ভূতে বড় ভয় পাই – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

ভূতে বড় ভয় পাই

১

ভূতনাথবাবুর নামের মধ্যে ‘ভূত’ শব্দটা থাকলেও ভূত বা এ ধরনের কথাতে তিনি মোটেই বিশ্বাস করেন না। বরং এসব ব্যাপারে কেউ কিছু বললে তিনি যে তা শুধু ফুৎকারে উড়িয়ে দেন তাই-ই নয়, ভূতের ব্যাপারটা যে একটা সর্বৈব মিথ্যা ব্যাপার তা প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। তাই চ্যালেঞ্জটা শেষ পর্যন্ত সত্যিই নিয়ে নিলেন তিনি।

ভূতনাথবাবুর অফিস কলিগ বামাপদবাবু ক-দিন আগে অফিস ক্যান্টিনে আড্ডা মারতে মারতে বলেছিলেন যে, জলপাইগুড়িতে এক চা-বাগান এলাকায় তিস্তা নদীর পাড়ে ব্রিটিশ আমলের একটা বাংলো আছে। সেই বাংলোতে অনেকেই না কি ভূত দেখেছে। এমনকী বামাপদবাবুর নিজের শ্যালকও না কি সেখানে ভূত দেখেছে! ওই ভূতের জন্যই না কি মালিকরাও কিছুদিন রাখার পরই বাড়িটা বিক্রি করে দেন। একথা শুনে ভূতনাথবাবু সঙ্গে সঙ্গে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছিলেন, “ব্যাপারটা হতেই পারে না। যারা ভূত দেখেছে বলে দাবি করেছে তারা হয় ভুল দেখেছে, না হয় মিথ্যা বলেছে। আবার এমনও হতে পারে যে, কেউ সেখানে ভূত সেজে মানুষকে ভয় দেখায়। মোদ্দা কথা হল, ভূত বলে কিছু নেই, থাকতে পারে না।”

কিন্তু বামাপদবাবুর আবার ভূত-প্রেতে অগাধ বিশ্বাস। তিনিও এত সহজে নিজের বিশ্বাস থেকে সরে যাবার পাত্র নন। তাই তিনি ভূতনাথবাবুর কথা শুনে বলেছিলেন, “আপনি যখন বলছেন যে ভূত বলে কিছু নেই তখন একবার সেখানে গিয়ে একটা রাত থাকুনই না? দেখব আপনার কত সাহস? তখন আপনি বুঝতে পারবেন ভূত আছে কী নেই। আপনি যদি চ্যালেঞ্জটা নেন তবে আমি এখনই শালাকে ফোন করে সেখানে থাকার ব্যবস্থা করে দেব। বর্তমান মালিক বাড়িটা থাকার জন্য ভাড়াও দেন।”

ভূতনাথবাবু যদি বামাপদবাবুর এ কথার পরও তার চ্যালেঞ্জটা না নিতেন তবে অফিস কলিগরা ভাবতেই পারতেন যে, তিনি মুখে বড় বড় কথা বলেন। আসলে ভূতও আছে, আর ভূতনাথবাবুর ভূতের ভয়ও আছে। সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার জন্যই দুপুরবেলা খাওয়া সেরে, কোচবিহার থেকে নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করে জলপাইগুড়ির উদ্দেশে ভূতনাথবাবু রওনা হয়েছিলেন।

তিস্তা নদীর পাড়ে জলপাইগুড়ির সে অঞ্চলে পৌঁছোতে ভূতনাথবাবুর চার ঘণ্টার মতো সময় লাগল। জিপিএসের মাধ্যমে পথ চিনতে তার খুব একটা অসুবিধে হল না। বন্ধ চা-বাগানের পথ ধরে তিনি যখন সেই বাংলোর সামনে এসে উপস্থিত হলেন তখন বিকেল হয়ে গেছে। শীতের ছোট বেলা। চারপাশে আলো সরে আসতে শুরু করেছে। অন্ধকার না নামলেও আশপাশের ঝোপঝাড় থেকে ঝিঁঝির ডাক শুরু হয়েছে। জায়গাটা কিন্তু সত্যিই নির্জন। চা-বাগানের পিছন দিকে একাকী দাঁড়িয়ে আছে কাঠের তৈরি বাংলোটা। আর তার গায়েই তিস্তা নদীর উন্মুক্ত চর। বেলাশেষের আলোতে তার জল চিকচিক করছে। কোথাও কোনো লোকজনের শব্দ নেই। বাংলোর সামনেও কোনো লোকজন দেখা যাচ্ছে না। ভূতনাথবাবু গাড়িতে বসে হর্ন বাজাতে লাগলেন।

২

বারকয়েক হর্ন বাজতেই বাংলোর সামনের লম্বা বারান্দা সংলগ্ন ঘর থেকে একটা লোক বেরিয়ে এল। তারপর বারান্দা থেকে নেমে তাড়াতাড়ি এসে গাড়ির সামনে হাতজোড় করে দাঁড়াল। বেশ বয়স লোকটার। গায়ে চাদর মুড়ি দেওয়া, পায়ে সস্তা দামের চপ্পল। গাড়ি থেকে নেমে লোকটাকে ভালো করে দেখার পর ভূতনাথবাবু তাকে প্রশ্ন করলে, “তুমি কে?”

মুখে বলিরেখা আঁকা লোকটা জবাব দিল, “আমি রামপ্রসাদ। বাংলোর চৌকিদার।” বামাপদবাবুর শালা ইতিমধ্যেই এ বাংলোর বর্তমান মালিকের সঙ্গে কথা বলে রেখেছে ভূতনাথবাবুর রাত্রিবাস করার ব্যাপারে। ভূতনাথবাবু নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, “আমি বাংলোতে আজ রাতে থাকব।”

রামপ্রসাদ বলল, “জানি বাবু, মালিক খবর পাঠিয়েছেন। আসুন বাবু।”

গাড়ি থেকে ব্যাগটা নামিয়ে নিয়ে ভূতনাথবাবু লোকটার পিছন পিছন বাংলোর দিকে এগোতে এগোতে জানতে চাইলেন, “তুমি এখানে কত বছর আছ?”

রামপ্রসাদ জবাব দিল, “ছোটবেলা থেকে আমি এখানে কাজ করি। আমার বাড়ি কাছেই, চা-বাগানের কুলি লাইনের বস্তির ওখানে।”

লোকটার পিছন পিছন ভূতনাথবাবু উঠে এলেন রেলিং দেওয়া কাঠের বারান্দাতে। সেই বারান্দার গায়ে পরপর কয়েকটা ঘর। তারই একটা ঘরের দরজা খুলে ভূতনাথবাবুকে নিয়ে প্রবেশ করার পর কেয়ারটেকার রামপ্রসাদ বলল, “আপনি আসবেন বলে আমি ঘর পরিষ্কার করে রেখেছি, লণ্ঠনে তেলও ভরে রেখেছি। এখানে কিন্তু কারেন্ট নেই।”

ঘরটা ভালো করে দেখলেন তিনি। কাঠের মেঝে, দেওয়াল, এক পাশে একটা সিঙ্গল খাটে পরিষ্কার বিছানা-কম্বল রাখা আছে, একটা টেবিল আর দুটো চেয়ার আছে। আর কী চাই? মাত্র এক রাতের তো মামলা। ঘরে একটা জানলা আছে, তা দিয়ে পিছনের তিস্তা নদী দেখা যাচ্ছে। রাত্রিবাসের জন্য ঘরটা বেশ পছন্দসই হল ভূতনাথবাবুর। ঘরটা খোলার পর রামপ্রসাদ তাকে প্রশ্ন করল, “আপনি এখানে রাত্রে থাকতে পারবেন তো?”

প্রশ্ন শুনে ভূতনাথবাবু হেসে বললেন, “ঘরটা তো ভালোই। কেন বলো তো? ভূতের ভয়ে? শুনেছি এখানে নাকি ভূত আছে? ব্যাপারটা কি সত্যি?”

রামপ্রসাদ প্রশ্ন শুনে মাথা চুলকে বলল, “লোকে তো তাই বলে বহু যুগ আগে চা-বাগানের ম্যানেজার গোরা সাহেব নাকি নেশার ঘোরে পিস্তলের গুলি চালিয়ে এখানে আত্মহত্যা করেছিলেন। তাকে নাকি দেখা যায়। অনেকে দেখেছে।”

ভূতনাথবাবু লোকটার কথা শুনে প্রশ্ন করলেন, “তুমি তাকে দেখোনি? তুমি তো বহুকাল আছ।”

বুড়ো রামপ্রসাদ বলল, “না বাবু, আমি দেখিনি। আমি তো রাতে থাকি না এখানে।”

এ কথা বলার পর সে বলল, “আমি এখন যাই বাবু। সন্ধ্যা নামবে। কাল ভোরে আবার আসব।”

অনর্থক রামপ্রসাদকে আর আটকে রাখলেন না তিনি। সে চলে যাবার পর ভূতনাথবাবু ঘর সংলগ্ন বাথরুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে পোশাক পালটে, গায়ে শাল জড়িয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন।

দ্রুত সূর্য অস্ত যেতে চলেছে। আর তার সঙ্গে সঙ্গেই কেমন যেন একটা নিঝুম ভাব নামতে শুরু করেছে চারপাশে, চা-বাগানের দিক থেকে ভেসে আসা ঝিঁঝির ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই।

৩

পুরোনো বাংলোর কাঠের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে চারপাশে ধীরে ধীরে নেমে আসা সন্ধ্যা উপভোগ করছিলেন তিনি। ভূতে বিশ্বাস না করলেও এই জায়গাটা যে খুব নিঝুম তা মনে মনে স্বীকার করে নিলেন তিনি। হঠাৎ একটা কণ্ঠস্বর কানে এল, “ও মশাই, আপনি কে? কোথা থেকে এলেন?”

প্রশ্ন শুনে ভূতনাথবাবু ফিরে তাকিয়ে দেখলেন, তার ঘরের কয়েকটা ঘর তফাতে একটা ঘরের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এসেছেন একজন মাঝবয়সি লোক। তার পরনে ধুতি-পাঞ্জাবির ওপর একটা কোট, গলায় জড়ানো মাফলার। লোকটাকে দেখে নিরীহ ধরনের ভদ্রলোক বলেই মনে হয়। মৃদু বিস্মিতভাবে তিনি চেয়ে আছেন ভূতনাথবাবুর দিকে।

ভূতনাথবাবু বললেন, “আমার নাম ভূতনাথ মুখুজ্জে। এই একটু আগেই এসেছি কুচবিহার থেকে। আপনার পরিচয়?”

ভদ্রলোক কয়েক পা এগিয়ে এসে নমস্কার জানিয়ে বললেন, “নিখিল সাহা। শিলিগুড়িতে থাকি, কাঠের ব্যবসা। এখানে এসে উঠেছি। চারপাশটা কেমন নিঝুম হয়ে আসছে দেখছেন! আপনি কী করতে এসেছেন? চা-বাগানের কোনো কাজে?”

ভূতনাথবাবু সত্যি কথাই বললেন, “না ওসব কাজে নয়। আমি এখানে ভূত দেখতে এসেছি। শুনেছি এখানে নাকি এক সাহেব ভূত থাকে।”

কথাটা শোনা মাত্রই ভদ্রলোক বললেন, “সত্যি বলছেন নাকি?”

ভূতনাথবাবু হেসে বললেন, “হ্যাঁ সত্যি বলছি। লোকে বলে এখানে ভূত আছে। কেয়ারটেকার রামপ্রসাদও তাই বলল। যদিও ব্যাপারটা আমি বিশ্বাস করি না। তবে দেখা যাক, দেখা পাই কি না?”

ভদ্রলোকের মুখটা কেমন যেন পাংশু হয়ে এল। তিনি বললেন, “কিন্তু আমি তো ভূতে বড় ভয় পাই। এমনিতেই চারপাশটা কেমন যেন নিঝুম! তার ওপর বিজলিবাতি নেই। রামপ্রসাদও বলল ভূতের কথা? সে গেল কোথায়?”

ভূতনাথবাবু জবাব দিলেন, “হ্যাঁ, বলল। সে বাড়ি চলে গেল। কাল ভোরে আসবে।”

নিখিলবাবু বললেন, “সে কী। সে চলে গেল। তার মানে, এত বড় বাংলোতে আমরা দু’জন রাত কাটাব! আপনার নামটা যেন কী বললেন? আবার বলুন?”

তিনি জবাব দিলেন, “ভূতনাথ মুখুজ্জে।”

নিখিলবাবু বললেন, “ওরে বাবা! আপনার নামের মধ্যেও ভূত আছে দেখছি।”

ভদ্রলোকের এই ছেলেমানুষি কথা শুনে তিনি বললেন, “আমার নামের মধ্যে ভূত কথাটা থাকলেও আমি কিন্তু ভূত নই। ভূত বলে কিছু হয় না। আপনার ইচ্ছা হলে আপনি আমার কাছে এসে হাতে চিমটি কেটে দেখতে পারেন।”

ভদ্রলোক এবার সম্ভবত লজ্জা পেলেন ভূতনাথবাবুর কথা শুনে। তিনি বললেন, “না, তার দরকার নেই। তবে আমি এখন ঘরে যাই। চারপাশে অন্ধকার নামতে চলেছে।”

ভূতনাথবাবু মনে মনে হাসলেন ভদ্রলোকের আচরণ দেখে। কিছুক্ষণের মধ্যে সত্যিই অন্ধকার নেমে এল চারদিকে। ভূতনাথবাবু মনে মনে ঠিক করলেন সারারাত তিনি জেগেই কাটাবেন। অন্ধকার নামার পর তিনি আপাতত ঘরে ঢুকে লণ্ঠন জ্বালিয়ে দরজা বন্ধ করে একটা বই নিয়ে বসলেন।

চার

বাইরে ঝিঁঝিপোকার ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। গাঢ় অন্ধকার মুছে গিয়ে চাঁদ উঠতে শুরু করল একসময়। ভূতনাথবাবুর ঘরের খোলা জানলা দিয়ে ধীরে ধীরে চাঁদের আলোতে সেজে উঠেছে তিস্তার নির্জন চর। সত্যিই সেই চর সিনেমাতে যেসব ভূতুড়ে পরিবেশ দেখানো হয় তেমনই বলে মনে হল ভূতনাথবাবুর। সময় এগিয়ে চলল। তিনি ঠিক করে রেখেছেন সারারাত বাংলোর বারান্দাতে বসে কাটাবেন। এমনও তো হতে পারে যে, এখানে ভূত সেজে কেউ ভয় দেখায়? তাহলে লোকটাকে ধরার চেষ্টা করবেন তিনি। এইসব নানা কথা ভাবতে ভাবতে রাত দশটা পর্যন্ত শুয়েই কাটিয়ে দিলেন। লণ্ঠনের আলোটা এরপর নিভু নিভু হয়ে এল। ভূতনাথবাবু সঙ্গে খাবার এনেছিলেন। লণ্ঠনটা নিভে যাওয়ার আগে তা দিয়ে খাওয়া সেরে নিলেন তিনি। লণ্ঠনটা এরপর নিভে গেল। ভূতনাথবাবু ভালো করে টুপি-মাফলারে মুখ ঢেকে রাত্রি জাগরণের জন্য বাইরে বেরিয়ে এলেন।

প্রথমে বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন তিনি। আকাশে অর্ধেক চাঁদ। তার আলো খুব উজ্জ্বল নয়। রাত্রির সঙ্গে সঙ্গে কুয়াশাও নামতে শুরু করেছে। বাংলোর একদিকে তিস্তার নির্জন চর, অন্যদিকে বন্ধ চা-বাগান। দীর্ঘদিন পাতা কাটা বন্ধ থাকার কারণে তাদের অগোছালো লাগছে। আর তার মধ্যে মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা গুঁড়ি-ওয়ালা বড় বড় শাল ইত্যাদি গাছগুলোকে যেন ঠিক মানুষের মতো লাগছে। তারা যেন তাকিয়ে আছে ভূতনাথবাবুর দিকে। কিছুক্ষণ রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকার পর তিনি বারান্দা দিয়ে হাঁটতে শুরু করলেন। সার সার বেশ কয়েকটা ঘর বারান্দার গায়ে। পুরোনো কাঠের পাটাতনের ওপর ভূতনাথবাবুর পায়ের শব্দ উঠতে লাগল। কয়েকটা ঘর পেরিয়ে একটা ঘরের সামনে আসতেই হঠাৎ সে ঘরের ভেতর থেকে গলার শব্দ শোনা গেল—“কে? কে? কে হাঁটে?”

মৃদু ভয় যেন মিশে আছে সেই কণ্ঠস্বরে। সেই নিখিলবাবুর গলা। ভূতনাথবাবু জবাব দিলেন, “আমি ভূতনাথবাবু, হাঁটছি।”

তার জবাব শুনে ঘরের ভিতর থেকে তিনি বললেন, “ও আপনি! আমি ভয় পেয়ে গেছিলাম!”

ভূতনাথবাবু হেসে বললেন, “ভয় পাবার কারণ নেই। আমি ভূত নই।”

বেশ কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করার পর নিজের ঘরের সামনে রাখা বেতের চেয়ারে এসে বসলেন তিনি। বেড়ে চলল রাত।

এক সময় একটু ঝিমুনি এসে গেছিল তার। কিন্তু হঠাৎই একটা শব্দে তার আচ্ছন্ন ভাব কেটে গেল। তার মনে হল কোথাও যেন একটা বাচ্চা কেঁদে উঠল! ভূতনাথবাবু টর্চের আলো ফেললেন চারদিকে। কিন্তু কেউ কোথাও নেই। ঠিক এই সময় দড়াম করে শব্দ করে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এলেন সেই নিখিলবাবু। ভয়ার্ত স্বরে তিনি বললেন, “ও মশাই, শব্দটা শুনলেন? কার কান্নার শব্দ?”

ভূতনাথবাবু বললেন, “আমিও শুনলাম। তবে ঠিক বুঝতে পারলাম না।”

নিখিলবাবু বললেন, “নিশ্চয়ই ভূতের কান্না হবে! আমার ভয় লাগছে।”

ভূতনাথবাবু বললেন, “ভূত বলে কিছু নেই। কান্নার মতো লাগলেও অন্য কিছুর শব্দ হবে। আপনি ঘরে ঢুকে শুয়ে পড়ুন।”

নিখিলবাবু বললেন, “তাইতো ছিলাম। ঘরের লণ্ঠনটা হঠাৎ নিভে গেল! আর তারপরই চিৎকারটা শুনলাম! একলা এই বাংলোতে থাকলে হয়তো হার্টফেল করে ফেলতাম। কিন্তু অন্ধকার ঘরে আমি থাকব কীভাবে? ভূতে বড় ভয় পাই।”

ভূতনাথবাবু বললেন, “তাহলে আসুন, দুজনে বারান্দায় বসে গল্প করি?”

কথাটা শুনে নিখিলবাবু বললেন, “তারও যে উপায় নেই আমার। নিমোনিয়ার ধাত। এই ঠান্ডায় বারান্দাতে থাকলে আমি নিজেই সকালে ভূত হয়ে যাব।”

তারপর বললেন, “তার চেয়ে চলুন না আমার ঘরে গিয়ে বসবেন? সত্যি বলছি, আমার বড় ভয় করছে।”

ভদ্রলোকের গলায় কাতর আকুতি ভেসে উঠল। ভূতের ভয় ব্যাপারটা এমন যে সেটা বড়-ছোট মানে না। ভূতনাথবাবু নিজে ভূতে বিশ্বাস না করলেও ব্যাপারটা জানেন। তাই তিনি ভদ্রলোকের কথা শুনে অনিচ্ছা সত্ত্বেও বললেন, “চলুন।”

টর্চ জ্বালিয়ে ভদ্রলোকের সঙ্গে তার ঘরে ঢুকে একটা চেয়ারে বসলেন ভূতনাথবাবু নিখিলবাবু বললেন, “ভাগ্যিস আপনি ছিলেন, নইলে আমার কী হত কে জানে! দাদা না বললে আমি কিছুতেই আসতাম না এখানে।” একথা বলে তিনি সম্ভবত গল্প শুরু করতে যাচ্ছিলেন। ঠিক সেই সময় বাইরে থেকে পরপর দু-বার সেই কান্নার সুর ভেসে এল। শব্দটা শুনেই নিখিলবাবু আতঙ্কে খাট ছেড়ে লাফিয়ে উঠে বলে উঠলেন, “ওই! ওই।”

বারান্দায় বসে ঝিমুনি আসায় এর আগে যে শব্দটা ভূতনাথাবাবু ঠিক বুঝতে পারেননি, এবার তিনি সেটা বুঝে ফেললেন। ভদ্রলোক খাট থেকে নেমে আর একটু হলে ভয় পেয়ে ভূতনাথবাবুকে জড়িয়ে ধরতে যাচ্ছিলেন, তাকে থামিয়ে দিয়ে ভূতনাথবাবু হেসে ফেলে বললেন, “এটা ভূতের কান্না নয়, শকুনের বাচ্চার ডাক। অবিকল মানুষের বাচ্চার কান্নার মতো লাগে। বাইরে কোনো গাছে নিশ্চয়ই শকুনের বাসা আছে।”

নিখিলবাবু বললেন, “সত্যি বলছেন?”

ভূতনাথবাবু বললেন, “হ্যাঁ, সত্যি। আমার বাড়ির কাছে একটা গাছে শকুনের বাসা ছিল। এ ডাক আমি অনেক শুনেছি।”

ভূতনাথবাবুর মন পড়ে আছে বাইরের বারান্দাতে। তাই তিনি শব্দর ব্যাপারটা সমাধান হয়ে যাবার পর বললেন, “শুনুন আপনি নিছকই বাচ্চা ছেলের মতো ভয় পাচ্ছেন। এবার বুঝতে পারছেন তো যে এসব ব্যাপারকেই লোকে ভৌতিক বলে মনে করে? ভূত বলে কিছু নেই। আমি বরং টর্চটা আপনাকে দিয়ে যাচ্ছি। ওটা নিয়ে আপনি শুয়ে পড়ুন। আর আমি তো বাইরে পাহারাতে রইলামই। তেমন হলে না হয় আমাকে ডাকবেন।”

নিখিলবাবু মনে হয় এবার কিছুটা লজ্জা বোধ করলেন নিজের আচরণে। তিনি বললেন, “আপনি যখন বলছেন তখন তাই করি।”

ভূতনাথবাবু টর্চটা নিখিলবাবুকে দিয়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলেন। নিখিলবাবু ঘরের দরজা বন্ধ করে দিলেন।

বাকি রাতটুকু বাইরে বারান্দায় বসেই ভূতনাথবাবু কাটিয়ে দিলেন। বারকয়েক শকুনের বাচ্চার ডাক শোনা গেলেও কোনো ভূতের খোঁজ পেলেন না তিনি, বা তাকে কেউ ভূত সেজে ভয় দেখাতেও এল না। নিখিলবাবুরও আর কোনো সাড়া-শব্দ তিনি পেলেন না। ভূতনাথবাবু অনুমান করলেন, তার কথা শুনে আশ্বস্ত হয়ে ভদ্রলোক ঘুমিয়ে পড়েছেন। রাত শেষ হয়ে পাখির ডাকে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করল একসময়। ভূতনাথবাবু এরপর তার নিজের ঘরে গিয়ে ঢুকলেন। ফ্রেশ হয়ে ভোরবেলাই ফেরার জন্য রওনা হবেন তিনি। কেয়ারটেকার রামপ্রসাদও কিছুক্ষণের মধ্যেই নিশ্চয়ই চলে আসবে।

ভালো করে ভোরের আলো ফুটতেই ফেরার জন্য রওনা হবেন বলে ব্যাগ নিয়ে ঘরের বাইরে বারান্দাতে বেরিয়ে এলেন ভূতনাথবাবু। বাইরে ঝলমলে পৃথিবী। মনে মনে হাসলেন তিনি। ভূত বলে যে কিছু নেই, আবার তা প্রমাণিত হল। অফিসে ফিরেই তিনি ভালো করে দাবড়ে দেবেন বামাপদবাবু আর ভূত-বিশ্বাসীদের। গতরাতে শকুনের ডাক শুনে নিখিলবাবুর আঁতকে ওঠার ব্যাপারটা মনে পড়াতেও হাসি পেল তাঁর। নিখিলবাবুর ঘরে টর্চটা রয়ে গেছে। ফেরার আগে সেটা নেবার জন্য ভদ্রলোকের ঘরের দরজার সামনে তিনি গিয়ে দাঁড়ালেন। কিন্তু দরজা বাইরে থেকে তালা বন্ধ। তবে কি তিনি প্রাতঃভ্রমণে গেলেন? তার খোঁজে চারপাশে তাকাতেই তিনি দেখলেন, বুড়ো কেয়ারটেকার রামপ্রসাদ বারান্দাতে উঠে আসছে। সে এসে ভূতনাথবাবুর সামনে দাঁড়াতেই তিনি তাকে প্রশ্ন করলেন, “এ ঘরের বাবু কোথায় গেলেন? ওঁর কাছে আমার টর্চ রাখা আছে।”

রামপ্রসাদ বলল, “এ ঘর তো তালা বন্ধ ছিল। চাবি আমার কাছে। এ ঘরে কেউ থাকবে কীভাবে?”

ভূতনাথবাবু বললেন, “কী আবোল তাবোল বকছ? কাল রাতে এ ঘরে এক ভদ্রলোক ছিলেন। তিনি ভূতের ভয় পাচ্ছিলেন বলে আমি তাকে টর্চটা দিলাম। নিশ্চয়ই ঘরে টর্চটা রেখে বাইরে বেরিয়েছে তিনি।”

ভূতনাথবাবুর কথা শুনে আর বাক্যব্যয় না করে দরজার চাবি খুলে ভূতনাথবাবুকে নিয়ে সে ঘরে প্রবেশ করল বুড়ো কেয়ারটেকার। ঘরে ঢুকেই ভূতনাথবাবু বুঝতে পারলেন বহুদিন ঘরটা বন্ধ ছিল। ভ্যাপসা গন্ধ ঘরের ভিতর। খাট, মেঝে, টেবিল, চেয়ার সর্বত্র পুরু ধুলো জমেছে। তবে সেই ধুলোমাখা খাটের ওপর ভূতনাথবাবুর টর্চটা পড়ে আছে। সেটা হাতে তুলে নিয়ে তিনি রামপ্রসাদকে বললেন, “এই তো আমার টর্চ। আর তুমি বলছ এ ঘরে কেউ ছিল না?”

এ কথা বলার পরই ভূতনাথবাবুর চোখে পড়ল দেওয়ালে ঝোলানো একটা বাঁধানো ছবি। মাকড়সার জালের আড়াল থেকে সে ছবির ভিতর থেকে যে লোকটা উঁকি দিচ্ছে তাকে চিনতে ভূতনাথবাবুর অসুবিধা হল না। তিনি ছবিটা দেখিয়ে রামপ্রসাদকে বললেন, ‘ওই যে, ওই ভদ্রলোক নিখিলবাবু, যিনি টর্চটা নিয়েছিলেন।”

বুড়ো কেয়ারটেকার বলল, “হ্যাঁ, বহুদিন আগে উনি কিছুদিন এখানে এসে থেকেছিলেন। সম্পর্কে উনি মালিকের ভাই হতেন।”

ভূতনাথবাবু বললেন, “বহুদিন কেন, কালও তো তিনি ছিলেন রাতে?”

একটু চুপ করে থেকে রামপ্রসাদ বলল, “এখানে এসে থাকার কিছুদিনের মধ্যেই এক রাতে তিনি হার্টফেল করে এ ঘরে মারা যান। ওঁর ভূতে খুব ভয় ছিল। তারপর থেকে এ ঘর বন্ধই থাকে। আপনি মালিকের থেকে ব্যাপারটা খোঁজ নিতে পারেন।”

ভূতনাথবাবু তার কথা শুনে হতভম্ব হয়ে গেলেন। মুহূর্তের জন্য ভূতনাথবাবুর কানে ভেসে উঠল গতরাতে শোনা নিখিলবাবুর ভয়ার্ত কণ্ঠস্বর—ভূতে বড় ভয় পাই।”

ভূতনাথবাবু দেখলেন এক অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠেছে বৃদ্ধ কেয়ারটেকার রামপ্রসাদের বলিরেখাময় মুখে। যেন সে হাসি বলতে চাইছে, “বাবু কি ভূত দেখলেন?”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *