আলেকজান্দ্রিয়ার মমি
নতুন কোনো জায়গাতে গেলে প্রথম ক-দিন রাতে ঘুম আসতে চায় না কিংশুকের। কিন্তু কী আর করা যাবে? চাকরি বড় দায়, তাই নানান জায়গায় তাকে ছুটে বেড়াতে হয়, রাত কাটাতে হয় তাদের কোম্পানির কাজের দায়িত্ব নিয়ে। ঠিক যেমন তাকে এবার কলকাতা বন্দরে পাঠানো হয়েছে কয়েকদিনের জন্য। কিংশুকদের কোম্পানি নানান ধরনের সমীক্ষার কাজ করে থাকে মূলত সরকারি নির্দেশে। কিংশুককে এখানে থাকতে হবে বন্দর-শ্রমিকদের নিয়ে এক সমীক্ষার জন্য। তাই বন্দর-লাগোয়া এই ঘরটাতে তার জন্য রাত্রিবাসের ব্যবস্থা করেছেন বন্দর-কর্তৃপক্ষ। কিন্তু আগে এ ঘরটার অবস্থা ভালো করে বুঝতে পারলে অন্যত্র হোটেলের রুম ভাড়া নিত কিংশুক। তার কাজ শুরু হবে আগামীকাল সকাল থেকে। আজ এখানকার সরকারি দপ্তরে এসে নিজের আগমন-বাৰ্তা জানাবার পর বিশেষ কোনো কাজ না থাকায় সে সোজা চলে গেছিল পার্ক স্ট্রিট অঞ্চলে, দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সময় কাটাবার জন্য। অনায়াসে সে সেই সময় ওই চত্বরে কোনো একটা হোটেলে তার রাত্রিবাসের ব্যবস্থা করতে পারত। কিংশুকের সঙ্গে গাড়ি আছে, সেখান থেকে এখানে আসা-যাওয়ার সমস্যা হত না। একে তো এ ঘরটাতে এসি নেই, তার ওপর মাথার ওপরের আদ্যিকালের ফ্যানটা যতটা ঘটঘট শব্দ করে ঘুরছে তার কণামাত্র বাতাস দিচ্ছে না। তার ওপর গরমের রাত। একটা বাজলেও কিংশুকের ঘুম আসছে না। জানালার দিকে পাশ ফিরে শুলো কিংশুক। সারাদিন মানুষের অবিশ্রান্ত কোলাহল আর ক্রেন দিয়ে বিরাট-বিরাট কন্টেনার নামাবার ধাতব শব্দ থেমে যাবার পর বন্দর অঞ্চল এখন নিস্তব্ধ। জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে দূরে নদীবক্ষে একটা মালবাহী জাহাজ বা কার্গো-শিপ মাথার ওপর লাল আলো জ্বেলে ভূতের মতো দাঁড়িয়ে আছে। সেদিকে তাকিয়ে কিংশুক চোখে ঘুম আসার প্রতীক্ষা করতে লাগল।
কিন্তু এরপরই কাণ্ডটা ঘটল। প্রচণ্ড শব্দ তুলে হঠাৎই বন্ধ হয়ে গেল ফ্যানটা! না, লোডশেডিং বা পাওয়ার কাট নয়, ঘরের ডিম লাইটটা জ্বলছে। বিছানা ছেড়ে উঠে পড়তে হল কিংশুককে। সুইচবোর্ডের কাছে গিয়ে বার কয়েক ফ্যানের সুইচ অফ-অন করেও কোনো কাজ হল না। জগদ্দল পাথরের মতোই নিশ্চলভাবে মাথার ওপর ঝুলে আছে পাখাটা, কোনো নড়াচড়া নেই। ধপ করে বিছানায় বসে কিংশুক ভাবতে লাগল এবার কী হবে? এত রাতে নিশ্চয়ই কেউ ফ্যান ঠিক করতে আসবে না, তাছাড়া এই মাঝরাতে কাকেই-বা ডাকবে সে? সরকারি কেয়ার-টেকার ঘর খুলে কিংশুকের হাতে চাবি গছিয়ে কোথায় যে চলে গেছে তার জানা নেই। ঘুম না হয় নাইবা এল, কিন্তু সারারাত এই বাতাসহীন গুমোট ঘরে কাটাবে কীভাবে তার পথ খুঁজতে লাগল কিংশুক।
ভাবতে-ভাবতেই একসময় প্রচণ্ড গরমে সে ঘামতে শুরু করল। আর এরপর সে বুঝতে পারল এই অসহনীয় গরমে এ-ঘরে তার পক্ষে রাত কাটানো কিছুতেই সম্ভব নয়। কিন্তু এই মধ্যরাতে কোথায়ই-বা যাবে সে? কিংশুকের একসময় মনে হল, অন্তত নদীর পাড়ে গিয়ে যদি বসা যায় তবে হয়তো কিছুটা আরাম বোধ হতে পারে। তার ঘরের থেকে কিছুটা এগোলেই একটা পরিত্যক্ত জেটি আছে, সেখানে গিয়ে বসা যেতে পারে। ভোট চারটে নাগাদ তো নিশ্চয়ই আলো ফুটে যাবে, অর্থাৎ আর ঘণ্টা-তিনেক সময় কাটিয়ে দিতে পারলেই সকাল হয়ে যাবে। এ কথা ভেবে শেষ পর্যন্ত কিংশুক সিদ্ধান্ত নিল সে বাইরে গিয়েই বসবে। তার বাসস্থানের কিছুটা তফাতে একটা পুরোনো দিনের জেটি চোখে পড়েছে তার। সেখানে গিয়ে বসা যেতে পারে। একথা ভেবে বিছানা ছেড়ে উঠে গায়ে শার্ট গলিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই বাইরে বেরোলো সে। তারপর দরজাতে তালা ঝুলিয়ে মধ্যরাতে আকাশের নীচে এসে দাঁড়ালো কিংশুক।
চারপাশে একবার ভালো করে তাকাল সে। সামনে নদীবক্ষে নোঙর করা আছে বেশ কয়েকটা ঘুমন্ত মালবাহী জাহাজ। তার একদিকে পাড় বরাবর রাখা আছে জাহাজ থেকে নামানো সার-সার ঘরের আকৃতির লোহার কন্টেনারগুলো। নদীর পাড়ে কয়েকটা বাতিস্তম্ভে বাতি জ্বলছে ঠিকই, কিন্তু তার আলো এত ম্রিয়মাণ যে চারপাশকে আলোকিত করতে পারছে না। মাথার ওপরেও চাঁদটা একফালি নখের মতো। তাই আশেপাশে অনেক জায়গাতেই খেলা করছে হালকা বা গাঢ় অন্ধকার। চারদিকে তাকিয়েও কোনো লোক চোখে পড়ল না কিংশুকের। কাছেই দাঁড়ানো তার গাড়ির দরজাটা ঠিকমতো বন্ধ করা আছে কি না তা একবার হাত দিয়ে টেনে পরীক্ষা করে নেওয়ার পর কিংশুক হাঁটতে শুরু করল কাছেই সেই জেটিটার দিকে।
কিছুটা হেঁটেই পৌঁছে গেল সেই জেটিতে। দেখেই বোঝা যায় নদীর গায়ে এই জেটি বহুদিন আগেই পরিত্যক্ত হয়ে গেছে। মালপত্র আজ আর এখানে ওঠানো-নামানো হয় না। তবে কালের সাক্ষী হয়ে নদীর পাড়-বরাবর অনেকটা বসার মোড়ার মতো দেখতে খর্বাকৃতি সেই লোহার স্তম্ভগুলো এখনও আছে। নদীর নাব্যতা যখন গভীর ছিল তখন জাহাজ চলে আসত পাড়ের কাছে। সেসময় জাহাজের কাছি বেঁধে রাখার জন্য বসানো হয়েছিল মাটি থেকে ফুট-চারেক উঁচু কাছি বা শিকল বাঁধার স্তম্ভগুলো। এ জেটিতে একটা ল্যাম্পপোস্ট আছে ঠিকই, কিন্তু তাতে বাতি জ্বলছে না। আলো বলতে শুধু মাথার ওপর ক্ষীণ চাঁদের আলো।
ল্যাম্পপোস্টটার কাছেই কাছি বাঁধার একটা লোহার স্তম্ভের কাছে গিয়ে দাঁড়াল কিংশুক। খর্বাকৃতি লোহার স্তম্ভের মাথাটা সমতল। দেখতে যেন টুলের মতো। তার উপর আরাম করে বসা যায়। তাই তার ওপরই বসল কিংশুক। তার কিছুটা তফাতেই শুরু হয়েছে নদী। তার বুকে দাঁড়িয়ে আছে ঘুমন্ত জাহাজগুলো। এ জায়গায় আসার আগে কলকাতার এই বন্দর সম্পর্কে কিছুটা পড়ে এসেছে সে। এক সময় ব্রিটিশ আমলে দেশের প্রধান বন্দর ছিল এই কলকাতা বন্দর। পালতোলা জাহাজে সে সময় ইউরোপ থেকে এ বন্দরেই এসে নামত শ্বেতাঙ্গরা। তারা কেউ আসতেন এখানে বাণিজ্য করতে, কেউ আসতেন এ দেশ শাসন করতে আবার কেউ-কেউ এদেশে এসে নিয়োজিত হয়েছিলেন সমাজ সংস্কারের কাজেও। আবার এই বন্দর থেকেই একসময় ইউরোপের বুকে যাত্রা করেছেন কত মনীষী। তার কেউ-বা ইউরোপে গিয়ে সেখান থেকে সঞ্চয় করে এনেছেন পাশ্চাত্য শিক্ষার আলো, আবার কেউ-বা সাগরপাড়ের দেশে গিয়ে বিলিয়ে এসেছেন সনাতন ধর্ম ভাবনা অথবা এই সুমহান ভারতবর্ষের প্রাচীন সংস্কৃতিকে। অষ্টাদশ শতকে ইউরোপে যখন দাস ব্যবসা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ হয় তখন পঞ্চাশ লক্ষ ভারতীয়কে ব্রিটিশরা চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক হিসাবে পাঠিয়েছিল এ বন্দর থেকেই। কত প্রাচীন ইতিহাস, অজানা কাহিনি জড়িয়ে আছে এ বন্দরের সঙ্গে। নদীর নাব্যতা কমে যাবার কারণে গত সত্তর-আশি বা একশো বছর ধরে হয়তো এ বন্দরের গরিমা ধীরে-ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে, কিন্তু একদিন তো তা ছিল। এসব কথাই নদীর দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগল কিংশুক। নদীর দিক থেকে মৃদু বাতাসও বইছে পাড়ের দিকে, ধীরে-ধীরে জুড়িয়ে আসতে লাগল তার শরীর।
হঠাৎই একটা অস্পষ্ট শব্দ শুনে পাশ ফিরে তাকিয়ে কিংশুক দেখতে পেল একটা লোককে। সে যখন নদীর দিকে তাকিয়ে নানান কথা ভাবছিল তখনই সম্ভবত কিছুটা তফাতে তারই মতো কাছি বাঁধার লোহার স্তম্ভটার ওপর লোকটা এসে বসেছে। লোকটার পরনে আলখাল্লার মতো লম্বা ঝুলের একটা পোশাক। তবে বাতিহীন ল্যাম্পপোস্টের ছায়াটা লোকটার মুখের ওপর এমনভাবে বসে পড়েছে যে তার মুখটা ঠিক ঠাহর করা যাচ্ছে না। তবে কিংশুকের মনে হল লোকটা যেন নদীর দিকেই তাকিয়ে আছে। লোকটা হয়তো বন্দরেরই কোনো শ্রমিক অথবা ভবঘুরে শ্রেণির লোক হবে, এ কথা ভেবে কিংশুক আবার নদীর দিকে চোখ ঘোরাতে যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময় লোকটা কিংশুকের উদ্দেশে বলল, “আপনাকে দেখে তো ঠিক বন্দরের লোক বা জাহাজি বলে মনে হয় না! এখানে নতুন এসেছেন নাকি?”
কিংশুক বলল, “হ্যাঁ। আজই এখানে সকালে এসেছি একটা কাজ নিয়ে। ক-দিন থাকব এখানে। কাছেই একটা ঘরে উঠেছি। কিন্তু খুব গরম। তাই ঘর ছেড়ে এখানে এসে বসলাম।”
লোকটা বলল, “হ্যাঁ। আজ বড্ড গরম পড়েছে। তবে এ জায়গাটা বেশ ভালো। বিশেষত রাত্রির দিকটা বেশ আরামদায়ক। আমি তো মাঝে মাঝেই রাত্রিবেলা চলে আসি এখানে।”
বেশ স্পষ্টভাবে বাংলা-ভাষাতে কথা বলছে লোকটা। এই বন্দর অঞ্চলে সকালবেলা এসে কিংশুক যেসব হিন্দিভাষী শ্রমিক বা মাল্লাদের দেখেছে, কেন জানি এ লোকটার কণ্ঠস্বর শুনে তাকে ঠিক সে গোত্রের লোক বলে মনে হল না কিংশুকের। সে লোকটার প্রশ্ন শুনে তাকে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি এখানেই কোথাও থাকেন?”
লোকটা জবাব দিল, “না, ঠিক এখানে নয়। এখান থেকে আমার বাসস্থানে যেতে আধঘণ্টা মতো সময় লাগে। পুরোনো দিনের একটা বাড়িতে একলাই থাকি আমি। রাতে ঘুম আসে না। তাই মাঝেমধ্যেই রাত্রে এখানে চলে আসি, তারপর ভোরের আগে আবার বাড়ি ফিরে যাই।”
এ কথা বলে লোকটা যেন স্বগতোক্তির স্বরে বলল, “আসলে এ জায়গার সঙ্গে আমার অনেক পুরোনো সম্পর্ক। এ বন্দরেই প্রথমে এসে নেমেছিলাম আমি। কলকাতার বুকে প্রথম পা রেখেছিলাম। তখন অবশ্য এ বন্দর এমন নিষ্প্রভ হয়ে যায়নি। দিনরাত লোকজন, জাহাজের আনাগোনা লেগেই থাকত এই কলকাতা বন্দরে।”
লোকটার কথা শুনে কিংশুক জানতে চাইল, “আপনি জাহাজি ছিলেন নাকি?”
লোকটা বলল, “না জাহাজি বা জাহাজকর্মী ছিলাম না। আমাকে প্যাসেঞ্জার বলতে পারেন। তবে জাহাজেই বহুদেশ ঘুরেছি আমি। লম্বা সমুদ্রপথও পাড়ি দিয়েছি। সমুদ্রের কথা—এই কলকাতা বন্দরের পুরোনো নানান কাহিনির কথা আমার জানা। সেসব কাহিনি আমি কিছুটা জেনেছি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে। আর কিছুটা আমি শুনেছি পুরোনো জাহাজি বা মানুষের থেকে।”
কিংশুক বলল, “আমি শুনেছি নাবিকদের ঝুলিতে নাকি নানান অদ্ভুত সব গল্প থাকে। প্রজন্মর পর প্রজন্ম ধরে না কি নাবিকদের মধ্যে প্রবাহিত হয় সেসব গল্প! আমার এক বন্ধু মার্চেন্ট-নেভিতে চাকরি করত, তার মুখেই শুনেছিলাম কথাটা।”
লোকটা বলল, “হ্যাঁ ঠিকই শুনেছেন। আসলে জাহাজে মনোরঞ্জনের বিশেষ উপকরণ থাকত না এক সময়। তাই তাস আর গল্পই ছিল জাহাজিদের মনোরঞ্জনের বিষয়। যে যত পুরোনো জাহাজি, তার ঝুলিতে গল্পের ভাঁড়ার তত বেশি। সূর্য ডোবার পর জাহাজের ডেকে বুড়ো জাহাজিকে ঘিরে বসে গল্প শুনতেও দেখেছি আমি।”
লোকটার কথাবার্তা শুনে লোকটাকে ভদ্রলোক বলেই মনে হচ্ছে কিংশুকের। তার সঙ্গে গল্প করে যদি রাতটুকু কাটিয়ে দেওয়া যায় তবে মন্দ হয় না। তাই কিংশুক লোকটার উদ্দেশে বলল, “আপনি তো জাহাজিদের কাছ থেকে নানা পুরোনো কাহিনি শুনেছেন বলছেন। আপত্তি না-থাকলে তেমন কোনো একটা কাহিনি বলুন না? আসলে বুঝতেই পারছেন, চুপচাপ বসে রাত কাটানোর চেয়ে আপনার কথা শুনে রাত কাটাতে পারলে ভালো লাগবে।”
কিংশুকের কথা শুনে প্রথমে বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল লোকটা। তা দেখে কিংশুক বলল, “ঠিক আছে আপনার যদি গল্প শোনাতে আপত্তি থাকে তবে বরং আমরা এমনি কথাবার্তা বলি, আগে যেমন বলছিলাম!”
লোকটা কিংশুকের কথা শুনে বলল, “না, আপত্তির কোনো ব্যাপার নেই। আমারও বরং কথা বলতে ভালোই লাগবে। যে কারণে যেচে কথা বললাম আপনার সঙ্গে। আসলে অনেক পুরোনো কাহিনি জানা আছে আমার, তাই ভাবছি কোন গল্পটা বলি আপনাকে?”
এরপর আরও মিনিটখানেক চুপ করে থাকার পর লোকটা বলল, “তবে আপনাকে যে কাহিনিই বলি, সে কাহিনির সূত্রপাত প্রায় দেড়শো বছর আগে, যখন এখানে ইংরেজ আমল। যে কাহিনি এক জাহাজে শুরু হয়েছিল বহু দূরের এক বন্দর থেকে, আর সে কাহিনির পরিসমাপ্তি হয়েছিল এই কলকাতা বন্দরে এসে। অদ্ভুত এক কাহিনি। তবে তার আগে জেনে নিই আপনার ভূতের ভয় নেই তো? কারণ, এ কাহিনি অনেকটা তেমনই।”
লোকটার কথা শুনে কিংশুক হেসে ফেলে বলল, “না, ওসব ভয় আমার নেই। থাকলে কি এই মাঝরাতে অন্ধকারে একলা এই জেটিতে এসে বসতাম?”
লোকটাও কিংশুকের কথা শুনে হেসে বলল, “ও ভয় আমারও নেই।”
আকাশে ক্ষীণ চাঁদের আলো। মৃদু ছলাৎছল শব্দে নদীর জল এসে ধাক্কা দিচ্ছে জেটির গায়ে।
নদীর বুকে ভূতের মতো দাঁড়িয়ে আছে জাহাজগুলো। লোকটা সেদিকে তাকিয়ে তার কাহিনি শুরু করল।
“জাহাজের নাম ওথেলো। পাঁচমাস্তুলঅলা এক বাষ্পীয় বাণিজ্যপোত। যে জাহাজ একইসঙ্গে কয়লা জ্বালিয়ে বাষ্প উৎপাদন করে এবং সমুদ্রের বাতাসকে ব্যবহার করে চালনা করা যায়। ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে এক আলোকোজ্জ্বল ভোরে ওথেলো ইংল্যান্ড থেকে যাত্রা শুরু করেছিল সমুদ্রে। অন্তিম গন্তব্য ছিল মলাক্কা। সেখান থেকে মশলা সংগ্রহ করার জন্যই প্রধানত মাঝারি আকৃতির সেই সমুদ্রপোত রওনা দিয়েছিল। জাহাজের অভিজ্ঞ ক্যাপ্টেনের নাম জর্জ গ্রেস। আর তার প্রধান সহকারী অর্থাৎ চিফ-মেটের নাম মার্টিমার। তাঁরা দুজনেই অভিজ্ঞ নাবিক। ইতিপূর্বে তারা বহুবার প্রাচ্যদেশে এসেছেন। তারা দুজন ছাড়া আরও পঞ্চাশজন নাবিক ছিল জাহাজে, তাদের কাজ ছিল দীর্ঘ যাত্রাপথে জাহাজের দৈনন্দিন কাজ সম্পন্ন করা।
সমুদ্রের আবহাওয়া বেশ মনোরম ছিল, আশঙ্কার কিছু ছিল না। বাতাসও অনুকূল ছিল। কাজেই নিতান্ত প্রয়োজন না হলে কয়লা মজুত রেখে ধবধবে সাদা পালের সাহায্যে রাজহংসীর মতোই ভেসে চলেছিল সেই বাণিজ্যপোত। লন্ডন থেকে প্রথমে ‘নর্থ সী’ হয়ে ইংলিশ চ্যানেল, তারপর সেখান থেকে ‘বে অফ বিস্কে’ হয়ে নর্থ আটলান্টিক ওসান। তারপর ক্রমে-ক্রমে ‘অ্যাল বোয়ান সী, ভূমধ্যসাগর, ডেসিটিয়া-নদী মোহনা অতিক্রম করে বেশ কয়েক মাসের যাত্রা শেষে অবশেষে নীলনদের আলেকজান্দ্রিয়া বন্দরে এসে কয়েকদিনের জন্য নোঙর করল ওথেলো। এ বন্দরে তেমন কোনো কাজ ছিল না জাহাজের। আলেকজান্দ্রিয়াতে জাহাজ থামানো হয়েছিল নাবিকদের দীর্ঘ যাত্রাপথের একঘেয়েমি কাটাবার জন্য, দু-তিন দিন যাতে তারা মাটিতে নেমে নানান ধরনের আমোদফুর্তি করে তাদের মনকে আবার চাঙ্গা করে তুলতে পারে। অতি প্রাচীন বন্দর এই আলেকজান্দ্রিয়া, যেমন তা বিশাল, তেমনই মনোরঞ্জনেরও বিপুল আয়োজন আছে সে বন্দরে। নাচগান, খানাপিনা থেকে জুয়ার আড্ডা সবকিছু। স্থানীয় মিশরীয়রা তো সে বন্দরে থাকেই, তাছাড়া আফ্রিকার নানান দেশের লোক, চৈনিক, ভারতীয়, আরবীয় এমনকী বেশ কিছু শ্বেতাঙ্গও বাস করে আলেকজান্দ্রিয়াতে। আর সেখানে যে কত অদ্ভুত জিনিস সেসময় বিক্রি হত তা বলে বোঝানো যাবে না। খাঁচাবন্দি জ্যান্ত সিংহ থেকে শুরু করে ভারতের আবলুশ-কাঠের সূক্ষ্ম কারুকাজ করা আসবাব, চিনা আফিম আরও অনেক কিছু। এমনকী ইউরোপে দাস-ব্যবসা নিষিদ্ধ হলেও তখনও সেখানে রমরমিয়ে চলছে দাস ব্যবসা। যাইহোক ক্যাপ্টেন গ্রেস সিদ্ধান্ত নিলেন তিনরাত কাটাবেন সে বন্দরে। আলেকজান্দ্রিয়াতে জাহাজ ভিড়তেই নাবিকরা নেমে পড়ল সে বন্দরে। তবে ক্যাপ্টেনের কড়া নির্দেশ ছিল, অন্ধকার নামার আগেই প্রত্যেক নাবিককে জাহাজে ফিরে আসতে হবে। তাই করত নাবিকরা। দুটো রাত দেখতে-দেখতে কেটে গেল। ক্যাপ্টেন কিন্তু এ দু-দিন জাহাজ ছেড়ে নামেননি। জাহাজ ছেড়ে সচরাচর কোথাও যান না তিনি। কিন্তু শেষদিন একটু বেলার দিকে তিনি চিফ-মেটকে বললেন, ‘এখানে যখন এলামই তখন একটু নীচে নেমে ঘুরে আসা যাক। তাছাড়া এখানে টাটকা-খেজুর পাওয়া যায়, সেগুলোও কিছুটা কিনে আনা যাবে।’ অতঃপর জাহাজ থেকে বন্দরে নেমে পড়লেন ক্যাপ্টেন গ্রেস আর চিফ-মেট মার্টিমার। বন্দরের গায়েই বিরাট বাজার আছে। নানান ধরনের জিনিস বিক্রি হয় সেখানে। ভালো খেজুর মিলে গেল সেখানে। বেশ কয়েক কেজি খেজুর কিনে পায়ে হেঁটে বন্দর-লাগোয়া শহরে ঘুরতে বেরোলেন তারা। বহু হাজার বছরের প্রাচীন শহর আলেকজান্দ্রিয়া। স্তম্ভ, মিনার, মন্দির, ফারাও আর মিশরীয় দেবতাদের বিশাল বিশাল মূর্তি সব ছড়িয়ে আছে শহরের নানান জায়গাতে। সেগুলো দেখতে-দেখতেই হাঁটছিলেন তারা। হঠাৎ রাস্তার পাশে একটা জিনিস দেখতে পেয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন ক্যাপ্টেন। এক বৃদ্ধ মিশরীয় একটা কাঠের কফিন বাক্স নিয়ে বসে আছে রাস্তার পাশে এক দেওয়ালের গায়ে। বাক্সের ডালাটা পাশেই নামিয়ে রাখা। আর বাক্সের মধ্যে শুয়ে আছে একটা মমি! যেটা দেখে ব্যাপারটা অনুমান করতে অসুবিধা হল না, এর আগেও বেশ কয়েকবার আলেকজান্দ্রিয়াতে আসা ক্যাপ্টেনের। সেই বুড়ো মমিটা বিক্রি করতে চায়।”
লোকটার কথা শুনে তার কথার মাঝেই কিংশুক বলে উঠল, “এভাবে মিশরে মমি বিক্রি হত নাকি?”
লোকটা কিংশুকের প্রশ্নের জবাবে বলল, “হ্যাঁ, হত, এমনকী মাত্র সত্তর-আশি বছর আগেও মিশরের নানা জায়গাতে মমি বিক্রি হতো। মমি কেনাবেচার এই পত্তন শুরু হয় দুশো বছর আগে। বাঘ-সিংহ, পশু-পাখির চামড়া, দাঁত, শিং যেমন অনেকে ঘরে একসময় “ট্রফি’ হিসাবে সাজিয়ে রাখত তেমনই সেসময় অনেক ধনাঢ্য ইউরোপীয়র ড্রয়িংরুমে মমি সাজানো থাকত। মমি মানে তো শুধু রাজা-রানিদের দেহ নয়, প্রাচীন মিশরে অনেক সাধারণ মানুষদের দেহও মমি করা হত। সেসব মরদেহ নানান কবর থেকে স্থানীয় মানুষরা সংগ্রহ করে এনে ইউরোপীয়দের কাছে সামান্য দামে বিক্রি করত। এ ব্যাপারে স্থানীয় শাসকদের তেমন কোনো বিধিনিষেধ ছিল না।”
কিংশুকের কথার জবাব দিয়ে লোকটা আবার তার কাহিনি বলতে শুরু করল— “সেই বুড়ো মমি-বিক্রেতাকে দেখে ক্যাপ্টেন গ্রেসের একটা কথা মনে পড়ে গেল। এই সমুদ্র-অভিযান উপলক্ষ্যে যাত্রা শুরুর আগে যে নৈশভোজের আয়োজন হয়েছিল, সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন ডিউক অফ ওয়েলিংটন পরিবারের একজন তিনি কথা প্রসঙ্গে ক্যাপ্টেন গ্রেসকে বলেছিলেন, ‘ক্যাপ্টেন যদি সমুদ্রযাত্রা থেকে ফেরার সময় একটা মমি সংগ্রহ করে আনতে পারেন তবে তিনি তা উপযুক্ত মূল্যে কিনে নেবেন।’
কথাটা মনে পড়তেই ক্যাপ্টেন তার সঙ্গীকে নিয়ে বুড়োটার সামনে গিয়ে হাজির হলেন। ভালো করে তারা প্রথমে দেখলেন সেই সারকোফেগাস অর্থাৎ শবাধার আর মমিটাকে। কাঠের তৈরি কফিন বা শবাধারটা মানুষের শরীরের আদলেই তৈরি। তার গায়ে মানুষের শরীরের মতোই মাথা থেকে পা আঁকা আছে যেমন আঁকা থাকে প্রাচীন মিশরীয় শবাধারের গায়ে। কফিনে শোয়ানো মমির ব্যান্ডেজ-মোড়ানো দেহের গায়ে লিনেনের আবরণ। তবে তার মাথা শুধুই রজন মাখানো কাপড়ের ফালিতে জড়ানো। আর তার মুখে পরানো কাঠের মুখোশ মুখ থেকে খুলে বুকের ওপর রাখা। সাধারণত মৃত ব্যক্তির মুখের আদলেই ওই মুখোশ নির্মাণ করা হত। এবং মমি তৈরি সম্পন্ন হবার পর সে মুখোশ পরিয়ে দেওয়া হত মৃতদেহের ব্যান্ডেজ-জড়ানো মুখে।
শবাধার আর মমিটা ভালো করে দেখে, সেটা যে সত্যিকারের একটা প্রাচীন মমি সে ব্যাপারে নিঃসন্দেহ হবার পর ক্যাপ্টেন গ্রেস বুড়োটার কাছে জানতে চাইল, ‘ও মমি সে কোথায় পেয়েছে?’ বুড়োটা জানাল, ‘মমিটা সে সংগ্রহ করেছে নীলনদের পশ্চিমপাড়ে, ভ্যালি অফ কিংস’-এর এক প্রাচীন কবরখানা থেকে। এ মমির বয়স নাকি চার হাজার বছর।
‘ভ্যালি অব কিংস’-এ একসময় প্রাচীন মিশরীয় সম্রাটদের কবর দেওয়া হত। বালক-রাজা তুতানখামেনের কবরও ছিল ওই উপত্যকায়। তবে শুধু রাজাদের কবরই নয়, তাদের দেহরক্ষী, পরিচারক, অর্থাৎ রাজার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদেরও কবর দেওয়া হত। বুড়োটা এও ক্যাপ্টেনকে জানাল মমিটার ব্যান্ডেজের ওপর লিনেনের কাপড়টা নাকি জানান দিচ্ছে এই ব্যক্তিও কোনো রাজার ঘনিষ্ঠ কেউ ছিল। কারণ, নানান প্রাচীন ছবিতে রাজার পরিচারকদের পরনে লিনেনের পোশাক দেখা যায়।
বিষয়ী ক্যাপ্টেন গ্রেস বুঝতে পারলেন, মমিটা যদি তিনি লন্ডনে নিয়ে যেতে পারেন তবে তা পঞ্চাশ গুণ চড়া দামে সেই ডিউক পরিবারের ব্যক্তিকে তিনি বিক্রি করতে পারবেন।
বুড়োটার সঙ্গে এরপর দর কষাকষি শুরু করলেন ক্যাপ্টেন। শেষপর্যন্ত মাত্র সত্তর পাউন্ডে মমিটা কিনে ফেললেন ক্যাপ্টেন গ্রেস। টাকা বুঝে নিয়ে বুড়োটা প্রথমে কাঠের মুখোশটা মমির মুখে আঁটো করে বসিয়ে দিল। তারপর কফিনের ডালা বন্ধ করে দিল। লোক ডেকে কফিনটাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে ক্যাপ্টেন আর তার সঙ্গী কফিনবন্দি মমিটাকে নিয়ে চলল নদীর পাড়ে জাহাজঘাটায়। বুড়োটাও চলল, তাদের পিছন পিছন।
সেখানে পৌঁছে যখন জাহাজে নিয়ে যাবার জন্য সেই কাঠের বাক্সটাকে নৌকোতে তোলা হচ্ছে তখন বিদায় নেবার আগে বুড়োটা ক্যাপ্টেনের উদ্দেশে একটা অদ্ভুত কথা বলল। “সে বলল, তোমরা কিন্তু এ বন্দরে বেশিদিন থেকো না সাহেব। সম্ভব হলে কালই বন্দর ছেড়ে চলে যেও।”
কথাটা শুনে গ্রেস বললেন, “কেন বলো তো?”
বুড়োটা বলল, ‘কেউ কি নিজের জায়গা ছেড়ে যেতে চায়। হাজার-হাজার বছর ধরে ওরা এ দেশের মাটিতে ঘুমিয়ে থাকে। অনেক সময় এমনও দেখা গেছে যে মমি কিনে জাহাজে তোলা হয়েছে কিন্তু পরদিনই সে মমি কফিন থেকে উধাও। পরে তাকে উদ্ধার করা হয়েছে ঠিক যে জায়গা থেকে তোলা হয়েছিল। তবে একবার যদি আপনারা সমুদ্রে রওনা হয়ে যেতে পারেন তবে তার পক্ষে ফেরা মুশকিল।’
বন্দর অঞ্চলের লোকেদের মধ্যে এমনিই নানা কুসংস্কার থাকে, তার ওপর ইউরোপীয়দের চোখে আফ্রিকা, এশিয়ার দেশগুলো তো তখন অশিক্ষিত মানুষদের দেশ। কাজেই বুড়োটার কথা শুনে ক্যাপ্টেন হেসে জবাব দিলেন, ‘ও নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। কারণ, চার হাজার বছরের পুরোনো মড়া কখনও জীবন্ত হয়ে উঠতে পারে না। তবে আমাদের আগেই সিদ্ধান্ত নেওয়া আছে কালই আমরা রওনা হয়ে যাব বন্দর ছেড়ে।’
বুড়োটা এরপর বন্দরের লোকজনের ভিড়ে হারিয়ে গেল। আর ক্যাপ্টেন বাক্সবন্দি মমিটাকে নৌকায় নিয়ে জাহাজের দিকে এগোলেন। জাহাজে শবাধারটা তোলার পর সেটা নিয়ে রাখা হল ডেকের ওপরেই একটা কেবিনের ভেতর।
পরদিন জাহাজ বন্দর ছাড়বে। তাই এদিন বিকেলের মধ্যেই নাবিকরা সবাই জাহাজে ফিরে এল। যদিও পরদিন তাদের রওনা হওয়ার কথা, কিন্তু চিফ-মেট একটা প্রস্তাব দিল ক্যাপ্টেনকে। মাটিমার বলল, ‘এখন বেশ বাতাস আছে, জলের টানও আছে বেশ। কাল ভোরের পরিবর্তে আমরা যদি এখনই বন্দর ছেড়ে রওনা হয়ে যাই তবে আর সকালে অন্য জাহাজের ভিড়ের মধ্যে পড়তে হবে না।’
সাধারণত সকালবেলাই বন্দর ছাড়ে জাহাজ আর নৌকাগুলো। সংঘর্ষ এড়াতে তখন অতি ধীর গতিতে জাহাজ পরিচালনা করতে হয়। বিকেলে সে সমস্যা নেই। কাজেই চিফ-মেটের প্রস্তাব শুনে মনে ধরল ক্যাপ্টেনের। তিনি নির্দেশ দিলেন, ‘নোঙর ওঠাও।’
ব্রিটিশ পণ্যবাহী জাহাজ যখন আলেকজান্দ্রিয়া বন্দর ত্যাগ করে নীলনদের বুকে আবার যাত্রা শুরু করল তখন দিনের শেষ আলো ছড়িয়ে পড়েছে প্রাচীন আলেকজান্দ্রিয়া নগরীর হাজার-হাজার বছর ধরে দাঁড়িয়ে থাকা ফারাও মূর্তিগুলোর মাথাতে। এরপর সূর্য অস্ত গেল, অন্ধকার নামল নীলনদের বুকে।
নীলনদ থেকে দিমেত্তিয়ান নদী হয়ে সুয়েজ ক্যানেল পৌঁছোতে হবে ওথেলোকে। সেখানে পৌঁছোতে দশদিনের মতো সময় লাগবে জাহাজের। এর মধ্যে জাহাজ তিনদিন চলবে নীলনদের বুক চিরেই। সেইমতো নীলনদের পথ ধরেই এগিয়ে চললেন ক্যাপ্টেন। নদের দু-পাশে জনবসতি নেই বললেই চলে। দিগন্ত-বিস্তৃত বালিয়াড়ি আর ঊষর প্রান্তর। আর তারই মধ্যে কোথাও চোখে পড়ে একাকী দাঁড়িয়ে থাকা কোনো পিরামিড বা জীর্ণ কোনো স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষ, নীলনদের বুকে জেগে থাকা প্রাচীন সভ্যতার চিহ্ন। মাঝে মাঝে হয়তো চোখে পড়ে নদীতে জল খাওয়াতে আনা যাযাবরদের উটের কাফেলা। এসব দেখতে-দেখতে নীলনদের যাত্রা শেষ করল তারা।
তিনদিন পর সেদিন সকালে সবে তারা নীলনদ ত্যাগ করেছে। ক্যাপ্টেন গ্রেস নিজের কেবিন ত্যাগ করে রৌদ্রোজ্জ্বল ভোরে সবে ডেকের ওপর ইজিচেয়ারে এসে বসেছেন, ঠিক সেই সময় চিফ-মেট মার্টিমার, হেনরি নামের একজন নাবিককে নিয়ে হাজির হল তাঁর সামনে। গতরাতে হেনরি ডেক-পাহারার কাজে নিযুক্ত ছিল। হেনরি, ক্যাপ্টেনকে বলল, ‘গত রাতে আমি ওই তৃতীয় মাস্তুলের কাছে ডেকের রেলিং ধরে একটা লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি স্যার। নীলনদ তখন প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, শেষরাত। লোকটার গায়ে মিশরীয়দের মতো পোশাক ছিল। তবে মাস্তুলের ছায়া পড়াতে লোকটার মুখ আমি ঠিক বুঝতে পারিনি। লোকটা সম্ভবত রেলিং ধরে নদীর পশ্চিমপাড়ের দিকে তাকিয়েছিল।’
নাবিকের মুখে কথাটা শুনেই সোজা হয়ে বসে হেনরিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তারপর কী হল?’
হেনরি জবাব দিল, ‘আমি ছিলাম জাহাজের প্রথম মাস্তুলের সামনে! দড়িদড়া পেরিয়ে লোকটার কাছে যাওয়ার আগেই সে যেন কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল। আমি তাকে আর খুঁজে পাইনি।’
যে সময়ের এ কাহিনি, সেই সময় লুকিয়ে জাহাজে চেপে এক বন্দর থেকে আর এক বন্দরে যাবার ঘটনা মাঝেমধ্যেই ঘটত। হেনরি যাকে দেখেছে সে লোকটা তেমন কোনো অবৈধ যাত্রী নয় তো? – এ কথা ভেবে ক্যাপ্টেন, চিফ-মেট মার্টিমারকে নির্দেশ দিলেন, ‘এখনই সারা জাহাজে তল্লাশি চালাও। বিশেষত খোলটা ভালো করে খোঁজ। দেখো লোকটা কোথায় লুকিয়ে আছে?’
মার্টিমার ক্যাপ্টেনের নির্দেশ পালন করে তল্লাশি চালাল কিছু নাবিককে সঙ্গে নিয়ে। খোলটা তো বটেই, প্রতিটা কেবিন খুলে তার আনাচেকানাচে লোকটার খোঁজ চালাল তারা। কিন্তু শেষপর্যন্ত মার্টিমার ফিরে এসে ক্যাপ্টেনকে জানাল যে জাহাজে অন্য কোনো লোকের খোঁজ পাওয়া যায়নি।
তা শুনে ক্যাপ্টেন সেই হেনরি নামের নাবিককে ডেকে বললেন, ‘ফের যদি তুমি নেশা করে রাত-পাহারা দাও তবে চাবকে তোমার ছাল তুলে নেব।’
ক্যাপ্টেনের ধমক খেয়ে ফিরে গেল বেচারা হেনরি। জাহাজ আগের মতোই এগিয়ে চলল।
নির্ধারিত সময় সুয়েজ ক্যানেলে পৌঁছোল জাহাজ, তারপর সুয়েজ গালফ অতিক্রম করে জাহাজ উপস্থিত হল লোহিত সাগরে। আড়াই মাসে অর্ধেকের বেশি পথ পেরিয়েছে জাহাজ। এ সমুদ্রে আবহাওয়া হঠাৎ হঠাৎ পরিবর্তন হয়, কখনও-বা হয়তো একটুও বাতাস থাকে না। সমুদ্রের জলও স্থির, তখন জগদ্দল পাথরের মতো ভারী হয়ে যাওয়া জাহাজের বয়লারে কয়লা ঠেসে আগুন জ্বালিয়ে জাহাজ চালাতে হয়। টানা কয়েকদিন হয়তো এমন রোদ ওঠে যে সূর্যাস্তের আগে ডেকে এসে দাঁড়ানো যায় না। আবার হয়তো একটানা তিন-চারদিন ধরে অবিশ্রান্ত বৃষ্টি হয়ে চলে, সমুদ্রের জল ফুঁসে উঠে ডেকের গায়ে ছোবল মারে। ওথেলোর এবারের যাত্রাপথেও লোহিত সাগরে আবহাওয়ার খামখেয়ালি ভাব বজায় ছিল। তবে এ আবহাওয়ার সঙ্গে অভিজ্ঞ ক্যাপ্টেন পূর্ব পরিচিত। তাই এই হঠাৎ পরিবর্তনশীল আবহাওয়ার মধ্যে দিয়েই তিনি সব প্রতিকূল অবস্থাকে সামাল দিয়ে এগিয়ে চলেছিলেন। কিন্তু এখানেই একদিন এমন একটা ঘটনা ঘটল যে নাবিকদের মানে প্রথম একটা সন্দেহের সৃষ্টি হল। বলাবাহুল্য, যে সন্দেহটা তাদের হল সেটা খুব একটা সুবিধাজনক নয়।” –এই বলে থেমে গেল লোকটা। হয়তো-বা লোকটা এটা বোঝার জন্যই থামল যে কিংশুক গল্পের প্রতি মনোযোগী কি না?
লোকটা থেমে যেতেই কিংশুক বলে উঠল, “কী ঘটল লোহিত সাগরে?”
কিংশুক যে মনোযোগ দিয়ে তার গল্প শুনছে এটা বুঝতে পেরে লোকটা আবার বলতে শুরু করল, “হ্যাঁ, লোহিত সাগর দিয়ে সে সময় ‘গালফ অফ এডেন’-এর পথে এগোচ্ছিল জাহাজ। সেদিন সকাল থেকেই বৃষ্টি শুরু হয়েছে, তার সঙ্গে সমুদ্রের জলও ফুঁসে উঠতে শুরু করেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঝড়বৃষ্টির প্রাবল্যও বাড়তে থাকল। তারপর মাঝদুপুরে যেন কেউ কালো চাদর ঢেকে দিল সূর্যের গায়ে। অন্ধকার নেমে এল। তার সঙ্গে প্রবল বৃষ্টি, বাতাসের দাপট আর প্রবল জলোচ্ছ্বাস। এতবড় জাহাজটা সমুদ্রের বুকে মোচার খোলার মতো দুলতে থাকল। এ সময় কেউ ডেকে দাঁড়িয়ে থাকলে বাতাস বা উঠে আসা ঢেউয়ের ধাক্কায় সমুদ্রে ছিটকে পড়াও অসম্ভব নয়। ক্যাপ্টেন তাই সবাইকে ডেক ফাঁকা করে কেবিনে ঢুকে যেতে বলে শক্ত হাতে হালের চাকা ধরে বসলেন। উত্তাল সমুদ্রের বুকে দুলতে-দুলতে এগোতে থাকল জাহাজ।
হঠাৎই ক্যাপ্টেন তার আসনে বসেই ডেকের ওপর ভারী কিছু পতনের যেন শব্দ পেলেন। প্রাথমিক অবস্থায় তিনি ভেবেছিলেন, ডেকে যে বড়-বড় কাঠের পিপেগুলো রাখা আছে তারই কোনওটা হয়তো-বা জাহাজ কাত হওয়ায় উলটে গেছে। কিন্তু এরপরই তিনি কার যেন চিৎকার শুনলেন, ‘পড়ে গেছে! লোকটা পড়ে গেছে।’ বলে!
চিৎকারটা শুনে হালের চাকা একজন লোকের হাতে ধরিয়ে ডেকে বেরিয়ে এলেন ক্যাপ্টেন গ্রেস। বাইরে প্রবল বৃষ্টি। মাস্তুল থেকে নেমে আসা কাছিগুলো যেন চাবুকের মতো ডেকের ওপর আছড়ে পড়ছে। একটু অসতর্ক হলেই তার সঙ্গে জড়িয়ে যেতে হবে। তবুও সেই ভারী জিনিস পতনের শব্দ আর তারপর সেই চিৎকার শুনে ক্যাপ্টেনের মতোই আরও কয়েকজন ডেকে বেরিয়ে এল। আর যে লোকটা চিৎকার করেছিল সেও বেরিয়ে এল তার কেবিন ছেড়ে। ক্যাপ্টেনসহ সবাই ডেকের মাঝখানে জমায়েত হল। জাহাজের প্রতিটা মাস্তুলের মাথার দিকে আড়াআড়িভাবে একটা করে পাটাতন থাকে। যে জায়গায় দাঁড়িয়ে নাবিকরা পালের রশি টানে অথবা সমুদ্রের ওপর নজরদারি চালায়। দড়ির মই বেয়ে উঠতে হয় সে জায়গাতে। যে নাবিক চিৎকার করেছিল, সে আঙুল তুলে তৃতীয় মাস্তুলের সেই দাঁড়াবার জায়গাটা দেখিয়ে বলল, ‘ওখানে নজরদার দাঁড়িয়েছিল। সে এই ঝড়ের মধ্যে দু-হাত ছেড়ে দুলতে থাকা মাস্তুলের মাথায় তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আমি ভয় পেয়ে জানালাতে মুখ রেখে তাকে নীচে নামার জন্য বলতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু ঠিক তখনই মাস্তুলসমেত জাহাজটা প্রচণ্ড দুলে উঠল, আর পাহারাদার নীচে পড়ে গেল! আর তা দেখেই আমি পড়ে গেল’ বলে চিৎকার করলাম।’
কথাটা শুনে ক্যাপ্টেন বেশ আশ্চর্য হয়ে গেলেন। এই প্রচণ্ড ঝড়ের সময় ওই মাস্তুলের ওপরে কাউকে নজরদারি করতে পাঠানো মানে তাকে মৃত্যুর মুখে পাঠানো। ক্যাপ্টেন তেমন নির্দেশ কাউকে তো দেননি !
গ্রেস, নাবিককে প্রশ্ন করলেন, ‘ঠিক কেমনভাবে লোকটা দাঁড়িয়েছিল বললে?’
নাবিক জবাব দিল, ‘দু-হাত দু-পাশে পাখির ডানার মতো ছড়িয়ে সে দাঁড়িয়েছিল। সেজন্যই তো তাকে দেখে আমি বেশি ভয় পেয়েছিলাম। যদিও আমি তার মুখ দেখতে পাইনি।’
দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রাতে অনেক সময় নাবিকরা অবসাদগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যা করে। তবে কি আত্মহত্যা করার জন্য কোনো নাবিক ওই মাস্তুলে উঠেছিল? –এ কথাটা মনে হতেই বৃষ্টি আর বাতাসের মধ্যে উপস্থিত নাবিকদের নিয়ে ক্যাপ্টেন ছুটলেন, তিন নম্বর মাস্তুলের দিকে। সেখানে পৌঁছে বেশ অবাক হয়ে গেলেন তারা। কোনো লোক সেখানে পড়ে নেই! কিন্তু পতনের শব্দটাতো ক্যাপ্টেনও শুনেছেন। তবে কী সে মাটিতে পড়ার পর কোনোভাবে রেলিং টপকে ছিটকে পড়েছে জলে? ক্যাপ্টেন আর তার সঙ্গীরা ঠিক বুঝে উঠতে পারলেন না ব্যাপারটা কী হয়েছে। একটু ভেবে নিয়ে তিনি বললেন, ‘ঝড়ের দাপট কমলে, সবাইকে এক জায়গাতে জড়ো করে গুনতি করতে হবে। তা হলে বোঝা যাবে কে নেই?’
সঙ্গীদের এ কথা জানিয়ে ক্যাপ্টেন গ্রেস সে স্থান ত্যাগ করতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু হঠাৎই একটা শব্দ শুনে তিনি তাকালেন একটা কেবিনের দিকে। তার দরজার পাল্লাদুটো খোলা। বাতাসের দাপটে পাল্লা দুটো শব্দ করে কেবিনের দেওয়ালে বাড়ি খাচ্ছে। ওই কেবিনেই আছে কফিনবন্দি মমিটা। হয়তো-বা ঝড়বৃষ্টির দাপটে পাল্লার শিকল খুলে গেছে। তাই তিনি সেটা বন্ধ করার জন্য এগোলেন সেই কেবিনের দিকে।
কেবিনের কাছে পৌঁছে ক্যাপ্টেন দরজার শিকল তোলার আগে তাকালেন ভিতর দিকে। বড় কেবিনটার এক কোণে দেওয়ালের গায়ে একটা কাঠের তাকের ওপরে রাখা আছে কফিনটা। কিন্তু তার ডালাটা খসে মাটিতে পড়ে আছে। দরজার শিকলের মতোই জাহাজের দুলুনিতে কফিনের ডালাটা মেঝেতে পড়েছে ভেবে ডালাটাকে যথাস্থানে স্থাপন করার জন্য কেবিনের ভিতর প্রবেশ করলেন ক্যাপ্টেন। কয়েকজন লোকও তার সঙ্গে ঢুকল কেবিনে। কিন্তু কফিনের কাছে গিয়ে মাটি থেকে কফিনের ডালাটা তুলে বসাবার সময় একটা অদ্ভুত জিনিস সবাই দেখতে পেল। মমিটার দেহ জলে ভিজে সপসপ করছে। যেন ক্যাপ্টেনের মতোই প্রবল বৃষ্টিতে ভিজছিল মমিটা! কিন্তু জল কোথা থেকে এল? মাথার ওপরের ছাদ, পায়ের নীচের পাটাতন বা দেওয়ালের গায়ে জলে কোনো চিহ্ন দেখতে পেলেন না ক্যাপ্টেন বা তার সঙ্গীরা। যাইহোক, এরপর তারা কফিনের ডালা বন্ধ করে বাইরে বেরিয়ে কেবিনের দরজাতে আগের মতো শিকল তুলে দিলেন।
বিকেলের দিকে বৃষ্টি একটু কমলে ক্যাপ্টেন নাবিকদের এক জায়গাতে জড়ো করে তাদের গুনতি করলেন। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার তিনি দেখলেন, একজনও লোক কম নেই জাহাজে!
রাতে নিজের কেবিনে শুয়ে ক্যাপ্টেন ভাবতে লাগলেন, ‘কেউ যদি ডেকে আছড়ে না-পড়ে থাকে তবে সবাই কীসের শব্দ শুনল? নাবিক তো দৃঢ়ভাবেই বলছে সে ওপর থেকে একজনকে পড়তে দেখেছে। আর মমিটাও-বা ভিজল কীভাবে?’
ক্যাপ্টেনের মতো তার সঙ্গী নাবিকরাও একই কথা ভাবতে-ভাবতে নিজেদের কেবিনে শুয়ে অস্বস্তিবোধ করতে লাগল।
রাত কেটে গিয়ে ভোর এল একসময়। টানা তিনদিন পর ঝড়-ঝঞ্ঝা মুছে গিয়ে ঝলমলে রোদ উঠল। বেলা একটু বাড়লে, চড়া রোদ উঠলে ক্যাপ্টেন গিয়ে মমিটাকে কফিনসমেত বার করে আনলেন সেটাকে রোদে শুকাবার জন্য। কারণ মমিটা যদি পচে নষ্ট হয়ে যায় তবে অনেক টাকা হাতছাড়া হবার সম্ভাবনা। সারা দিন মমিটাকে রোদ খাওয়াবার পর তাকে আবার যথাস্থানে রেখে এসে দরজার শিকল তুলে দেওয়া হল। দিনরাত্রি পেরিয়ে জাহাজ এগিয়ে চলল নিজের নিয়মে।”
একটানা অনেকক্ষণ কথা বলে কিছুক্ষণের জন্য থামল লোকটা। নদীর বুকে অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা জাহাজের মাথায় জ্বলতে-থাকা লাল আলোগুলো কেমন যেন একটা ভূতুড়ে পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। নদীর বুক থেকে ভেসে আসছে বাতাস আর জলের শব্দ। কিংশুকের মাথার ওপরের নখের ফালির মতো চাঁদটা যত না আলো ছড়াচ্ছে, তার চেয়ে বেশি যেন অন্ধকারের সৃষ্টি করছে এই পরিত্যক্ত জেটির চারপাশে। কিংশুক বেশ মন দিয়ে শুনে চলেছে লোকটার গল্প। নদীর দিকে কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে থাকার পর লোকটা আবার বলতে শুরু করল—
“জাহাজ এগিয়ে চলল ঠিকই, কিন্তু নাবিকদের মনে কোথাও যেন একটা অদ্ভুত অস্বস্তি অথবা ভয় দানা বাঁধতে শুরু করল ধীরে-ধীরে। শ্বেতাঙ্গ হোক অথবা কৃষ্ণবর্ণের, সে যুগের সাধারণ মাল্লারা প্রায়ই অশিক্ষিত হত। ভূতপ্রেতে তাদের অগাধ বিশ্বাস থাকত। আসলে পরপর দুটো ঘটনা তাদের মনে ভয়ের বীজ রোপণ করেছিল। সেই ভয়ই নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা ও নানান পুরোনো গল্পের সূত্র ধরে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতোই পল্লবিত হতে শুরু করল। এবং অতি স্বাভাবিকভাবেই তাদের মনে এ ধারণা জন্মাল যে নিশুতি-রাতে বা আঁধার নামা প্রবল বর্ষণের দুপুরে যাকে দেখা গেছে সে আর কেউ নয়, ওই প্রাচীন মমিটাই। এরপর মাঝে মাঝে অনেক মাল্লাই দাবি করতে শুরু করল, তারা নাকি সেই মিশরীয় লোকটাকে দেখতে পেয়েছে! কেউ তাকে দেখেছে ডেকে রাখা পিপের ওপর বসে থাকতে। ক্যাপ্টেন গ্রেসের কানে নাবিকদের কথাবার্তা অল্পবিস্তর যেতে লাগল। গ্রেস নিজে এসব ভূতপ্রেত-অপদেবতায় বিশ্বাস করেন না। যদিও সেই বর্ষণসিক্ত দুপুরের ঘটনাটা তাঁর নিজের কাছেও অমীমাংসিত থেকে গেছে। তবুও তিনি মনে করতেন ওই মমিকে দেখতে পাওয়ার ব্যাপারটা অশিক্ষিত নাবিকদের মনের কল্পনা থেকে ঘটা দৃষ্টিবিভ্রম। তবুও ক্যাপ্টেন একদিন সেই কেবিনের দরজার বাইরের শিকলে একটা তালা ঝুলিয়ে এলেন। কিন্তু আতঙ্কের পরিবেশ যখন সৃষ্টি হয় তখন মানুষ চারপাশে সব ঘটনার মধ্যেই আতঙ্কের কারণ খুঁজে পায়। তাই মমির কেবিনে ক্যাপ্টেনের তালা ঝুলিয়ে আসা দেখে নাবিকরা মনে করল, তবে কি সত্যিই ওই মমি ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসছে? সে যাতে বাইরে বেরিয়ে আসতে না পারে, তারজন্যই কি তালা ঝোলালেন ক্যাপ্টেন ? কিন্তু দরজাতে তালা ঝুলিয়ে কি প্রেতের গতিরুদ্ধ করা সম্ভব? সে তো সূক্ষ্মদেহ ধারণ করতেও সক্ষম!
নাবিকদের মনে আতঙ্ক আরও ঘনীভূত হতে লাগল। সূর্যাস্তের পর অনেক সময় নাবিকরা বসে গল্পগুজব করে। কিন্তু আতঙ্কের কারণে অন্ধকার নামলেই ডেক শূন্য হয়ে যেতে লাগল। নিতান্ত প্রয়োজনে যদি কাউকে রাতে ডেকে থাকতে হয় তবে সে সঙ্গে অন্য নাবিকদের নিয়ে থাকে। এভাবেই প্রায় মাসখানেক অতিক্রান্ত হল। রেড সী বা লোহিত সাগর অতিক্রম করে জাহাজ পৌঁছোল গালফ অফ এডেনে। এই গালফ অফ এডেন অতিক্রম করলেই ওথেলোর ক্যাপ্টেন পৌঁছে যাবেন ভারত মহাসাগরে। সেখান থেকে পশ্চিম দিকে মোটামুটি সোজা এগোলেই মশলা দ্বীপ বা মলাক্কা দ্বীপ।
কিন্তু ভারত মহাসাগরের প্রবেশ পথে গালফ অব এডেনেই ঘটল একটা মারাত্মক ঘটনা। যা কাঁপন ধরিয়ে দিল নাবিকদের বুকে। আর ক্যাপ্টেন গ্রেসও হতভম্ব হয়ে গেলেন ব্যাপারটাতে।
আর কয়েকদিনের মধ্যেই তখন ভারত মহাসাগরে পৌঁছোবে জাহাজ। একদিন সকালে চিফ-মেট মার্টিমার ক্যাপ্টেন গ্রেসের কেবিনে এসে বলল, ‘টমাস নামের রাতপ্রহরী বলছে, কাল রাতে নাকি সে ওই মমিটাকে আবার দেখেছে! নাবিকরা কেউ আর রাত-পাহারা দেবে না বলছে। একসঙ্গে দু-তিনজন মিলেও দিতে চাইছে না।’
কথাটা শুনে ক্যাপ্টেন গ্রেস বিচলিত বোধ করলেন। তিনি বললেন, ‘এ তো মহাসমস্যার ব্যাপার! আর দু-দিন পর জাহাজ ভারত মহাসাগরে পড়তে চলেছে, জানোই তো ওখানে বেশ কিছু জায়গাতে পোর্তুগিজ জলদস্যুদের আখড়া আছে। তখন শুধু ডেকেই নয়, দিনরাত মাস্তুলে বসে সমুদ্রে নজরদারি চালাতে হবে। নইলে যে কোনো মুহূর্তে বিপদ ঘনিয়ে আসতে পারে! এখন কী করা যায় বলো তো?’
মার্টিমার বলল, ‘নাবিকদের জোর করে কিছু করাতে গেলে বিপত্তি হতে পারে। এমনকী বিদ্রোহও ঘোষণা করতে পারে। তখন আর এক সমস্যা।’
‘তবে কী করা যায়?’ সহকারীর কাছে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন ক্যাপ্টেন গ্রেস।”
মার্টিমার বলল, ‘এমন কিছু একটা করতে হবে যাতে নাবিকদের মনের ভয় কেটে যায়। যাতে তারা বুঝতে পারে যে চার হাজার বছরের প্রাচীন মৃতদেহ কোনোদিন জীবন্ত হয়ে উঠতে পারে না। তারা যা দেখেছে বা শুনেছে, সবই তাদের মনের ভুল। তবেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।’
কিন্তু কীভাবে নাবিকদের মনের ভয় কাটানো যাবে? ভাবতে লাগল তারা দু’জন। ভাবতে-ভাবতেই হঠাৎ একজনের কথা মাথায় এল ক্যাপ্টেনের, তার সঙ্গে একটা পরিকল্পনাও তার মাথায় খেলে গেল। তিনি চিফ-মেটকে বললেন, ‘তুমি একবার বয়লার ঘরের সর্দার-ডেভিডকে আমার কাছে নিয়ে এসো। আমার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলছে।’
ক্যাপ্টেনের নির্দেশ পালন করতে বয়লার-রুমের দিকে রওনা হল মার্টিমার।
আমি যে সময়ের কথা বলছি সে সময় ইউরোপীয়, বিশেষ করে ব্রিটিশ জাহাজগুলোতে বেশ কিছু এমন মানুষ থাকত যারা আসলে দাগী অপরাধী বা খুনে। সমুদ্র অভিযানে নানা বিপত্তি, এমনকী জীবনহানিরও প্রভূত সম্ভাবনা থাকত। জাহাজডুবি, স্কার্ভিরোগ, জলদস্যুর আক্রমণ, নাবিকদের নিজেদের মধ্যে লড়াই—এসব নানা কারণে অনেক নাবিকই শেষ পর্যন্ত অভিযান শেষ করে নিজ দেশে আর ফিরে আসতে পারত না। তাই সাধারণ ভদ্রজনের বেশিরভাগেরই সমুদ্রযাত্রায় অনীহা ছিল। কিন্তু জাহাজ যদি দূরদেশে পাড়ি না-দেয় তবে ইংল্যান্ড-রাজের আর্থিক ক্ষতি। তাই ইংল্যান্ডের কারাগার থেকে কিছু কুখ্যাত অপরাধীকে এই শর্তে মুক্তি দেওয়া হত যে তারা নৌযাত্রায় অংশ নেবে। এ লোকগুলো আর ইংল্যান্ড ফিরে না-গেলেও দেশের কোনো ক্ষতি হত না। আবার এভাবে এই অপরাধীকে জাহাজে তুলে দিয়ে তাদের দায়ভার থেকে দেশ মুক্ত হত ও জাহাজ যাত্রাকে সচল রাখা হত। এই ডেভিড লোকটা তেমনই। লুটপাট ও খুনের অভিযোগে লোকটা বন্দি ছিল টাওয়ার অব লন্ডনের কারাগারে। তারপর সে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পেয়ে ওথেলো জাহাজে স্থান পেয়েছে। লোকটা যেমন সাহসী তেমনই দুর্ধর্ষ প্রকৃতির। এ জাহাজের সবথেকে সাহসী লোক তাকেই বলা যায়৷
কিছুক্ষণের মধ্যেই মার্টিমারের সঙ্গে ক্যাপ্টেনের কেবিনে এসে হাজির হল ডেভিড। দানবের মতো চেহারা তার। পেশিবহুল হাতের পাঞ্জাগুলো এত বড় যে তা দিয়ে যেন সে বাঘের গলা টেনে ছিঁড়ে ফেলতে পারে। সারাক্ষণ বয়লার-ঘরে কয়লা ঠেলার কাজে নিয়োজিত থাকার কারণে তার শরীরে কয়লার গুড়োর আস্তরণ জমে তার চেহারা এমন বর্ণ ধারণ করেছে যে তাকে দেখে মনে হয় সে সত্যি একজন কালো দানব। ক্যাপ্টেনের ঘরে ঢুকে সে সেলাম ঠুকে দাঁড়ালো।
গ্রেস কিছুক্ষণ দেখার পর তাকে প্রশ্ন করল, ‘তুমি ভূত-প্রেত-মমি, এসবে বিশ্বাস কর? ভয় পাও?’
নাবিক-ডেভিড বেশ দৃঢ়ভাবে বলল, ‘হুজুর আমি ইংল্যান্ডের রাজা আর জাহাজের ক্যাপ্টেন ছাড়া কাউকে ভয়ও করি না, পরোয়াও করি না।’
ডেভিডের কথা শুনে আনন্দিত হলেন ক্যাপ্টেন, তিনি তাকে বললেন, ‘যদি আমি তোমাকে ওই মমির কেবিনে তার সঙ্গে একরাত কাটাতে বলি, থাকতে পারবে? দরজা বাইরে থেকে তালা বন্ধ থাকবে কিন্তু। অবশ্য এ-কাজের জন্য আমি তোমাকে নগদ পাঁচ পাউন্ড আর একটা কড়া পানীয়ের বোতল বকশিস দেব।’
পাউন্ড আর পানীয়ের কথায় বেশ উৎসাহিত হয়ে বলল, ‘নিশ্চয়ই পারব হুজুর। কবে থাকতে হবে বলুন?’ ডেভিডের সঙ্গে মমির কেবিনে রাত্রিবাসের ব্যাপারটা চূড়ান্ত হয়ে গেল।
সেদিন বিকেলে জাহাজের সবাইকে এক জায়গাতে জড়ো করে তিনি তাদের উদ্দেশে বললেন, ‘তোমরা মমিটার ব্যাপারে যা ভাবছ বা যা দেখেছ, তা সবই তোমাদের মনের ভুল। এই যে ডেভিডকে তোমরা দেখছ, এ আজ রাত কাটাবে মমির কেবিনে। কাল ভোরে যখন ও কেবিন ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসবে, আশা করি তখন তোমরা ভয়-মুক্ত হবে। তোমাদের সামনেই ওকে ওই কেবিনে ঢোকানো হবে। বাইরে থেকে তালাও বন্ধ করা হবে।’
এরপর বিকেল গড়িয়ে যখন সূর্যাস্তের সময় হল তখন ডেভিড আর বেশ কিছু নাবিককে নিয়ে ক্যাপ্টেন হাজির হলেন মমির কেবিনের সামনে। দরজার তালা খুললেন তিনি। পাল্লা খোলার পর সবাই দেখল আধো অন্ধকার ঘরের কোণে দেওয়ালের গায়ে একইভাবে রয়েছে সেই তালাবন্দি কফিনটা। ডেভিডের হাতে একটা থলে। তার মধ্যে রাখা আছে মোমবাতি, খাবার, ইতিমধ্যে ক্যাপ্টেনের হাত থেকে হস্তগত করা, কড়া পানীয়ের বোতলটা। যদিও ডেভিড অত্যন্ত সাহসী তবুও তার মনোবল আরও বাড়াবার জন্য সে ঘরে ঢোকার আগে একটা পার্কাসন পিস্তল ক্যাপ্টেন তার হাতে ধরিয়ে দিলেন। পিস্তলের নলের মুখে একটা ফুঁ দিয়ে উপস্থিত নাবিকদের উদ্দেশে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ছুঁড়ে দিয়ে ডেভিড বলল, ‘নেহাত ওই কফিন বাক্সটা দুজনের ঘুমাবার পক্ষে ছোট, নইলে দুজনে একসঙ্গেই বাক্সটার মধ্যে শুতে পারতাম।’ –এ কথা বলে সে ঘরের ভিতর ঢুকে গেল। দরজা বন্ধ করে বাইরে থেকে তাতে বিরাট একটা তালা ঝুলিয়ে দিলেন ক্যাপ্টেন। আর তার চাবিটা তিনি তুলে দিলেন মাল্লাদের সর্দার বুড়ো-ফার্গুসনের হাতে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সূর্য ডুবে গিয়ে অন্ধকার নামতে শুরু করল। আর নাবিকরা উৎকণ্ঠিতভাবে রওনা হল নিজেদের কেবিনের দিকে।
রাত নামল এডেন উপসাগরে। নিজেদের কেবিনে শুয়ে বসে নাবিকরা প্রতীক্ষা করতে লাগল মমির কেবিন থেকে কোনো শব্দ ভেসে আসে কি না তা শোনার জন্য। একটু বেশিরাতের দিকে কেবিনের ভিতর থেকে যে শব্দটা ডেকে ভেসে বেড়াতে লাগল তা হল ডেভিডের হেঁড়ে গলার গান। কড়া পানীয় পান করার পর ফুর্তিতে গান ধরেছে সে। ক্যাপ্টেন-গ্রেস আর চিফ-মেট মার্টিমার তখন একসঙ্গে নৈশভোজ সাঙ্গ করছিলেন। ডেভিডের কণ্ঠস্বর কানে যেতেই উৎফুল্ল ক্যাপ্টেন বললেন, ‘ফন্দিটা কেমন বার করেছি বলো? কাল থেকে কেউ রাত-পাহারার কাজ না-করতে চাইলে তাকে ওই কেবিনে পুরে দেবো। তারপর দেখব তার ভয় কাটে কিনা?’
মার্টিমার হেসে বলল, ‘এত বুদ্ধি ধরেন বলেই তো ক্যাপ্টেন।’
ডেভিডের গান কানে যাওয়াতে নাবিকদের অনেকেই স্বস্তিবোধ শুরু করল। সেই গান শুনতে-শুনতে খাওয়া সেরে অনেক নাবিকই ঘুমিয়ে পড়ল। দীর্ঘক্ষণ গান গাইবার পর থামল ডেভিড। তারপর সারা জাহাজে নিস্তব্ধতা নেমে এল। নৈশভোজ সাঙ্গ হবার পর নিজের কেবিনে ভারত মহাসাগরের নৌ-মানচিত্র খুলে কিছুক্ষণ কাজ করলেন ক্যাপ্টেন। সামনেই সে-পথ পাড়ি দিতে হবে তাকে। তারপর একসময় তিনি নিজেও শুয়ে পড়লেন।
তখন শেষ রাত। একটা শব্দে ঘুম ভেঙে গেল ক্যাপ্টেনসহ বেশ কয়েকজন নাবিকের। দুম দুম শব্দ। বন্ধ কেবিনের ভিতর থেকে বাইরে বেরোবার জন্য দরজা ধাক্কা দিচ্ছে ডেভিড! আর এরপর তার কণ্ঠস্বরও কানে গেল। সে চিৎকার করছে, ‘দরজা খোলো ! দরজা খোলো!’ বলে!
তার চিৎকার শোনামাত্রই ক্যাপ্টেন রাত-পোশাকেই দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলেন। তার হাতে একটা দো-নলা পিস্তল। ডেভিডের ধাক্কাবার আওয়াজ আর চিৎকার শুনে কেউ-কেউ তাদের কেবিনের জানালা খুলেছিল। ক্যাপ্টেনকে দেখতে পেয়ে তাদের মধ্যে কেউ-কেউ বাইরে বেরিয়েও এল। তাদের মধ্যে মাল্লাদের সর্দার ফার্গুসন ও আছে, মার্টিমারও আছে। যারা ঘরের বাইরে বেরোলো তাদের সঙ্গে কমবেশি অস্ত্র আছে। যেমন ফার্গুসনের হাতে ছোরা, মার্টিমারের হাতে পিস্তল। ওদিকে দরজা ধাক্কা দিতে দিতে দরজা খোলার জন্য চিৎকার করেই চলেছে ডেভিড। তার কণ্ঠস্বরে ভয়ের ভাব স্পষ্ট।
অন্য নাবিকরা ক্যাপ্টেনের কাছে আসার পর যখন একটা মশাল জ্বালিয়ে সবাই সেই তিন নম্বর মাস্তুলের দিকে এগোতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই ‘দুম’ করে একটা শব্দ শোনা গেল, সেই কেবিনের ভিতর থেকে! তারপর ডেভিডের চিৎকার, দরজা ধাক্কানোর শব্দ সব থেমে গেল। ক্যাপ্টেন গ্রেস চিৎকার করে তার উদ্দেশে বললেন, ‘এখনই দরজা খুলছি। তুমি ঘাবড়িও না।’
কিন্তু ক্যাপ্টেনের কথার জবাবে সেই কেবিনের ভিতর থেকে কোনো উত্তর এল না। চারপাশ কেমন যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
ক্যাপ্টেনরা যথাসম্ভব দ্রুত পৌঁছে গেলেন সেই কেবিনের সামনে। ফার্গুসন চাবি দিয়ে দরজা খোলার সঙ্গে-সঙ্গেই সবাই হুড়মুড় করে সেই কেবিনে প্রবেশ করল। মশালের উজ্জ্বল আলোতে সবাই দেখতে পেল দরজার সামনেই চিৎ হয়ে পড়ে আছে ডেভিড। রক্তে ভেসে যাচ্ছে তার মাথার পাশটা। তখনও তার ডানহাতে ধরা আছে পিস্তলটা। তার কিছুটা তফাতেই পড়ে আছে পানীয়ের শূন্য বোতল। ভালো করে তার দিকে তাকিয়ে ব্যাপারটা সবাই বুঝতে পারল। পিস্তল দিয়ে নিজেই নিজের কপালে গুলি চালিয়েছে ডেভিড।
তখনও প্রাণ আছে ডেভিডের শরীরে। মাঝে-মাঝে কেঁপে উঠছে সে। ক্যাপ্টেন ঝুঁকে পড়ল তার মুখের ওপর। আতঙ্কের স্পষ্ট ছাপ ডেভিডের মুখে। তার চোখ দুটো যেন অক্ষিকোটর ছেড়ে ঠিকরে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। ক্যাপ্টেন তাকে প্রশ্ন করলেন, ‘কী হয়েছে? তুমি নিজেকে গুলি চালালে কেন?’
ক্যাপ্টেনের কথা সম্ভবত বুঝতে পারল মৃত্যুপথযাত্রী ডেভিড। কোনোরকমে বাঁ হাতটা একটু ওপরে তুলে ঘরের কোণের দিকটা একবার দেখাল। তারপর তার হাতটা আছড়ে পড়ল মাটিতে। ডেভিডের শরীরটা কয়েকবার মোচড় দিয়ে উঠে চিরদিনের জন্য স্থির হয়ে গেল। ডেভিড যেদিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করল সেদিকেই কফিনটা রাখা। সবাই ভয়ার্ত চোখে তাকাল সে দিকে। ক্যাপ্টেন দেখলেন, কফিনের ডালাটা আবার মাটিতে খসে পড়েছে। পিস্তল উঁচিয়ে ক্যাপ্টেন এগোলেন কফিনটার দিকে। অন্যরা নিরাপদ দূরত্বেই দাঁড়িয়ে রইল। কফিনের কাছে পৌঁছে তার ভিতর উঁকি দিলেন গ্রেস। তিনি দেখলেন মমিটা শুয়ে আছে ঠিকই, কিন্তু যেন কিছুটা পাশ ফিরে শুয়ে আছে। কিন্তু এমনভাবে তো শোয়ানো ছিল না। পাছে মমিটাকে এভাবে দেখলে আরও আতঙ্ক ছড়ায় তাই ক্যাপ্টেন তাড়াতাড়ি ডালাটা মাটি থেকে তুলে কফিনের ওপর বসিয়ে দিলেন। এরপর ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এসে দাঁড়াল সবাই। ক্যাপ্টেন ভাবতে লাগলেন, কোন আতঙ্ক থেকে বাঁচতে আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেন ডেভিডের মতো অমন দুর্ধর্ষ প্রকৃতির লোক। সে কি নেশার ঘোরে কিছু ভুল দেখে আত্মহত্যা করল, না কি সত্যিই মমিটা জীবন্ত হয়ে উঠেছিল? নিজের মনকে প্রবোধ দেওয়ার জন্য প্রথম সম্ভাবনাটাই ভাবতে লাগলেন। তিনি নিজের মনকে বলতে লাগলেন, ‘জাহাজের দুলুনিতে কফিনের ডালাটাতো খুলে যেতেই পারে। আর মমিটাও তো কাত হতে পারে তাই না? অথবা হয়তো ডেভিডই নেশার ঘোরে কফিন বাক্স খুলে মমিটা নিয়ে নাড়াচাড়া করেছিল।’
কিন্তু ক্যাপ্টেন নিজের মনকে যে-ভাবেই বোঝাবার চেষ্টা করুন না কেন, অন্য নাবিকদের মনে কিন্তু এই ধারণাই বদ্ধমূল হল যে মমিটা জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। আর তার আতঙ্ক থেকেই মুক্তি পেতে আত্মহত্যা করেছে ডেভিড।
ভোরের আলো ফুটল একসময়। ডেভিডের মৃতদেহ ক্যাপ্টেনের নির্দেশে সে ঘর থেকে বার করে এনে ডেকের ওপর রাখা হল। জাহাজে যেখানে যত নাবিক ছিল তারা এসে ডেকে উপস্থিত হয়ে ভিড় করে দাঁড়ালো ডেভিডের দেহটাকে। সবার মুখেই ফুটে উঠেছে আতঙ্কের ছাপ। আর ক্যাপ্টেন ডেভিডের মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলেন, ‘এ কীভাবে হল? কেন হল?’
ব্যাপারটা যেন ঠিক বিশ্বাস করেও উঠতে পারছেন না তিনি। একসময় মার্টিমার চাপা-স্বরে ক্যাপ্টেনের উদ্দেশে বললেন, ‘ডেভিডের দেহটা যতক্ষণ পড়ে থাকবে, ততক্ষণ কিন্তু উত্তেজনা বাড়তে থাকবে।’
হুঁশ ফিরল ক্যাপ্টেনের। তিনি ফার্গুসনকে বললেন, ‘ওর দেহ সৎকারের ব্যবস্থা করো।’
চলমান জাহাজে নাবিকদের দেহ সৎকারের জন্য একটাই ব্যবস্থা থাকে। তা হল একটা ছোট কাঠের ক্রুশ বুকে বেঁধে দেহটা সমুদ্রে ভাসিয়ে দেওয়া। সেটাই খ্রিস্টান জাহাজের নিয়ম। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হল না। ডেভিডের দেহে একটা ক্রশ বাঁধা হল। তারপর কয়েকজন মাল্লা দেহটাকে নিয়ে জাহাজের গায়ের দড়ির মই বেয়ে নীচে নেমে সমুদ্রে ভাসিয়ে দিয়ে এল।
দেহ ভাসিয়ে রেলিং টপকে লোকগুলো ডেকে ফিরে আসার পর ক্যাপ্টেন নির্দেশ দিলেন, ‘এবার যে-যার নিজের কাজ শুরু করো। দুদিনের মধ্যেই জাহাজ ভারত মহাসাগরে পড়বে। প্রবল হাওয়া বয় সেখানে। পালের দড়িগুলো কষে বেঁধে রাখা দরকার।’
ক্যাপ্টেনের নির্দেশ শুনে ফার্গুসন বলল, ‘হ্যাঁ, বাঁধব ঠিকই। কিন্তু তার আগে একটা কাজ বাকি আছে। সেটা করা দরকার।’
ক্যাপ্টেন প্রশ্ন করলেন, ‘কী কাজ?’
ফার্গুসন বলল, ‘ওই মমিটাকে এখনই সমুদ্রে ছুড়ে ফেলতে হবে। ওই ডেভিডের প্রাণ নিল। ও জাহাজে থাকলে আরও মানুষের প্রাণ যাবে।’
সর্দার মাল্লার কথা সমর্থন করে নাবিকরা সমস্বরে চিৎকার করতে থাকল, ‘ছুড়ে ফেলে দাও, এখনই ছুড়ে ফেলতে হবে ওই পিশাচের দেহটাকে।’
নাবিকরা প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে উঠেছে দেখে, একটু ইতস্তত করে ক্যাপ্টেন শেষ পর্যন্ত বললেন, ‘ঠিক আছে তোমাদের যা ইচ্ছা হয় তাই করো। তবে কিন্তু আমি এখনও বলছি, মমি জীবন্ত হয়ে উঠতে পারে না।’
তখন আর নাবিকরা যুক্তি দিয়ে কোনো কিছু বোঝার অবস্থাতে নেই। কয়েকজন একটু সাহসীগোছের নাবিক কেবিনের ভিতর ঢুকে কফিনবাক্সটা বাইরে বার করে আনল। সেটা রাখা হল তৃতীয় মাস্তুলের ঠিক নীচে। কে একজন বলল, ‘কাঠের বাক্সসমেত ওকে নীচে ফেললে সেটা ভাসতে থাকবে। বলা তো যায় না। সে আবার জাহাজেই উঠে এল। ওর গায়ে লোহার খণ্ড বেঁধে জলে ফেলতে হবে।’
একজন বলল, ‘জলে ফেলার আগে ওই দেহটা ভেঙেও ফেলতে হবে। যাতে কোনোভাবে ও সাঁতরাতে না-পারে।’
সবাই বলল, ‘হ্যাঁ, তাই করো, তাই করো। দেহটার সব হাড়গোড় ভেঙে তারপর লোহার টুকরো বেঁধে জলে ফেলে দাও।’
পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করার জন্য ফার্গুসন লাথি মেরে বাক্সের ডালাটা খুলে ফেলল । ভিতরে পাশ ফিরে শুয়ে আছে মমিটা। ডেভিডের মৃত্যুতে বয়লার ঘরে তার এক সহকারী প্রচণ্ড খেপে উঠেছিল। একটা লোহার দণ্ড নিয়ে সে এগিয়ে এল কফিনটার দিকে ক্যাপ্টেন গ্রেস আর তার সহকারী মার্টিমার অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলেন নাবিকদের কাণ্ডকারখানা।
মৃত ডেভিডের সহকারী লোহার দণ্ড দিয়ে প্রথমে আঘাত হানেন মমিটার পায়ের দিকে। সেই আঘাতে কফিনের মধ্যে উপুড় হয়ে গেল মমিটা। উল্লাস করে উঠল নাবিকরা। হেনরি নামের সেই নাবিক এর পর দ্বিতীয় আঘাতটা হানল মমির পিঠে। থরপর করে কেঁপে উঠল মমিটা। আবারও উল্লাসে চিৎকার করে নাবিকরা বলে উঠল, ‘ওর মাথাটা এবার গুঁড়িয়ে দিল।’
হেনরি লোহার দণ্ডটা তুলল, মমিটার মাথা লক্ষ করে সেটা নামিয়ে আনার জন্য। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই একটা ঘটনা ঘটল, হঠাৎ মাথার ওপর একটা মচমচ শব্দ শোনা গেল। হেনরি তার হাতের দণ্ডটা মমির মাথায় নামিয়ে আনার আগেই তিন নম্বর মাস্তুলের উপরের অংশটা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল নীচের দিকে। তার আঘাতে ছিটকে পড়ল হেনরি। আর তার সঙ্গে আরও একটা ঘটনা ঘটল। মাস্তুল দড়িদড়াসমেত আছড়ে পড়ার অভিঘাতে মমিটা ছিটকে উঠল কফিনের থেকে। একটা কাছির গায়ে এমনভাবে সে গিয়ে পড়ল যে দেখে মনে হল সে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল।
আর সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেল চিত্রটা। কে যেন চিৎকার করে উঠল, ‘মমি জ্যান্ত হয়ে উঠেছে। পালাও পালাও।’
সঙ্গে-সঙ্গে দুড়দাড় করে নাবিকরা কেউ কেবিনের দিকে বা খোলের দিকে পালাতে শুরু করল নাবিকরা। এবার যেন সম্বিত ফিরে পেলেন ক্যাপ্টেন। না, এভাবে আর অশিক্ষিত নাবিকদের কাছে মাথা নত করা চলে না। আর কী প্রমাণ আছে যে মমিটা জীবন্ত হয়ে ওঠে? আর সেটা যদি জীবন্ত হয়ে ওঠে তা নিজের চোখে ক্যাপ্টেনের চাক্ষুষ করা দরকার। নাবিকরা বললেই কি মমিটা জলে ফেলে দিতে হবে? –একথা ভেবে মুহূর্তের মধ্যে ক্যাপ্টেনের আত্মমর্যাদাবোধ জেগে উঠল। ক্যাপ্টেনই হলেন জাহাজের শেষ কথা। হ্যাঁ, তিনি যা বলবেন তেমনই চলতে হবে নাবিকদের।
কোমর থেকে পিস্তল বার করে শূন্যে গুলি চালালেন ক্যাপ্টেন। তারপর নাবিকদের উদ্দেশে বললেন, ‘থামো সব থামো।’
তার কণ্ঠস্বর শুনে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল নাবিকরা। পিস্তল উঁচিয়ে ক্যাপ্টেন কর্কশ-স্বরে নাবিকদের বললেন, ‘এতক্ষণ ধরে তোমাদের অনেক বেয়াদবি সহ্য করলাম, আর নয়। মমিটা এবার থেকে আমার কেবিনেই থাকবে। যতদিন না আমি প্রমাণ পাব যে মমিটা জীবন্ত, ততদিন মমিটা জাহাজেই থাকবে।’
ক্যাপ্টেন একথা বলার পর ফার্গুসন ক্যাপ্টেনের কথার প্রতিবাদ জানিয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই ক্যাপ্টেন তার দিকে এগিয়ে গিয়ে সজোরে একটা চড় কষালেন মাল্লা-সর্দারের গালে। জাহাজের কাছির ওপর ছিটকে পড়ল ফার্গুসন। এরপর ক্যাপ্টেন নাবিকদের উদ্দেশে বললেন, ‘ফের যদি কারও মধ্যে এতটুকুও বেচাল দেখি তবে আর চড় নয়, সটান বুকে গুলি করে সমুদ্রে ভাসিয়ে দেব। যাও যে-যার কাজে যাও। আর কালকের মধ্যেই ভাঙা মাস্তলটা ঠিক করে ফেলবে।’
ক্যাপ্টেনের এমন রুদ্রমূর্তি এর আগে দেখেনি ওথেলো জাহাজের নাবিকরা। বিশেষত তাদের সর্দারকে ক্যাপ্টেন গ্রেস প্রকাশ্যে চড় মারাতে ভয় পেয়ে গেল নাবিকরা। তারা ধীরে-ধীরে যে-যার কাজে ফিরে যেতে লাগল। কয়েকজন লেগে পড়ল ভাঙা মাস্তুলটা ঠিক করার কাজে। ক্যাপ্টেনের নির্দেশ পালন করে চিফ-মেট মার্টিমার আর কয়েকজন নাবিক মমিটাকে আবার কফিন-বন্দি করে ক্যাপ্টেনের কেবিনে পৌঁছে দিল। দু-দিন পর ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করল ক্যাপ্টেন গ্রেসের জাহাজ।”
একটানা কথা বলে থামল কিংশুকের কিছুটা তফাতে আধো-অন্ধকারে বসে থাকা লোকটা। মন্ত্রমুগ্ধের মতো লোকটার কাহিনি শুনে চলেছে কিংশুক। লোকটা থামতেই কিংশুক বলল, “আপনি এত সুন্দরভাবে গল্পটা বলে চলেছেন, শুনে মনে হচ্ছে আপনি নিজেই যেন ওই মমির জাহাজে উপস্থিত ছিলেন।”
যদিও লোকটার মুখ অন্ধকারে বোঝা যাচ্ছে না, তবুও কিংশুকের যেন মনে হল লোকটা তার কথা শুনে হাসল। এরপরই সেই পরিত্যক্ত জেটির কাছে নদীর পার থেকে কোথাও শিয়ালের ডাক ভেসে এল। তা শুনে লোকটা বলল, “শেষ প্রহরের শিয়ালের ডাক। রাত্রি শেষ হবে। তবে, আমার কাহিনিও শেষ হতে চলেছে। কারণ, ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করেছে ক্যাপ্টেন গ্রেসের জাহাজ।”
এরপর কয়েক-মুহূর্ত চুপ করে থেকে লোকটা বলতে শুরু করল তার কাহিনির শেষ অংশ—
“বেশ কয়েকদিন কেটে গেছে ভারত মহাসাগরের বুকে। সেদিনের সেই গোলযোগের পর বেশ ক-টা দিন নিরুপদ্রবভাবেই কেটে গেছে। নাবিকদের মনের ভিতর মমিটাকে নিয়ে আতঙ্ক থাকলেও ক্যাপ্টেনের ভয়ে তার বহিঃপ্রকাশ দেখাতে সাহস পাচ্ছে না নাবিকরা। কফিন বন্দি মমিটা ক্যাপ্টেনের ঘরেই রাখা। সে ঘরেই তিনি রাতে ঘুমান, বিশ্রাম নেন। কিন্তু একদিনের জন্যও দিনে বা রাতে কোনোদিন এমন কোনো ঘটনা চাক্ষুষ করেননি যা দেখে মমিটার জীবন্ত হয়ে ওঠার ন্যূনতম কোনো আভাস মেলে৷ বেশ কয়েকদিন ইতিমধ্যে কফিনটা খুলে দেখেছেন। ঠিক একইভাবে শায়িত আছে মমিটা। একসময় ক্যাপ্টেনের মনে এই ধারণাই বদ্ধমূল হতে লাগল যে তাঁর নিজের ভাবনাই ঠিক, চার হাজার বছরের প্রাচীন মমি কখনও জীবন্ত হয়ে উঠতে পারে না। সবটাই ছিল নাবিকদের কল্পনা, দেখা বা শোনার ভুল। ক্যাপ্টেন হিসাব করে দেখলেন আর দু-সপ্তাহের মধ্যে মলাক্কা বন্দরে পৌঁছে যাবেন তিনি। উৎফুল্ল হয়ে উঠল ক্যাপ্টেনের মন। কিন্তু কথায় বলে, বিপদ চলে যাবার সময় একটা শেষ কামড় দিয়ে যাবার চেষ্টা করে। আর তেমনই ঘটল ব্রিটিশ-বাণিজ্যতরি ওথেলোর ক্ষেত্রেও।
ভারত মহাসাগরে সেবার কিছুদিন আগেই বর্ষা নামল। মহাসাগরে মাঝামাঝি এসে উপস্থিত হয়েছে জাহাজ। শুরু হল প্রবল বর্ষণ আর বজ্রপাত। তবু তার মধ্যে দিয়েই দিনরাত এগোতে থাকল জাহাজ। একদিন একটা বাজ এসে পড়ল জাহাজের গায়ে। শক্তপোক্ত জাহাজ ওথেলো। বাজের আঘাতে জাহাজের কোনো ক্ষতি না-হলেও অন্য একটা বিপদ ঘটল তার ফলে। বজ্রপাতের প্রভাবে জাহাজের কম্পাসগুলো সব বিকল হয়ে গেল। কম্পাসহীন জাহাজ অনেকটা মানুষের অন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো। তার ওপর দিনের বেলাতেও ঘন বর্ষার মেঘে আচ্ছন্ন আকাশ। সূর্য কোনদিকে উঠছে তাও ঠাহর করা যাচ্ছে না। তবুও তারই মধ্যে অনুমানের ভিত্তিতে জাহাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে লাগলেন ক্যাপ্টেন। ঝড়, বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণই চোখে পড়ল না।
এরপর একদিন, দ্বিতীয় বিপত্তিটা ঘটল। বয়লার ঘরের ডেভিডের যে সহকারী সাহস দেখাতে গিয়ে মমির গায়ে আঘাত হেনেছিল সেই হেনরি নামের লোকটা কাণ্ডটা ঘটাবার পর প্রচণ্ড ভয় পেতে শুরু করেছিল। তার মনে এই ধারণা বদ্ধমূল হতে শুরু করেছিল যে মমিটা যে কোনোভাবে তার ওপর প্রতিশোধ নেবে। দিনে, রাতে কোনো সময় সে একলা থাকতে চাইত না। এমনকী রাতেও সে মমির ভয়ে জেগে বসে থাকত।
জাহাজের কঠিন কাজ আর সহজ কাজগুলো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বন্টন করা হয় নাবিকদের মধ্যে। বর্ষার সমুদ্রে ডেকে রাত-পাহারার কাজ সব থেকে কঠিন কাজ। বৃষ্টি আর প্রবল বাতাসের দাপটে ভিজতে ভিজতে জাহাজের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত পাহারা দিতে হয় । ক্যাপ্টেনের নির্দেশ আর কেউ অমান্য করার সাহস পায় না বলে ডেকে রাত-পাহারার ব্যবস্থা চালু আছে। হয়তো-বা কেউ কেউ মনে ভয় নিয়েই সামিল হয় রাত-পাহারাতে। প্রতিদিন দু-জন করে লোক সে কাজে নিযুক্ত থাকে। সকাল থেকেই সেদিন আগের দিনের মতোই বৃষ্টি হয়ে চলেছে। ডেকে ভিজে ভিজে কাজ করছে সবাই। ক্যাপ্টেনও আছেন। শেষ দুপুরে তিনি ডেকে উপস্থিত হবার জন্য খবর পাঠালেন সেই হেনরি আর রবার্ট নামের দুজন নাবিককে। তারা এসে উপস্থিত হলে ক্যাপ্টেন তাদের বললেন, ‘আজ তোমরা দু-জন রাত-পাহারা দেবে।’
ক্যাপ্টেনের কথা শুনে ব্রুস নামের লোকটা রাজি হলেও হেনরি ভয়ার্তভাবে বলল, ‘না, রাত-পাহারার কাজ আমি করতে পারব না। এতবড়ো জাহাজ, এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত দেখা যায় না। একলা পেয়ে মমিটা যদি আমার গলা টিপে ধরে তখন?’
ক্যাপ্টেন তার কথা শুনে ধমকে উঠে বললেন, ‘কী আবোলতাবোল বলছ তুমি। মমিটা বাক্সবন্দি অবস্থায় আমার ঘরে রয়েছে। সে যদি জীবন্ত হত তবে কি সে আমার চোখে পড়ত না?’
ক্যাপ্টেনের কথা আস্থা ফেরাতে পারল না হেনরির মনে। সে আবারও বলল, ‘না, আমি রাত-পাহারা দিতে পারব না।’
এবার তার জবাব শুনে খেপে গেলেন ক্যাপ্টেন। কোমর থেকে পিস্তল বার করে সেটা হেনরির দিকে তুলে ধরে বললেন, ‘তুমি যদি রাত পাহারা-না-দিতে চাও তবে আজ সারারাত হাত-পা বেঁধে ফেলে রাখব।’
হেনরি এবার বুঝতে পারল ক্যাপ্টেনের মতের পরিবর্তন হবে না। সে রাজি হোক বা না-হোক তাকে বৃষ্টি-মাখা ডেকের অন্ধকারেই রাত কাটাতে হবে। তার পরিত্রাণ নেই। লোকটা মমির আতঙ্কে এতটাই বিকারগ্রস্ত বা উন্মাদ হয়ে গেছিল যে, সে যেন কল্পনায় দেখতে পেল অন্ধকার ডেকে তার গলা টিপে ধরেছে সেই মমি! কল্পনায় সে দৃশ্য প্রত্যক্ষ করার পর সেই নাবিক তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নিল মমির হাতে অমন ভয়ংকর মৃত্যুর চেয়ে নিজের মৃত্যুকে ডেকে আনা ভালো। আর এই ভাবনার বশবর্তী হয়ে সবাইকে হতচকিত করে হেনরি হঠাৎই ছুট লাগাল জাহাজের রেলিং-এর দিকে। কেউ তাকে বাধা দেবার আগেই রেলিং টপকে ঝাঁপ দিল সমুদ্রের বুকে। মুহূর্তের মধ্যে উত্তাল বর্ষার সমুদ্রের জলরাশি গ্রাস করে নিল তার দেহকে। ভারত মহাসাগরে হারিয়ে গেল নাবিক হেনরি।
ডেকে দাঁড়িয়ে অন্য নাবিকরা প্রত্যক্ষ করল সেই দৃশ্য। এ ঘটনা নাবিকদের মতো ক্যাপ্টেনের মনকে বিচলিত করলেও তা তিনি বাইরে প্রকাশ করলেন না। রাত-পাহারাতে হেনরির স্থানে নতুন লোক নিয়োজিত করে নিজের কেবিনের দিকে পা বাড়ালেন। দুপুর গড়িয়ে বিকেল, তারপর রাত্রি নামল একসময়৷
রাত একটু গভীর হতেই চিফ-মেট মার্টিমারের মাধ্যমে বিশ্বস্ত কিছু নাবিককে ডেকে পাঠালেন তার কেবিনে। ওথেলো জাহাজের নাবিকরা তাদের জন্মসূত্রে দুটো দলে বিভক্ত ছিল। একদল ইংল্যান্ডের লন্ডনের বাসিন্দা ও অন্যদল আইরিশ অর্থাৎ আয়ারল্যান্ডের অধিবাসী। বহির্বিশ্বে ওরা সবাই ইংরেজ বলে পরিচিত হলেও জন্মভূমির শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে এই দু-জাতের লোকদের নিয়ে চাপা রেষারেষি থাকে। ক্যাপ্টেন গ্রেস আর মার্টিমার দু’জনেই ইংল্যান্ডের মানুষ। আর তাদের অনুগত নাবিকরাও সবাই লন্ডনের মানুষ। ক্যাপ্টেন তাদের নিয়ে আলোচনায় বসলেন। তিনি তাদের বললেন, ‘মলাক্কা দ্বীপ বেশি দূর নয়। কিন্তু কম্পাস বিকল হয়ে যাবার কারণে, এই ঝড়বৃষ্টির মধ্যে আমরা কিছুটা অসহায় অবস্থায় পড়েছি। তার ওপর আজকের ঘটনাতো তোমরা সবাই দেখলে। ডেভিড, হেনরি দুজনেই আইরিশ ছিল। এ ঘটনার বিকট প্রভাব পড়তে পারে আইরিশ নাবিকদের মধ্যে। তাই তোমরা সবাই সবসময় সজাগ থাকবে। তলোয়ার ধরার জন্য প্রস্তুত থাকবে। যেভাবেই হোক মলাক্কা দ্বীপ আমাদের পৌঁছোতে হবে।’
এরপর ঝঞ্ঝাবিধ্বস্ত সমুদ্রের প্রতিকূলতাকে কীভাবে কাটিয়ে নির্বিঘ্নে মলাক্বা বন্দরে পৌঁছোনো যায় তা নিয়ে বিশ্বস্ত সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করলেন ক্যাপ্টেন।
ক্যাপ্টেন গ্রেসের আশঙ্কা কিন্তু অমূলক ছিল না। সেদিন আরও একটু বেশি রাতের দিকে জাহাজের খোলের অন্ধকারে মাল্লা সর্দার ফার্গুসনের আহ্বানে জড়ো হল কিছু নাবিক। ফার্গুসন নিজে আইরিশ। যারা সেখানে জড়ো হল তারাও সবাই আইরিশ। আর তাদের অধিকাংশেরই ডেভিডের মতোই অপরাধের অতীত আছে। শর্তসাপেক্ষে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছে তারা। তাদের দেশে ফিরলেও চলে, না-ফিরলেও চলে। আর দীর্ঘদিনের নাবিক ফার্গুসনেরও মাটির প্রতি খুব একটা পিছুটান নেই। জীবনের অধিকাংশ সময় সে সমুদ্রের বুকেই জীবন কাটিয়েছে। ক্যাপ্টেন গ্রেসের সর্বসমক্ষে তাকে চড় মারার অপমান কিছুতেই সে মেনে নিতে পারেনি। ভিতরে-ভিতরে সে নিজেকে প্রস্তুত করে নিয়েছে ক্যাপ্টেনের বিরুদ্ধে নির্মম প্রতিশোধ নেবার জন্য। তাই এই গোপন সভার আয়োজন।
সে উপস্থিত নাবিকদের বলল, ‘আজকের ঘটনার কথা তো তোমরা সবাই জানো। আমরা নিজের জাতের দুজন লোককে ইতিমধ্যে হারালাম। আর আমাকে সবার সামনে অপমান করা হল সেটাও তোমরা দেখেছ। আর এ সবের মূলে দায়ী ওই ক্যাপ্টেন আর মমিটা। আমরা আইরিশ বলেই কি আমাদের মৃত্যু, অপমান সহ্য করতে হবে?’
এ কথা বলার পর তার সঙ্গীদের মনে ভয় ধরানোর জন্য ফার্গুসন বলল, ‘আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ক্যাপ্টেন গ্রেস কালো-জাদু জানে। ওর সম্পর্কে আমি একথা অনেকজনের মুখে আগে শুনেছি। সে কাজের জন্যই ও মমিটাকে জাহাজে তুলেছে। কালো-জাদু দিয়ে ক্যাপ্টেনই মমিটাকে জীবন্ত করে তোলে। ওর নির্দেশেই মমিটা পরিচালিত হয়। সে-কারণে মমিটা ত্যাগ করতে ক্যাপ্টেনের এত অনিচ্ছা। ডেভিডের মতো শক্তিশালী, সাহসী লোক যেখানে মমিটার সঙ্গে একরাতও কাটাতে পারল না, সেখানে ক্যাপ্টেন রাতের পর রাত মমিটার সঙ্গে এক সঙ্গে কাটাচ্ছে কীভাবে যদি না তার কালো-জাদু জানা থাকে। আমার মনে হয়, ক্যাপ্টেন আর ওই মমিটার জাতক্রোধ আছে আইরিশদের ওপর। আমরা তো এখনও মলাক্কায় পৌঁছোইনি, তার মধ্যেই এত ঘটনা ঘটল। ফেরার সময় আবার দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে হবে আমাদের। এমনভাবেই যদি ক্যাপ্টেনের নির্দেশে সবকিছু চলতে থাকে তবে শেষ পর্যন্ত ক-জন আইরিশ ইংল্যান্ডের মাটিতে ফিরতে পারব তা নিয়ে সন্দেহ আছে।’
সর্দার ফার্গুসনের এই সব সত্যি-মিথ্যে কথায় নাবিকদের কারও ক্যাপ্টেনের প্রতি তীব্র ঘৃণা, আবার কারও মধ্যে প্রাণরক্ষার প্রশ্ন জেগে উঠল। তারা সর্দারকে বলল, ‘এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?’
ফার্গুসন বলল, ‘তোমরা যদি আমাকে সাহায্য করো তবে আমাদের সবারই পরিত্রাণের উপায় আছে। ক্যাপ্টেনকে হত্যা করে জাহাজের দখল নেব আমি। বিদ্রোহ করব আমরা। আমার দীর্ঘদিনের সমুদ্রযাত্রার অভিজ্ঞতা আছে। জাহাজ চালাতে আমার অসুবিধা হবে না। এই ভারত মহাসাগরের বুকে অনেক ছোট বড় দেশ আছে। সেখানে পৌঁছোতে অসুবিধা হবে না। জাহাজটা কে আগুন লাগিয়ে মাঝসমুদ্রে মমি ও ক্যাপ্টেনের সঙ্গীসমেত ডোবাবার ব্যবস্থা করে নৌকা নিয়ে কোনো দেশ বা দ্বীপের মাটিতে নামব আমরা। টাকাপয়সা নিয়ে আমাদের ভাবনা নেই। মশলা কিনে এই খোল ভরাবার জন্য ক্যাপ্টেনের সিন্দুক ভর্তি মোহর আছে। সেগুলো আমাদের কাজে লাগবে। দ্বীপবাসীরা যদি নিরীহ হয় তবে তাদের ওপর কর্তৃত্ব করে বাকি জীবনটা তোমরা আরাম-আয়েশে কাটাতে পারবে। অথবা একটা জলদস্যুর দল গড়ে সমুদ্রে লুঠপাটও চালানো যেতে পারে। তবে জাহাজের দখল যদি নিতেই হয় তবে কাল-পরশুই নিতে হবে। প্রাকৃতিক গোলযোগ আর কম্পাস বিকল হয়ে যাবার জন্য এই মুহূর্তে ঝঞ্ঝাটের মধ্যে আছে ক্যাপ্টেন। আর এই সুযোগটাই আমাদের কাজে লাগাতে হবে।’
বেশ কিছুক্ষণ ধরে ফার্গুসন আর তার সঙ্গীদের মধ্যে আলোচনা চলল। শেষ পর্যন্ত তারা এই সিদ্ধান্ত নিল যে পরদিন রাতেই তারা ক্যাপ্টেনকে হত্যা করে ওথেলো জাহাজের দখল নেবে। তারপর পরিস্থিতি অনুযায়ী ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ঠিক করা হবে। চার্লি নামের একজন এই আলোচনাসভায় উপস্থিত ছিল। সে প্রত্যহ ভোরে ক্যাপ্টেনের কেবিন পরিষ্কার করে। তাকে দায়িত্ব দেওয়া হল। ক্যাপ্টেন যখন প্রাতঃকৃত্যের জন্য কেবিনের বাইরে বেরোবেন তখন সেই সুযোগে তার পিস্তল থেকে গুলি সরিয়ে ফেলার জন্য।
প্রকৃতির নিয়মেই পরদিন সকাল হল। কিন্তু আকাশে এত ঘন মেঘ আর অঝোর বর্ষণ যে সূর্য কোনদিকে তাও ঠিকমতো যেন ঠাহর করা যাচ্ছে না। ক-দিন ধরে যেমন অনুমানের ভিত্তিতে জাহাজ চলছিল। তেমনভাবেই এগোতে থাকল জাহাজ। তবে দুপুরের পর থেকে ঝোড়ো বাতাসের দাপট যেন কিছুটা কমতে শুরু করল, আর সমুদ্রও যেন শান্ত হতে থাকল। যদিও বর্ষণের বিরাম নেই। হাত ঘোরাবার চাকা ধরে বসেছিলেন ক্যাপ্টেন গ্রেস। তিনি চিফ-মেট মার্টিমারকে বললেন, ‘মনে হচ্ছে দুর্যোগ কমে আসছে। তবে মালাক্কা দ্বীপ এখনও সপ্তাহখানেকের পথ। কম্পাস বিগড়ে যাবার ফলে খুব সমস্যা হচ্ছে। তুমি জাহাজ পরিচালনা করো। আমি দেখি কম্পাসটা কোনোভাবে ঠিক করা যায় কি না?’
এ-কথার পর তিনি মার্টিমারের হাতে জাহাজ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে, কম্পাস দণ্ড থেকে কম্পাসটা খুলে নিজের কেবিনে ফিরে গিয়ে সেটা মেরামতের চেষ্টায় বসলেন। সময় এগিয়ে চলল। এরপর সত্যিই সমুদ্র অনেকটাই শান্ত হয়ে এল। বৃষ্টির প্রকোপও অনেকটা কমে এল। অনেকদিন পর শেষ বিকেলে মেঘ কেটে গিয়ে এক ঝলক সূর্যের আলো এসে পড়ল ওথেলো জাহাজের ডেকে। তা দেখে আনন্দে উল্লাসধ্বনি করে উঠল নাবিকরা। ক্যাপ্টেনও সেই চিৎকার শুনে তার কেবিনের বাইরে এসে দাঁড়ালেন। তার মুখমণ্ডলেও খুশির ভাব ফুটে উঠল। তিনি বুঝতে পারলেন, রাতের মধ্যেই বৃষ্টি থেমে গিয়ে সমুদ্রের পরিবেশ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
সূর্যাস্ত হল একসময়। স্বাভাবিক নিয়মেই শুরু হল অন্ধকার নামা। ক্যাপ্টেন তার কেবিনে ঢুকে একটা বড় মোমবাতি জ্বালিয়ে কম্পাস ঠিক করার কাজে নিয়োজিত হলেন। বেড়ে চলল বাইরের অন্ধকার।
একটু রাতের দিকে হঠাৎই চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু হল জাহাজ জুড়ে। একদল লোক তলোয়ার, লোহার দণ্ড, কয়লা ঠেলার কাটাওয়ালা বেলচা নিয়ে নীচ থেকে উঠে আসছে জাহাজের দখল নেওয়ার জন্য। তারা সব আইরিশ-নাবিক। আর তাদের নেতৃত্বে আছে নাবিক-সর্দার ফার্গুসন। তার হাতে একটা দো-নলা পিস্তল। ক্যাপ্টেনকে হত্যা করতে পারলে আর ডেকের বারুদ-ঘরের দখল নিতে পারলেই জাহাজ নিজেদের কব্জায় চলে আসবে ফার্গুসনদের।
ভয়ংকর চিৎকার করতে-করতে ডেকে উঠে এল আইরিশ বিদ্রোহীরা। প্রকৃতি অনেকটা স্বাভাবিক হলেও তখনও টিপটিপ বৃষ্টি হচ্ছে। লোকগুলো ডেকে উঠে এল ঠিকই কিন্তু ক্যাপ্টেনের নির্দেশ মেনে তার অনুগত নাবিকরা অনেকেই সতর্ক ছিল। ফার্গুসনের নেতৃত্বে বিদ্রোহীরা ডেকে উঠে আসতেই গন্ডগোলের আভাস পেয়ে মার্টিমারসহ কয়েকজন নাবিক অস্ত্র হাতে নিজেদের কেবিনে ছেড়ে বেরিয়ে এল। মশালের আলোতে বৃষ্টির মধ্যে দু-পক্ষের মধ্যে শুরু হল তুমুল লড়াই। তলোয়ারের ঝংকার, গুলির শব্দ, নাবিকদের আর্তনাদে ভরে উঠল ডেক। আর এ সবেরই মাঝে কেউ তাকে বাধা দেওয়ার আগেই ফার্গুসন পিস্তল হাতে ছুটল ক্যাপ্টেনের কেবিনের দিকে। সে জানে, ক্যাপ্টেনকে হত্যা করতে পারলেই লড়াই থেমে যাবে। তার লোকজন আত্মসমৰ্পণ করতে বাধ্য হবে।
বিদ্রোহীরা যখন ডেকের ওপর উঠে এল তার মাত্র কিছুক্ষণ আগে শেষ পর্যন্ত কম্পাসটা ভাগ্যক্রমে সারিয়ে ফেলতে সক্ষম হয়েছিলেন ক্যাপ্টেন। কিন্তু কম্পাস জাহাজের যে দিক নির্দেশ করছিল তা দেখে বেশ বিস্মিত বোধ করছিলেন তিনি। ঠিক এরপরই ডেকে চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দ কানে গেল তার। সেই শব্দ শুনে ক্যাপ্টেন অনুমান করলেন বাইরে কী ঘটছে। দেওয়ালের গায়ে টাঙানো পিস্তলটা নামিয়ে তিনি বাইরে বেরোতে যাবেন, ঠিক সেই সময় লাথি মেরে দরজা খুলে উদ্যত পিস্তল হাতে তাঁর ঘরে প্রবেশ করল ফার্গুসন।
কিন্তু জাহাজের ডেকে যে লড়াই চলছিল তা কিন্তু বেশি সময় ধরে চলল না। চিফ-মেট মাটিমার ও তার সঙ্গীরা অধিকাংশই আগ্নেয়াস্ত্র সজ্জিত ছিল। বন্দুক-পিস্তলের সঙ্গে তলোয়ারের লড়াই বেশিক্ষণ চলে না। ক্যাপ্টেনের সমর্থক কয়েকজন নাবিক আহত হলেও বিদ্রোহীদের নিকেশ করে দিল মার্টিমাররা। কয়েকজন বিদ্রোহী আবার বাঁচার জন্য জলে ঝাঁপ দিল, যদিও তাতে তাদের বাঁচার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। একসময় নিস্তব্ধ হয়ে গেল ডেক। তার চারপাশে তখন ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে বিদ্রোহীদের দেহগুলো। তাদের দেখতে-দেখতে মার্টিমার তার সঙ্গীদের বলল, ‘কিন্তু বিদ্রোহীদের পালের গোদা ফার্গুসনটা কোথায়? সে কি সমুদ্রে ঝাঁপ দিল, না কি কোথাও লুকিয়ে পড়ল?’
তার কথা শুনে একজন নাবিক বলল, ‘আমি তাকে ক্যাপ্টেনের কেবিনের দিকে ছুটে যেতে দেখেছি। কিন্তু ক্যাপ্টেন কই? তাকেও তো দেখা যাচ্ছে না।’ একথা শোনামাত্রই আশঙ্কিত মার্টিমার ছুটল ক্যাপ্টেনের কেবিনের দিকে।
সে ক্যাপ্টেনের কেবিনের সামনে পৌঁছোতেই ঘর্মাক্ত কলেবরে বেরিয়ে এলেন ক্যাপ্টেন। তাকে দেখে মার্টিমার বলল, ‘আপনি ঠিক আছেন তো? ডেকে যে বিদ্রোহীরা ছিল, তাদের সবকটাকে নিকেশ করেছি। কিন্তু ফার্গুসন কই?’
ক্যাপ্টেন গ্রেস জবাব দিলেন, ‘আমি ঠিক আছি। ফার্গুসনের মৃতদেহটা কেবিনের মধ্যে পড়ে আছে।’
ডেকের মাঝখানে এসে দাঁড়ালেন ক্যাপ্টেন। বিন্দু বিন্দু বৃষ্টি তখনও পড়লেও আকাশের মেঘ কেটে গেছে। চাঁদের আলোতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সব কিছু। ডেক পরিষ্কারের কাজ শুরু হল। বিদ্রোহীদের মৃতদেহগুলো ছুড়ে ফেলা হতে লাগল। ফার্গুসনের মৃতদেহটাও ক্যাপ্টেনের কেবিন থেকে বের করে এনে সমুদ্রে ছুড়ে ফেলা হল। এসব কাজ যখন শেষের পথে তখন একজন নাবিক হঠাৎ দূরে একদিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলল, ‘আরে, ওদিকে আলো দেখা যাচ্ছে মনে হয়।’
তার দৃষ্টি অনুসরণ করে ক্যাপ্টেনেরও মনে হল মাইল-পাঁচেক দূরে যেন বিন্দুর মতো আলো দেখা যাচ্ছে। ব্যাপারটা কী তা বোঝার জন্য একজন নাবিক একটা দূরবিন আনল। তাতে চোখ লাগিয়ে ক্যাপ্টেন গ্রেস আর মার্টিমার দুজনেই নিশ্চিত হল যে ওই আলোকবিন্দুগুলো বন্দরেরই আলো। সেসময় রাতেরবেলাতে নদীর পাড়ে উঁচু জায়গাতে সার-সার বড়ো অগ্নিস্তম্ভ জ্বালানো হত জাহাজকে বন্দরের অবস্থান জানাবার জন্য। সেই আলোই চোখে পড়েছে ক্যাপ্টেনের।
বিস্মিতভাবে ক্যাপ্টেন বলল, ‘এখানে বন্দর এল কীভাবে? এখন তো বন্দর আসার কথা নয়!’ এ কথা বলার পরই তিনি একজন নাবিককে নির্দেশ দিলেন তার কেবিন থেকে কম্পাসটা আনার জন্য।
কম্পাস নিয়ে হাজির হল নাবিক। সেটা দেখার পর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তিনি মার্টিমারকে বললেন, ‘কম্পাস ঠিক হয়ে গেছে। আর সে জানাচ্ছে গত দশ-বারো দিন দিগভ্রষ্ট হয়ে চলেছি আমরা। জাহাজ ‘বে অফ বেঙ্গল’-এর মোহনায় পৌঁছেছে, আর ওটা কোন বন্দরের আলো দেখা যাচ্ছে জানো? কলকাতা বন্দরের!’
মার্টিমার শুনে বিস্মিতভাবে বলল, “কলকাতা বন্দর! তার মানে ব্রিটিশ উপনিবেশ ভারতবর্ষে এসে পৌঁছেছি আমরা?”
ক্যাপ্টেন বললেন, ‘ঠিক তাই। যৌবনে যখন আমি সাধারণ নাবিক ছিলাম তখন আমি একবার এই বন্দরে এসেছিলাম। বহু ব্রিটিশ রাজপুরুষ বাস করে ওই কলকাতা নগরে।’
মাটিমার এবার বলল, ‘তবে জাহাজের মুখ এবার পিছনে ঘোরাতে বলি?’
মুহূর্তখানেক চুপ করে থেকে ক্যাপ্টেন বললেন, ‘না, আপাতত ওই বন্দরের দিকেই চলো। তবে ওই বন্দরে জাহাজ ভিড়াবো না আমরা। একটা কাজ সেরে ভোরের আলো ফোটার আগেই আবার ফেরার পথ ধরব মলাক্কায় যাবার জন্য।’
মাটিমার জানতে চাইল, ‘কী কাজ সারতে যাবেন আপনি?’
তাকে কিছুটা বিস্মিত করে ক্যাপ্টেন গ্রেস বললেন, ‘জাহাজ ওই বন্দরের কিছুটা দূরে নোঙর করে নৌকা নামিয়ে কয়েকজন মিলে মমিটাকে বন্দরে গিয়ে রেখে আসব।’
ক্যাপ্টেনের ইচ্ছাই পালিত হল এরপর। মধ্যরাতের কিছু সময় পর জাহাজ নোঙর ফেলল ওই বন্দরের কিছুটা তফাতে। ক্যাপ্টেন আর কয়েকজন নাবিক মিলে জাহাজ ছেড়ে মমিসমেত শবাধারটা নিয়ে নৌকা চেপে রওনা হলেন বন্দরের দিকে। টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। তখন বন্দর শুনশান। রাতের অন্ধকারে এই কলকাতা বন্দরে সবার অলক্ষে সেই প্রাচীন মিশরীয় মমিটাকে নামিয়ে রেখে ক্যাপ্টেন গ্রেস ফিরে চললেন তার জাহাজের দিকে। পরদিন ভোরের আলো যখন ফুটল তখন ক্যাপ্টেন গ্রেসের ওথেলো নামের জাহাজ ‘বে অব বেঙ্গল’ ছেড়ে ঝলমল সূর্যালোকে এগিয়ে চলেছে মলাক্কা দ্বীপে পৌঁছোবার জন্য।”
দীর্ঘক্ষণ ধরে বলে চলা কাহিনি শেষ করার পর লোকটা কিংশুককে বলল, “আপনি নিশ্চয়ই এবার জানতে চাইবেন সেই মমিটার তারপর কী হল? জবাবটা আগেই দিয়ে রাখি। কলকাতার ‘এশিয়াটিক সোসাইটি’ তখন তাদের মিউজিয়াম স্থানান্তরিত করেছে পার্ক স্ট্রিট অঞ্চলের বিশাল বাড়িতে। বর্তমানে সেটা ‘ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম’ নামে পরিচিত। তাদের কাছে খবর গেল কলকাতা বন্দরে মমিটা পড়ে থাকার কথা। তারা মমিটা উদ্ধার করে নিয়ে যত্ন করে স্থান দিলেন তাদের মিউজিয়ামে। সে মমি এখনও সেখানেই থাকে।”
লোকটার কথা শুনে কিংশুক বলে উঠল,’ অসাধারণ কাহিনি শোনালেন আপনি। আমি মিউজিয়ামে বেড়াতে গিয়ে ওই মমি দেখেছি। কিন্তু ওই মমিটা কীভাবে মিউজিয়ামে এসে পৌঁছেছিল তা জানতাম না।”
লোকটা যেন হাসল তার কথা শুনে। তারপর বলল, “জানবেন কী করে? ওথেলো জাহাজের কাহিনি তো আর কলকাতা বন্দরে কেউ জানতে পারেনি।”
এ কথা বলার পর আকাশের দিকে তাকাল লোকটা। পুব আকাশে শুকতারা ফুটে উঠেছে। আলো ফোটার পূর্বাভাস। লোকটার গল্প শুনতে-শুনতে কখন যে রাত শেষ হয়ে এসেছে তা বুঝতে পারেনি কিংশুক।
সেই শুকতারাটা দেখার পর লোকটা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “এবার আমি চলি। আলো ফোটার আগে আমায় আবার বাড়ি ফিরতে হবে। বহুদিন পর আমি কাউকে ওথেলো জাহাজের কাহিনিটা শোনালাম।”
এ কথা বলে লোকটা সে জায়গা ছেড়ে এগোতে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই কিংশুক তাকে বলল, “গল্পের একটা ব্যাপার আমার কাছে ঠিক স্পষ্ট হল না। ক্যাপ্টেন গ্রেস তো সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, মমিটা জীবন্ত সে ব্যাপারে প্রমাণ না-মিললে তিনি মমিটাকে ত্যাগ করবেন না। তবে তিনি কেন মমিটাকে এভাবে এ বন্দরে ছেড়ে গেলেন?”
কিংশুকের প্রশ্ন শুনে পা বাড়াতে গিয়েও থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল লোকটা। তারপর বললেন, “হ্যাঁ, একটা ছোট ঘটনার কথা আপনাকে বলা হয়নি। ক্যাপ্টেন গ্রেসের ঘরে ফার্গুসন ঢোকার পর কী ঘটেছিল সেটা। ওটুকু শুনলে আপনি আপনার প্রশ্নের জবাব পেয়ে যাবেন।”
এ কথা বলার পর লোকটা বলল, “ফার্গুসন তো পিস্তল হাতে ঢুকে পড়ল ক্যাপ্টেনের কেবিনে। পিস্তল হাতে মুখোমুখি দাঁড়াল তাঁরা দুজন। ক্যাপ্টেন আর দেরি করলেন না। ফার্গুসন গুলি চালাবার আগেই তিনি তার বুক লক্ষ করে পিস্তলের ট্রিগার টিপলেন। কিন্তু পিস্তল থেকে খট করে একটা শব্দ হল শুধু, গুলি বেরোল না। পাশবিক হাসি ফুটে উঠল ফার্গুসনের ঠোটে। ক্যাপ্টেনের পিস্তলে গুলি নেই। তার পিস্তলের গুলি পরিকল্পনা মতো আগেই সরিয়ে ফেলেছে ফার্গুসনের লোক। ক্যাপ্টেন তা না-জানলেও ফার্গুসনের তা জানা। ফার্গুসন এরপর এক পা-এক পা করে ক্যাপ্টেনের দিকে এগোতে থাকল, আর ক্যাপ্টেনও অসহায় ভাবে এক পা-এক পা করে পিছোতে লাগলেন। নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে খ্রিস্টের নাম নিতে শুরু করলেন তিনি। ফার্গুসন এরপর তার পিস্তল নিশানা করল ক্যাপ্টেনের বুক লক্ষ করে। গুলি চালাবার ঠিক আগের মুহূর্ত। আর ঠিক সেই সময়ই একটা অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটল। মমির সেই কফিনটা ঘরের একপাশে মেঝেতে নামিয়ে রাখা ছিল। ফার্গুসন ঠিক তার কাছেই দাঁড়িয়ে ক্যাপ্টেনকে গুলি চালাতে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই কফিনের ডালাটা শব্দ করে খসে পড়ল। কফিনের মধ্যে থেকে উঠে দাঁড়াল মমিটা। ফার্গুসন গুলি চালাবার আগেই এক হাত বাড়িয়ে পিছন থেকে সে চেপে ধরল ফার্গুসনের ঘাড়। অমানুষিক শক্তি সেই ব্যান্ডেজ জড়ানো হাতে। আর এরপরই মট করে একটা শব্দ শুনলেন ক্যাপ্টেন। ফার্গুসনের ঘাড়টা ভেঙে গেল। মমির হাতের চাপে। এরপর মমিটা হাত সরিয়ে নিতেই ফার্গুসনের দেহটা আছড়ে পড়ল মাটিতে। আর তারপরই মমিটা ধীরে-ধীরে নিস্তেজ হয়ে আগের মতোই শুয়ে পড়ল কফিনের ভিতর। হ্যাঁ, ক্যাপ্টেন শেষপর্যন্ত জানতে পেরেছিলেন মমি জীবন্ত হয়ে ওঠে। পাছে নাবিকরা ভয় পেয়ে যায় সেজন্য তিনি ব্যাপারটা নাবিকদের জানাননি।”
কথা শেষ হল লোকটার। তার গায়ে একটা ঢিলে আলখাল্লার মতো পোশাক। এবার সে পা বাড়াল ফেরার জন্য। লোকটার বলা কাহিনির এ অংশ শুনে কিংশুক অবাক হয়ে গেল। সে লোকটাকে প্রশ্ন করল, “এ কাহিনি আপনি জানলেন কীভাবে? আপনি কোথা থেকে কলকাতায় এসেছিলেন?”
এ প্রশ্নের জবাবে কিংশুককে আরও বেশি বিস্মিত করে লোকটা জবাব দিল, “জানব না কেন? আমি তো সেই জাহাজেই ছিলাম। আমি এখানে এসেছিলাম আলেকজান্দ্রিয়া থেকে।”
এ কথা বলে একটু ঝুঁকে, মৃদু খোঁড়াতে-খোঁড়াতে জোব্বা-পরা লোকটা তার চোখের সামনে দিয়ে শেষ রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করল। টিংটিং করে সাইকেলের ঘণ্টি কানে এল তার। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে-সঙ্গেই খবরের কাগজওয়ালা খবরের কাগজ দিতে বেরিয়েছে। একটা কাগজ কিনে কিংশুক ঘরে ফিরে এল।
পরিশিষ্ট
লোক এসে কিংশুকের ঘরের পাখাটা বদলে দিয়ে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই একজন লোক আসবে তাকে বন্দরের অফিসে নিয়ে যাবার জন্য। স্নান-খাওয়া সেরে বাইরে বেরোবার জন্য তৈরি হয়ে যে তাকে নিতে আসবে তার প্রতীক্ষা করতে-করতে সকালের কেনা সংবাদপত্রের পাতা ওলটাচ্ছিল। হঠাৎ কাকতালীয়ভাবে পাঁচমিশালি খবরের পাতায় একটা মমির ছবি চোখে পড়ল তার। কলকাতার জাদুঘরের মমির ছবি। বেশ কয়েকটি লাইনও লেখা আছে মমিটার সম্পর্কে। তা হল—
“কলকাতার জাদুঘরে রক্ষিত এই মমিটি জাদুঘরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। গবেষকরা পরীক্ষা করে দেখেছেন কাচের আধারে কাঠের শবাধারে শায়িত এই মিশরীয় মমিটি চার-হাজার বছরের প্রাচীন। তার পায়ের ও পিঠের পিছনে আঘাতের চিহ্ন আছে। এশিয়াটিক সোসাইটির প্রাচীন নথি থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় আনুমানিক ১৮৮০ থেকে ১৮৮২ সালের মধ্যবর্তী কোনো সময় লিনেন কাপড়ে জড়ানো এই প্রাচীন মমিটি সোসাইটির হাতে আসে। তার আগে বেশ কয়েকবার সোসাইটি মমি সংগ্রহ করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছিল। কিন্তু এই মমিটি অদ্ভুতভাবেই তাদের হাতে আসে। শোনা যায়, কোনো এক জাহাজি নাকি এই মমিটি কোনো এক দেশ থেকে সংগ্রহ করে অন্য কোনো দেশে নিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু মমিটি জাহাজে ওঠাবার পর নানা ভৌতিক ঘটনা ঘটতে থাকায় জাহাজের ক্যাপ্টেন এই মমি কলকাতা বন্দরে রাতের অন্ধকারে নামিয়ে রেখে নিজেদের গন্তব্যে পাড়ি দেন। অতঃপর মমিটি এশিয়াটিক সোসাইটির হস্তগত হয়। জাদুঘরের পুরোনো কর্মীদের মধ্যে কারও কারও বক্তব্য হল নৈশ প্রহরার সময় তারা না কি এই মমির জীবন্ত হয়ে ওঠা টের পেয়েছেন। দূর থেকে তারা দেখেছেন একটা ছায়া যেন রাতের অন্ধকারে ঘুরে বেড়ায় কলকাতার জাদুঘরে।”
লেখাটা পড়ার পর বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল কিংশুক। তার মনে হতে লাগল গতরাতের লোকটা এত নিখুঁতভাবে তার কাহিনিটি বর্ণনা করল কীভাবে? কাগজে মমিটার পায়ে ও পিঠে যে আঘাতের কথা বলা হয়েছে তা কি সেই হেনরির আঘাতের ফলেই হয়েছিল? লোকটা যাবার সময় যে কথাগুলো বলে গেল তা কি তবে সত্যি? ওই ব্রিটিশ জাহাজে চেপেই একদিন আলেকজান্দ্রিয়া থেকে সে উপস্থিত হয়েছিল কলকাতার মাটিতে! কিংশুকের চোখে ভেসে উঠল ভোররাতের সেই শেষ দৃশ্যটা— জোব্বার মতো পোশাক পরে খুড়িয়ে খুড়িয়ে অন্ধকারের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে লোকটা। তার পোশাকটা কি তবে লিনেনের ছিল? খবরের কাগজে তো মমির গায়ের পোশাকটা লিনেনেরই লেখা আছে। আর লোকটাও তার গল্পে একই কথা বলেছিল।
সমাপ্ত
