ক্ষমা করবেন মাস্টারমশাই – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

ক্ষমা করবেন মাস্টারমশাই

১

বিকেল পাঁচটা বাজে। অন্যদিন অফিস ছাড়তে ঋতব্রতর সন্ধ্যা সাতটা বেজে যায়। কিন্তু আজ একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার জন্য চেয়ার ছেড়ে উঠবেন ভাবছিলেন তিনি। আসলে আজ তাঁর শরীর, মন, কোনোটাই ভালো নেই। চেন্নাইয়ের আই হসপিটালের ডাক্তারবাবু তাঁকে ইঞ্জেকশন দেবার পর বলেছেন, এটাই শেষ চেষ্টা। তবে তিনি নিশ্চিতভাবে কথা দিতে পারছেন না ঋতব্রতর চোখটা শেষ পর্যন্ত বাঁচবে কি না। বাঁ চোখের দৃষ্টিশক্তি ক্রমশই ক্ষীণ হয়ে আসছে তাঁর। ইঞ্জেকশনে কাজ হলে তা দিন পনেরোর মধ্যেই হবে, নচেৎ আর ডাক্তারবাবুর কিছু করার নেই। কথাটা শুনে হোটেলে ফেরার পর ঋতব্রতর আর সারারাত ঘুম আসেনি। ভোরবেলা উঠে তিনি কলকাতায় ফেরার ফ্লাইট ধরেছিলেন। তারপর এয়ারপোর্টে নেমেই সোজা অফিসে। আজ অফিসে না এলে চলত না তাঁর। ঋতব্রত এই মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির কলকাতা অফিসের সর্বময় কর্তা। অফিস তিনিই পরিচালনা করেন। চেন্নাই যাবার কারণে গত দু-দিন অফিসে আসা হয়নি তাঁর। তা ছাড়া এ অফিসেই লোক নিয়োগের জন্য আগামীকাল একটা ইন্টারভিউয়ের ব্যাপার আছে। সে ব্যাপারেও কিছু কাজ ছিল। এ সব কারণে শরীর-মন ভালো না থাকলেও ঋতব্রতকে আসতেই হয়েছে অফিসে।

ঋতব্রত চেয়ার থেকে উঠতে যাচ্ছিলেন। ঠিক সেইসময় বেয়ারা দরজা ঠেলে উঁকি দিয়ে বলল, “স্যার, এক ভদ্রলোক দেখা করতে এসেছেন আপনার সঙ্গে। ভিতরে পাঠাব?”

ঋতব্রতদের কোম্পানি হল একটা এক্সপোর্ট কোম্পানি। তাদের মাধ্যমে অন্য নানা বড় বড় কোম্পানি বিদেশে তাদের পণ্য পাঠায়। যেজন্য বিভিন্ন কোম্পানির প্রতিনিধিরা তাঁর সঙ্গে মাঝে মাঝে দেখা করতে আসেন। বেয়ারার কথা শুনে তেমনই কেউ এসেছে মনে করে ঋতব্রত তাকে বললেন, “ম্যানেজার সাহেব তো তাঁর চেম্বারেই আছেন। তুমি লোকটাকে তাঁর চেম্বারেই নিয়ে যাও। তিনি যা কথা বলার বলবেন। আমি এখন উঠব।”

বড় সাহেবের কথা শুনে বেয়ারা একটু ইতস্তত করে বলল, “আমি তাঁকে বলেছিলাম ম্যানেজার স্যারের সঙ্গে দেখা করার জন্য। কিন্তু তিনি বললেন কোম্পানির কাজে আসেননি। আপনি তাঁকে চেনেন। তাঁর আপনার সঙ্গে ব্যক্তিগত দরকার আছে।”

ঋতব্রত এবার মৃদু বিস্মিত হলেন বেয়ারার কথা শুনে। ব্যক্তিগত দরকার নিয়ে তাঁর কোন পরিচিত তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এল। ঋতব্রত বললেন, “আচ্ছা, ভিতরে পাঠিয়ে দাও।”

আধ মিনিটের মধ্যে দরজা ঠেলে যে মানুষটি ঋতব্রতর চেম্বারে প্রবেশ করলেন, তিনি একজন পলিতকেশ ধুতি-পাঞ্জাবি পরা শীর্ণকায় বৃদ্ধ। গায়ের রং চোখে পড়ার মতো ঘোর কৃষ্ণবর্ণ। সচরাচর এমন কৃষ্ণবর্ণের লোক চোখে পড়ে না। হয়তো-বা তাঁর ওই গায়ের রঙের জন্যই মুহূর্তের মধ্যে তাঁকে চিনে ফেলে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়লেন বিস্মিত ঋতব্রত।

ঋতব্রতকে উঠে দাঁড়াতে দেখে, তিনি তাঁকে চিনতে পেরেছেন বুঝতে পেরে বৃদ্ধ বললেন, “যাক, তুমি তাহলে আমাকে চিনতে পারলে বাবা। আমার এ চেহারা দেখে আমার অনেক ছাত্র তো আমাকে চিনতেই পারে না। কোথায় সেই মুগুর ভাঁজা, ডাম্বেল তোলা শরীর, এখন তো শুধু হাড়ের ওপর চামড়াটাই লেগে আছে।”

তিরিশ বছর পর সুদূর এক মফস্সলের স্কুলের তাঁর শিক্ষকমশাইকে এভাবে তাঁর চেম্বারে উপস্থিত হতে দেখে ঋতব্রত এতটাই বিস্মিত হলেন যে তাঁকে বসতে বলতেও ভুলে গেছেন। ছাত্র-শিক্ষক পরস্পরের দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর ঋতব্রত একদা যে বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন সেই কিশলয় জুনিয়ার হাই স্কুলের ভূতপূর্ব শিক্ষক কালীকিঙ্কর মুখোটি বললেন, “আমি একটু বসতে পারি বাবা? তোমার ঘরটা কী সুন্দর ঠান্ডা!”

কথাটা শুনে সংবিৎ ফিরে পেয়ে ঋতব্রত লজ্জিত স্বরে বললেন, “হ্যাঁ, স্যার, বসুন বসুন। আপনি আমার কাছে এসেছেন আমি তা বিশ্বাসই করতে পারছি না। কী খাবেন বলুন?”

শীর্ণ বৃদ্ধ বললেন, “কিছু না বাবা। শরীরে এত রোগ বাসা বেঁধেছে যে বাইরের কিছু খাই না। শুধু একটু জল দাও। বাইরে ভয়ংকর গরম। তার ওপর বহুদিন পর ট্রেনে-বাসে এতটা পথ এলাম। খুব তেষ্টা পেয়েছে।”

মাস্টারমশাইয়ের কথা শুনে ঋতব্রত টেবিলে রাখা জলের বোতলটা এগিয়ে দিলেন তাঁর দিকে। ঢক ঢক করে বোতলের প্রায় অর্ধেকটা জল পান করলেন কালীকিঙ্কর। ঘামে জ্যাবজ্যাব করছে বৃদ্ধের শরীর। তাঁর কণ্ঠার কাছে গলায় পরা রুদ্রাক্ষের মালাটাও চোখে পড়ল ঋতব্রতর। হ্যাঁ, এই মালাটা সেদিনও পরে থাকতেন কালীকিঙ্কর। ওই রুদ্রাক্ষের মালাটার জন্য সেসময় ছাত্রমহলে প্রচারিত ছিল যে কালীকিঙ্কর না কি তন্ত্রসাধনাও করেন! তবে তিরিশ বছর আগে ফেলে আসা স্কুলের অন্য শিক্ষকদের অনেককেই আজ ভুলে গেলেও ঋতব্রত কালীকিঙ্করবাবুকে মনে রেখেছেন অন্য একটা ঘটনার কারণে।

তিনি জল খাবার পর ঋতব্রতর উদ্দেশে বললেন, “তুমি বসো। দাঁড়িয়ে কেন? এ তো কিশলয় স্কুলের ক্লাসরুম নয়। তুমি জীবনে এত উন্নতি করেছ দেখে ভালো লাগছে।”

ঋতব্রত প্রশ্ন করলেন, “আপনি আমার খোঁজ কীভাবে পেলেন স্যার? স্কুল ছাড়ার পর তো আমি বাবার বদলির সুবাদে কলকাতা চলে আসি। আর কোনোদিন ও গ্রামে যাওয়া হয়নি। ওখানের কারও সঙ্গে আমার যোগাযোগও নেই।”

কালীকিঙ্কর মৃদু হেসে বললেন, “এ ব্যাপারটাকে কাকতালীয়ই বলা চলে। অলকেশকে মনে হয় আজ আর তোমার মনে নেই। তোমার সঙ্গে সে স্কুলে পড়ত। গ্রামেরই ছেলে। আমার বাড়ির কাছেই থাকে। একটা স্টেশনারি দোকান আছে। ব্যবসার মাল কিনতে মাঝে মাঝে কলকাতায় আসে। ওর হাত দিয়েই ছেলের আবেদনপত্রটা তোমার এই অফিসে জমা দিতে পাঠিয়েছিলাম সপ্তাহখানেক আগে। ও তোমাকে এ অফিসে দেখে চিনতে পেরেছিল। সংকোচের কারণে তোমার সঙ্গে কথা বলেনি। তবে ও এ অফিস থেকে ফেরার সময় এ কথা জেনে গেছিল যে তুমি এ অফিসের সর্বময় কর্তা। তার থেকেই আমি খবরটা পেলাম। তাই একটা অনুরোধ জানাতে ছুটে এলাম।”

ঋতব্রত এবার যেন এত বছর পর কালীকিঙ্করের তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসার কারণ কিছুটা অনুমান করতে পারলেন। নিজের চোখের চশমাটা একটু ঠিক করে নিয়ে মাস্টারমশাইকে প্রশ্ন করলেন, “কী অনুরোধ স্যার?”

কালীকিঙ্কর বললেন, “জানি এ অনুরোধ করা অন্যায়। বলতে পারো একপ্রকার নিরুপায় হয়েই তোমার দ্বারস্থ হয়েছি। কাল তো তোমার অফিসে ক্লার্ক নিয়োগের ইন্টারভিউ। দেখো না যদি ছেলেটার চাকরিটা করে দিতে পারো?”

এ কথা বলার পর কালীকিঙ্কর ধীরে ধীরে তাঁর দুরবস্থার কথা বলতে শুরু করলেন—“খুব বিপদের মধ্যে আছি বাবা। পুত্রসন্তান লাভের আশায় সে জন্মাবার আগে চারটে মেয়ে হল আমার। তাদের আর আমার সবারই দুর্ভাগ্য যে তারা সবাই বাপের মতো গায়ের রং পেল। ধার-কর্জ করে মোটা যৌতুক দিয়ে দুজনের বিয়ে দিতে হয়েছে। এখনও দুটোর বিয়ে বাকি….”

কালীকিঙ্করের কথার সঙ্গে সঙ্গে ঋতব্রতর মনে ভেসে উঠতে লাগল গ্রামাঞ্চলের পুরোনো একটা স্কুলবাড়ি। একটা মাঠের চারপাশে টানা বারান্দা-অলা সার সার ক্লাসরুম, টালির ছাদ-অলা খুপরি খুপরি ঘরে কাঠের নড়বড়ে বেঞ্চ, দেওয়ালের গায়ে ঝুলন্ত ব্ল্যাকবোর্ড, ছেলেদের কোলাহল – কিশলয় জুনিয়ার হাই স্কুল।

কালীকিঙ্কর বলে চলেছেন, ‘জুনিয়ার’ হাই স্কুলের ড্রিল টিচারের বেতনই বা কত ছিল সেই সময়! আর সেই অনুপাতেই তো পেনশন। স্ত্রীর হার্টের ব্যামো ধরা পড়েছে বছর তিনেক আগে। ভাল্ভ পালটাতে বলেছে ডাক্তার। টাকার অভাবে পারছি না…”

মাস্টারমশাইয়ের কথা এবার কিছুটা ঋতব্রতর কানে ঢুকতে লাগল, কিছুটা নয়। পরিবর্তে তাঁর চোখের সামনে যেন ভেসে উঠতে শুরু করল সেই ঘটনা, যা ঋতব্রত ভুলে যেতে চেয়েও এত বছর পরও ভুলতে পারেননি, যে কারণে তিনি ড্রিল টিচার কালীকিঙ্করকে আজও ভুলতে পারেননি—কিশলয় স্কুলের ক্লাস এইটের ঘর। নির্দিষ্ট মাস্টারমশাই তখনও ক্লাসে না আসায় ক্লাসে হই-হট্টগোল চলছে। ঋতব্রতও আছেন সেই ক্লাসে। কয়েকজন ছাত্র আবার বেঞ্চ থেকে উঠে করিডোরে উঁকিও মারছে। হঠাৎই তাদের মধ্যে একজন ছাত্র বলে উঠল, “আরে আমাদের ক্লাসে মনে হয় কেলে কিঙ্করবাবু আসছেন।”

ঋতব্রত জানলার বাইরে তাকিয়ে দেখতে পেলেন, “হ্যাঁ, হেডস্যারের ঘরের দিক থেকে মাঠ পেরিয়ে কালীকিঙ্কর এগিয়ে আসছেন তাঁদের ক্লাসরুমের দিকে। নির্দিষ্ট শিক্ষক কোনো ক্লাসে অনুপস্থিত থাকলে হেডস্যার অনেক সময়ই ড্রিল টিচারকে সেই ক্লাসে পাঠাতেন। কালীকিঙ্করবাবু ক্লাসে ঢুকে কখনও বাংলা রিডিং পড়িয়ে, কখনও বা ছবি আঁকিয়ে শান্ত রাখতেন ক্লাস। কালীকিঙ্করের গাত্রবর্ণের জন্য তাঁর নাম ‘কেলেকিঙ্কর’ দিয়েছিল কোনো দুষ্টু ছাত্র। আর সেটাই ছড়িয়ে পড়েছিল ছাত্রমহলে। তা ছাড়া কালীকিঙ্কর ড্রিল টিচার। সেজন্য ওই ‘কেলেকিঙ্কর’ ডাকের পিছনে হয়তো-বা কিছুটা অবজ্ঞাও ছিল অপরিণত ছাত্রদের মনে। যাই হোক, কালীকিঙ্করকে আসতে দেখে ছাত্ররা চটপট বেঞ্চে বসে পড়ল। ক্লাসে ঢুকলেন কালীকিঙ্কর। তিনি ক্লাসে ঢুকতেই পিছনের বেঞ্চ থেকে কোন একটা ছেলে যেন বলে উঠল, “কেলে কিঙ্করই সত্যিই এলেন!”

কথাটা পৌঁছোল কালীকিঙ্করের কানেও। পিছনের বেঞ্চগুলোর দিকে চাইলেন তিনি। কথাটা শুনে হেসে ফেলেছে অনেক ছাত্রই। সে বয়সে যেমন হয়। কালীকিঙ্করের সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গেল পিছন দিকের বেঞ্চে বসা ঋতব্রতর সঙ্গে। তার ঠোটের কোনাতেও লেগে আছে হাসির রেশ। কালীকিঙ্কর তা দেখে সোজা এগিয়ে এসে দাঁড়ালেন ঋতব্রতর সামনে। এরপর ঋতব্রত কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার বাম চোখ আর গালের ওপর নেমে এল কালীকিঙ্করের পেশিবহুল হাতের বিরাশি সিক্কার থাপ্পড়। ঋতব্রতর চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এল।

নিজের চেম্বারে বসে এত বছর পর অবিকল সে ঘটনাটা তাঁর মনে ভেসে ওঠায় কয়েক মুহুর্তের জন্য কেঁপে উঠলেন ঋতব্রত।

ব্যাপারটা মনে হয় কালীকিঙ্করের নজর এড়াল না। তিনি কথা থামিয়ে জানতে চাইলেন, “তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে বাবা?”

ঋতব্রত নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, “না, কিছু নয়। আসলে ক-দিন ধরে খুব পরিশ্রম যাচ্ছে তাই একটু ক্লান্ত লাগছে।”

ঋতব্রতর মনের ভাব পাঠ করার কথা নয় বৃদ্ধ শিক্ষকের। তিনি ধারণা করলেন যে এতক্ষণ তাঁর বলে চলা কথাগুলো মন দিয়ে শুনেছেন ঋতব্রত। তাই তিনি এরপর বললেন, “সবই তো শুনলে বাবা। ছেলেটার যদি গতি করে দাও তবে সংসারটা কোনোরকমে বেঁচে যায়। আমার শরীরের সব অঙ্গই বিকল হতে শুরু করেছে শুধু চোখটাই ঠিক আছে। এখনও চশমার প্রয়োজন হয় না। কিন্তু শুধু চোখ দিয়ে কী হবে? বয়স হয়েছে, সামান্য পরিশ্রম করলেই হাঁফ ধরে যায়। আমি যে নিজে কোনো কাজ করব তার উপায় নেই।”

একথা বলে একটু থেমে তিনি বললেন, “আমার ছেলে বলে বলছি না। ওর নাম কৃশানু ঘোষাল। ওর মার্কশিট দেখলেই বুঝতে পারবে ও পড়াশোনায় বেশ ভালো। সৎ, কর্মঠ। ওকে তুমি নিশ্চিন্তে নিতে পারো। ওর চাকরিটা করে দিলে তোমার কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকব আমি।” –একটা কাতর আবেদন ভেসে উঠল অসহায় বৃদ্ধ শিক্ষকের গলাতে ৷

কালীকিঙ্করের কথা শুনে ঋতব্রত কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। হ্যাঁ, এ কথা ঠিকই, তিনি যাকে নির্বাচন করবেন সেই চাকরিটা পাবে। যোগ্যতা থাকলে কালীকিঙ্করের ছেলেকে চাকরিতে বহাল করতে কোনো সমস্যা নেই তাঁর। কিন্তু চাকরি দেবার ব্যাপারে কাউকে কোনো আশার প্রতিশ্রুতি দেওয়া ঠিক নয়। তাই তিনি একটু ভেবে নিয়ে জবাব দিলেন, “আপনি যখন আমাকে অনুরোধ করছেন তখন আমি চেষ্টা করে দেখব।”

কথাটা শুনেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল বৃদ্ধর দু-চোখ। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে তিনি বললেন, “আমি জানি তুমি চেষ্টা করলেই হবে। অনেক আশা নিয়ে আমি আজ ফিরে যাচ্ছি।”—এ কথা বলে তিনি তাঁর পাঞ্জাবির গলার কাছ থেকে রুদ্রাক্ষের মালাটা বার করে আশীর্বাদের ভঙ্গিতে তুলে ধরে উঠে দাঁড়ালেন।

২

নিজের চেম্বার ছেড়ে চাকরির আবেদনপত্রের ফাইলটা সঙ্গে নিয়ে অফিস থেকে বাড়ির পথে রওনা হলেন ঋতব্রত। রাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম এদিন একটু বেশি ছিল। গাড়ি যখন দক্ষিণ কলকাতাতে তাঁকে বাড়ির সামনে নামিয়ে দিল তখন সন্ধ্যা নেমে গেছে। একজন পরিচারক আর ঋতব্রত থাকেন এ বাড়িতে। স্নান সেরে ফ্রেশ হয়ে অফিস থেকে আনা ফাইলটা নিয়ে বসলেন ঋতব্রত। তিনি তাঁর মধ্যে খুঁজেও পেলেন কৃশানু ঘোষালের আবেদনপত্র। না, কালীকিঙ্করবাবু তাঁকে মিথ্যা বলেননি। ছেলেটা অ্যাকাউন্টেন্সিতে অনার্স। মাধ্যমিক থেকে গ্র্যাজুয়েশন পর্যন্ত সব সার্টিফিকেট প্রথম শ্রেণির। কম্পিউটারও জানে। ছেলেটাকে যদি ঋতব্রত কাজে বহাল করেন তবে অন্য চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে খুব একটা অন্যায় করা হবে না। আবেদনপত্রের সঙ্গে একটা ছবিও আছে। শান্ত মুখশ্রী। তবে ছেলেটার গায়ের রং ছবি দেখে তার বাবার মতোই মনে হল। ছবিটার দিকে তাকিয়ে ঋতব্রত ভাবতে লাগলেন—কী অদ্ভুত ব্যাপার! যার জন্য তাঁর আজ একটা চোখ নষ্ট হতে বসেছে। সেই আজ ঋতব্রতর কাছে সাহায্যের আবেদন নিয়ে হাজির হয়েছে। হ্যাঁ, সেদিন মাস্টারমশাইয়ের থাপ্পড় খেয়ে বাড়ি আসার পর এক চোখে কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না ঋতব্রত। তবে তার জন্য কালীকিঙ্করের বিরুদ্ধে থানা বা স্কুলে কোনো অভিযোগ জানাতে যাননি ঋতব্রতর বাবা। সময়টা অন্য ছিল যে তখন। চড়-থাপ্পড়, বেতের বাড়ি ছিল শিক্ষার অঙ্গ। আর অভিভাবকরাও মনে করতেন যে ভবিষ্যতে মানুষ তৈরি করার জন্য ছাত্রকে প্রহারের অধিকার শিক্ষকের আছে। তবে ঋতব্রতকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। বেশ কিছুদিন চিকিৎসা করার পর ঋতব্রত তাঁর বাঁ চোখের দৃষ্টি ফিরে পেয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু সে সময়ই ডাক্তারবাবু আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে বয়স বাড়লে ঋতব্রতর আঘাতপ্রাপ্ত চোখের দৃষ্টিশক্তি আবারও চলে যেতে পারে। তাঁর আশঙ্কা মিথ্যা হয়নি। গত কয়েক বছর ধরে ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে চলেছে ঋতব্রতর বাঁ চোখের দৃষ্টি। বেশ কিছুক্ষণ ধরে আবেদনপত্রটার দিকে তাকিয়ে তিনি ভাবলেন তাঁর কী করা উচিত? তিনি অশক্ত বৃদ্ধ পিতার আবেদনে সাড়া দেবেন, না কি সেদিনের সেই ঘটনার জন্য আজ উপযুক্ত শিক্ষা দেবেন কালীকিঙ্করকে?

শেষ পর্যন্ত একটা অদ্ভুত সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন তিনি। গত দু-তিনদিন ধরে ঋতব্রতর শরীরের ওপর দিয়ে অনেক ধকল গেছে। কাজেই এদিন তিনি রাত আটটা নাগাদ তাড়াতাড়ি ডিনার সেরে বিছানাতে চলে গেলেন।

পরদিন ঠিক দশটাতে ঋতব্রত অফিসে পৌঁছোলেন। চাকরিপ্রার্থীরাও ইতিমধ্যে হাজির হতে শুরু করেছেন। প্রথমে যে লিখিত পরীক্ষা হবে তার দায়িত্বে ম্যানেজার সাহেব। আর তারপর পরীক্ষার্থীদের ডেকে চূড়ান্ত প্রার্থী বাছাই করবেন ঋতব্রত। বেলা সাড়ে দশটায় চাকরিপ্রার্থীদের পরীক্ষা শুরু হল। কুড়িজন মতো আবেদনকারী। বেলা বারোটার সময় তাদের পরীক্ষা শেষ হলে ঋতব্রতর চেম্বারে চাকরিপ্রার্থীদের স্কোর শিট পাঠিয়ে দিলেন ম্যানেজার সাহেব। ঋতব্রত দেখলেন তার মধ্যে কৃশানু ঘোষালের নামও আছে। খুব একটা মন্দ পরীক্ষা দেয়নি সে। প্রথম পাঁচজনের মধ্যেই তার নাম আছে। তিনি তাঁর বেয়ারাকে নির্দেশ দিলেন যে কৃশানু ঘোষাল নামের ছেলেটাকে যেন সব শেষে তাঁর কাছে পাঠানো হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই চাকরিপ্রার্থীরা প্রবেশ করতে শুরু করলেন তাঁর চেম্বারে।

প্রায় ঘণ্টাতিনেক সময় লাগল ঋতব্রতর অন্যদের ইন্টারভিউ নিতে। তারপর সব শেষে তাঁর চেম্বারে প্রবেশ করল কৃশানু ঘোষাল। ঋতব্রত মুখ তুলে তাকালেন তার দিকে। পঁচিশ বছর বয়সের একটা ছেলে। শান্ত-সৌম্য মুখশ্রী। গায়ের রং কালীকিঙ্করের মতোই ঘোর কৃষ্ণবর্ণের। ছেলেটার পোশাক পরিচ্ছন্ন হলেও জামার কলারের কাছটা যে ফাটা তা নজর এড়াল না। অর্থাৎ সত্যিই অর্থকষ্টে আছে তারা। ঋতব্রত ইশারাতে ছেলেটাকে তাঁর টেবিলের সামনে মুখোমুখি চেয়ারে বসতে বললেন।

ছেলেটা বসল। কিছুক্ষণের নিস্তব্ধতা। ঋতব্রত চেয়ে রইলেন তার দিকে। ওভাবে তাকিয়ে থাকতে ছেলেটার মধ্যে যেন একটা অস্বস্তিবোধ ফুটে উঠল। তার কী করা উচিত সেটা ঠিক বুঝতে না পেরে ছেলেটা এরপর তার হাতের ফাইলটা খুলতে যাচ্ছিল সম্ভবত তার ভিতরে রাখা মার্কশিট ইত্যাদি ঋতব্রতকে দেখাবার জন্য। কিন্তু ঋতব্রত তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “থাক, ওসব দেখাবার দরকার নেই।”

ফাইলটা খুলতে গিয়েও থেমে গেল ছেলেটা। ঋতব্রত এরপর তাকে প্রশ্ন করলেন, “মাস্টারমশাইয়ের ছেলে হয়ে এই সামান্য কেরানির চাকরির আবেদন করেছেন কেন? আপনার তো ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার, নিদেনপক্ষে একটা শিক্ষক হবার কথা?”

কৃশানু ঘোষাল নামের ছেলেটা মৃদু চুপ করে থেকে উত্তর দিল, “পরিবারের সামর্থ্য ছিল না বলে ওসব পড়তে পারিনি। অন্য কোনো চাকরি পাইনি বলে এখানে ইন্টারভিউ দিতে এসেছি।”

ঋতব্রত বললেন, “আপনার বাবা তো শিক্ষক ছিলেন। আদর্শ শিক্ষক বলতে আপনি ঠিক কী বোঝেন?”

ছেলেটা কয়েক মুহূর্ত ভেবে নিয়ে জবাব দিল, “তাঁরা সমাজ গড়ার কারিগর। সঠিক শিক্ষা দিয়ে মানুষ গড়ে তোলেন তাঁরা।”

“সঠিক শিক্ষা মানে কি শুধু পুঁথিগত শিক্ষা?” জানতে চাইলেন ঋতব্রত।

“না, শিক্ষা মানে শুধু পুঁথিগত শিক্ষা নয়, নৈতিক ও চারিত্রিক শিক্ষাও বোঝায়।”

কৃশানুর জবাব শুনে সোজা হয়ে বসলেন ঋতব্রত। ছেলেটার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে তিনি বললেন, “কিন্তু সেই শিক্ষকই যদি তাঁর ছাত্রকে কোনো অনৈতিক অনুরোধ করেন তাহলে কি তিনি তাঁর নিজের পথ থেকে ভ্রষ্ট নন? এই যেমন তোমার বাবা এসেছিলেন তোমার চাকরির সুপারিশ করতে। তোমার থেকে যোগ্য কোনো লোককে যদি বঞ্চিত করে তোমাকে কাজে নেওয়া হয় তবে তা কি অনৈতিক কাজ নয়।”

কথা বলতে বলতে আপনি ছেড়ে তুমি সম্বোধনে নেমে এলেন ঋতব্রত। তাঁর কথা শুনে এবার মাথা নিচু করল কৃশানু। সম্ভবত এই মুহূর্তে সে এ প্রশ্নের জবাব দিতে অপারগ।

ঋতব্রত এরপর বেশ চিবিয়ে চিবিয়ে ছেলেটার উদ্দেশে বললেন, “তোমার বাবাকে গিয়ে জানিও যে তাঁর ছাত্র কখনওই তাঁদের নীতিশিক্ষার পথ থেকে ভ্রষ্ট হবে না। তাহলে যে তাঁদের শিক্ষা ব্যর্থ হয়ে যাবে।”

শেষ কথাটা বেশ শ্লেষের সঙ্গে বললেন ঋতব্রত। যার অর্থ হল অন্য প্রার্থীদের বঞ্চিত করে তাকে ঋতব্রত নিতে পারছেন না৷

ঋতব্রতর কথা শুনে ছেলেটার মুখটা এবার ফ্যাকাশে হয়ে গেল। উঠে দাঁড়িয়ে সে ঋতব্রতকে একবার হাতজোড় করে নমস্কার জানিয়ে মাথা নিচু করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

সে ঘর ছাড়বার পর ঋতব্রত মনে মনে হাসলেন। ছেলেটা নিশ্চয়ই বাবাকে গিয়ে বলবে তার ইন্টারভিউয়ের কথা। কালীকিঙ্করবাবু নিশ্চয়ই ধরে নেবেন চাকরিটা তাঁর ছেলের হচ্ছে না। তার জন্য এ ক-টা দিন তিনি যে মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করবেন সেটাই তাঁর প্রতি ঋতব্রতর প্রতিশোধ। একটা চোখ হারাবার বিনিময়ে এটুকু প্রতিশোধ তাঁর ওপর নিতেই পারেন ঋতব্রত। অন্তত তেমনটাই তাঁর মনে হয়েছে।

ছেলেটা চেম্বার ছেড়ে চলে যাবার পর ঋতব্রত ম্যানেজার সাহেবকে ডেকে পাঠালেন। তিনি তাঁকে বললেন, কৃশানু ঘোষাল নামের এই ছেলেটিকেই তাঁর পছন্দ হয়েছে যোগ্য প্রার্থী হিসাবে। নিয়োগপত্র তৈরি করে ঋতব্রতকে দিয়ে স্বাক্ষর করিয়ে যেন ছেলেটার বাড়ির ঠিকানাতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। চিঠি হাতে পাবার সঙ্গে সঙ্গেই যেন ছেলেটি কাজে যোগ দেয় সে কথা যেন লেখা থাকে চিঠিতে। ঋতব্রত মনে মনে হিসাব করে দেখলেন নিয়োগপত্র পৌঁছোবার আগে পর্যন্ত অন্তত আরও সাতদিন মনোকষ্টে ভুগবেন কালীকিঙ্করবাবু।

৩

মাঝের দুটো দিন কাজের চাপে যেমন কাটে তেমনই কাটল ঋতব্রতর। প্রতিদিনই ঠিক দশটায় অফিসে এসেছেন। আর অফিস ছেড়েছেন সাতটা নাগাদ। এ দিন শনিবার। অন্যদের ছুটি থাকলেও ঋতব্রত শনিবার দুপুরের দিকে অফিসে আসেন সারা সপ্তাহের কাজ মিলিয়ে দেখার জন্য। গেটকিপার অফিস খুলে দেয়। নিজের চেম্বারে বসে তিনি কাজ করেন, তারপর বাড়ি ফিরে যান। এ শনিবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। ঋতব্রত বেলা দুটো নাগাদ অফিসে ঢুকে কাজে বসলেন। একটা পুরোনো দিনের বাড়ির একতলাটা ভাড়া নিয়ে ঋতব্রতদের অফিস। উত্তর কলকাতার এ গলিতে আরও বেশ কয়েকটা অফিস আছে। ঋতব্রতর চেম্বারের কাচের শার্সি দিয়ে রাস্তা দেখা যায়৷ সকাল থেকেই আজ বেশ গুমোট ভাব। গুমোট ভাব ঋতব্রতর মনেও। তাঁর বাঁ চোখের দৃষ্টিটা ক্রমশ আরও যেন ঝাপসা হচ্ছে। তবে কি আর ক-দিনের মধ্যে সত্যি এ-চোখের দৃষ্টি হারাবেন তিনি! ফাইলগুলো দেখতে থাকলেও সে চিন্তাটাই ঘুরপাক খাচ্ছে তাঁর মনে। বিকাল চারটে নাগাদ হঠাৎই তিনি বুঝতে পারলেন চেম্বারের এসিটা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল। অর্থাৎ পাওয়ার কাট—লোডশেডিং হল। জানালা দিয়ে আসা সূর্যালোকও যেন কমে আসছে। টেবিলের গায়ের কাচের জানালাটা খুলে ফেলে ভালো করে বাইরে তাকিয়ে ব্যাপারটা অনুমান করতে পারলেন তিনি। বৈশাখ মাসে এই বিকাল সাড়ে চারটে নাগাদ বাইরে প্রখর রোদ থাকে। কিন্তু সূর্য নিষ্প্রভ হয়ে আসছে। ছাই রঙের মেঘে দ্রুত ছেয়ে যাচ্ছে আকাশ। বাইরের বাতাসে কেমন যেন একটা ঠান্ডা ভাব। কালবৈশাখী আসছে! সেজন্যই হয়তো আগাম সতর্কতা গ্রহণ করে পাওয়ার কাট করল বিদ্যুৎ দপ্তর। আজ আবার জেনারেটর যে চালায় সে অফিসে আসেনি। ঋতব্রত একবার ভাবলেন অফিস থেকে বেরিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দেন। কিন্তু পরক্ষণেই তাঁর মনে হল, রাস্তায় ঝড়-বাদলের মধ্যে পড়লে বিপদ হতে পারে। আজ তিনি নিজেই নিজের গাড়ি চালিয়ে এসেছেন। ঝুঁকি নেবার দরকার নেই। অফিসে নিরাপদে বসে তারপর তিনি বাড়ি ফিরবেন। জানালা দিয়ে আসা ঠান্ডা বাতাসের ঝলক বেশ লাগছে ঋতব্রতর। আলো কমে আসাতে ফাইলপত্র গুটিয়ে জানালার দিকে চেয়ে বসে রইলেন তিনি। কিছুক্ষণের মধ্যেই জানালার বাইরে যেন অন্ধকার নেমে এল, বইতে শুরু করল দমকা বাতাস। বাইরের রাস্তা ফাঁকা হয়ে গেছে। বাতাসে উড়ছে ধুলো, শুকনো পাতা। পাছে সেসব আবর্জনা জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ে সেজন্য জানালাটা বন্ধ করতে যাচ্ছিলেন তিনি, ঠিক সেই সময় ঘরের দরজায় টোকা দেবার শব্দ শুনে গেটকিপার ছেলেটা এসেছে ভেবে ঋতব্রত বললেন, “কাম ইন।”

দরজা ঠেলে যে আধো-অন্ধকার ঘরে প্রবেশ করল তাকে দেখে অবাক হয়ে গেলেন ঋতব্রত। বিস্মিত স্বরে তিনি বলে উঠলেন, “স্যার আপনি?”

কালীকিঙ্কর হেসে বললেন, “হ্যাঁ, কলকাতায় এসেছিলাম তাই তোমার সঙ্গে দেখা করতে এলাম। তবে আমি বসব না বাবা। দুটো কথা বলেই চলে যাব।”

ঋতব্রত অনুমান করলেন, সম্ভবত ছেলেটা বাড়ি গিয়ে পুরো ঘটনাটা জানিয়েছে বাবাকে। ছেলের চাকরির জন্য শেষবারের জন্য অনুরোধ জানাতে এসেছেন বৃদ্ধ। ব্যাপারটাতে মনে মনে বেশ তৃপ্তি অনুভব করলেন ঋতব্রত। তাঁর চোখের ক্ষতিপূরণ বাবদ এক মধুর প্রতিশোধ নিতে চলেছেন তিনি।

বাইরের অন্ধকারটা আরও ঘন হয়ে এল। ঘরের ভিতর সে অন্ধকার আরও বাড়ল। বৃদ্ধ কালীকিঙ্করের অবয়বটা কেমন যেন আবছা দেখাচ্ছে। ঋতব্রত বললেন, “বলুন মাস্টারমশাই।”

কালীকিঙ্কর বললেন, “তোমাকে আমি ধন্যবাদ জানাতে এলাম বাবা।”

“কীসের ধন্যবাদ?” জানতে চাইলেন ঋতব্রত।

মাস্টারমশাই জবাব দিলেন, “ছেলেটার চাকরিটা করে দিয়ে বড় উপকার করলে তুমি।”

ঋতব্রত কথাটা শুনে বেশ অবাক হয়ে গেলেন। গতকালই সবে ঋতব্রত ছেলেটার অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারে স্বাক্ষর করার পর সেটা ডাকে দেওয়া হয়েছে। সে চিঠি তো এই একদিনের মধ্যে মফস্বলে কালীকিঙ্করবাবুর বাড়িতে পৌঁছোনোর কথা নয়। তবে কি ইন্টারভিউ দিতে আসা ছেলেটা ঋতব্রতর সঙ্গে কথোপকথন কালীকিঙ্করকে জানায়নি ! আর তিনিও চাকরিটা হচ্ছে ধরে নিয়ে আগাম ধন্যবাদ জানাতে এসেছেন তাঁকে? এরপর দ্বিতীয় একটা সম্ভাবনার কথাও মাথায় এল তাঁর। হয়তো কৃশানু বাড়িতে গিয়ে সব কথা জানিয়েছে, আর কালীকিঙ্কর বিদ্রুপ করতে এসেছেন তাঁকে।—এ দুইয়ের মধ্যে কোনটা সঠিক তা বুঝতে না পেরে কালীকিঙ্করের দিকে তাকিয়ে রইলেন ঋতব্রত। না, কোনো ব্যঙ্গ বা বক্রোক্তি শোনা গেল না তাঁর কণ্ঠ থেকে।

কালীকিঙ্কর বললেন, “আমি জানতাম বাবা তুমি আমার কথা ফেলতে পারবে না। তোমাকে ধন্যবাদ জানাবার ভাষা নেই।”

তাঁর কথা শুনে ঋতব্রতর মনে হল তাঁর প্রথম ধারণাটাই ঠিক। পরিকল্পনা বানচাল হওয়াতে একটু মুষড়ে পড়লেন ঋতব্রত। তিনি বললেন, “কিন্তু আপনার ছেলে তো এখনও কোনো চিঠি পায়নি। কীভাবে জানলেন ওর চাকরিটা হয়েছে?”

ঋতব্রতর মনে হল কালীকিঙ্কর যেন হাসলেন। তারপর বললেন, “আমি জানি বাবা। চাকরিটা ওর হয়েছে।”

তাঁকে এরপর কী বলা উচিত তা বুঝতে না পেরে ঋতব্রত চুপ করে রইলেন। বাইরে এবার ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হল।

কয়েক মুহূর্ত কালীকিঙ্করও চুপ করে থাকার পর এবার বললেন, “এবার আমি আসি বাবা। তবে যাবার আগে একটা কথা তোমাকে বলে বিনিময়ে তোমাকে আমি একটা জিনিস উপহার দেব। হয়তো সেটা আমার পাপক্ষালনও বলতে পারো। জীবনে তোমার আরও উন্নতি হোক বাবা।”

ঋতব্রত এবার বলে উঠলেন, “পাপক্ষালন মানে?”

আধো-অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা কালীকিঙ্কর যেন আবারও হাসলেন তাঁর কথা শুনে। তবে তিনি কোনো কথা না বলে পাশ ফিরলেন দরজার দিকে। ঠিক সেইসময় বাইরে বিদ্যুতের একটা চমক হল। সে আলো মুহূর্তের জন্য ঘরের অন্ধকার ঘুচিয়ে দিল। আর সেই আলোতে ঋতব্রত এতক্ষণ পর খেয়াল করলেন বৃদ্ধের একটা চোখে একটা স্টিকিং প্লাস্টার লাগানো! ঋতব্রত বলে উঠলেন, “এই ঝড়-জলের মধ্যে কোথায় যাচ্ছেন মাস্টারমশাই? বসে যান।” কিন্তু তাঁর কণ্ঠস্বর চাপা পড়ে গেল মুহুর্মুহু বাজের গর্জনে।

যেমন অদ্ভুতভাবে এসেছিলেন তেমনই অদ্ভুতভাবে চলে গেলেন বৃদ্ধ মাস্টারমশাই কালীকিঙ্কর। অন্ধকার ঘরে একলা বসে রইলেন ঋতব্রত। ঘণ্টাখানেক বাদে ঝড়-জল থামলে ঋতব্রত অফিস ছেড়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হলেন।

৪

রবিবার অফিস বন্ধ। সোম, মঙ্গল যেমন অফিস করার তেমনই অফিস করলেন ঋতব্রত। বুধবার ভোরে উঠে একটা আশ্চর্য ব্যাপার বুঝতে পারলেন ঋতব্রত। তাঁর বাঁ চোখের অস্পষ্ট ভাব যেন সম্পূর্ণ দূর হয়ে গেছে। সে চোখে স্পষ্ট সবকিছু দেখতে পাচ্ছেন তিনি। তবে নিশ্চয়ই চেন্নাইয়ের ডাক্তারবাবুর দেওয়া শেষ ইঞ্জেকশন কাজ করেছে। বহুদিন পর আনন্দে ভরে উঠল ঋতব্রতর মন।

নির্দিষ্ট সময় বেশ খুশি খুশি মন নিয়ে অফিসে হাজির হলেন তিনি। চেম্বারে ঢোকার কিছুক্ষণের মধ্যেই বেয়ারা এসে খবর দিল কৃশানু ঘোষাল নামে একজন চাকরির নিয়োগপত্র নিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। ঋতব্রতর মন আজ ভালো হয়ে গেছে তাঁর চোখের দৃষ্টি ফিরে পাওয়াতে। আজ এই মুহূর্তে তাঁর আর কোনো ক্ষোভ নেই মাস্টারমশাইয়ের প্রতি। তিনি বেয়ারাকে বললেন, “ওকে আমার ঘরে পাঠিয়ে দাও।”

কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘরে ঢুকল কালীকিঙ্করের পুত্র কৃশানু। কিন্তু তার পোশাক দেখে বেশ অবাক হয়ে গেলেন ঋতব্রত। কৃশানুর খালি পা। পরনে একটা সাদা কাপড়, গায়েও একটা সাদা কাপড় জড়ানো। তার এক হাতে একটা কুশ-আসন, অন্য হাতে ধরা চাকরির নিয়োগপত্রের খাম। দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে ক-দিনের মধ্যে পিতা বা মাতাকে হারিয়েছে। কালীকিঙ্কর বলেছিলেন বটে তাঁর স্ত্রী গুরুতর অসুস্থ। সে ব্যাপারটাই মাথায় রেখে ঋতব্রত তাকে বললেন, “তোমার মা চলে গেলেন?”

প্রশ্ন শুনে ছেলেটা জবাব দিল, “মা নয়, বাবা। আমি গতকালই চিঠিটা হাতে পেলাম। চিঠি পেলেই কাজে যোগ দিতে বলা হয়েছে। তাই এ অবস্থাতেই কাজে যোগ দিতে এসেছি।

“মাস্টারমশাই কবে চলে গেলেন?” জানতে চাইলেন ঋতব্রত।

কৃশানু জবাব দিল, “গত শনিবার বিকালে। কলকাতার হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলাম। খুব ঝড়-জল হচ্ছিল সেদিন। কিন্তু শেষরক্ষা হল না। তিনি চলে গেলেন।”

কথাটা শুনে বিস্মিত ঋতব্রত বললেন, “গত শনিবার! কিন্তু কীভাবে তিনি চলে গেলেন?”

একটু চুপ করে থেকে ছেলেটা ধরা গলাতে ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল, “গত বুধবার ইন্টারভিউ দিয়ে আমি বাড়ি ফিরে আপনার সঙ্গে আমার কথোপকথন বাবাকে জানাই। তা শুনে তিনি কেমন যেন চুপ হয়ে যান। সেদিন রাতে আর বৃহস্পতিবার তিনি কারও সঙ্গে কোনো কথা বলেননি। কেমন যেন গুম হয়ে গেছিলেন। শুক্রবার ভোরে উঠেই কেমন যেন অসংলগ্ন কথা বলতে লাগলেন তিনি। বলতে লাগলেন, “প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে আমাকে। নইলে এ সংসার রাহুর গ্রাস থেকে মুক্ত হবে না।”

তবে কী কাজের প্রায়শ্চিত্ত জিজ্ঞেস করলেও তা তিনি বলেননি। আমাদের বাড়ির কাছেই একটা শ্মশানকালীর মন্দির আছে। বাবা একটু-আধটু তন্ত্র-মন্ত্রর চর্চা করতেন, মাঝে মাঝে ওই মন্দিরেও যেতেন। শুক্রবার সন্ধ্যাবেলা কিছুটা শান্ত হয়ে তিনি বললেন, “আমি মন্দিরে যাব।” যদি সেখানে গেলে তাঁর মন শান্ত হয় তাই তাঁকে আমরা আর বাধা দিইনি। সন্ধেবেলাতে বাবা বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। তারপরই আমাদের ওখানে সেদিন ঝড়-বৃষ্টি নামল। সারারাত বৃষ্টি চলল। সেদিন রাতে আর বাবা বাড়ি ফিরলেন না। পরদিন ভোরবেলা একজন লোক এসে খবর দিল বাবা নাকি মন্দিরে পড়ে আছেন! আমি সেখানে গিয়ে দেখলাম এক বীভৎস দৃশ্য!” এ পর্যন্ত বলে কেঁপে উঠে থেমে গেল কৃশানু নামের ছেলেটা।

ঋতব্রত উত্তেজিতভাবে বলে উঠলেন, “থামলে কেন? সেখানে গিয়ে তুমি কী দেখলে?”

এত বড় ছেলেটা এবার সে দৃশ্যের কথা সম্ভবত কল্পনা করে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলল, “দেখলাম বাবা রক্তাক্ত অবস্থায় কালীমূর্তির সামনে পড়ে আছেন। তাঁর এক হাতে ধরা একটা ছুরি। তাঁর বাঁ চোখটায় শূন্য কোটর, রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে সেখান থেকে। আর তাঁর চোখের মণিটা পড়ে আছে দেবীমূর্তির পায়ের কাছে। সম্ভবত তিনি তাঁর চোখ দেবীমূর্তিকে বলি দিয়ে কোনো কিছুর প্রায়শ্চিত্ত করেছেন সংসারের মঙ্গল কামনা বা আমার চাকরির জন্য। বাবা অজ্ঞান হয়ে পড়ে ছিলেন। কয়েকজন বন্ধুর সাহায্যে আমি তাঁকে কলকাতায় নিয়ে এলাম। কিন্তু শেষরক্ষা হল না। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের জন্য সেই ঝড়-জলের বিকালে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। তিনি কী এমন পাপ করেছিলেন যে এমন প্রায়শ্চিত্ত করতে হল?” এ কথা বলে হাউ হাউ করে কাঁদতে শুরু করল ছেলেটা।

ঋতব্রত বাকরুদ্ধ, বিস্মিত-স্তম্ভিত তার কথা শুনে। নিশ্চুপভাবে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি। মিনিট দু-তিনের মধ্যে অবশ্য সংবিৎ ফিরে পেল ছেলেটা। চোখের জল মুছে ছেলেটা বলল, “সরি স্যার। আসলে বাবার এভাবে চলে যাওয়াটা কিছুতেই মানতে পারছি না। আমাকে কী করতে হবে বলুন?”

প্রাথমিক বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে উঠে ঋতব্রত তার উদ্দেশে বললেন, “তোমাকে আজ কিছুই করতে হবে না। অ্যাটেন্ডেন্সে সই করে বাড়ি চলে যাও। ভয় নেই, তোমার চাকরি যাবে না। আর হ্যাঁ, তোমার বেতনের থেকে কিছু অগ্রিমও তোমাকে দেবার ব্যবস্থা করছি। শ্রাদ্ধ-শান্তির কাজ মিটলে তারপর এসো।”

ঋতব্রত এরপর ম্যানেজার সাহেবকে ডেকে সবকিছুর বন্দোবস্ত করার নির্দেশ দিয়ে ছেলেটাকে পাঠিয়ে দিলেন তাঁর সঙ্গে।

শূন্য ঘর। ঋতব্রত একলা বসে। পুরো ব্যাপারটাতে বিস্ময়ের সীমা নেই তাঁর। তবে সেই ঝড়-বাদলের বিকেলে কে এসেছিলেন তাঁর কাছে? ঋতব্রতর কানে যেন ভেসে উঠল কালীকিঙ্করের বলা কথাটা, ‘তোমাকে আমি একটা জিনিস উপহার দেব। হয়তো সেটা আমার পাপক্ষালনও বলতে পারো।”

মুহূর্তের জন্য ঋতব্রতর চোখের সামনে যেন ফুটে উঠল সেই দৃশ্যও—বিদ্যুৎ চমকের আলোতে কালীকিঙ্করের বাঁ চোখে লাগানো একটা স্টিকিং প্লাস্টার !

ডান চোখ বুজে বাঁ চোখটা একবার পরীক্ষা করলেন ঋতব্রত। না, বিন্দুমাত্র ঝাপসা ভাব নেই সে চোখে। সবকিছু স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন তিনি। ঝড়-জলের বিকেলে তাঁর সঙ্গে ঠিক কে দেখা করতে এসেছিলেন সেটাও এখন মোটামুটি স্পষ্ট ঋতব্রতর কাছে। কালীকিঙ্করের সেই বিদেহী আত্মার প্রতি মনে মনে প্রণাম জানিয়ে ঋতব্রত বললেন, “ক্ষমা করবেন মাস্টারমশাই।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *