আপনারা জানলেন কীভাবে?”

প্রশ্ন শুনে গণেশ কাহার নামের লোকটা হেসে বলল, “শুধু আমরা কেন, পোস্ট অফিসে যে বেশ কয়েকবার ডাকাত পড়েছে তা গ্রামের সবাই জানে। আপনি অনুমতি দিলে একটু বসে কথা বলি?”

কাঞ্চন বলল, “আচ্ছা বসো।”

ওরা দু’জনেই কাঞ্চনের থেকে সামান্য দূরত্বে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল। তারপর বলল, “আগের মাস্টারবাবু আমাদের রাত পাহারার কাজে রাখতেন। লাঠি আর বল্লম হাতে আমরা পাহারা দিলে ডাকাতের সাহস কী যে এখানে হানা দেয়! আপনাদের বুড়ো পিয়ন আমাদের চেনে৷”

পিয়ন তাদের পরিচয় জানে শুনে কাঞ্চন বলল, “তোমরা পাহারা দেবার জন্য কত টাকা নাও? কাজের শর্ত কী?

“তেমন কিছু নয়। রাত পিছু দু’জনকে পঞ্চাশ টাকা করে অর্থাৎ মোট একশো টাকা দিলেই হবে। আগের মাস্টারবাবুও তাই দিতেন। এছাড়া আর কোনো শর্ত নেই।” কার্তিক জবাব দিল।

খুব একটা বেশি দাবি করছে না লোকগুলো। কাঞ্চন বলল, “এ টাকাতে তোমাদের পোষায়?”

গণেশ বলল, “আমরা এর পাশের গ্রামেই জন খাটছি এখন। এক জনের মুখে শুনলাম আপনি এসেছেন তাই কথা বলতে এলাম। রাতে তো আমাদের কাজ নেই, তাই আপনি বললে রাত পাহারার কাজ করব। সন্ধ্যার সময় আসব, আবার ভোর-ভোর কাজে ফিরে যাব। আমরা গরিব মানুষ বাবু। যে ক-টা বাড়তি পয়সা আয় করতে পারি সেটাই আমাদের কাছে অনেক।”

ওদের কথা শুনে কাঞ্চন বলল, “ঠিক আছে, আমি একটু ভেবে দেখি। কিন্তু কীভাবে যোগাযোগ করব তোমাদের সঙ্গে?”

কার্তিক বলল, “তিন-চার দিন পর আমরা আবার কাজ সেরে এখানে খোঁজ নিতে আসব। ওই সময়েই তো পাহারার দরকার হয়। আপনি বললে কাজে লেগে যাব।”

“ঠিক আছে, তবে তাই হবে। দরকার হলে কাজে নেব তোমাদের।”

গণেশ বলল, “দেখবেন বাবু। আমরাই এ কাজ করে আসছি। অন্য কাউকে কাজে নিলে মনে বড় ব্যথা পাব। এবার আমরা আসি বাবু।” বলে কাঞ্চনকে আরও একবার প্রণাম জানিয়ে ফেরার পথ ধরল তারা দু’জন।

কিছুক্ষণের মধ্যে মাঠের অন্ধকারে তারা হারিয়ে যেতেই কাঞ্চন ভাবল, লোক দুটোর সম্পর্কে খোঁজ নিতে হবে রামলালের কাছ থেকে। তারপর সে পাহারার ব্যাপার নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

এবারে ঘরে ফেরার জন্য উঠে দাঁড়াল সে। কিন্তু এক-পা এগোতেই কাগজে মোড়ানো কিছু একটা পায়ের নীচে পড়তেই চমকে উঠল সে। কৌতূহলবশত সেটা মাটি থেকে তুলে নিয়ে তার গায়ের বাঁধনটা খুলতেই তার ভেতর থেকে বেরিয়ে এল অনেক ক-টা নোট! কার টাকা এগুলো? ওই লোক দুটোর? নাকি অন্য কারও টাকা? ব্যাপারটা ঠিক বুঝে উঠতে পারল না কাঞ্চন। চারপাশে তাকিয়েও সে কাউকে দেখতে পেল না। অগত্যা সে কোয়ার্টারের দিকে এগোল।

ঘরে ঢুকে বিদ্যুৎ বাতির ক্ষয়াটে আলোয় সে নোটগুলো দেখল। দশটা পাঁচশো টাকার নোট! এরপর যে কাগজটা দিয়ে নোটগুলো জড়ানো ছিল সেটা আলোর নীচে উল্টেপাল্টে দেখতেই ব্যাপারটা অনেকটা স্পষ্ট হয়ে গেল তার কাছে। পুরোনো কাগজটার একপাশে জনৈক রাধারানি বিশ্বাসের নাম লেখা আছে নদিয়া জেলার হাঁসখালির ঠিকানা সহ। অপরদিকে আর একটা নাম লেখা—মাধব বিশ্বাস।

কাগজটা দেখে কাঞ্চন অনুমান করল, ঘটিগরম চানাচুরওয়ালা সেই মাধব নামের লোকটাই নিশ্চয়ই দেখা করতে এসেছিল তার সঙ্গে মানি অর্ডারের টাকা দেবার জন্য। আর তখনই টাকাগুলো তার কাছ থেকে পড়ে গিয়ে থাকবে। গরিব মানুষটা যখন দেখবে তার টাকাগুলো খোয়া গেছে, বড্ড ভেঙে পড়বে। ভাগ্যিস টাকাগুলো কাঞ্চনই কুড়িয়ে পেয়েছে।

টাকাগুলো হাতে নিয়ে কাঞ্চন মনে মনে ঠিক করল, মাঠে যখন মাধব তার চানাচুর বেচতে আসবে তখন সে তাকে ডেকে ব্যাপারটা জানিয়ে তারপর টাকাটা অর্ডার করবে। তেমন হলে রেললাইনের ওপারে লোক পাঠাবে তার খোঁজে। আপাতত টাকাটা যেমন আছে তেমনই থাক। একথা ভেবে সে আগের মতোই টাকাটা কাগজে মুড়ে আলমারিতে তুলে রেখে শুয়ে পড়ল।

৩

পরদিন সকালে কাঞ্চন পিয়নকে ডেকে জিগ্যেস করল, “এখানে যে বেশ কয়েকবার ডাকাতি হয়েছে সে কথা তুমি আমাকে বলোনি তো?”

প্রশ্ন শুনে বুড়ো পিয়ন বলে, “তা হয়েছে কয়েকবার। আপনি নতুন এসেছেন, ঘাবড়ে যাবেন সেই ভয়ে বলিনি। তবে আগের মাস্টারবাবু রাত পাহারার ব্যবস্থা করার পর আর ডাকাতি হয়নি।”

“তুমি জানো সেই পাহারাদারদের খবর?”

“হ্যাঁ বাবু, কার্তিক আর গণেশ। ওরা এ গাঁয়েরই লোক। খুব সাহসী। তবে শুনলাম তারা নাকি ক-দিন হল অন্য গ্রামে মুনিষ খাটতে গেছে।”

কাঞ্চন বলল, “হ্যাঁ, জ্যানি। ওরা দু’জন কাল রাতে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল রাত পাহারার জন্য।”

“ওদের রাখতে পারেন বাবু। সৎ লোক।” পিয়ন আশ্বাস দিল।

রামলালের মুখ থেকে লোকদুটোর সম্পর্কে সার্টিফিকেট পেয়ে কাঞ্চন বলল, “ঠিক আছে, তেমন প্রয়োজন বুঝলে ওদেরই ক-টা রাতের জন্য রাখব এবার থেকে।” খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে কাঞ্চন এবার রামলালকে জিগ্যেস করল, “আচ্ছা, তুমি ঘটিগরম চানাচুরওয়ালা মাধবকে চেনো, যে সন্ধ্যাবেলা মাঠে চানাচুর বিক্রি করতে আসে? রেললাইনের ও পাশের বস্তিতে থাকে?”

“হ্যাঁ বাবু, মুখ চিনি। ওর বাড়ি না চিনলেও খুঁজে পেতে অসুবিধা হবে না। মাস্টারবাবু, আপনার কি তাকে দরকার?”

ব্যাপারটা না ভেঙে কাঞ্চন তাকে শুধু বলল, “প্রয়োজন হলে তার খোঁজে তোমাকে পাঠাব।”

সেদিন রাতেও খাওয়া সেরে মাঠের ধারে গিয়ে বসল কাঞ্চন। সে আশা করেছিল মাঠে ঘটিগরম চানাচুরের কুপির আলো দেখা যাবে। কিন্তু মাধব বিশ্বাসের দেখা মিলল না। এমনকী তার পরেরদিনও মাঠে এল না লোকটা।

এর পরদিনই সদর থেকে ক্যাশ গাড়ি এল প্রথম দফার মানি অর্ডারের টাকা নিয়ে। সে টাকা নিতে লোকজনও এল। প্রায় সত্তর ভাগ টাকা বিলিও হয়ে গেল। সারাদিনের পরিশ্রমের পর কাঞ্চন মাঠে গিয়ে বসার কিছুক্ষণের মধ্যেই কার্তিক আর গণেশ এসে হাজির হল তার কাছে। কার্তিক বলল, “বাবু, রাত পাহারা লাগবে নাকি?”

খুব বেশি টাকা সেদিন মজুত নেই। তাই কাঞ্চন বলল, “আজকে পাহারার দরকার নেই।”

কাঞ্চনের জবাব শুনে গণেশ বলল, “ঠিক আছে বাবু, কাল আবার আমরা খোঁজ নিতে আসব।”

মাধব বিশ্বাসের দেখা মিলল না সেদিনও। তবে সে রাতে ঘুমের ঘোরে একবার যেন কাঞ্চনের মনে হল ঘুঙুরের টুং-টাং শব্দ বাজল কোথাও।

পরদিনও সদর থেকে ক্যাশ গাড়ি এল। এদিনও সত্তর শতাংশ টাকা বিলি হয়ে গেল। রাতে মাঠে মাধব বিশ্বাস না এলেও কার্তিক, গণেশ কিন্তু কাজের প্রত্যাশায় এসে হাজির হল। যদিও দু-দিনের বেশ কিছু টাকা জমা রয়েছে পোস্ট অফিসের সিন্দুকে তবুও কাঞ্চন শেষ পর্যন্ত তাদের জানিয়ে দিল পাহারার প্রয়োজন নেই। তারা ফিরে গেল৷

কার্তিক-গণেশ চলে যাওয়ার পর মাঠ থেকে ফিরে পোস্ট অফিসের ঘরের তালাগুলো ভালো করে লাগানো হয়েছে কিনা তা পরীক্ষা করে বিছানায় শুয়ে পড়ল কাঞ্চন।

কিন্তু হঠাৎই মাঝরাতে একটা শব্দে ঘুম ভেঙে গেল তার। ঘুঙুরের শব্দ! অন্ধকার ঘরে শুয়ে কাঞ্চনের মনে হতে লাগল সে শব্দ যেন ঘুরে বেড়াচ্ছে পোস্ট অফিস আর কাঞ্চনের ঘরকে বেড় দিয়ে। কিছুক্ষণ শব্দটা শোনার পর কাঞ্চন উঠে বসে জানালার বাইরে তাকাল। আর সঙ্গে-সঙ্গেই শব্দটা যেন হারিয়ে গেল! জানালা দিয়ে মাঠের দিকে তাকিয়ে কাঞ্চন ভাবল, সত্যিই কি ঘুঙুরের শব্দ শুনল? না কি ওর মনের ভুল?

বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর কাঞ্চন মনে মনে ভাবল, “মানি অর্ডারের ঝামেলা মিটে গেলে রামলালকে পাঠাব লোকটার খোঁজে। আমি যে টাকাটা পেয়েছি তা তাকে জানানো দরকার।”

পরদিন সকালে তৃতীয় দিনের মতো ক্যাশ গাড়ি এল মানি অর্ডারের টাকা নিয়ে।

৪

পিয়ন রামলাল বাড়ি বাড়ি ঘুরে মানি অর্ডারের টাকা দিয়ে আসার পর দিনের শেষে কাঞ্চন ক্যাশ গুনতে বসল। এদিন অন্য দিনের থেকে দ্বিগুণ টাকা এসেছে। যার অর্ধেক বিলি করা যায়নি। তাছাড়া গত দু-দিনের বেশ কিছু টাকা পড়ে আছে। কাঞ্চন হিসাব করে দেখল আজ টাকার পরিমাণ প্রায় চার লক্ষ! অঙ্কটা যে বিরাট তা বলাই বাহুল্য। সত্যিই আজ দুশ্চিন্তা হচ্ছে কাঞ্চনের। পিয়নও বলল, “আজ রাতে কিন্তু পাহারার ব্যবস্থা করলে ভালো হয় বাবু।”

কাঞ্চনও সিদ্ধান্ত নিল, এ দিন রাতে কার্তিক-গণেশকে পাহারার কাজে নিযুক্ত করবে। এতগুলো টাকা যখন আছে তখন ঝুঁকি নেওয়া কিন্তু ঠিক হবে না।

টাকাগুলো থলেতে পুরে সিন্দুকে রেখে পোস্ট অফিসের ঘরের দরজায় ভালো করে তালা ঝুলিয়ে কাঞ্চন যখন বাইরে বেরোল তখন অন্ধকার নেমে গেছে। দ্রুত খাওয়া সেরে কাঞ্চন মাঠের দিকে এগোল পাহারাদারদের খোঁজে। অমাবস্যার রাত। চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার। পাঁচ হাত দূরেও কিছু দেখা যাচ্ছে না। কাঞ্চন মাঠে পৌঁছোনোর কিছুক্ষণের মধ্যেই যথারীতি কার্তিক-গণেশ এসে হাজির।

কাঞ্চন ওদেরকে দেখে খানিক স্বস্তি পেল। বলল, “ভালোই হল আজও তোমরা এসেছ, আজকের রাতটা তোমাদের পাহারা দিতে হবে।”

কাঞ্চনের কথা শুনে অন্ধকারের মধ্যে হাসি ফুটে উঠল তাদের মুখে। কার্তিক বলল, “আপনি কিছু চিন্তা করবেন না। রাত দশটা নাগাদ আমরা লাঠি আর বল্লম নিয়ে হাজির হয়ে যাব।”

ওরা চলে গেলে কাঞ্চন ঘরে ফিরে এল। যতক্ষণ না পাহারাদাররা আসে ততক্ষণ তার দুশ্চিন্তা কাটবে না। ঘড়ির কাটার টিক টিক শব্দের সঙ্গে সময় এগিয়ে চলল।

একসময় ঘড়ির কাঁটা দশটা ছুঁল। কিন্তু দশটা পেরিয়ে গেলেও তারা উপস্থিত না হওয়াতে উত্তেজনা বাড়তে লাগল কাঞ্চনের। ওরা আসবে তো?

জানালা দিয়ে মাঠের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে ওদের জন্য প্রতীক্ষা করতে লাগল কাঞ্চন। হঠাৎই সেই ঘুঙুরের শব্দটা কানে এল! শব্দটা যেন অন্ধকার মাঠের ভেতর থেকে নাচতে নাচতে এগিয়ে আসছে পোস্ট অফিসের দিকে! তবে কী মাধব বিশ্বাস তার সঙ্গে দেখা করতে আসছে? হ্যাঁ, শব্দটা তো সে স্পষ্টই শুনতে পাচ্ছে! কিন্তু অন্ধকারে কিছুই নজরে এল না তার। শব্দটা এসে থেমে গেল পোস্ট অফিসের সামনে। কাঞ্চনের মনে হল লোকটা হয়তো এবার হাঁক দেবে তার উদ্দেশে।

কয়েক মুহূর্ত নিস্তব্ধে কেটে গেল। তারপর একটা গলা শোনা গেল ঠিকই, তবে সেটা কার্তিক নামের লোকটার গলা, “বাবু আমরা এসেছি।”

গলা শুনে নিশ্চিন্ত হয়ে কাঞ্চন এগিয়ে গেল দরজার দিকে। “যাক, নিশ্চিন্ত হলাম। ভোরের আলো ফুটলে যাবার সময় টাকা নিয়ে যেও।”

কথাটা শুনে ফ্যাসফেসে গলায় কার্তিক বলল, “হ্যাঁ, টাকাইতো নিতে এসেছি আমরা। আর টাকাটা আমরা রাতেই নেব।”

“ঠিক আছে। আমি টাকাটা এখনই দিয়ে দিচ্ছি।”

গণেশ বলল, “শুধু ওই একশো টাকা নয়, তোমার পোস্ট অফিসের সিন্দুকে যে টাকা আছে সেটাও আমাদের চাই।”

“তার মানে?”

গণেশের হাতে ধরা বল্লমের ফলাটা এগিয়ে এল কাঞ্চনের দিকে। তারপর আরক্ত চোখে বলে, “মানে, সিন্দুকের চাবিটা আমাদের চাই! সেটা না পেলে তুমি আর কাল ভোরের আলো দেখবে না মাস্টার!”

বল্লমের হিম শীতল তীক্ষ্ণ ফলাটা স্পর্শ করল কাঞ্চনের কণ্ঠনালী। কার্তিকের হাতেও কখন যেন নিঃশব্দে উঠে এসেছে একটা ধারালো ছোরা!

হতভম্ব কাঞ্চন, ঠিক বুঝে উঠতে পারল না তার এ মুহূর্তে ঠিক কী করা উচিত? তবে লোক দুটো যে পাহারাদারদের ছদ্মবেশে সত্যিই ডাকাতি করতে এসেছে তা তার বুঝতে অসুবিধে হল না।

তাকে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কার্তিক বাঘের মতো গর্জন করে বলল, “অফিস ঘর আর সিন্দুকের চাবি দাও। সময় নষ্ট কোরো না! এখানে কেউ নেই যে তোমাকে বাঁচাতে আসবে।”

নিরুপায় কাঞ্চন চাবির গোছা বার করতে যাবে এমন সময় হঠাৎ বেজে উঠল সেই ঘুঙুরের শব্দ। আর তারপরই অন্ধকারের মধ্যে থেকে একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “কে বলে কেউ নেই…আমি আছি ঘটিগরমওয়ালা।”

সেই কণ্ঠস্বর কানে যেতেই কার্তিক আর গণেশের চোখ মুখের চেহারা বদলে গেল। কাঞ্চন দেখল, তাদের খানিক তফাতে দাঁড়িয়ে আছে সেই ঘটিগরম চানাচুরওয়ালার অস্পষ্ট মূর্তি। তার গলায় ঝোলানো ঝুড়িতে ঘটির মধ্যে রাখা অঙ্গারের লাল আভায় শুধু তার মুখটা দেখা যাচ্ছে।

তাকে দেখেই গণেশ বলে উঠল, “আরে, ব্যাটা তো মরেনি দেখছি! শেষ করে দে ওকে! আমাদের কাজের কোনও সাক্ষী রাখা চলবে না!”

সঙ্গীর পরামর্শমতো কার্তিক তার ছুরিটা বাগিয়ে ধরে লোকটার দিকে এগোল তাকে শেষ করার জন্য। মাধব নামের লোকটা কিন্তু তাতে ভয় পেল না। বরং কাঠ কয়লার রক্তিম আভাতে তার মুখে যেন অদ্ভুত একটা হাসি ফুটে উঠল। কার্তিক ছুরিটা উঠিয়ে ওর সামনে ধেয়ে যেতেই মাধব একটা অদ্ভুত কাজ করল। ঘটির ভিতর হাত ঢুকিয়ে সে বার করে আনল গনগনে জ্বলন্ত অঙ্গারের টুকরোগুলো। তারপর তা মুঠো করে ছুড়ে মারল কার্তিকের মুখ আর শরীর লক্ষ করে।

জ্বলন্ত আগুন মুখে পড়তেই ছুরি ফেলে দিয়ে আর্তনাদ করে উঠল কার্তিক। ব্যাপারটা দেখে গণেশ, কাঞ্চনকে ছেড়ে এগিয়ে গিয়ে তার হাতের বল্লমটা সোজা ছুড়ে মারল মাধবকে লক্ষ করে। বল্লমটা গিয়ে চানাচুরের ঝুড়িতে লেগে ছিটকে পড়ল। মাধব আবারও অদ্ভুতভাবে ঘটির মধ্যে হাত ঢুকিয়ে তুলে নিল একমুঠো জ্বলন্ত অঙ্গার। তারপর তা একইভাবে অব্যর্থ লক্ষ্যে ছুড়ে দিল গণেশের শরীর লক্ষ করে।

অঙ্গারের কয়েকটা টুকরো গণেশের বুকের কাছে জামার খোলা অংশ দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। সেগুলো বার করার জন্য গণেশ লাফালাফি শুরু করে দিল। মাধব আবারও একইভাবে অঙ্গার তুলে নিয়ে ছুড়তে শুরু করল ওদের দু’জনকে লক্ষ করে। আর এরপর কার্তিক হঠাৎ বলে উঠল, “ও আগুনগুলো হাত দিয়ে ধরছে কীভাবে?”

তার কথা শুনে গণেশেরও খেয়াল হল, “তাই তো, ও এমনভাবে জ্বলন্ত কয়লাগুলো ধরছে কী করে?”

ওদের দু’জনের কথা শুনে মাধব হেসে উঠে বলল, “আগুনে পুড়েছি তো তাই।” তার কথায় কার্তিক-গণেশ কী বুঝল কে জানে, তারা হুড়মুড় করে ছুটতে শুরু করল অন্ধকার মাঠের দিকে।

চানাচুরওয়ালা এবার এগিয়ে এল কাঞ্চনের দিকে। এসে বলল, “আপনার আর ভয় নেই বাবু। ওরা আর আসবে না। তবে আমি ওদের ছাড়ব না। কোথায় পালাবে ওরা?”

প্রাথমিক বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে কাঞ্চন মাধবকে বলল, “ভাগ্যিস তুমি এসে পড়েছিলে! নইলে এই কার্তিক-গণেশ আমাকে হয়তো মেরেই ফেলত… অথচ ওদের আমি বিশ্বাস করে পাহারা দিতে ডেকেছিলাম।”

মাধব মাথা নাড়িয়ে বলল, “না না বাবু, এরা কার্তিক-গণেশ নয়। এরা জেল খাটা খুনি। নাম ভাঁড়িয়ে এসেছিল আপনার কাছে। তবে শাস্তি ওরা পাবেই! কিন্তু একটা কষ্ট রয়ে গেল আমার…’

“কী কষ্ট?” জানতে চাইল কাঞ্চন।

“সেদিন কথামতো আমি টাকা নিয়ে আসছিলাম আপনাকে দেবার জন্য। মাঠের কিনারে ওরা দুজন আমাকে ধরল, টাকাগুলো কেড়ে নিল। আর তারপর…’

লোকটাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে কাঞ্চন বলে উঠল, “ও টাকা আমি কাগজে লেখা ঠিকানা সমেত সেদিনই মাঠে কুড়িয়ে পেয়েছি। শয়তান দুটোর কাছ থেকে পড়ে গেছিল নিশ্চয়ই। আমি তাই তোমাকে খুঁজছিলাম। টাকাগুলো আমার কাছেই আছে। তুমি বললেই ওই পাঁচ হাজার টাকা কালই আমি পাঠিয়ে দেব।”

কথাটা শুনেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল মাধব বিশ্বাসের মুখ। “টাকাটা আপনার কাছে বাবু! টাকাটা দয়া করে কালই বাড়ির ঠিকানায় পাঠিয়ে দেবেন বাবু…টাকার বড় দরকার ওদের!”

কাঞ্চন বলল, “তুমি নিশ্চিন্তে থাকো। কাল সকালে অফিস খুললেই আমি প্রথমেই তোমার কাজটা করে দেব। একটা কথা, তুমি তো এত জায়গা ঘুরে বেড়াও, রাতে পাহারার জন্য দুটো বিশ্বাসী লোক দিতে পারবে? আসল কার্তিক-গণেশকে খবর দিতে পারবে?”

মাধব কথাটা শুনে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পর বলল, “পাহারার জন্য লোক রাখতে হবে না বাবু। সে কাজ এখন থেকে আমিই করে দেব। রাতে ঘুঙুরের শব্দে জানান দেব, আমি এসেছি। এবার নিশ্চিন্তে শুয়ে পড়ুন। আমি শয়তান দুটোর ব্যবস্থা করি। দয়া করে মানি অর্ডারটা করে দেবেন বাবু।”

“কাল সকালেই করে দেব।” কাঞ্চন তাকে আশ্বাস দিল।

মাধব বিশ্বাস এরপর আর দাঁড়াল না। কাঞ্চনকে প্রণাম জানিয়ে ঘুঙুরের শব্দ তুলে অদৃশ্য হয়ে গেল অন্ধকার মাঠে।

পরদিন সকালে অফিস খুলতেই পিয়ন এসে খবরটা দিল। জেল পালানো দু’জন খুনে আসামীর লাশ পাওয়া গেছে মাঠের ধারে লাইনের গায়ে। সে আরও খবর এনেছে, ওই জায়গাতেই নাকি দিন ছয়েক আগে মিলেছিল চানাচুরওয়ালা মাধব বিশ্বাসের লাশও! কারা না কি তাকে সেখানে মেরে রেখে গেছিল। এই দ্বিতীয় খবরটা আগে জানা ছিল না রামলালের।

কাঞ্চনের কাছে এবার স্পষ্ট হয়ে গেল সবটা। মাধব কীভাবে এত অনায়াসে জ্বলন্ত অঙ্গারগুলো হাতে তুলে নিচ্ছিল, কেন শেষ পর্যন্ত তার ভয়ে ছুটে পালিয়েছিল ডাকাত দুটো—সব কিছু জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল। কাঞ্চন এ বিষয়ে আর কোনও কথা বাড়াল না। মাধব বিশ্বাসের অর্ডারের ফর্ম ভরতে শুরু করল।

না, আজ রাতে আর কোনো পাহারাদার রাখল না কাঞ্চন। একটু রাত বাড়তেই সে শুনতে পেল ঘুঙুরের টুংটাং শব্দ। শব্দটা পাক খেতে লাগল পোস্ট অফিসের চারপাশে। কাঞ্চন বুঝতে পারল গরিবের টাকা পাহারা দিতে এসেছে মাধব। সে এ টাকার মর্ম বোঝে। ঘুঙুরের শব্দ শুনতে-শুনতে কাঞ্চন নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *