কালো বুড়ির শবযাত্রা
১
গঞ্জের সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বাইরে গেটের মুখেই দাঁড়িয়েছিল তীর্থ, রাহুল আর সঞ্জয়। বেলা এগারোটা বাজে। কিন্তু আকাশে সূর্যের তেজ নেই। সবেমাত্র বৃষ্টি ধরেছে, আবার যে-কোনো সময় নামতে পারে, বর্ষাকালে যেমন হয়। ডাক্তারবাবুকে এরপর বাইরে বেরিয়ে আসতে দেখেই তারা এগিয়ে গেল তাঁর দিকে। তীর্থ তাঁকে জিজ্ঞেস করল, “কালো বুড়িকে কেমন দেখলেন ডাক্তারবাবু?”
তিনি একটু চুপ করে থেকে জবাব দিলেন, “আমার যা চেষ্টা করার তা করেছি। কিন্তু কোনো আশা দেখছি না। বয়সের ভারে সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিকল হয়ে গেছে। তার ওপর বিনা চিকিৎসায় বেশ কিছুদিন ঘরে পড়ে ছিল। আমার অভিজ্ঞতা বলছে আর বিশেষ কিছু করার নেই। যে-কোনো মুহূর্তেই বুড়ি মারা যাবে।”
ডাক্তারবাবুর কথা শুনে চুপ করে গেল তারা তিনজন। ডাক্তারবাবু বাস্তববাদী মানুষ। পেশার কারণে এ ধরনের মৃত্যু তাঁকে হামেশাই দেখতে হয়। এরপর তিনি তাদের উদ্দেশে বললেন, “চেনা-জানা লোকজনকে বলে রাখো। ওর দেহের সৎকারের তো ব্যবস্থা করতে হবে। তোমরা তিনজন মিলে তো ওকে শ্মশানে নিয়ে যেতে পারবে না। আরও কয়েকজন লোক লাগবে। তার ওপর আবার বর্ষাকাল। দেখো কী ব্যবস্থা করতে পারো?” –এ কথাবলে অন্যত্র নিজের কাজে রওনা হলেন ডাক্তারবাবু।
তিনি এগোবার পর তীর্থ বলল, “খুব খারাপ লাগছে কথাটা শুনে। কিন্তু আমরাই বা কী করব বল? হাসপাতালে নিয়ে আসা, ওষুধ কেনা সবই তো করলাম।”
রাহুল বলল, “হ্যাঁ। তবে শেষ কাজটাও আমাদেরই করতে হবে। কালো বুড়ি বলত বটে ও মরলে ওর দেহ ভূতে শ্মশানে নিয়ে যাবে। কিন্তু তা তো আর হবার নয়। যা করার আমাদেরই করতে হবে।”
তাদের দুজনের কথা শুনে সঞ্জয় বলল, “কিন্তু কাঁধ দিতে হলেও অন্তত চারজন লাগবে। কালো বুড়ির বদলে অন্য কেউ মরলে শ্মশানে যাবার লোক জোটাতে সমস্যা হত না। কিন্তু কালো বুড়ির জন্য আর একজন লোক জোটানোও মুশকিল। দেখলি না অন্য বন্ধুরা নানান অজুহাতে কেমন পাশ কাটিয়ে সরে পড়েছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রেও কেউ এল না। জ্যান্ত অবস্থাতেই যখন কালো বুড়িকে লোকে ভয় পেত তখন মরলে পরে তো আর কোনো কথাই নেই। হাজার ডাকলেও কারো সাড়া মিলবে না শ্মশানে যাবার জন্য।”
রাহুল এবার বলল, “আচ্ছা, তোদের কি মনে হয় কালো বুড়ি সত্যিই কি তুকতাক, ভূত নামানো এ সব জানে বা জানত? নইলে কেন বলত, ‘আমি মরলে, ভূতে আমাকেশ্মশানে নিয়ে যাবে’।”
তীর্থ তার কথা শুনে এবার একটু ঝাঁঝিয়ে উঠে বলল, “বোকার মতো কথা বলিস না। ওসব গ্রামের লোকেদের কুসংস্কার। বুড়ি কথাটা বলত ঠিকই। কিন্তু সেটা নিছক মজা করে। ও জানত ওর কেউ নেই, তাই কথাটা বলত।”
সঞ্জয় বলল, “কিন্তু আমাদের তো কোনো ব্যবস্থা করে রাখতে হবে। এখন কী করবি সেটা বল?”
তার কথা শুনে তীর্থ একটু ভেবে নিয়ে বলল, “গঞ্জের বাজারে ‘স্বর্গরথ’ নামের একটা গাড়ি থাকে। শ্মশানে মড়া নিয়ে যাবার গাড়ি। দেখেছিস নিশ্চয়ই। সেটার ব্যাপারে খোঁজ নেওয়া যেতে পারে।”
রাহুল জানতে চাইল, “কোনো ফোন নম্বর আছে ওই গাড়ির সঙ্গে যোগোযাগে করার?”
তীর্থ বলল, “না, নেই। তবে গাড়ির সঙ্গে আগাম কথা বলার জন্য গঞ্জে যাওয়া যেতে পারে। কতক্ষণই বা সময় লাগবে।”
সঞ্জয় বলল, “তবে তাই চল। এখনই বেরিয়ে পড়ি। আবার কখন বৃষ্টি নামবে তা বলা যায় না।”
কাছেই তিনজনের সাইকেল রাখা ছিল। এরপর তারা সাইকেল নিয়ে রওনা হয়ে গেল গঞ্জের দিকে।
২
হ্যাঁ, কালো বুড়ির বদলে অন্য কেউ হলে তাকে নিয়ে এমন সমস্যায় পড়তে হত না সদ্য কলেজে পড়তে যাওয়া এই তিন যুবককে। একই গ্রামের বাসিন্দা তারা, শহরে একই কলেজে পড়ে আর একই সঙ্গে রোজ বিকালে ফুটবল খেলে। তারা তিনজন ছোটবেলা থেকে একই স্কুলে পড়ে এসেছে ও বর্তমানে একই কলেজে পড়ছে বলে অন্য বন্ধুদের তুলনায় তাদের নিজেদের মধ্যে সখ্যর পরিমাণ বেশি। একই সঙ্গে সবসময় ঘোরে-ফেরে, কাজের সিদ্ধান্ত নেয় তারা। কালো বুড়ি তাদের কেউ হয় না। তার আসল নামও জানা নেই তাদের। তবে লোকে তাকে ওই নামেই ডাকে। হয়তো সেটা তার ঘরটার জন্য, চেহারার জন্য আবার হয়তো বা লোকে ভাবে সে “কালো জাদু” অর্থাৎ তুকতাক জানে এ কথা মনে করে। গ্রামের মানুষের কাছে তার সম্পর্কে তেমন প্রচারই বহুকাল ধরে চলে আসছে। কালো বুড়ির সঙ্গে বছরখানেক আগে এই তিন বন্ধুর সাক্ষাৎ কিছুটা কাকতালীয়ভাবেই হয়েছিল। আগে তারা বিকালে যে মাঠে ফুটবল খেলত, একদিন সে মাঠের মালিক সেখানে চালকল করবে বলে মাঠ ঘিরে ফেলল। তখন খেলার জন্য নতুন মাঠ খোঁজা শুরু করল। কিন্তু অন্য মাঠগুলোতে অন্য ছেলেরা খেলে। অগত্যা তারা শেষ পর্যন্ত গিয়ে হাজির হল গ্রামের শেষ প্রান্তের মাঠটাতে। যার গায়েই আম-কাঁঠালের ছায়া ঘেরা আধো-অন্ধকার মতো জায়গায় কালো বুড়ির কালো রং করা বেড়ার ঘর। কালো বুড়ি গ্রামের কারও সঙ্গে মিশত না। তাকে নিয়ে নানান রটনা আছে গ্রামে। তার মধ্যে একটা হল অমাবস্যার রাতে কালো বুড়ি নাকি ভূত-প্রেত নামায় ওই মাঠে। তাই ছেলের দল ওই মাঠের দিকে তেমন একটা যেত না। কাজেই ও মাঠটা পেতে এই তিন বন্ধুসহ আরও কিছু বন্ধুর তেমন অসুবিধা হয়নি। ও মাঠে খেলা শুরু করলেও তারা সবাই খেয়াল রাখত, চেষ্টা করত যাতে কালো বুড়ির ঘরের দিকে ফুটবলটা না যায়। কিন্তু সবসময় কি নিয়ম মেনে চলা যায়? সাবধানতা সত্ত্বেও একদিন খেলা শেষের মুখে, সন্ধ্যা নামার একটু আগে রাহুলের একটা জোরালো শটে ফুটবলটা পৌঁছে গেল কালো বুড়ির ঘরের কাছে। সেখানে গিয়ে বল আনতে যখন অন্য ছেলেরা রাজি হল না কালো বুড়ি তাদের কোনো তুকতাক করতে পারে সেই ভয়ে। তখন এই তিন বন্ধুই প্রথমবারের জন্য গিয়ে হাজির হয়েছিল কালো বুড়ির ঘরের কাছে। তখন দিনের আলো মরতে বসেছে। কিছু বাদেই সূর্য ডুববে। তার ওপর কালো বুড়ির ঘরের চারপাশের বড় বড় ডালপালাগুলো মাথার ওপর জড়াজড়ি করে অন্ধকার নামার আগেই সেখানে এমন আধো-অন্ধকারের সৃষ্টি করেছিল যে তার কুঁড়ের সামনে পৌঁছে একটু হলেও ঘাবড়ে গিয়েছিল তারা তিনজন। কালো আলকাতরার রং করা নড়বড়ে একটা ঘর, আর তার একপাশে একটা কুয়ো। ছায়া আর অন্ধকারে সব কিছু এমন মাখামাখি অবস্থায় ছিল যে বলটা কোথায় তা ঠিক তারা ঠাহর করতে পারছিল না। আর ঠিক সেই সময় তাদের চমকে দিয়ে তাদের সামনে আবির্ভূত হয়েছিল কালো বুড়ি! ইতিপূর্বে তার নাম শুনলেও কালো বুড়ির সঙ্গে সেটাই তাদের প্রথম সাক্ষাৎ ছিল। লাঠি হাতে থুথুড়ে এক বুড়ি, গায়ের রং অন্ধকারের মতোই কালো। মাথার চুল শনের মতো সাদা, পরনের কাপড়টাও সাদা। তবে তার চোখ দুটো বড় উজ্জ্বল ছিল, অন্ধকারের মধ্যেও যেন জ্বলজ্বল করছিল। বুড়িকে দেখে তাদের কী বলা উচিত তা ঠিক বুঝতে পারছিল না তারা তিনজন। বুড়ির ঘরের কাছে বল পড়েছে বলে সে যদি শাপ-শাপান্ত গালিগালাজ করে সে ভয়ও হয়তো বা সেই মুহূর্তে তাদের মনে এসেছিল। কিন্তু তাদের সে ভয় ভেঙে দিয়ে বুড়ি খোনা গলায় বলেছিল— “আমাকে ভয় পেয়ো না বাছারা। তোমরা অন্ধকারে না দেখতে পেলেও আমি দেখতে পাচ্ছি। ওই তো কুয়োর ধারে তোমাদের বলটা পড়ে আছে। নিয়ে যাও।”
কালো বুড়ির কথা শুনে তার দৃষ্টি অনুসরণ করে তারাও এরপর বলটা দেখতে পেয়েছিল। তীর্থ গিয়ে বলটা কুড়িয়ে নিয়েছিল। তারপর যখন তারা ফিরে আসতে যাচ্ছিল তখন বুড়ি তাদের বলল, “আমার এখানে কেউ তো আসে না। তোমরা এলে, খালি মুখে ফিরে যাবে? এই নাও আতা খাও, বড় মিষ্টি আতা।”—এই বলে সে তার কোঁচড় থেকে কয়েকটা আতা বের করে বাড়িয়ে দিল তাদের দিকে। কালো বুড়ির কথার মধ্যে এমন কিছু একটা ছিল যে তার কথা শুনে তার হাত থেকে আতাগুলো নিয়েছিল তিন বন্ধু। বুড়ির চোখ দুটো যেন আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল আনন্দে। তারপর সে বলেছিল, “ভয় নেই, এই আতা খেলে তোমাদের কিছু হবে না। খেয়ে দেখো।”
তার কথা শুনে আতায় প্রথম কামড় বসিয়েছিল তীর্থ। তারপর জন্য দুজনও। সত্যিই খুব মিষ্টি ছিল সেই আতা। এরপর তারা বল নিয়ে ফিরে এসেছিল মাঠে। এভাবেই কালো বুড়ির সঙ্গে তাদের প্রথম পরিচয়। আর তার সঙ্গে সঙ্গে এদিন থেকেই কালো বুড়ির সম্পর্কে যাবতীয় ভয় তাদের ভেঙে গেছিল। কালো বুড়ির ঘরের সামনে বল গেলেই তারা নির্ভয়ে সেখানে গিয়ে হাজির হত। কালো বুড়ি তাদের দেখলে খুশি হত। আতা, জামরুল, পাকা পেঁপে তুলে দিত তাদের হাতে। এভাবেই কালো বুড়ির সঙ্গে তাদের তিনজনের কেমন যেন একটা মায়ার বন্ধন ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছিল তা তারা বুঝতেও পারেনি। যদিও এই তিন বন্ধুর অন্য সঙ্গীরা বরাবরের মতো কালো বুড়ির ঘরের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখেছিল। তীর্থ, সঞ্জয় আর রাহুলই শুধু যেত তার কাছে। ইদানীং তো তারা প্রায় নিয়ম করে খেলা শেষ হবার পর হাত-মুখ ধোবার জন্য যেত কালো বুড়ির ঘরের সামনের কুয়োতে। বুড়ির সঙ্গে তাদের টুকটাক নানান কথাবার্তাও হত। তারা বুড়িকে প্রশ্ন করেছিল, “এখানে একলা থাকতে তোমার ভয় করে না?”
প্রশ্ন শুনে বুড়ি হেসে বলেছিল, “না, করে না।”
তারা বলেছিল, “কিন্তু তুমি একা থাকো, অসুখ-বিসুখ অন্য কিছু তো হতে পারে?”
বুড়ি জবাব দিয়েছিল, “তা হতে পারে। মরেও যেতে পারি। তবে আমার তাতেও চিন্তা নেই। ভূতে আমার দেহ নিয়ে গিয়ে শ্মশানে পৌঁছে দেবে।”
এই শেষ কথাটা, তার সঙ্গে কথা বলার সময় বেশ কয়েকদিন শুনেছে তারা। তবে তাদের তিনজনই কালো বুড়িকে কোনোদিন জিজ্ঞেস করেনি তার সম্পর্কে গ্রামের লোকের রটনা সত্যি কিনা? অর্থাৎ সে ভূত-প্রেত নিয়ে কারবার করে কিনা? এ প্রশ্ন শুনে বুড়ি কষ্ট পেতে পারে ভেবেই তারা তাকে এ প্রশ্ন করেনি। কিন্তু অকস্মাৎ যে কালো বুড়ির জীবনে এমন মৃত্যুমুখে পতিত হবার সম্ভাবনা তৈরি হবে তা তাদের জানা ছিল না। সব কিছু ঠিকই চলছিল। কালো বুড়ি বয়সের ভারে একটু ন্যুব্জ হলেও তাকে দেখে তিন বন্ধুর ক-দিন আগে পর্যন্ত অসুস্থ বলে মনে হয়নি। বর্ষাকাল শুরু হয়েছে দিন পনেরো হল। বৃষ্টির জন্য মাঝে মাঝেই খেলা বন্ধ থাকছে। তিনদিন প্রবল বর্ষণের পর গতকাল বিকালে বৃষ্টি থামতেই তারা তিনজন মাঠে গিয়ে হাজির হয়েছিল মাঠে কতটা জল জমেছে তা দেখার জন্য। মাঠ জলে টইটম্বুর। ব্যাঙের ডাক ভেসে আসছিল চারপাশ থেকে। খেলার উপযুক্ত ছিল না সে মাঠ। মাঠ পর্যবেক্ষণ করার পর একবার কালো বুড়ির সঙ্গে দেখা করে ফেরার জন্য তারা তিন বন্ধু গিয়ে হাজির হয়েছিল কালো বুড়ির ঘরের সামনে। “ও বুড়ি? ও বুড়ি?”–বলে হাঁকডাক করে তার সাড়া না পাওয়াতে তারপর তারা গিয়ে ধাক্কা দিয়েছিল তার ঘরের দরজাতে। খুলে গেছিল দরজা। আর সঙ্গে সঙ্গে তারা দেখতে পেয়েছিল ঘরের ভিতর চৌকাঠের কিছুটা তফাতে মাটির ওপর পড়ে আছে কালো বুড়ি। সে সংজ্ঞাহীন। তীর্থ তার গায়ে হাত দিয়ে দেখেছিল জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে তার গা! হাজার ডাকে আর চোখেমুখে অনেক ঝাপটা দিয়েও যখন তার জ্ঞান ফিরল না তখন তারা তিনজন কোনোরকমে একটা রিকশা-ভ্যান জোগাড় করে সন্ধ্যাবেলা বুড়িকে নিয়ে এসে ভর্তি করেছিল গ্রামের ছোট হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। না, কালো বুড়ির জ্ঞান আর ফেরেনি। আর তারপর আজ কালো বুড়ির খোঁজ নিতে এসে তারা জানতে পারল এই কথা। আর তারপর…।
৩
তীর্থদের গ্রাম থেকে গঞ্জের দূরত্ব মাইল পাঁচেক মতো। স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে সাইকেলে রওনা হয়ে আধঘণ্টার মধ্যেই সেখানে পৌঁছে গেল তারা। বিশাল গঞ্জ। অনেক ঘরবাড়ি, দোকানপাট-লোকজন, চালের আড়ত আছে সেখানে। এই গঞ্জকে কেন্দ্র করেই আশেপাশের গ্রামগুলো গড়ে উঠেছে। গঞ্জে পৌঁছে একজনকে ‘স্বর্গরথ’ কোথায় পাওয়া যাবে তা জিজ্ঞেস করতেই সে বলল, “হ্যাঁ, এখানে মড়া টানার গাড়ি আছে। যে লোক গাড়ি চালায় তার নাম দুর্যোধন পাহাড়ি। সোজা চলে যাও। গঞ্জের শেষ মাথায় যে চালকল আছে তার পাশেই স্বর্গরথ রাখা থাকে। লোকটাও পাশেই একটা ঘরে থাকে। কোথাও মড়া টানতে না গেলে তাকে আর তার স্বর্গরথকে সেখানে পেয়ে যাবে নিশ্চয়ই।”
গঞ্জের লোকটার কথা শুনে তার নির্দেশ মতো তিন বন্ধু এরপর গিয়ে হাজির হল নির্দিষ্ট স্থানে। রাইস মিলের প্রাচীরের গায়ে এ জায়গাটা বেশ ফাঁকা ফাঁকা। বিরাট একটা অশ্বত্থ গাছ দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। গাছের পিছনে টিনের চালার একটা ঘর। তারা দেখতে পেল গাছের ছাওয়াতে দাঁড়িয়ে আছে পিছনে কাচের বাক্স বসানো মৃতদেহবাহী সেই শবযান—স্বর্গরথ। গাড়ির সামনে সাইকেল থেকে নেমে গাড়ি বা তার আশেপাশে তারা কাউকে দেখতে পেল না। তারা অনুমান করল সামনের ঘরটাই স্বর্গরথের চালক দুর্যোধন নামের লোকটার ঘর হবে। তীর্থরা এরপর এগিয়ে গিয়ে কড়া নাড়ল সেই ঘরের দরজাতে। বারকয়েক কড়া নাড়ার পর দরজা খুলে দাঁড়াল একজন লোক। খালি গা, পরনে একটা লুঙ্গি, গায়ের রং কালো বুড়ির মতনই মিশমিশে কালো, আর তার চেহারাটাও পাহাড়েরই মতো। তার লাল চোখ দুটো দেখে তীর্থ-রাহুল-সঞ্জয়ের মনে হল লোকটা সম্ভবত সারারাত জেগেছিল অথবা অসুস্থ। অল্পবয়সি তিনজন ছেলেকে দেখে ফ্যাসফ্যাসে গলাতে যেন একটু বিরক্তির স্বরে জানতে চাইল, “কী চাই?”
সঞ্জয় জবাব দিল, “আমরা ওই স্বর্গরথের জন্য এসেছি। চালক দুর্যোধনবাবুর সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।”
লোকটা কথা শুনে বলল, “আমার নামই দুর্যোধন। কোথা থেকে আসা হচ্ছে? বডি কোথা থেকে তুলে এনে কোথায়, কোন শ্মশানে পৌঁছোতে হবে?”
তীর্থ বলল, “বেশি দূর নয়, কুসুমপুর গ্রামের স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে বডি নিয়ে নিশ্চিন্তপুরের শ্মশানে।”
তীর্থর জবাব শুনে স্বর্গরথের চালক দুর্যোধন বলল, “পাঁচশো টাকা দিতে হবে। বেশি দূরে হলে যেতাম না। শহরের হাসপাতাল থেকে একটা বডি নিয়ে ফিরতে গিয়ে আমাকে সারারাত জাগতে হয়েছে। তাছাড়া শরীরটাও ভালো নেই আমার। বডি রেডি আছে তো? আমি কিন্তু অপেক্ষা করতে পারব না। বডি তুলব আর শ্মশানে তা পৌঁছে দিয়ে চলে আসব। একটু দাঁড়াও তবে, আমি জামা-প্যান্ট পরে নিচ্ছি।”
লোকটার কথা শুনে সঞ্জয় বলল, “না না, এখনও সে মরেনি। তবে ডাক্তারবাবু জানিয়েছেন আজকালের মধ্যেই সে মারা যাবে। তাই গাড়ির খোঁজে এসেছি। আপনি বললে আমরা কিছু টাকা অ্যাডভান্সও দিতে যেতে পারি। সে মরলেই আমরা আপনাকে খবর দেব।”—এ কথাটা বলার পরই সঞ্জয় আর তার দুই বন্ধু বুঝতে পারল ওই অ্যাডভান্স টাকা দেবার কথাটা বলা তাদের ভুল হয়ে গেছে। কারণ, এ কথা শুনেই দুর্যোধন তাদের উদ্দেশে দাঁত খিঁচিয়ে বলে উঠল “দুপুরবেলা তোমরা কি আমার সঙ্গে ইয়ার্কি মারতে এসেছ? লোক মরেনি আর তোমরা চলে এসেছ মড়ার গাড়ি বুক করতে? স্বর্গরথ কি বিয়েবাড়ির গাড়ি যে আগাম টাকা দিয়ে বুক করে রাখা যায়? যখন যে মরে তখন ডাকলে হাজির হই আমি।”
তীর্থ এবার ব্যাপারটাকে সামাল দেবার জন্য বলল, “কথাটা বলা ভুল হয়েছে আমাদের। আসলে গাড়িটা পেতে হলে কী করতে হবে সেটাই জানতে এসেছি আমরা।”
তীর্থর কথা শুনে দুর্যোধন এবার যেন তার রাগটা কিছুটা সামলে নিয়ে বলল, “কী আবার করবে? গাড়ির গায়ে নম্বর লেখা আছে টুকে নিয়ে যাও। বডি পৌঁছে দেবার দরকার হলে খবর দেবে। সে সময় অন্য বডি তুলতে না গেলে যাব।”—এ কথা বলে কাশতে কাশতে দরজার পাল্লা বন্ধ করতে গিয়েও মুহূর্তর জন্য থামল সে। তারপর বলল, “তবে একটা কথা মাথায় রেখো, ফাজলামি করে মিথ্যা ডেকে আমার সময় নষ্ট করলে কিন্তু আমি সে ফোন নম্বর পুলিশের কাছে দিয়ে দেব। তখন মজা টের পাবে।”
তীর্থ তার উদ্দেশে বলতে যাচ্ছিল, “না, আমরা মজা করার জন্য এখানে আসিনি।” কিন্তু তার আগেই লোকটা তাদের মুখের ওপর তার দরজাটা বন্ধ করে দিল। এরপর তারা তিনজন গাড়ির গায়ে লেখা ফোন নম্বরটা নিজেদের মোবাইলে তুলে নিয়ে ফেরার জন্য রওনা হল।
বাড়িতে ফিরে এসে দুপুরবেলা স্নান-খাওয়া সেরে ঘুমিয়ে পড়েছিল তীর্থ। বিকাল চারটে নাগাদ মোবাইল ফোন বেজে উঠল তার। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কালো বুড়িকে ভর্তি করার সময় তার ফোন নম্বরটাই দেওয়া ছিল সেখানে। ফোন করে তারা তাকে জানাল কিছু সময় আগে মারা গেছে কালো বুড়ি। খবরটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই তীর্থ তা তার অন্য বন্ধু দুজনকে জানিয়ে দিল। কালো বুড়ির জন্য তারা শ্মশানে যাবে তা শুনে তাদের বাড়ি থেকে মৃদু আপত্তি উঠলেও শেষ পর্যন্ত তেমন বড় কোনো বাধা এল না। তারা তিন বন্ধু তৈরি হয়ে কিছু সময়ের মধ্যেই যে যার বাড়ি থেকে রওনা হয়ে গেল স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দিকে।
৪
তিন বন্ধু স্বাস্থ্যকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে প্রথমেই দেখা করল ডাক্তারবাবুর সঙ্গে। তিনি স্থানীয় মানুষ হিসাবে মোটামুটি জানেন কালো বুড়ির ব্যাপারে। তার যে তিনকুলে কেউ নেই সেটাও তিনি শুনেছেন। কালো বুড়ির দাহকার্যর জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি করার পর তিনি তাদের বললেন, “ওর যখন কেউ নেই তখন ওর সৎকারের জন্য দেহটা তোমাদেরকেই দিচ্ছি। তবে সরকারি নিয়ম অনুসারে সেটা পেতে তোমাদের আরও ঘণ্টা দু-এক সময় লাগবে। ইতিমধ্যে তোমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সেরে রাখো।”
ডাক্তারবাবুর ঘর থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বাইরে এসে দাঁড়াল তারা।
তীর্থ বলল, “এবার এই দুর্যোধন বলে লোকটাকে ফোন করে খবরটা জানাতে হবে। দু-চারজন বন্ধুকেও ফোন করে দেখ যদি তারা আসে।”
সঞ্জয় বলল, “হ্যাঁ, কালো বুড়ির দেহ তো আর তার কথা মতো ভূতে শ্মশানে নিয়ে যাবে না, আমাদেরই কাজে নেমে পড়তে হবে। বডি ওঠানো-নামানোর জন্য বাঁখারির চালি, কাপড় এ সবের ব্যবস্থাও করতে হবে।”
পরিকল্পনা মতো এরপর তারা প্রথমে ফোন করল স্বর্গরথের গায়ে যে নম্বর লেখা ছিল সেই নম্বরে, অর্থাৎ দুর্যোধনের নম্বরে। কিন্তু বারকয়েক ফোন বেজে যাবার পরও কেউ ফোন তুলল না। হয়তো বা সে সারারাত জাগার পর এখনও ঘুমাচ্ছে। এরপর তারা নিজেদের বেশ কয়েকজন বন্ধুকে ফোন করল। কিন্তু নানান অজুহাতে সে সব বন্ধুরা জানিয়ে দিল তারা কেউই কালো বুড়ির জন্য শ্মশানে যেতে পারবে না। তীর্থ বলল, “চল আগে আমরা বাঁশ ইত্যাদি কিনে এনে চালিটা বানিয়ে ফেলি, তারপর আবার স্বর্গরথকে ফোন করব। লোকটার ঘুম মনে হয় এখনও ভাঙেনি।”
সেই মতোই কাজ হল, বাঁশ, কাপড় ইত্যাদি কিনে এনে মৃতের জন্য শয্যা প্রস্তুত করে ফেলল তারা। আর এ সব করতেই ঘণ্টাখানেক সময় কেটে গেল, সূর্যও ডুবে গেল, আঁধার নামতে শুরু করল। গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্র। তার কর্মী বলতে একজন ডাক্তারবাবু, একজন নার্স আর দুজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মী। সন্ধ্যা নামার পর ডাক্তারবাবু তাদেরকে ডেকে বললেন, “এবার বডিটা তোমরা নাও। অন্য কোনো পেশেন্ট তো নেই তাই আমরা দরজা বন্ধ করে চলে যাব।”
ইতিমধ্যে কালো বুড়ির দেহটাকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বারান্দার মেঝেতে এনে রাখা হয়েছে। ডাক্তারবাবুর নির্দেশমতো তীর্থরা এরপর কালো বুড়ির সাদা কাপড় ঢাকা শীর্ণ দেহটাকে দু-জন স্বাস্থ্যকর্মীর সাহায্যে বাঁশের মাচাতে অর্থাৎ চালিতে তুলে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বাইরে আনাল। কাছেই একটা টিনের চাল আছে রোগী আর তাদের সঙ্গীদের বসার জন্য। সেখানেই নামিয়ে রাখা হল দেহটাকে। তখন অন্ধকার নেমে গেছে। এ কাজ মেটার পর ডাক্তারবাবু আর অন্য স্বাস্থ্যকর্মীরা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ছেড়ে চলে গেলেন। রাহুল এরপর প্রথম ফোন করল স্বর্গরথে। কিন্তু যথারীতি আগের মতো ফোন বেজে গেল। এরপর থেকে থেকেই তারা প্রত্যেক নিজেদের মোবাইল থেকে ফোন করে যেতে লাগল শববাহী গাড়িকে, কিন্তু ফোন বেজেই যেতে লাগল। সময় এগিয়ে যেতে লাগল তার সঙ্গে।
আকাশে অন্যদিনের মতো চাঁদের আলোও তেমন ফুটে উঠল না। তীর্থরা বুঝতে পারল আকাশে আবার মেঘে জমতে শুরু করেছে। আলো বলতে শুধু কিছু দূরে ল্যাম্পপোস্টের একটা ক্ষয়াটে আলো। শেডের নীচে আধো-অন্ধকারে কালো বুড়ির দেহ নিয়ে বসে শববাহী গাড়ির চালকের নাম্বারে ফোন করে যেতে লাগল তারা। এভাবে ঘণ্টাখানেক সময় কীভাবে যেন কেটে গেল!
৫
রাত আটটা বাজল একসময়। ঠান্ডা বাতাস বইতে শুরু করল, বৃষ্টি নামার পূর্বাভাস। ঠিক সেই সময় ল্যাম্পপোস্টের আলোটাও নিভে গেল। গ্রামাঞ্চলে ঝড়-বৃষ্টির সময়ে অনেক সময় গাছের ডাল পড়ে ইলেকট্রিকের তার ছিঁড়ে যায় বলে দুর্ঘটনা এড়াতে ইলেকট্রিক অফ করে দেওয়া হয়। সেজন্যই হয়তো আলোটা নিভিয়ে দেওয়া হল। সঞ্জয়
বলল, “যাঃ, আলোটাও চলে গেল! এবার বৃষ্টি নামলেই ষোলোকলা পূর্ণ হয়!”
তীর্থ বলল, “কী যে করি কিছুই তো বুঝতে পারছি না। লোকটা ফোন ধরছে না কেন কে জানে?”
সঞ্জয় বলল, “এমন হতে পারে যে লোকটা ঘরে ফোন ফেলে রেখে কোথাও মড়া টানতে গেছে। অথবা তার আসার ইচ্ছা নেই বলে ফোন ধরছে না। লোকটা তো বলছিল যে রাত জেগেছে, তার শরীর খারাপ।”
তীর্থ বলল, “কিন্তু যাই হোক, এভাবে তো মড়া আগলে সারারাত বসে থাকা যায় না। কিছু একটা করতে হবে। কিন্তু কী যে করি সেটাই মাথায় আসছে না।”
তার কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে আকাশে বিদ্যুৎ চমকাতে শুরু করল আর তার সঙ্গে সঙ্গে টিনের চালার ওপর ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টিও শুরু হল। ধীরে ধীরে বেড়ে চলল বৃষ্টি, আর তার সঙ্গে গুম গুম শব্দে বাজ পড়তে শুরু করল।
সঞ্জয় একবার সাদা কাপড়ে ঢাকা কালো বুড়ির মৃতদেহটার দিকে তাকিয়ে মৃদু উম্মা প্রকাশ করে বলল, “কালো বুড়ি মরে গিয়ে আমাদের এমন বিপদের মধ্যে ফেলে গেল কেন কে জানে! এমন দুর্যোগের রাতে এখন আমরা কী করব! এমন বাজ পড়া আমি কোনোদিন দেখিনি!”
রাহুল বলল, “বুড়ির কথা যদি সত্যি হত ভালো হত। ওর দেহ যদি ভূতে শ্মশান নিয়ে যেত তবে আমাদের কোনো চিন্তা থাকত না।”
তীর্থ বলল, “তা বটে। কিন্তু এবার বুঝতে পারছিস তো কালো বুড়ি যা বলত তা মজা করে বলত। আর গ্রামের লোকেরাও ওর সম্পর্কে যা বলে তা সবই মিথ্যা রটনা।”
তীর্থ এরপর আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে প্রচণ্ড আলোতে ঝলসে গেল তাদের চোখ। আর তার পরমুহূর্তেই কান ফাটানো শব্দ আর থরথর করে কেঁপে উঠল টিনের চালাটা। যে যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখান থেকে ছিটকে পড়ল মাটিতে।
বাজের অভিঘাত সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়াতে বেশ কয়েক মুহূর্ত সময় লাগল তাদের। তারপর তারা এক এক করে উঠে দাঁড়াল। তীর্থ এবার বেশ জোরালোভাবে বলল, “না, এভাবে এখানে মড়া নিয়ে বসে থাকার কোনো মানে হয় না। আমাদের আর কারোকে দরকার নেই। চল আমরাই কালো বুড়িকে শ্মশানে নিয়ে যাই।”
তার কথা শুনে রাহুলও বেশ দৃঢ়ভাবে বলল, “হ্যাঁ, চল, আমরাই নিয়ে যাই। আমরাই এখন কালো বুড়ির সেই সব ভূত হই। কালো বুড়ি বলত যারা তাকে শ্মশানে নিয়ে যাবে।”
সঞ্জয় হেসে বলল, “হ্যাঁ, ঠিক তাই। আমরাই এখন কালো বুড়ির সেই সব ভূত।” বাঁখারির চালিসমেত কালো বুড়ির দেহটাকে এরপর তুলে নিল তারা। তারপর সেই চালা ছেড়ে ঝড়বৃষ্টির মধ্যে তারা অন্ধকার রাতে রওনা হল শ্মশানের দিকে।
সত্যি কথা বলতে কী কালো বুড়ির দেহটা শ্মশানে নিয়ে যেতে তেমন কোনো কষ্ট হল না তাদের। আর যেন বেশ তাড়াতাড়ি তারা শ্মশানে পৌঁছে গেল। আর তারা সেখানে পৌঁছোতেই ঝড়-বৃষ্টিও থেমে গেল। গ্রামের ছোট শ্মশান, লোকজন কেউ নেই। তবে একটা শুকনো জায়গায় কাঠ রাখা আছে। ইতিপূর্বে অন্য লোকজনের সঙ্গে বহুবার শ্মশানে আসার, মড়া মোড়ানোর অভিজ্ঞতা তাদের কাছে। তাই ঝটপট চিতা সাজিয়ে ফেলল তারা। চিতায় ওঠাবার আগে একবার কালো বুড়ির মুখ থেকে কাপড়টা ওঠাল সঞ্জয়। ক্ষীণ চাঁদের আলোতে সে মুখের দিকে তাকিয়ে তাদের মনে হল কালো বুড়ি যেন হাসছে তিনজনের দিকে চেয়ে!
রাহুল তার উদ্দেশে বলল, “নাও, আমরা তিনজনই তোমার সেই ভূতেরা হলাম। যারা তোমাকে শ্মশানে বয়ে নিয়ে এল। নাও এবার চিতায় ওঠো।”
এরপর কালো বুড়িকে চিতায় তুলে আগুন দেওয়া হল। জ্বলতে শুরু করল চিতা। উড়তে থাকল ধোঁয়া, ছাই। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই কালো বুড়ির দাহকাজ শেষ হয়ে গেল। সঞ্জয় বলল, “ছাই লেগে আমাদের দেহগুলোও কেমন কালো হয়ে গেছে দ্যাখ! ঠিক যেন ভূতের মতোই লাগছে! চল এবার ফিরতে হবে।”
তীর্থ বলল, “হ্যাঁ, যেন কালো বুড়ির শববাহক ভূতের মতোই লাগছে। হ্যাঁ, এবার ফিরতে হবে। তবে ঘরে নয়, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চালার ওখানে যাব আমরা।”
৬
দুর্যোগের রাত কেটে ভোরের আলো ফুটল একসময়। ডাক্তারবাবুর কোয়ার্টার স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কাছেই। দুর্যোগের মধ্যে কালো বুড়ির দেহটাকে ছেলেগুলো কীভাবে সৎকার করল সে কথা ভাবতে ভাবতেই সকালবেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দিকে আসছিলেন তিনি। সেখানে পৌঁছে স্বাস্থ্যকন্দ্রের সামনে যে টিনের শেডটা আছ তার সামনে উত্তেজিত জনতার ভিড় দেখে সেদিকে এগিয়ে গেলেন তিনি। আর তারপরই তাঁর চোখে পড়ল এক ভয়ংকর দৃশ্য! সেই টিনের চালার নীচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে বাজ পড়ে পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া তিন যুবকের মৃতদেহ। তবে কালো বুড়ির দেহটা সেখানে নেই।
