আবলুশ কাঠের নৌকা
১
বাড়িটা একদম নদীর গায়েই। বিশাল জীর্ণ বাড়িটার থেকে থাক থাক সিঁড়ি নেমে গেছে নদীর বুকে। যদিও এই প্রাচীন জমিদারবাড়ির স্থানে স্থানে পলেস্তারা খসে গিয়ে যেমন ইট বেরিয়ে পড়েছে, এ সিঁড়িটাও তার ব্যতিক্রম নয়। সিঁড়ির একপাশের রেলিং ধসে গিয়ে তার ভিতর থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে একটা নধরকান্তি বটবৃক্ষ। তার ডালপালা সোপানশ্রেণির এক অংশের মাথায় চাঁদোয়ার সৃষ্টি করেছে। সেই সিঁড়িতেই দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন ইন্দ্র লাহিড়ী আর এই প্রাচীন জমিদারবাড়ির উত্তরাধিকারী সত্রাজিৎ মজুমদার। সত্রাজিতের বয়স ইন্দ্রবাবুর অর্ধেক হবে। মানে, এই পঁচিশমতো বয়স হবে তার। সদ্য স্কুল মাস্টারের চাকরিতে ঢুকেছে সে। ইন্দ্রবাবুর লেখার একনিষ্ঠ ভক্ত পাঠক সে। তারই আমন্ত্রণে ইন্দ্রবাবুর মুর্শিদাবাদ জেলার এ বাড়িতে পদার্পণ। আসলে কিছুদিন ধরে ইন্দ্রবাবুর “রাইটার’স ব্লক’ চলছে। অর্থাৎ লেখার জন্য মাথায় কোনো প্লট আসছে না। লেখকদের মাঝে মাঝে এমন হয়, আবার কোথাও থেকে একটু বেরিয়ে-টেরিয়ে এলে অর্থাৎ একটু মুক্ত পরিবেশে ছুটি কাটিয়ে এলে তা কেটেও যায়। তাই সত্রাজিৎ যখন তাকে এ বাড়িতে থাকার আমন্ত্রণ জানাল, তখনই এ বাড়িতে আসবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন ইন্দ্রবাবু। আর সেইমতো তিন দিনের মধ্যেই তিনি আজ এখানে কলকাতা থেকে চলে এলেন। একটু আগেই তিনি সত্রাজিতের বাইকের পেছনে চেপে এ বাড়িতে এসে পৌঁছেছেন। তারপর নির্দিষ্ট ঘরে জিনিসপত্র রাখার পর শেষ বিকালের আলোতে ঘাটে এসে দাঁড়িয়ে বাক্যালাপ করছেন। সত্রাজিৎ তাকে বলল, “এ বাড়িতে এখন আর ইলেকট্রিসিটির লাইন নেই। আপনার ঘরের লণ্ঠনে তেল ভরা আছে, কয়েকটা বড় মোমবাতিও আছে। আপনার কোনো অসুবিধা হবে না তো স্যার? আপনি চাইলে আমার বর্তমানে বাসস্থানে গিয়ে থাকতে পারেন।”
ইন্দ্রবাবু হেসে বললেন, “না, কোনো অসুবিধা হবে না। এ বাড়ি যখন বানানো হয়েছিল, তখন সে যুগে তো আর ইলেকট্রিসিটি ছিল না। তখনকার মানুষরাও নিশ্চয়ই প্রদীপ বা তেলের আলোতেই রাত কাটাতেন। তবে আমি রাত কাটাতে পারব না কেন?”
ইন্দ্রবাবুর কথা শুনে সত্রাজিৎ হেসে বলল, “তা বটে। এই বাড়ি তৈরি হয়েছিল আলিবর্দি খাঁ-র আমলে। অর্থাৎ আড়াইশো বছরেরও বেশি সময় আগে। তখন তো ইলেকট্রিসিটির ব্যাপারটা কল্পনাই করা যেত না। একটু পরই দেখবেন, ভাগীরথীর বুক থেকে বাতাস ঢুকতে শুরু করেছে বাড়ির ভেতর। সেজন্য গরমকালেও বাড়ির এদিককার ঘরগুলোতে ফ্যানের দরকার হয় না। জানালা খোলা থাকলে হু হু করে বাতাস ঢোকে ঘরে।”
ইন্দ্রবাবু জানতে চাইলেন, “পুরোনো আমলের, অর্থাৎ সেই আলিবর্দি-সিরাজের যুগের কোনো জিনিস আছে না কি এ বাড়িতে?”
সত্রাজিৎ বলল, “সামান্য কিছু জিনিস আছে একটা ঘরে। তার মধ্যে একটা মজার জিনিসও আছে। কাল সকালে যখন আপনার জন্য চা নিয়ে আসব, তখন সে ঘর খুলে জিনিসটা আপনাকে দেখাব।”
সূর্য ডুবতে শুরু করেছে ভাগীরথীর বুকে। দিনের শেষ আলো ছড়িয়ে পড়েছে নদীর ওপারেও। গাছপালার আড়াল থেকে ওপারে দু-একটা ঘরবাড়ির অস্পষ্ট অবয়ব চোখে পড়ছে। সেদিকটা দেখিয়ে ইন্দ্রবাবু জানতে চাইলেন, “ওপারে কোন জায়গা?”
সত্রাজিৎ বলল, “ওটাই তো মুর্শিদাবাদ। একদা আলিবর্দির রাজধানী। আপনি তো দু-দিন থাকবেন এখানে। সব আপনাকে ঘুরিয়ে দেখাব। নৌকা বলে রেখেছি। ওপারে নিয়ে যাবে। আপনি তো ইতিহাস নিয়ে গল্প-উপন্যাস লেখেন, আপনার ভালো লাগবে।”
ইন্দ্র বললেন, “যদিও আমি অন্য পথে একবার মুর্শিদাবাদ বেড়াতে এসেছিলাম। তবুও আবার যাব তোমার সঙ্গে। এসব জায়গা কোনোদিন পুরোনো হয় না। হয়তো নতুন কোনো গল্পের প্লট পেয়ে গেলাম।”
এ কথা বলে তিনি জানতে চাইলেন, “তোমার পূর্বপুরুষরা কীভাবে এই জমিদারি লাভ করেছিলেন তা জানো?”
সত্রাজিৎ জবাব দিল, “আমাদের বংশপরম্পরায় যে কাহিনি প্রচলিত হয়ে আসছে তা হল, যিনি এই বাড়ির পত্তন করেন, এই জমিদারির প্রথম পুরুষ শিবকালী রায় নাকি প্রথম জীবনে বস্ত্র ব্যবসায়ী ছিলেন। বর্গি হানার সময় না কি তিনি একবার বর্গিদের হাত থেকে অরক্ষিত মুর্শিদাবাদকে রক্ষা করেছিলেন। তাই নবাব খুশি হয়ে তাঁকে জমিদারি প্রদান করেন। বীরপুরুষ ছিলেন শিবকালী। তবে তিনি কীভাবে বর্গিদের পরাস্ত করেছিলেন তা আজ আর জানা যায় না৷”
এরপর ঘাটে দাঁড়িয়ে আর কিছুক্ষণ কথা বলার পর সত্রাজিৎ বলল, “এবার আমাকে ফিরতে হবে, স্যার। কাল সকালে ঠিক হাজির হয়ে যাব।”
এ কথা শোনার পর ইন্দ্র লাহিড়ী তার তাকে আটকে রাখলেন না। ইন্দ্রবাবুকে ভাগীরথীর গায়ে আড়াইশো বছরের সেই প্রাচীন বাড়িতে একলা রেখে সত্রাজিৎ বাইক চেপে রওনা হয়ে গেল তাদের বর্তমান বাসস্থানে ফেরার জন্য। আর এরপরই ঝুপ করে অন্ধকার নামল ভাগীরথীর তীরে।
২
সত্রাজিৎ চলে যাবার পর নিজের ঘরে ঢুকে লণ্ঠন জ্বালালেন ইন্দ্রবাবু। বেশ লেগেছে তাঁর নদীর ধারে এই নির্জন বাড়িটা। মনকে বিশ্রাম দেবার পক্ষে আদর্শ জায়গা। তার ওপর ইন্দ্রবাবু ইতিহাস আশ্রিত গল্প-কাহিনি লেখেন বলে বাংলার ইতিহাসের পীঠস্থানে অবস্থিত এই প্রাচীন বাড়িটা আরও বেশি পছন্দ হয়েছে তাঁর। হয়তো-বা এই বাড়ির আনাচকানাচেও কোনো অজানা ইতিহাস লুকিয়ে আছে। বিশেষত যখন এ বাড়ির মালিক বর্গি দমন করেছিলেন, তখন তা থাকাই স্বাভাবিক। ইন্দ্রবাবু ভাবলেন, পরদিন দিনের আলোতে ভালো করে ঘুরে দেখবেন বাড়িটা। চেষ্টা করবেন এ জায়গা সম্পর্কে খোঁজখবর নেবার। সত্রাজিৎ এ ঘরে তাঁর রাত্রিবাসের জন্য খাট-বিছানার ব্যবস্থা করে গেছে। সময় কাটাবার জন্য ইন্দ্রবাবু লণ্ঠনটা খাটে তুলে, সঙ্গে আনা একটা বই নিয়ে পড়তে বসলেন।
বইটা পড়া যখন শেষ হল, তখন রাত ন-টা বেজে গেছে। স্টেশন থেকে আসার পথে একটা হোটেল থেকে সত্রাজিৎ অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলের মোড়কে ইন্দ্রবাবুর জন্য রাতের খাবার তুলে এনেছিল। বই পড়ার পর খাট থেকে নেমে ইন্দ্রবাবু রাতের খাওয়া সেরে জলের বোতল হাতে নিয়ে যখন জানালার পাশে মুখ ধুতে গেলেন, তখন তাঁর চোখ গেল বাইরে। আকাশে বেশ বড় চাঁদ উঠেছে। বাইরে জ্যোৎস্নাবিধৌত চরাচর। তিনি যে ঘরে আছেন, সেখান থেকে কিছুটা তফাতেই ঘাটটা দেখা যাচ্ছে। চাঁদের আলোতে থাক থাক সিঁড়ি নেমে গেছে জলের বুকে। ইন্দ্রবাবুর রাত এগারোটার আগে ঘুম আসে না। তাই সেই নিঃসঙ্গ সোপানশ্রেণির দিকে তাকিয়ে ইন্দ্রবাবুর মনে হল, যতক্ষণ না ঘুম পায়, ততক্ষণ এই সিঁড়িতে গিয়ে বসা যাক।
ভাবনামতোই এরপর ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়লেন ইন্দ্রবাবু। পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে ঘাটের কয়েকটা সিঁড়ি নীচে নেমে মাঝামাঝি এক জায়গায় বসলেন। তাঁর সামনেই চন্দ্রালোকে উন্মুক্ত ভাগীরতীর জলপ্রবাহ। বেশ ঠান্ডা বাতাস উঠে আসছে নদী থেকে। ওপারে ঘুমন্ত মুর্শিদাবাদ।
আড়াইশো বছরের প্রাচীন জমিদারবাড়ি সংলগ্ন নদীর ঘাটে বসে সামনের ভাগীরথী নদী আর ওপারের ঘুমন্ত নগরীর দিকে তাকিয়ে ইন্দ্রবাবু নানা কথা ভাবতে লাগলেন। মুর্শিদাবাদ নামটা শুনলেই বুকের মধ্যে কেমন রোমাঞ্চ জাগে! মুর্শিদকুলি, আলিবর্দি, সিরাজ, মিরজাফর, কত নাম জড়িয়ে ওই নগরীর সঙ্গে! কত ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী ওই মুর্শিদাবাদ নগরী আর এই ভাগীরথী নদী! একসময় এই ভাগীরথীতেই সিরাজের বজরা ভাসত, আবার তাঁর পতনের পর পলাশি লুণ্ঠন করে লক্ষ লক্ষ টাকার সম্পদ নিয়ে এই নদীবক্ষ দিয়েই কলকাতার দিকে যাত্রা করেছিলেন লর্ড ক্লাইভ। ইংরেজদের হাতে বাংলার স্বাধীনতা সূর্য অস্ত গিয়েছিল এই ভাগীরথীর বুকে। কত ঘটনা, কত ইতিহাস জমা হয়ে আছে এই নদীবক্ষে।
বেশ কিছু সময় কেটে গেল। এসব নানা ঐতিহাসিক ঘটনার কথাই ভাবছিলেন ইন্দ্রবাবু। হঠাৎ একটা কণ্ঠস্বর তাঁর কানে এল, “এ জায়গা আপনার কেমন লাগছে?” হঠাৎ কণ্ঠস্বরটা শুনে মৃদু চমকে উঠে পাশ ফিরে তাকাতেই ইন্দ্রবাবু দেখতে পেলেন একজনকে। তাঁর কিছুটা তফাতে যেদিকটায় সিঁড়ির ওপর বট গাছের ছায়া এসে পড়েছে, সেই আলো-আঁধারিতে এসে বসেছে একজন লোক। তার পরনে লুঙ্গি আর ফতুয়ার মতো একটা জামা, বুক পর্যন্ত নেমে-আসা কালো দাড়ি, মাথায় একটা সাদা টুপি, খালি পা। ইন্দ্রবাবুর লোকটাকে দেখে মাঝবয়সি মুসলমান সমাজের মানুষ বলেই মনে হল। তবে তাকে দেখে কোনো আপত্তিকর লোক মনে হয় না। লোকটা আবারও তাঁকে প্রশ্ন করল, “কেমন লাগছে এ জায়গা?”
ইন্দ্রবাবু হেসে বললেন, “বেশ লাগছে চাঁদনি রাতে বাতাসের মধ্যে নদীর পাড়ে বসে থাকতে। খুব সুন্দর জায়গা। আপনি কি এখানেই থাকেন?”
ইন্দ্রবাবুর কথা শুনে লোকটার ঠোটে যেন হাসি ফুটে উঠল। যেন সে খুশি হল তার জবাব শুনে। সে বলল, “হ্যাঁ, এখানেই থাকি। এ বাড়িতেই।”
লোকটাও এ বাড়িতেই থাকে শুনে ইন্দ্রবাবু বললেন, “যদিও এ বাড়িটা আমার এখনও ঘুরে দেখা হয়নি, তবুও যতটুকু দেখলাম, তাতে এই জমিদারবাড়িটা আমার বেশ লাগছে। শুনলাম, এ বাড়ির মালিক না কি বর্গি দমন করে আলিবর্দির কাছ থেকে জমিদারি লাভ করেছিলেন। খুব সাহসী পুরুষ ছিলেন জমিদার শিবকালী। কত ইতিহাস জড়িয়ে আছে এই জমিদারবাড়ির সঙ্গে। আমি আবার ইতিহাস নিয়ে গল্প লিখি। সেজন্য আমার আরও ভালো লাগছে এ জায়গা।”
ইন্দ্রবাবুর কথা শুনে লোকটা একটু চুপ করে থেকে বলল, “শিবকালী সাহসী পুরুষ ছিলেন তা আপনাকে কে বলল? বই লিখলে এ কথা আপনি লিখবেন না কি?”
ইন্দ্রবাবু জবাব দিলেন, “এ কথা আমি এ বাড়ির বর্তমান উত্তরাধিকারী সত্রাজিতের মুখ থেকে শুনলাম। তার আমন্ত্রণেই আমি এখানে এসেছি। এ বাড়ি নিয়ে আমি যদি কোনোদিন লিখি, তবে নিশ্চয়ই লিখব যে এ বাড়ির প্রথম পুরুষ শিবকালী একজন বীরপুরুষ ছিলেন, তিনি বর্গি দমন করেছিলেন। মুর্শিদাবাদকে বর্গি হানা থেকে রক্ষা করেছিলেন।”
লোকটা এবার ইন্দ্রবাবুর কথা শুনে তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে বলল, “সত্রাজিৎ তো সেদিনের ছেলে, শুধু সে কেন, তার বাপ-ঠাকুরদাই-বা কতটুকু জানে? আর যদি তারা জানতও যে তার সেই পূর্বপুরুষ একজন ভিতু মানুষ ছিলেন তাহলেও কি তারা সে কথা বলতে পারত? জমিদার বংশের উত্তরপুরুষের কাজই হল পূর্বপুরুষদের বীরত্বের কথা বলা। তা সত্যিই হোক বা মিথ্যাই হোক। এক্ষেত্রেও ব্যাপারটা তেমনই৷”
লোকটার কথা শুনে ইন্দ্রবাবু বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন, “তবে কি শিবকালী বর্গিদের পরাস্ত করেননি? আলিবর্দির থেকে সেজন্য জমিদারি পাননি তিনি? তিনি সাহসী ছিলেন না?”
লোকটা বলল, “আলিবর্দি তাঁকে মুর্শিদাবাদ রক্ষা করার জন্য জমিদারি দিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু তিনি মোটেই সাহসী পুরুষ ছিলেন না।”
ইন্দ্রবাবু আবারও বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন, “তাহলে তিনি বর্গিদের রুখলেন কীভাবে? আপনার কথা যেন কেমন গোলমেলে লাগছে!”
লোকটা বলল, “হ্যাঁ, গোলমেলে লাগারই কথা। আসল ব্যাপারটা যে শিবকালী সবার কাছে চেপে গিয়েছিলেন। নইলে যে তাঁর জমিদারি পাওয়া হত না। তবে সেই আসল কারণটা যদি আপনি জানতে চান, তবে আমি তা আপনাকে শোনাতে পারি। শুনবেন?”
লোকটার কথা শুনে ইন্দ্রবাবু উৎসাহভরে বললেন, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, শোনান!”
পায়ের নীচে ছলছল করছে ভাগীরথীর জল। সেদিকে তাকিয়ে একটু চুপ করে থেকে লোকটা বলতে শুরু করল তার কথা।
৩
“আমার এ গল্প বড় নয়, সেটাই বলা যেতে পারে। তবে শিবকালীর জমিদারিলাভের আসল কারণ রয়েছে আমার এই গল্পে। সত্যি ঘটনা। অনেকদিন ধরে কাউকে বলব ভাবছিলাম। কিন্তু বলা হয়নি। আজ আপনাকে বলছি—শিবকালীর জমিদারপ্রাপ্তি যে সময়ের ঘটনা, সেটা সত্যি সত্যিই নবাবি আমল। গিরিয়ার যুদ্ধে সরফরাজ খানকে পরাজিত ও নিহত করে কিছুদিন আগেই বাংলার সিংহাসনে আরোহণ করেছেন নবাব সিরাজের দাদু আলিবর্দি খাঁ। তবে নবাব হয়েও তিনি শান্তিতে সিংহাসনে বসতে পারছেন না। প্রায়শই তাঁকে নানা ছোটখাটো বিদ্রোহ দমন করার জন্য ছুটে যেতে হচ্ছে বাংলা-বিহার-ওড়িশার নানা প্রান্তে। শিবকালীর ব্যবসাবুদ্ধি ছিল প্রখর। তাই তাঁর ব্যবসা ফুলেফেঁপে উঠতে লেগেছিল। ওই যে নদীর ঘাট দেখছেন, এর চারপাশে লাগানো থাকত রেশমবস্ত্রের নৌকা। জলপথই তখন ছিল পণ্য পরিবহনের প্রধান মাধ্যম। এখানে তাঁর নৌকাও বানাতেন শিবকালী। একসময় শিবকালী ঠিক করলেন, এখানে তাঁর নতুন বসতবাটী বানাবেন। তাতে তাঁর কাজকর্মের সুবিধা হবে। শুরু হল এই বাড়ি তৈরির কাজ। রাজমিস্ত্রি, কামার, ছুতোর এসে এখানে বাড়ি তৈরির কাজে যোগ দিল। কিছুদিনের মধ্যে গড়ে উঠল বাড়ি। তবে প্রথমের সেই বাড়ি অবশ্য আজকের মতো এত বড় ছিল না। জমিদারিলাভের পর শিবকালী এ বাড়ির কলেবর বৃদ্ধি করেন। যা-ই হোক, এ বাড়ি মোটামুটি তৈরি হবার পর শিবকালী তাঁর পরিবার নিয়ে মুর্শিদাবাদ ছেড়ে এখানে এসে উঠলেন। ভালোই চলতে লাগল তাঁর কারবার।
তবে কোথায় যে কখন দুর্যোগ নেমে আসে তা কেউ বলতে পারে না। বাংলার বুকেও একসময় তেমনই দুর্যোগ নেমে এল। মারাঠা সেনাপতি ভাস্কর পণ্ডিতের নেতৃত্বে শুরু হল বর্গি হানা। ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে দ্রুতগামী অশ্বের পিঠে চেপে বর্গিরা হানা দিতে লাগল বাংলার গ্রামে গ্রামে। শুধু লুঠতরাজই নয়, নৃশংস বর্গিরা খুন করতে লাগল নিরীহ মানুষদের। জ্বালিয়ে দিতে লাগল গ্রামের পর গ্রাম।”
এ কথা বলে একটু থামল লোকটা। তারপর আবার শুরু করল
“তখন বর্ষাকাল। নবাব কিছুদিন আগেই মুর্শিদাবাদ ত্যাগ করে কী একটা কাজে বিহারের পূর্ণিয়াতে গেছেন তাঁর সেনাদের নিয়ে। ঠিক তখনই একদিন তিরিশজন অশ্বারোহীর এক বর্গি বাহিনী এসে উপস্থিত হল এ তল্লাটে। তিরিশজন হলেও তারা তিনশো সৈন্যের মোকাবিলা করার ক্ষমতা রাখে। তাদের দলপতির নাম গণপতি রাও। নৃশংস ব্যক্তি সে। বহু মানুষকে হত্যা করে, বহু গ্রাম জ্বালিয়ে সে নদীর তীরে এসে তাঁবু ফেলল। তার লক্ষ্য হল নদীর অপর তীরে অবস্থিত মুর্শিদাবাদ।
তার আগমনবার্তা শুনেই হাত-পা কাঁপতে শুরু করল শিবকালীর। বর্গি সর্দার গণেশ রাওয়ের কাছে তখন মুর্শিদাবাদ লুণ্ঠনের ক্ষেত্রে একমাত্র বাধা এই ভাগীরথী নদী। এ নদী পেরোতে পারলেই সে কেল্লা ফতে করতে পারবে। ধূর্ত বর্গি সর্দার তাই প্রথমে শিবকালীর বাড়ি আক্রমণ না করে তার কাছে খবর পাঠাল যে শিবকালী যদি তাকে তিরিশজন অশ্বারোহী নিয়ে নদী পেরোতে পারে এমন একটা নৌকার ব্যবস্থা করে দেয়, তবে সে রক্ষা পাবে বর্গি হানা থেকে। নচেৎ বর্গিরা শিবকালীর ঘরবাড়ি নৌকা সব জ্বালিয়ে দিয়ে হত্যা করবে সবাইকে। তিরিশজন অশ্বারোহী নিয়ে নদী পেরোবার মতো বড়ো নৌকা শিবকালীর আছে ঠিকই, কিন্তু তা দিলে শিবকালীর মাথায় ভবিষ্যতে অন্য বিপদ নেমে আসার সম্ভাবনাও প্রবল। কারণ, আলিবর্দি ফিরে এসে যখন জানতে পারবেন যে শিবকালী বর্গিদের নৌকা সরবরাহ করেছেন, তখন তিনি নিশ্চয়ই শিবকালীর গর্দান নেবেন। তাই কী করবেন তা বুঝে উঠতে না পেরে প্রচণ্ড আতঙ্কিত, কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লেন। তাঁর এই বাড়িতে তখন চাকরবাকর, লোকলশকর নিয়ে সমর্থ পুরুষের সংখ্যা প্রায় পঞ্চাশজন হবে। তাদের অনেকে প্রস্তাব দিল বর্গিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য। কারণ, কয়েকটা গাদাবন্দুক ছিল এ বাড়িতে। কিন্তু ভীরু শিবকালী সে প্রস্তাবে রাজি হল না।
শিবকালী যখন নাওয়া-খাওয়া বন্ধ করে প্রায় খাবি খেতে শুরু করেছেন, ঠিক সেই সময় তাঁর কাছে উপস্থিত হল একজন। লোকটা একজন মুসলমান ছুতোর। কাঠের কাজ করে। সম্প্রতি দক্ষিণ ভারত থেকে কিছু কাঠ আনানো হয়েছে এ বাড়ির আসবাবপত্র বানাবার জন্য, লোকটা সেই কাঠের কাজই করে।
মালিকের কষ্ট দেখে লোকটা শিবকালীকে বলল, “সে হয়তো তাঁকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে। শিবকালী তখন খড়কুটো আঁকড়ে ধরে বাঁচার পথ খুঁজছেন। তাই তিনি জানতে চাইলেন কীভাবে তা সম্ভব?”
প্রশ্নের জবাবে সেই ছুতোর শিবকালীর কানে কানে যা বলল, তাতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল শিবকালীর মুখ। শিবকালী এরপর বর্গি সর্দারের কাছে খবর পাঠলেন যে তিনি নৌকা দেবেন, কিন্তু জলে ভাসানোর আগে নৌকা মেরামতির জন্য দুটো দিন সময় দিতে হবে। দু-দিন পর সস্তায় তিনি নৌকা তুলে দেবেন তাদের হাতে। গণেশ রাও সম্মত এই প্রস্তাবে। পরদিন থেকে নতুন কাঠ দিয়ে একটা বড় নৌকা মেরামতির কাজে লেগে গেল সেই ছুতোর।”
একটানা কথা বলে থামল লোকটা। মন দিয়ে লোকটার কথা শুনছিলেন ইন্দ্রবাবু। সে থামতেই তিনি ব্যগ্রভাবে বলে উঠলেন, “তারপর? তারপর কী হল?”
লোকটা তা দেখে হেসে বলল, “এ গল্পের খুব বেশি আর বাকি নেই, শুনুন তবে। যেদিন সন্ধ্যায় নৌকা বর্গিদের হাতে তুলে দেবার কথা, সেদিন দুপুরেই একদল বর্গি সেখানে হাজির হয়ে গেল। নৌকাটা ডাঙায় তোলা ছিল। ছুতোরের কাজ শেষ হবার পর তারা নৌকার ওপর-নীচে ভালো করে জল ঢেলে পরীক্ষা করে নিল, নৌকার কোথাও কোনো ছিদ্র আছে কি না। না, কোনো ছিদ্র পাওয়া গেল না। নিশ্চিন্ত হল তারা। নৌকা তুলে দেওয়া হল তাদের হাতে। সূর্য ডোবার পর আবার যখন চাঁদ উঠল, তখন গণেশ রাওসহ পুরো দলটাই হাজির হল ওখানে। নৌকাটাকে প্রথমে ঠেলে জলে নামিয়ে ঘোড়াসহ নৌকাতে বর্গিরা উঠে বসল। বর্ষার ভরা ভাগীরথী। কাছি কেটে দিতেই তা স্রোতের টানে মাঝনদীতে গিয়ে পড়ল। তারপর যা ঘটার তা-ই ঘটল। ছাদে দাঁড়িয়ে ভীরু শিবকালী দেখলেন, মাঝনদীতে পৌঁছেই হঠাৎই ঘোড়া সমেত বর্গিদের নিয়ে ভুস করে ডুবে গেল নৌকা! প্রাণরক্ষা হল না একজন বর্গিরও। সেবারের মতো রক্ষা পেল মুর্শিদাবাদ। সবাই জানল, বর্গিদের জলে ডুবিয়ে মেরে বাংলার রাজধানী রক্ষা করেছেন ‘বীরপুরুষ’ শিবকালী! নবাব আলিবর্দি ফিরে এসে এ কাজের জন্য তাঁকে জমিদার খেতাব দিলেন।
লোকটার কথা শুনে ইন্দ্রবাবু জানতে চাইলেন, “নৌকাটা ওই ছুতোর মিস্ত্রি কী কৌশলে ডুবিয়েছিল। নৌকাতে তো কোনো ছিদ্র ছিল না।”
লোকটা জবাব দিল, “আবলুশ কাঠ।”
ইন্দ্রবাবু বললেন, “তার মানে?”
সে জবাব দিল, “ওই যে, সে সময় দক্ষিণ ভারত থেকে এখানে আবলুশ কাঠ আনানো হয়েছিল আসবাবপত্র বানানোর জন্য। নৌকা সারাবার ছলে ছুতোর মিস্ত্রি সেই নৌকার কিছু শিমুল কাঠ খুলে তার পরিবর্তে সেখানে বসিয়ে দিয়েছিল কিছু আবলুশ কাঠ। তাই স্রোতের টানে মাঝনদীতে পৌঁছে গিয়ে ভুস করে ডুবে গেল নৌকা। কারণ, আবলুশ কাঠই একমাত্র কাঠ, যে জলে ভাসে না। বরং জলে পড়লে সিসের মতো ভারী হয়ে যায়। এ ব্যাপারটা জানা ছিল সেই ছুতোর মিস্ত্রির, আর তা দিয়েই সে কার্যসিদ্ধি করেছিল।”
ইন্দ্রবাবু কথাটা শুনে অবাক হয়ে গেলেন। তিনি বললেন, “বাঃ, দারুণ কাহিনি তো! সেই ছুতোর মিস্ত্রির তারপর কী হল?”
এ প্রশ্ন শুনে লোকটা মৃদু চুপ করে থেকে উত্তর দিল, “বর্গিরা যখন নৌকা নিয়ে জলে নামল, তখন তাকেও দড়ি বেঁধে নৌকাতে তুলে নিয়েছিল, পাছে ফেরার সময় যদি নৌকা মেরামতির প্রয়োজন হয়, সেজন্য। বর্গিদের সঙ্গে সে-ও ডুবে গিয়েছিল ভাগীরথীর জলে। শিবকালী কাউকে জানাননি তার কথা। ভাগীরথীর অন্ধকারে চিরদিনের মতো হারিয়ে গেল সে।” এ কথা বিষণ্ণভাবে বলে লোকটা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “এবার আমি যাই। এ জায়গা নিয়ে গল্প লিখলে ওই ছুতোর মিস্ত্রির কথাটা লিখবেন।”
অদ্ভুত কাহিনি শেষ করে লোকটা পা বাড়াল সিঁড়ি থেকে ওপরে ওঠার জন্য৷ প্ৰাথমিক বিস্ময়ের রেশ কাটিয়ে উঠে ইন্দ্রবাবু লোকটার কাছে জানতে চাইল, “আপনার নামটা?”
মুহুর্তের জন্য লোকটা থেমে জবাব দিল, “আমার নাম আবদুল।”
আর এরপরই যেন নিমেষে অদৃশ্য হয়ে গেল আবদুল নামের লোকটা। ইন্দ্রবাবু এরপর ঘাট থেকে ঘরে ফিরে এসে এই বিচিত্র কাহিনির কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লেন।
৪
ইন্দ্রবাবুর বেশ ভালোই ঘুম হল। ভোরবেলা ঘুম ভাঙার পরই গত রাতের সেই লোকটা আর তাঁর কাহিনির কথা মনে পড়ে গেল। ঘরের জানালা দিয়ে ঘাট আর নদীটা দেখা যাচ্ছে। ভোরের নরম আলো ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে। ভারি সুন্দর লাগছে বাইরের পৃথিবীটা। কিছুক্ষণের মধ্যেই সত্রাজিৎ চা নিয়ে হাজির হল। চা-পান শেষ হবার পর সে বলল, “চলুন, আপনাকে যে পুরোনো দিনের জিনিস দেখাব বলেছি, সেটা দেখাই।”
ইন্দ্রবাবু ঘর ছেড়ে বেরিয়ে সত্রাজিতের পেছনে পেছন কাছেই একটা ঘরের সামনে উপস্থিত হলেন। তালা খুলে ইন্দ্রবাবুকে নিয়ে সে ঘরে প্রবেশ করে সত্রাজিৎ বলল, “এ ঘরে যা কিছু আছে তা সবই শিবকালীর আমলের। অর্থাৎ নবাবি আমলের।”
বেশ কিছু ঢাল, তলোয়ার ইত্যাদি রাখা আছে সে ঘরে। আর-একটা টেবিলের ওপর রাখা আছে দু-ফুট আকৃতির কাঠের তৈরি কালো রঙের একটা নৌকা। জিনিসটা যে খুব প্রাচীন তা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। নৌকাটা হাতে তুলে ইন্দ্রবাবু সেটা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখার পর সত্রাজিৎ নৌকাটা নিয়ে বলল, “কাঠের তৈরি এই নৌকাটার মধ্যে অদ্ভুত একটা মজার ব্যাপার আছে। ঘাটে চলুন, দেখাব।”
সে ঘর থেকে বেরিয়ে সত্রাজিতের পেছন পেছন সেই সোপানশ্রেণিতে এসে উপস্থিত হলেন। ওই তো বট গাছের ছায়ায় নীচের জায়গা, যেখানে বসে গত রাতে গল্প শোনাচ্ছিল সেই আবদুল।
সিঁড়ির শেষ ধাপে নেমে পড়লেন তাঁরা দুজন। ভোরের আলোতে ঝলমল করছে চারপাশ, নদীর ওপারে মুর্শিদাবাদ।
প্যান্টটা হাঁটু পর্যন্ত গুটিয়ে এরপর সত্রাজিৎ নৌকা হাতে জলে নেমে পড়ল। তারপর সে নৌকাটা জলে নামাতেই সেটা ডুবে গেল। যতবারই সে নৌকাটা তুলে নিয়ে জলে রাখল, ততবারই ডুবে গেল নৌকাটা!
কয়েকবার ব্যাপারটা ইন্দ্রবাবুকে দেখাবার পর সত্রাজিৎ নৌকাটা নিয়ে সিঁড়িতে উঠে ইন্দ্রবাবুকে বলল, “জমিদার শিবকালীর আমলে তৈরি এই কাঠের নৌকার অদ্ভুত ব্যাপারটা দেখলেন! কাঠের নৌকা হলেও জলে ভাসে না! আশ্চর্য ব্যাপার তা-ই না?”
ইন্দ্রবাবুর মনে পড়ে গেল আবদুল নামের লোকটার বলা গল্পের কথা। তিনি প্রশ্ন করলেন, “আবদুল কে?”
ইন্দ্রবাবুর কথা শুনে সত্রাজিৎ বিস্ময় প্রকাশ করে বলল, “আপনি ফারসি ভাষা ও জানেন দেখছি! হ্যাঁ, এই নৌকার গায়ে ফারসি ভাষায় আবদুল নাম লেখা আছে। সম্ভবত যে এই খেলনা নৌকাটা বানিয়েছিল, সেই ছুতোর মিস্ত্রি তার নাম খোদাই করেছিল নৌকার গায়ে।”
এ কথা বলে সত্রাজিৎ নৌকার গায়ে খোদাই-করা ফারসি ভাষাটা দেখাল।
ইন্দ্রবাবু ফারসি ভাষা পড়তে পারেন না। নৌকার গায়ে যে তা খোদাই করা আছে তা তিনি খেয়ালও করেননি। বিস্মিতভাবে তিনি চেয়ে রইলেন ফারসিতে খোদাই করা নামটার দিকে।
সত্রাজিৎ এরপর বলল, “নৌকাটা কী কাঠের তৈরি কে জানে!”
আবদুল ছুতোরের তৈরি সেই প্রাচীন নৌকাটার দিকে তাকিয়ে ইন্দ্রবাবু বিড়বিড় করে বললেন, “আবলুশ কাঠের নৌকা।”
