দিনেমারের বাড়ি – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

দিনেমারের বাড়ি

ধনঞ্জয়বাবুর বাড়িটা একদম গঙ্গার গায়েই দাঁড়িয়ে। জোয়ারের সময় গঙ্গার জল আজও এসে ছুঁয়ে যায় প্রায় তিনশো বছরের প্রাচীন বাড়িটার পিছনের ঘাটটাকে, তাঁর সিঁড়িগুলোকে। গঙ্গার পশ্চিমপাড়ে শ্রীরামপুর থেকে উত্তরে চুঁচুড়া পর্যন্ত এ-তল্লাটে একসময় বহু ইউরোপীয় জাতির বাণিজ্যকুঠী বা উপনিবেশ গড়ে উঠেছিল। ওলন্দাজ, দিনেমার, ফরাসি, ইংরেজ। কালের নিয়মে তাঁদের কোনো অস্তিত্ব বর্তমানে না-থাকলেও তাদের কিছু-কিছু চিহ্ন আজও গঙ্গার পাড় বরাবর আধুনিক জনপদগুলোর মধ্যে কিছুটা মুখ লুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হয়তো সেকালে কোনো ইউরোপীয় গর্ভনর হাউস বা বাণিজ্যকুঠী, কোনো কবরস্থান, নজরমিনার বা কোনো বর্ধিষ্ণু বণিকের বাড়ি। বৃহৎ স্থাপত্যগুলো সরকার অধিগ্রহণ করে সরকারি দপ্তরে রূপান্তরিত করলেও এখনও এসব অঞ্চলে এমন কিছু বাড়িঘর রয়ে গেছে বা ব্যক্তি মালিকানাধীন। গঙ্গার ধারে দাঁড়িয়ে ধনঞ্জয়বাবুর থামওয়ালা দোতলা বাড়িটা তেমনই একটা বাড়ি। তাঁর বাপ-ঠাকুরদার মুখে গল্প শুনেছেন যে ও বাড়িটা না কি দিনেমার বা ডাচদের তৈরি। তারা যখন এদেশ থেকে চলে যায় তখন তাদের থেকে এবাড়ি কিনে নেন ধনঞ্জয়বাবুর পূর্বপুরুষরা। এদেশে ব্যবসা করতে আসা ইউরোপীয়রা সে সময় শরীর ও মনে যেমন শক্তপোক্ত হতেন, তেমনই তাদের তৈরি জিনিসগুলোও শক্তপোক্ত হত। তাই হয়তো-বা সময়কে অতিক্রম করে আজও দাঁড়িয়ে আছে বাড়িটা। তার গায়ে কোথাও কোথাও পলেস্তারা খসে পড়েছে ঠিকই, বাড়ির কার্নিশে সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য যে-মূর্তিগুলো ছিল সেগুলো ভেঙে পড়েছে ঠিকই, কিন্তু এটুকু তো হবারই কথা। বাড়ির বয়স তো আর কম হল না। ধনঞ্জয়বাবুর পিতা-মাতা গত হয়েছেন অনেকদিন। তার ভাই-বোনও কেউ নেই। অকৃতদার ধনঞ্জয়বাবু একলাই থাকেন এবাড়িতে। সকাল সাতটায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে কলকাতাতে অফিস করতে যান তিনি। ফিরে আসতে আসতে সন্ধ্যা সাতটা বেজে যায়। রবিবার ছুটির দিন সকালে সারা সপ্তাহের বাজার সারেন তিনি। আর বিকালবেলায় তাঁর সমবয়সি কয়েকজন প্রবীণ-মানুষ আড্ডা দিতে আসেন ধনঞ্জয়ের বাড়িতে, অথবা ধনঞ্জয় তাঁদের সঙ্গে গল্প করতে যান কাছেই গঙ্গার ধারে একটা বসার জায়গাতে। এভাবেই ধনঞ্জয়বাবুর দিন মোটামুটি ভালোই কেটে যায়।

কিন্তু সম্প্রতি ধনঞ্জয়বাবুর মনের মধ্যে একটা দুশ্চিন্তা কাজ করছে। নৃসিংহ দত্ত পরপর বেশ কয়েকদিন তার সাথে দেখা করতে এসেছিল এবাড়িটা তার কাছে বিক্রির প্রস্তাব নিয়ে। সে না কি বাড়িটা ভেঙে এখানে ফ্ল্যাট বানাতে চায়। প্রোমোটিংয়ের ব্যবসা করে সে। নৃসিংহ দত্তর সঙ্গে ধনঞ্জয়ের পূর্বপরিচয় না থাকলেও লোকটার নাম শুনেছেন তিনি। নাম নয়, বদনাম বলাই ভালো। লোকটা না কি সুবিধার নয়, নানা ধরনের দু-নম্বরী কারবার আছে তার, এসবের পাশাপাশি রিয়েল এস্টেট অর্থাৎ জমিজমা, প্রোমোটিংয়ের ব্যবসাতেও নেমেছে সে। লোকটাকে তিনি অবশ্য প্রথম দিনই জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, বাড়িটা তিনি বিক্রি করতে আগ্রহী নন, তবুও লোকটা বারবার আসছে। ধনঞ্জয়বাবুকে নানা ধরনের প্রলোভন দেখাবার চেষ্টা করছে বাড়িটা বিক্রি করার জন্য।

এ রবিবারও যখন ধনঞ্জয় বাজার থেকে ফেরার পর বেলা দশটা নাগাদ মোটরবাইক চেপে এক সঙ্গীকে নিয়ে নৃসিংহ দত্ত আবারও ধনঞ্জয়বাবুর বাড়িতে হাজির হয়ে ধনঞ্জয়বাবু মত পরিবর্তন করেছেন কি না তা খোঁজ নিতে এল এবং যাবার সময় বলে গেল যে, সে আবারও আসবে, তখন ধনঞ্জয় ঠিক করলেন ব্যাপারটা তাঁর বন্ধুদের জানিয়ে রাখা ভালো। কারণ, দিনকাল ভালো নয়, আর নৃসিংহ দত্ত লোকটাও সুবিধার লোক নয় তাই।

বিকাল পাঁচটা নাগাদ রোদের তাপ একটু কমতেই ধনঞ্জয়ের বাড়িতে একে-একে এদিন হাজির হলেন তাঁর তিন-বন্ধু পরিতোষ, সুরঞ্জন আর অবনী। তারাও সকলেই ধনঞ্জয়ের মতোই প্রবীণ।, মধ্য পঞ্চাশ বা ষাটের কাছাকাছি বয়স তাঁদের। তাঁরা সকলেই এ শহরের পুরোনো বাসিন্দা।

একতলায় বৈঠকখানাতে চা-পান শেষ হলে ধনঞ্জয় আর তাঁর সঙ্গীরা গিয়ে বসলেন বাড়ির পিছনে ঘাটের পৈঠায়। যেমন ও বাড়িতে এলে বসেন তাঁরা। এ সময় বেশ ফুরফুরে বাতাস বয় এখানে। বেশ আরাম লাগে জায়গাটাতে বসতে। তাদের পায়ের নীচে সিঁড়ির শেষ প্রান্ত এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে গঙ্গার জল। জ্যৈষ্ঠ মাস প্রায় শেষ হতে চলেছে। নদী এখন শান্ত হলেও আর কয়েকদিনের মধ্যেই বর্ষা নামবে। তখন দেখতে-দেখতে কয়েকদিনের মধ্যেই নদী ফুলেফেঁপে ওঠে, জলও তখন সিঁড়ির ওপর পর্যন্ত উঠে আসে। তখন আর ও জায়গায় বসা যায় না।

প্রথমে বেশ কিছুক্ষণ বন্ধুদের সঙ্গে নানান বিষয় নিয়ে আড্ডা দেবার পর ধনঞ্জয় একসময় কথাটা তুললেন বন্ধুদের সামনে। তিনি বললেন, “তোমাদের একটা কথা জানাই । তোমাদের সঙ্গে পরামর্শ করা দরকার। নৃসিংহ দত্ত-র নাম তো নিশ্চয়ই তোমরা সকলে জানো। লোকটা ক-দিন ধরে বিরক্ত করছে আমাকে।”

সুরঞ্জন বললেন, “হ্যাঁ, ওর নাম জানি। লোকটাকে দূর থেকে দেখেওছি। গুন্ডাদের মতো দেখতে, বুক খোলা জামা, গলাতে সোনার চেন, লাল-চোখ, মোটরবাইক নিয়ে ঘোরে, সে তোমাকে বিরক্ত করছে মানে?”

ধনঞ্জয় বললেন, “বিরক্ত করছে মানে হল, সে মাঝে মাঝেই আমার বাড়ি আসছে। আজ সকালেও এসেছিল। আমার বাড়িটা সে কিনতে চায়, ফ্ল্যাট বানাবে। প্রথম দিনই তা ‘না’ করে দিয়েছি, তবু লোকটা যেন নাছোড়বান্দা। আজও ‘না’ বললাম, তবুও বলল আবারও আসবে। লোকটাকে দেখে আমারও ঠিক সুবিধার বলে মনে হচ্ছে না।”

কথাটা শুনে অবনী বললেন, “হ্যাঁ, ও লোক ভালো নয়। ওর না কি চোরাই-মাল কেনাবেচার কারবার আছে। একবার কী একটা খুন-খারাপির সঙ্গে যুক্ত হয়ে কিছুদিনের জন্য জেলেও গেছিল। পরে প্রমাণের অভাবে খালাস পায়। শুনেছি ওর বাপ-ঠাকুর্দা ও না কি এসব কাজই করত। এখন প্রোমোটিং বিজনেসে নেমেছে। হয়তো কালো-টাকা সাদা করার জন্য, অথবা এ ব্যবসায় লাভ বেশি বলে।”

ধনঞ্জয়বাবুর অপর এক বন্ধু সুরঞ্জন বললেন, “অবনী ঠিকই বলেছে। এ শহরে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটা ফ্ল্যাট-বাড়ি তুলেছে লোকটা। সে যে দু-নম্বরী লোক তাতে সন্দেহ নেই। গঙ্গার ধারে যে-মাঠটা ছিল, ‘দিনেমার গোরস্থান’ বলে যার নাম। ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি ও জায়গায় দিনেমারদের কবর দেওয়া হত বলেই এমন নাম। সেই মাঠটাও না কি কীভাবে মিথ্যা কাগজপত্র বানিয়ে নৃসিংহ দত্ত দখল করে নিয়েছে। প্রাচীর দিয়ে ইতিমধ্যে মাঠটা ফিরে ফেলার কাজ শুরু হয়েছে। আর ক-দিনের মধ্যেই খোঁড়াখুড়ি শুরু হবে, ফ্ল্যাট উঠবে সেখানে।”

সুরঞ্জন এরপর ধনঞ্জয়কে জিজ্ঞেস করলেন, “ওই নৃসিংহ তোমাকে কোনো হুমকি-টুমকি দিয়েছে নাকি?”

ধনঞ্জয় বললেন, “না, এখনও পর্যন্ত সে কোনো হুমকি দেয়নি। শুধু লোভ দেখাচ্ছে। কখনও টাকার পরিমাণ বাড়াবে বলছে, একটার বদলে দুটো ফ্ল্যাট দেবে বলছে। তবে তোমাদের কাছে ওর যা বায়োডাটা শুনছি তাতে ওর ভয় দেখানো শুরু করতে আর কতক্ষণ? কী করা যায় বলো তো?”

এ-কথা শুনে অবনী বললেন, “তুমি তো আমাদের বেশ চিন্তায় ফেললে ভায়া। সত্যি কথা, এসব লোকেরা কখন কী করে বসে বিশ্বাস নেই। আমাদের তো কারওরই আর এখন হাতাহাতি করার বয়েস নেই যে লোকটাকে ভয় দেখানো যাবে। সবচেয়ে বড় কথা তুমি এত বড় বাড়িতে একলা থাকো। রাতবিরেতে লোকটা এসে কোনো অঘটন ঘটাবার চেষ্টা করলেও কাউকে ডেকে পাবে না।”

ধনঞ্জয় কীভাবে নিরাপদ থাকতে পারেন তার সমাধান-সূত্র খুঁজতে গিয়ে বেশ কিছুক্ষণ আলাপ-আলোচনার পর সুরঞ্জন একসময় বললেন, “ধনঞ্জয়, তুমি একটা কাজ করতে পারো। তোমার বাড়িতে তো ব্যবহারযোগ্য বেশ কয়েকটা ঘর ফাঁকা পড়ে আছে। ভালো লোক দেখে দু-একটা ভাড়াটে বসিয়ে দিতে পারো। তাতে তোমার টাকাও আসবে, আর সব থেকে বড় কথা কোনো বিপদ-আপদ হলে তুমি তাদের ডাকতেও পারবে। যেসব বাড়িতে বেশি লোকজন থাকে, সেসব বাড়িতে চট করে কেউ ঝামেলা করতে আসে না।”

অবনী বললেন, “সুরঞ্জন কিন্তু কথাটা মন্দ বলেনি। ভদ্রলোক দেখে একটা-দুটো ভাড়া বসিয়ে দাও তুমি। লোকজন দেখলে ওই নৃসিংহ দত্তও একটু থমকে যাবে। সে বুঝতে পারবে সহজে সে বাড়িটা নিতে পারবে না।”

পরিতোষও তাঁর অন্য বন্ধুর কথায় সমর্থন করে ধনঞ্জয়কে বললেন, “এখানে যে সাপ্তাহিক সংবাদপত্রটা প্রতি বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হয়, তুমি চাইলে সেখানে ‘ভাড়াটে চাই’ বলে তোমার ফোন নম্বর দিয়ে বিজ্ঞাপনের ব্যবস্থা করতে পারি। কয়েকশো টাকা মাত্র খরচ হবে। তাতে ভাড়াটে খোঁজার জন্য তোমাকে আর ঝামেলা পোহাতে হবে না। বিজ্ঞাপন দেখে লোকজন নিজেরাই তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করবে। ভাড়া বাসাবার জন্য তাদের মধ্যে লোক বেছে নিতে পারবে তুমি।”

সবদিক চিন্তা করে ধনঞ্জয়বাবু ভেবে দেখলেন তাঁর বন্ধুদের কথাই ঠিক। এত বড় বাড়িতে একলা থাকেন তিনি। বয়স তার দিন-দিন বাড়ছে। ওই নৃসিংহর দিক থেকে কোনো বিপদ না এলেও তিনি তো নিজেও যে কোনোদিন অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন। রাতবিরেতে যদি ডাক্তার ডাকতে হয় অথবা হাসপাতালে যেতে হয় তাহলেও তো লোকের প্রয়োজন হয়। ধনঞ্জয় তাই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন তিনি ভাড়াটে বসাবেন।

বন্ধুদের পরামর্শ মতোই কাজ করলেন ধনঞ্জয়বাবু। স্থানীয় সংবাদপত্রে স্বল্প খরচে ধনঞ্জয়বাবুর ফোন নম্বর সহ ভাড়াটে চাই বিজ্ঞাপনটা ছাপাবার ব্যবস্থা করে দিলেন পরিতোষ। বৃহস্পতিবার সকালে বিজ্ঞাপনটা প্রকাশিত হবার পরই দু-দিন ধরে বেশ কিছু ফোন এল ধনঞ্জয়ের কাছে। সেসব ফোনের মধ্যে যে-সব লোককে বাড়িভাড়া দেওয়া যেতে পারে বলে ধনঞ্জয়বাবুর মনে হল তাদের প্রত্যেককেই তিনি জানালেন রবিবার বিকালে তার বাড়িতে আসার জন্য। ধনঞ্জয়বাবু ঠিক করে নিলেন, বাড়ির ভিতর দিকে অর্থাৎ নদীর দিকে একতলার তিনটে ঘর ভাড়া দেবেন তিনি। ঘরগুলো মোটামুটি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, আলো-বাতাসও খেলা করে। আর দুটো ঘরে ধনঞ্জয়বাবুর বাপ-ঠাকুর্দার আমলের খাট আর কিছু আসবাবপত্রও আছে। যেগুলো ভাড়াটিয়াদের কাজেও লাগতে পারে। ওই ঘরগুলো একটা বারান্দা দিয়ে বাড়ির সামনের অংশের বারান্দা ও ওপরে ছাতে যাবার সিঁড়ির সঙ্গেও যুক্ত। কাজেই ওই ঘরগুলো বাড়ির সামনের অংশে না-হলেও ভাড়াটেদের বাইরে যাওয়া আসা বা ছাদে ওঠার কোনো সমস্যা হবে না। তাছাড়া আরও একটা ব্যাপার, ওল্ড প্যাটার্নের বাড়িটার একটা বাহুর দোতলায় ধনঞ্জয়বাবুর শয়নকক্ষ, আর বাহুর অন্য প্রান্তে একতলায় ওই ঘরগুলো অবস্থিত। প্রয়োজনে ধনঞ্জয়বাবু দোতলায় নিজের ঘরের জানালা থেকেই একতলায় ওই ঘরগুলোর ওপর নজর রাখতে পারবেন অথবা প্রয়োজনে তাদের ডাকতে পারবেন।

যদিও ঘরগুলো মোটামুটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নই ছিল, তবুও রবিবার সকালবেলা বাজার করে ফেরার পথে ধনঞ্জয়বাবু একজন লোককে সঙ্গে করে এনে ঘরগুলো আবারও ধুইয়ে মুছিয়ে ভালোভাবে সাফসুতরো করে নিলেন। এ-কাজ মিটলে ঘরের কাজ, রান্না, স্নান খাওয়া সেরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে-না-নিতেই বিকেল হয়ে গেল। তারপর একসময় বাড়ির নীচ থেকে তার উদ্দেশে হাঁক-ডাক শুনতে পেলেন তিনি। অর্থাৎ বাড়ি ভাড়ার খোঁজে যাদের আসার কথা তারা এসে উপস্থিত হয়েছে।

একতলায় নেমে ধনঞ্জয় দেখতে পেলেন জনাপাঁচেক লোক হাজির হয়েছে সেখানে। তাদের প্রত্যেকেই টেলিফোনে তার সঙ্গে কথা বলেই বাড়ি দেখতে এসেছেন। ধনঞ্জয় তাদের একসঙ্গে নিয়ে গিয়ে প্রথমে তাঁর বৈঠকখানায় বসালেন। তারপর তাদের এক-একজন করে ঘর দেখাবার জন্য নিয়ে যেতে লাগলেন। ঘরপ্রতি তিনি ভাড়া ধার্য করেছেন দু-হাজার টাকা। আর একসঙ্গে কেউ তিনটে ঘর ভাড়া নিলে পাঁচ হাজার টাকা। ভাড়াটা এমন কিছু বেশি নয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যারা বাড়ি ভাড়া নিতে এসেছিলেন তাদের কারও সঙ্গেই কথা পাকা হল না। কারও কথাবার্তা ঠিক পছন্দ হল না ধনঞ্জয়বাবুর। কারও আবার খোলা গঙ্গার দিকে ঘর বলে তা পছন্দ হল না। একটা লোক আবার বাড়ি ভাড়ার দালাল ছিল। লোকটার পরিচয় বুঝতে পেরে ধনঞ্জয়বাবু নিজেই তাকে ভাগিয়ে দিলেন। তার কাজ না হলেও লোকগুলোকে এক-এক করে ঘর দেখাতে আর কথাবার্তা বলতে-বলতেই ধনঞ্জয়বাবুর সারাটা বিকেল কেটে গেল। ভাড়া খুঁজতে আসা শেষ লোকটাকে যখন ধনঞ্জয়বাবু বিদায় দিলেন তখন গঙ্গার বুকে সূর্য ডুবে গেছে।

মনমতো কোনো ভাড়াটে না-পাওয়াতে বেশ একটু হতাশই হলেন ধনঞ্জয়বাবু। তিনি ভাবলেন, পরিতোষকে বলে আবারও একবার তিনি ভাড়াটের সন্ধানে খবরের কাগজে বিজ্ঞাপনের ব্যবস্থা করবেন, আর বাড়ির সামনের ল্যাম্পপোস্টে একটা পোস্টারও সাঁটাবেন, যদি তাতে কোনো ফল মেলে। দেখতে-দেখতে বাইরে সন্ধ্যা নামল, বৈঠকখানার ভিতরও অন্ধকার জমতে শুরু করল। ধনঞ্জয়বাবু এরপর সেই ঘর ছেড়ে ওপরে নিজের শোবার ঘরে দোতলায় ফিরে যাবার উপক্রম করছিলেন, ঠিক এই সময় দরজার বাইরে থেকে একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “বাড়িতে কেউ আছেন?”

বৈঠকখানার বাতি জ্বালিয়ে ধনঞ্জয়বাবু দরজার সামনে দাঁড়াতেই দেখতে পেলেন বারান্দার আধো অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে একজন লোক। ধনঞ্জয়বাবুর উদ্দেশে হাতজোড় করে লোকটা নমস্কার জানিয়ে বলল, “বাড়ি ভাড়ার ব্যাপারে এসেছি। সে ব্যাপারে একটু কথা বলা যাবে?”

ধনঞ্জয়বাবু বললেন, “হ্যাঁ, ভিতরে আসুন।”

বৈঠকখানায় প্রবেশ করল লোকটা। বছর চল্লিশের মাঝবয়সি একজন লোক। বেশ শক্তপোক্ত সুদর্শন চেহারা লোকটার। গায়ের রং ফর্সা, মাথার চুলে একটা লালচে ভাব আছে। লোকটার জামার বুকের কাছে একটা বোতাম খোলা, সেখান থেকে উঁকি দিচ্ছে চেনে ঝোলানো একটা রুপোর ক্রশ। তা দেখে মনে হয় লোকটা সম্ভবত ধর্মে খ্রিস্টান। লোকটাকে আগে কোনোদিন দেখেছেন বলে ধনঞ্জয়বাবুর মনে পড়ল না। ভালো করে কয়েক মুহূর্ত লোকটাকে পর্যবেক্ষণ করার পর ধনঞ্জয় তার উদ্দেশে বললেন, “আপনার আসার ব্যাপারে আমার সঙ্গে কি টেলিফোনে কথা হয়েছিল ? ঠিক খেয়াল করতে পারছি না তো?”

প্রশ্ন শুনে লোকটা বিনীতভাবে বলল, “আমাকে মার্জনা করবেন। আপনার সঙ্গে কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়াই আমি চলে এসেছি, টেলিফোনে কারও কথা হয়নি। খবরের কাগজে দেখলাম আপনি বাড়ি ভাড়া দিতে চান, তাই আপনার বাড়ির খোঁজখবর নিতে এখানে চলে এলাম। আমার ভাড়ার খুব দরকার।”

ধনঞ্জয় জানতে চাইলেন, “আপনার নাম কী? কোথায় বর্তমানে থাকেন?”

লোকটা বলল, “আমার নাম যোহান, আমি থাকি দিনেমারদের গোরস্থান বলে মাঠটা যেখানে আছে সে-জায়গাতে।”

লোকটার নাম, চেহারা আর বুকে ঝোলানো ক্রশটা দেখে ধনঞ্জয় এবার অনুমান করলেন একসময় এ-অঞ্চলে যেসব বিদেশি বসবাস করত সম্ভবত তাদেরই কারও রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে এ-লোকটার ধমনীতে। ইউরোপীয়রা এসব অঞ্চলে বসতি স্থাপন করার পর তাদের কেউ কেউ স্থানীয় রমণীদের বিবাহও করেছিল। সংখ্যায় কম হলেও তাদের কিছু বংশধরকে আজও এসব অঞ্চলে দেখা যায়। যাদের কারও গায়ের রং ফর্সা, কটা চুল অথবা নীল রঙের চোখের মণি আজও তাদের পূর্বপুরুষদের সাক্ষ্য বহন করে চলে। এ লোকটার চেহারাও তেমনই।

যোহান নামের লোকটার জবাব শুনে বন্ধু অবনীর বলা একটা কথা মনে পড়ে গেল ধনঞ্জয়ের। তিনি বললেন, “শুনলাম ওই গোরস্থান মাঠে ফ্ল্যাটবাড়ির কাজ শুরু হয়েছে, তাই না?”

যোহান বলল, “হ্যাঁ, আপনি ঠিকই শুনেছেন। ইতিমধ্যেই সে কাজ শুরু হয়ে গেছে। তবে ও জায়গায় ওসব কাজ না-করলেই ভালো হত। কত পুরনো ইতিহাসের সাক্ষী ওই জায়গা। আমার বেশ কয়েকজন পূর্বপুরুষের কবরও ওখানে আছে।”—এ কথা বলে যেন মৃদু দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল লোকটা।

ধনঞ্জয় কথাটা শুনে বললেন, “আপনার পূর্বপুরুষেরা দিনেমার ছিলেন বুঝি? আমার এই বাড়িটাও কিন্তু দিনেমার বা ডাচদের তৈরি বাড়ি।”

যোহান বলল, “হ্যাঁ, দিনেমার ছিলেন তারা। আপনার ঘর কি ভাড়া হয়ে গেছে? নাকি এখনও আছে?”

ধনঞ্জয়বাবু এ-প্রশ্নের জবাবে প্রথমে কোনো উত্তর না দিয়ে লোকটার সম্পর্কে আরও খোঁজখবর জেনে নেবার জন্য প্রশ্ন করলেন, “আপনি কী করেন? কে কে আছে আপনার?”

সে জবাব দিল, “বউ আছে আর দুটি সন্তান আছে। মেয়েটির বয়স এগারো আর ছেলেটির বয়স নয়। আমি সুতোর ব্যবসা করতাম। বেশ বড় ব্যবসা ছিল আমার। বর্তমানে অবশ্য ব্যবসা বন্ধ রেখেছি। তবে তাতে আমাদের খাওয়া-পরা বা আপনার ভাড়া দেবার ব্যাপারে কোনো সমস্যা হবে না। আপনি যে কয়মাসের ভাড়া অগ্রিম চাইবেন আমি তা দিয়ে দেব।”

ধনঞ্জয় লোকটার কথা শুনে ভালো লাগলো। এমনই একজন স্বচ্ছল ফ্যামিলিম্যানই ভাড়াটে হিসাবে মনে-মনে চাইছিলেন তিনি। কাজেই ধনঞ্জয় এরপর তাকে বললেন, “হ্যাঁ, তিনটে ঘর খালি আছে, চলুন আপনাকে ঘরগুলো দেখাই।”—এ কথা বলে লোকটাকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দার আলোগুলো জ্বালিয়ে সে-পথ ধরে বাড়ির পিছনের অংশে গিয়ে ঘরগুলোর সামনে তিনি উপস্থিত হলেন। অন্ধকার নেমে গেছে, নদীও অদৃশ্য হয়ে গেছে তার মধ্যে। শুধু ঘাটের কাছ থেকে জলের ছলাৎ ছল শব্দ ভেসে আসছে। চাবি দিয়ে তালা খুলে ঘরের বাতি জ্বালিয়ে পরপর তিনটে ঘরই লোকটাকে দেখালেন ধনঞ্জয়বাবু। কাছেই স্নানের ঘর আর বাথরুমটাও দেখানো বাকি রইল না। সবকিছু দেখাবার পর ধনঞ্জয় লোকটার কাছে জানতে চাইলেন তার ঘর পছন্দ হয়েছে কিনা? আর তার সঙ্গে ভাড়ার ব্যাপারটাও তিনি জানিয়ে দিলেন। ধনঞ্জয়বাবুর কথা শুনে যোহান নামের লোকটা বলল, “আমার বেশ পছন্দ হয়েছে ঘরগুলো। এমন শান্ত পরিবেশেই আমি থাকতে চাই। আমার পরিবারের লোকজনেরও এমন জায়গা পছন্দ। কোনো ঝামেলা, চিৎকার-চেঁচামেচির মধ্যে থাকতে অভ্যস্ত নই আমরা। তবে তিনটে ঘর অর্থাৎ এদিকের পুরো অংশটাই আমি নিতে চাই। কয়মাসের অ্যাডভান্স টাকা দেব বলুন?”—এই বলে পকেটে হাত ঢুকালো লোকটা।

ধনঞ্জয় কোথায় যেন শুনেছেন যে অগ্রিম ভাড়া নিলে না কি ভাড়াটিয়াকে চট করে ওঠাতে সমস্যা হয়। যদি এ-লোকটাকে ভাড়া দেবার পর কোনো কারণে তাকে উঠিয়ে দিতে হয় তবে অগ্রিম ভাড়া নিলে অসুবিধা হতে পারে। তাই ধনঞ্জয়বাবু আগাম সাবধানতা অবলম্বন করে বললেন, “না, অগ্রিম ভাড়া নেব না। ইংরেজি মাসের পয়লা তারিখে ভাড়ার টাকা দিলেই চলবে। কবে থেকে ভাড়া থাকতে চান আপনি?”

যোহান বলল, “কালই আমি পরিবার নিয়ে এখানে উঠে আসতে চাই। ওই ফ্ল্যাট-বাড়ি তৈরি হতে যাচ্ছে বলে আগের জায়গায় যা হই-হট্টগোল শুরু হয়েছে তাতে সেখানে আর একদিনও থাকতে মন চাইছে না আমার।”

যোহানের কথাবার্তা শুনে ইতিমধ্যে তাকে বেশ পছন্দ হয়েছে ধনঞ্জয়বাবুর। অন্য লোকগুলোর সঙ্গে কথা বলে ইতিমধ্যে তিনি বুঝতে পেরেছেন যে মনমতো ভাড়াটে পাওয়া সহজ ব্যাপার নয়। যদিও ধনঞ্জয়বাবুর সোমবার অফিসে প্রচণ্ড কাজের চাপ থাকে বলে অফিস কামাই করা সম্ভব নয়। তবুও ভাড়াটে হাতছাড়া হয়ে যাবার ভয়ে তিনি যোহানকে বললেন, “ঠিক আছে, তবে কালই চলে আসুন। যদিও আমি কাল ভোরে উঠেই অফিস যাব তবে তাতে আপনাদের কোনো অসুবিধা হবে না। ঘরগুলোর একসেট চাবি দিয়ে যাচ্ছি। বারান্দা দিয়ে এসে মালপত্র নিয়ে ঘরে ঢুকে পড়বেন। রাতে ফেরার পর আপনাদের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হবে। আর কোনো প্রয়োজন হলে ফোন করবেন আমাকে।” যোহান সম্মত হল ধনঞ্জয়বাবুর প্রস্তাবে। এরপর সে তাঁর সঙ্গে আরও কিছু প্রয়োজনীয় কথাবার্তা সাঙ্গ করে পরদিন পরিবার নিয়ে এ বাড়িতে আসবে বলে তার থেকে চাবি নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে গেল।

পরদিন সকাল সাতটা নাগাদ প্রতিদিনের মতোই কলকাতায় অফিস যাবার জন্য বাড়ি থেকে স্টেশনের দিকে সাইকেল নিয়ে রওনা হয়ে গেলেন ধনঞ্জয়বাবু। সপ্তাহের প্রথম দিন অফিসে কাজের খুব চাপ ছিল। তাই অফিসে ঢুকে কাজ করতে বসে প্রায় তিনি ভুলেই গেলেন তার বাড়িতে নতুন ভাড়াটে আসার কথা। কোনো ফোনও এল না তার কাছে। কথাটা তার খেয়াল হল দিনের শেষে ট্রেন থেকে নামার পর। গ্যারেজ থেকে সাইকেল নিয়ে বাড়ি ফেরার পথ ধরলেন তিনি। রেল স্টেশনের কাছে জনসমাগম ছেড়ে বেশ খানিকটা ফাঁকা রাস্তা পেরোতে হয় তাঁর বাড়ি পৌঁছোতে হলে। সে-পথ ধরে কিছুটা এগোতেই হঠাৎই একটামোটর সাইকেল পিছন থেকে এসে তার সাইকেলের পাশাপাশি চলতে শুরু করল। কিছুক্ষণ বাইকটা তার পাশে চলার পর ধনঞ্জয় তাকিয়ে দেখলেন বাইক চালকের পিছনের আসনে বসে আছে সেই নৃসিংহ দত্ত!

ধনঞ্জয়ের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই লোকটা বলল, “বাড়িতে ভাড়াটে বসাচ্ছেন শুনলাম? খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন বেরিয়েছে।”

ধনঞ্জয় সাইকেল চালাতে-চালাতেই জবাব দিলেন, “হ্যাঁ, আমার বাড়ি, আমি ভাড়াটে বসাব তাতে কী হল?”

তাঁর কথা শুনে নৃসিংহ দত্ত হেসে বলল, “না, তাতে তেমন কিছু হবে না। বাড়িটা আমার হাতে এলে ভাড়াটে তুলতে আমার দু-মিনিটও সময় লাগবে না। আমার প্রস্তাবটা নিয়ে ভাবুন। ক্যাশ তিরিশ লাখ আর তার সঙ্গে দুটো ফ্ল্যাট। এমন দাম কোথাও পাবেন না।”

ধনঞ্জয়বাবু এ কথার কোনো জবাব দিলেন না। নৃসিংহ দত্ত-ও এরপর আর কোনো কথা বলল না। মোটর-সাইকেল ঘুরিয়ে নিয়ে যেদিক থেকে এসেছিল সেদিকে ফিরে গেল৷

বাড়ি পৌঁছে গেলেন ধনঞ্জয়বাবু। প্রথমে তিনি বাইরে থেকে বুঝে উঠতে পারলেন না যে তার ভাড়াটেরা এসেছে কি না? বাইরের খোলা বারান্দাটা অন্যদিনের মতোই অন্ধকার। প্রতিদিনের মতোই বারান্দায় সাইকেল তুলে সিঁড়ি দিয়ে দোতলাতে উঠলেন তিনি। নিজের ঘরের তালা খুলে ভিতরে ঢুকে জানালা দিয়ে নীচের ঘরগুলোর দিকে তাকাতেই তিনি দেখলেন একটা ঘরের দরজা একটু খোলা, আর তা দিয়ে ক্ষীণ আলোকরশ্মি এসে পড়েছে বাইরে। অর্থাৎ ভাড়াটেরা চলে এসেছে।

ধনঞ্জয়বাবু এরপর বাথরুমে ঢুকে স্নান সেরে পোশাক পালটে নিলেন। তিনি ভাবলেন ভাতটা গ্যাসের উনুনে বসিয়ে দিয়ে নীচে নেমে দেখা করে আসবেন ভাড়াটেদের সঙ্গে। কিন্তু তাকে আর নীচে নামতে হল না। তিনি ভাত বসাতে যাচ্ছেন এমন সময় ঘরের বাইরে সিঁড়িতে পায়ের শব্দ শুনতে পেলেন তিনি। তা শুনে ধনঞ্জয়বাবু ঘরের বাইরে বেরিয়ে দেখলেন। তাঁর নতুন ভাড়াটে যোহান ওপরে উঠে এসেছে। তবে সে একা নয়, সঙ্গে তার পুরো পরিবারও আছে। লম্বা গাউন পরা এক মহিলা, ফ্রক পরা একটা ছোট-মেয়ে আর তার সঙ্গে তার চেয়ে ছোট একটা ছেলে।”

যোহান, ধনঞ্জয়বাবুর দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, ‘আপনার সঙ্গে এদের পরিচয় করাতে আনলাম। এই আমার স্ত্রী রুনা, মেয়ে ওলা ও ছেলে পিটার। অসময়ে এসে যদি বিরক্ত করে থাকি তবে ক্ষমা করবেন।”

ধনঞ্জয় হেসে বললেন, “না, না বিরক্ত হবার কিছু নেই। আমি একটু আগেই বাড়ি ফিরেছি। ভাবছিলাম নীচে গিয়ে আপনাদের সঙ্গে দেখা করে আসব।” এ কথা বলে ছেলে-মেয়ে দুটোর দিকে তাকালেন ধনঞ্জয়। তারা ধনঞ্জয়ের উদ্দেশে বলল, “হ্যালো?”

ধনঞ্জয়ও প্রত্যুত্তর দিলেন ‘হ্যালো’ বলে।

এরপর তিনি জানতে চাইলেন, “সবার ঘর পছন্দ হয়েছে তো?”

জবাবটা এল যোহানের স্ত্রী রুনার কাছ থেকে। সে জবাব দিল, “হ্যাঁ সবারই বাড়িটা খুব পছন্দ হয়েছে। এমন শান্ত, খোলামেলা পরিবেশই আমরা খুঁজছিলাম।”

এর মধ্যেই ধনঞ্জয়বাবুর হঠাৎ মনে পড়ে গেল বাড়ি ফেরার পথে নৃসিংহ দত্ত-র সঙ্গে তার দেখা হবার ঘটনাটা। যোহানের উদ্দেশে তিনি বললেন, “আমি তো সারাদিন বাড়ি থাকি না। বাড়িটাকে নিজের বাড়ি মনে করে একটু দেখেশুনে রাখবেন। আর কোনো বিপদ-আপদ হলে নিশ্চয়ই আমরা একে-অন্যের পাশে থাকব।”

যোহান বলল, “সে-ব্যাপারে আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। কোনো প্রয়োজন হলে আমাকে সঙ্গে-সঙ্গে খবর দেবেন।”

ধনঞ্জয়বাবুর এই আশ্বাস শুনে ভালো লাগল। ছেলে-মেয়ে দুটোর দিকে তাকিয়ে তিনি জানতে চাইলেন, “ওরা কোথায় পড়াশোনা করে?”

যোহান জবাব দিল, “গঙ্গার ধারে ‘ড্যানিশ অ্যাকাদেমি’ নামে ছেলেদের একটা স্কুল আছে, পিটার সেখানেই পড়ে। আর মেয়ে আপাতত বাড়িতেই পড়ে।”

নতুন ভাড়াটের পরিবারের লোকজনের সঙ্গে প্রাথমিক পরিচয় সাঙ্গ হল ধনঞ্জয়বাবুর। যোহান এরপর তাঁকে বলল, “ঠিক আছে এবার আমরা আসি। সারাদিন আপনি পরিশ্রম করে এসেছেন, এবার বিশ্রাম নিন।”

ধনঞ্জয়বাবুর থেকে বিদায় নিয়ে তারা চলে যাবার পর রান্না, খাওয়া সেরে নিলেন তিনি। রাত-দশটা নাগাদ শোবার আগে ঘরের জানালা বন্ধ করতে গিয়ে একবার নীচের দিকে তাকালেন তিনি। ভাড়াটের ঘরগুলো অন্ধকার হলেও অন্য এক জায়গাতে তাদের চারজনকেই দেখতে পেলেন তিনি। ওপরের ঘরের জানালা থেকে বাড়ির ঘাটটা দেখা যায়। মাথার ওপরের আকাশে আধ ফালি চাঁদ আছে। ধনঞ্জয় দেখলেন সেই চাঁদের আলোতে ঘাটের পৈঠায় বসে যোহান তার পুরো পরিবার নিয়ে। ধনঞ্জয়ের দৃশ্যটা বেশ ভালো লাগল।

সোম থেকে শনি, সপ্তাহের ওই ছ-টা দিন কীভাবে যে কেটে যায় তা নিজেই ঠিক বুঝতে উঠতে পারেন না ধনঞ্জয়বাবু। সকালে উঠেই নাকে-মুখে কোনোরকমে খাবার গুঁজে ট্রেন ধরতে ছোটা। রাতে বাড়ি ফিরে রান্না করা, তারপর পরদিন আবার অফিস ছোটা। এ ভাবেই তার দেখতে-দেখতে অন্য সপ্তাহের মতো এ-সপ্তাহটাও ঝড়ের গতিতে কেটে গেল। মাঝে একদিন ধনঞ্জয়বাবু অফিস থেকে ফেরার পর যোহান এসেছিল তাঁর সঙ্গে দেখা করতে। এ বাড়িতে থাকতে তাদের সকলের বেশ ভালো লাগছে জানিয়ে আর ধনঞ্জয়বাবু কেমন আছেন তা জেনে চলে গেছিল সে। আর দুটো রাতে জানালা দিয়ে ধনঞ্জয় দেখতে পেয়েছিলেন পরিবার নিয়ে ঘাটের সিঁড়িতে বসে আছে যোহান।

রবিবার একটু দেরি করেই ঘুম থেকে ওঠেন ধনঞ্জয়বাবু। অর্থাৎ সাড়ে আটটা নাগাদ বিছানা ছাড়েন তিনি। এদিন কিন্তু অন্য রবিবারের থেকে আগেই একটা শব্দে ঘুম ভেঙে গেল তাঁর। মোরগের ডাক! শব্দটা আসছে বাড়ির পিছন থেকে। ঘুম ভাঙার পর কিছুক্ষণ বিছানাতে গড়াগড়ি খেয়ে উঠে জানালা খুললেন ধনঞ্জয়। তিনি দেখলেন নীচে তার ভাড়াটের ঘরের সামনে দড়ি দিয়ে বাঁধা রয়েছে বেশ কয়েকটা মুরগি ও আর একটা মোরগ। দেখে মনে হচ্ছে তাদের পুষবার জন্যই আনা হয়েছে। বাড়ির পিছন দিকে নদীর পাড়ে চরতে পারবে প্রাণীগুলো। এতে ধনঞ্জয়বাবুর সমস্যা না-হবারই কথা। তবে যোহান বা তার পরিবারের কাউকে তাদের ঘরের বাইরে দেখতে পেলেন না ধনঞ্জয়বাবু। এমনও হতে পারে তাদের ঘুম এখনও ভাঙেনি।

প্রতি রবিবারের মতো এ-রবিবারও বাজারে গেলেন ধনঞ্জয়বাবু। সেখানেই তার দেখা হয়ে গেল পরিতোষের সঙ্গে। তিনি জানালেন বিকালবেলা গঙ্গার ধারে বসার জায়গায় আড্ডাতে ধনঞ্জয় যেন আসেন।

রবিবার ছুটির দিন বেশ ফুরফুরে মেজাজেই থাকেন ধনঞ্জয়। আয়েশ করে বাজার করে, পরিচিত কিছু লোকের সঙ্গে কথা বলে বাড়ি ফিরলেন তিনি। কাপড় জামা কাচা, মাংস-ভাত রান্না করা, এসব কাজে দুপুর গড়িয়ে গেল। ধনঞ্জয়বাবু ভেবেছিলেন তিনি এদিন বাড়িতে আছেন বলে হয়তো যোহান তার সঙ্গে দেখা করতে আসবে। কিন্তু সে এল না। দুপুরবেলা খাওয়া সেরে জানালা বন্ধ করার সময় নীচে তাকিয়ে তিনি সে ঘরগুলোর দরজা-জানলা বন্ধই দেখলেন। ধনঞ্জয়বাবু তা দেখে ভাবলেন হয়তো-বা তারা বাড়ির বাইরে গেছে।

ধনঞ্জয়বাবু দুপুরে টানা ঘুম দিলেন। তারপর বিকালে উঠে চা পান করে রোদের আলো একটু নরম হলে বাড়ি ছেড়ে রওনা হলেন তাঁর আড্ডাস্থলে। তাঁর তিন বন্ধুই সে-জায়গায় যথারীতি উপস্থিত ছিলেন এদিন। ধনঞ্জয়বাবু তার ভাড়াটে লাভের কথা আর তাদের সম্পর্কে যতটুকু জেনেছেন তা জানালেন তাদেরকে। অবনী শুনে বললেন, “তোমার ভাড়াটের ছেলে ‘ড্যানিশ অ্যাকাদেমি’ নামের স্কুলে পড়ে। ওই স্কুল নিয়ে সম্প্রতি একটা কাগজে যেন কী একটা লেখা পড়লাম। তবে কী পড়েছি তা এখন ঠিক মনে আসছে না।”

পরিতোষ, অবনীকে বলল, “এই স্কুলের নাম আমি শুনিনি। খোঁজখবর নিয়ে দেখতে হবে। ভালো স্কুল হলে নাতিটাকে সেখানে ভর্তি করাব।”

ধনঞ্জয়, রাস্তায় নৃসিংহ-র সঙ্গে দেখা হবার কথাটাও জানালেন বন্ধুদের। তারা বললেন, “বাড়িতে তুমি যখন ভাড়াটে বসিয়ে দিয়েছ তখন তুমি অনেকটা নিরাপদ। নৃসিংহ দত্ত আবার কথা বলতে এলে একটু কড়া জবাব দেবে এবার।”

নানান গল্পগুজবে গঙ্গার ধারের আড্ডায় সন্ধ্যা পর্যন্ত কেটে গেল ধনঞ্জয়বাবুর। আড্ডা থেকে তিনি যখন বাড়ি ফিরলেন তখন সাতটা বেজে গেছে। সকালবেলা বাজার-ফেরতা একটা সংবাদপত্র কিনে এনেছিলেন তিনি। কাগজটা পুরো পড়া হয়নি। ঘরে ফিরে কাগজের বাকি অংশটা কিছু সময় ধরে পড়লেন। তারপর জামাকাপড় ইস্ত্রি করে খাবার গরম করে খাওয়া সারতেই প্রায় রাত ন-টা বেজে গেল। তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়তে হবে ধনঞ্জয়বাবুকে। পরদিন সকালে আবার অফিস ছুটতে হবে তাকে। শোবার আগে একবার জানালার সামনে এসে দাঁড়ালেন তিনি। চাঁদের আলোতে গঙ্গাবক্ষ দেখা যাচ্ছে। মৃদু-মন্দ গতিতে ভেসে চলেছে জল। ওপারে ইটভাটার চিমনির মাথাগুলোতে আলো দেখা যাচ্ছে। চাঁদের আলোতে বেশ সুন্দর দেখাচ্ছে বাইরের পৃথিবী। ধনঞ্জয় দেখতে পেলেন তার ভাড়াটের ঘরগুলোর দরজা খোলা। আবছা আলো দেখা যাচ্ছে ঘরের ভিতর। অর্থাৎ ঘরেই আছে তারা। কিছুক্ষণ নদীর দিকে তাকিয়ে থাকার পর জানালা বন্ধ করতে যাচ্ছিলেন তিনি। হঠাৎ জানালার বাইরে মাথার ওপর দিকে তাকিয়ে চোখ আটকে গেল তার। ধনঞ্জয়বাবুর ‘এল’ প্যাটার্নের বাড়ির যে অংশে তিনি ভাড়া বসিয়েছেন, তার ঠিক মাথার ওপরে ছাদের কিনারে কী যেন একটা নড়ছে। ভালো করে সেদিকে তাকাতেই হতবাক হয়ে গেলেন তিনি। দোতলার ছাদের কিনারে রেলিংয়ের মাথায় উঠে দাঁড়িয়েছে একটা বাচ্চা ছেলে! মাঝে মাঝে সে তার দু-হাত পাখির ডানার মতো দু-পাশে নাড়ছে। যেন ডানা মেলে ওড়ার জন্য ছাদ থেকে ঝাঁপ দেবে সে। চাঁদের আলোতে ছেলেটাকে চিনতে ভুল হল না ধনঞ্জয়বাবুর। ও যে ভাড়াটের ছেলে পিটার! ওই অবস্থায় তাকে দেখে আতঙ্কে হিম হয়ে গেল ধনঞ্জয়বাবুর শরীর। শ্যাওলা-ধরা ছাদের রেলিং, কোনোভাবে পা হড়কালেই ছেলেটা একদম গিয়ে ছিটকে পড়বে নদীতে। তাছাড়া ওই রেলিংটা অনেক পুরোনো। যে কোনো সময় ছেলেটাকে নিয়ে খসে পড়তে পারে নীচে, এসব হলে ছেলেটাকে আর কোনোভাবেই বাঁচানো যাবে না।

কয়েক মুহূর্ত স্তম্ভিতভাবে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইলেন ধনঞ্জয়বাবু। তারপর ভাবলেন ছেলেটাকে রেলিংয়ের মাথা থেকে কীভাবে নামানো যায়? একবার তিনি ভাবলেন যে, ছেলেটার উদ্দেশে চিৎকার করেন। কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে হল, হঠাৎ চিৎকার শুনে ছেলেটা ঘাবড়ে গিয়ে পড়ে যেতে পারে। তাই ছাদে গিয়েই তাকে ডেকে রেলিং থেকে নীচে নামানো ভালো। ধনঞ্জয় এরপর আর এক মুহূর্ত দেরি করলেন না। ঘর থেকে দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠতে শুরু করলেন। ছাদে উঠে ছেলেটা ছাদের যে অংশে রেলিংয়ের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল ধনঞ্জয়বাবু সে জায়গার কাছে পৌঁছোতেই তাঁর পায়ের শব্দে ছেলেটা ফিরে চাইল। চাঁদের আলোতে ছেলেটার মুখে জেগে আছে দুষ্টুমির হাসি। ধনঞ্জয় ছেলেটার উদ্দেশে বললেন, “শিগগির নেমে এসো ওখান থেকে।”

ছেলেটা যেন বুঝতে পারল তাকে ছাদের রেলিংয়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ধনঞ্জয়বাবু ভয় পেয়ে গেছেন। তাকে যেন আরও ভয় পাওয়াবার জন্য ছেলেটা এরপর তার হাতদুটো পাখির ডানার মতো দু-পাশে মেলে দিয়ে এক-পা তুলে দাঁড়াল। ভয়ংকর ব্যাপার! টাল সামলাতে না পেরে যে কোনো মুহূর্তে ছেলেটা ছিটকে পড়তে পারে নীচে। ব্যাপারটা দেখে আতঙ্কিত ধনঞ্জয়বাবু বলে উঠলেন, “এ কী করছ! এ কী করছ তুমি! এখনই নীচে নেমে এসো।”

কিন্তু ছেলেটা তাঁর কথায় কর্ণপাত না করে একইভাবে দাঁড়িয়ে রইল। যেন ধনঞ্জয়বাবুকে ভয় দেখাতে পেরে মজা পাচ্ছে সে।

পিটার মজা পেলেও ধনঞ্জয়বাবুর হাত-পা কিন্তু ঠান্ডা হয়ে আসতে লাগল। ছেলেটা তার কথা শুনছে না। এ অবস্থায় তাঁর কী করা উচিত তা বুঝে পেলেন না ধনঞ্জয় । তবে এর পরই একটা কণ্ঠস্বর শুনতে পেলেন ধনঞ্জয় –“কী হচ্ছে কী? তুমি ওঁনাকে ভয় দেখাচ্ছ কেন? এখনই নীচে নামো।” যোহানের গলা। ধনঞ্জয়বাবু দেখলেন যোহান ছাদে উঠে এসেছে।

বাবার কথা এবার শুনল পিটার। লাফ দিয়ে সে নীচে নেমে ধনঞ্জয়বাবু আর যোহানের সামনে এসে দাঁড়াল। যোহান মৃদু ভর্ৎসনার গলায় পিটারকে বলল, “আঙ্কেলকে সরি বলো। আর কোনোদিন কাউকে এমন ভয় দেখাবে না।”

বাবার কথা শুনে পিটার প্রথমে ধনঞ্জয়বাবুর দিকে তাকিয়ে “সরি” বলল। তারপর এক-ছুটে সিঁড়ির দিকে এগোল ছাদ থেকে নীচে নামার জন্য।

পিটার চলে যাবার পর ধনঞ্জয় স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন, “আপনার ছেলেটা সত্যিই আমাকে খুব ভয় পাইয়ে দিয়েছিল। শোবার আগে জানালা দিয়ে দেখলাম ও রেলিংয়ের ওপর দাঁড়িয়ে। সঙ্গে-সঙ্গেই ছাদে ছুটে এলাম আমি।”

যোহান কথাটা শুনে বলল, পিটারের জন্য আপনাকে এমনভাবে বিব্রত হতে হল বলে “আমি দুঃখিত, লজ্জিত ও আপনার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। আমি খেয়াল রাখব ভবিষ্যতে যাতে ও এমন কাণ্ড না-ঘটায়।”

এ কথা বলে একটু থেমে সে বলল, “আসলে পিটারের শরীরেও দিনেমারের রক্ত বইছে তো। তাই ও স্বভাবগতভাবেই একটু দুরন্ত।”

যোহানের কথাবার্তা ও বাচনভঙ্গি দেখে ধনঞ্জয়বাবুর যেন মনে হল যে পিটার রেলিংয়ের ওপর ওঠাতে যোহান খুব একটা শঙ্কিত হয়নি। সে লজ্জিত হয়েছে পিটারের আচরণে ধনঞ্জয় ভয় পেয়েছেন বলে।

এরপর তারা দুজনেই ছাদ থেকে নীচে নেমে এলেন।

এর পরের কয়েকটা দিন ধনঞ্জয়বাবুর নিস্তরঙ্গভাবেই কেটে গেল। সেই একই রুটিন তাঁর। রোজ সকালে উঠে অফিস যাওয়া আর রাত্রে বাড়ি ফেরা। ধনঞ্জয় যখন সকালে অফিস বেরোন তখন ভাড়াটেদের ঘরের দরজা-জানলা বন্ধ থাকে। রাতে অবশ্য আলোর আভা দেখা যায় জানলার ফাঁক গলে। একদিন রাতে তিনি যোহানকে পরিবারসমেত ঘাটের সিঁড়িতে বসে থাকতেও দেখলেন। তবে বৃহস্পতিবার থেকেই আষাঢ় মাস পড়ে গেল। আর সেদিন সন্ধ্যা থেকেই বৃষ্টি শুরু হল। টানা বৃষ্টি। তবে তার জন্য তো আর অফিস কামাই করা যায় না, তাই বৃষ্টির মধ্যেই ধনঞ্জয়বাবু কলকাতায় অফিস করতে লাগলেন। তবে অবিশ্রান্ত বৃষ্টিতে দু-দিনের মধ্যেই যেন নদী ফুলে ফেঁপে উঠল। তার স্রোতও যেন কয়েকগুণ বেড়ে গেল। শুক্রবার সারা রাতও প্রবল বৃষ্টি হল। শনিবার ভোরে তিনি যখন ঘুম থেকে উঠলেন তখনও বৃষ্টি হয়েই চলেছে। ধনঞ্জয় জানালা খুলে দেখলেন গঙ্গা ফুলে ফেঁপে উঠছে। বাড়ির ঘাটের সিঁড়িগুলোর অর্ধেকেরও বেশি ডুবে গেছে নদীর জলে। শনশন করে ছুটে চলেছে নদীর ঘোলা জল। আর তাতে ভেসে চলেছে খড়কুটো, ডালপালা, কচুরিপানা ইত্যাদি। ধনঞ্জয় দেখলেন প্রতিদিনের মতোই যোহানের ঘরগুলোর দরজা বন্ধ। তাদের মোরগ আর মুরগিগুলো ক-দিনের মধ্যেই পোষ মেনে গেছে। তারা তখন ছাড়াই থাকে। বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচবার জন্য তারা দল বেঁধে আশ্রয় নিয়েছে বারান্দার একটা থামের নীচে। তবুও এই বর্ষার মধ্যেই নির্দিষ্ট সময় ধনঞ্জয়বাবু অফিস যাবার জন্য বাড়ি ছেড়ে রওনা হলেন।

সারাটা যাত্রাপথ আর কলকাতা পৌঁছেও সারাদিন প্রবল বৃষ্টি পেলেন তিনি। ফেরার পথেও একই অবস্থা। বর্ষাকালের শুরুতেই এমন আকাশভাঙা বৃষ্টি এর আগে কবে দেখেছেন তা খেয়াল করতে পারলেন না তিনি। সন্ধ্যাবেলা স্টেশনে নেমে ছাতা ধরে সাইকেল চালাতে-চালাতে কোনোরকমে তিনি বাড়ি পৌঁছোলেন। ছাতা থাকলেও বাতাসের জন্য প্রায় ভিজেই গেলেন তিনি। ধনঞ্জয়বাবুর বাড়িটা যেন অন্ধকারের মধ্যে ডুবে আছে। ল্যাম্পপোস্ট বা দূরে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো বাড়িতেও আলোকবিন্দু দেখা যাচ্ছে না। ধনঞ্জয় বুঝতে পারলেন এই দুর্যোগের জন্য বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে তাদের অফিস থেকে।

অন্ধকার হাতড়ে বাড়ির ভিতর নিজের ঘরে ফিরে এলেন ধনঞ্জয়। একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে এলেন কলঘর থেকে। কিন্তু জলকাদাতে সারাদিন ভেজার কারণে বেশ অবসন্ন লাগছিল তার শরীর। তিনি ভাবলেন আর রান্না করবেন না। রাতটা চিড়েমুড়ি খেয়েই কাটিয়ে দেবেন। পরদিন রবিবার, ভালো করে রান্না করে খাওয়া যাবে’খন। এ-কথা ভেবে বিশ্রাম নেবার জন্য শুয়ে পড়লেন তিনি। কিন্তু বিছানাতে মাথা দেওয়া মাত্রই ঘুম নেমে এল তাঁর চোখে৷

ধনঞ্জয়বাবুর যখন ঘুম ভাঙল তখন রাত প্রায় বারোটা বাজে। মোমের আলো অনেকক্ষণ নিভে গেছে। রাতে খালিপেটে শোওয়া ভালো নয়, তাই বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লেন তিনি। বাইরে বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ আর শোনা যাচ্ছে না। মনে হয় বৃষ্টিটা ধরেছে। বাইরের অবস্থা কী, তা দেখার জন্য জানালা খুললেন ধনঞ্জয়বাবু। তিনি দেখলেন বৃষ্টি সাময়িক বিরতি নিয়েছে। মেঘ কেটে গিয়ে আকাশের বুকে চাঁদও আত্মপ্রকাশ করেছে। তার আলোতে দেখা যাচ্ছে ভরন্ত গঙ্গা। উদ্দাম জলরাশি নিয়ে পাগলিনীর মতো সে ছুটে চলেছে। নীচের ঘরগুলোর দিকে তাকালেন তিনি। এখনও ইলেকট্রিক ফেরেনি। তাই ঘরের দরজা-জানলা খোলা-না বন্ধ তা ঠিক ঠাহর করতে পারলেন না ধনঞ্জয়বাবু।

কিন্তু এরপর তিনি ঘাটের দিকে তাকাতেই দেখতে পেলেন দুজনকে। ছোট দুটো মনুষ্যমূর্তি। চাঁদের আলোতে ধনঞ্জয়বাবু চিনতে পারলেন তাদের। এলা এবং পিটার। তারা দুই ভাইবোন দাঁড়িয়ে আছে ঘাটের সিঁড়ির মাথায়। তবে তাদের বাবা-মাকে সেখানে তিনি দেখতে পেলেন না। এত রাতে যোহানের ছেলেমেয়েরা ওখানে কী করছে? জল উঠে এসেছে প্রায় সিঁড়ির মাথা পর্যন্ত অর্থাৎ ছেলে-মেয়ে দুটো যেখানে দাঁড়িয়ে ঠিক তাদের পায়ের সামনে পর্যন্ত। প্রাথমিক অবস্থায় ধনঞ্জয়বাবুর মনে হল, হয়তো-বা তারা বৃষ্টি থামার পর নদীর অবস্থা দেখতে এসেছে। নদীর দিকেই তো তাকিয়ে আছে তারা। ধনঞ্জয় দেখতে লাগলেন তাদের। কয়েক মুহূর্ত কেটে গেল। আর এরপর ধনঞ্জয় দেখলেন পিটার তার দু-হাত দু-পাশে পাখির ডানার মতো ছড়িয়ে দাঁড়াল, ঠিক যেভাবে সে দাঁড়িয়েছিল ছাদের রেলিংয়ের ওপর। পিটারের পর তার দিদি এলাও একইভাবে দু-পাশে দু-হাত মেললো। দু-এক মুহূর্ত একইভাবে দাঁড়িয়ে রইল তারা দুজন। তারপর যা ঘটল তাতে নিজের চোখকেও যেন বিশ্বাস করতে কষ্ট হল ধনঞ্জয়বাবুর। ভাইবোন দুজনেই ঝাঁপ দিল জলে। মুহূর্তের মধ্যে জলের মধ্যে হারিয়ে গেল তারা !

ধনঞ্জয়বাবুর সারা শরীর ব্যাপারটা দেখামাত্রই শিহরন খেলে গেল। ওই ভরা নদীতে বড়-বড় সাঁতারুরাও নামতে সাহস পায় না। কারণ সাঁতারের কৌশল এসময় কোনো কাজে লাগে না। গঙ্গার প্রবল স্রোত যা কিছু পায় তাকেই দুরন্ত গতিতে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। নির্ঘাত বাচ্চাদুটোর ক্ষেত্রেও একই ঘটবে। তারা আর জল থেকে উঠে আসবে না কোনোদিন। এ কী করল বাচ্চা দুটো! তারা কি নিছক খেলার ছলেই মৃত্যুকে বরণ করল? না কি আত্মহত্যা করল?

পিটার আর এলার জলে ঝাঁপাবার কারণ যাই হোক না কেন তাদের নিশ্চিত মৃত্যু হল—এ ব্যাপারটা উপলব্ধি করে ধনঞ্জয়বাবুর শরীর কাঁপতে লাগল। এই মুহূর্তে তাঁর ঠিক কী করা উচিত তা তিনি বুঝতে না-পেরে জানালার গরাদ ধরে দাঁড়িয়ে হতভম্বের মতো তাকিয়ে রইলেন ঘাটের দিকে। চাঁদের আলোতে উন্মাদের মতো ছুটে চলেছে নদীর জল। যার মধ্যে হারিয়ে গেল ছেলেমেয়ে দুটো!

কতক্ষণ ধনঞ্জয়বাবু এমন আতঙ্কিত, হতচকিতভাবে দাঁড়িয়ে রইলেন তা তিনি খেয়াল করতে পারলেন না। তবে এরপর হঠাৎই আবার একজনকে দেখতে পেয়ে কিছুটা হুঁশ ফিরল তাঁর। ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যোহান এসে উপস্থিত হয়েছে ঘাটে। কিছুক্ষণ আগে ঠিক যেখানে তার ছেলেমেয়েরা দাঁড়িয়েছিল ঠিক সেখানেই এসে দাঁড়িয়েছে সে। নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে ধনঞ্জয়বাবু যোহানের উদ্দেশ্যে ওপর থেকে চিৎকার করে বলতে যাচ্ছিলেন, “জলে ঝাঁপ দিয়েছে! জলে ঝাঁপ দিয়েছে দুজনেই।”

কিন্তু তার আগেই তিনি শুনতে পেলেন জলের দিকে তাকিয়ে যোহান যেন বলল, “উঠে এসো, উঠে এসো তোমরা।”

চিৎকার করতে গিয়েও থেমে গেলেন ধনঞ্জয়বাবু। এরপর তিনি স্পষ্ট শুনলেন যোহান জলের দিকে তাকিয়ে বলল, “অনেক স্নান হল। এবার ঘরে চলো তোমরা।”

যোহানের এ কথা শুনে ধনঞ্জয় বুঝতে পারলেন যে পিটার আর এলা যে জলে নেমেছে তা জানে যোহান! ধনঞ্জয় অবাক হয়ে গেলেন। যোহানই কি তবে না-বুঝে তার সন্তানদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিল?

কিন্তু ধনঞ্জয়বাবুর আরও বিস্মিত হবার তখনও বাকি ছিল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ধনঞ্জয়বাবুর সব আশঙ্কা সব আতঙ্ক অমূলক প্রমাণ করে একে-একে জলের ভিতর থেকে ওপরে উঠে এল এলা ও পিটার। সারা শরীর বেয়ে জল ঝরছে তাদের। ছেলেমেয়ে দুজনকে নিয়ে যোহান এরপর এগোল তার ঘরের দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘরের ভিতর অদৃশ্য হয়ে গেল তারা। ধনঞ্জয়বাবু যেন তাদের ঘরের দরজা বন্ধ হবার স্পষ্ট শব্দও শুনতে পেলেন ওপর থেকে।

এরপরও কিছুক্ষণ জানালার গরাদ ধরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন ধনঞ্জয়বাবু। তিনি বুঝে উঠতে পারলেন না পুরো ব্যাপারটা কী হল? এই উদ্দাম জলস্রোতের মধ্যে বাচ্চা দুটো সাঁতার কাটল কীভাবে? যাই হোক শেষ পর্যন্ত যে ছেলেমেয়ে দুটো বেঁচে ফিরল তা দেখে ধীরে-ধীরে কিছুটা শান্ত হল তাঁর মন। এরপর তিনি জানালা বন্ধ করে শুকনো খাবার দিয়ে রাতের খাবার সাঙ্গ করে আবার শুয়ে পড়লেন।

আজকাল ভোরবেলা অনেক সময় মোরগের ডাকেই ঘুম ভাঙে ধনঞ্জয়বাবুর। তীক্ষ্ণ ডাকটা নীচ থেকে তার ঘরের ভিতর উঠে আসে। এদিনও সেই শব্দেই ঘুম ভাঙল তার। আজ রবিবার, ধনঞ্জয়বাবুর অফিস যাওয়া নেই। ঘুম ভাঙার পর কিছুক্ষণ বিছানাতে গড়াগড়ি দিয়ে আলসেমি কাটিয়ে একসময় উঠে পড়লেন তিনি। জানালা খুলতেই প্রথমে তার চোখে পড়ল নদীটা। দুর্বার গতিতে ঘোলা জল ছুটে চলেছে তার। এর পরমুহূর্তেই ধনঞ্জয়বাবুর মনে পড়ে গেল গত রাতের ঘটনার কথা! অদ্ভুত ঘটনা! একবার তার মনে হল তিনি ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখেননি তো? তিনি তাকালেন যোহানের থাকার জায়গার দিকে। ঘরগুলোর দরজা-জানলা বন্ধ। তার মুরগিগুলো ঘুরে বেড়াচ্ছে বন্ধ দরজার সামনে।

বেলা আটটা নাগাদ বাজারে বেরিয়ে পড়লেন। তিনি বাজারে পৌঁছে বেশ খানিকটা সময় ধরে মাংস ইত্যাদি কেনাকাটা করলেন। পরিচিত কয়েকজনের সঙ্গে গল্পগুজব করলেন, তারপর বাজারের থলে হাতে ফেরার পথ ধরলেন। কিন্তু গতরাতের ঘটনাটা যেন তিনি কিছুতেই মন থেকে মুছে ফেলতে পারলেন না। বারবার তার চোখে ভেসে উঠতে লাগল গতরাতের অদ্ভুত দৃশ্যগুলো। বাজার নিয়ে বাড়ি ফিরে তিনি বারান্দাতে উঠতে যাচ্ছেন, ঠিক সেই সময় তিনি শুনতে পেলেন মোটরসাইকেলের হর্নের শব্দ। থমকে দাঁড়িয়ে পিছনে তাকালেন তিনি। এক স্যাঙ্গাতের মোটর-বাইকের পিছনে চেপে তাঁর সামনে এসে দাঁড়ালো নৃসিংহ দত্ত। তারপর পানের ছোপ-ধরা দাঁত বার করে হেসে ধনঞ্জয়বাবুর উদ্দেশে বলল, “কী? ভাবা হল?”

ধনঞ্জয়বাবু একটু রুক্ষভাবে বললেন, “কী ভাবব?”

নৃসিংহ বলল, “বাড়িটা বিক্রি করার ব্যাপারে?”

ধনঞ্জয়বাবু বললেন, “আপনাকে তো কতবার বলেছি যে বাড়িটা আমি বিক্রি করব না। তবু কেন বারবার আমাকে বিরক্ত করতে আসছেন? এর পর থেকে আমাকে বিরক্ত করবেন না।”

ধনঞ্জয়বাবুর এ-কথা শোনার পর নৃসিংহ দত্ত-র চোয়ালটা যেন কেমন শক্ত হয়ে গেল। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে সে বলল, “শুনুন মশাই, নৃসিংহ দত্ত-র চোখ যে-জায়গার ওপর পড়ে সেটা সে নিয়েই ছাড়ে। আমার কথা শুনলে আপনার লাভই হবে। সামনের সপ্তাহে আমি আর একবার আসব। কাগজপত্র আর টাকাও সঙ্গে আনব। আপনি সই করে দেবেন।”

লোকটার কথা শুনে হতভম্ব হয়ে গেলেন ধনঞ্জয়বাবু। নৃসিংহ যে এবার আর অনুরোধ নয়, বাড়ি বিক্রির জন্য নির্দেশ দিচ্ছে তাকে।

তবে লোকটা এরপর আর দাঁড়াল না। বাইকের ইঞ্জিন চালু অবস্থাতেই ছিল।

ধনঞ্জয়বাবু তাকে কিছু বলার আগেই তার সঙ্গী বাইক চালু করে দিল। এ ঘটনা ঘটায় বেশ উত্তেজিতভাবেই নিজের ঘরে ফিরলেন ধনঞ্জয়বাবু। বেশ কিছুক্ষণ ভাবার পর তার মনে হল যে নৃসিংহ দত্ত-র ব্যাপারটা তার নতুন ভাড়াটেকে জানিয়ে রাখা ভালো। জানালা দিয়ে তিনি তাকালেন নীচের ঘরগুলোর দিকে, তাদের দরজা-জানালা সব বন্ধ। বেশ একটু অবাকই হলেন ধনঞ্জয়বাবু। বেলা দশটা বাজতে চলল, এত বেলাতেও তাঁর ভাড়াটেদের ঘুম ভাঙে না না কি? না কি তারা ঘরে নেই?

ধনঞ্জয়বাবু ঠিক করলেন—রান্না, ঘরের কাজ সেরে ভাড়াটের ঘরে তার খোঁজ করতে যাবেন। যদি তারা বাইরে গিয়ে থাকে তবে তারা সে সময়ের মধ্যে ফিরে আসতে পারে।

অন্য রবিবারগুলো যে উৎসাহ নিয়ে তিনি রান্নাবান্না করেন এদিন তা হল না। মনের মধ্যে অশান্তি নিয়ে তিনি রান্নাবান্না, ঘর পরিষ্কার ইত্যাদি কাজ করলেন। এসব কাজ করতেই তার ঘণ্টা-দুই সময় কেটে গেল। তারপর তিনি যোহানের সঙ্গে দেখা করার জন্য নীচে নামলেন।

ধনঞ্জয়বাবু দেখতে পেলেন তিনটে ঘরের দরজাই ভিতর থেকে বন্ধ। “যোহান আছেন না কি?”—এই বলে তিনি হাঁক পাড়লেন। বারতিনেক হাঁক পাড়ার পর একটা ঘরের ভিতর থেকে যোহানের কণ্ঠস্বর শোনা গেল— “হ্যাঁ, হ্যাঁ, আছি, আছি। দরজা খুলছি।”

দরজা খুলতে অবশ্য আরও কিছুক্ষণ সময় লাগল। যোহান ঘরের ভিতর থেকেই বলল, “আসুন, ঘরে আসুন।”

বাইরের আলো থেকে ঘরে ঢুকে প্রথমে ঘরের ভিতর কিছুই দেখতে পেলেন না ধনঞ্জয়বাবু। তিনি বলেই ফেললেন, “আপনারা দিনেরবেলাতে এমন দরজা জানলা বন্ধ করে রাখেন কেন?”

যোহান জবাব দিল, আসলে দরজা-জানলা খোলা রাখলে পুবদিকের রোদ সোজা ভিতরে ঢোকে, ঘর গরম হয় তাই। তাছাড়া আমার ছেলেমেয়ে দুটোর চোখের সমস্যা আছে। ওরা কড়া আলো সহ্য করতে পারে না, সে জন্যও দরজা-জানলা বন্ধ করে রাখি অথবা সামান্য খুলে রাখি। কথা বলতে-বলতেই ঘরের আলো জ্বালাল যোহান।

আলোরও বেশি জোর নেই। হলদেটে রঙের একটা বাল্ব। ঘরের চারপাশে তাকালেন ধনঞ্জয়বাবু। এ-ঘরে যোহানের পরিবারের অন্য কেউ উপস্থিত নেই। অন্য ঘরে ধনঞ্জয়বাবুর খাট ইত্যাদি কিছু আসবাব থাকলেও ভাড়া দেবার সময় এ-ঘরটা তার ফাঁকাই ছিল। বর্তমানে এ-ঘরের এক কোণে একটা নিচু বিছানা পাতা রয়েছে মাটি থেকে সামান্য একটু ওপরে। যদিও বিছানার সাদা চাদর মেঝে পর্যন্ত নেমে এসেছে, তবু তা দেখে ধনঞ্জয়বাবুর মনে হল নিচু লম্বা-লম্বা বেঞ্চের মতো কয়েকটা জিনিস জুড়েই যেন একটা খাটের মতো জায়গা তৈরি করে তার ওপর বিছানা পাতা হয়েছে। এ-ছাড়া খুব সামান্য কয়েকটা জিনিস ধনঞ্জয়বাবুর চোখে পড়ল। বিছানাটা দেখিয়ে যোহান সেখানে বসতে বললেন ধনঞ্জয়বাবুকে। বসলেন ধনঞ্জয়বাবু। সঙ্গে-সঙ্গে একটা ক্যাচ-ক্যাঁচ শব্দ উঠল; ধনঞ্জয় বুঝতে পারলেন বিছানার নীচে কাঠেরই কিছু আছে।

আসল কথাটা শুরু করার আগেই হঠাৎই ধনঞ্জয়ের মনে পড়ে গেল গতরাতের ঘটনাটার কথা। তিনি যোহানকে বললেন, “জানালা দিয়ে গতরাতে আপনার ছেলেমেয়েদের ভরা-গঙ্গায় ঝাঁপ দিতে দেখে সত্যি কথা বলতে কী আমি কিন্তু খুব ভয় পেয়ে গেছিলাম।”

এ কথা শুনেই যোহানের মুখে একটা অপ্রস্তুত ভাব ফুটে উঠল। অত রাতে ব্যাপারটা যে ধনঞ্জয়বাবুর নজরে পড়বে- তা যেন সে ভাবেনি। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে সে জবাব দিল, “আসলে সাঁতার আর দুঃসাহসের ব্যাপারটাও ওদের জন্মগত। আসলে ওদের পূর্বপুরুষেরাও তো একদিন সমুদ্রের ঝড়বাদল পেরিয়ে এই ভারতবর্ষে এসেছিলেন—আপনি ও-নিয়ে বেশি ভয় পাবেন না।”

ধনঞ্জয় বললেন, “তা বটে। তবে যাই বলুন না কেন, ব্যাপারটা কিন্তু খুব রিস্কি। যে কোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারত।”

এ-কথা বলে তিনি মূল প্রসঙ্গে চলে গিয়ে যোহানকে প্রশ্ন করলেন, “আপনি নৃসিংহ দত্তকে চেনেন? প্রোমোটার, যে ওই পুরোনো কবরখানার জমিতে ফ্ল্যাট বানাবার কাজ শুরু করেছে?”

কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে যোহান জবাব দিল, “হ্যাঁ, দেখেছি লোকটাকে।” ধনঞ্জয়বাবু এরপর বিস্তারিতভাবে তার সমস্যার ব্যাপার খুলে বলতে শুরু করলেন যোহানকে।

পুরো ঘটনাটা শোনার পর যোহান বলল, “সত্যি কথা বলতে কী ওই লোকটার উপদ্রবের কারণেই আমরা আগের বাসস্থান ছেড়ে এখানে এসেছি। সে জায়গার শান্ত-পরিবেশ একদম নষ্ট করে দিয়েছে লোকটা। এখন দেখছি ওর এ-বাড়ির ওপরও নজর পড়েছে।”

এ কথা বলার পর সে ধনঞ্জয়বাবুকে আশ্বস্ত করে বলল, “আমরা তো আছি। এ বাড়িতে এসে সে আপনার ক্ষতি করতে পারবে না। তবে রাস্তাঘাটে একটু সাবধানে চলবেন। রাতে কোনো প্রয়োজন হলে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে ডাকবেন।”

ধনঞ্জয় খুশি হলেন তাঁর ভাড়াটের কথা শুনে। তিনি এরপর নিজের ঘরে ফেরার জন্য উঠে দাঁড়ালেন। ঠিক সেই সময় যোহান বলল, “দেখতে-দেখতে দু-সপ্তাহ পেরিয়ে গেল আপনার বাড়িতে। পরশু থেকে তো ইংরেজি মাস পড়বে। আপনি বরং ভাড়ার টাকাটা নিয়েই যান।”

ধনঞ্জয় আর আপত্তি না করে বললেন, “আচ্ছা দিন।”

যোহান এগিয়ে গিয়ে কুলুঙ্গি থেকে একটা চামড়ার বটুয়া বা থলে বার করে আনল। তারপর তার ভিতর হাত ঢুকিয়ে এক মুঠো কয়েন বা ধাতব-মুদ্রা বার করে মেলে ধরল ধনঞ্জয়ের সামনে৷

ধনঞ্জয়বাবু বললেন, “এগুলো কী?”

যোহান জবাব দিল, “পুরোনো আমলের খাঁটি রুপোর মুদ্রা।”

ধনঞ্জয়বাবু একটা টাকা হাতে তুলে নিয়ে দেখলেন। হ্যাঁ, কোনো রাজার ছবিওলা রুপোর টাকা। ওজনেও বেশ ভারী!”

বিস্মিত ধনঞ্জয়বাবু প্রশ্ন করলেন, “এ-জিনিস আপনি কোথায় পেলেন?”

যোহান হেসে বলল, “চুরির মাল নয়। আমার পূর্বপুরুষের জিনিস। অন্য টাকা আমার কাছে বর্তমানে নেই। আপনি তাই এগুলো রাখুন। আশা করি এগুলোর যা দাম তাতে আপনার ভাড়ার টাকা হয়ে যাবে। আপনি এগুলো রাখুন।”

ধনঞ্জয়বাবু বললেন, “হয়ে বেশিই হয়ে যাবে। কিন্তু এসব আপনার অমূল্য পারিবারিক জিনিস। আমি এসব নেব না। আপনি না-হয় ক-দিন পরই ভাড়ার টাকা দেবেন আপনার সুবিধামতো। কোনো তাড়া নেই।”

যোহান বলল, “আপনি আপাতত এই টাকা ক-টা রাখুন। তেমন হলে আমি না-হয় ক-দিন পর ফিরিয়ে নেব। কিন্তু এ গুলো না নিলে আমি অস্বস্তির মধ্যে পড়ব। সবসময় আমার মনে হবে আমি যেন বিনা ভাড়ায় আপনার বাড়িতে আছি।”

যোহানের কথার মধ্যে এমন কিছু একটা ছিল যে এরপর তাকে আর “না” বলতে পারলেন না ধনঞ্জয়বাবু। তাছাড়া বর্তমান অবস্থায় যেকোনো সময় তাঁর যোহানের সাহায্যের প্রয়োজন হতে পারে। তাই ধনঞ্জয়বাবু বললেন, “ঠিক আছে দিন। কিন্তু ওই কথাই রইল। আপনার টাকা জোগাড় হবার পর কিন্তু আপনি আমার থেকে টাকাগুলো ফিরিয়ে নেবেন।”

ধনঞ্জয়বাবু এরপর যোহানের থেকে সেই রুপোর টাকাগুলো নিয়ে দোতলাতে নিজের ঘরে ফিরে এলেন।

বর্ষাকাল। বৃষ্টি হওয়ার কোনো নিয়ম নেই। দুপুর থেকেই এরপর আবার আকাশে মেঘ জমতে শুরু করল। আর বিকাল হতেই অঝোরে বৃষ্টি নামল। কাজেই আড্ডা দেবার জন্য ধনঞ্জয়বাবুর আর বাইরে যাওয়া হল না। ঘরে বসে মাঝেমাঝেই তার নৃসিংহ দত্ত-র কথা মনে পড়লেও যোহানের সঙ্গে কথা বলে কিছুটা হলেও নিশ্চিন্ত বোধ করলেন তিনি। যোহান বেশ শক্তপোক্ত চেহারার লোক।

সময় নিজের নিয়মেই প্রবাহিত হয়। পরদিন থেকে যথারীতি অফিস শুরু হল ধনঞ্জয়বাবুর। বৃষ্টিও হয়ে চলেছে নিয়মিত। কখন যায় কখন আসে তার ঠিক নেই। তবে যোহানের পরামর্শমতো কিছুটা সাবধানতা অবলম্বন শুরু করেছেন ধনঞ্জয়। চেষ্টা করেন যথাসম্ভব দ্রুত অফিস থেকে বাড়ি ফেরার। স্টেশনে যাওয়া-আসার পথে কোনো পরিচিত লোক দেখলে তাঁর সঙ্গেই কথা বলতে-বলতে যাওয়া-আসার চেষ্টা করেন। এভাবেই ধনঞ্জয়বাবুর একটা সপ্তাহ প্রায় কেটে গেল। শনিবার সন্ধ্যায় অফিসফেরতা ট্রেন থেকে নেমে সাইকেল নিয়ে তিনি বাড়ির দিকে এগোতে-না-এগোতেই প্রবল বৃষ্টি শুরু হল। এমন বৃষ্টি যে আর সাইকেল চালাবার উপায় নেই। কাজেই বাধ্য হয়ে ধনঞ্জয় গিয়ে আশ্রয় নিলেন রাস্তার পাশেই এক চায়ের দোকানে। আর সেখানে ঢুকেই ধনঞ্জয়বাবু দেখতে পেলেন তার বন্ধু পরিতোষকে। নাতির জন্য স্টেশন বাজার থেকে খাতা-পেনসিল কিনতে এসে তিনিও বৃষ্টির থেকে বাঁচতে চায়ের দোকানে আশ্রয় নিয়েছেন। বৃষ্টি নামায় এক দিক থেকে ভালোই হল। বর্তমানে রবিবারের বৈকালিক আড্ডাতে ধনঞ্জয়বাবু অনিয়মিত হয়ে পড়েছেন। দুই বন্ধুর কিছুক্ষণের জন্য গল্পের সুযোগ করে দিল এই বৃষ্টি। দোকানে অন্য কোনো খদ্দের নেই।

দু-কাপ চা নিয়ে কেঠো বেঞ্চে বসে বাইরের বৃষ্টি দেখতে-দেখতে কথা শুরু করলেন দুই বন্ধু। নানান কথার মাঝে ধনঞ্জয় একসময় পরিতোষকে প্রশ্ন করলেন, “তোমার নাতির স্কুলে ভর্তির কী হল? ওই ‘ড্যানিশ অ্যাকাদেমি’ নামের স্কুলটার সম্পর্কে খোঁজ নিলে? আমি ভেবে রেখেছিলাম ওই স্কুলের ব্যাপারে তোমার নাতির জন্য খবর সংগ্রহ করব, কিন্তু নানান ঝামেলায় তাকে কথাটা জিজ্ঞেস করতেই ভুলে গেছি।”

কথাটা শুনে পরিতোষ ধনঞ্জয়কে অবাক করে দিয়ে বললেন, “তোমাকে তোমার ভাড়াটে কোন ড্যানিশ অ্যাকাদেমির কথা বলেছে জানি না, ওই নামে ওলন্দাজদের একটা স্কুল গঙ্গার ধারে একসময় ছিল বটে, তবে সেটা দুশো বছর আগেই উঠে গেছে। সেই স্কুলের ছাদহীন কয়েকটা ঘর শুধু অতীতের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। অবনী সেদিন বলছিল না যে ওই স্কুল নিয়ে কী একটা লেখা সে পড়েছে কাগজে? সেটা হল এ অঞ্চলে ডাচদের স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে একটা প্রবন্ধ। তাতেই এই স্থানের কথাও উল্লেখ আছে। অবনী পরে কাগজটা এনে লেখাটা আমাকে দেখিয়েছে।

পরিতোষের কথা শুনে ধনঞ্জয় বললেন, “এমন তো হতে পারে যে ওই পুরোনো নামে নতুন কোনো স্কুল গজিয়েছে?”

পরিতোষ এ-প্রশ্ন শুনে বেশ দৃঢ়ভাবে বললেন, “আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি। ও-নামে নতুন বা পুরোনো কোনো স্কুলই আর এখানে নেই।”

বৃষ্টি একসময় কিছুটা ধরল। ধনঞ্জয় আর পরিতোষ চায়ের দোকান ছেড়ে বেরিয়ে যে-যার বাড়ির পথ ধরার আগে কথা হল যে, পরদিন বিকেলে বৃষ্টি না-হলে গঙ্গার পাড়ে নির্দিষ্ট স্থানে বন্ধুদের আড্ডা বসবে।

ধনঞ্জয় বাড়ি ফিরে এলেন। বাড়ি ফিরে কিছুক্ষণের মধ্যে রাতের রান্নার কাজ শুরু করে দিলেন তিনি। এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হল। দরজা খুলে তিনি দেখতে পেলেন যোহানকে। তার হাতে কাগজে মোড়া একটা জিনিস। সে সেটা বাড়িয়ে দিল ধনঞ্জয়বাবুর দিকে। তিনি সেটা হাতে নিয়ে জানতে চাইলেন, “কী এটা?”

যোহান হেসে বলল, “আজ আমার কন্যা এলার জন্মদিন। তাই কেক দিয়ে গেলাম।”

ধনঞ্জয়বাবু খুশি হয়ে বললেন, “ধন্যবাদ আপনাকে। মেয়েকে আমার আশীর্বাদ জানাবেন।”

যোহানও হাসল। তবে সে আর দাঁড়াল না। এগোল নীচে নামার সিঁড়ির দিকে। আর ধনঞ্জয়বাবুও দরজা বন্ধ করে ঘরের কাজে মন দিলেন।

সব কাজ গুছিয়ে রাতের খাওয়া সেরে শোবার আগে জানালার সামনে এসে দাঁড়ালেন ধনঞ্জয়। আকাশে বেশ বড় চাঁদ উঠেছে মেঘের আড়াল থেকে। বৃষ্টি সাময়িক বিরতি নিয়েছে। চাঁদের আলোতে ছুটে চলেছে বেগবতী গঙ্গা। ধনঞ্জয়বাবু তাকালেন তাঁর ভাড়াটেদের ঘরগুলোর দিকে। সেদিন তিনি যে ঘরে গিয়ে ঢুকেছিলেন অর্থাৎ যোহানের ঘরের দরজাটা খোলা। এক চিলতে আলো ঘরের ভিতর থেকে বাইরে এসে পড়েছে। ধনঞ্জয়বাবুর মনে হল মৃদু সংগীত ধ্বনিও যেন ভেসে আসছে ঘর থেকে। হয়তো-বা জন্মদিনের পার্টি চলছে। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই সে ঘর থেকে পরিবারসমেত বাইরে বেরিয়ে এল যোহান। তাদের পোশাক দেখে বেশ অবাক হলেন ধনঞ্জয়বাবু। যোহানের পরনে একটা লম্বা ঝুলের পোশাক। বুকের কাছে পোশাকের বড়-বড় ধাতব বোতামগুলো চকচক করছে। তার কোমরে চওড়া চামড়ার বেল্ট, পায়ে জুতো, মাথায় বাঁকানো টুপি। টমের পোশাকটাকেও বলা যেতে পারে যোহানেরই ক্ষুদ্র-সংস্করণ। যোহানের স্ত্রী আর কন্যার পরনে লেস বসানো হাতাওলা ধবধবে সাদা গাউন, মাথায় লেসের টুপি। তাঁদের চারজনের পোশাকেরই ধাঁচের সঙ্গে বর্তমানে যে ধরনের পোশাক পরা হয় তার সঙ্গে ফারাক আছে। একসময় এদেশে আগত ইউরোপীয়ানরা এমন পোশাক পরত। ধনঞ্জয়বাবু ছবিতে দেখেছেন। তাদের দেখে ধনঞ্জয়ের মনে হল যেন ছবির বই থেকে উঠে এসেছে যোহান আর তার পরিবার। “হয়তো-বা এলার জন্মদিন উপলক্ষে পূর্বপুরুষদের পোশাকে সেজেছে ওরা। এটা ওদের সামাজিক রীতিও হতে পারে।” –এ কথা মনে-মনে ভাবলেন ধনঞ্জয়। দল বেঁধে পুরো পরিবারটা গিয়ে দাঁড়ালো ঠিক ঘাটের সামনে। তারপর চাঁদের আলোতে হাতে হাত ধরে চারজনে গোল হয়ে নৃত্য শুরু করল। পারিবারিক বন্ধনের, ভালোবাসার এ-এক অপূর্ব সুন্দর দৃশ্য। বেশ কিছুক্ষণ ধরে ধনঞ্জয়বাবু উপভোগ করলেন সেই দৃশ্য। তারপর দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়লেন।

পরদিন রবিবার। ধনঞ্জয়বাবুর সকালে উঠে চায়ের সঙ্গে গতরাতের উপহার পাওয়া কেকটা খেলেন। বেশ খেতে। জানালা দিয়ে তিনি দেখলেন যোহানের ঘরগুলো প্রতি সকালের মতোই বন্ধ। এরপর নির্দিষ্ট সময়ে বাড়ি থেকে বাজারের উদ্দেশে রওনা হলেন তিনি। ধনঞ্জয়বাবুর বাজারে গিয়ে একটা কথা মনে হল, জন্মদিনের কেক যখন যোহান দিয়ে গেছে তখন তার কন্যা এলাকে একটা উপহার দেওয়া উচিত। এ-কথা ভেবে ফেরার পথে তিনি একটু সুন্দর দেখতে ডল-পুতুল কিনে আনলেন।

বাড়ি ফিরে রবিবারের প্রয়োজনীয় ঘরের কাজ সেরে আগুনে মাংস বসিয়ে ধনঞ্জয়বাবু পুতুলটা নিয়ে চললেন মেয়েটাকে উপহার দেবার জন্য।

নীচে নেমে যোহানের ঘরের কাছে উপস্থিত হলেন তিনি। তিনটে ঘরের দরজাই ভিতর থেকে বন্ধ, যেমন বন্ধ থাকে।

যোহানের নাম ধরে ধনঞ্জয়বাবুর বার-কয়েক হাঁক দেবার পর দরজা খুলল যোহান। তার পরনে প্যান্ট-শার্ট। সাধারণত যোহান যে পোশাকে থাকে। বাইরের রোদ্দুরের আলো যোহানের মুখে পড়াতে কুঁচকে গেল তার চোখ। সে বলল, “আসুন, আসুন, ভিতরে আসুন।”

ধনঞ্জয়বাবু ঘরের ভিতর পা রাখলেন। সঙ্গে সঙ্গে একটা মৃদু আঁশটে গন্ধ এসে লাগল তাঁর নাকে। আগের দিনের মতোই ঘরটা অন্ধকার ছিল। যোহান ঘরের হলদেটে আলোটা জ্বালাল। তার দিকে এবার ভালো করে তাকিয়ে ধনঞ্জয়বাবুর মুহূর্তের জন্য মনে হল তার মুখটা যেন কেমন অদ্ভুত লাগছে! তবে সেই অদ্ভুত ব্যাপারটা যে কী তা তিনি ঠিক সেই মুহূর্তে ধরতে পারলেন না।

যোহান ধনঞ্জয়বাবুকে বললেন, 
“বসুন। ওই বদমাইশ লোকটা বাড়ি বিক্রি করার জন্য আপনাকে আবার ধরেছিল নাকি?”

ধনঞ্জয়বাবু জবাব দিলেন, “না, সে আসেনি। তবে আসবে হয়তো।”

এ কথা বলার পর তিনি বললেন, “আপনার মেয়েকে একটু ডাকুন। ওর জন্মদিন উপলক্ষে আমি একটা উপহার এনেছি।”

যোহানের মুখ দেখে ধনঞ্জয়বাবুর মনে হল সে যেন খুশি হল কথাটা শুনে। কিন্তু এরপরই সে একটু ইতস্তত করে বলল, “তাকে তো এখন ডাকা যাবে না। আসলে সারা রাত ধরে হই-হুল্লোড় করার পর সে এখন ঘুমোচ্ছে।”

কথাটা শুনে ধনঞ্জয়বাবু পুতুলটা যোহানের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “এটা তবে আপনিই মেয়েকে দিয়ে দেবেন।”

যোহান পুতুলের বাক্সটা হাতে নিয়ে বললেন, “অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। খুব খুশি হবে এলা। আমি তাকে বলব আপনার সঙ্গে সন্ধ্যা নামার পর দেখা করে আসতে।”

ধনঞ্জয়বাবু রান্না চাপিয়ে এসেছেন। যোহানের সঙ্গে আর বিশেষ কোনো কথা না-থাকায় এবার তিনি ঘরের বাইরে যাবার জন্য পা বাড়ালেন। তিনি চৌকাঠ ডিঙোতে যাচ্ছেন ঠিক সেই সময় একটা ঝটপট শব্দ শুনে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে পিছনে তাকালেন। পাখির ডানা ঝাপটানোর মতো শব্দটা আসছে যোহানের চাদর-ঢাকা বিছানার মতো জায়গাটার নীচ থেকে। আর এরপরই সে জায়গা থেকে ছটফট করতে-করতে বেরিয়ে এল যোহানের পোষা মোরগটা। ভালো করে মোরগটার দিকে তাকিয়ে ধনঞ্জয়বাবু অবাক হয়ে গেলেন। মোরগটা মুণ্ডুহীন। মাথাটা তার কেটে নেওয়া হয়েছে ধড় থেকে। রক্ত বেরোচ্ছে সেখান থেকে। বাজারে মাংসের দোকানে মুরগির মাথা কাটার পর দেহটা বেশ কিছুক্ষণ ছটফট করে। এক্ষেত্রেও ব্যাপারটা তাই হয়েছে বলে ধনঞ্জয়বাবুর মনে হল। তার ধারণা হল যোহান মোরগটাকে জবাই করছিল। যোহানের মোরগ, সে রান্নার জন্য জবাই করতেই পারে। ঘটনাটার মধ্যে আশ্চর্য হবার মতো কোনো ব্যাপার নেই। কিন্তু হঠাৎই এরপর ঘরের বাইরে পা রেখে যোহানের দিকে তাকিয়ে ‘যাচ্ছি’ বলতে গিয়ে ধনঞ্জয়বাবু আশ্চর্য হয়ে গেলেন অন্য কারণে। বাইরের রোদ এসে পড়েছে যোহানের মুখে। ধনঞ্জয়বাবু যে ব্যাপারটা এতক্ষণে যেন বুঝেও বুঝতে পারছিলেন না, সে-ব্যাপারটা স্পষ্ট ধরা দিল তার চোখে। যোহানের ঠোটের দু-পাশে রক্ত লেগে আছে।

জামার বুকের কাছেও কয়েক ফোঁটা রক্ত, আর লেগে আছে মোরগের একটা পালক। ঠোটের কষে রক্ত আছে বলেই ঘরে ঢুকে যোহানের মুখটা কেমন যেন অদ্ভুত বলে মনে হয়েছিল ধনঞ্জয়বাবুর।

তিনি দরজার বাইরে বেরিয়ে যোহানের দিকে তাকাবার পরই সে আর কোনো কথা না-বলে ধনঞ্জয়বাবুর মুখের ওপর দ্রুত দরজা বন্ধ করে দিল।

ঘরে ফিরে এলেন ধনঞ্জয়। কিন্তু ঘরের কাজ করতে-করতে কেমন যেন তাঁর মনে বার বার ভেসে উঠতে লাগল যোহানের রক্তমাখা ঠোঁটদুটো। যোহান কি তবে কামড়ে তার মোরগের মাথাটা ছিঁড়ে নিয়েছে? তার এমন আচরণের কারণ কী? যোহানরা এ বাড়িতে আসার পর থেকে ধনঞ্জয়বাবু তাদের নিয়ে যা দেখেছেন, যা শুনেছেন সেগুলো ভাবতে লাগলেন তিনি। যোহানের ওইটুকু ছেলের ছাদের প্রাচীরে উঠে দাঁড়ানো, তার ছেলেমেয়ের উত্তাল নদীতে ঝাঁপ দেওয়া। ধনঞ্জয়বাবুকে যোহানের প্রাচীন মুদ্রা দেওয়া, দিনেরবেলাতে তাদের ঘরের দরজা-জানলা বন্ধ রাখা, এসব কিছুর আড়ালে অন্য একটা রহস্য যেন লুকিয়ে আছে! এসব ভাবতে-ভাবতে একটা অস্বস্তিবোধ করতে লাগলেন ধনঞ্জয়বাবু। স্নান, খাওয়া সেরে যখন তিনি বিছানাতে শুতে গেলেন তখন বাইরে আকাশে আবার মেঘ ঘনাতে শুরু করেছে।

না, এদিন বিকেলেও বাইরে আর বেরোনো হল না ধনঞ্জয়বাবুর। বিকাল চারটে নাগাদ যখন তার ঘুম ভাঙল তখন বাইরে অঝোরে বৃষ্টি হয়ে চলেছে।

ঘুম ভাঙার পরও ধনঞ্জয়বাবু তাঁর ভাড়াটেদের সম্পর্কে ভাবনাগুলো মন থেকে সরাতে পারলেন না। তিনি অন্য নানান কথা ভাববার চেষ্টা করলেও বারেবারেই সেই অদ্ভুত ব্যাপারগুলো তাঁর মনের মধ্যে পাক খেতে লাগল। দেখতে-দেখতে বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল একসময়। বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লেন ধনঞ্জয়। তারপর বাতি জ্বালিয়ে চা বানিয়ে, চায়ের কাপ আর একটা গল্পের বই নিয়ে বসলেন। সময় এগিয়ে চলল।

ধনঞ্জয়বাবু ডুবে গিয়েছিলেন গল্পের বইয়ের মধ্যে। হঠাৎ তাঁর খেয়াল হল রাত ন-টা প্রায় বাজতে চলেছে। বাইরে থেকে বৃষ্টির শব্দ আর থামছে না, শুধু ব্যাঙের কলরব কানে আসছে। পরদিন সকালে আবার অফিস ছুটতে হবে ধনঞ্জয়বাবুকে। তাই খাওয়া সেরে শুয়ে পড়ার জন্য বই বন্ধ করে উঠে পড়লেন তিনি। ভাতটা গরম করার জন্য সেটা আগুনে বসিয়ে ঘরের জানালা খুললেন তিনি। হ্যাঁ, বৃষ্টি থেমেছে। চাঁদও আত্মপ্রকাশ করেছে মেঘের আড়াল থেকে। তার আলোতে দুর্বার গতিতে ছুটে চলেছে বর্ষার গঙ্গা। ধনঞ্জয়বাবু, যোহানের ঘরের দিকে তাকালেন। তার ঘরের দরজা খোলাই বলে মনে হল ধনঞ্জয়বাবুর।

ঠিক সেই সময় তাঁর ঘরের দরজায় টোকা পড়ল। ধনঞ্জয়বাবু ভাবলেন যোহান তার মেয়েকে পাঠিয়েছে ধন্যবাদ দেওয়ার জন্য। ধনঞ্জয়বাবু দরজা খুললেন। কিন্তু তারপরই তিনি চমকে উঠলেন। এলা কোথায়! তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছে নৃসিংহ দত্ত আর তার এক সাগরেদ। কখন যেন বাড়িতে প্রবেশ করে ওপরে উঠে এসেছে তারা দু’জন। ধনঞ্জয়বাবু আর নৃসিংহ কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপভাবে তাকিয়ে রইলেন পরস্পরের দিকে।

তারপর নৃসিংহ কোনো ভণিতা না-করে বলল, “আসব বলেছিলাম, এলাম। কাগজপত্র সঙ্গে করেই এনেছি। সই করে দিন।”

ধনঞ্জয়বাবু এবার খেয়াল করলেন রোল করা একটা কাগজ ধরা আছে নৃসিংহের হাতে।

ধনঞ্জয় বললেন, “না, কোনো কাগজে আমি সই করব না। বাড়ি আমি বেচব না। আপনারা চলে যান এখান থেকে।”

কথাটা শুনে নৃসিংহ শীতল-কণ্ঠে বলল, “সই আপনাকে করতেই হবে। আমি আর সময় নষ্ট করতে পারব না।”

ধনঞ্জয় বলে উঠলেন, “এ কি জবরদস্তি নাকি?”

নৃসিংহর মুখে একটা অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল। ডানহাতটা সে এবার ওপর দিকে তুলল। ধনঞ্জয় দেখলেন নৃসিংহর হাতে উঠে এসেছে একটা পিস্তল। আর তার নলটা তাক করা আছে সোজা তার বুকের দিকে।

ধনঞ্জয়বাবু হতভম্বের মতো চেয়ে রইলেন পিস্তলটার দিকে। তিনি এবার কী করবেন তা ঠিক বুঝে উঠতে পারলেন না।

তাকে চুপ করে থাকতে দেখে নৃসিংহ সাপের মতো হিসহিস করে বলে উঠল, ‘সময় নষ্ট করে আর লাভ নেই। এবার সই করে দাও।” –এ কথা বলে সে তার সঙ্গীকে ইশারা করতেই লোকটা কাগজ-কলম বাড়িয়ে দিল ধনঞ্জয়বাবুর দিকে।

ধনঞ্জয় বুঝতে পারলেন, তার এবার আর কিছু করার নেই। নৃসিংহ যদি সত্যিই গুলি চালায় তবে তাকে আটকাবার কেউ নেই। তার চেয়ে তার কথা মেনে সই করে দেওয়াই ভালো। তাতে যদি তার প্রাণরক্ষা হয়।

ঠিক সেই একথা ভেবে তিনি হাত বাড়াতে যাচ্ছিলেন কাগজ-কলম নেওয়ার জন্য, সময় দরজার বাইরে একটা শব্দ হল। তা শুনে সবাই তাকাল সেদিকে। ধনঞ্জয় দেখলেন নৃসিংহ আর তার সঙ্গীর পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে এলা আর পিটার। হয়তো-বা তারা ধনঞ্জয়বাবুকে ধন্যবাদ জানাবার জন্য ঠিক এসময় এসে উপস্থিত হয়েছে।

অন্য কেউ এসময় এখানে এসে উপস্থিত হবে নৃসিংহ তা ভাবতেও পারেনি। বড় মানুষ হোক বা ছোট মানুষ, নৃসিংহ যে কাজ করতে এসেছে তার কোনো সাক্ষী থাকা উচিত নয়। সম্ভবত তাই সে বাচ্চাগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘অ্যাই তোরা কারা? যা, ভাগ এখান থেকে।”

কিন্তু পিটার আর এলা কিন্তু গেল না। বরং তারা যেন আরও কাছে এগিয়ে এল। তাদের ভয় দেখাবার জন্য নৃসিংহ এবার তার হাতের পিস্তলটা ধনঞ্জয়বাবুর দিক থেকে তাদের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে বলল, “দেখেছিস আমার হাতে এটা কী? যা, পালা বলছি।” আর এরপরই এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটল। পিটার হঠাৎ লাফিয়ে উঠে নৃসিংহর সঙ্গীর হাত থেকে ছিনিয়ে নিল কাগজটা তারপর সোজা ছুটল কাছেই ছাদে ওঠার সিঁড়ির দিকে। এলাও অনুসরণ করল তাকে। ছুটে নয়। বলা ভালো তারা দুজন যেন উড়ে পালাল সিঁড়ির দিকে। এমনই তাদের ক্ষিপ্রতা।

এ ঘটনা যে ঘটতে পারে তা আন্দাজ করতে পারেনি কেউই। মুহূর্তের জন্য হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল নৃসিংহ আর তার সাগরেদ। তারপর তারাও ছুটল সিঁড়ির দিকে। তারা চারজনই অদৃশ্য হয়ে গেল সিঁড়ির ওপর দিকে।

নৃসিংহরা ধনঞ্জয়বাবুকে ছেড়ে চলে যাওয়ায় তিনিও ঘর থেকে বেরিয়ে নীচে নেমে পালাবার জন্য সিঁড়ির দিকে ছুটলেন। কিন্তু সিঁড়ির মুখে এসে তার মনে হল নৃসিংহ বাচ্চাগুলোর কোনো ক্ষতি করবে না তো? তার এই বাড়ির দামের থেকে বাচ্চাগুলোর জীবনের দাম যে অনেক বেশি। এ কথাটা মনে হতেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন তিনি৷ এরপর মুহূর্তের মধ্যে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন, পিটারের থেকে দলিলটা নিয়ে তাতে তিনি সই করে দেবেন। বাচ্চাগুলোকে বাঁচাতে হবে।

এ কথা ভেবে তিনি আর কালবিলম্ব না করে নীচে নামার পরিবর্তে সিঁড়ি বেয়ে ওপর দিকে উঠতে শুরু করলেন!

ধনঞ্জয়বাবু ছাদে উঠে চাঁদের আলোতে দেখতে পেলেন তাদের চারজনকেই। ছাদের যে প্রান্তের নীচে নদী ঠিক সে জায়গাতেই রয়েছে তারা। ধনঞ্জয়ও এগোলেন সেদিকে।

নীচে নদী বলে ছাদের এ অংশের প্রাচীন বা রেলিংটা ছাদের অন্য অংশের তুলনায় বেশি উঁচু। প্রায় এক মানুষ সমান উচ্চতা তার। এলা আর পিটার উঠে পড়েছে সেই রেলিংয়ে। পিটারের হাতে তখনও কাগজটা ধরা। আর তাদের কয়েক হাত তফাতে নীচে ছাদে দাঁড়িয়ে নৃসিংহ আর তার সঙ্গী। নৃসিংহর হাতে একটা পিস্তল আর তার স্যাঙাতের হাতে তখন চাঁদের আলোতে ঝিলিক দিচ্ছে একটা ছোরা! ছোট ছেলেমেয়েগুলো রেলিং-এর যে জায়গায় উঠে দাঁড়িয়েছে, সেখানে দেওয়ালের গায়ে কোনো খাঁজ নেই যা বেয়ে ওপরে চড়া যায়। বরং ছাদের রেলিংয়ের গা-গুলো শ্যাওলা ধরা। বর্ষার জলে ভিজে ভয়ংকর রকম পিছল হয়ে আছে। ছেলেমেয়ে দুটো যে কীভাবে রেলিং-এর ওপরে উঠল তা বোধগম্য হল না ধনঞ্জয়ের। তবে একটা জিনিস তিনি বুঝতে পারলেন, যে কোনো মুহূর্তে কোনো ভয়ংকর দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। পিটার বা এলা পা পিছলে ছাদ থেকে নীচে পড়ে যেতে পারে।

ধনঞ্জয় তাদের কাছাকাছি উপস্থিত হতেই সবাই ফিরে তাকাল তার দিকে। নৃসিংহ, ধনঞ্জয়কে বলল, “ছেলেটাকে কাগজটা দিতে বলুন, নইলে আপনারা কেউ বাঁচবেন না।”

ধনঞ্জয়ও আর সময় নষ্ট না করে পিটারকে বললেন, “কাগজটা ওদের দিয়ে দাও। এখনই রেলিং থেকে নীচে নেমে এসো তোমরা।”

কিন্তু ধনঞ্জয়বাবুর কথাকে যেন গুরুত্বই দিল না তারা। বরং খিলখিল করে হেসে উঠল ভাইবোন। তা দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে নৃসিংহ তাদের উদ্দেশে বলে উঠল, “দিয়ে দে, কাগজটা দিয়ে দে বলছি। নইলে এবার সত্যিই গুলি চালাব।”

নৃসিংহর কথায় পাত্তা-না দিয়ে আবারও হেসে উঠল দুই ভাইবোন। যেন কথা শুনে বেশ আমোদ পেয়েছে তারা। এরপর এক অদ্ভুত কাণ্ড করল পিটার। রেলিং থেকে ছাদের দিকে একটু ঝুঁকে কাগজটা সে বাড়িয়ে দিল ছাদে দাঁড়ানো নৃসিংহর দিকে। নৃসিংহ সেটা নেওয়ার জন্য ওপর দিকে হাত বাড়াতেই পিটার আবার সোজা হয়ে দাঁড়াল। তারপর ধনঞ্জয়বাবু আর নৃসিংহ দুজনকে অবাক করে দিয়ে হাসতে হাসতে দলিলের কাগজটা ছিঁড়তে শুরু করল। এলাও হাসতে লাগল তার কাণ্ড দেখে। কাগজটা কুটিকুটি করে ছিঁড়ে বাতাসে উড়িয়ে দিল পিটার। তার কিছু এসে পড়ল ছাদে আর কিছু বাতাসে ভেসে গেল নীচে গঙ্গার দিকে।

নৃসিংহ এরপর আর নিজেকে সংযত রাখতে না-পেরে পিটারকে লক্ষ করে গুলি চালিয়ে দিল। রেলিংয়ের ওপর থেকে ছাদের বাইরে গঙ্গার দিকে ছিটকে পড়ল পিটার। আর তা দেখার পরই এলাও ঝাঁপ দিল ছাদের বাইরে মহাশূন্যে। ধনঞ্জয়বাবু যেন স্পষ্ট ভাবে শুনতে পেলেন গঙ্গার বুকে তাদের দেহদুটো আছড়ে পড়ার শব্দ। নিজের অজান্তেই আতঙ্কিত ধনঞ্জয়বাবুর গলা দিয়ে একটা আর্তনাদ বেরিয়ে এল। নৃসিংহ এবার ফিরে দাঁড়াল ধনঞ্জয়বাবুর দিকে। তার চোখদুটো যেন হিংস্র শ্বাপদের মতো জ্বলছে! চাঁদের আলোতে তার মুখমণ্ডলে জেগে উঠেছে জান্তব বীভৎসতা। ধনঞ্জয়বাবুর উদ্দেশে সে বলল, “ও দুটো যখন মারলাম তখন তোকেও এবার মরতে হবে। যাতে এ ঘটনার কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণ না-থাকে। সব থেকে বড় কথা তোকে মারলে এ বাড়িটা আমার হবে।”

নৃসিংহর মধ্যে যেন খুনের নেশা জেগে উঠেছে। আতঙ্কিত, বাকরুদ্ধ ধনঞ্জয়বাবুর মনে হল চোখের সামনে যেন তিনি সাক্ষাৎ মৃত্যুকে প্রত্যক্ষ করছেন।

নৃসিংহ তার হাতের পিস্তলটা ওঠাল ধনঞ্জয়বাবুকে লক্ষ করে। ঠিক সেই মুহূর্তে আরও একটা কণ্ঠস্বর শোনা গেল, “আমিও যে সব ঘটনার সাক্ষী থাকছি। কতজনকে মারবে তুমি?”

ছাদের অন্ধকার কোণ থেকে তাদের কাছাকাছি এসে দাঁড়ালো একজন লোক। যোহান! তাকে দেখামাত্রই নৃসিংহ ঈশারা করল তার সঙ্গীকে। ছুরিটা বাগিয়ে ধরে সে এগোল যোহানের দিকে। কিন্তু যোহান স্থির, অচঞ্চল। যোহানের কাছে পৌঁছে লোকটা মুহূর্তের জন্য একবার নৃসিংহর দিকে তাকাল তার শেষ ইঙ্গিত পাবার জন্য। হাতের ইশারায় নৃসিংহ বুঝিয়ে দিল যোহানকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। পরমুহূর্তেই যোহানের বুক লক্ষ করে ছুরি চালিয়ে দিল লোকটা। ছুরিটা যোহানের বুকে কতটা বিদ্ধ হল তা ধনঞ্জয় ঠিক বুঝতে পারলেন না। তবে যোহানের শার্টের বুকের কাছ থেকে ছুরির আঘাতে একখণ্ড কাপড় খসে পড়ল। নৃসিংহর স্যাঙাত এরপর দ্বিতীয়বারের জন্য ছুরির আঘাত হানতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই যোহান তার ছুরিধরা হাতটা চেপে ধরল। ধনঞ্জয় যেন “মট” করে একটা শব্দ শুনলেন, কবজির হাড় ভাঙার শব্দ। ছুরিটা খসে পড়ল নৃসিংহর স্যাঙাতের হাত থেকে। আর এরপরেই যোহান কোনো এক কৌশলে শূন্যে তুলে নিল লোকটার দেহ। মাথার ওপর কয়েকবার পাক খাইয়ে আসুরিক শক্তিতে লোকটাকে যোহান ছুঁড়ে দিল মানুষ সমান প্রাচীরের ও-পাশে। ভেজা বাতাসে মিলিয়ে গেল লোকটার শেষ আর্তনাদ। এত ওপর থেকে লোকটার দেহ জলে আছড়ে পড়ার স্পষ্ট শব্দ পেলেন ধনঞ্জয় ৷

নৃসিংহ, পিস্তলটা যোহানের দিকে উঁচিয়ে ধরে বলল, “তুমি কে? তোমাকে কেমন যেন চেনা-চেনা লাগছে!”

আকাশে আবার মেঘ জমতে শুরু করেছে, মাঝে মাঝে ম্রিয়মাণ হয়ে আসছে চাদের আলো। যোহান, নৃসিংহর উদ্দেশে বলল, “ভালো করে দেখো, ঠিক চিনতে পারবে। তবে তোমার এ-জন্মেও আমি তোমাকে চিনতে পেরেছি ঘনরাম দত্ত।”

কয়েক-মুহূর্তের নিস্তব্ধতা। তারপর নৃসিংহও বলে উঠল, “হ্যাঁ। এবার আমিও তোমাকে চিনতে পেরেছি। এত বছর আগের কথা তো। তাই প্রথমে চিনতে পারিনি। তুমি দিনেমার যোহান।”

যোহান ঠোটের কোণে হাসি ফুটিয়ে বলল, “যাক চিনতে পেরেছ তা হলে, আমার চেহারা আগের মতোই আছে। তোমার মতো আমার আর পুনর্জন্ম হয়নি। অপঘাতে মরেছিলাম যে।”

কথাটা শুনে নৃসিংহ বলল, “হ্যাঁ, আমিই ঘনরাম, আমিই নৃসিংহ। এবারও তুই আমার হাতে মরবি ফিরিঙ্গী।”

আর এরপরই একখণ্ড কালো-মেঘ এসে কয়েক মুহূর্তের জন্য ঢেকে দিল চাঁদটাকে। চারপাশে নেমে এল গাঢ় অন্ধকার। তারপর চাঁদ যখন মেঘমুক্ত হল তখন সামনে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেলেন ধনঞ্জয়। ম্যাজিকের মতো হঠাৎ যোহান আর নৃসিংহর বেশভূষার পরিবর্তন হয়ে গেছে। যোহানের পরনে গতকাল রাতের সেই সাবেক দিনেমারদের মতো পোশাক। মাথায় বাঁকানো টুপি, ধাতুর বোতাম আটকানো লম্বা ঝুলের জামা, পায়ে হাঁটু পর্যন্ত চামড়ার জুতো। নৃসিংহর সঙ্গীর হাত থেকে খসে পড়া ছুরিটা এখন নিজের হাতে তুলে নিয়েছে। আর নৃসিংহর গা থেকেও তখন প্যান্ট-শার্ট খসে গেছে। তার পরনে শুধু এখন মালকোঁচা দেওয়া ধুতি, তেল চুকচুকে খালি গা, কপালে লাল তিলক। নৃসিংহর মুখমণ্ডল একই রকম থাকলেও তার মাথায় এখন কদমছাঁট চুলের বদলে কাঁধ ছাপানো বাবরি চুল, মাথার কাছে সেটা আবার লাল ফেট্টি দিয়ে বাঁধা। যেমন আগেকার দিনের ডাকাতদলের চেহারা হত! পিস্তলটা এখনও ধরা তার হাতে।

বিস্মিত হতভম্ব ধনঞ্জয়বাবুর তাদের দুজনকে দেখে মনে হল বহু যুগ, বহু শত বছরের ওপার থেকে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে দুজন লোক! তাদের মুখ দেখে মনে হচ্ছে লোক দুজন যেন শেষ লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। এক অদ্ভুত ভয়ংকর কাঠিন্য জেগে উঠেছে তাদের মুখমণ্ডলে।

দুজনে দুজনের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখে এবার বৃত্তাকারে পাক খেতে লাগল তারা। নৃসিংহ ওরফে ঘনরামের হাতে পিস্তল আর যোহানের হাতের উদ্যত ছোরা যেন সুযোগ খুঁজতে লাগল অব্যর্থ আঘাতে প্রতিপক্ষকে ধরাশায়ী করার জন্য।

এরপর হঠাৎই একসময় নৃসিংহ দত্ত পিস্তল চালিয়ে দিল যোহানের বুক লক্ষ করে। গুলির আঘাতে বেশ কয়েক হাত তফাতে ছিটকে পড়ল যোহান। কেঁপে উঠে স্থির হয়ে গেল যোহানের দেহ! নৃসিংহ এবার বিজয়ের আনন্দে অট্টহাস্য শুরু করল।

ধনঞ্জয় আতঙ্কে হিম হয়ে গেলেন। নৃসিংহর পিস্তলের পরবর্তী নিশানা যে তিনি তা তাঁর বুঝতে অসুবিধা হল না। ঘটনাটা হয়তো তাই ঘটতে যাচ্ছিল। কিন্তু মৃত ভেসে পড়ে থাকা যোহানের দেহটা হঠাৎ স্প্রিংয়ের মতো লাফিয়ে উঠল। তারপর তার হাতের ছুরিটা বিদ্যুতের মতো ছুটে গেল নৃসিংহর উন্মুক্ত বুক লক্ষ করে। তার বুকে আমূল বিদ্ধ হল ছুরিটা। মুহূর্তের মধ্যে নৃসিংহ দত্ত-র অট্টাহাস্য বদলে গেল প্রচণ্ড আর্তনাদে। আবারও কয়েক-মুহূর্তের জন্য মেঘ ঢেকে দিল চাঁদকে। তারপর আলো যখন ফুটল, ধনঞ্জয় তখন দেখলেন মাটিতে পড়ে থাকা ছুরিবিদ্ধ নৃসিংহর মৃতদেহের সামনে দাঁড়িয়ে আছে যোহান। তবে যোহানের পরনে সেই দিনেমারদের পোশাক থাকলেও নৃসিংহর গায়ে ফিরে এসেছে বর্তমানের পোশাক। যোহান, ধনঞ্জয়বাবুর উদ্দেশে বললেন, শয়তানটার হাত থেকে আপনি বেঁচে গেলেন। নইলে নির্ঘাত ও খুন করতে আপনাকে। চলুন এবার নীচে যাই, আমার পরিবারের লোকজন অপেক্ষা করছে। তবে তার আগে ঘনরামের এ-জন্মের দেহটার গতি করি।”

এই বলে সে মাটি থেকে তুলে নিল সেই মৃতদেহটাকে। তারপর সেটাকে ছাদের রেলিংয়ের ও-পাশে গঙ্গাবক্ষে ছুঁড়ে ফেলে দিল।

হতভম্ব, বাকরুদ্ধ ধনঞ্জয়বাবু যোহানের পিছন-পিছন নীচে নেমে এলেন। যোহানের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে তার স্ত্রী-পুত্র কন্যা। তাদের পরনে গতবারের মতো দিনেমারদের সাবেক পোশাক। কিন্তু গুলি খেয়ে অত ওপর থেকে পড়ে পিটার আর এলা জীবিত থাকল কীভাবে? যোহানের পিছন পিছন ধনঞ্জয়ও গিয়ে দাঁড়ালেন তার ঘরের সামনে। এরপর ধনঞ্জয় আর স্থির না-থাকতে পেরে বলে উঠলেন, “আমার মাথার ভিতর সব কিছু যেন কেমন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। আমি কি ঘুমের ঘোরে কোনো স্বপ্ন দেখছি?”

যোহান বলল, “স্বপ্ন নয়, সত্যি। তবে যা দেখলেন তা কাউকে জানাবেন না। বহু যুগ পর আমি ঘনরামকে হত্যা করে প্রতিশোধ নিলাম।”

ধনঞ্জয় বললেন, “কে ঘনরাম, কীসের প্রতিশোধ—আমি যে কিছুই বুঝতে পারছি না!”

যোহান বলল, “পূর্বজন্মে যে ছিল ডাকাত সর্দার ঘনরাম, সেই ছিল এ জন্মের নৃসিংহ। নবজন্ম হলেও তার চরিত্রের বদল হয়নি। এ-বাড়িতেই একদিন ঘনরাম দত্ত ডাকাতির উদ্দেশ্যে অতর্কিত হামলা চালিয়ে হত্যা করেছিল নিরীহ এক দিনেমার-দম্পতি আর তার সন্তানদের। তারই প্রতিশোধ নিলাম আমি।

এ কথা বলার পর যোহান হেসে বলল, “এবার আমাদের যেতে হবে। আপনার ঘর খালি করে দেব। তবে সত্যি কথা বলতে কী, এ বাড়িটার ওপর আমারও একটা মায়া আছে। এককালে এই বাড়িতেই আমরা ছিলাম কি না?”

যোহানের কথা শুনে ঢোক গিলে ধনঞ্জয়বাবু জানতে চাইলেন, “কোথায় যাবেন আপনারা?”

যোহান উত্তর দিল, “গঙ্গার ধারে দিনেমারদের সেই কবরখানায়। যেখানে আমরা ছিলাম। কাল থেকে আমাদের আর কেউ বিরক্ত করতে আসবে না ওখানে। ফ্ল্যাটবাড়ির কাজ বন্ধ হয়ে যাবে।”

এ কথা বলার পর যোহান তার ঘরের ভিতর গিয়ে ঢুকল। ধনঞ্জয়বাবু বাইরে থেকে দেখতে পেলেন যোহান ঘরে ঢুকে বিছানার মতো জায়গার ওপর থেকে চাদরটা

উঠিয়ে ফেলতেই তার তলা থেকে বেরিয়ে এল কাঠর তৈরি চারটে প্রাচীন কফিন বাক্স। যোহান আর পরিবারের লোকেরা সেই কফিন বাক্সগুলোকে ধরাধরি করে বাইরে এনে এগিয়ে গিয়ে থামল ঘাটের সামনে। বর্ষার ভরা-গঙ্গার জল উঠে এসেছে সিঁড়ির মাথা পর্যন্ত। যোহান আর তার পুরো পরিবারই এরপর ধনঞ্জয়বাবুর দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে বিদায় জানাল। তারপর একে-একে কফিন বাক্সগুলোকে জলে নামিয়ে তার ডালা খুলে চেপে বসল সেগুলোতে। চাঁদের আলোতে কফিন বাক্স চেপে তাদের পুরোনো ঠিকানা কবরস্থানের দিকে রওনা হয়ে গেল দিনেমার-বণিক যোহান আর তার পরিবার।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *